আল-জাজিরার প্রতিবেদন – চটকদার অন্তঃসার শূন্যতা

হাসান জামান টিপু ॥ ফেব্রুয়ারির প্রথমদিন কাতারভিত্তিক আল জাজিরা টেলিভিশনে All the prime minister’s সবহ নামে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথমপর্ব প্রচারিত হলো তাতে বাংলাদেশের জনমত দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। সরকার কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবনে ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে। জনগণের যে অংশটি সরকারবিরোধী তারা উল্লাসিত এই জন্য যে প্রতিবেদনটিতে সরকারের মধ্যে যে মাফিয়া তন্ত্রের প্রভাব এতো গভীর তাতে তারা জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়ার উল্লাসিত এবং ভবিষ্যতে সরকার পতনের একটা ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। তারা আরও উল্লাসিত কারণ জানা গেছে এরকম আরো পর্ব ধারাবাহিকভাবে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা দেশের গোপনীয় ও স্পর্শকাতর কিছু বিষয় একটা বিদেশী টিভি ক্যামেরা ধারণ করে নিলো যা সচেতন মানুষকে ভাবাচ্ছে।

All the prime minister’s সবহ এ কি কি আছে ?

১. সেনা প্রধানের পরিবারের লোকজন মাফিয়া, খুনি ও সরকারের অনুকম্পা পাওয়ার অভিযোগ।

২. বিডিআর প্রধান থাকাকালে সরকারকে ভোটে জয় ও সেনা প্রধান হিসাবে সরকারকে পূর্ণ অনৈতিক সহায়তা করা।

৩. হাঙ্গেরির মাধ্যমে ইসরাইলি স্পাইওয়্যার নামক অত্যাধুনিক গোয়েন্দা

সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া।

৪. সেনা প্রধানের ভাই মন্ত্রী, এমপি ও সরকারের নানান মহলে ঘুষ দিয়ে বা ভাগ বাটোয়ারার মাধ্যমে টেন্ডার পাইয়ে এবং তারা ২০% হারে কমিশন নিয়ে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ।  

৫. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিয়াল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। 

৬. বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলি সেনা প্রধান আজিজ সাহেবের ভাইকে সহযোগিতা করে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ডকুমেন্টারিটি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে তৈরি এবং উন্নতমানের নির্মাণ। প্রাথমিক একটা উত্তেজনা তৈরি করতে এটি সুড়সুড়ি দেয় বটে তবে দীর্ঘস্থায়ী কোন প্রতিক্রিয়া তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এই প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু সেনাবাহিনী, বিডিআর, র‌্যাব ও পুলিশ ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা একটা একপেশে প্রোপাগান্ডার অংশ, যথেষ্ট যুক্তিনির্ভর নয়। দেশে একাধিকবার বিভিন্ন অপকর্মের বা অপরাধের দায়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক, পরে বিদেশে পলাতক একজন বিদেশে বসে বললো, আর তা সত্য হিসাবে প্রচার করা যথেষ্ট তথ্যপূর্ণ না হলে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে এমন প্রতিবেদন করার আগে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকা বাঞ্ছনীয় ছিলো। দেশী বিদেশী যে কোন সাংবাদিকের জন্য এটা আবশ্যক। নিরপেক্ষতা ও নির্মোহতা সাংবাদিকতার অন্যতম হাতিয়ার অন্যথায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, নিছক প্রোপাগান্ডা হিসেবে গণ্য হয়। এতে সংবাদের উৎসগুলি যথেষ্ট নির্ভরশীল নয়। তাদের অন্যতম সোর্স সামি একজন মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করে তার মানে দালাল নিজেও একজন অপরাধী। এই দালালের সাথে হারিসের আলাপচারিতায় বিভিন্ন প্রসঙ্গ এসেছে। যা রাজা উজির মারার মতো বাগাম্ভরপূর্ণ যা প্রায়শ একজন স্বল্প-শিক্ষিত মাত্রাজ্ঞানহীন মানুষ করে থাকে। সামির দেওয়া তথ্য কখনোই গ্রহণযোগ্য নয় যতক্ষণ না সেগুলি যথেষ্ট তথ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশে পারিবারিক বন্ধন অনেক দৃঢ়, মানুষজনও বেশী ক্ষমতায় থাকা লোকগুলিকে বেশী মাত্রায় তোয়াজ করে এগুলো এদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ। এতে যদি আইনে ব্যত্যয় না ঘটে তবে তা আলোচ্য হতে পারে না। 

কমিশনে বা দালালদের মাধ্যমে এদেশে কেন সারা বিশ্বেই ব্যবসা বাণিজ্য হয়ে থাকে সেখানে ২০% একটা অবাস্তব অংক। এরকম কমিশন দিয়ে কেউই ব্যবসা করবে না। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ভেদে এটা ১-৩% হতে পারে। কেউ একজন ব্যবসা পেতে সাহায্য করলে পারিশ্রমিক হিসাবে টাকা পেতেই পারে। সামরিক সরঞ্জাম যদি ইসরায়েল থেকে তৃতীয় কোন দেশের মাধ্যমে এসে থাকে এটা এই প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়নি।

আলজাজিরা বাংলাদেশকে নিয়ে বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকারের রাজনৈতিক আদর্শের উল্টো দিকে চলা একটা সংবাদ মাধ্যম। এরা এর আগে হেফাজত নিয়ে যে রিপোর্ট করেছিলো তা মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে হয়েছিলো যা প্রমাণিত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও আল জাজিরার ভূমিকা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো যা দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। 

সেনাপ্রধানের নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রীর লোক হবেন সেটাও স্বাভাবিক আর তিনি যে তার আতœীয় স্বজনের অপরাধের দায় নেবেন তাও নয়। তার ভাইদের তিনি যদি সাহায্য করেও থাকেন এবং তা যদি আইনভঙ্গের কারণ না হয় তবে সমস্যা কোথায়? আল জাজিরা যদি নিরপেক্ষ হতো তাহলে বাংলাদেশের পজিটিভ খবরগুলিও প্রচার করতো যা তারা কখনোই করে না। তাই সংবাদমাধ্যম হিসেবে তারা যে বিশ্বাসযোগ্যতা সে দাবী করতে পারে না। এতে ধারণা হয় বিশেষ উদ্দেশ্যে এই ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছে চটকদার মাল মসলায়। তাঁরা যে তাদের ফুটেজে অনেক কাট পেস্ট করেছে, তাও প্রমাণিত হয়ে গেছে। এতেও রিপোর্ট গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। যা সাংবাদিকতা কিংবা ডকুমেন্টারি তৈরির নীতিমালার চরম  ব্যত্যয়।

তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ যে নিজে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে একটা অবস্থানে পৌঁছেছে তা একটা সিনেমাটিক সাফল্যের গল্প শুধু নয়, এখানে অনেক ধরণের আপোষ ও চাতুর্যময় সিদ্ধান্তের ব্যাপার থাকে, থাকে অনেককিছুই উপেক্ষা করার যার মধ্য দিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া

যায়।  সে প্রচেষ্টার রাস্তা কখনোই সরলরৈখিক নয়, মসৃণ নয়। সংবাদমাধ্যমকে সেই পরিক্রমাটা নির্মোহভাবে তুলে ধরতে হয় তা না হলে সংবাদ মাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। স্মরণ রাখতে হবে এটা নাগরিক সাংবাদিকতার যুগ, এখানে তথ্য লুকানো বা ম্যানুপুলেট করা খুব কঠিন।