আল্লাহ্ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালোবাসেন না – আল্ কুরআন

সংলাপ ॥ নাস্তিক’ উপাধি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা ও তারপর পুড়িয়ে ফেলার মতো বর্বরতা আবারো শংকিত করে তুলেছে জাতিকে। মধ্যযুগীয় বর্বরতা এই আধুনিক বাংলাদেশে এটা ভাবতেই চিন্তাজগতে এক ভয়ংকর আতংক দানা বাধে। ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের বর্তমান অবস্থানে বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর বিভিন্ন স্থানে হিংস্রাত্মক আক্রমণের প্রেক্ষিতে এবং তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামের নেতাদের সাম্প্রতিক উস্কানীমূলক ধর্মান্ধ রাজনৈতিক বক্তব্য  দেশের নিরীহ মানুষ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট হুমকি বলে চিন্তাবিদরা ধারণা করছেন। এ ধরনের বক্তব্য ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী এবং ধর্মভীরুদের আরো অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে এবং দেশের মধ্যে আরো বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে বলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত।

সরকার ও বিরোধী দলীয় রাজনীতিকদের ধর্ম নিয়ে সেরূপ হীনকৌশল অবলম্বন করাকে ধর্মভীরু দেশের ৭৫ ভাগ মানুষ কোন চোখে দেখছে এটা সহজেই অনুমেয়। রাজনৈতিক স্বার্থলোভী তথাকথিত ইসলাপন্থীরা ধর্মের লেবাস পরে যখন ধর্মান্ধতার আশ্রয় নিচ্ছে, হীনতার আশ্রয় নিচ্ছে তখনই মনে সংশয় হয় নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর শান্তি (ইসলাম) ধর্ম কোন দিকে বাঁক নিচ্ছে। মুহাম্মদী ইসলাম থেকে আমরা আজ দেড় হাজার বছর দূরে। দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রকৃতি বা স্বভাবের পরিবর্তনের  দিকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। প্রকৃতির ধর্মই হলো সত্যের নিগূঢ় রহস্য। সেই সত্যের নিগূঢ় তত্ত্ব ও রহস্য সময় ও পরিবেশের সাথে সাথে উদ্ঘাটন করাই কুরআনিক মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কুরআনে বলা হয়েছে – আল্লাহ সৃষ্ট প্রকৃতিকে তোমরা আবশ্যক করে ধরো যে প্রকৃতির উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। আর উহাই সুদৃঢ় দ্বীন। বর্তমানে আলেম, তালেবে এল্ম,  ধর্ম শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে যে ধর্মান্ধতা রয়েছে তা অসংখ্য ধর্মীয় পুস্তক রচনার মধ্যে বিদ্যমান। সেজন্য সংশোধনের নিমিত্তে নিজেদেরকেই প্রথমে এগিয়ে আসা শ্রেয়, অন্যকে দোষী করে নয়।

নাস্তিক বলার প্রবণতা অনৈসলামিক এবং এ সম্বন্ধীয় কোনো বক্তব্য নিজের হীনতারই প্রমাণ। কুরআন-হাদিসের দলীলে এসব হীনকর্মকা- সম্বন্ধে সতর্ক করা হয়েছে এবং সম্ভ্রান্ততার উচ্চমার্গের তালিম দেয়ার উপদেশ দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ধর্মান্ধ নেতাদের বক্তব্যের একটা অংশের প্রতি পাঠককূলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। দুঃখজনক হলেও সত্য তারা বিবৃতিতে এমন কথাও বলেছেন যার সারমর্ম হলো – তারা ছাড়া অন্যদেরকে লাঠি দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের মা-বোনদের হামলা করতে হবে। এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় তারা হামলা করার পক্ষে। অপর এক ধর্মবেত্তাও ঠিক একই কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, সরকার দলীয়দের মধ্যে নাস্তিক আছে, তাদের ছোটো করে দেখা মোটেই ঠিক হবে না (!)।

আমাদের মনে রাখা দরকার প্রত্যেকটা মানুষ একেকটি সংগঠক ও প্রতিষ্ঠান। অগণিত অসংখ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের ধর্মভীরু লোকেরা এসব এলোমেলো বক্তব্য থেকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে সে দায়িত্ব কার উপর বর্তাবে? তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থী ধর্মবেত্তারা কি এর উত্তর দিতে পারবেন?

কুরআনের একটি আয়াত – নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি হয়েছে এবং সাহাবীগণ ও নাসারাগণ যে কেউ ঈমান আনে আল্লাহর উপর এবং শেষ দিনের উপর এবং যোগ্য হয়ে কাজ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই। তাদের উদ্বিগ্নতাও থাকবে না (সূরা মায়েদা)। এখানে ইহুদি-নাসারা যে দুটি সম্প্রদায় কুরআনের পাঠকদের নিকট বেশি পরিচিত সে দুটি ছাড়া অন্য একটি সম্প্রদায়ের কথাও বলা হয়েছে অর্থাৎ সাহাবীগণ। এ সাহাবীগণ অপরিচিত। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের ঐশ্বী গ্রন্থধারীদেরকেই আমরা নির্দ্বিধায় এশব্দ দ্বারা বুঝে নিতে পারি।

অর্থাৎ যারাই বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতার সাথে কাজ করবে তাদের পুরস্কার নিশ্চিত করা হয়েছে। এটাই তো যে কোনো জাতির প্রগতির প্রাথমিক পদক্ষেপ। আউলিয়াদের শানেও ঠিক একই কথা বলা হয়েছে – তাদের কোন ভয় নেই তারা উদ্বিগ্নও থাকবে না। অন্য আরেকটি আয়াত – যদি তারা তাওরাত ও ইঞ্জিল এবং তাদের প্রভূর নিকট থেকে তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা দাঁড় করাতো তাহলে তারা তাদের উর্দ্ধদেশ থেকে এবং তলদেশ থেকে ভক্ষণ করতে পারতো (সূরা মায়েদা)। আজকের যুগে আমরা দেখছি ইহুদি ও খৃষ্টান সম্প্রদায় অধিক ভক্ষণ করছে। মাটির নিচের খনিজ সম্পদও তারাই জ্ঞান অন্বেষণের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে। আকাশ থেকে সেই একই জ্ঞান তারাই অর্জন করছে।

এসব আয়াত থেকে বিশ্ববাসীকে এক কাতারে দেখার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। সবাই মুক্তিপ্রাপ্ত হতে পারে যদি তারা বিশ্বস্ত আর যোগ্য হয়। অন্যত্র বলা হয়েছে – হে যারা ঈমান এনেছো কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে বিদ্রƒপ না করে। তারা ওদের থেকে উত্তম হতে পারে। নারীরাও যেন অন্য নারীদেরকে বিদ্রƒপ না করে। ওরা তাদের চাইতেও উত্তম হতে পারে এবং তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না। একে অপরকে অবজ্ঞাসূচক উপনাম দিয়ে ডেকো না। ঈমান আনার পর দোষণীয় নাম বড়ই নিন্দনীয় এবং যারা এরপর তওবা করবে না তারাই জালেম। এখানে কোনো সম্প্রদায়কে হীনভাবে সম্বোধন না করার আদেশ দেয়া হয়েছে। অনেকে বলে থাকেন এখানে ঈমানদারদের মাঝে পরস্পরের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এখানে কিন্তু তা বলা হয়নি। শুধু সম্প্রদায় বলা হয়েছে। তোমাদের মাঝে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে এরূপ করবে তা বলা হয়নি। যদি কেউ এরূপ বুঝেও থাকেন তবুও তিনি আরো মহান হতে পারেন। যেখানে নিজেদের মাঝে হীন সম্বোধন নিষেধ করা হয়েছে সেখানে অন্য সম্প্রদায়কে হীন সম্বোধন করার তো প্রশ্নই ওঠে না।

আজকের বাংলাদেশের ধর্মান্ধ উগ্রবাদী মুসলমানদের বক্তব্য ও আচরণে দেশের সাধারণ মানুষ ও  সারা পৃথিবী বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে।  কেউ কাউকে মুসলমানই মনে না করেন সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু তাই বলে তাদেরকে হেয়ভাবে সম্বোধন করার কোন অধিকারই কুরআন কাউকে দেয়নি। পৃথিবীর কোন সভ্য লোক একাজ করতে পারে না। কোনভাবেই তাদেরকে নিয়ে হীন মন্তব্য করার মজলিস বা বৈঠক বা সম্মেলন উম্মতে মুহাম্মদীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা চিন্তাশীল ব্যক্তির জন্য প্রকৃতিগতভাবেই সত্যই লজ্জাজনক ব্যপার । তবে প্রকৃতি খারাপ হয়ে গেলে তো কোনো কথাই নেই।

এবার হাদিসের আলোকে এসব অবাঞ্চিত কর্মের অবস্থান কোথায় দেখুন। হযরত আনাস থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেছেন রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বলেছেন, ঈমান এর মূলবিষয়ঃ যে ব্যক্তি বলেছে – লা ইলাহা  ইল্লাল্লাহ্  কিন্তু বাকি অংশ রপ্ত করেনি তার থেকে বিরত থাকো। তাকে কোনো গুনাহের কারণেই কুফর দ্বারা সম্বোধিত করো না । এখানে মুহাম্মদ  (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর কথা উল্লেখ করা হয়নি। কেউ হয়তো বলবেন মুহাম্মদের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) উপর ঈমান আনার বিষয়টি এখানে উহ্য আছে। রাসুল’তো বলেননি বরং রাসুল এখানে উদারতার শিক্ষা দিয়েছেন। রাজনৈতিক ইসলামপন্থী ও ধর্মবেত্তারা কেন সেই উদারতার শিক্ষা গ্রহণ করবেন না? কাউকে নাস্তিক ও কাফির বলার মধ্যে কি রহস্য আছে? অপর একটি হাদিসে  বলা হয়েছে কে কাফির আর কে কাফির নহে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জিম্মায়। যে ব্যক্তি আমাদের সালাত করে এবং আমাদের কেবলাকে সামনে রাখে এবং আমাদের জবাই করা মাংস খায়, সে মুসলিম। সে আল্লাহ্র জিম্মায় এবং তাঁর রাসুলের জিম্মায়।’ এখন প্রশ্ন যা আল্লাহর জিম্মায় তা নিয়ে ধর্মান্ধরা নাক গলাতে যাচ্ছেন কেন? আজকে মুসলমানরা এসব মহান শিক্ষা উপলব্ধি করতে অক্ষম কেন?

বিভিন্ন দেশের ধর্মান্ধ জুব্বাধারী তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা সন্ত্রাসী নামে বিশ্বে পরিচিত হচ্ছে। এটাই জালিম আর মজলুমের মধ্যে তফাৎ। যা হোক কাফের বা নাস্তিক বলার কোন ক্ষমতাই আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের ইসলামের শিক্ষায় নেই। এছাড়া ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, কোন ব্যক্তির কথায় যদি এক দৃষ্টিকোণ থেকে ঈমানী ব্যাখ্যা করা যায় আর নিরানব্বই দৃষ্টিকোণ থেকে কুফরী ব্যাখ্যা করা যায় তবে ঈমানী ব্যাখ্যাটি নিতে হবে। এরপরেও চিন্তার অবকাশ আছে যে, কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে – তারাই কাফির, তারাই জালিম, মুশরিক, ফাসিক ইত্যাদি। বিষয়গুলো খুবই গভীর উপলব্ধির বিষয়। দিব্যজ্ঞানী চিন্তাবিদগণই একমাত্র শব্দগুলোর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে ইতিহাস প্রমাণ দেয়। কুরআন বলছে – হে প্রশান্ত প্রাণ, তুমি তোমার প্রভুর দিকে ফিরে আসো যে অবস্থায় তুমিও তোমার প্রভুতে সন্তুষ্ট আর তিনিও  তোমার উপর সন্তুষ্ট। বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন সময়, পরিবেশ ও ব্যক্তি অবস্থানকে কেন্দ্র করে কাফির, মুশরিক, ফাসিক ইত্যাদিতে সম্বোধন করার অর্থই হলো যাতে সমগ্র মানবজাতি নিজেদের কর্মকান্ড নিয়ে সতর্ক থাকে। কিন্তু কোন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে  গালাগালি দেয়ার জন্য নয় বলে ইসলামি চিন্তাবিদগণ বিশ্বব্যাপী অভিমত ব্যক্ত করেছেন ও করছেন। ইসলামে  কোনো  গীবত, গালাগালি, হীন নামে ডাকাকে  কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, যেহেতু এগুলো সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনে। শান্তি (ইসলাম)- এ কঠোরভাবে এই বিপর্যয়কে ঠেকানোর উপাদান দেয়া হয়েছে। তাই মুসলমানদের কুরআনকে গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে আঁকড়ে ধরতে হবে। কুরআনে বারবার বলা হয়েছে – যদি তারা উপলব্ধি করতে পারে তবেই তারা সফলকাম। মোটকথা কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে কোন গালাগালি করা কখনো ইসলাম প্রশ্রয় দেয় না। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে উগ্র ধর্মান্ধরা ক্ষমতার লোভে আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের আসন দখল করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন!

ভাবতে অবাক লাগে যে, মুসলমানরা কি করে এই হীন ফতোয়াবাজিতে পতিত হলো? সর্বশেষে ধর্মান্ধ রাজনৈতিক ইসলামপন্থী, ধর্মব্যবসায়ী ও ধর্মবেত্তারা নাস্তিক ও কাফের ফতোয়া দেয়ার হীন চর্চা থেকে বিরত থাকবেন, বাংলাদেশে শান্তি (ইসলাম) রক্ষার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করবেন এবং মজলুম সম্প্রদায়গুলো স্বাধীনভাবে স্ব-স্ব বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে  বাংলাদেশব্যাপী শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠায় ও সার্বিক প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার দিক নির্দেশনা দেবেন এটাই জাতির প্রত্যাশা। বাংলাদেশের আপামর জনতা ভালো করেই জানে শান্তি (ইসলাম) কি। মিথ্যাচার করে, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে দেশের অগ্রগতি সাময়িক স্থগিত করা যাবে, সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করে মানব সমাজের মধ্যে কেবল বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করা যাবে, কোন কল্যাণতো নয়ই। কিন্তু তারপরও কি সীমালঙ্ঘনকারীরা বুঝতে পারবে না? কি হবে তাদের সময়ই তা বলে দেবে এবং একমাত্র আল্লাহই তা ভালো জানেন! আমরা জানি, নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না।

আল্লাহ্ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালোবাসেন না – আল্ কুরআন

সংলাপ ॥ নাস্তিক’ উপাধি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা ও তারপর পুড়িয়ে ফেলার মতো বর্বরতা আবারো শংকিত করে তুলেছে জাতিকে। মধ্যযুগীয় বর্বরতা এই আধুনিক বাংলাদেশে এটা ভাবতেই চিন্তাজগতে এক ভয়ংকর আতংক দানা বাধে। ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের বর্তমান অবস্থানে বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর বিভিন্ন স্থানে হিংস্রাত্মক আক্রমণের প্রেক্ষিতে এবং তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামের নেতাদের সাম্প্রতিক উস্কানীমূলক ধর্মান্ধ রাজনৈতিক বক্তব্য  দেশের নিরীহ মানুষ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট হুমকি বলে চিন্তাবিদরা ধারণা করছেন। এ ধরনের বক্তব্য ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী এবং ধর্মভীরুদের আরো অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে এবং দেশের মধ্যে আরো বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে বলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত।

সরকার ও বিরোধী দলীয় রাজনীতিকদের ধর্ম নিয়ে সেরূপ হীনকৌশল অবলম্বন করাকে ধর্মভীরু দেশের ৭৫ ভাগ মানুষ কোন চোখে দেখছে এটা সহজেই অনুমেয়। রাজনৈতিক স্বার্থলোভী তথাকথিত ইসলাপন্থীরা ধর্মের লেবাস পরে যখন ধর্মান্ধতার আশ্রয় নিচ্ছে, হীনতার আশ্রয় নিচ্ছে তখনই মনে সংশয় হয় নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর শান্তি (ইসলাম) ধর্ম কোন দিকে বাঁক নিচ্ছে। মুহাম্মদী ইসলাম থেকে আমরা আজ দেড় হাজার বছর দূরে। দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রকৃতি বা স্বভাবের পরিবর্তনের  দিকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। প্রকৃতির ধর্মই হলো সত্যের নিগূঢ় রহস্য। সেই সত্যের নিগূঢ় তত্ত্ব ও রহস্য সময় ও পরিবেশের সাথে সাথে উদ্ঘাটন করাই কুরআনিক মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কুরআনে বলা হয়েছে – আল্লাহ সৃষ্ট প্রকৃতিকে তোমরা আবশ্যক করে ধরো যে প্রকৃতির উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। আর উহাই সুদৃঢ় দ্বীন। বর্তমানে আলেম, তালেবে এল্ম,  ধর্ম শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে যে ধর্মান্ধতা রয়েছে তা অসংখ্য ধর্মীয় পুস্তক রচনার মধ্যে বিদ্যমান। সেজন্য সংশোধনের নিমিত্তে নিজেদেরকেই প্রথমে এগিয়ে আসা শ্রেয়, অন্যকে দোষী করে নয়।

নাস্তিক বলার প্রবণতা অনৈসলামিক এবং এ সম্বন্ধীয় কোনো বক্তব্য নিজের হীনতারই প্রমাণ। কুরআন-হাদিসের দলীলে এসব হীনকর্মকা- সম্বন্ধে সতর্ক করা হয়েছে এবং সম্ভ্রান্ততার উচ্চমার্গের তালিম দেয়ার উপদেশ দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ধর্মান্ধ নেতাদের বক্তব্যের একটা অংশের প্রতি পাঠককূলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। দুঃখজনক হলেও সত্য তারা বিবৃতিতে এমন কথাও বলেছেন যার সারমর্ম হলো – তারা ছাড়া অন্যদেরকে লাঠি দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের মা-বোনদের হামলা করতে হবে। এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় তারা হামলা করার পক্ষে। অপর এক ধর্মবেত্তাও ঠিক একই কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, সরকার দলীয়দের মধ্যে নাস্তিক আছে, তাদের ছোটো করে দেখা মোটেই ঠিক হবে না (!)।

আমাদের মনে রাখা দরকার প্রত্যেকটা মানুষ একেকটি সংগঠক ও প্রতিষ্ঠান। অগণিত অসংখ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের ধর্মভীরু লোকেরা এসব এলোমেলো বক্তব্য থেকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে সে দায়িত্ব কার উপর বর্তাবে? তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থী ধর্মবেত্তারা কি এর উত্তর দিতে পারবেন?

কুরআনের একটি আয়াত – নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি হয়েছে এবং সাহাবীগণ ও নাসারাগণ যে কেউ ঈমান আনে আল্লাহর উপর এবং শেষ দিনের উপর এবং যোগ্য হয়ে কাজ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই। তাদের উদ্বিগ্নতাও থাকবে না (সূরা মায়েদা)। এখানে ইহুদি-নাসারা যে দুটি সম্প্রদায় কুরআনের পাঠকদের নিকট বেশি পরিচিত সে দুটি ছাড়া অন্য একটি সম্প্রদায়ের কথাও বলা হয়েছে অর্থাৎ সাহাবীগণ। এ সাহাবীগণ অপরিচিত। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের ঐশ্বী গ্রন্থধারীদেরকেই আমরা নির্দ্বিধায় এশব্দ দ্বারা বুঝে নিতে পারি।

অর্থাৎ যারাই বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতার সাথে কাজ করবে তাদের পুরস্কার নিশ্চিত করা হয়েছে। এটাই তো যে কোনো জাতির প্রগতির প্রাথমিক পদক্ষেপ। আউলিয়াদের শানেও ঠিক একই কথা বলা হয়েছে – তাদের কোন ভয় নেই তারা উদ্বিগ্নও থাকবে না। অন্য আরেকটি আয়াত – যদি তারা তাওরাত ও ইঞ্জিল এবং তাদের প্রভূর নিকট থেকে তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা দাঁড় করাতো তাহলে তারা তাদের উর্দ্ধদেশ থেকে এবং তলদেশ থেকে ভক্ষণ করতে পারতো (সূরা মায়েদা)। আজকের যুগে আমরা দেখছি ইহুদি ও খৃষ্টান সম্প্রদায় অধিক ভক্ষণ করছে। মাটির নিচের খনিজ সম্পদও তারাই জ্ঞান অন্বেষণের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে। আকাশ থেকে সেই একই জ্ঞান তারাই অর্জন করছে।

এসব আয়াত থেকে বিশ্ববাসীকে এক কাতারে দেখার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। সবাই মুক্তিপ্রাপ্ত হতে পারে যদি তারা বিশ্বস্ত আর যোগ্য হয়। অন্যত্র বলা হয়েছে – হে যারা ঈমান এনেছো কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে বিদ্রƒপ না করে। তারা ওদের থেকে উত্তম হতে পারে। নারীরাও যেন অন্য নারীদেরকে বিদ্রƒপ না করে। ওরা তাদের চাইতেও উত্তম হতে পারে এবং তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না। একে অপরকে অবজ্ঞাসূচক উপনাম দিয়ে ডেকো না। ঈমান আনার পর দোষণীয় নাম বড়ই নিন্দনীয় এবং যারা এরপর তওবা করবে না তারাই জালেম। এখানে কোনো সম্প্রদায়কে হীনভাবে সম্বোধন না করার আদেশ দেয়া হয়েছে। অনেকে বলে থাকেন এখানে ঈমানদারদের মাঝে পরস্পরের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এখানে কিন্তু তা বলা হয়নি। শুধু সম্প্রদায় বলা হয়েছে। তোমাদের মাঝে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে এরূপ করবে তা বলা হয়নি। যদি কেউ এরূপ বুঝেও থাকেন তবুও তিনি আরো মহান হতে পারেন। যেখানে নিজেদের মাঝে হীন সম্বোধন নিষেধ করা হয়েছে সেখানে অন্য সম্প্রদায়কে হীন সম্বোধন করার তো প্রশ্নই ওঠে না।

আজকের বাংলাদেশের ধর্মান্ধ উগ্রবাদী মুসলমানদের বক্তব্য ও আচরণে দেশের সাধারণ মানুষ ও  সারা পৃথিবী বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে।  কেউ কাউকে মুসলমানই মনে না করেন সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু তাই বলে তাদেরকে হেয়ভাবে সম্বোধন করার কোন অধিকারই কুরআন কাউকে দেয়নি। পৃথিবীর কোন সভ্য লোক একাজ করতে পারে না। কোনভাবেই তাদেরকে নিয়ে হীন মন্তব্য করার মজলিস বা বৈঠক বা সম্মেলন উম্মতে মুহাম্মদীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা চিন্তাশীল ব্যক্তির জন্য প্রকৃতিগতভাবেই সত্যই লজ্জাজনক ব্যপার । তবে প্রকৃতি খারাপ হয়ে গেলে তো কোনো কথাই নেই।

এবার হাদিসের আলোকে এসব অবাঞ্চিত কর্মের অবস্থান কোথায় দেখুন। হযরত আনাস থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেছেন রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বলেছেন, ঈমান এর মূলবিষয়ঃ যে ব্যক্তি বলেছে – লা ইলাহা  ইল্লাল্লাহ্  কিন্তু বাকি অংশ রপ্ত করেনি তার থেকে বিরত থাকো। তাকে কোনো গুনাহের কারণেই কুফর দ্বারা সম্বোধিত করো না । এখানে মুহাম্মদ  (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর কথা উল্লেখ করা হয়নি। কেউ হয়তো বলবেন মুহাম্মদের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) উপর ঈমান আনার বিষয়টি এখানে উহ্য আছে। রাসুল’তো বলেননি বরং রাসুল এখানে উদারতার শিক্ষা দিয়েছেন। রাজনৈতিক ইসলামপন্থী ও ধর্মবেত্তারা কেন সেই উদারতার শিক্ষা গ্রহণ করবেন না? কাউকে নাস্তিক ও কাফির বলার মধ্যে কি রহস্য আছে? অপর একটি হাদিসে  বলা হয়েছে কে কাফির আর কে কাফির নহে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জিম্মায়। যে ব্যক্তি আমাদের সালাত করে এবং আমাদের কেবলাকে সামনে রাখে এবং আমাদের জবাই করা মাংস খায়, সে মুসলিম। সে আল্লাহ্র জিম্মায় এবং তাঁর রাসুলের জিম্মায়।’ এখন প্রশ্ন যা আল্লাহর জিম্মায় তা নিয়ে ধর্মান্ধরা নাক গলাতে যাচ্ছেন কেন? আজকে মুসলমানরা এসব মহান শিক্ষা উপলব্ধি করতে অক্ষম কেন?

বিভিন্ন দেশের ধর্মান্ধ জুব্বাধারী তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা সন্ত্রাসী নামে বিশ্বে পরিচিত হচ্ছে। এটাই জালিম আর মজলুমের মধ্যে তফাৎ। যা হোক কাফের বা নাস্তিক বলার কোন ক্ষমতাই আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের ইসলামের শিক্ষায় নেই। এছাড়া ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, কোন ব্যক্তির কথায় যদি এক দৃষ্টিকোণ থেকে ঈমানী ব্যাখ্যা করা যায় আর নিরানব্বই দৃষ্টিকোণ থেকে কুফরী ব্যাখ্যা করা যায় তবে ঈমানী ব্যাখ্যাটি নিতে হবে। এরপরেও চিন্তার অবকাশ আছে যে, কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে – তারাই কাফির, তারাই জালিম, মুশরিক, ফাসিক ইত্যাদি। বিষয়গুলো খুবই গভীর উপলব্ধির বিষয়। দিব্যজ্ঞানী চিন্তাবিদগণই একমাত্র শব্দগুলোর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে ইতিহাস প্রমাণ দেয়। কুরআন বলছে – হে প্রশান্ত প্রাণ, তুমি তোমার প্রভুর দিকে ফিরে আসো যে অবস্থায় তুমিও তোমার প্রভুতে সন্তুষ্ট আর তিনিও  তোমার উপর সন্তুষ্ট। বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন সময়, পরিবেশ ও ব্যক্তি অবস্থানকে কেন্দ্র করে কাফির, মুশরিক, ফাসিক ইত্যাদিতে সম্বোধন করার অর্থই হলো যাতে সমগ্র মানবজাতি নিজেদের কর্মকান্ড নিয়ে সতর্ক থাকে। কিন্তু কোন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে  গালাগালি দেয়ার জন্য নয় বলে ইসলামি চিন্তাবিদগণ বিশ্বব্যাপী অভিমত ব্যক্ত করেছেন ও করছেন। ইসলামে  কোনো  গীবত, গালাগালি, হীন নামে ডাকাকে  কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে, যেহেতু এগুলো সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনে। শান্তি (ইসলাম)- এ কঠোরভাবে এই বিপর্যয়কে ঠেকানোর উপাদান দেয়া হয়েছে। তাই মুসলমানদের কুরআনকে গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে আঁকড়ে ধরতে হবে। কুরআনে বারবার বলা হয়েছে – যদি তারা উপলব্ধি করতে পারে তবেই তারা সফলকাম। মোটকথা কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে কোন গালাগালি করা কখনো ইসলাম প্রশ্রয় দেয় না। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে উগ্র ধর্মান্ধরা ক্ষমতার লোভে আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের আসন দখল করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন!

ভাবতে অবাক লাগে যে, মুসলমানরা কি করে এই হীন ফতোয়াবাজিতে পতিত হলো? সর্বশেষে ধর্মান্ধ রাজনৈতিক ইসলামপন্থী, ধর্মব্যবসায়ী ও ধর্মবেত্তারা নাস্তিক ও কাফের ফতোয়া দেয়ার হীন চর্চা থেকে বিরত থাকবেন, বাংলাদেশে শান্তি (ইসলাম) রক্ষার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করবেন এবং মজলুম সম্প্রদায়গুলো স্বাধীনভাবে স্ব-স্ব বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে  বাংলাদেশব্যাপী শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠায় ও সার্বিক প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার দিক নির্দেশনা দেবেন এটাই জাতির প্রত্যাশা। বাংলাদেশের আপামর জনতা ভালো করেই জানে শান্তি (ইসলাম) কি। মিথ্যাচার করে, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে দেশের অগ্রগতি সাময়িক স্থগিত করা যাবে, সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করে মানব সমাজের মধ্যে কেবল বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করা যাবে, কোন কল্যাণতো নয়ই। কিন্তু তারপরও কি সীমালঙ্ঘনকারীরা বুঝতে পারবে না? কি হবে তাদের সময়ই তা বলে দেবে এবং একমাত্র আল্লাহই তা ভালো জানেন! আমরা জানি, নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালবাসেন না।