আমার সত্য আমাকেই আবিষ্কার করতে হবে

সংলাপ ॥ যা সত্য নয় তাই মিথ্যা। কারো কারো মতে, শুধুমাত্র জেনেশুনে মিথ্যা বললেই তা মিথ্যা বলে গণ্য হবে; ভুলবশত, কিংবা অনিচ্ছায় প্রকৃত অবস্থার বিপরীত কিছু বললে তা মিথ্যা বলে গণ্য না করে অজ্ঞতা হিসেবে গণ্য করা উচিত। কথা বলার আগে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা বক্তার দায়িত্ব। যে যা বলে তার দায়িত্ব তাকেই নিতে হয়, অন্যের উপর চাপানো যায় না। বক্তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা, অজ্ঞতা বা অন্য কোনো বিষয় এখানে ধর্তব্য নয়।

সুতরাং ইচ্ছাকৃতভাবে, অনিচ্ছাকৃতভাবে, অজ্ঞতার কারণে বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক বাস্তবের বিপরীত কোনো কথা বলাই মিথ্যা। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত যে কোন কালের কথা বাস্তবের বিপরীত হলে তা মিথ্যা বলে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যত সম্পর্কেও যদি কেউ বলে ‘আজ বৃষ্টি হবে’, বৃষ্টি না হলে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য হবে। ধর্ম, জাতি ও বর্ণ নির্বিশেষে মিথ্যাকে পাপ, অন্যায় ও ঘৃণিত মনে করা হয়। কুরআনে মিথ্যাচারকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মানুষকে সর্বাবস্থায় সত্যপরায়ণ হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে মিথ্যাকে ঘৃণিত পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তজ্জন্য ভয়াবহ শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে। সত্যই ধর্ম, সত্যই পুণ্য, সত্যই শান্তি দাতা। যিনি সত্য বলেন তিনি আল্লাহর কাছে ‘সিদ্দীক’ হিসেবে সম্মানীত হন।

কুরআন সর্বাবস্থায় ও সার্বক্ষণিক সত্যবাদিতার নির্দেশ দিয়ে বলছেন

“হে আমানুগণ! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।” (সুরা তওবা ঃ ১১৯)। “যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ন্যায্য বলবে স্বজনের সম্পর্কে হলেও।” (সুরা আন’আম ঃ ১৫৩)। “সত্যবাদী পুরুষ এবং নারী…এদের জন্য আল্লাহ্ ক্ষমা ও মহা প্রতিদান রেখেছেন।” (সুরা আহজাব ঃ ৩৫)। “হে আমানুগণ! আল্লাহ্কে ভয় কর এবং সত্য কথা বল, তাহলে তিনি তোমাদের কর্মকে ত্রুটিমুক্ত করবেন ও তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন।” (সুরা আহজাব ঃ ৭০-৭১ )।

অন্যদিকে, কুরআনে মিথ্যাকে ভয়ঙ্কর পাপ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাপ মানুষকে দুঃখ ও দুর্দশার দিকে পরিচালিত করে। যে মিথ্যা বলে বা মিথ্যা বলতে সচেষ্ট থাকে সে এক পর্যায়ে মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মিথ্যা বলা মুনাফিকীর অন্যতম চিহ্ন। তাই কুরআনিক মুসলিম অনেক অন্যায় করতে পারে, কিন্তু কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। কুরআন নির্দেশ দিচ্ছে

“মিথ্যা কথন থেকে দূরে থাক।” (সুরা হজ ঃ ৩০)। “হে ঈমানদার লোকেরা যা কার্যত তোমরা করছ না, তা কর বলে মুখে দাবি কর কেন? যা কর না, তা করো বলে প্রচার করা তো আল্লাহ্ নিকট খুবই জঘন্য কাজ। (সুরা সাফ ঃ ২-৩)। “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞকে হেদায়েত দান করেন না।” (সুরা আজ যুমা : ৩)। “যে মিথ্যাবাদী, তার উপর আল্লাহ্ অভিশাপ বর্ষিত হোক।” (সুরা আলে ইমরান ঃ ৬১)। “আর যে ব্যক্তি নিজে কোন অন্যায় বা পাপ করে, অতঃপর কোন নির্দোষ ব্যক্তির উপর তার দোষ চাপিয়ে দেয় সে তো নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গোনাহ।” (সুরা নিসা ঃ ১১২)। “আল্লাহ্ লা’নত তার উপর যদি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।” (সুরা নূর ঃ ৭)।

মিথ্যার প্রভাবে মানুষ ধর্মের নামে এমন সব কর্মে লিপ্ত হয় যা পার্থিব জীবনে হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি করে। পূর্ববর্তী ধর্মগুলির দিকে তাকালে আমরা বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। যেমন,  বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী  হযরত ঈসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের এক আল্লাহর ইবাদত করতে, পূর্ববর্তী ধর্মের ১০ মূলনির্দেশ পালন করতে, খাতনা করতে, তাওরাতের সকল বিধান পালন করতে এবং অন্যান্য কর্মের আদেশ নিষেধ উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন চাপে বাইবেলের আদেশ উপদেশ নিষেধ চাপা পড়ে গেছে। ফলে ক্রমান্বয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানব সন্তান ত্রিতত্ববাদের ব্যাখ্যায় লিপ্ত হয়েছে। আমরা অন্যদের দোষ দেখি, কিন্তু নিজেদের দোষ সচরাচর দেখি না। ইসলাম অনুসারীরাও যে এখন মিথ্যা হাদীসের চাপে পড়ে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ধ্বংস এবং শিরকের মধ্যে পতিত হচ্ছে তা আমাদের নজরে পড়ে না।

মিথ্যা সর্বদা ঘৃণিত। মিথ্যা যদি ওহীর নামে হয় তাহলে তা আরো বেশি ঘৃণিত ও ক্ষতিকর। সাধারণ মিথ্যা মানুষের বা মানব সমাজের জন্য জাগতিক ক্ষতি বয়ে আনে। আর ওহীর নামে মিথ্যা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ধ্বংস ও ক্ষতি করে। ওহীর নামে মিথ্যাচার সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যা হওয়ার কারণে কুরআনুল কারীমে ওহীর নামে বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নামে মিথ্যা বলতে কিংবা সন্দেহ জনক কিছু বলতে কিংবা আন্দাজে কিছু বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনের নির্দেশ “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তা অনুসরণ করো না। কান, চোখ, মন প্রত্যেকের কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সুরা বনি ইসরাইল ঃ ৩৬)।

“হে আমানুগণ তোমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুমান থেকে দূরে থেকো। কারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কল্পনা বা অনুমান করা পাপ।” (সুরা হুজুরাত ঃ ১২)।

কুরআনের নির্দেশ উপেক্ষা করে ‘ওহী’র নামে মিথ্যাচার চলছে সকল প্রচার মাধ্যমে। ওহীর নামে মিথ্যা প্রচারের দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথমত, নিজে ওহীর নামে মিথ্যা বলা ও দ্বিতীয়ত, অন্যের বলা মিথ্যা গ্রহণ ও প্রচার করা। উভয় পথ রুদ্ধ করার জন্য কুরআনে আল্লাহর নামে মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। অপরদিকে কারো প্রচারিত কোনো তথ্য বিচার ও যাচাই না করে গ্রহণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এবং রাসূল (যাঁর কৃপা আমাদের বর্ষিত) এঁর নামে যে কোন কথা বলার আগে নির্ভুলতা যাচাই করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয। জাগতিক সকল বিষয়ের চেয়েও বেশি সতর্কতা ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর বাণী গ্রহণের ক্ষেত্রে। কারণ জাগতিক বিষয়ে ভুল তথ্য বা সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করলে মানুষের সম্পদ, সম্মান বা জীবনের ক্ষতি হতে পারে কিন্তু আল্লাহ, রাসূল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর নামে মিথ্যা বললে ইহকাল ও পরকালের অনন্ত জীবনের জন্য ধ্বংস নেমে আসবে।

ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সকল প্রকার বিকৃতি, ভুল বা মিথ্যা থেকে ওহীকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। প্রত্যেক মুসলিমকে স্মরণে রাখতে হবে, “যে ব্যক্তি রাসূলের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নামে মিথ্যা বলবে তার আবাসস্থল জাহান্নাম”। অথচ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর নামে মিথ্যাচার চলছে হিজরি তৃতীয় শতক থেকে। ধর্ম প্রচারের নামে জাল হাদীস প্রচারের জঘন্য মিথ্যাচার শুধু যে অব্যাহত রয়েছে তা নয়, দিন দিন তা বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাহাবীগণ হাদীস রচনা করেন নি এবং তাঁরা হাদীসের নামে সকল মিথ্যাচারকে প্রতিরোধ করতেও সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা না থাকার কারণে অনেক ধর্মভীরু মানুষ ও ধর্মবেত্তারা না জেনে হাদীস বলেন, প্রচার করেন বা লিখেন। এভাবে সমাজে কুরআনের বদলে প্রাধান্য লাভ করছে হাদীস। আর আল্লাহর হাদীস বা কুরআন ক্রমেই চাপা পড়ে যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে অগণিত বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কথা হাদীস নামে আমাদের সমাজে প্রচারিত হয়েছে ও হচ্ছে। ফলে আমরা দুইদিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। একদিকে, এ সকল বানোয়াট হাদীস আমাদেরকে কুরআনের শিক্ষা, চর্চা ও আমল থেকে বিরত রাখছে। অন্যদিকে, এগুলির উপর আমল করে আমরা আল্লাহর কাছে পুরস্কারের বদলে শাস্তি পাওনা করে নিচ্ছি। ধর্মভীরু মানুষ মিথ্যাচারে  বিশ্বাস করে কঠিন পাপের মধ্যে নিপতিত  হচ্ছে।

প্রায় সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ আজ হাদীসের খপ্পরে পড়ে গেছে। হাদীসের প্রচারে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত  হচ্ছে ইসলাম। একদিকে আল্লাহ তায়ালা একবারও যা করতে বলেন নি তা হয়ে গেছে এখন মুসলমানের মানদ- (যেমন দাড়ি রাখা, টুপি পড়া ইত্যাদি আরো অনেক কিছু)। অন্যদিকে মানুষ মনোযোগ দিতে পারছে না কুরআনের প্রতি। ফলে কুরআনের উদার, মানবিক আহ্বানের প্রতি সাড়া দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ তৈরী হচ্ছে না। আমাদের দেশে একদিকে যয়ীফ ও বানোয়াট হাদীসের পঠন, পাঠন ও চর্চা বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে কমছে কুরআন চর্চা। কুরআনের প্রতি বিশেষ অবহেলা পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র।

হাদীস সংক্রান্ত নানারকম মারাত্মক বিভ্রান্তিতে আছে মুসলিম উম্মাহ। অনেক হাদীসবেত্তারাই মনে করেন ‘হাদীস’ মানেই রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর বাণী, কাজেই কোনো হাদীসকে দুর্বল বলে মনে করার অর্থ রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর কথা বা বাণীকে অবজ্ঞা করা। তাদের মতে যত দুর্বলই হোক, যেহেতু রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর কথা, কাজেই তাকে গ্রহণ ও পালন করতে হবে। কিন্তু কথাটি প্রকৃতই রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর কি-না, কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কি-না তা তারা যাচাই করে দেখতে চান না।

মুসলিমের দায়িত্ব হলো কুরআন অধ্যায়ন, বুঝা এবং কুরআন দর্শনকে জীবন দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা, লালন করা, পালন করা। প্রত্যেক মুসলিমকে আল্লাহর দরবারে তার নিজ কর্মের হিসাব দিতে হবে। অন্য কারো কর্মের জন্য আমাদের দায়ী করা হবে না, হিসেবও চাওয়া হবে না। তাই কথায় কথায় হাদীসের ব্যবহার থেকে প্রত্যেক মুসলিমকে সতর্ক হতে হবে। কোন অজুহাত দেখিয়ে আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া যাবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকেই বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন। প্রত্যেককেই দিয়েছেন চিন্তা করার ক্ষমতা, সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক করার ক্ষমতা। পৃথিবীর অনেক মানুষ মিথ্যা বললেও মিথ্যা বলা বৈধ হয় না। জেনে বা না জেনে অধিকাংশ মানুষ মিথ্যা বলছে তাই বলে আমিও মিথ্যা বলব এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। যে কোন বিষয়ে বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তা করে সত্যের অন্বেষণ করা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব। আমার আহার যেমন অন্য কেউ গ্রহণ করতে পারে না ঠিক তেমনি আমার স্থলে কেউ সত্য অন্বেষণ করে তৈরি সত্য আমার কাছে সরবরাহ করতে পারে না। আমার সত্য আমাকেই আবিষ্কার করতে হবে। যে কোন বিষয়ে হাদীসের উদ্বৃতি দেওয়ার আগে জেনে নিতে হবে যা বলা হচ্ছে তা কি সঠিক? কারো কথায় প্রভাবিত না হয়ে প্রত্যেককে অনুসন্ধিৎসু হতে হবে এবং প্রয়োজনে গবেষণা করে সত্য আবিষ্কার করতে হবে। নতুবা হাদীস বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেউ যদি জীবনে একটি হাদীসও না বলে তাহলে তার কোন পাপ হবে না কিন্তু রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে একটি কথাও যদি মিথ্যা বলা হয় তা হলে তা হবে মহাপাপ। এমনকি ধর্ম প্রচারের জন্য কিংবা অন্য কোন সৎ উদ্দেশেও যদি কেউ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে মিথ্যাচার করে তবে তা কঠিনতম পাপ। মুসলিম উম্মাহ একমত যে, রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে মিথ্যা বলা হারাম। যে ব্যক্তি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে পারে না, তার পান ও আহারের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম বিচার মূল্যহীন।

মহান আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের এই মহাপাপ থেকে রক্ষা  করেন। আমাদের জীবন আবর্তিত হোক কুরআনকে কেন্দ্র করে।