আত্মপরিচয়ের সন্ধানে আপ্রাণ প্রয়াস!

সংলাপ ॥ ভাষার কারুকার্যে, কথার  বুননে, শব্দের গাঁথুনি দিয়ে হয়তো দেশ-স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচনা করা যাবে চটকদার কোন প্রবন্ধ বা হৃদয়াবেগ। কিন্তু যথার্থ বাক্যে যথার্থ মর্যাদায় সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরা কি কখনো যাবে? না যাচ্ছে? ইতিহাসের সত্যতা অটুট রেখে ইতিহাসের প্রকৃত আদলটা তুলে ধরা বিরল কাজ। কেননা, যা কিছু অতীত এবং সময়ের সাথে সংগ্রাম করে স্থান দখল করে থাকে বর্তমানের, তা কালের বিবর্তনে, কলমের পক্ষপাতিত্বে, স্বার্থের সংঘাতে, নীতির বেসাতিতে কখনো পাল্টে ফেলে রং, কখনো সাজে ঢং। এই বাস্তব সত্যের বিকল্প এখনো দেখা যায়নি। কিন্তু তাই বলে কি কালের জটাজালে নিবন্ধ হয়ে একটি ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম স্তরে ভুল আদলে, ভুল দর্শনে, ভুল উপাত্ত নিয়ে প্রচারিত হতে থাকবে? আর এই ভুলের বিপাকে বিভ্রান্ত হতে থাকবে নতুন প্রজন্ম? ধ্বংস হবে চৈতনিক উত্থান? কিন্তু – কেন?

সঠিক ইতিহাস জানা একটি জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার অতীত ইতিহাস থেকেই সে নিজেকে চেনে, নিজেকে জানে। ইতিহাস থেকেই সে অবগত হয় তার অতীত ভুল। ইতিহাস থেকেই সে খুঁজে নেয় বর্তমানের এবং ভবিষ্যতের যাত্রাপথ। নির্মাণ করে কালের চাকায় নতুন চেতনার  নতুন আদর্শ। সেক্ষেত্রে বাঙালি জাতি একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করে চললেও, কোন চৈতনিক বিনির্মাণে কি একটি আদর্শিক অবস্থানে তাকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে? জাতি হিসেবে নিজেদের মৌলিকত্ব না খুঁজেই আমাদের গবেষকগণ অকপটে জানিয়ে দেন আমরা বাঙালি ‘শংকর জাতি’। নির্যাতন, নিপীড়নের সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারায় দেহে, মনে, ভাষায়, আশায়, চলনে, বলনে, পোশাকে, খাদ্যে, বিনোদনে, আচরণে, শিল্পে, সাহিত্যে লেনদেনের যেকারবার চলেছে সে সত্য অস্বীকার করবার নয়। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, নিজের শেকড়ের খোঁজ না রেখেই আমরা ডালপালায় ঝুলে থাকবো? জাতিগত বোধ তখনই সুদৃঢ় ভিত্তি পায় যখন কোন জাতি জানতে পারে তার আদি ইতিহাস, তখন সে বিশ্বাস স্থাপন করে তার মৌলিকত্বের ওপর। জাতি হিসেবে আমাদের প্রধান হাতিয়ার নিঃসন্দেহে আমাদের ভাষা অর্থাৎ ‘বাংলা’। ভাষা থেকে উদ্ভূত যে জাতীয়তাবোধ আমাদের চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছিল, সেই জাতীয়তাবোধই যে আমাদের বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে, তা স্বীকার করতে হবে প্রত্যেককেই। আমাদের সামান্য যা কিছু অগ্রগতি বা উন্নয়ন তাও ওই জাতীয়তাবোধেরই ফসল। অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডারে প্রকৃতির দুলাল হয়ে নির্বিঘ, জীবনযাপন করা বাঙালির সম্ভব হয়নি কখনো। দস্যু, লুটেরা, ভ-, প্রতারক, ব্যবসায়ী, শাসক তিন হাজার বছর ধরে একের পর এক বাঙালি জাতিকে করেছে নির্যাতন, শোষণ ও শাসন। ধারাক্রমে ধরা যায় পাক শাসন-শোষণই ছিল বাঙালি জাতির জন্য সর্বশেষ। তাই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এর ইতিহাস বাঙালি জাতির জন্য অন্যরকম গুরুত্ব বহন করেছে। কিন্তু এই গুরুত্ববহ ২৪ বছরের ইতিহাস কি সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে আজো রচনা করা সম্ভব হয়েছে? কেনই বা হয়নি? নয় মাসের (?) ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ’৭১ -এ অর্জিত ‘স্বাধীনতা’য় যে ছোট্ট ভূখন্ড বাঙালি জাতি অর্জন করেছে, তা অবশ্যই বাঙালি জাতির জন্য একটি সর্বোচ্চ বড় অর্জন। কিন্তু এই ‘বড় অর্জনটি পরবর্তী এই ৪৭ বছরের বহমান ধারায় এতো ‘বিতর্কিত’ এবং ‘বিভ্রান্তমূলক’ হয়ে উঠলো কিভাবে? কপটতা এবং অনাদর্শিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আজ আমরা দ্বিধাবিভক্ত। তাই জাতীয়তাবাদের স্বার্থে যে অনিবার্য ইতিহাসকে সাত্তিক বোধে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ছিল, তা আজ খন্ডিত ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। ‘শাসিত’ থেকে ‘শাসক’-এ উন্নীত হয়ে আমরা সরে গিয়েছি সংগ্রামী চেতনা থেকে, সমৃদ্ধ একটি একক অবস্থানে থেকে। লোভ, লালসা আর ধর্মের নামে জিঘাংসায় বলে খাচ্ছি নিজেদেরই। নিজেরাই হয়ে গেছি নিজেদের শত্রু।  ক্ষমতার নির্লজ্জ লোলুপতায় বহুমাত্রিক স্বার্থের ভূখ- খোর অবস্থান নিয়েছি আমরা। তাই পায়ের নিচের মাটি এবং ঘাস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ক্ষেপণ করেছি ধর্মের আনুষ্ঠানিকতায়, গদি আঁটা চেয়ারে এবং চেক বইয়ের পাতায়। স্বাধীনতার পরবর্তী আমাদের গতিবিধি সেই সত্যকেই তুলে ধরে। এই সত্যের রাতে ভাসমান বাঙালি জাতির কাছে এ কারণেই উপস্থাপিত হচ্ছে না প্রকৃত ইতিহাস স্বাধীনতার, মুক্তিযুদ্ধের, এমনকি জাতিসত্তার। অনাদর্শিক রাজনীতির রাতে গত ৪৮ বছরে যে ইতিহাস আমরা বহন করে চলেছি, তা সকলেরই জানা। ভ্রান্ত ইতিহাসের কবলে আজ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে প্রজন্ম। দিকভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে স্বদেশ। নিশ্চিত গন্তব্যে ধাবমান হচ্ছে না জাতি। বাঙালির এই আত্মবিনাশী যাত্রা ঠেকাতে চাই প্রতিটি অঙ্গনে বিশেষ করে ধর্মীয় জগতে সত্যের উন্মোচন। চাই আত্মপরিচয় সন্ধানের আপ্রাণ প্রয়াস, নিরন্তর সাধনা।