অপচয় ও অপব্যয় জাতিকে পিছনে টানছে

সংলাপ ॥ অপচয় ও অপব্যয় ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ক্ষতি বয়ে আনে, পেছনে টেনে নিয়ে যায়। ইসলাম অপচয় ও অপব্যয়কে ঘৃণা করে। প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয়ই হলো ইসরাফ বা অপচয়। অপচয় ও অপব্যয়-এ শব্দ দুটি অনেক ক্ষেত্রে সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় ব্যয় করার নামই অপচয়, যা আরবীতে ‘ইসরাফ’ বলা হয়। অন্যদিকে, অপব্যয় হচ্ছে অন্যায় ও অযৌক্তিক উপায়ে সম্পদের অপব্যবহার, যাকে আরবীতে ‘তাবযীর’ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে তাবযীর বা অপব্যয় সম্পর্কে অনেকগুলো আয়াত রয়েছে। সূরা বনী ইসরাইলের ২৮ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’

যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু ব্যয় করলে তা অপচয় হবে না এবং ব্যক্তি বিশেষে এই ব্যয়ের পরিমাণে তারতম্য হতে পারে। অনেক সময় ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানের উপরও তার ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করে। এছাড়া এক্ষেত্রে সামর্থ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপচয়ের অর্থ হলো বিনা কারণে সম্পদ ব্যয় করা। অন্য কথায় বলা যায়, সম্পদ নষ্ট করার নামই অপচয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে দেহসম্পদ ও ধন-সম্পদ হচ্ছে মানুষের কাছে আল্লাহর আমানত। কাজেই কোনো ভাবেই এই আমানতের খেয়ানাত করা যাবে না এবং তা সঠিক কাজে সর্বোত্তম পন্থায় ব্যবহার করতে হবে। কেউ এই সম্পর্কে সঠিক পথে কাজে না লাগিয়ে তা অপচয় ও অপব্যয় করে তাহলে সে দোষী হিসেবে গণ্য হবে। পবিত্র কুরআনের সূরা আরাফের ৩২ আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আহার কর ও পান কর। কিন্তু অপচয় করো না। আল্লাহতায়ালা অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ এই আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহতায়ালা চান তার দেয়া নেয়ামতগুলোকে সঠিক ও সর্বোত্তম ভাবে ব্যবহৃত হোক এবং যারা আল্লাহর নেয়ামতকে বিনষ্ট ও অবমূল্যায়ন করে আল্লাহ তাদের উপর অসন্তুষ্ট।

পাশ্চাত্য ও আরব দেশগুলোতে এখন মানুষকে অপচয় ও অপব্যয়ে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রচার চালানো হচ্ছে। আর এসব প্রচারণায় বাংলাদেশ এবং অনেক অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অধিবাসীরা উৎসাহিত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের বৃহৎ কোম্পানিগুলো বেশি বেশি পণ্য বিক্রি করে অধিক মুনাফা লাভের লক্ষ্যে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে অপচয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোনো কোনো মার্কিন কোম্পানির এখন এমন দশা যে, মানুষ যদি অপচয় না করে তাহলে ওইসব কোম্পানি টিকে থাকতে পারবে না। এ কারণে ওইসব কোম্পানি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সহযোগিতায় এ ধরনের অসহিষ্ণু সংস্কৃতি চালুর নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ধনী আরব দেশগুলো তাদের মদদ দিচ্ছে। অপচয় সব সময় মানুষকে পরনির্ভরশীল করে রাখে। অপচয়, অপব্যয় ও পরনির্ভরশীলতা যতো বাড়বে দেশ ও জাতি ততো সংকটে পড়বে। শুধু তাই নয় অন্য জাতির কাছে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশের ধনী সম্প্রদায় ও আরবের মুসলমানরা ভোগ-বিলাসিতার মাধ্যমে অহরহ ও অপব্যয় করছে।  বিশ্বব্যাপীও এ প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিলাসিতা এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করা অপচয়। আমরা ভোগ বিলাসিতার জন্য অর্থ অপচয় করি কিন্তু এই অর্থই উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, পূঁজিবিনিয়োগে কাজে লাগানো যেতে পারে, দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং তা দিয়ে দরিদ্রদের সাহায্য করা যেতে পারে। আমরা খেয়ালের বশে অর্থ অপচয় করে থাকি। অনেকেই নিজেকে সম্পদশালী এবং অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার জন্য চড়াদামের জিনিসপত্র ক্রয় করে থাকে বিশেষ করে কোরবানী ও রোজার সময় দেখা যায়, যা প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনীয় নয়। দামি জিনিসপত্র ও চাকচিক্য ইসলামের কাছে মানদন্ড নয়। নিজেকে বড় হিসেবে তুলে ধরার মনোভাব ও অহংকার কখনোই মানুষকে উন্নত করে না।

বর্তমানে নব নব প্রযুক্তির আবিষ্কার মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দিচ্ছে। ইসলাম নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরোধী নয়। কিন্তু অল্প কিছু দিন পরপরই ঘরের নতুন আসবাবপত্র ও গাড়ি পাল্টে সর্বশেষ মডেলের আসবাবপত্র ও গাড়ী কেনা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজনের তুলনায় লোক দেখানোর মানসিকতাই প্রাধান্য পায় কারণ কোনো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার না করাও অপচয়। ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কবির ভাষায় ‘যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশুগৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি।’ অর্থাৎ আজ যে অপচয়কারী ও বিলাসী, কাল সে ভিখারী ও পরমুখাপেক্ষী। এটা ব্যক্তি জীবনের মতো রাষ্ট্রীয়  জীবনেও সত্য।

অপচয় ও অপব্যয়ে কোন প্রাপ্তি না থাকলেও মোহগ্রস্ত মানুষ এ থেকে বিরত থাকছে না। মানুষের জীবন ধারণের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন অত্যন্ত জরুরি। এসব ছাড়া মানুষ জীবনধারণ করতে পারে না, তাই এগুলোকে মানুষের মৌলিক চাহিদা বলা হয়। ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, ছোট-বড় সকলেরই এসব প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক ও আর্থিক ভিন্নতার কারণে সকল মানুষ সমভাবে এসব প্রয়োজন মেটাতে পারে না। আমরা অপচয় ও অপব্যয় পরিহার করে সেই অর্থ ওইসব মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যয় করলে সমাজ যেমন সুন্দর ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে তেমনি আমরাও মানসিক প্রশান্তি পাব যা শান্তি (ইসলাম) এর সহায়ক।

মানব সম্পদ ও শক্তিকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার না করাও এক ধরনের অপচয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন ব্যক্তি যে কাজে অধিক পারদর্শী তাকে দিয়ে সে কাজ না করিয়ে অন্য কাজ করানো হচ্ছে অথবা অধিক পারদর্শী লোককে উপযুক্ত কাজে নিযুক্ত করা হচ্ছে না। এর মাধ্যমে অপব্যয় ও অপচয় বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে অনুপযুক্ত স্থানে চাকুরি করায় অনিচ্ছাকৃত ভাবে মানব সম্পদ অপচয় করছে। পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক না হবার কারণে প্রতি বছর ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। এছাড়া, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে প্রতিদিনই বহু খাদ্য ও জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে।

ধুমপানসহ সব ধরনের নেশাই মারাত্মক অপব্যয়। এর ফলে স্বয়ং ধুমপায়ী বা মাদকসেবীর পাশাপাশি তার আশেপাশের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাভাবিক ভাবেই যা কিছু মানুষের জন্য ক্ষতিকর তার সবই অপচয় ও অপব্যয় হিসেবে গণ্য। সূফী সাধকরা বলেন, যা আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং শরীরের ক্ষতি করে, তাই অপচয়।

অপচয় ও অপব্যয়ের নানাবিধ ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ইসলামে তা নিষিদ্ধ। অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে বৈষয়িক ক্ষতির পাশাপাশি আত্মিক ক্ষতিও ঘটে।

ভোগ-বিলাসিতা মানুষের দেহের চেয়ে আত্মার উপর বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে বরকতও হ্রাস পায়। মানুষের ধন-সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়।

মানুষ আল্লাহর নেয়ামতের অবজ্ঞা ও অবহেলা করে নিজের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে। অপব্যয়ের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের পথ থেকে সরিয়ে নিয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করাই উত্তম। অপচয়কারী কাজের প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে। বিনা কারণে অর্থ অপচয়কারী ব্যক্তিবর্গ যারা অপচয়ের মাধ্যমে সব শেষ করে আবার জীবিকা প্রার্থনা করে তাদের চেয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী ব্যক্তি উত্তম।

অপচয় ও অপব্যয়ের চূড়ান্ত পরিণতি হলো দারিদ্র্য। অপচয়কারী আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহের ব্যাপারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না এবং নিজেই নিজের করুণ পরিণতি ডেকে আনে। যারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে ও হিসাব-নিকাশ করে চলে, তাদের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ বিরাজমান থাকে, আর অপচয়কারীরা আল্লাহর অনুগ্রহ হাতছাড়া করে। অপচয় ও অপব্যয় সমাজে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকটতর করে।

ইসলাম মানুষকে ভারসাম্য রক্ষা করে চলার উপদেশ দেয় এবং ঐশী অনুগ্রহের ব্যাপারে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন ও সম্পদের সদ্ব্যবহারের উপর গুরুত্ব আরোপ করে। মিতব্যয় সম্পদকে বৃদ্ধি করে এবং অন্যকে সাহায্য করার পথ উন্মুক্ত রাখে। মিতব্যয়ীরা কখনোই নিঃস্ব হয় না। ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মনীষীদের জীবন প্রণালী বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাব তারা সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তারা কখনোই ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েননি। সম্পদ অপচয় ও অপব্যয় না করে মানুষকে বেশি বেশি দান করে মানুষের অন্তরে জীবিত আছেন। মিতব্যয় হচ্ছে যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু ব্যয় করা ও সম্পদের অপচয় না করা। কৃপণতা হলো, যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ব্যয় না করা। ইসলামে অপচয় ও অপব্যয়ের মতো কৃপণতাও নিষিদ্ধ। ক্ষুধার্তকে খাদ্যদান, বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য প্রদান, অনাথ-ইয়াতীমদেরকে লালন-পালন, নিঃস্ব ব্যক্তিদের উপার্জনের ব্যবস্থা করা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করাই মুসলমানদের কর্তব্য।