ওগো জ্যোতির্ময় -

তুমি যুগে যুগে আসো

মহাবিপ্লব হেতু

  

শাহ্‌ সগীর ॥

২০১৩ সালে এসে রজত জয়ন্তীর বছরে পা দিলো মিরপুর আস্তানা শরীফ। সাধককূল শিরোমনি সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর ২৫ বছর আগে ১৯৮৮ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় মিরপুর আস্তানা শরীফ। তারিখটি ছিলো বাংলা বর্ষপুঞ্জিতে ১৩ মাঘ। বাংলা প্রবাদে ১৩ সংখ্যাটিকে দেখা হয় অশুভ’র প্রতীক হিসেবে। কথায় বলে ‘১৩-তে ফেরে পড়ে’। ‘ফের’ মানে সমস্যায় পড়া সঙ্কটে পড়া। ইংরেজি প্রবাদেও ১৩-কে বলা হয় ‘আনলাকি থার্টিন’। অথচ এই অশুভ ১৩-তেই প্রতিষ্ঠিত হল মিরপুর আস্তানা শরীফ! তাও একজন সূফী সাধক বেছে নিলেন এই তারিখটিকে! ঘটনাক্রমে এই মিরপুর আস্তানা শরীফেরই রজত জয়ন্তীর বছরটিতেও চলে আসলো আরেকটি ১৩! অর্থাৎ ২০১৩। আর এই ১৩-তেই রজত জয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিতব্য ‘দিক্‌ হতে দিগন্ত’-তে  রহস্য উন্মোচনের পাওয়া গেল সবুজ সংকেত!

 ফের’র সংখ্যা ১৩ - ফেরার সংখ্যা ১৩ !

 ১৩ সংখ্যাটিকে, ইংরেজি ‘থার্টিন’কে ইংরেজি প্রবাদে যেমন বলা হয়েছে ‘আনলাকি’ অর্থাৎ অশুভ, তেমনি বাংলা প্রবাদেও ১৩’র সঙ্গে ‘ফের’ কথাটা জুড়ে দেয়া আছে। প্রবাদ কথা কোন বিচ্ছিন্ন উচ্চারণ নয়। অনেক বছর ধরে, শত বছর ধরে, এমনকি শত শত বছর ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্মের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ফসল হিসাবে উঠে আসে প্রবাদ কথা। বাংলায় ‘ফের’ শব্দটির অভিধানে যে ক’টি অর্থ রয়েছে তাতে দেখা যায়, ফের মানে হচ্ছে ভ্রম, ভুল, ধোকা, দূর্বিপাক, কুফল, বিঘ্ন, ব্যাঘাত, ঝঞ্ঝাট, কুটকৌশল, প্যাঁচ, ফন্দি, ফিকির, কর্তব্যবিমূঢ়তা, সমস্যা, শঠতা, উলট- পালট, অদল-বদল ইত্যাদি।

রীতিমত আঁতকে উঠবার মত তথ্য ! অথচ এই ফের শব্দটিই ভর করে ১৩-এর উপর। আর এই ফের’র ভিতরেই উল্লেখিত রয়েছে তাবৎ নেতিবাচক, চরম নেতিবাচক শব্দগুলো! তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে একই অভিধানে ফের শব্দটির আরও একটি অর্থ রয়েছে; আর তা হচ্ছে পরিবর্তন! ‘ফের’ শব্দের আরেকটি রূপ ‘ফির’। অভিধানে এই ‘ফির’ শব্দটির অর্থ দেয়া হয়েছে প্রত্যাবৃত্ত, যার সহজ বাংলা ‘ফিরে আসা’। এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে মিরপুর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠার জন্য এই ১৩ তারিখকে বেছে নেয়া কিসের ইঙ্গিত? কিসের লক্ষণ? কিসের বার্তা?

 জ্যোতির্ময়ের পুনরাবির্ভাব !

বিস্ময়কর ভাবে ‘ফের’ শব্দের অর্থের মধ্যে ভ্রম থেকে উলট-পালট, অদল- বদল এর-মত শব্দ যেমন রয়েছে তেমনি ফেরের অর্থ হিসাবে রয়েছে ‘পরিবর্তন’ কথাটি। পাওয়া গেছে ‘প্রত্যাবৃত্ত’ হওয়ার কথাটিও। শব্দ আর কথামালা বস্তু জগতেরই প্রতিচ্ছবি, অবস্তুরও। আলোতে আলোর উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন থাকেনা। আলোর উপস্থিতি থাকে আধাঁরে। আঁধার ভেদ করেই উঠে ভোরের সূর্য। সঙ্কটে নিমজ্জিত জনপদ, অনাচারে ডুবে যাওয়া সমাজে আবির্ভাব ঘটে মুক্তির দিশারী মহামানবের, মহা মানবগণের।

১৩ মাঘ পুনরাবির্ভাব ঘটে একজন মহামানবের। জ্যোতির্ময় এক মহাপুরুষের। আবির্ভাব কেন ঠিক এই ১৩  তারিখ-ই? কেন মাঘ মাসে? ‘মাঘের শীতে বাঘে পালায়’ - বাংলা প্রবাদ। মাঘের শীত অতি-জড়তা, চরম স্থবিরতার প্রতীক। ১৩-ও বহু অশুভ’র প্রতীক।

শান্তির, মুক্তির প্রতীক ধর্ম। ১৯৪৭ সালে ধর্মের নামে বিভক্ত হলো ভারতবর্ষ। অশান্তি আর মৃত্যুর বাহন হয়ে উঠলো ধর্ম। মিথ্যার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ডুবে গেলো জনপদ। থেমে থেমে রক্ত উচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে থাকলো গোটা বিশ্বভূমি। আর তখনই বুঝি অনিবার্য হয়ে উঠলো একজন মহামানবের আবির্ভাব! জ্যোতির্ময়ের পুনরাবির্ভাব! ১৯৮৮ সালের ১৩ মাঘ মিরপুর আস্তানা শরীফের প্রতিষ্ঠা ছিলো ওই জ্যোতির্ময়েরই যজ্ঞের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। ধ্বনিত হলো জ্যোতির্ময় ওই কালপুরুষের কন্ঠে মহাকালের আহবান- “ সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হোন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান”। কথার সুরেও প্রকাশ করে দিলেন তিনি নিজেকে “আকাশের চাঁদ চাইতে আসিনি/ পৃথিবীর গান গাইতে আসিনি/ তোমাদের আজ বলতে এসেছি/ মানুষ নামের মান-হুঁস টারে মরতে দিয়ো না”!

আবির্ভূত হয়েই তিনি টান দিয়ে বসেন মিথ্যার শেকড় ধরে, এর বিশ্বমূলে। যার প্রতীকী প্রকাশ ঘটে ঢাকার মিরপুরে সবার অলক্ষ্যে।  ইতোমধ্যে কথার সুরেও তিনি সত্যকে তুলে ধরে চলেছেন একে একে। ‘দুঃখের কথা বলব কারে কে বুঝবে মোর ব্যথা/ সত্য বললে পাগল বলে/ না বুঝে মর্ম কথা/ আল্লাহ যখন খোদা হল/ সালাত হল নামাজ/ সিয়াম যখন রোজা হল/ গোল্লায় গেলো সমাজ।’

সত্য প্রতিষ্ঠায় পূর্বসূরীদের অসমাপ্ত ধারার সমাপ্তি আনার জন্যই কি তবে তাঁর পুনরাবির্ভাব???

 অভিষেক তাঁর বৈশাখে !

 সূর্যকে বাদ দিয়ে যেমন দিন হয় না, তেমনি যাঁকে ঘিরে যাঁর যজ্ঞকে ঘিরে মিরপুর আস্তানা শরীফ সেই  যুগাবতারের কথা না বলে মিরপুর আস্তানা শরীফের কথা বলা যায় না। তাঁকে না-বুঝে মিরপুর আস্তানা শরীফকে বুঝা যাবে না।

দুর্ভিক্ষ পীড়িত বাংলাদেশ ছিলো ১৯৭৪ সাল। আত্মিক ক্ষুধায় পীড়িত দশা তাঁর। কোন্‌ এক মহাশূন্যতা নিয়ে যেন কাটছিলো বাঁধা-কর্তব্যের দিন-মাস-বছর-গুলো। আত্মিক জগতের রাজাধিরাজ, মহাশূন্যের মহাপূর্ণ-প্রভু বুঝি প্রতীক্ষায় ছিলেন তাঁরই আগমনের! এই ’৭৪ সালেরই এক রবিবার অবসান ঘটে বুঝি সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার! ঘটে ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ’ লেগে যাওয়ার মহা-ঘটন।

স্থান রাজধানী ঢাকারই অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি। এই ধানমন্ডিতেই হাক্কানী খানকা শরীফ। হাক্কানী দরবার বলে যার পরিচিতি সারাদেশে। এই দরবারেরই শাহানশাহ্‌ সাধককূল শিরমনি সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। ‘হক’ তথা সত্যের বাতিঘর সাজিয়ে ছিলেন তিনি সমাসীন। ১৯৭৪- এ তাঁরই সংস্পর্শে আসেন প্রেরিত পুরুষ যিনি উত্তরকালে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রধান। শুরু হয় যাত্রা গুরুর দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭-তিন বছরের মাথায় শিষ্য ভূষিত হলেন শাহ্‌ সূফী খেতাবে।

১৯৭৭-এর পহেলা বৈশাখ অভিষেকের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর স্বরূপে আবির্ভূত হওয়ার মহাযাত্রা। কিন্তু তখনও রয়ে গেলো পোশাকী রূপ। এরপর একে কেটে গেল ১০টি বছর। অপ্রকাশ্য সাধনার নিরন্তর পথ কেটে চললেন গুরু-উৎসর্গীকৃত শিষ্য গুরুরই হুকুমের তালে তালে।

১৯৮৭ সাল, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর হুকুমে প্রতিষ্ঠিত হলো মহানগরী খুলনায় হাক্কানী খানকা শরীফ। আর সেখানেই খসে পড়লো পরিচিত পোশাকী রূপ। সংসারী জীবনের ইতিটেনে পূর্ণ ব্রহ্মচারী জীবনের সূচনা ঘটলো গুরুর এই প্রধান শিষ্যের।

আরও একটি বছর। ১৯৮৮ সাল। অভিষেকের ঠিক এগার বছর পর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক - এঁর হুকুমে ১৩ মাঘ প্রতিষ্ঠিত হলো মিরপুর আস্তানা শরীফ। অসত্যের বিরুদ্ধের লড়াইয়ে সেনাপতিত্ব অর্পিত হলো প্রিয় শিষ্যের উপর আনুষ্ঠানিকভাবে। অসত্যের আঁধারে ঢাকা পড়ে থাকা শান্তি- ধর্ম পুনঃ প্রতিষ্ঠার লড়াই-এর হলো শুরু।

  তিন পাগলের হইলো মেলা !

 ১৩ মাঘ মিরপুর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠার এক মাসেরও কম পৌষের ২০,২১ এবং ২২ তারিখ। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান চলছিল হবিগঞ্জে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ কালিকাপুর-এ। ভক্তদের আনা ৪টি খাসি প্রস্তুত অনুষ্ঠানের জন্য। ৩টি খাসি ধবধবে সাদা, আর ১টি কালো রং-এর। গুরু সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর সঙ্গে প্রিয় শিষ্যও উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানস্থলে। সাদা ৩টি খাশি দেখে খুবই পছন্দ হয়ে গেলো তাঁর। শুধু কালোটি জবাই করে সাদা ৩টি রেখে দেয়ার কথা ভাবলেন। ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথাও চিন্তা করলেন। কিন্তু মুখেতো বলা যাবে না। রাজত্ব যে গুরুর! অন্তরের কথা অন্তরেই রইলো।

সময়ে দেখা গেলো সূফী সাধক আনোয়ারুল হক কেবল কালো খাসিটিই জবাই করে অনুষ্ঠান শেষ করতে বললেন। অনুষ্ঠানটি ছিলো তাঁরই গুরু- ভাই শাহ্‌ আব্দুর রহমান-এঁর স্মরণে।

শাহ্‌ আব্দুর রহমান-এঁর মাধ্যমেই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক দেখা পেয়েছিলেন তাঁর গুরু ওলীকুল শিরোমণি সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন-এঁর। বিরল সাধনায় যিনি আরোহন করেছিলেন সাধনার উচ্চতম মার্গে। অনুষ্ঠান শেষে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক হুকুম দিলেন সাদা খাসি ৩টি সঙ্গে ঢাকায় নিয়ে আসার। এবং শিষ্যকে অবাক করে দিয়ে খাসি ৩টি তিনি পাঠিয়ে দিলেন মিরপুরে, যেখানে বাস করেন তাঁর প্রিয় শিষ্য। আর এই ৩টি সাদা খাসিই পরবর্তীতে উৎসর্গকৃত হয় মিরপুর আস্তানা শরীফ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানমালায়। এভাবে শান্তির তিন দিশারী এসে মিশে গেলেন এক মোহনায়!

 এক-এ এক-এ এক!

 উনবিংশ শতকের ভারতবর্ষ। অজ্ঞানতা কুসংস্কার পশ্চাৎপদতা যার নিত্য সঙ্গী। ধর্মের নামে অধর্মের অসহনীয় দাপাদাপি চরমে। অশান্তির বিষাক্ত আঁধারে ঢাকা শান্তি ধর্ম। শাস্ত্রীয় শিক্ষার মাতামাতি গোটা উপমহাদেশ জুড়ে।  বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জের এক নিভৃত জনপদ ফরিদপুর থেকে কলকাতায় আগমন ঘটে এক তরুণ জ্ঞান পিপাসু শিক্ষার্থীর।

কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ শাস্ত্রীয় শিক্ষা শেষ করেন তিনি পুরো দখল নিয়ে। কিন্তু পিপাসা রয়ে যায় অপূর্ণই। কালের ইশারায় একদিন তিনি পেয়ে যান শান্তির সঠিক পথের সন্ধান।

সত্যের আলো নিয়ে খোদ কলকাতাতেই আসীন ছিলেন হুগুলি জেলা থেকে উঠে আসা এক নিভৃতচারী সাধক। আগ্রহীদের যিনি সন্ধান দিয়ে যাচ্ছিলেন শান্তির শ্বাশত পথের। যিনি নিজেও কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকেই শাস্ত্রীয় শিক্ষায় পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন আগেথেকেই। কিশোরগঞ্জের ওই তরুণ তাঁর শিষ্যত্ব নিয়ে সত্যের  সাধনায় ডুব দেন গভীরভাবে। একসময় পূর্ণতার আস্বাদন নিয়ে ফিরে আসেন নিজ অঞ্চলে।

বৈষয়িক সুখ ভোগের পথ বিসর্জন দিয়ে সাধনালব্ধ অর্জন নিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেন মানবতার অনন্য সেবায়। কান্দুলিয়ার মৌলভী নামে কালক্রমে যাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। এই তিনি হচ্ছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন। আর যে-গুরুর কৃপায় তিনি আধ্যাত্মিকতার জগতে ‘ধনবান’ হলেন তিনি হচ্ছেন হযরত আজানগাছী। সত্যের সাধনায় হারিয়ে যাওয়ায় আর খুঁজে পাওয়া যায়নি তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম!

সন্তানের দেখা মিলছিল না এক অভিজাত ব্যবসায়ী গৃহস্থি পরিবারের। কিশোরগঞ্জেরই অপর এক নিভৃতপল্লী চাঁনপুরে ছিল তাঁদের বাস। লোকমুখে শুনে, গিয়ে দারস্থ হন সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিনের কাছে ফরিদপুর গ্রামে। প্রত্যাশা পূর্ণ হওয়ার সবুজ সঙ্কেত নিয়েই তাঁরা ফিরে যান ব্যবসায়িক কর্মস্থল কলকাতায়। সেখানেই ভূমিষ্ঠ হন বহু কাঙ্খিত পুত্রধন - সূফী সাধক আনোয়ারুল হক।

ধর্মের বিষাক্ত ছুরিতে বাংলা বিভক্তির মূল্য দিতে গিয়ে মাঝ শৈশবেই তাঁকে ছাড়তে হয় পূন্য-জন্মভিটা কলকাতা। কৈশোর না-পেরোতেই সত্যের সন্ধানে শুরু হয় তাঁর ছুটাছুটি। একদিন মিললো সন্ধান। অদৃশ্য সূতোর টানে গিয়ে হাজির হলেন সত্যের দিশারী সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিনের কাছে। এইভাবেই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক কালক্রমে মিশে যান তাঁর গুরুর সাথে মহামিলনের ধারায়। অংক সাধনায় এক যোগ এক- এ দুই হয়; আর সত্যের সাধনায় এক-এ এক-এ হয় বিলীন। এবং এভাবেই চলে একের খেলা, এক হওয়ার পালা।

 মহাশক্তির আধার-বিভ্রান্তির সমাহার

 গুরু সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর অমূল্য ধনরাজীর সার্থক উত্তরাধিকার, তাঁর প্রিয় শিষ্যকে বলেছিলেন ‘ধনবান হও, প্রকাশিত হইও না’। অলক্ষ্যে থেকে, নিজেকে অপ্রকাশে রেখে তাঁর উত্তরাধিকার সত্য সাধক তাই বিভ্রান্তির চাদরে সন্তর্পণে ঢেকে রাখেন।

পাথরে পাথর ঘসে আসে আগুন। ভ্রান্তদের বিভ্রান্ত করে-করেই কি তবে তিনি দেখান অভ্রান্ত পথের সন্ধান?

 

 সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন

 

 

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের কিছু জলপ্রবাহ নিজ বুকে ধারণ করে আড়িয়াল খাঁ প্রবাহিত হয়ে যায় কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীকে দুই দিকে রেখে। এই আড়িয়াল খাঁর কোল ঘেষে কুলিয়ারচর থানার ফরিদপুর গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই উপমহাদেশের সাধককূল শিরোমণি হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন শাহ্‌ কলন্দর গউস পাক। প্রতি বছরেই উদ্‌যাপিত হচ্ছে তাঁর আবির্ভাব ও তিরোধান দিবস।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে ছিল এক সংকটময় কাল। মুসলমানদের মধ্যে দু’টি পরস্পর বিরোধী ভাবধারায় সমাজ গড়ে উঠতে থাকে। একটি হচ্ছে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ, যারা পাশ্চাত্য ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ধর্ম সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে পড়ে।

অপরদিকে, একদল আরবী, ফার্সী ও উর্দু ভাষা শিখে জীবিকা অর্জনের জন্য কোন সুবিধাজনক পথ না পেয়ে ইসলামের বিধানসমূহকে ব্যক্তিস্বার্থে পার্থিব উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। এই অবস্থায় সমাজের অবক্ষয় রোধকল্পে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদেরকে আল্লাহ্‌র পথে ডাক দিয়ে প্রকৃত পথের সন্ধান দেয়ার জন্য ও স্বার্থান্বেষী কথিত আলেম সম্প্রদায়ের মুখোশ সাধারণ মানুষের কাছে উন্মোচন করে ইসলামের স্বরূপ    উদ্‌ঘাটনের জন্য একজন আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন মহামানবের আবির্ভাব অতিশয় প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। ঠিক সেই সময়ে ইসলামের উজ্জ্বল তারকা হিসেবে বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর থানার ব্রহ্মপুত্র নদের কিনারে ফরিদপুর নামক এক নির্জন বর্ধিষ্ণু গ্রামে আল্লাহ্‌র হুকুমে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে লোক সমাজে আল্লাহ্‌র দ্বীন বিশেষ করে তাসাউফ শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন সূফী সাধক আক্তারউদ্দিন।

সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন-এঁর আবির্ভাব দিবস পালন হয় বিভিন্ন দরবারে ২২/২৩ অগ্রহায়ণ। পৃথিবীর বুকে এসেছিলেন কুলিয়ারচর থানার ফরিদপুর নামক গ্রামের সরকার বাড়িতে। তাঁর পিতা ছিলেন মোজাফ্‌ফর সরকার। তিনি অতিশয় ধার্মিক ছিলেন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন ছিলেন সবার বড়।

তাঁর জন্ম সন নিয়ে মতভেদ আছে। তবে যতদূর তথ্য পাওয়া যায় ১৮৭২ সন হতে ১৮৮০ সনের মধ্যে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে অতিশয় আদর ও যত্নে লালিত-পালিত হয়েছেন তিনি। শৈশবে কুলিয়ারচর থানার ওসমানপুর নামক গ্রামে ওসমানপুর মক্তবে (বর্তমান প্রাইমারী স্কুল) প্রাইমারী শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তৎকালীন আসাম প্রদেশের (বর্তমান সিলেট জেলা) কোন এক মাদ্রাসায় কিছুদিন শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসা হতে জামাত উলা (স্বর্ণ পদকসহ) পাশ করেন। এরপর এনট্রান্সও পাশ করেন।

এই সময় তিনি সাব রেজিস্ট্রার পদে চাকুরি পান। কিন্তু চাকুরি ও দুনিয়ারির মোহ তাঁকে আকৃষ্ট করতে না পারায় চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে বিভিন্ন দরবার ও আস্তানায় ঘুরে বেড়ান। তন্মধ্যে সূফী সাধক আজান গাছী ও শাহ্‌ সূফী আহসান উল্লাহ্‌-এঁর দরবার উল্লেখযোগ্য। তিনি ঢাকার মিরপুরে হযরত শাহ্‌ আলী বোগদাদী-এঁর মাজার শরীফে কিছুদিন কাটান। তবে উল্লেখযোগ্য সময় কাটান শাহ্‌ আহসান উল্লাহ্‌-এঁর দরবারে। এখানে তিনি ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

পরবর্তীতে ১৮৯৫ সনের দিকে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও ভাবুক প্রকৃতির। গ্রামে তাঁর সমবয়সীদের সাথে বেশি মেলামেশা না করে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে আরম্ভ করেন। তাঁর পিতা সন্তানের এই অবস্থা দেখে নরসিংদী জেলার গকুলনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ভূঁইয়া বাড়িতে মেয়ের সাথে বিবাহ দেন। তাঁর শ্বশুরের নাম আলী ভূঁইয়া।

বিবাহের পর তাঁর সংসারে দুই মেয়ে ও এক ছেলের জন্ম হয়। কিন্তু শৈশবেই এক মেয়ে ও এক ছেলের পৃথিবী থেকে বিদায় ঘটে এবং এক মেয়ে তাঁর ওফাতের এক থেকে দেড় বছর আগে বিদায় নেন। সন্তান জন্মের পর সাধারণত মানুষ বেশি উৎসাহ নিয়ে সম্পদশালী হতে চেষ্টা করে; কিন্তু এই সূফী সাধক ছিলেন ঠিক উল্টো। সাংসারিক জীবন তাঁর কাছে অর্থহীন ও উদ্দেশ্যবিহীন বোঝা হয়ে উঠেছিল।

তিনি গভীরভাবে এবাদত মুরাকাবা, মুশাহেদাতে মশগুল থাকাতেই বেশি সচেষ্ট থাকতেন। তাই বেশিরভাগ সময়ে তাঁকে একাকী অথবা কবরস্থানে পাওয়া যেত। এই সময় নারায়ণপুর গ্রামে প্রায় ৫/৬ বছর অবস্থান করেন। ঠিক এই অবস্থায় যখন তাঁর বয়স ৩৫ কী ৩৮ বছর তখন তাঁর স্ত্রীবিয়োগ হয়। তিনি হন মুক্ত।

কোন কিছুই তাঁকে দুনিয়াদারির প্রতি আকৃষ্ট করে রাখতে পারেনি। জ্ঞানের রাজত্বে বিচরণের জন্য ভাবের সাগরে ডুব দিয়েছিলেন তিনি। তৎকালীন লোভনীয় ও সম্মানীয় সরকারি চাকুরি সাব রেজিস্ট্রারের পদও তাঁকে আটকাতে পারেনি। আল্লাহ্‌র সন্ধানে তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন স্থানে কিছু কিছু সময় অবস্থান করেন।

দুনিয়াদার মানুষকে কর্মের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র দিকে আকৃষ্ট করাকে সাধনার প্রথম স্তরে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। তিনি কঠোর সাধনা ও রিয়াজতপূর্ণ জীবন প্রণালী দ্বারা সমাজে আদর্শ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সূফী সাধক আজান গাছী-এঁর খেলাফত প্রাপ্ত হলেও শাহ্‌ সূফী আহসান উল্লাহ্‌ (মুশুরী খোলার শাহ্‌ সাহেব নামে খ্যাত) ও হযরত শাহ্‌ আলী বোগদাদী-এঁর সঙ্গে তাঁর এক গভীর যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

নদীর কিনার ধরে হাঁটা, কবরস্থানে অবস্থান সর্বোপরি সারা রাত্রি দু-পায়ের উপর ভর করে বসে থাকা অবস্থায় নিজ খেয়ালে কুরআনের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তাঁর সাধনা জীবনের অন্যতম দিক। শত শত মানুষ যখন তাঁর পিছনে পিছনে হাঁটছে স্ব-স্ব মকসুদ পূরণের আশায়, তখন তিনি নিজের মনে হেঁটেই চলতেন। গড়ে প্রায় প্রতিদিন ২৪ থেকে ৩০ মাইল হাঁটতেন অথচ ক্লান্তি তাঁকে স্পর্শ করতে পারতো না।

গাছে ফুল ফুটলে তা শহর, গ্রাম, পাহাড়-পর্বত যেখানেই হোক না কেন মৌমাছি, মাছি আর ভ্রমর যেমন যাবেই ফুলের স্বাদ গ্রহণ করতে, ঠিক তেমনি সূফী সাধকের আবির্ভাব ঘটলে সাধারণ মানুষ, ধর্মানুরাগী ও সমাজের অবহেলিত মানুষেরও জমায়েত সেখানে হবেই। সাধারণ মানুষ ছুটে যাবে তাদের দৈনন্দিন সমস্যার সুরাহার জন্য আর ধর্মানুরাগী যাবে আশ্রয়স্থল নির্ধারিত করার স্বপ্নে।

অপরদিকে, অবহেলিত মানুষ যাবে সমাজের কাছে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। ঠিক একই ধারা চলতে থাকে কান্দুলিয়ায়। সূফী সাধক আক্তার উদ্দিনের কাছে জমায়েত হতে থাকে মানুষের বহর। এক আম গাছের নিচে কুঁড়ে ঘরে বাঁশের মাচার উপরে ছিল তাঁর অবস্থান।

তাঁকে ঘিরে দিনে-রাতে হাজার মানুষের আনাগোনা। ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাঁর কামালিয়াত। খ্যাত হয়ে পড়েন ‘কান্দুলিয়ার মৌলভী’ নামে। এভাবেই চলে যায় দীর্ঘ ১২ বছর। যে যায় সে আর খালি হাতে ফেরে না। ত্যাগের আদর্শে চলতে থাকে ইসলাম প্রচার মানবতার কল্যাণে।

সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন-এঁর সাধনার বয়সকাল ছিল প্রায় ৭৫ বছর। সাধনাকালে নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এঁর অনুসরণ করে তিনি তাঁর অনুসারীদের সত্যের পথ ও ত্যাগের মাধ্যমে পথ চলার বাস্তব দিকগুলো তুলে ধরেছিলেন। স্বভাবে সত্য আর ত্যাগের মাধ্যমে মানবতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তাঁর অনুসারীদের মাঝে, যাতে পরবর্তীতে তাঁরাও সমাজে একই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। ধর্ম মানবতার জন্য - এ আদর্শ তাঁর কর্ম, চলাফেরা সব কিছুতে প্রকাশ হয়ে পড়ে ঝড়ের বেগে। ষাটের দশকে তাঁর চাঁদোয়ার নীচে এসে জড়ো হতে থাকে মুক্তিপাগল কয়েক যুবক যাঁরা আজও সাধনার জগতে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরই আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে।

তাঁদের মধ্যে শাহ্‌ আব্দুর রহমান, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক অন্যতম। আরও আসলেন মুখলেসুর রহমান সাহেব, সূফী হামিদুল হক, সিরাজ সাহেব, পন্ডিত সাহেব, সোনা মিয়া, খালেক শাহ্‌, হানিফ শাহ্‌ ও আজিম উদ্দিন প্রমুখ। শাহ্‌ আব্দুর রহমান সব সময় সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন এঁর সাথে সাথে থাকতেন। তাঁর একটাই আর্জি ছিল সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন এঁর নিকট; তিনি যেন তাঁর মুর্শিদের আগেই ইন্তেকাল করেন। বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি আগরপুর গ্রামে।

সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন প্রতিদিন ফরিদপুর গ্রাম থেকে হেঁটে সরারচর আসতেন এবং পোষ্ট অফিসের সামনে একটি কাঁঠাল গাছের নিচে বসতেন। চা খেতেন। পোষ্ট অফিসের কর্মচারীদের জিজ্ঞাসা করতেন প্রতিদিন তারিখ ও সময় সম্বন্ধে। উপস্থিত জনসাধারণ, ভক্ত, আশেকানদের কথা শুনতেন; তারপর এক সময় উঠে রওনা দিতেন আবার ফরিদপুর গ্রাম অভিমূখে।

সূফী সাধকের সুযোগ্য উত্তরসূরী প্রধান খলিফা সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁরই নির্দেশে সাধারণ মানুষ ও ভক্তদের জন্য হাক্কানী ওজায়িফ, হাক্কানী দর্শন তুলে ধরেন জীবন চলার পথে শান্তি ও মঙ্গল হাসিল করার জন্য। তাঁর আদর্শকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার মানসে তিনি মানবতার সেবায় হাক্কানী খানকা/দরবার শরীফ/আস্তানা শরীফ শহর/জেলা/গ্রামে একের পর এক উদ্বোধন করেন।

সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন ১৯৮৩ সালে লোকান্তরিত হওয়ার ৩/৪ বছর আগে যখন ফরিদপুর হতে সরারচর বাজার পর্যন্ত  হাঁটতেন, তখন তা দেখে ভক্তরা পরামর্শ করে তাঁর জন্য একটি রিক্‌সা এনে তাঁর কাছে আর্জি পেশ করেন রিক্‌সায় উঠে যাতায়াত করার জন্য। সূফী সাধক এই আর্জি গ্রহণ করেন। এরপর থেকে প্রতিদিন তিনি   রিক্‌সায় উঠে বসলে ভক্তরা রিক্‌সা টেনে টেনে নিয়ে যেতেন। বেশিরভাগ সময়ে পথিমধ্যে ডুমরাকান্দার বাজারে চা খেতেন এবং কিছু সময় ব্যয় করতেন এই বাজারের আশেপাশে।

সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যার আগে আগে যখন তাঁর ভক্তদের নিয়ে ফরিদপুর গ্রামে পৌঁছাতেন তখন আরম্ভ হতো আর এক দৃশ্য। সরকার বাড়ির বৈঠকখানা ঘরটিই ছিল সূফী সাধকের দরবার। তিনি বারান্দায় বসতেন। টিনের ঘর। ভিতরে ছিল একটা চৌকি পাতা। কোন সময় বিশ্রাম নেয়ার প্রয়োজন মনে করলে অথবা ভক্তদের কাছ মধ্য থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন মনে করলে ওই চৌকিতে শুয়ে বিশ্রাম নিতেন। অবশ্য এক সঙ্গে ৪ ঘন্টার বেশি কোনদিনই তিনি বিশ্রাম নেননি।

এছাড়া, কোনো কোনো সময়ে বারান্দায় যেখানে তিনি বসতেন, সেখানে মাতৃগর্ভে শিশুরা যে অবস্থায় থাকে ঠিক একইভাবে বসার জায়গায় শুয়ে বিশ্রাম নিতেন। তাঁর বসার জায়গায় বিছানো থাকতো কাঁথা, যা ছিল তাঁর আসন। বারান্দা ছিল উঠান হতে খুব বেশি হলে ছয় ইঞ্চি উঁচু। আসনের সামনের উঠানে দু’টা ইট একত্রে রাখা থাকত।

প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে পৌঁছে তিনি ইটের উপর দাঁড়াতেন আর ভক্তরা তাঁর পায়ে পানি ঢালা আরম্ভ করত। এই পানি ভক্ত ও মকসুদিরা হুড়াহুড়ি করে পান করত আর কেউবা গায়ে মাখত, যার যার নিয়ত করে এবং অপার মহিমায় বেশির ভাগ লোকের সৎ নিয়তগুলো পূরণ হতো। সূর্য অস্তের সময়ে এই দরবারে প্রতিদিন কী দৃশ্যের অবতারণা হতো তা প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া অনুধাবন করা খুব কঠিন।

পা ধুয়ে বারান্দায় তাঁর আসনে উঠার সময় ভক্তদের মাঝে প্রতিযোগিতা শুরু হতো কে কার আগে গামছা দিয়ে পা-মুছিয়ে দেবেন। পা-মুছিয়ে দেয়া পর্যন্ত তাঁকে একটা শিশুর মত মনে হতো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন নির্বিকার। আসনে দু-পায়ের উপর উবু হয়ে বসতেন। তখন চতুর্দিকে আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালিয়ে পরিবেশটাকে ভাবগম্ভীর করে তুলতেন ভক্তরা। সবাই উঠানে বসে পড়ত। আরম্ভ হতো তাঁর তাত্ত্বিক আলোচনা। কার সঙ্গে তিনি আলোচনা করতেন একমাত্র তিনিই জানতেন। তবে ভক্তদের মধ্যে যারা একনিষ্ঠভাবে শুনতেন, তারা অনেকে জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছেন। যখন কোন ভক্ত বা মকসুদি কোন জিনিস তাঁর সামনে নজরানা হিসেবে পেশ করতেন, তখন তা উপস্থিত সবার মধ্যে তা বিলি করে দিতেন। যদি কারো আনা খাবার পছন্দ হতো তাহলে অনেক সময় তিনি আঙ্গুলের সাহায্যে তিন থেকে সাতবার তুলে খেতেন এবং বাকীটা বিলি করে দিতেন। সারারাত্রি একইভাবে কাটাতেন। মাঝে মাঝে সারারাত্রির মধ্যে ১/২ কাপ চা খেতেন। ফজর পর্যন্ত চলতো এভাবে, আবার হাঁটা শুরু হতো। প্রতি ওয়াক্তে আজান হতো। সবাইকে পাশের ঘরে উঠানে নামাজ পড়ার তাগিদ দিতেন। কিন্তু কেউ তাঁকে স্বশরীরে নামাজ পড়তে দেখেনি।

এ থেকে অনেক শরীয়তি মানুষের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। তারা মেতে ওঠে সূফী সাধকের বিরুদ্ধে চক্রান্তে। ফতোয়া দিতে আরম্ভ করে তাঁর বিরুদ্ধে, এমনকি সূফী সাধককে ‘কাফের’ আখ্যা দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি। কিন্তু তিনি নিশ্চুপ।  ইসলাম ধর্মের প্রতি আহ্বান এতে বাধাগ্রস্ত হলেও থেমে থাকেনি।

শরীয়ত সাধনার সাধক যা জানেন তা ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিজাত, গ্রন্থাদি প্রসূত। আর মারেফত সাধনার সাধক যা জানেন এবং যে জ্ঞানের পথে চলেন তা উপলব্ধিজাত। স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জ্ঞানের পথ ধরে হন জ্ঞানবান। জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ্‌র। তাই সত্য সন্ধানে মারেফতের উপর সাধককূল অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন যা লক্ষ্য করলে মনে হয় সাধক শরীয়ত উপেক্ষা করছেন। সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন এঁর ক্ষেত্রে ঘটেছিল ঠিক তাই।

তথাকথিত শরীয়তি আলেম সম্প্রদায় জনসাধারণের কাছে এমনকি তাঁর ভক্তদের মধ্যে ফ্যাসাদ সৃষ্টির জন্য উঠে পড়ে লাগে। কোন এক শুক্রবার সূফী সাধক ফরিদপুরে তাঁর দরবারে বসে আছেন এমন সময় কতিপয় কুচক্রী ধর্মজীবী দুপুর ১২টার দিকে তাঁর কাছে আসেন এবং তাঁর সাথে অবস্থান করতে থাকেন। জুম্মার নামাজের সময় অতিবাহিত হওয়ায়  তারা সূফী সাধককে প্রশ্ন করেন - হুজুর আপনি নামাজ পড়লেন না? আমরা তো আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য এসেছি। তাহলে আপনি কি শরীয়ত মানেন না? হুজুর নিশ্চুপ। ভক্তদের মাঝে গুঞ্জন।

দরবারে আনুমানিক ৩০০-৪০০ ভক্ত মকসুদি ছিল। সবাই পরিস্থিতি দেখছেন। এভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় কেটে গেল। দেখা গেল দু’জন মুসুল্লি মসজিদে নামাজ পড়ে দরবারের দিকে আসছেন। সঙ্গে ধামাতে ভাত ও তরকারি। তারা দরবারে এসে প্রথমেই সূফী সাধকের কাছে ক্ষমা চাইলেন দেরি হওয়ার জন্য। কুচক্রীদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি? তাদের মধ্যে একজন বললেন - হুজুর আমাদের সাথে নামাজ আদায় করার পর হুকুম দিলেন - দরবারে মেহমান আছে কিছু খাবার আনলে - এই কথা বলে চলে আসেন। মেহমানদের জন্যে আমাদের খাবার আনতে গিয়ে একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে। কুচক্রী ধর্মজীবীরা হতবাক।

সূফী সাধক তাদের খাওয়ানো শেষে বিদায় দিলেন। এমন জ্বলন্ত প্রমাণ পাবার পরও সরারচরে তাঁর যাওয়ার রাস্তায় বহুবার বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে, “সাবধান। যাঁরা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হন তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত। কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করতে পারো না” (২:১৫৪)।

আরো উল্লেখ আছে, “যদি তোমরা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হও অথবা মৃত্যুবরণ কর তা হলে নিশ্চয় আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে ক্ষমা এবং রহমত অনেক উত্তম” (৩:১৫৭)।

এই পৃথিবীতে যে সকল সাধক সত্য ও মানবতার জন্য নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং আল্লাহ্‌র রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করেন তাঁদেরকে মৃত মনে করা উচিত নয়। কেননা তাঁরা একমাত্র এক আল্লাহ্‌রই উদ্দেশ্যে তাঁদের নিজেদের জীবনকে সমর্পণ করেন। তাই তাঁরা শারীরিকভাবে লোকান্তরিত হলেও আধ্যাত্মিকভাবে চিরঞ্জীব থাকেন।

দুনিয়ায় অধিষ্ঠিত মানুষ ধন-দৌলতকে প্রাণের মতই ভালবাসে এবং সেই কারণে মৃত্যুকে অত্যন্ত ভয় পায়। অপরপক্ষে, সাধকগণ আল্লাহ্‌র পথে যাত্রা শুরু করে এমন এক অফুরন্ত ভাণ্ডারের অধিকারী হন যার সমকক্ষ কিছুই হতে পারে না। সেই রূপ অফুরন্ত ভাণ্ডারের অধিকারী সূফী সাধক আক্তার উদ্দিন কালোত্তীর্ণ এক মহাপ্রাণ।

 

 সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

 

 

সুবিশাল জগৎ সংসারে অনন্ত গতিময় জীবন প্রবাহে সৃষ্টির বৈচিত্র্যময়তা রয়েছে অক্ষুন্ন। পৃথিবীও নিজস্ব নিয়মে অব্যাহত রেখেছে এই ধারা। এখানে জীবন আসে জীবন যায়। ফেনায়িত সৃষ্টি-সাগরে সামান্য বুদবুদ সমান অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিটি মানুষ আসে এবং যায়। তবু এই সাধারণ নিয়মটাকে ব্যতিক্রমে বিভাসিত করেন কেউ কেউ। তফাতটা শুধু অস্তিত্বের দীর্ঘস্থায়ীত্বের অর্থাৎ সময়ের। এর পেছনে মূল যে সত্য প্রধান ভূমিকা রাখে তা হচ্ছে ‘কল্যাণ-ব্রত’।

‘অন্যের জন্যে আমি’ - এই কর্ম-সাধনায় তাঁরা অতিবাহিত করে যান সমগ্র জীবন। কল্যাণিত জীবন সমষ্টিই তাই ঋণী চেতনায় ‘একক জীবন’-কে ধরে রাখে। আত্মশক্তিতে ও সত্যে তাঁরা অধিকার করে নেন অনুগত জীবনের উপাচার। ‘একক জীবন’-কে ঘিরে বিচিত্র জীবনের যে সমাগম, তাদের কেউ সত্যকে, কেউবা শক্তিকে গ্রহণ করেন। স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও দু’য়ের কাছেই তিনি উপনীত হন মহাপ্রাণ-এ। দু’য়ের কাছেই তিনি হন স্তুতির ‘রূপ’।

রূপ থেকে রূপান্তরে যাত্রা তাই সেই সব ‘মহাপ্রাণ’-কে ক্ষয়িষ্ণু সত্তায় নয় বরং ক্রমশ জীবন্ততর করে তোলে সময়ের অভিযাত্রায়। এই ধূলি-ধরা থেকে লোকান্তরিত এমনই এক মহাপ্রাণ - “সুলতানুল আউলিয়া আলহাজ্ব হযরত শাহ্‌ কলন্দর সূফী খাজা আনোয়ারুল হক্‌ রওশন জমির মাদ্দা জিল্লাহুল আলী”। মানবতার মহান সাধক তিনি। তথাকথিত ধর্ম-ধারণা থেকে সম্পূর্ণরূপে এক ভিন্ন ও মূল সত্যে প্রতিষ্ঠিত ধর্মবোধকে পুনরুজ্জীবিত করে তিনি আত্মোৎসর্গ করেছেন মানুষেরই কল্যাণ-ব্রতে।

বিরল ব্যক্তিত্ব আগমনেই রেখে থাকেন আগামীর ইঙ্গিত। খুব সাধারণ ধারায় ঘটে না তাঁদের আগমন বা আবির্ভাব। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তাঁরা অভিবাদন গ্রহণ করেন পৃথিবীর, প্রকৃতির। জননী ও জনকের নিবিড় আকাঙ্খার সাত্ত্বিক প্রকাশ হয়ে তাঁদের প্রথম কান্না ধ্বনিত হয় জাগতিক বলয়ে।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-ও আবির্ভূত হন এই ধরায় মা-বাবার বহু আকাঙ্খার বহু সাধনার ধন রূপে। তাঁর মায়ের কন্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে সেই সত্য - “ওকে আমি মাজারে মাজারে ঘুরে পেয়েছিলাম।” তিনি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন কলকাতার হ্যারিসন রোডে দুই তলা বাসার পশ্চিমের ঘরে। অবিভক্ত বাংলায় ১৯৩৬ সালে। বাংলা সন হিসেবে ১৩৪৩-এর ১৭ অগ্রহায়ণ, বুধবার সকাল ১১টায়। বাবা মজর উদ্দিন ভূঁইয়া ও মা ছায়েদা আখতার দীর্ঘদিন বিভিন্ন পীর-ফকির, মাজার-দরবার, দান-দক্ষিণার পর লাভ করেন তাঁকে। কিন্তু দুর্লভ এই সন্তান দুর্লভই হয়ে রইলেন জগতের বুকে। অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় আবির্ভূত হয়ে তাঁর মন-মানসিকতাও শৈশব থেকে ছিল রাজসিক। রাজধানীর বিলাসপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মহান সাধক পরিবারের সাথেই দেশ বিভাগের সময় বাপ-দাদার ভিটেতে চলে আসেন বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কিশোরগঞ্জে। পিতার পথ অনুসরণ করে তিনিও আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নেন ব্যবসা। কিশোরগঞ্জ শহরেই ছিল তাঁর কাপড়ের দোকান। স্বাধীনচেতা মানুষকেই সচরাচর ব্যবসাকে অবলম্বন করতে দেখা যায়। চাকুরি করা মানেই অন্যের গোলামী করা - তিনি নিজেই তা বলতেন। আজীবন তিনি স্বাধীন জীবনযাপন করেছেন। আপন ভূবনে আপনিই বাদশাহী করেছেন।

সংসারের জটিল আবর্তে তিনি বাঁধা পড়ে থাকেননি। যদিও পারিবারিকভাবেই তিনি বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন ষাট দশকে আনুমানিক ১৯৫৫/৫৬ সালে। দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন আদর্শ স্বামী। যোগ্য স্ত্রীর সংস্পর্শে তিনিও তাঁর সাধনার গতিপথকে ত্বরান্বিত করতে পেরেছেন। দু’জনার মধ্যে কখনও বিবাদের ছোট খাটো অংশও প্রকাশ পায়নি। সংসার উদাসীন তিনি অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন মাজার-দরবার ঘুরতেন।

বিশাল সম্পত্তির মায়া ছিন্ন করে তিনি বাইরে বাইরে ঘুরতেন অন্তরে প্রোথিত সত্য সন্ধানী সত্তার উদ্বেলতায়। প্রচুর অর্থও নিজে দু’হাতে নিঃসঙ্কোচে ব্যয় করেছেন এ পথেই। অবশেষে তাঁর অনুসন্ধিৎস্যু মন খুঁজে পেলো তাঁর কাঙ্খিত আশ্রয়। আত্মবিকাশের সঠিক মাধ্যম। দর্শন পেলেন, আত্মসমর্পিত হলেন কিশোরগঞ্জস্থ কুলিয়ারচর থানার ফরিদপুর শরীফের  ‘কান্দুলিয়ার মৌলভী’ অর্থাৎ হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন শাহ্‌ কলন্দর গউস পাক্‌-এঁর শ্রী চরণে। গউস পাক তাঁর হাতে তুলে দিলেন হাক্কানী দর্শন। নিখাঁদ প্রেমের তরী ভাসালেন গউস পাক-এঁর হৃদয় সাগরে। কর্ম ও ত্যাগের সাধনায় তাঁর একনিষ্ঠতা তাঁকে মুক্তির সনদ এনে দিল।

পরশ পাথরের পরশে ‘ভাটির ছ্যাড়া’ (তাঁর হুজুর তাঁকে এ নামেই ডাকতেন) হলেন স্বতন্ত্র এক পরশ পাথর। সাধনার এই পর্যায়ে বৈশ্বিক মানবতার অনুধ্যান নিয়ে তিনি হলেন সংসার ত্যাগী। তবে পরিবারে তখন তাঁর মা, স্ত্রী, ছেলে বা ভাই-বোনদের কারো প্রতিই তিনি অবিচার করেননি।

ব্যবসা-সম্পত্তি সব ছোট ভাই আজিজুল হক বাচ্চুর হাতে দিয়ে দেন। স্ত্রীকে পূর্ব থেকেই ইঙ্গিত দিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখেন। আর তাঁর মা তো জানতেনই যে, “ওর বয়স যখন এক বছর তখন এক সাধক ওকে দেখে বলেছিলেন, ‘মা’ তুই এ ছেলেকে কোন বন্ধন দিয়েই ধরে রাখতে পারবি না।” সাধনার সন্তান হারালো সাধনায়। মাতৃভক্তি ছিল তাঁর চরম। তাঁর যারা অনুসারী বা তাঁর কাছে যারাই আসতেন তিনি তাঁদেরকে ‘মা’-এর প্রতি অনুরক্ত হতে উপদেশ দিতেন। তিনি বারবারই বলতেন যে, মায়ের ঋণ কখনো শোধ করা যাবে না।

গউস পাক্‌ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁকে খাঁটি পরশ পাথরে পরিণত করেছেন। সেসব অনেক ঘটনাই তিনি বলেছেন। অনেকেরই জানা আছে সেসব ঘটনা। জানা যায়, শাহ্‌ সূফী হওয়ার পর তিনি প্রথম অবস্থান করেন ছাতিরচরে। সেখান থেকে তিনি এলেন রাজধানী ঢাকার নারিন্দা ভুতের গলিতে। কিছুদিন থাকার পর তিনি ধানমন্ডিতে অবস্থান নেন।

বিলাসবহুল রাজধানীতে যাঁর জন্ম রাজধানীতেই তাঁর লোকান্তর। যদিও তফাৎটা এপার বাংলা - ওপার বাংলা। ঢাকার ধানমন্ডিতে তিনি হাক্কানী খানকা শরীফ স্থাপন করে তাঁর মুর্শিদের হুকুমে গড়ে তোলেন তাঁর রাজত্ব। কিন্তু শুধু ঢাকা কেন্দ্রিকই ছিল না তাঁর কর্মসাধনা, দেশ তথা উপমহাদেশ তথা সমগ্র এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অঞ্চলে ছড়িয়েছেন তাঁর সাধনার দীপ্তি। গ্রামে-গঞ্জের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে মানবতার ধর্মকে প্রসারিত করে দিয়েছেন। ভাববাদী ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে তিনি ধর্মান্ধতাকে কখনোই প্রশ্রয় দেননি। তাঁর সংস্পর্শে যিনি এসেছেন তিনিই উপলব্ধি করতে পেরেছেন প্রকৃত ধর্মের স্বরূপ।

ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে সারা দেশব্যাপী তিনি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে স্থাপন করেছেন হাক্কানী খানকা শরীফ, আস্তানা শরীফ, দরবার, হাক্কানী কমপ্লেক্স প্রভৃতি। তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠা সেই একই লক্ষ্যে - ‘ধর্ম মানবতার জন্য, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্য নয়’। হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ, হাক্কানী মিশন মহাবিদ্যালয় - তাঁর শিক্ষানুরাগকেই প্রকাশ করে। বর্তমান হলুদ সাংবাদিকতার জগতে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক হওয়ার জেহাদে রত, সৃজনশীল ও আত্মিক সেবা সহায়তা দানের অভিপ্রায়ে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ’ তাঁর যুগোপযুগী আধুনিক চিন্তা-চেতনাকেই প্রতিভাত করে।

ধর্মের গোঁড়ামিকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দিতেন না। ‘সূফীতত্ত্ব সাধনার’ উন্মুক্ত চিত্ত বলয়ে তাঁর পরিভ্রমণ। শুভ্র বসনে সজ্জিত হয়ে যে শাহানশাহীতে তিনি থাকতেন, তা কারো কারো কাছে প্রশ্নবোধক হয়ে দেখা দিতো। কিন্তু যিনি তাঁর সঙ্গ লাভ করেছেন তিনিই দেখেছেন বাহ্যিক আবরণের আড়ালে তাঁর ত্যাগের চরমতম নিদর্শন।

ভক্তদের উপহার, উপাচার তিনি কখনোই ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করেননি। বরং তিনি মর্জি মাফিক তা বিলিয়ে দিয়েছেন ভক্তদের মাঝে। যে পুঁরুষ সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের সাধনায় নিবেদিত, তাঁকে আর কী করে টানতে পারে জাগতিক সম্পত্তির মোহ? আত্মোন্নতির চরমতম পর্যায়ে উন্নীত হতে তিনি মজ্জুব অবস্থায়ও থেকেছেন।

পথে পথে, নদীর ঘাটে নিজের সাধনায় একাগ্রচিত্তে মশগুল থাকতেন। খাওয়া-দাওয়া তুচ্ছ জ্ঞান করে ‘এক   আল্লাহ্‌র’ ধ্যানে নিমগ্ন থেকেছেন তিনি। তাঁকে এক সপ্তাহ পর্যন্তও কোনো কিছু না খেয়ে থাকতে দেখেছেন অনুসারীদের মধ্যে কেউ কেউ। ভক্তদের আনা বিচিত্র রকমের অভিজাত খাবার সামনে থাকলেও কখনই তিনি পেট ভরে তা খেয়েছেন বলে শোনা যায় না। খুব সামান্যই তিনি খেতেন। ঘুমের ক্ষেত্রেও তাঁর নিয়ন্ত্রণ পুরোমাত্রায়। তাঁর সাথে রাত জেগেছে এমন অনেককেই বলতে শোনা যায় তিনি আদৌ ঘুমাতেন না। অর্থাৎ নিজের প্রতি নিজের    নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর পুরোপুরি। আল্লাহ্‌র শক্তিতে শক্তিমান যিনি তাঁর কাছে অন্য কোনো বিরুদ্ধ শক্তিই কি প্রভাব ফেলতে  পারে ?

সফর প্রিয় ছিলেন তিনি। অধিকাংশ সময়ই তিনি সফরে সফরে থাকতেন। কখনো গাড়িতে, কখনো নৌকায়, কখনো পায়ে হেঁটে তিনি সফর করেছেন দেশের আনাচে-কানাচে। তাঁর প্রতিটি সফর ছিল কার্যকারণ সম্পর্কিত। ধর্মকে কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন - “নিজের বিচার নিজে করো রাত্রদিনে।” আত্মবিশ্লেষণের সূক্ষ্মতায় আত্মোন্নয়নের পথে অভিযাত্রী রূপে গড়ে উঠতে তিনি দীক্ষা দিয়েছেন তাঁর অনুসারীদেরকে। ভালবাসায়, স্নেহে, আদরে-আপ্যায়নে, আতিথেয়তায় তাঁর তুলনা চলে না।

অনেকেই তাঁর কাছে আসতেন এসবেরই টানে। শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, জাগতিক কর্মানুশীলনের মাধ্যমেও তিনি অনেককেই দিয়েছেন নতুন জীবনের সন্ধান। তাঁর প্রতিটি কথায়, চলাফেরায়, ভঙ্গিমায়, চাহনিতে তিনি শিক্ষণীয় ইঙ্গিত রেখেছেন। যে যেভাবে বুঝেছে সে সেভাবেই তা গ্রহণ করেছে। দরবারী আদব ও তাঁর হুকুম যথাযথ পালন করতে পারলে অনেক মকসুদিই তাদের সমস্যার সমাধান করিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

আত্মপ্রচার বিমুখ ছিলেন বলেই ওলিকূল শিরোমণি হয়েও তিনি নিভৃত জীবনযাপন করেছেন। ‘মন চাইলে আইসেন’ - সূত্রে তাই তিনি আগন্তুকদের আহ্‌বান জানাতেন। কখনই তিনি নিজের সুপ্ত সাধন-ভান্ডার যেচে কারোর সামনে প্রচার করেননি। তাঁর শিক্ষাই হচ্ছে ‘ধনবান হও, প্রকাশিত হয়ো না’। যিনি তাঁর একান্ত অনুগ্রহের পাত্র শুধু তিনিই তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরেছেন।

২০ শ্রাবণ ১৪০৬, ৪ আগস্ট ’৯৯ বুধবার সকাল ৭টা ০৫ মিনিটে তিনি লোকান্তরিত হন। মা-ভক্ত সাধক সন্তান মায়ের মৃত্যু তারিখকেই বরণ করে নিলেন নতুন পথে যাত্রার। পরিশেষে মায়ের পাশেই শায়িত হলেন তিনি। কিশোরগঞ্জ জেলার চাঁন্দপুর  গ্রাম আজ এই মহাপ্রাণের স্পর্শে পুনরুজ্জীবন লাভ করে হয়েছে ‘চাঁন্দপুর শরীফ’। কল্লোলিত হয়ে উঠেছে তাঁর প্রেমিক, ভক্ত ও মকসুদিদের সমাগমে।

এক মহামিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে চাঁন্দপুর শরীফ। এর ব্যাপ্তি দিনে দিনে প্রসারমান। জাগতিক দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্‌ আজ অন্তরালে থেকেই নিজেকে প্রকাশিত প্রসারিত করছেন বিশ্বাসীদের অন্তরে ও চিন্তা প্রবাহে। বিশ্বাসীদের কাছে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী এক মহাপ্রাণ, যিনি অবশ্যই প্রশংসার সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত ছিলেন-আছেন-থাকবেন।

 

 

॥ অমৃত কথা ॥

 

 

* তুমি প্রতিটি কর্মের মধ্যে সত্যকে অন্বেষণ কর তাহলে তোমার ইবাদতের দ্বার খুলে যাবে।

* ঈমানদার সব সময় তার আল্লাহ্‌কে স্মরণ করে, দুঃখ শোকে ধৈর্য্যশীল।

* তোমার আল্লাহ্‌কে স্মরণ কর,  মুনাফিক আর মুশরিক না হওয়ার প্রচেষ্টায় রত থাক।

* সকল কর্মের প্রারম্ভেই তুমি তোমার আল্লাহ্‌কে অবশ্যই স্মরণ করিও।

* নিজের চোখকে আয়ত্তে আনো, সাধনার পথে এগিয়ে যাও।

* জ্ঞান অর্জনে বই-কেতাব হতে মানুষ-কেতাব উত্তম।

* যে ব্যক্তি সর্বদা তার আল্লাহ্‌র নিকট মার্জনা ভিক্ষা করে সে কখনো বিপদগ্রস্ত হয় না।

* সেই ব্যক্তি স্বাধীন যে নিজের নফস্‌কে আল্লাহ্‌র নির্ধারিত রাস্তায় বশে এনেছে।

* ক্ষমা প্রদর্শন ভদ্রতার নিদর্শন।

*যে মুর্শিদকে দর্শন করতে সচেষ্ট হয়েছে তার হজ্বের যাত্রাও শুরু হয়েছে।

* তোমার কর্মের মধ্যে প্রতারণা করিও না, প্রতারণা সব অপরাধকে বাড়িয়ে তোলে।

* নিজেকে চেনার চেষ্টা কর। যতই নিজেকে চিনবে ততই আল্লাহ্‌র নিকটবর্তী হবে।

* প্রত্যাশাহীন কর্মই ধার্মিক হতে সহায়তা করে ও আল্লাহ্‌ প্রাপ্তির সহায়ক হয়।

* ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষ্মভাবে দর্শন করার    মাধ্যমেই ঘটে আত্মদর্শন।

* সত্য দেখার আগে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করা শ্রেয়।

* আত্মকর্ম বিশ্লেষণে ব্রত নিলে সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যাবে।

* বিদ্যা, বুদ্ধি, বল বিক্রম, পান্ডিত্য গর্ব দোষে খর্ব হয়।

 

 

* নিজের বিচার নিজে কর রাত্রদিনে।

* সাবধান। হাসতে, খেলতে, দেখতে আর বলতে ঈমান চলে যেতে পারে।

* তুমি সেই ফুল হও - যে ফুল প্রস্ফুটিত হয় কিন্তু ঝরে যায় না।

* যে ব্যক্তি মুর্শিদের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে না, সে দ্বীনের কাজ করতে পারে না।

* আল্লাহ্‌র স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরী করলে আল্লাহ্‌র পরিচয় লাভ হবেই।

* মুর্শিদ দর্শনের মাঝে আত্মদর্শন। আর আত্মদর্শনের মাঝে আল্লাহ্‌ দর্শন।

* মনে রেখো কেহ কোন কাজে লেগে থাকলে মেগে খায় না।

* প্রশংসাকারী হও তাহলে প্রশংসিত হতে পারবে।

* মুর্শিদের প্রতি প্রেম, বিশ্বাস ও সমর্পণ যত অধিক হবে ততো তোমার অহংকার কমে যাবে।

* প্রত্যেক ব্যক্তিই তার স্বীয় কর্মের মধ্যে আবদ্ধ থাকিবে।

* এহ্‌সানের প্রতিদান এহ্‌সান ব্যতীত অন্য কিছু কি হইতে পারে?

*জ্ঞানী-গুণীজন কারো মন্দ গায় না - বিপথগামীও করে না, যারা বুঝে না তারা অজ্ঞ, শিক্ষিত হলে হবে কি।

* স্বীয় জিহ্‌বা শাসনে রাখো - পলকে পলকে মুর্শিদ দেখো।

* ভোগের আনন্দ সাময়িক - ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন।

* বিপদে ধৈর্যশীল হও, অন্যের দোষ ক্ষমা করো

* তাহলে তুমিও আল্লাহ্‌র দরবারে ক্ষমা পাওয়ার প্রার্থী হতে পারবে।

* মুর্শিদের হুকুম অনুসারে নিজের স্বভাব পরিবর্তন করার যুদ্ধে সর্বদা নিয়োজিত থাকা উত্তম এবাদত।

* আল্লাহ্‌কে পাবার জন্য শেষ রক্ত বিন্দু নিয়ে প্রস্তুত থাকো তাঁর হুকুমে দান করার জন্য।

* শরীয়ত ও তরিকত একত্রে মিশিয়ে ডুব দিলে আল্লাহ্‌র প্রেমে নিমগ্ন থাকা যায়।

* জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিথ্যাকে ধ্বংস এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্রতী হওয়ার জেহাদে রত থাকলে আত্মিক

   উন্নতি হবেই হবে।

* বিশ্বাসের সু-বাস উবে গেলে বিশ্বাস হয়ে যায় বিষ।

* চরিত্রহীন আলেমের সংসর্গ হতে চরিত্রবান দুনিয়াদার লোকের সংসর্গ অনেক ভাল।

* বিশ্বাসঘাতকেরাই নিজ নিজ কামনায় ধরা পড়ে।

* আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার অপর নাম এবাদত।

* বারবার মৃত্যু, বারবার জন্ম; এতে আছে আনন্দ কেউ জানে না মর্ম।

* ‘না’ দিয়ে পৃথিবী ধ্বংস করা যায়, ‘না’ দিয়ে নতুন সৃষ্টি করা যায় যদি বোঝা যায় ‘না’ এর মর্মকথা।

* তারা ইসলামের আলোকে দেখিতে পায় নাই যারা আল্লাহ্‌র জন্য লালায়িত নয়।

* যে অচল হয়ে পৃথিবীতে চলে তার কাছে অচল পয়সার দাম আছে।

* যার প্রেমের শুরু নেই, শেষও নেই তার প্রেম কাঁচা।

* দরবারে এসো আশেকান হিসেবে, নারী-পুরুষ হিসেবে নয়।

* যে ব্যক্তি মনে ও মুখে এক নয় তার এবাদত শুদ্ধ নয়।

* সরলে গরল মিশাইও না, গরলে সরল মিশাইও না।

* ভাতের নিচে কৈ মাছ, আমি কৈ মাছ তালাশ করে বেড়াই।

* আম গাছে কাঁঠাল হয় না, কাঁঠাল গাছে আম হয় না।

* ক্ষেতের ইটা ক্ষেতেই ভাঙ্গতে হয়।

* বিরক্তি সরাসরি প্রকাশ না করে আচরণ দিয়ে বুঝানো উত্তম।

* প্রয়োজন মাফিক সহানুভূতি ব্যক্ত করাই ভালো।

* অসুবিধায় সহনশীলতা কাম্য।

* ত্রুটি ও অক্ষমতা অকপটে স্বীকার করে উন্নতির চেষ্টা করা উত্তম পন্থা।

* কর্ম ও চিন্তায় সমন্বয় ঘটানো বুদ্ধিমানের কাজ।

* ত্রুটিপূর্ণ আচার-আচরণ বর্জন করে ভদ্র আচরণ করতে হবে।

* যুক্তি নির্ভর বক্তব্য সবার কাছে প্রিয় ও শিক্ষণীয়।

* এসেছিলাম অন্ধকারে, থাকতে আঁধার যাবো চলে।

* অভাব নয়, অজ্ঞতাই সকল ভুলের মূল।

* যেটুকু সময় তুমি তারে ধরে রাখো, সেটুকু সময় তোমার থাকবে খুব ভালো।

* দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য, অন্যের কথায় নয়।

* কৃতিত্ব সেখানে, যেখানে মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখা যায়।

* মানুষ যদি হতে চাও, মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করো।

* মুর্শিদ আমি খুঁজবো নাকো বন-জঙ্গলে যাইয়া, আমার মাঝে আমার মুর্শিদ আছে যে পথ চাহিয়া।

* অসময়ে মাশকলাই ক্ষেত বুনে কত ড্যাহা বাছুরের দেখলাম নাচ।

* মানুষ কখনো কাহাকেও অভিশাপ দেয় না।

* বেশি কিছু ভালো নয়, বেশির কাছে কম না থাকলে বেশির কি আর মূল্য রয়।

* ধুপী যখন সেজেই গেছি, সবার কাপড় কাচতে হবে।

 

 

* কষ্ট ও ক্ষতির পর মানুষ বিনয়ী ও জ্ঞানী হয়।

* মুর্শিদকে দর্শন ও স্মরণের মধ্যেই রয়েছে দরবারের আশেকানদের পরম প্রাপ্তি।

* তুমি তোমার আল্লাহ্‌র সাথে সংযোগ রক্ষার্থে প্রতিদিন তাঁকে কমপক্ষে এক হাজার একবার স্মরণ কর।

* দৈনন্দিন প্রতিটি কর্মের মাঝে তোমার আল্লাহ্‌কে প্রতিষ্ঠিত কর।

* ঘুম ভাঙ্গার পর চোখ মেলার আগেই তোমার আল্লাহ্‌কে স্মরণ কর।

* নিঃসন্দেহ সম্পর্ক আর সশ্রদ্ধ ভালোবাসা তোমার আল্লাহ্‌ প্রেমের  প্রাথমিক উপাদান।

* তুমি যতই তোমার প্রতিটি কর্মের বিশ্লেষণ করবে ততই তোমার আত্মিক উন্নতি হবে।

* কখনই নিজেকে অপরের সঙ্গে তুলনা করো না, যদি কর তাতে তুমি নিজেকেই অপমানিত করলে

   যা আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন না।

* তোমার আল্লাহ্‌র হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মধ্যেই রয়েছে সার্বিক শান্তি।

* একজনের কথা অপরজনের কাছে সঠিক প্রকাশ করতে না পারলে তুমি নিজেই মিথ্যাবাদী হবে।

* চোখ থাকতে অন্ধ, কান থাকতে কালা, মুখ থাকতে বোবা হয়ে যে আল্লাহ্‌র হুকুম পালন করে সেই সর্বোত্তম।

* সংস্কারমুক্ত হয়ে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার পথে পা বাড়াও, তুমি তোমার আল্লাহ্‌র রহমত হতে বঞ্চিত হবে না।

* সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হোন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান।

* সমর্পণ করা সহজ কিন্তু আত্মসমর্পণ করা অত্যন্ত কঠিন।

* সুজন, কুজন আর আপনজন - এই নিয়ে হয় জীবনযাপন।

 

জ্যোতির্ময়ের নিদর্শন

 

সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন শাহ্‌ কলন্দর গউসপাক এবং তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এ উপমহাদেশে সূফীতত্ত্ব ও হাক্কানী ধারায় উজ্জ্বল নক্ষত্র।

কান্দুলিয়ার মৌলভী নামে খ্যাত সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন-এঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা নির্জন বর্ধিষ্ণু গ্রামে। পরিবেশ, প্রকৃতি, নির্জনতায় মানবতার এই সাধকের জীবন যাপন ছিল সাদাসিধে ও সহজ সরল। অগণিত ভক্তকূল পরিবেষ্টিত হয়ে দিবারাত্রি মানব সেবায় রেখে গেছেন শ্রেষ্ঠ মানবতার স্বাক্ষর। চিরঞ্জীব রয়েছেন তাঁর ভক্তকূলের মাঝে, ওই অঞ্চলের মাটি, পানি, বায়ুতেও রয়েছে তাঁর সুশোভিত সুঘ্রাণ।

দৃষ্টি সীমার চারদিকে তাঁরই রূপ মাধুরী প্রস্ফুটিত, তিনি জীবন-যাপনে ছিলেন নির্মোহ, বিশেষ কোন পোশাক পরিচ্ছদ  কিংবা সুনির্দিষ্ট কোন রং ও নক্‌শার পোষাক পরিধান করতেন না। অধিকাংশ সময়ই গলায় রুমাল পেঁচানো বা গলায় গামছা এবং পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরিহিত অবস্থায় তাঁকে দেখা গেছে। অনেক সময় পাঞ্জাবিটিকে কোমর বন্ধনী হিসেবে দেখা যেত এবং পায়জামা পা’র গোঁড়ালি ও হাঁটুর মাঝ বরাবর ওঠানো থাকতো। এর বাইরে অনেকটা সময়ই গেঞ্জি, গামছা পরে থাকতেন। শত বর্ষ বয়স পেরিয়েও তিনি খালি পায়ে প্রতিদিন গড়ে ২৪ থেকে ৩০ মাইল হাঁটতেন অথচ ক্লান্তি তাঁকে স্পর্শ করতে পারতো না।

অপরদিকে, তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ভক্তকূল শিরোমণি সূফী সাধক আনোয়ারুল হকও তাঁর গুরুর অনুসরণে অত্যন্ত সহজ সরল জীবন যাপন করে গেছেন। ঢাকার ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় বিলাসী জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েও তিনি ছিলেন সকল কিছুর উর্দ্ধে। অবশ্য পরিবর্তনশীল সময়ের সাথে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তিনি হাক্কানী ধারায় বিশেষ পোষাক উদ্ভাবন এবং বিশেষ অনুষ্ঠানাদিতে ভক্তকূলের জন্য তা ব্যবহারের প্রচলন করেন। তাঁর চলাফেরায় কখনো কখনো দৃষ্টিনন্দন আভিজাত্য নজরে পড়লেও শ্বেত-শুভ্র ভূষণে ছিলেন স্বচ্ছ ও পবিত্র। সাদা ওড়নী, লুঙ্গি, কখনো কখনো গামছা, লুঙ্গিই ছিল তার মাধুর্যময় পরিচ্ছদ।

তিরোধানের পর এই দুই মহান সাধকের ব্যবহৃত অধিকাংশ জিনিসপত্রই সৌভাগ্রক্রমে যারা পেয়েছেন সংরক্ষণের জন্য তারা নিয়ে গেছেন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মিরপুর আস্তানা শরীফের সংরক্ষণেও রয়েছে তাঁদের ব্যবহূত মূল্যবান কিছু নিদর্শন যার মধ্যে লুকায়িত আছে গুরু-শিষ্যের খেলাঃ-

 

সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন এঁর স্বহস্তে লিখিত আশীর্বাদপত্র (২৮.৬.৭৮) পেলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। পত্রে উদ্ধৃতি - I wish your goodness (তোমার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি)। পরবর্তীতে ওই আশীর্বাদ  মিরপুর আস্তানা শরীফ-এ চলমান

মিরপুর আস্তানা শরীফ-এ সংরক্ষিত সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন ব্যবহৃত গামছা ও পায়জামা

 

 

সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন এঁর স্বহস্তে লিখিত তাঁর ঠিকানা (২.২.৭৪)।

[মিরপুর আস্তানা শরীফ-এর প্রাপ্তি]

মিরপুর আস্তানা শরীফে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর ব্যবহৃত তৈজসপত্র।

 

 

ধনভাণ্ডারে .......

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক প্রদত্ত

মিরপুর আস্তানা শরীফ এর প্রাপ্তি

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর অমৃত কথা - আমার একটা টাকা একশ কোটি টাকার সমান

 

সূফী সাধক দুনিয়াতে মিথ্যা বলিতে কিছু নাই, সতিত্বে মহৎ নয়। ভুল যদি হয় জন্মই মিথ্যা হয়।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর সাক্ষরিত অমৃত কথা -

(মিরপুর আস্তানা শরীফ এর প্রাপ্তি)

 

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক ব্যবহৃত তাঁর

পবিত্র পাদুকা জোড়া

[মিরপুর আস্তানা শরীফ]

 

পুষ্পে আশীর্বাদ

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক প্রদত্ত আশীর্বাদ পুষ্প

(শব-ই বরাত-১৯৮৮) [মিরপুর আস্তানা শরীফ এর প্রাপ্তি]

 

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক শয়ন কক্ষে ব্যবহৃত

দুটি বাতি (১৯৭৭)

[মিরপুর আস্তানা শরীফ এর প্রাপ্তি]

 

মিরপুর আস্তানা শরীফ এর দরবার কক্ষে সংরক্ষিত

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর ব্যবহৃত দ্বিতীয় আসন

 

 

 

মিরপুর আস্তানা শরীফ এর দর্শন কক্ষে সংরক্ষিত

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর ব্যবহৃত সামিয়ানা ও প্রথম আসন। ধানমন্ডি দরবার থেকে

মিরপুর আস্তানা শরীফ-এ

 

শাশ্বত সূফীতত্ত্বে হাক্কানী দর্শন

 

 

শাহ্‌ সারফুল ইসলাম মাহ্‌মুদ ॥

দর্শন। হাক্কানী দর্শন। সূফী-তত্ত্ব। শাশ্বত সূফী-তত্ত্ব। উদ্ধৃত শব্দসমূহের চয়ন থেকে স্বভাবতই উঠে আসে একগুচ্ছ জিজ্ঞাসা। সূফী-তত্ত্ব কি? তার আগে প্রশ্ন, সূফী কি? তখনই স্বভাবত জিজ্ঞাসা জাগে, তত্ত্ব কি? কেনই বা শাশ্বত সূফী-তত্ত্ব? অর্থাৎ, সূফী-তত্ত্ব কেন শাশ্বত? প্রশ্ন এসে যাবে শাশ্বত কি? তারপরই জিজ্ঞাসা জাগে, হাক্কানী-দর্শন কি? প্রশ্ন আসে, হাক্কানী কি? আবার জেনে নিতে হয়, দর্শন কি? এ-প্রশ্নও এসে যেতে পারে সূফী-তত্ত্বের সঙ্গে হাক্কানী-দর্শনের যোগ কোথায়? সর্বোপরি প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্ন আসতে পারে মিরপুর আস্তানা শরীফের রজত জয়ন্তীতে কেন হল এর অবতারণা?

শাশ্বত সূফী-তত্ত্ব বুঝতে গেলে সর্ব প্রথমেই জেনে নিতে হয় তত্ত্ব কি? তত্ত্ব কি জানা থাকলে পরিষ্কার ধরা পড়ে সূফী শব্দের মর্মার্থ। সূফী-তত্ত্বও পরিষ্কার হয়ে যায় এবং তখন আপনাতেই উত্তর এসে যায় সূফী-তত্ত্ব কেন শাশ্বত। আর তখন শাশ্বত শব্দের অর্থ ধরে সূফী-তত্ত্বের শাশ্বত হয়ে উঠার যথার্থতাও বোধগম্য হয়ে উঠে সহজভাবেই।

বাংলা অভিধানের আকর গ্রন্থ সাধক পুরুষ হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় সংকলিত বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে তত্ত্ব শব্দের যে সকল অর্থ দেয়া আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে স্বরূপ, ব্রহ্ম, বীজ, কারণ, বীজযন্ত্র ইত্যাদি।

ব্যুৎপত্তি ধরে সরাসরি সূফী শব্দের অর্থ বুঝতে গেলে অর্থ একটা পাওয়া যাবে ঠিকই, কিন্তু তা হবে অর্থগত অর্থে তত্ত্ব শব্দের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সূফী বোঝাতে গিয়ে অভিধানকারকগণ বিশেষ ধর্মাবলম্বী সাধকগণকে বুঝিয়েছেন এবং এ-কে একটি মতবাদ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। কিন্তু ব্যুৎপত্তি ধরে সূফী শব্দের প্রয়োগের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, সূফী কোন মতবাদ নয়, মতবাদ হতে পারে না। আরবী সূফী শব্দটির উৎস হিসেবে আরবী সাফ এবং সাফা উভয় শব্দকেই বিবেচনায় নেয়া হয়। সাফ কথাটির অর্থ পশম। আর এর সূত্র ধরেই অগভীর চিন্তাশ্রয়ীগণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, পশম তথা কম্বলে আবৃতকারী ব্যক্তিগণই ছিলেন সূফী। অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ-এঁর সমসাময়িক কাল এবং তৎপরবর্তীতে কম্বলে নিজেদের ঢেকে রাখতেন যেসব মুসলিম সাধক কেবল তাঁরাই সূফী এবং তাঁদের সূচীত ধারাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে সূফী মতবাদ হিসেবে। যা রীতিমত বিভ্রান্তিকর। বলা যায় উদ্দেশ্যপূর্ণতা দোষে দুষ্ট এবং হাস্যকরও বটে।

অপরদিকে, আরবী সাফা শব্দটির অর্থ হিসেবে পাওয়া যায় শুদ্ধতা শব্দটি; এর সূত্র ধরে সূফী শব্দের অর্থ নিতে গেলে যা এসে যায় তা হলো, শুদ্ধতা আনায় প্রচেষ্টারত ব্যক্তিই হলেন সূফী! এবং তখনই বড় হয়ে ওঠে শুদ্ধতা আনার বিষয়টি, প্রচেষ্টারত ব্যক্তিটি নন। কেননা ব্যক্তি তার স্থান-কাল ও তার পরিবেশ পরিচিতির মধ্যে আবর্তমান। কিন্তু প্রচেষ্টা স্থান-কাল কিংবা পরিবেশ পরিচিতি নিরপেক্ষ।

মতবাদ শব্দটিকে ভেঙ্গে দেখলে পাওয়া যায় মত এবং বাদ শব্দ দুটি। মত/অভিমত ব্যক্তি বিশেষের। বিশেষ বিষয়ে বিশেষ সময়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে এর উদয়। ব্যক্তি সময় আর পরিবেশ বদলালে পাল্টে যায়, বাদ হয়ে যায় মত! অপরদিকে, প্রচেষ্টা চলমান আবহমান। তাই তত্ত্বাশ্রয়ী। শুদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা হয়ে উঠতে পারে তত্ত্ব হিসেবে। সুতরাং সূফী কোন ব্যক্তিমাত্র নন, শুদ্ধ হয়ে উঠার প্রচেষ্টার তত্ত্বও বটে।

একইভাবে মর্মার্থ খুঁজলে দেখা যায়, সূফী বলতে যাঁরা ধার্মিক সেইসব মানুষদের বোঝায়। স্বভাবতই তাঁরা কোন স্থূল ধর্ম-বর্ণ, গোত্র কিংবা জাত-পাত অথবা দেশ-কালের সংকীর্ণ গন্ডিতে আবদ্ধ নন। বদ্ধ নন কোন বিশেষ মতবাদেও। সুতরাং যাঁরাই ধার্মিক তাঁরাই সূফী। ধার্মিক হওয়ার প্রচেষ্টা-তত্ত্বই সূফী-তত্ত্ব - যা অনন্ত নিরন্তর চলমান, আবহমান।

সঙ্গতকারণেই সূফী-তত্ত্ব তাই শাশ্বত। কারণ শাশ্বত মানে অপ-ক্ষয়-ক্ষণ-বিক্রিয়াবিহীন। বঙ্গীয় শব্দকোষে শাশ্বত শব্দের আরও যে ক’টি অর্থ দেয়া আছে তার মধ্যে লক্ষণীয় অর্থ হচ্ছে নিত্য, চিরন্তন এবং শিব ও সূর্য! সুতরাং শাশ্বত সূফী-তত্ত্বের মানে দাঁড়ায় বিচ্ছিন্ন সত্ত্বার ছিন্নত্ব কাটিয়ে মহাসত্ত্বার সঙ্গে একীভূতকরণ! এই ছিন্নত্বের মূলে রয়েছে অশুদ্ধত্ব! সুতরাং শুদ্ধত্ব-অশুদ্ধত্বকে ঘিরেই শাশ্বত সূফী-তত্ত্ব।

এবার আসা যাক, শ্বাশত সূফী তত্ত্বের সঙ্গে হাক্কানী দর্শনের যোগ কোথায় এবং যোগ কেন - সে প্রসঙ্গে। তার আগে শুদ্ধ শব্দটির দিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। আভিধানিক অর্থে শুদ্ধ মানে হচ্ছে নির্দোষ, নির্মল, ভেজালবিহীন, অমিশ্রিত, অদ্বৈত। শুদ্ধ’র মানে হিসেবে আরও রয়েছে শোধিত, খাঁটি, পবিত্র ও সাধুচরিত্র শব্দগুলোও। সঙ্গতভাবেই অশুদ্ধ মানে দাঁড়ায় দোষযুক্ত, মলযুক্ত, ভেজালযুক্ত দশা। আর এই দোষ-মল-ভেজাল দূর করেই পৌঁছা যায় পবিত্র দশায়। অর্জন করা যায় সাধুচরিত্র।

মূলত অশুদ্ধ থেকে শুদ্ধতে পৌঁছার যাত্রায় হাক্কানী দর্শন। অশুদ্ধকে শুদ্ধ করে তোলায় হাক্কানী দর্শন। সর্বোপরি, অশুদ্ধ থেকে শুদ্ধ-তে পৌঁছে দেয়ায় হাক্কানী দর্শন। ছিন্ন থেকে অবিছিন্ন হওয়ায় হাক্কানী দর্শন। দ্বৈত থেকে অদ্বৈতে পৌঁছানোতে হাক্কানী দর্শন। ভেদ ঘুচিয়ে অভেদ দশায় উত্তরণে হাক্কানী দর্শন।

বিষয়টিকে সহজভাবে বুঝতে গেলে প্রথমেই জেনে নেয়া দরকার হাক্কানী কি? এবং দর্শন কি? আরবী হক্‌ শব্দের অর্থ সত্য। বাংলায় সত্য শব্দের যে ক’টি মানে পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে যথার্থ, অকৃত্রিম, অমিশ্র, বিশুদ্ধ, সাধু, অমোঘ, বিষ্ণু, কৃষ্ণ ইত্যাদি। হক্‌-এর সঙ্গে ‘নী’ প্রত্যয় যুক্ত করে হয়েছে হাক্কানী। যার অর্থ দাঁড়ায় সত্যের সঙ্গে একাত্মতা। অর্থাৎ সত্যের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার তাগিদ থেকেই হাক্কানী।

অপরদিকে, দর্শন মানে দিতে গিয়ে বঙ্গীয় শব্দকোষে যে ক’টি শব্দ তুলে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে - দ্রষ্টা, দর্শয়িতা, প্রদর্শক, বোধক, অবলোকন, উপলব্ধি, বোধ, জ্ঞান, বুদ্ধি, সাক্ষাৎকার শক্তি, সাক্ষাৎকার স্বপ্ন, প্রকাশন, প্রকটন, শাস্ত্র, ধর্ম, যজ্ঞ, দর্পণ, বর্ণ, রঙ, রূপ ইত্যাদি এবং দর্শনের আরও দু’টি অর্থ দেয়া আছে যার একটি হচ্ছে  সমীপে আনয়ন ও হাজির করা।

কার্যতঃ হাক্কানী দর্শন হচ্ছে শাশ্বত সূফী-তত্ত্বেরই ফলিত রূপ। সাধনার শীর্ষস্তরে আরোহণ করা হাক্কানী সাধকগণ শুদ্ধ আর অশুদ্ধ, ছিন্ন আর অবিচ্ছিন্ন, ভেদ আর অভেদ, দ্বৈত আর অদ্বৈত - এর মাঝে গড়ে ওঠা, পড়ে থাকা দেয়ালগুলোকে চিহ্নিত করেছিলেন এবং তা অপসারণের উপায়সমূহ দেখিয়ে দেন তাঁদের নিজেদের জীবনে কঠোর অনুশীলনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরার মধ্য দিয়ে। তাঁরা বুঝে নিয়েছিলেন নির্দোষ হতে গেলে আগে প্রয়োজন দোষ দূর করা। নির্মল হওয়ার জন্য প্রয়োজন চিন্তা থেকে যাবতীয় মল ত্যাগ করা, পবিত্র হওয়ার জন্য চাই আগে ভেজাল মুক্ত হওয়া এবং নির্ভুল হতে গেলে লাগে আগে ভুল থেকে বেরিয়ে আসা। আর এভাবে নিরন্তর শোধনের মধ্যে দিয়েই দেখা মেলে খাঁটির।

হাক্কানী সাধকগণ যুগে যুগে একাত্ম হওয়ার পথ দেখিয়ে গেছেন। একাত্ম হওয়ার বাধা দূর করার উপায় দেখিয়ে গেছেন তাঁদের নিজ নিজ সময়ের উপযোগী করে গুরু-শিষ্য পরম্পরায়; যা নিরন্তর চলমান বহমান। হাক্কানীও তাই এক বহমান ধারা যা চলমান, নিরন্তর। নদীর মতই প্রান্তর থেকে প্রান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে - এর সতত পরিভ্রমণ। ঊনবিংশ শতকে এই ধারা পতিত হয় অগণন সাধককূলের পূণ্য স্মৃতি ধন্য বাংলার মাটিতে। বিশ শতক পেরিয়ে একবিংশ শতকেও বাংলার মাটি একে ধারণ করে রেখেছে উদ্দীপ্ত উজ্জ্বলতায়। মিরপুর আস্তানা শরীফ সেই ধারারই যোগ্য উত্তরাধিকার।

এই ধারাকেই ধারণ করে ১৯৮৮ সালের ১৩ মাঘ প্রতিষ্ঠিত মিরপুর আস্তানা শরীফকে ঘিরে আবির্ভূত জ্যোতির্ময় হাক্কানী-দর্শন নিয়ে অগ্রসরমান, একুশ শতকের লোকভূমিতে। তাঁর ডাক - “সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হোন, নিজে বাঁচুন - দেশ ও জাতিকে বাঁচান। তিনি প্রথম বলেছেন ‘সত্য বলুন’। কখন সত্য বলা যাবে? কি করে সত্য বলা যাবে? যা ঠিক তা বলতে পারলেই সত্য বলা যাবে। সেক্ষেত্রে আগে যা ঠিক তাই দেখতে হবে। অর্থাৎ দেখায় পরিপূর্ণতা আনতে হবে। যা কানে ঢুকে বলার সময় ঠিক তাই বলতে হবে। শুনতে হবে একনিষ্ঠ হয়ে  অর্থাৎ কোন কিছুকে পরিপূর্ণভাবে দেখা, কোন কিছুর সবকিছু পুরো নিষ্ঠ হয়ে শোনার তাগিদ থাকছে এই আহ্বানে।

এই সাধকই তাঁর এক বাণীতে বলেছেন - একজনের কথা অপরজনের কাছে সঠিক প্রকাশ করতে না পারলে তুমি নিজেই মিথ্যাবাদী হবে। আর তা করতে গিয়ে, তা করার অবিরাম অনুশীলনের মধ্য দিয়ে অর্জন করা যায় একরৈখিকতা। খুলে যায় সত্যের সাথে একাত্ম হওয়ার সরল পথ। এরপর সাধক বলেছেন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে। সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আগে জেনে নিতে হবে, খুঁজে নিতে হবে, বুঝে নিতে হবে, সর্বোপরি বেছে নিতে হবে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রটিকে।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, সত্য প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রের অবস্থান কোথায়? অবস্থানের অবস্থান দু’জায়গায় - ভিতরে আর বাইরে। এক্ষেত্রে ভিতর আর বাহির রয়েছে দু’ধরনের। প্রথমতঃ ব্যক্তির নিজের মাঝে অথবা অন্যের মাঝে। দ্বিতীয়তঃ ব্যক্তির চিন্তায় এবং কর্মে।

অন্যের মাঝে সত্য খুঁজতে যাওয়া দেখতে যাওয়ার প্রবণতা অভ্যাসেরই ছড়াছড়ি চারিদিকে, সর্বত্র। আর এ থেকেই যত বিপত্তি, যত গোলমাল; কারণ, সত্য যার-যার তার-তার। একজনের কাছে যা ঠিক আর একজনের কাছে তা ভুল। একজনের কাছে যা ন্যায় অপর জনের কাছে তা অন্যায়। একজনের কাছে যা সত্য অন্যদের কাছে তা মিথ্যা। ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য, তার নিজস্ব পরিবেশ, শিক্ষা ইত্যাদির জন্যই এই স্বাভাবিক ভিন্নতা। তাহলে বাকি থাকে ‘নিজের মাঝে’।

হাক্কানী ধারার মহান সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন-এঁর একটি বাণী এক্ষেত্রে পথের নির্দেশনা দেয় সুস্পষ্টভাবে। তিনি বলেছেন, ‘সত্য দেখার আগে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করা শ্রেয়’। অর্থাৎ সাধক বলে দিয়েছেন সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র নিজের জীবন।

হাক্কানী ধারায় সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন-এঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বিভ্রান্তি ঘোঁচাতে এক জায়গায় বলেছেন, পৃথিবীতে মিথ্যা বলতে কিছু নেই। যা থেকে পরিস্কার হয়ে যায় অন্যের মাঝে মিথ্যা নেই। অর্থাৎ মিথ্যা আছে মিথ্যা থাকে নিজের মাঝে। এই সাধক তাঁর অপর এক বাণীতে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিথ্যাকে ধ্বংস করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে বলেছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে নিজেকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একমাত্র ক্ষেত্র পাওয়া যাচ্ছে নিজের চিন্তা ও কর্ম। এক্ষেত্রে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক্‌-এঁর বাণী-সূত্র অনুযায়ী আগে মিথ্যাকে ধ্বংস করে নিতে হবে।

সুতরাং জীবনের দু’টি ক্ষেত্র পাওয়া যায় - একটি হচ্ছে চিন্তা, অপরটি কর্ম। ব্যক্তির চিন্তা ও কর্মে সত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই ঘটে সত্যের সঙ্গে একাত্মতা এবং তখনই কেবল নিশ্চিত করা সম্ভব নিজের বাঁচা আর দেশ ও জাতিকে বাঁচানো। অন্ধকারে পতিত, জীবনের জটিল-কূটিল ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত মুক্তিপিয়াসী শান্তিপিপাসু মানবকূলের সামনে জ্যোতির্ময় নিয়ে এসেছেন এই পথেরই নব দিশা।

 

বিস্তৃতির ২৫ বছর

  

 

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ

 

প্রাতিষ্ঠানিক ধারায় হাক্কানী দর্শন নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থেকে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর আশির্বাদে ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক উপলব্ধি করেছিলেন বর্তমান যুগে আধ্যাত্মিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও স্ব -শিক্ষার সমন্বয়ই আত্মউন্নতির চরম সহায়ক শক্তি।

তাই ‘ধর্ম মানবতার জন্য’ এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কর্ম-মানবতা-শান্তি প্রতীক নিয়ে সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে মিশন ইতোমধ্যে পার করে এসেছে দুই দশক। বহুমুখী কর্ম ধারায় বিস্তৃত করে চলেছে এর লক্ষ্যাভিমূখী উদ্যোগ। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার আদর্শে প্রাতিষ্ঠানিক ধারায় হাক্কানী দর্শন নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে।

১৯৯৮ সনে এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো হতে স্বীকৃতি লাভের পর হতে আজ পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিশন বহুমাত্রিক জনকল্যাণমূলক সেবাধর্মী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। স্বনির্ভর উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম নির্বাচন করে এগিয়ে চলছে। যার মধ্যে রয়েছে -

                       

                        - সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোর প্রচার ও অনুশীলন

                        - ধর্মভিত্তিক গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রকাশনা

                        - এলাকাভিত্তিক বিদ্যাপীঠ, মহাবিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসালয় স্থাপন

                        - এলাকাভিত্তিক অধিবাসীদের বিশেষ করে নারী ও শিশু-কিশোরদের একত্রিত করে ধর্মীয় ও সামাজিক            

                           উন্নয়নে গঠনমূলক কাজে তাদের নিয়োজিতকরণ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাজে উৎসাহিতকরণ

                        - নারী জাগরণ ও স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষার অঙ্গনে নারী শিক্ষার ব্যাপক

                          প্রসার ঘটানো; বিশেষ করে পথ-নারী, পথ-কন্যাদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন

                        - গরীব ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি সংগ্রহ ও প্রদানের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভে সহযোগিতা

                        - বাংলা লোকজ সংস্কৃতির বিশ্বায়ন

                        - প্রবীণ জনগোষ্ঠী সমাজের সম্পদ - তাদের বিভিন্নমুখী কল্যাণ সাধন

                        - পরনির্ভরশীলতা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে এলাকাভিত্তিক বেকার ও দরিদ্র তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থান

                          ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি

                        - মাতৃমঙ্গল ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষার্থে রোগ নিরাময়ক পরিচর্যা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবার কল্যাণ

                        - জলবায়ু ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেতনতা সৃষ্টি এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদি।

 প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে মিশন শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা, সেবা এবং মানব সম্পদ উন্নয়নকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি বিভিন্ন চিন্তন বৈঠক (সেমিনার), কর্মশালা, গুণীজন সংবর্ধনা ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু রেখেছে।

এ পর্য জাতীয় পর্যায়ে ৬০০টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৩টি চিন্তন বৈঠক (সেমিনার), ১২৪টি বিষয়ের উপর গোল টেবিল বৈঠক এবং ৩০জন গুণী ব্যক্তিকে সংবর্ধিত করার মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠান দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে সত্যের সাথে একাত্ম হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে।

     

শিক্ষায় হাক্কানী

 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ছাইফুল হক (মাঝখানে)

এবং হাক্কানী মিশন এর সাবেক উপদেষ্টা শাহ্ আক্তারুজ্জামান বাবুল (ডানে)

 

 

মিরপুর প্রভাত ফেরীতে বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা

 

 

 বার্ষিক ফলাফল প্রকাশ ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান ২০০৮ প্রধান অতিথি

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. নিতাই চন্দ্র সূত্রধর

 মিরপুর বর্ষবরণ উৎসব ১৪০৭ এর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে

নৃত্যরত বিদ্যাপীঠ শিক্ষার্থী 

মূল্যবোধ ভিত্তিক নতুন প্রজন্ম আর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়া এলাকায় ১৯৯৩ সনে ‘হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ’ স্থাপন করে এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ সনে  একে ‘মহাবিদ্যালয়’-এ উন্নীত করা হয়। আত্ম-কর্মসংস্থানমুখী যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি এই বিদ্যাপীঠে বাংলাদেশ কারিগরী শিক্ষা বোর্ড থেকে অনুমোদন নিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি ভোকেশনাল কোর্স চালু করা হয়। মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে এখানকার ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষাসহ চাকুরী প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ পেয়ে আসছে। অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সিলরদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে বিগত দশ বছরে এই বিদ্যাপীঠ হতে মোট ৩৬৪৭ জন এবং মহাবিদ্যালয় হতে ৩২০ জন শিক্ষার্থী কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে।

নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি নবীন শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশপ্রেম সঞ্চারিত করার লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠানে শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ প্রভৃতি জাতীয় দিবস নিয়মিত উদযাপন করা হয়। শিশু-কিশোরদের মধ্যে সত্য অনুশীলন ও মূল্যবোধ চর্চার তাগিদ থেকে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় মহান সাধকগণের জীবনী ও তাঁদের কর্মের সঙ্গে। শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক বিকাশ ও পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গঠনের উপযোগী নানান কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়ে থাকে বছর জুড়ে নিয়মিত পাঠ্যসূচীর বাইরে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, মুক্ত আলোচনা প্রতিযোগিতা, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থা রয়েছে নিয়মিত। মানসিক সুস্থ বিকাশের সঙ্গে শারিরীক সুস্থতাকে অপরিহার্য বিবেচনায় নিয়ে হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

 

সত্য প্রকাশনায় হাক্কানী -

 

 

 

সত্য প্রকাশের গভীর তাগিদ থেকে সত্যকে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ নিয়মিত প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগেরই ফসল হিসেবে ১৯৯৩ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে মাসিক বর্তমান সংলাপ-এর। নিছক অতীতচারিতা নয়, জীবন বিমুখ বাস্তবতা বিবর্জিত তত্ত্ব আর তথ্যের অবতারনা নয়, বর্তমানকে তুলে ধরার প্রয়াস থেকেই মিশনের এই প্রকাশনা উদ্যোগ। বর্তমান সংলাপ নামটিই এর প্রতীকি প্রকাশ। চার বছর মাসিক হিসেবে নিয়মিত প্রকাশনার পর ১৯৯৭-এ মাসিক থেকে বর্তমান সংলাপ এর উত্তরণ ঘটে সাপ্তাহিকে। সাপ্তাহিক হিসেবে দীর্ঘ পনের বছর ধরে বর্তমান সংলাপ এ দেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় স্থাপন করেছে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

  

সত্য প্রকাশে সংলাপ আয়োজিত

চিন্তন বৈঠক (সেমিনার)

 

এ কালের ধূমকেতু সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ বিভিন্ন সময়ে জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চিন্তন বৈঠকের আয়োজন করে থাকে যা কেবল ব্যতিক্রমই নয় সাহসী এবং দুঃসাহসীও বটে। বিগত বছরগুলোতে জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত এমনই কয়েকটি চিন্তন বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলার সাধককূল’, ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য,’ ‘ধর্মের নামে আরবি- সভ্যতার নামে ইংরেজি-বিনোদনের নামে হিন্দি-বিপন্ন বাংলা’ ও ‌'সংবিধান অবমাননা'।

 

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপনে

বর্তমান সংলাপ

 

 এছাড়া সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নিয়মিত আয়োজন করে থাকে আলোচনা অনুষ্ঠান, মতবিনিময় সভা এবং গুণীজন সংবর্ধনা।  এসব আলোচনা. মতবিনিময় সভায় বর্তমান সংলাপ পরিবার তুলে ধরে জাতীয় সংকট উত্তরণের রূপরেখা। আলোচনায় উঠে আসে জাতীয় বিকাশের পথনির্দেশনা। জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সমুন্নত রেখে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে  আয়োজিত বর্তমান সংলাপ-এর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালায় থাকে বাঙালি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের গভীর তাগিদ।

 

 

 

 

সাংবাদিকতায় মিথ্যাচারঃ মিথ্যাচারের প্রভাব -

 

সংবাদপত্র সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় সমাজ দর্পণ।  কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে গোষ্ঠীস্বার্থে। এদেশের সংবাদপত্র সংবাদমাধ্যমে সত্য খুঁজে পাওয়া ভার। নিজে সংবাদপত্র হওয়া সত্ত্বেও সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ হাক্কানী চেতনার তাগিদে সংবাদপত্র সংবাদমাধ্যম থেকে মিথ্যাচার দূর করায় গ্রহণ করে এক সাহসিক উদ্যোগ। আয়োজন করে সাংবাদিকতায় মিথ্যাচার নিয়ে ধারাবাহিক গোলটেবিল বৈঠক। এ পর্যন্ত সারাদেশে ৭ টি জেলায় এ বিষয়ে প্রাণবন্ত মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবগুলোতে সাংবাদিকদের নিয়ে অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে মত   বিনিময়সভা - মুক্ত আলোচনা।

 

সত্য সন্ধানে সংলাপ - জীবন চলার পথে

 

সত্যের অনুসন্ধান চালাতে হয় মানুষকে তার নিজ নিজ জীবনে। জীবন চলার পথে মেলে সত্যের সন্ধান। হাক্কানী সাধকগণের পথ নিদের্শনায় পরিচালিত সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এই উপলব্ধি থেকে গ্রহণ করে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। ২০০৫ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা ৬ বছর ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করে সাপ্তাহিক গোলটেবিল বৈঠক। সংলাপ কার্যালয়ে চক্রাকারে অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকের প্রতিটিতে আলোচ্য বিষয় হিসেবে বেছে নেয়া হয় জীবন চলার পথে আলোচিত শব্দ। বাংলাদেশে তো বটেই, গোটা বিশ্বেই এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। এসব বৈঠকে হাক্কানী অনুসারীগণ ছাড়াও দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদগণ বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত - অনিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের আত্মিক উন্নয়নে এই উদ্যোগ যেমন ভূমিকা রেখেছিল তেমনি বিজ্ঞ আলোচকদের আলোচনায়  বিষয়বস্তুকে ঘিরে নতুন চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে লক্ষ্যণীয় ভাবে যা বর্তমান সংলাপে নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। মোট ২৫১টি বৈঠকে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় আগ্রহী পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো :

জীবন চলার পথে আত্মবিশ্লেষণ, বিশ্বস্ততা, পারস্পরিক মূল্যবোধ, আনুগত্য, সহনশীলতা,স্ব-বিরোধিতা, চেতনা, একাত্মতা,  আত্মপরিচয়, সত্য অনুসন্ধান, সময়ের মূল্যায়ন, পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব, নববর্ষের গুরুত্ব, আধ্যাত্মিকতা, সংস্কার, শয়তান, প্রেম,  সম্পদ, সফলতা, মানুষ, শিক্ষা, সংকীর্ণতা, সাধনা, বন্ধু, ভ্রাতৃত্ব, বোধ, মিথ্যাচার, লোভ, নিরপেক্ষতা, আত্মঅহংকার, অজ্ঞতা, জ্ঞান, পরমজ্ঞান, বাস্তবতা, দায়িত্ববোধ, অধিকার, সম্পর্ক, অনুকরণ, ধারণ, লালন-পালন, নীরবতা, প্রশংসা, সৌন্দর্য, সন্তুষ্টি, সুখ-দুঃখ,  কৃতজ্ঞতা, সময়ানুবর্তিতা, আনুষ্ঠানিকতা, মোহ, আসক্তি, নিয়ন্ত্রণ, ভোগ-উপভোগ-সম্ভোগ, ত্যাগ, সমর্পণ, আত্মসমর্পণ, শয়তান, বর্তমান, স্বার্থ,  লক্ষ্য,  প্রতারণা,  সংযম, ধৈর্য্য,  ক্রোধ,  হিংসা,   চৈতন্যের বিকাশ,  একাত্মতা,  একরৈখিকতা,  দর্শনে না স্মরণে সংযোগ,  দেশপ্রেম, পাপ-পূণ্য, পর্যালোচনা, পরিকল্পনা, দ্রব্যমূল্য, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, চলমান প্রযুক্তি, পরিবেশ দূষণ,  পারস্পরিক সহযোগিতা, যৌবন, দরবার ও আদব,  একনিষ্ঠতা,  প্রেমে সামাজিক ও সংস্কার, সিয়াম, অনুশীলন,  সিদ্ধান্ত,  সংসার,  বর্তমান,  সৃষ্টি,  আহার,  মহররম, গুরুত্ব, প্রেরণা, সংগ্রাম, সংকল্প, বিবাহ, চেতনা, চোখের আদব, জিহ্বার আদব, কানের আদব,  ত্বকের আদব, জ্ঞানেন্দ্রিয়, অহংকার, বোধ, চিন্তা, বিনোদন, মিথ্যাচার, আমি, স্বপ্ন, পড়, নিজেকে পড়, ইচ্ছা, গ্রহণ-বর্জন,  একরৈখিকতা, সমালোচনা,  শিষ্য,  গুরু।

 

 

 

 

      

 

বর্তমান সংলাপ

চরম মিথ্যাচারিতার প্রতিবাদে রচিত

জন্ম পটভূমি

 

 

‘হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ইস্কুল থেইক্কা কলেজ হইছে, একদিন বিশ্ববিদ্যালয় হইব’।

‘বর্তমান সংলাপ মাসিক আছিলো সাপ্তাহিক হইছে, একদিন দৈনিক হইব’

                                                             - সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

 

১৯৮৩ সালের কথা। একজন সূফী সাধকের আস্তানা সম্পর্কে ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক একটি প্রতিবেদন ছাপে। হলুদ সাংবাদিকতার  নগ্ন প্রকাশ ছিল সেখানে। দায়িত্বজ্ঞানহীন একতরফা বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি ছিল সাংবাদিকতার নামে নোংরামির উৎকট প্রতিচ্ছবি। স্বভাবতই, প্রতিবেদনটি সরাসরি আঘাত করেছিল হাক্কানী ভক্তকূলের আবেগ অনুভূতিতে।

এ ঘটনায় অপমানের অবাঞ্ছিত জ্বালা, উত্তেজনা ও ক্ষোভে মাত্রাতিরিক্ত বিদ্ধ হয়েছিলেন একজন। ঘুম হয়নি তাঁর সারারাত। রাত জেগে পরামর্শ, সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পাশ করা ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। সিদ্ধান্ত, এই হলুদ সাংবাদিকতার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সংবাদ সম্মেলনের’ আয়োজন করতে হবে। কিন্তু, সিদ্ধান্ত নিলেই তো হবে না, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে চাই মহান সাধকের অনুমোদন। অনুমোদনের জন্য ছুটে গিয়েও লাভ হলো না। সরাসরি বাতিল হয়ে গেল আবেদন।

অদম্য ভক্তপ্রাণে এবারে সিদ্ধান্ত আসলো তাহলে নিজেরাই একটা পত্রিকা বের করে ফেলা। এবারও অনুমোদন মিললো না। ঠিক মিললো না তা নয়, বলা উচিৎ তাৎক্ষণিক মিললো না। মহান সাধকের ওই অনুমোদনটি মিললো ঠিক ১০ বছর পরে। আত্মপ্রকাশ ঘটলো সত্যের আলোকবর্তিকা স্বরূপ আবির্ভূত একটি সংবাদপত্রের। ১৯৯৩ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটা এই সংবাদপত্রটির নাম ‘বর্তমান সংলাপ’। যে মহান সূফী সাধকের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে বর্তমান সংলাপের আত্মপ্রকাশ তিনি হাক্কানী ধারার শেকড়, মহীরূহ, মিরপুর আস্তানা শরীফের মূল - সূফী সাধক আনোয়ারুল হক।

উল্লেখিত হলুদ সাংবাদিকতার ঘটনাটি ঘটেছিল ধানমন্ডিস্থ হাক্কানী খানকা শরীফকে নিয়ে। যার প্রতিষ্ঠাতা মহাপ্রাণ ‘সূফী সাধক আনোয়ারুল হক’। আর এই ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন যিনি তিনি হচ্ছেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হকের ভক্তকূল শিরোমণি, তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ-এর মহান তত্ত্বাবধায়ক ।

দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশের মাটিতে পা দিলে স্বভাবতই তাঁর নজরে আসে ওই প্রতিবেদনটি। ছোট ভাই শাহ্‌ আলমের সঙ্গে রাত জেগে পরামর্শ করে তৈরি করেন সংবাদ সম্মেলনের উপস্থাপনা। পরদিন অনুমোদনের জন্য ছুটে যান ‘ধানমন্ডি হাক্কানী খানকা শরীফে’ গুরু আনোয়ারুল হকের কাছে। কিছু বলার আগেই গুরু তাঁর হাতে তুলে দেন ওই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি।

প্রতিবেদন তো তাঁর আগে থেকেই দেখা। তবুও তা তিনি প্রকাশ না করে কেবল অনুমোদন চাইলেন সাংবাদিক সম্মেলন করার। কিশোরগঞ্জের নিভৃত পল্লী থেকে উঠে আসা সহজ সরল প্রাণ সাধক আনোয়ারুল হক স্বভাবজাত কন্ঠে বলে উঠলেন, “ক্যা রে? হ্যারার ইচ্ছে অইছে লিখছে, যার মন চায় হে আইসা দেইখা যাইব। এইডাও তো একটা প্রচার! আফনের কি ঠ্যাহা পড়ছে হের প্রতিবাদ করার?”

বিফল মনোরথ হয়ে শিষ্যের এবারের চিন্তা তাহলে আমরা নিজেরাই একটি পত্রিকা বের করে ফেলি! আবারো গুরুর দ্বারস্থ হওয়া। সূফী সাধক এবারের প্রস্তাব সরাসরি ফিরিয়ে না দিয়ে বললেন - “গোয়ালে সব বাছুর, একটাও গরু নাই।” গুরুর ইশারা বুঝে গেলেন শিষ্য। বুঝলেন পত্রিকা বের করা, একে টেনে নিয়ে যাবার মতো উপযুক্ততা এখনও আসেনি, হয়নি সময়। এজন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘ ১০টি বছর। ১৯৯৩-এ এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গুরুর আবির্ভাব মাস এই অগ্রহায়ণ তথা ডিসেম্বর। আত্মপ্রকাশ ঘটে হাক্কানী ধারার যুগান্তকারী প্রকাশনা ‘বর্তমান সংলাপ’।

শুরুতে মাসিক হিসেবেই ‘বর্তমান সংলাপ’ নিয়মিত প্রকাশিত হয় সাড়ে তিন বছর। ১৯৯৭ সালের জুন-এ উত্তরণ ঘটে সাপ্তাহিক হিসেবে। নিরবচ্ছিন্ন প্রকাশনায় বর্তমান সংলাপ পার করেছে দীর্ঘ ১৯টি বছর। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক যা বলেন তাই অমোঘ সত্যে পরিণত হয়।

১৯৯৯ সালে তাঁর মহাপ্রয়ানের আগে তিনি তাঁরই প্রতিষ্ঠিত খুলনা দরবারে বসে বলেছিলেন, “হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ইস্কুল থেইক্কা কলেজ হইছে, একদিন বিশ্ববিদ্যালয় হইব। বর্তমান সংলাপ মাসিক আছিলো সাপ্তাহিক হইছে, একদিন দৈনিক হইব।” সাধকের এই ভবিষ্যৎ বাণীর সার্থক রূপায়নের পথেই আজ অগ্রসরমান বর্তমান সংলাপ।


স্বাস্থ্য ও সেবায় হাক্কানী

 

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর সেবা বিভাগ এর পক্ষ থেকে

বাউনিয়াবাঁধ, কালশী এলাকায় চিকিৎসা নিবেশ কার্যক্রম

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর সেবা বিভাগ এর পক্ষ থেকে বরগুনা ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ

 

 

 

ধর্ম মানবতার জন্য। সেবা বড় ধর্ম। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ তাই এর মূল নীতি হিসাবে কর্ম ও শান্তির পাশাপাশি মানবতাকেও গ্রহণ করেছে গুরুত্বের সঙ্গে। রোগগ্রস্ত মানুষকে সুস্থ করা সর্বোত্তম মানবতা। মিশন তাই এ কার্যক্রমের মধ্যে স্বাস্থ্য-সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ফ্রি-ফ্রাইডে ক্লিনিক

 

 ফ্রি-ফ্রাইডে ক্লিনিক উদ্বোধন করতে এসে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদ

একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী মিশনের রক্তদান কর্মসূচী প্রত্যক্ষ করছেন

 চিত্রে মিশনের স্বাস্থ্য বিভাগের আয়োজনে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচী ও স্বাস্থ্য আলোচনা সভা।

 

দেশের অসহায়, দরিদ্র, চিকিৎসা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় এনে দেশকে রোগ-ব্যাধিমুক্ত করার লক্ষ্যে মিশন  নরসিংদী জেলার আনারপুর (দগরিয়া) ও কাজলডাঙ্গায় (ভাটেরচর) নিয়মিত ফ্রি-ফ্রাইডে ক্লিনিক পরিচালনা করছে।

ভ্রাম্যমান চিকিৎসা ও স্বেচ্ছা রক্তদান কর্মসূচী

 হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ হেলথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ভ্রাম্যমান চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এছাড়া, মিশন এর স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলক নানান কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে।

 যুব উন্নয়নে হাক্কানী

 এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। আত্মিক বিকাশনাশী নানামুখী প্রবণতা এসে দেখা দেয় যখন মানুষ কৈশোর থেকে পা দেয় তারুণ্যে, উপনীত হয় যৌবনে। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার, নিজেকে বিকশিত করার উপযুক্ত সময় যৌবন। এজন্যই কবি বলেছেন যৌবন যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময়। এ যুদ্ধ কেবল বহিশত্রুর সাথে নয়। বহিশত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ সাময়িক। বহিশত্রুকে ফাঁকি দেয়া যায়, দূরে থাকা যায়, রাখা যায় নিজেকে নিরাপদে। কিন্তু নিজের মাঝে নিজের সাথে যে যুদ্ধ দেখা দেয় তার যেমন অভ্যন্তরীণ তার চেয়েও বড় হলো এ যুদ্ধ নিরন্তর।  হাক্কানী মিশন তাই দেশের যুব সমাজকে নিজের সাথে নিজের যুদ্ধে বিজয়ী করে তোলার লক্ষ্য থেকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে যুব উন্নয়ন উদ্যোগ। আর এ লক্ষ্য থেকেই ২০০৭ সনে ৩১ আগষ্ট গঠন করা হয়েছে হাক্কানী যুব উন্নয়ন পর্ষদ যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৩২। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে এ সংগঠনের আঞ্চলিক পর্ষদ । এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৭২ জন, খুলনা বিভাগে ২২ জন, সাভারে ২১ জন এবং কুষ্টিয়ায় ১৭ জন সদস্য রয়েছেন। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর লক্ষ্য অর্জনে পরিচালিত কর্মকাণ্ডে হাক্কানী যুব উন্নয়ন পরিষদের সদস্যরা পালন করে থাকে সক্রিয় ভূমিকা। মিশনের স্বাস্থ্য সেবার কার্যক্রমে কিংবা ঘুর্ণিঝড় উপদ্রুত অথবা অসহায় বিপদগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হাক্কানী যুব উন্নয়ন পরিষদের সদস্যরা পালন করে থাকে অগ্রনী ভূমিকা। 

 

 মানবসম্পদ উন্নয়নে হাক্কানী

 

 চিত্রে মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগ আয়োজিত প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের

মাঝে সার্ট ড. এবিএম হাবিবুর রহমান চৌধুরী

(অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাঃ বিঃ)

অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান

(চেয়ারম্যান, দর্শন বিভাগ, ঢাঃ বিঃ)

আল্লামা মোহাম্মদ সাদেক নূরী, উপদেষ্টা হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ

রাশেদ খান মেনন, সভাপতি বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি

সুবোধ চন্দ্র দাস (এ্যাডভোকেট সুপ্রীম কোর্ট, ঢাকা)

ড. হাসান মোহাম্মদ

(অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চঃ বিঃ)

ড. মোঃ আব্দুল মান্নান চৌধুরী

(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চঃ বিঃ)

ড. মোঃ শাহজাহান (অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাঃ বিঃ)

আব্দুল লতিফ (অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাঃ বিঃ)

শাহ হাবিবুর রহমান

(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাঃ বিঃ)

আব্দুর রহমান সিদ্দিকী (অধ্যাপক,

সমাজবিজ্ঞান, রাঃ বিঃ)

স্বামী স্থিরাত্মানন্দ মহারাজ (রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা)

সুকুমল বড়ুয়া

(অধ্যাপক চেয়ারম্যান, পালি বিভাগ ঢাঃ বিঃ)

বিশপ থিও টোনিয়াস গমেজ (সিবিসিবি সেন্টার, ঢাকা)

বিচারপতি ফজলুল হক (ঢাকা হাইকোর্ট)

জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আশরাফ

ড. নুরুন্নাহার ফয়জুন নেসা (অধ্যাপক, ঢাঃ বিঃ)

আব্দুল আউয়াল

(মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

আ ন ম আব্দুল মান্নান খান (অধ্যাপক, আরবী বিভাগ ঢাঃ বিঃ)

ড. আ ন ম রইছ উদ্দিন (অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ ঢাঃ বি)

অধ্যাপক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

(সাবেক উপাচার্য, ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়)

এস এম সা’দ উল্লাহ (ইসলামিক চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট)

রফিকুল ইসলাম চৌধুরী (অধ্যাপক ও প্রাক্তন উপাচার্য, চঃ বিঃ)

ড. তারিখ সাইফুল ইসলাম (অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাঃ বি)

ড. মনোয়ার হোসেন ( সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ)

ড. এন আই খান (অর্থনীতিবিদ ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বিশ্বব্যাংক)

 

 

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ

ব্যবস্থাপনা সংসদ

 

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর কর্মকান্ডকে নির্দেশিত পথে বেগবান করতে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি ব্যবস্থাপনা সংসদ কর্ম-মানবতা-শান্তি প্রতীক সম্বলিত মিশন পতাকা বহন করে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে চলছে। পাশাপাশি বিভাগীয় বিভিন্ন প্রকল্প ও কার্যক্রমকে গতিময় করার জন্য রয়েছে আরো কয়েকটি পৃথক পর্ষদ। মিশন ব্যবস্থাপনা সংসদে রয়েছেন -

 

ছবিতে সর্ববামে শাহ সূফী ড.এমদাদুল হক কাজল (সভাপতি), ড. মেজবাহ-উল-ইসলাম  (নির্বাহী সভাপতি), শেখ সাহিদ হোসেন (সহ-সভাপতি), মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান (মহাসচিব), মোঃ খায়রুল হাসান (যুগ্ম সচিব), এন. সি. রুদ্র (কোষাধ্যক্ষ), মোঃ সাহিদুজ্জামান বাবলু (সাংগঠনিক সচিব), আশরিফা সুলতানা (সাংগঠনিক সচিব), শাহ মোঃ শহীদুল আলম (নির্বাহী সদস্য), আফরোজা রত্না (নির্বাহী সদস্য) এবং মাহমুদা আক্তার (নির্বাহী সদস্য)

 

প্রকাশনা বিভাগঃ

শাহ সূফী ড. এমদাদুল হক কাজল (সভাপতি)

শাহ মোঃ আব্দুল বাতেন - সদস্য

শাহ শেখ মজলিশ ফুয়াদ - সদস্য

কামরুজ্জামান মুক্তি - সদস্য

ফরিদা খাতুন মনি - সদস্য

 

শিক্ষা বিভাগঃ

ড. মেজবাহ-উল-ইসলাম - সভাপতি

শাহ মোঃ আব্দুল বাতেন - সদস্য

শাহ শেখ মজলিস ফুয়াদ - সদস্য

মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান - সদস্য

 

গবেষণা বিভাগঃ

শাহ মোঃ লিয়াকত আলী - (সদস্য সচিব)

খাঁন সরফরাজ আলী - সদস্য

শামসুর রহমান বিপ্লব - সদস্য

 

স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগঃ

শেখ সাহিদ হোসেন -  সভাপতি

শাহ মোঃ শহীদুল আলম - (সদস্য সচিব)

ডাঃ আমানুর রহমান - সদস্য

সালমা আক্তার - সদস্য

এন.সি.রুদ্র - সদস্য

 

যুব বিভাগঃ

খায়রুল হাসান - সভাপতি

মোঃ আফজাল হোসেন - সদস্য সচিব

এস.এম. শাহরিয়ার সুজা - সদস্য

ডা. সুমাইয়া সুলতানা - সদস্য

আব্দুল্লাহ আল মাসুম - সদস্য

 

 মহিলা উন্নয়ন বিভাগঃ

 আশরিফা সুলতানা - সভাপতি

মনোয়ারা সুলতানা - সদস্য সচিব

আফরোজা রত্না - সদস্য

ফরিদা খাতুন মনি - সদস্য

বিলকিস বেগম - সদস্য

 

 হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীঃ

খালেদা খানম রুনু - সভাপতি

ডা. সুমাইয়া সুলতানা - সদস্য সচিব

নারগিস সুলতানা - কোষাধ্যক্ষ

সাইয়্যেদা মারজিয়া - সদস্য

ফরিদা ইয়াছমিন - সদস্য

 

 

মিরপুর আস্তানা শরীফ

 

 

শান্তি-ধর্ম পুনঃ প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে হাক্কানী সাধকগণ যুগ যুগ ধরে যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তারই ধারাবাহিকতায় সূফী সাধক আনোয়ারুল হক হাক্কানী দরবার, খানকা ও আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশ জুড়ে।  সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী একই ধারাবাহিকতায় অব্যাহত রেখেছেন হাক্কানী দরবার, খানকা, আস্তানা প্রতিষ্ঠার ধারা - যা দেশ ছাড়িয়ে ইতোমধ্যে বহিঃর্বিশ্বেও সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব দরবার-খানকা-আস্তানায় নীরবে অনুশীলন চলে হাক্কানী দর্শনের শিক্ষাসমূহ। সপ্তাহ ধরে বছর জুড়ে চলে আত্মিক উন্নতি সহায়ক নিয়মিত কর্মশালাসহ নানান কার্যক্রম। অনুষ্ঠিত হয় সূফী সাধকগণের স্মারক বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা।

সত্য অনুসন্ধানী মানুষ যেমন এখানে সত্যের সন্ধান লাভ করেন, তেমনি আত্মিক উন্নয়নের পাশাপাশি রোগ ব্যাধি, সমস্যা-সংকটগ্রস্থ মানুষ লাভ করেন রোগমুক্তি, আর রেহাই মেলে সমস্যা সংকট থেকে।

 মিরপুর আস্তানা শরীফ থেকে স্বরূপ উন্মোচনের ধারাবাহিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে চলমান বিভিন্ন কার্যক্রমসমূহ গত প্রায় দুই যুগ ধরে দেশে ও দেশের বাইরে যে ভূমিকা পালন করে চলেছে তা বিশ্ব শান্তি তথা শাশ্বত সূফীতত্ত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশ-বিদেশে স্থাপিত বিভিন্ন হাক্কানী দরবার, খানকাহ ও আস্তানা শরীফ আধ্যাত্মিক শিক্ষার এক একটি জীবন্ত বিদ্যাপীঠ।

হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন শাহ্‌ কলন্দর গউস পাক এঁর স্মরণে সুলতানুল আউলিয়া আলহাজ্ব হযরত শাহ্‌ কলন্দর সূফী খাজা আনোয়ারুল হক্‌ রওশন জমির মাদ্দা জিল্লাহুল আলী হুজুর কেবলার হুকুমে ১৯৮৮ সালের ১৩ মাঘ রাজধানী ঢাকার মিরপুরে জ্যোতিভবন, সেকশন-৬, ব্লক-সি, রোড-১৩, বাসা-৫ মিরপুর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠিত হয়।  

৩০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪১০, ১৩ জুন ২০০৩ সালে মিরপুর আস্তানা শরীফ এর নবদিগন্তের উদঘাটন করেন সূফী সাধক হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন এঁর সুযোগ্য উত্তরসুরী সূফী সাধক দেওয়ান আব্দুল খালেক (জামালপুরী শাহ্‌ সাহেব)।

প্রতি রবিবার নারীদের জন্য এবং বৃহষ্পতিবার পুরুষদের জন্য নিয়মিত আত্মিক উন্নতি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনের পথ নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে। আস্তানা শরীফের প্রতিদিন সকাল ৯টা হতে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগত দর্শনার্থীদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও মূল্যবোধের আলোকে উপদেশ ও নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

 ১ অগ্রহায়ণ হতে ৩০ অগ্রহায়ণ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক - সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন এঁর আবির্ভাব দিবস উদযাপন, ১, ১৭, ২৩, ৩০ অগ্রহায়ণ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, ১৩ মাঘ (২৬ জানুয়ারী) মিরপুর আস্তানা শরীফ এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, ১২ রবিউল আউয়াল ঈদ এ মিলাদুন্নবী, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্র্জাতিক মাতৃভাষা ও ভাষা শহীদ দিবস, পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ, ৪-৭ জ্যৈষ্ঠ সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন-এঁর স্মরণে শান্তি সমাবেশ, ১-৩০ শ্রাবণ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর স্মরণে শান্তি সমাবেশ, ১-৩০ রজব খাজা বাবার স্মরণে শান্তি সমাবেশ, শবে বরাত, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপন।

মিরপুর আস্তানা শরীফের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ১১ সদস্য বিশিষ্ট দুটি পৃথক ব্যবস্থাপনা সংসদ - পুরুষ ব্যবস্থাপনা সংসদ এবং মহিলা ব্যবস্থাপনা সংসদ। এক নজরে আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদঃ

 পুরুষ বিভাগ

ছবিতে সর্ববামে শাহ্‌ সূফী শেখ আমজাদ হোসেন (সভাপতি), শওকত আলী খান (সহ সভাপতি), এ.কে.এম রফিকুল  ইসলাম (সহ সভাপতি), শাহ্‌ শাহাবউদ্দিন খান (মহাসচিব), আব্দুল কাদের টিটু (যুগ্ম মহাসচিব), শহীদুল্লাহ ইমরান (কোষাধ্যক্ষ), শফিউল আলম খোকন (সদস্য), গোলাম মোস্তফা (সদস্য), মোঃ আজমত খান (সদস্য),জাহাঙ্গীর আলম (সদস্য), মহিউদ্দীন সরকার (সদস্য)।

 মহিলা বিভাগ

ছবিতে সর্ববামে খালেদা খানম রুনু (সভাপতি), ফিরোজা খানম (সহ সভাপতি), মুনিরা জামান দীপু (সহ সভাপতি), ফরিদা ইয়াছমিন (মহাসচিব), মাহমুদা আক্তার (যুগ্ম মহাসচিব), শাহ জোহরা খানম (কোষাধ্যক্ষ), হামিদা নারগিস (সদস্য), পারভীন আক্তার (সদস্য),  শাকিলা ইসলাম (সদস্য), আবেদা বানু তরু (সদস্য), তৌহিদা জেসমিন (সদস্য),।

 

 

 

 

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

স্মারক কল্যাণ তহবিল

সাধককূল শিরোমণি আনোয়ারুল হক-এঁর আদর্শিক উত্তরাধিকার জ্যোতির্ময় ২০০০ সালে গড়ে তোলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক স্মারক কল্যাণ তহবিল। যার উদ্দেশ্য - অনুসারীদের প্রকৃত মানবতার শিক্ষা প্রদানের মধ্য দিয়ে  ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ দেখানো। লক্ষ্যণীয়, শিক্ষণীয় এবং ব্যতিক্রম উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এই তহবিলে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়। ভক্ত-অনুসারীগণ রমজান মাসে পানাহারে বিরত থাকার ফলে যে অর্থ বেঁচে যায় তা জমা রেখে এই তহবিল সমৃদ্ধ করা হয়। এছাড়া ভক্ত-অনুসারীগণ বছরের অন্যান্য সময় অনুষ্ঠান চলাকালীন দিনগুলোতে দিনের বেলায় উপোস থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থও এই তহবিলে প্রদান করে থাকেন। নিবেদিত ভক্তদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতি বৃহস্পতিবার উপোস থেকে তার অর্থ জমা দিয়ে থাকেন এই তহবিলে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক স্মারক কল্যাণ তহবিল হতে প্রায় ৩০০ দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষা সহায়তা, ১৫০ জনকে দাফন/সৎকার কাজে সাহায্য এবং ৭০ জন কন্যা-দায়গ্রস্ত' পিতা-মাতাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে। অভাব- অনটন এবং রোগব্যাধি মুক্ত সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে এক নতুন পথের দিশারী হিসেবে যে একদিন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক স্মারক   কল্যাণ তহবিল আবির্ভূত হবে তা কেবল সময়ের ব্যাপারমাত্র।

 হাক্কানী ট্রাস্ট

 

 হাক্কানী ট্রাস্ট উদ্বোধনের শুভক্ষণ

 

 

প্রাতিষ্ঠানিক ধারায় হাক্কানী দর্শন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক উজ্জ্বল প্রচেষ্ঠার নাম হাক্কানী ট্রাস্ট। ২০০৮ সালে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা। সু-প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার নিদর্শনভূমি ওয়ারী-বটেশ্বর অধ্যুষিত নরসিংদী জেলা সদরের দগরিয়া এলাকায় আনারপুরে শুরু হয়েছে ট্রাস্টের কার্যক্রম। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উপর দুই একরের বেশি জায়গার উপর নির্মানাধীন ট্রাস্টের বিভিন্ন স্থাপনা। এখানে হাক্কানী ধর্মতত্ত্ব বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট স্থাপনসহ নানামূখী সেবা ও গবেষণা কার্যক্রমেরও পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন চলছে হাক্কানী ট্রাস্টে।

 

হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমী

 

সাংস্কৃতিক গণজাগরণের মাধ্যমে দেশে ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামী নির্মূলের লক্ষ্যে ২০০১ সনে হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমী ও সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। সূচনাকাল হতে এ পর্যন্ত প্রায় ২৪০ জন সাংস্কৃতিক কর্মী এখান হতে দীক্ষা গ্রহণ করেছে। 

 

দূরদৃষ্টিতে

 

 

* দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ

* হাক্কানী ধর্মতত্ত্ব বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন

* হাক্কানী স্কুল অব থট প্রতিষ্ঠা

* মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন

* ফেলোশীপ/ডক্টরেট প্রদান

* সত্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

 দেশ দেশান্তরে - হাক্কানী

 

 

যুক্তরাজ্যে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক স্মরণে আয়োজিত

 

চিন্তন বৈঠকে (সেমিনার) হাক্কানী মিশনের লন্ডন প্রতিনিধি

 

জিসান সারোয়ার তুর্য

 

 

হাক্কানী খানকা শরীফ লন্ডন আয়োজিত বর্ষবরণ উৎসবে

ক্ষুদে হাক্কানী দল

 

লন্ডনে অনুষ্ঠিত শান্তি সমাবেশে ভক্তবৃন্দ

 

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ হাক্কানী মিশন নয়! শুধু হাক্কানী মিশন নয়! হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ! বাংলায় একটি শব্দ রয়েছে যাকে কৌতুক করে বলা হয় সাচিবিক বাংলা। এই সাচিবিক বাংলা শব্দটি হচ্ছে ‘স্বব্যাখ্যাত’ অর্থাৎ নিজেই যে তুলে ধরে নিজেকে। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ তার ধারনকৃত নামের  মধ্যেই রয়েছে তার পরিচয়; বিশেষ করে, তার কর্মপরিধি। অর্থাৎ, যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ, সুতরাং তার অর্থ দাঁড়ায় এই প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃতির আওতায় চলে আসে, হাক্কানী মিশন যুক্তরাষ্ট্র, হাক্কানী মিশন যুক্তরাজ্য, হাক্কানী মিশন কানাডা, হাক্কানী মিশন  অস্ট্রেলিয়া, হাক্কানী মিশন দুবাই  (ইউএই), হাক্কানী মিশন জর্ডান কিংবা হাক্কানী মিশন ভারত বা বার্মা। মিশনের এই দিক্‌ থেকে দিগন্তে, দেশ থেকে দেশান্তরে বিস্তৃতির সুবিস্তৃতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে মিশনের কালজয়ী আহবান থেকে। সাধারণ  কিংবা বিশেষ কোন উদ্যোগ হিসেবে নয়, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ দীর্ঘ সাধনাজাত উদ্যোগ। স্থুল যশ, খ্যাতি বা মুনাফার লাভের কিংবা লোভের তাগিদ থেকে নয়, শাশ্বত মানবিক বোধ কাজ করেছে হাক্কানী মিশন প্রতিষ্ঠার মূলে। আর এটাইতো স্বাভাবিক। কারণ, অনন্য এই প্রতিষ্ঠান কেবল এদেশ নয় এ বিশ্বভূমিতে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা তিন-তিনজন মহান সাধকের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে চলছে, লক্ষ্যাভিমূখ যাত্রাপথ ধরে। মিশনের কালজয়ী আহবানেও তাই নির্দেশ করে দেয় ইঙ্গিত এর কর্মপরিধির। ‘হে মানব জাতি: তোমরা যে ধর্মাবলম্বীই হও না কেন, জীবন চলার পথে শান্তি ও মঙ্গল হাসিল করার জন্য মুর্শিদ/ গুরু/ পথ প্রদর্শক তালাশ কর এবং সংযোগ স্থাপন কর। যদি সংযোগ স্থাপন করতে না পারো তা হলে অন্ততপক্ষে সংযোগ রক্ষা করে চল’। সংকীর্ণ মুসলমান জাতিকে নয়, কেবল বাঙালি জাতিকে নয়, অথবা নয় বিশেষ জাতি গোষ্ঠীকে; হাক্কানী মিশনের এই কালজয়ী আহবান গোটা মানব জাতির উদ্দেশ্যে। আর তাই হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে দেশান্তরে। আহবানের শুরুতেই রয়েছে মানবজাতি পরিধি ধরে পরিক্রমায় হা. মিশন ইতোমধ্যে পৌছে গেছে। ঘটে গেছে এর আন্তর্জাতিক সংযোগ। যুক্তরাজ্য, জর্ডান, তুরস্ক, ফ্যান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও অস্ট্রিয়অসহ বিশ্বের আরও  কয়েকটি দেশে গত কয়েক বছরে স্থাপিত হয়েছে হাক্কানী দর্শনের যোগসূত্র।

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

 

কর্মের মাঝে আজো আছেন .......

 

 

শাহ্‌ সূফী শামসুল হক চৌধুরী

 

সত্য ও সুন্দরের পূজারী এবং কর্মে নিষ্ঠ এক পৌরুষ হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর সাবেক সভাপতি শাহ্‌ সূফী শামসুল হক চৌধুরী ২০১১ সালের ২৪ জুলাই রোববার ঢাকায় তাঁর নিজ বাসভবনে লোকান্তরিত হন।

‘হক’ এর অন্বেষণে এক অনিরুদ্ধ স্রোতধারায় তাঁর জীবন তরী নোঙর করেছিল 'হাক্কানী'র তীরে। ১৯৪০ সালের ১৩ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে শাহ্‌ সূফী শামসুল হক চৌধুরীর জন্ম। তিনি কুকুটিয়া কমলাকান্দা বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন ঢাকা কলেজে। দীর্ঘ বার বছর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর মিরপুর আস্তানা শরীফ ‘ব্যবস্থাপনা সংসদ’ এর সভাপতি ছিলেন। ২০০১ সালে মিরপুর আস্তানা শরীফ থেকে তাঁকে শাহ্‌ সূফী খেতাব দেয়া হয়। ২০০১ সালে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ তাকে ব্যবস্থাপনা সংসদের সভাপতি নির্বাচিত করে। তখন থেকেই আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে তিনি হাক্কানী মিশনের সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেন এবং হাক্কানী ট্রাস্টেরও সম্মানিত সদস্য ছিলেন।

শাহ্‌ সূফী শামসুল হক চৌধুরী কর্মের মাঝেই খুঁজে পেয়েছিলেন তার ধর্মকে। জীবনের প্রতিটি কর্মে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তাঁর আল্লাহকে। তাই হাক্কানীর মৃত্যুহীন ভুবনে তিনি অবিনশ্বর, চিরঞ্জীব। হাক্কানী মিশনে তাঁর স্থান অপূরণীয়। মানবতার জন্য কর্মে তাঁর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব হাক্কানী মিশন-এর পতাকাবাহীদের অনুপ্রেরণা। তিনি আছেন মিশনের কর্মসাধনায়।

 

শাহ্‌ মোস্তাফিজুর রহমান

 

সত্যের পথ ধরে অবিরাম পথ চলার পথিক, হাক্কানী আদর্শ ধারণ-লালন ও পালনে একনিষ্ঠ কর্মী এবং হাক্কানী পরিবারের অনির্বাণ এক আদর্শের নাম শাহ মোস্তাফিজুর রহমান খান। সত্য ও সুন্দরের পূজারী, কর্মে শীল এক হাক্কানী প্রতীক তিনি। গত ২ অক্টোবর ২০১২, মঙ্গলবার সকাল ৮.৩৫ মিনিটে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ঢাকায় তিনি নিজ বাসভবনে পরলোক গমন করেন। বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফের সম্মানিত শাহ্‌ সাহেব শাহ্‌ মোস্তাফিজুর রহমান খান ১৯৪৭ সালের ১২ জানুয়ারী নরসিংদী জেলার চর্ণগরদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নরসিংদী 'সাটির পাড়া' স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে নরসিংদী ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি সংসার জীবন শুরু করেন ১৯৭২ সালের ২৭ এপ্রিল। সংসার জীবনে ২ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তান এর জনক ছিলেন তিনি। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি মানিকগঞ্জ খাদ্য বিভাগে 'ফুড ইন্সপেক্টর' হিসেবে যোগদান করেন। এরপর অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার পদে উন্নীত হয়ে সুনামের সাথে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর  সদস্য ও হাক্কানী ট্রাস্ট পরিচালনা পর্ষদের সম্মানিত কোষাধ্যক্ষ। নরসিংদীর আনারপুর দরবার শরীফ এর সম্মানিত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তিনি দায়িত্ব করেছেন। কর্ম-মানবতা-শান্তির আদর্শে দীক্ষিত হয়ে হাক্কানী আদর্শ প্রচার প্রসারে তিনি ছিলেন, আছেন  এবং থাকবেন।

  

বেগম শামসুন্নাহার

 

কর্ম, মানবতা ও শান্তির উত্থিত পতাকা হাতে ধাবমান হাক্কানী আদর্শে একাত্ম হয়ে নিরলস চিত্তে কাজ করে গেছেন বেগম শামসুন্নাহার।

১৯২৯ সালের ১৪ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাওঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ। ধর্মীয় সংকীর্ণতা উপেক্ষা করে উদারপন্থী পিতার অনুপ্রেরণায় তৎকালীন সময়ে বাই সাইকেলে চড়ে স্কুলে যেতেন বেগম শামসুন্নাহার।

১৯৪২ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরোজনী গার্লস হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৪৪ সালে ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতার লেডি ব্রেবন কলেজ থেকে বি,এ পাশ করেন।

তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রথম বি.এ পাশ মহিলা এবং পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অন্য কোন মহিলা বি.এ পাশ করেননি। ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.টি পাশ করেন এবং ১৯৪৮ সালে ঢাকার টিকাটুলি কামরুননেসা সরকারি গার্লস হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকুরীতে যোগ দেন। বেগম শামসুন্নাহার ছিলেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর একজন সক্রিয় সদস্য এবং মিরপুর আস্তানা শরীফের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত।

১৯৯৩ সালে তিনি হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ-এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মময় স্মৃতিকে ধারণ করে হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ আজ হাক্কানী মিশন মহাবিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে। ৩১ মে ২০১১ মঙ্গলবার বেলা ১১.১৫ মিনিটে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।

 

মোঃ সিরাজুল ইসলাম

  

সময়নিষ্ঠ, পরোপকারী ও কর্তব্য সচেতন মোঃ সিরাজুল ইসলাম ১৯২৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পয়াগ গ্রামে  জন্মগ্রহণ করেন।

অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে চতুর্থ শ্রেণীতেই বৃত্তি পান তিনি। এরপর ভর্তি হন অন্নদা হাইস্কুলে। হাইস্কুলের প্রথম দিনেই একজন মুসলমান ছাত্র হিসেবে অংক ক্লাসে সবগুলো অংক বোর্ডে করতে পারায় তিনি সকল ছাত্র ও শিক্ষকের দৃষ্টি আর্কষণ করেন। ষষ্ঠ শ্রেণীতেও তিনি বৃত্তি পান। দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হন। ক্লাস নাইনে উঠে তাঁকে হোস্টেলে থেকে, অন্যের বাড়িতে জায়গীর থেকে পড়ালেখা চালাতে হয়। ১৯৪৩ সালে প্রথম শ্রেণীতে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৪৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশের পর ঢাকা ভার্সিটিতে অর্থনীতিতে ভর্তি হন। অর্থনীতিতে অনার্স করে মাষ্টার্স শেষ করেন ১৯৪৯ সালে। এরপর তিনি চট্টগ্রামে এক প্রাইভেট কলেজে অধ্যাপনার চাকুরি নেন। কলেজে কয়েক বছর অধ্যাপনার পর করাচী থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষি ব্যাংকে ম্যানেজার পদে চাকরিতে যোগ দেন ১৯৫৭ সালে। এই কৃষি ব্যাংকেই কাটে তাঁর চাকুরি জীবনের দীর্ঘ ৩০ বছর। এক সময় তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘জেনারেল ম্যানেজার হন’। ১৯৮৬ সালে তিনি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সন্তানদের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ পিতা। ১৯৯১ সালে ২৪ অক্টোবর হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ -এর সদস্য পদ লাভের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে আরও একধাপ এগিয়ে নেন। ১৯৯২ সালে মিশনের মহাসচিব পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।  ১৯৯৪ সালের ৮ জুলাই শুক্রবার রাত ১১.৩০ মিনিটে তিনি লোকান্তরিত হন।

 

আবুল খায়ের

 

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের ২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে লোকান্তরিত হন। তার এই চলে যাওয়ায় স্বজন, পরিচিতজন, সহকর্মী সবাই শোকে হয়েছেন হতবাক। আর তাই তার বিদায়ক্ষণে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ভরে ওঠে সবার পদভারে।

শৈশব থেকেই মানবতা ও সমাজ সেবার চেতনায় দীক্ষিত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণসহ সেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। পৈতৃক নিবাস পিরোজপুর জেলার কাউখালি গ্রামে।

চাকুরী জীবনে প্রায় পনের বছর বিদেশে ছিলেন। এর মধ্যে কানাডায় পাঁচ বছর এবং অষ্ট্রিয়াতে দশ বছর সময়কাল চাকুরী করেছেন।

জড়িত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক ও সেবাধর্মী সংগঠনের সাথে। মুক্তি আন্দোলন, আমাদের পাঠচক্র; আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদ এবং হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর সাথে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন যাবৎ। সমাজসেবী হিসেবে তিনি সবার কাছে পরিচিত ছিলেন প্রিয় খায়ের ভাই হিসেবে।

উপদেষ্টামণ্ডলীর সম্মানিত সদস্য হিসেবে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশকে মূল্যবান নির্দেশনা দিয়েছেন। মিশন পরিচালিত ‌'কুরআন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আলোচনা কেন্দ্রের' একজন গবেষক হিসেবে সর্বক্ষণ নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন গবেষণাধর্মী কর্মকান্ডে। আবুল খায়ের তাঁর নামের যথার্থ মর্যাদা রেখে কল্যাণকারী হিসাবে আমাদের মাঝে ছিলেন-আছেন-থাকবেন।

 

খায়রুল আলম  বকুল

 

১৩ জানুয়ারি ২০১২, রবিবারের ভোর রাত ৪.৩০ মিনিটে অসীমের উদ্দেশ্যে চির বিদায় গ্রহণ করেন গুরুভক্ত ফকির মোঃ খায়রুল আলম বকুল। মাত্র ৫৬ বছরের জীবনধারী নির্বাক নীরব নিথর দেহখানি। নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলায় জিনারদী ইউনিয়নের পাঁচভাগ গ্রামে জন্ম ১৯৫৭ ইংরেজী সালে। স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছিলেন রাজধানী  শহর ঢাকাস্থ মিরপুরের পাইকপাড়ায়। এখানেই স্ত্রী ও তিন পুত্রসহ বসবাস করে আসছিলেন চমৎকার সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। জিনারদীর বাড়ারচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে ঢাকার মোহাম্মদপুর গভঃ হাইস্কুল হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্সে অনার্স মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।

মেধাবী স্পষ্টভাষী ও স্বাধীনচেতা বকুল মাষ্টার্স সম্পন্ন করে কোন চাকুরী জীবনে প্রবেশ না করে ঠিকাদারী ব্যবসা দিয়ে শুরু করে তাঁর কর্মজীবন। তিন বন্ধুর সমন্বয়ে গড়ে তুলেছিলেন মর্নিংস্টার কিন্ডারগার্টেন নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বনশ্রী ডেকোরেটর নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির তিনি ছিলেন ঢাকার মিরপুর থানার সংগ্রামী সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।  ১৯৮৯ সালে মিরপুর আস্তানা শরীফ থেকে নামের সাথে সংযুক্ত নামমাত্র খেতাবকে স্বার্থক করে তুলেছিলেন হাক্কানী পাঠশালায় অধ্যয়ন করে। এ সময় তিনি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত ছিলেন হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে। এক সময় মিশন ও দরবার কার্যক্রমের মূলধারায় সচেষ্ট ছিলেন তিনি। লোকান্তরিত হয়ে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মার পাশেই স্থান করে নিলেন খায়রুল আলম বকুল।

 

 নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী

 

হাক্কানী ভাবধারার একনিষ্ঠ অনুসারী, মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা পরিষদের সহ-সভাপতি কর্মক্ষেত্রে সততার মূর্ত প্রতীক, সদা হাস্যময় ও স্বল্পভাষী নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ২০১২ সালের ১০ অগ্রহায়ণ, ২৪ নভেম্বর শনিবার বিকেলে রাজধানীর গ্রীনরোডে অবস্থিত গ্রীন লাইফ হাসপাতালে দেহত্যাগ করেন।

তিনি মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা পরিষদে দীর্ঘদিন মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং আমৃত্যু একই পরিষদের সহ সভাপতি পদে নিয়োজিত ছিলেন।

‌'হক' এর সাথে একাত্ম হয়ে তিনি হাক্কানী পথের যাত্রী হিসেবে সত্য ও সততার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজ পরিবারে অত্যন্ত দায়িত্বশীল পিতা ও অভিভাবক এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিকট ছিলেন সততার মূর্ত প্রতীক।

নজরুল ইসলাম সিদ্দিকী ১৯৫৫ সালের ১ অক্টোবর টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার দত্তগ্রাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঘাটাইল ব্রাহ্মণশাসন গণ মহাবিদ্যালয় থেকে বি.এ ও পরবর্তি সময়ে সরকারি তিতুমির কলেজে লেখাপড়া করেন।

কর্মসূত্রে তিনি গুলশানস্থ কনকর্ড কন্সট্রাকশন কোম্পানীর হিসাব বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সততার কারণেই কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। হাক্কানী ভাবধারার যাত্রী হয়ে তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।

 

রুহুল আমিন বাদশা

  

১৯৬৪ সালের ৪ঠা জানুয়ারি  কুমিল্লা জেলার আলিপুর গ্রামের করিমাবাদ নামক জায়গায় ভূমিষ্ঠ হন রুহুল আমিন বাদশা। ছোটকাল থেকেই বড় শান্ত ও মা ভক্ত ছিলেন তিনি। রাজধানীর কলাবাগান হাইস্কুল এর মাধ্যমে তার শিক্ষা জীবনের শুরু। পরবর্তীতে নিউ মডেল স্কুল, ওয়েস্টার্ন হাই স্কুল ও তিতুমীর কলেজ হতে তার শিক্ষা জীবন আরও সমৃদ্ধি লাভ করে।

বরাবরই বড় স্বাধীনচেতা ও বাদশাহী আমেজে জীবন-যাপন করতে ভালবাসতেন। বহু জায়গায় চাকুরী পেয়েও তিনি নিজেকে শান্ত রেখেছেন কারণ অন্যের অধীনে কাজ করা তার প্রকৃতি বিরুদ্ধ ছিল।

স্বাধীনচেতা মন তাই ব্যবসা করবার পথে সায় দেয়। ব্যবসাকেই তিনি বেছে নেন অর্থ উপার্জনের একমাত্র পথ। জীবনে তিনি বহু ব্যবসা করেছেন। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো - কাঠের কারুশিল্পের দ্বারা সৌখিন জিনিসপত্র বানানো। সেখানে তার স্পষ্ট সৃজনশীলতার ছাপ লক্ষ্য করা যায়।

পরবর্তীতে কাপড়ের ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ১৯৮৮ সালে মিরপুর আস্তানা শরীফের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই শুরু হয় তাঁর দরবারী জীবন।  তিনি আস্তানা শরীফের দরবার কমিটির সহসভাপতি পদে নিযুক্ত ছিলেন। ২০১২ সালের ১১ই এপ্রিল মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত কারণে গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৮ই এপ্রিল হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে সকালবেলা তিনি সকলকে ছেড়ে চলে যান দূর অজানার পথে।

 

  সালাহউদ্দিন আহমেদ

 

১ অক্টোবর ’৯৯ ভোরের আলো আকাশ উদ্ভাসিত করার পূর্বেই হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও মিরপুর আস্তানা শরীফের মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ রাতের কোন এক সময় নিজ গৃহে  বিদ্যুৎস্পৃশ্য হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। ইলয়টগঞ্জ প্রাইমারী স্কুল থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। মতলবগঞ্জ জেবি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে প্রাণীবিদ্যায় ১৯৮৩ সালে বি.এস.সি অনার্স ডিগ্রী ১৯৮৪ সালে মৎস্য বিজ্ঞানে এম.এস.সি ডিগ্রী লাভ করেন। সামাজিক দায়বোধ শিক্ষা জীবনেই তাকে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত করেছিল। ছয় ভাইয়ের মধ্যে সালাহউদ্দিন ভাই প্রথম। কর্মে নিবেদিত প্রাণ সালাহউদ্দিন ভাই একের পর এক দরবার, মিশন এবং প্রকাশনা পত্রিকার, ফটোগ্রাফিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে যেতে লাগলেন একনিষ্ঠভাবে। ১৯৯৩ সনের ডিসেম্বরের প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা থেকেই তিনি মাসিক বর্তমান সংলাপের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  ১৯৯৪ সনের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবং মার্চ ’৯৪ থেকে জুন ’৯৫ পর্যন্ত সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩-৯৪ পর্যন্ত তিনি হাক্কানী মিশনের প্রকাশনা উপ-পরিষদে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিরপুর আস্তানা শরীফের শুরু থেকেই উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন। ১৯৯৭ সনে তিনি হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিরপুর আস্তানা শরীফের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করাকালীনই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

 এ.এফ.এম সিরাজুল ইসলাম

 

সিরাজুল ইসলাম একটি নাম। যার অর্থ শান্তির প্রদীপ।  ২০০০ সালের ২২ মে সোমবার রাত দশটায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালে নিভে যায় তাঁর প্রাণ প্রদীপ।

নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার চরমল্লিকপুর গ্রামে ১৯৩২ সালের পহেলা মে জন্মগ্রহণ করেন। মল্লিকপুরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ইতনা মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বৈতরণী পার করেন। চাকরি নেন পুলিশ বিভাগে ১৯৫১ সালে। দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথেই তিনি পালন করেন পুলিশ ইন্সপেক্টর পদের দায়িত্ব। অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮০ সালে। দীর্ঘ দিনের চাকরি জীবনে তাঁর সততাই তাঁকে দূরে রেখেছিল পার্থিব বিত্ত-বৈভবের প্রলোভন থেকে। কোন প্রকার দুর্নীতির আবর্তনে ধরা দেননি বলেই স্ত্রী, ৩ পুত্র ও ৩ কন্যার জন্য সঞ্চয় করতে পারেননি অর্থ- সম্পদের পাহাড়।

নামের তাৎপর্যকে লালন করেই গেছেন জনাব সিরাজুল ইসলাম জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত। শান্তির প্রদীপ চেয়েছিলেন একটি শান্তিময় জগত। শান্তিময় জীবনের স্পর্শ। যা তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন ১৯৮৮ সালে। মিরপুর আস্তানা শরীফে। ‌'হাক্কানী' আদর্শে বিশ্বাসী তিনি হলেন ভক্ত এবং পরবর্তীতে মিরপুর আস্তানা শরীফ-এর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। পূর্ণ শিখায় জ্বলে উঠলো শাস্তির প্রদীপটি। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের সকল কর্মকান্ডের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে তিনি রেখে গেলেন তাঁর কর্মময় স্মৃতি।

মিরপুর ১১ নম্বর কবরস্থানে তিনি চিরশয্যা নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির জগতে চির জাজ্জ্বল্যমান হয়ে থাকবে আবুল ফজল মোঃ সিরাজুল ইসলাম নামের শান্তির প্রদীপ শিখায়।

 

এস.এম  শাহ্‌ আলম

  

জীবনের সত্য সোপান ধরে সেবার মহান ব্রতে যাঁরা হন আত্ম নিবেদিত - তাঁদেরই একজন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সত্যানুসন্ধানী সাংবাদিক এস. এম. শাহ্‌ আলম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফল শিক্ষা জীবন শেষে মেধাবী, সহানুভূতিশীল এস. এম শাহ্‌ আলম সামাজিক দায় বোধকে প্রাধান্য দিয়ে আইন পেশাকে জীবন চলার অবলম্বন হিসেবে বেছে নেন। সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপে ‘শাহ্‌জী’ ছদ্মনামে তাঁর নিয়মিত লেখনী ‘শাহানশাহ্‌ কড়চা’ উল্লেখ্য। যা সংলাপের পাঠককূলের কাছে ছিল অত্যন্ত প্রিয়।

নির্ভীক সাংবাদিক এস. এম. শাহ্‌ আলম ১৯৯৫ সালের জুন মাসে মাসিক বর্তমান সংলাপ-এর আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব সম্পাদন করেন। একই বছরের জুলাই মাস হতে একটানা জুন ’৯৭ পর্যন্ত পত্রিকার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা পালন চিরস্মরণীয়। বাঙালি চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে তাঁর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নির্দেশনা স্মরণীয়। মিরপুরের দ্রাবিড় নাট্যগোষ্ঠী তাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।  চরম ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রম দিয়ে হাল ধরেছিলেন মিরপুর বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে আপন নিবাস মনে করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে অবদান রেখে গেছেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল, বিনম্র, সদালাপী ও নিরহংকার এই ব্যক্তিত্ব ২৩ আশ্বিন ১৪০৮ (৮ অক্টোবর ২০০১) সোমবার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অন্তিম শয়নে শায়িত হন।

 

এস.এম.শাহনেয়াজ আলী

 

প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় নির্মম আঘাতে স্বজনদের জর্জরিত করে সত্যের হাত ধরে বিদায় নিয়েছেন এস.এম. শাহনেয়াজ আলী ২০০২ সালের ১২ নভেম্বর তারিখে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীটা শুধু সার্টিফিকেট হয়েই থাকেনি, সমাজ-সংসারে সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছেন পুরোদস্তুর। ১৯৭৮ থেকে ২০০২ দীর্ঘ ২৪ বছরের চাকুরী জীবনে দায়িত্ব সচেতন, সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং দক্ষ ব্যক্তিত্বে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তারুণ্যের দুর্দান্ত সময়টাকে তাই তিনি বিফলে নষ্ট করেননি। শত্রুর মুঠো আগলে দেশকে মুক্ত করতে হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। জাতীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে তাঁকে ১৩ নভেম্বর ২০০২ সনে মিরপুরের কালসী গোরস্থানে। শুয়ে আছেন ঘুমে মগ্ন হয়ে মায়ের পায়ের কাছে ভাইয়ের পাশে। ‘দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা’ তাঁকে সম্পৃক্ত করেছে মানব কল্যাণমূলক কর্মকান্ডে। মিরপুর আস্তানা শরীফের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য হিসেবে একাত্ম হয়েছেন দরবারের সার্বিক কর্মকান্ডে। শুধু তাই নয় হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের লক্ষ্য - ‘ধর্ম মানবতার জন্য’ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন মিশনের ধর্মভিত্তিক মানব কল্যাণমূলক নানাবিধ কর্মকান্ডে। একজন ‘দরবারী ও মিশন - সদস্য’ হয়ে তিনি যে কর্মের নিদর্শন রেখে গেছেন তা অবশ্যই দৃষ্টান্ত স্বরূপ এবং থাকবে চির অম্লান।

আব্দুল হামিদ ও সাজেদা খাতুনের আশীর্বাদপুষ্ট সন্তান শাহনেয়াজ আলী সকল বন্ধনকে অতিক্রম করে আত্মব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন স্বজনের হৃদয়ে হৃদয়ে। তিনি চলে গিয়েও রয়ে গেছেন। তিনি  ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন ‌'বর্তমান' হয়ে॥

 

 এস এম সেলিম

 

এস এম সেলিম ১৯৫৫ সনের ১৪ নভেম্বর মায়ের কোল আলাকিত করে ধন্য পরিবারের কনিষ্ঠ ভ্রাতারূপে সাধক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল, নিরহংকার, এই ব্যক্তিত্ব ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সদস্যদের কাছে অতি আদরের ধন ছিলেন। বন্ধুভাবাপন্ন ও পরোপকারী গুণের কারণে পরিচিতজনদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘পিকু ভাই বা পিকু মামু’ হিসেবে। মেধ