কোরবানির নামে

পশুজবাই কি কুরআন নির্দেশিত ?

 

 

বিষয় থেকে বিষ, ভোগ থেকে ভোগান্তি আর ত্যাগ থেকে শান্তি ত্যাগ ব্যতীত শান্তি লাভের আর কোন পথ নেই পৃথিবীর সকল ধর্মের সকল সাধক যুগে যুগে ত্যাগ বা কোরবানির বাণী প্রচার করেছেন কোন কালে কোন সাধকই কোরবানি ব্যতীত  আল্লাহর নৈকট্য লাভের দ্বিতীয় কোন পন্থা প্রদর্শন করেননি পৃথিবীতে এমন কোন ধর্মও নেই যে ধর্ম পকারবানির আদেশ দেয়নি বেদ, গীতা, বাইবেল কোরবানির নির্দেশনায় পূর্ণ শান্তির ধর্ম ইসলামেরও মূল বিষয় - কোরবানি

আরবি কোরবান শব্দের উর্দু সংস্করণ কোরবানিকোরবান শব্দের আভিধানিক অর্থ ত্যাগ, উৎসর্গ কোরবান শব্দটি মূল শব্দ ক্কুরব থেকে উদ্ভুতক্কুরব অর্থ সন্তুষ্টি, নৈকট্য ও সান্নিধ্য এভাবে, কোরবান শব্দের অর্থ দাঁড়ায় - আল্লাহর নৈকট্য, সান্নিধ্য বা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে ত্যাগ এটা অভ্যাস, আরাম, স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ হতে পারে; অর্থ-বিত্ত, নাম-যশ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ত্যাগ হতে পারে কিংবা হতে পারে সংসার, কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা ত্যাগ

কোরবানি এমন কোন বিষয় নয় যা বৎসরে একবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্‌যাপন করা যায় নবী-রসুল এবং সাধকদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের জীবনে ত্যাগ মানে পশু জবাই নয় তাঁদের কাছে ত্যাগ হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অজর্নের লক্ষ্যে আজীবন পালনীয় সাধন ক্রিয়া কুরআন মতে, যিনি বিসর্জন দিয়েছেন তিনিই মুসলমান মুসলমান শব্দটি এসেছে সলম ধাতু থেকেসলম অর্থ - আত্মসমর্পণ সামান্য গবাদি পশু বিসর্জন দিলেই কেউ মুসলমান হয় না, মুসলমানিত্ব অর্জন করা এতো সহজ বা সস্তা বিষয় নয় যিনি আত্মসমর্পণ করেছেন অর্থাৎ আমিত্বকে বিসর্জন দিয়েছেন তিনিই মুসলিম কুরআন আল্লাহর পথে সকল ঐশ্বর্যকে কোরবানি দেবার নির্দেশ দিয়েছে কুরআনের নির্দেশনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, কোরবান হচ্ছে-পার্থিব জগতের প্রতি সকল আসক্তি ত্যাগ করা ইহজাগতিক আসক্তি ত্যাগ না করে গরুর পিঠে সওয়ার হয়ে বেহেশতে যাবার স্বপ্ন দেখা আহাম্মকি ব্যতীত অন্য কিছু নয়

আরবি কোরবান’  শব্দের সাতটি বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় যথা - ছাড়া, বর্জন, ত্যাগ, পরিত্যাগ, উৎসর্গ, বিসর্জন ও নিবেদন মানুষ ছাড়তে পারে - বদঅভ্যাস; বর্জন করতে পারে - মিথ্যাচার, অনর্থক বাক্যব্যয়, অধিক ঘুম, অধিক আহার; ত্যাগ করতে পারে - অর্থ-বিত্ত, নাম-যশ ও ক্ষমতার মোহ; পরিত্যাগ করতে পারে - কর্মফল, কামনা-বাসনা, প্রত্যাশা; উৎসর্গ করতে পারে - জীবন; বিসর্জন দিতে পারে - আমিত্ব ও পার্থিব আসক্তি, নিবেদন করতে পারে - জ্ঞান কুরআনের দৃষ্টিতে কোরবানি উল্লিখিত সাতটি স্তরেই বিদ্যমান

কুরআনের আলোকে কোরবানের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলো নিম্নরূপ : 

এক সুরা বাকারাতে আল্লাহ বলছেন -

''আর যখন মুসা তার নিজের সমপ্রদায়কে বলেছিল, ‘আল্লাহ তোমাদের একটা গরু জবাইয়ের হুকুম দিয়েছেন তারা বলেছিল, ‘তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছ?’ মুসা বলেছিল, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি, আমি যেন জাহেলদের (অজ্ঞদের) দলে না পড়ি তারা বলেছিল তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল ঐ গরুটি কেমন হবে? মুসা বলল, ‘আল্লাহ বলেছেন এ এমন একটা গরু যা বুড়োও না, অল্পবয়সীও না - মাঝবয়সী, অতএব তোমরা যে-আদেশ পেয়েছ তা পালন করো তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল ওর রং কী হবে মুসা বলল, ‘আল্লাহ বলেছেন সেটা হবে হলুদ রঙের বাছুর, তার উজ্জ্বল গাঢ় রং যারাই দেখবে তারাই খুশি হবে তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদেরকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল গরুটা কি ধরনের? আমাদের কাছে গরু তো একই রকম আর আল্লাহর ইচ্ছায় নিশ্চয় আমরা পথ পাব মুসা বলল, ‘এ এমন এক গোবৎস্য যাকে জমিচাষে বা ক্ষেতে পানিসেচের কাজে লাগানো হয়নি, সম্পূর্ণ নিখুঁত তারা বলল, ‘এখন তুমি সঠিক তথ্য এনেছ তারপর তারা সেটাকে জবাই করল যদিও তারা জবাই করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করে নাই (কষ্ট ও ক্ষতি স্বীকার করে নাই)''  (২ : ৬৩-৭১)

সুরা বাকারার উপরোক্ত আয়াতগুলো কোরবান সম্পর্কে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণবাকারা কুরআনের সর্ববৃহৎ সুরা উল্লিখিত আয়াতগুলোই সুরাটির এইরূপ নামকরণের কারণবাকারা শব্দের আভিধানিক অর্থ বকনা বাছুর পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত হলুদ রঙের কোন বকনা বাছুর কেউ দেখে নাই, কোন কালে হলুদ রঙের বকনা বাছুর ছিল এমনটিও কল্পনা করা যায় না সুতরাং নিঃসন্দেহে হলুদ রং’, ‘বাকারা ইত্যাদি শব্দগুলো রূপক শুধু তাই নয়, উল্লিখিত সবগুলো আয়াতই রূপক ও রহস্যপূর্ণ এই আয়াতগুলোর রহস্য উন্মোচিত হতে পারে নিম্নোক্তভাবে -

ক. এ এমন একটা গরু যা বুড়োও না, অল্পবয়সীও না - মাঝবয়সী এর অর্থ হচ্ছে - যৌবন

খ. সেটা হবে হলুদ রঙের বাছুর, তার উজ্জ্বল গাঢ় রং যারাই দেখবে তারাই খুশি হবে’ - হলুদ বসনেত্মর রং মানব জীবনের বসন্ত হচ্ছে যৌবন মহানবী (সা.) বলেছেন- যার যৌবন নাই তার তওবাও নাই’, সুতরাং হলুদ রঙের বাছুর বলতে এখানে যৌবন কাল বোঝানো হয়েছে

গ. এ এমন এক গোবৎস্য যাকে জমিচাষে বা ক্ষেতে পানিসেচের কাজে লাগানো হয়নি, সম্পূর্ণ নিখুঁত’ - এখানে এমন একজন যুবকের কথা বলা হয়েছে যে এখনও বীর্যপাত করে নাই এবং সংসারের ঘানি টানে নাই কুরআনে অন্যত্রও জমিচাষ বলতে রতিক্রিয়া বুঝানো হয়েছে যে এখনো বীর্যঙ্খলন করেনি তাকেই নিখুঁত বলা হয়েছে কারণ, যে এখনো বীর্যঙ্খলন করে নাই এবং সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হয় নাই সে বস্তুমোহের কলঙ্ক এবং লোভ থেকে অনেকটাই মুক্ত অন্যদিকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশে যে বীর্যঙ্খলন থেকে বিরত থাকে সে বীর্যবান জিতেন্দ্রিয় পুরুষ রূপে আবির্ভূত হয় আর, যুবকদেরকে স্ত্রী লিঙ্গরূপে বাকারা বলার তাৎপর্য হলো - তারা এখনও পুরুষ হয় নাই মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজে নিজেকে পূর্ণমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ পুরুষ হয় না

যৌবন আনন্দের স্বরূপ এ জগৎ সংসারকে জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোকে উদ্ভাসিত করতে হলে যৌবনশক্তি চাই, দুঃখপূর্ণ পৃথিবীতে আনন্দের জোয়ার আনতে চাই আশা, উৎসাহ, ত্যাগ ও বীর্যের তেজ সর্বকালে সর্বদেশে যৌবনশক্তির আত্মদানে আছড়ে পড়েছে অন্যায়, অসত্য, গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা আত্মদানের আনন্দে উচ্ছলিত হতে হলেও চাই যৌবন শক্তি যৌবনের আনন্দময়ী গতি, অপরিমেয় তেজ, জীবনের স্রোত রোধ করতে পারে না কোন প্রতিকূলতা ইসলামের জ্যোতিতে আজ বার্ধক্যের শীতল ছায়া বৃদ্ধ নেকড়ে শিকার ধরতে পারে না তাই সাধু সাজে বৃদ্ধ নেকড়ের মতোই সারা জীবন পাপ করে বার্ধক্যে এসে মানুষ ধর্ম-কর্মে উৎসাহী হয় তাই যৌবনশক্তিকে আহ্বান জানিয়ে আল্লাহ বলছেন - হে যুবক উঠো, জাগো, নব দিগন্ত উন্মোচনে, মানব কল্যাণে কোরবানি দাও তোমার যৌবন, গড়ে তোল এক নতুন পৃথিবী শান্তি-মঙ্গল আর ন্যায়ের পৃথিবী তবেই তোমার উপর বর্ষিত হবে রহমানুর রহিমের করুণা ধারা

দুই সুরা সাফ্‌ফাতে আল্লাহ বলছেন -

‘‘ইব্রাহিম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্ম পরায়ণদের মধ্য হতে দান কর আমি তাকে এক ধীরস্থির পুত্রের খবর দিলাম তারপর যখন তাঁর (ইব্রাহিমের) সঙ্গে প্রচেষ্টা গ্রহণের কাজ করার মতো বয়স হলো তখন ইব্রাহিম তাকে বলল, ‘বাছা! আমি নিদ্রায় দেখি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি, এখন তুমি চিন্তা কর, তুমি কি মত দিবে?’ সে বলল, ‘পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন আল্লাহ ইচ্ছা করলে, আপনি দেখবেন, আমি ধৈর্য ধরতে পারি তারা দুজনেই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল ও ইব্রাহিম তার পুত্রকে (জবাই করার জন্য) কাত করে শুইয়ে দিল, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি তো নিদ্রার আদেশ সত্যই পালন করলে এভাবেই আমি সৎকর্ম পরায়ণদেরকে পুরষকৃত করে থাকি নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা আমি (তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে) জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু এবং তাকে রেখে দিলাম পরবর্তীদের মাঝে’’ (৩৭ : ১০০-১০৮)

কেউ কেউ দাবি করেন যে, কোরবানির ঈদ ইব্রাহিম (আ.) থেকে এসেছে এবং এর পক্ষে তারা কুরআনের উক্ত আয়াতগুলোর উল্লেখ করেন কিন্তু কুরআনের উক্ত আয়াতগুলোতে একবারও কোরবানি ও ঈদ শব্দের উল্লেখ নেই এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা থেকেও এ সিদ্ধান্ত নিঃসৃত হয় না যে কোরবানির ঈদ ইব্রাহিম (আ.) থেকে এসেছে এটা একটা প্রচলিত বিভ্রান্তি।  চলতি কেচ্ছা হলো - এই আয়াতে ইসমাইলের পরিবর্তে আল্লাহ দুম্বা প্রেরণ করেছিলেন।  অথচ কুরআনের আয়াতে দুম্বার কোন উল্লেখ নেই আল্লাহর নির্দেশকে অবমাননা করার হীন উদ্দেশে কুরআনকে বিকৃত করে দুম্বা আমদানী করা হয়েছে কুরআনে বলা হয়েছে - জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু এই মহান জন্তু কি দুম্বা? দুম্বা কি কখনো মহান হয়? মহান জন্তু বলতে কুরআন কিসের ইঙ্গিত দিয়েছে তা আলোচনার দাবি রাখে

কুরআন মতে - ইব্রাহীম (আ.) একজন সৎসঙ্গীর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন আল্লাহ তার প্রার্থনা পূরণ করেন এবং তাকে সৎসঙ্গী হিসেবে পুত্র সন্তান দান করেন ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন খলিলুল্লাহ্‌ বা আল্লাহর বন্ধু তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেমে আত্মহারা কিন্তু শেষ বয়সে তিনি পুত্রের প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্ত হয়ে পড়েন তাই আল্লাহ তাঁর প্রতি ইব্রাহিম (আ.)-এঁর প্রেম কতটা নিখুঁত তা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন ইব্রাহিম (আ.)-কে আল্লাহ স্বপ্ন দেখালেন যেন আল্লাহর উদ্দেশে তার সন্তানকে জবাই করা হয় ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয়পাত্রকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জবাই করতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিলেন তাঁর আনুগত্য প্রমাণিত হলে আল্লাহ বিকল্প হিসেবে এক মহান জন্তু উপহার দিলেন।  এ ঘটনাকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা নির্বুদ্ধিতা এ ঘটনার মাধ্যমে বলা হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রিয় বস্তুকে ত্যাগ করতে হবে সব মানুষের প্রিয় বস্তু এক নয়, প্রত্যেক ব্যক্তির প্রিয় বস্তু বিভিন্ন হবে।  গবাদি পশুও কারো প্রিয় বস্তু হতে পারে কিন্তু বিশ্বের সকল মুসলিমদেরই প্রিয় বস্তু গবাদি পশু হতে পারে না ব্যক্তি তার প্রিয় বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে ত্যাগ করতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিলে আল্লাহ যদি কোন একটা বিকল্প উপহার দেন তবে সে উপহার মহান হবে এবং সেই বিকল্পকে তাঁর উদ্দেশে জবাই করলে এটা পরবর্তীদের জন্য পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে অন্যদিকে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইব্রাহিম (আ.) -এঁর পুত্র নিজেও নিজেকে জবাই হবার সম্মতি প্রদান করেন এবং তাঁর আল্লাহর প্রতি চরম আনুগত্য প্রকাশ করেন পুত্রের সম্মতিতে প্রমাণিত হয়, ইব্রাহীম (আ.) নিজ পুত্রকে তাঁরই আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন ইব্রাহিমের পুত্রও ছিলেন গুরুভক্ত গুরুর আদেশে ভক্ত পুত্রও নিজের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন গুরুর ইচ্ছায় ভক্ত নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন এবং মহানদের অন্তর্ভূক্ত হলেন এটাও কুরআনে উল্লিখিত মহান জন্তুর তাৎপর্য

ইব্রাহিম (আ.) -এঁর ত্যাগ হচ্ছে একটা কুরআনিক উদাহরণ উক্ত ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কঠিনতর বিপদেও তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও নির্ভরশীল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন এটা পরিতাপের বিষয় যে, অধিকাংশ মুসলিম এ থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করার বদলে গবাদি পশু জবাইয়ের ফতোয়া অনুসরণ করছে এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা না নিয়ে উদাহরণকেই উদ্‌যাপন করার মতো নির্বুদ্ধিতা আর কি হতে পারে? কিভাবে, কোন্‌ যুক্তিতে  নিজেরা নিজেদের প্রিয় বস্তু ত্যাগ না করে ইব্রাহিম (আ.) এঁর ত্যাগকে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে এ প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায় না তিন হাজার সাড়ে আটশ বছর আগে ত্যাগ করেছেন ইব্রাহিম (আ.) আর তাঁর সেই ত্যাগের আনন্দে তিন হাজার সাড়ে আটশ বছর পরে আমরা গবাদি পশু জবাই করছি! এটাই কি ইসলাম? এটাই কি কুরআনের শিক্ষা? এটাই কি মহানবীর আদর্শ? আমরা কি কিতাব বহনকারী গাধা জাতিতে পরিণত হয়েছি মল-মূত্র আর বীর্য ব্যতীত যারা আর কোন কিছুই ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তাদের পক্ষেই কেবল এমন প্রহসন করা সম্ভব

আমি উদ্‌যাপন করতে পারি কেবল আমার ত্যাগ আমার ত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ কোন বিকল্প উপহার দিলে আমি তাঁর নৈকট্যলাভের পরমানন্দে উদ্বেলিত-উচ্ছলিত হতে পারি ইব্রাহিম (আ.) আমাদের সকলের পক্ষ থেকে ত্যাগ করেননি আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মফল ভোগ করবে সুতরাং, তাঁর ত্যাগের কারণে এতোদিন পর আনন্দিত হয়ে গবাদি পশু জবাই করার মধ্যে কোন যুক্তি নেই

রেখে দিলাম পরবর্তীদের মাঝে অর্থ পরবর্তীদের জন্য এরকম জবাই বাধ্যতামূলক করা নয় কারণ, ইব্রাহীম (আ.) থেকে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত পশু জবাইয়ের এই ধারা অব্যাহত ছিল না ইব্রাহিম (আ.) -এঁর বংশধরগণ - হযরত ইসমাইল (আ.), ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.), ইউসুফ (আ.), ঈসা (আ.) পর্যন্ত-কোরবানি পালন হয়েছে বলে জানা যায় না তবে হযরত মুসা (আ.) কোরবানির প্রবর্তন করেছিলেন বলে প্রমাণ আছে কিন্তু তাঁর প্রবর্তিত কোরবানি গবাদি পশু জবাই ছিল না তাওরাতে - শস্য কোরবানি, যোগাযোগ কোরবানি ইত্যাদি নানারকম কোরবানির নিয়ম আছে সুতরাং, ‘রেখে দিলাম পরবর্তীদের মাঝে অর্থ বাধ্যতামূলক পশু জবাই নয়, এর অর্থ হচ্ছে ইব্রাহিম (আ.) -এঁর ত্যাগের মহান আদর্শকে কুরআনে সংযুক্ত করার মাধ্যমে এ ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখা হয়েছে যেন ভবিষ্যতে কিভাবে প্রেমের পরীক্ষা দিতে হয়, কিভাবে তাঁর প্রতি অনুগত ও নির্ভরশীল হতে হয়, কিভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয় তা যেন আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশীরা শিখে নেয়

তিন ॥  সুরা হজে আল্লাহ বলেন -

''উহাদের গোশত ও রক্ত আমার নিকট পৌঁছায় না কিন্তু তোমাদের তাকওয়া আমার নিকট অবশ্যই পৌঁছায়’ (২২ : ৩৭)

কুরআনের এ আয়াতটি বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য কারণ এ আয়াতটি গতানুগতিক পশু জবাইয়ের বিরুদ্ধে স্বয়ং আল্লাহতায়ালার প্রতিবাদ মানুষ গরু জবাই করে গোশত ভক্ষণ করে আর পাশাপাশি ইবাদতও করছে বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করে কিন্তু ইবাদতের পথ জিহ্বার লালসার মতো পিচ্ছিল নয় গবাদি পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না আল্লাহর কাছে পৌঁছায় বান্দার তাকওয়াতাকওয়া কুরআনের একটি অতি মর্যাদাবান শব্দ সকল ইবাদতের লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন করা তাকওয়া কি? ইমাম গাজ্জালী তাকওয়ার অর্থ করেছেন - মনুষ্যত্বের উদ্বোধন তাকওয়া শব্দের অনেকগুলো বাংলা প্রতিশব্দ রয়েছে, যেমন-আল্লাহর আনুগত্য, ধর্মনিষ্ঠা, সংযম, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং আল্লাহর নির্দেশ মানার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা তৈরী করা তবে সবকিছুরই মর্মকথা হলো - মনুষ্যত্বের উদ্বোধন।  আল্লাহ তায়ালা রক্ত কিংবা গোশতের মুখাপেক্ষী নন, তিনি তাঁর বান্দাকে ত্যাগের আদর্শ পালনের দীক্ষা দেন ধর্ম মানবতার জন্য, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের জন্য নয় তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর পথে অর্থাৎ মানবতার সেবায়, প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গের জন্য সদা প্রস্তুত থাকা তাকওয়া হচ্ছে - পশুপ্রবৃত্তির উপর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিষ্ঠা তাকওয়া ব্যতীত যে কোন মানবিক কর্ম নিজ স্বার্থে পশুপ্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবার জন্য পরিচালিত হয় পশুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করবার মোহে দেহ কারাগারে বন্দী আত্মা খুঁজে শান্তি ও মঙ্গলের নিশানা এই শান্তি ও মঙ্গল অর্জন করাই তাকওয়া এটি একটা মানসিক প্রশান্তির স্তর এ স্তরে পৌঁছাতে হলে সকল পশুপ্রবৃত্তিকে আল্লাহর দরবারে কোরবান হিসেবে পেশ করতে হয়

চার ॥  সুরা মায়িদায় আল্লাহ বলছেন -

''হে বিশ্বাসীগণ! অবমাননা করো না আল্লাহর নিদর্শনের, পবিত্র মাসের, জবাইয়ের জন্য কাবায় পাঠানো পশুর, গলায় মার্কামারা মালাপরানো পশুর আর তাদের যারা পবিত্র ঘরে আসে তাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির আশায়’ (৫ : ২)আল্লাহর পবিত্র কাবাগৃহ, পবিত্র মাস, জবাইয়ের জন্য কাবায় পাঠানো পশু ও গলায় মার্কামারা মালাপরানো পশু মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারিত করেছেন এ এজন্য যে তোমরা যেন জানতে পার যা-কিছু আকাশে ও পৃথিবীতে আছে তা আল্লাহ জানেন, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। (৫ : ৯৭)

উক্ত আয়াত দুটিতে যেসব গবাদি পশু অর্থাৎ নিজ দেহে পালিত পশু অন্তরের কোমলতা ও প্রেমানুভূতি খেয়ে অনুভূতির উর্বর মানবজমিনকে বিরানভূমিতে পরিণত করে, সেসব নিজ দেহে পালিত পশুকে জবাই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এটাই ইব্রাহিম (আ.)- এঁর শিক্ষা কাবাগৃহে ইব্রাহিম (আ.) সাপ, বাঘ, কবুতর ইত্যাদি নানারকম ছবি এঁকে রেখেছিলেন লোকজন কাবাগৃহে প্রবেশ করলে তিনি এক একটা ছবি দিখিয়ে বলতেন, ‘দেখো, এটা হচ্ছে সাপ, এটি তোমার বিষয়ের প্রতীক; এটা হচ্ছে বাঘ, তোমার হিংস্রতার প্রতীক; এটা হচ্ছে জোড়া কবুতর, তোমার কামনার প্রতীক এসব জন্তুরা রয়েছে তোমার দেহঘরে এগুলোকে জবাই করো, বিসর্জন দাও, কোরবান দাও তবে তুমি সফলকাম হবে কাম, আকর্ষণ, হিংস্রতা ইত্যাদি সবগুলো বিষয় একসাথে কোরবানি দেয়া মানুষের জন্য কষ্টকর হবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কষ্টের মধ্যে ফেলতে চান না তাই আল্লাহ বলছেন প্রতিবার জিলহজ মাসের ১০/১১ কিংবা ১২ তারিখে এগুলো থেকে কোন্‌টিকে বিসর্জন দেবে তা চিহ্নিত করো নিজের অভ্যাসকে কোরবান হিসেবে চিহ্নিতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধন পদ্ধতি একবার চিহ্নিত করার পর সিদ্ধানেত্মর অবমাননা করো না নিজের সিদ্ধান্তকে নিজে সম্মান দিতে পারলেই কেবল তুমি কল্যাণপ্রাপ্ত হবে বদঅভ্যাস ত্যাগ করার জন্য একে চিহ্নিতকরণই পশুর গলায় মালা পরানোর তাৎপর্য

পাঁচ উপরে উল্লিখিত কোন আয়াতে কোরবান শব্দটির ব্যবহার নেই।  কুরআনে কোরবান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ৩ বার, শুধুমাত্র নিচের ৩টি আয়াতে :

‘‘যারা বলে আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, আমরা যেন কোনো রসুলের ওপর বিশ্বাস না করি, যতক্ষণ পর্যন্ত সে (এমন) কোরবান না করবে যা আগুন গ্রাস করে ফেলবে’, তাদেরকে বলো, ‘আমার আগে অনেক রসুল স্পষ্ট নিদর্শন ও তোমরা যা বলেছ তা নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছিল; যদি তোমরা সত্য বল তবে তোমরা কেন তাদেরকে হত্যা করেছিলে?’ (৩ : ১৮৩)

অতঃপর তারা কোরবান হিসেবে যে ইলাহ গ্রহণ করলো তাদের সাহায্য করল না কেন?’(৬ : ২৮)

আদমের দুই পুত্রের কাহিনী বর্ণনা করুন যখন তারা দুজনে কোরবান পেশ করেছিল তখন একজনেরটা কবুল হয়েছিল আর অন্যজনেরটা কবুল হয়নি তাদের একজন বলল, ‘আমি তোমাকে খুন করবই অপরজন বলল, ‘আল্লাহ মুত্তাকীদের পক্ষ থেকেই তো কবুল করেন’ (৫ : ২৭)

উপরোক্ত কোন আয়াত থেকেই গবাদি পশু কোরবানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না আল-ই-ইমরানে আল্লাহর উদ্দেশে যে কোন বস্তুর উৎসর্গকে কোরবান বলা হয়েছে সুরা আহ্‌কাফে কোরবান শব্দের মাধ্যমে প্রতিমা বুঝানো হয়েছে আদমের দুই পুত্র হাবিল-কাবিলের ঘটনা সম্পর্কে কথিত আছে, হাবিল দুম্বা জবাই করে পাহাড়ের চূড়ায় রেখে দিয়েছিলো কিন্তু কাবিল কোরবান হিসেবে পেশ করেছিলেন যব ও গম এখান থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে ১. কোরবান গৃহীত হবার শর্ত বস্তুর গুণাগুণ নয় - দাতার তাকওয়া ২. শুধু গবাদি পশু নয় অন্যান্য বস্তুও কোরবান হিসেবে পেশ করা যায় কুরআনের কোথাও পশু জবাই অর্থে কোরবান শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায় না

যার নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আছে তার জন্য পশু জবাই করা বাধ্যতামূলক এমন কোন নির্দেশনাও কুরআনে নেই এতদসত্ত্বেও, ইসলামী আইন প্রণেতাদের মতে পশু জবাই করা সুন্নতে মুআক্কাদা, মতান্তরে ওয়াজিব কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে মতান্তর থাকতো না অধিকাংশের মতে পশু জবাই এমন একটা সুন্নত যা পালন না করলে আল্লাহ কোন শাস্তি দেবেন না কারণ, রসুল (সা.) কখনো কোরবান অর্থ পশু জবাই বুঝিয়েছেন এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি একবার জেহাদে রক্তদানকে কোরবান বলেছেন আরেকবার মুত্তাকীদের জন্য সালাতকে কোরবান বলেছেন যেমন, রসুল (সা.) বলেছেন - সালাত হলো কোরবান’ (আহমদ ইবন হাম্বাল, মুসনাদ, ৩:২১, ৩৯৯) যে ব্যক্তি জুমআর সালাত আদায় করে সে ঐ ব্যক্তির সমান যে একটি কোরবানি করে’ (আহমদ ইবন হাম্বাল, মুসনাদ ২ : ৪৯৯)।  লিসানুল আরব’ -এ উল্লিখিত দুটি হাদিসে বলা হয়েছে - এই উম্মাতের (মুসলিমগণের) বৈশিষ্ট্য হলো যে, তাদের রক্ত অর্থাৎ তাদের কোরবান আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশে, যারা ধর্মযুদ্ধে রক্তদান করে’ ‘সালাত প্রত্যেক ধার্মিক মুসলমানের কোরবান রসুল (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করলো না, সে যেন আমার ঈদগাহের কাছেও না আসে’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজা) পশু জবাই করা হয় ঈদের নামাজের আগে তাই রসুল (সা.) পশুজবাই অর্থে কোরবানি শব্দের ব্যবহার করে থাকলে এটা বলতেন না যে, কোরবানি না দিয়ে ঈদগাহের কাছে এসো না সুতরাং পশুজবাই নয়, কোরবানির অর্থ যে ত্যাগ, উক্ত হাদিসটিই এর স্পষ্ট প্রমাণ

পশু জবাইকে যাতে সাধারণ মানুষ অবশ্য পালনীয় সুন্নত হিসেবে বেছে না নেয় এজন্য হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত ইবনে আব্বাস কখনো পশু জবাই দেননি বলে প্রমাণ পাওয়া যায় রসুল (সা.)-এঁর একনিষ্ঠ সহচর, হযরত বিল্লাল (রা.) ঈদ-উল-আযহার দিনে মুরগি জবাই করতেন পশু কেনার অর্থ তিনি অভাবী ও দরিদ্রদের দিয়ে দিতেন ইসলামী শরিয়ার প্রবর্তকগণের মধ্যে ইমাম মালিক, ইমাম সাফি এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল প্রত্যেকেই এ ব্যাপারে হযরত বিল্লালকে অনুসরণীয় মনে করেন ব্যতিক্রম শুধু হানাফী শরিয়াপন্থীগণ হানাফীগণ নিজেদের পক্ষে একটা হাদিস ব্যবহার করেন হাদিসটি হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আবদুল্লাহ বিন নাফায়ের ভাষ্য মতে আয়েশা (রা.) বলেছেন যে, মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন - ঈদ-উল-আযহার দিনে মুসলমানের প্রধান কাজ হচ্ছে পশু জবাই করা আর ঐ পশুটির রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই আল্লাহর কাছে এই উৎসর্গ সাদরে গৃহীত হয় এ হাদিসটি কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক স্মরণে রাখা দরকার যে, সুরা মায়িদার ২৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ সবার কোরবান কবুল করেন না, কেবল মুত্তাকীদের কোরবান কবুল করেন অন্যদিকে, উল্লিখিত হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেন এমনকি ইমাম বোখারী এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলের মতো বিখ্যাত হাদিস সংকলকগণ মনে করেন আবদুল্লাহ বিন নাফায়ের ভাষ্য মোটেও নির্ভরযোগ্য নয় তাই অধিকাংশ ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদই এটি বাতিল করে দিয়ে হযরত বিল্লাল (রা.) - এঁর রীতির অনুমোদন করেছেন আর তা হচ্ছে পশু জবাই না করে এর অর্থ অভাবী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া

আমাদের দেশে ঈদ-উল-আযহাকে কোরবানির ঈদ, বকরী ঈদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয় কোরবানি শব্দের সাথে ঈদ শব্দটি যুক্ত করে কোরবান এবং ঈদ এই দুটির তাৎপর্যকেই ক্ষুণ্ন করা হয়েছেঈদ-উল-আযহাকে কোরবানির ঈদ বলা যায় না পশু বলির দিবস থাকতে পারে কিন্তু কোরবানির কোন দিবস থাকতে পারে না কোন বিশেষ দিনে রাস্তা-ঘাটে, যেখানে-সেখানে, পশু জবাই করে পরিবেশ দূষণ করে গোশত খাওয়ার পর্বকে কোরবানি আখ্যা দেয়া কুরআন সম্মত হতে পারে না আল্লাহ প্রয়োজনে পশু জবাই করা, গোশত খাওয়া, লোকদের খাওয়ানো ইত্যাদি সবকিছুকেই বৈধ করেছেন কিন্তু আনন্দের জন্য পশু জবাই করা অথবা পশু জবাই করে আনন্দ করা কুরআন তো নয়ই, কোন বিবেকবান মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য নয়

ঈদ-উল-আযহার দিনে পশু জবাইকে সুন্নতে মুআক্কাদা কিংবা ওয়াজিব হিসেবে মেনে নিলেও প্রশ্ন জাগে - অনেক মুসলমানই আছেন যারা জীবনে কোনদিন ফরজ ইবাদত পালন করেন না, যাকাত দেন না, কিন্তু ঈদ-উল-আযহার দিনে সুন্নতে মুআক্কাদা পালন করার জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেন এটা কি এজন্যই নয় যে, এটির মাধ্যমে গোশত ভক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়?

ঈদ-উল-আযহা একটি সামাজিক আনন্দ অনুষ্ঠান রসুল (সা.) মুসলিমদের আনন্দ উৎসব হিসেবে এই দিনটির প্রবর্তন করেন এটা কোরবানির ঈদ বা বকরী ঈদ নয় এই আনন্দ উৎসব তিন দিন ব্যাপী প্রত্যেক সমপ্রদায়েরই আনন্দ দিবস আছে মুসলিমগণ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাচ-গানের মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করতেন কিন্তু এই দিবসটি ত্যাগের দিন হিসেবে উল্লেখ নেই তবে এই দিবসে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে পশু জবাইয়ের রীতি প্রচলিত ছিল, এখনও আছে কিন্তু এই দিনে পশু জবাই করতেই হবে এমন কোন নির্দেশনা কুরআনে নেই

অন্যদিকে, প্রচলিত প্রথানুযায়ী হজ পালনের পরপরই পশু কোরবানি দেয়া হয় সুরা বাকারার ১৯৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে - ‘‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে হজ ও ওমরাহ সম্পাদন কর যদি তোমরা অবরুদ্ধ হও তাহলে সহজলভ্য হাদিয়া’; এবং তোমরা তোমাদের মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ হাদিয়া উহার স্থানে না পৌঁছে আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ অথবা যার মাথা ব্যথার কষ্ট আছে, তার জন্য ফিদিয়া’ ‘সিয়াম অথবা সাদাকাহ অথবা নুসুক যথেষ্ট’’ উক্ত আয়াতে অবরুদ্ধ হও অর্থ হচ্ছে - পথিমধ্যে শত্রু দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া কোন কোন ইমাম অসুস্থতাকেও বাধাপ্রাপ্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন কিন্তু যিনি হজ যাত্রী নন, হজ করার ইচ্ছাও যার নেই, হজের দিন যিনি মক্কা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছেন তার জন্যও পশু জবাই করা অবশ্য পালনীয় কি-না এ ব্যাপারে কুরআনের কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই পশু জবাই কি শুধু হাজীদের জন্য প্রযোজ্য না সর্বসাধারণের জন্যও? এটাও ভেবে দেখা দরকার হজ অবশ্য পালনীয় হিসেবে এসেছে ৬২৫ খ্রি. ওহোদের যুদ্ধের সময় হজের সময় পশু জবাইয়ের নির্দেশনা এসেছে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হোদায়বিয়ার সন্ধিরকালে কুরআন বলছে -  ‘‘তারপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজের আগে ওমরা করে লাভবান হবে সে সহজলভ্য জবাই করবে কিন্তু যদি কেউ জবাই করার মতো কিছুই না পায় তবে তাকে হজের সময় তিন দিন ও ঘরে ফেরার পর সাতদিন এই পুরো দশদিন রোজা রাখতে হবে এই নিয়ম তার জন্য যার পরিবার-পরিজন পবিত্র কাবার কাছে বাস করে (২:১৯৬)’’ উপরোক্ত আয়াতগুলোতে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা হাজীদের জন্যও পশু জবাইয়ের বিকল্প হিসেবে হাদিয়া, ফিদিয়া, সিয়াম, সাদাকাহ অথবা নুসুক উপস্থাপিত করেছেন

কুরআনিক নির্দেশনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে দুঃখজনকভাবে কোরবানি এখন পশু জবাই এর আনন্দে অধঃপতিত এবং চতুস্পদ জন্তুর উপর একটি অত্যাচারমূলক ব্যবস্থায় পর্যবসিত কোরবানির নামে এখন চলছে বিত্ত প্রদর্শনী কে কত বড় এবং  কে কতটা গরু জবাই করতে পারে এর নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা চলছে যে কোরবানি ছিল ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও আত্মোপলব্ধির মহান স্মারক, সে কোরবানিতে আজ ভোগবাদের ছায়া ত্যাগ ও উৎসর্গের অর্থ আজ ছাগল, গরু, ভেড়াতে এসে ঠেকেছে স্বার্থপর ও অকৃতজ্ঞ মানুষ আল্লাহর সাথে চালাকি করে মনের পশুকে জবাই না করে, জবাই করছে বনের পশু এতে করে একদিকে নিজেকে কোন কষ্ট বা বেগ পেতে হচ্ছে না, অন্যদিকে মজা করে গোশতও খাওয়া যাচ্ছে! আর.. নিজের ভেতরের পশুটা কোরবানির পশু খেয়ে আরো মোটাতাজা হচ্ছে কিন্তু আল্লাহ তায়ালাকে এভাবে ফাঁকি দেয়া যায় না কারণ, চতুর মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি যে চতুরশ্রেষ্ঠ’!

সাধক কবি কাজী নজরুল ইসলাম গতানুগতিক কোরবানির বিরুদ্ধে অনেক কবিতা ও প্রবন্ধ লিখেছেন শহীদি ঈদ কবিতায় নজরুল লিখেছেন - খেয়ে খেয়ে গোস্ত রুটি তো খুব/হয়েছো খোদার খাসি ওরে বেকুব/নিজেদের দাও কোরবানি/বেঁচে যাবে তুমি, বাঁচিবে দ্বীন/দাস-ইসলাম হবে স্বাধীন’ ... ‘দিওনাকো পশু কোরবানি/বিফল হবেরে সবখানি/মনের পশুরে করো জবাই/পশুরাও বাঁচে-বাঁচে সবাই

সুলতান বাবর তার পুত্র হুমায়ুনের জন্য এক উপদেশ লিপিকায় লিখে যান - তোমার প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ, তুমি গোহত্যা বর্জন করবে; কেননা ভারতবাসীদের অন্তর জয় করবার এই হচ্ছে সহজ পন্থা আর তোমার এই উদারতার পরিচয় পেলে দেশের প্রজাপুঞ্জ তোমার একান্ত ভক্ত এবং অনুরক্ত হয়ে পড়বে তুমি কোন জাতির বা ধর্মের মন্দির এবং ধর্মালয়ের কখনও কোন ক্ষতি করো না ন্যায়বিচার করবে, কেননা তাহলে প্রজাদের নিয়ে তুমি সুখে থাকবে, আর প্রজারাও তোমার শাসনে সুখে থাকবে ইসলাম সমপ্রসারণের শ্রেষ্ঠতর উপায় হচ্ছে দয়ার তরবারি, অত্যাচারের তরবারি নয় শিয়া এবং সুন্নিদের তর্কাতর্কি এবং কলহ-কোন্দলের মধ্যে থাকবে না এই বিসম্বাদই হচ্ছে ইসলামের দুর্বলতা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রজাদের সেভাবে মিলিত এবং সংমিশ্রিত করবে, যেভাবে - জল, বায়ু, অগ্নি এবং মৃত্তিকা এ চারটি উপকরণ সংমিশ্রিত হয়ে থাকে

সম্রাট বাবর এবং হুমায়ুনের সময় এদেশে পশু জবাই উৎসব হতো না ঐতিহাসিকদের মতে আমাদের দেশের বিত্তবানরা অসুস্থতার কারণে কিংবা অন্য কোন কারণে হজে যেতে না পারলে পশু জবাই করতেন কিন্তু কালের প্রবাহে এটা গোটা সমাজে বিস্তার লাভ করেছে ঘরে ঘরে পশু জবাইয়ের রীতি রসুল (সা.)- এঁর সময়ে আরবেও প্রচলিত ছিল না জানা যায়, গোটা বনী হাশেম গোত্রের পক্ষ থেকে রসুল (সা.) একা একটি পশু জবাই করতেন তাঁরই অনুসরণে ব্রুনাই দারুস সালামের সুলতান সমগ্র ব্রুনাইবাসীর পক্ষ থেকে ঈদ-উল-আযহার দিনে প্রতিবছর একটি মাত্র পশু জবাই করে থাকেন মালয়েশিয়ার মুসলিমগণ জীবনে একবার পশু জবাই করে বর্তমানে সৌদি আরবেও হজের সময় একটি নির্দিষ্ট স্থানে পশু জবাই হয়ে থাকে আমাদের দেশের মতো রাস্তা-ঘাটে আরব দেশব্যাপী পশু জবাই করা হয় না বাংলাদেশে যেভাবে কোরবানির নামে পশু জবাই করা হয় পৃথিবীর আর কোন দেশেই সেভাবে তা করা হয় না

বাংলাদেশের মানুষের জন্য গরু একটি অর্র্থকরি ও উপকারী গৃহপালিত পশু মানুষ গরুর গোশত খেতে পারে, চামড়া দিয়ে পরিধান তৈরি করতে পারে, গরুর হাড়ও নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করতে পারে এতে কোন বাধা নেই কিন্তু কুরআনের বাধা আছে অপচয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করা সুস্পষ্ট অপচয় একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক সুস্থ মানুষের জন্য দৈনিক ৫০ গ্রাম আমিষ খাদ্য গ্রহণ করাই যথেষ্ট কিন্তু ঈদ-উল-আযহার দিন গুলোতে অনেকেই প্রতিদিন এক/দেড় কেজি গোশত ভক্ষণ করে এভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করা কি সুস্পষ্ট অপচয় নয়? এই অপচয়কারী কি শয়তানের ভাই হয় না? একদিনে, একই সময়ে সারা দেশব্যাপী যেভাবে পশু জবাই করা হচ্ছে তা প্রাকৃতিক বিধিরও লঙ্ঘন বটে প্রকৃতিতে খাদ্য ও খাদকের সম্পর্ক বিদ্যমান কিন্তু কোন জীব-জন্তুকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রাণী হত্যা করতে দেখা যায় না একই সময়ে সারা দেশব্যাপী বিপুল সংখ্যক পশু জবাইয়ের ফলে একদিকে ডাক্তার ও ঔষধ বিক্রেতাদের বাড়তি উপার্জন হয়, অন্যদিকে, লাভবান হন ডিপ ফ্রিজের ব্যবসীয়ারা এ ছাড়া আর কোন্‌ পুণ্য সাধিত হয় তা ভেবে দেখা দরকার

বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি পরিবার এর মধ্যে প্রায় ৫০ লক্ষ পরিবার ঈদ-উল-আযহায় পশু জবাই করে এই বিপুল পরিমাণ পশুর অধিকাংশই ভারত থেকে চোরাচালানির মাধ্যমে আমদানী করা হয় বৈধ পথে আমদানী হয় মাত্র পাঁচ লাখ পশু প্রশ্ন হচ্ছে যে কর্ম অবৈধ ব্যবসাকে উৎসাহিত করে সে কর্মে কি কোন ধর্ম থাকতে পারে?’ প্রতিটি পরিবার গড়ে ১০ হাজার টাকা পশু জবাইয়ের নিমিত্তে খরচ করলেও ৫০ লক্ষ পরিবার মোট ৫ হাজার কোটি টাকা মূল্যের পশু জবাই করে পক্ষান্তরে, জাতি হিসেবে আমরা ঋণগ্রস্ত মাথা পিছু আমাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কোরবানির নামে পশু জবাই করা কতটা কুরআন সম্মত তাও ভেবে দেখা দরকার বাংলাদেশের মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে উদ্বুদ্ধ করে সমপরিমাণ অর্থ পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করতে পারলে আগামী এক যুগের মধ্যে বাংলাদেশ ঋণমুক্ত হবে এবং পৃথিবীর অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে হযরত বিল্লাল (রা.) -এঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমরা আমাদের পশু জবাই এর অর্থ যদি কোন দরিদ্রকে দান করি, কিংবা তাকে লালন-পালন করার জন্য একটা বকনা বাছুর উপহার দেই, তাহলে সে একজন সক্ষম ও উপার্জনক্ষম ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে রাষ্ট্র যেহেতু এখনো পর্যন্ত সম্মিলিত কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না সেহেতু সামাজিক দায়িত্ব বোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবতার নিরিখে এমন একটা উদ্যোগ নেয়াই উত্তম হবে

পুঞ্জিভূত অন্ধকার আজ আচ্ছন্ন করেছে মানুষের মন-মগজ, চিন্তা-চেতনা একদিন জাহেলিয়াতের অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ইসলাম যে গৌরব অর্জন করেছিল আজ তার চেয়েও গভীর অন্ধকার একে আচ্ছাদিত করেছে মেঘ আর কতকাল আড়াল করে রাখবে সূর্যকে? মেঘের আবরণ ভেদ করে সত্য উন্মোচিত হবে সূর্যের মতোইতোমরা হীনবল হয়ো না, উদ্যম হারিয়ো না এবং সন্ধির প্রস্তাব করো না, আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন, বিজয় তোমাদের হবেই’ (৪৭ : ৩৫) মানুষ ফিরে আসবে সত্য ধর্মে, অগ্রসর হবে শান্তি ও কল্যাণের দিকে

হাইয়্যা আলাল ফালাহহাইয়্যা আলাল ফালাহকল্যাণের জন্য এসোকল্যাণের জন্য এসো ভুল ভাঙাবার যাত্রা হলো শুরু।         

                                

 

শাহ্‌ সূফী ড. এমদাদুল হক

তত্ত্বাবধায়ক, কাজল ডাঙ্গা আস্তানা শরীফ