ধারাবাহিক

শিক্ষিত – বিবেকবান মানুষ ধর্ম ও রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে!

সংলাপ ॥ ধর্মকে সব মানুষের প্রধান শত্রু জ্ঞান করা কিংবা সবকিছুর জন্য ধর্মকে অপরাধী সাব্যস্ত করা কতটা সংগত? ধর্মই বরং মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দের চেতনার সঞ্চার করেছে। ভগবান বা গড বা আল্লাহ্ নামের আড়ালে কোনও এক অদৃশ্য মহাশক্তি মান্যতা পেয়েছে বিভিন্ন সমাজে। আর এই সর্বশক্তিমানের নির্দেশ হিসাবে প্রতিটি সমাজ থেকে যা প্রচারিত হয়েছে, তার মূল সুরটি অভিন্ন-নিজে বাঁচো অন্যকেও বাঁচতে সাহায্য করো। সকলের জীবন ও বৃদ্ধির মন্ত্রই শেখায় প্রতিটি ধর্ম-যা মামুলি কোনও সম্প্রদায় বিশেষের পক্ষ নেয় না কিংবা তাকে ঘৃণাও করে না। এই ধর্মবোধই শিখিয়েছে আমরা প্রত্যেকে সেই মহাশক্তির অংশ, তাঁরই সন্তান; আমাদের কেউ ছোট বা বড় নই। বেশিরভাগ মানুষই ধর্মভীরু, ভয় পান ¯্রষ্টাকে। সু আর কু দু’রকম চিন্তাকে একসঙ্গে নিয়েই চলা। কু-ভাব যাঁর যত বেশি নিয়ন্ত্রণে তিনি তত ‘ভালো মানুষ’। এই অত্যন্ত কঠিন কাজটি হাসিল করার জন্য সর্বশক্তিমানের প্রতি ভয়-ভক্তি ভালোবাসার বিকল্প কি?

তারপরও ধর্ম প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে! বিশ্বজুড়ে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে মর্মান্তিক হানাহানি দেখেই কিছু মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে এত বিতৃষ্ণা। সেখানেও প্রশ্ন যৌক্তিকতার।

একটি স্কুল থেকে দশ বছরে দশ হাজার জন পাশ করে বেরিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই সৎভাবে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করছেন। আবার দুর্ভাগ্যক্রমে ভবিষ্যৎ-সমাজ এমন দশজনকে পেয়েছে যারা ঘুষখোর, অসৎ রাজনীতিক, রিগিং মাস্টার, চাঁদাবাজ, জালিয়াত, ডাকাত, বর্ণবিদ্বেষী, মাতৃহন্তা, খুনি, ধর্ষক প্রভৃতি। সামগ্রিক বিচারে ওই স্কুলটি সম্পর্কে আমাদের কি মূল্যায়ণ হওয়া উচিত? শতাংশের হিসাবে নগণ্য ওই দশজনকে দেখেই স্কুলটিকে কুশিক্ষা দানের আখড়া বলে দেব? না। কারণ, তাতে সত্যেরই অপলাপ হবে। শুধু ওদেরকে দেখে স্কুলশিক্ষা নিষিদ্ধ করার সুপারিশও নিশ্চয় সুস্থ চিন্তা নয়। ঠিক এমনিভাবেই বোঝা দরকার যে, যারা সাধারণ মানুষকে দলিত নিগ্রহ করছে, অন্যের ধর্মস্থান ভাঙছে, অপবিত্র করছে, ‘বিধর্মী’ আখ্যা দিয়ে নিরপরাধ নারী-পুরুষদের ক্ষতি করছে তারা কোনও অর্থেই ধর্ম অনুসারী নয়। যে ধর্মেরই নামে এমন অন্যায় চলুক তা অবশ্যই ধর্মসম্মত নয়। সভ্য নাগরিকমাত্রই জানেন যে বেদ, উপনিষদ, গীতা, ত্রিপিটক, কুরআন, বাইবেল, গ্রন্থসমূহ অন্যকে ঘৃণা বা আঘাত করার শিক্ষা দেয়নি। বলেনি আলোর দিকে পিছন ফিরে থেকে অন্ধকার অন্ধকার বলে চেঁচাতে। প্রতিটি ধর্মের সার কথা হলো সব মানুষকে ভালোবাসো, তা পরমেশ্বর পর্যন্ত পৌঁছাবে, তুমি উজ্জ্বলতর আলোর দিকে এগুতে থাকবে।

তবু দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ধর্মের কতিপয় মানুষ নিজের ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নামে অন্যের ধর্মকে, সম্প্রদায়কে, ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্মমভাবে আঘাত করে চলেছে। ভাবখানা এই, অন্যের মা-বাবাকে হেয় করা গেলে তবেই নিজের মা-বাবাকে বড় বলে প্রমাণ করা যাবে! এরা আসলে যে-কোনও ধর্মেই অন্তর্ভুক্ত হবার অযোগ্য। এরপরও কি বলবেন? এইসব কুসন্তানকে দেখেই ধর্মের রূপ খুঁজবেন!

উপলব্ধি করার আরও একটি বিষয় হলো-ধর্মের নামে এই ধরনের ভ্রষ্টাচারীরা সংখ্যায় কিন্তু নগণ্য। তবু মনে হয় যেন তারাই সবচেয়ে শক্তিশালী, ইচ্ছে করলে সভ্য সমাজটিকে ছারখার করে দিতে পারে। এর কারণ বোধহয় ধর্ম সম্পর্কে তারা ঘৃণা, বিতৃষ্ণা ও ভয় ভাবটি জাগিয়ে দিতে পেরেছে শিক্ষিত বিবেকবান মানুষের মনে। একে একে শিক্ষিত, বিবেকবান মানুষ ধর্মচর্চার পথটি পরিহার করতে চাইছেন। তারা ভুলেই যেতে বসেছেন যে, প্রতিটি ধর্মই আমাদের সকলের গর্বের উত্তরাধিকার। নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও নারীর অধিকারকে মান্যতা দেয়া সহজ হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের নামে এখনও যেসব সামাজিক ব্যাধি রয়ে গিয়েছে, যা সমস্ত সচেতন মানুষকে মনোকষ্ট দিচ্ছে, সেগুলোও দূর করার প্রয়োজনে ধর্মের মূল্যবোধগুলো বড় হাতিয়ার হতে পারে। তপস্বিনী রাবেয়াও সব ধর্মে নরনারীর কাছে নমস্য। ভারতের স্বাধীনতা এসেছে ধর্মভাবকেই আশ্রয় করে আর ভারতবর্ষ টুকরো হয়ে গিয়েছে ধর্মের বিকৃতির কুঠারাঘাতে। আমাদের চিন্তাজগৎটিও সুস্থ রাখার দায়িত্বটি পালন করে চলেছে ধর্ম। সাহিত্য, চিত্র, ভাস্কর্য, সঙ্গীত, নৃত্য, বাদ্য, তীর্থ, পর্যটন প্রভৃতি নিয়ে যে সুবৃহৎ সংস্কৃতি তাকে কি কল্পনাও করা যায় ধর্মকে পাশ কাটিয়ে! বিশ্ব-অর্থনীতিও অনেকাংশে ধর্ম দ্বারা পরিপুষ্ট। এক কথায়, ধর্মই হল সমস্ত সভ্যতার প্রাণ। সমাজ-শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা যারা রাখেন, তারা ভয়ে স্বেচ্ছায় নিরাপদ দূরত্বে সরে থাকার যা ফল হবার এখন তাই হচ্ছে। ধর্মকে বাদ দিয়ে যে কোনও সমাজই চলতে পারবে না তা প্রমাণিত সত্য। এই প্রমাণ সমস্ত সভ্য দেশ বারবার পেয়েছে। ধর্মকে এড়িয়ে শান্তির সন্ধান করার চেষ্টা হয়েছে বিস্তর। প্রচেষ্টাটি জারি আছে এখনও। ধর্মকে অচ্ছুৎ গণ্য করাটা বিভিন্ন প্রজন্মে শিক্ষিতজনদের একাংশের কাছে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপারে থাকা মানেই টিকি-তিলকধারী কিংবা দাড়িওয়ালা পিছিয়ে-পড়া লোক বলে প্রতিপন্ন হয়ে যাওয়ার ভয়টা তাদের পেয়ে বসে। আর এই বিরাট শূন্যস্থানে জাঁকিয়ে বসার মওকা পায় কিছু ধান্দাবাজ-যারা প্রাচীন ধর্মগুলোর নামে অনেক অনাচার করেছে। এইসব ধর্মের বিভিন্ন তত্ত্ব তারা তাদের মতো করে ব্যাখ্যাসহ প্রচার করছে। যার আসল লক্ষ্য, অজ্ঞদের রাজত্বে প-িত সেজে বসার সুযোগ গ্রহণ। যার নেপথ্যে কাজ করে যোগ্যতা ছাড়াই ক্ষমতা, অর্থ, বিত্ত, সম্মান, প্রতিপত্তি ভোগের লালসা।

যে-দেশে অগণিত শিশু দুধের অভাবে মরছে সেখানেই ধর্মীয় উৎসবের নামে চাঁদার জুলুম ও নানাবিধ উৎকট প্রতিযোগিতাও এই দেশে ধর্মভাবের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। ওইসঙ্গে জুটেছে ধর্মের নামে উন্মাদনা, ইসলামের পবিত্রতা রক্ষার নামে বিশ্বজুড়ে ত্রাসসৃষ্টি। ভারত এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত কিংবা জাতীয় স্তোস্ত্রের মধ্যে ইসলাম-বিরোধী গন্ধ খোঁজার পালায় ইতি পড়েনি। সবটাই ধান্দাবাজির রকমফের। অন্যদের ঘৃণা ও অবজ্ঞা করার অপরাধ সংগঠন ছাড়া এমনটা হাসিল হওয়া যে দুষ্কর। এই বিভেদজ্ঞান থেকেই এই উপমহাদেশে অনেক মুক্তমনা নাগরিককে চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে এবং শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার অপরাধে মানসম্মান বিসর্জনের পরও অনেককে মরতে হচ্ছে ধনে-প্রাণেও। সব দেশেই একের পর এক তৈরি হয়েছে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেনেওয়ালা রাজনৈতিক দল। জাতপাতভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলোর সৃষ্টির নেপথ্যশক্তিও একই।  অতএব ধর্মকে বাদ দিয়ে এগুনোর যে প্রচেষ্টা তা একটি চতুষ্পদী প্রাণীর লেজ সোজা করার মতোই এক নিষ্ফলা গোঁয়ার্তুমি। যদি প্রকৃত শিক্ষিত নারী-পুরুষরা ধর্মশিক্ষা করতেন, যতœ নিয়ে সাধারণ মানুষকে শেখাতেন সব ধর্মের অমৃত কথাগুলো, বোঝাতেন ধর্মের নামে কোথায় কি বুজরুকি চলছে, বিকৃতি ঘটছে, তাহলে স্বাভাবিক নিয়মেই দুর্বল হয়ে যেত ধর্মধ্বজীদের অনৃত্য ভাষণ। মানুষ বুঝত সবধর্মের সারকথা অভিন্ন ‘মরো না মেরো না, পারো তো মৃত্যুকে ঠেকাও। ধর্মাচরণ প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত অধিকার, যে অধিকার অন্যের ভাবনা-চিন্তা, পছন্দ-অপছন্দের উপর আধিপত্য কামনা করে না। এমনকী যারা যে-কোনও প্রকার ধর্মবিশ্বাস থেকে শতহস্ত দূরে থাকতে চান একজন ধার্মিকের নিকট তাঁরাও সমান শ্রদ্ধেয়। মানুষের এমন উপলব্ধি যখন জোরালো হবে তখন কোনও দল ও সরকার, কোনও সম্প্রদায়কেই বাড়তি খাতির করার মধ্যে লাভালাভ খুঁজে পাবে না কিংবা সুযোগ পাবে না কাউকেই অবহেলা করার। কথাটি সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু দুই তরফের পক্ষেই সত্য হয়ে দেখা দেবে। তখন সংখ্যাগুরুর অন্যায় আধিপত্য এবং সংখ্যালঘু তোষণের মতো দুটি নিন্দাই অন্তর্হিত হতে পারবে। যে-কোনও প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখারই নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হবেন সমস্ত রাষ্ট্রনেতা। ধর্মকে ভোট হাতানোর কিংবা অন্যভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগের হাতিয়ার বানাবার কুফল ভোগ করছে সমগ্র উপমহাদেশ। আমরা যদি এই হীন উদ্দেশ্যে পরিচালিত না হতাম তবে মাটির পৃথিবীতেই স্বর্গ নেমে আসত।

আমরা যেখানে সংখ্যায় কম বা সংখ্যালঘু শুধু সেখানেই ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিতে সোচ্চার যেন না হই। প্রতিটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকরা যতক্ষণ না সেই দেশটি সবার জন্য সমান বলে অন্তর থেকে চাইবেন, ততক্ষণ ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি অর্থহীন। কোনও একটি ধর্মকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’-এর মর্যাদা দানও অন্যসকল ধর্মকে পিছনের সারিতে পাঠানোর হীনতায় সরকারি সীলমোহর।

একটি রাষ্ট্রও যদি এই প্রশ্নে অনুদার রয়ে যায় তবে সেই ব্যাধির সহজ সংক্রমণ ঘটে প্রতিবেশী রাষ্ট্রেও। সেখানকার বলিষ্ঠ অনুদার শ্রেণির কাছে যা ভয়ংকর লোভনীয় প্ররোচনা। এমন পরিবেশ তৈরি

হলে পরে কাউকে গোমাংস রাখা কিংবা খাওয়ার অপরাধে মরতে হবে না। শূকরের মাংস কিংবা কাঁকড়ায় যিনি অমৃতের স্বাদ পান, তাঁকেও তা গ্রহণের জন্য কোনও ভূভাগে চোর-পুলিশ খেলায় নাম লেখাতে হবে না। কাউকে মরতে হবে না মূর্তিপূজায় বিশ্বাস করার কারণে কিংবা হেনস্তা হতে হবে না রমজান মাসে ইফতারের আগে খাদ্যগ্রহণ করার অপরাধে। হিজাব

পরার অপরাধে কারও বিমানে ভ্রমণের অধিকার ক্ষুন্ন হবে না কিংবা চাকরি যাবে না। কাউকে

‘যবন’ কিংবা ‘মালাউন’ শব্দে অপমানিত হতে হবে না। হিন্দু কিংবা মুসলমান হওয়ার অপরাধে কোনও দেশেই কারও পিতৃপুরুষের পবিত্র ভিটে ‘শত্রুসম্পত্তি’ আখ্যা পাবে না। বিতর্কিত ধর্মস্থানগুলো নিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য সমাধানসূত্র পাওয়াও সম্ভব হবে। হিন্দুদের মধ্যে এমনকি অন্যভাবে ভেদবুদ্ধি রয়েছে মুসলমান, খ্রিস্টান সমাজেও। কাঙ্খিত পরিস্থিতিতে সমস্ত ভেদবুদ্ধি কমানো, এমনকী ধীরে ধীরে দূরীভূত হওয়ারও আশা জাগবে। ধর্ম এবং রাজনীতি আজ পরস্পর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত (রিসিপ্রোকাল)। আর এই দু’টিই ক্রমশ বিপজ্জনক হাতে চলে যাচ্ছে। বিপথগামীদের কব্জা থেকে ধর্ম ও রাজনীতিকে মুক্ত করাটাই এই সময়ের চ্যালেঞ্জ। এতে সাফল্য চাইলে এই দুই ক্ষেত্রেই প্রকৃত শিক্ষিত (নিছক উচ্চ ডিগ্রিধারীদের কথা বলা হচ্ছে না) ও বিবেকবান মানুষের যোগদান জরুরি। এই প্রচেষ্টা সফল হলে প্রমাণিত হবে যে, ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করেনি, মানুষে মানুষে শত্রুতার সম্পর্কও গড়ে দেয়নি; ধর্মচ্যুত হয়েই সব হারাচ্ছি আমরা।

বাংলার কথা কই – ১২

॥ হাসান মাহমুদ ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)

তারপর পেট যখন পিঠে ঠেকল আর পিঠ ঠেকল দেয়ালে, মরিয়া হয়ে একবার শেষ চেষ্টা করল অর্ধমৃত নীলচাষি। ঠিক সেই সময়টাতে নারকেলবেড়িয়ায় তীতুমীরের প্রাথমিক দু’টো সামরিক জয়লাভে উৎসাহ পেল নীলবিদ্রোহ। নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন হাজী শরিয়তউল্লাহ্ পুত্র দুদু মিয়া, দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ ঘোষ। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত নেতৃত্বে চাষার লাঙল চালানো কঠিন হাতে উঠে এল সড়কি বল্লম। তাই দেখে পিতৃনাম ভুলে সাহেবগিরি পেছনে ফেলে উল্কাবেগে কলকাতায় ছুটলেন নীলকর সাহেবরা। সামরিক বাহিনীর কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লেন। নায়েব-গোমস্তারা একাত্তরের আলবদরের মতো সুড়ুৎ করে গর্তে ঢুকে পড়ল। দাড়িওয়ালারা দাড়ি কেটে ধুতিতে, আর ধুতিওয়ালারা লুঙ্গি পরে দাড়িতে লুকোল। কিছু খুনখারাপিও হল।

বাংলা সংস্কৃতির পাদপীঠ কলকাতায় তখনো চিরকালের মতোই ফুল পাকি চাঁদ আর প্রেমিকার মুখ নিয়ে বিস্তর ধ্বস্তাধ্বস্তি করছেন কবি লেখকরা। নেতা, পাতিনেতা আর উপনেতারা প্রতিযোগিতামূলকভাবে জিহ্বা দিয়ে প্রভুদের বুটগুলোকে আরো চকচকে করে তুলছেন। আঁতেলরা কচু আলু আদা মিলে ক্বচাল্লাদা কিংবা পাত্রাধার তৈল নাকি তৈলাধার পাত্র তার বিশ্লেষণে খুব ব্যস্ত। শুধু জননীর নিঃশব্দ অশ্রু দেখে না কেউ। জাতির মুখে যে অন্ন তুলে দেয় সেই কৃষকের সশব্দ আর্তনাদ কানে যায় না কারো।

শুনলেন শুধু একজন। এমন কিছু মহাপ্রতিভাবান মহাপন্ডিত নন, নন সুপ্রচুর লেখার লেখক। তবু হাতে তুলে নিলেন কলম। গোর্কির ‘মা’ লেখা হয়েছিল বিপ্লবের পরে – মাতৃহৃদয়ের শাশ্বত আর্তনাদ এখনো ধারণ করে আছে সেটা। ‘নীলদর্পণ’ নাটক লেখা হল পবিবর্তনের পথিকৃৎ হিসেবে। লেখক দীনবন্ধু মিত্র নামের মান রাখলেন। দীনের বন্ধু হলেন, মিত্র হলেন। ঘাড় ধরে কলকাতার পুরো বাঙালি সমাজটাকে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের আঙ্গিনায়। ১৮৬১ সালে ‘নীলদর্পণ’ নাটক অভিনীত হলো কলকাতায়। আঁতকে উঠল কলকাতা। নীলের দর্পণে কৃষকের ভগ্ন মেরুদ- আর নিজের কদাকার চেহারাটা ফুটে উঠল। বিচলিত হলেন আরেকজন। সদা চামড়ার লং সাহেব। পাদ্রী মানুষ। নিজের জাতের শয়তানী চেহারা দেখে আর থাকতে পারলেন না। ‘নীলদর্পণ’ ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছুড়ে দিলেন ল-নের জনতা আর মন্ত্রীসভার মুখের উপর। মুচকি হাসিটি মনে লুকিয়ে গম্ভীর মুখে মিটিংয়ে বসল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বড়কর্তারা। বাইরে তখন জনতা আর পত্রিকাগুলো প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে নীলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। সব জাতেই ভালো-মন্দ মানুষ আছে।

আশ্চর্য এই জাত। মহারাজ নন্দকুমারের অন্যায় ফাঁসির পর এরাই উল্লাসে ফেটে পড়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার পর এরাই পদকভূষিত করেছে গণহত্যাকারী জেনারেল ডায়ারকে। সাইপ্রাসে শুধু দৃষ্টি-সুখের উল্লাসে শিুশুহত্যার পর এরাই বরফ থেকে বিড়াল শিশু বাঁচানোর জন্য অস্থির হয়েছে (মধ্যরাতের অশ্বারোহী, ফয়েজ আহমেদ)। মিটিংয়ে সদস্যরা যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। সর্বনাশ! নীলের নামে একি হচ্ছে বাংলায়! শুধু চাষ করারই তো কথা ছিল, অত্যাচার করার তো কথা ছিল না! না না এ হতেই পারে না। সাধারণ কৃষকের মঙ্গলইতো সরকারের দায়িত্ব। কাজেই নীলচাষ বন্ধ ঘোষণা করা হল।

ধন্য ধন্য পড়ে গেল দীনবন্ধু মিত্রের নামে যা অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য ছিল। ওদিকে মিটিং শেষে মুচকি হেসে গবেষণাগারের রিপোর্টটা দেরাজ বন্ধ করলেন দপ্তর সম্পাদক। রাসায়নিক নীল আবিষ্কার হয়ে গেছে। দামও খুব সস্তা। কাজেই, তুঁতের আর দরকারই নেই।

নীলাম্বু জলধিমণ্ডিত সসাদরা ধরিত্রী। নীলাঞ্জনা ঢেউ খেলে তার সর্ব অঙ্গে নিরন্তর। সতৃষ্ণ মাতৃমুখের মতো নিঃশব্দ নিথরে, নিস্পন্দ নীরবে ধরণীর মুখের ওপরে নুয়ে থাকে নিঃসীম নীলাকাশ। নীল পাপড়ির ফুল, নীল পালকের পাখি আর নীলাভ মাছের উৎসবে প্রকৃতি ভরপুর। নীলাদ্রী বরফের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে যায় নীলমেঘ। নীলনবঘনে রবীন্দ্রকাব্যের বর্ষণে আচ্ছন্ন হয়ে আসে নদীর ওপারের গ্রাম। শরীরের, মনের কষ্টে নীল হয়ে মানুষের মুখ। সমুদ্রমন্থনের গরল কণ্ঠে ধরে নীলকণ্ঠ হন মহাদেব। সাপে কাটা মৃতদেহ নীল হয়ে পড়ে থাকে। নীলকুঠি থেকে ভেসে আসা আর্তনাদের স্মৃতি আজো বাংলার পথে-প্রান্তরে হাহাকার করে ওঠে বাউকুড়ানির বাতাসে। নীলের নীলমণিহার কণ্ঠে ধারণ করে স্তব্ধ হয়ে থাকে বাংলার ইতিহাস। “মিথ্যাই, – নীল খোঁজা মন চায় উপমা। নেই, – নেই।”

হেমন্তের দরাজ গলায় বেজে ওঠেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

না, এ নীলের উপমা সত্যিই নেই কোথাও ॥ (চলবে)

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু

সত্যবাণী

Nazrul

ইসলাম জাগো! মুসলিম জাগো! আল্লাহ্ তোমার একমাত্র উপাস্য, কোরআন তোমার সেই ধর্মের, সেই উপাসনার মহাবাণী, – সত্য তোমার ভূষণ, সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা তোমার লক্ষ্য, – তুমি জাগো! মুক্ত বিশ্বের বন্য শিশু তুমি, তোমায় পোষ মানায় কে? দুরন্ত চঞ্চলতা, দুর্দমনীয় বেগ, ছায়ানটের নৃত্য-রাগ তোমার রক্তে, তোমাকে থামায় কে? উষ্ণ তোমার খুন, মস্ত তোমার জিগর, দারাজ তোমার দিল, তোমাকে রুখে কে?  পাষাণ কপাট তোমার বক্ষ, লৌহ তোমার পঞ্জর, অজেয় তোমার বাহু – তোমায় মারে কে? জন্ম তোমার আরবের মহামরুতে, প্রাণ প্রতিষ্ঠা তোমার পর্বত গুহায়, উদাত্ত তোমার বিপুল বাণীর প্রথম উদ্বোধন ‘কোহ-ই তুরের’ নাঙ্গা শিখরে, – তুমি অমর, তুমি চির জাগ্রত। ‘আল্লাহু আকবর’ তোমার ওঙ্কার, আলি তোমার হুঙ্কার, তুমি অজেয়! বীর তুমি, তোমার চিরন্তন মুক্তি, শাশ্বত বন্ধনহীনতা, ‘আজাদীর’ কথা ভুলায় কে? তোমার অদম্য শক্তি, দুর্দমনীয় সাহস, তোমার বুকে খঞ্জর চালায় কে? ইসলাম ঘুমাইবার ধর্ম নয়, মুসলিম শির নত করিবার জাতি নয়। তোমার আদিম জন্মদিন হইতে তুমি বুক ফুলাইয়া, শির উচ্চ করিয়া দুর্লংঘ্য, মহা পর্বতের মত দাঁড়াইয়া আছ, তোমার গগনচুম্বী শিখরে আকাশ-ভরা তারার আলো, অর্ধচন্দ্রের প্রদীপ্ত প্রশান্তি জ্যোতি – তোমার সে মহাগৌরবের কথা বিশ্বে চির-মহিমান্বিত। মনে পড়ে কি, তোমার সেই রক্ত-পতাকা যাহা বিশ্বের সিংহদ্বারে উড়িয়াছিল, তোমার সেই শক্তি যাহা দুনিয়া  মথিত আলোড়িত করিয়াছিল? বল বীর, বল আজ তোমার সে শক্তি কোথায়? বল ভীরু, তোমার সে প্রচন্ড উগ্র মহাশক্তিকে কে পদানত করিল? উত্তর দাও। তোমায় আমি আল্লাহ্র নামে আহবান করিতেছি, উত্তর দাও! তোমার অপমান কেহ কখনো করিতে পারে নাই, ইসলাম অবমাননা সহে নাই। তুমি সত্য, ইসলাম সত্য, তোমার-আমার বা ইসলামের অপমান যে সত্যের অপমান। তাহা যে সত্য করে, সে ভীরু – সে ক্ষুদ্র। যেদিন তুমি তোমার উদারবাণী মহাশিক্ষা ভুলিয়া স্বাধীনতার বদলে অধীনতার ছায়া মাড়াইতে গিয়াছ সেই দিনই তোমার শিরে মিথ্যা, দুশমনের ভীম প্রহরণ বাজিয়াছে। ইসলাম এক মহান আল্লাহ্ ব্যতীত আর কাহারো নিকট শির নোয়ায় না। তোমার চির-উচ্চ চির-অটল ঋজু সেই শির আনত করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাই আজ তুমি আঘাত পাইয়াছ, তাই তোমার বক্ষে বজ্রবেদন, শক্তিশেল বাজিয়াছে। যদি আঘাতই খাইয়াছ, যদি আজ এমন করিয়া গভীর বেদনাই তোমার মর্মে বাজিয়াছে, যদি এই প্রথম অবমানিত হইয়াছ, তবে তোমার লাঞ্ছিত সত্য, ক্ষুব্ধ শক্তি আবার উত্তাল সমুদ্র-তরঙ্গের মত উদ্বেলিত হইয়া উঠুক। বল, ইসলাম ভিক্ষা করে না, যাঞা করে না। বল, দুর্বলতা আমাদের ধর্মে নাই। বল, আমাদের প্রাপ্য আমাদের মুক্তি আমরা নিজের শক্তিতে লাভ করিব!

… তোমার বাঁধে ভাঙ্গন ধরিয়াছে, তোমাকে ইহা হইতে রক্ষা পাইতে হইবে। তাই আজ আমরা আমাদের সারা বিশ্বের লাঞ্ছিত বিক্ষুব্ধ শক্তি লইয়া এই মুক্ত মহা-গগন-তলে দাঁড়াইয়া বলিতে চাই – ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন’! এই মুক্ত গগনতল তোমার মহাতীর্থস্থান – আরাফাতের ময়দান অপেক্ষাও পবিত্র। এইখানে গৃহহীন পথহারা নিপীড়িত মুসলিম সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব পাইয়াছে, ঈদের দিনের মত পরস্পর পরস্পরকে আলিঙ্গন করিয়াছে, বুকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়াছে। এই উন্মুক্ত প্রান্তরে দাঁড়াইয়া মুসলিম, আবার বল, ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’। যদিও তুমি সর্বস্বহারা হও, কোথাও তোমার মাথা গুঁজিবার ঠাই না থাকে, কুছ পরোয়া নেই, তোমার মাথা নত করিও না। আবার সকলি পাইবে। মুসলিম হীন, এ ঘৃণার কথা শুনিবার পূর্বে কর্ণরন্ধ্রে সিসা ঢালিয়া বধির হইয়া যাও! তোমাদের এই ‘ইখওয়াৎ’কে কেন্দ্র করিয়া আমাদের অন্তরের সত্য স্বাধীন শক্তিকে যেন কোনদিন বিসর্জন না দিই। তোমার বীর ভাইগুলি ঐ যে তোমার দক্ষিণ পার্শ্বে ইসলামের এই শাশ্বত সত্য রক্ষার জন্য হেলায় প্রাণ বিসর্জন দিতেছে, সেই শহীদায়েন নব্য তুর্কি-তরুণদের দেখ, আর গৌরবে তোমার বক্ষ ভরিয়া উঠুক। তাহাদের পানে তাকাও, তাহাদের অস্ত্র-ঝঞ্চনা শোনে – তাহাদের হুঙ্কারে তোমার হিম-শীতল রক্ত উষ্ণ হইয়া বহিয়া যাক তোমার শিরায় শিরায়। মেঘ-মুক্ত প্রাবৃট-মধ্যাহ্নের রক্ত ভাস্কর তোমার বিপুল ললাটের ভাস্কর রাজটিকা হউক! তুমি অমর হও! তুমি স্বাধীন হও! তোমার জয় হউক!

ধর্ম ও কর্ম

যে স্বধর্মে পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তার কর্ম-ক্ষেত্রে প্রবেশের কোনো অধিকার নাই। আজ যাঁরা দেশের কর্মী বলে খ্যাত, তাঁদের অনেকেই অনাধিকারী বলেই ক্ষেত্রে লাঙলই চালিয়ে গেলেন, ফসল আর ফলল না। সামান্য যা ফসল ফল্ল, তাকে রক্ষা করার প্রহরী, সৈন্য পেলেন না। যিনি নিজে স্বাধীন হলেন না, তিনি দেশের, জাতির স্বাধীনতা আনবেন কেমন করে?  যাঁর নিজের লোভ গেল না, যিনি নিজে দিব্য সত্তা লাভ করেননি, তিনি কেমন করে লোভীকে তাড়াবেন, কোন শক্তিতে দৈত্য, অসুর, দানবকে সংহার করবেন? ধর্মভাব মানে এ নয় যে শুধু নামাজ, রোজা, পূজা, উপাসনা নিয়েই থাকবেন। কর্মকে যে ধার্মিক অস্বীকার করলেন, কর্মকে সংসারকে যিনি মায়া বলে বিচার করলেন, কর্ম, সংসার ও মায়ার স্রষ্টার তিনি বিচার করলেন। যিনি একমেবা দ্বিতীয়ম্ যাঁর কোন শরীক নাই, যিনি একমাত্র বিচারক, তাঁর সৃষ্টি বিচার করবে কে? এই পলাতকের শাস্তি সঞ্চিত আছে। তবে মাঝে মাঝে পালিয়ে যেতে হয়, একেবারে পগার পার হয়ে গেলে চলবে না। সমুদ্রের জল আকাশে পালিয়ে যায় বলেই বৃষ্টিধারা হয়ে ঝরে পড়ে।

নবনীরদ পাহাড়ে পালিয়ে যায় বলেই নদী-স্রোত হয়ে ফিরে আসে। এই উপরের দিকে উড়ে যাওয়া – এই উপরের দিকে উড়ে যাওয়া – অর্থাৎ আমাদের পরম প্রভুর ধ্যান করা মানে সময় নষ্ট করা নয়, আমাদেরই না-জানা পূর্ণতাকে স্বীকার করা; আমারই ঘুমন্ত অফুরন্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা। নির্লোভ, নিরহঙ্কার, দ্বন্দ্বাতীত হলে – লোভ, অহংকার ও দ্বন্দ্বের মাঝে নেমে অবিচলিত শান্ত চিত্তে কর্ম করা যায়। প্রশংসা, জয়ধ্বনি, অভিনন্দন তখন কর্মীকে ফানুসের মত ফাঁপিয়ে তোলে না। নিন্দা, হিংসা, অপমান, পরাজয় তখন কর্মীকে নিরাশ করতে পারে না, তাঁর অটল ধৈর্য ও বিশ্বাসকে টলাতে পারে না। মন্দ-ভাল দুয়ের মধ্যেই ইনি পূর্ণ অভয়চিত্তে বিচরণ করতে পারেন। তসবী অর্থাৎ জপমালা ও তরবারি দুই-ই তখন তাঁর সমান প্রিয় হয়ে ওঠে। সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ তিনগুণের অতীত হয়েও ইনি ঐ তিনগুণে নেমে বিপুল কর্ম করতে পারেন। এই সেনাপতি সাগরের মত কখনো শান্ত, কখনো অশান্ত ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। এরই আহবানে, এরই আকর্ষণে ছুটে  আসে দেশ-দেশান্তর থেকে স্রোতস্বিনী দুর্নিবার অনিরুদ্ধ প্রবাহ নিয়ে।

ত্যাগ ও ভোগ – দু’য়েরই প্রয়োজন আছে জীবনে। যে ভোগের স্বাদ পেল না, তার ত্যাগের সাধ জাগে না। ক্ষুধিত উপবাসী জনগণের মধ্যে এই সেনাপতি, অগ্রনায়ক আগে প্রবল ভোগের তৃষ্ণা জাগান। অবিশ্বাসী নিদ্রাতুর জনগণের বুকে রাজসিক শক্তি জাগিয়ে তাদের তামসিক জড়তা নৈরাশ্যকে দূর করেন। রাজসিক শক্তিকে একমাত্র সাত্ত্বিকী শক্তি নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। এই ভগ্নতন্দ্রা বিপুল গণ-শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করেন যে অগ্রনায়কের কথা বলছি – তিনি।

জনগণের শুধু উর্ধ্বে কথা বললে চলবে না। তাদের বুকে ভাল খাবার, ভাল পরবার উদগ্র তৃষ্ণাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। এই জাগ্রত ক্ষুধিত সিংহ ও সুন্দরবনের বাঘের দল যাতে উৎপাত না করে, তার ভার নেবেন সেই মায়াবী অগ্র-নায়ক। যিনি এই ভীষণ শক্তিকে জাগাবেন, তাকে সংযত করার শক্তি যেন তাঁর থাকে। নৈলে জগৎ আবার পশ্চিমের রাজসিক উন্মত্ততায় রক্ত-পঙ্কিল হয়ে উঠবে। নিজেরাই হানাহানি করে মরবে।

এদের ভোগের ক্ষুধাও জাগাতে হবে, ত্যাগের আনন্দে রসের তৃষ্ণাও জাগাতে হবে।

আমি একবার ‘নিউ মার্কেটে’র পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখি এক ভদ্রলোকের নগ্নবক্ষে যজ্ঞোপবীত, আর দুই হাতের এ হাতে একগোছা রজনীগন্ধা ও আর এক হাতে দুইটি রাম পাখি-মুর্গী। আমার অত্যন্ত আনন্দ হল, তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললামঃ ‘ফেয়ার ও ফাউলের’  এমন ‘কম্বিনেশন’ – সঙ্গতি আর দেখি নাই! ভদ্রলোকও আমায় জড়িয়ে ধরে বললেনঃ ‘নিত্য আপনার হাতে ফুল, পাতে মুরগি পড়ুক’।

মুরগির সাথে রজনীগন্ধার তৃষ্ণাও থাকবে?

বড় ত্যাগ তাঁর জন্য, যিনি সকলকে বড় করবেন। জনগণকে তাই বলে ধর্মের আশ্রয়চ্যুত করবার অধিকার কারুর নেই। এ অধিকারচ্যুত করতে চাইবেন যিনি, তিনি মানবের নিত্য কল্যাণের শান্তির শত্রু। মানুষের অন্ন-বস্ত্রের দুঃখ রাজসিক শক্তি দিতে পারে না। মানুষ পেট ভরে খেয়ে, গা-ভরা বস্ত্র পেয়ে সন্তুষ্ট হয় না, সে চায় প্রেম, আনন্দ, গান, ফুলের গন্ধ, চাঁদের জ্যোস্না। যদি শোকে সান্তনা দিতে না পারেন, কলহ-বিদ্বেষ দূর করে সাম্য আনতে না পারেন, আত্মঘাতী লোভ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে না পারেন, তা হলে তিনি অগ্রনায়ক নন। ধর্ম ও কর্মের যোগসূত্রে যদি মানুষ না বাঁধা পড়ে, তাহলে মানুষকে এমনি চিরদিন কাঁদতে হবে।

নবযুগের সাধনা

যুগে যুগে আদর্শবাদীরাই জগতকে আনন্দে, শান্তিতে ও সাম্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। যাঁহারা বৃহতের চিন্তা করেন, তাঁহারাই পৃথিবীতে বৃহৎ কল্যাণ আনয়ন করেন। ক্ষুদ্রত্বের বন্ধনে বাঁধা থাকিলে জীবন, যৌবন ও কর্মের শক্তি ক্ষুদ্র হইয়া যায়। পুকুরের জল গ্রামের কল্যাণ করে, কিন্তু সংক্রামক রোগের একটি জীবাণু পড়িলেই সে জল দূষিত ও অপেয় হইয়া যায়। কেননা, পুকুরের জলের চারিধারে বন্ধন; তার বিস্তৃতি নাই, গতি নাই, প্রবাহ নাই। নদীর জলেরও চারিধারে বন্ধন, – এক ধারে পাহাড়, এক ধারে সমুদ্র, দুই ধারে কূল। কিন্তু তার বিস্তৃতি আছে, তাই গতি ও প্রবাহ নিত্যসাথী। এই প্রবাহের জন্যই নদীর জলে নিত্য শত রোগের বীজাণু পড়িলেও তাহা অশুদ্ধ হয় না, অব্যবহার্য হয় না। তাই নদী পুকুরের চেয়ে দেশের বৃহৎ কল্যাণ করে। নদীর নিত্য তৃষ্ণা সমুদ্রের দিকে, অসীমের দিকে। অসীম সমুদ্রকে পাইয়াও সীমাবদ্ধ দেশকে সে স্বীকার করে, – তার বক্ষচ্যুত হয় না। আমাদের আদর্শ পরম পূর্ণের ; পরম নিত্যের তৃষ্ণা হইলেও আমরা কর্মচ্যুত হইব না, বৃহৎ কর্ম করিব।

বৃহৎ কর্মের অধিকারী হইতে হইলে, দেশের মানুষের বৃহৎ কল্যাণ আনয়ন করিতে হইলে, বৃহৎ শক্তির আধার হইতে হয়। নিত্য পরম ক্ষমাময় আল্লাহ্র তৃষ্ণা থাকিলে এই বৃহৎ কর্মের অধিকারী হওয়া যায়। নদী সমুদ্রের তৃষ্ণা নিয়ে ছোটে, তাই সমুদ্রকে পায়। সমুদ্রের তৃষ্ণা ছাড়া নদীর অন্য তৃষ্ণা নাই, তবু যাইতে যাইতে তার দুই কূলকে শস্য  শ্যামল, ফুল ফলে ফুল্ল করিয়া যায়; দুই কূলের লোকের সমস্ত অশুদ্ধিকে নিজের দেহে নেয়; তার দুই কূলের আবহাওয়াকে শুদ্ধ রাখে।

আত্মত্যাগী সাধকরাই আনিবেন বন্ধ জীবনে প্রাণশক্তির দুর্জয় প্রবাহ। যাঁহারা নবযুগের ছেলে-মেয়ে, তাঁহারা এই প্রবাহে মুক্ত হইয়া এই প্রবাহ-তরঙ্গকে গগনস্পর্শী করিয়া তুলুন – ইহাই নিপীড়িত মানবাত্মার প্রার্থনা।

(নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত)

চারিদিকে এত পানি চা খাওয়ার পানি নাই

সত্যব্রতী ॥ ‘চারিদিকে এত পানি চা খাওয়ার পানি নাই’ – বাংলার মহান সূফী সাধক খাজা আনোয়ারুল হক-এঁর দিক্ নির্দেশনামূলক বাণী এটি। বাণীটি পর্যবেক্ষণমূলক। পর্যবেক্ষকদের জন্য এটি দারুন খোরাক হিসেবে গণ্য হতে পারে। পর্যবেক্ষণ মানুষকে বদলে দেয়। বাণীটির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। প্রত্যেকটি বাস্তবতা এক একটি সত্যকে প্রকাশ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহান সাধক নৌকায় করে নেত্রকোনার বিশারতী যাবার পথে তাঁর ভক্ত অনুসারীদের উদ্দেশ্যে এ বাণী প্রদান করেছিলেন।

চায়ের উপযোগী পানি অর্থাৎ পানিকে যে পর্যায়ে উন্নীত করলে পানি দিয়ে চা বানানো যায়। সব পানিই পানি কিন্তু পানি মাত্রই চায়ের উপযোগী নয়। পরিস্কারভাবে বললে এর অর্থ দাঁড়ায়- নদী ভরা পানি থাকলেই হবে না, চা খেতে দরকার চায়ের উপযোগী প্রক্রিয়াজাত পানি। দেশ ভরা মানুষ থাকলেই হবে না, মানুষের মতো মানুষ দরকার, কাজের কাজী দরকার। ভক্ত-শিষ্য হলেই হবে না। ভক্তকে ভক্তের মতো, শিষ্যকে শিষ্যের মতো হতে হবে। মানুষ মাত্রই উন্নত, উপযুক্ত, দক্ষ ও যোগ্য মানুষ নয়। হাজার মানুষের ভীড়ে সত্যিকারের সমাজহিতৈষী মানুষ কোথায়। সবাই মানুষ কিন্তু চিহ্নিত করতে গেলে দেখা যাবে মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই, এই মানুষের ভীড়ে আমার সেই মানুষ নাই। আবার এই মানুষে সেই মানুষ আছে। এখানে সাধক একটি বাস্তবতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন এবং উপস্থিত সবাইকে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ-বাস্তবতার প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন।

সাধক বাণীর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সত্যটি অনুসন্ধান করতে হলে নিজের চিন্তন প্রক্রিয়ায় সেটিকে যুক্ত করে বারবার দেখতে হয়। ধারণ-লালন-পালন করতে হয়। প্রচেষ্টায় রত থাকলে সত্য নিজেই সেখানে উপস্থিত হয় সেই সত্যের রূপ দেখাতে। স্বরূপে সাধকবাণী অন্বেষণ পর্যন্ত ব্যাপৃত থাকে বাণীর পরিধি ও ব্যাপকতা। এটি বাণীর বিন্দুধারণ। বাণীর বিন্দু ধারণই তার সিন্ধু ধারণ, যা তার সত্য রং ও রূপকে প্রকাশ করে। সর্বক্ষেত্রে তা মিলিয়ে দেখার মধ্যেই বাণীর গভীরতা নিরূপন হয়। একজন সাধকের যে কোন একটি বাণীর সত্য আবিষ্কার করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলে সেই প্রচেষ্টা নিজেকে বৃহত্তর একটি সংযোগের পথে চালিত করে। নিজের সত্য সেখানে জগতের সত্যের পথ ধরে চলতে শুরু করে। আর সেটি সম্ভব হয় দেখা ও স্মরণে একনিষ্ঠতা  থেকে। স্মরণ নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতা এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্মরণ নিজেও একটি দেখা। না দেখে ধরা যায় না। না ধরলে ধারণে আসে না। ধারণে না আসলে লালন-পালন করা যায় না। সাধক বাণী, সাধকের আদেশ-উপদেশ-নিষেধ সবই সৃষ্টির মহাকর্মযজ্ঞ। এই জগতের মধ্যেই তিনি সৌন্দর্যময় সত্য, জগৎ সৃষ্টির মহা আয়োজনে সদা পরিব্যপ্ত। তিনি চিনতে বলেন, করতে বলেন, দেখতে বলেন, জানতে বলেন, চিহ্নিত করতে বলেন। আবার সে সবের পথ-পদ্ধতি বাতলে দেন বলেই সাধক নিত্য, খোদ স্বয়ং স্রষ্টারূপে বিরাজ করেন। কোন পরিবেশে আছি এবং নিজের মধ্যে সেই পরিবেশকে চিহ্নিত ও সমন্বয় করার মধ্যেই সাধনার প্রাপ্তি নিহিত থাকে। সাধকের দিকে শুধু চোখে চেয়ে থাকাকে সাধক অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করেন।

আমরা সবাই একটি ভ্রমণের পথে রয়েছি। এ পথ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। বিভিন্ন পরিবেশে, বিভিন্ন দিক্নির্দেশনা আসছে। প্রত্যেকটির সাথে উপযুক্ত পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে। ব্যক্তির স্ব-স্ব কর্মের যোগ্যতাকে নানা পরিবেশে দেখানো হচ্ছে যাতে করে সে নিজেই শেখে। এটি ব্যবহারিক জ্ঞান বিতরণ পদ্ধতি। জগত সংসারে প্রত্যেকটি সৃষ্টি স্ব-স্ব পরিবেশে আবদ্ধ, স্ব-স্ব কর্মবৃত্তের মধ্যে আবর্তিত। এই আবদ্ধতাকে দেখা, উপলব্ধি করা এবং অতিক্রম করার শিক্ষাই সাধকের শিক্ষা। এটিই মানুষের রূপান্তর। রূপান্তরে এসে মানুষ তার ফেলে আসা পথকে দেখতে পারে। যে পথ সে ফেলে অথবা ছেড়ে এসেছে সেই পথ তার চেনা বলেই সে আর সেখানে ফিরে যেতে পারে না। কিন্তু সে পথের সত্য তার জানা-চেনা।

প্রতিটি রং-রূপ-বৈচিত্র্য, প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি অঞ্চল, ভূগোল সবই সত্য। জলে, জঙ্গলে সর্ব জায়গায় স্রষ্টার কীর্তিময়তা। এসব কিছুর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেখা, পর্যবেক্ষণ করা এবং বাস্তবতার আঙ্গিকে নুড়ি পাথর কুড়িয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করাই সত্য পথ যাত্রীর কর্ম। স্বয়ং সাধক প্রতিটি ঘটনার অবতারণা করেন, পরিবেশ সৃষ্টি করেন হাতে-কলমে ভক্তকে তা শিক্ষা দেন। প্রয়োজনে বিদ্যমান পরিবেশে নিয়ে গিয়ে দেখান। তিনি সদা পরিভ্রমণ করেন এবং সঙ্গে থাকা ভক্তদের নানাভাবে দেখান। প্রতিটি যাত্রার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য রয়েছে। যাত্রা পথে প্রত্যেকটি ঘটনার পরম্পরা রয়েছে যা পরিস্কারভাবে একটি সংযোগ চিত্রকে তুলে ধরে। চা এখানে একটি উপলক্ষ্য। উপলক্ষ্য একটি আনুষ্ঠানিকতা। আনুষ্ঠানিকতার অর্থ পরিবেশ সৃষ্টি করা অথবা পরিবেশে নিয়ে যাওয়া। পরিবেশ ধরতে পারলে পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। কোন পরিবেশে কোন দৃষ্টান্তকে সামনে আনলে সেই পরিবেশে দিক্-নির্দেশনামূলক সত্যকে সামনে আনা যায় সেটি সাধক জানেন। এখানেই তিনি বিশেষণের বিশেষণ, মহাজ্ঞানী। পরিবেশ যেমন সৃষ্টি করা যায়, আবার গোটা জগতই একটি পরিবেশ। সাধক সব পরিবেশেই উপযোগী নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সাধক নজরুল বলেছেন- ও মা তোর ভূবনে জ্বলে এতো আলো/ আমি কেন অন্ধ হয়ে দেখি শুধুই কালো/ বিন্দু বারি পেলাম না মা সিন্ধু ফুলে রয়ে। সাঁইজী বলেছেন- জলে জঙ্গলে সর্ব জায়গায় তোমারী কীর্তিময়তা এই ত্রিবিধ সংসারে/ তবে আমি কেন জনম কানা না পায় দেখিতে। এখানে স্রষ্টার কীর্তিময়তা সর্বত্র বলা হয়েছে তবু দেখার ক্ষমতা তৈরি না হলে দেখা যাচ্ছে না।

জীবনের এই মহাভ্রমণে সদা নিত্য, সদা জাগ্রত ও প্রস্ফুটিত চোখে সত্য ধরা পড়ে। দেখা ও চিহ্নিত করার ক্ষমতা তৈরির নিরন্তর প্রচেষ্টাই সাধনা। কি কি সরে যাচ্ছে তাও দেখতে হবে। সবকিছুর ফলাফল নির্ভর করে প্রস্তুতির উপর। প্রস্তুতির অভাবে অনেক সময় সব কিছু চাইলেও করা যায় না। এটি উপলব্ধি-বাস্তবতা-চেতনার সাথে সর্ম্পকযুক্ত। প্রত্যেকটি যাত্রা, প্রত্যেকটি পদক্ষেপ, প্রতিটি পরিবেশ পরিচিতি পর্যালোচনা সব কিছুকে ষ্পষ্ট করে তোলে। মহান সাধক বস্তবতা জানার পরও কেন এমন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করলেন তার মধ্যে অনুসন্ধানীদের শিক্ষা লুকিয়ে আছে। এ শিক্ষা পারিবারিক সামাজিক রাষ্ট্রীয় জীবনের জন্য করণীয়। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যন্ত তিনি পরিবেশ বাস্তবতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ, গুরুত্ব অনুধাবন করে পথ চলার নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে করে কোন কিছু কম বা ঘাটতি না পড়ে। ঘাটতি বা কম পড়ার কারণে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যায় না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রত্যেকটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে এই বাণীটির সত্য খুঁজে পাওয়া যায়। এখানেই জড়িয়ে রয়েছে প্রাপ্তি যোগ-প্রাপ্তির সৌন্দর্য।

দেশ ও কালের এই যাত্রার অন্তর্নিহিত রূপ সৌন্দর্য মুক্তির আনন্দে ভরপুর। এই যাত্রা স্বয়ং নিজের। কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো বা দার্শনিক সত্যের বাহনে। প্রতিটি মুহূর্তে নানা পরিবেশ সামনে আসছে আবার চলেও যাচ্ছে। সব কিছু সত্য। সত্য কে চিহ্নিত করে তার সাথে যুক্ত হবার নিরন্তর প্রচেষ্টা থাকতে হয়।

সেখানে সত্যব্রতীর দেখা মেলে। তিনি দেখান নানা ঘটনায়, বাস্তবতার নিরিখে। এটি সাধক স্রষ্টার অপার করুণা। প্রেমের সম্পর্কের সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। পথ হারিয়ে ফেলা পথিকের পথ দেখিয়ে দেয়া। এটি প্রকৃত বন্ধুর কাজ। দেশে এত মানুষ, এত নেতা, এত পন্ডিত-বুদ্ধিজীবী, তবু যেন কাউকে দিয়ে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে হয়। তবেই জগতকে কিছু দিতে পারে সে। বৃক্ষ তোমার নাম কি, ফলে পরিচয়। সব গাছে কাঠ হয় না।

আমাদের দেশ ভর্তি রাজনীতিক কিন্তু রাজনীতিবিদ নেই। এত ডাক্তার, তবু যেন সেবার মহানব্রত তাদের জানা নেই। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার অভাব। এত শিক্ষিত মানুষ, সুশিক্ষিত মানুষের বড়ই অভাব। এত সমাজসেবক-দেশদরদী, তবু জনদরদী চোখে পড়ে না। নামাজী ভরা দেশ কিন্তু প্রকৃত ঈমানদার খুঁজে পাওয়া যায় না। ইসলাম ইসলাম বলে জিকির ধ্বনি পুরো দেশে, তবু শান্তির দেখা মিলে না। হাজারো ভক্ত অনুসারী প্রকৃত ও যোগ্য অনুসারীর খোঁজে থাকেন সাধক। দেশে এত লালন-রবী-নজরুল ভক্ত অথচ নতুন কোন লালন-রবী-নজরুলব্রতীর দেখা মিলছে না। গল্পবাজ, ধান্দাবাজ, বক্তৃতাবাজ, কৌশলবাজ, ফন্দিবাজ কল্পনাবাজ, চাপাবাজে ভরা। এ সবই মহান সাধকের বাণীটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।

সত্য শাশ্বত – চির বহমান শ্রাবণের ধারা চির অম্লান

SAM_0273

শাহ্ আবেদা বানু ॥ আকাশের বুকে গ্রহ, নক্ষত্র, আছে বলেই আকাশ সুন্দর। ফুল আছে বলে প্রকৃতির রাজ্য মনোরম। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আছে বলে সমুদ্র রূপময়। বিশ্বচরাচরে ওলি-আওলিয়া-সাধককুলের রূপের ছটায় স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ত্রিভূবন আলোকিত হয়। সে জ্যোতি দৃষ্টিকে ঝলসে দেয় না বরং আকর্ষণ করে। তাঁরা তাঁদের স্বর্গীয় প্রভায় পৃথিবীর শ্রীহীন মানুষের দীনতা দূর করেন। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে। অজ্ঞ মানুষ তা বুঝতেও পারে না। মানুষের কল্যাণে, সত্যে নিবিড় সাধনায় যাঁরা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন, সাধারণ মানুষের সাধ্য কি তাঁদের মহিমা বুঝতে পারা? যাঁদের অঙ্গুলি হেলনে বিশ্বপ্রকৃতি, দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি নতুন রূপ লাভ করে। সেই ঊর্ধ্ব লোকাচারী মানুষ, সাধারণের জানার সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা মুক্ত মানুষ, সত্যমানুষ, সত্যের আকাশে এক একটি ধ্রুবতারা।

এই জগতের সমাজ সংস্কারের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ পৃথিবীর সেবা করতে গিয়ে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করছে। সংস্কারের কালোমেঘ তাদের জীবনকে তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। পৃথিবীর অসহায় মানুষ তাদের জীবনের নানান সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে খোঁজে একটা নিরাপদ আশ্রয়। তাদের ত্রাণকর্তারূপে যুগে যুগে আগমন ঘটে কালজয়ী মহাপুঁরুষদের। মানুষের অসহায়ত্ব তাঁদের কষ্ট দেয়। তাঁদের হৃদয় কাঁদে নিভৃতে। জগৎবাসীর কল্যাণে অনায়াসে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন। তেমনই এক মহাপুঁরুষ হযরত সৈয়দ গাজী মোবারক (র.)।

কোলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ক্যানিং লাইন ধরে গেলে ঘুটিয়ারী শরীফ ষ্টেশন। এখানেই গাজীবাবার রওজা শরীফ। যা ঘুটিয়ারী মাজারশরীফ নামে সুপরিচিত। প্রতিনিয়ত সেখানে ভক্তদের আগমন ঘটে। তারা পার্থিব জগতের অশান্তির ছলনা থেকে পরিত্রাণ পেতে অথবা পার্থিব কিছুর আশায় ভীড় জমায় বাবার দরগায়। বাবা তাঁর ভক্তদের নিরাশ করেন না।

আজ থেকে প্রায় তিনশত বছর আগে ঘুটিয়ারী গ্রামসহ প্রায় সত্তরটি গ্রামজুড়ে প্রচন্ড খরা হয়। গ্রীষ্মের দাবদাহে জনজীবন অতীষ্ট। সূর্যের প্রচন্ড শাসনে মাটি ফেটে চৌচির। সেই সাথে কৃষকের ফসলতোলার স্বপ্নও চৌচির। সেইসময় অসহায় গ্রামবাসী গাজী বাবার শরণাপন্ন হয়। গ্রীষ্মের করুণ শাসন থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে চায়। বাবা তাদের আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। গ্রামবাসীরা আশ্বস্থ হয়ে ফিরে যান।

গাজী বাবা ছিন্ন খেঁজুর পাতার কুটিরের দরজা বন্ধ করে দেয়ার সময় তাঁর একজন ভক্তকে বলেন – যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি দরজা না খোলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত যেন তাঁর দরজা খোলার চেষ্টা না করা হয়। এই কথা বলে তিনি কুটিরে প্রবেশ করেন। ঠিক রাত্রি ১২টার পর আকাশের বুকে স্তরে স্তরে জমে ওঠে মেঘের স্তুপ। এক অপূর্ব মেঘ গর্জনের সমারোহে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে রাজ রাজেশ্বরের মতো নেমে আসে প্রবল বর্ষণধারা। গ্রামবাসীরা ফেলে স্বস্থির নিঃশ্বাস। সে শ্রাবণের বারিধারা রুক্ষ্ম প্রকৃতিকে সজীব, সতেজ করে মানুষের কল্যাণ বয়ে এনেছিলো। তৃষ্ণাতপ্ত মানুষের জন্য বয়ে এনেছিলো শান্তির বার্তা। এদিকে কুটিরের দরজার বাইরে ভক্ত নিরাপত্তা প্রহরীর মতো দন্ডায়মান।

সে সময় কোলকাতায় সুদের ব্যবসার খুব প্রসার চলতো। সুদ ব্যবসায়ীদের বলা হতো কাবলীওয়ালা। হঠাৎ সেই বৃষ্টির রাত্রিতে চারজন কাবলীওয়ালা স্টেশন থেকে নেমে সোজা চলে এলো গাজীবাবার কুটিরে। তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ দেখে বৃষ্টির হাত হতে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য তারা ভক্তকে দরজা খোলার জন্য পীড়াপীড়ি করতে শুরু করলো। ভক্ত দরজা খুলতে নারাজ। কিন্তু কাবলীওয়ালারা জোরপূর্বক দরজা খুলে ফেললো। দেখলো বাবা অচেতন অবস্থায় কাঁথা ঢাকা দিয়ে শুয়ে আছেন। কোন লোকে তিনি অবস্থান করছেন তা বোঝার সাধ্য তাদের কোথায়? তারা তখন তাঁকে মৃত ঘোষণা করলো। গ্রামবাসীদেরকে ডাকা হলো, তাঁকে সমাধিস্থ করার যাবতীয় কার্যক্রম চলছে। হঠাৎ দেখা গেল একটা বড় কালো ভ্রমরা তাঁর দেহের চতুর্দিকে ঘুরছে। অজ্ঞ মানুষ বুঝতে পারলো না সাধকের ক্ষমতা। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা, লৌকিকতার আড়ালে লুকায়িত থাকলো, গ্রামবাসী তাঁকে সাদরে সমাহিত করলো।

দিনটি ছিলো ১৭ই শ্রাবণ

তৎকালীন বঙ্গের রাজধানী সোনার গাঁয়ের রাজা বঙ্গের জমিদারদের তাঁদের জমিজমার হিসেব পূরণের জন্য আহ্বান জানালেন। বারুইপুরের জমিদার মহাসংকটে পড়েছেন। রাজার কাছে তাঁর পাওনার হিসেব পড়েছে অনেক। এই করুণ অবস্থায় তিনি দিশেহারা। সেই সংকটময় অবস্থায় তাঁরই ঘোড়ার গাড়ির মুসলামন সহিষ গাজী বাবার দরগাহ্ ঘুটিয়ারীশরীফের সন্ধান দেন মুস্কিল আহসানের জন্য। জমিদার আর কাল বিলম্ব না করে দরগাহ এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন। দরগাহ পর্যন্ত যেতে পারেননি। রাস্তায় বসা একটা ছোট ছেলে তাঁকে বললো – তোমার আর দরগাহ পর্যন্ত যেতে হবে না। তুমি ডান দিক দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে যাও। জামিদার তা-ই করলেন। কিন্তু মনে মনে নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। ভাবছিলেন দরগাহ পর্যন্ত যেতে পারলে কাজ হতো। এদিকে রাজদরবারে যাবার সময় ঘনিয়ে এলো। তিনি হিসেব-নিকেষের কিছু অর্থ সংগ্রহ করে নিয়ে সোনার গাঁয়ে পৌঁছান। নৌকার ঘাটে রাজার সৈন্য সামন্ত দেখে ভীত হয়ে পড়লেন। ভাবছেন এই বুঝি তাঁকে গ্রেফতার করা হবে। ভয়ে বুক দুরুদুরু কাঁপছে। রাজদরবারে যথাসময়ে জমিদারদের হিসেবের খাতা খোলা হলো। অলৌকিক ঘটনা। বারুইপুরের জমিদারের হিসেবের খাতা পরিশোধিত। কোন হিসেব বাকি নেই। গাজী বাবার কৃপার কাছে অলক্ষ্যে জমিদারের মাথা নত হয়ে এলো। তিনি হিসেব পরিশোধের জন্য যে অংক নিয়ে এসেছিলেন রাজাকে তা উপঢৌকন হিসেবে দিয়ে আসেন।

এরপর তিনি বাবার রওজা বিনির্মাণের কাজে হাত দিলেন। জমিদার ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। রওজা শরীফের চারটি স্তম্ভ স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত হলো। পরবর্তীতে তথাকথিত মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা সেই স্বর্ণ লুটপাট করে নিয়েছে। কিন্তু রওজার সৌন্দর্য, গাম্ভীর্য, চির রূপময় ঐশ্বর্যময় আজো।

সূফী সাধক আজানগাছি এঁর সঙ্গে গাজীবাবার ছিল ঘনিষ্ঠ সংযোগ। মানুষের অন্বেষণ শান্তি নিয়ে। সত্য আসে পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্য। শান্তির মধ্যে নিহিত আছে সত্য। সূফী সাধক আজানগাছি সত্যকে উপলব্ধি, আদর্শ ও দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি হাক্কানী আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠানের নির্মাতা। চার তরিকার সমন্বয় করে তৈরি করেন হাক্কানী।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে ছিল এক সংকটময়কাল। সে সময় মুসলমানদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী ভাবধারায় সমাজ গড়ে উঠতে থাকে। বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে তারা দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত হয়। সমাজের অবক্ষয় রোধকল্পে এবং ইসলাম (শান্তি)’র স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্য আবির্ভূত হন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণের জন্য ভাবের সাগরে ডুব দিয়ে তিনি সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন সূফী সাধক আজানগাছির। সূফী সাধক আজান গাছির সত্যের সাগরে পূর্ণতার আস্বাদন নিয়ে তিনি ফিরে আসেন কিশোরগঞ্জের ফরিদপুর গ্রামে নিজ অঞ্চলে। বাংলার মাটির স্পর্শ, বাংলার সুবাসে যিনি সুরভিত, বাংলার মানুষের কাছেই ফিরে আসেন। যিনি সত্যমানুষ তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকেন। তিনি প্রাকৃতিক মানুষ। সময়, কাল, দেশ, সম্প্রদায় সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর আবাস। তাঁর বিচরণ। বৈষয়িক সুখ ভোগের পথ বিসর্জন দিয়ে, সাধনালব্ধ অর্জন নিয়ে নিজকে উৎসর্গ করেন মানবতার অনন্য সেবায়। ত্যাগের আদর্শে, মানবতার কল্যাণে চলতে থাকে সাধকের শান্তির প্রচার। সাধারণ মানুষ, অবহেলিত মানুষ ছুটে আসে তাঁর কাছে সমস্যা সমাধানের জন্য। আর সত্যান্বেষী যায় আশ্রয়স্থল নির্ধারণের, স্বপ্ন পূরণের জন্য।

বাবা-মায়ের বহু সাধনার কাঙ্খিত ধন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। সংসার জীবনের মায়াজালে আবদ্ধ না হয়ে সত্যানুসন্ধানী, মুক্তিপাগল, সাধনার জগতের অতন্দ্রপ্রহরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক ছুটে চলেন সত্যের আকর্ষণে। তাঁর তৃষ্ণার্ত অনুসন্ধিৎসু হৃদয় খুঁজে পেল কাঙ্খিত আশ্রয়। আত্মসমর্পিত হন তাঁর পরম সত্য সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন এঁর পবিত্র চরণে। হাক্কানী দর্শনকে গুরু তাঁর সুযোগ্য শিষ্যের হাতে অর্পণ করেন। কর্ম ও ত্যাগের সাধনাই সাধক তাঁর জীবন সাধনারূপে বরণ করে নিলেন।

সৃষ্টির বৈচিত্রময়তায় আর এক নব সংযোজন

চব্বিশপরগনা অঞ্চলের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক বাবা-মা পুত্র সন্তানের আশায় দ্বারস্থ হন গাজী বাবার দরগায়। সেখানে মানুষ যায় স্বপ্ন পূরণের আশায়। দরগাহের সীমানার ভিতরে পুকুরে কলাপাতায় মোড়ানো শিন্নী ভাসায় কৃপাপ্রার্থীরা। সেই শিন্নি ভাসমান থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কৃপাপ্রার্থীরা পুকুরের কোলঘেঁষে পানির মধ্যে দুহাত পেতে বসে থাকে। শিন্নী ভাসতে ভাসতে যার হাতে এসে পৌঁছায় তার স্বপ্ন পূর্ণ হয়। গাজীবাবার দরগাতে হাত পেতে সেই বাবা-মা লাভ করলেন এক দুর্লভ সন্তান।

একসময় সেই সন্তান নিতান্ত খেয়ালের বশে। শুধু কি খেয়ালের বশে? না কি মূলের আকর্ষণে ছুটে গিয়েছিলেন সূফী সাধক আনোয়রুল হক এঁর দরবারে। প্রথম দর্শনে পেলেন ভিন্ন এক জ্যোতির্ময়তা। জ্যেতির্ময় গুরু প্রথম দেখায় পেলেন শান্তির, সত্যের এক বাহককে। তাঁর মানসপটে এঁকে নিলেন এক ভাস্কর্যমূর্তি। তাঁর শৈল্পিকনন্দনে সৃষ্ট ভাস্কর্য জগৎকে উপহার দিলেন এবং তাঁর শিষ্যের হাতে তুলে দিলেন হাক্কানী দর্শন। পরিয়ে দিলেন হাক্কানীর রাজটীকা।

প্রথম দর্শনে শিষ্য তাঁর সত্যকে ধারণ করলেন তেমনিভাবে, যেমনভাবে ঝিনুক, বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করে নিজের বক্ষে সৃষ্টি করে মূল্যবান রত্ন। গুরুর সৌন্দর্যে বিমোহিত থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে জীবনের সাধনারূপে গ্রহণ করে গুরুর কৃপায় সত্যের অতন্দ্রপ্রহরী নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছেন বিশালতার দিকে। শ্রাবণের যে বারিধারা একদা মানুষের কল্যাণ বয়ে এনেছিল, যুগ-যুগান্তর ধরে কল্যাণরূপ বারি বর্ষিত হচ্ছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, গবেষণা, সত্যের সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে। শ্রাবণ রয়েছে অব্যাহত, অক্ষুন্ন।

শ্রাবণে শেষ আবার শ্রাবণে শুরু। প্রবাহমানে হস্তান্তর। শ্রাবণ সর্বদাই বর্তমান। গুরুর জ্ঞানে যিনি জ্ঞানবান ও ধনবান তিনিই হাক্কানী। গুরুর আলোয় যিনি আলোকিত – তিনি রওশন জমির।  সত্যের অনুসারীদের সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়ে, সত্যের পথে চলমান রাখেন তিনি সুলতানুল আউলিয়া। গুরুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যিনি চর্চা ও চর্যায় গুরুময়, রূপময়, তিনিই শাহ্ কলন্দর। সত্য শাশ্বত-চির বহমান – শ্রাবণের ধারা চির অম্লান….

দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য অন্যের কথায় নয়

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে –

দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য অন্যের কথায় নয়

॥ শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥

‘দৃশ’ ধাতু থেকে দর্শন শব্দের ব্যুৎপত্তি। ‘দৃশ’ অর্থ দেখা। কিন্তু কেবল দেখাই দর্শন নয়। যে দেখার মাধ্যমে জ্ঞান উৎপন্ন হয় তাকে বলা যায় দর্শন। জ্ঞানের সাধনী যদি হয় শাস্ত্র তবে তাকে বলে দর্শনশাস্ত্র। ইংরেজি শব্দ ‘ফিলসফি’ বলতে আমরা যা বুঝি তা দর্শন নয় – দর্শনশাস্ত্র। কারণ, জ্ঞানের সাধনী কেবল শাস্ত্র নয়। জ্ঞানের সর্বোচ্চ সাধনী ‘নিজ’। নিজকে সাধনী হিসেবে নিয়ে যে জ্ঞানচর্চা করা হয় তাকে বলে – আত্মদর্শন।

লব্ধ এর অনুষঙ্গে উপরি হিসেবে যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে উপলব্ধি। যেখানে লব্ধ আছে সেখানে অল্প বিস্তর উপলব্ধি আছেই। যেমন, আমি কাউকে সিঁড়ি থেকে পড়ে পা ভাঙতে দেখলাম। এ দেখাটা লব্ধ। কিন্তু – ‘সিড়ি থেকে পড়েও পা ভাঙ্গে’ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া –  উপলব্ধি।

‘দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য’ এ অংশে রয়েছে নিজে সত্য হবার তিনটি স্তরের নির্দেশনা। প্রথম স্তরঃ আত্মদর্শন অর্থে দর্শন, দ্বিতীয় স্তরঃ বাস্তব উপলব্ধি অর্থে উপলব্ধি, তৃতীয় স্তরঃ আমি-ই সত্য হওয়া। ‘অন্যের কথায় নয়’ বলতে বুঝানো হয়েছে – জ্ঞান কেউ কাউকে দিতে পারে না। জ্ঞান দেয়া যায় না, শেখানো যায় না। জ্ঞান নিজ প্রচেষ্টায় অর্জন করতে হয়। জ্ঞানে কেউ পূর্ণ হলেও তিনি তা অন্যকে দিতে পারেন না। সত্যের উপলব্ধিতে জ্ঞান হয়। সত্য কখনও প্রকাশ করা যায় না। সত্যকে প্রকাশ করতে গেলেই এর সাথে মিথ্যার মিশ্রণ ঘটে। যা কিছু আমরা ভাষায় প্রকাশ করি তা পুরো সত্য নয়। আংশিক সত্য মাত্র। সুতরাং অন্যের কাছ থেকে শোনা কোন কথাই পুরো সত্য নয়। তবে এ কথা সঠিক যে – শোনা কথা, শিক্ষা, বুদ্ধি ও যৌক্তিক বিবেচনা সত্য উপলব্ধিতে সহায়ক। সত্য উপলব্ধিতে যে সব প্রতিবন্ধকতা আসে বা আসতে পারে তা দূর করার জন্য শিক্ষা, বুদ্ধি ও বিচার শক্তিকে ব্যবহার করা যায়। বাধা দূর করা সত্য উপলব্ধির একটা প্রধান উপাদান বটে কিন্তু বাধা দূর করলেই সত্য উপলব্ধিতে আসে না। বরঞ্চ শিক্ষা বা বুদ্ধির সাথে আত্মাকে এক করে ফেললে এসব নিজেই সত্য উপলব্ধিতে সহায়ক না হয়ে অন্তরায় সৃষ্টি করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সত্য সম্বন্ধে এমন সব পঠিত ও শ্রোত পূর্ব ধারণা আমাদের দৃষ্টিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে যে, আমরা সত্যকে দর্শন করতে পারি না। যদি সত্য সম্পর্কে পূর্ব ধারণা আমরা ত্যাগ করতে না পারি তাহলে দীর্ঘ সাধনার পর যা আমরা উপলব্ধি করবো তা অতীতেরই প্রতিচ্ছবি হবে, সত্য হবে না। সত্য অতীতের কোন প্রতিচ্ছবি নয়, সত্য সবসময়ই নতুন, একেবারে তাজা। তাই সত্যের এতো তেজ।

সত্য উপলব্ধির জন্য চিন্তার শুদ্ধতা আবশ্যক। চিন্তার শুদ্ধতা বলতে অতীত থেকে মুক্ত হয়ে বর্তমানে থাকার অভ্যস্থতা বুঝায়। ইন্দ্রিয় সমূহের কর্ম যখন বর্তমান চিন্তার অনুসারী হয় তখন ব্যক্তিত্ব সত্য দর্শনের জন্য প্রস্তুত হয়।

সত্যকে জানার সনাতন ও শাশ্বত পদ্ধতি নিজেকে জানা। এর কারণ হলো আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহের দুয়ারগুলো বাহিরের দিকে উন্মুক্ত। আমরা যখন কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে দেখি তখন তার বাহিরের রূপটিই দেখি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহিরের রূপ দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেই। অথচ আমরা বেশ ভালো করেই জানি যে, বাহ্যিক রূপ ব্যক্তিত্বের নগন্য অংশ মাত্র। তা জেনেও, বাহ্যিক রূপ দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া ব্যতীত আর কোন বিকল্প আমাদের থাকে না। কারণ কার ভিতরে কি আছে তা জানা শুধু যে কঠিন তা নয় প্রায় অসম্ভবও বটে। মানুষ অন্যের ভিতরে দৃষ্টি দিতে  পারে না, দৃষ্টি দিতে পারে একমাত্র নিজের ভিতরে। অনেক চেষ্টা করে কেউ যদি অন্য কারো মধ্যে কিছুটা প্রবেশ করতেও পারে, তাতেই কোন লাভ নেই। কারণ, একদিকে ব্যক্তিত্ব পরিবর্তনশীল আর অন্যদিকে এভাবে কতজনকে জানবো আমরা? সুতরাং অসংখ্য বাহ্যিক বস্তুর ভিতরে কি আছে তা জানার চেষ্টা করার চেয়ে নিজের ভিতরে কি আছে তা জানার চেষ্টা করা উত্তম। নিজেকে জেনে যে সত্যের দর্শন ও উপলব্ধি হয় সেই একই সত্য সর্বব্যাপী বিস্তৃত।

আত্মদর্শন ও আত্মোপলব্ধি এক নয়। দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য অন্যের কথায় নয়। উপলব্ধি হচ্ছে যাকে আমি বিশ্বাতীত ও বিশ্বাত্মক সত্তা হিসেবে ধারণ করেছি সেই মহিমাময় সত্তাকে নিজের জীবনে বাস্তব করা। উপলব্ধি বাস্তব। পরম সত্তার ধারণকে বাস্তব করতে হলে তিনটি স্তর অতিক্রম করেত হয়ঃ ১. অন্তদর্শনঃ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে যেমন অণুকে বীক্ষণ করা যায় তেমনি অন্তদর্শন করে অভ্যন্তরীণ আবেগ, অনুভূতি এক কথায় স্ব-রূপকে দর্শন করা যায়। নিজের অভ্যন্তরে অদৃশ্য দিগন্তগুলো একে একে উন্মোচিত হয়। তখন অদৃশ্য স্ব-রূপ নিজের কাছে বস্তুর মতোই দৃশ্যমান হয়, অণুবীক্ষণের সাহায্যে যেমন দৃশ্যমান হয় অদেখা বস্তু।

যারা দেখেছে তাদের কাছ থেকে বর্ণনা শুনে, কিংবা তাদের মূর্তির পূজা করে অন্তদর্শন হয় না। দু’জনের দেখা কখনও এক হয় না। শঙ্খচীল, বালিহাঁস দেখে জীবনানন্দের যে উপলব্ধি হয়েছে তা অন্য কারো হবে না। অন্তদর্শনের জন্য নিজে নিজেকে দর্শন করতে হয়। শাস্ত্রপাঠ, সাধকদের জীবনী পাঠ কিংবা রুমী, ওমর খৈয়াম, সা’দী, হাফিজের প্রাঞ্জল বর্ণনা আমাদেরকে আত্মদর্শনে উৎসাহ দিতে পারে কিন্তু নিজের কাজটি নিজেকেই করতে হয়। গুরু শিখিয়ে দিতে পারেন কিভাবে তা করতে হবে। কিন্তু আত্মদর্শন কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব ও অধিকার একমাত্র নিজের। আত্মদর্শনের মাধ্যমে ‘এক’ প্রত্যয় আমরা গঠন করতে পারি কিন্তু প্রত্যয় গঠনই উপলব্ধি নয়। অবিরাম একরৈখিকতা যখন কেবল ‘এক’ কেই দর্শন করে তখন ‘এক’ বাস্তব হয়। ফুলের কোমলতায়, পাথরের কঠিনতায়, পানির তরলতায়, আগুনের উত্তাপে যখন বাস্তবে তাঁকে দেখা যায় কেবল তখনই বলা যায় যে, ‘আমি তাঁকে দেখেছি’।

এভাবে সত্যদর্শন একবার হতে পারে, কয়েকবার হতে পারে আবার চলেও যেতে পারে। এটাই উপলব্ধির স্তর। এ উপলব্ধিকে স্থায়ী ও স্থিত করা কেবল দেখা ও উপলব্ধির বিষয় নয়। এর পর রয়েছে ‘এক’ এর সাথে ‘এক আকার’ হবার সাধনা। অন্তঃদৃষ্টি ‘এক’কে দেখতে পারে কিন্তু দৃষ্টিতে একাকার হওয়া যায় না। চোখ দিয়ে আলিঙ্গন করা যায় না।

সত্যকে আলিঙ্গন করতে হলে ইন্দ্রিয়সমূহের সমগ্রশক্তির একরৈখিকতা দরকার হয়। শুধু চোখ দিয়ে তাঁকে দেখলে হবে না। অস্তিত্বের প্রতিটি অংশ, সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে তাঁকে দেখতে এবং উপলব্ধি করতে হবে এমনভাবে যেন আমি নেই, তিনিই আমি। আমার হাত তাঁরই হাত, আমার কথা তাঁরই কথা, আমার দৃষ্টি তাঁরই দৃষ্টি।

প্রথমে সত্য দেখা, তারপর উপলব্ধি করা, তারপর আমি-ই তিনি হওয়া এ তিনটি স্তর অতিক্রম করে আমি-ই সত্য স্তরে স্থিতি লাভ। এটা এক অনন্ত আলোক পথে অন্তহীন অভিযাত্রা।

এসো শ্রাবণ বারিধারায় করি স্নান

SAM_0273

সংলাপ ॥ শ্রাবণ! বাংলায় হাক্কানী (সত্যব্রতী) চেতনায় চৈতন্যশীল হওয়ার পথযাত্রায় প্রতিটি মানুষের কাছেই ভিন্নমাত্রায় উপলব্ধির মাস। বিশেষ করে মিরপুর আস্তানা শরীফের এবং বাংলাদেশ জুড়ে সমগ্র হাক্কানী খানকা শরীফের আশেকান ভক্ত এবং দরবারী দরদীদের কাছে এই মাসটির গুরুত্ব অপরিসীম। যদিও একটি দুঃখবোধ অনেকেরই অন্তরানুভূতিতে তীক্ষ্ন হতে পারে এই ভেবে যে – যাঁদেরকে নিয়ে এই শ্রাবণ; মাসব্যাপী হাক্কানী অনুষ্ঠানমালায় প্রবাহিত হতে থাকে – সেই মহান সত্যমানুষদের জাগতিক অনুপস্থিতি। কিন্তু সে একেবারেই ক্ষণিক, কারণ তাঁদের বিশাল জ্ঞানজগতের ধনভান্ডারকে হাক্কানী অনুসন্ধানীরা পর্যায়ক্রমিক অনুসন্ধিৎসু কর্ম-প্রেরণার মধ্যে নিজেকে নিবিড় করতে সচেষ্ট। সত্যমানুষরা ছিলেন-আছেন-থাকবেন, বিস্ময়করভাবে দেখছেন, কর্ম-প্রেরণার নির্দেশ যোগাচ্ছেন, এমনই বাস্তবতায় শ্রাবণের মাসব্যাপী অনুষ্ঠান শেষ হয় সকলের শান্তিময় জীবনের আকাঙ্খার এবং সত্যের পথে চলার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক লোকান্তরিত হলেন ২০ শ্রাবণ ১৪০৬ সালে ইংরেজি ০৪ আগষ্ট ১৯৯৯ সনের বুধবার। সত্য সন্ধানের এক মহান পুঁরুষ লোকান্তরিত হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মানব কল্যাণে তার চেতনালব্ধ ধারণকৃত জ্ঞানকে রেখে যাওয়ার জন্য ছিলেন পরিপূর্ণ সচেতন এবং সচেষ্ট। তারই অব্যাহত ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছেন তিনি তাঁর বাণী এবং কর্মময় জীবনাচার এর মধ্যে। যারা তাঁর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে এসেছিলেন, তারা তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় এই মহান সাধকের কর্মের উৎস উৎসাহ প্রেরণাকে নিজের চেতনাবোধে আত্মস্থ করে জীবন জিজ্ঞাসার অসীম চলার পথকে আনন্দময়তার সৌন্দর্য সম্ভোগের অতি ইন্দ্রিয় সাফল্য-আনন্দকে উপভোগ্য করে তুলতে পারছেন। এই মহান সাধক তাঁর সাধনার ফসল যে রেখে গেলেন তা মানব কল্যাণে মানুষের সামনে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ এর তত্ত্বাবধানে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে প্রতি বছরই চলে বাণী অন্বেষণের অনুষ্ঠান। উদ্দেশ্য একটিই – এই বাণীর অন্তরাত্মাকে অনুভব করা এবং তাকে নিজের কর্মময়তার সাথে মিলিয়ে মানব জন্মের চেতনাকে শাণিত করে লক্ষ্যকে সামনে রেখে জীবনাচারের প্রাপ্ত-অর্পিত-সম্পর্কিত বস্তুময়তা থেকে নিজেকে বের করে সত্যানুসন্ধানকে অর্থবহ করে তোলা।

হাক্কানী ভক্ত আশেকানদের কাছে এই বাণী অন্বেষণের অনুষ্ঠানটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে বছর ধরে তাদের চিন্তাপ্রবাহের মধ্যে আবর্তিত সত্যানুসন্ধানের অনেক প্রশ্নেরই সমাধান বেরিয়ে আসে, যা তাদের জ্ঞান অন্বেষণের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আশেকান ভক্ত এবং শাহ্সাহেবগণ শ্রাবণের এই অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে নিজেদেরকে জ্ঞান ধারার অনন্ত বারিবরষণের শুদ্ধ স্নাত হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেন। যেহেতু জ্ঞান জগত অনন্ত-অসীম এবং তা বাহির থেকে কাউকে কখনো প্রদান করা যায় না, তাই সেই জগতের সন্ধান যারা পেয়েছেন – তাদের কর্মবৃত্ত নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করা হয় বলেই সেই পথে চলার সাহস এবং কর্মপথ তৈরির ক্ষেত্রে স্ব-স্ব চেতনায় ইতিবাচকতা সৃষ্টি করে। যেমন – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক যখন বলেন, ‘মুর্শিদ আমি খুঁজব নাকো বন জঙ্গলে যাইয়া, আমার মাঝে আমার মুর্শিদ আছেন যে পথ চাইয়া।’ তখন অনেকেই নিশ্চিত বিশ্বাস করেন এই বাণীর মধ্য দিয়ে সাধক নিশ্চিত করেছেন, মুর্শিদের জন্য আর বন-জঙ্গলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নেই কারো আদেশ-উপদেশ-নিষেধ শোনার কোনো প্রয়োজন, কারণ মুর্শিদ তো আমার মধ্যেই আছেন এবং আমার পথ চেয়ে আছেন। সুতরাং আর ভাবনা কি? আমি চাইলেই তো তাকে আমার মতো করে আমার প্রয়োজন মতো উপস্থিত উপস্থাপনা সংযোগ-বিয়োগ করতে পারি। এ ধরনের বিশ্বাস কিংবা ধারণার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির বিপুল অবকাশ যে আছে তা সত্যানুসন্ধানীদের পথ চলার মধ্য দিয়ে মোটামুটি ফুটে উঠে। বিশেষ করে – কে মুর্শিদ, কার (কোন ব্যক্তি বা সত্ত্বার) মুর্শিদ, কখন মুর্শিদ – কি প্রয়োজন মুর্শিদের? কোন পর্যায়ে নিজের চেতনায় মুর্শিদের অবস্থান নিশ্চিত হয়? প্রশ্নগুলো নিয়ে যখন চিন্তা জগতে উর্দ্ধগতি প্রবাহিত হয়, তখন অনেকেরই চিন্তা জগতে প্রেম, বিশ্বাস এবং বোধ যে নড়েচড়ে উঠে একরৈখিক হয় তা উপলব্ধি করা যায়।

মানব জীবনের প্রধান লক্ষ্য শান্তি। কিন্তু সেই শান্তি শব্দটি স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নানা রং রূপ রসে আদল প্রাপ্ত হয়। নিঃসন্দেহে প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই তা আলাদা আলাদা চেহারা নিতে পারে। সঙ্গত কারণেই শান্তিকে বিশেষ সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে জটিলতা আছে এবং বেশ কঠিন। একথা অবশ্যই জাগতিক চেতনাবোধের বস্তু জগতের বস্তুময়তায় বেড়ে ওঠা জগতের নিজস্বার্থের কেন্দ্রাভিমুখী চিন্তার বেলায়ই প্রযোজ্য। কিন্তু শান্তি বিষয়টি

যখন জ্ঞান জগতের ক্ষেত্রে হয় তখন শান্তি ব্যক্তির ভিন্নতা সত্ত্বেও আনন্দলোকে এককেন্দ্রিক  লক্ষ্যাভিমুখী। সেখানে ব্যক্তির স্বতন্ত্র সত্তা আর একটি ভিন্ন সত্তায় আপন অস্তিত্বের বিলীনতায় বিশ্বাসী হতে বাধ্য। হাক্কানী মৌলিক চেতনাটি এখানেই। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর প্রতিটি বাণীর মধ্যেই এই ইঙ্গিত এবং নিদর্শন রেখে গেছেন, যাতে মানুষ তার বস্তুময়তার ভোগ আকাঙ্খা লিপ্সা ঈর্ষা থেকে নিজেকে উত্তরণ ঘটায়ে জ্ঞান জগতের পথকে বেছে নিয়ে জ্ঞানবান হয়। ব্যক্তি যত বেশি স্বার্থকেন্দ্রিক এককেন্দ্রিকতায় অবস্থান নেবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত বেশি বাড়তে থাকবে। এর উদাহরণ আজকের আমাদের এই দেশ। এই সময়। যেখানে মানুষের চেতনাবোধ বিপরীতমুখী হয়ে শূন্যের দিকে নেমে আসছে। সমাজের প্রতিটি স্তরেই এখন আস্থাহীনতা ও বিশৃঙ্খলা ধীরে ধীরে সমস্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই গ্রাস করছে। এর প্রধান কারণই হলো – জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অনীহা, স্থবিরতা ও বন্ধ্যাত্ব। তাই কেউ মাদকের মধ্যে শান্তি খুঁজছেন কেউবা অর্থবিত্তে। দুটোই নেশা। এই নেশায় যারা সমর্পিত – তাদের কাছে ধর্ম-দর্শন-কলা কিংবা জীবন চেতনাবোধ কোনো অর্থ বহন করে না।

কামনা তাড়িত অর্থ-বিত্তের ভোগাকাঙ্খার স্বীয় স্বার্থ কর্মের যে জীবন ব্যবস্থার সুখ ও শান্তির তথাকথিত জীবন ধারণা আমাদের সামনে আছে, তার প্রতি আকৃষ্ট থেকে চেতনা জগতের শান্তির আঁধার তথা বিজ্ঞানময়তা সৃষ্টি করা যায় না। কেউ যখন স্ব-উদ্যোগী হয়ে স্ব-চেতনার শাণিত বোধ কামনায় অনন্ত জ্ঞান আধারে প্রবেশ ইচ্ছুক তখনই তার জন্য প্রয়োজন একজন উন্নত চেতনাবোধের সহায়ক মানুষ, যিনি তার এই চলার পথকে সহজতর এবং কৌশলী হতে সাহায্য করতে পারেন।

এখানে কৌশল বলতে নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ করে মনুষ্যত্বের পথে  নিরন্তর যাত্রাকেই বোঝানো হচ্ছে। এই কর্ম প্রক্রিয়া মানুষ চাইলেই ধরে রাখতে পারে না। প্রতিনিয়ত নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ করতে হলে সচেতন কর্ম প্রক্রিয়ায় কৃচ্ছতার প্রশ্নটি এসে যায় সবার আগে। আর কৃচ্ছতার অন্য অর্থই হচ্ছে ত্যাগ। যা মানুষের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তাই তো তারা ধর্মের সহজ সরল অর্থ করে কুরআনের যাকাতকে অতি সরলীকরণের মধ্য দিয়ে ভোগাকাঙ্খাকে অক্ষুন্ন রেখে, দারিদ্র্যের প্রতি কুম্ভাশ্রু বর্ষণ পূর্বক তথাকথিত আড়াই শতাংশ অর্থ দিয়ে আত্মপ্রতারণার এই সামাজিক প্রথা চালু করে সেই ইসলামের ঊষাকালেই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজনৈতিক ইসলাম সাফল্যজনকভাবেই আমাদের চেতনা জগতকে বস্তু ও বিষয়রাশির কামনা তাড়িত জীবনবোধ তৈরি করে মুহাম্মদী চেতনাবোধকে সুকৌশলে ব্যক্তি এবং সামাজিক জীবনবোধ থেকে বহু দূরে নিক্ষেপ করতে পেরেছে। যার ফলে ত্যাগের জীবনধারা তৈরিতে আমরা একেবারেই প্রস্তুত নই। কুরআন-সুন্নাহ-ইসলাম নিয়ে দেড় হাজার বছর ধরে পরস্পরের হিংসা-প্রতিহিংসার ইতিহাস সৃষ্টি করেই চলছি। প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের বেলায় একবার চিন্তা প্রবাহে আসে না কুরআন-সুন্নাহ কিংবা নবীজী অথবা ইসলামের কথা, তখন নিজের স্বার্থ, গোষ্ঠী কিংবা দল অথবা রাজনৈতিক স্বার্থই থাকে মূখ্য। একাত্তরের পাকিস্তানীদের বাঙালি হত্যাযজ্ঞ (যা তারা তখন ইসলামের নামেই চালাচ্ছিল) ধর্মের নামে আজও বাঙালি মানসে প্রজ্জ্বলিত। এখন ধর্মই হচ্ছে এই দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর হাতিয়ার। যারা সরাসরি সাইনবোর্ড লাগিয়ে নিয়েছে তাদের তো কথাই নেই, যারা সাইনবোর্ড লাগায়নি তারাও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এখন যথেচ্ছভাবেই চালিয়ে যাচ্ছেন। যার সাথে ধর্মের মূল চেতনা আত্মজিজ্ঞাসার ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। আত্মজিজ্ঞাসা এবং আত্মকর্ম বিশ্লেষণ ছাড়া যে ধার্মিক হওয়া যায় না সেই বোধ তৈরিতেই সাধকরা তাঁদের জ্ঞানভান্ডারকে উন্মুক্ত রেখে গেছেন মানব সমাজে, ব্যক্তির মানুষ হবার প্রায়শে শান্তিময় (ইসলামের) যাত্রায়। সমাজে ব্যক্তির বিশাল ভূমিকা এবং প্রভাব আছে, সে ক্ষেত্রে ব্যক্তির কর্মপ্রেরণা এবং প্রকাশই তার ধার্মিকতা। কর্মপ্রেরণায় বোধ থাকলে মানুষের চেতনায় শান্তিময়তা তৈরি হতে বাধ্য। এই সত্যই তাবৎ ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে সাধককূলের কর্মময় জীবন ও বাণীর মধ্যে নিহিত আছে।

সত্যকে উপলব্ধি করে ব্যক্তি স্ব-উদ্যোগী হয়ে অনুসন্ধানী পথে আরাদ্ধ আরাধনায় নিজেকে নিয়োজিত এবং নিমগ্ন করেই পথ তৈরি করতে পারে। এই পথ তৈরিতে তার প্রদর্শক অবশ্যই প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে খোঁজা ব্যতিরেকে বিকল্প কি? কিন্তু খুঁজে পেলেই তিনি পথ প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত থাকবেন এমন নিশ্চয়তা কোথায়? কিংবা উপস্থিতিই গ্রহণযোগ্যতা তা কি বলা যায়? কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত এই গ্রহণযোগ্যতা ব্যক্তি নিজে সৃষ্টি না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুর্শিদ জ্ঞান কি অতিকথন নয়? কাজেই মুর্শিদ বললেই মুর্শিদ তৈরি হয় না, তার জন্য প্রয়োজন কর্মপ্রচেষ্টা দ্বারা কর্মবৃত্ত সৃষ্টি। কর্মবৃত্ত সৃষ্টি করতে হলে জাগতিক মোহ চেতনার সকল সম্পর্কের যাকাত অর্থাৎ নিজের মধ্যে স্ব-খেয়ালের সমাধি। একটু পরিষ্কার করে বলা যায়, অভ্যাস বার বার পরিবর্তন করে জ্ঞান রাজ্যে প্রবেশের পথ করা। এই পরিবর্তনের ধারায় একটি পর্যায়ে স্বভাব তৈরি হয়। যা বর্তমান। এখান থেকেই নিজের সৃষ্ট শান্তিময়তার নয়া সাম্রাজ্যের বিস্তার। এই সাম্রাজ্যে নিজেই নিজের স্রষ্টা এবং নিয়ন্ত্রক।

কিন্তু সে তো বলা কথায় তৈরি হয় না, তার জন্য প্রয়োজন নিবিষ্ট চিত্তে আরাদ্ধকে আরাধনা। আর আরাধনার জন্য চাই প্রেম। দেখা শোনা জানা দেয়া নেয়ার মধ্যে কামনা আছে, প্রেম নেই। একমাত্র ভক্তির মধ্যেই প্রেম নিহিত।

জাগতিক ভালোবাসা দ্বারা জাগতিক কর্ম হাসিল করা যায় কিন্তু জ্ঞান জগতের আরাদ্ধ চেতনায় নিবিষ্ট হওয়া যায় না। একাগ্রচিত্তে নিবিষ্ট হতে না পারলে বস্তু মোহ মায়া থেকে নিজেকে উত্তরণ ঘটানো যায় না। নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করতে হলে চেতনা জগতে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হয় এবং তার জন্যই প্রয়োজন সমর্পণের। সমর্পণের ধারাবাহিক ক্রমবিকাশে জাগতিক বস্তুময়তার থেকে নিজেকে সুনির্দিষ্ট করতে সাহায্য করে। এখানেই ব্যক্তির বস্তুময় খেয়াল জগতটি ক্রমশ সংকুচিত হতে হতে এক-এ বিরাজমান থাকে।

যিনি করতে পারেন তখন আরাদ্ধ তার জন্য হন মুর্শিদ গুরু বা পিতা অথবা স্রষ্টা। তখনই মুর্শিদ তার অন্তরেই অবস্থান করেন, তার বন-জঙ্গলে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এই অবস্থাটির নামই মূলতঃ আত্মসমর্পণ। তিনি তখন তার সৃষ্টি জগতে প্রশংসিত এবং প্রশংসা তারই জন্য এবং তিনিই প্রশংসাকারী। এখানে আমাদের সাধারণ চিন্তাবোধ যেভাবে প্রশংসাকারী এবং প্রশংসিত নিয়ে যে বাধাধরা নিয়ম এবং সীমাবদ্ধতা তৈরি করে সাধারণ নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলবার চেষ্টা করছি – তা যে বিভ্রান্তিমূলক এবং তা দ্বারা আরাধনা জগতের আলোর পরিমাপও করা যায় না। সুতরাং আরবের আহম্মদ কখন মুহাম্মদ হলেন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ এখানে নিষ্প্রয়োজন। এখানে প্রয়োজন ব্যক্তির বিকশিত চিন্তা প্রবাহে শ্রদ্ধা ভালোবাসা, প্রেম ও ভক্তির সংযোজন।

একমাত্র প্রেম ও ভক্তির মধ্য দিয়েই মানুষ সৃষ্টি করতে পারে বা নিজে নিজেরই স্রষ্টা হতে পারে; যাকে বলে নিজেকে আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই ঘটে তার স্বাধীন সত্তার বিকাশ, যা অসীম এবং অনন্ত। তখনই আনন্দলোক চেতনায় আত্মবিলীনতা। নিঃসন্দেহে এটি সেকেন্ডের ঘটনা কিন্তু তার প্রস্তুতি দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে জীবনকে নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে পরিচালনা করে ভাব জগতে ঢুকতে হয়। ভাব জগত ছাড়া অনন্ত জ্ঞান জগতের সন্ধান কেউ কোনোদিন পায়নি পাবে না। কাজেই ভাব জগতের মধ্যেই আছে সেই সত্য যাকে মানুষ খুঁজে ফিরছে অনন্তকাল ধরে। প্রত্যেক সাধক বস্তুময় ব্যবহারিক জীবনকে অতি সচেতনভাবে পরিবর্তন করে তার নিজের সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাপ্রবাহকে একই পথে উর্দ্ধগমনে একই প্রবাহে প্রবাহিত করতে না পারলে মিলন বা মেরাজ সম্ভব নয়।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এবং সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দীন-এঁর বাণীগুলো ভক্ত আশেকান এবং সচেতন মানুষদের সেই জ্ঞান জগতের দিশা দেবার জন্যই মিরপুর আস্তানা শরীফ ও বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ অধীনস্থ সমগ্র দরবার শরীফে প্রতি শ্রাবণে মাসব্যাপী ধারাবাহিকভাবে আলোচনা পর্যালোচনা এবং তাৎপর্য অন্বেষণে অনুষ্ঠান করে আসছে। উদ্দেশ্য একটিই ব্যক্তির চেতনা জগতকে জাগ্রত রাখা ও শাণিত করা। লক্ষ্য একটি শান্তিময়তার দিকে সকল মানুষকে সচেতন করে তোলা।

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাধক নজরুল – ৩

Kaazi Nazrul Islam2
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বিশ্বজিত ঘোষ ॥ সাম্যবাদী নেতৃত্বের স্পর্শে মানবসম্প্রীতি ও সাম্যচিন্তায় নজরুল পেলেন ভিন্ন দর্শন কমিউনিস্ট নেতা মুজফফর আহমদ, বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সহ সমাজবাদী ও মানবতন্ত্রী নেতৃত্ব প্রচলিত ধর্ম ও সংস্কারের চেয়ে যে মানুষ অনেক বড় এই বোধে উজ্জীবিত করেছেন তাঁকে। কবি চিত্তের সহজাত মানবতাবোধ ও আত্ম-জৈবনিক এইসব অভিজ্ঞতা নজরুলের মানসলোকে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে নানামাত্রিক প্রণোদনা সঞ্চার করেছে। ফলে বাঙালি সমাজে তিনি আবির্ভূত হতে পেরেছেন একজন প্রকৃত মানবতাবাদী লেখক হিসেবে, একজন প্রকৃত দ্রোহী সাম্যবাদী কবি হিসেবে।
৪। ব্যক্ত হয়েছে যে, ব্যক্তির সহজাত মানস প্রবণতা এবং আত্ম-জৈবনিক অভিজ্ঞতা নজরুলের আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মৌল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই প্রেরণাতেই তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন, লিখেছেন একের পর এক গান। কিন্তু নজরুলের এই সম্প্রীতিবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রথম থেকেই কায়েমী স্বার্থবাদী মহল সহ্য করতে পারেনি। উভয় সম্প্রদায়ের স্বার্থান্বেষী চক্র তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছে, তাঁর সাহিত্যে পেয়েছে সংকীর্ণতার গন্ধ। মুসলমানরা ক্ষেপেছেন নজরুলের কবিতায় ভারতীয় দেব-দেবীর নাম দেখে, আর হিন্দুর রক্ত মাথায় উঠেছে, যখন দেখেছেন নজরুলের কবিতায় পশ্চিম এশিয়ার ঐতিহ্য জায়গা পেয়েছে, আর যখন তিনি ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন, তখন। বস্তুত, বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি কামনার জন্যই তিনি কবিতায় গানে একই সঙ্গে আল্লাহ্ ভগবান, মসজিদ মন্দির গীর্জা, মোহাম্মদ (সা.) কৃষ্ণ খালেদ অর্জুন, কুরআন বেদ-বাইবেল ত্রিপিটক প্রভৃতি অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে হজরত মোহাম্মদ (সা.) বিদ্রোহী সাম্যবাদী, কৃষ্ণ কঙসরূপী অত্যাচারী স্বৈরশাসকের ত্রাস, খালেদ নিপীড়িত মানুষের সেনাপতি, খলিফা ওমর সাম্য সুবিচার ও মানবতার প্রতীক, আর নটরাজ শিব ধ্বংস-সৃষ্টির যুগল স্মরণ। এ প্রসঙ্গে তাঁর দ্বিধাহীন উচ্চারণ :
এঁর কি মনে করেন হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিলেই সে কাদের হয়ে যাবে? তাহলে মুসলমান কবি দিয়ে বাঙলা সাহিত্য সৃষ্টি কোন কালেই সম্ভব হবে না জৈগুন বিবির পুঁথি ছাড়া। বাঙলা সাহিত্য হিন্দু মুসলমান উভয়ের সাহিত্য। এতে হিন্দু দেব-দেবীর নাম দেখলে মুসলমানের রাগ করা যেমন অন্যায়, তেমনি মুসলমানের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের মধ্যে নিত্য প্রচলিত মুসলমানী শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্য দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়। আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী; তাই তাদের এ সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব দেবীর নাম নেই।
নজরুল জানতেন এবং বুঝতেন শোষকশ্রেণীই সচেতনভাবে মানুষের মাঝে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। শোষকের ভিত যাতে সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর আঘাতে ভেঙে না যায় তাই তারা সর্বদাই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রাখে ধর্মকে শোষণের মৌল শক্তিতে পরিণত করে। এই শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে, এই ভন্ড ধার্মিকদের বিরুদ্ধে, এই নব্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছিল নজরুলের আমৃত্যু সংগ্রাম। তাই মার্কসবাদী সমাজতাত্ত্বিকের মতো তিনি ঘোষণা করেন এই অসামান্য উচ্চারণ : ‘হিন্দু-মুসলমানের দিনরাত হানাহানি জাতিতে-জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তুপের মতো জমা হয়ে আছে এই অসাম্য, এই ভেদ-জ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ-সুন্দর-সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। (নজরুল ইসলাম, ১৯৬৯:৩০০)
নজরুল ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি, বিদ্রোহ করেছেন ধর্ম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। একালে যেমন, তেমনি সেকালেও, ধর্মকে শোষণের উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই ভন্ড মোল্লা-মৌলভী আর পুরোহিতের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি ছিলেন সোচ্চার। রুদ্র-মঙ্গল গ্রন্থে তিনি লিখেছেন: হিন্দুত্ব মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায়, কিন্তু তাদের টিকিত্ব-দাড়িত্ব অসহ্য, কেননা ঐ দু’টোই মারামারি বাধায়। টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা হয়তো পান্ডিত্ব। তেমনি দাড়িত্ব ইসলামত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব। এই দুই ‘ত্ব’ মার্কা চুলের গোছা নিয়েই আজ এত চুলোচুলি। আজ যে মারামারিটা বেঁধেছে, সেটাও এই পন্ডিত মোল্লায় মারামারি; হিন্দু মুসলমানের মারামারি নয়। অবতার পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি, আমি ক্রীশ্চানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি, আলোর মতো, সকলের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তেরা বললে, কৃষ্ণ হিন্দুর; মুসলমানের ভক্তেরা বললে, মুহম্মদ মুসলমানের; খ্রীস্টের শিষ্যেরা বললে খ্রীস্ট ক্রীশ্চানদের। কৃষ্ণ-মুহম্মদ-খ্রীস্ট হয়ে উঠলেন জাতীয় সম্পত্তি। আর এই সম্পত্তিত্ব নিয়েই যত বিপত্তি। আলো নিয়ে কখনো ঝগড়া করে না মানুষ, কিন্তু গরু-ছাগল নিয়ে করে।’ (নজরুল ইসলাম,১৯৬৬:৭০৭)
বস্তুত, মানুষকে, মানুষের ধর্মকে নজরুল বড় করে দেখেছেন আজীবন। তিনি চেয়েছেন মানুষের কল্যাণ, সমাজের মঙ্গল, স্বদেশের স্বাধীনতা। তাই হিন্দু কিংবা মুসলমান নয়, বিদ্রোহের জন্য মানুষের প্রতিই ছিল তাঁর উদাত্ত আহ্বান। তিনি কল্পনা করেছেন এক সাম্যবাদী সমাজের, যেখানে নেই শোষণ, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িক বিভেদ:
গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা – ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান !
কে তুমি? পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো ?
কনফুসিয়াস? চ চেলা? বলে’ যাও, বল আরো।
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই।
(‘সাম্যবাদী’/সাম্যবাদী)
নজরুল ইসলাম বিশ্বাস করেন, ‘মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই; তাই মানুষকেই তিনি নিবেদন করেছেন তাঁর সকল শ্রদ্ধা, সকল ভক্তি ও ভালোবাসা। মানুষকেই তিনি সর্বদেশ, সর্বযুগ, সর্বকালের পরম জ্ঞাতি হিসেবে মেনেছেন এবং জেনেছেন:
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্।
নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি, সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
(‘মানুষ’ / সাম্যবাদী)
১৯১৮ সাল থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কবি নজরুলকে তীব্রভাবে ব্যথিত করে।
দাঙ্গার অমানবিকতা থেকে স্বদেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্য তিনি লেখনি ধারণ করেন। ১৯২৬ সালের জাতীয় কংগ্রেসের বঙ্গীয় শাখার প্রাদেশিক সম্মেলনের উদ্ধোধনী সঙ্গীত হিসেবে তিনি দাঙ্গার পটভূমিতে লিখলেন বিখ্যাত কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতা। ইতিহাসের নানা বাঁকেই হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি কামনায় নজরুলের সৃষ্টি ক্ষমপ্রজ্ঞা বারবার জ্বলে উঠেছে, মানুষকে দেখিয়েছে মুক্তির পথ।
মানুষের প্রতি অপরিসীম বিশ্বাস ও ভালোবাসা ছিল বলেই চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখেও নজরুল ইসলাম অবলীলায় শ্যামাসঙ্গীত আর বৃন্দাবন গীত রচনা করেছেন, লিখেছেন গজল, ব্যাখ্যা করেছেন তৌহিদের একেশ্বরতত্ত্ব। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সকল মানুষের কল্যাণ কামনা করেছেন। তাই যখন খন্ডিতভাবে ইসলামের সেবক হিসেবে তাঁকে উপস্থাপন করা হয়, তখন তাঁর শিল্পীসত্তাকেই অপমান করা হয়। তাঁকে গ্রহণ করতে হবে সমগ্র দৃষ্টি দিয়ে। মনে রাখতে হবে, তিনি যেমন হামদ নাত্ গজল লিখেছেন; তেমনি লিখেছেন কীর্তন আর শ্যামাসঙ্গীত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কালীকীর্তন ও না’ত রচনায় তিনি প্রায় সমার্থক চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন (মনিরুজ্জামান, ১৯৭২:৬১)। যেমন তাঁর একটি বিখ্যাত কালীকীর্তনে আছে:
আমার কালো মেয়ের পায়ের নীচে
দেখে যা আলোর নাচন
মায়ের রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব
যার হাতে মরণ বাঁচন।
আমার কালো মেয়ের আধার কোলে
শিশু রবি শশী দোলে
মায়ের একটু খানি রূপের ঝলক
ঐ স্নিগ্ধ বিরাট নীল গগন।
চাঁদ-সূর্যের এই চিত্রকল্প নজরুলের একটি অতি
পরিচিত না’তে একই ব্যঞ্জনায় নির্মিত হয়েছে:
তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে।
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।
যেন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি দোলে।
(জুলফিকার)
মানবাত্মার মুক্তিসাধনাই নজরুলের সাহিত্যকর্মের প্রধান অন্বিষ্ট। মানুষের অবচেতন সত্তায় তিনি জ্বেলে দিতে চেয়েছেন মানবিকতার আলো। ধর্মীয় কুসংস্কারকে তিনি অতিক্রম করেছেন মানবিকতার শক্তি দিয়ে তাঁর কাছে ধর্মের জন্য মানুষ নয় বরং মানুষের জন্যই ছিল ধর্ম। এই প্রাতিস্বিক মানববন্দনার পশ্চাতে নজরুলের সৃষ্টিশীল ঐতিহ্যচেতনা ছিল সদা-সক্রিয়। উত্তরাধিকারের ব্যাপকতা সম্পর্কে সচেতন নজরুল পশ্চিম এশীয় ইতিহাস এবং ভারতীয় ঐতিহ্যে শক্তির উৎস সন্ধান করেছেন বিদ্রোহকে বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রত্যাশায়। তাঁর এই শক্তি সঞ্চয় মূলত ধর্ম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য, অসত্য অমঙ্গল অকল্যাণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য, স্বৈরাচারী শাসককে আঘাত করার জন্য এবং ঔপনিবেশিক শক্তির ভিতকে কাঁপিয়ে দেয়ার জন্য। তাই নটরাজ শিব আর অসুরনাশিনী দুর্গার শক্তি কিংবা মোহররমের আত্ম-ত্যাগ আর মরুভাস্কর মোহাম্মদের (সা:) বিদ্রোহ তাঁর কবিতাত্মাকে উদ্দীপ্ত করে মানুষের মুক্তি কামনায়। সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে জন্ম বিদ্রোহী নজরুল সংগ্রাম করেছেন একক শক্তিতে আমৃত্যু কামনা করেছেন আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, কল্পনা করেছেন সুষম সমাজ ও মানুষের মুক্তি। (সমাপ্ত)

আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাধক নজরুল – ২

Kaazi Nazrul Islam2(পূর্ব প্রকাশের পর)

বিশ্বজিত ঘোষ ॥  ধর্মগ্রন্থ বা উপাসনালয়ের চেয়ে তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছে মানুষ – দ্বিধাহীনচিত্তে উচ্চারণ করেছেন মানববন্দনার অসামান্য এই পংক্তিমালা :

মানুষেরে ঘৃণা করি’

ও’ কারা কোরাণ, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’

ও মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,

যাহারা আনিল গ্রন্থ – কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,

পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল ! মূর্খরা সব শোনো,

মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।

আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ

কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর – বিশ্বের সম্পদ,

আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে

তাঁদেরি রক্ত কম বেশী ক’রে প্রতি ধমনীতে বাজে।

কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি ?

হয়ত উহারই বুকে ভগবান্ জাগিছেন দিবা রাতি!

                      [‘মানুষ’ / সাম্যবাদী]

৩। সূচনা সূত্রেই ব্যক্ত হয়েছে যে, সম্প্রদায় নিরপেক্ষ সম্প্রীতিবোধে নজরুলের মানসলোক ছিল আলোক উদ্ভাসিত। এক্ষেত্রে তাঁর ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার চেতনা যেমন কাজ করেছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তাঁর আত্ম-জৈবনিক অভিজ্ঞতা। নজরুল প্রতিভার উল্লেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্য এই যে, ভারতীয় মিথ-পুরাণ এবং পশ্চিম এশীয় ঐতিহ্য ব্যবহারে তিনি অর্জন করেছেন সমান সাফল্য। নান্দনিক ঐকান্তিকতায় এবং জৈবসমগ্র ঐক্যসূত্রে দুই ভিন্ন উৎসের শিল্প উপাদান নজরুল কবিতায় সৃষ্টি করেছে অভিজ্ঞানের একক সুর। এ-সূত্রে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নজরুলের ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার প্রসঙ্গটি। উত্তরাধিকারের ব্যাপকতায় নজরুল ইসলাম ছিলেন ঋদ্ধিশালী (মোতাহের, ১৯৭২ : ৩৪)। নজরুল জন্মসূত্রে ভারতীয়, তাই ভারতীয় উত্তরাধিকারকে তিনি আপন উত্তরাধিকার বলেই জেনেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে ধর্মসূত্রে তিনি ছিলেন পশ্চিম এশীয় তথা ইসলামের অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। তিনি সচেতনভাবে উভয় ঐতিহ্যকে লালন করেছেন আপন শিল্পীসত্তায়। তাই একই কবিতায় ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সার্থকভাবে তিনি মেলাতে পেরেছেন পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য। যে হাতে তিনি লিখেছেন শ্যামাসঙ্গীত, সেই হাত দিয়েই লিখতে পেরেছেন গজল আর ইসলামি গান। আপন ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা নজরুলকে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঐকান্তিক হতে বিস্তার করেছে অনেকান্ত সহযোগ।

নজরুলের আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা ও সম্প্রীতিচেতনা নির্মাণে পালন করেছে দূরসঞ্চারী ভূমিকা। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ন’ বছর বয়স থেকেই নজরুলকে উপার্জনের পথ বেছে নিতে হয়। শৈশবেই তাঁকে মোল্লাগিরি, মাজারের খাদেম, মসজিদের ইমামতি এসব কাজে নিয়োজিত হতে হয়। ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি জানতে এসব পেশা নজরুলকে ব্যাপক সহায়তা দান করে। ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যসূত্রে অল্প বয়সেই নজরুল জেনেছিলেন ইসলামি রীতিনীতি ও আদর্শ। ইসলামি রীতিনীতি অত্মস্থ করলেও নজরুল কেবল ইসলাম ধর্মের মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শৈশবেই তিনি পেয়েছিলেন মানব ধর্মের সারসত্তা। তাই বিশেষ কোনো ধর্ম নয়, বরং সকল ধর্মের প্রতিই তাঁর চিত্তে নির্মিত হলো ভক্তি ও ভালোবাসার অফুরান এক ফল্গুধারা। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় সুশীলকুমার গুপ্ত এর এই মন্তব্য :

যেখানে কীর্তন হত, কথকতা হত, যাত্রাগান হত,

মৌলবীর কোরান পাঠ ও ব্যাখ্যা হত, দুরন্ত বালক

গভীর আগ্রহ ও মনোযোগের সঙ্গে সেখানে ঘন্টার

পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতেন। বাউল, সূফী, দরবেশ,

সাধু-সন্ন্যাসীর সঙ্গে তিনি অন্তরঙ্গভাবে মিশতেন।

       [সুশীল কুমার, ১৩৮৪:৩৫]

জীবিকা নির্বাহের জন্য নজরুলকে লেটোর দলে গান রচয়িতার কাজ নিতে হয়েছিল। নিজস্ব ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে এবার তাঁকে জানতে হলো রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবত পুরাণের নানা গল্প ও অনুষঙ্গ। এর ফলে তাঁর মানস লোকের চেতনা হয়েছে আরও দৃঢ়মূল। ভারতীয় পুরাণ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে তাঁর চিত্তলোক নতুন মাত্রায় উদ্ভাতি হলো এবং আপন ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি নির্মাণ করতে সক্ষম হলেন তৃতীয় এক মাত্রা। উত্তরকালে নজরুলের কবিতা এবং গানে ভারতীয় মিথ-পুরাণের যে অনেকান্ত ব্যবহার, তার বীজ উপ্ত হয়েছিল লেটোর দলে গান বাঁধতে গিয়ে তাঁর আলোক-উদ্ভাসিত মানস মৃত্তিকায়।

কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ধর্মের বাহ্যিক আড়ম্বর বড় নয়, বড় হয়ে উঠেছিল মনুষ্যত্ববোধ। ভাগ্যের ছন্দহীন পথে তাঁকে কিছুদিনের জন্য থাকতে হয়েছিল ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকায়ত জীবনে বহমান অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ও সম্প্রীতি দেখে নজরুল ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। এ অঞ্চলে প্রচলিত গীতিকা, জারি, যাত্রা, করিগান, পালাগান ও পুঁথি পাঠের আসরে তিনি ছিলেন কৌত’হল শ্রোতা। রাত জেগে জেগে তিনি নানা ধরনের পরিবেশনা দেখেছেন এবং এভাবে নিজস্ব অসাম্প্রদায়িক চেতনাবিকাশে তিনি পেয়েছেন অফুরান শক্তি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় সমালোচকের এই ভাষ্য :

…এ অঞ্চলে [ময়মনসিংহ] বেশ যাত্রা, কবি ও খেমটা গান হ’ত আনাতেন অবস্থাপন্ন স্থানীয় হিন্দু জমিদারগণই। তখন পৌষসংক্রান্তি, দোল, দুর্গাপূজা ও অন্যান্য উৎসবে পূর্বধলা ও বৈলর জমিদার বাড়িতেও খেমটা, কবি, যাত্রা ইত্যাদি গানও হত – চলতো ৭/৮ দিন। ….এছাড়া স্থানীয় বা বাইরের জারী, ঘাটু এবং পুঁথির গান তো ছিলই। জায়গীর বাড়ীতে বালিশ কাঁথার নিচে শুইয়ে রেখে ছনের সেই ঘরের খোলা জানালা দিয়ে বের হয়ে যেত আসতো শেষ বাতে ঘুম ঢুলুঢুলু। নজরুল পরদিন শুকনির বিলের ধারে এসব গান আমাদের গেয়ে শোনাতো অবিকল, বিশেষ করে যাত্রার বিবেকের গান।  (মাহফুজউল্লাহ, ১৯৩৭ : ৪৯)

জীবিকার তাগিদে নজরুল যোগ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে এবং সে সূত্রে তাঁর স্বল্পকালীন করাচী বাস। করাচী পর্ব নজরুলের মানসলোকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে পালন করে দূরসঞ্চারী ভূমিকা। এসময় তিনি বিশেষভাবে পরিচিত হলেন ওমর খৈয়াম, রুমি, হাফিজ প্রমুখ কবির কবিতা ও জীবনাদর্শের সঙ্গে। পারস্যের এই করিদের রচনায় প্রচলিত ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মানবধর্ম বড় হয়ে উঠেছে। পরমত বা অন্য ধর্ম্মকে সম্মান জানান, সংস্কারমুক্তি ও প্রচল প্রথার বাইরে গিয়ে জীবন-যাপন ও মানবমুক্তির বাণী নজরুল পেয়েছিলেন এইসব কবিদের কাছ থেকে। করাচী ফেরৎ নজরুল কলকাতাবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সাহচর্য পেলেন তাঁর জীবনাচরণ ও ভাবনায় আবার ঘটলো পালাবদল। (চলবে)

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে দরবারে এসো আশেকান হিসাবে নারী-পুরুষ হিসাবে নয়

সূফী সাধক আনোয়ারুলহক এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে

॥ শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক কাজল ॥

যারা দরবারে গমনাগমন করেন তাদের উদ্দেশ্যে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক -এঁর নির্দেশ – ‘দরবারে এসো আশেকান হিসেবে নারী-পুরুষ হিসেবে নয়।’ দরবার কি? আভিধানিক অর্থে দরবার হচ্ছে – অভিজাত ব্যক্তির বৈঠকখানা বা কাছারি ঘর, যেখানে বিভিন্ন সমস্যাদি সমাধানের উদ্দেশ্যে সভা আহ্বান করা হয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়, কিংবা বিচার কার্য সম্পাদন করা হয়। সূফী সাধকদের দরবারও প্রায় একই অর্থ বহন করে। সাধকের দরবারে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ, বিভিন্ন বয়সের নারী ও পুরুষ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে গমনাগমন করে। সাধকের দরবারও একটা বিচারালয়। কিন্তু এ বিচারালয়ের বিচারের ধরনটা একটু অন্যরকম। এখানে সাধক প্রশাসক বা বিচারক নন। সাধক নিজে কারো বিচার করেন না, কোন রায় ঘোষণা করেন না। তিনি শুধু নিজের বিচার নিজে করার পদ্ধতিটুকু শিখিয়ে দেন। সাধকের দরবারে আসার উদ্দেশ্যও নিজের বিচার নিজে করতে শেখা। কিন্তু দরবার বলতে কেবল স্থানিক ঘর বুঝলে বাণীটির তাৎপর্য সীমিত ও সংকীর্ণ হয়। দরবার বলতে স্থানিক ঘর বুঝলে ধারণা করা হতে পারে যে, যখন স্থানিক দরবারের বেষ্টনীতে প্রবেশ করা হবে তখন নারী বা পুরুষ ভাব না  রেখে গমনাগমনকারীদেরকে আশেকান হিসেবে আসতে হবে। আর, দরবারের সীমানার বাইরে গেলে নারী-পুরুষ হিসেবে আচরণ করা ত্রুটিপূর্ণ হবে না। বাণীটির তাৎপর্য মোটেও এমন নয়। তাই ‘দরবার’-কে কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। যারা আত্মিক উন্নতির পথযাত্রী তাদের দরবার হচ্ছে ‘নিজ’, নিজের চিন্তার জগত ও ভাবজগত। দরবারের আশেকানকে নিজের মধ্যে একটা দরবার প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। নিজের মধ্যে দরবারে অধিষ্ঠিত করতে হয় নিজের মুর্শিদকে। এই মুর্শিদ-ই অন্তরগুরু। এই অন্তরগুরু প্রতিষ্ঠিত হলে আশেকান কখনো দরবারের বাইরে যেতে পারেন না। তিনি যেখানেই যান, দরবার তার নিজের মধ্যেই থাকে। কারণ, মানুষ নিজ থেকে পৃথক হতে পারে না। এমন কোথাও যেতে পারে না যেখানে সে ‘দরবার’ নিজের মধ্যে বহন করে না। তাহলে সে যেখানে যে অবস্থায় থাকবে সেখানে সে অবস্থায়ই আশেকান হিসেবে আচরণ করবে নারী-পুরুষ হিসেবে নয়। তাই দরবার বলতে এই বাণীতে কেবল স্থানিক দরবারের কথা বুঝানো হয়নি, নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত দরবারের কথাও বুঝানো হয়েছে।

জগতের কোন মানুষই বিশুদ্ধ নারী বা বিশুদ্ধ পুরুষ নয়। প্রতিটি মানুষই নারী-পুরুষ। কারণ, নারী এবং পুরুষের সম্মিলনেই নারী বা পুরুষের সৃষ্টি। প্রত্যেক মানুষই অর্ধেক নারী এবং অর্ধেক পুরুষ। উভয়ের মধ্যে কিছুটা দৈহিক পার্থক্য আছে বটে কিন্তু উভয়ের দেহ প্রায় একই নিয়মের অধীন। উভয়ের বেঁচে থাকার উপাদানও অভিন্ন।

মানব মস্তিষ্ক দুটি বলয়ে বিভক্ত। বাম বলয় এবং ডান বলয়। বাম বলয় ডান দিকের সাথে এবং ডান বলয় বাম দিকের সাথে সম্পৃক্ত। ডান বলয়ে রয়েছে স্বজ্ঞা, আবেগ কল্পনা, দিবা-স্বপ্ন, ধর্ম, কাব্য। এই ডান বলয়টি নারী শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। মস্তিষ্কের বাম বলয়ে রয়েছে – হিসাব, গণিত, দাম্ভিকতা, পেশিশক্তি, লোভ ইত্যাদি। এই বাম বলয়টি পুরুষশক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে দুই আছে সেখানে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। মানুষের বাম ও ডান এই দুটি বলয়ের মধ্যে অর্থাৎ হিসাব এবং আবেগের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে। তাই মানুষ চিন্তা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় করতে পারে না। নারী অস্তিত্বটা মানুষকে আবেগ, কাব্য, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিকতার দিকে টানে কিন্তু পুরুষ অস্তিত্বটা তাকে টানতে থাকে হিসাব, গণিত, অহঙ্কার এবং পেশিশক্তি প্রয়োগের দিকে। ফলে মানুষ জীবনের প্রতিটি কাজে দু’টানার মধ্যে থাকে। নিজের মধ্যে পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর ভারসাম্য করতে পারে না, কোন কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে না, একরৈখিক হতে পারে না। এই দু’টি শক্তির মধ্যে যখন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই মানুষ প্রতিষ্ঠিত হয় সিরাতাল মুত্তাকিমে। কোন একটা দিকে বিশেষভাবে আর ঝুঁকে পড়ে না। ফলে সহজভাবে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য সিরাতাল মুত্তাকিমে থাকা সবচেয়ে কঠিন কাজ। মানুষের অভ্যাস হচ্ছে একদিকে ঝুঁকে পড়া।

মানুষ যে দিকেই আকর্ষিত হয় সে দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই পতন ঘটে, সোজা হয়ে লক্ষ্যাভিমুখে যাত্রা করতে পারে না। নিজের মধ্যে পরস্পরবিরোধী এই শক্তি দুটির সমন্বয় সাধন করতে পারলে মানুষ আর শুধু নারী বা শুধু পুরুষ থাকে না, প্রতিটি মানুষ পরিণত হয় নারীপুরুষে। সমন্বিত এই নারীপুরুষ শব্দটি তখন দুটি শব্দ থাকে না। দুইয়ে মিলে তখন এক হয়ে যায়। এই দুইয়ে মিলে যখন এক হয় তখন তার অস্তিত্বে এমন একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে যে এই নবসৃষ্টিকে তখন বলা হয় ‘মানুষ’। মানুষ নারীও নয় পুরুষও নয়। এই নতুন মানুষ তখন পরিণত হয় আশেক বা আশিক-এ। আশেক অর্থ – প্রেমিক, মাশুক – প্রেমাস্পদ। সূফীতত্ত্বে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের সম্পর্ক। কিন্তু এই প্রেমিক এবং প্রেমাস্পদের মধ্যে কেউ নারী বা পুরুষ নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত নারী-পুরুষ ভাব থাকবে ততক্ষণ গুরু-শিষ্যের মধ্যে প্রেমভাব থাকে না। মাশুক তাঁর আশেকের হৃদয়ে প্রেমভাব সঞ্চার করেন। যে অবস্থায় উপনীত হলে শিষ্য সর্বত্যাগী হয়ে তাঁর আরাধ্য গুরুর চরণে নিজেকে নিবেদন করেন সে অবস্থাকে বলে প্রেম। এ অবস্থায় শিষ্য আত্মসুখ বিসর্জন করতে স্বতঃপ্রস্তুত। এই অবস্থায় আশেক আর সাধারণ মানুষ থাকেন না। প্রেমে আত্মহারা হয়ে সুধাকরের সুধাপানে যখন তিনি মাতোয়ারা, কামনা-বাসনার প্রতি যখন পূর্ণমাত্রায় বিতৃষ্ণ তখন নারী-পুরুষ ভেদ লোপ পায়। এ অবস্থায়ই আশেক তার মাশুকের সান্নিধ্য লাভ করে।

এ সম্পর্ক স্থাপন করা সহজ নয়। একদিন সাধক আনোয়ারুল হক বলেছিলেন, ‘দুই যুগে কত বছর হয়?। একজন উত্তর দিলেন – ‘২৪ বছর’। তিনি বললেন, ‘২৪ বৎসর লেগে থাকলে একজন আশেক হয়।’  ‘২৪ বৎসর লেগে থাকলে আশেক হয়’ – অর্থাৎ ক্ষণিকের ভাবোচ্ছ্বাস প্রেম নয়। বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ দরবারে আসে। অনেকেই আসে পার্থিব প্রত্যাশা নিয়ে। এসব জাগতিক প্রত্যাশা পূরণ হলে সাধকের প্রতি ক্ষণিকের প্রেমভাব জাগ্রত হয়। কিছুদিন যেতে না যেতেই এই ভাবোচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে। যে মানসিক অবস্থা থেকে সে দরবারে এসেছিলো আবার সে অবস্থায় পতিত হয়। এরকম ক্ষণস্থায়ী আবেগকে মুর্শিদের প্রতি প্রেম বলে না। আশেক হতে গেলে আবেগানুভূতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হয়।

‘নারী-পুরুষ হিসেবে নয়’ অর্থ – দৈহিক নারী-পুরুষ নয়, মানসিক নারী-পুরুষ। সহজ ভাষায় সাধক বলতে চেয়েছেন – ‘কামনা-বাসানা নিয়ে দরবারে এসো না, দরবারে এসো মাশুক বা গুরুর প্রেমের টানে।’ আধ্যাত্মিক সাধনায় কামনা-বাসনার নিয়ন্ত্রণ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যতদিন পর্যন্ত কামনা নির্বাপিত না হয় ততদিন প্রেমের উন্মেষ ঘটে না। নারী-পুরুষের পাস্পরিক দৈহিক আকর্ষণ, তা যত গভীরই হোক না কেন, কখনো প্রেম হতে পারে না।  নারী বা পুরুষের কাম আচরণ ‘স্বাভাবিক’ না হলে আত্মিক উন্নতির প্রচেষ্টা করার কোন সুযোগই তৈরি হয় না।

কয়েকটি শক্তিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় মানব জীবন বৃত্ত। এইসব কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সর্বাধিক মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ক্রিয়াশীল কেন্দ্রটি হচ্ছে – কামকেন্দ্র। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কামকেন্দ্র অন্য সবগুলো কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ মানুষের সকল কর্ম, কাম চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়। এ কেন্দ্র মানবজীবনে এতটাই আধিপত্য বিস্তার করে যে অন্যান্য কেন্দ্রগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না। ফলে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি, বিচারশক্তি ও সৃজনীশক্তি লোপ পায়, লয়প্রাপ্ত হয়। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের জীবনই কামকেন্দ্রমুখী। ব্যবসা, বাণিজ্য, শিল্প, বিনোদন যেদিকেই আমরা তাকাই না কেন সেদিকেই কামনা-বাসনার হাতছানি। যে কোন পণ্যদ্রব্যের বিজ্ঞাপনে নারীর ছবি ব্যবহৃত হবার পেছনেও এটাই কারণ। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, সিনেমা ইত্যাদির সিংহভাগ কামনা-বাসনাকে কেন্দ্র করে রচিত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, মানব জীবনে যেন কামনা-বাসনা ছাড়া আর কোন সমস্যাই নেই। কামকেন্দ্র অন্যান্য কেন্দ্রগুলো থেকে শক্তি না এনে শুধু মাত্র নিজস্ব শক্তি নিয়ে কাজ করলে এটা জীবনের জন্য, জীবনকে বিকশিত করার জন্য কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতো না।

‘দরবারে এসো আশেকান হিসেবে নারী-পুরুষ হিসেবে নয়’। এই বাণীটির তাৎপর্য তখনই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় যখন জীবনের বৃত্তের কেন্দ্রটি পরিবর্তিত হয়। কাম কেন্দ্র থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে মুর্শিদ কেন্দ্রিক জীবন রচনা করলেই কেবল আশেক হওয়া যায়। আশেক হলে নারী-পুরুষ ভাব থাকে না। নারী-পুরুষ এক হয়ে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত পুঁরুষে পরিণত হয়।

আধ্যাত্মিক পরিভাষায়, সামান্য ব্যতিক্রম ব্যতীত সকল মানুষই নারী। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের উপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না ততক্ষণ পর্যন্ত কেহই পুরুষ হয় না।