ধারাবাহিক

সুজন, কুজন আর আপনজন এই নিয়ে হয় জীবনযাপন

– শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক

‘আমি’ এক বৃত্ত। বৃত্ত রচনা না করে ‘আমি’ অস্তিত্বে শীল থাকতে পারে না। ‘আমি’ বৃত্তের কেন্দ্রে যিনি অবস্থান করেন তিনি আপনজন। যিনি কেন্দ্রের নিকটবর্তী তিনি সুজন। যিনি কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী তিনি কুজন। কুজন সীমালঙ্ঘনকারী। ‘আমি’র সীমানা অতিক্রম করে তিনি ‘আমার’ জগতে অবস্থান কারী, অহংবোধে অন্ধ। আপনজন আমির সাথে যুক্ত হয়ে ‘আমরা’।

‘কু এবং ‘সু’ অস্তিত্বের দুটি অবস্থান। অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে উচ্চ বা নিচ, মোটা বা সরু, উজ্জ্বল বা অনুজ্জ্বল, উৎকুচিত বা সঙ্কুচিত। কিন্তু আপনজন  – অস্তিত্ব।

কুজন ‘কু’ জনন করে, সুজন ‘সু’ জনন করে কিন্তু আপনজন ?  সু, কু উভয়কে গ্রহণ করে।

কুজন নিকৃষ্ট, সুজন ভাল, আপনজন উৎকৃষ্ট। উৎকৃষ্ট নিশ্চিন্তে চলে নিকৃষ্টের সাথে, সেই মধ্যম যে চলে তফাতে।

সুজন কুজন আর আপনজন এই নিয়ে হয় জীবনযাপন। সুজন আর কুজন উভয়েই ঘুরছে কিন্তু নিজে থেকে ঘুরছে না। কোন একটা কেন্দ্র তাকে ঘুরাচ্ছে। যে শক্তি তাকে ঘুরাচ্ছে সে ‘ক’ বা ‘স’। ‘ক’ বা ‘স’ এর সাথে ‘উ’ যুক্ত হয়ে ‘কু’ বা ‘সু’ হয়েছে। তাই পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করা শ্রেয়। কেন্দ্র শক্তি বিচ্ছুরণ করে টানতে পারলে তারা কেন্দ্রেই আসবে। আপনজন হবে। কেন্দ্রের এই টানাটানিই জীবন।

‘ক’ বা ‘স’ বিভিন্ন করণ শক্তি। আপনি আপনার হবার সাধানার সার কথা – এসকল করণ শক্তিকে একত্রিত করে বৃহৎ শক্তিতে রূপান্তর। শক্তি কখনও ‘কু’ বা ‘সু’ হয় না। শক্তিকে কুপথে বা সুপথে ব্যবহার করে কর্তা। কর্তা পরমশক্তির সাথে সংযোগ না রাখলে ‘ক’ বা ‘স’ শক্তির অধীনস্ত হয়ে ‘কু’ বা ‘সু’ কর্ম করে। সব কর্ম করা হয় শক্তি দ্বারা। শক্তি ব্যতীত কর্ম নাই। শক্তিকে দোষমুক্ত করার প্রশ্নই আসে না, আপনার অধীনে সকল শক্তির সমন্বিত কর্মেই আসে কেন্দ্রের নিকট্য। ফলতঃ কেন্দ্রে অবস্থান। বিভিন্ন করণ শক্তিকে একশক্তিতে রূপান্তর করতেও শক্তি লাগে। এ শক্তি আসে আপনজনের কাছ থেকে।

কে সুজন, কে কুজন তা নির্ণয় করে কে? যখন পার্থক্য জ্ঞান কাজ করে তখন তো আমিই কুজন। আমি এক নই বলেই আসে দ্বৈততা। আপন যদি হই আপনার তাহলে কী দিয়ে জানবো কে সুজন আর কে কুজন? আত্মার সাথে আত্মীয়তা হলে আত্মা চারিদিকে শুধু আত্মাকেই দেখে। চারিদিকে যা কিছু আছে সবই তো তিনি। কোথায় সুজন, কোথায় কুজন, সবই যে এক আত্মা।

ইন্দ্রিয়ের দুয়ারগুলো বাহিরের দিকে খোলা তাই তো দেখি সুজন-কুজন। যখন আপনজনকে দেখি তখন সবই তো এক আকার বা নিরাকার। আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন তো কিছু নেই। থাকবে কী করে? চোখ তো কিছু দেখে না, যে দেখে সে তো আপন। যে দেখে, শুনে, জানে, বলে, সে এক হলে দুই দেখবে কি করে?

আপনাকে জানতে হলে আপনবোধকেই যে জানতে হয়। চিন্তাকে জানতে হলে জানতে হয় চিন্তককে। কিন্তু চিন্তককে জানতে গিয়ে আমরা আটকে যাই চিন্তার জালে। ক্রমে হয়ে উঠি চিন্তাময়, পতিত হই ভ্রমে। কোথায় আপনজন? কোথায় পাবো তারে? চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আমরা এক আকার না হয়ে বহু আকারের হই। ইচ্ছে করলেই আমরা সব সময় চিন্তাকে তার নানামুখী বিচ্ছুরণ থেকে একে আনতে পারি না। যখন পারি না, কুজন-সুজন, আর যখন পারি – আপনজন।

সুজন-কুজন, আপনজন এতো অন্তর্বৃত্তিরই বিভাজন। একদিকে চিন্তার নানামুখী বিচ্ছুরণ অন্যদিকে কেন্দ্রের শক্তিতরঙ্গ। একদিকে জীবন জীবিকার টান, চাওয়া পাওয়ার কর্মপ্রমত্ত জগত, অন্যদিকে আপনজনের আকর্ষণ শক্তি। জীবনের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে আত্মা চায় আত্মীয়তা করতে। আবার জগতও চায় গ্রাস করতে আপনাকে। আপনজনের প্রেমের স্রোত যখন প্রত্যাশাকে ভাসিয়ে নেয় অকূলপানে তখন আসে আনন্দ।

চিন্তক ও চিন্তার মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন। চিন্তুক চিন্তাসাগরে ডুব দিয়ে ভেসে চলে প্রবাহে। ঢেউয়ের পর ঢেউ আসে কে রাখবে হিসাব? কীভাবে রাখবে? কতক্ষণ রাখবে? তাই চিন্তককে জানতে হলে ফিরে যেতে হয় অতীত স্মৃতির ভান্ডারে। ওখানে সমীক্ষকের তীক্ষ্মদৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয় সুজন-কুজনের অবয়ব। আমি কতটা সুজন-কুজন তা জানার এই উপায়। কিন্তু এ উপায়ে সফলতা আসে চিন্তক যখন অন্ধকার স্মৃতিভান্ডারকে আলোকিত করে। এজন্য  আপন থেকে পৃথক হয়ে জানতে হয় আপনাকে। চিন্তাতরঙ্গে ভেসে চিন্তককে যায় না জানা।

আমি সুজন বা কুজন এমন সিদ্ধান্ত নিলে তলিয়ে যেতে হবে। সুতরাং কোন বিচার বা সিদ্ধান্ত নয় নিস্পন্দ অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে আপনজনকে পর্যবেক্ষণ। আঁধারের অন্দরমহল থেকে যতটুকু আবিষ্কার করা যায়। এটা আবিষ্কার, বিচার নয়। বিচার করতে গেলেই সুজন-কুজন, আপনজনকে একসাথে নিয়ে জীবনযাপন করতে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে। আপনার সাথে আপনার দ্বন্ধে সৃষ্টি হবে স্ব-বিচ্ছিন্নতা। আবার হারিয়ে যেতে হবে আত্মবিভাজনের তমসায়।

একই কথা সত্য বহিঃজগতেও। কে সুজন, কে কুজন এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার কারও নেই। আমি যখন কাউকে সুজন বা কুজন বলি তখন নিজেই অন্যের জীবনের চৌহদ্দিতে প্রবেশ  করে সীমানালঙ্ঘনকারী হই। আমি যদি মানুষকে সত্য পথে সহযোগিতা করতে চাই তাহলে প্রথম শর্ত হলো – যে যেমন, তাকে তেমনভাবে গ্রহণ করা। যে যেমন তাকে তেমনভাবেই সৃষ্টি করেছে মহাশক্তি। নিশ্চয়ই তাকে দিয়েও কোন মিশন বাস্তবায়িত করতে চান তিনি। আর অন্যদিকে – সুজন, কুজন কেউ স্থিত নয়, ঘূর্ণায়মান। আজ যে সুজন, কাল সে কুজন। সুতরাং কোন মন্তব্য নয়, যে যেমন তেমনভাবে তাকে গ্রহণ করেই জীবনের পথে চলা। মানুষকে ভালোবাসা, নিজেকে ভালোবাসা। কাউকে ঘৃণা করা নয়। আমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবো, শ্রদ্ধা ও সম্মান করবো। এবং এইভাবে এক হবো সমগ্র সৃষ্টির সাথে। এতেই আছে শান্তি। তাই হোক।

নিজের কথা – ২৩

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥ তাপ তথা আলোকম-ল বায়ুমন্ডল জলমন্ডল ও ভুমন্ডল নিয়ে গঠিত আমাদের পরিবেশ। এ পরিবেশেরই উপাদান নিয়ে গড়ে ওঠে আমাদের স্থূল দেহকাঠামো। বলা হয় আগুন পানি মাটি বায়ু এসকল উপাদানই হল আমাদের স্থূল দেহের মৌলিক উপাদান। কিন্তু স্বাস্থ্য বিজ্ঞাপনের গবেষণা থেকে জানা যায়, সুস্থ দেহের জন্য যে শক্তির প্রয়োজন  তার মাত্র ৩০ শতাংশ শক্তির যোগান আসে আমাদের পরিবেশের এসকল মৌলিক উপাদান থেকে। যার ১০ ভাগ আসে জলমণ্ডল ও ভূমন্ডল থেকে এবং ২০ ভাগ আসে বায়ুমন্ডল ও তাপমন্ডল থেকে। আর বাকি ৭০ শতাংশ শক্তির যোগান আসে ব্যক্তির চেতনা জগতের চিন্তনশক্তি থেকে। তাই স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য কেবল পরিবেশের বিশুদ্ধ খাবার তাপ পানি বায়ুই যথেস্ট নয় বরং এর সাথে বিশুদ্ধ চিন্তন শক্তির পরিমিত যোগান নিয়মিত রাখা অত্যাবশ্যক ।

আমাদের স্থূলদেহজগত সুক্ষআত্মার আত্মিকশক্তির সাহায্যে পরিচালিত হয় এবং সুনির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনে অংশগ্রহণ করে থাকে। তাই বাহ্যিক দেহজগতের সুস্থ্যতা অন্তরের আত্মার সুস্থ্যতার উপর নির্ভরশীল। আমাদের স্থূল সুস্থ্য দেহজগতের জন্য আগুন (তাপ) পানি বায়ু মাটি ইত্যাদির বিশুদ্ধ খোরাক যেমন দরকার, তেমনি দরকার আত্মার সুস্থ্যতার জন্য আত্মিক বিশুদ্ধ খোরাকের। বিশুদ্ধ চিন্তন শক্তি হল আত্মার বিশুদ্ধ খোরাক। বিশুদ্ধ পড়া শোনা ও দেখার মাধ্যমে বিশুদ্ধ চিন্তন শক্তির যোগান দেয়া হয়। সুস্থ্য আত্মা একই সাথে শারিরীক মানসিক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জগতের কর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম। তাই স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ আমাদের জীবনের স্বাস্থ্যকে চার ভাগে ভাগ করেছেন। যথা – শারিরীক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য সামাজিক স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য । 

যে ব্যক্তি সাঁতার কাটা জানে আর যে জানেনা তাদের উভয় এর দেহ কাঠামো এক নয়। আর স্বাস্থ্যের অবস্থাও ভিন্ন। আবার যিনি সাঁতার শিক্ষা দেন আর যে শিক্ষা গ্রহণ করে তাদেরও দেহ কাঠামো এক নয় এবং স্বাস্থ্যেরও ভিন্নতা থাকে। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি কেবল অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে সাঁতার শিক্ষা দেন আর যিনি অর্থসহ সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সাঁতার শিক্ষা দেন তাঁদের উভয়ের দেহ কাঠামোও এক হতে পারেনা। স্বাস্থ্যের মধ্যেও ভিন্নতা থাকে। এ বিভিন্নতাকে বিচার করে সাঁতার না জানা ব্যক্তির স্বাস্থ্যকে শারিরীক স্বাস্থ্য ধরা হলে সাঁতার শিক্ষানবিশের স্বাস্থ্যকে মানসিক স্বাস্থ্য কেবল অর্থউপার্জনকারী সাঁতার শিক্ষকের স্বাস্থ্যকে সামাজিক স্বাস্থ্য এবং অর্থউপার্জন সহ সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণ বিবেচনাকারী সাঁতার শিক্ষকের স্বাস্থ্যকে আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য বলা যাবে।

স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, দৈহিক স্বাস্থ্য মানষিক স্বাস্থ্য সামাজিক স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য এ চার ধরনের স্বাস্থ্যের প্রভাব বিদ্যমান থাকে সুস্থ মানব দেহে। তাই সুস্থ মানবদেহের অধিকারী হতে হলে কেবলমাত্র নির্ভেজাল তাপ বায়ু জল স্থূল খাবার সামগ্রীই যথেস্ট নয় বরং পরিমিত নির্ভেজাল চিন্তা সামাজিক ও আধ্যাত্মিক খোরাকের নিয়মিত যোগান থাকা অত্যাবশ্যক হবে। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব?

মানবাত্মা মানব দেহের চালিকা শক্তি। মানবদেহ আত্মার উপস্থিতিতে জীবন্ত থাকে। আর আত্মার অনুপস্থিতিতে মৃত্যু ঘটে। তাই মানবের চেতনা জগতের কার্যকারিতা মানবাত্মার উপর নির্ভর করেই স্বক্রীয় থাকে।

আত্মা যতটা শক্তিশালী হবে মানবদেহ ততটাই সতেজ ও সুস্থ্য থাকবে। অপরদিকে আত্মা যতটা নিস্তেজ ও দুর্বল হবে মানব দেহ সেভাবেই অসুস্থ ও দুর্বল হতে থাকে। প্রশ্ন আসতে পারে আত্মা কিভাবে সতেজ ও দুর্বল হয়? দেহের সুস্থ থাকার জন্য যেমন পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ ও পরিমিত খাবার দরকার হয়, আত্মারও তেমনি সুস্থ্য থাকার জন্য নিয়মিত বিশুদ্ধ পরিমিত খাবারের দরকার হয়।

সতেজ আত্মার প্রাণশক্তি আছে। তাই আমরা যে নিস্প্রাণ খাবার দেহে গ্রহণ করি সতেজআত্মা সে সকল নিস্প্রাণ খাদ্য সামগ্রীকে প্রাণশক্তি ও দেহকোষে  রূপান্তর করে সুচারুভাবে আমাদের দেহের প্রয়োজনীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন করে। কিন্তু অসুস্থ নিস্তেজ আত্মা সুচারুভাবে আমাদের দেহের অঙ্গ – প্রত্যঙ্গের গঠনসাধন করতে পারেনা।

সবল আত্মার বিভিন্ন চিন্তন ক্ষমতার স্তর আছে। তাই আমরা চেতনা জগতের অচেতন অবচেতন প্রাকচেতন স্তরের বিষয়াদি মুখস্ত ও আত্মস্থ করে বিভিন্ন অনুমান ও ধারণার সাহায্যে বিভিন্নভাবে পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে চলতে পারি। কিন্তু অসুস্থ দুর্বল আত্মা চেতনাজগতের বিভিন্ন স্তরে বিচরণ করতে ও পরিবেশের সাথে খাপখেয়ে চলতে অক্ষম ।

সুস্থ্য সবল আত্মার ব্যক্তির মাঝে প্রেমশক্তি কার্যকর থাকে তাই তাঁরা স্বদেশপ্রেম প্রকিতি প্রেম পিতৃত্ব ভ্রাতৃত্ব মাতৃত্ব এ সকল গুনাবলীর মাধ্যমে কৃপা ক্ষমা ভাললাগা ভালবাসা সন্মান শ্রদ্ধা স্নেহ ভক্তি এসকল উদার মানবিক গুণাবলীর ব্যবহার করে পরস্পরের সাথে সাচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। অপরদিকে অসুস্থ দুর্বল আত্মার ব্যক্তি মানবিক গুণাবলীর সুষ্ঠ ব্যবহার করে অন্যদের সাথে সদাচারন করে চলতে পারেনা। তাই তারা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে চলার পথে পারস্পরিক কলহ ও অশান্তির মাঝে জীবনযাপন করে থাকে। সুস্থ্য সবল আত্মার হিতাহিত জ্ঞানশক্তি থাকে। তাই সহজেই জীবনের ভাল- মন্দ ন্যায় -অন্যায় মঙ্গল- অমঙ্গল যাচাই- বাছাই করে বিশুদ্ধ আনন্দলোকের জীবনযাপন করার সুযোগলাভ করে কিন্তু অসুস্থ্য দুর্বল আত্মা অজ্ঞতার করনে এসব যাচাই-বাছাই পুর্বক আনন্দলোকে জীবনযাপন করতে পারেনা। তাই তারা অধিকাংশই কর্মে ভুল করে দুরবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করে ।

সুস্থ্য সবল আত্মার আস্থা ও আত্মবিশ্বাস থাকে। সুস্থ্য সবল আত্মার জ্ঞানশক্তির কারনে কে প্রতারক কে প্রতারসক নয় কোনটি সত্য কোনটি সত্য নয় ইত্যাদির তফাত সহজেই ধরতে পারেন। তাই সুস্থ্য সবল আত্মা বিশ্বাস অতি খাঁটি ও অটল হয়। তাই তাঁরা সন্দেহমুক্ত জীবনযাপন করে থাকে। কিন্তু দুর্বল ও অসুস্থ্য আত্মার বিশ্বাস অজ্ঞতার কারণে নড়বড়ে ও ঠুনকো হয়। তাই তারা সন্দেহ প্রবণ ও নিরানন্দের জীবনযাপন করে থাকে।

সুস্থ্য সবল আত্মা পবিত্র। কারন তাঁরা জ্ঞানার্জন ও বিশ্বস্ততার কারনে তাঁরা সহজেই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করে থাকেন। (চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ১৯

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৬৪: শরীরের জন্য যেমন আহারের দরকার, আত্মার পুষ্টির জন্যও তেমনই আহারের দরকার। আত্মার আহার – সৎ চিন্তা, সৎ আলোচনা, উপসনা, জপ, ধ্যান, ধারণা প্রভৃতি।

দেখ! যে যার বেশি চিন্তা করে, তার প্রতিই মনের টান হয়। টান ও ভালোবাসা বৃদ্ধির সাথে সাথে চিন্তাও বেড়ে ওঠে। ফাঁক না দিয়ে ইষ্টকে চিন্তা করার নামই ধ্যান।

সাধারণত এক মিনিট পর্যন্ত ফাঁক না দিয়ে ইষ্টকে চিন্তা করার নাম ধারণা। পাঁচ মিনিট পর্যন্ত এমনি ফাঁক না দিয়ে চিন্তা করার নাম ধ্যান। ধ্যান গাঢ় হলেই সমাধি। কমপক্ষে আধঘন্টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন গভীর চিন্তাধারা প্রবাহিত থাকলে সমাধি হয়।

ধ্যান গাঢ় হওয়ার সাথে সাথেই বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলোর কাজ কমতে থাকে। সমাধি অবস্থায় বাহ্য ইন্দ্রিয়ে খিলি পড়ে। বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলো কোন কাজই করতে পারে না।

সমাধি দুই প্রকার-সবিকল্প ও নির্বিকল্প। যখন পর্যন্ত আমি ও তুমি থাকে তখন সবিকল্প, আর যখন এক হয়ে যায় তখন নির্বিকল্প।

উপদেশ-৬৫: ওরে! স্বর্গ ও নরক, এ দুটি সাধারণ লোকে, দুটি স্থান মনে করে। বাহ্যিকভাবে স্থান মনে করলেও এগুলো কোন স্থান নয়, এগুলো মনের স্তর মাত্র।

যখন দুঃখ, কষ্ট, শোক, অশান্তি ভোগ করে তা-ই নরক। আর যখন সুখভোগ করে, তা-ই স্বর্গ। দেখ, এমন একটা স্তর আছে, যেখানে দুঃখভোগ নেই আবার সুখভোগও নেই। এককথায় সেই স্তরে ভোগ বলে কোন জিনিসই নেই। শুধু শান্তি-পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন, দয়ালের সাথে ভক্তের মিলন। একমাত্র দয়ালের প্রেমিক ছাড়া আর কারও ইহা বুঝবার বা অনুভব করার শক্তি নেই। দয়ালের প্রেমিক স্বর্গ-নরকের বহু উপরে।

ওরে! দয়াল কখনও নিষ্ঠুর হতে পারেন না। মানুষ নিজ নিজ কর্মফলেই স্বর্গ ও নরক ভোগ করে।

পাপে যখন মানুষের মন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে, দুর্বল চঞ্চল হয়ে পড়ে, তখন আনন্দ উপভোগ করবার স্তরে সে আর থাকে না। জ¦র হলে দুধ পর্যন্ত ভালো লাগে না। সৎ কর্ম দ্বারা মন পবিত্র হলে সবকিছুতেই সে আনন্দ পায়। প্রকৃত স্বাস্থ্যবানের নিকট সবকিছুই ভালো লাগে।

ওরে! জীবাত্মা আর পরমাত্মায় কোন প্রভেদ নেই, মাত্র খন্ড অহংরূপ মোহের আবরণ কল্পনা করে পরমাত্মাই জীবাত্মা হয়েছেন। এই আবরণ তুলে দিলেই এক। সাধন, ভজন যাই করিস শুধু সেই আবরণ তুলবার জন্য।

উপদেশ-৬৬ : নামাজ কাকে বলে? যা দ্বারা মন পবিত্র হয়ে দয়ালকে স্মরণ হয় তা-ই নামাজ। দয়ালকে স্মরণ করাই নামাজের উদ্দেশ্য। মনকে দয়ালের কাছ হতে দূরে রাখলে নামাজের উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। প্রবৃত্তির বিষয়ে উচ্ছৃঙ্খল থেকে শুধু অজু গোছলের পবিত্রতা লয়ে লাফালাফি করে এবং কেবল অঙ্গভঙ্গি দ্বারা নামাজ আদায় হয় না। নামাজ হৃদয়ের জিনিস।

রোজা কাকে বলে? রোজা তিন প্রকারের – নিকৃষ্ট, মধ্যম ও উৎকৃষ্ট। আহার না করা নিকৃষ্ট শ্রেণীর রোজা। ইন্দ্রিয় সংযমী হওয়া, প্রবৃত্তিকে বশে আনা মধ্যম শ্রেণীর রোজা। একমাত্র দয়ালের- প্রেমময়ের চিন্তা ছাড়া অন্য চিন্তা না করা, অর্থাৎ দয়ালে মজনু হয়ে থাকাই প্রকৃত রোজা। জাকাত কাকে বলে? জাকাত অর্থ পবিত্র হওয়া, চক্ষে কু-দর্শন না করা, কানে কু-শ্রবণ না করা, মুখে কু-কথা, মিথ্যা কথা না বলা অর্থাৎ দয়ালের দেয়া জিনিসের অপব্যবহার না করা- সদ্ব্যবহার করাই জাকাত।

হজ্ব কাকে বলে? সৎ হয়ে, পবিত্র হয়ে দয়ালের কাছে যাওয়াই হজ্ব। হজ্বে যাওয়ার পূর্বে সকলের কাছে বিদায় নিতে হয়। তেমনি নিজের সমস্ত কিছু ভুলে দয়ালের সমাধিতে মগ্ন হওয়াই হজ্ব। দয়ালের নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণই হজ¦।

দেখ! দয়ালের প্রেমিকের নিকট সকল স্থানই সমজিদ, সকল দিনই শুক্রবার, সকল মাসই রমজান মাস। (চলবে)

হাক্কানী মর্মকথা

সংলাপ ॥ ‘আহলে-আল-হাক্ক’ অর্থাৎ সত্যের অনুসারীগণই হাক্কানী। ইসলামের আবির্ভাবের সাথে খ্রি. সপ্তম শতকে এমন কিছু সাধকের আবির্ভাব ঘটে যাঁরা আত্মিক উন্নতির জন্য কর্ম ও প্রেমের পথ বেছে নেন। তাঁদেরকে ‘আহলে-আল-হাক্ক’ বলা হতো।  

আরবি ‘হক’ শব্দের সাথে ‘নী’ প্রত্যয় নিয়ে ‘হাক্কানী’ শব্দটির উৎপত্তি। ‘হক’ অর্থ সত্য। ‘হক’ এর সাথে ‘নী’ প্রত্যয় যুক্ত হবার তাৎপর্য হলো – সত্যের সাথে একাত্মতা ঘোষণার নিশ্চয়তা। এইভাবে, হাক্কানী অর্থ হচ্ছে – সত্যের সাথে একাত্মত.

‘সত্যের সাথে একাত্ম’- অর্থ হলো ‘আমিই সত্য’ (আনাল হক) -এর ঘোষণা। ‘আনাল হক’ বা ‘আমিই সত্য’, ‘আমিই পরম সত্তা’ প্রথম এই ঘোষণাটি দিয়েছিলেন সূফী সাধক আবু মুসা ইবনে মনসুর হাল্লাজ। পরমসত্তার সাথে অভিন্ন সাধক নিজেই পরম সত্তা। কিন্তু বিভ্রান্তরা ‘আনাল হক’ ঘোষণাকে অংশীদারী বললো।

মানুষ সত্যের প্রতিনিধি অর্থাৎ মানুষ সত্যেরই অংশ। সাধনার মাধ্যমে অংশ সমগ্রতে নিজেকে বিলীন করতে পারে – এটা তারা বুঝতে চাইলো না। তারা ফতোয়া দিলো – সূফী সাধক মনসুর আল হাল্লাজ ইসলাম দ্রোহী। ‘আমিই সত্য’ ঘোষণাকে তারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করলো। এই ঘোষণাকে বাতিল বলে স্বীকারোক্তি আদায় করতে প্রথমে তাঁর উপর নির্যাতন চালানো হলো। চাবুক মারা হলো, দু’পা কেটে ফেলা হলো। তাঁকে ঝুলিয়ে রাখা হলো সারারাত। তবু তিনি তাঁর ঘোষণাকে প্রত্যাহার তো করলেনই না বরঞ্চ হাসি মুখে ভক্তদের নির্দেশনা দিয়ে চললেন। এক ভক্ত তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘হক, তোমার এই করুণ অবস্থা কেন?’ মুচকি হেসে সাধক মনসুর জবাবে বললেন, – “তাঁর আদরের প্রকাশ এরকমই; যে তাঁর সঙ্গে মিলন চায়, তাকে এভাবেই তিনি কাছে টেনে নেন”। তারপর কারাগার থেকে জল্লাদ আনা হলো, নির্মমভাবে হত্যা করা হলো সূফী সাধক মনসুরকে। তিনি আনন্দের সাথে বরণ করলেন সব নির্যাতন কিন্তু ত্যাগ করতে পারলেন না ‘হক’ বা ‘সত্য’-কে। কিভাবে করবেন? অংশ সমগ্রতে বিলীন হয়ে গেলে কি সেই অংশকে পৃথক করা যায়? একফোঁটা জল সমুদ্রের পানিতে মিশে গেলে কি এই ফোঁটাটাকে আবার সমুদ্র থেকে আলাদা করা যায়? যায় না। – এটাই সত্যের সাথে একাত্মতা। সত্যের সাথে যিনি একাত্ম, তিনি সত্যের জন্য সব ত্যাগ করতে পারেন কিন্তু সত্যকে ত্যাগ করতে পারেন না। কারণ, আমিই যখন সত্য তখন সত্যকে ত্যাগ করলে যেমন আমি থাকে না তেমনি আমিকে ত্যাগ করেও সত্য থাকতে পারে না। সত্য আর আমি একাকার হলে, অর্থাৎ – আমির সাথে সত্য এবং সত্যের সাথে আমি অবিচ্ছিন্ন, অবিচ্ছেদ্য হলেই সত্যের সাথে একাত্মতা হয়। এটাই ‘হাক্কানী’ শব্দের পারিভাষিক তাৎপর্য।

নিজেকে পরিশুদ্ধ করে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই এ হাক্কানীতত্ত্বের মূলকথা। যিনি নিজেকে তাঁর স্রষ্টার সাথে সংযুক্ত রাখার সাধনায় নিয়োজিত রাখেন তাকেও হাক্কানী বলা হয়। হাক্কানী তত্ত্ব তরিকত বা আল্লাহর প্রাপ্তির পথ। ‘তরীকা’ শব্দটি ‘তারীক’ শব্দ থেকে উদ্ভুত। তারীক শব্দের আভিধানিক অর্থ – পদ্ধতি, পথ, পন্থা, নিয়ম, প্রণালী। সূফী পরিভাষায় – ‘তরীকা’ শব্দটির পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে – সত্যের সাথে একাত্ম হবার – ‘আনাল হক’ বা ‘আমিই সত্য’ হবার নির্দেশিকা, নির্দেশনা, নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, পদ্ধতি বা প্রণালী।

যে যান পানির উপর দিয়ে চলে কিন্তু পানি যার ভেতরে ঢোকে না সে যানকে বাংলায় তরী বা নৌকা বলা হয়। হাক্কানী তত্ত্ব এমনই একটা তরী বা তরণসাধনীর নাম, যে সাধনী ব্যবহার করে নদী পার হয়ে ওপাড়ে যাওয়া যায় কিন্তু শরীর ভেজে না। সূফীতত্ত্বে এই তরণসাধনী একটা নতুন মাত্রা এনেছে। হাক্কানী তত্ত্ব বিশ্ব মানবতাকে আহ্বান জানায় – সংসারের জালে আবদ্ধ থেকেও উপনীত হওয়া যায় সাধনার সর্বোচ্চ শিখরে। ‘তুমি পানিতেই থাক, পানিতেই সাঁতার কাট কিন্তু রাজহংসের মতো হও, এমন হও যেন পানি তোমার শরীর ভিজিয়ে না দেয়। তরী চলার জন্য পানি লাগবেই। কিন্তু পানি থাকবে তরীর বাইরে। তরীর ভেতরে পানি ঢুকে গেলে তরী ডুবে যাবে। তুমি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না।’

যে ব্যক্তি জগতের জন্য কিছু করতে চায়, তাকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয় জগত যেন তার মধ্যে ঢুকে না যায়। জগত অত্যন্ত নিপুণভাবে মায়ার জাল বিস্তার করে রেখেছে। জগত ব্যক্তির মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করবার, ভেতরে ঢুকবার অবিরাম চেষ্টায় আছে, সমুদ্রের পানি যেমন অবিরাম চেষ্টা করে নৌকার ভেতরে ঢুকে যেতে। সুন্দর নর-নারী, তেজস্বী ঘোড়া, স্বর্ণালঙ্কার কোন কিছুর অভাব নেই এখানে। জগতের প্রতি এই মায়ার জাল ছিন্ন করা বড়ই কঠিন কাজ। একটু ছিদ্র থাকলেই পানি ঢুকে যায়। পানি ঢুকতে ঢুকতে ছিদ্রটা বড় হতে থাকে ফলে নৌকাডুবি হয়।

সমাজ ও সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাম, ক্রোধ, মোহ, ঈর্ষা ইত্যাদি কিভাবে উৎপন্ন হচ্ছে, কিভাবে পরম প্রকৃতির উপর আবরণ তৈরি করছে তা পরীক্ষা করা যায় না, জানা যায় না। সংসারের বাইরে থাকলে কাম-ক্রোধ উৎপন্ন করার মতো পরিবেশ থাকে না, ফলে তা উৎপন্ন নাও হতে পারে। ফলে কিছুদিন সংসারের বাইরে থাকলে এমন একটা ধারণার জন্ম হতে পারে যে এসবের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু আবার মানুষের মাঝে ফিরে এলেই টের পাওয়া যাবে, ‘এই ধারণা সঠিক ছিল না’। পরিবেশের প্রভাবে সুপ্ত শক্তিগুলো ভিন্ন পরিবেশে এসে শক্তি সঞ্চয় করে জাগ্রত হতে পারে। তাই সমাজ ও সংসার অর্থাৎ মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কই সত্যের সাথে একাত্ম হবার সঠিক পন্থা। পারস্পরিক সম্পর্কই জীবন। এমনকি সমাজ ও সংসারের সাথে যার কোন সম্পর্ক নেই তারও সম্পর্ক আছে জগতের সাথে, জীবনের সাথে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের মাধ্যমেই দ্বন্দ্ব, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, পরনির্ভরতা, পরচর্চা ও পরমুখাপেক্ষিতার অবসান ঘটিয়ে এর স্থলে স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা, প্রেম, শ্রদ্ধা ও ভক্তির সৃষ্টি করা যায়। জীবন চলার পথে নানান রকম মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়। পারস্পরিক সম্পর্কের মিথষ্ক্রিয়ায় উন্মোচিত হয় নিজের মধ্যে সুপ্ত পরম প্রকৃতি। তাই হাক্কানীতত্ত্বের মূল কথা – “অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ।”

অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় মুক্তির স্বাদ লাভের পদ্ধতিই “হাক্কানীতত্ত্ব”। হাক্কানীতত্ত্ব – “ভেতর থেকে বাহিরে” এবং “বাহির থেকে ভেতরে” এই দুটি পদ্ধতির সমন্বিত পথ নির্দেশনা। এই নির্দেশনার একটি দিক – ‘নিজ’-কে পর্যবেক্ষণ করা, অন্য দিকটি হচ্ছে – কিভাবে ‘নিজ’, জগত-সমাজ-সংসারের সাথে সম্পর্কিত হচ্ছে তা দর্শন করা। এই সমন্বিত পদ্ধতিতে সত্যের সাথে একাত্ম হবার সাধনায় রত থাকার নিমিত্তে হাক্কানীতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘হাক্কানী মিশন’। হাক্কানী মিশন হচ্ছে হাক্কানী তত্ত্বানুসারীদের সাধনার ক্ষেত্র। মিশনের মাধ্যমে দেশে এবং বহি:র্বিশ্বে হাক্কানী তরীকা তুলে ধরছে তার কর্ম, মানবতা ও শান্তির সূফীতত্ত্ব। এই তত্ত্বের লক্ষ্য হলো শান্তি, আদর্শ হলো মানবতা, মূলনীতি হলো কর্ম। সৃষ্টির প্রতি প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রেমার্জন হাক্কানী মিশনের মূল আদর্শ।

জীবন থেকে পালিয়ে নয়, জীবনের প্রবাহে থেকে জগতের অশুভ ও অকল্যাণের সাথে যুদ্ধ করে নিজেকে বিকশিত করা হাক্কানী নীতি। হাক্কানীতে হেরে যাওয়া মনোবৃত্তি, নিষ্ক্রিয়তা ও অসাড়তার কোন স্থান নেই। জীবনের সকল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দুঃখকে জয় করার শিক্ষা দেন হাক্কানী সাধকগণ।

বস্তুত: এটাই ছিল মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর শিক্ষা। কিন্তু কালক্রমে বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েছে নবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) প্রদর্শিত পথ। সত্য আর শান্তির যে বার্তা মরু-আরবে  মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নিয়ে এসেছিলেন সে বার্তার ভাবান্তর  ঘটেছে। ধর্মকে ব্যক্তি আর গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহারের তৎপরতায় মোহাম্মদী ইসলাম বা সাধনার ইসলাম রপান্তরিত হয়েছে স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ইসলামে। ধর্মের মর্মবাণীকে নির্বাসনে ঠেলে একে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থ করার বর্ম হিসেবে। ফলে ধর্ম হয়েছে লুন্ঠন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার এবং শোষিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সম্পদ পিপাসু আর ক্ষমতা লিপ্সু রাজারূপী আরব, তুর্কি আর পার্সিয়ান দস্যুদের তরবারির খাপে করে ভারতীয় উপমহাদেশে ১২০৪ সালে ঢুকে পড়েছিল এই মতলবি ইসলাম। প্রাচীন বাংলার গৌড়ের রাজা লক্ষণ সেনকে পরাস্ত করে দস্যু ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গ বিজয় করেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। বখতিয়ার খিলজি এদেশে শান্তির ধর্ম ইসলামের সাম্য আর মৈত্রীর বাণী নিয়ে আসেনি, এসেছে মতলবি ইসলামের হিংস্রতা ও বর্বরতা নিয়ে! তৎকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ উস সিরাজসহ সমকালিন ঐতিহাসিকদের বিবরণে জানা যায়, বখতিয়ার খিলজি ও তাঁর পরবর্তী শাসকরা সে সময় হিন্দু মন্দির আর বৌদ্ধ বিহারগুলো কেবল ধ্বংসই করেনি, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নিধনে চালিয়েছিল গণহত্যা। অবাধে লুন্ঠন করেছিল মন্দির আর বৌদ্ধ বিহারে থাকা সোনা-দানা আর ধনসম্পদ। এর বিপরীতে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তার আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী এদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেন সূফী দরবেশগণ। যাঁরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন ত্যাগ, প্রেম আর মানবসেবা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বখতিয়ার খিলজিরও শত বছর আগে সূফী দরবেশ বাবা আদম ধর্ম প্রচারে এসেছিলেন বাংলায়। তারপরই পাওয়া যায় শাহ্ মোহাম্মদ সুলতান রুমীর নাম। যিনি ধর্ম প্রচার করে গেছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলে। এই সাধকদেরই হাত ধরে বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রহণ করেছিল শান্তি ধর্ম ইসলাম। খিলজি ও তার উত্তরসূরী  তথাকথিত মুসলমান শাসকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক ইসলাম ভারতবর্ষে তার স্থান করে নেয় ক্ষমতাকে ঘিরে। তবে আচার সর্বস্ব এই রাজনৈতিক ইসলাম ভারতবর্ষে ইংরেজ রাজত্ব পূর্ব পর্যন্ত ঘোরতর শান্তি বিনষ্টের কারণ হয়নি কখনও। তারও কারণ অবশ্য ওই ক্ষমতা। ভারতবর্ষে মুসলমান নামধারী এই শাসকদের আচার সর্বস্ব ধর্মের প্রচার প্রসার নিয়ে ভাবনা ছিল না। ক্ষমতাকে ধরে রাখার এবং ক্ষমতা বিস্তারের দিকেই তাদের মনোযোগ ছিল। গোল বাঁধলো যখন শুরু হলো এদেশে ইংরেজ রাজত্ব। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার চিন্তা থেকে ইংরেজরা এদেশে নিয়ে আসলো ঘৃণ্য বিভেদ নীতি। ইতিহাসে যা কুখ্যাত হয়ে আছে উরারফব ধহফ জঁষব চড়ষরপু নামে। এই নীতি ভারতবর্ষের প্রধান দুই ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু আর মুসলমানকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বিশেষ করে হাজার বছরের অভিন্ন বাঙালি সত্তা মুখোমুখি হয়ে পড়ে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক বৈরিতায়। আনুষ্ঠানিকতা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক ইসলামকে ইংরেজ সর্বাত্মক সুচতুর পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, কখনো প্রকাশ্যে কখনো নেপথ্যে। উদ্যোগ নেয় আচারসর্বস্ব মোল্লা তৈরির কারখানা-মাদ্রাসা শিক্ষার। এরই অংশ হিসেবে ১৭৮১ সালে ইংরেজরা প্রতিষ্ঠা করে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা। একের পর এক ইংরেজ পাদ্রীদের অধ্যক্ষ করে তাদের ভাবধারায় এদেশে বিস্তার ঘটে মাদ্রাসা শিক্ষার।  আরবে এই নিকৃষ্ট রাজনৈতিক ইসলামের মতাদর্শগত নেতৃত্ব দেয় যা পরিচিত লাভ করে ওহাবী ভাবধারা নামে। এই ওহাবী ভাবধারাই গত শতকে আবির্ভূত হয় রাজনৈতিক ইসলাম রূপে। ইংরেজ মদদপুষ্ঠ শান্তিধর্ম বিনাশি এই ওহাবি ভাবধারা উত্তর ভারতে নিয়ে আসেন স্যার সৈয়দ আহমদ (১৭৮৩-১৮৩১)। আর বাংলাদেশে এই বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এনায়েত আলী (১৭৯৪-১৮৫৮) এবং কেরামত আলী (১৮০০-১৮৭৪) তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া নামে আন্দোলনের মাধ্যমে। সমসাময়িক কালেই এদেশে ওহাবি ভাবধারা ছড়িয়ে দেয়ায় ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে ফরিদপুরের শরিয়ত উল্ল্যাহকে (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজি আন্দোলন নামে। এই তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া এবং ফরায়েজি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাঙালি মুসলমানদেরকে ধর্মের মর্মমূল থেকে তুলে এনে কেবলি গোঁড়া আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব করে তোলা।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটে আনুমানিক ১৮৩০-৪০ সালে ভারতীয় মুসলমান বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের সত্যের পথ দেখাতে আর্বিভাব ঘটে একজন মহান সূফী সাধকের। এই সাধক  আজানগাছী নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর জন্ম আজকের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। আত্মপ্রচার বিমুখ এই সাধক নাম পরিচয় মুছে দিয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তাঁর গাঁয়ের নামে। হাওড়া ও হুগলি এই দুই জেলার সঙ্গমস্থলে রূপনারায়ণ নদীর তীরে ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই আজানগাছী গ্রাম অবস্থিত। গ্রামের নাম এরূপ হওয়ার কারণ যতদূর জানা যায়, গাছে উঠে এক ব্যক্তি আজান দিয়েছিলেন এবং এই আজানের শব্দ যতদূর শুনা গিয়েছিল ততদূর জুড়ে এলাকার নাম হয়েছিল আজানগাছী। জানা যায়, কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাগ্রহণ করতে যেয়ে তাঁর সত্যপিপাসু চিত্তে ধরা পড়ে ধর্মব্যবসায়ীদের স্বরূপ। ধর্মের নামে প্রতারণাপূর্ণ আচার সর্বস্বতা, ভোগের ছড়াছড়ি আর হিংসা হানাহানি দেখে সত্যের অন্বেষণে ব্রতী হন তিনি। ত্যাগের মন্ত্রে সমর্পিত হয়ে ডুব দেন সত্যের সাধনায়।

২৫ বৎসর বয়সে সত্যের মহা আকর্ষণে সংসারের মায়াজাল ছিন্ন করে তিনি গৃহত্যাগী হন। ঘুরতে থাকেন  দেশ থেকে দেশান্তরে, সান্নিধ্যে আসেন বিভিন্ন তরিকার  সূফী সাধকদের। বহুদেশ ভ্রমণ শেষে তিনি কলকাতার উত্তরে শুড়ার জঙ্গলে গভীর তপস্যায় আত্মনিয়োগ করেন।  জানা যায়, সাধনার প্রথম অবস্থায় তিনি সপ্তাহে একদিন লোকালয়ে এসে কিছু ছোলা নিয়ে যেতেন। দিনান্তে একবার আহার করতেন। আগুনের সাহায্যে প্রস্তুত কোন খাদ্য গ্রহণ করতেন না। পরবর্তীকালে গাছের পাতা ও পানি দিয়ে ক্ষুদা-পিপাসা নিবারণ করতেন। এইভাবে একনিষ্ঠ সাধনায়  ১৫ বছর কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন লোকালয়ে। সর্বপ্রথম মধ্য কলিকাতার মির্জাপুরে মানুষদের আহ্বান জানাতে থাকেন ধর্মের মর্মপথে। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগ বাধাপ্রাপ্ত হয়।সঙ্ঘবদ্ধ কাবুলী সম্পদ্রায় তাঁকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে। তিনি বুঝতে পারেন – ধর্মের নামে প্রতারণাপূর্ণ আচার সর্বস্বতা আর লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় আল্লাহকে পাওয়া যায় না। স্রষ্টাকে পাওয়ার সহজ ও মোক্ষম উপায় হচ্ছে মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা। তাই সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে কলিকাতার মানিকতলা খালের পূর্ব পারে বাগমারী রোডে আসেন এবং সেখানে অনাথ মল্লিক নামে একজন হিন্দু জমিদারের বস্তিতে কিছু জায়গা বন্দোবস্ত নিয়ে সেখানে একটি বেড়ার ঘর তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হাক্কানী আঞ্জুমান’ নামক একটি সংগঠন। হাক্কানী আঞ্জুমানের মধ্য দিয়ে তিনি সত্যকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালান। সাধারণ মানুষের ঝোঁক থাকে কি করে আরও ধন-সম্পত্তি অর্জন করা যায় কিন্তু তাঁর ঝোঁক ছিল কিভাবে এবং কত শীঘ্র সর্বস্ব আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে মানবতার সেবায় বিলিয়ে দেয়া যায়। এইভাবে ত্যাগের মন্ত্রে সমর্পিত হয়ে তিনি ডুব দেন সত্যের সাধনায়। তাঁর সুদীর্ঘ সাধনার জীবনে উপলব্ধি করেছিলেন -‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’

১৯৩২ সালের ১৯ ডিসেম্বর বাংলা ১৩৩৯ সালের ৪ পৌষ লোকান্তরিত হন এই মহান সাধক রাজধানী কলকাতায়। ঠিক চার বছর পর যেখানে ১৯৩৬ সালে আর্বিভাব ঘটে তাঁরই উত্তর প্রজন্ম সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর। তবে হযরত আজানগাছী সূচিত হাক্কানী ভাবধারা সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আরেক মহান সাধক পুরুষ হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দীন শাহ্ কলন্দর গউস পাক। যিনি ছিলেন হযরত আজানগাছীরই ভাবশিষ্য – সুযোগ্য উত্তরসূরী।

সূফী সাধক হযরত আজানগাছী, হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ পরম্পরায় সত্যের সাথে একাত্ম হবার তত্ত্বকে ধারণ-লালন-পালন করে আমরা হাঁটছি হাক্কানী হবার অন্তহীন অভিযাত্রায়।

নিজের কথা – ২২

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন, ‘মানুষ নিজের সাথে নিজেই সবচেয়ে বেশী প্রতারণা করে।’ প্রশ্ন আসে প্রতারণা কি? কেন কিভাবে মানুষ নিজের সাথে প্রতারণা করে থাকে?

মানুষ অন্তরে যা চায়না বাহিরে তেমন কিছু প্রদর্শন করে অন্যকে ফাঁকি দিয়ে স্বার্থ হাসিল করে থাকে। মানুষের এমন কর্মকেই প্রতারণামূলক কর্ম বলা হয়। প্রতারণাকারীকে প্রতারক বলা হয়। প্রতারণার অপর নাম মুনাফেকী বা দ্বিচারিতা।

প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মঙ্গল চায়। কিন্তু কর্মের নিয়ম অনুসারে যে যেমন কর্ম করে সে তেমনিই কর্মফল ভোগকরে থাকে। অর্থাৎ যে ভাল কর্ম করে সে ভাল কর্মফল ভোগ করে। আর যে মন্দ কর্ম করে সে মন্দ কর্মফল ভোগ করে থাকে। অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিজেই বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে নিজেই নিজের ক্ষতি সাধন করে থাকে।

প্রতারণা করার উদ্দেশ্য অন্যের ক্ষতি সাধন করে নিজে লাভবান হতে চাওয়া। কিন্ত বাস্তবে বিবেকের অশান্তির ছোবলে পড়ায় সে প্রকৃত লাভবান হতে পারেনা। ব্যক্তির নিয়ত মন্দ হওয়ার কারণে তার কর্মফল মন্দ হয় এবং পরিণতি তার স্বার্থের প্রতিকুলে আসে ও অশান্তি ভোগ করতে হয়। প্রশ্ন আসতে পারে কিভাবে প্রতিকুলে যায়? যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতিসাধন করতে চাই তাকে পরিশুদ্ধ চিন্তাথেকে সরে এসে নোংরামির করার চিন্তার মধ্যে নেমে আসতে হয়। ফলে তার মস্তিস্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতা লোপ পায় এবং নোংরামি চিন্তাশক্তির কারণে বিকৃত মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে ভালোলাগার পরিবেশ বিলুপ্ত হয় এবং মন্দলাগার পরিবেশ কার্যকর হয়। ফলে ব্যক্তির মানষিকতা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। সাথে সাথে মন্দলাগার প্রভাব দেহের উপর পড়তে থাকে। ফলে দেহের সুস্থ্যতার বিঘ্ন ঘটে এবং অসুস্থ্যতার কারণ হিসেবে নানামুখী অসুখ কার্যকর হতে থাকে। এছাড়াও ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আত্মীয় অনাত্মীয় শত্রুতে পরিণত হয়। পারস্পরিক কলহ বাড়ার ফলে এক সময় পরিবেশ বসবাসের অনুপযুক্ত হয়। পরিশেষে ব্যক্তির বাঁচার জন্য পরিবেশ ত্যাগ করে নিজেকে নতুন পরিবেশে স্থানান্তর করতে হয়। এভাবে অন্যের সাথে মন্দ ব্যবহার তথা প্রতারণা করার পরিনতি নিজের উপরই এসে পড়ে।

স্বার্থের ভুবনে ব্যক্তির লোভ মোহ হিংসা পরশ্রীকাতরতা ঈর্ষা এ সকল দুর্বল চিন্তাশক্তির প্রভাব এতবেশী প্রকট হয় যে ব্যক্তি তার হিতাহিত জ্ঞানশক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে অতি ভোগমাত্রা ব্যক্তির মাঝে বিষয় ভোগ আসক্তির প্রভাব বাড়িয়ে তোলে যা ক্রমেই ব্যক্তির মাঝে মধুমোহ বা ডায়াবেটিক্স ব্যধির সুত্রপাত ঘটায়। এ ব্যধির কারণে ব্যক্তির দেহে নানান জটিলতা সৃষ্টি হয় ও জীবনিশক্তি দুর্বল করতে থাকে। পরবর্তীতে মানুষ অতিমাত্রার ভোগলিপ্সা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ক্রমেই জীবনিশক্তির দুর্বলতা বৃদ্ধি পায় ও মরনব্যধিতে রূপ নেয়। স্বার্থের জগতে প্রতারণায় ফাঁদে আটকে পড়ে ব্যক্তির চেতনা জগতের জ্ঞানশক্তির প্রভাব ক্রমেই লোপ পেতে থাকে এবং অজ্ঞতার প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ব্যক্তি ক্রমেই হিতাহিত জ্ঞানশুণ্য হতে থাকে এবং নানাবিধ ভুলভ্রান্তির মাঝে জড়িত হয়। ফলে নানাধরনের অসুখ-বিসুখ রোগ ব্যধিতে আক্রান্ত হতে থাকে। যার প্রভাবে ব্যক্তি ক্রমেই অসুস্থ্য বিত্তশুণ্য যন্ত্রণা ও অশান্তির মাঝে পতিত হতে থাকে। এভাবে ব্যক্তি প্রতারণার সাথে জড়িত হয়ে অজ্ঞতার মাঝে পতিত হয় এবং নিজেই নিজেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। এ প্রসংগে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘অভাব নয় অজ্ঞতাই সকল ভুলের মূল।’

বাণীর ‘নিজের’ শব্দটির অর্থ – ব্যক্তি যে সকল বিষয়ের উপর অধিকার বজায় রাখে বা রাখতে চেয়ে কখনো কখনো সুখ-দু:খ কিংবা আনন্দ-বেদনা পেয়ে থাকে।

বাণীর ‘নিজেই’ শব্দটিতে ব্যক্তির স্বয়ং স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বকারী সত্ত্বা তথা আত্মাকে বুঝায়। যে সত্ত্বা ¯্রষ্টার নিকট থেকে এসে ব্যক্তির দেহজগতের প্রতিপালনের দায়িত্ব পালনে রত থাকে আবার ¯্রষ্টার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে চায়। এ সত্ত্বা ব্যক্তির অর্জিত জ্ঞানশক্তির ক্ষমতানুসারে ব্যক্তির চেতনা জগতের বিভিন্ন স্তরে (অচেতন, অবচেতন, প্রাকচেতন, স্বচেতন, দ্বৈতচেতন, উর্ধচেতন ও পরমচেতন) কর্মরত থাকতে সক্ষম। শাস্ত্রমতে এ সত্ত্বাকে বলা হয় কখনো ‘নফস বা আত্মা , আবার কখনো ‘রূহ্ বা প্রভুর নির্দেশ’, আবার কখনো আদ্যাশক্তি স্বয়ং স্রষ্টা। যার মাঝে থাকে বিভিন্ন আদ্যশক্তির (প্রাণশক্তি চিন্তাশক্তি প্রেমশক্তি ভাবশক্তি ইচ্ছেশক্তি জ্ঞানশক্তি বিশ্বাসশক্তি আনন্দ – শান্তিশক্তি ইত্যাদি শক্তির) সমাহার। হাক্কানী (সত্যনিষ্ট) চিন্তনপীঠে আত্মাকে বলা হয় চৈতন্যশীলদেহ।

জ্ঞানীগুণীজন চেতনাজগতের সচেতনস্তর হতে জ্ঞানশক্তির আলোকে আলোকিত থেকে জীবন চালার পথে স্রষ্টার সান্নিধ্যলাভ (পরম শান্তি) তথা জীবনের লক্ষ্যাভিমূখে কর্ম করতে সক্ষমতা অর্জন করেন বিধায় প্রতারণা বিহীন সফল জীবনলাভ করতে পারেন। অন্যথায় সাধারন ব্যক্তি অজ্ঞতার অন্ধকারে থেকে জীবনের লক্ষ্য (পরম শান্তির কথা) ভুলে গিয়ে নিজের পরিবার সংসার বিষয়-আশয় এর প্রতি নজরদারী ও সময়ব্যয় করে নিজেই নিজেকে সবচেয়ে বেশী প্রতারিত করতে থাকে চিরজীবন। (চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ১৯

উপদেশ-৬১: আচ্ছা বল দেখি! শরিয়ত কাকে বলে? অর্থ সৎপথ। দেখ! যে হিংসা, নিন্দা করে না, মিথ্যা বলে না, অন্যের ক্ষতি করে না, ইন্দ্রিয়ের অধীন নয়, লোভী নয়, দয়াল ভক্ত-এক কথায় যে সৎ, সে-ই প্রকৃত শরিয়তী। যেখানে শরিয়ত সেখানে বিবাদ নেই, বিসংবাদ নেই, বিচারেরও দরকার পড়ে না. -দলাদলি-ফালাফালি নেই।

দেখ, তুই যদি দাড়ি রেখে, মাথায় টুপি দিয়ে, নামাজ পড়িস, রোজা করিস কিন্তু যদি দলাদলি, হিংসা, টুরি, লোভ, নিন্দা করিস, মিথ্যা কথা বলিস, তবে তোর শরিয়তী কোথায়’রে! তুই একজন বড় শরিয়তী বলে লম্বা লম্বা কথা বলিস। আচ্ছা জিজ্ঞেস করি, তোর নামে এত মামলা কেন? তোর আমার দল কেন? অমুকের উন্নতিতে, হিংসায় তোর পেট ফেটে যেতে চায় কেন?

বাজারে বেশ্যাদের দেখছিস না কেমন শক্ত বেড়া দিয়ে আব্রু তৈরি করে। কিন্তু সেই বেড়ার ভেতর নরকের খেলা। তেমনি যদি বাহ্যিকভাবে সাধু হস, শরিয়তী হস, তবে বেশ্যাদের চেয়ে আর বেশি ভালো কিসে?

উপদেশ-৬২: খাওয়ানোতে একটা পুণ্য আছে। কোন কিছুতেই ‘না’ নেই, কিন্তু খাওয়ায় ‘না’ আছে। দেখ! যাকে খাওয়াবি, এই খাওয়ার ফলে তার যে শক্তি হয়, সেই শক্তি দ্বারা সে যে কাজ করে, তার ফলের ভাগী তুইও হবি। যদি সৎ কাজ করে, তারও ভাগী হবি। তাই সাধু, মহাপুরুষ, অলি-আওলিয়া, দরবেশদের দেখা পেলে খাওয়াবার চেষ্টা করতে হয়।

তবে কি ক্ষুধায় কাতর অপরিচিত লোককে খাওয়াবি না? নিশ্চয় খাওয়াবি। তবে একটা ভাব নিয়ে। মনে করবি, এই লোকটির ভেতর দিয়ে তোর দয়ালকে খাওয়াচ্ছিস! দেখ! জামাই যদি আসে, তখন কত বাজার খরচ? বড় মাছ, দুধ, দই আনিস কিন্তু অতিথিরূপে তোর দয়ালকে খাওয়াবার সময় কি করিস ? ফলও তেমনি হয়। খাওয়াবার সময় যখনই দয়ালকে খাওয়াচ্ছিস্ মনে না করবি, তখনই যাকে খাওয়াবি তার কৃতকর্মের ফল, সে ভালোই হোক আর মন্দই হোক-অংশী হবি।

যারা বেশি খায়, তাদের আয়ু কম হয় প্রায়ই বেশি খানেওয়ালা গরিব হয়। যারা বেশি মেহনতের কাজ করে, তারা হয়তো কিছু বেশি খায়, তাই বলে কি দুই-তিন জনের খাদ্য খাবে?

বেশি খানেওয়ালা কখনও দয়াল ভক্ত হতে পারে না, তাদের কাম, ক্রোধ, লোভ এগুলো বেশি হয়। বেশি খেলে সমস্ত শক্তি হজম করতেই চলে যায়, -আলস্য হয়, সাধন-ভজন কি প্রকারে হবে?

বেশি উপবাস থাকাও উচিত নয়। পেট যদি চো চো করে, তখন ভালো-মন্দ জ্ঞান থাকে না, অল্পতেই তেতে ওঠে, দয়ালের চিন্তা করবে কি?

উপদেশ-৬৩: স্বজাতি, স্বজাতিকেই আকর্ষণ করে। গাঁজাখোর আর এক গাঁজাখোরকে দেখলে কেমন আনন্দ করে! দয়ালভক্ত, আর এক দয়ালভক্তকে দেখলে আপন মনে করে,- আনন্দ পায়।

কোথায়ও দয়ালের আলোচনা হচ্ছে, সেখানে যদি কোন সংসারী, বদ্ধ-জীব যায়, তার একটুও ভালো লাগবে না। হয়তো ঘুমিয়েই পড়বে, নয়তো একটা ছুতা ধরে চলে আসবে। কারণ সে যে সেখানে একটুও আনন্দ পায় না। আবার যদি কোন ত্যাগী ভক্ত, কোন কারণে বদ্ধ সংসারী লোকের সংস্পর্শে আসে, তবে তার নিকট নরকবৎ মনে হয়।

এক ভক্ত, আর এক ভক্তের আপদে-বিপদে সাহায্য করতে ছুটে আসে। গাঁজাখোর হয়তো নিজের ভাইকে দু’পয়সা দিয়ে সাহায্য করবে না, আবার অন্য এক গাঁজাখোরকে দশ টাকা দিয়ে দেবে।

এক রাজার অতি প্রিয় একটি তোতাপাখি ছিল। একবার বিদেশে যাওয়ার সময় রাজা তোতাকে বলল, ‘তোমার যদি কোন কিছু বলবার থাকে তবে বল।’ তোতা বলল ‘অমুক দেশে অমুক বনে আমার স্বজাতিরা বাস করে, তাদের নিকট বলবেন যে, আমি সোনার খাঁচায় আপনার বাড়িতে আছি।’

বহুদিন ঘুরতে ঘুরতে রাজা সেই বনে তোতার স্বজাতিদের দেখতে পেলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের এক ভাই, আমার বাড়িতে সোনার খাঁচায় আছে। তোমাদের এ সংবাদ বলতে বলেছে।’ একথা শুনা মাত্রই সর্দার তোতাটি গাছ হতে পড়ে মরে গেল। অন্য তোতাগুলোও এক এক করে পড়ে মরে গেল। রাজা আশ্চর্য হয়ে, বাড়ি ফিরে এসে তোতাকে সে কথা জানালেন। তোতা সে কথা শুনেই পড়ে মরে গেল। রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। চাকরকে মৃত পাখিটাকে ফেলে দিতে বললেন। খাঁচা হতে খুলে ফেলে দেয়ার সাথে সাথে তোতা জীবিত হয়ে বনের দিকে উড়ে চলল। রাজাকে ডেকে বলল, ‘আমি বদ্ধ ছিলাম, এই সংবাদ আমার স্বজাতিরা জানতে পেরেই মুক্তির পথ আপনাকে দিয়েই ইঙ্গিতে পাঠিয়ে দিল।’ ‘জীবিত থাকতেই মরতে হবে।’

দেখ, যখনই কেউ তাঁকে পাওয়ার জন্য সাধন, ভজন করে বা তাঁর জন্য কাঁদে তখনই সমস্ত সাধকের-ভক্তের মহাপুরুষদের আর্কষণ তার উপর এসে পড়ে, আশীর্বাদ আসতে থাকে। (চলবে)

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য – ১৬


‘যে মুর্শিদকে দর্শন করতে সচেষ্ট হয়েছে তার হজ্বের যাত্রাও শুরু হয়েছে।’ – সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন

‘মুর্শিদ আমি খুঁজবো নাকো বন জঙ্গলে যাইয়া, আমার মাঝে আমার মুর্শিদ আছে যে পথ চাইয়া।’ – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

‘মুর্শিদকে দর্শন ও স্মরণের মধ্যেই রয়েছে দরবারের আশেকানদের পরম প্রাপ্তি।’- সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ মুর্শিদই যে সবকিছু তাতে কোন ভুল নেই। ফকির লালন সাঁই বলেন-‘যেহি মুর্শিদ সেইতো রাসুল ইহাতে নেই কোন ভুল খোদাও সে হয় – লালন কয়না এমন কথা কোরআনে কয়’। ‘হে আল্লাহ্ – কে বোঝে তোমার অপার লিলে, তুমি আপনি আল্লাহ – ডাকো আল্লাহ্ বলে’। ‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার’। সাঁইজীকে কেউ হিন্দু বানায়, কেউ মুসলমান বানায় কিন্তু কি কথা তিনি বল্লেন তা তলিয়ে দেখেনা। সাঁইজী এমন চিন্তার উত্তর দিয়েছেন এই বলে ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এক নজরে’। 

হাক্কানী চিন্তনপীঠ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রকাশ করে যাচ্ছে – ‘বাঙালির জন্য বাঙালি সাধকই পথ প্রদর্শক’। সত্য প্রতিষ্ঠার অনন্য এই যাত্রায় পরিচয় করিয়েছেন বাংলার সাধকদের সঙ্গে।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ নিজেকে লুকিয়ে রেখেই নানান ভাবে অত্যন্ত নিপুণ হাতে চালিয়েছেন এই কর্মকান্ড। সমস্ত কর্মকান্ডের মধ্যে নিজের গুরুকে রেখেছেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এক মুহূর্তের জন্যও অসচেতন হননি। গুরুনিষ্ঠার চরম ও পরম পরাকাষ্ঠা ফুটে উঠেছে সমগ্র জীবনব্যাপী। তারপরও একজন সাধককে কতটা চেনা-জানা সম্ভব? অজানা অচেনাই থেকে যায় বিশালের বিশালত্ব। তাই বলেন- ‘দুঃখ বলব কার সনে, দরদী নাই মোর এই ভূবনে।’ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর এই কথাটির উল্লেখ করতেন প্রায়ই। না জানার, না বোঝার কষ্টটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ –

ঠাকুরের দুই পাখি কবিতায় এভাবে-

খাঁচার পাখি ছিলো সোনার খাঁচাটিতে,

বনের পাখি ছিলো বনে,

একদা কি করিয়া মিলন হলো দোহে,

কি ছিলো বিধাতার মনে।

বনের পাখি বলে খাঁচার পাখি ভাই,

বনেতে যাই দোহে মিলে,

খাঁচার পাখি বলে বনের পাখি আয়,

খাঁচায় থাকি নিরিবিলে,

বনের পাখি বলে না- আমি শিকলে ধরা নাহি দিব,

খাঁচার পাখি বলে হায়-আমি কেমনে বনে বাহিরিব।

বনের পাখি গাহে বাহিরে বসি বসি,

বনের গান ছিলো যত,

খাঁচার পাখি পড়ে শিখানো বুলি তার,

দোহার ভাষা দুই মত

বনের পাখি বলে, খাঁচার পাখি ভাই,

বনের গান গাও দেখি,

খাঁচার পাখি বলে, বনের পাখি ভাই,

খাঁচার গান লহ শিখি।

বনের পাখি বলে, আকাশ ঘন নীল,

কোথাও বাঁধা নাহি তার,

খাঁচার পাখি বলে, খাঁচাটি পরিপাটি,

কেমন ঢাকা চারিধার।

বনের পাখি বলে, আপনা ছাড়ি দাও

মেঘের মাঝে একেবারে,

খাঁচার পাখি বলে, নিরালা সুখ কোনে,

বাঁধিয়া রাখ আপনারে।

বনের পাখি বলে, না, সেথা কোথা উড়িবারে পাই,

খাঁচার পাখি বলে হায়- মেঘে কোথায় বসিবার ঠাঁই

এমনই দুই পাখি, দোহারে ভালোবাসে,

তবুও কাছে নাহি পায়,

খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে, পরশে মুখে মুখে,

নিরবে চোখে চোখে চায়

দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে,

বোঝাতে নারে আপনায়,

দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা,

কাতরে কহে কাছে আয়।

বনের পাখি বলে, না- কবে খাঁচায় রুধে দিবে দ্বার,

খাঁচার পাখি বলে, হায়-মোর শক্তি নাহি উড়িবার।

বুঝতে না পারা, বুঝাতে না পারার, এ এক বোবা কষ্ট, এ এক যন্ত্রনা। জগৎ জুড়েই রয়েছে-কেউ কাউকে না বোঝার, না চেনার কষ্ট। অবশ্য স্বীকৃত গুরু-শিষ্যের ব্যপারটি আলাদা।

নিজেকে চেনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন সকল সত্যমানুষগন সর্বকালে। অথচ প্রচলিত ধর্মাচরণে এ এমন একটি ব্যাপার উপেক্ষিতই রয়ে গিয়েছে যা মানুষের মুক্তির একমাত্র মূলমন্ত্র। সবচেয়ে চিন্তার ব্যপার হচ্ছে এযাবৎ কাল যত মহামানব নিজেকে জানতে বা চিনতে বলেছেন তাঁরা কেউই বলে যাননি নিজেকে কিভাবে চিনতে হবে এবং কেউই এটাকে কোড অব লাইফ করে যাননি, কেন? সেখানে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে? এটাও গবেষণার ব্যাপার, চিন্তার ব্যপার। তবে এটুকু বলা যায় সবাই একারনেই হয়তো এটাকে পাশ কাটিয়ে গেলেও বাজারজাত করার সুযোগ পায়নি। নিজেকে চেনার ব্যপারটি মুক্তই রাখা হয়েছে। এখানে গবেষণার ব্যাপার রয়ে গিয়েছে। তবে এটা বলা যায় প্রতিটি মানুষ অনন্য। তাদের সার্বিক অবস্থাও অনন্য। তাই প্রত্যেকের নিজেকে চেনার পথ পদ্ধতি সবই অনন্য-ই হবে। কোন নিয়মে কোন সীমায় তা বাঁধা যাবেনা। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন-‘নিজেকে চেনা ব্যপারটি এপ্রোপ্রিয়েট না। নিজেকে চেনা ব্যপারটি নিয়ে পড়ে গেলাম ফাপরে, কেউ কি নিজেকে চিনতে পারে? শুধু চেনা বললে একটা জায়গা দেয়া যায়। কেউ নিজেকে চিনতে পারেনা তবে মুর্শিদকে চিনতে পারে। মুর্শিদকে চিনলে নিজেকে চেনা যায়। মুর্শিদ দর্শনের মাঝে আত্মদর্শন, আত্মদর্শনের মাঝে আল্লাহ্ দর্শন।’ ‘দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য, অন্যের কথায় নয়’। ‘যে যত বুঝতে গেছে সে তত পড়ছে পিছে, অজ্ঞান হলে থাকতো কাছে, পেয়ে যেতো সাথে সাথে চলার পথে’। পড়ে গেলাম বিধির বামে। যতক্ষণ পর্যন্ত উপলব্ধি বোধ না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত এটার প্রকৃত সত্যটা সে ধারণ করতে পারবে না, লালন করতেও পারবে না। দ্বিচারিতা থাকবে। ‘মহব্বত না হোতে কুছ নেহি হোতে’।

‘আঘাত ছাড়া মানুষ নিজেকে চিনতে পারবে না’। লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে যে কোন ধরণের যন্ত্রণা আপনাকে সমৃদ্ধ করবে। দেখা ও শোনার মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, জানা ও চেনার মধ্যে তার চেয়ে অনেক বেশী পার্থক্য আছে। আর একদিন বলেছিলেন- ‘যদি আমাকে চিনে থাক, যা কিছু করবে মাফ পাবে, আর যদি আমাকে না চিনে থাক, যা কিছু করবে, তার ফল তোমাকেই ভোগ করতে হবে। অভাবে চিনতে পারলে স্বভাবে চেনা সহজ হবে। আপন-এঁর দুটো দিক আছে, এক আপন হলো নিজ, আর এক আপন হলো কাউকে আপন করে গ্রহণ করে থাকলে। আত্মদর্শনের দুটো দিক আছে, একটা বাহ্যিক, আর একটা অভ্যন্তরীন। চেনার শুরু কোথা থেকে? মানুষ কেন নিজেকে চিনতে চায়? কোন অনুপ্রেরণায়? আট হাজার বছর ধরে চেনার কথা বলা হলো। সক্রেটিসেরও বহু আগে। নিজেকে চেনার তিনটি জায়গা আছে- আমি, তুমি, সে। সত্য না চিনলে, উপলব্ধি করা যায় না। চিন্তার জগতে অবিরাম নিজেকে ব্যস্ত রাখার ও আত্মস্থ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে নিজেকে চেনা যায়। জাত না চিনলে পরে নাম ধরে ডেকে তারে সাড়া কি পাওয়া যায়? নিজেকে চিনতে হবে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। ‘এক’ এ না আসলে উপলব্ধি হবেনা। উপলব্ধি না হলে নিজেকে চেনা যাবেনা। আগে পাঠ কর। পাঠ করতে আর একজনের সহযোগিতা লাগে। দেখতে, শুনতে, জানতে, বুঝতে হয়। তারপর চেনা। আমার মূল্যায়ন আমি নিজে করি। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কয় মিনিট লক্ষ্যের সঙ্গে যোগ করি?’

নিজের কাজতো নিজেকেই করতে হবে। কারো আশা করা যাবেনা। নিজের সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুদ্ধ কে করে দিবে! কারো যুদ্ধ কি কেউ করতে পারে? বরং সব চারপাশ বৈরী হয়ে উঠবে। এটাই স্বাভাবিক। ছোটবেলা অনেক গল্প পড়েছি, শুনেছি। তখন এই গল্পগুলো নিছক বাচ্চাদের জন্য মজার গল্পই মনে হতো। দরবারি জীবনে এসে দেখলাম এগুলো মানব জাতির জন্য দিক নির্দেশনায় পূর্ণ। এমনই একটি গল্পের কথা বলব আজ যা জীবন চলার পথের প্রতিটি জায়গায় স্মরণে আসে। নীচের ক্লাশের পাঠ্য ছিলো এটি। গল্পটি হলো এরকম-ধান ক্ষেতের মধ্যে সারস পাখির বাসা, মা সারস সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আসলে ছানারা কহিল, ‘মা আজ চাষী মজুরকে ধান কাটিতে বলিয়াছে, চল পালাই’। মা কহিল, ‘কাল মজুর আসিবেনা’। পরের দিন সত্যিই মজুর আসিল না। মা বাসায় আসলে ছানারা আবার ও কহিল, ‘মা, চাষী তার ছেলেকে কাল ধান কাটিতে বলিয়াছে, চল পালাই’। মা কহিল্ল, কাল ছেলেও আসিবেনা। পরদিন সত্যিই ছেলেও আসিল না। মা বাসায় আসলে আজও ছানারা কহিল, ‘মা কাল চাষী নিজেই ধান কাটিতে আসিবে, চল পালাই’। মা কহিল, ‘কাল চাষী অবশ্যই ধান কাটিতে আসিবে। চল আজ পালাই’।

কি পেলাম এই গল্পে আমরা? চিন্তাজগতের কোন খোরাক কি পাওয়া গেল? (চলবে)

জীবনশৃঙ্খল

মুক্তির জন্য উদগ্রীব, অথচ জীব তার শৃঙ্খলকেই ভালবাসে। এই হল মানুষের স্বভাবের প্রথম প্রহেলিকা ও দুর্ভেদ্য গ্রন্থি। জন্মের বন্ধন মানুষ ভালবাসে, তাই  জন্মের দোসর মৃত্যুর বন্ধনে হয় সে আবদ্ধ। যাবতীয় শৃঙ্খলের মধ্যে থেকেই সে তার সত্তার মুক্তি, তার আত্মপরিপূর্ণতার আকাঙ্খা করে। মানুষ ক্ষমতাকে ভালবাসে, তাই সে দুর্বলতার অধীন। শক্তির যত তরঙ্গরাজি পরস্পরের সাথে এসে মিলিত হচ্ছে, পরস্পরের উপর নিরন্তর প্রতিহত হচ্ছে, তাদের নিয়ে যে এক মহাসাগর তাই হল জগৎ। কোন তরঙ্গের শিখরে যে আরোহণ করবে, তাকে আর শত তরঙ্গের আঘাতে অভিভূত হতে হবে। মানুষ ভালবাসে সুখ, তাইতো তাকে শোকের বেদনার ভার বহন করতে হয়। অমিশ্র আনন্দ কেবল মুক্ত রাগবর্জিত অন্তঃপুরুষের জন্য; মানুষের মধ্যে সুখের অন্বেষণ করে চলে যে বস্তু তা হল একটা দুঃখভাগী কৃচ্ছপ্রয়াসী কর্ম্মর্শক্তি। মানুষের ক্ষুধা প্রশান্তির জন্য, তবে, সেই সঙ্গেই আবার চঞ্চল চিন্তার আর উদ্বেল হৃদয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করবার তৃষ্ণাও তার আছে। ভোগ বলতে বোঝে তীব্র বিক্ষোভ, আর প্রশান্তি তার কাছে জড়তা ও বৈচিত্র্যশূন্যতা। মানুষ ভালবাসে তার দৈহিক সত্তার সসীমতা, তবুও সে চায় আবার তার অসীম আর অমরাত্মার অবাধ মুক্তি। মানুষের ভিতরে একটা কি জিনিস আছে যা এই সব বৈরূপ্যের মধ্যে পায় এক বিচিত্র রস। তার চিন্তাময় সত্তা এ সকলকে জীবনের কারুকার্য হিসাবে গ্রহণ করে। কেবল অমৃত নয় বিষও তার রসনাকে, তার কৌতূহলকে আকৃষ্ট করে। সকল জিনিষেরই অর্থ আছে। সকল বিরোধ থেকেই মুক্তি লাভ করা যায়। প্রকৃতির যোগাযোগ যতই খেয়ালী হোক তার মধ্যে একটা পদ্ধতি রয়েছে, তার গ্রন্থি যত জটিল হোক, মীমাংসা তার আছে। জীবনের কাছে প্রকৃতি নিরন্তর যে প্রশ্ন করে চলেছে, তারই নাম মৃত্যু। মৃত্যুর ভিতর দিয়ে প্রকৃতি জীবনকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন এখনও নিজেকে পায়নি। মৃত্যুর আক্রমণ আদৌ না থাকলে জীব একটা অসম্পূর্ণ জীবনযাত্রার মোড়কে চিরকাল আবদ্ধ হয়ে থাকত। মৃত্যু তাকে অনুসরণ করে চলেছে বলেই তো জীব  জীবনের আদর্শ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে, আর তার উপায় এবং কি ভাবে সম্ভব তার আবিষ্কার করে চলেছে। দুর্বলতাও ঠিক সেই একই পরীক্ষা, একই প্রশ্ন নিয়ে এসেছে, আমাদের গৌরব যত সামর্থ্য মহত্ব তাদের কাছে। শক্তি হল জীবনের লীলা, শক্তি মাপ করে দেয় জীবনের মাত্রা, নির্ণয় করে জীবনের আত্মপ্রকাশের মূল্য। দুর্বলতা হল মৃত্যুর লীলা-মৃত্যু জীবনের গতি অনুধাবন করে জীবনের শক্তিসঞ্চয়ের সীমা নির্দেশ করে চলেছে।

দুঃখ ও সন্তাপের ভিতর দিয়ে প্রকৃতি জীবকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তার সকল সুখভোগ হল অস্তিত্বের সত্যকার আনন্দের একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত। আমাদের সত্তার প্রত্যেক বেদনা ও যাতনার মধ্যে তাদের রহস্য রূপে রয়েছে এক তীব্রানন্দের শিখা-এর তুলনায় আমাদের সুখভোগও যেন আলোর স্তিমিত-আভা। এই গূঢ় রহস্যটির জন্যই কঠোর অগ্নিপরীক্ষা, যন্ত্রণা, নিদারুণ অভিজ্ঞতা সকলের উপর একটা আকর্ষণ রয়েছে, যদিও এ সবকে আমাদের স্নায়ুবিক মানস-সত্তা পরিহার করে চলে, তাদের স্পর্শমাত্র সহ্য করতে পারে না।

জগতে সর্বদাই দাতার আসন গ্রহণ করো। সর্বস্ব দিয়ে দাও, আর ফিরে কিছু চেও না। ভালবাসা দাও, সাহায্য দাও, সেবা দাও, যতটুকু যা তোমার দেবার আছে দিয়ে যাও; কিন্তু সাবধান, বিনিময়ে কিছু চেও না। কোন শর্ত করো না, তা হলেই তোমার ঘাড়েও কোন শর্ত চাপবে না। আমরা যেন আমাদের নিজেদের বদান্যতা থেকেই দিয়ে যাই-ঠিক যেমন গুরু আমাদের দিয়ে থাকেন। গুরু একমাত্র দেনেওয়ালা, জগতের সকলেই তো দোকানদার মাত্র। গুরু অনির্বচনীয় প্রেমস্বরূপ-তিনি উপলব্ধির বস্তু; কিন্তু তাঁকে কখনও ‘ইতি ইতি’ করে নির্দেশ করা যায় না। আমরা যখন দুঃখ-কষ্ট ও সংঘর্ষের মধ্যে পড়ি, তখন জগৎটা আমাদের কাছে একটা অতি ভয়ানক স্থান বলে মনে হয়। আমাদের মারামারি ইত্যাদি যা কিছু-সব গুরুর চোখে খেলা বই আর কিছু নয়। এই জগৎটা সবই কেবল খেলার জন্য-গুরু এতে শুধুু মজাই পান। জগতে যাই হোক না কেন, কিছুতেই তাঁর কোপ উৎপন্ন করতে পারে না।

গুরু প্রকাশ যে-শুধু সাধুতেই আছে আর পাপীতে নেই, তা নয়; এ প্রকাশ প্রেমিকের ভিতরেও যেমন, হত্যাকারীর ভিতরেও তেমনি রয়েছে। গুরু সকলের মধ্য দিয়েই আপনাকে অভিব্যক্ত করছেন। অশুচি বস্তুর উপর পড়লেও আলোক অশুচি হয় না, আবার শুচি বস্তুর উপর পড়লেও তার গুণ বাড়ে না। আলোক নিত্যশুদ্ধ, সদা অপরিণামী। সকল প্রাণীর পেছনের সেই ‘সৌম্যাৎ সৌমতরা’, নিত্যশুদ্ধস্বভাবা, সদা অপরিণামিনী গুরু রয়েছেন।

তিনি দুঃখকষ্টে, ক্ষুধা তৃষ্ণার মধ্যেও রয়েছেন, আবার সুখের ভিতর, মহামানবের ভিতরও রয়েছেন। ঈশ্বরই সর্বত্র রয়েছেন জেনে সাধক ব্যক্তিত্ব নিন্দা-স্তুতি দুই ছেড়ে দেন।

এই যে আমাদের এত ভয়, ওটা জড়কে সত্য বলে বিশ্বাস করা থেকে এসেছে। পেছনে চিন্তা রয়েছে বলেই জড়তার সত্তা লাভ করে আমরা জগৎ বলে যা দেখছি, তা প্রকৃতির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত গুরুই ।

সাহসী ও অকপট হয়ে যে পথে ইচ্ছা ভক্তি-বিশ্বাসের সহিত চললে, অবশ্যই সেই পূর্ণ বস্তুকে লাভ করা যায়। একবার শিকলের একটা কোনমতে যদি ধরে ফেলা যায়, সমগ্র শিকলটা ক্রমে ক্রমে টেনে আনতে পারা যায়।

নিজের কথা – ২০

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ জীবন চলার পথে আমরা রাতদিন ২৪ ঘন্টা সময় অতিবাহিত করে থাকি প্রতি নিয়ত। সরাসরি ভাবে সূর্যরশ্মির কিরণের সাথে সংযোগে থাকে পৃথিবীর যে অংশটি তাকে দিন আর যে অংশটি সংযোগে থাকেনা সে অংশটিকে রাত বলে ধরা হয়। ভৌগলিকদের মতে পৃথিবী তার নিজ কক্ষপথে একবার প্রদক্ষিণ করতে রাতদিন তথা  ২৪ ঘন্টা সময় দরকার হয়। পৃথিবীর নিজ কক্ষপথে যে গতিতে দিবারাত্র ২৪ ঘন্টা পথ অতিক্রম করে, এ গতিকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বলা হয়। আবার পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে তার চারপাশের পরিধিকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এক বছর সময় লাগে। পৃথিবী সূর্যের পরিধিকে যে গতিতে একবার প্রদক্ষিণ করে থাকে, এ গতিকে পৃথিবীর বার্ষিক গতি বলা হয়।

মানুষের জড়দেহও পৃথিবীর অংশবিশেষ। তাই এ জড়দেহকেও পৃথিবীর মতই আহ্নিকগতি ও বার্ষিক গতির সাথে তাল মিলাতে হয়। আর এ তাল মিলাতে গিয়ে পৃথিবীর সাথে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তন অনুসারে অবস্থানভেদে বিভিন্ন ঋতুর পরিবর্তনের কারনে শীত বসন্ত গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্তের প্রভাব  আমরা অনুভব করে থাকি। প্রতিদিন আমরা সকালের পর দুপুর, দুপুরের পর সন্ধ্যা, সন্ধ্যার পর রাত্র, ঘোররাত্র, অতপর ভোররাতের পর আবার সকাল দুপুর সন্ধ্যা দিবা- রাত্রির চক্রের মাঝে আবর্তন করে এক এক সময়ের এক এক ধরনের প্রভাব আমরা অনুভব করে থাকি। একইভাবে আমরা বার্ষিক গতির আবর্তনের ফলে স্থান কাল পাত্র ভেদে শীত গ্রীষ্ম শরত বর্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন ঋতুর প্রভাব অনুভব করে থাকি।

বছরের পর আসে যুগ যুগান্তর শতাব্দি কাল মহাকাল। আর কাল মহাকালের প্রভাব পড়তে থাকে আমাদের অনাগত আত্মাময় জীবনের উপর।

শাস্ত্রমতে কালের চক্রাকারকে সত্যসনাতন ত্রেতা দাপর কলি ও ঘোরকলি যুগ এবং ঘোরকলি যুগের পর আবার সত্যসনাতন যুগের আবির্ভাব হয় বলে জানা যায়। সত্যসনাতন যুগের মানুষ মানবতার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে জীবনযাপন করতেন বলে শোনা যায়। এ যুগের জীবনযাপন ছিল সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উদারতার জীবন। এ যুগের মানুষ পরস্পরের উপকারে নিবেদিত থেকে জীবনযাপন করা পছন্দ করতেন। তাই এ যুগের জনগনকে বলা হত দাতা বা দেবতা। ক্রমেই মানুষের জীবনযাপনে সংস্কার ঘটতে থাকায় কর্মফল হিসেবে পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে মানব সমাজে ত্রেতা দাপর ও কলিযুগের আগমন ঘটে। মানুষ ক্রমেই উদারতার স্তর থেকে নেমে আসে সংকীর্ণতাপূর্ণ ঘোর কলিযুগের আবর্জনাময় জীবনযাপনে। শান্তিধর্মের জীবনযাপন থেকে ক্রমেই মানুষ ধর্ম বর্ণ গোত্রে বিভাজন করে পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ক্রমেই অশান্তিময় দ্বান্দিক জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ে ।

অনন্ত কালের আত্মিক স্বর্গীয় জীবন নিয়েই মানুষের পৃথিবীতে আগমন। এ স্বর্গীয় আত্মিক জীবনকে ধরে রেখে পৃথিবী থেকে স্বর্গে প্রস্থান করার মাধ্যমেই আছে মানব জনমের পরম স্বার্থকতা। কর্মে সচেতন থেকে লক্ষ্যাভিমূখে পথ চলার শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যুগে যুগে নানান নবী রসুল সাধক ওলী আওলিয়াগণ। তাঁদের পদাংক অনুস্মরনের মাধ্যমে পেতে পারে অনুস্মরণকারী কাংখিত সফল জীবন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারীদের জন্য বলেন,‘সফল কর্মের জন্য তিন হাজার বছর আগের ও তিন হাজার বছর পরের অবস্থান বিবেচনা করে কর্মে সচেতন থেকে কর্ম করবেন।’

মহাকালের সুতিকাগার পরমাত্মা ¯্রষ্টার নিকট থেকেই আমাদের (আত্মার) এ মনোরম মর্তের পৃথিবীতে আগমন আবার পৃথিবী হতে আমাদের আশ্রয়দাতা পরমাত্মা ¯্রষ্টার নিকটেই আমাদের অনিবার্য প্রত্যাগমন। তাই পরমশান্তির স্বর্গীয় জীবনযাপন করার জন্য আমাদের দরকার অলীআল্লাহগণের আদর্শিক জীবনযাপনের পদাংক অনুস্মরণ করা।

একদা কোন এক সময় সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘নানাভাই তোমার জীবনে কতটা সময় ঘুমিয়ে, কতটা সময় খাওয়া-দাওয়ায়, কতটা সময় চলাফেরা, গোসল, প্রসাব পায়খানা ও বাথরুমে কাটিয়েছ আর কতটা সময় তোমার আল্লার সাথে কাটিয়েছ তোমার মতো করে তার হিসেব কষে আন তো দেখি, ভাই।’  নানাভাই এঁর কথামত সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বেশ কয়েকদিন ধরে জীবনের বিভিন্ন কর্মের হিসেব কষে বের করলেন স্বীয় জীবনের নানামুখী ব্যবহারিক তালিকা সাথে সাথে তিনি তাঁর আল্লাহর সাথে কতটা সময় জীবনে কাটিয়েছেন তার হিসেবও বের করে নানাভাই এর নিকট হাযির হলেন। হিসেবের খাতায় দেখা গেল অন্যান্য সকল কর্মের চেয়ে আল্লাহর সাথে সময় ব্যয় করার হিসেব একেবারেই নগন্য কয়েক ঘন্টা মাত্র। সাধক আনোয়ারুল হক হিসেব দেখে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কে বললেন, ‘নানাভাই! তুমি তোমার জীবনের অন্যান্য কাজের তুলনায় তোমার আল্লাহকে এতে অল্প সময় দেওয়া সত্বেও তোমার আল্লাহ তোমাকে কতকিছু দিয়েছেন। উচ্চতর ডিগ্রী, বড় চাকুরী, সুন্দর পরিবার, মান সম্মান। তুমি তোমার আল্লাহকে আর একটু বেশী সময় দিয়ে দেখ তোমার আল্লাহ কতইনা সুন্দর, তোমার প্রতি তাঁর কতটা ভালবাসা।’ (চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ১৭

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৫৫: ভোগীর কাছে প্রথমে ত্যাগের কথা বললে, তোর উপর রাগই শুধু হবে না টিটকারিও কিছু দেবে। সংসারে দুঃখে-কষ্টে, রোগে-শোক, অশান্তিতে একবারে অস্থির হয়ে পড়ে, তবুও ভোগের ইচ্ছা ছাড়তে চায় না। ভোগে কি তৃপ্তি আছে রে, না তার শেষ আছে? উট কাঁটাযুক্ত ঘাস খায়, মুখ হতে রক্ত পড়ে কিন্তু ক্ষান্ত দিতে চায় না।

দেখ, পিতা হয়তো চিরজীব, ভোগ করেও দেখল ভোগে সুখ নেই, শান্তি নেই, শুধু অশান্তি-দুঃখ, কষ্ট, তবুও ছেলেকে অল্প বয়সেই বিবাহ দিয়ে সংসারে ঢুকিয়ে ভোগের রাস্তা খুলে দিল। বিবেক জন্মবার জ্ঞান হবার সময় পর্যন্ত দিল না। বিবেক নিয়ে, জ্ঞান নিয়ে ভোগ করলে তবে ত্যাগ আসে। আর ত্যাগ না আসা পর্যন্ত শান্তির আশা করা যায় না। সংসারে থেকেই মনে ত্যাগ আনতে হবে।

রামসুন্দরবাবু একজন অত্যাচারী নায়েব। এক বয়স্ক বিধবার নিকট হতে খাজনা বাবদ কিছু বেশি টাকাই আদায় করলেন। ভয়ে বিধবাটি তখন বেশি কোন কথা বলেনি। একদিন ঘরে বসেই অন্য একজনের নিকট জোরে জোরে বলছে, ‘রামা গোলামের জ¦ালায়, এ দেশে আর থাকবার জোঁ নেই।’ ঠিক সে সময়েই ঘরের পাশ দিয়ে রামসুন্দরবাবু যাচ্ছিলেন! তিনি শুনে চিৎকার করে বললেন, ‘তুই কি বললি শালী।’ বিধবাটি বলল, ‘না বাবু, আমি বলি, রামসুন্দরবাবু থাকাতেই আমি এদেশে আছি। তিনি দয়ার মানুষ, না হলে কবেই এদেশ থেকে চলে যেতে হতো।’ রামসুন্দরবাবু এত অত্যাচারী তবুও তাকে ভালোই বলতে হবে।

ভোগে এত দুঃখ আনে তবুও ইহা ছাড়াবার ইচ্ছা হয় না, বরং ভালোই লাগে, ভালোই বলে। ভোগেই ত্যাগ আনে ঠিক কথা, কিন্তু বিবেক দিয়ে, জ্ঞান নিয়ে ভোগ করলে, নতুবা নয়।

উপদেশ-৫৬: দেখ! স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন কেউই তোকে চায় না। চায় শুধু তোর কাজ করার ক্ষমতা-উপার্জিত অর্থ। একমাত্র দয়াল সৎগুরু শুধু তোকে চায়, তোর উপার্জিত কোন কিছুই চায় না। তুই যাদের আপন মনে করিস, বাস্তবিকই তারা তোর আপন কি-না চিন্তা করে দেখ। পাপের ফলে যখন রোগ হয়, সে রোগের ভাগী তো কেউ হয় না।

এক গৃহস্থের তিন বন্ধু ছিল। প্রথম বন্ধুর সাথেই প্রায় সব সময় থাকতেন। দ্বিতীয় বন্ধুর সাথে প্রায় সময়ই দেখা হতো,-খুব খাতির। তৃতীয় বন্ধুর সাথে ছয় মাস, বছরে একবার দেখা হতো। দেখা হলেই এই বন্ধু অনেক উপদেশ দিতেন।

কয়দিন পর হঠাৎ ঋণের দায়ে, পুলিশ এসে গৃহস্থকে জেলে নিয়ে চলল। সাহায্যের আশায় প্রথম বন্ধুর নিকট গেলেন। কিন্তু বন্ধু দেখাই দিল না, ঘরের ভেতর লুকিয়ে রইল। দ্বিতীয় বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, ‘আমার কোন ক্ষমতা নেই তোকে সাহায্য করি। তোকে ভালোবাসি তাই, জেলখানার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’ গৃহস্থ চিন্তা করতে লাগল, যাদের সাথে দিনরাত দেখা হয়, সেই বন্ধুরাই যখন সাহায্য করতে অপারগ, তখন তৃতীয় বন্ধুর কাছে গিয়ে আর লাভ কি? তবুও যাবে বলে সে অগ্রসর হলো। তৃতীয় বন্ধু দৌড়ে এসে দেখা করে বলল, ‘তোর কোন ভয় নেই। আমার সম্পত্তি আছে, আমি আছি। আমার সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। যদি না কুলায়, তোর ঋণের দায় নিজের উপর নিয়ে, আমি জেলে যাব, তোকে মুক্ত করবই।’ দেখ, প্রথম বন্ধু মানে-টাকা-পয়সা, জায়গা-সম্পত্তি, মৃত্যুর সময় এগুলো কোন কাজেই আসে না – দূরে পড়ে থাকে। দ্বিতীয় বন্ধু মানে – স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন প্রভৃতি শ্মশান ঘাট বা সমাধিক্ষেত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে। আর তৃতীয় বন্ধু – দয়াল- প্রেমময় গুরু।

উপদেশ-৫৭: কয়েকজন একত্র হয়েছিস, কোথায় ধর্ম আলাপ, আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের জীবনী আলোচনা করবি, তা না শুধু বাজে আলাপ, আর পরনিন্দা। ওরে! বাজে আলাপে মন অত্যন্ত মলিন ও নিস্তেজ হয়ে যায়। পরনিন্দা ত্যাগ কর। নিন্দা দ্বারা নিজের চিত্তই যে শুধু মলিন হয়, তা নয়-পরের পাপ নিজের উপর আকর্ষণ করাও হয়। নিজে পাপ না করেও নিন্দার ফলে অন্যের পাপের ভাগী হতে হয়।

এক রাজার কুষ্ঠ রোগ। কোন কিছুতেই আর সারে না। এক মহাপুরুষকে ধরলেন। মহাপুরুষ বললেন, ‘খুব বেশি পাপ না করলে কুষ্ঠ রোগ হয় না। এক কাজ কর, একটি পৃথক বাড়িতে ছয় মাসের খোরাক ও তোর বয়স্কা মেয়েকে সেবার জন্য সঙ্গে নিয়ে বাস কর। অন্য কেউ যেন সে বাড়িতে না যেতে পারে। ছয় মাস পর আমি যাব।’

রাজা সেইমতো কাজ করলেন। এক মাস পরেই রানীর মন কচ্ কচ্ করতে লাগল। তিনি দাসীদের সাথে বলাবলি করতে লাগলেন, ‘উপযুক্তা মেয়ে, না জানি কি?’ ক্রমে দেশের লোক রাজাকে নিন্দা করতে লাগল,- ‘যার স্বভাব এত খারাপ, তার কুষ্ঠ হবে না তো কার কুষ্ঠ হবে ?’ ছয় মাস পর মহাপুরুষ এসে উপস্থিত। রাজা সেই বাড়ি হতে বের হয়ে আসলেন-দিব্যি চেহারা-কুষ্ঠের চিহ্নও নেই।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রভু! এ কেমন করে হলো? মহাপুরুষ বললেন, ‘তোর স্বভাব ভালো ছিল, কিন্তু লোকের মিথ্যা সন্দেহ, তোর নিন্দা করে সমস্ত পাপ নিয়ে গেছে। এখন তুই পাপমুক্ত, তাই কুষ্ঠ রোগও নেই।’

দেখ! যার নিন্দা করবি তার পদানত না হওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই। পর নিন্দায় অল্প সময়ে, কম মেহনতে পাপ সংগ্রহের বড় পথ। (চলবে)