ধারাবাহিক

নূরে মোহাম্মদী’র আদর্শ গুণসম্পন্ন মানুষই হলেন সূফী বা ‘সত্যমানুষ’

3bf235094df42d518ab0b9b1c333c137

সংলাপ ॥  ‘তোমাকে (মোহাম্মদ) বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমত স্বরূপ প্রেরণ করিয়াছি’। (সুরা আম্বিয়া-১০৭)

হজরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) সমগ্র বিশ্বের মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ ও রহমত স্বরূপ, যেহেতু তাঁর বাণী বিশেষ জাতি বা দেশের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মাধ্যমে বিশ্বের জাতিসমূহ আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়েছে।

সূরা আহযাবের ২১ আয়াতে আছে – “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের (মোহাম্মদ) মধ্যে উৎকৃষ্টতম আদর্শ রহিয়াছে তাঁহার জন্য, যে আল্লাহ্ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহ্কে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।” মানুষের মনের প্রকৃত পরিচয়, তার মাহাত্ম্য বা সংকীর্ণতা তখনই পাওয়া যায় যখন সে মহাবিপদে বা ঘোর অন্ধকারে পতিত হয় অথবা যখন সে নিজের শত্রুকে পরাজিত দেখে কৃতকার্যতা ও বিজয়ের গৌরব অর্জন করে। ইতিহাসে এ কথার ভুরি ভুরি সাক্ষ্য প্রমাণে ভরপুর যে, মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) স্বীয় সঙ্কট মুহূর্তে যেমনি মহান ও মহীয়ান ছিলেন, স্বীয় কৃতকার্যতা ও বিজয়ের মুহূর্তে তেমনি মহান মহীয়ান ছিলেন। সঙ্কট বা বিপদ তাকে হতাশ বা মুহ্যমান করেনি। আবার কৃতকার্যতা ও বিজয় তাকে গর্বিত করেনি।

হজরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর চরিত্র মাহাত্ম্যের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল স্বাক্ষর এই যে, যারা তার নিত্যসঙ্গী ছিলেন এবং তাঁকে ঘনিষ্টভাবে জানতেন তারা সকলে তাঁকে সত্য নবী বলে গ্রহণ করেছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন বিবি খাদিজা, হজরত আলী, হজরত আবু বকর ও মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস যায়েদ।

মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ছিলেন উচ্চতম মানবতার প্রতীক। তিনি ছিলেন সুন্দরের, কল্যাণের ও পরহিতের মহত্তম আদর্শ। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের ও মহান চরিত্রের যে কোনো দিক দিয়ে তিনি ছিলের অনুপম। তিনি মানবতার জন্য অতুলনীয় দৃষ্টান্ত ও আদর্শ, সর্বাধিক অনুসরণযোগ্য। তাঁর জীবন, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, উন্মুক্ত ইতিহাসের মতো পাতায় পাতায় বর্ণিত। তিনি অনাথ বালক হিসেবে জীবন শুরু করেন এবং সমগ্র জাতির ভাগ্যনিয়ন্তা হিসেবে জীবন সমাপ্ত করেন। বালক বয়সে তিনি ছিলেন শান্ত, গম্ভীর ও মর্যাদাবান। যৌবনের প্রারম্ভে তিনি ছিলেন নীতিবান, চারিত্রিক গুণাবলীর উৎকৃষ্ট উদাহরণ, ন্যায় ও গাম্ভীর্যের মূর্ত প্রতীক। মধ্য বয়সে তিনি সকলের কাছে হলেন আল-আমিন (বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী)। ব্যবসায়ী হিসাবে তিনি ছিলেন বিবেক-বিবেচনা ও সততার শীর্ষে। পিতা হিসেবে তিনি ছিলেন অতিশয় স্নেহশীল, বন্ধু হিসাবে ছিলেন বিশ্বস্ত ও বিবেচনাশীল। একটি অধঃপতিত সমাজের সংস্কারের গুরু দায়িত্ব যখন তাঁর কাঁধে চাপল এবং এই কারণে যখন অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হলেন, তখন তিনি মোটেই দমে যাননি। বরং ধৈর্য ও মর্যাদার সাথে তা বরণ করে নেন। সাধারণ সৈনিকরূপে তিনি যুদ্ধ করেছেন। আবার বড় বড় সেনাবাহিনী পরিচালনাও করেছেন। তিনি পরাজয় বরণ করেছেন, বিজয়ীও হয়েছেন। তিনি আইন প্রণয়ন করেছেন, আবার বিচারকের আসনও অলংকৃত করেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাদাতা ও মানুষের নেতা। নিয়মিত সেনাবাহিনী ছাড়া, নিয়মিত দেহরক্ষা ছাড়া, নিয়মিত রাজত্ব ও রাজপ্রাসাদ ছাড়া যদি কোনো মানুষের এ কথা বলবার অধিকার থাকে যে তিনি ঐশী অধিকার বলে শাসন করেছেন, তবে সে অধিকার একমাত্র নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এর ছিল। কেননা তিনি সর্বময় ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী ছিলেন। যদিও ক্ষমতা প্রয়োগের সব যন্ত্র ও ব্যবস্থাপনা তাঁর হাতে ছিল না। তিনি নিজ হাতে গৃহকর্ম করতেন, চামড়ার মাদুরে নিদ্রা যেতেন। দৈনিক কয়েকটি খেজুর কিংবা বার্লি-রুটি, পানিসহ আহার হিসাবে গ্রহণ করতেন। সারাদিন নানাবিধ কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের পর রাত্রির প্রহরগুলো তিনি দোয়া ও প্রার্থনায় কাটিয়ে দিতেন। বিশ্বে এমন কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই যিনি এসব পরিবর্তিত অবস্থা ও অবস্থানের ভিতর দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন, অথচ নিজে সামান্য পরিবর্তিত হননি।

মহানবী হজরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নিজে উম্মী – নিরক্ষর ছিলেন এ কথায় আধুনিক গবেষকরা সন্দেহ প্রকাশ করেন। কোনো শিক্ষকের কাছে রীতিসিদ্ধ শিক্ষা গ্রহণ না করেও নিজেই বিশ্বের শিক্ষকরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁর শিক্ষার ভার নিয়েছিলেন স্বয়ং বিশ্ব শিক্ষক, আল্লাহ্ তায়ালা যেমন হজরত আদম (আঃ)-কে নিজেই শিক্ষা দিয়েছিলেন। আর কুরআনে বলা হয়েছে ঃ ওয়া আল্লামা আদামাল আসমাআ কুল্লাহ… আর তিনি শিক্ষা দিলেন আদমকে যাবতীয় নাম। মানব রচিত কোনো পুস্তক থেকে নয়, প্রকৃতির বিশাল উন্মুক্ত গ্রন্থ থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন। হজরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নিরক্ষর হওয়া  সত্ত্বেও তিনি মানুষের বিদ্যাশিক্ষার সমস্যার যে উৎকৃষ্ট সমাধান দিয়ে গেছেন, এমন অন্য কোনো মহাপুরুষ করতে পারেননি। তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে যে অপার্থিব মনীষা ও সংস্কৃতি মূর্ত হয়ে উঠেছে, তার তুলনা নেই। তাঁর ওপর প্রথম যে আয়াত নাজিল হল, সেটাই বিদ্যা শিক্ষার প্রেরণাব্যঞ্জক। বলা হল ঃ ইকরা বি ইসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক। খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরা মুল্লাযী আল্লামা বিল কালামু আল্লামাল ইনসানা মালাম ইয়ালাম। অর্থাৎ পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের সাহায্যে – শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না (৯৬ঃ১-৫)।

কোরানপাক-এ আল্লাহ্ বলেছেন ঃ তোমরা আমাকে অনুসরণ কর এবং আমার নবীকে অনুসরণ কর। মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এর কাছে ক্ষমা না পেলে আল্লাহ্ আমাদেরও ক্ষমা করবেন না। নবীর শাফায়াত লাভের উপায় হচ্ছে নবী আমাদের যা করতে বলেছেন সেগুলো আমল করা এবং যা নিষেধ করেছেন সেগুলো বর্জন করা। আমাদের আদর্শ একটিই – আমাদের নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। তিনি সম্পূর্ণ মানুষ। তিনি একজন মানবতার মূর্তস্বরূপ।

রাসুল করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর বাণীগুলো ভুলে আমরা দলে দলে বিভক্ত হচ্ছি, খন্ড-বিখন্ড হচ্ছি। একদল ডাইনে গেলে অন্যদল বাঁয়ে হাঁটে। একদল অন্য দলকে সঙ্কটে-বিপদে ফেলবার জন্য জোর চক্রান্ত করে, মোর্চা গঠন করে। এতে দেশের ও ধর্মের উপকার হয় না।  সাধারণ মানুষের কল্যাণে আসে না। হজরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এর বাণী মিথ্যা হবার নয়। তিনি বলেছিলেন ঃ তোমরা আবার আগের  মতো বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে ফেতনা ফ্যাসাদে লিপ্ত হবে। মুসলমানগণ ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। হচ্ছেও তাই। অথচ আল্লাহ্তালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন ঃ তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর। তোমরা পরস্পর বিভক্ত হইও না। এবং স্মরণ কর তোমাদের ওপর আল্লাহ্র নিয়ামতকে যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন এবং তোমরা তারই নিয়ামতের ফলে পরস্পরের ভাই ভাই হয়ে গেলে (৩ঃ১০৪)।

অন্যত্র আল্লাহ্ বলছেন ঃ নিশ্চয়ই মোমেনগণ পরস্পর ভাই ভাই, অতএব তোমাদের মধ্যে বিভেদ সংশোধন করে শান্তি স্থাপন কর (৪৯ঃ১১)।

আল্লাহ্ আরও বলেছেন – আমার সরল ও সুদৃঢ় পথ অনুসরণ কর, অন্য পথের অনুসরণ করো না, কারণ সেগুলো আল্লাহ্র পথ থেকে তোমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে (৬ঃ১৫৪)।

কিন্তু হায়! ধর্মের নামে, ইসলামকে ব্যবহার করে, ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ বজায় রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের ধর্মে যে সমস্ত ভালো গুণ ছিল, যা নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলো ক্রমে ক্রমে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ধর্মকে নিয়ে এক ধরনের উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দৃশ্যত মসজিদে অসংখ্য লোকের আগমন লক্ষ্য করি। দেশে এত মুসলমান, এত মসজিদ, এত ধর্মপ্রাণ মানুষ – তবুও এত দুর্নীতি, এত হত্যা, এত সন্ত্রাস কেন? দেশের মানুষ মিথ্যা বলে কেন?মানুষের চরিত্রে এত কলঙ্ক কেন? তাহলে বুঝতে হবে যে, মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছেন, সেই শিক্ষা আর যেটুকু আমাদের গ্রহণ করা এবং অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল তা আমরা পরিহার করছি।

ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী আমাদের জন্য রহমত বরকতে পরিপূর্ণ দিবস। নিজের অন্তরে সুপ্তভাবে বিরাজিত নুরে মোহাম্মদী সত্ত্বা যার যখন জাগ্রত হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিই হবে তার জন্য হাকিকতে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী। মহানবীর আগমন দিবসে আমাদের শপথ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে – আমরা মুসলমান (শান্তিপ্রিয়) হব। মোমেন (সত্যমানুষ) হব। আল্লাহ্র রজ্জুকে আঁকড়ে ধরব। নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) কে অনুসরণ করব, তাঁর শিক্ষার আদর্শে নিজেদের জীবনকে গড়ে তুলব। ধর্মের নামে ইসলামের নামে মিথ্যাচার করে দেশের মানুষের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করব না। সত্যমানুষকুলের বাণী- ‘সত্য মানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’-অনুস্মরণের মাধ্যমে নূরে মোহাম্মদীর চরিত্রগুণে নিজেদের সাজাবো।

নিজের কথা – ১২

শৃঙ্খলাবোধ হটকারী ও অগুছালো জীবনযাপন পরিহারপূর্বক সাজানো গুছানো জীবনযাপন করতে সাহায্য করে। তসবীহ এর দানাগুলো তসবীর মধ্যে যেমন একের পর এক ধারাবাহিক ভাবে সাজানো থাকে এবং এক এক করে সরিয়ে সরিয়ে তসবিহ এর ব্যবহার করা হয় তেমনিভাবে তসবিহ এর দানার মতই একের পর এক সময় অনুসারে কর্ম করার ক্ষমতা ব্যক্তি শৃঙ্খলাবোধ থেকে অর্জন করে থাকে। কর্মে এলোমেলো বা গোল পাকানোর মত কোন ঘটনা শৃঙ্খলাবোধ থেকে ঘটার কোন সম্ভাবনা নেই। ফলে ব্যক্তি শৃঙ্খলাবোধ থেকে পরিপাটি ও সাজানো গুছানো পরিচ্ছন্ন জীবনলাভ করে থাকে। সাংসারিক দৈনন্দিন কর্ম তালিকার অনেক কর্ম করে ব্যক্তিকে জীবনযাপন করতে হয়। শৃঙ্খলাবোধের অভাবে সময়ের কাজ সঠিক সময়ে করার অভ্যাস গঠন না করলে অথবা কাজ করার পর যেখানের যে জিনিস সেখানেই সে জিনিস সংরক্ষণের অভ্যাস গঠন না করলে দৈনন্দিন জীবনযাপনে অনেক সময় বড় দুর্গতি ও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। শৃঙ্খলাবিহীন এলোমেলো জীবনে অনেক সময় দেখা যায় ঘরের চাবি না নিয়েই তালা লক করা হয় অথবা চাবি জায়গা মতো না রেখে অন্যত্র রাখার কারনে সময়মত তালা লক করা যায় না। আর তালা লক করতে না পারার কারণে মানসিক বিরক্তির উদ্ভব ঘটে। সুই-সুতা, টেস্টার, ছুরি-কাঁচি, কাপ-পিরিচ কাঁটাচামুচ, ছাকনি ইত্যাদি ছোটখাট জিনিসপত্র প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে না পেলে দৈনন্দিন জীবনে বিরক্তির উদ্রেক হয়। শৃঙ্খলাবোধ না থাকার কারনে অনেক সময় এ সকল ছোটখাট বিষয়কে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মাঝে কথা কাটাকাটি এমনকি মারপিটের মত অশান্তি হয়ে থাকে। শৃঙ্খলাবোধ না থাকার কারনে কেবল ব্যক্তি নয় পরিবার সমাজ আত্মীয়তা ও পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ায় অনেকেই বসবাসের অনুপযুক্ত অস্বস্থিকর পরিস্থিতির শিকার হন। ফলে শৃঙ্খলাবিহীন জীবনের পরিনতি হিসেবে অনেকের জীবনে ভয়ঙ্কর জীবনঘাতি মরণব্যাধির সূত্রপাত হয়ে থাকে। কিভাবে কেন এ মরণ ব্যাধির সূচনা হয়? আমাদের জীবন চায় ব্যাধিমুক্ত শান্তিময় অবস্থান। যখনই জীবনের আশ্রয়স্থলে অশান্তির কারণ দানাবাধে তখনই অন্তরে ব্যাধির সুত্রপাত ঘটে থাকে। বিশৃঙ্খলা হতে অপরিচ্ছন্নতার প্রভাব অন্তরে প্রতিফলিত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা থেকে জানা যায় দূষিত অন্তরই হল সিফিলিস সাইকোসিস এ জাতীয় জটিল ক্রনিক ব্যাধির উৎস। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অন্তরের দুষণকে বলে মনোকুন্ডায়ন। এ মনোকুন্ডায়নই হল সকল চিররোগের জননী। বিশৃঙ্খল জীবনের ছোটখাট বিষয় থেকেই ক্রোধ হিংসা ঈর্ষা লোভ মোহ এ জাতীয়

দূষিত বিষয় থেকে চিন্তার দূষণ হয়। চিন্তার দূষণ প্রেসার হাইপারটেনশন বহুমূত্র ও স্নায়বিক নানান জটিল ব্যধির সূত্রপাত হয়ে থাকে। এসব ব্যাধির কারণে ব্যক্তির একদিকে যেমন স্বাস্থ্য ভেঙে যায় তেমনি অন্যদিকে বদমেজাজের কারণে পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের সাথে সুসম্পর্কের অভাবে আত্মীয়তা বিনষ্ট হয়। আবার পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে পরিবেশ হয় বসবাসের প্রতিকূল। একটু সচেতনতার মাধ্যমে শৃঙ্খলার জীবন গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকলে স্বাস্থ্য আত্মীয়তা বসবাসের অনুকূল পরিবেশ সব কিছুই ঠিক রেখে শান্তিময় জীবন গড়ে তোলা যাবে অতি সহজেই।

আমরা সবাই জানি….

গুরু সত্যমানুষ। আমরা সবাই জানি যে গুরুর রাজ্যই হচ্ছে শিষ্যের বিচরণক্ষেত্র। গুরুভাবে গুরু ব্যাকুল মাতোয়ারা হয়ে তিনি সাথী ও ভক্তদের সঙ্গে কতো খেলাই না করেছেন এবং করেন দিবারাত্রি। সেই শুভ মুহূর্তগুলোতে উপস্থিত ভাগ্যবান ভক্তরা বিহ্বলচিত্তে এবং অনাবিল আনন্দে ওইসব দৃশ্য দর্শন করে। আবার তাদের মধ্যে বিশেষ চিহ্নিত মুষ্টিমেয় কেউ কেউ তাঁরই কৃপাবলে তাঁর কৃপাকল্পতরু রূপটি ধারণা করতেও সক্ষম হন। তিনি তাঁর ভাব ও রূপ কখনও প্রচ্ছন্ন রাখেননা, এটাই তাঁর ইঙ্গিত প্রকাশের একটি রূপ। গুরু নিত্য কল্পতরু, তাই তাঁর রূপটি ধারণ করে নিতে উপযুক্ত আধারের পক্ষে কোনও অসুবিধা হয়না। তিনি  সদাই কল্পতরু। জীবকে কৃপা করাই তাঁর একমাত্র কাজ। তিনি নিত্যই জীবকে কৃপা করেন, তিনি কৃপাসিন্ধু, বিশেষ ভক্তরা বিশেষ ভাবে বুঝতে পারেন।

পরিবেশ মোতাবেক অনেকরকম সংশয়ের প্রধানতম কারণটি হলো গুরুর সহজ-সরল জীবনধারা, যার স্বরূপ তাঁর ওই কৃপা কল্পতরু রূপটি কখনও সর্বসমক্ষে প্রকটিত হয়ে ওঠেনা বা বলা যেতে পারে তিনি তা প্রকটিত হতে দেননা। তিনি তাঁর ভাব ও স্বরূপ সম্পূর্ণ গোপন করে রাখেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর দিন কাটে অতি অনাড়ম্বর, দীনহীনভাবে এবং দুঃখবেদনা-জর্জরিত এই জাগতিক সংসারে এক সামান্য সংসারীরূপে। তাঁর এই বাইরের রূপটি সমস্ত বিভ্রান্তির উৎসস্থল। সম্পূর্ণ সংসারীর মতো বেশ ও আচরণ দেখে তাঁর প্রকৃত রূপটি ধারণা করা সাধারণ মানুষের সাধ্যের অতীত। গুরু অতি সহজ ও সাধারণ। বাইরের আচরণ দেখে তার অসাধারণত্ব বোঝা যায় না। ঘটনার বৈচিত্রে  আড়ম্বর একেবারেই থাকেনা।

কেউ কেউ তাঁকে বিধাতা বা প্রভু বলে দেখলেও তিনি নিজে কিন্তু সে বিষয়ে একান্তভাবে অনাগ্রহী থাকেন, পরন্তু কেউ তাঁকে ওইভাবে প্রকাশ্যে দেখতে চাইলে তিনি তাকে নিরুৎসাহই করেন অথবা অতিযতেœ ওই প্রসঙ্গে এড়িয়ে চলেন, এমনকী কখনও কখনও ওই আলোচনা ও দৃষ্টিভঙ্গির মূলে নির্মমভাবে আঘাত করেন।

গুরুর দু’টি রূপ। একটি সাধারণ মানবীর রূপ। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের মতো সামাজিক সকল বিধি ব্যবস্থাই মেনে চলেন, সাধারণ সংসারীর ন্যায় দুঃখ, কষ্ট, শোক, তাপ সবই অনুভব করেন। অপরটি অসাধারণ সত্যমানুষ রূপ-সাধারণ রূপটির অন্তরালে লুক্কায়িত রখেন। সংসারের সবই গ্রহণ করেন, কিন্তু এটা  তাঁর বাহ্যরূপ; সংসারের সব কোলাহলের মধ্যে তাঁর চিন্তা সর্বদাই প্রশান্ত ও ঊর্ধ্বমুখী-বাকী সবই  বহু নিচে পড়ে থাকে। সবকিছুর মধ্যে থেকেও তিনি কিছুতেই নাই। এটিই গুরুর সত্যমানুষ রূপ।

এই অসামান্য রূপটিই গুরু মহাভাবে গোপন রাখতে পারেন না, ঘনঘন ভাবাবেশে যার প্রকাশ ঘটে। ভক্তদের কাছে তাঁর প্রকৃত রূপটি প্রকাশ-অপ্রকাশই থেকে যায়।  তাঁর কৃপালাভে বঞ্চিত থাকেন না ভক্তরা, থাকেন না তাঁর সদা প্রবাহমান স্নেহধারায় অবগাহন করে প্রশান্তি লাভ হতে বঞ্চিত। ভক্তরা অন্ধ হলে তিনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন না। অজ্ঞানতা  থাকলেই প্রশ্ন, সংশয়, দ্বিধা। গুরুর কৃপাতেও কোন বিরাম নেই, সেই কৃপাবর্ষণ হচ্ছে অতি সংগোপনে, জাগতিক দৃষ্টির অগোচরে, প্রকাশ্যে নয়। কৃপাধন্য অন্তরঙ্গ ভক্ত ছাড়া গুরুর ওই কৃপাপ্রবাহের সন্ধান থাকে সাধারণ মানুষের জ্ঞানের অতীত। গুরুর কৃপাবন্যার ধারা ভক্তদের কাছে সদা-সর্বদা প্রবাহমান।

রূপ ও ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রভেদ পরিলক্ষিত হলেও, গুরু-স্বীকৃত শিষ্যের কাছে সেই রূপ অভেদ ও অভিন্ন এই বিষয়ে কোনও সংশয়ের অবকাশ থাকে না। এই চরম সত্যটি তাঁরা উভয়েই বারবার নিজ মুখেই স্বীকার করে থাকেন। মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। স্বীকৃত – শিষ্য গুরুর মতো একাধারে ভাব জগতে গুরুভাবে কোনও রকম কার্পণ্য না করে নিরবচ্ছিন্ন ধারায় গুরুর মতো এক পথ অনুসরণ ও ষ্মরণ করে কৃপা বিতরণ করে যান। বাস্তবে তা সংঘটিতও হয়। কিন্তু তা উপলব্ধি করার জন্য যে অনুধ্যানের প্রয়োজন, সেটা বর্তমান সাধন ও চিন্তনপীঠগুলোতে একান্ত অভাব।

গুরু-স্বীকৃত শিষ্য সর্বদাই সচেতন। গুরুভাবে কোনও রকম বাছ-বিচার না করেই শত শত অভাজনকে স্থান-কাল-আধার ভেদে দীক্ষা দিয়ে তিনি কৃপা করেন ও তাদের সবকালের দায়-দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করে অশেষ যন্ত্রণাও ভোগ করেন। অভাজনকে আশ্রয় দিচ্ছেন। কৃপালাভ থেকে কাউকে বঞ্চিত করছেন না। যারা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিলেন বা আসেন, তারা যেমন কৃপালাভ করেন, যারা আসতে পারেননি, তাদের জন্যও তাঁর কৃপাধারা একইভাবে প্রবাহমান।

কী অপার করুণা! যে গুরুর চরণে আশ্রয় লাভে নিজেকে বন্দী করেছে, সে-ই অনুভব করছে তাঁর কৃপা ও সংস্পর্শ। বাস্তবতার নিরিখে গুরু রূপেরই মহিমার প্রকাশ। গুরু রূপটিকে তিনি অতি যত্ন সহকারে প্রচ্ছন্ন রাখেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার ধারণা করা খুবই কঠিন। সব রূপেই গুরুর কৃপা কল্পতরু সত্যমানুষ রূপটির সবিশেষ পরিচয় লাভ করতে হলে গুরুর মুখ থেকে নিঃসৃত দৃপ্ত এবং সুস্পষ্ট কৃপাবাণীগুলো উপলব্ধি করায় নিমগ্ন থাকতে হয়। শান্তি ও সত্য অন্বেষণের পথযাত্রীরা সেটা ঠিকমতো অনুভব করতে না পারলে, সেটা তো তাদেরই অক্ষমতা!

যাকে দেবার, গুরুই (সত্যমানুষ) দেন। দুই ফকির শহরে ঘুরে বেড়াত। তাদের মধ্যে একজন সব সময় বলত : গুরু যাকে দেন, তাকে আর কে  কী দেবে? আর এক ফকির বলত : ধনীরা যাকে দেন, গুরু তাকে আর কী দেবে? অর্থাৎ ধনীদের দয়াতেই যখন সবকিছু পাওয়া যায়, তখন গুরুকে আর কোনো দরকার নেই।

ঘুরতে ঘুরতে ওই দুই ফকির শহরের সেরা ধনীর বাড়ীতে এসে নিজেদের কথা শোনাল। ধনী ব্যক্তিটি প্রথম ফকিরের দিকে ফিরেও চাইলেন না। দ্বিতীয় ফকির, সে ধনী ব্যক্তিকে গুরুর চেয়েও বড়ো বলেছিল, তাকে তিনি কাছে ডাকলেন। ফকির ভাবলো, ধনী ব্যক্তিটি যখন আমার উপর খুশী হয়েছেন, তখন না জানি কত ধন-দৌলত আমাকে দেবেন। ধনী ব্যক্তিটি একটা তরমুজের ভিতর হীরে জহরত ভরে সেই তরমুজটা দ্বিতীয় ফকিরকে দিলেন। ফকির জানতো না তরমুজের ভিতরে মহামূল্য সম্পদ রয়েছে। তাই সে ভাবল, ধনী ব্যক্তিটির এত ধন-দৌলত থাকতে আমাকে কিনা সামান্য একটা তরমুজ দিলেন। এ তরমুজ আমি খাব না। এই ভেবে তরমুজটা বিক্রি করবে বলে সে এক ফলওয়ালার কাছে গিয়ে বলল: ‘পাঁচ টাকায় তুমি এটা নেবে?’ ফলওয়ালা দেখল এটা সে দশ টাকায় বিক্রি করতে পারবে : তাই দরাদরি না করে পাঁচ টাকায় সে ফকিরের কাছ থেকে তরমুজটা  কিনে নিল।

এদিকে প্রথম ফকির ধনীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভিক্ষেয় বেরুল। ভিক্ষে করে তার জুটল দশ টাকা। সেই দশ টাকা নিয়ে সে বাজারে গেল আটা কিনতে, কিন্তু বাজারে গিয়ে হঠাৎ তরমুজ দেখে তরমুজ খাওয়ার শখ হলো। সে তখন ফলওয়ালার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো : ভাই, তোমার এ তরমুজের দাম কতো? ফলওয়ালা বললো : দশ টাকা। প্রথম ফকির দশ টাকা দিয়ে কিনে নিল তরমুজটা। খেতে গিয়ে দ্যাখে তার ভিতর মণিমুক্তো ঠাসা রয়েছে। ফকির তখন গুরুর উদ্দেশে বলতে লাগলো : ‘হে মালিক, তুমি যাকে দাও, তাকে এমনিভাবে তরমুজ ভরতি করেই দাও।

আবার একদিন দুই ফকির এসেছে শহরের সেই সেরা ধনীর ওই বাড়িতে। যে ফকিরকে তরমুজ দিয়েছিলেন, তাকে ডেকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তোমাকে যে তরমুজ দিয়েছিলাম তা দিয়ে তুমি কী করলে?’ ফকির বললো: আমি ফলওয়ালার কাছে পাঁচ টাকায় বিক্রি করেছিলাম। ধনী ব্যক্তিটি তখন ফলওয়ালাকে ডাকলেন। সে বললো: আমি দশ টাকায় এক ফকিরের কাছে তরমুজ বেঁচেছিলাম। এবার প্রথম ফকিরের ডাক পড়লো। ফকির বললো : ‘হুজুর আমি তো প্রথমেই আপনাকে শুনিয়েছিলাম যে গুরু যাকে দেন, তাকে আর কে  কী দেবে? তখন আপনি আমার উপর রাগ করে আমাকে কিছু না দিয়েই বিদায় করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখুন আমার কথা ঠিক কিনা। আপনি আমায় কিছুই দেননি, কিন্তু গুরুই আমাকে তরমুজ ভরতি করে হীরে-জহরত পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ধনী ব্যক্তিটি এবার বুঝতে পারলেন যে দেবার মালিক তিনি নন, মালিক যাকে দেন, শুধু তারই কপালে ঐশ্বর্যলাভ ঘটে। জগতে দাতা একজনই, তিনি হলেন গুরু। হাজার সদিচ্ছা থাকলেও কেউ কাউকে কিছু পাইয়ে দিতে পারে না। যাকে যা দেবার তা গুরুই দিয়ে থাকেন, আর তা দেন মানুষের হাত দিয়েই। তিনি না চাইলে রাজা-বাদশাহ-ধনীর দুয়ারে গিয়েও কিছু মেলে না। ভক্তরা তাই তাঁর দিকেই চেয়ে থাকেন সব অভাব-অভিযোগ মেটাবার জন্য, কারণ তারা জানেন যে রাজা-মহারাজা চাইলেও কারুর অভাব ঘোচাতে পারেন না যদি গুরু তা না চান।

নিজের কথা – ১১

শাহ মো. লিয়াকত আলী।। পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা জীবনকে সতেজ ও স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করে। সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র জীবনযাপন করতেন। শাস্ত্রে বলা হয় পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ । পরিচ্ছন্নতা পবিত্রতার বাহ্যিক স্তর। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার সামগ্রীক রূপ হল পবিত্রতা। অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা না থাকলে বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা হয় লোক দেখানো। লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতা পবিত্রতার স্তর নয়। এটা সৌখিনতার একটা স্তরমাত্র। অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা হলো চিন্তাজগৎকে দূষনমুক্ত করা। প্রভুর স্মরণ ব্যতীত চিন্তাজগত দূষনমুক্ত করা যায় না। প্রভু স্মরণ বলতে বুঝায় প্রভুর নির্দেশনা মেনে কর্ম করা। সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ তাঁর প্রভুর নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে ধারণ লালন ও পালন করতেন। তিনি বলতেন,”যে প্রভুর নির্দেশনা ধারণ লালন ও পালন করেন তিনি ধার্মিক আর প্রভুর নির্দেশনা ধারণ ও লালন না করে শুধুই পালন করে সে প্রতারক। প্রভুর নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে সাধকের বাণী, ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করে না তার এবাদত শুদ্ধ নয়।’ বিশুদ্ধতা পবিত্রতার একটি রূপ। প্রভুর হুকুম বলতে প্রভুর আদেশ নিষেধ ও উপদেশকে বুঝায়। আল কুরআনে রুহ্ হল প্রভুর হুকুম বা নির্দেশ। যিনি পবিত্র আত্মা সমৃদ্ধ তিনি রুহ্প্রাপ্ত। হাক্কানী চিন্তনপীঠে যে ব্যক্তি প্রভুর হুকুমপ্রাপ্ত তিনি রুহ প্রাপ্ত। শুদ্ধ হল বিশুদ্ধকরণের একটি রূপ। যে ব্যক্তি দেহ ও আত্মিকভাবে বিশুদ্ধতা অর্জন করেন তিনি চৈতন্যশীল দেহলাভ করেন। হাক্কানী চিন্তনপীঠে চৈতন্যশীল দেহকেই আত্মা বলে। দেহজগতের বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও অন্তর কে প্রভুর হুকুম বা নির্দেশনা অনুসারে পরিচালনা করে অভ্যাস গঠন পূর্বক জীবনযাপন করার এক পর্যায়ে এসে ব্যক্তি চৈতন্যশীল দেহলাভ করে থাকেন। হাক্কানী চিন্তনপীঠে চৈতন্যশীল দেহলাভকারী ব্যক্তিকেই আত্মা লাভকারী ব্যক্তিত্ব তথা বিশুদ্ধ ব্যক্তিত্ব বলা হয়। দেহজগতের অন্তর ও বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমেই প্রভুর বিশ্বাসী তথা বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিত্বে উপনীত হওয়া যায়। বিশ্বাসের স্তর অর্জন করার মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সমুহ প্রভুর গুণাগুণ সমৃদ্ধ ক্ষমতালাভ করে। অতপর ব্যক্তি লাভ করে পবিত্রতার জীবন। তাইতো চৈতন্যশীল দেহধারনকারী ব্যক্তিত্বগণ লোকের সন্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু ঘটে থাকে তা তাঁরা জ্ঞাত থাকেন এবং তাঁরা যখন যা কিছু করার ইচ্ছাপোষন পূর্বক ‘হও’ বলেন, অমনি তা হয়ে যায়। পবিত্রতা নিয়ে শাস্ত্রে অনেক স্তরবিন্যাস করে বিস্তারিত আলোচনা করা আছে। আগ্রহীরা সেখান থেকে আরও অধিক বিশদভাবে জানতে পারবেন।(চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ৬

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ – ২১। দয়াল বলছেন, ‘যে অনন্য চিত্তে আমার উপাসনা করে, সে চেষ্টা না করলেও তার অভাবের বস্তু আমি নিজে বহন করে থাকি।’ দয়ালের নিকট অন্য কিছু চাইবি না, শুধু তাঁকেই চাইবি। রাজাকে পাওয়া গেলে সমস্ত সম্পদ ও বিভূতি আপনা হতেই আসবে। যারা দয়ালকে ব্যতীত অন্য কিছু চায় না, তা’দিগকে নিষ্কামী ভক্ত বলে। নিষ্কামী ভক্তকে কোন বিভূতি দেন না বটে, নিজকেই দিয়ে দেন। নিষ্কামী ভক্তের সর্ব কামনা আপনিই পূর্ণ হয়ে যায়, চাওয়ার দরকার পড়ে না।

দয়ালের নিকট অথবা কোন মহাপুরুষের নিকট অসুখ-বিসুখ, মামলা-মোকদ্দমা, সংসারের অভাব-অনটন প্রভৃতির বিষয় প্রার্থনা করার মতো আহাষ্মকি আর নেই। যেখানে মুক্তা পাওয়া যেত সেখান হতে কাঁচ নিয়ে ফিরে আসতে হয়। তোরা শুধু তাঁকে চা, – তোদের পক্ষে যা ভালো তা তিনিই করবেন- তোদের ভাবতে হবে না।

দেখ, সাধন পথে অগ্রসর হওয়ার সময় অনেক অলৌকিক শক্তির বিকাশ পায়। সাবধান, এগুলোর প্রতি মনোযোগ দিবি না। এগুলোর প্রতি লক্ষ্য গেলে আর সাধন-পথে অগ্রসর হওয়া যায় না, – কাঁচ পেয়ে আটকে পড়লে আর জহরতের আশা করা যায় না।

উপদেশ – ২২। দয়ালের নাম জপ কর, ধ্যানই র্ক আর নামাজ-রোজা যাই করুক প্রাণ মিশিয়ে করতে হবে নতুবা কোন ফলই হবে না। অনেককে দেখি, বেশ তাঁর নাম জপ করছে,-নিয়মমত পাঁচবার নামাজ পড়ছে, রোজাও রাখছে, অথবা ত্রিসন্ধ্যা নাম করছে কিন্তু জীবনভর তা করেও প্রাণে কোন উদ্দীপনা, – তাঁর প্রেমের কোন অনুভূতিই আসছে না, যেই সেই। তার কারণ মনকে বন্ধক দিয়ে ফেলেছে। ভালো মানুষি  অর্থাৎ ঘুষ লওয়া-পাড়ার অমুকের অবস্থা ভালো, ক্ষেতে ভালো ফসল হয়েছে,- ছেলেটি ভালো চাকরি করছে, তার জন্য হিংসার জ্বালা তো’ কমেনি। মিথ্যা বলা, অন্যের ক্ষতি করা, নিন্দা করা তো আর কমায়নি। সমস্ত রাত্র নৌকার দাঁড় বেয়ে সকালে দেখা যায়, নৌকা যেখানে ছিল সেখানেই আছে-নৌকার গেরাফী তোলা হয়নি।

যারা বলে মৃত্যুর পর সুখ-শান্তি আসবে, ওরে, আমি বলি তাদের একথা কখনও বিশ্বাস করিস না। যার এথায় নেই, তার সেথায়ও নেই, দয়ালের কাজে কোন বাকি-বকেয়া নেই-সব নগদ।

তাঁর নাম করে করে যখন দেখবি, তাঁর প্রেমের কোন আভাস-অনুভূতি-শান্তি আসবে না তখন বুঝবি, তাঁর নাম করে মনকে যতটুকু পরিস্কার করছিস, তার চেয়ে বেশি অন্য কাজে মনের উপর ময়লা লাগাচ্ছিস।

উপদেশ – ২৩। দেখ! পাহাড়, সমুদ্র, আকাশ প্রভৃতি কোন কিছুতেই দয়ালের স্থান হয় না। এগুলো সীমাবদ্ধ-অসীমের স্থান, এগুলোতে কেমন করে হবে ? একমাত্র ভক্তের হৃদয়েই অসীমের-অনন্তের স্থান হয়। ভক্তের হৃদয় সুনির্মল দর্পণস্বরূপ। ছোট আয়নাতে দেখিস না কেমন এত বড় আকাশের প্রতিবিম্ব ওঠে। আয়না স্বচ্ছ তাই প্রতিবিম্ব ওঠে। সেই প্রকার ভক্তের হৃদয় সৎ, তাই সত্যকে ধারণ করতে পারে। ভক্তের হৃদয় সিংহাসনেই দয়ালের বসতি।

ওরে, ভক্ত আর দয়ালে পৃথক নয়। ভক্তের আহারই তাঁর আহার, ভক্তের শান্তিই তাঁর শান্তি-এক কথায় ভক্তের সব কিছুই দয়ালের। ভক্তকে সেবা যদি করিস্ সে দয়ালকেই সেবা করা হয়। ভক্তকে যাই করিস্ সে দয়ালকেই করা হয়।

ভক্ত বলে কাকে ? যে যাকে ভালোবাসে সেই তাঁর ভক্ত। দয়ালকে যে ভালোবাসে সে দয়াল ভক্ত। ভক্তেরও স্তর আছে। যে শুধু তাঁর কথা শুনে, সে নিম্ন স্তরের ভক্ত, যে তাঁকে দেখে, সে মধ্যম স্তরের ভক্ত আর যে দেখে ও ভোগ করে সে উত্তম স্তরের ভক্ত।

উপদেশ – ২৪। রাতদিন খালি সংসার সংসারই করছিস, এ সংসারীর কি শেষ আছে’রে ! দেখ্ কুকুর হাড় চিবায়, মাংস নেই, মুখ হতে রক্ত পড়ছে তবুও ভ্রুক্ষেপ নেই-চিবানো ক্ষান্ত দিতে চায় না।

এক দৈত্য হরিণের মাংস পছন্দ করত। কয়েকটি হরিণ মেরে একজন লোককে রান্না করতে দিল। চুলায় একটু দূরে সে বিরাট হাঁ করে বসে আছে। লোকটি রান্না করে, এক একটি হরিণের মাংস দৈত্যের মুখে দিতে লাগল। সমস্ত মাংস দেয়ার পরও দৈত্য বলে, ‘আমার পেট ভরেনি আরও দাও।’ দেখ, দৈত্যরূপ এই যে সংসার, তার পেটও ভরবে না,-খালি বলে দাও! দাও!

তৈল মেখে জলে নামলে সর্দি হয় না। দয়ালকে সাথে রেখে সংসার করলে ক্ষতি হয় না। ওরে, অন্তত সকালে-বিকালে এক ঘন্টা করে দয়ালকে ভাববি-ডাকবি! চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে দু’টি ঘন্টাও যদি তাঁর ভাবে মন না দিতে পারিস, তবে কেমন করে হবে? তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হয়, কাজ কমিয়ে দেয়ার জন্য।

প্রথম প্রথম সাধন-ভজন হয়তো ওষুধ গিলার মতো বিরক্তি বোধ হতে পারে, কিন্তু পরে আনন্দ পারি। আস্তে আস্তে সময় বাড়িয়ে নিবি। কয়দিন পরই দেখবি, একটা সংস্কার বেঁধে গেছে,-একটু-আধটু আনন্দ আসছে।

তাঁর নাম জপ করতে বা ভাবতে বলে সংসার চিন্তা দূরে সরিয়ে দিবে। প্রথম প্রথম বিষয় চিন্তা আসবেই, কিন্তু অনবরত চেষ্টা ও অভ্যাসের দ্বারা সংসার চিন্তা সরিয়ে দিতে পারবি। আর দেখ যখন সংসারের কাজ করবি তখনও মাঝে মাঝে তাঁকে দেখে নিবি। ছোট সন্তানের মাকে দেখিস না? সংসারের কাজকর্ম করছে, কিন্তু মনের একটা অংশ সব সময়ই তার সন্তানের কাছে রয়েছে। আবার মাঝে মাঝে চুপি দিয়ে দেখে আসে।

উপদেশ – ২৫। পন্ডিতি বিদ্যায় কোন কিছুই হয় না, লম্বা লম্বা কথা বলা যায় মাত্র। জানলি অনেক কিছুই, না করলে কি ফল হবে? খেলে পেট ভরে জানলি কিন্তু খেলি না, পেট কি ভরবে? জানিস বিষ খেলে ক্ষতি হয়, তবু খেলি,- এ জানার মূল্য কি? বিষয় আসক্তিই যদি রইল, মিথ্যা, হিংসা, নিন্দা, লোভই যদি রইল,- দয়ালের প্রতি প্রাণের টানই যদি না আসে-সৎই যদি না হলি তবে শাস্ত্র পড়ে, কোরাণ-কিতাব পড়ে, – কথায় কথায় লম্বা লম্বা সংস্কৃত শ্লোক-আরবি রয়াৎ ঝাড়লি, -কি লাভ হলো? দু’চারদিন লোকের নিকট একটা বাহাদুরি পাবি মাত্র,- পরে তাও পাবি না।

দেখ্ পাখিদের মধ্যে কাক, পশুদের মধ্যে শিয়াল চালাক। কাক বিষ্ঠা খায়, শিয়াল বনে-জঙ্গলে থাকে। তোরা যদি এত পড়ে পন্ডিত, মৌলভী হয়ে দয়ালকে ভুলে, বিষয়, আসক্তিরূপ বিষ্ঠাতে, কাম, ক্রোধ, লোভরূপ বনে-জঙ্গলে থাকিস, তবে কাক আর শিয়ালের চেয়ে ভালো কিসে ? যেমন জানবি তেমনি সে অনুযায়ী চললে লাভ, নতুবা মাছির মতো ভন্ ভন্ করতে পারবি মাত্র। (চলবে)

শান্তির পথ প্রদর্শনে লালন সাঁইজী

lalon

আল্লাহর নাম সার করে যেজন বসে রয়

তাহার কিসের কালের ভয় ॥

সময় বয়ে গেল আল্লাহ্র নাম বল

মালেকুত মউত এসে বলিবে চল

যার বিষয় সে লয়ে যাবে

সেকি করবে ভয় ॥

আল্লাহর নামের নাই তুলনা

সাদেক দেলে সাধলে পরে বিপদ থাকে না

যে খুলবে তালা, জ্বালবে আলো

দেখতে পাবে জ্যোতির্ময় ॥

ভেবে ফকির লালন কয়

নামের তুলনা দিতে নয়

আল্লাহ্ হয়ে আল্লাহ্ ডাকে

জীবে কি তার মর্ম পায় ॥

সংলাপ ॥ জাতি ধর্ম-বর্ণ, গরীব-ধনী, শিক্ষিত-মূর্খ-জ্ঞানী নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষই শান্তি চায়। কিন্তু খুব কম মানুষই শান্তি পায়। তাই যুগে যুগে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে স্ব-স্ব জাতির মধ্যে শান্তির পথ প্রদর্শক আবির্ভূত হয়েছেন। বাংলার বুকে অন্য জাতি, অন্য ভাষা ও অপসংস্কৃতি যখন বারবার হানা দিচ্ছিল সেই সময় লালন সাঁইজীর আবির্ভাব ঘটে। বাংলা ১২৯৭ সালের ১ লা কার্তিক, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর ১১৬ বৎসর বয়সে লালন সাঁইজী দেহত্যাগ করেন।

সাঁইজীর দর্শনে রয়েছে – সবার উপরে মানুষ সত্য, মানুষ মানুষের জন্য। মানুষ হওয়ার জন্যে দরকার সৎ-স্বভাব যার পরিচয় মেলে কথা ও কাজে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অমূল্য বাণী – ‘সত্য বল্ – সুপথে চল্’ – বাংলার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়ে বাঙালি জাতিকে দিয়ে আসছে দিক নির্দেশনা। গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে সাঁইজীর দর্শন বাংলার মানুষকে দেখালো নতুন দিগন্ত, নতুন প্রাণ যার ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান।

লালন সাঁইজী একজন বাঙালি। এই বাংলায় বাঙালিদের মধ্যে বাংলা ভাষায় শান্তি-ধর্ম প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। শান্তি-ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যে দর্শন দিয়েছেন তা বাঙালি জাতিকে একটি উন্নত জীবনধারার সন্ধান দিয়েছে। সহজ সরল সাধারণের ভাষায় কবিতার ছন্দে, গানের মরমী সুরে তিনি যে ‘লালন সংস্কৃতি’ সৃষ্টি করে গেছেন, তা বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য। পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন লালনও হয়ে থাকবেন স্মরণীয় এবং বরণীয়।

পূজিত হবেন একজন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার উর্ধ্বে ‘শান্তি-ধর্ম’ প্রচারক হিসেবে। তাঁর সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে মনসুর উদ্দীন বলেছেন, ‘লালন ছিলেন ভোরের কোকিল, আটপৌরে ভাষার প্রাণবান কবি। হৃদয়ের অনুভূতি, দার্শনিক তত্ত্ব এমন সরল করে বাংলায় আর কোনো কবি বা গীতিকার প্রকাশ করতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই।’ একথা অনস্বীকার্য যে, তৎকালীন সময়ে বাংলার বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবহেলিত মানুষদের মন্দির-মসজিদের প্রচলিত সংকীর্ণ ধর্মীয় উগ্রতার রুদ্ধ কক্ষে বন্দি না করে উদার, উন্মুক্ত খোলা আকাশের নিচে বসে দেশ-মাটি-প্রকৃতির নিবিড় পরশে পরম স্রষ্টার সাথে এক প্রত্যক্ষ মধুর ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রেমময় সম্পর্ক সৃষ্টির শাশ্বত শান্তির ধর্মে আহ্বান জানিয়েছেন ভোরের কোকিলের মতোই। আত্মদর্শনের লালনীয় তত্ত্বাদর্শে বাংলার মানুষ খুঁজে পেয়েছিল মুক্তির পথ।

সাধকদের মতে বাঙালি জাতির প্রাণপুরুষ এই মহান দার্শনিকের দর্শন জেনে-বুঝে চর্চা করে নিষ্ঠার সঙ্গে  চিন্তা-চেতনায় ধারণ করলে সুস্থ সুন্দর সত্য স্বসংস্কৃতি সম্পন্ন একটি অসাম্প্রদায়িক মানব গোষ্ঠী গড়ে উঠতে বাধ্য।

তাই লালন সাঁইজী বাঙালির ঐতিহ্যের লালন, ইতিহাসের লালন, সংস্কৃতির লালন। সাঁইজী বাঙালির পরিচিতি। তিনি শেকড়ের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর প্রেরণাতেই বাংলার বুকে বহু সাধক আজও নিয়োজিত নিরবচ্ছিন্ন কর্ম সাধনায়। সাধন-ভজনের পদ্ধতির বীজমন্ত্রও তিনি দিলেন –

‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার

সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার।’

সমাজের প্রতিটি স্তরে সাঁইজীর দর্শন অনুসারী রয়েছে, যারা প্রকৃতই চিন্তা-চেতনায় লালন পূজারী। বাউল সাধকদের কাছে লালন সাঁইজী তাদের ধর্মগুরু। তাঁর সমাধিস্থল তাদের কাছে তীর্থভূমি। কোনো আঙ্গিকেই সাঁইজীর সামান্যতম অবমাননা, বাঙালি জাতি সহ্য করবে না – হোক তা লালন নামের গায়ে সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানোর কসরৎ অথবা তাঁকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবসায়িক হাতিয়ার বানানোর কূটচাল অথবা শুধুমাত্র কবি, বাউল, ফকির বানানোর অপচেষ্টা। অপরদিকে নিছক সাংবিধানিক অধিকার আদায় অথবা প্রত্নতাত্ত্বিক পূরাকীর্তি নিদর্শন সুরক্ষা জাতীয় মানবিক বিষয় মনে করলেও আমাদের ভুল হবে। আমদানীকৃত অপসংস্কৃতির হাত ধরে নগরায়ণ ও উন্নতির নামে বাঙালি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থানগুলোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

নিজের কথা – ৯

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥  সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ সময়ের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। তিনি সময়নিষ্ঠ জীবন যাপন করা পছন্দ করতেন। যারা তাঁর নিকট সময় দিয়ে কথা রক্ষা করেননি তিনি তাদের ব্যাপারে মন্তব্য করতেন, ‘এদের জন্মের দোষ আছে।’ তিনি যে সময় যে কার্যক্রম করার অনুষ্ঠানসূচী নির্ধারণ করতেন যথাসময়ে সে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম আরম্ভ করতেন। প্রতিষ্ঠানের কোন সভায় পূর্ব নোটিশ না করে কেহ বিলম্বে উপস্থিত হলে তাকে তিনি সভায় থাকার অনুমতি দিতেন না। এমন কি বেশ কয়েকবার মিশনের অনুষ্ঠানের চীফ গেষ্ট অনুষ্ঠান আরম্ভের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে পারেন নি কিন্তু তাতে কি! তিনি অনুষ্ঠান যথাসময়ে আরম্ভ করেন। পরে চীফগেষ্ট বিলম্বে উপস্থিতির জন্য sorry বলেন। এভাবে তিনি অনুসারীদের মাঝে সময়নিষ্ঠ হবার আচরণ শিক্ষা দিতেন। তিনি তাঁর জীবনের সময়নিষ্ঠতার কথা বলেন, তিনি যখন যেখানে উপস্থিত থাকার জন্য কাউকে কোন কথা দিতেন নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই সেখানে উপস্থিত থাকতেন। তিনি বলেন, একবার তাঁর হুজুর (সূফী সাধক আনোয়ারুল হক) কোন এক সফরে যাবার জন্য সফর সঙ্গীদের সকাল ৮ টায় তাঁর ধানমন্ডির দরবার শরীফে উপস্থিত হতে বলেন কিন্তু তাঁকে (শাহ্ শাহেবকে) সকাল ৮.৩০ মিনিটে উপস্থিত হবার খবর দিলেন। এমন সময় দরবারে উপস্থিতির মধ্য থেকে একজন জানতে চাইলেন, ‘হুজুর অন্যান্যদের সকাল ৮ টার সময় আসতে বললেন কিন্তু শাহ্ শাহেবকে ৮.৩০ মিনিটে আসতে বললেন কেন?’ হুজুর উত্তরে বলেন, ‘যাদের ৮ টায় উপস্থিত হতে বলা হয়েছে তাদের কেহ কেহ ৮.৩০ মিনিটেও উপস্থিত হতে পারবেনা কিন্তু শাহ্ শাহেব ঠিকই ৮.৩০ মিনিটের ৫ মিনিট পুর্বেই উপস্থিত হবেন।’ বাস্তবে দেখা গেল যাত্রার দিন শাহ্ শাহেব ৮.৩০ মিনিট বাজার ৫ মিনিট পূর্বেই দরবারে উপস্থিত হলেন আর কেহ কেহ সময়মত উপস্থিত হতে না পারার কারণে যাত্রাপথের সঙ্গী হতে পারলেন না।

একবার বিশাউতি কলমাকান্দা নেত্রকোনায় হাক্কানী কমপ্লেক্স উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধান অতিথি হিসেবে তৎকালীন সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বিকাল তিনটায় কমপ্লেক্স উদ্বোধন করবেন। সেখানে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ মিরপুর আস্তানা শরীফ থেকে একটা কাফেলাকে কিছু দায়িত্বভার দিয়ে সকাল ৭ টার মধ্যে নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে বলেন। সে মোতাবেক কাফেলাদল যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে রওয়ানা দিতে নির্ধারিত সময় হতে ১০/১২ মিনিট বিলম্ব করে। সময়সচেতন না হওয়ার কারনে দেখা গেল রাস্তার মাঝে যানজটে পড়ে বিলম্ব হল। পথে বিলম্বের কারণে কাফেলাদল যথাসময়ে কমপ্লেক্স উদ্বোধনস্থলে পৌঁছতেই পারলনা। এদিকে মন্ত্রী সাহেব কমপ্লেক্স উদ্বোধন করে ফিরে আসলেন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলতেন, ‘যৎসামান্য ব্যবধানে তোমার আমার মিল হলনা। সময় তোমার সঙ্গের সাথী তাকে কেন বাঁধনা।’ সময় নিয়ে লালন সাঁইজী বলতেন, ‘ সময় গেলে সাধন হবেনা।’

সরারচর কিশোরগঞ্জের আস্তানা শরীফের অনুষ্ঠানের এডভ্যান্স কর্মীদল হিসেবে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ কাজ করছেন। সেখানে দিনরাত ধরে কাজ চলছে। আস্তানা

শরীফের বারান্দায় আর একটি টিন লাগালেই টিনের ছাউনির কাজ প্রায় শেষ। এদিকে রাত বারটা বেজে গেছে। কর্মীরা সবাই ক্লান্ত দেখে শাহ্ সাহেব বললেন, থাক এটা কাল সকালে লাগালেই চলবে। এখন খেয়েদেয়ে সব বিশ্রাম নেন। এদিকে শোয়া মাত্রই সকলে গভীর ঘুমে বিভোর। রাত্রে হঠাৎ টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনে শাহ্ সাহেব তড়িৎ উঠে আস্তানা শরীফের বারান্দায় গিয়ে দেখেন তাঁর হুজুর বারান্দায় পায়-চারী করছেন আর যে টিন টি লাগানো বাকি ছিল সেটি লাগানো হয়েছে। শাহ্ সাহেব কিছুটা লজ্জিত হলেন। শাহ্ সাহেবের দিকে চেয়ে হুজুর বললেন, ‘কাল নয় আজ, আজ নয় এখন। কাম করে গপ্ করা ভালা..না..?।’ এভাবেই সাধক অনুসারীদের সময়ানুবর্তী হওয়ার জন্য সময়ের কাজ সময়ে করার শিক্ষা দিতেন।

নিজের কথা – ৯

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥ জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয় সাধন স্বনির্ভর সফল জীবন যাপনের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্ঞানহীন কর্ম আর কর্মহীন জ্ঞান কোনটাই জীবন চলার পথে প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রয়োজন মেটাতে কর্মের সাথে জ্ঞানের কিম্বা জ্ঞানের সাথে কর্মের সমন্বয় সাধন অপরিহার্য বিষয়। একজন চাষী অন্যের দেখাদেখি ফসলের খামার করতেই পারে। জমি চাষ, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রম, সময় সবকিছুই লাগানোর পর পরিমিত মাত্রাজ্ঞানের ও সময়জ্ঞানের অভাবে অনভিজ্ঞ চাষী কাংখিত ফসল তোলা থেকে বঞ্চিত থাকে। আর ভাগ্যকে দোষারোপ করতে থাকে। অর্থাৎ ভাগ্যদাতা স্রষ্টাকে দোষারোপ করে থাকে। স্রষ্টা সবকিছুর মালিক, স্রষ্টা দেয়নি, তাই সে পায়নি। নিজের যোগ্যতা কতটা আছে তা বিচার করতে চায় না। কথায় আছে, যেমন কর্ম তেমন ফল। প্রসংগত সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী,  ‘বিদ্যাই মানবগনে প্রদানে নম্রতা, নম্রতা হতে পরে পায় সে যোগ্যতা, যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়, ধন হতে ধর্ম, ধর্ম হতে সুখোদয়’। জীবন চলার পথে শাস্ত্র মতে জ্ঞানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। শান্তিময় জীবন যাপনের জন্য শাস্ত্রমতে ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নরনারীর জন্য অপরিহার্য’। আবার দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত তথা আজীবন জ্ঞান অর্জন করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এমনকি শাস্ত্র মতে জ্ঞানীর নিদ্রাকে মূর্খের ইবাদতের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। অপরদিকে শাস্ত্রমতে, স্রষ্টা মানুষকে কর্ম করে সফল জীবন গড়ার জন্য শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছেন। সফল জীবন বলতে কি ধরনের জীবনকে বুঝায়? মানুষ শান্তিকামী। চূড়ান্তভাবে জীবনের শান্তির জন্যেই মানুষ কর্ম করা পছন্দ করে কিন্তু পরিমিত জ্ঞানের অভাবে অনেকেই কর্ম করে কাংখিত ফলাফল অর্জন করতে পারেনা। লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যতীত কেহই সফল জীবন গড়ার পথে অগ্রসর হতে পারেনা। তাই সফলতার কর্মে লক্ষ্য নির্ধারণ করা অপরিহার্য শর্ত। জীবনের লক্ষ্য বলতে কি বুঝায়? জীবন চলমান। যারা শান্তির জন্য কর্ম করেন তাদের শান্তি প্রতিষ্ঠা জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু শান্তি অর্জন করতে হয়। শান্তি উৎপাদন কিম্বা হাটে বাজারে বেচাকেনা করা যায় না। এটি কিভাবে অর্জন করা যাবে? একমাত্র জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। জ্ঞানের মালিক একমাত্র স্রষ্টা। তাই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ পূর্বক পূর্বক স্রষ্টার গুণে গুণান্বিত না হয়ে শান্তি অর্জন করা যায়না। যাদের জীবনের চাওয়া পাওয়া শান্তি আর উদ্দেশ্য স্রষ্টার কাছে ফিরে যাওয়া তাদের জীবনের লক্ষ্য একটাই, আর অন্য কোনকিছুকে লক্ষ্য বানানোর সুযোগ নেই। আমরা দুনিয়াদার লোকেরা নিজেদের নৈমত্তিক জীবনের প্রয়োজন মেটাই উৎপাদন করে, হাটবাজার হতে বেচাকেনা করে। তাই সাধারণ জনগনের প্রিয় জায়গা হলো হাটবাজার। কিন্তু জ্ঞানীরা জ্ঞান অর্জনের জন্য মাসজিদে সেজদার মাধ্যমে তাঁর স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করেন। আর সালাতের মাধ্যমে স্রষ্টার দিদার লাভপূর্বক অন্তরের ভাব বিনিময় করেন। শাস্ত্র মতে, দুনিয়ার মাঝে বাজার হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান আর মসজিদ হলো সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান। তাই জীবনের লক্ষ্যে পথচলা জ্ঞানীজন ব্যতীত সাধারণ জনগণের পক্ষে কতটা সম্ভবপর হয় তা গবেষণার দাবি রাখে। অনভিজ্ঞ চাষির মতই সাধারণ জনগণ শ্রম দেয়, অর্থবিত্ত ব্যয় করে দামী পোশাক পরে জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে যা কেবল লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আন্তরিকভাবে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা যায় না। তাই সাধারণ মানুষ জ্ঞানার্জন ও শান্তিলাভের জন্য যা কিছু করে তা কেবলই দেখাদেখি কপি করে আর তা হয় লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা। ফলে তারা জ্ঞানার্জন পূর্বক সফল জীবনলাভ করতে পারেনা। উপযুক্ত জ্ঞানার্জন ব্যতিত সফল জীবনলাভ করা সম্ভবপর নয়।

প্রশ্ন আসে কিভাবে উপযুক্ত জ্ঞান করা যায়। সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন বলেন, ‘জ্ঞান অর্জনে বই কিতাব হতে মানব কিতাব উত্তম’। একজন ব্যক্তি আজীবন যতটা সময় মানুষের সান্নিধ্য লাভ করার সুযোগ পায়, বই এর সাথে ততটা সম্পৃক্ত থাকতে পারেনা। মানুষের কর্মজগৎ চিন্তাজগত জ্ঞানজগতে বিচরণ করার যতটা সুযোগ থাকে, বই এর সে সুযোগ থাকেনা। কারণ বই প্রাণহীন। তাই বই অপেক্ষা মানুষের বহুমুখী বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। কারন মানুষ বর্তমান কেন্দ্রিক জীবনযাপন করে থাকে। তাই মানুষ বাস্তব সম্মত আলোচনা রাখতে সক্ষম। আর বই অতীত বিষয়ের উপর আলোচনা করে। যা অতীতের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটের ধারণা মাত্র যে ধারনা বর্তমানে কার্যকর নাও থাকতে পারে। তাই মানুষ হলো জীবন্ত বই কেতাব। আর বই হলো প্রাণহীন কেতাব। যদিও বই কেতাব একজন মানুষেরই সম্পাদিত বই। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটের নয়। মানুষ বর্তমান প্রেক্ষাপটের পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে বাস্তবতার উপর যে সকল বিষয় আলোচনা করতে পারে বই কিতাব তা পারেনা। সর্বোপরি, একজন প্রাণের সাথে আর একজনের প্রাণের স্পন্দন যতটা প্রাণবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব একজন প্রাণের সাথে প্রাণহীনের সে পরিবেশ ও সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারেনা। তাই যারা জানেনা তারা জ্ঞানার্জনের জন্য, যাঁরা জানেন তাঁদের সান্নিধ্য লাভ করেই বাস্তব জগতে জ্ঞানার্জনের উত্তম সুযোগ লাভ করে থাকে।

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য

‘শিশুই হচ্ছে সেই জমি যেখানে সমাজ মানবীয় গুণাবলীর বীজ বপন করে’।

* ‘প্রয়োজন মাফিক সহানুভূতি ব্যক্ত করাই ভালো’- সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

* ‘যার কান্না তারে কানতে দাও’- সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ প্রাণী জগতের মধ্যে মানবশিশুর মত অসহায় এবং লালন পালনের মুখাপেক্ষি আর কোন প্রাণীর শিশুরাই নয়। এই অসহায়ত্ব হলো মানব মস্তিস্কের বিস্ময়কর সম্ভাবনাগুলোর প্রত্যক্ষ পরিণাম। ক্ষুদ্র মোরগ ছানা অনায়াসে ডিমের খোলা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে। এবং জীবনের প্রথম মুহুর্তগুলো থেকেই স্বনির্ভরভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। একবার একটা পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেলে ডিমের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা মোরগ ছানাকে আবার একটি কৃত্রিম পূর্বাপেক্ষা কম শক্ত খোসায় ঢুকিয়ে দেয়া হলো। অভিজ্ঞ মোরগ ছানাটির অতি সহজেই নতুন কাজটি সম্পন্ন করার কথা কিন্তু তা ঘটলো না। এবার মোরগ ছানা এমনকি বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করলোনা। তার সহজাত প্রবৃত্তি কেবল অনুরূপ একটি অবস্থাতেই তাকে সাহায্য করতে পারে। এ ধরনের দ্বিতীয় অবস্থাটি যা বংশগতির যন্ত্র দ্বারা আগে থেকে পরিকল্পিত নয় তা তার জন্য মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়। এমনই হচ্ছে সহজাত প্রবৃত্তির শক্তি যা কঠোরভাবে প্রাণীর আচরণ নিয়ন্ত্রন করে। সহজাত প্রবৃত্তি চালিত হাজার হাজার মাছ তাদের পূর্ব পুরুষদের ডিম ছাড়ার যায়গায় যাওয়ার অদম্য বাসনা হেতু বাঁধের কাছে গিয়ে মারা যেতে পারে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রতি বছর দক্ষিনের দিকে সুদীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার সময় বহুকাল আগে লুপ্ত পর্বতগুলো ঘিরে উড়তে থাকে। সহজাত প্রবৃত্তি অন্ধ।

তবে একথা বলা ঠিক হবেনা যে মানুষ সহজাত প্রবৃত্তি থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। মানুষের আচরণের কিছু মুখ্য জীবতাত্ত্বিক ধারা বংশগতভাবে পূর্ব নির্ধারিত। যেমন বংশবৃদ্ধি, ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ, আত্মরক্ষা ইত্যাদি।

নবজাত শিশুর মস্তিস্কের বিস্ময়কর বৈশিষ্ট হচ্ছে তা অনেকাংশে সহজাত প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত এবং শিক্ষা লাভের পক্ষে, স্বনির্ভরভাবে বিশ্বকে উপলব্ধির পক্ষে ও নিজস¦ অভিজ্ঞতা অর্জনের পক্ষে খুবই উপযুক্ত। পরবর্তীকালে এসমস্ত গুণের দ্বারাই নিরূপিত হয় তার মানব প্রকৃতির সারগর্ভতা। তার বুদ্ধি, চরিত্র, বোধশক্তি, মানুষের প্রতি, শ্রমের প্রতি ও নিজের প্রতি তার মনোভাব। জন্মের আগেই শিশু কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভ করে যা তাকে প্রথমদিকে নিকট ও দূর পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বংশগত কর্মসূচীটি বাস্তবায়নে সাহায্য করে। এই কর্মসূচীটির উপাদান হচ্ছে সেই সমস্ত সহজাত প্রবৃত্তি যার দ্বারা চালিত হয় দুনিয়ার সমস্ত প্রাণীর নবজাতকেরা।

একথা সত্য যে নবজাতকের সমস্ত দক্ষতা বর্ননা করা অসম্ভব। এর কোন কোনটি বিলোপ পায়। বাকিগুলো টিকে থাকে, উৎকর্ষতা লাভ করে।

শিশুর চোখের উপর উজ্জল আলো ফেললে দেখা যায় যে, মুহুর্তের মধ্যে চোখের পাতাগুলো বুজে যায়। এর আগে শিশু নিজের উপর কখনও আলোর প্রতিক্রিয়া অনুভব করেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে চোখ বাঁচানো দরকার। হঠাৎ জোরে হাত তালি দিলে শিশু আঁতকে উঠে এবং হাত দুটো প্রসারিত করে দেয় কাছে থাকা কারো কাছে আশ্রয়ের জন্য। সে বিপদের আশঙ্কায় কাউকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে যেনো।

শিশু জানে কিভাবে খাদ্য যোগাড় করতে হয়। সে মাকে ক্ষুধা, ঠান্ডা ও ব্যথার কথা জানাতে পারে। সে হাত পা নাড়াতে পারে, অবশ্য খুবই বিশৃঙ্খলভাবে। এই সমস্ত অঙ্গ সঞ্চালন শিশুর জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তা তার রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া উন্নত করে। হৃদয় ও ফুসফুসকে তালিম দেয়, তাকে নিজ দেহকে আয়ত্বে আনতে শিখায়। নবজাতক হাচি দিতে জানে, গিলতে জানে স্বর ও জোর অনুযায়ী শব্দ চিনতে পারে। মিষ্টি ও টকের পার্থক্য বুঝে এবং সে শিক্ষা লাভে সক্ষম।

মায়ের ভালোবাসা প্রসঙ্গে:

প্রথমেই ভালোবাসা ও আদরের পার্থক্য বুঝতে হবে। শিশুর প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহ হতে পারে অপরিসীম। কিন্তু আদর অবশ্যই সীমিত করা প্রয়োজন। শিশুর কাছে পৃথিবীটা সম্পূর্ণ অপরিচিত নতুন। সে তৃষ্ণায় শুষে নেয় তার লব্ধ জ্ঞান এবং তাকে নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আচরণের নিজস্ব কর্মসূচীতে রূপান্তরিত করে। কাজেই জীবনের প্রথম দিনগুলো থেকেই যদি তার জীবন সম্পর্কে ধারণা হয়ে থাকে মায়ের সীমাহীন আদর। নিজের ইচ্ছায় সব পাওয়া, আবদার আর জিদ মেনে নেয়ার অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। তাহলে ভবিষ্যৎ জীবন কি সংসার, সমাজ তার কাছে যা আশা করবে, তার সঙ্গে কি এর কোন সঙ্গতি থাকবে? এরকম একজন মানুষের দ্বারা নিজের, সমাজের, সংসারের কোন শুভ কিছু হতে পারে কি?

শিশুরা জন্মায় অসহায় হয়ে। কিন্তু তারা বিলাসে অভ্যস্ত, আদুরে গোপাল, আত্মপ্রেমী আর স্বার্থপর হয়ে জন্মগ্রহন করেনা। অনিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা আর মাত্রাতিরিক্ত আদরই তাদের এরূপ করে তোলে।

তবে গোড়া থেকেই যদি শিশুকে নিজের চেষ্টায় খেটে খুটে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে দেয়া হয় এবং বড়রা তার উপর ব্যক্তিত্ব বঞ্চিতকারী সাহায্য চাপিয়ে না দেয় তাহলে এই শিশু নিজের জন্য, সংসারের জন্য, সমাজের জন্য সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। সে বহু মূল্যবান গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হয়।

মানুষ মাত্রই ভালোবাসা প্রয়োজন। কিন্তু তা হতে হবে যুক্তিসঙ্গত ভালোবাসা যা মানুষকে মহীয়ান করে তোলে। মায়ের প্রতি সন্তানের অনুরাগ প্রথমেই গড়ে ওঠে তার চাহিদা পূরণের জন্য মেলামেশার মধ্য দিয়ে। শিশুকে খাওয়ানো, এটিরও শিক্ষামূলক প্রভাব রয়েছে। খাওয়ানোর কাজ কিভাবে চলছে এর উপর নির্ভর করছে মায়ের প্রতি, বর্হিজগতের প্রতি শিশুর মনোভাব।

প্রশ্ন আসতে পারে শিশুর জীবনের প্রথম তিন-চার সপ্তাহ্ এর কোন তাৎপর্য আছে কিনা? আসলে শিশুর জীবনের শুরু থেকে প্রতিটি সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে বয়সে যা হওয়ার, সময় মত তা না পেলে পরবর্তীতে তা আর হয়না। মানে যখন যে জিনিসের প্রয়োজন ঠিক তখনই সেই জিনিস চালু করতে হয়। প্রথম থেকেই শিশু দেখতে, শুনতে, রঙ ও রূপ, শব্দ, সৌরভ চিনতে আর বুঝতে শিখে। শিশুর ঘুম পুরা না হলে, ক্ষুধার্ত থাকলে, সেবা যতœ না পেলে এই বিজ্ঞান বা বিশেষ জ্ঞান আয়ত্ব করতে বেশ কষ্টকর হয় এবং কোনদিনই সঠিকভাবে হয়না। কাজেই প্রথম থেকেই শিশুর খাওয়া ঘুমানো, জাগ্রত থাকা রুটিন মাফিক হওয়া প্রয়োজন এবং এটাই হলো নবজাতকের শিক্ষা-দীক্ষায় কিছুদিন যাবত ঘড়িই হওয়া উচিত প্রধান কন্ট্রোল প্যানেল।

শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ের আগে খেতে দিলে ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবারের যে আনন্দ তা থেকে সে বঞ্চিত হয়। ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবার পেলে একই সঙ্গে মায়ের গুরুত্ব এবং মায়ের রূপ শিশুর হৃদয়ে ফুটে ওঠে। যা থেকে তাকে বঞ্চিত করা অনুচিত ও ক্ষতিকর। এছাড়া ধীরে ধীরে শিশুর মধ্যে সেই অভ্যন্তরীণ সক্রিয়তার উপশম ঘটে বা সর্বদা দৈহিক চাহিদা পুরণের আগে দেখা দেয়। অন্যথায় শিশুকে এভাবে খাওয়ালে তার মধ্যে উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য প্রয়াস প্রদর্শনের এক মিথ্যা ধারণা গড়ে উঠতে পারে। শিক্ষাবিদ ও পথ্যবিদরা খাবার গ্রহনের নির্দিষ্ট সময় ও পদ্ধতি প্রস্তুত করেননি। একটা কথা জানা দরকার যে শিশুর ক্ষুধাবোধ কোন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির আভাস নয়। জীবদেহ বাইরে থেকে শক্তি লাভ ব্যতিরেকে আরও কিছুকাল টিকে থাকতে পারে। তাই ক্ষুধার্ত শিশুর চিৎকার ভবিষ্যতে পুষ্টিকর দ্রব্যের সম্ভাব্য অভাব সম্পর্কেই সতর্ক করে দেয়। এরূপ চিৎকার বর্তমানের কোন ভয়ঙ্কর অভাবের সংকেত নয়। তাই বিশেষজ্ঞগন মনে করেন মায়ের বেশী শোনা উচিত-সন্তানের জোরালো কন্ঠ নয়, ঘড়ির টিক টিক শব্দ। শিশু যেইমাত্র রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, অমনি সে অসময়ে খাবার চাওয়া ছেড়ে দেবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবনের প্রথম মাসগুলো থেকে এই সময়ানুবর্তিতা শুধু শারীরিক বিকাশের জন্যই নয়, মস্তিস্কের কাজকেও সুশৃঙ্খলিত করে দেহযন্ত্রের সঠিক ক্রিয়াকলাপে সাহায্য করে। (চলবে)

নিজের কথা – ৭

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥ সংকীর্ণতা ও উদারতা মানবিক চেতনা জগতের দুটি স্তর। এ স্তর দুটির কার্যক্রমের প্রকাশ সম্পূর্ণ পরস্পর বিপরীতমূখী। যেমন রাত আর দিন কিম্বা গরম আর ঠান্ডা একসাথে অবস্থান করতে পারেনা তেমনিই সংকীর্ণতা ও উদারতার অবস্থান একসাথে থাকতে পারেনা।

আলোর অভাব থেকে যেভাবে অন্ধকারের সূচনা ঘটে, আবার উষ্ণতার  অভাব থেকে ঠান্ডার সূচনা হয় তেমন ভাবেই উদারতার অভাব থেকেই সংকীর্ণতার সূচনা ঘটে থাকে। আলোর কর্মক্ষমতা যতটা হ্রাস পায় অন্ধকারের কর্মক্ষমতা ততটাই বৃদ্ধি পায়। একইভাবে উষ্ণতার কর্মক্ষমতা যতটা হ্রাস পায় ঠান্ডার কর্মক্ষমতা ততটাই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তেমনইভাবে উদারতার প্রভাব ব্যক্তির মাঝে যতটা হ্রাস পেতে থাকে সংকীর্ণতার প্রভাব ব্যক্তির মাঝে ততটাই বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বাস্তব জগতে আলো অন্ধকারের বিপরীতমুখী শক্তি আবার উষ্ণতা ঠান্ডার বিপরীতমুখী শক্তি। একই ভাবে উদারতা সংকীর্ণতার বিপরীতমূখী শক্তি। তাই বাস্তব কর্মক্ষেত্রে উদার ব্যক্তির অবস্থান আর সংকীর্ণ ব্যক্তির অবস্থান এক হয় না।

সমাজে একটা প্রবাদ চালু আছে, ‘সংগ দোষে লোহা ভাসে’।  উদারগণ মহানুভব প্রজ্ঞাময় ¯্রষ্টার সান্নিধ্যে থাকার জন্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রজ্ঞাময়ের উদারতার গুণে গুণান্বিত হতে থাকে। যে কারণে উদারদের সাথে সংকীর্ণদের পথ চলায় সমস্যা থাকলেও সংকীর্ণদের সাথে উদারদের পথ চলতে কোন সমস্যা হয়না তাঁরা যাকে খুশী তাকে সংগী করেই কর্ম জগতে সহজ পরিবেশ গড়ে পথ চলতে সক্ষম ব্যক্তিত্ব। আবার সংকীর্ণদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রজ্ঞাময় স্রষ্টানিষ্ঠ না হয়ে বরং জ্ঞানহীন সৃষ্টিনিষ্ঠ হয়ে থাকে। যে কারণে তাদের মতামত গ্রহণ না করে কেহ নিজের পছন্দ ও মতামত তুলে ধরতে চাইলে তারা তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয় ও বিরুপ মন্তব্য করে থাকে। প্রশ্ন আসতে পারে এমনটি হয় কেন?

গবেষকদের মতে প্রত্যাশাহীন ভালবাসা তথা প্রেমময় জীবন ধারণ করার কারনে উদার ব্যক্তিত্বগন চেতনা জগতের উচ্চস্তরের জীবনযাপনে অভ্যস্ত থাকেন। তাই তারা অপেক্ষাকৃত বলবান বা শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। যে কারনে চলার পথে তাঁরা পারস্পরিক পছন্দ ও মতামতকে সম্মান দিয়ে পথ চলা পছন্দ করেন কিন্ত সংকীর্ণরা তেমনটা পছন্দ করতে পারেনা। কারন তারা প্রত্যাশাহীন ভালবাসা তথা প্রেমময় উচ্চতর স্তরের চেতনাজগতের জীবনযাপনে অভ্যস্ত নয়। তারা অচেতন বস্তুনিষ্ঠ প্রেমহীন অস্থিতিশীল প্রত্যাশার জগতের জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাই তারা স্বাভাবিক জীবনযাপনে মানষিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল থাকে। যে কারনে তারা খেয়াল-খুশিমত পথ চলে এবং অন্যান্যদের উচ্চমানের জীবনযাপন সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনা। প্রশ্ন আসতে পারে অধিকাংশ মানুষ উদার না হয়ে সংকীর্ণ হয় কেন?

মানুষের পরিবেশের উপর শুভশক্তি ও অশুভশক্তি এই উভয়শক্তির প্রভাব বর্তমান থাকে। শুভশক্তির প্রভাবে উদার ও সুস্থ্য জীবনযাপন করা যায়।  শুভশক্তির প্রভাব আসে স্রষ্টা ও স্রষ্টার সান্নিদ্ধে যে সকল উদার ব্যক্তিত্বগন অবস্থান করেন তাদের নিকট থেকে। আর অশুভশক্তির প্রভাব আসে সৃষ্টি আর সৃষ্টির উপর নির্ভরশীল হয়ে যারা জীবন যাপন করে তাদের নিকট থেকে।  যার প্রভাবে ব্যক্তি হয় অসুস্থ্য আর সংকীর্ণ ।

স্রষ্টানিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব অপেক্ষা সৃষ্টিনিষ্ঠ ব্যক্তির সংখ্যা অনেক বেশী থাকায় তাদের সম্মিলিত প্রভাবে পরিবেশ অধিক মাত্রায় প্রভাবিত থাকে। অপরদিকে ব্যক্তির ইচ্ছেশক্তির প্রভাব অধিক বলবান হওয়ার কারণে যে সকল ব্যক্তিত্ব সৃষ্টির সান্নিধ্য অপেক্ষা স্রষ্টার সান্নিধ্যে থাকা অধিক পছন্দ করেন তাঁরা সংখ্যায় অনেক কম হলেও বলবান ইচ্ছেশক্তির প্রভাবে তাঁরা সৃষ্টির লোভ-লালসা-ভোগ পরিত্যাগ করে স্রষ্টার আদর্শিক জীবনযাপন করা পছন্দ করেন। তাঁরা অন্যের নিকট ভোগ করা অপেক্ষা অন্যদের ভোগ করার সুযোগ করে দিয়ে নিজেরা আদর্শিক মিতব্যয়ী জীবনযাপন করা পছন্দ করেন। তাইতো সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘ভোগের আনন্দ সাময়িক, ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন’।

আবার উদার মানসিক ব্যক্তিত্বগন আদর্শিক জীবনযাপন করা পছন্দ করেন, তাই তাঁরা সৃষ্টির মোহ ও আকাংখা পরিত্যাগ করে স্রষ্টার গুণাবলী অর্জনপূর্বক আদর্শিক উদার জীবনযাপন করে থাকেন। উদার ব্যক্তিত্বগন স্রষ্টানিষ্ঠ। তাই উদার মহামানব সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ জীবন চলারপথে আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট’।