ধারাবাহিক

জীবনশৃঙ্খল

মুক্তির জন্য উদগ্রীব, অথচ জীব তার শৃঙ্খলকেই ভালবাসে। এই হল মানুষের স্বভাবের প্রথম প্রহেলিকা ও দুর্ভেদ্য গ্রন্থি। জন্মের বন্ধন মানুষ ভালবাসে, তাই  জন্মের দোসর মৃত্যুর বন্ধনে হয় সে আবদ্ধ। যাবতীয় শৃঙ্খলের মধ্যে থেকেই সে তার সত্তার মুক্তি, তার আত্মপরিপূর্ণতার আকাঙ্খা করে। মানুষ ক্ষমতাকে ভালবাসে, তাই সে দুর্বলতার অধীন। শক্তির যত তরঙ্গরাজি পরস্পরের সাথে এসে মিলিত হচ্ছে, পরস্পরের উপর নিরন্তর প্রতিহত হচ্ছে, তাদের নিয়ে যে এক মহাসাগর তাই হল জগৎ। কোন তরঙ্গের শিখরে যে আরোহণ করবে, তাকে আর শত তরঙ্গের আঘাতে অভিভূত হতে হবে। মানুষ ভালবাসে সুখ, তাইতো তাকে শোকের বেদনার ভার বহন করতে হয়। অমিশ্র আনন্দ কেবল মুক্ত রাগবর্জিত অন্তঃপুরুষের জন্য; মানুষের মধ্যে সুখের অন্বেষণ করে চলে যে বস্তু তা হল একটা দুঃখভাগী কৃচ্ছপ্রয়াসী কর্ম্মর্শক্তি। মানুষের ক্ষুধা প্রশান্তির জন্য, তবে, সেই সঙ্গেই আবার চঞ্চল চিন্তার আর উদ্বেল হৃদয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করবার তৃষ্ণাও তার আছে। ভোগ বলতে বোঝে তীব্র বিক্ষোভ, আর প্রশান্তি তার কাছে জড়তা ও বৈচিত্র্যশূন্যতা। মানুষ ভালবাসে তার দৈহিক সত্তার সসীমতা, তবুও সে চায় আবার তার অসীম আর অমরাত্মার অবাধ মুক্তি। মানুষের ভিতরে একটা কি জিনিস আছে যা এই সব বৈরূপ্যের মধ্যে পায় এক বিচিত্র রস। তার চিন্তাময় সত্তা এ সকলকে জীবনের কারুকার্য হিসাবে গ্রহণ করে। কেবল অমৃত নয় বিষও তার রসনাকে, তার কৌতূহলকে আকৃষ্ট করে। সকল জিনিষেরই অর্থ আছে। সকল বিরোধ থেকেই মুক্তি লাভ করা যায়। প্রকৃতির যোগাযোগ যতই খেয়ালী হোক তার মধ্যে একটা পদ্ধতি রয়েছে, তার গ্রন্থি যত জটিল হোক, মীমাংসা তার আছে। জীবনের কাছে প্রকৃতি নিরন্তর যে প্রশ্ন করে চলেছে, তারই নাম মৃত্যু। মৃত্যুর ভিতর দিয়ে প্রকৃতি জীবনকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন এখনও নিজেকে পায়নি। মৃত্যুর আক্রমণ আদৌ না থাকলে জীব একটা অসম্পূর্ণ জীবনযাত্রার মোড়কে চিরকাল আবদ্ধ হয়ে থাকত। মৃত্যু তাকে অনুসরণ করে চলেছে বলেই তো জীব  জীবনের আদর্শ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে, আর তার উপায় এবং কি ভাবে সম্ভব তার আবিষ্কার করে চলেছে। দুর্বলতাও ঠিক সেই একই পরীক্ষা, একই প্রশ্ন নিয়ে এসেছে, আমাদের গৌরব যত সামর্থ্য মহত্ব তাদের কাছে। শক্তি হল জীবনের লীলা, শক্তি মাপ করে দেয় জীবনের মাত্রা, নির্ণয় করে জীবনের আত্মপ্রকাশের মূল্য। দুর্বলতা হল মৃত্যুর লীলা-মৃত্যু জীবনের গতি অনুধাবন করে জীবনের শক্তিসঞ্চয়ের সীমা নির্দেশ করে চলেছে।

দুঃখ ও সন্তাপের ভিতর দিয়ে প্রকৃতি জীবকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তার সকল সুখভোগ হল অস্তিত্বের সত্যকার আনন্দের একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত। আমাদের সত্তার প্রত্যেক বেদনা ও যাতনার মধ্যে তাদের রহস্য রূপে রয়েছে এক তীব্রানন্দের শিখা-এর তুলনায় আমাদের সুখভোগও যেন আলোর স্তিমিত-আভা। এই গূঢ় রহস্যটির জন্যই কঠোর অগ্নিপরীক্ষা, যন্ত্রণা, নিদারুণ অভিজ্ঞতা সকলের উপর একটা আকর্ষণ রয়েছে, যদিও এ সবকে আমাদের স্নায়ুবিক মানস-সত্তা পরিহার করে চলে, তাদের স্পর্শমাত্র সহ্য করতে পারে না।

জগতে সর্বদাই দাতার আসন গ্রহণ করো। সর্বস্ব দিয়ে দাও, আর ফিরে কিছু চেও না। ভালবাসা দাও, সাহায্য দাও, সেবা দাও, যতটুকু যা তোমার দেবার আছে দিয়ে যাও; কিন্তু সাবধান, বিনিময়ে কিছু চেও না। কোন শর্ত করো না, তা হলেই তোমার ঘাড়েও কোন শর্ত চাপবে না। আমরা যেন আমাদের নিজেদের বদান্যতা থেকেই দিয়ে যাই-ঠিক যেমন গুরু আমাদের দিয়ে থাকেন। গুরু একমাত্র দেনেওয়ালা, জগতের সকলেই তো দোকানদার মাত্র। গুরু অনির্বচনীয় প্রেমস্বরূপ-তিনি উপলব্ধির বস্তু; কিন্তু তাঁকে কখনও ‘ইতি ইতি’ করে নির্দেশ করা যায় না। আমরা যখন দুঃখ-কষ্ট ও সংঘর্ষের মধ্যে পড়ি, তখন জগৎটা আমাদের কাছে একটা অতি ভয়ানক স্থান বলে মনে হয়। আমাদের মারামারি ইত্যাদি যা কিছু-সব গুরুর চোখে খেলা বই আর কিছু নয়। এই জগৎটা সবই কেবল খেলার জন্য-গুরু এতে শুধুু মজাই পান। জগতে যাই হোক না কেন, কিছুতেই তাঁর কোপ উৎপন্ন করতে পারে না।

গুরু প্রকাশ যে-শুধু সাধুতেই আছে আর পাপীতে নেই, তা নয়; এ প্রকাশ প্রেমিকের ভিতরেও যেমন, হত্যাকারীর ভিতরেও তেমনি রয়েছে। গুরু সকলের মধ্য দিয়েই আপনাকে অভিব্যক্ত করছেন। অশুচি বস্তুর উপর পড়লেও আলোক অশুচি হয় না, আবার শুচি বস্তুর উপর পড়লেও তার গুণ বাড়ে না। আলোক নিত্যশুদ্ধ, সদা অপরিণামী। সকল প্রাণীর পেছনের সেই ‘সৌম্যাৎ সৌমতরা’, নিত্যশুদ্ধস্বভাবা, সদা অপরিণামিনী গুরু রয়েছেন।

তিনি দুঃখকষ্টে, ক্ষুধা তৃষ্ণার মধ্যেও রয়েছেন, আবার সুখের ভিতর, মহামানবের ভিতরও রয়েছেন। ঈশ্বরই সর্বত্র রয়েছেন জেনে সাধক ব্যক্তিত্ব নিন্দা-স্তুতি দুই ছেড়ে দেন।

এই যে আমাদের এত ভয়, ওটা জড়কে সত্য বলে বিশ্বাস করা থেকে এসেছে। পেছনে চিন্তা রয়েছে বলেই জড়তার সত্তা লাভ করে আমরা জগৎ বলে যা দেখছি, তা প্রকৃতির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত গুরুই ।

সাহসী ও অকপট হয়ে যে পথে ইচ্ছা ভক্তি-বিশ্বাসের সহিত চললে, অবশ্যই সেই পূর্ণ বস্তুকে লাভ করা যায়। একবার শিকলের একটা কোনমতে যদি ধরে ফেলা যায়, সমগ্র শিকলটা ক্রমে ক্রমে টেনে আনতে পারা যায়।

নিজের কথা – ২০

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ জীবন চলার পথে আমরা রাতদিন ২৪ ঘন্টা সময় অতিবাহিত করে থাকি প্রতি নিয়ত। সরাসরি ভাবে সূর্যরশ্মির কিরণের সাথে সংযোগে থাকে পৃথিবীর যে অংশটি তাকে দিন আর যে অংশটি সংযোগে থাকেনা সে অংশটিকে রাত বলে ধরা হয়। ভৌগলিকদের মতে পৃথিবী তার নিজ কক্ষপথে একবার প্রদক্ষিণ করতে রাতদিন তথা  ২৪ ঘন্টা সময় দরকার হয়। পৃথিবীর নিজ কক্ষপথে যে গতিতে দিবারাত্র ২৪ ঘন্টা পথ অতিক্রম করে, এ গতিকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বলা হয়। আবার পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে তার চারপাশের পরিধিকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এক বছর সময় লাগে। পৃথিবী সূর্যের পরিধিকে যে গতিতে একবার প্রদক্ষিণ করে থাকে, এ গতিকে পৃথিবীর বার্ষিক গতি বলা হয়।

মানুষের জড়দেহও পৃথিবীর অংশবিশেষ। তাই এ জড়দেহকেও পৃথিবীর মতই আহ্নিকগতি ও বার্ষিক গতির সাথে তাল মিলাতে হয়। আর এ তাল মিলাতে গিয়ে পৃথিবীর সাথে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তন অনুসারে অবস্থানভেদে বিভিন্ন ঋতুর পরিবর্তনের কারনে শীত বসন্ত গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্তের প্রভাব  আমরা অনুভব করে থাকি। প্রতিদিন আমরা সকালের পর দুপুর, দুপুরের পর সন্ধ্যা, সন্ধ্যার পর রাত্র, ঘোররাত্র, অতপর ভোররাতের পর আবার সকাল দুপুর সন্ধ্যা দিবা- রাত্রির চক্রের মাঝে আবর্তন করে এক এক সময়ের এক এক ধরনের প্রভাব আমরা অনুভব করে থাকি। একইভাবে আমরা বার্ষিক গতির আবর্তনের ফলে স্থান কাল পাত্র ভেদে শীত গ্রীষ্ম শরত বর্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন ঋতুর প্রভাব অনুভব করে থাকি।

বছরের পর আসে যুগ যুগান্তর শতাব্দি কাল মহাকাল। আর কাল মহাকালের প্রভাব পড়তে থাকে আমাদের অনাগত আত্মাময় জীবনের উপর।

শাস্ত্রমতে কালের চক্রাকারকে সত্যসনাতন ত্রেতা দাপর কলি ও ঘোরকলি যুগ এবং ঘোরকলি যুগের পর আবার সত্যসনাতন যুগের আবির্ভাব হয় বলে জানা যায়। সত্যসনাতন যুগের মানুষ মানবতার উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে জীবনযাপন করতেন বলে শোনা যায়। এ যুগের জীবনযাপন ছিল সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উদারতার জীবন। এ যুগের মানুষ পরস্পরের উপকারে নিবেদিত থেকে জীবনযাপন করা পছন্দ করতেন। তাই এ যুগের জনগনকে বলা হত দাতা বা দেবতা। ক্রমেই মানুষের জীবনযাপনে সংস্কার ঘটতে থাকায় কর্মফল হিসেবে পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে মানব সমাজে ত্রেতা দাপর ও কলিযুগের আগমন ঘটে। মানুষ ক্রমেই উদারতার স্তর থেকে নেমে আসে সংকীর্ণতাপূর্ণ ঘোর কলিযুগের আবর্জনাময় জীবনযাপনে। শান্তিধর্মের জীবনযাপন থেকে ক্রমেই মানুষ ধর্ম বর্ণ গোত্রে বিভাজন করে পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ক্রমেই অশান্তিময় দ্বান্দিক জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়ে ।

অনন্ত কালের আত্মিক স্বর্গীয় জীবন নিয়েই মানুষের পৃথিবীতে আগমন। এ স্বর্গীয় আত্মিক জীবনকে ধরে রেখে পৃথিবী থেকে স্বর্গে প্রস্থান করার মাধ্যমেই আছে মানব জনমের পরম স্বার্থকতা। কর্মে সচেতন থেকে লক্ষ্যাভিমূখে পথ চলার শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যুগে যুগে নানান নবী রসুল সাধক ওলী আওলিয়াগণ। তাঁদের পদাংক অনুস্মরনের মাধ্যমে পেতে পারে অনুস্মরণকারী কাংখিত সফল জীবন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারীদের জন্য বলেন,‘সফল কর্মের জন্য তিন হাজার বছর আগের ও তিন হাজার বছর পরের অবস্থান বিবেচনা করে কর্মে সচেতন থেকে কর্ম করবেন।’

মহাকালের সুতিকাগার পরমাত্মা ¯্রষ্টার নিকট থেকেই আমাদের (আত্মার) এ মনোরম মর্তের পৃথিবীতে আগমন আবার পৃথিবী হতে আমাদের আশ্রয়দাতা পরমাত্মা ¯্রষ্টার নিকটেই আমাদের অনিবার্য প্রত্যাগমন। তাই পরমশান্তির স্বর্গীয় জীবনযাপন করার জন্য আমাদের দরকার অলীআল্লাহগণের আদর্শিক জীবনযাপনের পদাংক অনুস্মরণ করা।

একদা কোন এক সময় সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘নানাভাই তোমার জীবনে কতটা সময় ঘুমিয়ে, কতটা সময় খাওয়া-দাওয়ায়, কতটা সময় চলাফেরা, গোসল, প্রসাব পায়খানা ও বাথরুমে কাটিয়েছ আর কতটা সময় তোমার আল্লার সাথে কাটিয়েছ তোমার মতো করে তার হিসেব কষে আন তো দেখি, ভাই।’  নানাভাই এঁর কথামত সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বেশ কয়েকদিন ধরে জীবনের বিভিন্ন কর্মের হিসেব কষে বের করলেন স্বীয় জীবনের নানামুখী ব্যবহারিক তালিকা সাথে সাথে তিনি তাঁর আল্লাহর সাথে কতটা সময় জীবনে কাটিয়েছেন তার হিসেবও বের করে নানাভাই এর নিকট হাযির হলেন। হিসেবের খাতায় দেখা গেল অন্যান্য সকল কর্মের চেয়ে আল্লাহর সাথে সময় ব্যয় করার হিসেব একেবারেই নগন্য কয়েক ঘন্টা মাত্র। সাধক আনোয়ারুল হক হিসেব দেখে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কে বললেন, ‘নানাভাই! তুমি তোমার জীবনের অন্যান্য কাজের তুলনায় তোমার আল্লাহকে এতে অল্প সময় দেওয়া সত্বেও তোমার আল্লাহ তোমাকে কতকিছু দিয়েছেন। উচ্চতর ডিগ্রী, বড় চাকুরী, সুন্দর পরিবার, মান সম্মান। তুমি তোমার আল্লাহকে আর একটু বেশী সময় দিয়ে দেখ তোমার আল্লাহ কতইনা সুন্দর, তোমার প্রতি তাঁর কতটা ভালবাসা।’ (চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ১৭

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৫৫: ভোগীর কাছে প্রথমে ত্যাগের কথা বললে, তোর উপর রাগই শুধু হবে না টিটকারিও কিছু দেবে। সংসারে দুঃখে-কষ্টে, রোগে-শোক, অশান্তিতে একবারে অস্থির হয়ে পড়ে, তবুও ভোগের ইচ্ছা ছাড়তে চায় না। ভোগে কি তৃপ্তি আছে রে, না তার শেষ আছে? উট কাঁটাযুক্ত ঘাস খায়, মুখ হতে রক্ত পড়ে কিন্তু ক্ষান্ত দিতে চায় না।

দেখ, পিতা হয়তো চিরজীব, ভোগ করেও দেখল ভোগে সুখ নেই, শান্তি নেই, শুধু অশান্তি-দুঃখ, কষ্ট, তবুও ছেলেকে অল্প বয়সেই বিবাহ দিয়ে সংসারে ঢুকিয়ে ভোগের রাস্তা খুলে দিল। বিবেক জন্মবার জ্ঞান হবার সময় পর্যন্ত দিল না। বিবেক নিয়ে, জ্ঞান নিয়ে ভোগ করলে তবে ত্যাগ আসে। আর ত্যাগ না আসা পর্যন্ত শান্তির আশা করা যায় না। সংসারে থেকেই মনে ত্যাগ আনতে হবে।

রামসুন্দরবাবু একজন অত্যাচারী নায়েব। এক বয়স্ক বিধবার নিকট হতে খাজনা বাবদ কিছু বেশি টাকাই আদায় করলেন। ভয়ে বিধবাটি তখন বেশি কোন কথা বলেনি। একদিন ঘরে বসেই অন্য একজনের নিকট জোরে জোরে বলছে, ‘রামা গোলামের জ¦ালায়, এ দেশে আর থাকবার জোঁ নেই।’ ঠিক সে সময়েই ঘরের পাশ দিয়ে রামসুন্দরবাবু যাচ্ছিলেন! তিনি শুনে চিৎকার করে বললেন, ‘তুই কি বললি শালী।’ বিধবাটি বলল, ‘না বাবু, আমি বলি, রামসুন্দরবাবু থাকাতেই আমি এদেশে আছি। তিনি দয়ার মানুষ, না হলে কবেই এদেশ থেকে চলে যেতে হতো।’ রামসুন্দরবাবু এত অত্যাচারী তবুও তাকে ভালোই বলতে হবে।

ভোগে এত দুঃখ আনে তবুও ইহা ছাড়াবার ইচ্ছা হয় না, বরং ভালোই লাগে, ভালোই বলে। ভোগেই ত্যাগ আনে ঠিক কথা, কিন্তু বিবেক দিয়ে, জ্ঞান নিয়ে ভোগ করলে, নতুবা নয়।

উপদেশ-৫৬: দেখ! স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন কেউই তোকে চায় না। চায় শুধু তোর কাজ করার ক্ষমতা-উপার্জিত অর্থ। একমাত্র দয়াল সৎগুরু শুধু তোকে চায়, তোর উপার্জিত কোন কিছুই চায় না। তুই যাদের আপন মনে করিস, বাস্তবিকই তারা তোর আপন কি-না চিন্তা করে দেখ। পাপের ফলে যখন রোগ হয়, সে রোগের ভাগী তো কেউ হয় না।

এক গৃহস্থের তিন বন্ধু ছিল। প্রথম বন্ধুর সাথেই প্রায় সব সময় থাকতেন। দ্বিতীয় বন্ধুর সাথে প্রায় সময়ই দেখা হতো,-খুব খাতির। তৃতীয় বন্ধুর সাথে ছয় মাস, বছরে একবার দেখা হতো। দেখা হলেই এই বন্ধু অনেক উপদেশ দিতেন।

কয়দিন পর হঠাৎ ঋণের দায়ে, পুলিশ এসে গৃহস্থকে জেলে নিয়ে চলল। সাহায্যের আশায় প্রথম বন্ধুর নিকট গেলেন। কিন্তু বন্ধু দেখাই দিল না, ঘরের ভেতর লুকিয়ে রইল। দ্বিতীয় বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, ‘আমার কোন ক্ষমতা নেই তোকে সাহায্য করি। তোকে ভালোবাসি তাই, জেলখানার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’ গৃহস্থ চিন্তা করতে লাগল, যাদের সাথে দিনরাত দেখা হয়, সেই বন্ধুরাই যখন সাহায্য করতে অপারগ, তখন তৃতীয় বন্ধুর কাছে গিয়ে আর লাভ কি? তবুও যাবে বলে সে অগ্রসর হলো। তৃতীয় বন্ধু দৌড়ে এসে দেখা করে বলল, ‘তোর কোন ভয় নেই। আমার সম্পত্তি আছে, আমি আছি। আমার সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। যদি না কুলায়, তোর ঋণের দায় নিজের উপর নিয়ে, আমি জেলে যাব, তোকে মুক্ত করবই।’ দেখ, প্রথম বন্ধু মানে-টাকা-পয়সা, জায়গা-সম্পত্তি, মৃত্যুর সময় এগুলো কোন কাজেই আসে না – দূরে পড়ে থাকে। দ্বিতীয় বন্ধু মানে – স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন প্রভৃতি শ্মশান ঘাট বা সমাধিক্ষেত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে। আর তৃতীয় বন্ধু – দয়াল- প্রেমময় গুরু।

উপদেশ-৫৭: কয়েকজন একত্র হয়েছিস, কোথায় ধর্ম আলাপ, আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের জীবনী আলোচনা করবি, তা না শুধু বাজে আলাপ, আর পরনিন্দা। ওরে! বাজে আলাপে মন অত্যন্ত মলিন ও নিস্তেজ হয়ে যায়। পরনিন্দা ত্যাগ কর। নিন্দা দ্বারা নিজের চিত্তই যে শুধু মলিন হয়, তা নয়-পরের পাপ নিজের উপর আকর্ষণ করাও হয়। নিজে পাপ না করেও নিন্দার ফলে অন্যের পাপের ভাগী হতে হয়।

এক রাজার কুষ্ঠ রোগ। কোন কিছুতেই আর সারে না। এক মহাপুরুষকে ধরলেন। মহাপুরুষ বললেন, ‘খুব বেশি পাপ না করলে কুষ্ঠ রোগ হয় না। এক কাজ কর, একটি পৃথক বাড়িতে ছয় মাসের খোরাক ও তোর বয়স্কা মেয়েকে সেবার জন্য সঙ্গে নিয়ে বাস কর। অন্য কেউ যেন সে বাড়িতে না যেতে পারে। ছয় মাস পর আমি যাব।’

রাজা সেইমতো কাজ করলেন। এক মাস পরেই রানীর মন কচ্ কচ্ করতে লাগল। তিনি দাসীদের সাথে বলাবলি করতে লাগলেন, ‘উপযুক্তা মেয়ে, না জানি কি?’ ক্রমে দেশের লোক রাজাকে নিন্দা করতে লাগল,- ‘যার স্বভাব এত খারাপ, তার কুষ্ঠ হবে না তো কার কুষ্ঠ হবে ?’ ছয় মাস পর মহাপুরুষ এসে উপস্থিত। রাজা সেই বাড়ি হতে বের হয়ে আসলেন-দিব্যি চেহারা-কুষ্ঠের চিহ্নও নেই।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রভু! এ কেমন করে হলো? মহাপুরুষ বললেন, ‘তোর স্বভাব ভালো ছিল, কিন্তু লোকের মিথ্যা সন্দেহ, তোর নিন্দা করে সমস্ত পাপ নিয়ে গেছে। এখন তুই পাপমুক্ত, তাই কুষ্ঠ রোগও নেই।’

দেখ! যার নিন্দা করবি তার পদানত না হওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই। পর নিন্দায় অল্প সময়ে, কম মেহনতে পাপ সংগ্রহের বড় পথ। (চলবে)

আত্মদর্শনে ঃ গুরু

বাংলা ভাষায় ‘গুরু’ শব্দটি বহুভাবে প্রচলিত, বিশেষ করে সাধনার জগতে যেখানে গুরু অর্থ অন্ধকারে আলো হিসেবে সম্মান দেয়া হয়। গুরুর এক বিশেষ অর্জিত শক্তি থাকে। তিনি শিষ্যের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি অতি স্পষ্টরূপে বুঝতে পারেন। বুঝে তাকে যে পথে পরিচালিত করলে সহজে তার শান্তি লাভের সম্ভাবনা তা বলে দেন। গুরুর সাথে শিষ্যের সাক্ষাতের সর্বদা সুযোগ থাকলে সাধন-কালীন সময়ে নানা প্রকার বিঘ্নের সময় শিষ্যকে বিঘ্ন দূর করবার উপায় বলে দেন এবং তার সাধনায় উন্নতি অনুযায়ী উচ্চ শিক্ষা দিয়ে তাকে সাহায্য করেন।

গুরুগণ শিষ্যগণের আর এক উপকার করে থাকেন। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে শিষ্যগণের ভার গ্রহণ করে থাকেন, অর্থাৎ শিষ্য বিপথে গেলেও যাতে সে পুনরায় সত্যের পথে আসে তারজন্য লৌকিক-অলৌকিক নানাবিধ উপায় অবলম্বন করে থাকেন। এক গুরুতে যাবজ্জীবন নিষ্ঠাই উত্তম, নতুবা ভাব ঠিক রাখতে পারা যায় না। গুরুর আদেশ মানবার কথা যা আছে, তার সম্বন্ধে বক্তব্য এই, গুরু কখনও কোনও রূপ অন্যায় আদেশ করেন না।

গুরুর শরণাগত হওয়া, তাঁর চরণে নিজেকে বিকিয়ে দেয়া সোজা কথা নয়। যাঁকে জানি না, চিনি না, কেমন করে তাঁকে ভালবাসব, কেমন করে তাঁর কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেব-এই প্রশ্ন স্বতঃই চিন্তা জগতে ভেসে ওঠে।

গুরুকরণ যারা করেছেন, গুরু তাদের জীবন চলার পথে সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেন এবং রাস্তার বাধাবিঘ্ন যা কিছু সব দূর করতে সহযোগিতা করেন। গুরুবাক্যে বিশ্বাস করে তিনি যেমনটি বলেছেন তা করে গেলে চিন্তাজগতের ময়লা সব কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য নিজের মধ্যে আলো আসবে। গুরুর প্রতি সার্বিক অঙ্গনে ঠিক ঠিক বিশ্বাস হলেই সব কাজ সুষ্ঠভাবে হয়ে যাবে। শিষ্যের নিকট গুরু স্রষ্টা।

গুরু জপ, গুরুর ধ্যান ও চিন্তা করতে করতে চিন্তাজগত যখন শুদ্ধ হয়ে যায়, তখন গুরু শিষ্যকে দর্শন করে সরে যান। শুদ্ধ আধার, শুদ্ধ চিন্তা না হলে তাঁর দর্শন পাওয়া যায় না। 

যেসব শিষ্যের সংসার-বন্ধন ঘোচে না, যারা দেখার ও উপলব্ধি করার চেষ্টা করেননি, গুরুর আদেশ পাননি, তাঁর শক্তিতে শক্তিমান হননি, তাদের সাধ্য কি যে অপরের সংসার-বন্ধন মোচন করে। কানা কানাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলে হিতে বিপরীত হয়। নিজে মুক্ত হলেই তবে অপরকে মুক্ত করা যায়।

গুরুর প্রতি অনুরাগ আসলে, উপলব্ধির মাধ্যমে সাধনা করবার ইচ্ছে হলে তখনই তিনি গুরুকে চেনার পথ পাবেন। গুরুর জন্য সাধনার পথের যাত্রীদেও চিন্তা করবার কোন দরকার নেই। যাদের গুরু লাভ হয়েছে তাদের আর ভাবনা কি, রাস্তা তো তারা পেয়েছেন। সে রাস্তা ধরে লক্ষ্যের পথে চলাই নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

গুরু কৃপা করছেন, সদিচ্ছাটাও জেগেছে, সাধুসঙ্গও মিলেছে, এখন একের দয়া হলেই হয়। চিন্তাজগত্কে একমুখী করার জন্য নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলে তবে গুরুর দয়া ও করুণা বুঝতে ও ধারণ করতে পারা যায়। কর্মে নিষ্ঠার মাধ্যমে চিন্তাজগত্কে বশে আনতে হয়। চিন্তাজগতের স্বভাবই হচ্ছে স্মৃতিপটের সাহায্যে একরৈখিকতা থেকে টেনে এনে বহু বিষয়ের মধ্যে ফেলে দেয়া।

আত্মতত্ত্ব চেনা কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও বুদ্ধির কসরতের দ্বারা হয় না। বুদ্ধিমান হলে সে যুক্তির সাহায্যে অপরের যুক্তিকে খ-ন করতে পারে। এমন যুক্তি নেই, যার খ-ন বেরোয়নি। শুধু যুক্তির সাহায্যে আত্মতত্ত্ব বোঝা যায় না। যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

মানুষের চিন্তাজগত্ যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়াসক্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়ের রাগে রঞ্জিত, ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মতত্ত্ব ধারণ করতে পারা যায় না। শিষ্যের চিন্তার স্তর অনুসারে যতটুকু বোঝবার ততটুকু গুরু বোঝান, শুধু বুদ্ধি ও পা-িত্যের দ্বারা গুরুর তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম হয় না। তত্ত্ব শুনে বা পড়ে আসল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। আসল উদ্দেশ্যে গুরুতত্ত্বকে চিনে সমস্ত অনাত্ম-বন্ধন যা রয়েছে, তা থেকে মুক্ত হওয়া। এই যে বন্ধন-মুক্তি, শাস্ত্রে যাকে অজ্ঞানের নিবৃত্তি বলা হয়েছে, তা হতে হলে তত্ত্বের সাক্ষাৎকার চাই ও তত্ত্বের অপরোক্ষ জ্ঞান চাই। বুদ্ধিপূর্বক যে জানা, প্রত্যক্ষের দ্বারা যা অর্জিত নয়, তাকে বলা হয় পরোক্ষ। পরোক্ষ জানা হলে প্রত্যক্ষ সেখানে অজ্ঞান, তা দূর হয় না। অজ্ঞানটা প্রত্যক্ষ। আমরা সাক্ষাৎ-ভাবে অজ্ঞান অনুভব করছি, যুক্তির সাহায্যে নয়। এই সাক্ষাৎভাবে অনুভূত যে অজ্ঞান, প্রত্যক্ষ যে অজ্ঞান, তা দূর করতে গেলে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি চাই। অন্য কোন উপায়ে এই প্রত্যক্ষ অজ্ঞান দূর হয় না। শুনে পরোক্ষ জানা হবে-জ্ঞান হবে না। শাস্ত্রের ভাল প-িত-ভাল বক্তা-বুদ্ধির দ্বারা ধর্মীয় শাস্ত্র বুঝিয়ে দেবেন। শুনে মনে হবে, যা বলেছেন, খাঁটি কথা, এর বিরুদ্ধে কোন যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ সব কথাই তো বলা হলো কিন্তু সংশয় যাচ্ছে না। জ্ঞানের পথের যাত্রী হওয়া যাচ্ছে না। কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে, যে খটকাকে হয়তো পরিষ্কার করে, ভাষায় প্রকাশ করতে পারা যাচ্ছে না। এইজন্য তত্ত্বকে পরোক্ষ করলে কাজ হবে না, অপরোক্ষ অর্থাৎ প্রত্যক্ষ করতে হবে। এটা সকল শাস্ত্রের সূক্ষ্ম কথা। পরোক্ষ জানা আমাদের অনুভূত নয়।

জ্ঞান অর্জনের পথে যাত্রা মাত্রই অজ্ঞানের নিরসন হয় না। সংশয়-বিপর্যয় রহিত জানা অর্থাৎ যে জানা ও চেনার ভিতর আর সংশয় আসে না বা বিপরীত কোনো ভাবনা আসে না সেই জানা ও চেনা অজ্ঞানের নিরসনকারী। সংশয় বিপর্যয় দূর করার জন্য যিনি জ্ঞানবান তাঁকেও অভ্যাস করতে হয়। অভ্যাস পরিবর্তনের খেলা কতদূর করতে হবে তার সম্বন্ধে কোনো নিশ্চিত সীমারেখা টানা নেই। যে গুরুকে অনুভব করেছে, বিষয় যার কাছে তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে, সে তার বাকী জীবনটা কাটাবে একমাত্র তাঁকে নিয়েই। ওই ভাবকে দৃঢ় করবার জন্য যাতে আর পূর্ব-সংস্কার চিন্তাজগত্কে আচ্ছন্ন করতে না পারে তার জন্য বার বার অভ্যাসের পরিবর্তন ধারা রাখতেই হয়। লক্ষ্য অনুভূত হলে আর কিছু করণীয় থাকে না তা নয়, থাকে। তখনও কর্মে একনিষ্ঠতা ও একরৈখিক থাকার দরকার হয়। জ্ঞানের দ্বারা অজ্ঞানের নাশ হলেও সাধনার প্রয়োজন আছে। জ্ঞানের দ্বারাই অজ্ঞানের নাশ হয়। জ্ঞান লাভ করতে হলে সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অভ্যাস করতে হয়। পরমতত্ত্বকে জানলে হৃদয়ের গ্রন্থি অর্থাৎ সমস্ত বাসনা দূর হয়। সমস্ত সংশয় ছিন্ন হয়ে যায়। এইজন্য বার বার অভ্যাস পরিবর্তন জরুরি। একবার তত্ত্বের অনুভূতি উপলব্ধিবোধে বর্তমান হয়ে গেলে আর ভ্রমের উৎপত্তি হয় না। কিন্তু তারপরেও লক্ষ্যে পৌঁছানো হয়ে গেলেই হয় না, যাতে তার থেকে চিন্তাজগত্ আর বিক্ষিপ্ত না হয়, বিচ্যুত না হয় তার জন্য অভ্যাস করতে হয়। সকল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে গুরুময় স্থিতির অর্থাৎ শান্ত থাকার অভ্যাস করতে হয়। অভ্যাস ছাড়া স্থিতি লাভ হয় না। জ্ঞান অর্জনের পথে দেহ জড় হয়ে গেলে সেই দেহ আর স্থায়ী হয় না। তখন আর তত্ত্বজ্ঞানের উপদেশ দেয়ার লোক থাকে না। জ্ঞান অর্জনের পথের পথিক পুঁরুষেরা দেহকে আঁকড়ে ধরেও থাকতে চান না, আবার পরিহারও করতে চান না। গুরুর অধীন হয়ে, গুরু প্রেরিত হয়ে ব্যবহার করতে হয় বিশ্বব্রহ্মা-কে। আর সেই দেহের দ্বারাই জগতের কল্যাণ হয়।

হাক্কানী কথা – ৫

– সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

প্রতিটি কর্মে নিষ্ঠাবান কিনা, না কাউকে ঠকাচ্ছেন, না কারও সঙ্গে দুনিয়াদারী ফায়দা নেয়ার জন্য যোগাযোগ রাখছেন? ভিতরে একরকম চিন্তা করছেন, বাইরে আরেক রকম করছেন। নাকি এগুলো কারও মধ্যে নেই? সবাই শুদ্ধ ও পবিত্র হয়ে আসছেন? এখানে কেউ বলতে পারবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত- আমি কতটুকু ছিলাম, কতটুকু আছি, কতটুকু থাকবো? আর কতটুকুই বা প্রাপ্তির সৌন্দর্য দেখলাম? একটা প্রাপ্তির সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে দরবারে গেলাম,দেখলাম সেখানে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বসে আছেন। কিছুই জানিনা। আসনে বসেন আছেন, চোখ পড়লো, দেখতেই থাকলাম। সে দেখা আজও শেষ হয়নি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেষ হবেও না। মানুষ এরকম এক প্রজাতি যেকোন সময় যে কোন মুহুর্তে – বিট্রে করতে পারে। আবার তারাই নিজেদের নাম রেখেছে আশরাফুল মাকলুকাত বলে। আবার বলেছেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। হ্যাঁ নাই। কিন্তু মানুষকে যখন অন্বেষণ করা যাবে তখন দেখা যাবে- মানুষ রূপি কতজন আছেন! তাহলে কোন জায়গায় আমরা? আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে কোন জায়গায় আমরা অবস্থান করছি আমারই জগতে? আমি কোন জায়গায় আমার কর্মজীবনে, আমার পরিবেশে, আমাকে কেন্দ্র করে যত মানুষ আছে তার মধ্যে একটা মানুষের কাছে আমি সত্যের উপরে আছি? খুঁজে পেয়েছেন তো? একটা মানুষের কাছে কি কেউ পুরা সত্য বলে? তার নিজের কথা , যখন যেটা চিন্তা করছে খারাপই হোক বা সমাজে ভালই হোক সেটা বড় কথা না। তার চিন্তাতে যে কথাটি তার মুখ দিয়ে প্রকাশ হচ্ছে সেটা মুক্তভাবে বলতে পারছে। যাদের নিয়ে সংসার জীবনে, যাদের জন্যে এই পার্থিব জগতে নীতি বহির্ভূত হয়ে আমরা বাহিরে কাজ করে যাচ্ছি; তিনি কি বলতে পারবেন – আমিই সত্য অন্তত একজনের কাছে? আমরা বলি আমি সত্য না হলে গুরু সত্য নয়। গুরুর কথা বাদ দেই। এটা অনেক উচ্চস্তরের কথা। আমরা শিখেছি একটা, পড়েছি আরেকটা। এই জন্যে সহজেই উচ্চারণ করি গুরু। কিন্তু আসলে তো সঠিক না। তুমি তো ধারণই করনি! গুরু গুরু কর কেন? এটা আমাদের প্রচলিত হয়ে গেছে। যার জন্যই কিন্তু আমরা প্রাপ্তির সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে পারছিনা। ওখানে পর্যবেক্ষণ করতে পারছিনা, অনুসন্ধান করতে পারছিনা। তাহলে কেমন ভাবে তাঁকে ফেলে দেই? বহু ধর্ম আছে- বেহেশত দোযখ দেখিয়ে দিয়েছে -এটা করলে এটা হবে, এটা করলে ওটা হবে, এগুলো কিছু না। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি – আমি সারা পৃথিবী ঘুরে এসে বলছি যে, এগুলো শুধু প্রলোভন। এসব সত্য জায়গায় একটা মানুষকে নিয়ে যেতে পারছে না। যেমনভাবে আজ মোহাম্মদি ইসলাম নাই। মোহাম্মদি ইসলাম, যাঁর আশির্বাদ আমাদের উপর বর্ষিত হোক এটা কামনা করব। অথচ আমরা বলি আমার শান্তি তোমার উপর বর্ষিত হোক। কতবড় ধৃষ্টতা! নবী মোহাম্মদের উপর আমরা সালাম দিতে পারি? কিন্তু আমাদের শিখিয়েছেন। কেউ দুর থেকে সালাম বলছেন, কেউ বলেন সাল্লাল্লাহ আলাই ওয়া সাল্লাম। বলেন আপনারা এটা ধৃষ্টতা না? আমাদের যা করতে হবে, বলতে হবে              -তাঁর আশির্বাদ আমার উপর বর্ষিত হোক’। এর মধ্যে কৃতজ্ঞতা স্বীকার আছে। এটা কুরানে বহু জায়গায় আছে যে-কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, আরও পাবে। সে ধর্মই বা কোথায় হারায়ে ফেললাম? এ পর্যন্ত অনেক কিছু লেখা হয়েছে, সেখানে মোহাম্মদী ইসলামের কিছুই নাই। যেহেতু তারা জানে, তারা যা করেছে তা চতুরতার সংগে করেছে, যেহেতু নবী মোহাম্মদ তো এসে সামনা সামনি প্রতিবাদ করবেনা। যখন ধর্ম প্রচার করা শুরু করেছে তখন তো প্রতিবাদ করেননি। একটা নামে যত কিছু নেয়া যায়, আসলে আমরা আমাদের আধিপত্য বিস্তার করেছি।

তুমি তো আধিপত্য বিস্তার করছ খুব ভালো কথা। কিন্তু কোরআনে বলে গেলেন -‘তুমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব অভাবিদের মধ্যে বন্টন করে দাও’ – কই তুমি তা দিচ্ছ? তুমি তাঁর অনুসারী, তাঁর উম্মত, তোমার নামে বাড়ী নাই! তোমার নামে ব্যাংক ব্যালেন্স নাই! তাহলে কেমন ভাবে তুমি মোহাম্মদকে বলবে আমার রসুল আমার নবী? কোথা থেকে এটা পরিবর্তন হলো, এটা আমাদের চিন্তা করতে হবে। কখন থেকে এগুলো পরিবর্তন হলো? মহানবীর উপরে আঘাত না আসলে কখনো আঘাত করেন নাই। নিজে বিচার করে দেখেন। তারপরে  আপনারা যেগুলো পড়েন এগুলোর মধ্যে কত পার্সেন্ট সত্য আছে, নিজে চিন্তা করে, গবেষণা করে বের করতে হবে। যখন আপনি আল্লাহ এক-এই সূত্র ধরে আপনার জীবনকে আপনি প্রতিষ্ঠিত করতে যাবেন, তখন আসবে এক-কে কেন্দ্র করে চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত পথে চালানো। যে ‘এক’ ছাড়া আমি কিছু বুঝিনা, আমিও এক। যে একের সংগে সংযোগ করবো। যতক্ষণ এই জায়গায় না আসবেন ততক্ষণ তো এটা বুঝার কথা না। এটা হবে কথার কথা। মুখের কথা। এই রকম অনুষ্ঠান হবে। ১৪০০ বছর ধরে এই রকম সবাই বলে যাচ্ছি আমরা। সারা বিশ্বজুড়ে আবার অহংকার করছি, আমরা সারা বিশ্ব জয় করে ফেলছি কিন্তু আদতে কি করছি? তারা যে বলছে, মোহাম্মদ রসুল, মোহাম্মদ নবী, আমরা তাঁর উম্মত। এতটুকু ভালবাসা থাকলে তাহলে তাঁর নামে কেন দেশটা হলো না? যারা দখল করে নিল, সৌদিআরব তার নামে হয়েছে! কই এখানে তো মুসলমানরা কেউ এগিয়ে যায় না! কেন বলে না এটা মোহাম্মদি আরব হবে? এটা অবারিত, আমাদের নবী, আমাদের রসুল, এখানে সবার অধিকার আছে। কোন জায়গা থেকে আওয়াজ শুনেছেন বা কোন পত্রিকায় দেখেছেন আপনারা যে এই ধরনের কথা তুলেছে? অন্যের জমিতে আপনাকে কেন থাকতে দিবে? কেন যেতে দিবে? তার তো নিজস্ব একটা এজেন্ডা আছে! সত্য নিজের মধ্যে। নিজের বাস্তবতায়। নিজের কর্মের মধ্যে। নিজের পরিবেশের মধ্যে। এরমধ্যে নিজের কতটুকু পরিবর্তন হচ্ছে সেটা ধরতে হবে তো। পকেট থেকে ১০০ টাকা উধাও হয়ে গেলে সেখানে কি অবস্থার সৃষ্টি হয়? একটা সম্পদ আপনার হাতছাড়া হয়ে গেলে কি অবস্থার সৃষ্টি হয়? আপনার চারপাশ আপনার পরিবেশ। আপনার বাবামা, ছেলেমেয়ে পৃথিবী থেকে চলে কি অবস্থা হয়- এটা কি – উপলব্ধি করে না? বাহ্যিক ভাবে করে। বাস্তবতার নিরিখে করে না। লালনটা হবে কি করে ধারণ না করলে? অথবা সত্যমানুষের সংস্পর্শে গিয়ে নিজেকে পরিবর্তন না করলে? যেমনভাবে আমরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বাহ্যিকভাবে- ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছি, আরেক জনের সহযোগিতা নিয়ে। কেউ জন্মগ্রহণ করে সংগে সংগে অন্যের সহযোগিতা ছাড়াই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার সবকিছু হতে পেরেছে? সব ক্ষেত্রে এক-এ থাকার নামই কিন্তু যোগ্যতা। আপনাদের কাছে আমার আবেদন- নিজেদেরকে খোঁজেন নিজের মধ্যে। (চলবে)

নিজের কথা – ১৮

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে ” বাণীটি সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর। আমরা জীবন চলার পথে বুঝে না বুঝে বিভিন্নভাবে প্রতিটি মুহুর্ত বিভিন্ন কর্ম করে থাকি। কখনও ক্ষুধা পিপাসা নিবারণে, কখনও বিনোদনে, কখনোও আপদবিপদ সরাতে, আবার কখনও বা না বুঝে, দেখাদেখি । আমাদের জীবনের সকল কর্মের মাঝেই কিছু না কিছু সময় ব্যয় হয় আবার কখনও অর্থ ব্যয় হয়। অর্থ ও সময় ব্যয় এর মাধ্যমে জীবনের প্রয়োজনে যে সকল কর্ম সম্পাদন করে আমরা অভাব মোচন করতে পারি এগুলোকে আমরা সার্থক কর্ম বলে বিবেচনা করি । যা আমাদের জীবনের পরিতৃপ্ত ঘটায় এবং সুখানুভূতি কিম্বা আনন্দানুভূতির সঞ্চার করে। কর্মে আশা ও উৎসাহ যোগায়। অন্যথায় অসার্থক অপচয় বেকার কর্ম বিবেচিত হলে আমরা দু:খ পায় নিরানন্দ হই। কর্মে উৎসাহ হারাই। জীবনে হতাশার অনুভূতি অনুভব করে থাকি। প্রশ্ন আসতে পারে এ পৃথিবীতে আমাদের আগমন দু:খ নিরানন্দ হতাশা বঞ্চনা ও অশান্তির জীবনযাপন করা, না সুখী উৎসাহ আনন্দ ও চির শান্তিময় জীবন যাপন করার যোগ্যতা অর্জন করা। সাধকের বাণীর তাৎপর্য অন্বেষণের মাধ্যমে আমরা সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে পারি। বাণীর প্রথমেই ‘নিজের’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার ভাবার্থ স্বয়ং চিরন্তন আত্মাকে বুঝায়। শাস্ত্র মতে, স্বয়ং চিরন্তন আত্মার আগমন স্রষ্টার নিকট থেকে এবং প্রত্যাগমন স্রষ্টার নিকটেই হবে ( আল-কুরআন)। তাই ‘নিজের’ শব্দটির অস্তিত্বের পরিসর জন্ম-মৃত্যুর সীমানার বাহিরে কালের সাক্ষ্য কালজয়ী অমর অস্তিত্ব। কালের প্রতিটি মুহুর্ত বিচরণকারী এ কালজয়ী সত্ত্বা কালের মাঝে ভ্রমনকালে কতটা স্রষ্টার নিয়ম নীতি অনুস্মরণ পুর্বক দায়-দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে থাকে, তা স্বয়ং নিজে এবং স্ররষ্টা ব্যতীত অন্য করো পক্ষে সঠিক মূল্যায়ণ করা সম্ভব নয়। বাণীর ‘বিচার’ শব্দটি ব্যক্তির এমন এক কর্মক্ষমতাকে বুঝায় যা দিয়ে ব্যক্তি কোন কর্ম কতটা ত্রুটিমুক্ত কিংবা ত্রুটিযুক্ত করে থাকে তা নিরুপন করতে পারেন। ‘বিচার’ কর্মটি ব্যক্তির চেতনা জগতের স্বচেতন স্তরের কার্যক্রম। স্বচেতন স্তরে ব্যক্তি জ্ঞানযোগে কর্ম সম্পাদন করে থাকে। তাই ব্যক্তির স্বচেতন স্তরের কর্ম ত্রুটিমুক্ত ও সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকে। বাণীর ‘ নিজে ‘ শব্দটি স্বয়ং নিজ স্বত্ত্বাকেই বুঝায়। যা চিরন্তন কালজয়ী অমর। শাস্ত্রমতে সকল শক্তির আধার হল স্বয়ং স্রষ্টা । আবার জ্ঞান পবিত্রতা প্রেম বিশ্বাস আনন্দ শান্তি এ সকল গুণাবলীর আধার হলেন স্বয়ং স্রষ্টা নিজে। কাজেই স্রষ্টা তথা পরমাত্মার নিকট থেকে যে চিরন্তন আত্মা তথা ‘ নিজ ‘ এর আগমন , সে চিরন্তন আত্মার মাঝে পরমাত্মারই গুণাবলীর প্রতিফলন হবে এটাই স্বাভাবিক । স্রষ্টা তথা পরমাত্মার জ্ঞান ও গুণাবলী সমৃদ্ধ আত্মা যা চৈতন্যময় সত্ত্বা তথা ব্যক্তির আমিত্ব। কিন্তু কালের আবর্তে পরিভ্রমণ করতে করতে চৈতন্যময় সত্ত্বা তথা ব্যক্তির আমিত্বের উপর নানান অনিয়ম জনিত অপকর্মের আবরণ পড়তে থাকে। যা এক সময় ব্যক্তির আমিত্বকে তথা চৈতন্যময় সত্ত্বাকে প্রলেপন করে ফেলে। ফলে পার্থিব জগতে পরিভ্রমণরত আত্মার পরমাত্মার নৈকট্যলাভ করতে সরল সঠিক পথে পথ চলা সম্ভব হয়না। এমতাবস্থায় ব্যক্তি বিচার শক্তির আশ্রয় নিলে জ্ঞান তথা স্বচেতন অবস্থার চৈতন্যশীল স্বত্ত্বালাভ করে নিজেকে আমিত্বের আবরণমুক্ত করতে পারে। ফলে ব্যক্তির পক্ষে ¯্রষ্টা তথা পরমাত্মার সান্নিধ্যলাভ করার পথে পথ চলা সহজ হয়। এ প্রসংগে দিকনির্দেশনা দিতে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন,” আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার অপর নাম এবাদত।” বাণীর ‘ কর ‘ শব্দটিতে ব্যক্তিকে তাগিদ দেয়া হয়েছে। ব্যক্তি বিচার পূর্বক কর্ম করলে সুষ্ঠুভাবে নির্ভুল কর্ম করে সাফল্য অর্জনের পথে থাকবে অন্যথায় বিভ্রান্তদের দলভুক্ত হয়ে অসফল পথের পথিক হবে। বাণীর ‘ রাত্র-দিনে ‘ শব্দমালায় সদাসর্বদা স্বচেতন অবস্থায় কর্মনিষ্ঠ থেকে কর্ম করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যাতে কাংখিত সাফল্যলাভ করা সহজ হয়। (চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ১৪

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৪৯: তোরা কি মনে করছিস্ মহাপুরুষ হলে বনে-জঙ্গলে চলে যেতে হবে অথবা লেংটা হয়ে পাগলের মতো পথে পথে ঘুরতে হবে? যে মানুষে, মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ হয়েছে, সে-ই মহাপুরুষ।

যে মানুষের মধ্যে হিংসা, নিষ্ঠুরতা, ভন্ডামি, ছলনা, ভোগ, বিলাস, অপচয়, অপব্যয়, অমিতাচার, স্বৈরাচার, অনাচার, মিথ্যা, ঔদ্ধত্য, বাচালতা, ভীরুতা, আলস্য, পরমুখাপেক্ষিতা, অস্থিরচিত্ততা, ইন্দ্রিয় আসক্তি নেই, -ভগবৎ ভক্তি, প্রেম, বিনয়, নম্রতা, সত্যনিষ্ঠা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সৎসাহস, স্বাবলম্বন, অধ্যবসায় প্রভৃতি বিকাশ হয়েছে সে-ই মহাপুরুষ।

কিন্তু প্রকৃত মহাপুরুষ সে-ই যিনি গাছে, মাছে, মানুষে, পশুতে, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সব কিছুতে একমাত্র দয়ালের বিকাশ দেখেন। একমাত্র দয়াল ছাড়া আর কিছু আছে এ মহাভুল যার নেই, দয়ালই সব, সবই দয়াল, তিনিই প্রকৃত মহাপুরুষ। প্রকৃত মহাপুরুষত্বে আর ঈশ^রত্বে বেশি প্রভেদ নেই।

উপদেশ-৫০: দয়ালকে, প্রেমময়কে প্রত্যক্ষ করাই জীবনের মূল উদ্দেশ্য। কেউ হয়তো নাম জপ করতে করতেই তাঁকে লাভ করল। কেউ হয়তো ধ্যান করে, কেউ হয়তো রোজা-নামাজ করে, কেউ হয়তো পূজা, যোগ, হোম করেই তাঁকে লাভ করল। যিনি যে পথে তাঁকে লাভ করেছেন, তিনি সে পথেরই গুণ বর্ণনা করে গেছেন, – তাকে শ্রেষ্ঠ বলে গেছেন। তাই প্রত্যেক মতাবলম্বীদের অনুসরণকারীরা, নিজ নিজ পথকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। হয়তো অন্য মতকে অস্বীকারই করে বসল আর নিকৃষ্ট তো স্বাভাবিকই মনে করে। ঝগড়া-বিবাদ যত এখানেই।

অধিকার ভেদেই পথ। কেউ হয়তো বাজার হতে বালতি দিয়ে দুধ আনে, কেউ আবার কলসি দিয়েও আনে। দুধ আনা নিয়ে তো কথা, কিন্তু সে কথা ভুলে, বালতি ভালো, কলসি ভালো তাই নিয়ে ঝগড়া কেন?

ওরে নামাজ, পূজা, নাম জপ, ধ্যান প্রভৃতির মূলে কি? দয়ালের প্রতি ভালোবাসা। নিষ্ঠার সাথে, মনোযোগের সাথে যে কোন পথেই অগ্রসর হস্ না কেন, সেই ভালোবাসায়ই পৌঁছে দিবে।

নিমন্ত্রণ বাড়িতে অনেক কিছুই পাক হয়। এখন যে যা খেলে সহ্য হয়, তা খেয়েই পেট ভরে। অধিকারভেদে, কেউ নাম জপ করে, কেউ নামাজ পড়ে, কেউ পূজা করে। একনিষ্ঠভাবে করলে, সেই চরম ফল-দয়ালের প্রতি ভালোবাসা হবে। প্রেমময়ের প্রতি প্রেমই যদি না হয়, তবে পূজা, নামাজ, নাম জপ কোনটাই ফল হলো না বুঝবি! দয়ালের প্রতি ভালোবাসা আসা নিয়ে কথা, সে যে পথেই হোক।

যে মতে তোর নিষ্ঠা আসে, একাগ্রতা আসে, দয়ালের প্রতি ভালোবাসা বাড়তে থাকে, সেই পথই তোর জন্য শ্রেষ্ঠ,- সেই পথেই তাঁর কাছে পৌঁছে যাবি।

উপদেশ-৫১: ওরে, মানুষই সব’রে-মানুষই সব। মানুষের ভেতর দিয়েই দয়ালের প্রেমময়ের আদর পাবি। একমাত্র মানুষের ভেতর দিয়েই, তাঁর কথা, তাঁর উপদেশ শুনতে পাবি।

দয়ালকে – প্রেমময়কে ভালোবাসতে, সেবা করতে, ভোগ করতে, রস আস্বাদন করতে যদি চাস্ তবে সে একমাত্র মানুষের ভেতর দিয়েই।

দেখ, মানুষের মধ্যেই শিয়াল, কুকুর, বাঘ, ভল্লুক, ভূত, পেত্নী আছে, আবার দেবতাও আছে, মানুষের মধ্যেই শয়তান আবার সাধু-ভক্ত, অলি-আওলিয়া, দরবেশ আছে। মানুষের মধ্যেই একজন অপরকে মারতে যায়, আবার এই মানুষই অপরকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দেয়। জগৎ সৃষ্টিকারী মানুষই, আবার ধ্বংসকারী মানুষই।

মানুষের মধ্যে যখন সম্পূর্ণ মানবত্ব ফুটে ওঠে, তখনই সে প্রকৃত মানুষ। প্রকৃত মানুষের ভিতরই সর্বশক্তি-পূর্ণানন্দ বিরাজ করে। সকলের উপরে মানুষ, তার উপরে নেই। দয়াল নিজের পূর্ণত্ব দিয়ে মানুষ তৈরি করেছেন বা হয়েছেন। (চলবে)

হাক্কানী কথা – ৪

হাক্কানী কথা – ৪

– সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

প্রথম যে কথাটাকে সম্ভোধন করছে ‘তুমি’ বলে, ‘তুমি’-টা কে?  কে বলছে কাকে? এখানে ‘তুমি’ রূপক। সাধককে না জানলে, নিজেকে না মানলে এর ব্যাখ্যা অন্যরকম হবে। বিভিন্ন উরসবহংরড়হ এ, যার যার চিন্তার পরিধির উপর ‘তুমি’ কে? কাকে বলল সেটার উপর নির্ভর করবে। যেমনভাবে আজকে আসছে ‘সত্যমানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’। দেশ, জাতি ও সত্য আছে কিন্তু মানুষ সত্য হতে পারছে না। মানুষ সত্য।

এটা কর্মের মধ্যে হবে না। এটা ধারণের ব্যাপার।  সে কারণেই সত্যমানুষ হওয়ার এই জনপদে দেশ ও জাতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্যে, আমি কিছুটা হলেও সত্য অন্বেষণ করব নিজের মধ্যে। যতটুকু নিজের মধ্যে অন্বেষণ করব, দেখবেন যে পৃথিবীর বুকে বহু সত্যমানুষ আছেন যার সঙ্গে একাত্মতা হয়েছে। এই একাত্মতা হয় বলেই অনুস্মরণকারী হয়, স্মরণে রাখে, আস্তে আস্তে সংযোগ বাড়ে, সম্পর্ক হয়।  -‘কাম এন্ড গো’, ‘নিজের মধ্যে একটা মতলব আছে’- এরকম একটা মনোবৃত্তি  নিয়ে সত্যমানুষের কাছে যাবেন- তিনি ধরে নিবেন যে, সে কিসের জন্য এসেছে। তারপরেও তাকে নার্সিং করবেন, নার্সিং করলে যে ফল পাওয়া যায়, তার জ¦লন্ত প্রমাণ এই হানিফ। সত্যমানুষ এর সংস্পর্শে এসে  কেমনভাবে রূপের আর ভাবের পরিবর্তন হয় সেটা নিজেই দেখেছি,দেখছি নিজেকে নিয়ে। ‘সত্য’ কথাটা নিয়ে চিৎকার করে বলতে পারি, এছাড়া হবে না। কোন শান্তি পাবেন না। কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হতে পারেন যেটা একটা মুহুর্তের জন্যে। তা না হয় তো সর্বক্ষণ দেখবেন যে আপনার চিন্তার জগতে সর্বদা ঠোকর দিচ্ছে। চিন্তা করছেন কখন ছাড়বে – যাব, বসে বিভিন্নভাবে চিন্তা করছেন। নিষ্ঠার সঙ্গে সবাই কি পুরো এই আলোচনা শুনতে পেরেছেন?  পারবেন না,  এটা আরও সময়ের দরকার! কিন্তু এই যে আপনারা ৫টা হতে বসে আছেন, বসে বিভিন্ন চিন্তা করছেন, এটাও ধৈর্য্যরে পরীক্ষা দিচ্ছেন যেটা আপনার ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগবে। ঐ সত্য খুঁজতে একনিষ্ঠ হওয়ার জন্য। যদিও সঠিকভাবে অনেকে বসতে পারেন না। বসতে জানেনও না, আদবও রক্ষা করতে পারেন না। এখানে কোন চিন্তা করা হয় নাই। আপনার বসার পদ্ধতি দেখেও বলা যায় কেন এভাবে বসলেন, এখন কি চিন্তা করছেন, একাগ্রতা আছে কিনা,  নিষ্ঠা আছে কিনা? তারপরও ঠিক আছে, কারণ সে তো আসছেই অন্য কাজে। এটাই চলছে। এটাই বাস্তব।

 সবাই ভাল করে শুনে রাখেন- চেতনার জগতে যতক্ষন আপনি সচেতন অবস্থায় না যাচ্ছেন, যা চতুর্থ আসমান পর্যন্ত- আপনার কর্মকান্ডের মধ্যে এমন বিশৃঙ্খলা থাকবে। আর যখন থেকে আরম্ভ করবেন সচেতন অবস্থাতে- তারপর যখন দ্বৈত চেতনে যেতে পারবেন, তারপর যখন উর্দ্ধ চেতনে যেতে পারবেন তখন আপনি দেখবেন যে, আপনি যে কথাটাই বলছেন সেই কথাটা ঠিক, আপনি নিজেই যে সত্য- এটা প্রকাশ হয়ে যাবে। মানুষ বুঝতে পারবে। সাধারণ মানুষ এ-জায়গায় যেতে পারে না বলেই সে দৌড়ায় সত্যমানুষের কাছে। কিন্তু সত্যমানুষেরা আবার ভেগ ধরে। যখন দেখেন- এর মধ্যে ব্যবসা আছে, এর মধ্যে লোভ আছে, এর মধ্যে মোহ আছে। নিজে যখন সত্যের উপর যাবেন তখন দেখবেন, দেশ ও জাতির সঙ্গে আপনি একাত্মতা করবেন। তখন দেখবেন আপনার কাছে তথাকথিত মৃত্যুর কোন জায়গা নাই জীবন ছাড়া।

তাছাড়া পারবেননা এবং সে পরিবর্তন ঘটিয়ে যাবেই। সত্যমানুষ পরিবর্তন ঘটিয়ে যাবে। সূফীতত্ত্বে যেটা অনেকে বলে সূফীবাদ! সূফীবাদ নয়, যারা সূফীবাদ বলে এরা কখনও সূফী হতে পারবেনা। যারা বাদ করে দিচ্ছে ওরা আবার সূফী হবে কি করে? ওদের মধ্যে এটুকু ধারণা নাই যে, বাদ বললে সেটার মধ্যে কি কি জিনিস থাকতে হবে। ‘সূফীতত্ত্ব’ এটার মধ্যে ঢুকছে – একেক সময়ে, একেক যুগে, সেই সৃষ্টির প্রথম থেকে। সূফীগণ  বলে যে, আমরা এটা নবী মোহাম্মদের কাছ থেকে পেয়ে আসছি। সূফী অর্থই হলো সত্যমানুষ (বাংলায়)। যাঁর প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি অঙ্গ, প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যে তিনি সত্য ছাড়া কিছু দেখে না। তাঁরাই সত্যমানুষ কিন্তু তফাৎটা কোথায়, কেন তত্ত্ব হলো? একেক যুগে একেক জন আসছেন। একেক জনপদে একেকজন আসছেন। তিনি তাঁর মতো করে সেখানে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন সেই জনপদকে উত্তোরণ ঘটানোর জন্য। এইসবগুলোর সমাহারই হলো সূফীতত্ত্ব – এটা চলতে থাকবে। মানুষ প্রজাতি যখন থেকে আসছে, যখন তারা ব্যক্তি স্বার্থের মধ্যে ঢুকে হানাহানি করা আরম্ভ করেছে, মারপিট হত্যা রাহাজানি সবকিছু যখন তাদের মধ্যে হচ্ছে, সেখানেই একজন সত্যমানুষ এসেছে। এই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে সমগ্র বিশে^। এটাই আধ্যাত্মিক জগত। যেটা হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলছে- সূফী বলোনা, বলো তোমার ভাষায় সত্যমানুষ। ‘মানুষ সত্য’ নয় ‘সত্যমানুষ’। কিন্তু দেখ- সত্যমানুষ না হতে পারলেও তো যোগ তো পাবো।   ছিটমহলে যারা থাকে এখনো বলে আসছে গ্রামে একটা বাড়ী নাই। অন্যের বাড়ীতে  বসে তারা বলছে – আমরা খুব সুখে আছি। আবার যারা পাঁচ তলা, দশ তলা বিল্ডিং করে আছেন, সেও বলছেন আমি ভাল আছি। তেমনি সত্য কতটুকু জায়গায় আছে? যে সত্য বাংলার বুকে চলছে, বাতাসে চলছে, পানিতে চলছে, মাটিতে আছে। বাংলার মাটিতে এমন কোন ফসল আছে যা  ফলেনা। এটা কি মরুভূমি? মরুভূমিতে মানুষ হয় পাষান। একটাও ভাল লোক না। কেন? দেখে এসেছি। এই যে বাংলার মাটি এইখানে যে আবহাওয়া, এটাতো মানবতার আবহাওয়া। নিজেদেরকে যখন বিশ্লেষণ করতে যাবেন, তখন দেখবেন প্রতিটি বাড়িতে একজন মেহমান আসলে কেমন মেহমানদারি হয়। সবকিছুই যদি তাকে নিংড়ে দিতে পারি, তাহলে খুশি হই। ‘মুসলিম’ বাংলায় হচ্ছে ‘শান্ত’, ‘ইসলাম’ অর্থ ‘শান্তি।  যত সহজভাবে বুঝতে যাবেন তত দেখবেন নিজেকে। আপনি সুন্দরভাবে চিন্তা করতে পারবেন যে, আমি কে কোথায়। আমরা বলি, প্রথম আয়াত এসেছে এক দিয়ে অর্থাৎ পড়। যাদেরকে বক্তব্য দিতে বলা হবে এ ব্যাপারে, পড়ার মধ্যে কি কি আছে?  তার মাথার মধ্যে আরেকজন না বলে দিলে, সে কি পড়তে পারবে ? সে না দেখলে,  না শিখলে, না শুনলে, না জানলে, না বুঝলে এটা কি করতে পারবে? আপনারা আপনাদের ছেলে মেয়েদের পড়ান না?  পড়া- দেখা, শুনা, বুঝা, জানা এই চারটার যখন সমন্বয় ঘটে তখন সে চেনে, এবং তখন সে পড়তে পারবে। তা নাহলে সেকি পড়তে পারবে? নিজেকে পড়বে। এগুলো আমাদেরকে বলা হয়নি। এগুলোর মধ্যে আপনারা যখন গবেষণা করবেন, দেখবেন অনেক ষড়যন্ত্র আছে। চিন্তনপীঠের একজন সদস্য হিসাবে আপনাদের আছে আবেদন থাকবে- আপনারা নিজেকে চিনতে শেখেন, আপনারা আপনাকে চিনেন না। যে আপনি কত শক্তিশালী এবং কতটা সত্যের অধিকারী। সেই সত্যের উপর কেমনভাবে আপনি এই পার্থিব মায়াজালের যে জঞ্জালগুলো আছে, সেগুলো দিয়ে আপনি আপনাকে ঢেকে ফেলেছেন। সেখান থেকে নিজেকে একটু বার করেন। প্রতিটি জায়গায়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, এমন কোন জায়গা নাই যে, যেখানে গিয়ে আপনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না। কিন্তু আমরা পারিনা আমাদের এই মোহাচ্ছতার কারণে।

নিজেকে নিয়ে কিছুটা হলেও উপলব্ধির মধ্যে আনতে হবে।

চেতনার পরিক্রমায় সচেতন না হলে, যা কাজ করবেন বেকার হবে। সেটা সচেতন ভাবে করবেন, সচেতন ভাবে করতে হলে নিষ্ঠা থাকতে হবে। একাগ্রতা থাকতে হবে। সেখানে অর্থাৎ আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এটা হবেই হবে। যেমন ভাবে এখানে বাণীতে বলা হয়েছে যে ‘সত্যমানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’। অর্থাৎ হবেই হবে। ‘কুন ফা ইয়াকুন’ এর কথা বলেছেন অর্থাৎ হও বললে হয়ে যায়। কার হবে? যে সচেতন ভাবে তাঁকে নিয়ে যেতে পারবে। (চলবে…)

নিজের কথা – ১৭

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ ‘মানুষ যদি হতে চাও মনুষ্যত্বকে জাগ্রত কর।’ বাণীটি সুফী সাধক হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীন এঁর। সাধকের মতে মনুষ্যত্বের জাগরণ ব্যতিত কেহ বাস্তবে মানুষ হতে পারেনা। কি এই মনুষ্যত্ব আর কে এই মনুষ্যত্বের অধিকারী মানুষ?

মানবদেহ পরিচালনাকারী শক্তিকে বলা হয় আত্মা। সত্যনিষ্ঠচিন্তনপীঠে আত্মাকে বলা হয় চৈতন্যশীল দেহ। মানুষের বাহ্যিক স্থূল আবরণটা হল মানবদেহ। আর আভ্যন্তরীন সূক্ষ্ম অস্তিত্বটি হল মানব আত্মা। বাহ্যিক দেহ স্থূল ও পার্থিব উপাদানে গঠিত। তাই এর প্রয়োজন মেটাতে পার্থিব উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়। যা প্রকৃতি, শিল্প কারখানা, ক্ষেত-খামারে উৎপাদন ও হাট-বাজার হতে সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু আত্মার প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রকৃতি, শিল্প-কারখানা, ক্ষেত- খামারে উৎপাদন করা কিংবা হাট-বাজারে কেনা-বেচা হয়না। দেহের খোরাক আগুন, পানি, মাটি, বায়ু এ সকল উপাদান হতে আসে। কিন্ত আত্মার খোরাক এর সাথে এ সব কিছুর কোন সংশ্রবই নেই। হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুখ, লোভ, ক্রোধ, হিংসা, ঘৃণা, অহংকার, ঈর্ষা এ সকল বিষয় এর পাশাপাশি দয়া, ক্ষমা, সম্মান, অপমান, স্নেহ, শ্রদ্ধা, ভাব, ভক্তি, প্রেম, বিশ্বাস এ সকল বিষয় আমরা সকলেই কমবেশী জীবনে ধারন করেই বসবাস করি। এ সকল বিষয়ের সাথে আমরা জীবন চলার পথে হরহামেশাই সংশ্লিষ্ট থাকি। এ সকল বিষয় আগুন, পানি, মাটি, বায়ুর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে। আবার এগুলোকে আমরা হাটে-বাজারে কেনা-বেচা করা কিংবা প্রকৃতির ক্ষেত-খামার কিংবা জলে সহজে উৎপাদন করতে পারিনা। এসকল বিষয় ব্যক্তি পছন্দমত নিজেদের অন্তরেই উৎপাদন করে নিজেরাই ভোগ করে থাকে। এ সকল সুক্ষ্ম বিষয় ব্যক্তির জ্ঞান রুচি ও পছন্দ অনুসারে নিজেদের অন্তরে উৎপাদন ও ভোগ করে নিজেদের আত্মাকে কখনো কলুষিত চৈতন্যহীন করে। আবার কখনো নিষ্কলুষ চৈতন্যশীল করে গড়ে তুলে। যে সকল ব্যক্তির চেতনাজগতের চিন্তনপীঠের আত্মিকশক্তি কলুষিত থাকে এবং চৈতন্যহীন আত্মা গড়ে তুলে তাদের মনুষ্যত্বের জাগরণ হয়না। ফলে তারা অমানুষ পশু কিংবা তদাপেক্ষাও নিম্নমানের জীবনযাপন করে থাকে। আবার যাঁদের চেতনাজগতের আত্মিকশক্তি নিষ্কলুষ হয় এবং চৈতন্যশীল দেহ গড়ে তুলতে সক্ষম হন, তাঁদের মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটে। ফলে তাঁরা মানুষে রূপান্তরিত হন এবং মানবতার জীবনযাপন করে থাকেন। মনুষ্যত্ব-কে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়, মনুষ্য +স্ব+আত্মা। ‘মানুষ’ শব্দটি ‘মান ও হুঁশ’ এর সমন্বিত রূপ ধারন করে। ‘স্ব’ শব্দটি ‘নিজ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। সত্যনিষ্ঠ  চিন্তনীপীঠে আত্মা শব্দটি চৈতন্যশীল দেহকে বুঝায়। চৈতন্যশীল দেহ বলতে নিয়ন্ত্রিত দেহ তথা জ্ঞানময় দেহকে বুঝায়। অর্থাৎ যে দেহ মনুষ্যত্ব তথা কেবলমাত্র মানবিক গুণাবলী ব্যবহার করে জীবনযাপন করতে সক্ষম। সাধারণত মানুষের অন্তরে মানবিক গুণাবলী অর্থাৎ সততা, নিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা, কর্তব্যপরায়নতা, দয়া, ক্ষমা, মান-সম্মান, স্নেহ, নিষ্কাম ভালবাসা অর্থাৎ প্রেম শ্রদ্ধা ভক্তি বিশ্বাস ইত্যাদি যেমন থাকে তেমন থাকে ঈর্ষা হিংসা লোভ ক্রোধ ঘৃণা অহঙ্কার মোহ মাৎসর্য ইত্যাদি অমানবিক তথা পাশবিক গুণাবলী। সাধারণ মানুষ স্বার্থের চরিতার্থে কখনো পাশবিক আবার কখনো মানবিক গুণাবলী ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু প্রকৃত মানুষ চৈতন্যশীল দেহের অধিকারী। তাই তাঁরা সর্বদা জাগ্রত মনুষ্যত্ব তথা জ্ঞনের আলোকে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করে থাকেন। (চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ১৩

 

উপদেশ – ৪৬: যাকে ভালোবাসিস্, তার কথাই বার বার মনে পড়ে। আবার যাকে বেশি চিন্তা করিস্, তার প্রতিই ভালোবাসা বাড়ে। একটি বিষয়ে গাঢ় চিন্তার নামই ধ্যান। যতই দয়ালকে ভাববি, ততই তাঁর প্রতি ভালোবাসা বাড়তে থাকবে। দয়ালকে গাঢ়ভাবে ভাবতে পারলেই ধ্যান হয়।

নীরব জায়গায় স্থিরভাবে বসে ধ্যান করাই ভালো। প্রথম হয়তো প্রেমময়ের চরণ দুখানাই শুধু ভেসে উঠল অথবা মুখখানাই শুধু ভেসে উঠল; ক্রমে তাঁর দয়ায় অভ্যাসে সমস্ত দেহ ভেসে উঠবে।

কোন শুভক্ষণে, জ্যোতি ঘনপূর্ণ দেহ ভেসে উঠবে, – দেখবি তোর দিকে চেয়ে যেন স্বর্গীয় হাসি হাসছে। তারপরই আসে সেই পুণ্য মুহূর্ত, যখন সমস্ত বিশে^র অগোচরে, শুধু তুই আর তোর প্রেমময়। পূর্ণভাবে দেখবি, বলবি, শুনবি। সে মিলন জগতের আর কেউ দেখবে না, জানবে না – শুধু তুই আর তোর প্রেমময়।

তোদের মধ্যে যারা প্রেমময়ের ধ্যান রীতিমতো করছে, তারা যে কিছু অগ্রসর না হয়েছে এমন নয়। ওরে! জীবন পণ করে লেগে যা। প্রেমময়ের ধ্যানে – অনুরাগ, ভক্তি, বিবেক, বৈরাগ্য, জ্ঞান, প্রেম আসবেই আসবে।

দয়াল প্রেমময় তোদের দেখা দেয়ার জন্য পাগল হয়ে আছে’রে! ভালোবাসা দিয়ে, আপন ভোলা ভাবে তাঁর দিকে চেয়ে থাকলে, – শুভলগ্নে তাঁর দেখা পাবিই পাবি।

উপদেশ – ৪৭:   দেখ! খুব রোখ থাকা চাই, না হলে কি কিছু হবে’রে! সাধন-ভজনে নিষ্ঠা না থাকলে অগ্রসর হওয়া যায় না, – নিষ্ঠা প্রথমে চাইই চাই, নতুবা হবে কেন? প্রথম প্রথম সন্ধ্যায় ও খুব ভোরে অন্তত এক ঘন্টা করে প্রেমময়ের নাম বা ধ্যান করা চাই। কোন সাংসারিক কাজই যেন এই নিয়ম ভাঙ্গতে না পারে, এই নিষ্ঠা চাই। পরে যেমন ধ্যান-ধারণায় রস, আনন্দ পাবি তখন আর নিয়ম-টিয়ম ঠিক থাকবে না। তখন নিজের গরজে, প্রাণের টানে ফাঁক পেলেই নাম, ধ্যান করতে ইচ্ছা হবে। প্রথম প্রথম একটু জোর-জবরদস্তি করেই অভ্যাস করে নিতে হয়।

দেখ! যদি কোন প্রকারে নামের-ধ্যানের সংস্কার বেঁধে যায়-আনন্দ পাওয়া যায়, তবে আর কুচ্পরোয়া নেই। যদি কোন কারণে অসৎ সঙ্গেও পড়ে যাস, তবে তাঁর দয়ায় সেই সংস্কারের গুণে একেবারে ধ্বংস করতে পারবে না। নামের ধ্যানের বীজ যদি একবার হৃদয়ে বসে যায়, তবে কোন দুর্বল মুহূর্তে ডুবে গেলেও আবার ভেসে উঠবি। এ অমৃতের বীজ কখনও ধ্বংস হয় না। ওরে! দু’চার দিনেই কি একটা সংস্কার বাঁধে? বেশ কিছুদিন মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করতে হয়, তবেই না আনন্দ পাবি – সংস্কার হবে। দয়ালের দয়ায়ই সবকিছু হয়। সাধন, ভজন, ধ্যান, ধারণা উপলক্ষ্য মাত্র, তবুও এগুলোর দরকার, কারণ এগুলোই দয়ালের দয়া আকর্ষণের হেতু।

উপদেশ – ৪৮: কে বলে তোরা পাপী, দুর্বল, হীন? তোদের ভেতরেই আছে-পূর্ণ শক্তি, পূর্ণ তেজ, পূর্ণ বীর্য। তোদের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছেন দয়াল নিজে সব কিছু নিয়ে।

সাত পরদা কাপড়ের ভেতর মুক্তা ঝলমল করছে’রে। ছিড়ে ফেলে দে পরদা-টরদা সবকিছু, দেখবি হৃদয়ের মাণিক তোর অপেক্ষায়ই দাঁড়িয়ে আছেন।

ওরে, তুই আর তোর দয়ালে কোন প্রভেদ নেই। শুধু মনের ভুলে নিজেকে খন্ড ভেবে, দুর্বল ভেবে, সসীম মনে করে পৃথক হয়ে রয়েছিস। যেদিন ভুল চলে যাবে, দেখবি তুইই পূর্ণ শক্তিমান-পূর্ণানন্দময়। তুই আর তোর দয়াল একজন। খোদই খোদা – খোদাই খোদ।

 দেখ, তুই আর তোর দয়ালের মধ্যে যে পৃথকত্ব, তা তোলবার উপদেশ দিয়ে মহাপুরুষেরা কত কথাই না বলে গেছেন। মনে রাখবি, পূর্ণ আনন্দ সায়রে ডুব দিয়ে, আনন্দময়ই হতে হবে। (চলবে)