ধারাবাহিক

খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি ঃ জীবন ও দর্শন

সূফী সাধক খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি এঁর জন্ম সিস্তানের চিশতি নামক গ্রামে। পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকেই তিনি হযরত আলীর বংশধর। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী এবং সাধক, নাম-গিয়াসুদ্দীন হাসান। তাঁর মায়ের নাম, সাইয়েদা উম্মুল ওয়ারা।

তাঁর আবির্ভাবকালে সমগ্র মুসলিম জগতেই ছিল অরাজকতা ও নৈরাজ্য। বিশেষ করে তাঁর জন্মস্থান সিস্তানে মানব জীবনের কোন নিরাপত্তা ছিল না। মারামারি, কাটাকাটি, লুটতরাজ, রাহাজানী লেগেই থাকতো। তাছাড়াও তাতার জাতির অত্যাচারে অতিষ্ট ছিল সাধারণ মানুষ। এরকম পরিস্থিতিতে তাঁর পিতা গিয়াসুদ্দীন হাসান নিরাপত্তার খোঁজে সিস্তান ছেড়ে রাজধানী নিশাপুরে বসবাস শুরু করেন। নিশাপুর ছিল তৎকালীন সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র। নিশাপুরের নিজামিয়া পাঠাগার ছিল বিশ্বখ্যাত। কিন্তু যে শান্তি ও নিরাপত্তার সন্ধানে পিতা গিয়াসুদ্দিন হাসান সিস্তান ছেড়ে এসেছিলেন তা নিশাপুরেও ছিল না।

খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি শিশুকাল থেকেই তাঁর পিতার তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া শুরু করেন। হিজরী ৫৫১ সালে ১৫ বৎসর বয়সে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি পিতৃহারা হন। মা হারিয়েছিলেন এর আগেই। ফলে লোভ, হিং¯্রতা, হত্যা ও রাহাজানির মধ্যে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে তিনি একবারেই একা হয়ে যান। তরুণ খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি – যৌবনের সমগ্র শক্তি ও সাহস তিনি ব্যয় করেছেন আধ্যাত্মিক সাধনায়। যৌবনে তিনি বিয়ে করেননি। লক্ষ্য অর্জনের পর, মতান্তরে ৫৯০ হিজরিতে তিনি প্রথম বিয়ে করেন। তিনি নিজে তাঁর স্ত্রীকে স্ব-ধর্মে দিক্ষীত করেন এবং স্ত্রীর নাম রাখেন বিবি আমাতুল্লাহ।

৬২০ হিজরীতে অর্থাৎ প্রায় ৯০ বৎসর বয়সে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম বিবি আসমত। বিবি আসমত ছিলেন আজমীরের কমিশনার সৈয়দ ওয়াজিউদ্দিনের কন্যা। সৈয়দ ওয়াজিউদ্দিন তার কন্যার বিয়ের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। কথিত আছে, তিনি একদিন স্বপ্নে রসুল সা. হতে তার মেয়েকে খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি-এঁর নিকট বিয়ে দেবার জন্য নির্দেশিত হন। খাজা ছিলেন আঁতায়ে রসুল অর্থাৎ রসুল সা. এঁর উপহার। তাই তিনি ওয়াজউদ্দিনের প্রস্তাবে সম্মত হলেন।

দুনিয়াদারির হিসেবে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি -এঁর তিন ছেলে এবং এক মেয়ে ছিল। তিন ছেলের নাম – ফখরুদ্দিন, হিসামুদ্দিন, জিয়াদ্দিন। মেয়ের নাম- বিবি হাফিজা জামাল। মতান্তরে জিয়াদ্দিনের মা ছিলেন বিবি আসমত। বড় ছেলে ফখরুদ্দিন আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন এবং দিল্লীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সংস্পর্শে আসেন। ১২৬৫ খৃষ্টাব্দে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজমীর থেকে ৩৭ মাইল দূরে আজমীর কিকরি রোডে তাকে শায়িত করা হয়। দ্বিতীয় ছেলে হিসামুদ্দিনও সাধক ছিলেন। তিনি ১২৫৫ সালে দেহত্যাগ করেন। তৃতীয় সন্তান জিয়াদ্দিন সম্পর্কে এইটুকুই জানা যায় যে, ৫০ বৎসর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজমীরে দরগায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়। দুনিয়াদারির হিসেবে তাঁর একমাত্র মেয়ে, বিবি হাফিজা জামাল ছিলেন বিদূষী মহিলা। তার বিয়ে হয়েছিলো সূফী সাধক হামিদ উদ্দিনের ছেলে রাজিউদ্দিনের সাথে। দরগার দক্ষিণ দিকে বিবি হাফিজা জামাল শায়িত আছেন। খাজার সহধর্মীনীদেরকেও আজমীর দরগায় সমাধিস্থ করা হয়।

হিজরি ৬৩৩ সনে (১২৩৩ খ্রি.) ৬ রজবে ৯৭ বৎসর বয়সে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি দেহত্যাগ করেন। ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং আধ্যাত্মিক আবেগ ও অনুভূতির মহাকর্ষণে প্রতি বছর ৬ রজবে তাঁর উরস বা মহামিলন দিবস উৎযাপন করা হয়।

তাঁর প্রকৃত জীবন হচ্ছে সাধনার জীবন, দর্শন এবং দরশনের জীবন। যতদূর জানা যায়, এ জীবনের শুরু হিজরি ৫৫৬ সনে অর্থাৎ ২০ বৎসর বয়সে, একটি বিশেষ ঘটনার মাধ্যমে। ঘটনাটা হলো- হিজরি ৫৫৬ সনে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি একদিন তাঁর বাগানে পানি দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক মজ্জুব সাধক তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। তিনির মজ্জুব সাধকের হাতে চুমু খেয়ে তাঁকে গাছের ছায়ায় বসতে আকুতি জানালেন। বাগান থেকে কিছু আঙ্গুর নিয়ে এলেন তাঁর জন্য। সাধক, তরুণ খাজা মঈন উদ্দিন- এঁর আদব, বিনয় ও আন্তরিক আতিথেয়তায় বুঝতে পারলেন যে, এ তরুণের মধ্যে সত্যের জন্য প্রবল তৃষ্ণা আছে। এই সাধকের নাম শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি। শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি তাঁর নিজ থলে হতে একটা রুটি বা খৈল বের করলেন। রুটিটি চিবিয়ে তিনি খাঁজা মঈন উদ্দিন-এঁর মুখে দিলেন। খাজা কোন দ্বিধা না করে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলেন এবং অসাধারণ এক আত্মিক অভিজ্ঞতার পথ লাভ করলেন। ভাব জগত-এ যখন তাঁর প্রত্যাবর্তন তখন আর খুঁজে পেলেন না সাধক শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি-কে।

২০ বৎসর বয়সী এক তগবগে যুবক তাঁর সর্বস্ব ত্যাগ করে কপর্দকহীনভাবে একাকী লোকালয় ত্যাগ করে বের হলেন এলমে দ্বীন অর্জনের পথে এবং মানবেতর প্রাণীদের মতো জীবন-যাপন শুরু করলেন। কোন পিছুটান না থাকায় তিনি একনিষ্ঠভাবে সাধনায় নিমগ্ন হলেন। জ্ঞানের প্রবল পিপাসায় সমরকন্দ থেকে বোখারা, বোখারা থেকে খোরাসান ছুটলেন। বোখারায় তিনি কুরআনের তফসীর, হাদিস ও ফেকাহশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তিনি প্রথাগত ইসলামী শিক্ষায় সমরখন্দ ও বোখারার বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্ত ছিলেন। কিন্তু জ্ঞানের তৃষ্ণা যে কেতাবী বিদ্যায় মেটে না। তাই তিনি হাটতে থাকেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আধার অলি-মাশায়েখগণের দরবারে, মাজারে। সত্যের সন্ধানে দরবার থেকে দরবারে ঘুরে তিনি এসে পৌঁছেন ‘হারুন’ নামক গ্রামে। এখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় খাজা ওসমান হারুনী-এঁর সাথে। তিনি খাজা ওসমান হারুনী-কে তাঁর মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং হযরত ওসমান হারুনীও তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন। এরপর থেকে মুর্শিদের আদেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং একনিষ্ঠ সাধনায় নিমগ্ন থাকেন। একটানা ১৫ বছর তিনি তাঁর মুর্শিদের সাথে অবস্থান করেন।

খাজা উসমান হারুনীর বয়স যখন ৭০ বছর অতিক্রান্ত, তখন খেলাফত প্রদান করে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি-কে দ্বীন-এ মোহাম্মদী প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি আধ্যাত্মিকতায় চিশতিয়া ধারার প্রচার এবং প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু চিশতিয়া ধারাটি শুরু হয়েছিল তাঁর আগে। খাজা উসমান হারুনীর মুর্শিদ ছিলেন খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতি। খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতি থেকে আধ্যাত্মিক সাধনায় চিশতিয়া ধারা শুরু হয়। খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি তাঁর মুর্শিদের মাধ্যমে চিশতিয়া ধারায় দীক্ষিত হন এবং ভারতবর্ষে চিশতিয়া ধারার ব্যাপক প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন।

নিজের ভক্তশ্রেষ্ঠকে ভারতবর্ষে প্রেরণকালে খাজা উসমান হারুনী বলেছিলেন- ‘বাবা মঈন উদ্দিন সৃষ্ট জীবের কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করবে না।’ নিজের মুর্শিদের এই উপদেশকে আদেশ হিসেবে গ্রহণ করে খেরকান, ওস্তারাবাদ, হেরাত, সবজাওর, বলখ, গজনী, লাহোর, দিল্লী পার হয়ে তিনি আজমীরে পৌঁছেন। আজমীরে এসে তিনি যাত্রা বিরতি করার ও আস্তানা স্থাপনের নির্দেশনা লাভ করেন। যতদিন মানুষের মাঝে মানুষকে নিয়ে ছিলেন তিনি তাঁর মুর্শিদের আদেশ- ‘সৃষ্টজীবের কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করবে না’ বিস্মৃত হননি। প্রত্যাশাহীন কর্ম করে গেছেন আজীবন। তাই লোকে তাঁর নাম দিয়েছে গরীবে নওয়াজ। ‘নওয়াজ’ অর্থ প্রতিপালক। তিনি ছিলেন আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার গরীবের প্রতিপালক ও বন্ধু।

গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি আল্লাহর রঙে নিজেকে রঞ্জিত করেন। তাই লোকশ্রুতি আছে- ‘খাজার দরবারে কেউ ফেরে না খালি হাতে। মানুষ সম্পর্কে তাঁর কোন ভেদজ্ঞান ছিল না। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসহায় ও দিশেহারা মানুষ শান্তি লাভের আশায় ভীড় করেছে তাঁর দরবারে। ধর্মীয় অনুশাসন ও আত্মিকভাবে গরীব মানুষ তাঁর কাছে থেকে সমভাবে উপকৃত হয়েছে এবং এখনও তাঁর নির্দেশনা থেকে সঠিক পথের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছে। উল্লেখ্য, কোন মুসলিম শাসকের প্রচেষ্টায় বা শক্তির প্রভাবে ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারিত হয়নি। ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে মূলত খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি এবং তাঁর পরবর্তী হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া, শাহজালাল, শাহপরান, শাহআলী, শাহ সুলতান প্রমুখ সূফী সাধককুলের প্রচেষ্টায়।

সুদীর্ঘ কালের সাধনা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি যে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে জ্ঞানের জ্যোতি ছড়িয়েছে তাঁর কালজয়ী লেখার মাধ্যমে। কাব্যের অনুপম ছন্দে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর অর্জিত তত্ত্ব। তিনি এক চিরঞ্জীব কবি ও সাহিত্যিক, তত্ত্বজ্ঞানী ও দর্শন ভান্ডার। সূফীতত্ত্বকে যে অসাধারণ বাক্যচয়নে তিনি প্রকাশ করেছেন তা সত্যানুসন্ধানী ও জ্ঞান-পিপাসুদের কাছে চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

শুধুমাত্র একটা গজলে সাধক কবি মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি সূফীতত্ত্বের সবটুকু প্রকাশ করেছেন, শব্দের সীমানায় আবদ্ধ করেছেন অসীমকে। তাঁর গজল পাঠে ব্যক্তি মানস হারিয়ে যেতে থাকে অসীম শূণ্যতায়। এমনই একটি গজলে খাজা আল্লাহ্কে উদ্দেশ্য করে বলছেন-

‘আমরা তোমাকে অন্বেষণ করি আর তুমি আমাদের থেকে পালিয়ে বেড়াও, আমরা তোমার দিকে ঝুঁকে থাকি আর তুমি আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো। আমরা তোমার দিকে ঝুঁকে থাকি আর তুমি আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো। আমরা ছয়দিক থেকে বেরিয়ে এসে শতদিকে তোমাকে অন্বেষণ করি। আমাদের দিকে না তাকিয়ে আর কতকাল তুমি সবদিকে নিজেকে ব্যস্ত রাখবে?’ সত্যের অন্বেষণে ব্যাকুল আত্মার এটাই শ্বাশ্বত প্রশ্ন।

এই প্রশ্নের জবাবে কবি আল্লাহ্র জবানীতে গেয়ে উঠেন- ‘হে বেখবর, তুমি যেখানেই থাক না কেন, আমাদের সাথেই আছো আমরা তোমাকে ছাড়া থাকি না, যদি না তুমি থাক আমাদের ছাড়া।

আমরা সমুদ্র, তুমি মেঘমালা, কাজেই বারি বর্ষণের চিন্তা করো না। যদি তুমি অশ্রুজল ফেলো তবে তোমার বাগিচা হবে হাস্যোজ্জ্বল। মারেফাতের নিগূঢ়তত্ত্ব আরো স্পষ্ট করার জন্য তিনি আবার পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘তাকে বললাম, পর্দার অন্তরালে আর কতকাল গোপন থাকতে চাও? সে সময় এসেছে যখন তুমি আমাদের কাছে চেহারা ঢেকে রাখতে পারবে না। আল্লাহ্ উত্তরে বললেন,-‘আমি পর্দাবিহীন, যদি কোন পর্দা দেখ তবে তা- ‘তুমিই’।

তুমি আছো হাজার পর্দায় ঢেকে আমাদের থেকে। তুমিইতো তোমার হকিকত, কতদিন আর এনাম ওনামে চলবে? (আমিত্বের আবরণ) এ এক অনর্থক অস্তিত্ব, তা তুলে নাও আমাদের থেকে।’

খাজার এই গজলে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার সকল প্রশ্নের উত্তর। খাজা কেবল একজন কবিই নন, তিনি একজন জ্ঞানবান প্রবন্ধকার। খাজা যেসব প্রবন্ধ তাঁর ভক্তশ্রেষ্ঠ, প্রধান খলিফা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, তাতে প্রকাশিত হয়েছে ইসলামের দার্শনিক ও সূফীতাত্ত্বিক তাৎপর্য, যা সাধনায় রত প্রত্যেকের জন্য আলোকবর্তিকা।

নিজের মাবুদগুলোকে নাই করতে পারলেই কেবল ‘ইল্লালাহু’ বলার তাৎপর্য আছে, অন্যথায় মুখে এই কালেমা পড়ার কোন তাৎপর্যই নেই। ‘লা ইলাহা’ দ্বারা সাধক প্রথম নিজের আমিত্ব ও প্রবৃত্তির দাসত্বকে অস্বীকার করবে এবং ‘ইল্লালাহু’ দ্বারা আল্লাহ্র আমিত্বের প্রভুত্ব মেনে নেবে। ‘লা ইলাহা’ প্রবৃত্তির দাসত্বের স্তর আর ‘ইল্লালাহু’ আল্লাহর প্রেমের স্তর। ‘ইল্লালাহু’ স্তরে প্রবৃত্তির দাসত্ব থাকতে পারে না। তাই এই স্তরে শুধু ‘ইল্লালাহু’ আছে কিন্তু ‘লা ইলাহা’ বলার কোন অর্থ নেই। এই স্তরে উপনীত হয়েই সাধকগণ শুধু ‘ইল্লালাহু’ জিকির করেন, ‘লা ইলাহা’ বলেন না। মুনসুর হাল্লাজ এই স্তরে উপনীত হয়েই বলেছিলেন – ‘আনাল হক’; বায়েজিদ বলেছিলেন – ‘আমি-ই পবিত্র সত্তা’; ফরিদ বলেছিলেন – ‘আমি-ই সে’। তাই খাজা বলেন -‘মনে রেখো যে পর্যন্ত সালেক তার চিন্তাজগত থেকে গায়রুল্লাহর খেয়াল দূরীভূত করতে না পারবে অর্থাৎ যে পর্যন্ত ‘লা ইলাহা’ না বলতে পারবে সে পর্যন্ত সে মারেফাতের রাস্তায় এক কদমও অগ্রসর হতে পারবে না।

খাজা সালাতকে দুইভাগে বিভক্ত করেন। রুকু, সেজদা, কেয়াম, কেরাত সম্বলিত লোক দেখানো সালাত এবং আম্বিয়া ও আউলিয়াগণের সালাত যা হুজুরি কালব্ সহকারে আদায় করা হয়। কুরআন প্রথমোক্ত সালাতকারীদের জন্য অর্থাৎ লোক দেখানো নামাজীদের জন্য ধ্বংস নেমে আসবে বলে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছে। এ ধরনের লোক দেখানো নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করা যায় না। খাজা বলেন – ‘লোক দেখানো নামাজ একেবারে মূল্যহীন – শারীরিক কসরত মাত্র। সাধকগণ হুজুরি কালব সহকারে হকিকি সালাত করেন এবং তাঁরা সর্বদা নিজেদেরকে গায়রুল্লাহ্র খেয়াল থেকে মুক্ত রাখেন। সালাতের হকিকত হলো আমিত্বের আবরণগুলো উন্মোচন করার প্রচেষ্টা। এই সালাত রুকু, সিজদা ও কেয়ামে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের আল্লাহ্ ব্যতীত চিন্তাজগত থেকে অন্য সকল চিন্তাকে দূরীভূত করা এবং চিন্তায় কেবলমাত্র আল্লাহ্কে প্রতিষ্ঠিত করাই সালাতের তাৎপর্য। এই সালাত সালাতকারীর জন্য মেরাজ অর্থাৎ আল্লাহ্র সাক্ষাৎ। যে সালাতে মেরাজ হয় না তা লোক দেখানো নামাজ হয় কিন্তু কুরআনিক সালাত হয় না।

সিয়ামের তাৎপর্য হচ্ছে – নিজেকে দ্বিন এবং দুনিয়ার আশা-আকাঙ্খা থেকে মুক্ত করা। দ্বিনের আশা-আকাঙ্খা হচ্ছে বেহেশতের আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও হুরের লোভ। এসব লোভ ও আশা-আকাঙ্খা সাধকের জন্য পরিত্যাজ্য। কারণ, এসব আকাঙ্খাও আল্লাহ্ ও বান্দার মাঝে আবরণের সৃষ্টি করে। যতক্ষণ সাধকের মনে বেহেশতের লোভ থাকে ততক্ষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। দুনিয়ার প্রতি লোভ হচ্ছে – অর্থ-বিত্ত, নাম-যশ ও ক্ষমতার লোভ। এসব লোভ শেরেক পর্যায়ভুক্ত। খাজা বলেন – ‘সিয়াম হকিকি তখনই সঠিক হবে যখন মানুষ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য সবকিছু চিন্তাজগত থেকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, যাতে গায়রুল্লাহর ধারণা পর্যন্ত থাকে না এবং সব রকমের আশা ও ভয় থেকে চিত্ত মুক্ত হয়।’ সাধকের সংযম একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তিনি সংযম করেন কিন্তু কখনো তা ভঙ্গ করেন না। সাধকের ইফতার দিদারে এলাহি।

খাজা বলেন – ‘মনে রেখো, যে ব্যক্তির শায়েখ, মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক নেই তার দ্বিন নেই। যার দ্বিন নেই তার মারেফাতে এলাহি নেই। যার মারেফাতে এলাহি নেই সত্যপথের পথিকদের সাথে তার সম্পর্ক নেই। সত্যপথের পথিকদের সাথে যার সম্পর্ক নেই তার কোন শুভাকাঙ্খী নেই। যার শুভাকাঙ্খী নেই তার কোন বন্ধু বা মাওলা নেই।’ যার মাওলা নেই তার সিয়াম থাকবে কি করে?

উদ্বৃত্ত সময় আল্লাহ্র পথে ব্যয় করার নাম যাকাত। একইভাবে, মেধা, বুদ্ধি, শারিরীক ও মানসিক শক্তিরও উদ্বৃত্ত আছে। কার, কোথায়, কতটুকু উদ্বৃত্ত আছে তা তাকেই খুঁজে বের করতে হয় এবং এই উদ্বৃত্তের সমুদয় আল্লাহ্র পথে ব্যয় করার নাম যাকাত। মুক্ত মানুষেরই যাকাত দেবার অধিকার আছে। যে ব্যক্তি মুক্ত নয় তার যাকাত নেই। সুতরাং যাকাত প্রদানের পূর্বশর্ত হচ্ছে – মুক্ত হওয়া। যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির বন্ধনে আবদ্ধ তার প্রথম যাকাত হচ্ছে প্রবৃত্তিকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে আনা। যে ব্যক্তি নফসের দাসত্ব করে সে কোন যাকাত দিতে পারে না।

নাবালকের কোন যাকাত নাই। সাবালকের যাকাত আছে। মানুষের নাবালকত্ব আর সাবালকত্ব বয়সের উপর নির্ভর করে না। নাবালকত্ব হচ্ছে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীলতা। মানুষ আল্লাহ্ ছাড়া যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে নাবালক।  যে ব্যক্তি তার প্রতিটি কর্মের জন্য ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ অর্থাৎ মানুষের গ্রহণশীলতার উপর নির্ভরশীল থাকে সে সাবালক নয়। যে সাবালকই হয়নি তার যাকাতও নেই। সাবালকত্ব হচ্ছে ‘অনেষ্টি টু দ্যা পারপাস, সিনসিয়ারিটি টু দ্যা পারপাস’। সাবালকত্ব হচ্ছে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের যোগ্যতা। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের পরিপূর্র্ণ দায়িত্ব নিজে নিতে না পারে, যতক্ষণ  পর্যন্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তার নিষ্ঠা, সততা ও একাগ্রতা প্রতিষ্ঠিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে সাবালক বলা যায় না।

‘কেউ ফেরে না খালি হাতে খাজা তোমার দরবারে।’ খাজার দরবারে চাইতে জানলে এখনো কেউ খালি হাতে ফেরে না। কিন্তু এসব চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারে খাজা বলেন – যে ব্যক্তি আল্লাহ্কে চিনতে সক্ষম হয়েছে সে কখনো আল্লাহ্র কাছে কিছু চায় না।’ এইসব চাওয়া পাওয়া থেকে যে ব্যক্তি নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছেন তিনিই আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করেন।

খাজা বলেন – ‘নিজের সম্মুখ থেকে চাওয়া-পাওয়ার নেকাব তুলে ফেলো। হৃদয়ের আয়নায় তুমি মাওলার সৌন্দর্য দেখো। সাধুতার কাঁচ দিয়ে আঘাত কর ভৎসনার পাথরে। তাকওয়ার মর্যাদাকে ঢেলে দাও প্রেমালয়ে।’

খাজার এই আহ্বান আঘাত করে অস্তিত্বের অতলান্তে। তাই তাসাউফ ভুবনে খাজা চিরঞ্জীব, অবিস্মরণীয়। সত্যানুসন্ধানীরা তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ দিয়ে আসছেন। পৃথিবীতে মানুষ যতদিন থাকবে ততদিন এ ধারাও থাকবে অব্যাহত।

খাজা বলেন –  ‘প্রেমাস্পদ এমন আগুন জ্বালিয়েছে যা আমার দেহ ও প্রাণ পুড়ে ফেলেছে। ভাবলাম, আহ্ করে চীৎকার দেবো, অমনি আশা ও ভাষা পুড়ে গেছে। বিরহ অনলের তাপ ও জ্বালা দোজখের আগুনেও নেই। হায়! এ আগুন আমার ভেতরটাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। দোজখের আগুন দগ্ধ করে শুধু গুনাহ্গারদের চামড়া তাঁর বিরহের আগুন দগ্ধ করেছে আমার হাড়ের ভেতরের মজ্জা। হৃদয় দোজাহানের নেয়ামত ও তার পরিণাম কামনা করেছে প্রেমাস্পদের আগুন এসে আমার দোজাহানই পুড়ে ছাই করেছে। দুনিয়া ও আখেরাত চলে যাক্, শুধু মাওলার প্রেম থাকাই যথেষ্ট।’

মানবতাই ধর্ম

সংলাপ ॥ স্বার্থের হানাহানিতে মানবজাতি আজ নিজেদের মধ্যে বিভক্তি এনে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বিভক্ত বিশ্বে ক্ষমতাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। ক্ষমতা, ধর্ম, সমাজ, মানবতা ও রাজনীতি যেটাই হোক না কেন সমাগত সত্যকে চাপা দিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে স্বকীয় নীতির প্রবর্তন করে চলেছে।

অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়াস ও বিশ্বায়নের বিশ্বে প্রায় চারশত পঞ্চাশ কোটি মানুষ ধনবান তাই তাদের এই অবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে আধিপত্যবাদের রাস্তা নিতে হয়েছে। অপরদিকে প্রায় তিনশত কোটি মানবেতর জীবনযাপনকারী মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারছে না। তাই অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রয়োজনে প্রকটভাবে উপলব্ধি করছেন ধর্মীয় চিন্তাবিদগণ। আধ্যাত্মিক উন্নতি হলে তবে শান্তির খোঁজ পাওয়া যাবে ও তার স্থায়ীত্ব আনা যাবে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গোষ্ঠী স্বার্থে বারবার পূর্ব-সংস্কারের বশবর্তী করতে চেয়েছে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের – যাতে ধর্ম নিয়ে মতপার্থক্য বিরাজমান থাকে এবং সমাগত সত্য ধারণ- লালন-পালন না করতে পারে।

ধর্মের আদর্শ, নীতি ও মূল্যবোধগুলো বাস্তবায়িত করা হচ্ছে না। ধর্মমতের আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় ব্যাপক সহযোগিতা দিয়ে সৃষ্টি করা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় তাদের মতবাদ সংখ্যালঘু ধর্মান্ধদের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে বারবার সৃষ্টি করছে অবাঞ্ছিত ও অকল্যাণকর কর্মকা-।

মানবধর্মকে উপেক্ষা করার প্রবণতা সত্যকে অস্বীকার করে অশান্তি, উচ্ছৃংখলতা, সন্ত্রাস ও ধ্বংস ডেকে এনে সামাজিক অবক্ষয় বাড়াচ্ছে।

মানবতার নামে সাম্প্রদায়িক আধিপত্য বিস্তার হচ্ছে। সাহায্যের ফাঁদ পেতে উৎপাদনমুখী দরিদ্র মানুষকে পঙ্গু ও ভিক্ষুকে পরিণত করা হচ্ছে।

আমাদের নতুন করে ভেবে দেখতে হবে ধর্ম ও ধর্মচিন্তার স্থিতি ও গতি নিয়ে। পরিবর্তনশীল বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থার গতির ভিতর ধর্মের অবস্থান কোথায় ও কেমন হবে। মানবতার স্বরূপ কেমন হবে। ধর্ম মানবতার জন্য কিনা।

এই আঙ্গিকে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণে গেলে দেখা যায় জীবন, নির্দিষ্ট সময় ও কর্মসমষ্টি নিয়ে মানুষ। সময়ের তালে তালে কর্ম পরিবর্তিত রূপ নিয়ে জীবনের পরিবর্তন আনে এবং মানুষের উন্নতির ক্রমবিকাশ ঘটে। এ ধারা চিরন্তন। বাস্তবে সময় ও জীবন অদৃশ্যমান হলেও কর্মে দৃশ্যমান। আকর্ষণ ও বিকর্ষণ কর্ম-প্রক্রিয়ায় মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে সংঘবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।

কর্ম-প্রক্রিয়ার মধ্যেই স্বভাব, অনুকরণ ও অনুসরণজাত কর্মের উৎপত্তি ও বিকাশ। অনুসরণজাত কর্ম সাধনা স্বভাব ও অনুকরণজাত কর্মের উপর প্রভাব বিস্তার করে নির্দিষ্ট জীবন-লক্ষ্যে ব্যক্তি-মানুষকে নিয়ে যায়। তখন স্বভাব ও অনুকরণজাত কর্ম অনুসরণজাত কর্মকে শক্তিশালী করে। নির্দিষ্ট জীবন-লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে এমন সকল কর্মই একরৈখিক কর্মে রূপান্তরিত হয়।

জীবন এক, নির্দিষ্ট সময় এক, কর্মসমষ্টির লক্ষ্য এক দিকে ধাবিত হলে – কর্মপ্রক্রিয়ার অব্যাহত সাধনায় জীবন-লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হয়, ব্যক্তির সত্য উদ্ভাসিত হয়ে পরমসত্যের দিকে আকর্ষণে অনাবিল শান্তি অর্জিত হয়। স্বভাব, অনুকরণ ও অনুসরণজাত কর্মগুলোকে ধারণ-লালন-পালনের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি কর্ম সংস্কারের মাধ্যমে একরৈখিক করে তোলে জীবন-লক্ষ্যও অর্জিত হয়। লক্ষ্য-কর্ম ব্যক্তির ধর্ম এবং ব্যক্তির একরৈখিক সমগ্র কার্যক্রম ধর্মের আচরণবিধি রূপে বিন্যাসিত হয়। এই ধারায় কর্মকা- পরিচালনার মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়, জীবন সমৃদ্ধশালী হয় এবং ব্যক্তি-মানুষ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে অর্জন করে শান্তি। কর্মস্রোতের মাঝে শান্তির নুড়ি কুড়াতে কুড়াতে সত্য ও শান্তির আধার মানুষ মহাপুরুষ রূপে সমাজে আবির্ভূত হয়ে বাস্তবতার নিরিখে সত্য ও শান্তির ধর্ম প্রচার করে। তাঁর ছত্রছায়ায় এসে তাঁকে অনুসরণ করে ধর্মকে নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে তাঁরই অনুসারীগণ। এভাবেই ব্যক্তি থেকে সমাজ; সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় তথা বিশ্ব-সমাজে জীবন-লক্ষ্য কর্ম-ধর্ম প্রসার লাভ করছে।

অপরদিকে ব্যক্তি যখন সমগ্র কর্মকান্ডে স্বভাব বা অনুকরণজাত কর্মকে প্রাধান্য দিচ্ছে তখন জীবন-লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকছে। সত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। শান্তির সন্ধান পাচ্ছে না। আনুষ্ঠানিকতার আবরণে ব্যক্তি-স্বার্থকে আঁকড়ে ধরে অশান্তির জাল বুনে আত্মতৃপ্তির মিথ্যা প্রচেষ্টায় রত থাকছে আমরণ।

খুব সহজভাবে অনুধাবন করলে দেখা যায়, মানুষ যা ধারণ করে তাই ধর্ম। এই ধারণ করার প্রক্রিয়া দু’টি ঃ কর্মে ধারণ এবং চিন্তায় ধারণ। চিন্তা ও কর্মের যোগসূত্র অবিচ্ছেদ্য; তাই চিন্তা ও কর্ম একে অপরের পরিপূরক। চিন্তাকে যারা কল্পনা মনে করেন না তারা সকলেই জানেন এবং মানেন যে চেতনায় রূপান্তরিত প্রতিটি চিন্তা বাস্তবতা থেকে জাত এবং তা থেকে যে কর্মের উৎপত্তি তা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তনের ধারায় কাম্য বাস্তবতা গড়ে তোলে। যেখানে বাস্তবতা বা প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারায় কাঙ্খিত বাস্তবতার কর্মসমূহ তাৎক্ষণিক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে সেখানেই মানুষ নতজানু হয়েছে। মানুষের না পারার সীমা বা ব্যর্থতা থেকেই অন্যের ধারণকৃত ধর্মকে আঁকড়ে ধরে অনুকরণ ও অনুসরণ করার চেষ্টা চালিয়ে একে অন্যের কাছাকাছি হচ্ছে এবং একই ধর্মাবলম্বী হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই ধর্ম অতীত বা ভবিষ্যত নয়, সর্বদাই বর্তমান। যতদিন এই সুন্দর পৃথিবী থাকবে এবং মানুষের কর্মের সীমা থাকবে ততদিন ধর্ম ও ধর্মাবলম্বী হওয়ার তাৎপর্য অব্যাহত থাকবে।

ধর্ম, ধর্ম-চেতনা ও ধর্ম-বিশ্বাস কোন আকস্মিক ব্যাপার নয় বরং আবশ্যিক হিসেবে বিভিন্নরূপে সমাজে বারবার প্রাধান্য পেয়েও কর্ম-প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে যে নৈতিকতা, আচরণবিধি ও মূল্যবোধ, তা থেকেই শুরু মানবতা ও  শিক্ষার, আর শিক্ষা থেকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞান। এভাবেই গতিশীল প্রকৃতিতে অজানাকে জানার এবং অদৃশ্যকে দেখার প্রক্রিয়া রয়েছে প্রবহমান।

মানবতা একটা বোধ (জ্ঞান)। মনুষ্যত্বের উদ্ভব মানুষ থেকেই। মনুষ্যত্ব প্রকাশ ও বিকাশের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের অস্তিত্বের সাথে অন্যের অস্তিত্বের সংযোগ সাধন করে। পরিবর্তনের ধারায় সংস্কারের মধ্য দিয়েই সময়ের চাহিদা মোতাবেক মানুষের নীতিবোধ জাগরিত হয়ে সৃষ্টি হয় সময়োপযোগী মনুষ্যত্ববোধ তথা মানবতাবোধ। মনুষ্যত্ব প্রকাশ পেলেই আত্মোন্নতি ও মানবতাবোধের সৃষ্টি হয়। কর্মজীবনে ব্যক্তি যখনই গুরুত্ব দিয়েছে সর্বোপরি অনুস্মরণীয় আবেগকে, তখনই জন্ম নিয়েছে শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালবাসা, ভক্তি ও প্রেম একের প্রতি অন্যের। মানুষ হয়েছে কল্যাণকামী।

ধর্মকে যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, ধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা তথা মানব জাতির সার্বিক মুক্তি। তাই ব্যক্তি-মানুষ শিশুকাল থেকেই ধর্ম ও মানবতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়ে। কর্ম-প্রক্রিয়ার মধ্যে ধারণ-লালন-পালনকৃত কর্মই ব্যক্তি মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ জাগায়, ব্যক্তি-মানুষ ব্যক্তি-স্বার্থজাত সংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে সমাজে ধর্মীয় মানবতাবাদী রূপে কল্যাণকামী কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। কালক্রমে সংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ হিসেবে সমগ্র মানব জাতির কল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ ক’রে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে। সংস্কারমুক্ত মানব সত্তার পক্ষেই সম্ভব প্রকৃত মানবতার চর্চা করা। সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত মানুষ চেতনার সুবিচারমূলক সেবা ধারণকৃত কর্মের মধ্যে লালিত বলেই ধর্ম মানবতার জন্য।

আজকের সমাজ ব্যবস্থায় গণজীবনে ধর্মের অবস্থান বিবেচনা করে আমরা ধর্মাবলম্বী মানব জাতিকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত দেখতে পাই ঃ ধর্মভীরু, ধর্মান্ধ ও ধার্মিক।

ধর্মভীরু মানুষ তারাই যারা নিজের ও অন্যের জীবনাচরণ ও ধর্মাচরণের মাঝে কোন যোগসূত্র খুঁজে পায় না অথবা খোঁজে না। তারা ধর্মের দর্শনগত দিক উপেক্ষা ক’রে শুধু আচরণবিধি পালন করে। ধর্মের শিক্ষা ও মূল্যবোধ গ্রহণ করে না। স্থান-কাল ভেদে আচরণবিধি পরিবর্তনের পক্ষেও নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো ধারণ-লালন-পালন করে না। সরল-সাধারণ শ্রেণীর মানুষ ধর্মভীরু বলেই আনুষ্ঠানিকতায় ভরপুর। ভাগ্যে বিশ্বাসী ও ব্যক্তিস্বার্থ কেন্দ্রিক কর্মের মধ্যে সর্বদা নিয়োজিত। এরাই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। ক্ষমতা এই শ্রেণীকে অতি সহজে ব্যবহার করে।

ধর্মান্ধ-শ্রেণী সারা পৃথিবীতে ধর্মকে গতির মধ্যে পরিবর্তনের ধারায় বিচার করতে না পারার কারণে সবচেয়ে গোঁড়া হিসেবে বিবেচিত। ধর্মের দার্শনিক দিক স্বীকার করে কিন্তু ধারণ করে না। সমাজ পরিবর্তনে ধর্মের যোগসূত্র তৈরি করতে পারে না। সীমাহীন উগ্রতার আনুষ্ঠানিকতায় ভরপুর মনগড়া ধর্মতত্ত্ব তৈরি ক’রে ধর্মভীরু শ্রেণীর উপর তা চাপিয়ে দিতে জবরদস্তির আশ্রয় নেয়। ভাগ্যে বিশ্বাসী, কর্মে নয়। অনুকরণীয় ধর্মশিক্ষায় বাহ্যিক শিক্ষিত কিন্তু জ্ঞানী নয়। তাদের ধর্মান্ধতা যুগোপযোগী জ্ঞান চর্চা ও চর্যার পরিবেশকে গ্রহণ করতে আপত্তি তোলে। ফলে চিন্তায় তারা বন্ধ্যা, গ্রহণশীলতায় তাদের অনীহা বিদ্যমান। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ কেন্দ্রিক কর্মে সর্বদা নিয়োজিত থাকে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পন করে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে সমাজে আধিপত্য বিস্তারের নেশায়। পৃথিবীর সকল ধর্মভিত্তিক অনাসৃষ্টির জন্য এই শ্রেণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও এরা সংখ্যালঘু শ্রেণী কিন্তু ধর্মভীরুদের উপর এদের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি।

ধার্মিক শ্রেণী সৃষ্টি রহস্যের গূঢ়তত্ত্ব ধারণ-লালন-পালন করে, তাই তাঁরা সৃষ্টিশীল। তাঁরা বোঝেন ও বিশ্বাস করেন ধর্ম ও প্রগতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কর্মের প্রকৃতি আর প্রগতি তার গতি। গতির নিরিখে ধর্ম ও সভ্যতার জন্য এই শ্রেণী চিন্তা ও চেতনায় ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে। সংস্কারমুক্ত হওয়ার জন্য নিজের সাথে অবিরত যুদ্ধ করেন। ধার্মিক শ্রেণী ধর্মভীরু ও ধর্মান্ধ শ্রেণীর উপর প্রভাব বিস্তার করতে চান না বরং তাদের পথ দেখাতে চান। ক্ষমতার দিকে এই শ্রেণীর দৃষ্টি নেই। ধর্মভীরু সাধারণ মানুষের কাছে ধার্মিক শ্রেণী শ্রদ্ধেয়। ধর্মান্ধ শ্রেণী ধার্মিক শ্রেণীকে শত্রু মনে করে এবং প্রয়োজনে তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। ধার্মিক শ্রেণী সংখ্যায় খুবই কম। সংস্কারমুক্ত হয়ে তাঁরা প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে ভালবাসেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তথা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত সকল ধর্মের ধার্মিক শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

যেহেতু –

* ধর্মভীরু শ্রেণীকে ধর্মান্ধ শ্রেণীর হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

* সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে।

* সংস্কারমুক্ত ক’রে দেশবাসীকে এক কাতারে আনতে হবে।

* ব্যক্তি-মানুষের মনুষ্যত্ববোধ জাগরিত ক’রে মানবতাকে

   দুস্থ, দুর্বল, অসহায়দের রক্ষাকবচ হিসেবে সমাজে 

   প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

* যুব সমাজকে সত্য, শান্তি ও অহিংসার ধর্মশিক্ষা দিতে 

   হবে।

* ‘ধর্ম মানবতার জন্য, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্য নয়’ 

   – এই বোধ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্ব 

   জীবন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

* ধর্মান্ধ শ্রেণীকে চিহ্নিত ক’রে শুদ্ধিকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে নচেৎ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

দেশের প্রতিটি মসজিদ, গীর্জা, মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার সময় এসেছে যাতে সেখানে মানবিক অনুশীলন হয় এবং মুক্ত চিন্তার মুক্ত-মানুষ গড়ে উঠে। এটাই সময়ের দাবি দেশ ও জাতির কল্যাণে।

দয়ালের উপদেশ – ২২

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ - ৭৩ ॥ কর্মফল সবাইকে ভোগ করতেই হয়, তবে নতুন কর্ম দ্বারা পূর্ব কর্মফল কমানো বা বাড়ানো যায়। পা কেটে গেল, শুকাতে হয়তো দশদিন লাগবে, কিন্তু ওষুধ দিলে হয়তো তিন দিনেই সেরে গেল। গলা কাটার জায়গায় পা কাটা।

রাজার ছেলে বনে বসে তপস্যা করছে। এক দিনমজুর তা দেখে সেও রাজপুত্রের কাছেই এক জায়গায় বসে তপস্যা করতে লাগল। কয়দিন পর সরকারিভাবে উভয়ের জন্যই খাবার আসতে লাগল। সোনার থালে, সোনার পেয়ালায় মূল্যবান খাবার রাজপুত্রের জন্য আসতে লাগল্ আর একটি সাধারণ বাসনে, সাধারণ খাদ্য দিনমজুরের জন্য আসল। মজুর দুঃখিত হলো, ‘হায়, দয়াল কি সবাইকে সমান দেখেন না। একভাবেই তপস্যা হলো, তবে খাবারের এমন বিভিন্নতা কেন?’ তখন দৈববাণী হলো, ‘তোর কর্মফলে সাধারণ খাদ্যই ছিল, সমস্ত দিন খেটে যা জোগাড় করতি, আর এখন বসে থেকেও তা পেতেছিস। রাজার ছেলে একটা রাজত্ব ত্যাগ করে আমার জন্য এসেছে। বাড়িতে এমন মূল্যবান খাদ্যই আহার করত, এখনও তার কর্মফল অনুযায়ীই ভোগ্য আসছে।’

উপদেশ - ৭৪ ॥ তোর রোগের কষ্ট দেখে এক একবার মনে করি তা’ সরিয়ে দেই, কিন্তু তা’ করছি না কেন জানিস? এখন ভোগ না করলে, পরে ভোগ করতে হবে। এখন বয়স অল্প, কষ্ট যাই হোক এখন ভোগ করাই ভালো।

ওরে, তোর কর্মফলে যে সব রোগ-ভোগ আছে তা করতেই হবে। তবে মহাশক্তিবান মহাপুরুষরা নিজে ভোগ করে মুক্তি দিতে পারেন। কোন কোন সময় এমন বিচার হয় যে জরিমানা অথবা জেল। সে অবস্থায় টাকা দিলে জেল খাটতে হয় না। তেমনি কোন কোন রোগে ওষুধ কিনে বা যে কোন সৎ কাজে অর্থ খরচ করলে রোগ সেরে যায়। আবার এমনও আছে, জরিমানা হয় না, জেল খাটতেই হবে, সে অবস্থায় শত শত টাকা খরচ করলেও রোগ সারবে না, ভোগ হয়ে তবে সারবে।

কর্ম দ্বারা পূর্ব কর্মফল অনেকটা খন্ডন হয়। দয়ালের নাম করলে, তাঁর চিন্তা করলে অনেকটা পূর্ব কর্মফল হতে রক্ষা পাওয়া যায়। আগুন যেমন সমস্ত পুড়িয়ে ফেলে, তেমনই দয়ালের প্রেম সমস্ত পূর্ব কর্মফল পুড়িয়ে দেয়, তাই দয়াল প্রেমিক মুক্ত হয়।

দেখ, প্রকৃত মহাপুরুষ, যারা দয়ারের প্রেমে মশগুল হয়ে থাকেন, তারা কখনও দয়ালের আইনের বাইরে যেতে চান না। ভক্তের জন্য অনেক সময় নিজে ভোগ করেন, তবুও জোর করে, নিজের উপর কর্তৃত্ব এনে কিছু করতে ইচ্ছা করেন না।

দয়ালের প্রেমিক যা’ চায় তাই পায় বটে, তবুও তাঁরা দয়ালের আইনের বাইরে কিছু করতে চান না।

উপদেশ - ৭৫ ॥ দেখ, প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ কাজ করে। দুঃখে, কষ্টে যখন মানুষ ভেঙ্গে পড়বার উপক্রম হয়, তখনই শান্তির তালাস করে, তখনই দয়াল গুরুর চরণে আশ্রয় নেয়। যখন দয়ালের উপর ভালোবাসা হয়, প্রাণের টান হয়, তখন এই ভালোবাসার তাগিদেই তাঁর চিন্তা না করে, ধ্যান না করে পারা যায় না।

তিনটি লোক বেড়াতে বেড়াতে সন্ধ্যার সময় এক জায়গায় দিয়ে আশ্রয় নিল। খাবার খুলে দেখে, মাত্র একজনের উপযোগী খাদ্য আছে। তখন তারা পরামর্শ করল, তিনজনেই ঘুমিয়ে পড়বে, যে ভালো স্বপ্ন দেখে সেই খাদ্য খাবে। তিনজনেই শুইয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে একজন অত্যন্ত পেটুক ছিল। ক্ষুধার তাড়নায় পেটুকের কোন মতেই ঘুম আসছে না। সে চুপি চুপি উঠে খাবারগুলো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে উঠে যে যার স্বপ্ন বলতে লাগল। প্রথম ব্যক্তি বলল, ‘দেখ ভাই, স্বপ্নে আমি মদিনায় হযরতের কাছে চলে গেছি, সেখানে কত আমোদ-আহলাদ করলাম।’ দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, ‘আমি স্বপ্নে খোদার দরবারে গিয়েছিলাম সেখানে যে কত কি দেখেছি তা বলে শেষ করতে পারব না।’ শেষে পেটুক বলল, দেখ আমি শুয়ে আছি, এমন সময় একজন ভীষণ লোক লাঠি হতে এসে বলল, ‘খাবারগুলো এখনই খেয়ে ফেল নতুবা মাথা ফাটিয়ে দেব। আমি ভয়ে সবগুলোই খেয়ে ফেলেছি। তোদের যে ডাকব সে যো নেই। কারণ তোরা তখন একজন মদীনায়, আর একজন খোদার দরবারে।’ পেটুক তার পেটের দায়েই খেতে বাধ্য হয়েছে। সাধন, ভজন, ধ্যান-ধারণা, নাম-জপ প্রথম প্রথম একটু জোর করেই করতে হয়। পরে আর জোর করতে হয় না, নিজের প্রাণের তাগিদেই তখন সে সব হয়ে পড়ে। (চলবে)

বাঙালির বাংলা

বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে – ‘বাঙালির বাংলা’ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে। সেদিন একা বাঙালিই ভারতকে স্বাধীন করতে পারবে। বাঙালির মতো জ্ঞান-শক্তি ও প্রেম-শক্তি (ব্রেন সেন্টার ও হার্ট-সেন্টার) এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীতে কোন জাতির নেই। কিন্তু কর্ম-শক্তি একেবারে নেই বলেই তাদের এই দিব্যশক্তি তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাদের কর্ম-বিমুখতা, জড়ত্ব, মৃত্যুভয়, আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিচ্ছার কারণ। তারা তামসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে চেতনা শক্তিকে হারিয়ে ফেলেছে। এই তম, এই তিমির, এই জড়ত্বই অবিদ্যা। অবিদ্যা কেবল অন্ধকার পথে ভ্রান্তির পথে নিয়ে যায়; দিব্যশক্তিকে নিস্তেজ, মৃতপ্রায় করে রাখে। যারা যত সাত্বিক ভাবাপন্ন, এই অবিদ্যা তাদেরই তত বাধা দেয় বিঘ্ন আনে। এই জড়তা মানবকে মৃত্যুর পথে নিয়ে যায়। কিছুতেই অমৃতের পানে আনন্দের পথে যেতে দেয় না। এই তমকে শাসন করতে পারে একমাত্র রজগুণ, অর্থাৎ ক্ষাত্র-শক্তি। এই ক্ষাত্রশক্তিকে না জাগালে মানুষের মাঝে যে বিশ্ব-বিজয়ী ব্রহ্মশক্তি আছে তা তাকে তমগুণের নরকে টেনে এনে প্রায় সংহার করে ফেলে। বাঙালি আজন্ম দিব্যশক্তিসম্পন্ন। তাদের ক্ষাত্রশক্তি জাগলো না বলে দিব্যশক্তি কোনো কাজে লাগলো না – বাঙালির চন্দ্রণাথের আগ্নেয়গিরি অগ্নি উদ্গিরণ করলো না। এই ক্ষাত্রশক্তিই দিব্য তেজ। প্রত্যেক মানুষেই ত্রিগুণান্বিত। সত্ব, রজ ও তম এই তিন গুণ। সত্বগুণ, ঐশীশক্তি অর্থাৎ সৎশক্তি সর্ব অসৎ শক্তিকে পরাজিত করে পূর্ণতার পথে নিয়ে যায়। এই সত্ব গুণের প্রধান শত্রু তম গুণকে প্রবল ক্ষাত্র শক্তি দমন করে। অর্থাৎ, আলস্য, কর্ম-বিমুখতা, পঙ্গুত্ব আসতে দেয় না। দেহ ও মনকে কর্মসুন্দর করে। জীবনশক্তিকে চির-জাগ্রত রাখে, যৌবনকে নিত্য তেজ-প্রদীপ্ত করে রাখে।  নৈরাশ্য, অবিশ্বাস, জরা ও ক্লৈব্যকে আসতে দেয় না। বাঙালির মস্তিষ্ক ও হৃদয় ব্রহ্মময় কিন্তু দেহ ও মন পাষাণময়। কাজেই এই বাংলার অন্তরে-বাহিরে যে ঐশ্বর্য পরম দাতা আমাদের দিয়েছেন, আমরা তাকে অবহেলা করে ঋণে, ব্যাধিতে, অভাবে, দৈন্যে, দুর্দশায় জড়িয়ে পড়েছি। বাংলার শিয়রে প্রহরীর মতো জেগে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গিরি হিমালয়। এই হিমালয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মুনি-ঋষি-যোগীরা সাধনা করছেন। এই হিমালয়কে তাঁরা সর্ব দৈব-শক্তির লীলা নিকেতন বলেছেন। এই হিমালয়ের গভীর হৃদ-গুহার অনন্ত স্নেহধারা বাংলার শত শত নদ-নদী রূপে আমাদের মাঠে-ঘাটে ঝরে পড়েছে। বাংলার সূর্য অতি তীব্র দহনে দাহন করে না। বাংলার চাঁদ নিত্য স্নিগ্ধ।

বাংলার আকাশ নিত্য প্রসন্ন, বাংলার বায়ুতে চিরবসন্ত ও শরতের নিত্য মাধুর্য ও শ্রী। বাংলার জল নিত্য প্রাচুর্যে ও শুদ্ধতায় পূর্ণ। বাংলার মাটি নিত্য-উর্বর। এই মাটিতে নিত্য সোনা ফলে। এত ধান আর কোনো দেশে ফলে না। পাট শুধু একা বাংলার। পৃথিবীর আর কোনো দেশে পাট উৎপন্ন হয় না। এত ফুল, এত পাখি, এত গান, এত সুর, এত কুঞ্জ, এত ছায়া, এত মায়া আর কোথাও নেই। এত আনন্দ, এত হুল্লোড়, আত্মীয়তাবোধ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এত ধর্মবোধ – আল্লাহ্, ভগবানের উপাসনা, উপবাস-উৎসব পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বাংলার কয়লা অপরিমাণ, তা কখনো ফুরাবে না। বাংলার সুবর্ণ-রেখার বালিতে, পানিতে স্বর্ণরেণু। বাংলার অভাব কোথায়? বাংলার মাঠে মাঠে ধেনু, ছাগ, মহিষ। নদীতে ঝিলে বিলে পুকুরে ডোবায় প্রয়োজনের অধিক মাছ। আমাদের মাতৃ-ভূমি পৃথিবীর স্বর্গ, নিত্য সর্বৈশ্বর্যময়ী। আমাদের অভাব কোথায়। অতি প্রাচুর্য আমাদের বিলাসী, ভোগী করে শেষে অলস, কর্ম-বিমুখ জাতিতে পরিণত করেছে। আমাদের মাছ, ধান, পাট, আমাদের ঐশ্বর্য শত বিদেশী লুটে নিয়ে যায়, আমরা তার প্রতিবাদ তো করি না, উল্টো তাদের দাসত্ব করি; এ লুন্ঠনে তাদের সাহায্য করি।

বাঙালি শুধু লাঠি দিয়েই দেড়শত বছর আগেও তার স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রাখতে চেষ্টা করেছে। আজো বাংলার ছেলেরা স্বাধীনতার জন্য যে আত্মদান করেছে, যে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, ইতিহাসে তা থাকবে স্বর্ণ-লিখায় লিখিত। বাংলা সর্ব ঐশীশক্তির পীঠস্থান। হেথায় লক্ষ লক্ষ যোগী-মুনি-ঋষি-তপস্বীর পীঠস্থান, সমাধি; সহস্র সহস্র ফকির-দরবেশ-ওলী-গাজীর দর্গা পরম পবিত্র। হেথায় গ্রামে হয় আজানের সাথে শঙ্খ ঘন্টার ধ্বনি। এখানে যে শাসনকর্তা হয়ে এসেছে সেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। বাংলার আবহাওয়ায় আছে স্বাধীনতা-মন্ত্রের সঞ্জীবনী শক্তি। আমাদের বাংলা নিত্য মহিমাময়ী, নিত্য সুন্দর, নিত্য পবিত্র।

আজ আমাদের আলস্যের, কর্ম-বিমুখতার, পৌরুষের অভাবেই আমরা হয়ে আছি সকলের চেয়ে দীন। যে বাঙালি সারা পৃথিবীর লোককে দিনের পর দিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে পারে তারাই আজ হচ্ছে সকলের দ্বারে ভিখারি। যারা ঘরের পাশে পাহাড়ের অজগর, বনের বাঘ নিয়ে বাস করে, তারা আজ নিরক্ষর বিদেশীর দাসত্ব করে। শুনে ভীষণ ক্রোধে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠে, সারা দেহমনে আসে প্রলয়ের কম্পন, সারা বক্ষ মন্থন করে আসে অশ্রুজল।

যাদের মাথায় নিত্য স্নিগ্ধ মেঘ ছায়া হয়ে সঞ্চারণ করে ফিরে, ঐশী আশীর্বাদ অজস্র বৃষ্টিধারায় ঝরে পড়ে, শ্যামায়মান অরণ্য যাকে দেয় স্নিগ্ধ -শান্তশ্রী, বজ্রের বিদ্যুৎ দেখে যারা নেচে উঠে, …হায় তারা এই অপমান এই দাসত্ব বিদেশী দস্যুদের এই উপদ্রব নির্যাতনকে কি করে সহ্য করে? ঐশী ঐশ্বর্য – যা আমাদের পথে ঘাটে মাঠে ছড়িয়ে পড়ে আছে তাকে বিসর্জন করে অর্জন করেছি এই দৈন্য, দারিদ্র্য, অভাব লাঞ্ছনা। বাঙালি সৈনিক হতে পারলো না। ক্ষাত্র শক্তিকে অবহেলা করলো বলে তার এই দুর্গতি তার অভিশপ্তের জীবন।

তার মাঠের ধান, পাট, রবি ফসল, তার সোনা তামা লোহা কয়লা – তার সর্ব ঐশ্বর্য বিদেশী দস্যু বাটপাড়ি করে ডাকাতি করে নিয়ে যায়, সে বসে বসে দেখে। বলতে পারে না ‘এ আমাদের ভগবানের দান, এ আমাদের মাতৃ-ঐশ্বর্য! খবরদার, যে রাক্ষস একে গ্রাস করতে আসবে, যে দস্যু এ ঐশ্বর্য স্পর্শ করবে – তাকে ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’ দিয়ে বিনাশ করবো, সংহার করবো।’

বাঙালিকে, বাঙালির ছেলে-মেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও ঃ

‘এই পবিত্র বাংলাদেশ

বাঙালির – আমাদের।

দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’

তাড়াব আমরা, করি না ভয়

যত পরদেশী দস্যু ডাকাত

‘রামা’দের ‘গামা’দের।’

বাঙলা বাঙালির হোক! বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক।

দয়ালের উপদেশ – ২১

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৭০: মূল জিনিস হলো প্রেমময়ের প্রতি – দয়ালের প্রতি প্রাণের টান। প্রাণের টান হলে আর কি? অমুকে বিশ বছর ব্রহ্মচর্য পালন করে, সেদিন বিয়ে করেছে। সংসারী হয়েছে, তোরা খুব হৈ চৈ আরম্ভ করেছিস। আমি বলি, যদি দয়ালের প্রতি তার প্রাণের টান থাকে, তবে একটা কেন,বিশটা বিয়ে করলেই তাঁর কি ক্ষতি হবে? আর যদি দয়ালের প্রতি প্রাণের টান না থাকে, তবে বিয়ে না করে,সংসারী না হলেই লাভ কি? বরং ভীষণ ক্ষতি। খোজারাও তো বিয়ে করে না, স্ত্রী-সঙ্গ করে না। দামড়া গরু, খাসি প্রভৃতিও তো কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে পারে না, -সংসারী হয় না, তা বলে কি ওগুলো মুক্ত হয়ে গেল,-মহাপুরুষ হয়ে গেল?

তবে একটা কথা হয়েছে কি জানিস? সাধকদের প্রথম অবস্থা হতেই মনের কু-প্রবৃত্তিগুলোর সাথে যুদ্ধ করতে হয়, জয়ী হলেই সে মুক্ত। কু-প্রবৃত্তিগুলোকে প্রশ্রয় দিলেই বিপদ, একেবারে ধ্বংস করে দেবে। দয়ালের প্রতি যদি প্রাণের টান হয়, ভালোবাসা হয়, তবে কু-প্রবৃত্তিগুলো দমন করা সহজ হয়।

দয়ালের প্রতি যতই প্রাণের টান ও ভালোবাসা গভীর হতে থাকে, ততই মন খালি দয়ালের চিন্তায় রত থাকতে চায়, -দূরে যেতে চায় না। তখন সংসার-ফংসার, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের কথা মনেও হতে চায় না, বরং ঐগুলো বিরক্তিকর মনে হয়।

মুখে মুখে শুধু ‘দয়ালের প্রতি প্রাণের টান আছে, ভালোবাসা আছে’ বললেই চলবে না। কাজের দ্বারাই বুঝা যায়, দয়ালের প্রতি কার কতটুকু প্রাণের টান আছে।

দয়ালের প্রতি গভীর প্রাণের টানে যে অবস্থায় লোকে অন্য সবকিছু হতে আস্তে আস্তে দূরে সরে দাঁড়ায়, সেই অবস্থায়, তুই যদি দূরে সরে দাঁড়ানো দূরে থাক, বাজে জিনিসে আগ্রহ করিস, তবে কি তোর প্রাণের টান দয়ালের প্রতি গভীর বলতে হবে?

উপদেশ-৭১: সাধু বা ফকির নামধারী লোক শ’হিসাবে পাবি। অনেকে লোকের রোগ ভালো করে, মামলা জিতিয়ে টাকা আদায়ের ফিকিরে আছে। কয়েকজন বাস্তবিকই দয়ালের ভাবে আছে, তাঁকে অনুভব করবার, প্রত্যক্ষ করবার চেষ্টা করছে। এমন হাজার চেষ্টা করা লোকের মধ্যে একজনেরও দয়ালের ভাবে সমাধি হয় কিনা সন্দেহ। নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে দয়ালের সাথে ভাবে মিশে থাকাই সমাধি। সমাধিতে পাঁচ, সাত, দশ ঘন্টাও থাকে। সমাধি হতে নেমে আসলেও সর্বদা স্মরণ মনন করে। তাদের সংসারের সব কিছুতেই কেমন একটা উদাসীনতা। দয়ালের প্রেমিক ফুলের আঘাতে ব্যথা পায়, আবার বজ্রের আঘাতে ভ্রুক্ষেপ নেই।

প্রকৃত দয়াল প্রেমিকের অভাব বলে কোন কথাই নেই। রাজার চাকরি যে করে, দেশে শত অভাব পড়লেও তার কোন চিন্তা নেই। দয়াল পূর্ণ, তাঁর চিন্তা করে, তাঁর সেবা করে, কেউ অভাবে পড়তে পারে না। অন্তর দিয়ে প্রাণ ঢেলে দয়ালের সেবা করতে হয়, তাঁর ভাবে মশগুল হয়ে থাকতে হয়, নতুবা লোক দেখানো কাজে ফল ধরে না।

উপদেশ-৭২: একজন বড়লোকের সাথে যদি আত্মীয়তা করতে পারিস, দেখবি অনেক বড়লোকই তোর আত্মীয় হয়ে গেছে। কোন একজন জীবন্মুক্ত মহাপুরুষের চরণে যদি আশ্রয় নিতে পারিস, তবে বহু মহাপুরুষেরই আশীর্বাদ পাবি, স্নেহ-আদর পাবি।

ওরে, জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ যথায় তথায় মিলে না। একটা দেশে একটা রাজাই থাকে, অনেক রাজা থাকে না। আচার-ব্যবহারে, ভাবে মহাপুরুষ চেনা যায়। দেখ, দয়ালের ভাবে যিনি সমাধিস্থ হন, তিনি প্রকৃত মহাপুরুষ বলে জানবি।

অনেক সাধন-ভজন না করলে, দয়ালের প্রতি গভীর ভালোবাসা না হলে, দৃঢ় অভ্যাস না হলে সমাধি হতে পারে না।

অনেক লোকের নানা রকম অলৌকিক শক্তি থাকতে পারে, রোগ ভালো করতে পারে, মামলা জিতাতে পারে, এমন কি মরা জীবিত করতে পারে, তা হলেও এসব লোক জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ নাও হতে পারে। অনেক লোক তান্ত্রিক মতে নানা রকম কাজ করে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন হয়।

দেখ, প্রকৃত দয়ালভক্ত মহাপুরুষেরা অলৌকিক শক্তি দেখাতে চান না। দু’একটা কোন কারণে প্রকাশ হলে বিব্রত হয়ে পড়েন। এগুলোকে তারা বিষ্ঠার মতো মনে করেন। বিষ্ঠা নিয়ে নাড়াচাড়া করা পছন্দ করেন না, দয়ালের ভাবে মশগুল হয়ে থাকতে চান। দয়ালের ভাবে মশগুল যে হতে পারে তার জীবনই সার্থক। দয়ারের ভাবে সমাধিযুক্ত লোককে প্রকৃত মহাপুরুষ বলে জানবি, এতে কোন ফাঁকি থাকতে পারে না।  গরিব লোকে যদি দু’শ টাকা পায়, তবে মাথা গরম হবার যো হয়। অহংকারে পা কোথায় ফেলবে ঠিক পায় না। আর রাজার বেটা যদি দু’চার কোটি টাকা পায় তবুও ‘হলুম কী’ মনে করে না। ছোট আধারগুলোই একট সাধন-ভজন করে যদি একটু শক্তি পায়, তবেই লাফালাফি আরম্ভ করে। (চলবে)

ধর্মের নামে…. – ১৯

সংলাপ ॥ রাজা বললেন দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। চারিদিকে নানা সমস্যা। মন্ত্রীবর্গ, আপনারা আমার হাতকে শক্তিশালী করুন। যেই বলা সেই কাজ। মিটিং বসল। ভুড়ি ভোজন চললো। সিদ্ধান্ত আসে সিদ্ধান্ত যায়। কাজে লাগে না কোনোটাই। নিজেরাই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না – রাজাকে বলবে কী? এক মন্ত্রী বললেন, যেহেতু রাজার হাতকে শক্তিশালী করতে বলেছেন সেহেতু আমার দৃঢ় বিশ্বাস তার হাত দুর্বল হয়ে গেছে। অন্যজন বললেন, পচনও তো ধরতে পারে। আমরাতো আর কাছে যেতে পারি না। আলোচনা পর্যালোচনার শেষ পর্যায়ে ঘর্মাক্ত মন্ত্রী পরিষদ এ সিদ্ধান্তে আসল, যে করেই হোক রাজার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। এক মন্ত্রী বললেন, রাজার হাত লোহা দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হোক। অন্যজন বললেন, অসম্ভব, লোহার মতো কম দামী জিনিস দিয়ে রাজার হাত মুড়িয়ে শক্তিশালী করতে গেলে তাঁকে অপমান করা হবে, বরং সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হোক। অন্যজন বললেন, সোনা মূল্যবান মানি। কিন্তু স্বর্ণ তো নরম লোহার মতো শক্ত নয়। শেষ পর্যন্ত লোহারই প্রয়োগ হল। ছলে-বলে-কৌশলে অনেক সময় নিয়ে সকল মন্ত্রীবর্গ রাজার হাতের মাপ সংগ্রহ করে কামার দিয়ে দুটো হাতের দুটো ফ্রেম বানালেন। মন্ত্রী পরিষদ দারুণ খুশী। রাজদরবারে সদর্পে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন আমরা রাজার হাতকে শক্তিশালী করবো। রাজও খুশী কিন্তু কিভাবে কাজটা হবে তা বুঝে ওঠার আগেই দুই মন্ত্রী লোহার বানানো দুটো হাতের ফ্রেম রাজার হাতে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, ‘রাজা মহাশয়, চিরকালের জন্য আপনার হাত মজবুত করে দেয়া হলো। আপনার হাত আর দুর্বল হবে না।’ বুদ্ধিমান রাজা সবগুলো মন্ত্রীকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কথাগুলো তিনি বাংলায়ই বলেছিলেন। সে কথার অর্থে যে কী অনর্থ হলো তা আর বলতে চাই না। তবে যেটা বলতে চাই সেটা হচ্ছে যে যা-ই বলুক বুঝতে হবে। বিবেক খাটিয়ে চলতে হবে। রুগীর প্রেসক্রিপশান ডাক্তার লিখে দেন। আমরা দোকানে যাই। বিক্রেতা কাগজ দেখে ঔষধ দেন। কাগজ পকেটে-বাক্সে রেখে দেই। ঔষুধ খাই সুস্থ হয়ে যাই। কোরানও তেমনি একটা প্রেসক্রিপশান। এটা পড়লে চলবে না। ঘরে টাঙিয়ে রাখলে হবে না। গলায় তাবিজ করলে পার পাওয়া যাবে না। লিখে ধুয়ে পানি খেলে কোন কাজে আসবে না। যে কথাগুলো বলা হয়েছে সেগুলো বুঝতে হবে। বুঝে সেভাবে জীবন বিধি পরিচালনা করতে হবে। এটাই আদেশ। বারবার জ্ঞান খাটানোর জন্য, অনুধাবন করার জন্য, গবেষণা করার জন্য, চিন্তা করার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়া থাকলেও আমরা সে কথার ধারে কাছেও যাই না। কোরান ছেড়ে হাদিস ধরি, ফেকা ছেড়ে শাস্ত্র ধরি, শাস্ত্র ছেড়ে রূপকথা ধরি। ফলে মূল সত্য থেকে বেরিয়ে এসে আমরা পরিপূর্ণ মিথ্যাকে সত্য জেনে সেই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছি।

চারজন লোককে যদি একটা টেবিলের দৈর্ঘ্য মাপতে বলা হয় তখন তারা তাদের হাত দিয়ে মেপে সঠিক মাপটিই আদেশদাতার নিকট দেবে। চারজনের মাপ চার ধরনের হতে বাধ্য। কারণ, চারজনের কারোরই হাতের দৈর্ঘ্য সমান নয়। ফলে কেউ একটা মাপ বলবে এবং সেটা সে সত্য বলেই জানবে এবং তার উপর সে স্থির থাকবে। অন্যজন আরেকটি দৈর্ঘ্যরে কথা বলবে। সেও সত্যই বলেছে। কারণ সেও তো তার হাত দিয়েই মেপেছে। চারজনের মাপও যেমন ঠিক চারজনের কথাও তেমন ঠিক। কিন্তু টেবিলের সঠিক দৈর্ঘ্য কত তা চারজনের কারো নিকট থেকে পাওয়া যাবে না। একেক জনেরটা একেক রকম হবেই। এ অবস্থায় যদি একটা কাঠি বা স্কেল দিয়ে চারজনকেই টেবিলটাকে মাপতে বলা হয় তখন সবাই টেবিলের দৈর্ঘ্য একটাই বলবে। মতভেদ থাকবে না। এই মতভেদ ঘোচানোর জন্যই যে মাধ্যম সকলকে মেনে নিতে হবে তা হচ্ছে কোরান। কোরান দিয়ে বিচার করলে মতানৈক্য হতে পারে না। যদি হয় তবে কোরানের ভুল নয়-যার যার জ্ঞানের পরিধির ভুল। সুতরাং জীবন-বিধি একটাই আর সেটা মানুষের জন্য বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে কোরানের পাতায় পাতায়। প্রশ্ন উঠছে কোরানের অর্থতো একেকজন একেকভাবে করে চলেছেন। সেখানেও তো মতভেদ। এটা সাময়িক ব্যাপার। ভুলটা অন্যখানে। কোরান বলছে, ‘পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত কোরানের মর্ম বাণী ছোঁয়া যাবে না।’ আমরা সেটার অর্থ করেছি, ‘পবিত্র না হয়ে কোরান স্পর্শ করা নিষেধ।’ চাচার কবর কোথায় আর চাচী কাঁদেন কোথায়? পবিত্র বলতে দৈহিক পবিত্রতাকে ধরে আমরা হাত পা ধুয়ে ওজু করে কোরানের পাতা খুলছি। তারপর পড়ছি। বুঝছি যা তাতো সমাজেই আছে। আসলে পবিত্রতা আনতে হবে আত্মায়। আত্মিকভাবে যিনি পবিত্র নন তিনি কোরানের মর্ম বাণী বুঝতে পারবেন না। এই পবিত্রতা অর্জন করতে হলে আল্লাহর সুন্নত ও দ্বীনকে নিজের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কাজে লাগাতে হবে। সত্তা গুণে বিকশিত হয়ে পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে দমন করতে হবে। যে সকল আদেশ কোরানে করা হয়েছে সেগুলো মেনে চলতে হবে। যেগুলো নিষেধ করা হয়েছে সেগুলোকে বর্জন করতে হবে। এভাবে চললে জীবন আপনা আপনিই পবিত্র হয়ে যাবে। তখন কোরান বোঝার জন্য অন্য কারো কাছে যেতে হবে না। হেদায়েত বা পথ দেখানোর মালিক তখন আল্লাহ। রাসুল (যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) -কে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘সংবাদ পৌঁছে দিন, পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার (আল্লাহর)।’ সুতরাং রাসুল (যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এর জীবনী ও জীবন কথা অবিকৃত। কারণ কোরানও অবিকৃত। রাসুল (যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এর জীবনী জানতে চাইলে একমাত্র এবং একমাত্র কোরানই মাধ্যম। অন্যত্র হাত দিলে বিতর্ক হবেই, মতভেদ আসবেই, দলাদলি হবেই-মারামারি কাটাকাটি পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশে যত না বাংলা ভাষায় কোরান বিক্রি হয় তার চেয়ে লক্ষ গুণ বেশী আরবী কোরান বিক্রি হয়। যেখানেই যখন যে নবী এসেছেন সেখানেই তখন সে নবী সে জাতির মাতৃভাষায় ঐশী বাণী প্রকাশ করেছেন। তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল এগুলোর ভাষা কি আরবী ছিল? মোটেই না। অনেক ভাষায় ঐশী বাণী এসেছে আমরা তার সংখ্যাও জানিনা। আরবী প্রীতি আমাদের মাঝে এত বেশী প্রবল যে আরবীতে লেখা কুকুরের রচনার কাগজ যদি মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি তবে ভিজে কামড় দিয়ে সাথে সাথে তুলে চুমু খেয়ে সম্মানে যথাস্থানে রেখে দেই। আরবীতে মিলাদ পড়ি, নামাজ পড়ি, খুৎবা পড়ি, বিয়ে করি-বিচিটাও বুঝি না। এর জন্য দায়ী করবো কাকে? আমি আমার নিজেকেই প্রথমে দায়ী করলাম। আমি বুঝেছি যে আরবীটাকে বাংলায় পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং মানতে হবে। আজ তাই সবিনয়ে জাতি, ধর্ম, নির্বিশেষে সকল মানুষকে যার যার মাতৃভাষায় ধর্মগ্রন্থ পাঠের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাই। এতেই কল্যাণ। যে ব্যক্তি প্রচার করেছে যে একটা অক্ষর আরবীতে পড়লে দশটা নেকী হয় সে ভুল বলেছে। আরবী ভাষাভাষীর জন্য সেটা দশ কেন কোটি হতে পারে। আমি বলি বার বার মাতৃভাষায় যে পুরা কোরান পড়েছে এবং বুঝেছে তার লক্ষ কোটিবার আরবীতে কোরান পাঠের চাইতে বেশী উপকার হবে। আমরা সব সময় কোরানে বর্ণিত তথ্য বিশ্বাস করবো। কোরানে যে সকল ঘটনার,তথ্যের,বিধানের উল্লেখ আছে, কোন ইতিহাসে বা চরিত পুস্তকে এমনকি হাদিসেও যদি তার বিপরীত কোন কথা বর্ণিত হয়,তবে কোরানের বিপক্ষে অন্য সকল পুস্তকের বা ব্যক্তির বর্ণনা আমরা অগ্রাহ্য ও অবিশ্বাস্য বলে নির্ধারণ করব। হাদীসকে কোন অবস্থাতেই কোরানের ব্যাখ্যারূপে গ্রহণ করব না। কোরান নিঃসন্দেহে পরিপূর্ণ কিতাব। কোরানের ব্যাখ্যা কোরান নিজেই। আরবী বা ফারছী বা অন্য যে কোন ভাষায় লেখা হলেই সেটাকে আমরা মুসলিমদের জন্য পালনীয় ধর্মগ্রন্থ বলে মানবো না। আমরা যা-ই করি, যা-ই বলি তা কোরান দ্বারা প্রত্যায়িত হতে হবে। যা কোরান দ্বারা প্রত্যায়িত নয় তা আমরা আমাদের পুণ্যের খাতিরেই অগ্রাহ্য করবো।(চলবে)

ধর্মের নামে…. – ১৮

সংলাপ ॥ পূর্ব কথিত ভক্তরূপী শত্রুগণের কল্পনার বাহাদূরী এবং তাদের সহজসাধ্য অতিভক্তি শোচনীয়তার ফলে যুগবাণী আজও সত্যের আলোক থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে। এতে জ্ঞান, ধর্ম, জীবনবিধান, কর্ম ও মনুষত্বের যা ক্ষতি হয়েছে তা অবর্ণণীয়। এ প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব ও যীশু খ্রীষ্টের কথা কলা যেতে পারে।

পাক-ভারত ও তৎসংলগ্ন এলাকা অতিশয় প্রাচীন এবংসভ্য দেশ এটা সর্বসম্মত বিষয়। কৃষির প্রচলনও এখানেই। দর্শনে, গণিতে এবং সাহিত্যে, পাক ভারত উপমহাদেশ ইউরোপের সভ্যতা তো সামান্য কথা যীশুখ্রীষ্টের জন্মের বহু শতাব্দী পূর্বেও যে উন্নতি লাভ করেছিল, আজকের এই উন্নত বিশ^ জ্ঞানের হিসেবে তার নিকট মাথা নত করে। কিন্তু সংস্কৃত ভাষা এবং হিন্দুদের প্রাচীন শাস্ত্র সাহিত্য ও পুরাণ ইতিহাস প্রভৃতির সূক্ষ্ম গবেষণার দ্বারা, বহু শতাব্দীর জমিয়ে রাখা রাশিকৃত আবর্জনার মধ্য থেকে কৃষ্ণ চরিত্রের কতকটা অস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু বিধি-বিধানের মতো বিষয়ে মতৈক্য হয় না। বুদ্ধদেবের বিষয়টা আরো শোচনীয়। প্রামাণ্য দলিল না থাকায় ভক্তদের কল্পনা, অজ্ঞতা ও অতিরঞ্জনের ফলে তার মাধ্যমে প্রাপ্ত স্রষ্টার বিধি-বিধান কার্যত দুর্বোধ্য হয়ে পড়েছে। বুদ্ধদেবের পরলোকের সাথে সাথে বৌদ্ধরা তাঁকে হারিয়ে তাঁর স্থলে ‘তথাগত’ ও ত্রিকায়াবিশিষ্ট একজন আদি বুদ্ধকে বসিয়েছেন, যিনি আবার অতিমানব এবং স্বয়ং সাক্ষাৎ শ্রীভগবান। শ্রীকৃষ্ণের বেলায়ও তা-ই ঘটেছে। যীশু সম্বন্ধে সমস্যা, তথ্য আরো প্রকট, জটিল ও অবোধ্য। কারণ, বহু শতাব্দী পর্যন্ত কতগুলো অলৌকিক, অস্বাভাবিক এবং অযৌক্তিক আজগুবী ঘটনার মধ্যে যীশু চরিত্রের মহত্বগুলোকে বাইবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। কিন্তু ইউরোপের নিরপেক্ষ পন্ডিতগণ নানা ধরনের অকাট্য যুক্তি প্রমাণের দ্বারা অখন্ডনীয়রূপে প্রমাণ করেছেন যে, ইতিহাসের হিসেবে এই বাইবেলগুলোর কানাকড়ি মূল্যও নাই। হযরত (সা:) এ জীবনী নিয়ে তো আজ রীতিমতো তুলকালাম কান্ড। তাঁর জীবনী নিয়ে যে সকল বই পুস্তক রচনা হয়েছে তার অধিকাংশই সত্য-মিথ্যা-বিশ্বাস্য ও অবিশ্বাস্য বিবরণে পরিপূর্ণ। অজ্ঞ ও অল্পজ্ঞ লোকদের কথা না হয় বাদই দিলাম, অনেক পন্ডিতের পক্ষেও তার যথার্থতা বের করা দু:সাধ্য। আশার বাণী এই যে, পবিত্র কোরান অবিকৃত থাকাতে পথটি সহজ হয়েছে। তবে মস্তিষ্কের দাসত্ব-শৃংখল যিনি কাটাকে না পারবেন, বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষদের কথা, পীর মুর্শেদগণের প্রতি অতিভক্তি যিনি পরিহার করতে না পারবেন, পূর্বতন পন্ডিতগণের নজির বা দৃষ্টান্ত যিনি এড়াতে না পারবেন, মক্কার মোশরেকগণ তথা পরবর্তীকালের রাজ-রাজাদের চোখ রাঙানীকে যিনি উপেক্ষা করতে না পারবেন তার পক্ষে মূল তত্ত্বে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। তাই ইসলামী জীবন বিধান তথা হযরত (সা:)- এর বক্তব্যের সথ-মিথ্যা কোরান থেকে যাচাই করে নেয়ার যথেষ্ট তথ্য রয়েছে আমরা যে বিষয় নিয়ে মূলত ভাবছি সে বিষয়গুলো হলো জীবন-বিধান তথা ধর্ম, স্রষ্টার দাসত্বের জন্য করণীয় ব্যবস্থা ও পদ্ধতি। এ দুটো বিষয় নিয়ে মূলত সমাজে তুমুল সমালোচনা, হানাহানি, রক্তপাত ও যুদ্ধ হয়েছে। এ দুটো বিষয়ের সঠিক ব্যাখ্যার অভাবে মানুষের মধ্যে বিভক্তি এসেছে, উপধর্মের জাল চারিদিকে ছড়িয়েছে, লোকাচারকে শাস্ত্র বিধি মেনে তার উপর যে যেমনে পেরেছে নিজেকে ধার্মিক ভাবার চেষ্টা করেছে। পূর্বেই দেখেছি যে মানুষ ও জ্বীনকে সৃষ্টি করা হয়েছে স্রষ্টার দাসত্ব করার জন্য। সেই দাসগণেরা কিভাবে দাসত্ব করবে? কেন করবে? করলে তার ফলাফল কী হবে? এসবের বিস্তারিত বিবরণ কোরানেই বিবৃত আছে। কোরান থেকে বের হয়ে যখনই অন্য কোনো তথ্যের কাছে যাবো তখনই দেখবো যে, মূল সত্যের চেয়ে মিথ্যার বাবুগিরি আর ফালাফালি অনেক বেশী।

রাসুল (সা:)-এর প্রতি আল্লাহ যে নির্দেশ জারী করেছেন তা তিনি অবশ্যই পালন করেছেন। তিনি ওহী গোপন করেন নাই। নিজে কোন কথা বানিয়েও বলেন নাই। যেটা জানতেন না সেটা অকপটে স্বীকার করেছেন। তাই দেখা যায় যে, পুরা কোরান জুড়ে রাছুলের যে বিবরণ দেয়া আছে তাতে আমাদের জবিন বিধানে তাঁর উপর বিশ্বাস আনয়ন করার এবং তা মেনে চলার পথে কোন বাঁধা তো নেই-ই বরং কোরান মেনে চললে যেমন নবীকে মানা হয় তেমনি স্রষ্টার দাসত্বও স্বীকার করা খুবই সহজ হয়। আমরা মূল ধর্মগ্রন্থ কোরান থেকে শিক্ষা না নিয়ে কল্পিত-কল্পনায় বিশ্বাস করে জীবন-বিধানে নানা ধরনের পরিবর্তন আনছি। এটার জন্য আমরাই দায়ী। কোরান বুঝে পড়ি না। পড়লেও তা পড়াতেই সীমাবদ্ধ রাখি কাজে লাগাই না। শতকরা ৯৯% লোক কোরান আরবীতে পড়েন অথচ তাদের মাতৃভাষা আরবী নয়। মাতৃভাষা আরবী না হবার কারণে কোরান বোঝে না। ফলে অন্যের নিকট থেকে সত্য-মিথ্যা যা-ই শোনে তা-ই বিশ্বাস করে এবং সেটাই মেনে চলতে চায়। এটা সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা। স্রষ্টা তাকে কী আদেশ দিয়েছেন, কীভাবে জীবন-বিধি চালাতে বলেছেন তিনি তা না জেনে খুশী তেমন চলবেন এটা তো হতে পারে না। অনেকে আরবী ভাষার কোরান দৈনিকই পাঠ করেন এবং মনে মনে ভাবেন যে অনেক পুণ্যের কাজ করলেন। বোকার স্বর্গে আছেন তিনি। দৈনিক কতবার, কতজন যে কোরান পাঠ খতম করছেন তার ইয়ত্তা নেই। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোরান পাঠ করলে কী লাভ হবে যদি তা না বোঝা যায়? আসলে আমরা কী পড়ছি? কেন পড়ছি? পড়লে কী লাভ কী ক্ষতি? এ অংকের হিসাব আগে মেলাতে হবে। একজন পুরুষ বা একজন নারী সারা জীবন আরবী কোরান মুখস্থ করে মুখে মুখে পাঠ করল। জীবন শেষে তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় দু’চারটা বিধানের কথা বলুন তো? তিনি কী করবেন? অপারগ হয়ে মাথা নত করবেন। কোরান নিয়ে এ তামাশা আরবী ভাষাভাষী বাদ দিয়ে সকলের মাঝে ব্যাপকভাবে বহমান। কোরানে হাফেজ সাহেব সবটা কোরান মুখস্থ করেও জীবন বিধির অনেক কিছুই বলতে পারেন না।

একদিনে মাইক দিয়ে পুরা কোরান সবিনা খতমে পাঠ করে যে পূণ্যের আশা করা হয় তা কি পূন্য না কোরানের অপমান? আমি মোটামুটি বিত্তবান। আমার পিতাকে শ্রদ্ধা করি। তার সব কথা মেনে চলি। তিনি চিঠি লিখলেন পত্রবাহকের মাধ্যমে কিছু অর্থ প্রেরণের জন্য। পিতার চিঠি শ্রদ্ধাভরে চুমু খেলাম। অবোধ্য ভাষায় পাঠ করলাম। যত্ন করে বুকে রেখে দিলাম। কাজের কাজ কী হলো? মা অসুস্থ, একগ্লাস পানি চাইলেন। মায়ের ভাষা আমি বুঝি না। পানির জন্য কষ্ট পাচ্ছেন। আমি সামনে দাঁড়িয়ে। মায়ের প্রশংসা ও গুণগান করছি। মা পানি চেয়েই চলছেন অরবীতে। আমিও মুখস্থ কতগুলো আরবী বাক্যে মায়ের প্রশংসা করে চলছি। পাঠক! অবস্থাটা চিন্তা করুন। কী উদ্দেশ্যে কী এলো আর কী কাজ করলাম? যদি বুঝতাম তবে পত্রবাহক মাধ্যমে পিতাকে টাকা দিয়ে দিলেই আদেশ পালন হয়ে যেতো। মাকে একগ্লাস পানি দিলেই আদেশ পালন হয়ে যেতো। আর তো কোন ঝামেলাই থাকতো না। আমরা ঠিক তেমনিই আরবীতে পাঠানো আমাদেরই জন্য জীবন বিধান মুখস্থ করে চলছি, বলছি এবং কাজের বেলায় ভক্তিভার ভন্ডামী করছি। তাও আবার নানা মতে নানা ভাগে ভাগ হয়ে। (চলবে)

বিপদে ধৈর্যশালী হও, অন্যের দোষ ক্ষমা করো তাহলে তুমিও আল্লাহর দরবারে ক্ষমা পাওয়ার প্রার্থী হতে পারবে

ধৈর্য হচ্ছে – প্রফুল্ল চিত্তে সকল দুঃখ ও যন্ত্রণাকে বরণ করে নেয়া, প্রবল দারিদ্র্য আসলেও মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করা, বিপদকে আল্লাহর তরফ থেকে আসা নেয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা, দুনিয়াতে বিপদ বলতে কিছু নেই এ মনোভাব নিয়ে জীবন যাপন করা, কোন বিপদের সম্মুখীন হলে বিহ্বল না হয়ে, আল্লাহর সাথে বাদানুবাদে প্রবৃত্ত না হয়ে, অন্যের সাথে বিপদ সম্পর্কে আলোচনা না করে শান্ত থাকা, বিপদে অধীর না হয়ে এ সম্পর্কে সচেতন থাকা, আল্লাহ্ যে অবস্থায়ই রাখেন না কেন তাতে সন্তুষ্ট থাকা।

দুঃখ যেমন শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক স্তরে হয় তেমনি এ তিনটি স্তরেই ধৈর্য ধরতে হয়। শারীরিক স্তরে ধৈর্য হচ্ছে – শারীরিক দুঃখ-কষ্ট, ক্ষুধা, রাত্রি জাগরণ ইত্যাদি সহ্য করা। মানসিক স্তরে ধৈর্য হচ্ছে – মানসিক দুঃখ কষ্টে বিচলিত না হওয়া, প্রিয়জনের মৃত্যু কিংবা রোগ-ব্যাধিতে ব্যাকুল না হওয়া। আত্মিক স্তরে ধৈর্য হচ্ছে – প্রবৃত্তির তাড়না সংযত রাখা এবং ধনবান হয়েও তা প্রকাশ না করা।

ধৈর্য একটা স্থায়ী গুণ হিসেবে যার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় তিনি কোন অবস্থাতেই উচ্ছ্বসিত বা বিচলিত হয়ে উঠেন না। যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তার সাথেও তিনি সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন যে তাকে বঞ্চিত করে তাকেও তিনি দান করেন;যে তার প্রতি জুলুম করে তার প্রতিও তাঁর প্রেমভাব থাকে।

আমরা স্থুল দৃষ্টিতে যেসব অপ্রীতিকর বিষয়কে বিপদ বলি সেগুলোও আসলে বিপদ নয়। পরোক্ষভাবে এগুলো আল্লাহর তরফ থেকে আসা এক ধরনের নেয়ামত। কেননা, বিপদের মধ্য দিয়েই আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয় তাদের প্রতিই আল্লাহ সন্তুষ্ট হন।

তাই বলা হয় যে কুরআনের দুটি আয়াতের মধ্যেই সূফী সাধনার মূল তত্ত্ব বিশ্লেষিত হয়েছে। ‘তুমি যা চাও তা পেলে আনন্দে আত্মহারা হইও না, আবার তুমি যা চাও না তা পেলে দুঃখে রোদন করো না।’ (৫৭ সুরা হাদিদ : ২৩)। আল্লাহ বলেন আমি ধৈর্যশীলদের সাথে আছি (২ সুরা বাকারা : ২৪৯), আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ কর। ( ১৩ সুরা রাদ : ২২)। এতে বুঝা যায় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ধৈর্য যে শুধু সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, ধৈর্য নিজেই সাধনার একটা পথ। অর্থাৎ অন্য সবকিছু বাদ দিয়েও শুধু ধৈর্য ধরতে পারলেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

ধৈর্য যখন সাধনার স্বতন্ত্র পথ তখন ‘বিপদে ধৈর্যশীল হও’ এ নির্দেশের তাৎপর্য এ নয় যে – বিপদ আসলে তবে ধৈর্যশীল হতে হবে। এ নির্দেশনার তাৎপর্য হচ্ছে -‘প্রথমে বিপদ সৃষ্টি কর, তারপর ধৈর্যশীল হও’। কিভাবে বিপদ সৃষ্টি করা যায়? যেমন, ঘরে যথেষ্ট খাবার থাকা সত্ত্বেও আমরা নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি যে পরিমাণ খাবার আজ রান্না হচ্ছে তা কি প্রয়োজনীয়? স্বাস্থ্যকর? যথেষ্ট উপাদেয় খাবার সামনে থাকা সত্ত্বেও নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি,যে পরিমাণ খাদ্য আমরা গ্রহণ করছি তার কতটুকু দৈহিক প্রয়োজনে আর কতটুকু সাময়িক মজার আকর্ষণে? এসব প্রশ্ন করলে বিপদ সৃষ্টি হবে এবং নিজের সৃষ্ট বিপদে ধৈর্য ধারণ নিজেকে সুস্থতার দিকে নিয়ে যাবে। এভাবে ক্ষুধা-তৃষ্ণায়, কামোত্তেজনায়, ক্রোধে, উস্কানীর মুখে নিজেকে প্রশ্ন বিপদ সৃষ্টি হয় এবং সৃষ্ট বিপদে ধৈর্যশীল হবার প্রচেষ্টা করা যায়। সূফীতত্ত্বে ক্ষুধায় ধৈর্য ধারণের নাম ‘ক্কানাআত’,যৌন উত্তেজনায় ধৈর্য ধারণের নাম ‘সচ্চরিত্রতা’,সংগ্রামে ধৈর্য ধারণের নাম ‘হেলেম’, বিপদে ধৈর্য ধারণের নাম ‘দৃঢ়তা’ এবং উস্কানীর মুখে ধৈর্য ধারণের নাম ‘ক্ষমা’। যার যেখানে ধৈর্য কম তার সেখানে ধৈর্য ধারণ করার চর্চা করতে হয়। চর্চার মধ্যে থাকলে মানুষ ধৈর্যে শীলবান হয়ে উঠে অর্থাৎ ধৈর্য গুণের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

একবার সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর জ্বর হলো। কয়েকজন গিয়ে তাঁর মুর্শিদ হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীনকে তাঁর জ্বরের সংবাদটা দিলেন। শুনে হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীন বললেন, ‘তাকে নদীতে বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখলে-’ তাই হলো, কয়েকজনে ধরাধরি করে সাধক আনোয়ারুল হক-কে নদীতে নামিয়ে দিলেন। তিনদিন তিনরাত তিনি বুক পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর সারা পায়ে মাছ ঠুকরিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে তবু তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি। সত্যদ্রষ্টা সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দীন প্রায়ই বিভিন্নভাবে তার ভাব শিষ্যদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতেন। তাই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক নির্দেশ দিতে পারেন – ‘বিপদে ধৈর্যশীল হও’। ‘ধৈর্যশীল হও’ – অর্থাৎ, তুমি যা চাও তা পেলেও রাজি থাকো আর না পেলেও রাজি থাকো। কারণ কার জন্য কোন্টা পাওয়া ভালো আর কোন্টা না পাওয়া ভালো তা গুরুই ভালো জানেন। গুরুর নৈকট্য প্রত্যাশী ভক্তের দায়িত্ব – ফলাফলের প্রতি নয়, গুরুর নির্দেশে কর্মের প্রতি একনিষ্ঠতা।

বিপদে ধৈর্যশালী হওয়া মানে ধৈর্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। ধৈর্য যখন নিজ অস্তিত্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য একটা চারিত্রিক গুণ হয় তখনই মানুষ ধৈর্যে শীল হয়। বিপদ আসলেও অন্তত তিনটি কারণে গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় – প্রথমত, এ জন্য যে, বিপদ হয়ত এর চেয়ে কঠিন হতে পারত। দ্বিতীয়ত, এ জন্য যে, আল্লাহ তায়ালা বিপদ সহ্য করার মতো ক্ষমতা দিয়েছেন। তৃতীয়ত, এ জন্য যে, বিপদে পড়লে গুরুকে স্মরণ করার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে কতক্ষণ আমরা ধৈর্য ধরবো? সবগুণেরই একটা সীমানা আছে কিন্তু ধৈর্য এমন একটা গুণ যার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। খাবারের কথাটাই ধরা যাক্ না। খাবার না খেয়ে ক্ষুধায় ধৈর্য ধারণ করতে করতে এমন স্তরেও উপনীত হওয়া সম্ভব যে স্তরে প্রায় খাদ্য গ্রহণ না করেও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা যায়। সাধক লোকনাথ ব্রহ্মচারী এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বিপদে অধৈর্য হয়ে কান্নাকাটি করা নারী ও বালক সুলভ চপলতা। হায়-হুতাশ করে নিজের দুর্বলতা অন্যের কাছে প্রকাশ করাও সমীচীন নয়। এভাবে অধৈর্য প্রকাশ করলে চারিত্রিক দুর্বলতাই প্রকাশিত হয়। পুরুষ হতে হলে বিপদে ধৈর্যশীল হতে হয়। পুরুষ অর্থ – বাহ্যিক আকৃতিতে পুরুষ হওয়া নয়। মনস্তাত্বিকভাবে নিজের মধ্যে পৌরষত্ব জাগ্রত করা। বাহ্যিক আকৃতিতে একজন নারীও ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের মধ্যে সেই পৌরষত্বকে জাগিয়ে তোলতে পারেন।

‘জীবন দুঃখময়’ -এ সত্য গ্রহণ করলে বিপদে ধৈর্যধারণ করতে সুবিধা হয়। জীবন কোন ফুলেল শয্যা নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক এবং আর্থিক দুর্যোগের সম্ভাবনা। শান্তিতে থাকতে হলে, সকল বিপদ-আপদকে চরম ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করতে শিখতে হয়। আল্লাহ বলেন -‘বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করবে। এই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ।” (৩১ সুরা লুকমান :১৭)।

বিপদে ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশিত হয়। বিপদ এবং দুঃখকষ্ট যত কঠিনই হোক না কেন, অবশ্যই তার অবসান হবে। এজন্য অস্থির হলে বিপদ কাটে না, বিপদ কাটে মানুষ সুস্থির হলে। বিপদে অস্থিরতা এবং অধৈর্য বিপদ আরো বাড়িয়ে তোলে।

 বিপদে ধৈর্যশীল ব্যক্তিই নিজেকে সমর্পণ করে মুসলিম হতে পারে। একজন প্রকৃত মুসলিম এভাবে জীবন যাপন করে যেন, তার জীবনে সবকিছুই ঘটছে আল্লাহর ইচ্ছায়। সে নিজে কিছুই ঘটাচ্ছে না। আসলে মানুষ কোন কিছুই ঘটায় না, সবকিছুই ঘটে বিধাতার বিধানে। জন্ম, যৌবন, মৃত্যু সবই ঘটনা। মানুষ যৌবনে উত্তীর্ণ হয়, যৌবন ইচ্ছে করে কেউ নিয়ে আসতে পারে না। যৌবন চলেও যায় এভাবেই, কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আমাদের জীবনে সবকিছুই ঘটছে অদৃশ্যের অমোঘ বিধানে। সুতরাং অধৈর্য না হয়ে ধৈর্যশীল হওয়াই উত্তম। জীবনে যা ঘটবার তা ঘটুক। জীবনের ভিতরে ডুব না দিয়ে, একজন দর্শকের ভূমিকা নিয়ে জীবনকে যাপন করাতেই শান্তি।

বিশ্বাসীকে ধৈর্যের মাধ্যমে তার বিশ্বাসের পরীক্ষা দিতে হয়। দেহের সাথে মাথার যেরূপ সম্পর্ক বিশ্বাসের সাথে ধৈর্যের সম্পর্কও তদ্রুপ। তাই কুরআনে অন্তত ১২ টি সূরায় ১৫ বারেরও অধিক স্থানে ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা বারবার ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, আল্ল­াহর সন্তুষ্টি অর্জন করা কোন সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়। আল্ল­াহর সন্তুষ্টি পেতে হলে সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হয়। সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হলে সাধককে সার্বক্ষণিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়। এ যুদ্ধ একদিক থেকে সমাজ ও পরিবেশের সাথে, অন্যদিক থেকে প্রবৃত্তির সাথে। এ দুর্গম পথে তাই ধৈর্য না থাকলে পথহারা হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। তাই আল্লাহ্ তায়ালা সুরা আল-ই-ইমরানের শেষ আয়াতে বলছেন – ‘তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর’।

আল্লাহ তায়ালা শুধু ধৈর্য ধারণের জন্যই আহ্বান জানাননি – ধৈর্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘প্রতিযোগিতা’-র আহ্বান প্রমাণ করে ধৈর্যের কোন সীমানা নাই, কোন মাত্রা নাই। ধৈর্য সীমাহীন একটি চারিত্রিক গুণ।

আল্লাহ বলছেন, ‘সুতরাং তুমি ধৈর্য ধরো, সুন্দর করে ধৈর্য ধরো’। (৭০ সুরা মা’আরিজ : ৫)। যে যত বেশি ধৈর্য ধারণ করতে পারবে সে তত বেশি সফলকাম হতে পারবে। তাই ধৈর্য ধারণের প্রতিযোগিতার সাথে সাথেই থাকছে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ। কারণ, ধৈর্য ব্যতীত কেউ কোন যুদ্ধে জয়ী হতে পারে না। বিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য এই যে, যুদ্ধে সে থাকবে – ‘সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো’ ধৈর্যশীল।

ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে, লোকে মোহাম্মদ (সা.)-কে কখনো পাগল, কখনো কবি বলে উপহাস করেছে,বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করেছে, অনেক রকমের লোভ-লালসা দেখিয়েছে। এ সবকিছুতে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছিলেন বলেই তিনি সক্ষম হয়েছিলেন ইসলামের বিজয় ঝান্ডা উড়াতে। আল্লাহ্ বলেন, ‘হে মোহাম্মদ, ধৈর্যের সাথে কাজ করতে থাকো। তোমাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা আল্লাহ্ তায়ালা দিয়েছেন। ওদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত-চিন্তিত হয়ো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রের জন্য মন ভারাক্রান্ত করো না’। (১৬ সুরা নাহল : ১২৭)। ‘হে মোহাম্মদ, তোমার পূর্বেও অসংখ্য নবী রসুলকে অমান্য করা হয়েছে। কিন্তু এ নির্যাতনের মোকাবেলায় তারা ধৈর্য ধারণ করেছেন।’ (৬ সুরা আনআম  ৩৪)। এর উত্তরে মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘আমি একজন নবীকে দেখেছি, তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে প্রহার ও  রক্তপাত করেছিল। তিনি তাঁর মুখম-ল থেকে রক্তের ধারা মুছে ফেলে বলেছিলেন, ‘হে মাবুদ! আমার কওমকে ক্ষমা কর, কারণ -তারা অন্ধ।’ তাই আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন – ‘তোমরা ধৈর্য ধরো, যেমন ধৈর্য ধরেছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রসুলগণ।’ (৪৬ সুরা আহ্কাফ : ৩৫)।

 ধৈর্যের পরপরই বলা হয়েছে ক্ষমার কথা। ‘অন্যের দোষ ক্ষমা করো তাহলে তুমিও আল্লাহর দরবারে ক্ষমা পাওয়ার প্রার্থী হতে পারবে’। এভাবে বলার কারণ, যে ধৈর্যশীল কেবল সে-ই ক্ষমা করতে পারে। আমরা যা দেই তা-ই পাই। আমরা যে রূপ বিচারে বিচার করি, সেরূপ বিচারে আমরাও বিচারিত হবো, এবং যে পরিমাপকে আমরা পরিমাণ করি, সেই পরিমাপকেই আমাদের পরিমাণ করা হবে। আমি অন্যের দোষ ক্ষমা করলে, আমার দোষও ক্ষমা করা হবে। আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন যে, আমরা যদি লোকের অপরাধ ক্ষমা করি, তবে আমাদের অপরাধও ক্ষমা করা হবে।

তবে মনে রাখতে হবে যে প্রথমত, একজন মানুষ তখনই ক্ষমা করার যোগ্যতা অর্জন করে যখন বিচার করার ক্ষমতা তার থাকে। কেউ আমার সাথে অন্যায় করল কিন্তু তার বিচার করার ক্ষমতা বা সাহস যদি আমার না থাকে তাহলে – ‘তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম’ বলা যায় না। এ ধরনের ক্ষমা করে দেয়া আসলে ক্ষমা নয় – দুর্বলতা। যখন অপরাধীকে শাস্তি দেবার পূর্ণ ক্ষমতা আমার আছে তখনই তাকে ক্ষমা করার অধিকার আমি অর্জন করি। আর তখন ক্ষমাই হচ্ছে অপরাধীর জন্য সর্বাপেক্ষা বড় শাস্তি। দ্বিতীয়ত, অপরাধী যদি না-ই বুঝে যে, সে অপরাধী তবে সে এটাও বুঝবে না যে তাকে ক্ষমা করা হয়েছে। তাই ক্ষমা করার আগে অপরাধীকেও বুঝতে হবে যে, সে অপরাধ করেছে নইলে তাকে ক্ষমা করার প্রশ্ন উঠে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ‘আমার ভ্রাতা আমার নিকটে কত বার অপরাধ করিলে আমি তাহাকে ক্ষমা করিব? কি সাত বার পর্যন্ত? যীশু তাঁহাকে কহিলেন, তোমাকে বলিতেছি না, সাতবার পর্যন্ত, কিন্তু সত্তর গুণ সাতবার পর্যন্ত’। (মথি ১৮ : ২১)। সত্তর গুণ সাতবার পর্যন্ত অন্যের দোষ ক্ষমা কর কিন্তু নিজের দোষকে একবারও ক্ষমা করিও না। – এটাই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক -এঁর শিক্ষা।

বাঙালির আত্মদর্শনে বাংলা ভাষা

ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন ॥ সারা বিশ্ব জুড়ে হাজার হাজার ভাষা রয়েছে। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের এ ভাষার রয়েছে নিজস্ব বিশেষত্ব। প্রতিটি ভাব প্রকাশ বিকাশের ও ভাষা মাধ্যমের রয়েছে ভিন্নতা ও সুক্ষ্মতা। ভিন্নতা ও সুক্ষ্মতার সকল মাত্রাকে ছাড়িয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। বৈচিত্র্যতার বহুবিধ রূপ শুধু নয় মানব অস্তিত্বের এক অন্তরঙ্গ সূত্রের সাথে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে বাংলা ভাষা। বাংলা শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম নয়, এ ভাষা বাঙালির সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিকতার সাথে জড়িত আজন্মকাল থেকে। আত্মদর্শনে এক জীবন্ত রূপ ‘বাংলা’। যদিও বাংলা ভাষার এই বিশেষ রূপটি আজ ক্ষমতালোভী ধর্মীয় রাজনীতির খপ্পরে পড়ে তার আপন ঐশ্বর্য হারিয়ে অনেকটা পঙ্গুভাবে এগিয়ে চলছে।

একটু পেছনে গেলেই আমরা বাংলা ভাষার গৌরবময় আধ্যাত্মিক রূপটা বুঝতে পারবো।

বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্ণ অ। অ হচ্ছে ব্রক্ষবীজ তথা সকল সৃষ্টির আদি বীজবর্ণ বা কারণ। অ থেকেই উদ্ভব হয়েছে অনেক তথা বহুত্বের। মানবদেহের সুক্ষ্ম সুর ও স্বরসহ সমস্ত উচ্চারণের আদি স্বর হচ্ছে অ। অ স্বর হতে অক্ষর। বাংলা ভাষার আদ্যস্বর এবং বাংলা বর্ণমালার আদ্যক্ষর ও তাই অ। পন্ডিত ও বৈয়াকরনবিদগণ দাবি করেছেন আবহমান কাল থেকে বাংলা অ’ কার স্বতন্ত্র অবস্থায় বর্তমান ছিল। কেউ কেউ বলে দেবনগরী অ থেকে বাংলা অ-কারের সৃষ্টি হয়েছে। উৎপত্তি বা বুৎপত্তি নিয়ে যত মতান্তর থাকুক না কেন, পৃথিবীর সকল ভাষায় প্রথম স্বরচিহ্ন রূপে ‘অ’ এর ব্যবহার অতিদৃষ্ট হয়। যেমন আরবী ভাষায় আলিফ, রোমান ভাষায় আলফা, ইংরেজী ভাষায় অ্য ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতাত্ত্বিক পানিনি বলেন, “অকুহ বিসর্জনারা নং কণ্ঠ অর্থাৎ অ-কারের উচ্চারণ স্থান কন্ঠ সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে উচ্চারণ ভেদে অ-কার আঠারো প্রকার। যথা: হ্রস্ব অ, দীর্ঘ অ, পুত অ। এরপর উদাও অ, অনুদাও অ, স্বরিত অ। তারপর পুত উদাও অ, পুত অনুদাও অ ও পুত স্বরিত অ। এ নয় প্রকার উচ্চারণের রয়েছে আনুনাসিক ও অনানুনাসিক উচ্চারণের পার্থক্য যা অষ্টাদশ  স্বরে বা আঠারো পর্দায় বিন্যস্ত। বাংলা অ-কার উচ্চারণের এমন স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য পৃথিবীর অন্য কোন ভাষার আদি অন্তরে নেই। অ-কারের এমন বৈচিত্র্যময় উচ্চারণ আত্মস্থ করার জন্য সম্যক গুরু তথা তত্ত্বজ্ঞানী সূফী সাধকের শরণাপন্ন না হয়ে শিখতে গেলে যথার্থ ‘অ’ আয়ত্ব করা যায় না। তাই বুনিয়াদি ভাষা শিক্ষা প্রাচীন ভারতে এ কারণেই আধ্যাত্মিক শিক্ষার সাথে একত্রে সংযুক্ত বিষয় ছিল। প্রাচীন বাংলা ভাষার ব্যবহার শিক্ষা গুরুমূখী উচ্চাঙ্গ সংগীত সাধনার মতো সমৃদ্ধ ও অত্যন্ত কঠিন বিষয় ছিল। একজন সত্যমানুষ তথা সূফী তথা সম্যক গুরুর কাছে হাতে কলমে বাংলা শিক্ষার জন্য তার আশ্রমে দীর্ঘকাল নানা আসনে ধ্যান ও কণ্ঠসাধনা করতে হতো। কানাই বিনে যেমন গীত নেই আমাদের বাঙালি ঐতিহ্যে তেমনই গুরু তথা আধ্যাত্মিক শিক্ষক ব্যতীত কোন ভাব ও ভাষার অস্তিত্ব মেলে না। প্রাচীন বাংলায় তাই প্রাচীন বঙ্গভাষায় অ এর হ্রস্ব, দীর্ঘ, পুত এ তিন ধরনের উচ্চারণ শুদ্ধভাবে আত্মস্থ করার জন্য তত্ত্বজ্ঞানী গুরুর দ্বারস্থ হতেই হতো। পিতামাতাগণ শৈশবে আপন সন্তানকে তাই গুরুর নিকট হস্তান্তর করতেন বিনীত চিত্তে।

কেন বাংলাভাষা আধ্যাত্মিক গুরুর নিকট শিখতে হয় তা অ কারের উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। অ কার শুরু একটি অক্ষর নয়। এটি একটি অস্তিত্বের নাম যা সকল অস্তিত্বের অস্তিত্ব। অ-কারে আল্লাহ তথা ঈশ্বরত্ব প্রতিপাদিত। অ-কারের মধ্যে ব্রহ্ম, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও শক্তি সকলই বিরাজমান। কোন কোন স্থানে অ কারে ব্রহ্ম তথা আল্লাহর অস্তিত্ব ও বুঝানো হয়েছে। যেমন- ভারতচন্দ্র রায় গুনাকার অন্নদামঙ্গলে বলেছেন- অ কার ব্রহ্ম কেবল একাক্ষর কোষ।

অউম তথা প্রণবনাদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রাচীন সূফীগণ করেছেন। জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি ও তুরীয়Ñ এ চারটি স্তর আত্মচেতনার। ব্রহ্মের চারটি পর্যায় – বিরাট, হিরন্যগর্ভ, ঈশ্বর ও ব্রহ্ম। জগত তথা দেহ চারভাবে বিভক্ত। যথা – স্থুল, সূক্ষ্ম, কারন ও মহাকারন। বোধের চার পর্যায় – বস্তু, ভাব, শক্তি ও চৈতন্য। এ সকল কিছুর বাচক হলো অউম নাদ বিন্দু। সাধারণত যে ‘ওম’ উচ্চারণ করা হয় তা বৈলরী বাক। এর তিনটি স্তর – সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর ও সূক্ষ্মতম এবং বোধের পর্যায় অনুসারে ওর আরও তিনটি গোপন তল আছে। সেগুলোকে বলা যায়- ভাবনা, জ্যোতি ও স্পন্দন। সব মন্ত্রই শেষ পর্যন্ত অউমকারে পর্যবসিত হয়। সেটা শূণ্যচিত্তে বা চিন্তাকাশের গভীরে একটি স্পন্দন মাত্র। স্পন্দন জ্যোতি হয়, জ্যোতি চিন্তা জগতের ভেতর ফুটে উঠে ভাবনার ভেতর দিয়ে, অত:পর বাক বা বাক্য হয়ে বেরিয়ে আসে। যে কোন মন্ত্রের বা গুরুদেবতার বা অবতারের এটাই পরম তাৎপর্য। দেবতা, মন্ত্র, গুরু ও আমি এ চারটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দক্ষিণা মুর্তিই হচ্ছে আত্ম চৈতন্য যা স্ফুরিত হয় ব্রহ্ম চৈতন্যে। আত্মচৈতন্য আর ব্রহ্ম চৈতন্যের মধ্যের মন্ত্রটি ওমকারের স্পন্দন সেতু। আর দক্ষিণা মুর্তি হলো পানিতে একফোটা পানি ফেললে যেমন ছড়িয়ে পড়ে তেমনি তিনি তুরীয়রূপে ছড়িয়ে পড়ছেন। এভাবে তিনি (উম) প্রণবার্থ, মন্ত্রের অর্থ বা প্রতিপাদ্য বা বাচ্য।

অ-উ-ম এ তিন বীজবর্ণের সমবায়ে ওঁ প্রণবের উৎপত্তি। শুদ্ধচিত্ত সাধু যোগীগণ বলেন, চিন্তা একাগ্র করতে হলে প্রথম অবস্থায় ওঁংকার উচ্চারণ করলে চলবে না। তারপূর্বে ওঁকারের আদিস্বর অ- কার এবং অ-উ-ম কার উচ্চারণ করতে হবে। অ হচ্ছে আদি ব্রহ্মনাদ। তাই সকল নামের সমষ্টি ‘অ’।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাংলা ভাষার অ অক্ষর এবং অউম (ওম/ওঁ) এর উচ্চারণের মাহাত্মের সাথে সত্যমানুষ তথা সূফী সাধকগণ জড়িয়ে আছেন অর্থাৎ আত্মদর্শনের জন্য বাংলা ভাষা একটি জীবন্ত মানবভাষা যা অন্যান্য ভাষা থেকে একেবারেই ভিন্নতর ও বৈচিত্র্যময়। কিন্তু ভাষা যখন মানবিক ভাববিকাশের সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন আর আত্মদর্শনমুখী গুরুবাদের মর্যাদা এবং ধর্মের ভাব কোথাও রক্ষিত হয় না। ফলে পররাজ্যগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী কূটাচার অনুসারে ভাষাভিত্তিক ধর্ম হয়ে উঠে ক্ষমতা দখলমূলক রাজনীতির হাতিয়ার। তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষে শাসন শোষণ পোক্ত করতে ইংরেজ পন্ডিত হ্যালহেড সাহেবকে দিয়ে ইংরেজী ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশ করেন তাদের মতো করে। এর অন্তরালে ছিল রাজনৈতিক ধর্ম ব্যবসার এক সুদূর প্রসারী চিন্তা-ভাবনা। ১৮০১ সালে এদেশে রাজনৈতিকভাবে বাঙালিদের ধর্মান্ত করনের লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ ও প্রকাশের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ কাজ দ্রুত গতিতে সফল সরার  জন্য খ্রিষ্টান পাদ্রি উইলিয়াম কেরিকে দিয়ে বাংলা ব্যাকরণ ও লিপি সংস্কারের নামে বাংলা বর্ণ অ এর হ্রস্ব ও দীর্ঘ এ দুটি রূপ অর্থাৎ “অ-কার ও আ-কার” রেখে বাকী উচ্চারণ বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যকে নিধন করা হয়। আর এরই সাথে নিধন করা হয় আত্মদর্শনমূলক জীবন্ত মানবভাষা বাংলার আধ্যাত্মিক স্বরূপকে। কারণ প্রাচ্যের গুরুমূখী (আধ্যাত্মিক শিক্ষক) এ সূক্ষ্মতর ভাষা একাডেমিক চর্চার মাধ্যমে কোন পাশ্চাত্যে পন্ডিতের পক্ষে আয়ত্ব করা একেবারে অসম্ভব ব্যপার ছিল। তাছাড়া এদেশে দ্রুতগতিতে অধিক সংখ্যক বাঙালিকে খ্রিষ্টান বানানোর পথে দীর্ঘকালীন সাধনা সাপেক্ষ এমন কঠিন পদ্ধতির ভাষাশিক্ষাকে মারাত্মক একটি প্রতিবন্ধক রূপে দেখেছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্র। আর তাই আত্মদর্শনের জীবন্ত মানবভাষা বাংলা আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের ধর্মীয় রাজনীতির চক্রান্তে পড়ে তার আপন ঐশ্বর্য হারাল। রুদ্ধ হলো বাংলা ভাষার স্বাধীন গ্রহণ-বর্জন ক্ষমতা ও অবারিত বিকাশ পথ।

সুতরাং আমরা এখন যে প্রমিত নামক তথাকথিত শুদ্ধ বাংলায় বলতে ও লিখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি তা আমাদের মায়ের ভাষার প্রকৃত ঐতিহ্যের বিকশিত রূপ মোটেও নয়। কলোনিয়াল ধর্মান্ধ শোষকদের সংস্কারকৃত ভাষা মাত্র। প্রকৃত বাংলা ভাষা নান্দনিকভাবে নিগৃহীত,রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত সাংস্কৃতিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের দালালদের দ্বারা।

আর এভাবেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের মূল অস্তিত্বকে। যদিও বাংলা ভাষা সহজ হয়েছে কিন্তু ভেতরের প্রাণটুকু অনেকটাই নিষ্প্রভ। সাধনার সংযোগ নেই। তাই ভাষার ব্যবহারে আধ্যাত্মিক বাঙালি চরিত্র ব্রিটিশ দালালী তথা ভিন্ন সংস্কৃতির মাঝে হারিয়ে গেছে অনেকটাই ব্রিটিশ বিদায়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালির ধর্মীয় পরিচয়টাকে প্রধান করে দেখানোর চেষ্টা করেছে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। বাঙালি পরিচয়কে ভেঙ্গে হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি রূপে চিত্রিত করা হয়েছে ধর্মান্ধতার মুখোশে। হিন্দু বাঙালির চেয়ে মুসলমান বাঙালি ভিন্ন জাতি সত্ত্বার মানুষ সেটা বুঝানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় লিপ্ত হয় পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। বাঙালি মুসলমানকে তার স্বজাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এমনকি মুখের ভাষা থেকেও বিচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়। এমনিভাবে আরবী, ফারসী, পর্তুগীজ, উর্দু ইত্যাদি ভাষার শব্দের আগমনে বাংলা তথাকথিত সমৃদ্ধির নামের স্বকীয়তা বিলীন বিসর্জন দিয়েছে বার বার। শাসন শোষন ধর্মান্ধতার মাধ্যমে গভীর আধ্যাত্মিক গুরুমূখী ভাষাটিকে বার বার অস্ত্রোপাচার করার চেষ্টা হয়েছে সুক্ষ্মভাবে।

সময় এসেছে আবারো গুরুমূখী হয়ে প্রকৃত বিদ্যা শিক্ষা করার। প্রকৃত বাঙালি ও বাংলাভাষী হয়ে বিধাতাচরিত্র গ্রহণ ও ধারণ করবার।

দয়ালের উপদেশ – ২০

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৬৭: সাধক জীবনের চারটি অবস্থা-স্থুল, প্রবর্তক, সাধক, সিদ্ধি,নাছুত, মালাকুত, জবরুত ও লাহুত।

প্রথম, স্থুল বা নাছুত অবস্থায় সাধক সামজিক নিয়ম প্রণালী অনুযায়ী সাধন-ভজন করে। সন্ধ্যা, পূজা, শরিয়ত পালন এ অবস্থার কাজ। দ্বিতীয়, প্রবর্তক বা মালাকুত অবস্থায় সাধক ঘরে ঢুকে মুরশিদের চরণে আশ্রয় নেয়। এই অবস্থায় সাধক মনের মলিনতা পরিষ্কার করে পবিত্র হয়। পাপ হতে দূরে সরে দাঁড়ায়। তৃতীয়, সাধক বা জবরুত অবস্থায় সাধকের পবিত্র হৃদয়ে আধ্যাত্মিক তত্ত্ব বা মারফতি জ্ঞান জেগে ওঠে। দয়ালের প্রতি প্রেম জন্মে। চতুর্থ-সিদ্ধি বা লাহুত অবস্থায় সাধক নির্বাণ বা সাযুজ্য লাভ করে। এই অবস্থায় প্রেমিক সাধক, প্রেমময়ের প্রেমে সমাধি লাভ করে। সাধক জগৎ ভুলে যায়, এমনকি নিজের অস্তিত্ব পর্যন্ত ভুলে একমাত্র প্রেমময়কে ছাড়া আর কিছুই দেখে না, বুঝে না। প্রেমময়ের ধ্যানে এমন অবস্থা হয় যে, শুধু যে খাওয়া-পরার খবর থাকে তা নয়, নিজের ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত থাকে না-আকাশে-বাতাসে, জলে-স্থলে, বিশ্বজগতের প্রতি রেণুতে পর্যন্ত একমাত্র প্রেমময়ের সত্তাই দেখে-উপলব্ধি করে! এই অবস্থার কোন তুলনা নেই। এই অবস্থাই এই অবস্থার তুলনা। এই স্তরে সাধক আর প্রেমময়ে পৃথক থাকে না রে-এক হয়ে যায়। ভক্ত জলবিন্দু আর দয়াল মহাসাগর। জলবিন্দু মহাসাগরে মিশে যায়।

উপদেশ-৬৮:  দেখ! মানুষ সৃষ্টির পূর্বেই ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে। চক্রে পড়ার আগেই চক্র হতে বের হবার পথ তৈরি করা হয়েছে।

এ জগতে মূল ধর্ম মাত্র একটি। বাংলা ভাষায় তাকে বলে সনাতন ধর্ম, আরবি ভাষায় বলে ইসলাম। সনাতন অর্থ সত্য আর ইসলাম অর্থ শান্তি। সত্য যেখানে, সেখানেই শান্তি, আর শান্তি যেখানে, সেখানেই সত্য। দুটি শব্দেরই মূলগত অর্থ এক।

যখন মানুষ এই মূল ধর্মের মৌলিক নীতি ছেড়ে দিয়ে কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও মূল জিনিস বাদ দিয়ে পথকেই মূল জিনিস মনে করে, শুধু আচারকেই সব মনে করে, তখনই ধর্ম প্রবর্তক বা অবতার। সেই বিকৃত ধর্মকে যুগোপযোগী ও দেশোপযোগী করবার জন্য আসেন।

দেখ! সেই সৃষ্টি হতে আরম্ভ করে দাউদ, সোলেমান, ইশা, মুসা, শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, হযরত মোহাম্মদ কত প্রবর্তকই না এসে ধর্মকে রিফাইন করে গেছেন।

হিন্দু ধর্ম, মুসলমান ধর্ম, ইহুদি, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রভৃতি প্রত্যেকটি ধর্মই সেই মূল ধর্ম হতে প্রবর্তিত। মূলধর্ম একটি গাছ আর প্রবর্তিত প্রত্যেকটি ধর্ম এক একটি ডালা।

প্রত্যেক ধর্মেরই মূলগত নীতি এক, কি প্রকারে সত্যে পৌঁছানো যায়, শান্তির ক্রোড়ে বিশ্রাম লওয়া যায়।

উপদেশ-৬৯:  দেখ! যদি শান্তি পেতে চাস তবে তা সংসার করেও পাওয়া যায়। তবে প্রথমেই সৎসঙ্গ করে একটু শক্ত হয়ে নিতে হয়। যদি শান্তিতে ও নিশ্চিন্তে জীবনটা কাটাতে চাস, তবে বৃথা কাজ বাড়াবি না। যা না করলেই নয়, মাত্র তাই করবি।

ওরে! নিস্কামভাবে অর্থাৎ ফলের দিকে লক্ষ্য না করে কাজ করা কঠিন, যদিও মুখে বলা সহজ। মূল তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, একটা উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করা হয়।

বাহাদুরি দেখাবার জন্য অথবা অন্যের উপকার করবে, এই মনে করে অনেকে অনেক কিছুর মেম্বার, প্রেসিডেন্ট হয়ে কাজ বাড়িয়ে ফেলে। দেখ, তাতে অন্যের উপকার হোক বা না হোক, নিজের যে সর্বনাশ হয়, তা ভাববার ফুরসৎ পর্যন্ত নেই।

যাঁর সৃষ্টি সেই রক্ষা করবে, তোদের আর বাহাদুরি দেখাতে হবে না। অন্যের উপকার করবি, অমুক করবি, তমুক করবি, সে সব বাদ দিয়ে, এখন দয়ালকে লাভ করবার চেষ্টা কর। তাঁকে পেলে তখন যা করবার করিস। যতই বৃথা কাজ বাড়াবি, ততই জালের ভিতর গিয়ে পড়বি। তখন বাইরে আসা কঠিন হবে।

যদি দয়ালকে পেতে চাস, শান্তির আশা করিস তবে দয়ালের কাছে, কাজ কমিয়ে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করবি।

কোথায় কাজ কমাবার চেষ্টা করবি- তা না, শুধু বাজে কাজ বাড়িয়ে জীবনটাও বাজে করে ফেলিস। মনে রাখবি, জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য দয়ালকে লাভ করা – শান্তি পাওয়া। বাজে কাজের বাহাদুরির মোহে পড়ে, মনটার আর বাজে খরচ করিস্ না। (চলবে)