ধারাবাহিক

ধর্ম ও দর্শনের সমন্বিত রূপ-‘মানবতা’

মিরপুরে ‘জ্যোতিভবন’-এ ‘মানবতা’ বিষয়ে চিন্তন বৈঠকের ১০ম পর্ব অনুষ্ঠিত

ধর্ম ও দর্শনের সমন্বিত রূপ-‘মানবতা’

সংলাপ ॥ বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক চিন্তন বৈঠকের ‘মানবতা’ বিষয়ে ১০ম পর্ব (নতুন আঙ্গিকে ৬ষ্ঠ পর্ব) ১৪ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকাল ৫ টায় মিরপুর আস্তানা শরীফ-এর ‘জ্যোতিভবন’-এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ মহাসচিব শাহ খায়রুল মোস্তফা’র সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাহাখাশ সদস্য ও মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির মহাসচিব শাহ মনোয়ারা সুলতানা, হাক্কানী মহিলা উন্নয়ন বিভাগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রানু আখতার, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা)’ব্যবস্থাপনা সংসদের সাংগঠনিক সচিব ফরিদা খাতুন মণি এবং হামিবা সদস্য সালেহা আল দ্বীন সঙ্গীত। বৈঠকটির সঞ্চালনায় ছিলেন বাহাখাশ সদস্য শাহ আবেদা বানু তরু।

শাহ মনোয়ারা সুলতানা বলেন, মানবতা-ল্যাটিন শব্দটি এসেছে ‘হিউমিনিটাস’ শব্দ থেকে । হিউমেনেটি অর্থ দয়া, করুণা, প্রেম, ভালোবাসা, অন্যের কল্যাণ।  মানবতার মাধ্যমে স্রষ্টার ইবাদত এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে উঠে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষ এবং প্রাণীর প্রতি যে মমত্ব ও ভালোবাসা তাই মানবতা। মানবতার দাবীদার একমাত্র মানুষ, অন্য কোনো প্রাণী নয়। আবার এই মানবতার লঙ্ঘনও করে মানুষ। যে গুণাবলী মানুষকে মানুষ নামে আখ্যা দেয় তাই মানবতা। মানবতা গুণটি মানুষ  জন্মগতভাবে কিছুটা পেলেও  তা পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে হলে সেটির চর্চা করতে হয়।

অ্যাডভোকেট রানু আখতার বলেন, ‘মানবতা’ শব্দটি শুনে আসছি, কিন্তু এর ভেতর এত বিশালতা লুকিয়ে আছে তা আগে কখনও বুঝতে পারিনি। কেউ মানবতা করতে চাইলে আগে তাকে মানবিক হতে হবে। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর মূলমন্ত্র হচ্ছে কর্ম-মানবতা-শান্তি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মানবতার সাথে কর্ম-এর সম্পর্ক রয়েছে। যে কর্ম অন্যের কল্যাণের জন্য করা হয় তাই মানবতা। মানব কে? যার ভেতর মান আছে তিনি মানব। মানবতা শব্দটি ভেঙ্গে এভাবে বলা যায় মানবতা হচ্ছে মানব+দেবতা। দেবতা হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ, পবিত্র, কল্যাণময়, করুণাময়, ক্ষমাশীল, শান্তিদানকারী,, অভিভাবক, সবচেয়ে সম্মানিত, সর্বজ্ঞানী, প্রতিপালক, দুর্নিবার, সত্য ঘোষণাকারী ও জামিনদার। এই গুণাবলী যে মানুষের মধ্যে বিরাজমান কেবলমাত্র তিনিই পারেন মানবতা করতে। বলা যায়, দেবতার গুণাবলী যখন কোনো মানুষ লালন করেন তখন তা হয় মানবতা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে মানবতা করতে পারে? একমাত্রসত্যমানুষই মানবতা করতে পারে। কারণ, আমরা জানি স্রষ্টার গুণাবলী একমাত্র সত্যমানুষ মহান সাধকরাই ধারণ করতে পারেন। মানবতা করতে হয় কর্মের মধ্য দিয়েই। নিঃস্বার্থ কর্মই প্রেম এবং প্রেমই মানবতা। যে-সকল কর্মের মাধ্যমে অন্যের কল্যাণ হয় এবং এর বিনিময়ে কোনো প্রত্যাশা থাকে না তাই মানবতা।

মানবতার লক্ষ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা। আর শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রথমে করতে হয় নিজের মধ্যে, তারপর ক্রমান্বয়ে পরিবার, সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র, সর্বোপরি বিশ্বময়, বিশ্বব্যাপী। সূফী সাধক (সত্যমানুষ) শেখ আব্দুল হানিফ  বলেন, ‘সত্যমানুষ হও, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’। মানুষের কল্যাণের জন্য ‘কর্ম’ করতে হলে প্রথমে সত্যমানুষ হতে হবে। অর্থাৎ নিজেকে সত্যে প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত কেউ মানবতা করতে পারে না।

ফরিদা খাতুন মণি ‘মানবতা’ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করে বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সকল সাধক, মুণী-ঋষি মানবতাকে মানবধর্ম বলেছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঈশ্বরজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শুধু মানবজাতির কল্যাণ সাধন করেছেন-এরকম মহামানব পৃথিবীতে বিরল। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত) থেকে শুরু করে সাধক জালালুদ্দিন রুমি, ওমর খৈয়াম, হাফিজ, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি,কবীর, তানসেন, নিজামউদ্দিন, লালন সাঁই, সাধক নজরুল,সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন, আনোয়ারুল হক ও শেখ আবদুল হানিফ-এঁর মতো মহামানবগণ মানবতার কল্যাণেই আবির্ভূত হয়েছেন এই ধূলির ধরায়। একমাত্র এই অঞ্চলেই ধর্ম ও দর্শনের এক সমন্বিত রূপ হচ্ছে‘মানবতা’।

হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বললেন – ‘আমি মানুষ, মানবতা আমার ধর্ম’ – এটি উপলব্ধির বিষয়। অন্যের ধর্ম কেউ লালন করেনা, পালন করে। যার ফলে সে সবকিছুই করে। আবার নিজের ধর্ম পালন করতে গিয়েও মানুষ নিজের সাথে নিজেই বেশি প্রতারণা করে। ইসলাম (শান্তি) মানুষের ধর্ম না, মানুষ যা ধারণ করে তাই তার ধর্ম। যেহেতু মানবতার লক্ষ্য শান্তি। সুতরাং শান্তির জন্য সত্য অবধারিত।’

প্রজাতি হিসেবে সকল মানুষই মানবজাতির অংশ।  ধর্ম যেহেতু ধারণের বিষয়, সুতরাং ধর্ম ব্যক্তি মানুষের। সাধক বললেন, এটি উপলব্ধির বিষয়। অর্থাৎ উপলব্ধি-বাস্তবতার আলোকে মানবতা তার জীবনে পরীক্ষিত সত্য হয়ে আসতে হবে। বিষয়টি এভাবেও দেখা যায়, মানুষের মাঝে মানবতার ধর্ম প্রচ্ছন্নরূপে ধারণ করাই আছে, তাকে জাগিয়ে তোলাই মূখ্য কাজ।  মানুষের ধর্ম মানবতা সেটি অবশ্যই অর্জনের বিষয়, মানুষ হয়ে ওঠার বিষয়। সকল প্রজাতি মানুষের ধর্মই মানবতা নয়, আমিত্বের আবরণ উন্মোচিত হলে যে মান+হুশ সম্পন্ন মানুষের রূপান্তর ঘটে, তাঁর ধর্মই মানবতা।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ আরও বলেন, ‘সবাইতো আবার সবার সেবা নিবে না, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মতো কেউ হলে বলবেন, ‘তুইতো তো মা-বাবাকেই দেখিসনা, তোর মা ভিক্ষা করে খায়, তুই আমার কী সেবা করবি, তুই দরবার কী বুঝবি?।’ সুতরাং মানুষের ধর্ম মানবতা সেটি জীবনের লক্ষ্য ও লক্ষ্যপথে ধারণ-লালনের মধ্য দিয়ে আসে। তবে মানুষ যা ধারণ করে তাই তার ধর্ম কীভাবে, কোন মানদন্ডের নিক্তিতে এবং মানবতা কিভাবে মানুষের ধর্ম এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

প্রজাতি মানুষ অত্যন্ত অশান্ত জীব। তার মস্তিষ্কে নিত্য চিন্তার ঢেউ বহমান। সেজন্য শান্ত হতে হলে তাকে কঠোর-কঠিনতম পরীক্ষার মধ্য দিয়েই ধারণ করতে হয়, নিজ সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। সর্বকালেই এটি পরীক্ষিত সত্য-একমাত্র জ্ঞানবান তথা সত্যমানুষগণই পরিবর্তন-বিবর্তন-রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টি করতে পারেন এবং মানবতার কল্যাণ করেন। মানবতা ধর্মবোধে ধারণ করতে হলে মানুষকে সত্যমানুষের সান্নিধ্যে আসতেই হবে। সেজন্যই ধর্মীয় শাস্ত্রাদিতে ঘোষণা এসেছে,‘ বিশ্বের প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি ভাষা ও জাতিতে তাদের রসূল (সত্যমানুষ) প্রেরণ করা হয়েছে।’

মানুষের ধর্ম মানবতা এটি উপলব্ধির বিষয়। ‘হাক্কানী স্কুল অব থট’ অনুসারে এই উপলব্ধি এবং বাস্তবতার নিরিখে যে সমস্ত মানুষ চলে আসতে পারে, বর্তমানে থেকে নিজেকে পরীক্ষা করতে পারে, প্রতিটি কর্মকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ধর্ম ধারণ করতে পারে সেই পবিত্রতা অর্জন করে এবং সেই কেবল মানবতার কাজ করতে পারে।  সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘কোন একটি সত্যের সঙ্গে যতক্ষণ না একাত্ম হচ্ছি, ধারণের প্রশ্নই উঠেনা। ধারণ করার পর শক্তিতে পরিণত করলে তিনি প্রতিদিনই তা লালন করেন। কোনব্যক্তি যখন গুরু-মুর্শিদরূপে তার ধর্মকে ধারণ করবে এবং লালন করবে, বলা হয়েছে দুই যুগ লেগে থাকলে একজন আশেক বা প্রেমিক হয়। এভাবে ধারণ করলে সে তার ধর্ম, তার সত্য দেখতে পাবে। সেই প্রকৃত মানবতার কর্ম করতে পারবে।’

হাক্কানী চিন্তনপীঠ অনুসারে কর্মই ধর্ম, হাক্কানী ওজায়িফেও কথাটি এসেছে। ব্যক্তির ইচ্ছাতেও কর্ম হয়, খেয়ালেও কর্ম হয়। কিন্তু জীবনের লক্ষ্যকে ঘিরে তথা সত্যকে ঘিরে যা কিছু করা হয় তাই কর্ম। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন – প্রশংসিত কর্ম থেকেই কর্ম সৃষ্টি হয়। খেয়াল ইচ্ছাতে পরিণত হলে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বাকি সব কর্ম কিন্তু ওখানে এক নাই।’ এভাবে কর্মকে ধর্ম করে নিতে হয়, তাহলে মানুষের অভ্যাস থেকে স্ব-ভাবে রূপান্তর ঘটে। জীবনের এক লক্ষ্যের কর্মপথেই মানবতা ধর্ম হয়ে আসে। যিনি স্বভাবে অধিষ্ঠিত তিনিই মানবতার ধর্মে প্রতিষ্ঠিত ।

ইসলাম ধর্মের প্রবক্তা হযরত মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘ধর্ম কি?’ এর উত্তরে তিনি তিনবারই বলেছিলেন, ‘সৎ-স্বভাব’। এই প্রেক্ষিতে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ শুধু স্বভাব-এর উপর জোর দিলেন। হাক্কানী চিন্তনপীঠ-এ মানুষের স্ব-ভাবে প্রতিষ্ঠার উপর সবচাইতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যিনি স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত, যিনি তার স্বভাবে প্রতিষ্ঠিত তিনিই কেবল তার ধর্ম জানতে পারেন, ধর্ম ধারণ করতে পারেন। স্বভাব শব্দটাই প্রেমজগতের কথা। ভক্তি, শ্রদ্ধা থেকে আসে স্বভাব। ভালবাসা থেকে এর সূত্রপাত হয়। নিষ্ঠা ও নিমগ্নতার সাথে কর্ম করলে অভ্যাস পরিবর্তন হয়ে স্বভাবে রূপান্তরিত হয়। সেজন্যই সাধক বলেন, ‘অভ্যাস পরিবর্তনই এবাদত। স্বভাবে প্রতিষ্ঠিত মানুষই মানবতার কর্ম করতে পারে’। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, – ‘যতক্ষণ না ব্যক্তি কমপক্ষে ৮ ঘন্টা নিজের কর্মের মধ্যে নিজের স্বকীয়তা খুঁজে না পাবে, ততক্ষণ স্বভাব বুঝতে পারবে না, একাত্মও হতে পারবে না।

সত্যমানুষ বলেন- ‘পৃথিবীর সকল মানুষের মধ্যেই একটি সত্য আছে’ – সেটি খুঁজে পেতে হবে, সেজন্যই একজন সত্যমানুষ- এঁর সান্নিধ্য প্রয়োজন। নচেৎ, কখনই নিজের সত্য জানা যাবে না। যা আমরা জানি না বা জানার চিন্তা করত: আমাদের জীবনে পরীক্ষিত সত্য হয়ে আসে নি সেটি সত্য নয়। জানার জন্য শাস্ত্রাদির আশ্রয় নেয়া, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের উপর নির্ভরতা,  মানুষ স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে, দর্শন আর উপলব্ধি না হলে কেউ সত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সূফীসাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন – ‘ নিজ জীবনের পরীক্ষিত দর্শন ও উপলব্ধিই কেবল সত্য। আল্লাহ্-সৃষ্টিকর্তা, সত্যমানুষ হতে গুরু পরম্পরায় যে জ্ঞানধারা দর্শন ও উপলব্ধির নিক্তিতে জীবনে পরীক্ষিত সত্য হয়ে আসে সেটিই সত্য।

সাধক আরও  বলেন, – ‘ব্যক্তির খেয়ালমাফিক কর্ম সত্য নয়। ইচ্ছা সবসময় সত্যের প্রতিনিধিত্ব করে, আর করে বলেই সেই ধর্মটা জানতে পারে, ধর্মে পৌঁছুতে পারে। উপলব্ধির সঙ্গে ইচ্ছাশক্তি এক হয়ে বাস্তবতার নিরিখে সত্য হয়ে আসে। না হলে কোন কর্ম সত্য হয়ে আসে না। ’ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী – ‘ভোগের আনন্দ সাময়িক-ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন’ মানবতা ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ারপথে বাণীটি গুরুত্বপূর্ণ। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এ প্রসঙ্গে হেসে বলেন, ‘কোন্ ত্যাগের কথা আপনারা বলছেন, মলত্যাগও তো ত্যাগ। প্রেমজগতে প্রবেশ না করলে কোন্ ত্যাগের মধ্য দিয়ে আপনি মানবতার সেবা করবেন?’  সত্যমানুষ-এঁর মানবতা ব্যক্তি, গোষ্ঠী, পরিবেশ, স্থানও কালিক ধারণার ঊর্ধ্বে। মানবতা সত্যমানুষ-এঁর একটি কৃপারূপ। মানুষকুল ছাড়াও সমগ্র প্রকৃতি ও অন্যান্য জীবজগতের প্রতিকৃপারূপ তাঁদের জ্ঞানধারা হতে উৎসারিত। যিনি শ্রীগুরু তথা সমৃদ্ধ গুরু তার মানবতা গ্রহণ করে সবাই যারা তাঁর সংস্পর্শে আসে। কিন্তু তা ধরতে পারেন কেবল তাঁর শিষ্য। পরবর্তীকালে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে শিষ্যই একদিন হয়ে ওঠেন জগৎগুরু। এই পরম্পরায়ই চলছে সৃষ্টিজগৎ। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলা হচ্ছে – সত্যমানুষের কাজ হলো সমাজ সংস্কার। সত্য ধারণ-লালন-পালন করতে পারলে, নতুন সৃষ্টি হলে জ্ঞান আসে, জ্ঞানের পথ ধরেই আসে প্রকৃত মানবতা।

সালেহ্ আল দ্বীন সঙ্গীত বলেন, ‘মানবতা’ একটি প্রক্রিয়া যা চর্চা, অর্জন ও ধরে রাখার বিষয়। আজ একটা উপকারী কাজ করলাম, পরদিন পরিবেশে পড়ে বদলে, তা হলে কি ‘মানবতা’ হবে? অল্প যা অর্জন করলাম সবটাই তো শূন্য হয়ে যাবে চর্চা না করার ফলে। সতর্ক না থাকার কারণে পিছলে পড়ছি প্রতিনিয়ত। প্রতিটি মানবসন্তান একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে জন্মায়। পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে দুটোই পরিবর্তন হয়ে যায়। একজন শিশু বেড়ে উঠার সাথে সাথে তার বিভিন্ন পরিচয় যোগ হয় যা অন্যদের শিখিয়ে দেয়া। তার প্রথম পরিচয়টাই সে ভুলে যায়। মানুষ যখন তার আসল পরিচয় ভুলে যায় তখন তার চরিত্রে তা ফুটবে কীভাবে? মানুষ না হতে পারলে কী মানবতা হবে?

মানুষের কর্ম অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। নিজে (অভ্যন্তরীণ) ভালো তো জগৎ ভালো। আগে তো নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে। লক্ষ্য সেখানে একটাই-‘মানুষ হওয়া’। লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিনিয়ত নিজের জগৎ পরিশুদ্ধ করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে না গেলে যোগ্যতা আসবে কী ? দেখা যাবে, সারা জীবন যা করে এসেছি-নিজের ক্ষতি, মিথ্যাচার-তাই করে যাবো। মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য তো শুধু চিন্তা, ব্যবহার এবং কর্মে।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে বলতে গেলে মানবতার জন্য প্রয়োজন হয় কর্মের। আমার সৌভাগ্য আমি হাক্কানী মিশনের কিছু কর্মের সাথে নিজেকে যুক্ত করার সুযোগ পেয়েছি যেখানে প্রত্যেকটি প্রকল্প মানবতার জন্য। এই প্রকল্পগুলোতে নিজেকে কীভাবে জড়াবো তার সম্পূর্ণ নিজের ওপর। মানবতা যেহেতু একটি প্রক্রিয়া এবং এর কোনো শেষ নেই । সারাজীবন উদ্দেশ্যহীনভাবে চলতে চলতে জীবন চলার পথে যখন কোনো ছন্দ ছিলো না এবং গঠনমূলক কর্মও ছিলো না সেখানে এসে আজ উপলব্ধি আমার একটাই সচেতন হয়ে জীবন চলতে হবে। আমার শুদ্ধ ও কর্মের সাথে সমন্বয় রাখতে হবে। শুধু চিন্তায় রাখলে হবে না, বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে হবে।

নিজের কথা – ৫

শাহ মো. লিয়াকত আলী ॥ সাধারণত মানুষের চিন্তাজগতের দুটো বিচরণ ক্ষেত্র বা বলয় থাকে। যার একটি হলো বাহ্যিক দেহজাগতিক বলয়। আর অপরটি হলো অভ্যন্তরীণ আত্মিকজগত। দেহজগত উৎপাদনশীল উপকরণ নির্ভর বস্তজগত। আর আত্মিকজগত হলো জ্ঞান নির্ভর শক্তিময়জগত। দেহজগত অভ্যন্তরীন আত্মিক জগতের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। দেহে আত্মার উপস্থিতির কারনেই কর্ম অনুসারে দেহের পরিবর্তন বিবর্তন ও রূপান্তর সাধন হয়ে থাকে। যে কারণে একজন সাধারণ মানুষের কর্মক্ষমতা যেখানে শেষ হয় একজন সাধকের কর্ম করার ক্ষমতা সেখানে আরম্ভ হয়। তাই সাধারণ মানুষ বিপদআপদে পরিত্রাণ পেতে সাধকদের স্মরনাপন্ন হয়ে থাকে। কি সেই ক্ষমতা যা সাধকদের থাকে সাধারণ মানুষের থাকেনা। গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়, সাধারণ মানুষের চিন্তা শক্তির বিচরণক্ষেত্র সাধারণত দেহজাগতিক। তাই তাদেরকে সারাজীবন ধরে দেহজাগতিক বলয়ের মাঝে বস্তুনিষ্ঠ বৈষয়িক কর্ম করতে দেখা যায়। কিন্ত সাধকগন কেবল দেহজগত নয় বরং চিন্তাজগতের উর্দ্ধে জ্ঞানজগতের মাঝে বিচরন করে তাঁদের নৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করে থাকেন। তাই সাধকেরা নিত্য কল্যাণময় নির্ভুল কর্ম সম্পাদন করে থাকেন।

সাধারনত চিন্তাজগতে ব্যক্তিকে অনুকরণ ও অনুশীলের মাধ্যমে অভ্যাস গঠন পূর্বক অভিজ্ঞতার স্তর পর্যন্ত উপনিত হতে দেখা যায়। গবেষকদের মতে মানুষের চেতনা জগতের সাতটি স্তর আছে। এ স্তরগুলোর মধ্যে অচেতন অবচেতন ও প্রাকচেতন এ তিন স্তর হল ব্যক্তির চিন্তাশক্তির বিচরণক্ষেত্র। আবার চেতনাস্তরের সচেতন, দ্বৈতচেতন, ঊর্ধচেতন ও পরমচেতন চেতনার এ স্তরগুলো হলো জ্ঞানশক্তির বিচরণক্ষত্র। এ স্তরগুলোতে চিন্তাশক্তির বিচরণ করার ক্ষমতা নেই। তাই সাধারণ লোকেরা সচেতন স্তরের কর্ম করতে পারেনা। তারা অন্যকে নকল করে কর্ম করে। তাই তারা কর্মের মাঝে আস্থা আনতে পারেনা। কর্ম করেও তারা সন্তুষ্ট হতে পারে না। এমনকি অনেক সময় ভয়ভীতি সংশয় অনিশ্চয়তার মাঝে জীবন যাপন করে। অপরদিকে সাধকদের সাধনার কার্যক্রম চেতনাজগতের সচেতন অবস্থা থেকে আরম্ভ করেন। কর্মে তাঁরা অন্যকে নকল করেন না। এমনকি অন্যরা তাঁদের নকল করুক তা তাঁরা আদৌ পছন্দ করেন না। সাধকগন জ্ঞান পিপাসু। তাই তাঁরা নিজে জ্ঞান জগতে বুঝে কর্ম করেন ও অন্যরা করুক তা পছন্দ করেন। এ বোধশক্তি তাঁদের আস্থার সাথে নির্ভুল কর্ম করার শক্তি যোগায়। তাঁরা অন্যের নকল করে কর্ম করা পছন্দ করেন না। তাঁরা কর্মের মাঝে সন্তুষ্টচিত্ত থাকেন এবং ভয়ভীতি সংশয় অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত থাকেন। তাই সাধারন মানুষের জীবনযাপন অপেক্ষা সাধকদের জীবনযাপন নির্ভীক শান্তিময় ও উন্নত। জ্ঞান বৈষয়িক বলয়ের বিষয়বস্ত নয়। তাই বৈষয়িক বিষয়বস্তর মত জ্ঞান উৎপাদন বা হাটে-বাজারে বেচাকেনা হয় না। জ্ঞানশক্তির মাধ্যমে বৈষয়িক বিষয়বস্তু উৎপাদন করা যায়। উৎপাদিত পণ্যভোগের তৃপ্তি অপেক্ষা উৎপাদন করার আনন্দ অনেক শ্রেয়। সাধারন মানুষের ভোগের সামগ্রী আয়োজনের সঠিক পথ ও  পদ্ধতি কি হওয়া দরকার তা তুলে ধরার জন্যই সাধকগনের নিকট জ্ঞানের আনন্দলোকের জীবনযাপন অধিক পছন্দনীয়।

প্রসঙ্গত: সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী, ‘ভোগের আনন্দ সাময়িক, ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন’। সাধারনণ জনতার দেহজগৎ অচৈতন্যশীল তাই তারা জ্ঞানজগতের পরিভ্রমণ অপেক্ষা উৎপাদনশীল ভোগের জগতে বিচরণ করতে অধিক পছন্দ করে। আবার সাধকগনের দেহজগত হলো চৈতন্যশীল। কারণ সাধকগনের আত্মার খোরাক হল জ্ঞানশক্তি। তাঁদের দেহজগতের অংগপ্রত্যঙ্গগুলো জ্ঞানশক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রনাধীন রেখে ইচ্ছেমত কর্ম পরিচালিত করে থাকেন। তাই তাঁরা সর্বদাই চৈতন্যশীল থেকে সন্তুষ্টচিত্তে নির্ভুল কর্ম করে আনন্দলোকের জ্ঞানজগতে বিচরন করা পছন্দ করেন।

কাজেই তাঁরা নিরন্তন অনাবিল জ্ঞানের আনন্দঘন জীবন উপভোগের জন্য সাময়িক ভোগের জীবন পরিহার করেন। হাক্কানী চিন্তনপীঠে আগতদের উদ্দেশ্যে মাঝে মধ্যেই সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলতেন, ‘আমি হাক্কানীর একটা গরু, হাক্কানীতে এসে যা পেয়েছি তা নিয়েই আমি শক্তি (জ্ঞান) অর্জনের জন্য জাবর কাটি এবং জাবরকাটা পছন্দ করি’। তিনি যখনই কোন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন তখনই সে বিষয়ের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর হুজুরের জীবনাদর্শের ঘটনাবলীর উদাহরণ দিতে পছন্দ করতেন। দেখা গেছে একই উদাহরণ তিনি শত শত প্রসঙ্গে বিভিন্ন সময় তুলে ধরেন। এভাবেই তিনি সাধনাজীবনের অংশবিশেষ শিক্ষাদানের জন্য আগতদের জ্ঞাতার্থে চলার পথে বিভিন্ন প্রসঙ্গে গল্পের ছলে তুলে ধরতেন।

নিজের কথা – ৩

শাহ্ লিয়াকত আলী ॥ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন, ‘পাশাপাশি চলো বন্ধু হতে পার’। সাধক কাকে বন্ধু করার জন্য এ আহবান রাখলেন। সাধকের বাণী যাদের বোধগম্য নয় তারা কিভাবে সাধকের পাশাপাশি পথ চলে বন্ধু হতে পারবে? আবার সাধকের একান্ত সান্নিধ্যে থেকে যে বা যারা নির্দেশিত কর্ম করে সফল হতে পারেনি তারা কি সাধকের পাশাপাশি পথ চলার সুযোগ পেয়েও বন্ধু হতে পেরেছেন ? তাহলে তো তারা কর্মে সফল হতেন। কারণ সাধক বন্ধুত্বের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে কার্পণ্য করতে পারেন না। তাহলে সাধকের পাশাপাশি চলার ক্ষমতা কে রাখতে পারে? সাধক তো জ্ঞানজগতের পথিক আর যারা সাধারণ তারা বড়জোর চিন্তাজগতের পথিক। সাধকের কৃপা না থাকলে কার সাধ্য চিন্তাজগতের পথিক হয়ে সাধকের সাথে পথ চলে বন্ধু হতে পারে। সুতরাং পাশাপাশি চলার আহ্বানে তাঁরাই অগ্রসর হতে পারবেন যাঁরা জ্ঞানজগতের পথিক অথবা যাঁদেরকে সাধক কৃপা করে বন্ধু হিসেবে পাশে নিয়ে পথ চলার সুযোগ করে দেন। কথায় আছে ‘ভক্তের বোঝা ভগবান লয়’। আবার ভগবানের বোঝাও ভক্ত বহন করতে চান। কিন্তু ভগবানের কৃপা ছাড়া কি আদৌ সম্ভব যে ভক্ত তাঁর ভগবানের বোঝা বহন করতে পারে? তাই আমার নিকট পাশাপাশি চলার অর্থ হলো আদর্শিক পথ চলা। অর্থাৎ গুরুর গুণাবলী অর্জন করার জন্য গুরুর আদর্শে আদর্শবান হয়ে পথ চলতে থাকা। চিন্তাজগতে পথ চলে বড়জোর অতীতের সংঘটিত ঘটনাবলীর দৃশ্যপটের সাথে পুণর্মিলন করা যায় কিন্তু ভবিষ্যতের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষণ করা আদৌ কি সম্ভব? এটি জ্ঞান জগতে পথ চলার কাজ। আর জ্ঞানজগতের পথ তিনিই অতিক্রম করতে পারেন যাঁর পাশে তাঁর গুরুজী থেকে ভক্তদের পথ চলতে সাহায্য করেন। জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত তাঁর অসীম জ্ঞানের কোন বিষয় কেহই বুঝতে পারে না। ( আল্ কুরআন) গুরু যিনি সকলের চেয়ে বড়। একমাত্র আল্লাহই সকলের চেয়ে বড়। আরবী ভাষায় যাকে আল্লাহু আকবার বলা হয়। গুরুজীর পাশাপাশি পথ চলার অর্থ আমার নিকট চিন্তাজগত অতিক্রম করে জ্ঞানজগতে গুরুজীর কৃপাধন্য হয়ে পথচলা। এ আদর্শিক পথ চলার মাধ্যমেই গুরুর গুণে গুণান্বিত হয়ে এক সময় গুরুজীর কৃপাধন্য বন্ধুর আসনে সমাসীন হবার জীবনে সুযোগ আসতে পারে। গুরুজী চৈতন্যময়। অর্থাৎ গুরুজী জ্ঞানময়। হাক্কানী চিন্তনপীঠে বলা হয়, ‘চৈতন্যশীল দেহই হল আত্মা।’ ভক্ত গুরুজীর পাশাপাশি চলতে চলতে তাঁর করুণাসিক্ত জ্ঞানে জ্ঞানবান হতে হতে ভক্ত একসময় চৈতন্যশীল দেহ লাভ করতে সক্ষম হন। একমাত্র গুরুজীর এ জ্ঞানময় আত্মার অধিকারী ভক্তই তাঁর প্রজ্ঞাময় পরমাত্মার সাথে মিলিত হয়ে বন্ধুত্ব স্থাপনের যোগ্যতা লাভ করে থাকেন। ভক্ত গুরুজীর বিশ্বাসী পাত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করলেই পারস্পরিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব। সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলতেন, ‘আমি ভালবাসি সকলকে কিন্তু বিশ্বাস করি কেবল আমার মালিককে।’ তাই হাক্কানী চিন্তনপীঠে বিশ্বাসের স্তর অতি উচ্চতর। পারস্পরিক বিশ্বাসের স্তর অর্জন করেই হাক্কানী চিন্তনপীঠে পরস্পরের বন্ধু হওয়ার সুযোগ আসতে পারে অন্যথায় ভালবাসার পথ ধরে পথ চলতে হয়। এ পথে থাকে কেবলই চাওয়া পাওয়ার সুখ আর না পাওয়ার বেদনার গ্লানি। প্রসঙ্গত সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী, ‘সুখ সুখ করি আমি আমার এ সুখ কি রবে চিরদিন, কালে কালে এ সুখ হবে কালেতে বিলীন। দুখ দুখ করি আমি আমার এ দুখ কি রবে চিরদিন, কালে কালে এ দুখ হবে কালেতে বিলীন।’

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রথমবার যখন তাঁর গুরুজী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর নিকট যান, তিনি গুরুজীর নিকট সাক্ষাৎলাভ করার পর বাসায় ফিরার অনুমতি প্রার্থনা করলে সাধক তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘মন চায়লে আইসেন নচেৎ সময় নস্ট কইরেন না’। সাধক সময় কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি সময় কে মানব জীবনের সঙ্গের সাথী বলতেন। সাধকের এই মহামূল্যবান বাণী ও সম্মোহনী আচরণে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ মুগ্ধ হন এবং তারপর থেকে আমরণ তিনি সাধকের আদর্শিক জীবনকে গ্রহণ করে সাধকের বন্ধু হয়ে পাশাপাশি পথ চলেন। (চলবে)

নিজের কথা – ২

শাহ্ লিয়াকত আলী ॥ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন,” সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হোন দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।” এটি সাধকের নিজের কথা। সাধকের এ বাণীকে কে কিভাবে গ্রহণ করবেন তা একান্ত তার নিজস্ব পছন্দের বিষয়।

সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হউন বলতে সাধক কোন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলতে চেয়েছেন, তা বিচার বিশ্লেষণ করার অবকাশ আছে। এ জন্য  সাধকের জীবন আলেখ্যের কিছু কথা তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করছি। সাধক সমাজের অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতই মা বাবা ভাইবোনের সাথে পরিবারের মাঝেই বড় হয়েছেন। মা ভাইবোন বউ সন্তান সন্ততিদের নিয়ে একদিকে জীবিকা অর্জনের জন্য চাকুরী অন্যদিকে জ্ঞান অর্জনের জন্য কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মের বাস্তব প্রশিক্ষণ তিনি  নিজে নিয়েছেন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিতে সাহায্য করেছেন।

সংসার জীবনের চলার পথে তিনি একদা সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে আসেন ও দরবারের পরিবেশ আদর আপ্যায়নে তিনি আকর্ষিত হন। এ আকর্ষণের পথ ধরেই শুরু হয় সাধনার জগতে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ এঁর পথচলা।

সূফী শব্দের ভাবার্থ  হল সত্যমানুষ। সত্যমানুষ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক ছিলেন সাধক সম্রাট পরশ পাথর। এ সত্যমানুষ সত্ত্বা  পরশ পাথরের সংস্পর্শে এসে পথ চলতে চলতে কাল ক্রমেই  সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ নিজেই হয়ে উঠলেন -সত্যমানবসত্ত্বা , পরশপাথর সূফী সম্রাট সত্যমানুষ।

সাধনার পথে চলতে চলতে ভাললাগা ,ভালবাসার সংকীর্ণতার জীবনস্তর অতিক্রম করে তিনি উদারতার প্রেমময় অনন্ত জীবনের পথচলার মাধ্যমে বিশ্বপতির গুণাবলী অর্জন করে বিশ্বমাতার স্নেহধন্য হয়ে  কর্ম মানবতা শান্তির পথিকৃত হিসেবে বিশ্বদরবারে সত্যব্রতী জীবন গড়ার জন্য গড়ে  তোলেন দেশে ও বিদেশে মিশনারী প্রতিষ্ঠান হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ সহ বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) পরিচালিত অনেক আধ্যাত্মিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান খানকা শরীফ, দরবার শরীফ,আস্তানা শরীফ , সত্যাশ্রম।

একজন সাংসারিক সাধারণ মানুষ একজন সাধকের সংস্পর্শে থেকে সাধনা জগতের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায়  মানবতার পথ ধরে রূপান্তরিত হলেন মহামানব সত্যমানুষে।

জীবনের এ অভিজ্ঞতার মহান বার্তা  বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরলেন সাধক, “সবার উপর সত্য মানুষ তাহার উপরে নেই।”

একজন সাধারণ  মানুষ ও একজন সত্য মানুষের মাঝে আকৃতিগত পার্থক্য তেমনটা পরিলক্ষিত না হলেও আচরণগত পার্থক্য থাকে আকাশ পাতাল। আহার নিদ্রা চলা বলা উঠা বসা দেখা শোনা জীবনের এমন কোন দিক নেই যেখানে সত্যমানুষের সাথে সাধারণ মানুষের ভিন্ন আচরণ পরিলক্ষিত হবেনা। আচরণের মাঝে এ ভিন্নতা কেন এবং কিসের প্রভাবে হয়ে থাকে। গবেষণার মাধ্যমে জানা যাবে চিন্তা জগতের স্তর গত পার্থক্য করলেই সাধারণ মানুষের আচরণের সাথে সত্য মানুষের আচরণের পার্থক্য হয়ে থাকে।

সাধারণ লোকেরা প্রত্যাশাহীন গন্ডীর মাঝে জীবনযাপন করে না। তাদের জীবনযাপনের কর্মে চাওয়া পাওয়ার সুখানুভূতি কিংবা না পাওয়ার বেদনার প্রভাব পড়ে। তারা জীবনে সর্বদাই প্রাপ্তির আশা নিয়ে কর্ম করে। কর্মফল তাদের চাওয়া মাফিক হলে খুশী হয় আর না হলে  খুশী হতে পারেনা অখুশি হয়। প্রত্যাশার পরিসরে খুশী আর অখুশির দোলাচলে থেকে এক অস্থিতিশীল অবস্থার মাঝে জীবনযাপন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। তাই তাদের জীবনে একদিকে থাকে পাওয়ার আত্মসুখ বড়ত্ব মিথ্যে অহমিকা অন্যদিকে থাকে না পাওয়ার বেদনা, হীনমন্যতা, সঠতা ক্রোধ লোভ হিংসা মান অপমান বোধ যে সকল কারণে এ স্তরের জীবনযাপনে ব্যক্তি তার স্বাভাবিকতা রক্ষা করতে পারে না। তাদের চারপাশের জীবজন্তু প্রতিবেশী সংখ্যাহীন থেকে নিরাপদে অবস্থান করতে পারেনা করলেও নিরুপায় হয় অবস্থান করে। সাধারণ মানুষ স্বার্থপর হওয়ার কারণে অন্যের স্বার্থ রক্ষা না করে অন্যের অকল্যাণ করে আবার নিজের স্বার্থ রক্ষার পরিমিত জ্ঞান না থাকায় নিজের কল্যাণ সাধন করতেও জানেনা। স্বার্থপরতার প্রভাবে প্রভাবিত হওয়ার কারণে তারা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা স্নেহ সম্মান প্রেম ভক্তি বিশ্বাস সম্পর্ক আন্তরিক ভাবে করতে পারেনা। ফলে তারা সর্বদাই আনন্দঘন কল্যাণকর জীবনানন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে।

অপরদিকে একজন সত্যমানুষ স্বার্থের গন্ডির উর্ধে গিয়ে অন্যের মঙ্গলের জন্য কর্ম করে নিজের আনন্দ ও কল্যাণ করে থাকেন। তাই তাঁরা সর্বদাই কিভাবে অন্যের স্বার্থ রক্ষাকরা যায় সেদিকে গভীরভাবে নজরদারী করেন। অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন স্নেহ সম্মান প্রেম ভক্তি বিশ্বাস স্থাপনের মধ্যদিয়েই নিজের সর্বোত্তম কল্যাণ সাধন করা যায় এ বিশ্বাস সত্যমানুষেরা করে থাকেন। এ সেভাবে তাঁরা মানবিক স্বাভাবিক আচরণ দিয়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশের সেবাদান করে থাকেন। সত্যমানুষেরা প্রত্যাশাহীন ভাবে পরিবেশের কর্মে অংশগ্রহণ করেন। তাই তাঁরা কর্মের বিনিময় আশা  না করেই কর্মের মাঝে আনন্দ উপভোগ করেন। সত্যমানুষেরা পরিবেশের সকলের কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতি আন্তরিক থাকেন। তাই তাঁদের পরিবেশে প্রতিটি প্রাণীই বেশ স্বাচ্ছন্দ ও নিরাপত্তার সাথে জীবনযাপন করতে দেখা  যায়। মোট কথা সত্য মানুষের জীবনাচরনের প্রভাবেই গড়ে ওঠে আনন্দঘন নিরাপত্তাবেষ্টনির শান্তিময় পরিবেশ গড়ে ওঠে সকলের জন্য মঙ্গলজনক কল্যাণময় জীবনব্যবস্থা।

লেগে থাকা

‘লেগে থাকায় সৃষ্টি, লেগে থাকায় বিনাশ; এর মাঝে আছে পরিবর্তন – বিবর্তন – রূপান্তর; তার পরেও আছে পরিবর্তন বিবর্তন রূপান্তর; এভাবেই চলছে।’ – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ চিন্তায় লালন করাটা একটা বিরাট বিষয়। গ্যাপ দিয়ে লেগে থাকা যায়। সেখানে মাথায় লালন করা হয়। চিন্তায় রাখাটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিন্তায় কিভাবে রাখা যায়? সেখানেও একটা পথ আছে, পদ্ধতি আছে। আর লেগে থাকাটা দুটো শব্দ। এটার গভীরতা এত বেশী এটা সাধারণ ভাবে দেখার কোন অবকাশ নেই। আবার বলছি দেখার অবকাশ আছে। কারণ সাধারণ থেকে অসাধারণে যাওয়া যায়। এক এক করেই কিন্তু সেই সিড়ি পার হওয়া যায়। দুই যুগ লেগে থাকলে একজন আশেক হয়। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কথা। তাহলে যারা দুই যুগ লেগে আছে এবং ২৫/৩০/৪০ বছর যাবত যারা এখানে (হাক্কানী দরবারে) লেগে আছি তারা কি সেই পর্যায়ে লেগে আছি? কারণটা কি? তাহলে কি লেগে থাকা হয়নি? কাজেই লাগার মত লেগে থাকার একটা ব্যাপার  আছে এখানে। সেখানে কার্যকারিতাও একটা ব্যাপার। আমরা তো আউটপুট চাই। এখানে লেগে থাকার একটা আউটপুট অবশ্যই থাকতে হবে। বলা হয়েছে দুই যুগ লেগে থাকলে একজন আশেক হয়। আমরা একটা প্রশ্ন পেয়েছিলাম। একজন আশেক হওয়ার পর আর কি লেগে থাকার প্রচেষ্টা থাকে? নাকি নিয়মের মধ্যে পড়ে যায়। সে পর্যন্ত তো যেতে হবে। কারণ ব্যাপারটা অদৃশ্য। অনুভূতির ব্যাপার। নিজেকে তো আর ফাঁকি দেয়া যায় না। নিজের ভিতর কোন পর্যায়ে আছে সেটা একটু নজর দিলেই, নিজেকে পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝা যায়।

লেগে থাকার সর্বস্তরে কার্যকারিতার বিষয় আছে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী – ‘মনে রেখো, কেহ কোন কাজে লেগে থাকলে মেগে খায় না’। এখানে মেগে খাওয়া বলতে কি বুঝাচ্ছে? পরনির্ভরশীলতা? একজন ব্যক্তি যে কোন কাজে লেগে থাকলে বিশেষ করে সাধকদের কাছে যারা আসেন, তাদের প্রত্যেককে এই পরনির্ভরশীলতা দূর করে আত্মনির্ভরশীলতার পথটি দেখান। প্রত্যেকের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার দরকার আছে। এমনকি সাধক কাউকে তাঁর নিজের উপর নির্ভরশীল করে রাখেন না। যার ফলে কঠোর অবস্থান নেন। দুরে সরিয়ে দেন। দুরে রেখে তৈরি করেন। নানা পরীক্ষা দ্বারা তৈরি করেন। সাধক তো পারেন নিজের উপর নির্ভরশীল করে রাখতে। সেই ক্ষমতা তো আছে। একজন বাবা মার যতই ক্ষমতা থাকুক না কেন সারা জীবন একটা বাচ্চাকে  ধরে লালন পালন করেন না। পারেনও না। এখানে লেগে থাকা মানে আত্মনির্ভরশীলতার ব্যাপার অবশ্যই আছে।  প্রত্যেকে আমরা স্বতন্ত্র। শুধু নিজের পরিচিতির জন্যই প্রত্যেকে  নিজের আইডেন্টি রক্ষায় যুদ্ধ করতে হয়। প্রতি মুহুর্ত আমরা পরনির্ভরশীল হয়ে যাই। প্রতি মুহুর্তে আমাদের পরনিভর্রশীল করার জন্য প্রচেষ্টা করা হয় সাহায্যের নামে। এটা জীবনের প্রতিটি স্তরে দেখেছি। একটু সচেতন না হলে আমরা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ি বা পরনির্ভরশীল করে রাখা হয়। সেখানে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হয়। কোথায় লেগে থাকতে হয়?

যেহেতু হাক্কানী চিন্তন পীঠের আলোচনা সেখানে প্রশ্ন থাকছে নিজের কোন লক্ষ্য  আছে ? এটা নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে । সেই লক্ষ্যটা কি সিদ্ধান্ত নেয়া? সেই লক্ষ্যটা কি সুনির্দিষ্ট? ঠিক আছে চলে দেখি। দেখি কত দূর যেতে পারি। সিদ্ধান্ত নিলে সেখানে একটা কাজ হবেই হবে। সেখানে একটা মানুষ আগায়। সেখানে থামার কোন অবকাশ থাকে না। যোগ হয় এখানে। কিভাবে লেগে থাকা যায়। আমি একটু আগে বলেছি চিন্তার জগতে ধারণ করা। লালন আমরা বলি। পালন বলি। আমরা জানি চিন্তার জগতে চতুর্থ স্তরে না গেলে কোন কাজ শুরু করা যায় না। সেই শুরুটাই বা কি ? সেই শুরুটা কি যাওয়ার জন্য লেগে থাকা? বিপরীত অবস্থা দিয়েই কোন বিষয় বুঝতে হয়। বৈচিত্রের মাঝেই কোন বিষয়কে সুক্ষ্মভাবে সুন্দরভাবে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়, আলাদা করা যায়। এত  বৈচিত্রের মাঝে এক এর সাথে লেগে থাকার বিষয়টি চিন্তার মধ্যে রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে। এখানে তো লেগে থাকা সত্যমানুষের সাথে লেগে থাকা। লক্ষ্যের সাথে লেগে থাকা। সেই সত্যমানুষকে কি আমি জীবনের লক্ষ্য হিসাবে নিয়েছি? লক্ষ্যটা আমি মস্তিষ্কে কিভাবে রেখেছি? কোন অবস্থানে রেখেছি? ভাল লাগা শব্দটা আমরা ব্যবহার করি। ‘ভাল’ শব্দের সাথে ‘লাগা’ শব্দটা আছে। ভাললাগা যেখানে আছে সেখানে লেগে থাকার ব্যাপার আছে। সেখানে ভালবাসার ব্যাপার আছে।

সাধকের কাছে শুনেছি  – আমি ভালবাসি যারে সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে? আমি ভালবাসি যে বিষয় তা আমার মধ্যে সুন্দরভাবে আমার মধ্যে অবস্থান করে নেয়। এখানে মন্দ লাগার ব্যাপার আছে। যা চিন্তার জগতে লালন করি। সেটার অবস্থানই বা কি? যখন কোন কিছু আমরা ঘৃনা করি, কারও প্রতি বিদ্বেষ থাকে, কারও প্রতি পরশ্রীকাতরতা থাকে এইসব বিষয় চিন্তার জগতে স্থান দেই। এই অবস্থানও লেগে থাকা। চিন্তার জগতে রাখা বিষয়টা আমাদের মনে রাখতে হবে। কোন কিছুই খারাপ না। এটা চিন্তনপীঠে বলা হয়। একজন মানুষের মধ্যে যা কিছু আছে এটা তার শক্তি। চালকশক্তি হিসাবে চালিয়ে দেয়। সেগুলো এক রূপ দিলে বাকী সমস্ত শক্তি নিয়ন্ত্রণে আসে অথবা আত্মসমর্পন করে। কাজেই পদ্ধতি একটাই। আদেশ উপদেশ নিষেধ, চেষ্টা কতক্ষণ থাকে? একটা সময়ে সবকিছু অটো হয়। তার আগে নিজের মধ্যে ঢুকার চেষ্টা করতে হয়। নিজের সাথে লেগে থাকা বড় ব্যাপার। নিজের চিন্তার সাথে লেগে থাকা। এক এ থাকতে হলে নিজের মধ্যে ঢুকতে হয়। ডুব দিতে হয়। বাহিরেও আমাকে থাকতে হবে। আমি চাইলে বাহিরের সেই দৃশ্য শব্দ জাগ্রত করা যায়। স্মরণের মাধ্যমে লেগে থাকা যায়। নিজের মধ্যে লেগে থাকার জন্য নিমগ্নতার কোন বিকল্প নেই। নিমগ্নতার জন্য সারা জীবন প্রচেষ্টা করতে হয় এবং আস্তে আস্তে নিজেকে গুটাতে হয়। এখানে কঠিনভাবে নিজেকে রাখা কত কষ্টের। চারপাশ তাকে টানতে থাকে। জালের মত তাকে টানতে থাকে। হঠাৎ করে ভাল লেগে গেলে নিমগ্নতা আসে। ভাললাগার ব্যাপার লেগে থাকার সাথে জড়িত। হাক্কানী চলার পথে যার যে বিষয় ভাল লাগে সেই বিষয় লক্ষ্য হিসাবে নেয়। আমরা লেগে আছি অন্যভাবে। প্রকৃতি আমাদের লাগিয়ে রেখেছে।  প্রকৃতির দান প্রকৃতি আমাদের যেমন লাগিয়ে রেখেছে এই  দুই পক্ষকে এক এ আসতে হলে  দুই পক্ষের প্রচেষ্টা থাকবে। সেখানে একটা ইতিবাচক ফলাফল আসবে। বার বার আমাদের সচেতন হওয়ার কথা কেন বলা হয়? আমরা হয়তো অন্য দিকে চলছি ।

বস্তুর সাথে বস্তু কিভাবে লেগে থাকে? বস্তুর সাথে নিবস্তু কিভাবে লেগে থাকে? স্থুলের সাথে সূক্ষ্ম কিভাবে লেগে থাকে? কিভাবে লাগিয়ে রাখা যায়? কিভাবে নিজের সাথে নিজ লেগে থাকে? কিভাবে চিন্তায় ও কর্মে সমন্বয় করতে হয়? বা করা যায়? সর্বত্র রয়েছে যোগের ব্যাপার। সমন্বয়ের ব্যাপার। লেগে থাকার মধ্যে কোন ফাঁক থাকতে পারেনা। বস্তুতে বস্তুতে ফাঁক সৃষ্টি হলে বস্তু ভেঙ্গে যায় সেরকম সূক্ষ্ম জগতেও ফাঁক সৃষ্টি হলে ফাঁকি হয়ে যায়। দুটো পদ্ধতি আছে এখানে। যেখানে নিমগ্নতা আছে সেখানে ফাঁক থাকবেনা। যেখানে নিমগ্নতা আছে সেখানে লেগে থাকতে হয় অন্য উপায়ে (পদ্ধতিতে)। নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থাকার জন্য সচেতন থাকতে হয় সার্বক্ষনিক দুই পক্ষ থেকে। একজন সাধকের চারপাশে লেগে থাকার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পরিবেশ দিয়ে ঘিরে রাখা হচ্ছে। অপর পক্ষ উদাসিন থাকলে হবেনা। সমুদ্রে বাস করেও পাত্র উল্টে থাকলে পানি ঢুকবেনা। লেগে থাকতে হয় সর্বোতভাবে। একটা ছুটে গেলে যেন আরেকটা থাকেই। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর বাণী – ‘যেটুকু সময় তুমি নিজেরে ধরে রাখো- সেটুকু সময় তোমার থাকবে ভালো’।

নিজেকে নিজে ধরে রাখতে শিখতে হয়। নিজেকে নিজের সাথে যোগ করে রাখা শিখতে হয়। ধর্মকে ধারণ লালন পালন করতে হয়। লেগে থাকতে হলে নিরবচ্ছিন্নভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলতে হয়। তা নাহলে ছেদ পড়ে যায়। যে ধারাবাহিকতা সূক্ষ্ম স্থূল সর্বোত উপায়ে। সুক্ষ্মতে ধারাবাহিকতা থাকলে স্থূল ছেদ পড়েনা। চিন্তায় লালন করে যেতে হয়।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন-

‘চিন্তায় একটা বিষয় লালন করে গেলে কোননা কোনদিন পৌঁছানো যায়। একটা ফল শেষ পর্যন্ত গাছে লেগে থাকলে পরিপূর্ণতা পায়। লেগে থাকা মানে যোগে থাকা – সংযোগে থাকা। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে কি হয়? পানি থাকেনা, গ্যাস থাকেনা, বিদ্যুৎ থাকেনা। যে পুকুরের সংযোগ থাকে সমুদ্রের সাথে, তার পানি কখনোও ফুরায়না’।

সাধনার দ্বারাই সত্যলাভ হয়

()

গুরু আলো দেখিয়ে নিয়ে চলেন এক অনন্ত আনন্দ-দেশের দিকে, সে আনন্দের সামান্যও সংসারের কেউ দিতে পারে না এটা  নিশ্চিত।  বুদ্ধি দ্বারা সত্য লাভ করা যায় না। সাধনা দ্বারাই নিজের সত্য লাভ করতে হয়। গুরু কৃপা করলে সব হয় । দিন ফুরিয়ে আসছে। বৃথা তর্ক করার সময় নেই। প্রেমিককে কঠোর তপস্যা দ্বারা স্বরূপে, গুরুকে লাভ করতে হয়। সাধন বিনে সাধ্য লক্ষ্য নাহি হয় লাভ। কাতর হয়ে গুরুর দিকে তাকান, তা হলে তিনিই সত্য জানাবেন। গুরুর নির্দেশ ও উপদেশ ধারণ-লালন-পালনে বিশেষ প্রয়োজনে আসে আনন্দের শুভ পদক্ষেপ অসীম শক্তি ও শান্তি। গুরু আশীর্বাদ করেন শিষ্য ও ভক্তরা যেন সবাইকে সেবা করতে পারে। আশীর্বাদ একটা বিরাট সাম্রাজ্য পাওয়ার চেয়ে অনেক বড় পাওয়া। অগণন সাধনার পথের যাত্রীদের স্মৃতি পৃথিবীর ধূলোয় মুছে গেছে কে তাদের কথা স্মরণ করে? ইতিহাসে যাদের নামাঙ্কিত হয়েছে, কে তাদের জন্য নৈবেদ্য দীপ জ্বালে? কিন্তু গুরুর কথা কেউ কি কোনোদিন ভুলবে, না ভুলতে পারে? সকল যুগের প্রেমিকের অন্তরে তাঁর জন্য পাতা অমর আসন। কালের হাওয়ায় বাতি নিভে যায়, কিন্তু গুরুর স্পর্শ আলো নিভে না, দিনে দিনে তা আরও উজ্জ্বল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশ হতে দেশান্তরে। অন্তরে জ্বলে তাঁর আলো। গুরুর কৃপাবর চরম দান। সৌভাগ্যের দুর্লভ স্বাক্ষর।

সর্বদা স্মরণ রাখতে হয়, উপলদ্ধি করতে হয় এবং সচেতন থাকতে হয় যাতে একটু বিশ্বাসের আলোর অভাবে যেন সব কিছু অন্ধকারে হারিয়ে না যায়। সম্ভাবনাপূর্ণ একটা জীবন যেন পরিচয়হীন অন্ধকারে লুপ্ত না হয়। নিরন্তর নিজের মধ্যে গুরুনাম স্মরণের আলো জ্বালিয়ে রাখলে, সর্বদা তাঁর নির্দেশিত পথ অবলম্বন করে চললে কোনো লোভের ছলনায়, কামনার কূপে, অহমিকার অন্ধকারে জীবনকে হারাবার কোনো ভয় নেই। একটা  ভুলের জন্য সাধকদেরও অনেক খেসারত দিতে হয়, সব হারাতে হয় কখনো। একটা আদেশ অমান্য করায় অকালে ঝরে যায় এক দিব্য জীবন। একটা উপদেশ, একটা অনুরোধ উপেক্ষা করায় জীবন গৌরব হারিয়ে যায়। কোনো কারণে একটু সন্দেহ, একটু অহংকার, একটু অভিমানে সব হারাতে হয়। আবার সেই অবস্থান হতে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে চলা শুরু করতে হয়। গুরুর করুণা লাভ করতে সব বিষয়ে চলতে হয় নিজের বিচার করে। গুরুর  দয়াতেও সাবধান থাকতে হয়। সীমা লঙ্ঘন করলে দন্ড ভোগ করতে হয়। নিজের সত্যে সুদৃঢ় না থাকলে, গুরুর সর্বদা নির্দেশিত পথ অবলম্বন করে না চললে কখনোই  লাভ করা যায় না অমর আনন্দ, দিব্যজীবন।

সাধনা পথের যাত্রী, সকলের দাস এমন কাজ করা ঠিক নয় যাতে অবিনয় প্রকাশ পায়। ভালোবাসার মধ্যে কোনো ফাঁকি যেন না থাকে। গুরুকে ভালোবাসলে তাঁর কথা শুনা উচিত উর্দ্ধমুখী চেতনার জন্য। গুরু যে শক্তি যে কাজের জন্য দেন, তা সেই কাজেই ব্যয় করতে হয়। কোনো দুঃখে, কোনো অভাবে, তা অন্য কাজে ব্যয় করা উচিত নয়। সমস্ত উপদেশই কঠোরভাবে পালন করতে হয়।  একটা  বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়ায় শিথিল হলে অন্যান্য সকল বিষয়ে শৈথিল্য দেখা দেয়। শেষে সাধনা-কর্ম সব যায়। এই দুর্বলতা অনেকের মধ্যে এসে যায়। সংসারে ব্যক্তিস্বার্থে মত্তদের মধ্যে এ দোষ সীমাহীন ভাবে বর্তমান, সেজন্য অনেক জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠানকে অকালমৃত্যু বরণ করতে হয়, প্রচুর কলহ বিবাদে হারিয়ে যায় লক্ষ্য, মহৎ প্রচেষ্টা হয় ব্যর্থ।

(২)

ভক্তি, গুরু উপাসনার মাহাত্ম্য। গুরুভক্তি-সাধনার সর্বোচ্চ অবস্থা। সাধক ভক্তিসাধনার চরম-পরম দেশে তার উপাস্য গুরুকে দর্শন করে থাকেন। ভক্তিসাধনার ফলস্বরূপ এটাই পরম পরিণতি। প্রেমের জগতে এক এক মিলে দুই না হয়ে একই হয়। অংশ ও অংশী ভিন্নও বটে, আবার অভিন্নও।  ভক্তের আকর্ষণ ও ব্যাকুলতা থাকে নিজ সত্তায় নিজেকে প্রেমাস্পদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে, তাঁর মধ্যে নিমজ্জিত হতে, তাঁর সত্তার সঙ্গে নিজের সত্তাকে একীভূত করতে। এজন্য প্রেমিক প্রেমের সর্বোচ্চ অবস্থায় প্রেমাস্পদের সঙ্গে অভেদসুখানন্দ অনুভব করেন। দ্বৈতভাব  থাকলে প্রেমাস্পদের সঙ্গে প্রেমিকের সম্বন্ধাশ্রিত রসানুভব সম্ভব হয় । অদ্বৈতরাজ্যে জ্ঞানের ভেদ বিলুপ্ত হয়। অনুরাগী প্রেমিক ভক্ত স্বভাববশেই দ্বৈতদেশে নেমে এসে প্রেমাস্পদের সঙ্গে সম্বন্ধাশ্রিত রস-সম্ভোগ করে। ভক্তের সার্বজনীন প্রেম স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত হয়ে থাকে। ভক্ত সব দেশে প্রেমাস্পদকে দর্শন করে সকল রূপে তাঁকেই অভিব্যক্ত দেখে সকলকে আন্তরিক ভালবাসেন। তখন কোন জীব আর তাঁর নিকট কেবল জীবমাত্র থাকে না, সকলকেই তিনি প্রেমাস্পদের বিভিন্ন রূপে দর্শন করেন। সার্বজনীন প্রেম বা বিশ্বপ্রেম প্রেমের চরম পরিণতি।

মানুষ শরীর, কথা ও চিন্তা দ্বারা যা কিছু করে তাই কর্ম। জীবমাত্রই সকল অবস্থায় সর্বদা কোন-না-কোন কর্ম করে। কর্মই জীবনের লক্ষণ। কর্ম না করে কেহই ক্ষণকালও থাকতে পারে না। যখন মানুষ গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত থাকে, তখনও তার ভুক্তদ্রব্য-পরিপাক, রক্তসঞ্চালন এবং নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস প্রভৃতি দৈহিক কর্ম চলতে থাকে। নিঃশেষে সকল কর্ম ত্যাগ করা কোন জীবের পক্ষেও সম্ভব নয়। জীবনধারণ করতে হলে বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে সর্বদা সংগ্রাম প্রাণীগণের পক্ষে অপরিহার্য। জীব-জগতে জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর অবিরত সংগ্রাম চলছে। এই সংগ্রামই কর্ম।

কর্মের উদ্দেশ্য বিশ্লে­ষণ করলে দেখা  যায় যে, কোন ভক্তই কেবলমাত্র জীবন-রক্ষার জন্যই সকল কর্ম করে না। জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে চেষ্টা করে তার সীমাবদ্ধ অপূর্ণ জীবনের গ-ি অতিক্রম করে এক অসীম ও পরিপূর্ণ জীবন লাভ করতে, সকল অজ্ঞান, অভাব ও দুঃখ হতে মুক্ত হয়ে, সকল চাওয়া ও সকল পাওয়ার অবসান ঘটাতেই নিজস্ব অভ্যাসের দাসত্ব ত্যাগ করে সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে, সকল বন্ধন দূরে সরিয়ে মুক্তিলাভ করতে সাধক-ভক্তরা কর্ম করে।

অভ্যাস জীবনব্যাপী। গুরু যোগের মূল ভিত্তি অভ্যাস। চিত্ত নিরোধের প্রথম উপায় আসক্তি নিয়ন্ত্রণ। আসক্তি দু’প্রকার। বিষয়-আসক্তি আর গুণ-আসক্তি। বাইরের পদার্থ অনিত্য, এই বিচার নিজে করে চিত্ত সদা জাগ্রত রাখা দরকার। নিয়ন্ত্রণ বোধে চিত্ত জাগ্রত হয়। গুরুযোগের লক্ষ হলো রাগ, দ্বেষ, মোহ নিয়ন্ত্রণ। গুরুযোগে রাগ-দ্বেষের দ্বন্দ্বের অবসান হয়, বিমূঢ় ভাবও অন্তর্হিত হয়। এই অবস্থার জন্য প্রথম প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ। আমি গুরু ছাড়া কোন বাহ্য  বস্তুর উপর নির্ভরশীল নই এই ভাবনা চিত্তে সদা জাগ্রত রাখা। গুরুযোগেও  সমস্ত ভোগ সম্মুখে উপস্থিত হয়। গুরুযোগীকে তখন সবচেয়ে বেশী সতর্ক থাকার প্রয়োজন হয়। সমস্ত বাহ্যিক সুখকে ধীরে ধীরে প্রত্যাখ্যান করতে হয়। চিত্তকে  তৈরি করতে হয়। চিত্ত প্রসাধনে ভক্তের অন্তরে শান্তি, আনন্দ জন্মায়। বাইরের জগতে অশান্তি, অবিচার, নিরানন্দ, দুঃখ সতত উপস্থিত থাকে। এই সবের প্রতি উপেক্ষার ভাব রাখা দরকার। উপেক্ষার পরে আসে করুণার স্থান। দুঃখে বিচলিত নয়। জগতে যা কিছু প্রতিকূল, তার প্রতি দৃষ্টি রেখে, এই ভাবের মনন করা। সবার জন্য হিত কামনা, শুভ কামনা থাকা দরকার। এই ভাব মৈত্রী ভাব। সবার প্রতি কল্যাণের ভাবনা, মৈত্রীর ভাবনা ও সবার দেখে আনন্দিত হলে চিত্তের ব্যাপ্তি সহজ হয়।

গুরু-প্রণিধান ভাবনা চেতনার প্রেরণায় সম্ভব। এই প্রেরণাই গুরুশক্তি অর্থাৎ গুরুময়তা। গুরু এমন এক পুঁরুষ, যাঁর ক্লেশ নেই, আশায় নেই, তিনি সবার গুরু। জপ চিত্ত নিরোধের এক সহজ উপায়। গুরুনাম স্মরণ, নিজের চিত্ত গুরুর চিত্তের মতো বীতরাগ, শুদ্ধ হয়ে যাক্, এমন ভাবনা চিন্তাজগতে রাখা দরকার।  নিজেকে জ্যোতির্ময় তরঙ্গরূপে দর্শন করা, প্রাণের প্রচ্ছর্দন ও প্রসারণ, তার সাথে সাথে ব্যাপ্তি ভাবনা করা।  প্রাণবৃত্তি আপনা আপনি শুদ্ধ হতে থাকবে। নিদ্রা আর স্বপ্নে জাগ্রত থাকার চেষ্টা করে তা হতে প্রাপ্ত চেতনাকে অবলম্বন করলে চিত্ত নিরোধ সহজ হয়।

শ্রদ্ধা আস্তিকতা। শ্রদ্ধা আপনা আপনি হৃদয়ে উৎপন্ন হয়। তাকে বলপূর্বক উৎপন্ন করা যায় না। শ্রদ্ধায় আবিষ্ট হলে দিব্য জীবনের আভাস আসে এবং লক্ষ্যের বিষয়ে চেতনা দৃঢ়মূল হয়ে যায়। শ্রদ্ধা ঊষার অরুণালোক।  এরপরে সূর্যোদয় অবশ্যম্ভাবী। শ্রদ্ধাই প্রথম নিশ্চিত প্রত্যয় বা উপায় ভক্তি ভাবের। নিশ্চিত প্রত্যয় এলে সেই প্রত্যয়কে কার্য্যান্বিত করবার জন্য সংযোগশক্তির উদয় হয়। জাগ্রত হয় বিবেক।

শ্রীকৃষ্ণঃ যার রূপের অন্ত নেই

krishna-pz17_l

সংলাপ ॥ ভগবদ্ভজনের মাধ্যমে একজন উপলব্ধি করতে পারেন যে, কৃষ্ণ সর্বপ্রথম স্বয়ং রূপে তারপর তদেকাত্ম রূপে ও আবেশ রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন। এই তিন রূপেই তিনি তাঁর শ্রীবিগ্রহকে প্রকাশ করেন। যারা কৃষ্ণের অন্যান্য রূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না, তাদের কাছে ভগবান তাঁর এই স্বয়ং রূপকে প্রকাশ করেন। পক্ষান্তরে বলা যায়, যার দ্বারা কৃষ্ণ প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধ হন তা হচ্ছে তাঁর স্বয়ং রূপ। আর তদেকাত্ম রূপ হচ্ছে প্রায় স্বয়ংরূপেরই  মতো। কিন্তু এই রূপে কিছু দেহগত পার্থক্য রয়েছে। এই তদেকাত্ম রূপকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, এক হচ্ছে স্বাংশ আর এক হচ্ছে বিলাস রূপ। আর আবেশ রূপ সম্বন্ধে বলা যায় উপযুক্ত জীবতত্ত্বকে প্রতিনিধিরূপে ভগবান শক্তি সঞ্চার করলে এই জীবাত্মাকে তখন আবেশ রূপ বা শক্ত্যাবেশ অবতার বলা হয়।

ভগবানের এই স্বয়ং রূপকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়। তা হচ্ছে স্বয়ং রূপ ও স্বয়ং প্রকাশ। এই স্বয়ং রূপ সম্বন্ধে বলা যায় যে, এইরূপেই কৃষ্ণ সর্বদা বৃন্দাবনে ব্রজবাসীদের সঙ্গে বসবাস করেন। এই স্বয়ং রূপকে আবার প্রাভব এবং বৈভব দু’রূপে ভাগ করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ রাসলীলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গোপীর সঙ্গে নৃত্য করার জন্য ভগবান নিজেকে নানারূপে তখন স্বয়ং প্রকাশ করেন। ঠিক সেইরকম দ্বারকাতেও ষোল হাজার একশ’ আটজন মহিষীর সঙ্গে প্রাসাদে একসঙ্গে বসবাসের জন্য কৃষ্ণ নিজেকে এক হাজার একশ’ আট রূপে প্রকাশ করেছিলেন। অনেক যোগীর দৃষ্টান্ত আছে, যারা নিজের দেহকে নানা অংশে প্রকাশ করেন; যদিও কৃষ্ণ নিজেকে কখনও যোগ পন্থায় প্রকাশ করেননি। যদিও কৃষ্ণের প্রতিটি অংশ ছিল স্বতন্ত্র। বৈদিক ইতিহাসে সৌভরী ঋষি যৌগিক পন্থায় নিজেকে আট রূপে প্রকাশ করেন, কিন্তু সৌভরী ঋষি স্বয়ং একজনই ছিলেন। আর কৃষ্ণ সম্বন্ধে বলা যায় যখন তিনি নিজেকে নানারূপে প্রকাশ করেন, তখন তাঁর প্রতিটি অংশই স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে বিরাজ করে। দ্বারকায় বিভিন্ন প্রাসাদে কৃষ্ণ দর্শনে গিয়ে নারদমুনি এই দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন এবং তথাপি যোগীর কায়ব্যূহ দর্শনে নারদমুনি কখনও অবাক হননি। কারণ তিনি সেই কৌশল সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি বস্তুতঃই কৃষ্ণের বিভিন্ন অংশ দর্শনে অবাক হয়েছিলেন। ষোল হাজার একশ’ আটটি প্রাসাদে প্রতিটি মহিষীর সঙ্গে কৃষ্ণের উপস্থিতিতে নারদমুনি আশ্চার্যান্বিত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ স্বয়ং প্রতিটি মহিষীর সঙ্গে বিভিন্ন রূপে এবং বিভিন্নভাবে লীলা প্রকাশ করেছিলেন। একরূপে তিনি তাঁর সন্তানদের সঙ্গে ক্রীড়ায় নিয়োজিত ছিলেন। যে রূপে ভগবান এই সমন্ত বিভিন্ন কার্যাবলী অনুষ্ঠানদ করেন তার নাম ‘বৈভব প্রকাশ’। সেই রকম কৃষ্ণ রূপের অসংখ্য অন্যান্য প্রকাশ রয়েছে এমনকি। তাঁরা অসংখ্যভাবে বিস্তারিত বা বিভক্ত হলেও সমস্ত রূপই এক, সম-জাতীয় ও অভিন্ন থাকে। কৃষ্ণের একরূপ ও অন্যরূপের সঙ্গে কোন প্রভেদ বা পার্থক্য নেই, এই হচ্ছে লীলাপুরুষোত্তম ভগবানের অদ্বয় প্রকৃতি।

শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, কৃষ্ণ ও বলরাম উভয়ে সমভিব্যাহারে গোকুল থেকে মথুরা যাত্রাকালীন অক্রুর যমুনায় জলে প্রবেশ করে, সেখানে সমগ্র বৈকুণ্ঠলোকের দর্শন করেন। তাছাড়াও ভগবদুপাসনারত চতুঃসন ও নারদমুনিসহ ভগবানকে বিষ্ণুরূপে তিনি দর্শন লাভ করেন, শ্রীমদ্ভাগবতে (১০/৪০/৭) উল্লেখ আছে যে,- ‘অন্যে সংস্কৃতাত্মানো বিধিনা ভিহিতেনতে। যজন্তি ত্বন্মায়াস্তাং বৈ বহুমূর্ত্ত্যকেমূত্তিকমৃ ॥’

বিভিন্ন পন্থায় শুদ্ধ ও নির্মল হওয়ার বিভিন্ন উপাসক রয়েছেন। যেমন বৈষ্ণব বা আর্য আপন আপন পারমার্থিক জ্ঞান ও বিশ্বাস অনুসারে পরমেশ্বরের উপাসনা করেন। শাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে ভগবানের বিভিন্ন রূপের জ্ঞান নিয়েই প্রত্যেকটি উপাসনার পন্থা রয়েছে। কিন্তু স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবানের উপাসনাই হচ্ছে অন্তিম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

বৈভব প্রকাশে ভগবান স্বয়ং বলরাম রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন। এই বলরাম রূপ স্বয়ং কৃষ্ণের রূপের মতই উত্তম। শুধু প্রভেদ এই যে, কৃষ্ণের দেহের রূপ কালো আর বলরামের গৌর বর্ণ। ঠিক এই জড় জগতে প্রবেশের সময় চতুর্ভুজ নারায়ণ রূপে তাঁর মাতৃদেবী দেবকীর সম্মুখে আবির্ভূত হওয়ার সময় কৃষ্ণ তাঁর বৈভব প্রকাশ রূপ প্রদর্শন করেছিলেন। কিন্তু পিতা-মাতার অনুরোধে তিনি আবার তাঁর দ্বিভুজ রূপ ধারণ করেন। এইভাবে কখনও তিনি চতুর্ভুজ কখনও বা দ্বিভুজ রূপ ধারণ করেন। বস্তুত ভগবানের রূপ হচ্ছে প্রাভব প্রকাশ। আর স্বয়ং রূপে কৃষ্ণ হচ্ছেন ঠিক একজন গোপবালক এবং নিজেকে কৃষ্ণ সেইভাবে মনে করেন, কিন্তু বাসুদেব রূপে তিনি নিজেকে ক্ষত্রিয় সন্তান বলে মনে করেন এবং একজন শাসক ও রাজন্যবর্গের ভূমিকা গ্রহণ করেন।

দ্বিভুজ নন্দনন্দন গোপালরূপে কৃষ্ণ তাঁর পূর্ণ ঐশ্বর্য, পূর্ণ রূপ, পূর্ণ সৌন্দর্য, শ্রী, আকর্ষণীয়তা ও তাঁর লীলাবিলাস প্রদর্শন করেন। বস্তুত কোন কোন বৈষ্ণব সাহিত্যে কৃষ্ণের বাসুদেব রূপকে বৃন্দাবনের গোবিন্দরূপে আকৃষ্ট হতে দেখা যায়। গোবিন্দরূপে ও বাসুদেবের রূপ এক ও অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও, এইভাবে বাসুদেব রূপে তিনি কখনও কখনও গোপবেশে গোবিন্দদের লীলা সুখ-ভোগে অভিলাষী হন। এই প্রসঙ্গে লতিত-মাধব (৪/১৯) চতুর্থ অধ্যায়ে কৃষ্ণ উদ্ভবকে বলেন, ‘প্রিয় বন্ধু! গোপবালক গোবিন্দরূপ আমার খুবই আকর্ষণীয়। বস্তুত গোবিন্দের রূপে মুগ্ধ আমিও ব্রজবাসী হতে চাই।’ এইরকম আবার অষ্টম অধ্যায়ে কৃষ্ণ বলেন, ‘কি অপরূপ এই ব্যক্তি। ইনি কে? তাঁর দর্শনে আমি বিমোহিত। ঠিক রাধিকার মত আমিও তাঁকে এখন আলিঙ্গন করতে ইচ্ছুক।’

তা’ছাড়া ঈষৎ ভিন্ন কৃষ্ণের আরও রূপ রয়েছে। তাঁরা হচ্ছে তদেকাত্ম রূপ। এই তদেকাত্ম রূপ বিলাস ও স্বাংশরূপে বিভক্ত। তারা আবার প্রাভব ও বৈভবরূপে বিভক্ত। বিলাসরূপ সম্বন্ধে বলা যায় অসংখ্য প্রাভব ও বিলাসরূপ দ্বারা কৃষ্ণ স্বয়ং বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যু এবং অনিরুদ্ধরূপে নিজেকে প্রকাশ করেন।

কখনও কখনও ভগবান স্বয়ং নিজেকে গোপবালক অভিমান করেন, কখনও কখনও ক্ষত্রিয় রাজপুত্র বসুদেব সন্তানরূপে নিজেকে অভিমান করেন। কৃষ্ণের এই মনোভাবকে তাঁর লীলা বলা হয়। বস্তুত তাঁর প্রাভব বিলাস ও বৈভব প্রকাশ একইরূপ, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তিনি কখনও বলরাম, কখনও কৃষ্ণরূপে আবির্ভূত হন বা নিজেকে প্রকাশ করেন। তাঁর বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যু, অনিরুদ্ধ অংশগুলো হচ্ছে, আদি চতুর্ভুজরূপ।

বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন ধামে ভগবানের অসংখ্য চতুর্ভুজ রূপ রয়েছে। দ্বারকায় ও মথুরায় নিত্যকাল তাঁরা বিরাজমান। বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যু এবং অনিরুদ্ধ এই চার প্রধান চতুর্ভুজ থেকে চব্বিশটি প্রধান বৈভব বিলাস নামক রূপ প্রকাশিত। চতুর্ভুজ ভগবানের হাতে শঙ্খ, গদা, পদ্ম ও চক্রের অবস্থান অনুযায়ী তাঁদের বিভিন্ন নাম আছে। পরব্যোমের প্রতি ধামে কৃষ্ণের এই প্রধান চারি রূপ দেখা যায়, ধামগুলো নারায়ণরূপে প্রকাশিত। প্রত্যেক নারায়ণ রূপ থেকে বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যু ও অনিরুদ্ধ রূপ প্রকাশিত হয়। এইভাবে নারায়ণকে কেন্দ্র করে বাসুুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যু ও অনিরুদ্ধ বৃত্তাকারে এই চতুঃরূপে অবস্থান করেন। এই চারি রূপ আবার প্রত্যেক তিন অংশে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের বিভিন্ন নাম রয়েছে। প্রথম অংশের নাম কেশব। তাঁদের হাতে শঙ্খ, গদা, পদ্ম ও চক্রের অবস্থান অনুযায়ী তাঁদের বার জনের বারটি বিভিন্ন নাম রয়েছে।

বাসুদেব রূপ সম্বন্ধে বলা যায় তাঁর তিনটি অংশ প্রকাশের নাম হচ্ছে কেশব, নারায়ণ এবং মাধব। সঙ্কর্ষণের তিনটি অংশ প্রকাশের নাম হচ্ছে গোবিন্দ, বিষ্ণু এবং শ্রীমধুসূদন। এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে এই গোবিন্দ আর বৃন্দাবনে নন্দনন্দন গোবিন্দরূপ এক নয়। সেইরকম প্রদ্যু তিন অংশে বিস্তারিত। তাদের নাম ক্রিবিক্রম, বামন এবং শ্রীধর। আর অনিরুদ্ধের তিন অংশ প্রকাশের নাম হচ্ছে হৃষীকেশ, পদ্মাভ এবং দামোদর।

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য

সত্য এক, আমরা দেখি বহু। তাই বার বার প্রশ্ন এসে যায় সত্য কি, কার সত্য, কোন সত্য। কে, কোথায় কিভাবে, কখন এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে।

সত্য শাশ্বত-সত্য জাগতিক। আংশিক সত্য নয়, সত্যের ছায়া। সামগ্রীক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সঠিক চিত্র পাওয়া যায়। আংশিক দেখা দিয়ে কখনও সঠিক বিচার করা যায়না। আংশিক দেখায় সঠিক চিত্র উঠে আসেনা। কাজেই আংশিক দেখায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়না। আংশিক আপাতগ্রাহ্য, সার্বজনীন নয়, সর্বসময়ের নয়। ব্যক্তিক হতে পারে, সাময়িক হতে পারে। সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পাওয়া যায় মর্মকথা। আয়নার পারদ যেমন ছবি দৃশ্যমান করে তুলে-ইন্দ্রিয়সমূহের সীমাবদ্ধতাও তেমনি জাগতিক সত্যকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে তুলে। দৃশ্যমান জগৎ পরম সত্যের ঘনীভূত রূপ। বাতাস ঘনীভূত হয়ে যেমন দৃশ্যমান হয়, ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য হয় তেমনি। আলো হালকা মাধ্যম থেকে যখন ঘন মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন আমাদের জাগতিক দৃষ্টিতে বাকা প্রতিয়মান হয় তেমনি চেতনার আলো যখন ঘন মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তা বাঁকা ভাবেই প্রকাশিত হয়। যার ফলে বহু রূপকের মাধ্যমে সত্যে পৌঁছুতে হয় ক্রম উর্ধায়মান পরিবর্তন বিবর্তন রূপান্তরের মাধ্যমে। অনুভুতি দিয়ে যার যাত্রা শুরু। এখানেও দয়াল হানিফ শাহ বলেন-“অনুভুতির উর্ধ্বে না গেলে চেতনা হবেনা।”  “ আমি সত্য না হলে আমার গুরু সত্য হয় কি করে?”

তাই বলছি ব্যক্তি নিজের সত্যে যতটুকু প্রতিষ্ঠত হতে পারবে – সমাজে ততটুকু সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। নিজের সত্য উপলব্ধি না হলে তার দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। জীবনের লক্ষ্য একটাই হয়, জীবন চলার পথের লক্ষ্য বহু। যিনি সত্যকে জীবনের লক্ষ্য হিসাবে নিয়েছেন তার জন্যই সত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। দয়াল হানিফ শাহ বলেন- “সিদ্ধান্তে যে অটল তার পক্ষে কোন কিছুই অসম্ভব নয়”। জীবন চলার পথের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত করে করেই জীবনের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। জীবন চলার পথের লক্ষ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত না হলে নিজেকে একটা বাহ্যিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে রাখা যায়না। বাহ্যিক দেহের জন্য একটা বাহ্যিক ভিত্তিও প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। দুই দিকে সমন্বয় করে চলতে পারাই কৃতিতে¦র। তার মধ্যেই রয়েছে সৌন্দর্য, তার মধ্যেই রয়েছে সার্বিক কল্যান। একদিক নিয়ে চলা শিকড় বিহীন গাছের মত- যে কোন সময় উল্টে যেতে পারে। একটা মজবুত বেদীর উপর দাঁড় করাতে হয় নিজেকে – ভিতরে এবং বাহিরে। একটা মজবুত প্রতিষ্ঠানের উপর দাঁড় করাতে হয় নিজেকে। জাগতিক যুদ্ধে না হয় টিকে থাকা কঠিন হয়। সাবধানের মার নেই, সচেতনতারও মার নেই। আল্লাহ্ সাবধানীদের সঙ্গে থাকেন।

যেকোন জিনিসের একটা শুরু থাকে । সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন – “যার শুরু ভালো তার সব ভালো”, আবার তিনি বললেন “যার মাঝ ভালো তার সব ভালো”, এরপর তিনি বললেন “যার শেষ ভালো তার সব ভালো”। আমরা সাধারণত শেষ কথাটিই বলে থাকি ‘যার শেষ ভালো তার সব ভালো”। কিন্তু সাধক এখানে ইঙ্গিত দিলেন, শেষ ভালো করার জন্য শুরু থেকেই ভালো কাজটি করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত থাকতে হয় বিশ্বস্ত। সত্য থেকে যার যাত্রা শুরু হয়েছে, তিনি যেখানেই অবস্থান করেন না কেন, পথ পরিক্রমার সর্বক্ষেত্রেই তার অবস্থান ভালো। তিনি সর্বদা বর্তমানে আছেন। কেননা এক লক্ষ্য স্থির করে যিনি কাজ শুরু করেন তিনি তার শেষ দেখে তবেই ছাড়েন। মাঝ কিংবা শেষ সবই তার সত্য। (চলবে)

পথ চলা বন্ধ হয় না

পৃথিবীর অগণিত মানুষ নাম জপ করে। শ্রীগুরু-প্রদর্শিত পথে জপ-ধ্যান করা অবশ্যই কর্তব্য। অনেকে দীক্ষা গ্রহণ করে প্রত্যহ নির্দিষ্ট সংখ্যক জপ করে ভাবেন-যথেষ্ট। বিভিন্ন শাস্ত্রে নিজকে চৈতন্যময় করবার নানাবিধ সাধন আছে। আমরা চোখ বুজে ধ্যান-জপ করি আর চারিদিকে অন্ধকার দেখি। কখনো নিজের মাঝে হতাশ ভাবও আসে। তাই শ্রীগুরুর কাছ থেকে চৈতন্যশীল হওয়ার প্রক্রিয়া জেনে নিয়ে সাধন করলে জপ-ধ্যানের আস্বাদ পাওয়া যায়। শব্দের বারবার উচ্চারণে ও জপে একপ্রকার উপলব্ধি হয়। জপ করতে করতে জাপকের সামনে তার লক্ষ্যের আবির্ভাব হয়।

জপ হচ্ছে বর্ণের সমষ্টি। বর্ণের সমষ্টি হচ্ছে পদ। যে-পদের শক্তি থাকে, তাই সার্থক, নইলে শক্তিহীন পদ নিরর্থক। এই শক্তিজ্ঞান শ্রীগুরুর নিকট হতে লাভ হয়। এই শক্তিজ্ঞান লাভ হলে, তখন উচ্চারণ করলে সেই জ্ঞানের স্মরণ হয়। প্রতিপাদ্য বস্তুর জাগরণও ঘটে। এরই নাম চৈতন্য সাধন। প্রতিপাদ্য বস্তু গুরুর কাছ থেকে শুনতে হয়। কিন্তু একবার শুনলেই যে বোঝা যায়, তা নয়, কারণ সাধারণতঃ আমাদের বুদ্ধি মলিন। সেইজন্য পুনঃপুনঃ স্মরণ অভ্যাস করতে হয়।

শ্রীগুরুরা সচরাচর উপদেশ দ্বারা শিষ্য ও ভক্তগণের ভেতরে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বীজ বপন করেন। বিভিন্ন ধর্মীয় দর্শন মতে সমুদয় জগৎ নাম-রূপাত্মক। ব্যক্তি মানুষের চিত্তমধ্যে এমন একটি তরঙ্গ থাকতে পারে না, যা নাম-রূপাত্মক নয়। প্রকৃতি সর্বত্র এক নিয়মে নির্মিত হয় বলেই এই নাম-রূপাত্মকতা সমুদয় জগতের নিয়ম। এ দেহ-ভান্ডকে জানতে পারলে বিশ্বব্রহ্মান্ডকে জানতে পারা যায়। রূপ বস্তুর বাহ্যিক স্বরূপ আর নাম বা ভাব তার অন্তর্নিহিত শস্যস্বরূপ। দেহ-রূপ আর অন্তঃকরণ-নাম, আর বাক্শক্তিযুক্ত প্রাণিসমূহে এই নামের সাথে তাদের ব্যষ্টি চিত্তে চিন্তা-তরঙ্গগুলো উত্থিত হয়ে প্রথমে শব্দ, পরে তদপেক্ষা স্থূলতর আকার ধারণ করে।

প্রথমে নাম, পরে রূপাকারে জগৎ রূপে অভিব্যক্ত। ব্যক্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎই রূপ। এর পশ্চাতে অনস্থ অব্যক্ত শব্দ রয়েছে। সমুদয় জগতের অভিব্যক্তির কারণ শব্দজগৎ। সমুদয় নাম অর্থাৎ ভাবের নিত্য-সমবায়ী উপাদান-স্বরূপ নিত্য শব্দজগৎই সেই শক্তি, যা এই জগৎ সৃজন করে। কোনরূপ বিশ্লেষণ বলেই যখন ব্যক্তি ভাব হতে শব্দকে পৃথক করতে পারেন না, তখন নিত্য-শব্দজগতের মধ্যে নিত্যসম্বন্ধ বর্তমান। সমুদয় নামরূপের জনকস্বরূপ পবিত্রতম শব্দ হতে জগৎ সৃষ্ট হয়েছে। শব্দ ও ভাব নিত্যসম্বন্ধ একটি ভাবের বাচক অনন্ত শব্দ থাকতে পারে, সুতরাং সমুদয় জগতের অভিব্যক্তির কারণ স্বরূপ ভাবের বাচক যে একটিমাত্র শব্দই তার কোন অর্থ নেই। শব্দজগৎ সমুদয় ভাবের উপাদান অথচ কোন পূর্ণ বিকশিত ভাব নয়; অর্থাৎ বিভিন্ন ভাবগুলোর মধ্যে পরস্পর যে প্রভেদ তা যখন দূর করে দেয়া হয়, তখন এই শব্দই অবশিষ্ট থাকবে। আর যখন, যে কোন বাচক শব্দ দ্বারা অব্যক্ত শব্দজগৎকে প্রকাশ করতে হলে তাকে এতদূর আবিষ্ট করে ফেলে যে তাতে আর শব্দজগৎ থাকে না, তখন যে শব্দ দ্বারা উহা খুব অল্প পরিমাণে বিশেষভাবাপন্ন হয় আর যারা যথাসম্ভব উহার স্বরূপ প্রকাশ করে, তাই তার সর্বাপেক্ষা প্রকৃত বাচক ‘অ’ সমুদয় শব্দের ভিতর সর্ব্বাপেক্ষা অল্প বিশেষ ভাবাপন্ন। এই ‘আমি অক্ষরের মধ্যে আকার।’ আর সমুদয় স্পষ্টোচ্চারিত শব্দই মুখগহব্বরের মধ্যে জিহ্বামূল হতে আরম্ভ করে স্পর্শ করে উচ্চারিত হয়। ‘অ’ কণ্ঠ হতে উচ্চারিত, ‘ম’ শেষ ওষ্ঠ শব্দ।

আধ্যাত্মিক জীবন আরম্ভ করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিচার-নিজের বিচার। যতই বিচারশক্তি বাড়বে ততই ক্ষণস্থায়ী জাগতিক বস্তু থেকে তৃষ্ণা দূর হবে এবং অনন্ত চিরস্থায়ী দৈবসম্পদের প্রতি আকর্ষণ বাড়বে।

নিজের কার্যাবলী বিচার করে মানুষ যে সব বস্তুকে সবচেয়ে ভাল বলে চিন্তা করে তা হচ্ছে-অর্থ, যশ ও সুখানুভুতি। এর মধ্যে শেষটির পরিণাম ঘটে তৃপ্তিতে ও অনুতাপে; অপর দুটি কখনও তৃপ্ত হয় না। ব্যক্তি যত পায় ততই তার তৃষ্ণা বেড়ে যায়। যশোলিপ্সা অপরের মতামত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে ব্যক্তিকে বাধ্য করে। কোন বস্তুর প্রতি আকর্ষণ না থাকলে তা নিয়ে কোন ঝগড়া হবে না, তা ধ্বংস হলে দুঃখ হবে না, কারো থাকলে ঈর্ষাও হবে না-এককথায় অন্তরে কোন চাঞ্চল্য উঠবে না। বস্তুর প্রতি আসক্তিবশতঃ নিজের দোষগুলো জাত হয়। চিরস্থায়ী বস্তুর প্রতি আকর্ষণ চিত্তে আনন্দ আনে আর এ আনন্দ দুঃখহীন। সুতরাং সর্বশক্তি দিয়ে ব্যক্তির এই আনন্দকে কামনা করতে হয় এবং খুঁজতে হয়।

মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জীবনের চির-চঞ্চলতার মধ্যে শাশ্বত সুখ লাভ করা। এই শাশ্বত সুখ হচ্ছে লক্ষ্যভিত্তিক-আনন্দ। চেতনায় মগ্ন হওয়া হচ্ছে অন্তর রাজ্যে প্রবেশ।

জীবনের উদ্দেশ্য লক্ষ্য-লাভ এবং জাগতিক ভোগসুখ ক্ষণস্থায়ী-এ ধারণা অনেকের আছে। হৃদয় কিন্তু এতে সাড়া দেয় না কারণ ভোগ্যবিষয়ে সুখ খোঁজা ব্যক্তির অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। লক্ষ্যভিত্তিক-আনন্দ খুঁজবার জন্য ব্যক্তির নুতন অভ্যাস সৃষ্টি করতে হয়। লক্ষ্যকে পরিপূর্ণ জানবার জন্য ব্যক্তিকে ঘন ঘন একটানা চিন্তা করতে হয়; আর যখন তার প্রতি ভালবাসা আসবে তখন চিত্ত ক্রমাগত তার কথাই ভাববে। হৃদয় আপ্লুত হবে লক্ষ্যভিত্তিক-আনন্দ ও সম্পদ অর্জনে।

লক্ষ্যভিত্তিক-চিন্তায় নিজকে নিবদ্ধ করতে শিখতে হয়। জীবনে দুর্বলতা ফুটে উঠুক, বিস্মৃতি আসুক-কিছুই এসে যায় না; শেষে লক্ষ্যে পৌঁছাতে অধ্যাত্ম সংগ্রামে নিয়োজিত থাকতে হয়। শিশু যখন হাঁটতে শেখে, সে ক্রমাগত পড়তে থাকে। সে যে কোনদিন হাঁটতে পারবে-সেটা অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। কিন্তু সে নিজেকে বার বার ঠেলে তোলে, কারণ তার ভেতরে রয়েছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা। আর শেষে সে না টলে সোজা হেঁটে চলে। ঠিক তেমনি অধ্যাত্ম জীবনে দৃঢ় প্রত্যয়ী হলে নিষ্ফলতা আসে না। লক্ষ্যই জীবনের যথাসর্বস্ব-এ দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে কখনই পথচলা বন্ধ হয় না। চোখ শরীরের আলোকবর্তিকা। দৃষ্টি একাগ্র ও স্বচ্ছ হলে সারা শরীর দীপ্তিমান হয়ে উঠে।

সংসারে সবাই চলছে!

সত্যমানুষ তাঁর অনুসারীদের বলেন, তোমরা পবিত্র কুরআনের বিধান মেনে চলবে। এই মহাগ্রন্থ যা কিছু করতে বলেছে তা করবে এবং যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছে তা থেকে বিরত থাকবে।  আল্লাহর বিধানের উল্টো চলা অবস্থায় কেউ তোমার প্রশংসা করে তাহলে সেই ধোঁকায় পা দিও না। সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী প্রতিটি মানুষ প্রশংসা শুনলে খুশি হয় এবং সমালোচনা শুনলে কষ্ট পায়। সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিরা মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তির অপব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নেয়। তারা একজন মানুষের যে ভালো গুণগুলো নেই তাকে সেসব গুণে ভূষিত করে তার অন্তরে স্থান করে নেয় এবং এরপর নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে। দুষ্টু লোকের এই ধোঁকাবাজি থেকে রক্ষা পাওয়া মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ।

সত্যমানুষ আরো বলেন, আমি তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি। এখন সে হয় কৃতজ্ঞ,না হয় অকৃতজ্ঞ হবে। অর্থাৎ মানুষকে পথ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে বলে সে হয় সুপথ বেছে নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে অথবা অকৃতজ্ঞ ও আল্লাহর বিধি-বিধানের বিষয়ে বিদ্রোহী হয়ে এর পরিণতি ভোগ করবে।

মানুষের অপরাধ ক্ষমা করা শ্রেয়। যতক্ষণ না ক্ষমাগুণের অধিকারী হতে পারা যায় ততক্ষণ সত্যমানুষ হওয়ার পথের যাত্রীরা হৃদয়ের পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করতে পারে না। তাদের জন্য ক্ষমাগুণের অভ্যাস একান্ত প্রয়োজন। দয়া, বন্ধুত্বস্থাপন ও ক্ষমা করতে হবে। ক্ষমার উপদেশ সব শাস্ত্রেও আছে।

সত্যমানুষ বলেন, নিজের জীবনে অপরের দ্বারা উৎপীড়িত হওয়া সত্ত্বেও কখনও তাদের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ কোরো না।। তাদের আর্শীবাদ করো যাতে আর অমঙ্গলময় কাজ না করে। মানুষের অজ্ঞানজনিত কর্মকে ক্ষমা করতে হয় কারণ তারা জানে না যে তারা কি করছে বা করেছে।

আধ্যাত্মিকতার জীবনে ক্ষমা অভ্যাসে পরিণত করতে হয়। কোন মানুষ নির্বোধের মতো হয়ে ক্ষতি করলে প্রতিদানে তাকে বিদ্বেষহীন ভালবাসায় কাছে টানতে হয়। সে যত ক্ষতি করবে তত শুভেচ্ছা জানানো শ্রেয়। হৃদয় থেকে অপকারেচ্ছা মুছে ফেলতে হয়; এমন কি শত্রুর প্রতিও বিদ্বেষভাব রাখা ঠিক না। সকলকে প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ করতে হয়। ক্ষমাগুণ না থাকলে এবং অন্তরে ক্রোধ ও বিদ্বেষ থাকলে তবে তা যেমন নিজের যন্ত্রণার কারণ অপরের জন্যও তেমন। সেজন্য বিপরীত ভাবনার উপদেশ মানা ভালো যাতে মানুষ বিশ্বের সঙ্গে সমভাবে শান্তি উপভোগ করতে পারে।

অধিকাংশ ব্যক্তির পক্ষে ক্ষমা অভ্যাস কঠিন । কারণ যখন কেউ কারোর প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হয় তখন ওই তরঙ্গে আহত হয়ে নিজের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়। বেশী আঘাত লাগে অহংকারে। ক্ষমা মস্থ বড় গুণ। মানুষের দোষ ক্ষমা করতে পারলে অহংকারের গন্ডি অতিক্রম করা যায়।

ত্যাগ  মানুষকে শান্তি দেবার জন্য। গৃহস্থদেরও দরকার ছোট ছোট ত্যাগ করা। ধনীরা যখন কোন কারণে এক হাজার টাকা দেয় তাতে ওদের যায়-আসে না। অনেক অর্থের মধ্যে কিছুটা দেয়। আবার গরীবরা যখন এক টাকা করে এক হাজার মানুষ দেয়, সেটার মূল্য অনেক বেশী এবং ভীষণ শক্তিশালী।

আধ্যাত্মিক নারী-পুরুষের স্বভাব আধ্যাত্মিকতার উপদেশ বিলি করা। পূর্ণ বিশ্বাস । এই বিশ্বাসই একদিন ব্যক্তিকে ঠিক পথ নিজেই দেখিয়ে দেয়। সত্যমানুষকূল কিছু সত্যমানুষ মানুষ তৈরী করে যান। দেখা আর পথই তাদের সম্বল।

সব শাস্ত্রীয় ধর্মের ধর্মবেত্তাগণ বিশ্বের সর্বত্র মোসাহেবি ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি চালু করে চলেছেন। এ কারণে সাধারণ মানুষ প্রশংসা শুনলে খুশি এবং সমালোচনা শুনলে ক্ষুব্ধ হয়। এই অপসংস্কৃতি দূর করার লক্ষ্যে সত্যমানুষ তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ করে বলেন: সমাজের সকল লোক তোমাকে ভর্ৎসনা করলে দুঃখ পেও না এবং সবাই মিলে অনর্থক তোমার প্রশংসা করলে তাতেও খুশি হওয়ার কিছু নেই।