ধারাবাহিক

নিজের কথা- ৩১

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ।।

“কাম করে গপ করা ভালা” অমৃতকথাটি বলেন,সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। শ্রমের মর্যাদা দিতে পারলে জীবনের উন্নতি নিশ্চিত ভাবে লাভ করা যায়। অন্যথায় জীবন চলার পথে ব্যক্তি গতানুগতিক জীবন যাপন করে থাকে। সূফী সাধক আগ্রহী অনুসারীবৃন্দের উন্নত জীবন যাপন করার ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা দেন আলোচ্য বাণীতে। বাণীর প্রথম শব্দ “কাম” । এ “কাম” শব্দটির অর্থ – কাজ করা। জীবন একটা চলমান সত্ত্বা। এ চলমান সত্ত্বাকে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে কাজ করার বিকল্প কিছু নেই। কারণ স্রষ্টার নিকট থেকে এ পৃথিবীতে আমরা সবাই আগমন করেছি। এ পৃথিবী থেকে আমরা সবাই একদিন প্রস্থান করব। প্রস্থান কালে আমাদের অবলম্বন অন্য কিছুই থাকবে না কেবলমাত্র আমাদের কৃতকর্মের হালনাগাদ ফিরিস্তি। স্রষ্টা আমাদেরকে শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছেন। তাই আমরা শ্রমের মর্যাদা দিতে পারলে জীবনের উন্নতি হবে। আমাদের জীবনের উন্নতি বলতে বুঝায় আমরা কতটা স্রষ্টার কৃপায় তাঁর বিধিমালা অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারি। একমাত্র সফল ব্যক্তিরা উন্নত জীবন যাপন করতে পারেন। আর তাঁরাই সফল ব্যক্তি যারা জীবনে শ্রমের মর্যাদা দিতে পারেন। কিভাবে শ্রমের মর্যাদা দিতে পারি? কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জন ব্যতীত ঐ কর্ম সম্পাদনের সময়ানুবর্তীতা স্থান উপযোগিতা বিষয়ে কে তাগিদ দেবে আমার জানা নেই। এমতাবস্থায় কিভাবে শ্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারা যাবে। যে ব্যাক্তি চা খাওয়া পছন্দ করেন, কিন্তু তা কিভাবে তৈরি করা যায় তা জানেনা। পৃথিবীর অন্য কেউ কি তার পছন্দের চা তৈরি করে খাওয়াতে পারবে? সেই ব্যক্তি পারবে যে সেই মত চা বানানোর জন্য পরিমিত জ্ঞানার্জন করেছেন। এ জন্যই শান্তিময় জীবনযাপন করার জন্য জ্ঞানার্জন অপরিহার্য শর্ত ধরা হয়। জ্ঞানার্জন কি? জীবন ভোর অন্যের বানানো চা পান করে গেলাম। সে চা এর মজাদার স্বাদের অনুভূতিও ধরে রাখলাম, এটা ঐ চা বানানো ব্যক্তির জ্ঞানার্জন হলেও সে চা ভোগকারী ব্যাক্তির জ্ঞানার্জনের কোনো বিষয় নয়। যতদিন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি তার পছন্দের কোন বিষয় যতবার ইচ্ছা তৈরি করার অভিজ্ঞতা অর্জন না করবে ততদিন পর্যন্ত সে ব্যক্তি সে বিষয়ে জ্ঞানার্জনের কোনো সুযোগ পেতে পারে না। কিন্তু আফসোস আমাদের জীবনের পরনির্ভরশীলতা এতোই বেশি যে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পরনির্ভরশীল জীবন যাপন করে থাকি। বিপুল পরিমাণ অজ্ঞতার কারণেই কর্মে একদিকে যেমন আত্মবল অনুভব করি না অন্যদিকে সঠিক সময়ে সঠিক কর্ম সম্পাদন করতে পারি না। কিন্তু প্রকৃতির সকল জীবজগতের দিকে তাকিয়ে দেখল দেখা তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনের জীবিকা বাসস্থান পরিবার প্রতিপালন স্বাস্থ্য সচেতনতা বিনোদন এ সকল কর্মের কোন বিষয়েই অন্যের উপর নির্ভরশীল না থেকে প্রত্যেক বিষয়ে অত্যন্ত সচেতনভাবে নানান প্রতিকূল পরিবেশে মোকাবেলা করে নিজেরাই নিজেদের জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান দিয়ে থাকে। এদের জীবন যাপন কার্যক্রমের মাঝে কাম ফেলে গপ করে চলার কোনো অবকাশ দেখা যায় না। স্রষ্টা মানুষ সম্পর্কে তার বাণীতে মন্তব্য করেন, “আমি মানুষকে কতইনা চমকপ্রদভাবে সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তারা সৌন্দর্যের অবস্থানে না থেকে অধঃপতনের অতল তলে নিপতিত হলো।” স্রষ্টা সূক্ষ্মভাবে কর্মীদের কর্মফল দিয়ে থাকেন। কর্ম নির্ভর করে ব্যাক্তির আন্তরিকতার উপর। আন্তরিকতা বাহ্যিক লোক দেখানো কোন বিষয় নয়। আমাদের শরীর অন্য কিছুই পড়তে পারে না। আমরা চিন্তাশক্তির মাধ্যমে যা কিছু করতে চাই,তাই করার জন্য সাধ্যমতো আমাদের শরীর আমাদের সহযোগিতা করে থাকে। আমাদের নবীজি বলেন,” মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী কর্ম করে এবং কর্মফল পেয়ে থাকে।” কর্ম ফলপ্রসূ করার জন্য দরকার কর্ম বিষয়ক জ্ঞানার্জন করা অপরিহার্য শর্ত। কর্ম বিষয়ক জ্ঞানার্জন করা না হলে অন্যকে নকল করে মানুষ কর্ম করে থাকে। নকল করা কর্ম থেকে জ্ঞানার্জন করা কর্মের আনন্দ পাওয়া সম্ভবপর হয়না। শান্তি আসে নির্ভুল কর্ম করার উপযোগী জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে। তাই শান্তির জীবন যাপন জ্ঞানার্জনের উপর। জ্ঞানার্জন ব্যতীত মানুষ থাকে অন্ধ। আর অন্ধদের অন্যের উপর নির্ভর করে জীবন যাপন করতে হয়। তারা স্বাধীন জীবন যাপন করার আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে। জ্ঞানার্জন ব্যতীত কেহ নিজেকে ইসলামের অনুসারী বলে পরিচিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে তা বিবেকবানদের মুল্যায়য়ণ করার এখনই যথাযথ সময়।

‘দয়ালের উপদেশ – ২৭

উপদেশ-৯৬: দান গ্রহণ করা উচিত নয়। দান গ্রহণ করলে দাতার পাপরাশি গ্রহণ করতে হয়। কারও কাছে কিছু চাইলেই নিজে ছোট হতে হয়, মন সংকীর্ণ হয়ে যায়।

সৎপথে থেকে, অর্থ উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা উচিত, তাতে মন দুর্বল হয় না- পবিত্র থাকে। দেখ! নিজের উপার্জিত অর্থের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে যদি সাধন-ভজন করিস, তবে তার শরিক আর কেউ হয় না, কোন পাপও এসে এই সাধন-ভজনের ক্ষতি করতে পারে না।

দয়াল প্রত্যেককেই হাত-পা দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। নিজের জীবিকা অর্জন করতে যে সময়টুকু যায়, তা বাদ দিয়ে বাকি সময়টুকুও সাধন-ভজন করলে, দয়ালকে প্রত্যক্ষ করা বাকি থাকবে না। পরগাছার মতো পরের উপর খাওয়া-পরা নির্ভর করা অত্যন্ত পাপ জানবি।

একটা কথা আছে, যদি দয়াল-প্রেমে এমনঅবস্থা হয় যে, খাওয়া-পরার খবর নেই, শীত-গ্রীষ্ম বোধ নেই, সে অবস্থায় দয়ালই তার জীবিকার উপায় করে দেন। যেমন ছোট শিশু, মা-বাপের উপর নির্ভর করে থাকে, তার কোন কিছুই করতে হয় না।

দান গ্রহণ করবার একমাত্র অধিকারী তিনি, যিনি এক হাতে গ্রহণ করে অন্য হাতে গরিব, দুঃখীদের বা সৎকাজে সমস্ত বিলিয়ে দেন। মনে একটু দ্বিধা হয় না ও নিজে ভোগ করেন না। যে দান গ্রহণ করে, কিন্তু দান করে না, সে অধম মানুষ। যিনি দান গ্রহণ করেন ও নিজে দান করেন তিনি মধ্যম মানুষ। আর যিনি শুধু দান করেন, দান গ্রহণ করেন না-তিনি উত্তম পুরুষ।

কেউ যদি কোন হেতু কারণ শূন্যভাবে তোকে কোন কিছু দেয়, আর তুই যদি এ জিনিসের কোন আকাক্সক্ষা না করে থাকিস, তবে মনে করবি ইহা দয়ালের দান। ইহা কৃতজ্ঞতার সাথে করলে ক্ষতি হয় না বরং গ্রহণ না করলে অন্যায় হয়।

উপদেশ-৯৭: মৃত্যু কিছুই নয়’রে মাত্র পঞ্চভৌতিক দেহটা ত্যাগ করা। কর্মফল বা সংস্কার অনুযায়ী সূক্ষ্মদেহ ধারণ ও স্থুল দেহ ত্যাগই মৃত্যু। সাপের ছলম বদলানোর মতো।

সুপারি শুকালে ছোলা হতে আলগা হয়ে থাকে। তেমনি প্রকৃত সাধকেরাও জীবিত থাকতেই এই পঞ্চভৌতিক দেহ হতে আলগা হবার অভ্যাস করে নেয়। ধ্যান-ধারণা দ্বারা যতই দেহাত্মবোধ কমতে থাকে, ততই ভিতরে একটি সূক্ষ্ম দেহ তৈরি হতে থাকে এবং স্থুল দেহ থেকে পৃথক হতে থাকে। মৃত্যুর সময়ে তাদের কোন কষ্ট হয় না, বরং আনন্দই হয়।

সাধারণ লোকের মৃত্যু ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। কাঁচা সুপারি খুলতে বেশ শক্তি লাগে। তেমনি সাধারণ লোকেরও শক্তি যখন শরীরের প্রতি অংশ হতে চলে আসে তখন ভীষণ যন্ত্রণা হয় এবং প্রায় লোকই শেষ সময়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সাধকদের প্রায় সব সময়ই পূর্ণ জ্ঞান থাকে।

দেখ, জীবিত থাকতে তোর দয়ালের সম্বন্ধে যতটুকু অনুভূতি হবে মৃত্যুর পরও ঠিক ততটুকুই থাকবে-একটুও কমবে না বা বাড়বে না। অনেকে বলে মৃত্যুর পর দয়ালকে পাবে। সে ভুল। দেখ! যার এখানে যতটুকু শান্তি-আনন্দ, সেখানেও ততটুকু – কম-বেশি নয়।

তোরা শুধু দয়ালকে চিন্তা কর, আপনি ধ্যান হবে, -ধ্যান গাঢ় হলে সমাধি হবে। সমাধি অবস্থায় ওই পঞ্চভৌতিক দেহ হতে বেশ কিছু আলগা হয়ে যায়। দেখ! মৃত্যু অভিশাপ নয়, -মৃত্যু দয়ালের অতি আদরের একটি দান। ওরে! ধ্যান, সমাধিতে যতই সূক্ষ্মতম দেশে যাবি, ততই ইচ্ছাশক্তি ও অনুভূতি বৃদ্ধি পাবে।

উপদেশ-৯৮: পঞ্চভৌতিক দেহ ত্যাগের অল্প কিছু পূর্বে, কর্মফল অনুযায়ী একটি সূক্ষ্ম দেহ তৈরি হতে থাকে। সমস্ত শক্তি পঞ্চভৌতিক দেহ হতে নিঃশেষিত হয়ে সেই সূক্ষ্ম দেহে যায়। জ্ঞান, বুদ্ধি, মন ও মনের সংস্কার সমস্তই সেই সূক্ষ্ম দেহে থাকে।

যদি একটি পাথরে দাগ দিস, তারপর সে পাথর ঘষা আরম্ভ করিস দেখবি, আস্তে আস্তে সমস্ত দাগই ক্রমে মুছে যাবে, যেটা গভীর সেই দাগটাই শেষ পর্যন্ত থাকে। সেই প্রকার মনে যতগুলো সংস্কারের দাগ জীবনে পড়ে সমস্তগুলোই মৃত্যু সময়ে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যায়। সেইগুলোর মধ্যে যে সংস্কারের দাগটি সবচেয়ে গভীর, শেষ পর্যন্ত একমাত্র সেই সংস্কার অনুযায়ীই চিন্তা আসবে। সে অনুযায়ীই সূক্ষ্ম দেহ তৈরি হবে ও গতি হবে।

যারা প্রকৃত সাধক তাদের মনে দয়ালের সংস্কারই গভীর হয়। মৃত্যু সময়ে তারা দয়ালের চিন্তা করতে করতে দয়ালের কাছে চলে যায়। বিষয়ী ও ভোগী লোকেরা মৃত্যু সময়েও বিষয় এবং ভোগের চিন্তাই করে। ফলও তেমনি হয়। দেখ! চিরজীবন দয়ালের চিন্তা না করলে মৃত্যু সময়ে তাঁর কথা মনে আসতে পারে না। মৃত্যুর সময়ে যখন সমস্ত ইন্দ্রিয় শিথিল হয়ে যায়, সাধকরা তখনও অন্তরে সেই দয়ালকে নিয়েই থাকেন।

মৃত্যু সাধারণ লোকের জন্য কষ্টকর হলেও সাধকদের জন্য আশীর্বাদ, -বিদেশ হতে বাড়ি যাওয়া।

মৃত্যু কেমন করে হয়? মৃত্যুর পর কি অবস্থা? এই নিয়ে মন অস্থির না করে, শুধু দয়ালকে চিন্তা কর, তাঁকে ভালোবাসতে শেখ তোদের কোন চিন্তাই করতে হবে না, দয়াল আছেন, ভয় কি? মৃত্যুর পর শান্তি হবে কি না হবে, সে সবের চিন্তা করবি কেন? দয়ালকে চিন্তা করলে-ভালোবাসলে তো নগদই শান্তি মিলে, বাকি খবরের কাজ কি?

দয়ালের উপদেশ

উপদেশ-৯৪: দেখ! এক একটা লোক লৌকিক বিদ্যায় কত শিক্ষিত হয়েছে, বেশ বড় বড় চাকরি করছে, কত টাকা উপার্জন করছে। তারা সূক্ষ্ম যুক্তি-তর্কে ‘হ্যাঁ’ কে ‘না’ করাতে পারে, ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ করাতে পারে। তাদের দাপটে অধীনস্ত কর্মচারীরাই শুধু নয়, সমাজের লোক পর্যন্ত তটস্থ।

এইসব সংসারাসক্ত বড়লোকগুলো যখন বাড়ির ভেতর যায়, তখন নারী বিশেষের হাসি দেখলে নিজকে কৃতার্থ মনে করে! আর মুখ মলিন দেখলে নিজকে পাপী মনে করে-অসহায় মনে করে। এসব লোকের নিঃস্ব অন্তঃকরণ ও বাইরের দাপট দেখে শক্তিমানেরা হাসে, আবার তাদের জন্য দুঃখও করে।

কেন এমন হয় জানিস? এসব লোকগুলো নিজকে উজাড় করে স্ত্রীর নিকট বিলিয়ে দিয়ে, নিঃস্ব হয়ে একেবারে ভেড়া বনে যায়। আবার বাইরের লোকের প্রতি তাদের দাপট কত?

দেখ! একমাত্র কামের সেবা করে এই ফল লাভ করেছে। তারা বলে ‘স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা-প্রেম।’ এ মূর্খের কথা। যেখানে খাঁটি ভালোবাসা-প্রেম, সেখানে মানুষ দুর্বল হয় না-সবল হয়, পরাধীন হয় না-স্বাধীন হয়। কেউ কেউ যুক্তি দেখায় ‘কয়েক বছর যাবৎ কামের সেবা করিনি।’ পূর্বে যে কামের সেবা করেছে, তার ফল কোথায় যাবে? কামের সেবার ফলে কয়েকটি ছেলে-মেয়ে তো হয়েছে। মনের যে ক্ষতি হয়েছে বা এখনও হচ্ছে তা পূরণ করবার চেষ্টা হয় কি? স্ত্রীর প্রতি এমন মোহ হয়েছে যে, দয়ালের প্রতি ভালোবাসা আসতেই পারছে না।

দয়ালের প্রতি মুখে মুখে কত ভালোবাসাই দেখাবে, যুক্তিতর্ক দিয়ে নিজেকে একজন ভক্ত ঠাওরাবে। ওরে! যে সব লোকদেরকে ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীর প্রতি মোহযুক্ত দেখবি অথচ নাকি কান্না কেঁদে নিজকে ভক্ত বলে জাহির করতে চায়, তাদের বিশ্বাস করবি কি প্রকারে?

গা ভেজেনি অথচ ম্লান করেছে, এ কেমন করে বিশ্বাস করা চলে। সংসারাসক্তি রয়েছে, স্ত্রী-ছেলেমেয়ের প্রতি বেশ আসক্তি রয়েছে। অথচ বেশ আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়েছে, একথা বললেই তো আর বিশ্বাস করা চলে না। কেউ আবার কোন কারণে বিরক্ত হয়ে দু’চার দিনের জন্য দূরে সরে যায় আবার কয়দিন পর আসে, এ মর্কট বৈরাগ্যে কি ফল হবে?

উপদেশ-৯৫:  দেখ! যেই ছেলে-মেয়ে-স্ত্রীর জন্য স্বার্থপর হয়ে অন্যের ক্ষতি করলি, মনে কষ্ট দিয়ে পাপ জমালি, মান-যশঃ খোয়ালি, সেই ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী কি তোর পাপের ভাগী হবে? তারাই পরে তোকে দোষী বলবে।

স্বার্থপর লোক কখনও সরল হতে পারে না। নিজের স্বার্থ করতে করতে, মধ্যে মধ্যে এমন অবস্থা হয় যে নাকানি-চুবানি খেয়ে জীবন যাওয়ার ব্যবস্থা হয়।

স্বার্থপরতায় মানুষ অন্ধ হয়ে পড়ে, হুঁশ থাকে না। মানুষ পিশাচ হয়ে যায়, মান-সম্মান সমস্ত কিছু নষ্ট হয়ে যায়। স্বার্থপর লোকের পক্ষে আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতি লাভ করা অসম্ভব। আর দেখ, স্বার্থপর লোক বুঝতে পারে না যে, সে নিজে একজন স্বার্থপর লোক, অন্য কেউ বুঝালেও সে তা বুঝতে চায় না। স্বার্থপর লোক জীবনে কখনও শান্তির মুখ দেখতে পায় না।

দেখ, সংসার করতে গেলে অনেক বিষয়ে সাবধান হতে হয়। অনেককে দেখা যায় ঋণ করে কাজ কারবার করে, এটি অত্যন্ত খারাপ। হঠাৎ মরে গিয়ে সেই ঋণের বোঝা থেকে যায়। মনে রাখবি, ঋণ করা মহাপাপ।

যদি তোর কাছে পাঁচ’শ টাকা থাকে তবে চার’শ টাকা দিয়ে জমি কিনে বা অন্য কাজ করতে পারিস। এক’শ টাকা হাতে থাকা চাই। অনেকে পাঁচশ টাকা থাকলে, হাজার টাকা দিয়ে ঋণ করে জমি কিনে বা কোন কাজ কারবার করে। এ অত্যন্ত খারাপ, এতে অনেক সময় মান-সম্মান নষ্ট হয়ে মনের শান্তি নষ্ট করে দেয়। তোর প্রতি লোকে যে সম্মান দেখায় মনে রাখবি ইহা দয়ালের দান। হেলায় সে দান নষ্ট করলে শেষে অনেক অনুতাপ করতে হবে। স্বার্থপর কখনও হতে নেই। স্বার্থপরের কখনও শান্তি হয় না, অনেক সময় বিশ্বাসঘাতক পর্যন্ত হয়ে পড়ে।

‘হাক্কানী দিবস’ প্রতীকী শপথের দিন, প্রতীকী সত্য দিবস

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সত্য শাশ্বত – চির বহমান, চির অম্লান। হাক্কানী দিবস সার্বজনীন। সত্য সবার জন্য। মহাকাল এসে মিলে গেলো একটি বিন্দুতে। আকাশের বুকে গ্রহ নক্ষত্র আছে বলেই আকাশ এত সুন্দর। ফুল আছে বলেই প্রকৃতির রাজ্য এত মনোরম। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আছে বলে সমুদ্র রূপময়। বিশ্ব চরাচর সত্যমানুষের রূপের ছটায় মুগ্ধ, ধন্য। তাঁদের স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ত্রিভূবন আলোকিত। সে জ্যোতি দৃষ্টিকে ঝলসে দেয় না বরং আকর্ষণ করে। তাঁরা তাঁদের স্বর্গীয় প্রভায় পৃথিবীর শ্রীহীন মানুষের দীনতা দূর করেন। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে। অজ্ঞ মানুষ তা বুঝতেও পারেনা। মানুষের কল্যাণে সত্যের নিবিড় সাধনায় যাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেন – সাধারণ মানুষের সাধ্য কি তাদের মহিমা বুঝতে পারা? যাদের অঙ্গুলী হেলনে বিশ্ব প্রকৃতি, দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি নতুন রূপ লাভ করে। সেই ঊর্ধ্ব লোকাচারী মানুষ সাধারণের জানার সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা মুক্তমানুষ, সত্যমানুষ, সত্যের আকাশে এক একটি ধ্রুবতারা। সমাজ সংস্কারের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ নিজস্ব সৃষ্টি শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করছে। সংস্কারের কালোমেঘ তাদের জীবনকে তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। জীবনের নানান সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে খুঁজে খুঁজে ব্যাকুল একটা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। তাদের ত্রাণকর্তারূপে যুগে যুগে আগমন ঘটে কালজয়ী মহাপুঁরুষদের। মানুষের অসহায়ত্ব তাঁদের কষ্ট দেয়। তাঁদের হৃদয় কাঁদে নিভৃতে ।

সত্যমানুষের হাত ধরে আবির্ভাব হয়েছিল বাঙালির জাতিসত্তার। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে বাঙালি জাতিসত্তার বীজ রোপিত হয় সত্যমানুষের মাধ্যমে। সেই থেকে আজ অবদি চলমান রয়েছে এই পথ। তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতি সত্যমানুষদের দেখানো শান্তি ও সত্যের পথ ধরে চলে এসেছে কিন্তু এমন ঐতিহ্যের  অধিকারী এই জাতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বহি:শত্রুর আক্রমনে নির্যাতিত হতে হতে নিজ জাতিসত্তার সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ হারিয়ে ফেলতে বসেছে। নানান দেশ হতে আগত ঔপনিবেশিক ধর্ম ও সংস্কৃতি বাঙালির চির শাশ^ত ও সৌন্দর্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির মাঝে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছে স্বধর্ম ও সংস্কৃতি। মিশ্র ধর্ম ও সংস্কৃতির যাতাকলে পড়ে যেন ভুলে যেতে বসেছে জাতিসত্তার আসল রূপ, আপন সত্তার আসল সত্য।

বাঙালির জাতিসত্তার আসল রূপ পুনরুদ্ধারে যুগে যুগে এই মাটিতে আগমন করেছেন সত্য ও শান্তির দিশারী সত্যমানুষ সূফী সাধকগণ। সত্যমানুষ সূফী সাধকদের আবির্ভাবের ফলে বাঙালি আপন সত্য ও সৌন্দর্যের সাথে পুনঃসংযোগ করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সত্য ও সৌন্দর্যের সংযোগ সূত্র যখনই ভুলতে বসেছে বাঙালি তখনই আবির্ভাব ঘটেছে সত্যমানুষদের অর্থাৎ সূফী সাধকদের। একেক জন সাধক একেক প্রক্রিয়ায় সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ প্রকাশ করেছেন এই জাতির মাঝে। আজও প্রকাশ করে চলছেন এই জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য। সত্যমানুষ সূফী সাধকদের আবির্ভাবের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতির মুক্তি ও শান্তির দূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, তিনিও বেড়ে উঠেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার চাঁন্দপুর গ্রামে। এই দুই মহান সাধক বাংলায় হাক্কানী তথা সত্য প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। জীবন ও জগতের সত্য, মানুষের সত্য, ধর্মের সত্য, এক কথায় মানুষের জীবনের প্রকৃত রহস্যের সন্ধান দেন এই দুই মহান সাধক। এই সাধকদের মহা সত্যকে জগতে বহমান রাখার জন্যে আবির্ভূত হন আরো অনেক সত্যমানুষ। সৃষ্টির বৈচিত্রময়তায় আর এক নব সংযোজন। পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক বাবা-মা পুত্র সন্তানের আশায় দারস্থ হন গাজী বাবার দরগায়। সেখানে মানুষ যায় স্বপ্ন পূরনের আশায়। দরগাহের সীমানার ভিতরে পুকুরে কলাপাতায় মোড়ানো শিন্নী ভাসায় কৃপাপ্রার্থীরা। সেই শিন্নী ভাসমান থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কৃপাপ্রার্থীরা পুকুরের কোলঘেঁসে পানির মধ্যে দুহাত পেতে বসে থাকে। শিন্নী ভাসতে ভাসতে যার হাতে এসে পৌঁছায় তার স্বপ্ন পূর্ণ হয়। গাজীবাবার দরগাহতে হাত পেতে সেই বাবা-মা লাভ করলেন এক দুর্লভ সন্তান। নাম রাখেন শেখ আবদুল হানিফ। এক সময় সেই সন্তান নিতান্ত খেয়ালের বশে, শুধু কি খেয়ালের বশে? না কি মূলের আকর্ষণে ছুটে গিয়েছিলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর ধানমন্ডি’র দরবারে। প্রথম দর্শনেই পেলেন ভিন্ন এক জ্যোর্তিময়তা। জ্যোতির্ময় গুরু প্রথম দেখায় পেলেন শান্তির সত্যের এক বাহককে। তাঁর মানসপটে এঁকে নিলেন এক ভাস্কর্যমূর্তি। তাঁর শৈল্পিকনন্দনে সৃষ্ট ভাস্কর্য জগৎকে উপহার দিলেন এবং তাঁর শিষ্যের হাতে তুলে দিলেন হাক্কানী দর্শন। পরিয়ে দিলেন হাক্কানীর রাজটীকা। প্রথম দর্শনে শিষ্য তাঁর সত্যকে ধারণ করলেন তেমনিভাবে, যেমনভাবে ঝিনুক বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করে নিজের বক্ষে সৃষ্টি করে মূল্যবান রত্ম। গুরুর সৌন্দর্যে বিমোহিত থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে জীবনের সাধনারূপে গ্রহণ করে গুরুর কৃপায় সত্যের অতন্দ্র প্রহরী নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছেন বিশালতার দিকে। বাংলার বুকে, বাঙালির জাগরণে, বাঙালির জাতিসত্তার সত্য উন্মোচনে দিয়েছেন মুক্তির বাণী ও দিক নির্দেশনা। সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি বাঙালি জাতির উত্তরণের সেই মন্ত্র- ‘সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নির্ভীক মহান সাধক বাঙালির জাগরণে আবারো দিয়েছেন আর এক মহামন্ত্র- ‘সত্য মানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।’

হাক্কানী দিবস-সত্য দিবস। সত্যমানুষ-এঁর আবির্ভাব দিবস। সত্য ছিল-আছে-থাকবে কিন্তু মানুষের জীবনাচরণে ক্রমশ তা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ তথা সারা বিশে^ হাক্কানী দিবস হিসেবে কোন দিবস পালিত হয়নি যা সারা বিশ্বের মানুষকে একই ব্যানারে একই আহ্বানে একত্রিত করতে পারে। হাক্কানী দিবস অত্যন্ত সূদুরপ্রসারি উন্মুক্ত একটি আহ্বান নিয়ে এসেছে যা সার্বজনীন।

হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীদের সত্য উপলব্ধি করার জন্য তাঁদের নির্দেশে বাংলার বুকে শুরু হয়েছে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার উদাত্ত আহ্বান। আর তাই চৈত্র মাসের তৃতীয় সোমবার ১৪২১ বঙ্গাব্দে প্রথম বারের মতো ঢাকাস্থ হাক্কানী আস্তানা শরীফ পাইকপাড়া মিরপুরে, ‘এক দিনের জন্য হলে ও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি’ – এই আহ্বানে বাংলার বুকে তথা বিশ্বের বুকে সর্বপ্রথম উদ্যাপিত হয়েছে হাক্কানী (সত্যব্রত) দিবস। এরই ধারাবাহিকতা চলছে এবং চলবে। মানবের মাঝে লুকায়িত থাকা সত্যকে আবিষ্কার করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে একটি দিবসকে সত্যব্রত দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে সত্য অনুসন্ধিৎসুদের প্রেরণায়।

হাক্কানী দিবসের সাথে বাংলার প্রকৃতির রয়েছে এক অপরূপ মিল। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে হাক্কানী দিবস ও বাংলার চৈত্র মাসের সাথে যোগ- সৌন্দর্যের কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। চৈত্র মাসের আবহটা কেমন এই বাংলায়? চৈত্র মাসের ঠিক আগে বাংলার প্রকৃতি কেমন? ষড়ঋতুর বাংলায় বসন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সৌন্দর্যের ঋতু। ফাল্গুন চৈত্র এই দুই মাস নিয়ে হয় বাংলার বসন্তকাল। বসন্ত মানেই রং এর প্রাচুর্য। নতুনের আবির্ভাব। প্রকৃতিতে নতুন পাতা, নতুন ফুল সবই বাহারী রং নিয়ে আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। শীতের জরা-জীর্ণতার শেষে বাংলা প্রকৃতির এমন রূপ দেখে নেচে উঠে বাঙালির চিত্ত খুশি আর আনন্দে। কবির ভাষায় –  আহা আজি এ বসন্তে / কত ফুল ফুটে / কত পাখি গায়…..।

বসন্তের আগমনে বাংলার প্রকৃতি সাজে সম্পূর্ণ নতুনসাজে, নতুন উদ্যমে, নতুন জাগরণে, নতুন স্বপ্নে। ফাগুনে প্রকৃতির বুকে নতুন সৌন্দর্যের জোয়ার আসে, চৈতালিতে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়। চৈত্রের খর তাপে ফুল, পাতা, ফলের জোয়ার আসে গাছে গাছে। তেমনি ভাবে হাক্কানী তথা সত্য পথের যাত্রীগণও হাক্কানী সাধকদের সান্নিধ্যে এসে সত্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে নিজকে জানা ও চেনার দিকে এগিয়ে যায়।

বস্তুত ‘হাক্কানী দিবস’ একটি প্রতীকী শপথের দিন, একটি প্রতীকী সত্য দিবস। একটি দিন এ দিবস পালন করলেই সকলে সত্যমানুষ হয়ে যাবেনা। কিন্তু সত্যমানুষ হয়ে ওঠার অঙ্গীকার করতে পারবে। দৃঢ় শপথের মাধ্যমে এ দিবসকে পালন করে নিজের জীবনে সত্যকে বাস্তবায়ন করে নিতে পারলে- এর চেয়ে পরমপ্রাপ্তি নবীন হাক্কানীদের জন্য আর কি হতে পারে !

হাক্কানী (সত্যব্রত) দিবসের অঙ্গীকার- ‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি – অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’। যে একদিনের জন্য নিজ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে, সে সত্যমানুষ হওয়ার পথের যাত্রী হিসাবে সত্যানুসন্ধানী হবে। নিজ সত্যের স্বরূপের সঙ্গে একবার সংযোগ হলে আর ভয় থাকেনা কিছু হারাবার। এটাই শাশ্বত চিরন্তন। হাক্কানী (সত্যব্রত) দিবস আবহে কৃপার সাগরে ধুয়ে যাক, মুছে যাক আমাদের সকল পঙ্কিলতা এই আমাদের প্রার্থনা।

আবির্ভাবের মাহেন্দ্রক্ষণে…….

‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি –
অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’

সংলাপ ॥ সত্য শাশ্বত – চির বহমান, চির অম্লান। সত্য সার্বজনীন। সত্য সবার জন্য। মহাকাল এসে মিলে গেলো একটি বিন্দুতে। আকাশের বুকে গ্রহ নক্ষত্র আছে বলেই আকাশ এত সুন্দর। ফুল আছে বলেই প্রকৃতির রাজ্য এত মনোরম। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আছে বলে সমুদ্র রূপময়। বিশ্ব চরাচর সত্যমানুষের রূপের ছটায় মুগ্ধ, ধন্য। তাঁদের স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ত্রিভূবন আলোকিত। সে জ্যোতি দৃষ্টিকে ঝলসে দেয় না বরং আকর্ষণ ও উজ্জ্বল করে। তাঁরা তাঁদের স্বর্গীয় প্রভায় পৃথিবীর শ্রীহীন মানুষের দীনতা দূর করেন। কখনও প্রকাশ্যে কখনও গোপনে। অজ্ঞ মানুষ তা বুঝতেও পারেনা। মানুষের কল্যাণে সত্যের নিবিড় সাধনায় যাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেন – সাধারণ মানুষের সাধ্য কি তাদের মহিমা বুঝতে পারা? যাদের অঙ্গুলী হেলনে বিশ^প্রকৃতি, দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি নতুন রূপ লাভ করে – সেই ঊর্ধ্ব লোকাচারী মানুষ সাধারণের জানার সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা মুক্ত মানুষ, সত্যমানুষ, সত্যের আকাশে এক একটি ধ্রুবতারা। সমাজ সংস্কারের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ নিজস্ব সৃষ্টি শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করছে। সংস্কারের কালোমেঘ তাদের জীবনকে তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। জীবনের নানান সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে খুঁজে একটা নিরাপদ আশ্রয়। তাদের ত্রাণকর্তারূপে যুগে যুগে আগমন ঘটে কালজয়ী মহাপুঁরুষদের। মানুষের অসহায়ত্ব তাঁদের কষ্ট দেয়। তাঁদের হৃদয় কাঁদে নিভৃতে ।

সত্যমানুষের হাত ধরে আবির্ভাব হয়েছিল বাঙালির জাতিসত্তার। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে বাঙালি জাতিসত্তার বীজ রোপিত হয় সত্যমানুষের মাধ্যমে। সেই থেকে আজ অবদি চলমান রয়েছে এই ধারা। তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতি সত্যমানুষদের দেখানো শান্তি ও সত্যের পথ ধরে চলে এসেছে কিন্তু গৌরবান্বিত ঐতিহ্যের অধিকারী এই জাতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বহি:শত্রুর আক্রমণে নির্যাতিত হতে হতে নিজ জাতিসত্তার সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ হারিয়ে ফেলতে বসেছে। নানান দেশ হতে আগত ঔপনিবেশিক ধর্ম ও সংস্কৃতি বাঙালির চির শাশ্বত ও সৌন্দর্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির মাঝে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছে স্বধর্ম ও সংস্কৃতি। মিশ্র ধর্ম ও সংস্কৃতির যাতাকলে পড়ে যেন ভুলে যেতে বসেছে জাতিসত্তার আসল রূপ, আপন সত্তার আসল সত্য।

বাঙালির জাতিসত্তার আসল রূপ পুনরুদ্ধারে যুগে যুগে এই মাটিতে আগমন করেছেন সত্য ও শান্তির দিশারী সত্যমানুষ সূফী সাধকগণ। সত্যমানুষ সূফী সাধকদের আবির্ভাবের ফলে বাঙালি আপন সত্য ও সৌন্দর্যের সাথে পুনঃ সংযোগ করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সত্য ও সৌন্দর্যের সংযোগ সূত্র যখনই ভুলতে বসেছে বাঙালি তখনই আবির্ভাব ঘটেছে সত্যমানুষদের অর্থাৎ সূফী সাধকদের। একেক জন সাধক একেক প্রক্রিয়ায় সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ প্রকাশ করেছেন এই জাতির মাঝে। আজও প্রকাশ করে চলছেন এই জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য। সত্যমানুষদের আবির্ভাবের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতির মুক্তি ও শান্তির দূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। এই দুই মহান সাধক বাংলায় হাক্কানী তথা সত্য প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। জীবন ও জগতের সত্য, মানুষের সত্য, ধর্মের সত্য, এক কথায় মানুষের জীবনের প্রকৃত রহস্যের সন্ধান দেন এই দুই মহান সাধক। এই সাধকদের মহা সত্যকে জগতে বহমান রাখার জন্যে আবির্ভূত হন আরো এক সত্যমানুষ। সৃষ্টির বৈচিত্রময়তায় আর এক নব সংযোজন।

তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের (বর্তমান পশ্চিম বাংলার) সোনারপুর মহকুমার চাকবেড়িয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক বাবা-মা পুত্র সন্তানের আশায় দারস্থ হন গাজী বাবার দরগায় (হযরত গাজি মোবারক শাহ, যার রওজা ঘুটিয়া শরীফ নামে পরিচিত)। সেখানে মানুষ যায় স্বপ্ন পূরণের আশায়। দরগাহের সীমানার ভিতরে পুকুরে কলাপাতায় মোড়ানো শিন্নী ভাসায় কৃপাপ্রার্থীরা। সেই শিন্নী ভাসমান থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কৃপাপ্রার্থীরা পুকুরের কোলঘেঁসে পানির মধ্যে দুহাত পেতে বসে থাকে। শিন্নী ভাসতে ভাসতে যার হাতে এসে পৌঁছায় তার স্বপ্ন পূর্ণ হয়। গাজীবাবার দরগাহতে হাত পেতে সেই বাবা মা লাভ করলেন এক দুর্লভ সন্তান। জগতবাসী পেল এক শান্তির দূত। এক সময় সেই সন্তান নিতান্ত খেয়ালের বশে, শুধু কি খেয়ালের বশে? না কি মূলের আকর্ষণে ছুটে গিয়েছিলেন বাংলার মহান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে। প্রথম দর্শনেই পেলেন ভিন্ন এক জ্যোর্তিময়তা। জ্যোতির্ময় গুরু প্রথম দেখায় পেলেন শান্তির সত্যের এক বাহককে। তাঁর মানসপটে এঁকে নিলেন এক ভাস্কর্যমূর্তি। তাঁর শৈল্পিকনন্দনে সৃষ্ট ভাস্কর্য জগৎকে উপহার দিলেন এবং তাঁর শিষ্যের হাতে তুলে দিলেন হাক্কানী দর্শন। পরিয়ে দিলেন হাক্কানীর রাজটীকা। প্রথম দর্শনে শিষ্য তাঁর সত্যকে ধারণ করলেন তেমনিভাবে, যেমনভাবে ঝিনুক বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করে নিজের বক্ষে সৃষ্টি করে মূল্যবান রত্ম। গুরুর সৌন্দর্যে বিমোহিত থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে জীবনের সাধনারূপে গ্রহণ করে গুরুর কৃপায় সত্যের অতন্দ্র প্রহরী নিরলসভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বিশালতার দিকে। বাংলার বুকে, বাঙালির জাগরণে, বাঙালির জাতিসত্তার সত্য উন্মোচনে দিয়েছেন মুক্তির বাণী ও দিক নির্দেশনা। জগতের বুকে পরিচিতি পেয়েছেন সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ নামে। সত্যমানুষ শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি বাঙালি জাতির উত্তোরণের সেই মহামন্ত্র-

‘সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’।

সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নির্ভীক মহান সত্যমানুষ বাঙালির জাগরণে আবারো দিয়েছেন আর এক মহামন্ত্র-

‘সত্য মানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।’

মা-মাতৃভাষা-মাতৃভূমির তথা বাঙালি জাতিসত্ত্বার সত্য প্রকাশে, প্রচারে ও প্রতিষ্ঠায় কেমন অনুরাগী ছিলেন তা তাঁর বাণী থেকেই উপলব্দি করা যায়।

সত্যমানুষ আবির্ভূত হন, জগতের বুকে সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার তরে। সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলে। হাক্কানী দর্শন প্রচার-প্রসারের যাত্রা হযরত আজানগাছি হতে শুরু হয়ে সূফী সাধক হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক হয়ে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ এঁর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। হাক্কানী দর্শনকে তিনি নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

সৃষ্টির বিধানে সকলেই বাধা। সত্যমানুষ সে বিধানে পরিবর্তন করেন না। অগনিত ভক্ত আশেকানদের ফাঁকি দিয়ে মহামিলনে পাড়ি জমিয়েছেন ৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার, সকাল ৭ টায় এবং ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২২ জুলাই ২০১৯, সোমবার, বেলা ১১.২১ মি. তাঁকে রওযায় চির বিশ্রামে শায়িত করা হয়। সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীদের শিখিয়েছেন আপনসত্য উপলব্ধি করার পথ। ‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি – অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’। যে একদিনের জন্য নিজ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে, সে সত্যমানুষ হওয়ার পথের যাত্রী হিসাবে সত্যানুসন্ধানী হবে। নিজ সত্যের তথা স্বরূপের সঙ্গে একবার সংযোগ হলে আর ভয় থাকেনা কিছু হারাবার। এটাই শাশ্বত, এটাই চিরন্তন। সত্যমানুষের কৃপার সাগরে ধুয়ে যাক, মুছে যাক আমাদের সকল পঙ্কিলতা এই আমাদের প্রার্থনা। সত্যমানুষ হারান না, সর্বদা বর্তমান। যে হৃদয় সত্যময় হয়ে উঠে সে হৃদয়ে সর্বদা সত্যমানুষ বর্তমান। সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীর হৃদয় নিজেকে প্রবোধ দেয় এই বলে – ‘নয়নের সম্মূখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’। ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছো নয়নে নয়নে’।

‘উপলব্ধি’ বিষয়ে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ পরিচালিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে উপলব্ধি বিষয়ে ২৬টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি পর্বে সত্যমানুষ উপস্থিত হয়ে বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের আলোচনাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। পথ দেখিয়েছেন। সম্মানিত আলোচকগণের চিন্তাশক্তিকে গভীর থেকে গভীরতম পর্যায়ে নিতে সহায়তা করেছেন। উপলব্ধি হচ্ছে প্রাপ্তির সৌন্দর্য এই সঙ্গা ধরেই হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীরা তাদের উপলব্ধিকে নিয়ে শাণিত করছেন প্রতিমুহুর্ত, প্রতিদিন।

‘উপলব্ধি’ বিষয়ে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ

আমি এক। এক ছাড়া আর কিছু কি আছে? সময় কি? আমি। অভ্যাস কি? আমি। আমি ছাড়া কেউ কি করতে পারবে? প্রাপ্তি এক, হানিফ এক, হানিফের প্রাপ্তি এক। ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান মানে- বল  আল্লাহ এক। হাক্কানী স্কুল অব থট বলছে – “তুমি এক উপলব্ধি কর”। প্রাপ্তি ঘটছে কিনা জানতে হলে তোমাকে অবশ্যই একটা বিন্দুতে সংযোগ করতে হবে। একটা নিয়ে চিন্তা করলে তা সঠিক হবে। তাই এক এ নিমগ্ন থাকতে হবে। এক এর সাথে একটাই কথা একাত্ম হওয়া। এক এর সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য সময়ের কি কোন প্রয়োজন আছে? কর্মের সাথে কতক্ষণ একাত্ম থাকেন। এক এর মূল্য কি? ১+১= ২ হয়? এক একাত্ম হয়ে তাঁর সৌন্দর্য অবলোকন কর। নিজেকে শূন্য করতে পারলে অবশ্যই এক এর সাথে একাত্ম হওয়া যায়। উপলব্ধিতে আসতে হলে পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠতা থাকতে হবে। যখন যে কর্ম করেন তখন সেই কর্মের মধ্যে ঢুকেন কিনা?

দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য- অন্যের কথায় নয়।দর্শন কি? দেখতে দেখতে দর্শন। আমার সমস্ত কর্মের মধ্যে দেখছি। ধারণের চোখে দেখছি। চিন্তা জগত, কর্মজগত, সর্বক্ষেত্রে সর্বসময়ে এক কে ধারণ করে চলা। কল্পনার জগতে তাঁকে ধরে রেখে নিষ্ঠার সাথে নিমগ্নতায় থাকা। দেখাই আমার সাধনা, স্মরণ আমার জীবন। সর্বকাজে সর্বসময়ে উপলব্ধি আছে। নিষ্ঠার সাথে নিমগ্নতার সাথে দেখলে সেখানে সৌন্দর্য পাওয়া যাবে। যেখানে উপলব্ধি আছে, সেখানে সফলতা আছে। এক এর দরজায় পোঁছালে আমার দর্শন শক্তি যোগাবে। প্রকৃতির অংশ হিসাবে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে যাও – এটাই এক। যা তিনি বহন করেন। বহন করেন তার সময়ের সাথে সাথে। সেখানেই ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান। সে যেদিকে যাবে সেদিকে সফল হবে। তার মধ্যে ৩টি গুনাবলীর সমন্বয় হবে। ১. পর্যবেক্ষণ (যে মুহুর্তে শুনছি ঐ মুহুর্তে করণীয় কি) ২. নিমগ্নতা (কি কি আমাকে করতে হবে) ৩. নিষ্ঠা (নিজস্ব সৌন্দর্যের সাথে ভাব হবে)। আপনি কি দেখেছেন আপনি কোন জায়গায় কতক্ষণ নিমগ্ন থাকতে পারেন ? এটাই ল্যাবরেটরি। এটাই ধর্ম। নিমগ্ন থাকলে আমি সৌন্দর্য দেখতে পাবো। প্রতিটি কর্মে একাত্মতা আছে। যেখানে একাত্মতা আছে সেখানে সৌন্দর্য আছে। যে মুহুর্তে যার সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছি, যেটা শুনেছি সেটাই করা। সংকীর্নতা সন্দেহ ভাল মানুষকেও নষ্ট করে দেয়। সংকীর্নতা মানে তুলনা বুঝায়। হীনমন্যতা থাকে বলে এটা হয়। উদ্বেগ, আবেগ, সংবেদনশীলতা, আর উত্তেজনা এই চারটা অবস্থানে একাত্ম থাকতে পারি কিনা ? পর্যবেক্ষণ করা যে আমি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছি কিনা এবং একাত্ম ছিলাম কিনা। তাহলে সৌন্দর্য দেখতে পাবো। আপনার মুখ যা বলেন তাই করেন কিনা নাকি মুনাফেকি করেন? দ্বিচারিতায় ভুগছেন। যিনি সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তিনি চুপচাপ আছেন। যেভাবেই যোগ হয় সেখানেই স্পার্ক হবে। সৌন্দর্যের ক্ষেত্র তৈরী হবে। সেটা কি আমি অনুধাবন করতে পারছি? অথবা তোমার মধ্যে যে কম্পন হয়ে গেল সেখানে কিছু ঘটে গেল কি না? বা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেলাম কি না ? ঐ কম্পন, অনুভবের জায়গা ধরে ফেলতে পারছি কিনা? ধরে ফেলতে পারলে আমি শান্ত হয়ে যাবো । ‘ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান’ হাক্কানী স্কুল অব থটের কথা। তোমাকে মোহাম্মদ হতে হবে। এটাই মহৎ। নিষ্ঠা, নিমগ্নতা দিয়ে প্রতিটি কর্মে প্রতিটি সময়ে থাকতে পারলে উপলব্ধির দরজায় আসতে পারবে। এগিয়ে যাওয়ার জন্যই সমুদ্রের স্রোতের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এখানে দু:খ নাই, কষ্ট নাই। আছে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ।  

কর্ম ব্যাখ্যা করলে তা সেবার মধ্যে পড়ে। সেবা করার চিন্তাটা এখনও আমাদের মধ্যে পৌঁছে নাই। কাছাকাছি যাওয়ার জন্য সেবা একটা মাধ্যম। বিশ্বাসের ঘরে যখন যাওয়াই হয়নি তখন গেলেই কি আর না গেলেই কি? সেবার পরিপূর্ণ জিনিস স্মরণ করতে হয়। চিন্তার জগতে করা যায়, দৃষ্টিতে করা যায়, মুখের কথায় উচ্চারণ করে করা যায়। সত্য যে খুঁজবো সে সত্যের আলো তার মধ্যে আসতে পারে আবার নাও আসতে পারে। দরবারে যখন খাচ্ছি সেটা কি কোন কিছু পাওয়ার আশায় নাকি ভক্তি বা শ্রদ্ধার সাথে হচ্ছে? পর্যবেক্ষণ শক্তি নিজের মধ্যে নিজে তৈরি করতে পারছি কিনা? অনুভূতির কোন জায়গায় আমি ধারণ করে আছি?

আমার আপাদমস্তক অর্থাৎ পা থেকে মাথা পর্যন্ত যতগুলি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে সে অঙ্গের একটি জায়গায় ধরে রাখতে পারছি কিনা। একটুখানি ধরে রাখতে পারলে আমি বুঝতে পারি? অনুভূতির জায়গায় আমি আছি কিনা? অনুভূতি ছাড়া পরিবর্তন হয়না। আমি কোন জায়গায় আমি স্থিত করেছি। অর্থাৎ অনুভব করছি। যেখানে নিয়ন্ত্রন আছে সেখানে স্থিতি আছে। নিয়ন্ত্রণ কি নিচে থেকে উপরের দিকে? নাকি উপরের দিক হতে নিচের দিকে করবো? চিন্তাজগত থেকে একটা চিন্তা বাছাই করে নাম স্মরণ করতে গেলে কি পরিবর্তন আসে? বুঝতে হবে। পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিজে নিজে উপার্জন করে অর্জন করতে হবে। কখনও কি চিন্তা জগতে তুমি ছাড়া রাখছি? আমাদের প্রায় ষাট হাজার চিন্তার আর চার হাজার কর্ম আছে। এর মধ্যে এটা একটা পদ্ধতি। সময়ের তালে তালে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। বই পড়ে পান্ডিত্য করা যাবে। নিজেকে চেনা যাবে না। কোন জায়গায় নিজেকে স্থিত করলাম?  বর্তমানই সত্য। কার সাথে একাত্ম হলে আত্মিক সম্পর্ক হলে শান্তি পাবো? নিজেকে শান্তিময় করে তুলতে পারবো।

শান্তির একটাই পথ। হাক্কানী সত্যের সাথে একাত্মতা। এজন্য আমি বহন করে যাচ্ছি সেখানে কোন জায়গায় আমি সত্যটাকে রাখছি? সেই সত্য আমার মধ্যে বাসা বাঁধছে। সত্য অন্বেষণ করে, পর্যবেক্ষণ করে, অনুসরণ করে কি আমি আমার অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারছি? কোথায় আছি আমরা? শুরু কোথা থেকে করতে হবে? মিরপুর আস্তানা শরীফ এটা একটা পরীক্ষাগার। সত্যময় সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। এত সস্তায় আনারকে ধরবেন?

সত্য অন্বেষণ করবেন কিনা তা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নিজেকে নিজে তৈরি করতে হবে। প্রশংসা আমরা বুঝি কি না?  সর্বস্তরে যিনি ধারণ ও লালন করতে পারে তিনিই প্রশংসা করতে পারেন। প্রশংসা করতে পারে একমাত্র গুরু। আমাদের জন্য করণীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, আরও পাবে। উপলব্ধির উৎস এক এ। সেখান থেকে উপলব্ধির শুরু। এক এ আসা মানে উপলব্ধির দরজায় আসা। উপলব্ধি মানে বোধ। উপলব্ধি শক্তি নয়। বোধ মানে জ্ঞান। উপলব্ধি হয়না বলেই আমি কোনটাতেই তৃপ্ত হইনা। জ্ঞান একটাই। যে কোন একটাতে আমি ঐ বিষয় নিয়ে পড়ে আছি। সে সৌন্দর্যের কোন শেষ আছে? আমি আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে আছি। আমাকে বার বার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমার ভাললাগা, অনুভূতি বার বার ঐ দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। বোধ জ্ঞানের পথে প্রথম দরজা। সব প্রাপ্তির মধ্যে এক প্রাপ্তি কোথায়? সব প্রাপ্তি প্রাপ্তি না। প্রাপ্তির কোন শেষ নাই। হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে প্রাপ্তির সত্যটা কোথায়? উপলব্ধির সত্য কোনটা?” সেইটার সাথে একাত্মতা হতে পারছি কিনা? ঐ এক পেয়ে আমি কি সন্তুষ্ট ? বহু প্রাপ্তি আছে। জ্ঞান সাগরে আমি দাড়িয়েছি। পা ফেলে ফেলে যাব। জ্ঞানের দরজার কাছে চলে এসেছি। প্রাপ্তি নেতিবাচক হতে পারে। ইতিবাচক হতে পারে। নেতিবাচক না হলে আমি সিজনড হবো কি করে? কোন প্রাপ্তি থেকে আমি সন্তুষ্ট?  ইলমাদুন্নবী  মানে দূরদর্শিতা। চেতনার স্তর যত মোটা তত সে জ্ঞানের দিকে যাবে। বাস্তবতা তাকে ফুয়েল দিবে। বাস্তবতার নিরিখে তুমি বার বার দেখো। সূক্ষ রেখা থেকে বাড়তে থাকে এই উপলব্ধি। সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে সে তখন নিজেই সৌন্দর্য হয়ে যাবে। স্পিরিট মানে আধ্যাত্মিকতা। চেতনার সর্বোত্তম শিখরে যখন যাবে তখন সে খেলবে। যে কোন রূপ ধরতে পারে। যে কোন ঘটনা ঘটাতে পারে। একমাত্র গুরুই চিনতে পারে। প্রাপ্তি তো সেখানেই।

ব্যক্তির সবচাইতে কঠিন জায়গা হচ্ছে তার ইচ্ছা। ইচ্ছা যখন প্রাপ্তির আশা করে তখন এই ইচ্ছা অন্য একটি ইচ্ছার কাছে সমর্পিত হতে হয়॥ তা না হলে হয় না। হামিবা যখন করবো তখন সত্য হবে ব্রত হিসাবে ধারণ। সত্য কোনটা? আমি লেখাপড়া করছি, আমি চাকরি করছি, এখানে কোন সত্য খুঁজতে যাবো? যে শাস্ত্রই বলেন, সব শাস্ত্র ঘেটে পাওয়া যাবে এক ঈশ্বরবাদ। সেই এক কে আমি কিভাবে বাস্তবায়ন করছি? কিভাবে একাত্মতা হচ্ছি? এখানে আমরা বসে আছি চার দেয়ালের মধ্যে। এখানেও প্রাপ্তি আছে। ভাল খারাপ বলছি না। এই মধ্যেও বৈচিত্র আছে। এই যে দেখা শুনার অনুভূতি সেইটা কতটুকু কোন জায়গায় একাত্ম হচ্ছে? আবার সরিয়ে দিচ্ছে? এই জন্যই উপলব্ধির জায়গায় যেতে হবে। প্রথমে নিজেকে এক এর মধ্যে অবগাহন করতে যেয়ে যে উপলব্ধি আসবে সেটাকে সে আস্তে আস্তে প্রতিনিয়ত নিয়ে যাবে। কাল আমি যে রূপ দেখেছি সেই রুপ বহন করে আবার আজ যে রূপ দেখছি এ দুটোর মধ্যে কতটা পার্থক্য হচ্ছে? পরিবর্তন হচ্ছে?

আমি ছেড়ে দিতে হবে। তুমিতে আসতে হবে। কিন্তু আমি ভুলে গিয়ে তুমির মধ্যে চলে তখন আমি কোথায় থাকে? যেখানে “তুমি” যতই দেখতে পাবে আমি ততই দুরে সরে যাবে। কেন? দৈহিক যে জিনিসটা আমরা বুঝি দৈহিক শক্তি যা বহন করার শক্তি আছে। সে শক্তিটা কি আমরা বুঝি? সেখানে দেখা যায় নিজের ইচ্ছার উপর নিজের আস্থা নাই। প্রতেক্যের কোন জায়গায় আকর্ষন করলো, বৈচিত্রতা সেখানে কার কতটুকু, কোথায় কতটুকু সময় এটা বৃদ্ধি করাতে হয়।এটা করলে ডেভেলপমেন্ট তাড়াতাড়ি হয়। যাই হোক। কম হোক বেশী হোক। যে সময়টা কাটানো হচ্ছে সেখানে কিছু না কিছু গ্রহণ থাকবে। প্রত্যেকের একটা অভ্যন্তরিণ সৌন্দর্য আছে। সে সৌন্দর্যটা সে দেখলো কি না। ব্যক্তি যে পরিবর্তনের ধারার মধ্য দিয়ে চলছে, ক’জন আছে মানুষ তার পরিবর্তন ধরতে পারে? যে ঐ পরিবর্তন ধরতে পারে সে তত নিজের সত্যের কাছে আসতে পারে। নিজের মধ্যে অভ্যাসের দাস, ইচ্ছার দাস, ভোগের দাস কোনটা নাই? এটা দোষ না। পৃথিবীতে জন্মাবার পর থেকে শুধু দেখেই আসলাম নিজের সৌন্দর্য দেখার অবকাশ পেলাম কোথায়?

এক- এর থিওরিতে যাবো কি করে? এটা নিজের আত্মবিশ্লেষণ করলে, নিজেকে নিজে পর্যবেক্ষণ করলে ধরা যায়। উপলব্ধি হচ্ছে প্রেমের পথে শুরুর বিন্দু। এখানে অনুসরণ এবং অনুস্মরণ বাধ্যতামুলক। চিন্তার পদ্ধতি শুরু হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত অনুভূতি আছে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈচিত্র আছে। বৈচিত্রময়তা আছে। অনুভব হলে তা স্থিত হয়।

…. হাক্কানী সম্পর্ক ….

শাহ আকমল ইমাম ॥ উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে সমগ্র ভারতবর্ষের মতই বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে ছিল এক সংকটময় কাল। এমনই প্রেক্ষাপটে ইসলামের উজ্জ¦ল তারকা হিসাবে বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর থানার ব্রহ্মপুত্র নদীর কিনারে ফরিদপুর নামক নির্জন গ্রামে আল্লাহর হুকুমে আবির্ভাব ঘটে হযরত মাওলানা আবু আলী আক্তার উদ্দিন শাহ্ কলন্দর গউস পাক এঁর। সেইরূপ অফুরন্ত ভা-ারের অধিকারী কালোত্তীর্ণ এক মহাপ্রাণ, তিনি ১৯৮৩ সালে ফরিদপুর শরীফ গ্রামে লোকান্তরিত হন। তাঁর রওজা শরীফও আজ এই  গ্রামের সবুজ বৃক্ষের শ্যামল ছায়ার আবরণে। তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি ও প্রধান খলিফা সুলতানুল আউলিয়া আলহাজ্ব হযরত শাহ্ কলন্দর সূফী খাজা আনোয়ারুল হক রওশন জমির মাদ্দা জিল্লাহুল আলী। তাঁরই নির্দেশে মানবতার মহান সাধক’-এঁর ওপর সাধারণ মানুষ ও ভক্তদের জন্য হাক্কানী ওজায়িফ, হাক্কানী তরীকার প্রচার ও প্রসার ঘটানো দ্বীন- দুনিয়ার শান্তি ও মঙ্গল হাসিলে তাঁর আদর্শকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার মানসে তিনি সারা বাংলাদেশে এবং বহিঃ বিশ্বে মানবতার সেবায় হাক্কানী খানকা, দরবার শরিফ, আস্তানা শরীফ একের পর এক শহর, বন্দর, গ্রামে  প্রতিষ্ঠিত করেন যে ধারা আজো অব্যাহত রয়েছে তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক কিশোরগঞ্জ জেলার চান্দপুর শরীফে মায়ের মৃত্যু তারিখ ২০ শ্রাবণ ১৪০৬, ৪ আগস্ট ১৯৯৯ সালে বরণ করে নেন রূপান্তরের নতুন ঠিকানা।

এদিকে, বাংলা ১৩৫৩ সনের (১৯৪৬ খ্রীস্টাব্দ) চৈত্র মাসের তৃতীয় সোমবার অবিভক্ত ভারতবর্ষের পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলার সোনারপুর মহুকুমার, চাকবেড়িয়া গ্রামে আবির্ভাব হয়  সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর যিনি ১৯৭৪ সালে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর দর্শন লাভ করেন সহধর্মিনী শাহ্ আনোয়ারা বেগম-এঁর মাধ্যমে ধানম-ি জিগাতলা দরবারে। ১ বৈশাখ ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে (১৯৭৭ সালে) সূফী সাধক আনোয়ারুল হক কর্তৃক শাহ্ সূফী খেতাবে ভূষিত হওয়ার পর শেখ আবদুল হানিফ বাংলা ১৩ মাঘ ১৩৯৫ সনে, ১৯৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারী গুরুর নির্দেশে মিরপুর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠা করে এর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তারপর কর্ম-মানবতা-শান্তি এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে ১৯৯০ সনে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর  নির্দেশেই তিনি হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা), হাক্কানী মিশন  বিদ্যাপীঠ (বর্তমান বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়), বর্তমান সংলাপ এবং হাক্কানী ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এই চিরঞ্জীব মহাপ্রাণ সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ তাঁর মুর্শিদ-এঁর লোকান্তরিত মাসকেই বরণ করে নিলেন ৫ শ্রাবণ, ২০ জুলাই ২০১৯ তারিখটিকে।

শেখ আবদুল হানিফ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর দর্শন লাভ করেন ১৯৭৪ সালে। তারপর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর সাথে সফরের মাধ্যমে সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন এঁর সঙ্গে সংযোগ হয়।  সূপী সাধক আনোয়ারুল হক এর আরেকজন অন্যতম শিষ্য সূফী সাধক কামরুল হাসান-এঁর সাথে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর সংযোগ হয় আনুমানিক ১৯৭৯ সালে। সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন-এঁর সঙ্গে সময়ের ব্যবধানে সেই একই ধরাধামে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর সঙ্গে সংযোগ হয় সূফী সাধক কামরুল হাসান-এঁর। ১৯৮১ সালে সূফী সাধক আব্দুর রহমান-এঁর রওজায় এবং ধানমন্ডি দরবারে উনাকে (সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফকে) নিয়ে ১৭ দিন অবস্থান করার পর বিভিন্ন ধরনের ফল দিয়ে কান্দুলিয়ার হুজুরের (সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন) কাছে পাঠান। একদিন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘কামরুল সাব, আপনার সাথে পাঞ্জাবী শাহ সাহেবের (সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ) দেখা হবে।’ তখন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ শিক্ষা ও কর্মসূত্রে  সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন ১৯৮৩ সালে লোকান্তরিত হওয়ার পর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর সফর শুরু হয়। সরারচর, যেখানে সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন যে কাঁঠাল গাছের নিচে দাঁড়াতেন সব সময় তাঁর সফরসঙ্গী হিসাবে থাকতেন পাঞ্জাবী শাহ্ সাহেব হিসাবে পরিচিত সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ। ১৯৮৫ সালে সরারচর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠালগ্নে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর সফর সঙ্গী ছিলেন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ। এই দুই মহান সাধকের ধরাধামে আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ ও সূফী সাধক কামরুল হাসান-এই দু’জনও হয়ে উঠেন দুই মহান সাধক হিসেবে। হাক্কানীতে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফকে প্রথম এবং  সূফী সাধক কামরুল হাসানকে দ্বিতীয় বলে আখ্যায়িত করেন। এই দুই জন গুরু ভাই। তাঁদের সম্পর্কের  স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে নিজ মুর্শিদের কথা স্মরণ করতেন। তখনও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ, সূফী সাধক কামরুল হাসান এঁর সাথে কথাবার্তা হয়নি। হঠাৎ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক ১৯৮৫ সালের দিকে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফকে বলেন, ‘শাহ সাহেব ছেলেটার সাথে কথা বললে…। ’ তখনও নিজের থেকে কথা বলা হয়নি। কিন্তু মুর্শিদের হুকুমে কথা বলা শুরু হয় সরারচর আস্তানার সামনের পুকুর পাড়ে বসে। কথা বলতে বলতে ভোর হয়ে যায়। নিজেদের দরবারে আসার বৃত্তান্ত ও ঘটনাবলী সূচনা হয় এভাবেই। শুরু হয় দু’জনের পথ চলা। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর দরবার হাক্কানী খান্কা শরীফ, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি ঢাকার উক্ত দরবারে গোপনে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর আর্বিভাব উদযাপনের সময় একদিন দুই গুরুভাই পরার্মশ করে নিজেদের চিন্তায় হুজুরের আবির্ভাব বড় আকারে সরারচর আস্তানায় উদযাপন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন হুজুরের অনুমতি সাপেক্ষে। তারপর থেকেই হাক্কানী খান্কা শরীফ ধানমন্ডি, মিরপুর আস্তানা শরীফ, সরারচর আস্তানা শরীফসহ অন্যান্য দরবারে যত রকমের অনুষ্ঠান হয় তাতে দুই গুরু ভাইয়ের অংশগ্রহণ ও আন্তরিকতা ছিল অন্যরকম। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক অনেক রকমের আধ্যাত্মিক খেলা খেলতেন, সেগুলো নিয়ে দুই গুরুভাইয়ের মধ্যে আলোচনা হতো। এর মধ্যে ভাল মন্দ সবই ছিল, কারণ হুজুরের ভাষা বুঝা ছিল কঠিন। সরারচরের শাহ্ সাহেব যখন ধানমন্ডি দরবারে হুজুরের সাথে দেখা করতে যেতেন হুজুর কয়টা ভাত খাওয়ায়ে তাকে মিরপুর আস্তানায় পাঠিয়ে দিতেন পাঞ্জাবী শাহ্ সাহেবের কাছে। এখানে প্রায় সময়ই ৩/৪/৫দিন অবস্থানের পর সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বিদায় দিলে সরারচর যেতেন। ধানমন্ডি দরবার হতে সরারচর আস্তানায় হুজুরের সফরে অগণিত ভক্তবৃন্দের মধ্যে অন্যতম সফর সঙ্গী পাঞ্জাবী শাহ সাহেব (সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ)। সেই সফরে পাঞ্জাবী শাহ্ সাহেব এবং সরারচরের শাহ্ শাহেব হযরত খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশ্তী হুজুরের অনুষ্ঠানসহ সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন স্মরণে অনুষ্ঠিত ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ্য উদযাপন অন্যতম। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এর মনোনীত শাহ্ সাহেবদের মধ্যে অন্যতম  সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ সূফী সাধক কামরুল হাসান। হুজুরের সময়ে ভক্তবৃন্দের মধ্যে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হতো, পাশের ক্ষেত্রে উনারা দুই গুরু ভাই এগিয়ে থাকতেন। হুজুরের কাছে বিভিন্ন ভাবে প্রিয় ছিলেন দুই গুরু ভাই, ফলে কতিপয় ভক্ত বৃন্দ তাদেও অপছন্দও করতেন। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ গুরুর কাছে আরজি জানিয়েছিলেন আমরন ছাত্র হয়ে থাকার, তিনি তা গ্রহনও করেন। যে কারণে উনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করার সুযোগ হয়। আরেক গুরুভাই  সূফী সাধক কামরুল হাসান গুরুর কাছে একদিন বিদেশ যাওয়ার আর্জি করলে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন ‘শাহ্ সাহেব আপনার সারা বিশ্ব এখানেই পাবেন’। একদিন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক সরারচর আস্তানায় খাজা বাবার অনুষ্ঠান করার জন্য আসেন সফর সঙ্গী ছিলেন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ। অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পড়ে উনার এবং সূফী সাধক কামরুল হাসান এর উপর। সে সময় দুই গুরু ভাই মিলে প্যান্ডেলের কাজ করেন অন্যান্য ভক্তদের নিয়ে, একটা টিন লাগানো বাকী ছিল পরে লাগাবেন বলে। উনারা গল্প করতে করতে শুয়ে পড়লেন। হুজুর শেষ রাতে বৃষ্টি হওয়ার আগেই টিনটি কাউকে দিয়ে লাগিয়ে ফেলেন। উনারা দুইগুরু ভাই বৃষ্টির আওয়াজ পেয়ে উঠে এসে দেখে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক দরবারের বারান্দায় হাটছেন এমন সময় উনাদেরকে দেখে বলেন ‘শাহ্ সাহেব কাম শেষ করে গফ (গল্প) করা ভাল না?’ উনারা সরমিন্দায় মাথা নথ করে ফেলেন। এ ঘটনাটি  সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ বহুবার স্মৃতিচারণ করেন। একদিন সরারচর আস্তানায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন যে মুর্শিদের বিভিন্ন দিক নিয়ে তখন দুই গুরুভাই সিদ্ধান্তে উপনিত হন “আমার জন্য আমার  আল্লাহ্ই যথেষ্ট”।  সূফী সাধক কামরুল হাসান বলেন – বড়ভাই মিরপুর আস্তানা শরীফ থেকে প্রকাশ শুরু করেন তবে দুই গুরুভাই অটল ছিলেন- আছেন। একদিন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ ইচ্ছা প্রকাশ করেন- শাহ্ সাহেব চান্দপুর রওজা শরীফ এর সামনে একটি ঘর করলে দুইভাই অনুষ্ঠানে বসতে পারবো সেই কারণে সরারচরে শাহ্ সাহেব ঘর করলেন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ নামকরণ করেন। সরারচরের শাহ্ সাহেবের ডাক নাম ‘মেরাজ’ থেকে ‘মিরাজ’ রাখেন নাম দেন সেই ঘরের এবং দু’জনই একসাথে দুই দিন রাত্র যাপন করেন চান্দপুর শরীফে সূফী সাধক আনোয়ারুল এর ভক্ত মহাসম্মেলন অনুষ্ঠানে।  দুই গুরুভাই এর সম্পর্ক এমনই ছিল যেকোন সিদ্ধান্ত নিতেন বিশেষ ক্ষেত্রে একমত ছিলেন। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ত্যাগ করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ধরে রাখেন। এমনই ভাবে সূফী সাধক কামরুল হাসান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ত্যাগ করে সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন এর রওজা শরীফের পুরো কাজ সম্পন্ন করেন। পাশা পাশি শাহ্ আব্দুর রহমান (আগরপুর), শাহ্ সিরাজুল ইসলাম কোরাইশী (কালিকা প্রসাদ), মাওলানা শাহ্ সূফী মোখলেছুর রহমান (দেওকুল এর শাহ্ সাহেব), সম্রাট ওলী  আছমত আলী চৌধুরী (ছাতিরচরের শাহ্ সাহেব)আনোয়ারী পাগলী(কটিয়াদী), শাহ্ সূফী শেখ আব্দুর রহমান দেওয়ানী (মন্ডলেরভাগ চান্দপুর শরীফ), টহু মামু (নূরপুর তেঘরিয়া), ভাগলপুরের দেওয়ান সাহেবের, মাদার শাহ্ এর (গোবিন্দপুর, তেঘরিয়া) রওজা শরীফ এবং  সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এর  রওজা শরীফ এর মূল রওজা সহ এ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে পুকুর মাটি ভরাট সহ অন্যান্য কাজ।  সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ এঁরও সূফী  সাধক কামরুল হাসান এর উপরোক্ত নির্মাণ কাজের পূর্ণ সর্মথন সহ চান্দপুর শরীফে (লিটন শাহ সাহেব ছোট ছিলেন বলে) এর সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন সরারচরের শাহ সাহেব এবং সূফী সাধক শেখ হানিফ এও বলেন একা আমার ঢাকা থেকে এগুলো করা সম্ভব ছিল না। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এর লোকান্তরিত হওয়ার পর ধানমন্ডি দরবার হতে চান্দপুর শরীফে নিয়ে আসার ব্যাপারে অনেক বাধা অতিক্রম করে সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ  সূফী সাধক কামরুল হাসান এর বিশেষ চেষ্টায় সূফী সাধক আনোয়ারুল হককে চান্দপুর শরীফ নিয়ে আসা হয় এবং সেখানে রওজা শায়িত হন।

হাক্কানী  চিন্তা চেতনায় দুই গুরু ভাই এক ছিলেন তবে সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ বলেন- চলা চলে বিভিন্ন সময় মত পার্থক্য হয়েছে আমাদের মধ্যে কিন্তু ব্যাক্তিগত সম্পর্কের নয়। একবার ইউনাইটেড হাসপাতালে  সরারচরের শাহ্ সাহেব আড়াই দিন ভর্তি ছিলেন। সেখানে সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ এর হুকুমে চিকিৎসার খোজ খবর রাখেন মিরপুর আস্তানার ভক্ত হাসান সাহেব। ২০১৪ সালের প্রায় এক মাস আগে  সূফী সাধক কামরুল হাসান কিছু দিন শারীরিক কিছু বিষয় নিয়ে মিরপুর আস্তানা শরীফ গুরু ভাই এর কাছে আসেন এবং এক টানা সাত দিন রাত্র যাপনও  করেন। শুরু হল আরেক প্রেক্ষাপট ২০১৪ সালের ১ লা অগাস্ট সরারচর আস্তানা শরীফে সূফী সাধক কামরুল হাসান এর উপর বর্বর হামলা করেন আস্তানার কতিপয় লোক। উনাকে মৃত্যু কোলে ঢেলে দিয়ে সিংহাসন (সরারচর আস্তানা শরীফ) দখলে ক্ষমতা গ্রহনের উদ্দেশ্য ছিল। ঐ দিনই ভর্তি হলেন আনোয়ার খাঁন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। তাৎক্ষনিক চিকিৎসার সকল দায়িত্বে ছিলেন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এর হুকুমে শাহ্ সূফী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবাহ-উল ইসলাম। উনি নিয়মিত ভাবে একটি মাস হাসপাতালের চিকিৎসার খবর রাখেন এবং সবসময় সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফকে অবগত করেন। সূফী সাধক কামরুল হাসান এর সকল বিষয়ে সবসময় সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ খোজ খবর রাখেন লোকান্তরিত হওয়ার  আগ-মূহুর্ত পর্যন্ত। সরারচর আস্তানার কতিপয় ভক্ত চক্রান্তের কারণ জানতে চাইলে

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন – আরে ক্ষমতার জন্য ধানমন্ডি দরবারে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক হুজুরকে কতিপয় ভক্ত তিন দিন আটকে রাখেন তার পরিনতিও উনি দেখেছেন বলেন। চলতে থাকে হাক্কানী সম্পর্ক। হাক্কানী ধারায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফের ইচ্ছায় যদিও শারীরিক গোপনীয়তার মধ্যে দিয়েও পূর্ণাঙ্গ সময় দেন সূফী সাধক কামরুল হাসান। সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন এর মহা সম্মেলন ফরিদপুর শরীফে একএে একঘরে পাশাপাশি বিছানায় তিন দিন অবস্থান করেন দুই গুরু ভাই। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর- ৮০ তম আবির্ভাবের কাফেলায়ও উপস্থিত ছিলেন সূফী সাধক কামরুল হাসান তাঁর ভক্ত বৃন্দ সহ। সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ একদিন বাহাখাশ এর ক্রেন্দ্রীয়  কমিটির সদস্য দলকে বলেন- চান্দপুর শরীফ যাচ্ছেন আসার সময় সরারচর শাহ্ সাহেবকে দেখে ফরিদপুর শরিফ হয়ে ঢাকা আসার হুকুম দিলেন। আনুমানিক ২০১৭ সালে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ সহ অন্যান্য কমিটির ব্যক্তিবর্গ সহ দরবারের তিনতলা সভা কক্ষের সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ সবার উদেশ্যে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। হঠাৎ বলেন – ‘আপনারাতো মনে করেন যে আমি শুধু মিটিং মিটিং নিয়ে থাকি- আরেকজন সরারচরের শাহ্ সাহেব সারা দিন বসে থাকে, আপনারা উপলব্ধি করে দেখে আসেন আমি মিটিং করি এবং উনি বসে থেকে কি করেন?’ সরারচর আস্তানা শরীফের প্রথম দিকে (১৯৮৫) সবুজ ঘর ও সাদা ঘর ছিল । সবুজ ঘরে থাকতেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। সাদা ঘরে থাকতেন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এবং সূফী সাধক কামরুল হাসান (৩৫ বছরে)  প্রায় ১০০ দিন একসাথে এক বিছানায় অবস্থান করেছেন – এই যে দুই গুরু ভাইয়ের সম্পর্ক। সূফী সাধক কামরুল হাসান বলেন-  ‘সত্যমানুষ কূল অর্থাৎ সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন+ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক+সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ + সূফী সাধক কামরুল হাসান একই ফ্রেমে বাধা’। হাক্কানী সম্পর্ক এভাবেই যুগ হতে যুগান্তরে সদা বহমান সদা চিরন্তন। এ সংযোগ ও সম্পর্কেও শেষ নেই। এ এক অনন্ত পথযাত্রা সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায়। 

স্ব-ভাব

মানুষ জন্মাবার পর পারিপার্শ্বিকতা হতে তার অভ্যাস গড়ে তোলে। প্রথমে সে চোখকে বেশি কাজে লাগায়। অনুকরণ ও অনুসরণ করতে চেষ্টা করে পরিবারের সদস্যদের এবং চোখ দিয়ে যা দেখছে সেগুলোকে। অতঃপর চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের সহযোগিতায় হাত, পা, মুখ, পায়খানা ও প্রসাবের রাস্তা সমূহের দ্বারা বিভিন্ন কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। যখনই কোন কর্ম করে তখনই সে সুখ, দুঃখ বা ঔদাসীন্যের সঙ্গে জড়িত হয়, কর্মফলের উপর নির্ভর করে। এভাবেই ধীরে ধীরে সে বড় হতে থাকে পরিবেশগত কর্মের মাধ্যমে। গবেষকদের মতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ৫ (পাঁচ) হাজার হতে ৭ (সাত) হাজার কর্মের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে প্রতিদিন। প্রতিদিনের এই কর্মগুলোর মধ্য দিয়েই একই পরিবেশ অন্তর্ভূক্ত কর্মের বারবার বাস্তবায়নে তার গড়ে ওঠে অভ্যাস। এই অভ্যাসের প্রকাশ ভঙ্গিতেই আস্থা গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে স্ব-ভাবে পরিণত হয়। ধর্মীয় আঙ্গিকে স্ব-ভাবের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্ব-ভাবকে দুই ভাগ করে সৎ স্ব-ভাব ও মন্দ স্ব-ভাব বলা হয়েছে এবং সৎ স্ব-ভাবের উপর বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সর্বযুগে-সর্বকালে সকল ধর্মে।

ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে সরাসরি সৎ স্ব-ভাবের উপর জোর দেয়া হয়েছে আত্মিক উন্নতির জন্য। নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন ঃ

– সৎ স্ব-ভাবই ধর্ম।

– সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট কার্য সৎ স্ব-ভাব।

– সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট গুণ সৎ স্ব-ভাব।

– সৎ স্ব-ভাবের বলে মানুষ ‘ছায়েমুদ্দাহার’ অর্থাৎ সারা বৎসর সিয়াম পালন করার এবং ‘ক্বায়েমুল্লাইল’ অর্থাৎ সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে এবাদত করার ফযিলত ও ছওয়াব লাভ করতে পারে।

ধর্মীয় গবেষকগণ সৎ স্ব-ভাবের পরিচয় বা তত্ত্ব বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হয়ে নানা মত ও পথের জন্ম দিয়েছেন নিজেদের জানা ও উপলব্ধিবোধ হতে। যেমন – হাসি মুখ, কষ্ট সহ্য করা বা অত্যাচারে প্রতিশোধ না নেয়া সৎ স্ব-ভাব। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলো এক একটি শাখা বা লক্ষণ কিন্তু সৎ স্ব-ভাবের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নয়।

মানুষ প্রাকৃতিক নিয়মেই জন্ম নেয়। পরবর্তীতে নিজের এক এক রূপ সৃষ্টি করে বিবর্তনের ধারায়। পরিবেশকে মোকাবিলা করার জন্যে কর্ম করে। কর্মের মধ্য দিয়েই তার দেহ শক্তিশালী হয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রকৃতি ও বৃত্তিগুলি সমভাবেই বিকশিত ও স্ফূর্ত হয়। এই বিকাশের ধারা থেকেই বিভিন্ন অঙ্গের শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, নিয়ন্ত্রণ শক্তি এবং প্রবৃত্তি জেগে উঠে। এদের মাঝে সমতা এবং সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্য আবির্ভাব ঘটে বিচার শক্তির। এই চার শক্তির কোনটা কম বা বেশি থাকলে স্ব-ভাব গড়ে উঠে না অপূর্ণ থাকে। কম হলে দুর্বল বা অকর্মণ্য হয় আর বেশি হলে কুৎসিত আকার ধারণ করে এবং তা তার কর্মের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। একই তালে চারশক্তির প্রবৃদ্ধি যখন ঘটে একটা কর্মকে কেন্দ্র করে তখনই গড়ে ওঠে স্ব-ভাব। স্ব-ভাব দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং তা যথাক্রমে সৎ স্ব-ভাব ও অসৎ স্ব-ভাব। এই দুই স্ব-ভাবের মধ্যে ব্যবধান নির্ণয় করার জন্য কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। ব্যক্তি যখন তার কর্ম অঙ্গগুলো সজাগ রাখে, তার বিচার শক্তি দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং প্রতিটি কর্ম বিশ্লেষণ করে তখনই তার মধ্যে চিন্তাজগতে দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয় আর এই দ্বন্দ্বই তাকে সৎ-অসৎ পথের সন্ধান দেয়।

যখনই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় প্রতিটি কর্মকে ঘিরে তখনই সৎ সংসর্গে আসা একান্ত আবশ্যক যিনি সংশোধনের জন্য পথ দেখান। তিনি অসৎ পথগুলোর ব্যাখ্যা করেন এবং পারিপার্শ্বিকতা গড়ে তুলতে অসৎ হতে সৎ পথের যাত্রীকে সহযোগিতা করেন। এছাড়াও যখন কেহ কর্ম বিশ্লেষণ করে নিজেকে উপলব্ধির পর্যায়ে উন্নীত করেন তখন তার কর্মগুলো খারাপ হতে পারে না। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং চিন্তাজগতকে সঠিক পথে চালাতে পারে। এইভাবে কোন কাজের অভ্যাস করতে থাকলে পরিশেষে ওই অভ্যাসই তার স্ব-ভাব হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কারণেই বলা হয় অভ্যাস দ্বিতীয় স্ব-ভাব। এখানেই অনুসন্ধিৎসু মানুষ পথ প্রদর্শক খোঁজে এবং মুর্শিদের সন্ধান করে আত্মসমর্পণ করে আত্মিক উন্নতির জন্যে। মুর্শিদ তাকে পথ দেখায় – আল্লাহ্ প্রেমের সন্ধান দিয়ে।

শরীর অসুস্থ হলে ভাল খাবারও যেমন মুখে খারাপ লাগতে পারে অরুচির জন্যে, ঠিক তেমনি চিন্তা ও চেতনায় খারাপগুলো অনুপ্রবেশ ঘটালে আল্লাহ্ প্রেম হতে সে দূরে থাকবে। তার ভাল লাগবে না আজ্ঞাবহ হতে।

চিন্তাজগতকে একরৈখিকতায় কার্যকরী করে যে সমস্ত কাজ করা যায় তার একটা প্রভাব অভ্যন্তরীণ চেতনায় বিস্তার লাভ করে। ফলে ব্যক্তি এক অনির্বচনীয় জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন – আল্লাহ্র নির্দেশ আনন্দের সাথে পালন কর। যদি না পার তবে জবরদস্তি সহকারে পালন কর, কেননা এই জবরদস্তি করার মধ্যে প্রচুর পুণ্য রয়েছে।

সাধনা এবং পরিশ্রম দুটোর সাহায্যেই ফিরিশতার স্ব-ভাব ও গুণ অর্জন করা যায় এবং আধ্যাত্মিক জগতই মানবজাতির মূল উৎপত্তিস্থল। ধন-দৌলত এবং পার্থিব প্রতিপত্তির মোহে মত্ত থাকিলে নিকৃষ্ট স্ব-ভাব গড়ে উঠে। সেই নির্বোধ যে নিজের সম্বন্ধে ভাল ধারণা পোষণ করে, নিজকে বহু গুণের অধিকারী বলে মনে করে ও নিজের মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি আছে বলে মনে করে না। বুদ্ধিমান সেই যে নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে সজাগ থাকে।

“একদা এক জিহাদ হতে আসার পর সাহাবাগণকে নবী মুহাম্মদ (সঃ) জিজ্ঞাসা করলেন – আমরা ছোট জিহাদ হতে আসলাম, না বড় জিহাদ হতে? সকলে আরয করলেন – ইয়া রাসুলাল্লাহ্ (সঃ),বড় জিহাদ কি? তিনি উত্তর দিলেন – নিজের নফস্ বা প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করাই বড় জিহাদ।” যত বড় দুর্দম্য এবং অবাধ্য প্রজাতি হোক না কেন নফস্ বা প্রবৃত্তি তদপেক্ষা অধিকতর অবাধ্য। তাই শক্তির লাগাম হতে অধিকতর শক্ত লাগাম দিয়ে নফস্কে সর্বদা বশে রাখা আবশ্যক। আর এর জন্য মুর্শিদের উপদেশ নামক অধিকতর শক্ত লাগামটি সর্বোৎকৃষ্ট।

এই আলোকে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সৎ স্ব-ভাবের কি প্রয়োজন তা একটু চিন্তা করলে বেশ বুঝা যাবে। মা-বাবা সৎ স্ব-ভাবী হলে ছেলে-মেয়ে সৎ স্ব-ভাবী হতে বাধ্য। এভাবে প্রত্যেকটি পরিবার সচেতন হলে সমাজ সচেতন হবে এবং সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলে যাবে। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় জীবনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন কর্ণধারদের অবশ্যই সৎ স্ব-ভাবী হতে হবে। তাঁদের সৎ স্ব-ভাব থাকলে তারই স্পর্শে প্রশাসনিক ধারায় সৎ স্ব-ভাবের প্রভাব পড়তে থাকবে যা শুধু সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করবে না বরং আত্ম-উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।

পৃথিবীর সকল চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় কিন্তু নিজের বিবেককে ফাঁকি দেয়া যায় না। তাই মানুষ সংসার জীবনে শুধু লোভ আর মিথ্যা অহং ভাবের বশবর্তী হয়ে বিবেকের তাড়নাকে ঢাকা দেয়ার জন্য অভিনয় করে যাচ্ছে মাত্র। ব্যক্তি জীবনে প্রত্যেক মানুষই ধর্মপালন করে যাচ্ছে আর সেটা হচ্ছে তার মোহাচ্ছন্নতার ইচ্ছাধর্ম। পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু তাতে তার লোভ ও অহংকার দিন দিন বাড়ছে বই কমছে না। ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলে শব্দটা বই পুস্তকে রয়ে যাচ্ছে কিন্তু ব্যক্তি জীবনে এর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণকে স্ব স্ব জীবনে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে চোখ। এই চোখই যতো নষ্টের গোড়া আবার এই চোখই সাধারণ মানুষকে আত্মিক উন্নতিতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে স্ব-ভাব গড়াতে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির স্ব-ভাবের পরিবর্তন দলের উপর প্রভাব বিস্তার করতে করতে সমগ্র জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করে জাতীয় জীবনে এক মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। তাই প্রয়োজন নেতৃত্বদানকারী নেতা-নেত্রীর সত্য ও দৃঢ় প্রত্যয়ী স্ব-ভাবী হওয়া। বিপদে পড়লে মানুষের চরিত্রের অনেক গোপন রহস্য উদ্ঘাটিত হয় আবার প্রকৃত বন্ধুও চেনা যায়।

আমাদের স্মরণে রাখতে হবে দেশবাসী না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তারা একটু শান্তি চায়, একটা সুন্দর পরিবেশ চায় যেখানে সার্বিক আতঙ্কমুক্ত থাকতে পারা যায়। আসুন, আমরা সৎ স্ব-ভাবী হওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের পথে পা রাখি।

সত্যমানুষতত্ত্ব

শাহ্ শাহনাজ সুলতানা ॥ ‘সূফী মানে সত্যমানুষ। মানবপ্রজাতির মধ্যে আবহমান কাল ধরে সত্যমানুষের স্বরূপের সমাহারই সূফীজম বা সূফীতত্ত্ব বা সত্যমানুষতত্ত্ব। স্বরূপ ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত যে জন তিনিই সত্যমানুষ। তিনি বর্তমান। তিনি প্রাকৃতিকরূপে বিরাজমান। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সত্য ছাড়া কিছুই দেখেননা। একেকজন একেক জনপদে আসছেন তিনি তাঁর মত করে তাঁর জনপদের উত্তরণ ঘটিয়ে যাচ্ছেন। এসবের সমাহারই সত্যমানুষতত্ত্ব। এটাই ঘটছে। এটাই আধ্যাত্মিকতা’। (-সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ)

সত্যমানুষতত্ত্বের আধুনিক ও যুগোপযোগী রূপরেখা প্রণয়ণে নিরলস কাজ করেছেন বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) তত্ত্বাবধায়ক প্রধান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ। সত্য অন্বেষণকারীদের প্রতি সত্যমানুষের বাণী, আহ্বান হাক্কানী স্কুল অব থট বা হাক্কানী চিন্তনপীঠ এর অন্তর্ভূক্ত। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে যা বলা হয় তা হচ্ছে হাক্কানী চিন্তন ধারা। এই ধারা থেকে বলা হচ্ছে-সবার উপরে সত্যমানুষ, তাঁহার উপরে নাই।

সত্যমানুষতত্ত্বের আধুনিক রূপরেখার স্বরূপ কি? যে ব্যক্তি যে রূপে আপাদমস্তক পরিপূর্ণ থাকেন সেটাই তার স্বরূপ। তিনি সেটাকে লালন করেন। যুগোপযোগী করেন। জ্ঞানার্জন করেন এবং প্রতিটি সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অর্জনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন এবং এগিয়ে যান। সত্যকে খুঁজতে গিয়ে কালে কালে কর্মের মধ্যে সত্যমানুষের স্বরূপের আধার অন্বেষণ করলে দেখা যায় তাঁরা পথ দেখিয়েছেন শান্তির। শান্তির পূর্বশর্তই হলো সত্য। যিনি যে কর্মে তার সত্যকে ধারণ করেছেন তিনি সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে যান একজন সত্যমানুষ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একেকজন একেক সত্য নিজের মধ্যে ধারণ করে লালন-পালনের ধারায় মানবজাতির জন্য নিজেকে প্রকাশিত ও বিকশিত করেছেন। সত্য প্রচার, প্রসার ও বিস্তার করেছেন। এখানেই সত্যমানুষতত্ত্বের নিগূঢ় কথা। সত্যমানুষ প্রাকৃতিকভাবে বিরাজমান এবং তিনি বর্তমান। বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন সম্পর্কের বেড়াজালে নিজেকে প্রকাশিত করেন। কেউ বলেন প্রাণের সখা, সুখ-দুখের সাথী, দয়াল, বন্ধু, সঙ্গের সাথী, দয়াল মুর্শিদ, বাবা, ভাই, মামা, এমন বহু নামের আড়ালে তিনি তাঁর কর্ম করে যান এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে মানবজাতির কল্যাণে বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে শান্তির জন্য আহবান রাখেন। সাধারণ মানুষ নানাভাবে তাকে ডেকে সম্বোধন করে মুক্তির পথ খুঁজেন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন- ‘আমি যারে চাই তার ভাবের অন্ত নাই- আমি যারে পাই তার রূপের অন্ত নাই’। আর তাই সত্যমানুষ নিরানন্দের মাঝে আনন্দের উৎস হন।

সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন- ধর্ম এবং ধর্ম্ম এক নয়। ধর্ম্মে ধারণের ব্যাপার আছে। এখানে ধর্ম কি? অনুভূতিসম্পন্ন হওয়া। এক বা ওয়ান সর্বোচ্চ শক্তি লক্ষ্যকে পাওয়ার ক্ষেত্রে। ওয়াননেস উয়িথ ওয়ান। নেশা খারাপ কিন্তু এক এর নেশা ভালো। অন্যের চিন্তা যখন নিজের চিন্তাকে উদ্ভাসিত করে তখন মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে। আমি যে মানুষ আমার যে সৌন্দর্য আছে, নিজের অবয়বের মধ্যে যা আছে নিজের সৌন্দর্যের মধ্যে নিজে পাগল থাকতে পারছিনা। প্রত্যেক কর্মে নিষ্ঠা খুব কঠিন জিনিস। কর্মের মধ্যে নিষ্ঠা থাকলে এবং নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেলে তার ফল পাওয়া যায়। যেটা শিখবেন, ভালমত শিখবেন। মায়ার বন্ধন, শ্রদ্ধার বন্ধন এবং ভাবের বন্ধন কি এক হতে পারে?

কখন মঙ্গলপ্রদীপ জ¦ালানো হয়? যখন একটা অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সূর্যাস্তের সময় এবং সূর্যোদয়ের সময়। সব আছে কিন্তু নিষ্ঠার অভাব। নির্দেশিত পথে চলা খুব কঠিন। ক’জন পারে? নিজের ইচ্ছায় সবাই চলতে পছন্দ করে। আবার যখন নিজের ইচ্ছায় চলে তখন বলে আল্লাহ আমায় দেখছেনা।” এভাবেই সত্যমানুষ যুগে যুগে কথা দিয়ে, বাণী দিয়ে সাধারণ মানুষদের দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলা হচ্ছে- সত্যমানুষের কর্ম হলো সমাজ সংস্কার করা। সুতরাং সত্যমানুষ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। যার দুটি দিক আছে। অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান যেখানে তাঁর সত্যের সাথে একাত্মতার কর্মপ্রণালী বিদ্যমান। অন্যটি হচ্ছে বাহ্যিক প্রতিষ্ঠান। মিশন স্কুল, কলেজ, গবেষণাকেন্দ্র, স্বাস্থ্য সেবা, হাক্কানী চিন্তনবৈঠক এর মাধ্যমে সমাজে সংস্কার মূলক কাজ করে যাওয়া এবং সম্পৃক্ত করা।

হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলা হয়েছে -“হক থেকে হাক্কানী। সত্য এবং সত্যের সাথে একাত্মতা। মহাসত্যের পথ। এই সত্যকে খুঁজতে গিয়ে যুগে যুগে কালে কালে কর্মের মধ্যে সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন সত্যমানুষ। নিজের মধ্যে একটি সত্যকে যখন ধারণ করে লালন করা হয় তখন দেখা যায় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগ, সংযোগ, সম্পর্ক হয়েছে। এই অবস্থায় আমরা দেখতে পাই সূফী সাধক আজানগাছী, সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রত্যেকেই এক একটি প্রতিষ্ঠান এবং এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত ও বিকশিত হয়েছে। সত্যমানুষ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে দ্বীন ও দুনিয়া এক করে ফেলেন। দ্বীনের মধ্যে দুনিয়াকে চাদরের মধ্যে আবৃত করে ফেলেন।”

মানুষের অন্বেষণ হচ্ছে শান্তি নিয়ে। চিন্তনপীঠে থেকে বলা হয়েছে- “যত রাসুল এসেছেন সবাই ইসলাম মানে শান্তি বলেছেন কিন্তু ধর্ম মানে শান্তি বলেননি। সূফী সাধক আজানগাছী এটাকে উপলব্ধি করেছেন। তৎকালীন সময়ে চার তরিকার সকলের সাথে সমন্বয় করেছেন। তাদের আদর্শ নীতি জেনেছেন। সকল ধর্মের সারাংশ হলো সত্যদর্শন। সেই সত্যের ধারাবাহিকতা এগিয়ে নিয়ে গেছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। সত্যদর্শন নিজের জীবনে লালন পালন করলেন। তিনি সত্যকে আলিঙ্গন করলেন। প্রধান শিষ্য সূফী সাধক আনোয়ারুল হককে বেছে নিলেন। হাক্কানীতে এমন কোন তরিকা নেই যার জিস্ট নেই। বর্তমানে যে ধারা চলছে তাতে ইসলাম মানে শান্তি এটা স্থাপন করা যাবেনা। এটা ভেবেই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে কাছে যতজন গেছেন তাদেরকে তিনি দুইভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

১. প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২. আধ্যাত্মিকভাবে।

প্রাতিষ্ঠানিক এবং আধ্যাত্মিক দুইভাবে সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসোবে কর্ম করেছেন তাঁর অন্যতম শিষ্য সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ। হাক্কানী চিন্তনপীঠে বলছে – সত্যকে যিনি আলিঙ্গন করেন তিনি হাক্কানী। একটা সত্যকে যিনি ধারণ লালন করেছেন তিনিও হাক্কানী পথের যাত্রী। সকল কর্মকান্ডে সত্য প্রতিষ্ঠা করার পিছনে যিনি সর্বক্ষণ নিয়োজিত তিনি হাক্কানী। যারা ধারন করেন, লালন করেন তাদের কাছে সবই সত্য। যে সত্যের অন্বেষণ করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের খলিফা আবু বকর হলেন ছিদ্দিক। এটা আর কেউ পায়নি। লক্ষ্য কি? আশু লক্ষ্য কি? চূড়ান্ত লক্ষ্য কি? এটা কি মুখের কথা? এই সত্য নিয়ে সূফীজমের কনসেপ্ট নিয়ে আবু আলী আক্তার উদ্দিন বাংলার মাটিতে পা রাখলেন এবং পরবর্তীতে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে তুলে দিলেন। ১৯৯০ সনে প্রতিষ্ঠা পেল হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

যোগ্যতা দেখা হয় হাক্কানীতে। কতটুকু সত্য নিয়ে তিনি সমাজে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং কতটুকু নিজের পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। পৃথিবীর বুকে যত তরিকা এসেছে সত্য ছাড়া চলতে পারবে না। যিনি ধারন করতে পেরেছেন তাদের কাছে পরম পাওয়া। নিজের মধ্যে যে অভ্যাসগুলো গড়ে উঠেছে তা কি এক-কে কেন্দ্র করে? যতক্ষণ পর্যন্ত হাবুডুবু খাবে ততক্ষণ হবে না। মোবাইল এসেছে। এ সংস্কারকে মেনে নিতে হবে। হাক্কানীর কথা এর উর্ধ্বে যাও। দেখ, সত্য তোমাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে?

কোরানিক মুসলিম মানে ভদ্র শান্ত। কোরান মানে পাঠ করা। আমি প্রতিদিন কি পাঠ করছি? আমি প্রতিদিন আমার এক কে পড়ছি কিনা? এটা যার যার উপলব্ধির ব্যাপার। আল্লাহ পাগল তাঁর পাগলের জন্য। সত্যকে আলিঙ্গন না করলে কেউ শান্ত হবে না। অর্ধসত্যে থাকলে ছল চাতুরি আশ্রয় নিতে হবে। শান্তি আনতে গেলে শান্ত হতে হবে। যেখানে যে সত্যের উপরে দাঁড়িয়ে আছে সে থাকবে নির্ভীক। কাউকে ভয় পাবেনা। স্বশিক্ষায় উদ্ভাসিত করতে না পারলে উপলব্ধি আসবেনা। যার যত কর্মের প্রতি অনুসন্ধিৎসুতা থাকবে, একনিষ্ঠতা থাকবে তার তত উপলব্ধি আসবে। মানুষ হিসাবে যে শক্তি ছিল তা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। কিভাবে উপলব্ধি আসবে? আর যারা সংযোগে থাকবে আপাদমস্তক যে আবরণে আছে তারা বিশ্লেষণ করতে পারবে কোনপথে আছে।”

সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন- ‘সত্য বের করা কঠিন। সত্যমানুষ হওয়া আরও কঠিন। নিজের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে নিজের সত্যকে বের করতে হয়’। এজন্যই আহবান রেখেছেন – ‘সত্যমানুষ হোন – দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’।

প্রার্থনা

॥ শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥

এক শিশু একটি ফুল পেয়েছিল। ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে সে যা চাইতো তা-ই পেত। একটি পাপড়ি ছিঁড়ে শিশুটি বলল – ‘খেলনা চাই, অনেক-অনেক খেলনা’। অমনি আকাশ থেকে এত খেলনা আসতে থাকলো যে, সে খেলার মতো খালি জায়গাই পেলো না। তাড়াতাড়ি সে আর একটি পাপড়ি ছিঁড়ে বলল -‘সব খেলনা ফিরিয়ে নাও’।

এক দম্পতীর ৪০তম বিবাহ বার্ষিকীতে স্বয়ং বিধাতা এসে বললেন, ‘তোমাদের প্রেমে আমি সন্তুষ্ট। আমার কাছে কিছু একটা চাও তোমরা, যা চাও তা-ই পাবে। স্ত্রী বললেন, ‘আমি আমার বরের সঙ্গে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে চাই’। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বভ্রমণের সরঞ্জাম পেয়ে গেলেন। স্বামী একটু ভেবে-চিন্তে বললেন, ‘আপনি যা দিলেন তা অতি চমৎকার, কিন্তু আমি চাই আমার স্ত্রী যেন বয়সে আমার থেকে ২৫ বছরের ছোট হয়’। বিধাতা বললেন, ‘তথাস্ত’ সঙ্গে সঙ্গে সে ৯৩ বছরের বৃদ্ধ হয়ে গেল।

এক অন্ধ ভিখারিকে বিধাতা বলেলেন, ‘দেখ হে! আমি তোমার উপাসনায় সন্তুষ্ট। তুমি কিছু একটা চাও কিন্তু একটিমাত্র জিনিসই চাইতে পারবে’। ভিখারি খুব বিপদে পড়ে গেল। কী যে চাইবে, কিছুতেই ঠিক করতে পারল না। একবার ভাবল দৃষ্টি ফিরে চাইবে, আবার ভাবল টাকাকড়ি চাইবে, আবার ভাবল দীর্ঘজীবন চাইবে কিন্তু কী যে চাইবে ঠিক করতে পারল না। অগত্যা সে বলল, ‘আমি একদিনের সময় চাই’। বিধাতা বললেন – ‘তথাস্ত’।

মানুষ তার অসহায়ত্বকে অতিক্রম করতে পারে না। জীবন চলার পথে প্রত্যেকে অনুভব করে, আমাদের সমস্যার সমাধান, সুরক্ষা এবং বিভিন্ন চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তির সাহায্য প্রয়োজন। তাই আমরা সাহায্য পার্থনা করি।

যে ছাত্র পড়াশোনা করে না, পরীক্ষা দেয় না, সে যদি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে পরীক্ষা পাশের সনদ চায় তবে সে প্রার্থনায় অধ্যক্ষ ছাত্রের প্রতি আরো রুষ্ট হবেন, এটাই স্বাভাবিক। অধ্যক্ষের সাথে আমরা বিদ্রুপ করতে পারি না। মানুষকে সফলতা দেয়ার দায়িত্ব বিধাতা নেন নি। আমরা যদি মেনে নেই যে, বিধাতা আমাদের কোনো কোনো প্রার্থনা গ্রহণ করেন আর কোনো কোনো প্রার্থনা গ্রহণ করেন না তবে তা ভুল। মানুষ তার কর্মের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। মানুষ নিজেই তার কর্মফল তৈরি করে।

বিধাতা তাই চান যা আমরা চাই। তা-ই করেন যা আমরা নিজেরা নিজেদের জন্য নিজেরা করি। আমাদের কোনো কর্মে বিধাতা হস্তক্ষেপ করেন না। কোনোদিন করবেনও না। বিধাতা আমাদের কর্মের দ্রষ্টা, স্রষ্টা নন। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু জীবনে যা কিছু সৃষ্টি হয় তা আমাদের দ্বারাই হয়। যদি তিনিই আমাদের কর্মের স্রষ্টা হবেন তাহলে কেমন করে তিনি আমাদের যোগ্যতা বিচার করবেন? বিধাতা আমাদের পালনকর্তা। কিন্তু তিনি আমাদের সেভাবেই পালন করেন যেভাবে আমরা চাই এবং যেভাবে পালিত হওয়ার যোগ্যতা আমরা অর্জন করি। তিনি যদি তার ইচ্ছামতো আমাদের পালন করেন তাহলে কীভাবে তিনি সত্য? আমার জীবনের চৌহদ্দিতে আমার ইচ্ছাই বিধাতার ইচ্ছা। আমাদের যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই জীবনযাপন করতে পারি, করছিও তাই। এখানে বিধাতার করার কিছুই নাই। প্রার্থনা করার আগে এটা উপলব্ধিতে আসতেই হবে যে বিধাতার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার নেই, চাওয়ার কোনো তাৎপর্যও নেই।

এটিই সবচেয়ে বড় প্রহেলিকা যে, আমরা মনে করি আমাদের জীবনে যা কিছু হচ্ছে তা তিনিই করছেন। যত বিপদ-আপদ আসছে তা তাঁর কাছ থেকেই আসছে। যত সফলতা আসছে তা তাঁর কাছ থেকেই আসছে। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। আর তা হতেও পারে না। বিধাতা খেলা দেখেন কিন্তু কারো পক্ষ হয়ে খেলেন না। শেষ বলে চার রান হলেই খেলায় জিত। বিধাতার কাছে কোটি মানুষ হাত তোলে ‘প্রার্থনা’ করতে পারে। চার দেয়ার ক্ষমতাও তাঁর আছে কিন্তু কারো ‘প্রার্থনায়’ সাড়া দিয়ে চার দিলে যে অন্যায় পক্ষপাতিত্ব হয়, তা বিধাতা কদাপি করেন না। কোটি কোটি মানুষের ‘প্রার্থনার’ চেয়ে সত্য অনেক বড়।

সাময়িক আবেগে ‘প্রার্থনা’ কিংবা অন্যের শিখানো তথাকথিত যেসব ‘প্রার্থনা’ আমরা আবৃত্তি করি তা যে ছাদ পর্যন্তও পৌঁছায় না তা আমরা জানি। কিন্তু ‘যা চাইবো তা-ই পাবো’ এই সুযোগ কিংবা ‘বিশ্বাস’ যদি আমাদের থাকে, তাহলে ‘কী চাইবো’ তা নির্ণয়ের জন্য আমাদের সময় চাইতে হবে। আমরা জানি না প্রকৃতই কী চাই। অর্থ, বিত্ত, খ্যাতি সহজেই সবাই চাইতে পারি। কিন্তু কী পেলে যে আর কোনো অভাববোধ থাকবে না, তা আমরা জানি না।

আমি যা চাই তা-ই আমার সত্য। আমার সত্য কোনটি?

আমার সত্য আমার কাছে রহস্য, গুপ্ত। বিধাতা আমার কাছেও আসেন কিন্তু চাওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত নই। তাই আমি ভিখারির মতো বলি – ‘কী যে চাই তা জানার জন্য সময় চাই’। মানব জীবনটাই ‘কী যে চাই’ তা নির্ণয়ের সময়।

কী চাই, তা-ই যখন জানি না তখন তা পাওয়ার যে কোনো আশাও নাই – তা আমি বুঝি। তাই ‘কী চাই’ এ প্রশ্নই নিজেকে করি বারবার। জীবনকে মন্থন করি, বারবার পাঠ করি, চিন্তায় ঝড় তুলি। আমি কিছু একটা চাই। কিছু একটা অন্বেষণ করি। কিন্তু কী যে খুঁজি, কাকে যে খুঁজি, কী পেলে যে আমি পূর্ণ হবো, তা আমি জানি না। কোনো চাওয়াতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। কিছু একটা চাই কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, আমি যা চাই এ তো তা নয়। যাহা পাই তাহা চাই না। যাহা পাই তাহাই আমার কাছে বোঝা মনে হয়, স্বার্থের টানে। তাই আমার ‘চাওয়ায়’ একটার স্থলে অন্যটা প্রতিস্থাপিত হয়। যা অবলম্বন করে আমি জীবনের স্বপ্ন দেখি তা যখন ছেড়ে দেই তখন আমি ভোগ করি আমার মৃত্যু যন্ত্রণা। বারবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হাঁটছি জীবনের পথে। অথচ আমি এমন কিছু চাই যা পেলে প্রতিস্থাপনের প্রশ্ন উঠবে না।

আমার মধ্যে অ-মৃতের নেশা। মৃত্যুর মধ্যে অ-মৃতের স্বাদ পেয়েছি প্রেমে। কিন্তু প্রেমিক আমি হতে পারিনি হয়েছি শিশু: পাপড়ি ছিঁড়ে বলছি, খেলনা দাও…., হয়েছি কামুক স্বামী, অন্ধ ভিখারি। 

প্রেমিক প্রেমাস্পদের কাছে কী চায়? প্রেমাস্পদ তো চাইবার আগেই জানেন, প্রেমিক কী চায়। তাই সত্যিকার অর্থে প্রার্থনা হলো যখন কোনো প্রার্থনা থাকে না।