ভিতরের পাতা

সন্তুষ্টি আমার সম্পদ

সংলাপ ॥ জীবন চলার পথে আমরা অনেক সমস্যার সম্মুখীন হই, সমস্যার সমাধানও করি কিন’ কিছুদিন পর দেখি সমাধান নিজেই সমস্যা। জীবন ও জগত বহুমাত্রিক কিন’ প্রাত্যহিক জীবনে সমস্যার সমাধানে আমরা সেই বহুমাত্রিকতাকে ধারণ করতে পারি না। যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা সমাধান বের করি সে দৃষ্টিভঙ্গিতেই থাকে দ্বন্দ্ব ও সংশয়। ফলে সৃষ্টি হয় অসনে’াষ। আমরা ভাবতে থাকি এমন কোন অবস্থা কি আছে যা সনে’াষজনক?

যা আছে তা সত্য। যা আছে তার সাথে একাত্মতা – সন’ষ্টি। সন’ষ্টি – চেতনার এমন একটা  উন্মুক্ত ও উচ্চতম স্তর যেখানে ব্যক্তিত্ব দুঃখকে রূপান্তরিত করতে পারে সুখে, শোককে – শক্তিতে, বিরহকে প্রেমে, লোভকে কৃতজ্ঞতায়। সন’ষ্ট ব্যক্তির কোন অভিযোগ থাকে না, যা আছে তার চেয়ে বেশি কেন নেই এ নিয়ে তার কোন উদ্বিগ্নতা নেই। সন’ষ্ট ব্যক্তিত্ব – পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা, আকাঙ্খা, উদ্বিগ্নতা, পরিতাপ, দীনতা ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত। বিনম্রতা ও কৃতজ্ঞতা তার স্বভাব। সন’ষ্টি কেবল পরিতৃপ্তি নয় – যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা ও আনন্দও বটে।

সন’ষ্টি এমন একটি মনস্তাত্বিক অবস্থা যা কোন শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ এটা-ওটা পেলে সন’ষ্ট হবো বা এটা ওটা পেয়েছি বলে সন’ষ্ট আছি বলা যায় না। কারণ কিছু পেয়ে সন’ষ্ট হলে তা হারানোর ভয় থাকে। যেখানে হারানোর ভয় আছে সেখানে সন’ষ্টি থাকে না। কেবল ভয়শূণ্য চিত্তই প্রসন্ন, পরিতৃপ্ত ও আনন্দিত।

যার যা আছে তা নিয়ে সন’ষ্ট না থাকতে পারলে সে যা পাবার প্রত্যাশী তা পেলেও সন’ষ্ট হতে পারবে না। আমার দু’টি চোখ আছে এ নিয়ে যদি আমি সন’ষ্ট না থাকতে পারি তাহলে চারটি চোখ থাকলে আমি কি সন’ষ্ট হতে পারবো? দু’টি চোখ নিয়ে অসন’ষ্ট থাকলে চারটি চোখ নিয়ে দ্বিগুণ অসন’ষ্ট হতে হবে। তাই আমাদের যার যা কিছু আছে তা নিয়ে অসনে’াষ থাকলে, যদি আরো বেশি থাকে তাহলে অসনে’াষও বেশি হবে। সুতরাং, যা চাই তা পাওয়া সন’ষ্টি নয়, সন’ষ্টি হচ্ছে চাওয়ার অবসান। যে আরো চায় সে যত ধনীই হোক সন’ষ্ট নয়। কিন’ যে আর কিছুই চায় না সে নিতান্ত দরিদ্র হলেও সন’ষ্ট। আমরা যদি ভাবতে থাকি আমাদের কি নেই তা হলে কখনও সন’ষ্ট হতে পারবো না। আমাদের কি আছে এদিকে চিন্তাযোগ থেকে সন্তষ্টি উৎপন্ন হয়।

আমরা কোথায় আছি, কি করছি, আমাদের কত ধন-সম্পদ, প্রভাব প্রতিপত্তি বা ক্ষমতা আছে তাতে সন’ষ্টি নির্ভর করে না। সন’ষ্টির অবস্থান চিন্তার জগতে। চিন্তা ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই উৎপন্ন হয় সুখ-দুঃখ। যেমন, অর্ধেক গ্লাস পানিকে দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একজনের দৃষ্টিতে গ্লাসের অর্ধেক পানিতে ভর্তি অন্যজনের দৃষ্টিতে গ্লাসের অর্ধেক শূন্য। যে ব্যক্তি গ্লাসের অর্ধেক পানিতে ভর্তি দেখতে অভ্যস্ত সে সন্তষ্টির দিকে যেতে পারে। সন’ষ্টির উদ্ভব ঘটে চিন্তার ইতিবাচক বিন্যাস ও বিন্যস্তকরণ থেকে। – আমরা পৃথিবীতে নিজের দেহটি ব্যতীত আর কিছু নিয়ে আসিনি, এখান থেকে চলে যাবার সময় কিছু নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। সুতরাং অনেক পেয়েও উল্লাসিত হবার যেমন কোন কারণ নেই তেমনি হারালেও দুঃখিত হবার কোন কারণ নেই। আমরা কিছু নিয়ে আসিনি যে হারাবো। কিছুই ‘আমার’ নয়। এখন যা আমার তা কিছুদিন আগে অন্যের ছিল। কিছুদিন পর আবার তা অন্যের হবে। সুতরাং যা আছে আমি তার ব্যবহারকারী মাত্র। সন’ষ্ট ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি এই।

প্রয়োজনের বাইরে একের পর এক চাওয়াকে প্রয়োজনের স্তরে নিয়ে এলে মানুষ তা পেতে মরিয়া হয়ে উঠে, ফলে পতিত হয় অসন’ষ্টির কূপে। যেমন, পানি মানুষের প্রয়োজন। কিন’ শীতে গরম পানি, গরমে ঠান্ডা পানি প্রয়োজনের স্তরে পড়ে না। মাত্র ১০০ বছর আগেও জীবন যাপনের জন্য বিভিন্ন তাপমাত্রায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না। পানির তাপমাত্রা, রঙ, স্বাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চাহিদাকে প্রয়োজনের স্তরে নামিয়ে আনলে জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়। গরম পানির জন্য চাই স্বয়ংক্রিয় বয়লার, ঠান্ডা পানির জন্য চাই ফ্রিজ, চাই সার্বক্ষণিত বিদ্যুৎ। সন’ষ্টি পানির উষ্ণতার ওপর নির্ভরশীল হলে তা আরও অনেক শর্তাধীন ব্যাপার। ঠিক একইভাবে আধুনিক মানুষ যেসব ভোগ্যপণ্যকে নিত্য প্রয়োজনীয় মনে করে, আসলে এত ভোগ্যপণ্য জীবনের জন্য প্রয়োজনের তালিকাভুক্ত নয়। বিভিন্ন তাপমাত্রার পানি প্রয়োজন নয়, বিলাসিতা। সন’ষ্ট হতে চাইলে প্রয়োজন এবং বিলাসিতার পার্থক্যজ্ঞান থাকা জরুরী। বিলাসিতা প্রয়োজন নয়, আত্মার দারিদ্র্যতা।

জীবনই সন’ষ্টি অর্জনের এবং সন’ষ্ট থাকার ক্ষেত্র। অর্থাৎ জীবন না থাকলে কেউ সন’ষ্ট কি-না তা অনুভব করতে পারবে না। সুতরাং প্রশ্ন আসে, জীবনের জন্য প্রয়োজন মেটানোর নিশ্চয়তা না থাকলে কেউ কি সন’ষ্ট থাকতে পারবে? পেট ভরে সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণের পর তৃপ্তির ঢেকুর দেয়া যায় কিন’ তীব্র ক্ষুধা নিয়েও কি মানুষ তৃপ্ত থাকতে পারবে? মৌলিক চাহিদার নিশ্চিত ব্যবস্থা কি সন’ষ্ট থাকার শর্ত? অন্ন, বাসস্থান ও বস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেই কি জীবন জীবিত থাকে? মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুর নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন নয়। কিন’ যার মধ্যে চাহিদা জাগে তার নিশ্চয়তা কে দেবে? যে জীবন পানীয় ও অন্ন গ্রহণ করে, শীত ও তাপ অনুভব করে সে জীবনই যদি না থাকে তবে অন্ন বস্ত্র গ্রহণ করবে কে? অন্ন বস্ত্রের প্রয়োজন আছে বটে কিন’ এসবের প্রয়োজন ততক্ষণই, যতক্ষণ জীবন আছে এবং জীবনের গ্রহণ করার মতো চাহিদা আছে। সবার ওপরে জীবন, জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি। সুতরাং অন্ন বস্ত্রের মজুদ থাকলেই কেউ সন’ষ্ট থাকতে পারে না। অন্ন বস্ত্রের প্রতি জীবনের চাহিদা কেমন, জীবন কিভাবে সে চাহিদা মেটাতে চায়, সেটাই প্রশ্ন। একজন সন’ষ্ট ব্যক্তিরও চাহিদা থাকবে, ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকবে কিন’ ক্ষুধায় খাদ্য না পেলে কিংবা তৃষ্ণায় পানীয় না পেলে সে অসন’ষ্ট হবে না। সন্তষ্ট ব্যক্তির জন্য জীবনও যা মৃত্যুও তাই। একজন সন’ষ্ট ব্যক্তির জীবনেও মৃত্যু আসবে কিন’ তিনি মৃত্যু ভয়ে ভীত হবেন না বরঞ্চ তিনি মৃত্যুকে বরণ করবেন আনন্দ উৎসবে।

জীবনের জন্য আশ্রয়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন খাদ্যের, খাদ্যের চেয়ে বেশি প্রয়োজন পানির, পানির চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাতাসের। বাতাস সম্পূর্ণ ‘ফ্রি’। যার যত খুশি বাতাস খেতে পারে, বাতাসের কোন অভাব নেই, পানিও ‘ফ্রি’। পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই পানি – পৃথিবীর সব মানুষ সারাদিন পানি পান করলেও নদীর পানি কমবে না। ঠিক একইভাবে খাদ্য এবং আশ্রয়ও যদি ফ্রি হয় মানুষ কি সন’ষ্ট হবে? বাতাস এবং পানি যে ‘ফ্রি’ পাওয়া যাচ্ছে এ জন্য কি মানুষের কোন কৃতজ্ঞতা আছে? খাদ্য ও আশ্রয় ‘ফ্রি’ হলে কি মানুষ কৃতজ্ঞ ও সন’ষ্ট হবে?

আমরা যা চাই তা না পেলে অসন’ষ্ট হই। কিন’ যা চাই তা পেলে কি সন’ষ্ট হই? মানুষ আরো চায়, আরো চায়, যত পায় তত চায়, এ অন্তহীন চাওয়াই সৃষ্টি করে অসন’ষ্টি। যা চায় তা পেলে মানুষ সাময়িক সফলতার আনন্দ পায় বটে, সফলতার আনন্দ সন’ষ্টি নয়। সন’ষ্টি আরো ঊর্ধ্বতন স্তরের অনুভব। ‘যা চাই তা-ই পাই’ এতে কোন সন’ষ্টি নেই কারণ ‘যা চাই তা-ই পাই’ অবস্থায় অল্প সময় পর অসন’ষ্টি আসবেই। ‘যা পাই তা-ই চাই’ – এ বোধের জাগরণে আছে সন’ষ্টি।

অসন’ষ্টির সৃষ্টি অন্যের সাথে তুলনা থেকে, অন্যের সাথে তুলনা থেকেই সৃষ্টি হয় হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, লোভ। নিজেকে  অন্যের সাথে তুলনা করার শিক্ষা প্রথমে আমরা পাই পরিবেশ থেকে। জন্মের পর থেকেই পরিবারে, বিদ্যালয়ে আমাদেরকে তুলনা করা হয় অন্যের সাথে। যে যেমন সে তেমনভাবে বিকশিত হবার শিক্ষা ও প্রেরণা আমরা পাই না।  সব সময় বলা হয় আমরা যেন অন্যের মতো হই।  অন্যের সাথে তুলনা থেকেই সৃষ্টি হতে থাকে মনস্তাত্বিক জটিলতা ও অসনে’াষ।

নিজের প্রকৃত ক্ষমতা, যোগ্যতা ও শক্তি সম্পর্কে ভুল বুঝাবুঝি শুরু হয়। যাকে নিজের চেয়ে বড় বলে বোধ হয় তার সাথে নিজের তুলনা থেকে জন্ম নেয় হীনমন্যতা। হীনমন্যতা কুরে কুরে খায় ব্যক্তিত্বকে। ব্যক্তি ডুবে থাকে অসনে’াষের ডোবায়। অন্যদিকে নিজেকে যদি অন্যের তুলনায় বড় বলে বোধ হয় তাহলে জন্ম নেয় উদ্ধত মনোভাব। ঔদ্ধত্য থেকেও একইভাবে পতন ঘটে অসনে’াষে। অন্যের সাথে যদি আমরা নিজেকে তুলনা না করি তাহলে আমরা ছোটও নই বড়ও নই, সুন্দরও নই,কুৎসিতও নই, জ্ঞানীও নই মুর্খও নই। আমি তখন ‘আমি’, শুধুই ‘আমি’। এক ‘অনন্য’ ও ‘অসাধারণ’ ব্যক্তিত্ব। আমি অতুলনীয়। এই অতুলনীয়, অসাধারণ ও অনন্য ব্যক্তিত্বই সন’ষ্ট।

সন’ষ্টি অতীত বা ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের সম্পদ। আমি যেভাবে আছি, সেভাবে পরিতৃপ্ত থাকলে আমি বর্তমানে আছি। আমি যদি আরো কিছু হতে চাই তাহলেই আসে ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যৎ থেকে আসে অসন’ষ্টি ও উদ্বিগ্নতা। ভবিষ্যতের জন্য আমরা নষ্ট করি বর্তমানকে। বর্তমানে অসন’ষ্ট হই, ভবিষ্যতে সন’ষ্ট হবার জন্য। কি করতে হবে কিংবা কি করার বাকী আছে তা নিয়ে আমরা ভাবি কিন’ এখন যা করছি তা পরিপূর্ণভাবে করছি কি-না তা নিয়ে ভাবি না। ফলে আমাদের সব কাজ অসুন্দর ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আমরা অসন’ষ্ট হই। দরিদ্র ভাবে ধনসম্পদ হলেই সে সন’ষ্ট হতো। দারিদ্র্যতা থেকে অনেক লোক প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়েছে কিন’ সন’ষ্ট হতে পারেনি। আসলে ধনসম্পদের প্রাচুর্যতা মানুষকে ধনী-দরিদ্র করে না। সন’ষ্টিই ধন বা সম্পদ। এ ধন যার আছে সেই ধনী, যার নেই সে দরিদ্র।

অসনে’াষ না থাকলে কর্মের উদ্দীপনা আসবে কোত্থেকে? যা কিছু আছে তা নিয়ে সন’ষ্ট থাকলে, কি করবেন একজন সন’ষ্ট ব্যক্তি? এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যা আছে তা নিয়ে সন’ষ্ট থাকলে মানুষের কর্মক্ষেত্র হবে ‘যা আছি তা নিয়ে’। নিজেকে আরো উন্নততর স্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অসনে’াষ থেকে আসে না। আমি গান গাইতে ভালোবাসি তাই আরো ভালো গান গাইতে চাই, আরো ভালো গান গাইতে চেষ্টা করি। অন্যের সাথে আমার কোন প্রতিযোগিতা নেই, নাম-যশ বা অর্থ প্রাপ্তির প্রত্যাশাও নেই। গান গাইতে ভালো লাগে তাই গান গাই। ভালো লাগাই সন’ষ্ট ব্যক্তির কর্মের উদ্দীপনা।  সন’ষ্ট ব্যক্তি যা করতে ভালোবাসে তা-ই করে। ভালোলাগা থেকেই আসে সন’ষ্টি। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজে যা করতে ভালোবাসে তা করতে পারবে না ততক্ষণ সে সন’ষ্টির স্বাদ পাবে না।

সন’ষ্টি ব্যক্তির কাছে কর্ম হচ্ছে এমন একটি খেলা যে খেলার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কোন প্রতিযোগী নেই। শিশুরা যেমন খেলা করে তেমনি এক খেলা। শিুশুরা খেলা করে, সর্বশক্তি দিয়ে, যে খেলার প্রতিদ্বন্দ্বী সে নিজে। কোন লোভ নেই, কোন পরশ্রীকাতরা নেই, অন্যের সাথে তুলনা নেই, নাম-যশের আকাঙ্খা নেই, তবু সে খেলে চলছে সন’ষ্টির শান্তিময় অবস্থা থেকে। মানব শিশুর জন্ম হয় সন’ষ্টি থেকে, সন’ষ্টি নিয়ে। জীবন চলার পথে সে জমা করে অসনে’াষ। সন’ষ্ট হতে চাইলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সে-ই পূর্বাবস্থায় যে অবস্থা থেকে অসনে’াষ সৃষ্টি হতে শুরু করেছিলো। জগতের সাথে মানিয়ে চলতে নিজের প্রকৃতিকে যতটুকু আমরা বদলে দিয়েছি ততটুকু বদলে দেয়াই অসন’ষ্টির কারণ। আমরা যতটা নিজ প্রকৃতিতে ফিরে যাবো ততটা সন’ষ্টি আমাদের আসবে। সন’ষ্টি এক প্রাকৃতিক সম্পদ। নিজের প্রকৃতিতে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি সন’ষ্ট। নিজের মধ্যে বা বাহ্যিক জগতে কোথাও কোন ত্রুটি নেই যা শোধন করতে হবে। মানুষের দেহে কোন অপূর্ণতা নেই। যেখানে যে অঙ্গ যেভাবে আছে সেভাবে ব্যতীত অন্যকোনভাবে  এদের সাজানো অসম্ভব। যদি কোন কারণে কোন একটা অঙ্গের অবস্থান অন্যরকম হয় তবে তা অসুস্তুতা। একইভাবে ব্রহ্মান্ডের কোথাও কোন ত্রুটি নেই। রূপান্তরের অব্যাহত ধারায় ব্রহ্মা  নিজেকে রেখেছে বিশুদ্ধ ও পূর্ণ করে। সুতরাং যা কিছু ঘটছে তা যেভাবে ঘটা উচিত সেভাবেই ঘটছে। কোথাও সংশোধনের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। কোন প্রয়োজন নেই পৃথিবীকে বদলে দেবার কিংবা নিজেকে বদলে দেবার। বাতাসের কাছে চৈত্রের শিমুল তুলো যেভাবে নিজেকে সমর্পন করে সেভাবে কর্ম সমর্পনের মাধ্যমে আসে সন’ষ্টি। বাতাস যেদিকে নেয় সেদিকেই উড়ে বেড়ায় শিমুল তুলো। কোথাও যাবার জন্য তার কোন প্রচেষ্টা নেই। ‘আমি যে তোমার’, তোমার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে ব্যবহার করো। আমার জীবনে যা কিছু ঘটে সব তোমারই আশীর্বাদ। আমার সকল কর্ম তোমার প্রতি সমর্পিত। কোন কর্মফলের প্রত্যাশী আমি নই। সন’ষ্ট ব্যক্তির ভাব তো এই-ই।

এ ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য কি কিছু করা যায়? একমাত্র অসন’ষ্ট ব্যক্তিই সন’ষ্ট হবার জন্য কিছু করতে পারে। তাই সন’ষ্টির লক্ষ্যে তৎপরতা যার বন্ধ হয়নি সে সন’ষ্ট নয়। সন’ষ্টির লক্ষ্যে কিছুই করা যায় না। সন’ষ্টি লক্ষ্য নয়। লক্ষ্যমুখী কর্ম থেকে সন’ষ্টি আসে। সন’ষ্টি আসতে পারে একমাত্র লক্ষ্যের প্রতি কর্মসমর্পনে। লক্ষ্যের দিকে যে যতটুকু অগ্রসর হবে সে ততটুকু সন’ষ্ট হবে।

জীবন প্রদীপের মতো, তেল দিয়ে প্রদীপের আধার যতই পূর্ণ করা হোক না কেন প্রদীপ পূর্ণ হয় না যদি না তাতে আগুন থাকে। প্রদীপের সম্পদ তেল নয় – জ্যোতি। প্রত্যেক মানুষে ঘুমিয়ে থাকে এক জ্যোতির্মুখি, সূর্যমুখি ফুল। মানুষ যেদিকেই মুখ করুক না কেন সত্তার গভীরে একটি ফুল মুখ করে থাকে জ্যোতির দিকে। ঐ জ্যোতির অভাবই অসন’ষ্টির মূল কারণ।

যে চায় সে ভিক্ষুক। যে যত বেশি চায় সে তত বড় ভিক্ষুক। যে চায় না, দেয় – সে সম্পদশালী; সন’ষ্টিই তার সম্পদ। যে বণিক বাণিজ্য যাত্রা করে নৌকা তাকে বাইতেই হয়, যে প্রেমিক সাগরের সাথে মিলিত হতে চায়, তার নৌকা বাইবার প্রয়োজন নেই। নদীতে নৌকা ভাসিয়ে শান্ত হয়ে প্রতীক্ষা করলে নদীই তাকে পৌঁছে দেবে সাগরে। যে প্রেমিক সাগরে পৌঁছেছে সন্তষ্টিই তার সম্পদ।

মিথ্যার বাজারে মিথ্যুক ধরা কোন প্রকারে!

সংলাপ ॥ শতকরা ৭২ ভাগ মানুষ অন্যের মিথ্যাচার ধরতে পারে! বিশ্বাস হচ্ছে না! ঠিক আছে বিশ্বাস না করুন, মনে করুন আমি এমনিতেই বলেছি। অর্থাৎ কথাটি সত্য না। আচ্ছা, আমরা কি বলতে পারি কখন বা কোন অবস্থায় আমাদের আশপাশের মানুষ মিথ্যা বলছে! আপনি হয়তো বিরক্ত হচ্ছেন বিষয়টা নিয়ে এবং ভাবছেন, পরিবারের সদস্য, বন্ধু, অফিসের সহকর্মী-সবার ব্যাপারেই আপনি জানেন এবং সেক্ষেত্রে তারা কে কখন কি বলছে তা সত্য না মিথ্যা-তা ধরাধরির কোনও ব্যাপার না। এটা সবাই পারে! কিন’ সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে পাওয়া তথ্য হয়তো আপনাকে একটু চিন্তায় ফেলে দিতে পারে। ওই পর্যবেক্ষণে পাওয়া তথ্যগুলো দেখুন-

* অধিকাংশ মানুষ দিনে অন্তত ২টি কঠিন মিথ্যা বলে

* কথা এককান থেকে দুই কান হওয়ার ক্ষেত্রে এর সত্যাসত্যে কিছু বিচ্যুতি ঘটে

* চাকরি বাঁচাতে শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি লোক মিথ্যার আশ্রয় নেয়

জার্মান পন্ডিত নিৎসের সেই আলোচিত বক্তব্যটি এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, মিথ্যা হচ্ছে জীবনেরই একটি শর্ত বা অবস্থা। হয়তো বাউল সম্রাট লালন এ কারণেই বলেছেন – সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন!

মিথ্যাচার বা প্রতারণা-প্রবঞ্চনা-জোচ্চুরি প্রমাণে পাশ্চাত্যের একজন আলোচিত পেশাদার নারী পামেলা মেয়ার। মিথ্যা যাচাই  করার ক্ষেত্রে নানান লাগসই কৌশল নিয়ে তার লেখা একটি বই আছে ‘লাইস্পটিং: প্রুভেন টেকনিক্স টু ডিটেক্ট ডিসিপশন’ নামে। পামেলার দাবি, প্রতিদিন আমরা ২০ থেকে ২০০টি মিথ্যা শুনে থাকি। একথা শুনে আপনারা হয়তো বলবেন, তিনি নিশ্চয়ই পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন! নাহলে এত মিথ্যা তিনি পান কই? আর পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে কাজ না করে থাকলে তার এখনি উচিত পলিটিশয়ানদের মিথ্যা ধরার কাজে নেমে পড়া।

‘মিথ্যা-নির্ণয় কৌশল এমন এক জটিল-আধুনিক কলা, যা ছল-চাতুরি ধোঁকাবাজিপূর্ণ গোলকধাঁধাঁর পাঁকচক্রের এই যুগজীবনে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে সত্যকে যাচাই করতে আপনার অবশ্যই জানা উচিত। আপনার প্রতিদিনকার চারপাশের দুনিয়া অনেক ভালোমানুষ সাধু-সন’-দরবেশ ছাড়াও ছেয়ে আছে আপনাকে প্রতারণার জালে ফাঁসাতে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভুয়া ডিজিটাল বন্ধু, চাকরিপ্রার্থীর ফোলানো ফাঁপানে রিজিউম (জীবনবৃত্তান্ত), পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া (সংবাদ মাধ্যম), বন্ধুর পরিচয়ে থাকা ছদ্মবেশী জোচর, মষেমেজে পরিবর্তন ঘটানো পাসপোর্ট-ব্যাংক-আইডি নাম্বার, বর্ণচোরা কুচক্রী, প্রেমিকের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ ধর্ষকসহ হাজারো ঠগ-বাটপারে।

উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছানো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে একইসঙ্গে ঈর্ষণীয় বিকাশ ঘটেছে যোগাযোগ প্রযুক্তির। এ দুয়ের কল্যাণে, বিশেষ অবস্থার সুযোগ নিয়ে মিথ্যার ঠাসবুনোটে এখন তিলকে তাল বানানো আর ‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানো’ সহজ থেকে সহজতর হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির চরম উন্নতির এই যুগকে একই সঙ্গে মিথ্যা আর প্রতারণার এক মহামারী যুগ বললেও বাড়িয়ে বলা হয়না, বোধ করি।

ছোট ছোট মিথ্যাগুলো ঃ দৈনন্দিন জীবনের কিছু মিথ্যাকে বলা যায় লোকাচারের অংশে পরিণত হয়েছে। এসব মিথ্যা যেন আমাদের দৈনন্দিন স্বাদহীন আটপৌরে জীবন চলায় কিছুটা লবণ-মশলার যোগান দেয়। আমরা সবাই বুঝি কথাটা মিথ্যা, তারপরও আশা করি কেউ এটা বলুক, কারণ শুনতে ভালো লাগে, এরকম ‘কোমল-মিথ্যা’ অনেক সময়েই আনন্দদায়ক।

যেমন, মটকু টাইপের বেঢব বপুওয়ালা কোনও বন্ধু বা কলিগ টাইট জিন পড়ায় তাকে বিদঘুটে লাগছে। বেচারা বিষয়টা নিয়ে নিজেও অস্বস্তিতে আছে। কিন’ তাৎক্ষণিকভাবে তা বদলানোর সুযোগও নেই। এদিকে, আপনাকে মুখভর্তি মেকি হাসি নিয়ে বলতে হয় – প্যান্টটা আপনাকে যা মানিয়েছে না বস! কিংবা কাগতাড়ুয়ার মত চুল কেটে আসা বন্ধুকে দেখে বলে উঠলেন- দো…স…ত, যা একখান ছাট দিছো না, পুরা টম ক্রুজ লাগতেছে!

আরেকটা জনপ্রিয় আর অবশ্য ব্যবহার্য মিথ্যা হচ্ছে, ‘আরে না না, মনে করার কী আছে, আমি কিছুই মনে করিনি।’ অস্বস্তি আর মেনে না নেয়ার চিরতা তিতা কষ্টগুলো গিলেও সামাজিকতার কারণে এ ধরনের মিথ্যাচর্চা আমরা অহরহ করে থাকি। কিন’ এ ধরনের হালকা মিথ্যাও কিন’ চাকরি-বাকরি-ব্যবসা এমনকি আপনার দাম্পত্য বা রোমান্টিক জীবনে অতটা সহজপাঠ্য নয়। কারণ, এখানে সত্যটা জানা দরকারি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

মিথ্যা ধরার সনাতন ধারণাগুলো ঃ দুঃখজনক ব্যাপার হল মিথ্যা ধরা সহজ কাজ নয়। বিষয়টা গলের সেই পিনোকিওর নাকের মত নয় যে মিথ্যা বললেই (মিথ্যুকের) সেই নাক লম্বা হয়ে যাবে বেশ কিছুটা সময়ের জন্য। আর আপনি চেঁচিয়ে উঠলেন-ব্যাটা মিথ্যুক!

আপনি হয়তো বলবেন, কেউ মিথ্যা বলার সময়ে শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠা, চেখে চোখ না রাখা বা ঘেমে ওঠা, শরীরের কোনো অংশের মাংসপেশী কুঁচকে ওঠা – এসব দেখে খুব সহজেই মিথ্যাবাদীকে ঠাহর করা যায়। মিথ্যাবাদীকে চিহ্নিত করতে এসব তো সুপ্রাচীনকাল থেকেই আমরা অনুসরণ করে আসছি। কিন’ আমাদের জন্য হতাশার বিষয় হচ্ছে, জনপ্রিয় এই ধারণাগুলো সবসময়ে ‘ফুলপ্রুফ’ ফলদায়ক হয় না। মানুষ এমন অসাধারণ এক জানদার যন্ত্র- যে আপনি অধিকাংশ সময়েই ধরতে পারেন না যে এইমাত্র আপরার সামনে থেকে যাওয়া বা বসে থাকা লোকটি আপনাকে মিথ্যা গিলিয়েছে। তার সেই মিথ্যাকেই আপনি সত্য মেনে নেন, যদি না পরবর্তীতে কোনো এককালে এই ধারণা আপনার ভুল প্রমাণ হয়।

একবার ঠকলে ঠগের দোষ, দ্বিতীয়বার তোমার দোষ ঃ মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতির একটি হতে পারে যে, এ ব্যাপারে ধারণা রাখা যে, আপনার সামনে কোন ব্যক্তিটি মিথ্যা বলতে পারে এবং কেন? এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্মুখী (Introvert) স্বভাবের ব্যক্তিদের চেয়ে বহির্মুখী (Extrovert) স্বভাবের ও আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিরা মিথ্যা বেশি বলে থাকেন। মিথ্যা বলার কৌশল আর দক্ষতায় ইনারা অন্তর্মুখীদের তুলনায় এগিয়ে। আর ব্যক্তিটি যদি হন ক্ষমতার শীর্ষে, সেক্ষেত্রে তার সেই দক্ষতা শৈলিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। গবেষণা মতে – তারা মিথ্যা বলেনও বেশি। আর মানুষ সাধারণত সেসব লোকের সামনে মিথ্যা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে যাদেরকে ফাঁকি দেয়া সহজ মনে হয়।

পরিবারের কিছু সম্পর্কের মাঝেও (যেমন অভিভাবক আর টিনএজ সদস্যদের মাঝে) সারাক্ষণ একটি ফাঁকি-ঝুঁকির সম্পর্ক বিরাজ করে। বেলা ডি পাওলো নামের এক  মনস্তত্ত্ববিদ তার পর্যবেক্ষণে  দেখতে পেয়েছেন- কলেজ পড়-য়ারা মায়েদের সঙ্গে প্রতি দুবারের কথাবার্তায় অন্তত একবার মিথ্যাচার করে।

মিথ্যার ফল বা প্রভাব যাই হোক, এর দু’টি রূপ আছে। এক হচ্ছে আক্রমণাত্মক, আর দ্বিতীয়টি রক্ষণাত্মক। আক্রমণাত্মক মিথ্যার মূল উদ্দেশ্য থাকে কোনো কিছু অধিকার করা (যেমন ধরুন কোনো সুবিধা, চুক্তি বা কাজ বাগানো), নিজের নেতিবাচক স্বভাবের বিপরীতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা (নিজের টুঁটাফাটা অর্জনকে মিথ্যার অলঙ্কারে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রকাশ অথবা নিজেকে মহিমান্বিত করতে কল্পকথার ফানুস ওড়ানো)।

আর রক্ষণাত্মক মিথ্যার উদ্দেশ্য থাকে সাধারণত কোনো শাস্তি বা অপ্রস্তুত অবস্থা কিংবা অপদস্তু হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া অথবা কাউকে এ ধরনের অবস্থা থেকে রক্ষা করা। প্রসঙ্গত, মেয়েদের মিথ্যা বলার অন্যতম কারণের একটি হলো এই ‘অন্যকে বাঁচানো’র মহতি চেষ্টা।

যদি ধারণা করেন যে কেউ মিথ্যা বলছে, বুদ্ধি খাটান, তাকে এতে উৎসাহিত করে পরীক্ষা করুন – এ কায়দায় আপনার সন্দেহের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন (আবার নাও পারেন। কারণ মিথ্যাবাদীরা একটা মিথ্যাকে ঢাকতে ১০টি মিথ্যা বলে থাকে)।

মিথ্যা সনাক্ত করণের কিছু কৌশল ঃ মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রজ্ঞা বলে- একজন মিথ্যাবাদী কখনো আপনার চোখে চোখে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে না বা দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবে। কিন’ আপনার-আমার জন্য হতাশার বিষয় হচ্ছে, একজন দক্ষ মিথ্যুক ঠিক আপনার চোখে চোখে রেখে কথা বলবে- আপনাকে এটা বোঝানোর জন্য যে সে মিথ্যা বলছে না। কারণ- সনাতনি ওই ধারণাটা (মিথ্যুক সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না) তারও অজানা নয়। অন্যকে বোকা বানাতে এই সুযোগটাই নেয় কামেল টাইপের মিথ্যুকরা। পামেলা মেয়ারের  মতে, সাদাসিধা, নির্ভেজাল কথোপকথনের সময়টায় আমরা শতকরা ৬০ ভাগ সময় চোখে-চোখে তাকাই। মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এডওয়ার্ড গিসেলম্যান (তিনি তথ্যানুসন্ধানী ইন্টারভিউয়িং কৌশল শিক্ষা দিয়ে থাকেন এফবিআই’র ঝানু গোয়েন্দাদের) এর মতে – যদি অনুভব করেন, কথা বলার সময় কেউ আপনার চেহারায় তাকিয়ে আছে বা বোঝার চেষ্টা করছে আপনি তার ‘গল’ কতটা গিলছেন- সাবধান হয়ে যান। এক্ষেত্রে বুঝবেন, তার ‘মিথ্যা’ আপনার ওপর কতটুকু আসর করছে- ওই তাকানোটা আসলে তাই বোঝার চেষ্টা। মিথ্যা বোঝার আরও কিছু শরীরী আচরণগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- বক্তার শরীরের উর্ধ্বাংশ আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া, উচ্চগ্রামে কথা বলা (মনে করুন- ‘চোরের মার বড় গলা’ প্রবাদটি) কিংবা কথা বলার ভঙ্গি বদলে ফেলা, বিস্তারিত চোখের মণি, আলাপ শেষ হওয়া মাত্র   স্বস্তির প্রকাশ, দীর্ঘশ্বাস ছাড়া, একটু মুচকি হাসি কিংবা বসা বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি পরিবর্তন করা।

কথার মাঝে যতি আর পুনরুক্তি ঃ চাপের মধ্যে পড়ে যখন কথা বলতে বাধ্য হয় (যেমন পুলিশের জেরা) তখন মিথ্যুকরা সাধারণত পালা প্রশ্ন করে এবং একই প্রশ্ন বারবার করে কিংবা থেমে যায় – চিন্তা বা মিথ্যাগুলোকে সুবিন্যস্ত করে সাজানোর জন্য। এ ধরনের ব্যক্তিরা যদি একটু রিহার্সেল করার সুযোগ পায় – ধরে নিন তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বহীন অনায়াস ভঙ্গিতে যে উত্তর দেবে, তা প্রায় বিশ্বাসযোগ্য   হবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা সন্দেহ ভাজনদেরকে প্রায়ক্ষেত্রেই তাদের বক্তব্য দোহরাতে বলেন। সন্দেহভাজনের একই বয়ানের পুনরুক্তির সময়ে পুলিশ কান পেতে থাকে – অসঙ্গতি ধরার জন্য। সাধারত পেশাদার অপরাধীদের মিথ্যা কথাগুলো সংক্ষিপ্ত হয়। এর পেছনের কারণটা হলো-অপরাধীরা (বা মিথ্যুক) মনে করে – যত কম বলবে, ফেঁসে যাওয়ার সম্বাবনা তোমার তত কমবে।

শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা ঃ কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মিথ্যা ধরার মূলসূত্র গাঁথা থাকে বক্তার শব্দ ব্যবহারে পছন্দ-অপছন্দের মাঝে। মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক জেমস পেনিবাকের এক্ষেত্রে দু’টি প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নের ওপর আলোকপাত করেছেন –

পাকা মিথ্যুকরা সর্বনাম (প্রথম পুরুষ) যথাসাধ্য কম ব্যবহার এবং নিজেদের সম্পর্ক বাদ দিয়ে বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করবে। মিথ্যুকরা নিজের বলা ‘মিথ্যা’ থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করে। তারা ‘আমি’; ‘আমাকে’ বা ‘আমার’ ধারার শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করবে। কারণ এসব শব্দে ঘটনার সঙ্গে অপরাধী বা মিথ্যুকের সম্পর্ক নির্দেশিত হওয়ার সহজ সম্ভাবনা থাকে।

পেনিবাকের এর মতে – মিথ্যুকরা সাধারণত বেশ উদ্বেগ আর অপরাধবোধে আক্রান্ত থাকে। সাধারণত তারা বাক্যের মাঝে প্রসঙ্গান্তর বা বাধ সাধে- এ ধরনের শব্দ কম ব্যবহার করে। ‘কিন’’, ‘ব্যতীত’, ‘ওটাও না’- ধরনের শব্দ কম উচ্চারণ হয় তাদের কণ্ঠে। এসব শব্দ তারা যা করেছে এবং যা করেনি সহজেই চিহ্নিত করে ফেলতে পারে। কারণ এসব শব্দের পিঠে স্বাভাবিকক্রমেই আরও অনেক বিপজ্জনক প্রশ্ন এসে পড়তে পারে জেরাকারী বা প্রশ্নকর্তার কাছ থেকে।

মনুষ্যত্ব ১

॥ মোতাহের হোসেন চৌধুরী ॥

মানুষের মধ্যে দু’টি সত্তা – জীব সত্তা আর মানব-সত্তা। জীব-সত্তার কাজ প্রাণধারণ – আত্মরক্ষা ও বংশরক্ষা। এখানে মানুষ বৈশিষ্ট্যহীন, প্রাণীজগতেরই একজন – অপরাপর প্রাণীদের মতো ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে ছুটাছুটি করা তার কাজ। কি করে বাঁচা যায় ও সন্তান-সন্ততিদের বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেই চিন্তায় সে অস্থির। কিন’ প্রাণী হলেও মানুষ অপরাপর প্রাণীদের পশ্চাতে ফেলে এসেছে। এবং নিজের মধ্যে অনুভব করেছে এক নতুন সত্তা। এই নব-অনুভুত সত্তার নামই মানব-সত্তা, আর এখানেই মানুষ অপরাপর প্রাণী থেকে আলাদা। আত্মরক্ষা কি বংশরক্ষা নয়, মুক্তির আনন্দ উপভোগই এখানে বড় হয়ে ওঠে। মুক্তি মানে অস্তিত্বের চিন্তা থেকে নিষ্কৃতি, শুধু তাই নয়, এক নব সূক্ষ্ম অস্তিত্বের উপলব্ধি। ব্যাপারটা আসলে ঋণাত্মক নয়, ধনাত্মক। সাহিত্যশিল্পের মারফতেই এই মুক্তির আনন্দ আস্বাদন করা যায়, তাই তাদের এত মূল্য।

প্রাণধারণের জন্য সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, তা যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, মনুষ্যত্ব নয়, প্রাণিত্ব; আর অবসর সময়ে সাহিত্যশিল্পের রস-আস্বদান, তা যতই অপ্রয়োজনীয় হোক না কেন, মনুষ্যত্ব। মনুষ্যত্ব রসের ব্যাপার, তাই রসিকরাই বেশী মানুষ। জাতি ধর্ম্ম ও আদর্শ নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে বেমালুম মিশে যেতে পারেন বলে রসিকরাই মনুষ্যত্বকে সবচেয়ে বেশী উপলব্ধি করেন – কোন বাধাই তাদের উপলব্ধি পথ রোধ করে দাড়াতে পারে না। (এখানেই মদতবাদীর সঙ্গে রসিকের পার্থক্য; মতবাদী যতই মানুষের উপকারের জন্য চিৎকার করুক না কেন, কখনো মনুষ্যত্বকে উপলব্ধি করতে পারে না – মতবাদের নেশাই তার উপলব্ধির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আর রসিক যত অকাজেরই হোক না কেন, মনুষ্যত্বের পূর্ণ উপলব্ধির সৌভাগ্য তারি।) অপ্রয়োজনের জগৎই মনুষ্যত্বের জগৎ; এখানেই মানুষ আত্মার লাবণ্য উপভোগ করে। প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দ না হলেও প্রাণধারণের ক্ষতি হয় না; বাঁচার জন্য এরা একান্ত প্রয়োজনীয় নয়। কিন’ মানুষের মতো বাঁচতে হরে এসব না হলে চলেনা। তাই একান্ত প্রয়োজনীয় না হলেও প্রেম, সৌন্দর্য্য ও আনন্দেই মনুষ্যত্বের বিকাশ। এসব নিয়ে মানুষ বাঁচে না, কিন’ এসবের জন্য বাঁচে।

সাহিত্য ও শিল্পে জগৎ প্রেম, সৌন্দর্য্য ও আনন্দের জগৎ। তাই এখানে অস্তিত্ব তথা যোগ্যতমের উদ্‌বর্ত্তনের কথা বড় হয়ে ওঠে না, প্রেম ও সহানুভূতির কথা বড় হয়ে ওঠে। প্রেম ও সহানুভূতি আত্মার ইন্দ্রিয়, আর এই ইন্দ্রিয়ের সহায়তায়ই মানুষ মানব-সত্তাকে উপলব্ধি করে।

মনুষ্যত্ব তথা মুক্তির আকাঙ্খা মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ দিক হলেও প্রাণিত্বকে অবহেলা করা যায় না; বরং মনুষ্যত্বকে বাদ দিয়েও চলা যায়; কিন’ প্রাণিত্বকে বাদ দিয়ে চলা কঠিন। তাই মানুষকে প্রাণিত্বের সাধনাই করতে হচ্ছে বেশি। রাজনীতি সমাজনীতি ও অর্থনীতি প্রাণিত্বের ব্যাপার না থেকে ধীরে ধীরে মানবিক ব্যাপার হয়ে ওঠে। ‘মানবিক’ হওয়ার অর্থ জৈব ব্যাপারটাই মনুষ্যত্বের পর্য্যায়ে উন্নীত হওয়া নয়, মানুষের বুদ্ধি ও কল্পনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া-মানবোচিত হওয়া।

মানুষ তার বুদ্ধি ও কল্পনার সহায়তায় জৈব ব্যাপারটি সুনিয়ন্ত্রিত করতে চাচ্ছে; সেজন্য পৃথিবী জুড়ে বিরাট আয়োজন চলেছে। খুব আশা ও আনন্দের কথা। কিন’ লক্ষ্যের দিকে নজর না রাখলে শেষ পর্য্যন্ত সমস্ত চেষ্টাই ভণ্ডুল হতে বাধ্য। লক্ষ্য হচ্ছে মুক্তি-আত্মার লাবণ্য উপভোগ। শারীরিক চিন্তা থেকে মুক্তি চাই আত্মার জগতে প্রবেশের জন্য, একথা মনে না রাখলে জীবনের উন্নয়ন সম্ভব হয় না।

মানুষের জীবনকে একটি দোতলা ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। জীব-সত্তা সেই ঘরের নীচের তলা, আর মানব-সত্তা বা মনুষ্যত্বে উপরে তলা। জীব-সত্তার ঘর থেকে মানব-সত্তার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই আমাদের মানব-সত্তার ঘরে নিয়ে যেতে পারে। অবশ্য জীবসত্তার ঘরেও সে কাজ করে; ক্ষুৎপিপাসার ব্যাপারটি মানবিক মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া। অন্য কথায়, শিক্ষার যেমন প্রয়োজনের দিক আছে, তেমনি অপ্রয়োজনের দিকও আছে, আর অপ্রয়োজনের দিকই তার শ্রেষ্ঠ দিক। সে শেখায় কি করে জীবনকে উপভোগ করতে হয়, কি করে মনের মালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায়।

শিক্ষার এই দিকটা যে বড় হয়ে ওঠে না, তার কারণ ভুল শিক্ষা ও নীচের তলায় বিশৃঙ্খলা। জীব-সত্তার ঘরটি এমন বিশৃঙ্খল হয়ে আছে যে, হতভাগ্য মানুষকে সব সময়ই সে সম্বন্ধে সচেতন থাকতে হয় – উপরের তলার কথা সে মনেই আনতে পারে না। অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দী। ধনী-দরিদ্র সকলেরই অন্তরে সেই একই ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে : চাই, চাই, আরো চাই। তাই অন্নচিন্তা তথা অর্থচিন্তা থেকে মানুষ মুক্তি না পেলে, অর্থসাধনাই জীবনসাধনা নয় – একথা মানুষকে ভালো করে বুঝাতে না পারলে মানবজীবনে শিক্ষা সোনা ফলাতে পারবে না। ফলে শিক্ষার সুফল হবে ব্যক্তিগত, এখানে-সেখানে দু’একটি মানুষ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যটি উপলব্ধি করতে পারবে, কিন’ বেশীর ভাগ লোকই যে-তিমিরে সে-তিমিরে থেকে যাবে।

তাই অন্নচিন্তার নিগড় থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার যে চেষ্টা চলেছে তা অভিনন্দনযোগ্য। কিন’ লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতন না থাকলে সে চেষ্টাও মানুষকে বেশী দূর নিয়ে যেতে পারবে বলে মনে হয় না। কারারুদ্ধ আহার-তৃপ্তক মানুষের মূল্য কতটুকু? প্রচুর অন্নবস্ত্র পেলে আলো-হাওয়ার স্বাদ-বঞ্চিত মানুষ কারাগারকেই স্বর্গতূল্য মনে করে গান ধরবে :

আগর ফেরদৌস বরোয়ে জমিন আস্ত হামিন আস্ত হামিন আস্ত, হামিন আস্ত।

(স্বর্গ যদি কোথাও থাকে ধরণীর পরে তবে তা এখানে, এখানে, এখানে।)

কিন’ তাই বলে যে তা সত্যসত্যই স্বর্গ হয়ে যাবে, তা নয়। বাইরের আলো-হাওয়ার স্বাদ পাওয়া মানুষ প্রচুর অন্নবস্ত্র পেলেও কারাগারকে কারাগারই মনে করবে, এবং কি করে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে তাই হবে তার একমাত্র চিন্তা। আকাশ-বাতাশের ডাকে যে-পক্ষী আকুল, সে কি খাঁচায় বন্দী  হবে সহজে দানাপানি পাওয়ার লোভে? অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্য্যের চেয়েও মুক্তি বড়, এই বোধটি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচয়। চিন্তার স্বাধীনতা, বুদ্ধির স্বাধীনতা; আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা যেখানে নেই, সেখানে মুক্তি নেই। মানুষের অন্মবস্ত্রের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে মুক্তির দিকে লক্ষ্য রেখে। ক্ষূৎপিপাসায় কাতর মানুষটিকে তৃপ্ত রাখতে না পারলে আত্মার অমৃত উপলব্ধি করা যায় না বলেই ক্ষুৎপিপাসার তৃপ্তির প্রয়োজন। একটা বড় লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি রেখেই অন্মবস্ত্রের সমাধান করা ভালো নইলে তা আমাদের বেশীদূর নিয়ে যাবে না।

তাই মুক্তির জন্য দু’টি উপায় অবলম্বন করতে হবে। একটি অন্নবস্ত্রের চিন্তা থেকে মানুষকে মুক্তি                   দেয়ার চেষ্টা, আরেকটি শিক্ষা-দীক্ষার দ্বারা মানুষকে মনুষ্যত্বের স্বাদ পাওয়ানোর সাধনা। এই উভয়বিধ চেষ্টার ফলেই মানবজীবনের উন্নয়ন সম্ভম। (চলবে)

আধ্যাত্মিকতায় শব্দ ও সঙ্গীত – ৫৮

মূল: সাধক এনায়েত খান – – – – ভাষান্তর: ফজলুর রহমান

(পূর্ব প্রকাশের পর)

প্রশ্ন ঃ অতীতের স্মৃতি কিভাবে মুছে ফেলা যায়?

উত্তর ঃ এটা সম্পূর্ণ রূপে সূফীগণের অনুসৃত পথ। এই পথ আমরা একাগ্রতা এবং ধ্যানের মাধ্যমে অর্জন করতে পারি। এই কাজ করাটা সহজ নয়। খুবই কঠিন কাজ। তা সত্বেও এ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কাজ। এই কাজ/শিক্ষাকে অনুমান, বিশ্বাস, মতবাদ বা ধারণার থেকে মুক্ত রাখতে হয়। এখানে কাজকে নিজের মধ্যে ধারণ করে নিজকে ব্যস্ত রাখতে হয়। যদি বলা হয় যে সপ্ত স্বর্গে তোমার জন্য বাড়ী করা হচ্ছে- তাহলে এই ধরনের বাক্য কৌতুহল বাড়ানো ছাড়া আর কিছু করবে না। এই ধরনের বার্তা/ কৌতুহল ধ্যানের মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব। এর ফলে নিজের মধ্যে স্বর্গ তৈরী করা সম্ভবপর।

সূফীতত্ত্বের সকল রহস্য মন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিহিত। অনেকটা চিত্রকরের ক্যানভাসের মত যেখানে চিত্রকর যা খুশী আঁকতে পারে বা মুছতে পারে। অনুরূপ ভাবে, হৃদয় নামক ক্যানভাসে ইচ্ছানুযায়ী জিনিস আঁকতে বা মুছতে সক্ষম হলে আমরা মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হব। ফলে যে জন্য আমরা এখানে এসেছি তা সফল করতে পারব। তখন আমরা আমাদের নিয়তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। আমাদের উদ্দেশ্যে একে অনুসরণ করাও নিয়ন্ত্রণ করা, যদিও এ হচ্ছে এক কঠিন কাজ।

ইচ্ছা শক্তি

ইচ্ছা কোনো শক্তি নয়। তবে সকল শক্তি এর অন্তর্ভূক্ত। স্রষ্টা কিভাবে এই জগত সৃষ্টি করলেন? ইচ্ছার মাধ্যমে। আমাদের মধ্যে যে ইচ্ছাশক্তি বর্তমান, তা প্রকারন্তে স্রষ্টার শক্তি। এই জগত প্রকাশের পিছনে যদি কোন রহস্য কাজ করে থাকে, তবে তা হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি। এই ইচ্ছাশক্তির জোরেই আমরা সকল মানসিক ও দৈহিক কাজ করে থাকি। আমাদের হাত যতই শক্তিশালী হোক না কেন, ইচ্ছা শক্তি ব্যতীত তার এক গ্লাস পানি ধরে রাখার ক্ষমতা নেই। একজন ব্যক্তি যতই শক্তিশালী ও সামর্থ হউক না কেন, নিজকে ইচ্ছাশক্তি ছাড়া সোজা দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবে না।

আমরা সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকি। এখানে দেহের কোন ভূমিকা নেই। এটা ঘটে ইচ্ছাশক্তির কারণে। এই ইচ্ছাশক্তির কারণে আমরা চলাফেরা করতে পারি। পাখি তার পাখার কারণে উড়ে না বরং ইচ্ছাশক্তির কারণে সে উড়তে পারে। একই ব্যাপার মাছের বেলায় প্রযোজ্য। ইচ্ছাশক্তির কারণে মাছ সাঁতার কাটে। মানুষ যখন ইচ্ছা করে তখন সে মাছের মত সাঁতার কাটতে পারে।

এই ইচ্ছাশক্তির জোরে মানুষ অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারে। ইচ্ছাশক্তির কারণে সফলতা বা অসফলতা আসে। ইচ্ছাশক্তির কারণে একজনের জীবনে সফলতা আসে। ব্যক্তি যতই শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান হউক না কেন, ইচ্ছাশক্তি না থাকলে কৃতকার্য হতে পারে না। ইচ্ছা কোনো মনুষ্য শক্তি নয়। এ হচ্ছে ঐশী শক্তি। ইচ্ছাশক্তি ব্যতীত মানুষ এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করতে অক্ষম। ইচ্ছাশক্তি ব্যক্তির চিন্তাকে ধরে রাখে।

প্রশ্ন হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি কি দিয়ে তৈরী? কবির ভাষায় বলা যায় যে ইচ্ছাশক্তি হচ্ছে প্রেম। দর্শন অনুযায়ী প্রেম হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি। কেউ যদি বলে, “স্রষ্টা হচ্ছে প্রেম”- এর অর্থ দাড়ায় স্রষ্টার ইচ্ছা। স্রষ্টার ইচ্ছার কারণেই এই জগতের প্রকাশ। কাজেই প্রেমের মূল উৎস হচ্ছে ইচ্ছা। যখন কেউ বলে, “আমি এই কাজ করতে ভালবাসি”- এর মানে দাঁড়ায় “আমি কাজটি করবই”।

পবিত্র কুরআন বলে, “আমরা বললাম- ‘হও’ অমনি হয়ে গেল। জগত সৃষ্টির চাবি হচ্ছে এই ‘হও’ ইচ্ছা শক্তির বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এই জগতের প্রকাশ। সকল সৃষ্টির, সকল প্রকাশের মূল হচ্ছে ‘হও’।

আমরা যদি সৃষ্টির কৌশলের দিকে দেখি তবে মনে হবে যে একজন প্রকৌশলী ছাড়া কিভাবে জগত সৃষ্টি হলো। কোন কৌশলে সৃষ্টি হলো? এ আর কিছু নয়। এ হচ্ছে ওই রূপকারের ইচ্ছাশক্তি। তিনি তার নিজের সুবিধার্থে ওই কৌশল অবলম্বন করেন। যেহেতু আমরা রূপকারকে দেখিনা, শুধু তার সৃষ্টি দেখি তাই রূপকারকে মনে করি না। প্রখ্যাত দার্শনিক রূমী (রঃ) তার মস্‌নভীতে যথার্থ বলেছেন, আব, আতশ, খাক, মরুৎ- আমাদের কাছে বস্তু বা সত্বা মনে হলেও স্রষ্টার কাছে এসব হচ্ছে জীবন্ত সত্বা। এরা সার্বক্ষণিক অনুগত ভৃত্যের ন্যায় ঐশী ইচ্ছা পালনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

স্রষ্টার ইচ্ছাশক্তির ক্ষুদ্র অংশ আমরা উত্তরাধীকার সূত্রে পেয়েছি এবং আমাদের সচেতনতা একে ব্যাপকতা দিয়েছে। যদি এই ব্যাপারে সচেতন না হই তবে এ ছোট হয়ে থাকবে। জীবনের প্রতি আশাবাদ ইচ্ছাশক্তির জন্ম দেয়। অন্যদিকে নিরাশাবাদ ইচ্ছাশক্তিকে দমন করে দেয়। কাজেই জীবনের উন্নতির পথে আমরা নিজেরাই বাঁধা হয়ে দাড়াই। আমাদের প্রগতির সামনে আমরাই সব সময় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছি।

মাটিতে শস্য বপণ করলে মাটি তা ধারণ করে। পরবর্তীতে সেখানে গাছের জন্ম হয় এবং তাতে ফুল ও ফল আসে। একই কথা হৃদয় সম্পর্কে বলা যায়। হৃদয় চিন্তাকে ধারণ করে। পরবর্তীতে তা পূর্ণতা পায়। দেখা যাচ্ছে যে চিন্তা কোন বিষয় নয়। চিন্তাকে ধরে রেখে পূর্ণতা দেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বলতে শোনা যায়, “আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি তথাপি মনের একাগ্রতা আনতে পারি নাই। আমি আমার মনকে স্থির করতে পারি নাই।” কথাটার মধ্যে সত্যতা থাকলেও এটা পুরাপুরি সত্য নয়। যথাসাধ্য চেষ্টার অর্থ শেষ পর্যায় না। যথাসাধ্য তখনই হবে যখন তা পরিপূর্ণতা পাবে বা সুফল বয়ে আনবে।

মন হচ্ছে বুনো ঘোড়ার মতন। একটি বন্য ঘোড়াকে ধরে এনে গাড়ীতে জুড়ে দিলে দেখা যাবে সে লাফাচ্ছে, লাথি মারছে, গাড়ী ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করবে। এর কারণ হচ্ছে সে এতে অভ্যস্ত নয়। এই অভিজ্ঞতা তার জন্য নতুন। মনে কোনো চিন্তা ধরে রাখতে গেলে মনের উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। মন তখন চঞ্চল হয়ে পড়ে। মন সব সময় চঞ্চল, বাঁধা ধরা নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ হতে চায় না। তবে কিছু চিন্তা মন নিজ থেকেই ধারণ করে রাখে- অসফলতা, দুঃখ, কষ্ট ও ব্যর্থতা ইত্যাদি। মন এই সমস্ত জিনিস এত দৃঢ়ভাবে ধারণ করে যে মন থেকে এই সব চিন্তা সহজে বের করা যায় না। মন নিজ থেকে এই সমস্ত বিষয় ধারণ করে। তবে তুমি যদি মনকে কোন বিশেষ চিন্তাকে ধারণ করতে বলো, তাহলে মন তা ধারণ করবে না। মন বলবে “জনাব, আমি আপনার চাকর নই।”

সাধনার মাধ্যমে মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মনের ইচ্ছাশক্তি তোমার ভৃত্য হয়ে পড়বে। একবার মন তোমার ভৃত্য হয়ে পড়লে, তোমার চাওয়া পাওয়ার কিছু থাকবে না। সমস্ত মনোজগতটা তোমার হয়ে যাবে। তোমার সাম্রাজ্যে তুমি রাজা হয়ে যাবে। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে- “যেহেতু আমি স্বাধীন, তাই মনকে কেন স্বাধীনতা দিব না?” কিন’ আমি এবং মন হচ্ছে পৃথক দুইটা জিনিস। এই কথা বলার অর্থ হচ্ছে “ঘোড়া এবং ঘোড় সওয়ার দুই জনকে স্বাধীন করে দেয়া।” সেক্ষেত্রে ঘোড়া চাইবে উত্তরে যেতে, অন্য দিকে ঘোড় সওয়ার চাইবে দক্ষিণ দিকে যেতে। যদি এরকম হয় তবে কি তারা একত্রে চলতে পারবে?

কিছু মানুষ আছে যারা বলেন- “আত্মাকে মুক্ত করে দাও, ইচ্ছাশক্তি মুক্ত হয়ে যাবে।” এরূপ হলে আমাদের অবস্থা কি হবে? আমাদের অবস্থান কোথাও হবে না। নিয়ন্ত্রণ মানুষের জীবনে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। নিজকে নিয়ন্ত্রণ করাটা প্রথম দিকে যতই কঠিন এবং নৃশংস হউক না কেন পরিশেষে সে তার মনের উপর নিয়ন্ত্রণ পায়। এই কারণে যোগী/সাধকগণ সংসার ত্যাগ করে নিজকে কঠোর তপস্যায় নিয়োজিত রাখেন। এই তপস্যার একটা উদ্দেশ্য থাকে। এই তপস্যা বিফলে যায় না। বিষয়টা অনুকরণ যোগ্য নয় বরং বুঝার বিষয়। তারা এটা ব্যবহার করে কিভাবে নিজের উদ্দেশ্য সাধন করেন, তাই দেখা ও বুঝার বিষয়। এ হচ্ছে নিজকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং এর মাধ্যমে ইচ্ছাশক্তিকে আরও শক্তিশালী করা।

জীবনে যত অপূর্ণতা দেখা যায় তার মূল কারণ হচ্ছে ইচ্ছাশক্তির অভাব। জীবনের সকল সফলতার মূল কারণ হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি।

প্রশ্ন ঃ ইচ্ছাশক্তিকে উন্নত/জাগ্রত করার সবচেয়ে ভাল উপায় কি?

উত্তর ঃ সাধকগণ ইচ্ছাশক্তি উন্নত করার জন্য কিছু নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলেন। প্রাথমিক অবস্থায় তারা নিজের দেহকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। তারা সেই ভাবে বসেন যেভাবে বসতে বলা হয়। যেভাবে দাঁড়াতে বলা হয় সেইভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই সব করার সময় তারা দেহকে কোন রূপ বিশ্রাম দেন না, দেহকে ক্লান্ত বা অবসাদগ্রস্তু হতে দেন না। দেহ তার চাহিদানুযায়ী সাড়া দিয়ে থাকে। দেহ যখন তার কথামত সাড়া দিতে থাকে তখন বুঝা যায় দেহ কতটা তার অবাধ্য ছিল। কাজেই দেহকে শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে- সব অস্ত্র প্রয়োগ করে অনুগত করা হয়।

দেহকে নিয়ন্ত্রণে আনার পর মনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। মনকে কেন্দ্রীভূত/একগ্রতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। মনকে কোন বিষয়ে চিন্তা করতে বললে, সে অন্য কিছু চিন্তা করতে থাকে। অন্য কথায় মন চঞ্চল থাকে। মন এক জায়গায় স্থির থাকেনা। সে নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে পছন্দ করে না। যখন একে বশে আনার চেষ্টা করা হয়। তখন সে জংলী ঘোড়ার ন্যায় আচরণ করতে থাকে। প্রায়শঃই লোকদের বলতে শোনা যায় যে, মনকে কোন বিষয়ের উপর কেন্দ্রীভূত করতে চাইলে মন লাফালাফি শুরু করে দেয়। অন্য সময় সে অবশ্য অনেকটা শান্ত থাকে। এর কারণ হলো মন একটা পৃথক সত্বা। মন সব সময় চঞ্চল থাকতে ভালবাসে। মন নিজকে জংলী ঘোড়ার মত মনে করে এবং বলে, “তুমি আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ? তবে মনে রাখতে হবে যে দেহের মাধ্যমেই মনকে নিয়ন্ত্রন করতে হবে। যদি মন ও দেহ তোমার কথামত একসাথে কাজ না করে তবে প্রকৃত সুখ ও শান্তি পাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন ঃ দয়া করে বলবেন কি, একাগ্রতা ও নীরবতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

উত্তর ঃ একাগ্রতা হচ্ছে কোন বিশেষ চিন্তা নিজের সামনে ধরে রাখা। নীরবতা হচ্ছে মন ও দেহকে বিশ্রাম দেয়া। এ হচ্ছে শান্ত করা বা নিরাময় যোগ্য করা।

প্রশ্ন ঃ একাগ্রতা ও সাধনা করার মধ্যে পার্থক্য কি?

উত্তর ঃ সাধনার আরম্ভ হয় একগ্রতার মধ্যে দিয়ে। অন্যদিকে একাগ্রতা হচ্ছে সাধনার শেষ । এ হচ্ছে একাগ্রতার উৎকর্ষ সাধনার শেষ পর্যায়। মনের অন্তর্দশী/সুক্ষ্ম কাজকে সাধনা বলা হয়। এই কাজ হচ্ছে একাগ্রতার চাইতে নিগূঢ়। একাগ্রতা নিজের বশে এসে গেলে ব্যক্তির পক্ষে সাধনা করা সহজ হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন ঃ বলা হয় ইচ্ছাশক্তি আমাদের উপর নির্ভরশীল না। এটা কাউকে অনুগ্রহ করে বা আশীর্বাদ স্বরূপ দেয়া হয় না?

উত্তর ঃ এটা আমাদের উপর নির্ভরশীল না হলেও এটা কিন’ আমাদের নিজস্ব। এ হচ্ছে অনুগ্রহ বা আশীর্বাদ এতে কোনো সন্দেহ নেই। একে আমাদের মধ্যে পাওয়া যাবে। এ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব সম্পদ।

প্রশ্ন ঃ ইচ্ছা এবং চেতনা কি মূলত এক?

উত্তর ঃ হ্যা। এ হচ্ছে একই বস্তুর দুই ভাবে প্রকাশ। এক হতে দুইয়ের আগমন। এ হচ্ছে স্রষ্টা হতে আগত। যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন ইচ্ছাশক্তি বলা হয়। আর শান্ত অবস্থায় চেতনা বলা হয়। অনেকটা শব্দ ও আলোর মত- এক এবং একই বস্তু হতে আগত। এক অবস্থায় কম্পনকে শোনা যায়। আবার অন্য অবস্থায় কম্পনের ঘর্ষনের ফলে আলো উৎপন্ন হয়। এই জন্য আলো এবং শব্দের প্রকৃতি এবং স্বভাব এক ও অভিন্ন। একই কথা ইচ্ছাশক্তি ও চেতনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মূলতঃ উভয়েই স্রষ্টা হতে আগত।

প্রশ্ন ঃ ইচ্ছাশক্তি আমাদের দেহকে যদি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শক্তিশালী ও পরিপূর্ণ করতে পারে। তাহলে মৃত্যুর অবস্থান কোথায়?

উত্তর ঃ মৃত্যু ইচ্ছাশক্তি হতে আলাদা কিছু নয়। মৃত্যু আর ইচ্ছা একই জিনিস। মৃত্যুর কারণ কিন্তু এই ইচ্ছাশক্তি। নিজের মৃত্যুকে নিজে কেউ আহ্বান করে না, এই কথাটা সত্য বটে। কিন্তু ব্যক্তিগত ইচ্ছা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বৃহত্তর ইচ্ছা, দুর্বল ইচ্ছাকে গ্রাস করে ফেলে। দুর্বল ইচ্ছা তখন বৃহত্তর ইচ্ছার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। (চলবে)

অসহায় বৃত্তে বন্দি মানুষ!

সুহৃদ মান্নাফী ॥ বৃত্তাবদ্ধ সংস্কৃতি মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে। মানব জীবন প্রবাহে যত প্রকার অনুষঙ্গ রয়েছে তার সকল কিছুই আজ চক্রাকারে ঘুরপাক খেতে খেতে মানব জীবনকেই বিষিয়ে তুলেছে। সকল প্রকার অনুষঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে সম্পদ বা বিষয় নামক বিষ। যদিও বর্তমান মানব প্রজাতির কেহই সম্পদ বা বিষয়হীন হয়ে চলতে পারে না। তবু সম্পদ নামক অপরিহার্য অনুষঙ্গ ব্যক্তি মানুষ থেকে দল, সমাজ থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে বিশ্ব সর্বোপরি পুরো মানবজাতিকে প্রতিমুহূর্তেই চরম অসহায় সংকটের ঘূর্নাবর্তে ফেলে দিচ্ছে। এই ঘূর্নাবর্তে পড়ে মানবজাতি আজ দিশাহীন উন্মাদের মতো সম্পদ উপার্জনের নেশায় ছুটে চলছে দেশ হতে দেশান্তরে। সম্পদ অপরিহার্য হলেও সম্পদের  পাহাড় গড়ে তোলার অপরিনামদর্শী ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পুরো বিশ্বের মানবজাতি একে অন্যকে নিজেদের সৃষ্টি করা ফাঁদে বন্দি করে ফেলছে। এই বন্দিদশার অন্যতম কারণ সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা। যেদিন থেকে মানুষ সম্পদের ব্যক্তি মালিকানার দাবীদার হয়েছে সেদিন থেকেই মানুষ নিজেদের জীবনে অশান্তি আর অমঙ্গলকে সাদর সম্ভাষণে বরণ করে নিয়েছে নিজেদের অগোচরেই। মানুষ ভালো করেই জানে তার জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব। তথাপি এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রয়োজনীয় সম্পদের চেয়ে অতিরিক্ত ভোগের নেশা তাকে দিশাহীন সমুদ্রে ফেলে ঢেউয়ের ঝাপটে মেরে মেরে ভাসিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কোথা হতে কোথা চলে যাচ্ছে মানুষ তা সে নিজেই টের পাচ্ছে না। জীবনের সীমানা নির্ধারিত থাকলেও সম্পদ অর্জনের এবং তা নিজের মালিকানায় দখলে নেবার কর্মে অন্ধ থাকার কারণে মানুষ সম্পদ অর্জনের সীমারেখা টানতে পারছে না। ফলে মানবজীবনের যে মূল সুর, মূল ভূমিকা, মূল উদ্দেশ্য তা মানবের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে এবং সম্পদ মোহের প্রাচীরে নিজেকে বন্দি রাখার কারণে বারবার মানব প্রজাতিতে নিজেকে জন্ম দিয়ে চলেছে। এ জন্ম জন্মান্তরের বৃত্ত থেকে মানুষ নিজেকে বের করতে পারছে না। এই ভয়াবহ চক্রের ফেরে মানুষ নিজের অজ্ঞাত সারেই বাধা পড়ছে।

বিশ্ব জগতে মানবের প্রয়োজনীয় উপাদান উপকরণ প্রাকৃতিক ভাবেই বিরাজিত। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই বিশ্ব প্রকৃতি থেকে সকল কিছু পেয়েও মানুষ তৃপ্ত হতে পারেনি। তাই নিজ মেধা বিদ্যা বুদ্ধির বলে ভোগের আর উপভোগের বহু সামগ্রী মানুষ আবিস্কার করে নিয়েছে। আর এই ভোগ উপভোগের বাহারী পণ্য মানুষের জীবনে যতটা না শান্তির কারণ হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী অশান্তি নিয়ে এসেছে। মানবের জন্য কি কি উপাদান খুব প্রয়োজনীয় তা আমরা কতজন গভীরভাবে ভেবে দেখি? আমরা শরীরের চাহিদা মেটাতে খাবার চাই। শরীর ঢাকতে পোষাক চাই আর বিনোদনের জন্য আনন্দদায়ক কোন অনুষঙ্গ চাই। শিক্ষার জন্য চাই শিক্ষা উপকরণ, চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা উপকরণ, ইত্যাদি ইত্যাদি যে সব উপাদান উপকরণ একটি জীবনের জন্য মানুষের প্রয়োজন হয় তার প্রয়োজনে কি পরিমাণ সম্পদ লাগে তা আমরা হিসেব করে দেখতে চাই না। ফলে একটির পর একটি, এক চাহিদার যোগান পেলে নতুন চাহিদাপত্র, এক ভোগ শেষ হতে না হতেই অন্য ভোগের আবির্ভাব এভাবে চলছেই। আর ফলাফল যা হবার তাই হচ্ছে। নিজেরাই নিজেদের চিন্তার দ্বারা, কর্মের দ্বারা ভোগের ভোগ্য বস’তে পরিণত হয়ে সুন্দর মানব জীবন বিনষ্ট করে দিচ্ছি।

সম্পদ অর্জনের নেশায় বিভোর মানুষ একে অন্যকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ফেলে ব্যবহার করছে কিভাবে কত অধিক সম্পদ উপার্জন করা যায়। সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দু’টি অনুষঙ্গকে মানুষ ব্যবহার করে তা হল শিক্ষা বা বিদ্যা এবং বল বা শক্তি। এই দুই অনুষঙ্গ ব্যবহার করে মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়তে লেগে পড়েছে। বর্তমান সমাজ ও বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে তাকালে এর বাস্তবতা চরমভাবে আমাদের চোখে পড়ে। অধিক সম্পদের মালিক হবার মানসে আমরা ভালভাবে পড়ালেখার তাগিদ নেই সন্তানদের। চেষ্টা তদবির করে কিংবা ডোনেশন প্রদানের মাধ্যমে ছেলে মেয়েদের ভাল একটি স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করাই। আমাদের উদ্দেশ্যই থাকে জীবনে প্রতিষ্ঠা। আর সে প্রতিষ্ঠা মানে একটু ভাল উপার্জন, একটু সামাজিক ষ্ট্যাটাস, একটু ক্ষমতার দাপট দেখানোর যেন পথ হয়, একটু প্রভাব যেন বিস্তার করতে পারে পরিবারে, সমাজে, আত্নীয়-বন্ধু পরিমন্ডলে, রাষ্ট্রে কিংবা বিশ্বে। ভাল একটি প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে বের হলে ভাল জায়গায় চাকুরী পাবার সম্ভাবনা থাকে, ভাল চাকুরী মানে ভাল উপাজন, ভাল উপার্জন মানে ভাল বাড়ি, ভাল গাড়ি, আরও আরও কিছু। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হলে তো কথাই নেই।

এক্ষেত্রে যতটা না বিদ্যান হবার আনন্দ ও গর্ব তার চেয়ে ঢের বেশী সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তি, মান সম্মান এবং আর্থিক ভাব। মানবের মনোজগতে অর্থ সম্পদই যেন এক অমোঘ চাওয়া। এই চিন্তায় কিংবা এ প্রক্রিয়ায় প্রায় সকলেই আচ্ছন্ন। কেউ বুঝে, কেউবা না বুঝে। একজন আরেক জনকে ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধগলির দিকে। ডাক্তারের বেশী রোগী চাই, নইলে ভাল ইনকাম নাই, গাড়ি হবে না, ফ্লাট হবে না, সমাজে ষ্টাটাস পাওয়া যাবে না। ক্লাব হবে না, পার্টি হবে না। সমাজে অর্থনৈতিক জাতিভেদ তৈরী করতে না পারলে যেন মান বাঁচে না।

আমরা খুব খুশি হই যখন আমাদের একটি ছেলে কিংবা মেয়ে ডাক্তার হয়। কারণ ডাক্তার রোগীর চিকিৎসা সেবা প্রদানের মাধ্যমে রোগ নিরাময় করবে তাতে মানবসেবা হবে। কিন্তু পাশাপাশি যত বেশী রোগী হবে ততবেশী হাসপাতাল হবে। যত বেশী হাসপাতাল হবে ততবেশী ডাক্তার লাগবে। যত বেশী রোগী, যত বেশী ডাক্তার, নার্স, যত বেশী হাসপাতাল ততই বেশী ঔষধ, ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানী। সকল কিছুতেই সম্পদের অপরিহার্যতা এবং সম্পদ অর্জনের এক নীলনকশা। তবু মানুষ চেষ্টা করবে না কি করে রোগ স্থায়ী নিরাময়ের ব্যবস্থা করা যায়। বর্তমানে বাংলায় মানুষের রোগ অনেকটা মহামারির মতো। এর অন্যতম কারণ খাবারে বিষাক্ত উপাদান। এমন কোন খাবার পাওয়া দুরুহ যাতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বিষের সংক্রমন নেই। মোরগ-মুরগীর মাংস খাবেন? বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া যাবে। গরুর মাংস খাবেন? ইউরিয়া সার এবং মানব দেহের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকারক ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজাকৃত গরুর খামারে সয়লাভ দেশ। মাছ খাবেন? পুকুর জলাশয়ে খুব চাষ চাষ হচ্ছে সকল প্রকার দেশী বিদেশী মাছ যার খাবারে বিষাক্ত উপাদান। সবজি ফল মূল এখন ফরমালিন ও নাম নাজানা আরো অসংখ্য পচনরোধী বিষ দিয়ে বহুদিন বাঁচিয়ে রেখে অধিক মুনাফার কৌশল। শিশু খাদ্য, গুরু দুধ, নুডুলস? সব একই প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত ও মানহীন। বাহারী বিজ্ঞাপনে ফুসলিয়ে, ডাক্তারদের দিয়ে কিংবা দুর্নীতিবাজ মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষাকারী অমানুষদের দিয়ে সার্টিফিকেট প্রদান করে বাধ্য করে সকল শ্রেণী পেশার মানুষদের খেতে। আর ফলাফল? তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘ মেয়াদী হাজারো জটিল কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তার হাসপাতালের শরনাপণ্য। এক জনের অধিক সম্পদ অর্জনের মোহ অন্যকে মরণ ফাঁদে ফেলে দিচ্ছে এবং রোগীর সাথে ডাক্তার, ডাক্তারের সাথে হাসপাতাল ব্যবসায়ী, হাসপাতাল ব্যবসায়ীর সাথে সরকারী মন্ত্রণালয়, ফার্মাসিউটিক্যালস ইত্যাদি ইত্যাদি সকল প্রকার ব্যবসায়িক শিল্প প্রতিষ্ঠান। আপাত সব মহৎ কর্মে এবং মানব সেবায় নিয়োজিত মনে হলেও অবৈধভাবে কিংবা বৈধভাবে সম্পদ উপার্জন করার নেশায় মত্ত হতে গিয়ে আমরা সকলেই এক অদৃশ্য বন্দীশালার বাসিন্দা হয়ে পড়েছি। নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টি করা সম্পদের ফাঁদে পড়ে নিজের মন, শরীর এবং জীবন নষ্ট করছি।

জীবনের সন্তুষ্টি!

শেখ উল্লাস ॥ বাংলার কবি শেখ ফজলল করিম লিখেছিলেন, ‘আকাশের চেয়ে উচ্চতা বেশি কার? জ্ঞানী বলে, বাছা, সত্যের চেয়ে উঁচু নাহি কিছু আর।..সাগর হইতে কে অধিক ধনবান? জ্ঞানী বলে, তুষ্ট হৃদয় তারো চেয়ে গরীয়ান। কামিনী রায় লিখেছিলেন, আপনাকে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। আর রবী ঠাকুরের বাণী হচ্ছে, ‘অনেক তোমার খেয়েছি, অনেক নিয়েছি মা, তবু জানিনে কী বা তোমায় দিয়েছি মা, আমার জনম গেল বৃথা কাজে, আমি কাটিনু দিন ঘরের মাঝে’।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন ও পদোন্নতির সর্বশেষ পরিস্থিতির খবর যেভাবে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, তাতে যে কেউ ধারণা করবেন যে, এ নিয়মে অসন্তুষ্টির মাত্রাটাই অনেক বেশি। বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ সরকারি জনবলের বিরাট একটি অংশের। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই শুধু এ ব্যাপারে কোনো রা নেই। কারণ, তারা বলা চলে নিজেদের মতো করে যতটুকু নেয়া যায়, ততটুকুই নিতে পেরেছেন অন্যদের তুলনায়। কিন্তু এই পৃথিবীতে কারো সাথে কারো কি তুলনা করা সম্ভব? না কি এটা আদৌ উচিত? মহান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী হচ্ছে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্বীয় কর্মবৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকিবে’। ১৯৭২ সালে অস্ত্র সমর্পণ করতে আসা এক দল মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের তিন বছর কিছু দিতে পারবো না। আরো তিন বছর যুদ্ধ চললে, তোমরা যুদ্ধ করতে না। উত্তর ছিল, ‘করতাম, করতাম’। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, তা হলে মনে কর যুদ্ধ চলছে, তিন বৎসর যুদ্ধ চলবে। সেই যুদ্ধ দেশ গড়ার যুদ্ধ। অস্ত্র হবে লাঙ্গল আর কোদাল।’ সেই বঙ্গবন্ধুকে সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা করলো এদেশেরই মানুষ। এর জন্য নিশ্চয়ই এদেশের সাধারণ মানুষ, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ তথা গণযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, রক্তদানকারী গ্রাম-বাংলার লাখো-কোটি সাধারণ মানুষ দায়ী ছিল না। হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের সবাই ছিল স্বাধীনতার সুফলভোগী কিছু রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা।

আজ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে অষ্টম বেতন স্কেল ঘোষণার পরে যখন দেখা গেল, সরকারি বেতনভুক্ত অধিকাংশ উচ্চপদস’ কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মধ্যে মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধাদি নিয়ে ক্ষোভ ও অসন’ষ্টি, তখন বিবেকের কাছে নানা প্রশ্নের উদয় হয়। এ অবস্থাটি কি আমাদের জাতীয় লজ্জা নয়? কারণ, কিছু মানুষ যারা এই বেতন স্কেল কাঠামোর নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাদের ব্যক্তিস্বার্থ ও সংকীর্ণতার কারণে সামগ্রিক অবস্থাটাকেই স্বার্থপরতার এক জ্বলজ্বলে উদাহরণ হিসেবে পরিণত করেছে। এ নিয়ে যত কথা, যত বাড়াবাড়ি হবে বিষয়টি ততই লজ্জার হবে। এক সময় আন্দোলন করতো কম সুবিধাভোগীরা, এখন করে বেশি সুবিধাভোগীরা! এক্ষেত্রে বাংলা প্রবাদ ‘লোকটি যত পায়, তত চায়’ -অনুসন্ধিৎসুদেরকে নির্দেশনা দেয়। অবশ্য বেতন-ভাতা ও মর্যাদা বাড়ানোর পর সবাই সন’ষ্ট হয়ে যার যার কাজকর্মে সত্যবাদী, সৎ, নিষ্ঠাবান ও আন্তরিক হলে আর কোনো কথা থাকে না। দেশে তখন আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব হতে পারে। কিন্তু তা কবে কখন সম্ভব? মানুষের পক্ষে সন্তুষ্টি অর্জন কখন সম্ভব? এ ব্যাপারে হাক্কানী সাধকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘একজন ব্যক্তি তাঁর জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে সত্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবন চলার পথে চলতে পারলেই কেবল জীবনের সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব’।

সূফী সাধক আব্দুর রহমান স্মরণে শান্তি সমাবেশ হলো

1.3সংলাপ ॥ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক হুকুমে সূফী সাধক আব্দুর রহমান স্মরণে গত ২০ – ২২ পৌষ ৩ – ৫ জানুয়ারী ২০১৬  হবিগঞ্জস্থ্য বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ, কালিকাপুরে বার্ষিক শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। মিলাদ পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন সম্মানিত তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ সৈয়দ আছাদ আলী। অনুষ্ঠানে আকর্ষনীয় দিক ছিল স্বাস্থ্য নিবেশ – স্থানীয় গরীব, দুঃস্থ্য ও রোগাক্রান্তদের মাঝে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ প্রদান, হাক্কানী ওজায়িফ পাঠ, মুক্ত আলোচনা, ওয়াজ মাহাফিল, ভাবসঙ্গীত পরিবেশন ও শোধন সেবা। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন শাহ্ ফখর উদ্দিন আলী আহম্মদ।1

যোগ্যতায় বেঁচে থাকা – ৩

* সৌন্দর্যের মূল্যঃ মানুষের কাছে মানুষের হাসিমুখ

সংলাপ ॥ কবি-সাহিত্যিকের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার না করে উপায় নেই। তারাই জীবনের সুকুমার বৃত্তিগুলি বাঁচিয়ে রাখেন। গৃহনির্মাণে গৃহস্বামীর যে স্থান রাষ্ট্রগঠনের ব্যাপারেও কবি-সাহিত্যিকদের সেই স্থান! গৃহস্বামীর ইচ্ছা, অভিরুচি, খেয়াল ও কল্পনার খোঁজ নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার গৃহের প্লান বা পরিকল্পনা তৈরী করেন; পরে ওভারশিয়ার, রাজমিস্ত্রি ও যোগালির সহায়তায় গৃহনির্মাণ কার্য সমাধা করেন। রাষ্ট্রও এভাবেই গঠিত হয়। রাষ্ট্রে বাস করে ‘জীবন’। জীবন মূক; তার প্রতিনিধি কবি ও সাহিত্যিক; জীবনের ভালো লাগা, মন্দলাগা, আশা-আকাঙ্খা, বিচিত্র সাধ ও গভীর অভিলিপ্সা এদের মারফতেই অভিব্যক্ত হয়। রাজনৈতিক চিন্তাবীদরা এদের জীবনবোধের সহায়তা নিয়ে আদর্শ রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করেন। তার পরে আসেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ; ছোট-বড় কর্মীদের সহযোগিতায় তারা গড়ে তোলেন জীবনের আকাঙ্খিত রাষ্ট্রসৌধ। কবি-সাহিত্যিকের জীবনবোধের দিকে না তাকালে তা হয়ে পড়ে শ্রী-মাধুর্যহীন কাজ-চলা গোছের ইমারত। তাতে সাধারণ জীবন তথা ব্যবসা-বাণিজ্য চলে ভালোই, কিন্তু সুন্দর জীবন যাপন হয়ে পড়ে অচল।

এ সম্বন্ধে আরেকটি কথা মনে রাখা ভালো। সৌন্দর্যের সাধনা পূর্ণাঙ্গ চেহারার সাধনা, শুধু শিরদাঁড়ার সাধনা নয়। তাই চেহারা সম্বন্ধে আমরা যতটা সচেতন মেরুদণ্ড সম্বন্ধে ততখানি নই। আমাদের খাওয়া-পরা বিলাস-বসন সমস্ত কিছু এই চেহারার সৌন্দর্যের জন্যই। অবশ্য খাওয়া-দাওয়ার ফলে শিরদাঁড়াও শক্ত হয়। কিন্তু সেদিকে আমরা সজাগ নই, আমাদের সচেতনতা কেবল চেহারা নিয়ে। আর চেহারার সৌন্দর্য কেবল খাওয়া-পরার উপর নির্ভর করে না, সেজন্য ভাবসাধনারও প্রয়োজন। এমনকি সৌন্দর্য সাধনার ব্যাপারে খাওয়া-পরার চেয়ে ভাবসাধনার দানই বেশী; আর এই ভাবসাধনার প্রবণতা মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে দেয়ার দিকে যতখানি, সিধা রাখবার দিকে ততখানি নয়। তথাপি সাধনাকেই আমরা ভালোবাসি। বিশ্রী চেহারার দৃঢ় মেরুদণ্ড মানুষের চেয়ে সুন্দর চেহারার দুর্বল মেরুদণ্ড মানুষই আমাদের প্রিয়। ক্ষীণকায় শিল্পবীরের সঙ্গেই আমরা হাত মিলাতে চাই, বিপুলকায় মল্লবীরের সঙ্গে নয়। এখানেই মানুষের মনুষ্যত্বের জয়, কেননা এখানেই সে তার নিজকে মূল্য দেয়।

ব্যক্তির জীবনে শিরদাঁড়ার যে স্থান, জাতির জীবনে রাজনীতির সেই স্থান। শিরদাঁড়া ছাড়া ব্যক্তি চলতে পারে না। আর রাজনীতি ছাড়া জাতি অচল। তথাপি মাত্রাজ্ঞানহীন মেরুদণ্ডের সাধনা যেমন ব্যক্তির পক্ষে মারাত্মক, মাত্রাজ্ঞানহীন রাজনীতির সাধনাও তেমনি জাতির পক্ষে অশুভকর। কেননা, উভয় ক্ষেত্রেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে বিকৃত হয়ে যায়। জাতি যদি কেবল রাজনীতির সাধনা করে তো তার মেরুদণ্ড ষাঁড়ের মত শক্ত হয় বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারাটিও ষাঁড়ের মতোই কদর্য হয়ে ওঠে। রাজনীতিসর্বস্ব ষণ্ডামার্কা। জাতিরা মৌতাতের জন্য মানুষের মতো কোলাকুলি বা করকম্পন না করে ষাঁড়ের মতো গুঁতোগুঁতি করে।

ফলে শান্তি ও শৃঙ্খলা লণ্ড-ভণ্ড হয়ে পৃথিবীর সর্বনাশ হয়; মানুষের জীবনে মূল্যবান বলে আর কিছু থাকে না। প্রতিকারস্বরূপ মনে রাখা দরকার, মেরুদণ্ড বাঁচার লক্ষ্য নয়, উপায় মাত্র; রাজনীতিও জাতির লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ্য। লক্ষ্য সৌন্দর্যধ্যান ও আনন্দ সাধনা। লক্ষ্যের স্থান উপলক্ষ্য তথা দেবতার স্থানে বাহনকে বসিয়ে পূজা করলে কালের হাতে শাস্তি পেতে হয়, আর যুদ্ধ ও সামপ্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার ভিতর দিয়ে আমরা সেই শাস্তিই পেয়ে থাকি।

উপরের যে বন্ধুটির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে আবার আমার দেখা হয় কিছু দিন আগে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ল’ ও অর্থনীতিতে এম.এ পড়ছেন। দেখলুম, তার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে- আত্মতুষ্টি আর স্ফূর্তি বেদনার স্থান নিয়েছে। তবু সমব্যথী পেয়েছি ভেবে আমার স্বভাব অনুযায়ী তাকে সমাজের মানসিক দৈন্যের কথা বললুম; সমাজ যে প্রগতিশীল হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে ঝাঁঝাল সুরে ইঙ্গিত করলুম; কিন্তু তাতে তার পূর্বপরিচিত সংবেদনশীল চিত্তের সাড়া পেলুম না। বরং আমার কথায় একটু খানি হেসে নিশ্চিন্তে সিগারেট টানতে টানতে ও পান চিবুতে চিবুতে বললেন : সমাজের দোষ কি? এখন অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমাজ যে স্তরে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে তার কাছে এর চেয়ে বেশি আর কিছুই আশা করা যায় না। অর্থনীতিই তো জীবনের ভিত্তি; কাজেই আফসোস করে লাভ নেই।

আমি নৈরাশ্যমিশ্রিত সুরে বললুম: কিন্তু সেই অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের কোন সুষ্ঠু ব্যবস্থা হচ্ছে কি? কতিপয়ের বড় হওয়ার দিকেই তো সমাজের দৃষ্টি, সাধারণের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার দিকে নয়।

তিনি আশ্বাসের সুরে বললেন: হ্যাঁ হচ্ছে বৈ-কি? এই যে লোকেরা চাকরী পাচ্ছে, এতেই সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

আমি: কিন্তু  খুব আশানুরূপ এগিয়ে যাচ্ছে কি?-অন্তত চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে?

তিনি: হ্যাঁ, যাচ্ছেই তো। হিন্দুসমাজ কি আর একদিনে এতদূর এগিয়ে এসেছে? আস্তে আস্তে এগিয়ে এসেছে। আমরাও আস্তে আস্তে এগিয়ে যাব। রোম নগরী একদিনে নির্মিত হয়নি, মনে রাখবেন।

আমি আর কিছু না বলে সিগারেটটি জ্বেলে ধীরে ধীরে টানতে লাগলুম, আর মনে মনে ভাবলুম: লোকটা ভাগ্যবান, লেখাপড়ার ফলে বেদনার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

আমি বদ নসীব, আমার আর মুক্তি হল না। বেদনা থেকে মুক্তি আর আত্মিক মৃত্যু এক নয় কি? সহজ নিশ্চিন্ত জীবনের মূল্য কতটুকু। অসম্ভবের ক্ষুধা না থাকলে জীবনে আর থাকে কি? বন্ধুর মসৃণ জীবনের ক্রমবিকাশটি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। এম.এ ডিগ্রি,

বি.সি.এস পরীক্ষা, ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট, এম.এল.এ অথবা মন্ত্রীকন্যা, এস.ডি.ও, ম্যাজিষ্ট্রেট, তারপরে সকলের যা হয় তাই। সেই শেষ অনিবার্য পরিণতি, আর বিস্মৃতি। মানে ‘তরক্কী’ যাকে বলে তার সবটাই তিনি করবেন কিন্তু প্রকৃত উন্নতি কতটুকু করবেন তা বুঝতে পারলুম না।

মানুষ সব জায়গাতেই অর্থনীতির হাতে বন্দী, শুধু এই সৌন্দর্য ও আনন্দের ব্যাপারেই সে মুক্ত। এর জন্য প্রয়োজনীয় কেবল প্রকৃত ক্ষুধা, আর কিছু হলে ভাল, না হলেও চলে। একবার যার অন্তরে এই ক্ষুধা জেগেছে, সে তার স্বাধীনতা উপলব্ধি করেছে- এক অ-বস্তুনির্ভর আলোকে তার জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। যারা দু’দিক সামলাতে চান, শ্যাম ও কূল উভয় দিক রক্ষা করতে চেষ্টা করেন, বুঝতে হবে তাদের জীবনে সত্যিকারের ক্ষুধার অভাব;   সৌন্দর্যের ডাকে তাদের আত্মা উতলা হয়নি। এই ক্ষুধা যাদুমন্ত্রের মতো এক অদ্ভূত জিনিস। যে অনুভব করল সে বেঁচে গেল; আর যে অনুভব করতে পারলে না সে হতভাগ্য, এক অনির্বচনীয় আনন্দ থেকে তাকে বঞ্চিত থাকতে হল। তার কাছে তাই বড় হয়ে ওঠে অর্থ আর আচার পূজা-নিজেকে ফাঁকি দেয়ার সবচেয়ে বড় উপায়।

উপরের দার্শনিক মতবাদ সৌন্দর্য ও আনন্দের ব্যাপারে ক্ষুধামন্দ ঘটিয়ে নিশ্চেষ্টতার প্রশ্রয় দেয় বলে তাকে সাবধানে গ্রহণ করা উচিত। মানুষ অবস্থার দাস নয়, প্রভু-এটাই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আশ্বাসের কথা। সাধারণভাবে মানুষের দৈন্য-দুর্দশা দূর করার চেষ্টা ভালো। কিন্তু অর্থ না হলে সৌন্দর্য ও আনন্দচর্চা চলতে পারে না এবং তা ধনেরই একটা বাই প্রোডাক্ট-এর মত মারাত্মক ধারণা আর নেই।

সৌন্দর্যের কথা মনে রাখলে খাওয়া-পরার কথা আপনা-আপনি এসে পড়ে, কিন্তু খাওয়া-পরার কথা মনে রাখলে সৌন্দর্যের কথা মনে না-ও আসতে পারে। আর সৌন্দর্যপ্রেমই খাওয়া-পরার ব্যাপারে সংযম ও শালীনতা এনে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। শুধু নিজের তৃপ্তির দিকে নজর রাখলে চলবে না, সকলেরই তৃপ্ত হওয়া দরকার- একমাত্র সৌন্দর্য প্রেমই তা আমাদের শেখাতে পারে।  প্রকৃত সৌন্দর্য- প্রেমিকের কাছে মানুষের হাসিমুখের মূল্য অনেক। (সমাপ্ত)

মাতৃভাষায় কুরআন চর্চা

সংলাপ ॥ আলোচনা-সেমিনার, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ-প্রবন্ধ, এমনকি কতক লোকের ক্রিয়াকাণ্ড দেখে ভ্রম হওয়া স্বাভাবিক যে, ইসলাম মানেই আরবীয় বেশভূষা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং মুসলিম হলো আরবী ভাষার আবরণে কোনো জীব যাদের কৃষ্টি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি শুধু নয়, মুখ নিঃসৃত শব্দও আরবিয় ঢংয়ে উচ্চারিত হবে। কেননা, আরবি ভাষার মাহাত্ম্য এমনভাবে প্রচার করা হয় যে, পড়লে নেকী, শুনলে নেকী, প্রতি হরফে দশ নেকী।

এ কারণেই হয়তো বা আরবি উচ্চারণ ও আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের কসরৎ কম হয়নি। উর্দু ভাষী পাকিস্তানীদের খুশি করতে ওদের নজরানা খেয়ে এ ধরনের উদ্ভট চেষ্টা-তদবির চলেছে অনেকদিন ধরে। কারণ, এ সমস্ত শিক্ষিতপাপী পরগাছা গোষ্ঠীর প্রভুদের দৃষ্টিতে বাংলা স্লেচ্ছদের অচ্ছুৎ ভাষা। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করে বাংলার নাম-নিশানা চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রও তাই অভিন্ন উৎস থেকেই। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা, গান-বাজনা হারাম ঘোষিত হওয়া ভিন্ন চিন্তাধারা প্রসূত নয় আদৌ। ভাষা আন্দোলনের দাঁতভাঙ্গা জবাব এদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ। বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রের থাবা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলে, যার সফল পরিণতিই ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্রের বিস্ময়কর অভ্যুদয়। সারা পৃথিবীময় এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উপমহাদেশের মধ্যে বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র, প্রতিবেশি বৃহৎ দেশগুলোর শাসকবর্গের কাছে হুমকিস্বরূপ নিশ্চয়ই। তা না হলে এখানে অশান্তির বীজ বপন করার স্বার্থকতা কোথায়! সর্বত্রই চক্রান্ত ও কূটচালের মরণ ফাঁদ বিছানো। আমাদের জাতির বিবেক, গর্ব এবং জাতীয় অহংকারের প্রতীক – লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রমুখ মনীষীদের নিয়ে তেলেসমাতির অন্ত নেই এখনও। মঙ্গল প্রদীপ, তিলক, ফুলচন্দন, প্রভাতফেরী, শহীদ মিনার, পুষ্পার্ঘ নিবেদন প্রভৃতি দেশজ কৃষ্টিগুলোকে বিতর্কিত, কটাক্ষ এবং পরিশেষে হেয় প্রতিপন্ন করার লোকের অভাব নেই। স্বীয় রক্ত-মাংস-অস্থিমজ্জার সঙ্গে লেপ্টালেপ্টিভাবে একাকার হয়ে যাওয়া জাতীয় স্বতন্ত্র অস্তিত্বের প্রতীক কৃষ্টি-সভ্যতা-সংস্কৃতিকে বেদাত অথবা অনৈসলামিক বা হারাম বলে ফতোয়া প্রদান করা সুস্থ জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেকপ্রসূত ভাবধারা নয় কোনক্রমেই। কাবা ঘরকে বুকে ধারণকারী সৌদি আরবের বিবাহ, আকিকা, জন্মোৎসব অনুষ্ঠানে প্রচলিত উলুধ্বনি প্রদান, বাড়িতে বাড়িতে তুলসী গাছ লাগিয়ে আদর-যত্ন করার দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলে জ্ঞান-বুদ্ধিতে আড়ষ্ট তথাকথিত মোল্লা-মৌলভীদের বন্দি জীবনের করুণ আর্তনাদ এরূপ নগ্নতায় পর্যবসিত হতে পারতো না নিশ্চিত করে বলা যায়।

নিজের ভাষা এবং নিজের দেশের আবহাওয়া-জলবায়ু উপযোগী পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ না করে, বরং গ্রহণ করতে উৎসাহী হতো এবং এখনকার মতো এমন পরগাছা-পরজীবী চরিত্র দৃষ্টির সীমানায় ধরা পড়ে লজ্জায় মুখ ঢাকতে হতো না আমাদেরকেও। প্রগতিশীল দাবি-দাওয়াও কম কিসে! মন-মানসিকতায় বাঙালি হলে সর্বত্র বাংলা প্রচলনে বাধা কিসে; অন্তরায় কি? কাউকে হেয় না করে অথবা অন্য ভাষার প্রতি সামান্যতম বিদ্বেষ পোষণ না করেই জানতে ইচ্ছে হয়, নিজস্ব ভাষা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার যোগ্যতা, শক্তি কি নেই আমাদের? স্বকীয় ঋতু বৈশিষ্ট্যের সমাহারে সমৃদ্ধ নির্ভরযোগ্য ও নির্ভুল বর্ষপঞ্জির অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি দিবসটিও ইংরেজী ২১ ফেব্রুয়ারিতে উদযাপিত হয়, ৮ ফাল্গুন থাকে উপেক্ষিত।

মহামতি সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত বাংলা সন হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ ব্যবহার না করার ফলে। শুধুমাত্র বৈশাখের মিছিল, মেলা আর লোক দেখানো ইলিশ ভাজা ভোজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মোনাফেকী চরিত্রের প্রকৃত রূপই বটে!

পবিত্র আল কুরআন বর্ণিত প্রকৃত এবং সত্যিকার ইসলাম কিন্তু কোনো ধরনের গোঁড়ামী ও ধর্মান্ধতা সমর্থন করে না।  যুগে যুগে নবী রসুলদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্র অনুগত শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে, ভাষা শিক্ষা দেয়ার জন্য নয়। চৌদ্দ’শ বছর পূর্বে আরবের মরুভূমিতে মুহাম্মদ (সঃ)-এঁর আগমন ঘটে এই একই উদ্দেশ্য। তিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন, পথহারা মানব জাতির সামনে আলোকজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে দেখা দিলেন – পথপ্রদর্শক রূপে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক তথা জীবনের সমগ্র দিকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপত্র দিলেন। তিনি যেহেতু আরবি ভাষী তাই তাঁর দেয়া ব্যবস্থাপত্র আরবিতে সংরক্ষণ এবং সংকলন হয়েছে। ভাষা যেহেতু ভাব প্রকাশের বাহক তাই আরবি ভাষায় লিখিত কুরআন প্রত্যেক মুসলিম তাদের স্ব স্ব মাতৃভাষায় বুঝে, ভালোভাবে হৃদয়াঙ্গম করে কর্মে প্রতিপালন ঘটাবে – এটাই স্বাভাবিক; না বুঝে তোতা পাখির মতো আরবি মুখস্ত করা বা আরবিয় পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করার মধ্যে আল্লাহ্র আনুগত্য প্রকাশ পায় না। তাছাড়া সব ভাষাই আল্লাহ্র – বিধর্মীদের ভাষা বলতে পৃথিবীতে কিছুই নেই। হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত, বাংলা, পালি সব ভাষাই আল্লাহ্ বুঝেন। তবে বিভিন্ন ভাষার শব্দ প্রয়োগে যথার্থতা নিরূপিত হওয়া উচিৎ। আরবি ভাষায় নাম রাখলে মুসলিম হবে এ কথা অযৌক্তিক – কুরআনও সমর্থন করে না। যেমন বলা হয়েছে – ‘আমি প্রত্যেক পয়গম্বরকেই তাঁর জাতীয় ভাষায় প্রেরণা দিয়েছি, যাতে তিনি তাদের বুঝিয়েছেন; অতঃপর যার ইচ্ছা আল্লাহ পথে চলে এবং যার ইচ্ছা পথভ্রষ্ট হয়। কিন্তু আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান এবং সুবিবেচক’ (সূরা ইব্রাহীমঃ ৪)।

‘আসমান-জমিনের সৃষ্টি, নানাবিধ ভাষা, বর্ণও তাহার অন্যতম নিদর্শন। সমঝদারদের জন্য এতে প্রভূত নিদর্শন রয়েছে’ (সূরা রুমঃ ২২)।

‘আমি তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (সূরা দুখানঃ ৫৮)।

‘আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কুরআন রূপে যাতে তোমরা বুঝতে পারো’ (সূরা যুখরুফঃ ৩)।

‘আমি যদি আজমি ভাষায় (আরবি ব্যতীত অন্য ভাষা) কুরআন অবতীর্ণ করতাম তারা অবশ্যই বলতো – এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত হয়নি কেন? কি আশ্চর্য যে এর ভাষা আজমি অথচ রাসুল আরবিয়। বলোঃ মুমিনদের জন্য ইহা পথনির্দেশ ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন’ যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন হবে এদের জন্য অন্ধত্ব। এরা এমন যে, যেন এদেরকে আহ্বান করা হয় বহুদূর হতে’ (সুরা হামিম সিজদা : ৪৪)।

‘আমি যদি ইহা কোনো আজমির কাছে অবতীর্ণ করতাম এবং সে উহা পাঠ করে তাদেরকে শুনাতো তবে তারা উহাতে ঈমান আনতো না’ (সূরা  শুয়ারা ঃ ১৮৯,১৯৯)।

‘আমি এই কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (সূরা  জুমার ঃ ২৭)।

‘আরবি ভাষায় এই কুরআন বক্রতামুক্ত যাতে মানুষ সাবধানতা অবলম্বন করতে পারে’ (সূরা  জুমার ঃ ২৮)।

অতএব, বাংলা ভাষা-ভাষী কোনো মুসলিম তার নাম খিজির আলী (শুকর আলী) না রেখে যদি সুশান্ত রাখে তবে অবশ্যই সে কাফের হয়ে যাবে না বা ইসলাম থেকেও খারিজ হবে না। মনে রাখতে হবে ঐশীগ্রন্থ কুরআনের সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িকতার উর্দ্ধে – ভাষা, বর্ণ, জনপদের ব্যবধান দিয়ে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা, দলাদলীর জন্মদান রীতিমতো আহাম্মকী ও গোঁড়ামী। বিভিন্ন জনপদের অধিবাসীর হরেক রকম ভাষায় কথা বলায় ও অভিন্ন বিধান ইসলামের অনুসারী হতে কোনোই বাধা নেই। কেননা, ইসলাম কিছু আচরণ-অনুষ্ঠান বা পর্ব পালন নয় অথবা দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, সুরমা, আতর, পায়জামা-পাঞ্জাবী জাতীয় কিছু পোশাক পরিচ্ছদের নামও নয়। মানব কল্যাণ তথা জীব ও জগতের কল্যাণে নিয়োজিত সব ধরনের মহৎ কর্মই ইসলাম। সৃষ্টির আদি অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) হতেই এই ইসলাম বিভিন্ন নবী-রসুলদের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। সুতরাং ইসলামকে গন্ডিবদ্ধ করা ঠিক নয়। আরবি নাম ধারণ করে নির্দিষ্ট কয়েকটি আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেই কুরআনে বর্ণিত মুসলিম (অনুগত) হওয়া সম্ভব নয়। প্রবৃত্তিমুক্ত বিবেকের অনুসারী বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই মুসলিম পরিচয় দিতে পারে। বিশেষভাবে স্মর্তব্য যে, সব মানুষের জন্ম ও মৃত্যু প্রক্রিয়া একই অর্থাৎ মানুষের উৎস ও পরিণতি অভিন্ন। সুতরাং জন্ম-মৃত্যুর মধ্যকার সময়টুকুর বিশ্লেষণ, স্বীকৃতি এবং পরিচয় তাদের স্ব স্ব কর্মানুযায়ী নির্ণীত হয়। তাই আল্লাহ দরবারে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ইহুদী, জৈন ইত্যাদির কোনোই স্থান নেই। যারা অনুগত ও ভদ্র এবং ন্যায় পবিত্রভাবে ঐশিগ্রনে’র আলোকে ব্যক্তিজীবন ধারণ করে সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত থাকে তারাই আল্লাহ্র পছন্দনীয় – তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। যেমন বলা হয়েছে – ‘নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তারাই উৎকৃষ্টতম সৃষ্টি’ (সূরা বায়্যিনাহঃ৭)।

মনের ভাব আদান-প্রদান করার জন্যই ভাষা। শ্রুতিমধুর, সহজ-সরল, অর্থবোধক শব্দ প্রয়োগে যদি ভাব ও বক্তব্য সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায় তবে তা গ্রহণ করায় আপত্তি থাকা উচিৎ নয়। হোক না তা সংস্কৃত, ইংরেজি, ফার্সি, উর্দু তথা যে কোনো ভাষার শব্দ। তবে আল্লাহ্কে খোদা, সালাতকে নামাজ (যার অর্থ চন্দ্র, সূর্য, পাহাড়, পবর্ত ইত্যাদিকে পূজা করা) বললে যাদের ধর্ম নষ্ট হয় না বরং ধর্ম নষ্ট হয় অর্থবোধক বিশ্রদ্ধ বাংলা শব্দ প্রয়োগ করলে, তাদের বাপারে বলার কি বা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে কুরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করা যেতে পারে – ‘আর প্রত্যেক উম্মতের জন্য এক একজন রসুল রয়েছেন, সুতরাং তাদের সেই রসুল যখন এসে পড়েন (তখন) তাদের মীমাংসা করা হয় ন্যায়ভাবে আর তাদের প্রতি অবিচার করা হয় না’ (ইউনুসঃ৪৭)।

এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, আল্লাহ্র বাণীই প্রচারিত হয় রসুলদের মাধ্যমে যা সর্বজনীন, যে ভাষাতেই বর্ণিত হোক না কেন।

‘সুনিশ্চিত যে মুসলমান, ইহুদী, নাছারা এবং সাবেঈন সমপ্রদায় যারা বিশ্বাস রাখে আল্লাহ্ এবং কেয়ামতের প্রতি আর নেক কাজ করে তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে। তাদের প্রভুর কাছে তাদের কোনো ভয়ও নাই, তারা শোকান্বিতও হবে না’ (সূরা বাকারাঃ৬২)।

অতএব নির্দ্বিধায় এবং দ্ব্যর্থহীনভাবেই বলা যায় যে, ঐশীগ্রন্থ বা কুরআনের পরিপূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত অনুগত, ভদ্র বা মুসলিম হওয়া সম্ভব নয়। কারণ কুরআন অনুসরণ করতে হলে প্রথমেই মাতৃভাষা বুঝতে হবে। মাতৃভাষার মাধ্যমে কুরআনকে আঁকড়ে ধরা এবং জীবনদর্শন হিসেবে ব্যক্তিজীবনে প্রতিষ্ঠিত করাই নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এঁর উম্মত দাবিদারদের জন্য বেশি প্রয়োজন।

আধ্যাত্মিকতায় শব্দ ও সঙ্গীত – ৫৭

মূলঃ সাধক এনায়েত খান              ভাষান্তরঃ ফজলুর রহমান

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সাধকগণের জন্য এই চিন্তার ছবি পাঠ করার প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি চিন্তা সাধকের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, যার ফলে তিনি সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পান। এছাড়া সাধকগণের জন্য চিন্তার ছবি দৃশ্যমান অবস্থায় দেখার প্রয়োজন হয় না। পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে সবকিছু অবগত করায়। চিন্তা নিজেই চিৎকার করে বলতে থাকে, “আমি এই অবস্থায় আছি।” যা হোক এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে চিন্তার ভাষা আছে, কণ্ঠ আছে, চিন্তার শ্বাস-প্রশ্বাস এবং জীবন আছে।

প্রশ্নঃ কল্পনা কি?

উত্তরঃ কল্পনা হচ্ছে অবাধ্য/উন্মুক্ত/অদম্য চিন্তা।

প্রশ্নঃ শক্তিশালী কল্পনা করা কি ভালো?

উত্তরঃ শক্তিশালী হওয়াটা ভালো। শক্তি থাকলে কল্পনা শক্তিশালী হবে, চিন্তাও শক্তিশালী হবে। শক্তিশালী চিন্তার আর এক অর্থ হলো নিজের কাছ থেকে শক্তি মুক্ত হয়ে যত্রতত্র বিরাজ করা। কাজেই শক্তিশালী কল্পনা সব সময় শুভ হয় না। যা প্রয়োজন তা হলো চিন্তার শক্তি। তাহলে চিন্তা কি? চিন্তা হচ্ছে স্ব-নিয়ন্ত্রিত ও দমনীয় কল্পনা।

প্রশ্নঃ চিন্তার যদি দেহ থাকত তাহলে তাকে কি কোনো জায়গায় আবদ্ধ রাখা যেতো নাকি সে সারা বিশ্ব ভ্রমণ করত?

উত্তরঃ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি কেউ প্রশ্ন করে- “একজন কয়েদী যখন জেলখানায় যায় তখন তার সাথে মনও জেলখানায় যায়। সেক্ষেত্রে মন কি সব সময় জেলখানায় আবদ্ধ থাকে নাকি জেলের বাইরেও যায়।” এর সরল উত্তর “হ্যা বাইরে যায়।” ব্যক্তির দেহ জেলের মধ্যে থাকে কিন’ তার মন সব জায়গায় বিচরণ করতে পারে। মনোজগতে উৎপন্ন চিন্তা মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্ব ঘুরে আসতে পারে।

প্রশ্নঃ অপ্রয়োজনীয় চিন্তাকে কিভাবে ধ্বংস করা যায়? যে ব্যক্তি এটা তৈরী করেছে, তাকেই কি এটা ধ্বংস করতে হবে?

উত্তরঃ হ্যা। চিন্তার জন্ম যিনি দিয়েছেন তাকেই এটা ধ্বংস করতে হবে। তবে সবার পক্ষে এটা করা সম্ভব হয় না। তা সত্বেও যে মন দক্ষ সেই মন কিছু সৃষ্টি করলে তা সে অনায়াসে ধ্বংস করতে পারে।

প্রশ্নঃ মানুষের মস্তিষ্ক চিন্তা তৈরীতে কি ভূমিকা পালন করে?

উত্তরঃ মস্তিষ্ক ফটোগ্রাফিক প্লেটের সাথে যুক্ত থাকে। চিন্তা মস্তিষ্কে ওই ভাবে প্রতিফলিত হয় ঠিক যেভাবে ফটোগ্রাফিক প্লেটের উপর কোন ছায়া প্রতিফলিত হয়। মস্তিষ্কের উপর নিজস্ব চিন্তা ও অন্যের চিন্তা উভয় প্রতিফলিত হয়ে থাকে। এই প্রতিফলনের আর একটি প্রক্রিয়া আছে। চিন্তাকে ফটোগ্রাফিক প্লেটের ন্যায় ডেভেলপড করা যায়। ফটোগ্রাফিক প্লেটকে কিছু রাসায়নিক দ্রবণের সাহায্যে পরিস্ফুটিত করা হয়। কিন’ মস্তিষ্ককে কিভাবে পরিস্ফুটিত করা হয়? মস্তিষ্ককে পরিস্ফুটিত করা হয় বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। এর ফলে বিষয়বস’ অনেক স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

প্রশ্নঃ চিন্তার উপাদান একটার চাইতে আর একটি কি উন্নত হয়? উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, আতশের উপাদান দ্বারা তৈরী রঙ্গীন চিন্তা কি অন্য উপাদান দ্বারা তৈরী চিন্তার চেয়ে উন্নত হয়?

উত্তরঃ উপাদানের মধ্যে উন্নত বলে কোনো কথা নেই। মনের অবস্থা ভেদে উন্নত চিন্তার উদ্ভব হয়। উদাহারণ স্বরূপ বলা যায় যে যদি কেউ মাটিতে দাড়িয়ে সামনে দেখে তবে সে তার নিকটেই দিগন্ত রেখা দেখতে পাবে। আবার কেউ যদি উঁচু জায়গায় দাড়িয়ে দেখে তবে সে অনেক দূরে দিগন্ত রেখা দেখতে পারে। সম্পূর্ণ বিষয়টা দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থার উপর নির্ভরশীল। কাজেই দৃষ্টি ভঙ্গির উপর চিন্তার উন্নতি বা অবনতি নির্ভর করে। কোন চিন্তাকে উন্নত বা অনুন্নত বলাটা বেশ দূরূহ। চিন্তা কোন মুদ্রা নয়। এই মুদ্রা বড়, এই মুদ্রা ছোট এভাবে চিন্তার প্রকাশ অসম্ভব। চিন্তার পিছনে যে উদ্দেশ্যে কাজ করছে তার দ্বারা চিন্তা উন্নত না অনুন্নত প্রকাশ পাবে।

স্মৃতি

স্মৃতি হচ্ছে এক ধরনের মানসিক শক্তি যা মন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এ হচ্ছে এক ধরনের রেকর্ডিং যন্ত্র। পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আগত যা এর উপর পতিত হয় তার সবকিছুই এখানে রেকর্ড হয়ে যায়। একজন ব্যক্তি যা দেখে, শোনে, ঘ্রান নেয়, স্পর্শ করে বা স্বাদ নেয়- এর সব কিছু স্মৃতিতে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। কোন আকৃতি, ছবি, কল্পনা একবার দেখলে সারা জীবনের জন্য স্মৃতিতে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। এই জাগতিক জীবনে মানুষ অনেক কথাই শুনে থাকে। তবে এর মধ্যে কিছু কথা তার সারা জীবন মনে থাকে অর্থাৎ মানসপটে জীবন্ত থাকে।

সঙ্গীতের ক্ষেত্রে একই বিষয় প্রযোজ্য। কেউ যদি খুবই সুন্দর ও মধুর গান শোনে তবে তা তার স্মৃতিতে লিপিবদ্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যায়। স্মৃতি হচ্ছে জীবন্ত মেশিন। স্মৃতি হতে যে কোন প্রিয় সঙ্গীতকে পুনরুদ্ধার করা যায়। সুন্দর সুগন্ধির আমেজ অনেক দিন পর্যন্ত জীবন্ত থাকে। স্মৃতি সুগন্ধিকে ধারণ করে রাখে। তবে নোট বই এবং স্মৃতি আলাদা জিনিস। নোট বই হচ্ছে মৃত জিনিস। এর মধ্যে যা রাখা হয় সবই মৃতের ন্যায় পড়ে থাকে। অন্যদিকে স্মৃতি হচ্ছে জীবন্ত। স্মৃতিতে যা লিপিবদ্ধ হয় সবই জীবন্ত থাকে। অনেক সময় ব্যক্তি আনন্দময় স্মৃতি যা লিপিবদ্ধ হয়ে আছে জীবনের বিনিময়ে ধরে রাখতে চায়।

কোন এক সময় এক বিধবার করুন অবস্থা দেখে আমি বিচলিত হয়ে পড়ি। উক্ত বিধবা মহিলা সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ ছিন্ন করে দিয়েছিলো। মহিলা যাতে সবার সাথে মেলামেশা করে নিজকে হাসিখুশী রাখেন সে ব্যাপারে বুঝানোর জন্য তার আত্মীয়গণ আমাকে অনুরোধ করেন। সেই মতে আমি মহিলাকে প্রস্তাব দিলে মহিলা আমাকে বলেন, “এই জগতে যত আনন্দ আছে সবই আমার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ছে। কোনো আনন্দই আমাকে আনন্দ দেয় না। আমি আমার প্রিয়তমের স্মৃতিচারণ করেই আনন্দিত হই, সুখ অনুভব করি। অন্য সব আনন্দ আমাকে দুঃখিত করে। আমি নিজকে সুখী মনে করি। আমি প্রিয়তমের কথা চিন্তা করেই আনন্দ লাভ করি।” মহিলার কথায় আমি অবিভূত হয়ে পড়ি। তাকে আমি যে কথা বলতে চেয়েছিলাম তা বলতে পারি নাই। তার কাছ থেকে এই আনন্দ কেড়ে নিতে আমার মন সায় দিল না। আমি তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, সেখান হতে চলে আসি।

স্মৃতির মধ্যেই স্বর্গ-নরক নিহিত রয়েছে। এই ব্যাপারে ওমর খৈয়াম তার ‘রুবাইয়াত’ এ বলেছেন, “আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলেই স্বর্গ পাওয়া যায়, আত্মা যখন দুঃখে পোড়ে নরক তখন হয়।” এটা কি? কোথায় থাকে? উত্তরে বলা যায় এর অবস্থান স্মৃতির মধ্যে। মস্তিষ্কের মধ্যে লুকায়ে থাকার নয়। এ হচ্ছে জীবন্ত জিনিস এবং এর ব্যাপকতা এত বেশি যে আমাদের ক্ষুদ্র মন তা ধারণ করতে অক্ষম। এ হচ্ছে নিজেই একটা জগত।

অনেকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, “মানুষ যখন তার স্মৃতি হারিয়ে ফেলে তখন তার অর্থ কি দাড়ায়? মস্তিষ্কের বিশৃঙ্খলা থেকে কি এর উৎপত্তি?” প্রথমত বলা যায় যে মানুষ স্মৃতি হারিয়ে ফেলতে পারে কিন্তু স্মৃতি তাকে হারায় না। কারণ স্মৃতি হচ্ছে তার নিজস্ব সত্ত্বা/বস্তু। এখানে যা ঘটে তা হলো মস্তিষ্কে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে স্মৃতিতে তা রাখা আছে তাকে সঠিকভাবে পৃথক/অনুধাবন করতে পারে না। কাজেই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে স্মৃতি ভ্রষ্ট ব্যক্তির স্মৃতি ঠিক থাকে তবে মস্তিষ্কের বিশৃঙ্খলার জন্য তা এলোমেলো হয়ে যায়। বিশৃঙ্খল মস্তিষ্কে স্মৃতি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।

ভাল স্মৃতি শুধুমাত্র ভাল নয় বরং ব্যক্তির জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। ভাল স্মৃতি আধ্যাত্মিকতার নিদর্শন স্বরূপ। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে তার বুদ্ধিমত্তা পরিষ্কার এবং মস্তিষ্কের প্রতিটি অনু-পরমাণু এর দ্বারা আলোকিত হয়। ভাল স্মৃতি উচু আত্মার পরিচায়ক। স্মৃতি হচ্ছে সেই ভান্ডার যেখানে ব্যক্তির সব জ্ঞান গচ্ছিত থাকে। ব্যক্তি যদি স্মৃতিতে রক্ষিত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে না পারে তাহলে বই তাকে খুব একটা সাহায্যে করে না।

আমার মুর্শিদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করার ছয় মাস পরের ঘটনা। একদিন তিনি অধিবিদ্যা বা দর্শন শাস্ত্রের উপর বক্তব্য রাখছিলেন। যেহেতু অধিবিদ্যার প্রতি আমার বিশেষ ঝোঁক ছিল, তাই আমি শোনার জন্য উৎসাহী হলাম। গত ছয় মাস আমি কোন ব্যাপারে জানার জন্য বিশেষ আগ্রহী হই নাই। আমাকে যতটুকু জানানো হয়েছে তার বেশি কখনই জানতে চেষ্টা করি নাই। আমি মুর্শিদের পদতলে চুপ করে বসে থাকতাম। কিন্তু অধিবিদ্যার কথা গুরুর মুখ হতে শোনা এক বিরল ভাগ্যের ব্যাপার। বিষয়টা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। যে মুহূর্তে আমি নোট বই বের করে লিখতে যাব ঠিক তখনই তিনি কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। তিনি ওই বিষয়ে আর কিছুই বললেন না। এর থেকে আমি যে শিক্ষা পেলাম তা হলো- “নোট বইকে আমার জ্ঞানের সংরক্ষক বানালে চলবে না। আমার কাছে যে জীবন্ত নোট বই অর্থাৎ স্মৃতি ভান্ডার আছে তাতে সব কিছু সংরক্ষণ করতে হবে। এই জীবন্ত নোট বই আমার ইহকাল ও পরকালের সাথী হয়ে থাকবে।

পার্থিব জগতের অনেক কিছু আমরা কাগজে লিখে রাখি। কিন্তু আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কিত জ্ঞান, ঐশী জ্ঞান- এসবের কি হবে? এসব অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই নয় কি? নোট বই এই জ্ঞান ধারণ করতে পারে না। নোট বই এই বিদ্যার উপযোগী নয়। এই জ্ঞান শুধুমাত্র স্মৃতি ভান্ডারে সংরক্ষণ করা যায়। স্মৃতি হচ্ছে এর উপযুক্ত সংরক্ষণ যন্ত্র। স্মৃতি হচ্ছে উর্বর ভূমি। স্মৃতিতে যা রাখা/বপন করা হয়, তা কিছু না কিছু উৎপন্ন করে। স্মৃতি কাজ করতে থাকে। কাজেই কেউ স্মৃতিতে জমা রাখলে পরবর্তীতে সে তা লাভসহ ফেরৎ পায়।

অনেক সময় স্মৃতির উপর বেশি চাপ/জোর পড়লে স্মৃতি দুর্বল হয়ে যায়। কেউ যখন কিছু স্মরণ করতে চায় তখন স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়ায়/স্মৃতির উপর জোর দেয়। এটাই স্বাভাবিক। স্মৃতির স্বভাব হচ্ছে স্মরণ রাখা। স্মৃতির উপর চাপ প্রয়োগ করলে স্মরণে আসবে। এরপর আবার ভুলে যাবে। স্মৃতির উপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে স্মৃতি হারিয়ে যাবে। কাজেই স্মৃতির উপর স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা অনুচিত। কোন কিছুকে স্মরণে আনার জন্য ইচ্ছা শক্তির প্রয়োগ করা সঠিক নয়। বর্তমানে মনে করার জন্য যে ইচ্ছা শক্তির প্রয়োগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। ইচ্ছা শক্তি স্মৃতিকে দুর্বল করে দেয়। এছাড়া কার্যক্ষেত্র এবং বিশ্বাসের মধ্যে ভারসাম্য থাকাটা জরুরী।

স্মৃতি কখনও হারায় ন। যা ঘটে তা হলো যে মন যখন বিপর্যস্ত থাকে, স্মৃতি তখন অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। যার মানসিক শক্তি যত বেশি তার পক্ষে স্মৃতিতে রাখা তথ্যাদি স্পষ্টভাবে মনে করা সম্ভব। কোন ব্যক্তির মন যখন বিপর্যস্ত থাকে, মন যখন শান্ত থাকে না, তখন স্মৃতিতে সংরক্ষিত তথ্যাদি সে পড়তে পারে না। স্মৃতির ভান্ডার হতে তথ্য হারিয়ে যায়-একথা ঠিক নয়। মানুষ বেশি উত্তেজিত, ভীত, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, হতবিহ্বল ইত্যাদি হয়ে পড়লে, জীবনের ছন্দ হারিয়ে ফেলে এবং এর ফলে তার মানসিক বিপর্যয় ঘটে। সে তখন স্মৃতিতে রাখা তথ্যাদি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে এবং পড়তে পারে না। এমতাবস্থায় ব্যক্তির উচিৎ নিজকে শান্ত রাখা, জীবনের ছন্দ ফিরিয়ে আনা। এর ফলে সে স্মৃতিকে স্পষ্ট দেখতে পাবে।

প্রশ্নঃ তাহলে কোন কিছু মনে করার জন্য কি মস্তিষ্কের উপর জোর দেয়া যাবে না?

উত্তরঃ কোন কিছু মনে করার জন্য মস্তিষ্কের উপর জোর দেয়া উচিৎ নয়। এর ফলে মস্তিষ্কের উপর চাপ পড়বে। স্মৃতি মানুষের নিয়ন্ত্রাধীন। যদি সে তাৎক্ষণিক কিছু জানতে চায় তবে মস্তিষ্কের উপর জোর ব্যতীত তা তার কাছে চলে আসবে। এ হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মত। যখনই সে জানতে আগ্রহী হবে তখনই তা আপনা আপনি চলে আসবে।

প্রশ্নঃ যে কোনো কিছু মনে রাখতে পারে না, তার কি করা উচিৎ?

উত্তরঃ তার প্রথম কাজ হচ্ছে মনকে প্রশান্ত রাখা। এইভাবে স্মৃতিকে উন্নত করা যায়। দৈহিকভাবে কম আহার করা ও পরিমিত ঘুম হওয়া প্রয়োজন। বেশি করা, বেশি উদ্বিগ্ন হওয়া, বেশি চিন্তা করা- এসব হতে নিজকে মুক্ত রাখতে হবে।

প্রশ্নঃ মৃত্যুর পর স্মৃতি কি উপায়ে কাজ করবে?

উত্তরঃ দেহ হতে মন সম্পূর্ণ পৃথক। মন দেহ হতে সম্পূর্ণ স্বাধীন। পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পার্থিব জ্ঞান লাভের জন্য মনকে দেহের উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু স্মৃতি ভান্ডারে তথ্য জমা রাখার জন্য মন দেহ হতে স্বাধীন। যেহেতু আমরা সকল জ্ঞান, অভিজ্ঞতা দেহের মাধ্যমে লাভ করি, তাই মনে হয় যে মন দেহের অধীন। কিন’ এ সত্য নয়। মন দেহ ছাড়া চলতে পারে।

প্রশ্নঃ পূর্বের স্মৃতি ভুলে যাওয়াটা কি বিপদজনক নয়?

উত্তরঃ প্রচলিত উক্তি অনুযায়ী “যদি তুমি অতীত দেখতে চাও, অতীতকে নিয়ে চিন্তা কর বর্তমানের দিকে দৃষ্টি দিও না। যদি বর্তমানে থাকতে চাও তবে ভবিষ্যৎ এর চিন্তা কর না। যদি ভবিষ্যৎ এর মধ্যে বাস করতে চাও, তবে নিজকে ভবিষ্যৎ উপযোগী করে তোলো”। (চলবে)