ভিতরের পাতা

৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মিলনমেলায় মিরপুর আস্তানা শরীফ

সত্যের দুর্নিবার ঝাণ্ডা নিয়ে বাংলার এই অঞ্চলে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠায় পূর্ব দিগন্তে এক মাহেন্দ্রক্ষণে যে জ্যোতির্ময়ের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাঁরই জ্যোতি আজ দিক হতে দিগন্তে প্রসারিত। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক সেই জ্যোতি, সত্যের কান্ডারী। হাক্কানী হওয়ার পথযাত্রী ও সত্যানুসন্ধানীদের জীবনে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মিরপুর আস্তানা শরীফ হাক্কানী চিন্তনপীঠের প্রাণকেন্দ্র্র। নিজের সত্যকে উপলব্ধি করার নতুন প্রেরণাশক্তি নিয়ে আমাদের জীবনে প্রতিবছর ফিরে আসে মিরপুর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, আসে অনাবিল আনন্দ উদ্যাপনের শুভ লগ্ন। ১৯৮৮ সন থেকেই তা হয়ে আসছে। বাংলা ১৩৯৪ সনের ১৩ মাঘ, ইংরেজি ১৯৮৮ সনের ২৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার ‘মিরপুর আস্তানা শরীফ’ প্রতিষ্ঠিত হয় রাজধানী ঢাকার মিরপুরে।

হাক্কানী দর্শনের তিন সত্যমানুষের মহামিলনের পূণ্য তীর্থকেন্দ্র মিরপুর আস্তানা শরীফ দীর্ঘ ৩১ বছর অতিক্রম করে এবছর ৩২-এর প্রোজ্জলন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। ৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনে মিরপুর আস্তানা শরীফ ১২ ও ১৩ মাঘ ১৪২৫, (২৫-২৬ জানুয়ারি ২০১৯) রোববার ও সোমবার সত্যানুসন্ধানীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রারম্ভে কিশোরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মাজার চান্দপুর শরীফে যথাযথ ভক্তি ও আদবের সাথে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়।

দু’দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ১২ মাঘ ১৪২৬, (২৬ জানুয়ারি ২০২০) রবিবার দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত হাক্কানী খানকা, দরবার ও আস্তানা শরীফ থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ ও দরবারি ভাই বোনদের নাম নিবন্ধন, বরণ, স্বত:স্ফূর্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বিকেল ০৪.৪৫ মিনিটে আস্তানা শরীফ প্রাঙ্গনে হাক্কানী শব্দ তরঙ্গের তালে পতাকা উত্তোলন করেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের সহসভাপতি শফিউল আলম খোকন, হামিবা-র সহসভাপতি শাহ্ ইমতিয়াজ আহমেদ টিটু এবং বাহাখাশ এর সহসভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ। এরপর হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদ-এর নেতেৃত্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন পর্ষদ ও মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের সদস্যবৃন্দ, বাহাখাশ কেন্দ্রিয় ব্যবস্থাপনা সংসদের সদস্যবৃন্দসহ বাহাখাশের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ ও বিভিন্ন প্রকল্পের সদস্যবৃন্দ এবং উপস্থিত দরবারি ভাই-বোন দরবারে প্রদক্ষীণ করে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন। শব্দ তরঙ্গ পরিবেশনায় ছিলেন হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ। এদিন দিবা-রাত্রি সন্ধিক্ষণে দরবারের পশ্চিম পার্শ্বের মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হামিবা সভাপতি – শাহ্ সূফী ড. মুহাম্মদ মেজবাহ উল ইসলাম। এবং দরবারের পূর্ব পাশ্বের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হামিবা মহাসচিব এন সি রুদ্র, নির্বাহী সদস্য মো. ওয়াহিদুজ্জামান, নির্বাহী সদস্য হারুন অর রশিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এম আর জয়ন্ত, সাংগঠনিক সচিব নাসরিন সুলতানা জুলি, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এর সদস্য শেখ সাদি, হাক্কানী মহিলা উন্নয়ন বিভাগ এর সভাপতি এ্যাড. রানু আখতার, হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর সদস্য নার্গিস সুলতানা সুমি, হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাসিমা করিম, হামিবা স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের সদস্য সালমা আক্তার এবং হাক্কানী যুব উন্নয়ন বিভাগের সদস্য সোহরাব আহমেদ শিপলু।

মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলনের পরবর্তী পর্ব ছিল ‘বন্ধনে তুমি-আমি’ বিষয়ক মুক্ত আলোচনা। সূচনা বক্তব্য রাখেন হামিবা মহাসচিব শাহ্ এন সি রুদ্র। এরপর ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য রাখেন হাক্কানী বিশেষ দূত মোল্লা হাসানুজ্জামান টিপু,হামিবা সদস্য বহরদার টিপু সুলতান, বিবি ফাউন্ডেশন এর সভাপতি – সত্যানুসন্ধানী বাহাদুর বেপারি এবং হামিবা সভাপতি শাহ্ সূফী ড. মুহাম্মদ মেজবাহ উল-ইসলাম।

সন্ধ্যা ৭.০১ মিনিটে হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদের নেতৃত্বে কেক কেটে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন উপস্থিত সকল ভক্ত ও আশেকানবৃন্দ। সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে হাক্কানী আস্তানা শরীফ এর তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ শওকত আলী খান এবং রোজলিন বিশ্বাস ববিকে বিবাহোত্তর সংবর্ধনা দেয়া হয়। শোধনসেবা বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের মূলতবী করা হয়।

দ্বিতীয় দিন ১৩ মাঘ, ২৭ জানুয়ারি, সোমবার বিকেল ৪.০১ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিকেল ৪.৪৫ মিনিটে গিলাপ, ফুল ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের অন্যান্য উপাদান নিয়ে দরবার প্রদক্ষীণ করে মিরপুর আস্তানা শরীফ-এর নেতৃত্বে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর রওজায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। দিবারাত্রির সন্ধিক্ষণে ৫.৪০ মিনিটে দরবারের পশ্চিম দিকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলন করেন হামিবার নির্বাহী সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মি, দরবারের পূর্ব দিকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা’র নেতৃত্বে শাহ্ এন সি রুদ্র, শাহ্ মনোয়ারা সুলতানা, শাহ্ তৌহিদা জেসমিন,শাহ্ খায়রুল আলম রাসেল, শহীদুল ইসলাম খান, আব্দুল্লাহ আল মাসুম, আব্দুল হামীম মিয়া, কাজী সবুর, মমতাজ বেগম এবং মমতাজ বেগম।

একই সাথে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর রওজার সম্মুখে বাহাখাশ এর প্রধান উপদেষ্টা শাহ্ মো. লিয়াকত আলী’র নেতৃত্বে বাহাখাশ এর সকল সদস্যবৃন্দ মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলন করে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন।

অনুভূতি প্রকাশ পর্বে ‘মিরপুর আস্তানা শরীফ ও আমি’ বিষয়ের উপর মোট ১২ জন ভক্ত আস্তানা শরীফের সঙ্গে তাদের জীবনের স্মৃতি বিজরিত কর্ম ও বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে আলোচনা করেন। তারা হলেন -ড. খাঁন সরফরাজ আলী পরশ, শহীদুল ইসলাম খান, আব্দুল কাদের টিটু, শেখ বরকত উল্লাহ রানা, শাহ্ খায়রুল আলম রাসেল, শাহ্ শহীদুল আলম, শাহ্ ইমতিয়াজ আহমেদ, শাহ্ আশরিফা সুলতানা, শাহ্ মনোয়ারা সুলতানা, শাহ্ মো. লিয়াকত আলী, শাহ্ শাহনাজ সুলতানা এবং শাহ্ শওকত আলী খান।

৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণে অর্থাৎ ৭.০১ মিনিটে ‘তোমারই আশীসে মোদের রেখো ক্ষমায়’ এই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে হাক্কানী শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে দরবারের ক্ষুদে বন্ধুরা এবং উপস্থিত সকল ভক্ত ও আশেকান ক্ষুদে বন্ধুদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। বিশেষ পর্বে মিরপুর আস্তানা শরীফের ভক্ত ও হামিবা নির্বাহী সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা কে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)মিরপুর আস্তানা শরীফ এর তত্ত্বাবধায়ক এর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। একই সাথে তাঁকে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) ও হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা) এর পক্ষ হতে শাহ্ উপাধি দেয়া হয়। এরপর সরারচর আস্তানা শরীফ এর মাননীয় তত্ত্বাবধায়ক দেওয়ান শাহ সূফী কামরুল হাসান তাঁকে (সুমাইয়া সুলতানা) শাহ্ সূফী উপাধিতে অলংকৃত করেন।

এরপর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর পরিচালনায় ভাবসঙ্গীত পরিবেশন করেন হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ কুষ্টিয়া থেকে আগত অতিথি শিল্পীবৃন্দ,এবং হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মী ও একাডেমীর অন্যতম সদস্য-হাক্কানী আস্তানা শরীফ-এর তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ শওকত আলী খান। যন্ত্রসঙ্গীতে সহযোগিতায় ছিলেন তবলায়-আলী নূর এবং বাঁশিতে কৌশিক।

২ দিনব্যাপী আয়োজিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদের সাংগঠনিক সচিব নাসরিন সুলতানা জুলি, নির্বাহী সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মি, বর্তমান সংলাপ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শেখ সাদি এবং হাক্কানী আস্তানা শরীফ এর মহাসচিব আব্দুল কাদের টিটু। ভোর ৫.৩০ মিনিটে হাক্কানী স্মরণ ও নৈবেদ্যের মধ্য দিয়ে ১৪২৭ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পর্যন্ত অনুষ্ঠান মূলতবী হয়।

নেতাজী সুভাষ-কে ঘিরে সাত দশক ধরে তথ্য গোপন আর বিভ্রান্তির শেষ কোথায়?

সংলাপ ॥ কালের নিয়মে ২৩ জানুয়ারি প্রতি বছরই আসে, মোটামুটি একই রুটিনে তা পালিত হয়। সেই প্রভাতফেরী, স্কুলে স্কুলে  কুচকাওয়াজ,  মোড়ে মোড়ে নেতাজির ছবি বা কাট-আউটে গাঁদা ফুলের মালা, সেই সঙ্গে কোনও স্থানীয় নেতার বক্তৃতার ছবিটা বহু বছর ধরে এ রকম চলে আসছে। গত বিশ-পঁচিশ বছর ধরে একটা বাড়তি উপাদান যোগ হয়েছে, দূরদর্শনে সকালে ‘সুভাষচন্দ্র’ ছায়াছবির প্রদর্শন, বাঙালি লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে ‘একবার বিদায় দে মা’ শুনে ক্ষণিকের জন্য আবেগাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। তবু আমাদের ছোটবেলায় আমরা একটু বাড়তি উদ্দীপনা বোধ করতাম, কেননা, তখন সুভাষচন্দ্রের বয়স হতো পঞ্চান্ন থেকে ষাটের মধ্যে, অর্থাৎ জাগতিক নিয়মে তিনি ফিরে আসতে পারেন, এমন একটা সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও থেকে যেত। আজ তাঁর জন্মের শতবর্ষের দুই দশক পরে সে আশা মরীচিকার চেয়েও অলীক হয়ে উঠেছে।

কিন্তু দেশনায়কের এ বছরের জন্মদিনে যদি কিছুটা অতিরিক্ত ‘জোশ’ দেখা যায়, তার সবটুকু কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। তিন মাস আগে এক শারদসন্ধ্যায় তার অপ্রত্যাশিত ঘোষণা দেশের কোণে কোণে  হারিয়ে যাওয়া দেশনায়ক সম্বন্ধে নতুন আগ্রহের জোয়ার এনে দিয়েছে। সাত দশক ধরে যে ভারত সরকার সর্বপ্রযতেœ তাঁকে মৃত প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, আজ সেই সরকারের প্রধান সেই অচলায়তনের দরজা খুলে দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে নেতাজি সম্বন্ধে শেষ কথা এখনও বলার সময় হয়নি, তার সরকার অন্তত গোপনীয়তার যাবতীয় বেড়াজাল ভেঙে ফেলতে রাজি। আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এই পদক্ষেপের গুরুত্ব অপরিসীম। অবশ্য এরও এক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার রাজ্যের নেতাজি বিষয়ক গোপন ফাইলগুলি প্রকাশ করে দিয়ে এই উন্মুক্তায়নের সূচনা করেছিলেন, মোদীজী তার পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এই পদক্ষেপগুলিকে বৈপ্লবিক বলা হয়েছে, কেননা, তার আগের সাত দশক কেবলই নেতাজি বিষয়ক তথ্যগোপনের ইতিবৃত্ত। ১৯৪৫-এর ২৩ অগস্ট জাপানি সরকারি সংবাদ সংস্থা প্রচার করে যে পাঁচ দিন আগে, অর্থাৎ ৮ তারিখে নেতাজি তাইহোকু দ্বীপে (বর্তমান তাইপে) এক বিমান দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন, তাঁকে জাপানে নিয়ে আসা হয় এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে জানা যায় যে, নেতাজির ঘনিষ্ঠ পার্ষদ এবং আজাদ হিন্দ সরকারের তথ্য ও প্রচারমন্ত্রী এস এ আয়ার টোকিওতে বসে জাপানি সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুরোধে (বা নির্দেশে) খবরটির খসড়া করে দেন। আয়ার পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। তিনি ঘটনাস্থলের ধারেকাছেও ছিলেন না বা নেতাজির মৃতদেহ চোখেও দেখেননি। পরে ধীরে ধীরে সংশোধনী আসতে শুরু করে যে, মৃত্যু এবং সৎকার, দুটিই তাইহোকুতে সম্পন্ন হয়, কেবল চিতাভস্ম টোকিওর একটি বুদ্ধমন্দিরে রাখা হয়েছিল। খবরে ভারতে শোকের ঝড় উঠল বটে, কিন্তু অচিরেই লোকে সন্দিগ্ধ হতে শুরু করল। অবিশ্বাসীদের তালিকায় বড়লাট লর্ড ওয়াভেল থেকে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, সকলেই ছিলেন। সরকার একটি শক্তিশালী, উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা দলকে এই ঘটনার তদন্ত করতে দিলেন, সে দলে ইংরেজ, মার্কিন, ভারতীয় যাবতীয় গোয়েন্দা ছিলেন। এরা জাপান ও তাইহোকুতে অনুসন্ধান চালালেন, যে ডাক্তার নেতাজির চিকিৎসা করার দাবি করতেন, তাকেও জেরা করেন, কিন্তু কোনও সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। কেননা, অক্টোবর মাসে সুভাষ বসুকে নিয়ে কী করা যায় তা নিয়ে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা দীর্ঘ আলোচনা করে। বিচার, জেল বা ফাঁসির দাবি না তুলে ভারত সরকার সুপারিশ করেছিল তিনি যেখানে আছেন, তাঁকে সেখানেই থাকতে দেয়া হোক। এই সুপারিশ থেকে তাঁর বিদেশে আত্মগোপনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

এই অনুসন্ধানের মধ্যেই মিত্রশক্তির গোয়েন্দারা নেতাজির একান্ত বিশ্বাসভাজন, আজাদ হিন্দ ফৌজের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ কর্নেল হবিবুর রহমানের দেখা পান। হবিবুর জানান, তিনি নেতাজির শেষ যাত্রার সঙ্গী ছিলেন। দুর্ঘটনা, মৃত্যু, সৎকার তার সর্বাধিনায়কের অন্তিম পরিণামের আঁখো দেখা হাল তিনি গোয়েন্দাদের শুনিয়ে দেন। হবিবুরের বৃত্তান্ত সম্বন্ধে কেউ কেউ সন্দিহান হলেও তার বয়ানই শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়। পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে হবিবুর গান্ধীজী ও বসু পরিবারকেও তার কাহিনী শুনিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করেন। দেশবিভাগের পরে অবশ্য তিনি পাকিস্তান চলে গিয়ে সেখানকার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৪৬ সালেই জনৈক কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক হারীন শাহ তাইহোকু গিয়ে নিজের উদ্যোগে কিছু অনুসন্ধান চালান। তিনি হবিবুর কথিত হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার ও নার্সদের সঙ্গে কথা বলেন যাঁরা নেতাজির শেষশয্যার পাশে উপস্থিত ছিলেন। তার পর তিনি নগরপালিকা থেকে নেতাজির সৎকারের সার্টিফিকেটের নকলও সংগ্রহ করেন। দেশে ফিরে যাবতীয় তথ্য তিনি কংগ্রেসের শীর্ষনেতাদের হাতে তুলে দেন এবং তাঁরাও নেতাজির মৃত্যু সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হয়ে যান। স্বাধীনতার পর থেকেই সংসদে প্রধানমন্ত্রী নেহরু বার বার জোর গলায় এই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন।

সুভাষচন্দ্রের দুর্ভাগ্য, বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তাঁর পক্ষ থেকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে তাঁর অস্তিত্ব নিয়ে লড়াই করার লোক সে সময় খুব বেশি ছিল না। কংগ্রেসে তিনি দীর্ঘ দিন অপাংক্তেয়, তাঁর মেজদা শরতন্দ্রও দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। কমিউনিস্টরা তাঁকে তোজোর কুকুর বলে ব্যঙ্গ করতেন, দক্ষিণপন্থী শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গেও তাঁর প্রীতির সম্পর্ক ছিল না। তা ছাড়া, চিরকৌমার্য্যে দীক্ষিত সুভাষচন্দ্রের গোপনে নিজের বিদেশিনী সেক্রেটারিকে বিবাহ করে কন্যার পিতা হওয়া রক্ষণশীল বসু পরিবারের সকলের পক্ষে মেনে নেয়ায় অসুবিধা ছিল। লোকসভায় হরিবিষ্ণু কামাথের মতো কয়েক জন সুভাষ-অনুরাগী তাঁর পরিণতি সম্বন্ধে পূর্ণ তদন্ত দাবি করলেও নেহরু তা নস্যাত করে দিতেন, বলতেন, নেতাজির মৃত্যু নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। পাঁচের দশকের শুরুতে নেহরু পূর্বোল্লিখিত এস এ আয়ারকে দিয়ে জাপানে কিছু খোঁজখবর করিয়েছিলেন। একদা সুভাষের অনুগত হলেও আয়ার সাহেব রুটির কোন দিকে মাখন মাখানো থাকে খুব ভাল ভাবে বুঝতেন। তিনি নেহরুর মতকে সমর্থন করে তাঁর রিপোর্ট দিলেন, নেহরু তা সংসদকে জানিয়ে দিলেন।

নেতাজির মৃত্যু যে সন্দেহাতীত নয়, সে কথা জোর দিয়ে বলা শুরু করেন বিখ্যাত আইনশাস্ত্রী রাধাবিনোদ পাল। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী ট্রাইবুনালের অন্যতম বিচারপতি রূপে তাঁকে দীর্ঘ দিন টোকিওতে থাকতে হয়েছিল। সেই সময়েই নানা সূত্র থেকে তিনি জানতে পারেন যে তাইহোকু দুর্ঘটনা নিয়ে জাপানেই অনেকে অবিশ্বাসী। তিনি ভারতে ফিরে এসে এ কথা প্রকাশ করলে কলকাতায় রীতিমতো আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯৫৫ সালে, আজাদ হিন্দ ফৌজের বীর সেনানী শাহনওয়াজ খানের সভাপতিত্বে এক জনসভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, কেন্দ্র সম্মত না হলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলেই একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। এ খবর পেতেই নেহরু তড়িঘড়ি মত বদলে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ফেললেন শাহনওয়াজেরই অধ্যক্ষতায়। তিনি জানতেন কংগ্রেসের সাংসদ ও অন্যতম পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি হিসাবে শাহনওয়াজ তাঁকে অমান্য করতে পারবেন না। বাকি দুই সদস্য ছিলেন সরকারের পক্ষে শঙ্করনাথ মৈত্র, আইসিএস এবং বসু পরিবারের প্রতিনিধি রূপে নেতাজির সেজদা সুরেশচন্দ্র বসু।

কমিটি কাজ শুরু করতেই সুরেশ বসুর সঙ্গে বাকি দুই সদস্যের মতান্তর লেগে গেল। সুরেশ বসু অভিযোগ করলেন, শাহনওয়াজ সঠিক পদ্ধতিতে কমিটি চালাচ্ছেন না, যাঁরা বিমান-দুর্ঘটনার পক্ষে, কেবল তাঁদের ডেকে সাক্ষ্য নেয়া হচ্ছে আর তাঁরা লিখিত বিবৃতি পড়ে যাচ্ছেন, তাঁদের ঠিকমতো প্রশ্নও করা হচ্ছে না। বিবাদ এতটাই বেড়ে গেল যে সুরেশবাবু কমিটি থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। বাকি দু’জন যখন সিদ্ধান্তে এলেন যে বিমান-দুর্ঘটনায় নেতাজি মৃত, সুরেশবাবু রিপোর্টে সই করতে রাজি হলেন না। আলাদা বিরোধী রিপোর্টে তিনি বললেন যে সাক্ষীরা বহু পরস্পরবিরোধী এবং অসংলগ্ন কথা বলেছেন, যা বাকি দুই সদস্য মেনে নিয়েছেন। সরকার অবশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপোর্টকেই মান্যতা দিল। নেহরু বললেন, নেতাজি সম্বন্ধে যাবতীয় বিসংবাদ এ বার শেষ হবে, যদিও তাঁর আপত্তিতে কমিটি তাইহোকু গিয়ে তদন্ত করতে পারেননি।

১৯৫৬ সালে কমিটি নেতাজিকে সরকারি ভাবে মৃত ঘোষণা করা সত্ত্বেও বিতর্ক কিন্তু থামল না। ওই সময় থেকে উত্তর ভারতের নানা জায়গায় এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে দেখা যেত যিনি সর্বদা নিজের মুখ ঢাকা দিয়ে থাকতেন আর পর্দার আড়াল থেকে লোকের সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি এ কথাও বলতেন, তাঁর কোনও নাম নেই। কয়েক জন প্রাক্তন বাঙালি বিপ্লবী তাঁকে নেতাজি বলে সনাক্ত করলেন। ষাটের দশকে উত্তরবঙ্গের শোলমারী গ্রামে শারদানন্দ নামে এক সাধু উদিত হলেন, সারা দেশে রটে গেল তিনি নাকি নেতাজি। কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দা দফতর থেকে বসু পরিবারের লোকজন, সকলে সেখানে হাজির হলেন। অনেক বছর পরে অবশ্য প্রমাণ হয়েছিল তিনি এক প্রাক্তন বিপ্লবী, নেতাজি নন। ইতিমধ্যে বিদেশ দফতরের প্রাক্তন অফিসার ও কংগ্রেস সাংসদ সত্যনারায়ণ সিংহ তাইহোকু-মানুরিয়া গিয়ে বেশ কিছু লোকের দেখা পেলেন যাঁরা ১৯৪৫-এর পরেও নেতাজিকে ওই এলাকায় দেখেছে। রাশিয়া গিয়ে তিনি আর এক পরিচিতের মাধ্যমে জানতে পারলেন যে, নেতাজি দীর্ঘ দিন সাইবেরিয়ায় বন্দি ছিলেন, তাঁর সেলের নম্বরও তিনি প্রকাশ করলেন। সিংহজি দাবি করেন তিনি নেহরুকেও এ কথা জানিয়েছিলেন কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা চন্ডুখানার কিসা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

এই সব তথ্যের ভিত্তিতে সাংসদ সমর গুহ নতুন করে নেতাজি সম্বন্ধে তদন্ত দাবি করলেন এবং সাংসদের চাপে সরকারকে তা মানতেও হল। বিচারপতি জি ডি খোশলার নেতৃত্বে এক তদন্ত কমিশন কাজ শুরু করল ১৯৭০ সালে। খোশলা কমিশন চার বছর ধরে, আধখানা এশিয়া ঘুরে, ২২৪ জন সাক্ষীকে জেরা করে, শাহনওয়াজ কমিটির সিদ্ধান্তকেই মেনে নিলেন। সমর গুহ ও অন্যান্যরা বহু চেষ্টা করেও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের জ্বলন্ত অসঙ্গতি ও পরস্পরবিরোধিতার দৃষ্টান্তগুলি বিচারপতির নজরে এল না। তাঁর পালা জবাব ছিল, বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় ও আত্মসমর্পণের ফলে যে ডামাডোল সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্যই অনেক কিছু ঠিকঠাক হয়নি।

জরুরি অবস্থার শেষে জনতা সরকারের আমলেও সমর গুহ চাপ অক্ষুণ রাখেন, যার ফলে মোরারজি দেশাই বলতে বাধ্য হন, খোশলা রিপোর্ট নেতাজি সম্বন্ধে শেষ কথা নয়। কিন্তু এর পরেই নেতাজির সাম্প্রতিক ছবি বলে একটি জাল ছবি প্রচার করে সমর গুহ বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন, সুভাষবাদীদের আন্দোলনও জমি হারাতে শুরু করে। ১৯৮৫ সালে অযোধ্যায় রহস্যময় সন্ন্যাসী গুমনামী বাবার রহস্যময় জীবনাবসান আবার নেতাজি-বিতর্ককে জাগিয়ে তোলে। তত দিনে সুরেশ বসু প্রয়াত হয়েছেন, তাঁর কন্যা লতিকা সাধুজির বাসস্থানে এসে তাঁর রেখে যাওয়া জিনিস পরীক্ষা করে বলে ফেললেন, সন্ন্যাসী সম্ভবত তাঁর রাঙাকাকাবাবু। শুনেছি, সাধুর শয়নকক্ষে সুভাষচন্দ্রের পিতা-মাতার ফটো টাঙানো ছিল, তাতে টাটকা ফুলের মালা ঝুলছিল। লতিকা বসুর আবেদনে হাইকোর্ট আদেশ দেয় যে, সন্ন্যাসীর যাবতীয় অস্থাবর সম্পত্তি জেলাশাসক সযত্নে সরকারি তোষাখানায় সংরক্ষণ করবেন। সাধুর সম্পত্তি কিছু কম ছিল না, খান কুড়ি লোহার ট্রাঙ্কে ছোট-বড় প্রায় ২৭০০টি জিনিস ছিল।

নব্বুইয়ের দশকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা পূরবী রায় গবেষণার কাজে মস্কো গিয়ে কিছু কাগজের সন্ধান পান যার থেকে মনে হয়, বিশ্বযুদ্ধের পর নেতাজিকে রাশিয়ায় আশ্রয় দেয়ার প্রশ্ন নিয়ে পলিটব্যুরোতে আলোচনা হয়েছিল। তিনি আরও খোঁজ করেন কিন্তু আর কিছু তাঁর হাতে আসেনি। এ দিকে নেতাজি জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সরকারি মহল ও পরিবারের এক অংশ টোকিও থেকে তাঁর চিতাভস্ম ভারতে নিয়ে আসায় আগ্রহী হয়ে উঠলে কিছু অনুরাগী হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। হাইকোর্ট সরকারকে নির্দেশ দেন যে নেতাজির তথাকথিত মৃত্যু নিয়ে যখন এখনও বিতন্ডা চলছে, তখন সরকার যেন আর একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে বিষয়টির ফয়সালা করে। সেই আদেশ অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মুকুল মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। ছয় বছর পরে কমিশন ঘোষণা করে, তাইহোকু-তে কোনও বিমান-দুর্ঘটনা হয়নি, ওই ঘটনাটি সৃষ্টি করা হয়েছিল নেতাজিকে পলায়নের সুবিধা করে দেয়ার জন্য। এত দিনের রূপকথার গল্প এ ভাবে শেষ হল। কিন্তু তত দিনে মনমোহন সিংহ সরকার ক্ষমতাসীন, তারা রিপোর্টটি মানতে রাজি হল না। সবাই আবার খোশলাতেই ফিরে এলো।

এই পরিপ্রেক্ষিতে মোদীজী নেতাজির গোপন ফাইল খুলে দিচ্ছেন। তার থেকে কী পাওয়া যাবে কেউ জানে না। কিন্তু দেশবাসী রয়েছে কোনও এক চমৎকারের প্রতীক্ষায়!

হারিয়ে যাচ্ছে নদী : হারিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি

হাসান জামান টিপু ॥ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। মাতা যেমন প্রসব করে, নদী সেরকম বাংলা নামক ব-দ্বীপটি প্রসব করেছে, তাই নদীমাতৃক বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল হিমালয় থেকে ছুটে আসা অসংখ্য নদ-নদীর প্রবাহ থেকে। যে প্রবাহের সাথে বহমান বিন্দু বিন্দু পলিমাটি হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে তুলেছিল পৃথিবীর বৃহত্তম এই ব-দ্বীপ। এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা সবকিছুতেই রয়েছে নদীর প্রভাব। সভ্যতার প্রধান দুই উপকরণ সুপেয় পানি ও খাদ্য নদী থেকে নিয়েই গড়ে উঠেছে নদীতীরের বসতি। নদীর পাড়ের এই মানুষের জীবন-জীবিকা ও পেশা নিয়ে তৈরী হয়েছে গান, কবিতা, উপন্যাস ও চলচ্চিত্র। সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের সংস্কৃতিজগত।

মুলত তিব্বতী ভাষায় বঙ্গ অর্থ ভেজা। আবার বাংলায় বঙ্গ শব্দটি বহন এবং ভাঙ্গার সাথে জড়িত। তাই বঙ্গ একসাথে বহন করে উপরের পানি ও পলিমাটি আবার সেটা বিভিন্ন পথে ভাঙ্গনের সৃষ্টি করে। তাই এ দেশের অন্য নাম হল বঙ্গ দেশ। 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর হিসাব অনুযায়ি বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫টি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১০২টি, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১১৫টি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী ৮৭টি, উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী ৬১টি, পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী ১৬টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী ২৪টি হিসেবে বিভাজন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদ-নদীর মধ্যে অনেকগুলোই আকার এবং গুরুত্বে বিশাল। এসব নদীকে বড় নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বৃহৎ নদী হিসেবে কয়েকটিকে উল্লেখ করা যায় এমন নদীসমূহ হচ্ছে: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, গোমতী ইত্যাদি। বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমা।৩৯৯ কিলোমিটার লম্বা। সবথেকে চওড়া যমুনা। দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্র। গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গা, এর থেকে পদ্মা হয়ে সাগরে মিশেছে। আবার ব্রহ্মপুত্র থেকে যমুনা হয়ে সাগড়ে মিশেছে। লুসাই পাহাড় থেকে মেঘনার উৎপত্তি। বাংলাদেশের সব নদীর উৎপত্তি হিমালয় থেকে। একমাত্র সাংগু নদীর শুরু ও শেষ বাংলাদেশে।

হাজার বছরের বাঙালি ও বাংলাদেশের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত নদী। হাজার হাজার বছরের বাঙালি সভ্যতার ভিত্তিই তৈরী করেছিলো নদী কেন্দ্রিক জীবনধারা। এখানকার নদীবিধৌত পলি আমাদের উর্বর জমি দিয়েছিলো চাষাবাদের জন্য, নদী ছিলো আমাদের যাতায়াতের প্রধানতম উপায় তাই গড়ে উঠেছিলো নদী কেন্দ্রিক হাট, বাজার, গঞ্জ ইত্যাদি। নদী কেন্দ্রিক শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গড়ে উঠে ছিলো। মানুষের শিরা উপশিরা যেমন মানুষের শরীরকে সচল রাখে তেমনি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে সচল রাখতে সাহায্য করে।

নদী কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড গড়ে উঠেছিলো এই বাংলাদেশে। পাল তোলা, গুনটানা, ছোট ছোট নৌকা চলমান নৌকা প্রকৃতিকে সমৃদ্ধি করে, পরিবেশকে মনোরম করে, দৃশ্যগুলিকে মোহনীয় করে। নদীর কুলে কুলে সাঁতার, মাছধরা ইত্যাদি মনোরম দৃশ্য ছবির মতো। নদীর পাঁড়ের বধু জল নিয়ে যাচ্ছে এরকম একটা দৃশ্য আমাদের গল্প, কবিতা, শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করেছে। ভাটিয়ালি সুর এই নদীরই সৃষ্টি।

মানুষের মত বিভিন্ন পাখ পাখালি সাথে সক্ষতাও গড়ে তুলেছে নদী।

বাঙালি স্বকীয়তার আন্দোলনে, আত্মপরিচয়ে তুলে ধরতে নদীর ভূমিকা অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুও তাজউদ্দীন আহামেদ একই নৌকায় ছবিটা এক্ষেত্রে বিচার্য। আওয়ামী লীগে নির্বাচনী প্রতিক নৌকা নদীর অপরিহার্যতার সাক্ষ্য দেয়। স্বাধীনতার অন্যতম শ্লোগান ছিলো, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নৌপথে আমাদের মুক্তিবাহিনী ছিলো অপ্রতিরোধ্য।

 নদী বিধৌত বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল করেছে নদী। আমাদের নগরায়নের ভিত্তি স্থাপন করেছে নদী। নদী আমাদের একান্ত আপনজন । (চলবে)

ধর্মের নামে…. – ১৭

সংলাপ ॥ জীবন বিধান কেমন হবে তা আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি। এখন প্রশ্ন হলো মতভেদ হলো কেন? এই মতভেদের মূল উৎস কোথায়? কারা এর হোতা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা অবার যাবো ধর্মগ্রন্থে। যেখানে খুঁজে পেতে চেষ্টা করবো কারা স্রষ্টার দেয়া জীবন বিধানকে খন্ডখন্ড করেছে? কারা মতবিরোধ ঘটিয়েছে? কারা অভক্তি দেখিয়ে বিভক্তি এনেছে? বিভক্তি এবং মতভেদের কারণে ইসলামী জীবন বিধানের কী পরিণতি হয়েছে? যারা বিভক্তি এনেছে তাদের পরিণতিই বা কী হয়েছে? কতকাল পূর্ব থেকে এ ধারা বিরাজ করছে? ধর্মের সংখ্যা মানুষের জন্য একটিই। আল্লাহও এক, কোরানও এক, অথচ জীবন বিধানে এই যে ব্যপক পার্থক্য সুদূর অতীত থেকে শুরু হয়ে তার পরম্পরা অদ্যাবধি চলছে-আরো হয়তো চলবে এবং এই চলার পরিণতি কী হয়েছে, কী হচ্ছে এবং হবে তা আমরা একটু বিশ্লেষণে যাবো। প্রথমে কোরানের সাহায্য নেবো। সুরা রুমের ৩০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আপনি শান্তিপূর্ণ জীবন বিধানের জন্য মুখ তুলে দাঁড়ান-একনিষ্ঠভাবে। আল্লাহর ফিতরাত গতি-প্রকৃতি ও তাই যার উপরে মানব সন্তানকে সাজিয়ে তুলেছেন। আল্লাহর সৃষ্টি ধারার কোন রদবদল নেই মোটেই। এইতো হচ্ছে সহজ-সরল জীবন ব্যবস্থা। কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষই তো কিছুই বুঝে না।’ সুরা কাসাসের ৫০ নং আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘কিন্তু ওরা যদি আপনার দাবী পূরণ না করে তাহলে আপনি জানবেন ওরা নিজেদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করছে। অথচ তার চাইতে বেশী পথহারা গোমরাহ আর কে-ই বা হতে পারে, যে নাকি শুধু নিজের খেয়াল খুশীটাকেই মেনে চলছে-আল্লাহর কাছ থেকে যে পথ নির্দেশ এসেছে তা বাদ দিয়ে। আল্লাহ জালিমকে পথ দেখান না একথা সত্য সুনিশ্চিত।’ সুরা ফাতির-এর ৪৩নং আয়াত দ্বারা আমরা আল্লাহর সুন্নতের প্রমাণ করবো। এই ছত্রের শেষাংশে বলা হয়েছে –

ফালান তাজেদা লিছুন্নতিল্লাহ তাবদিলা, ওলান তাজেদা লিছুন্নাতিল্লাহি তাহবিলা অর্থাৎ ‘আপনি আল্লাহর বিধানে কোনও রদবদল পাবেন না, আর আপনি আল্লাহর বিধানে কিছুমাত্র নড়চড়ও দেখতে পাবেন না।’ এখানে আল্লাহর দ্বীন, আল্লাহর সুন্নত এ দুটো শব্দ দিয়ে আমরা পরিস্কারভাবে বুঝতে পারলাম যে হযরত (সাঃ) যা করেছেন তা আল্লাহর নির্দেশে করেছেন, যা বলেছেন তা আল্লাহ বলছেন বলেই বলেছেন। তিনি নিজে কিছু বানিয়ে বলেননি বা নিজে কোন মতবাদ তৈরি করে রেখে যাননি। তিনি আল্লাহর দ্বীন অর্থাৎ আল্লাহর সুন্নতই পালন করেছেন। সুতরাং রছুলের নামে আলাদা যে একটা সুন্নত সমাজে আমরা দেখতে পাই এটার উৎস কোথায়? কে তৈরি করল এমন সুন্নত? আল্লাহর সুন্নতের পাশাপাশি নবী কি একটা সুন্নত ব্যবস্থ আলাদা করে রেখে গেছেন? হতেই পারে না। যা ওহীযোগে এসেছে তা আল্লাহর সুন্নত। সুতরাং সুন্নাতাল্লাহ কী করে সুন্নতে রাছুলুল্লাহ হয় সেটা আমার প্রশ্ন। প্রশ্ন করি, রাছুল (সাঃ) কোন সুন্নত পালন করতেন? আল্লাহরটা না নিজেরটা? আল্লাহর সুন্নতের বাইরে আরো সুন্নত আছে কি? থাকতে পারে কি? নবী (সাঃ) কি আল্লাহর সুন্নত প্রচার করেননি? দু’জনের সুন্নত কি এক? যদি একই হয় তবে নাম ভিন্ন কেন? যদি ভিন্ন হয় তবে দু’জনের সুন্নত পালন করে আমরা কি শেরেকি করছি? আমাদের নবীর নামের সুন্নত কি নকল? হাদিসে বলা হচ্ছে-(মান তারাকা সুন্নতি ফালাইছা মিন্নি) অর্থাৎ যে আমার সুন্নত পালন করবে না সে আমার উম্মতের মধ্যে নহে। এই যে, সুন্নাতিল্লাহ এবং সুন্নাতি রাছুলুল্লাহ নামে দুটো সুন্নত নিয়ে আমরা দিশেহারা হয়ে আছি তার বিধান আজ কে দেবে? বাংলাদেশ নয় সমগ্র বিশে^র জ্ঞানী সমাজের কাছে প্রশ্ন করছি। আপনারা এর সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবেন কি? ধর্মের নামে ধর্মের মাঝে এই যে সমস্যা তা মিটবে কবে? তাহলে কি ধরে নেবো কোরানের বিধান যাতে দুনিয়ার বুকে স্থায়ী হতে না পারে তার জন্য আলাদা করে মানুষই রাছুলের নামে রাছুলকে ভাঙিয়ে খাবার জন্য একটি আলাদা জীবন ব্যবস্থা তৈরি করেছে? স্বয়ং রছুল যেখানে বলছেন তিনি আল্লাহর ওহী বা জীবন বিধান ছাড়া কিছু বলেননি সেখানে আমরা সুন্নতের নামে মতানৈক্যে ভরা একটি বিশাল ‘সুন্নাতি রাছুলুল্লাহ’ পেয়ে গেলাম যার আকার বই-এর পাতা হিসেবে কোরানের প্রায় দশগুণ বেশী। এই বেশী কথা কে বলেছেন? কাদের প্ররোচনায় কারা এসব করে ধর্মজীবনকে খন্ড খন্ড করে ফেলেছে? ভেবে চিন্তে আলেম সমাজের কাছে এর উত্তর গঠনমূলকভাবে কামনা করছি। শুনেছি নবীর আমলেই নাকি বলা হয়েছিল মুসলমানদের মধ্যে তিয়াত্তরটি দল হবে এবং এর মধ্যে একটি দল মাত্র বেহেশতে যাবে। স্বয়ং রাছুলুল্লাহ (সাঃ) কি একথা বলেছেন? রাছুলতো ভবিষ্যৎ বা গায়েবের খবর জানতেন না। অদৃশ্য কোন বিষয়ে তিনি মন্তব্যও করতেন না। এমন কি গণকের নিকট যেতেও তিনি নিষেধ করেছেন। তাহলে একথা তিনি কেমন করে বললেন? আমার মনে হয় এটা মানুষের বানানো কথা যা রাছুলের নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। তা না হলে কোরান বিরোধী বক্তব্য এসে যায়। সুরা আরাফের ১৮৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি ঘোষণা করে দিন, আমিতো নিজের লাভ লোকসানের ক্ষমতাও রাখি না। তবে আল্লাহ যা ইচ্ছা করবেন। আমি যদি গায়েব বা অদৃশ্য জানতাম তবে অনেক সম্পদ জমা করে নিতাম।’ সুরা মায়েদার ১০৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ পাক যেদিন রাছুলগণকে সমবেত করবেন, আর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন; তোমরা কী উত্তর পেয়েছিলে? তাঁরা বলবেন, আমরাতো কিছুই জানিনা। আপনিইতো অপ্রকাশ্য সব কথা ভাল করেই জানেন।’ এমতাবস্থায় নবীর নামে এ ধরনের কথা চালু করাটা কারো জন্য শোভা পায়? নবীর নামে এমন অনেক কথা চালু আছে যা নবী বলেননি অথচ তা অনেকে ভক্তি ভরে পালন করছে, পালন করতে গিয়ে মারামারি পর্যন্ত করছে।

এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাঠক সমাজের সামনে তুলে ধরবো। তুলে ধরবো এ কারণে যে চুলচেরাভাবে ধর্মকে সংজ্ঞায়িত করেছি-ধর্মকে বিকৃত করার কারণ ও পরিবেশটাও দেখেছি। পাঠক সমাজকে সালাত এবং জাকাতের ব্যাখা দিতে গিয়ে এখানে অনেক কথা বলতে হয়েছে। সামনে আরো কিছু কথা বলতে হচ্ছে। কেননা, যে কারণে জীবন বিধানে বিভেদ, সে কারণের মূল উৎসের সন্ধানে আমাদেরকে কষ্ট করে হলেও একটু যেতেই হচ্ছে। এটা সত্য যে, আমাদের জ্ঞান ও বিবেক, স্বাধীন আলোচনা ও গবেষণার দ্বারা অসত্যের পুঞ্জীকৃত ন্যাক্কারজনক আবর্জনা রাশির নিচ থেকে সত্যের উদ্ধার সাধন করার জন্য পরিশ্রম করি না-ভাবিনা। ৮ বাজে মানসিকতা, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের রকেটে চড়ে জীবন যাপনে জ্বালানীর কমতি নেই। মহাপুরুষদের জ্ঞানের গভীরতা, তাঁদের চরিত্রের মহিমা, তাঁদের জীবনের ব্রত ও সাধনা এসব নিয়ে আলোচনা করলে হাঙ্গামা হয়। আবার ভক্তি করতে হলে জীবনীকে বাদও দেয়া যায় না। এমতাবস্থায় ভক্তকুল কিছু আজগুবী, অনৈতিহাসিক গল্প গুজব, অলৌকিক ও অস্বাভাবিক উপকথার আবিস্কার করে উভয় কূল রক্ষা করে একথা মনে করেন যে তারা বিরাট একটা কিছু করে ফেললেন। কালক্রমে ঐসব কুসংস্কারমূলক ও অলৌকিক কেচ্ছাকাহিনী, মহাপুরুষগণের জীবনের প্রকৃত শিক্ষণীয় বিষয়গুলোকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ইতিহাস ও পুরাণ পুস্তকের পৃষ্ঠায় আসন নেয় যা পরবর্তীতে শাস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। এ শাস্ত্রের বিপরীতে কথা বলা যায় না। যারা বলেন, তাদেরকে মুরতাদ, ধর্মদ্রেহিী বানিয়ে দেয় সমাজের বোকারা। মূলধর্ম গ্রন্থ থেকে যত যুক্তিবাণী দেখানো হোক না কেন শাস্ত্র ছাড়া ভক্তরা কিছু বোঝে না। সত্য বলতে গেলে ভক্তরা বলে বসে তুমি কোন নতুন পাগল আজ এসব বলছো? মোদের পূর্বপুরুষেরা কি মূর্খ ছিলেন? এসব কথা কোরানেও আছে আজো লোকে বলে। এ ধরনের জঞ্জাল পরিস্কার করাকেই কোরান নিজের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য বলে নির্ধারণ করেছে। কিন্তু জন্মগত ও পারিপার্শ্বিক কুসংস্কারের চাপে কোরানের স্পষ্ট শিক্ষার বিরুদ্ধাচারণ করাকেই অনেকে ইসলাম বলে মনে করে। (চলবে)

যাহা নিত্য তাহাই সত্য – ১৭

* ‘সকল কর্মের প্রারম্ভেই তুমি তোমার আল্লাহ্কে অবশ্যই স্মরণ করিও।’

             -সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন

* ‘ক্ষেতের ইটা ক্ষেতেই ভাঙ্গতে হয়।’

             -সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

* ‘ঘুম ভাঙ্গার পর চোখ মেলার আগেই তোমার আল্লাহ্কে স্মরণ কর।’

             -‘সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ’

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ বিশ্বজুড়ে সত্যব্রত আন্দোলন শুরু হয়েছে। আপনি/ আমিও এই আন্দোলনে একাত্ম হয়ে আত্মোন্নয়নের মাধ্যমে দেশ ও জাতির উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হতে পারি। দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে এখনই শুরু করি:

* জীবন একটাই সুতরাং নিজের সাথে নিজের প্রতারণা আর নয়।

* জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করি এবং কর্মে একনিষ্ঠ ও নিমগ্ন থাকি।

*নিজের বিচার নিজেই করি।

* নিজের সত্যকে খুঁজে বের করি এবং পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবতার নিরিখে উপলব্ধি করি।

* সার্বিক কর্মে সচেতন থাকি এবং আত্মবিশ্বাসে দৃঢ় হই।

* সেবার মাধ্যমে মানুষকে ভালোবাসি এবং শ্রদ্ধা করি।

* সত্যমানুষের পাশাপাশি চলে সত্যব্রতী বন্ধু হতে চেষ্টা করি।

এই আহবানটি ২০১৭ সালের। বর্তমান সংলাপের ২৫ বর্ষ ৪৩ সংখ্যায় এসেছে। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে জানা গেলো সত্যপ্রতিষ্ঠার এ নব যাত্রাটি শুরু হয়েছে একশত বছর পূর্বে যার প্রতিষ্ঠানিক যাত্রার এক নব সংযোজন ২০১৭-এ।

কালের সাক্ষী সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ। সত্য প্রতিষ্ঠার বহুমুখী পদচারণায় আমাদের জন্য রেখে গেলেন ‘হাক্কানী কথা’। দেখি কোন্ মুক্তো কুড়ানো যায় এ যাত্রায়।

হাক্কানী কথা: 

‘সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেছেন- ‘এ জগতে যে যত বেশী বুঝতে গেছে, সে তত পড়ছে পিছে। অজ্ঞান হলে থাকতো কাছে, পেয়ে যেতো সাথে সাথে চলার পথে।’ হাক্কানী শব্দের উৎপত্তি হক থেকে। হক অর্থ সত্য। মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ এবং গোষ্টিস্বার্থের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তখন সত্য আস্তে আস্তে উদ্ভাসিত হয়েছে। যে সকল ব্যক্তিত্ব তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন তাঁরা সত্যকে নিয়ে এগিয়ে গেছেন পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্যে। ধারাবাহিকভাবে এটা চলে আসছে এবং রূপান্তরিত হয়ে আরবী ভাষায় ‘হক’ থেকে আসলো ‘হাক্কানী’ শব্দটি। হাক্কানী অর্থ সত্য। অপরদিকে হকের দুটো দিক আছে। একটি হচ্ছে আল্লাহ্র প্রতি হক আর একটি হচ্ছে আমি যে পরিবেশে আছি সেখানে আমার হক। এর বিশেষণ দেয়া হলো যখন ইসলাম ধর্ম আসলো। মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) যখন বললেন, মুসলিমদের জন্য ধর্ম হচ্ছে শান্তি। নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী তার একমাত্র কারণ- তিনি এমন শব্দ প্রয়োগ করলেন, ধর্ম হিসাবে যা আর কেউ করতে পারবে না। ইসলাম অর্থ শান্তি। মানুষের অন্বেষণ হচ্ছে শান্তিকে নিয়ে। এইজন্য তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। মানবজাতির ইতিহাসে যত নবী – রসুল এসেছেন সবাই শান্তির কথা বলেছেন, সত্যের কথা বলেছেন কিন্তু ধর্ম ‘শান্তি’ একথা নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ব্যতিত আর কেউ বলেন নাই। ধর্ম যখন শান্তি হিসাবে আসলো তার মধ্যে নিহিত আছে হক।

এই উপমহাদেশে সূফী সাধক আজানগাছি তা উপলব্ধি করেছেন এবং সত্যকে তাঁর আদর্শ ও দর্শন হিসেবে গ্রহন করে এগিয়ে গেলেন। তৎকালীন সময়ে যতগুলো তরিকা ছিলো, বিশেষ করে চারটি তরিকা এবং অন্যান্য তরিকার সাথে তিনি সমন্বয় সাধন করলেন। প্রত্যেকের কাছে তিনি গিয়েছেন, তাদের আদর্শ, নীতি এবং তাঁরা কোন পথে চলছেন তা তিনি জেনেছেন। জানার পর তিনি তৈরী করলেন ‘ হাক্কানী যা সকল তরিকার সারোৎসার। সত্য হলো দর্শন। সেই সত্যের ধারাবাহিকতায় তিনি দুটো দিকে অগ্রসর হলেন। একটি প্রতিষ্ঠানিক দিক অন্যটি আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিক দিকে তাঁরই স্নেহ ধন্য হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন ‘হাক্কানী’ নিয়ে আসলেন বাংলার বুকে। তিনি লালন পালন করলেন সত্য দর্শনকে নিজ জীবনে। প্রতিটা মুহূর্তে চলার পথে তিনি সত্যকে আলিঙ্গন করে নিলেন। হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন তাঁর প্রধান খলিফা হিসাবে বেছে নিলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-কে। হাক্কানী দর্শনকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন। তিনি তা নিয়ে চলা আরম্ভ করলেন। পৃথিবীতে এমন কোন তরিকা নাই যেই তরিকার সারোৎসার হাক্কানী তরিকায় নাই। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক প্রথমেই উপলব্ধি করলেন, বর্তমান পৃথিবীতে গতানুগতিক যে ধারা চলছে সে ধারায় হাক্কানীকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না এবং ইসলাম ‘শান্তি’ এটাকেও প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। তিনি ক্ষমতায় আসার পর হাক্কানী তরিকা হিসাবে প্রথমে নিয়া আসলেন। তাঁর কাছে যারা গেছেন তাদেরকে তিনি যার যার যোগ্যতা অনুসারে বিভিন্ন তরিকার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। যারা হাক্কানী হতে চেয়েছে তাদেরকে তিনি প্রতিষ্ঠানিক ও আধ্যাত্মিকতা এই দুটি দিকে পথ প্রদর্শন করেছেন। সত্যকে আলিঙ্গন করবে যে সে হাক্কানী। সত্যকে যে নিজের জীবনের সঙ্গে একাত্ম করবে সে হাক্কানী। জীবন চলার পথে একটি সত্যকে যিনি ধারণ করেছেন এবং লালন করেছেন তিনি হাক্কানী পথের যাত্রী। যত কর্মকান্ড আমরা প্রতিদিন করি তার মধ্যে অন্তত একটিকে বেছে নিয়ে যিনি সত্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি হাক্কানী পথের যাত্রী। আর যিনি পরিপূর্ণভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন যে আমি হাক্কানী হবো, সকল কর্মকান্ডের মধ্যে ‘ আমি’ সত্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিয়োজিত থাকবো তিনি হবেন হাক্কানী। হাক্কানী পথের যাত্রীও কালক্রমে হাক্কানী হতে পারেন। পৃথিবীতে যতদিন মানবজাতি থাকবে ততদিন সত্যের ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে। কখনো বা জোয়ারে অনেক দূর চলে যাবে কখনো বা ভাটির টানে স্তব্ধ হয়ে যাবে অথবা কিছুটা পিছিয়ে আসবে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলে গেছেন ‘দুনিয়াতে মিথ্যা বলে কিছু নেই’। আমি বলছি সত্য পথের যাত্রী আর হাক্কানী। প্রশ্ন উঠতে পারে মিথ্যা বলে যখন কিছু নেই তখন সত্য নিয়ে এতো কথা কেন? দুনিয়াতে মিথ্যা বলে কিছু নেই-এটা উপলব্ধির একটা স্তর, চেতনার একটা স্তর। হাক্কানীতে চেতনার স্তরকে সাতটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। চিন্তা জগতের সাতটি স্তরের সাথে এর সমন্বয় আছে। চেতনার একটি স্তরে উপলব্ধি হয়-দুনিয়াতে মিথ্যা বলে কিছু নেই, সবই সত্য। তখন ঐ স্তরে চলে আসে আত্মদর্শনের ব্যপার। যে নিজেকে, সত্যকে ধারণ-লালন-পালন করতে গিয়ে একটা স্তরে চলে আসে, যাঁর আপাদমস্তক সত্য ছাড়া কিছু নেই তাঁর কাছেতো সবই সত্য। এই স্তরে উর্দ্ধরণ সহজসাধ্য নয়। এজন্য প্রথমেই জীবনে একটা সত্য নির্ধারণ করতে হবে। প্রশ্ন আসতে পারে কেন একটা সত্যকে নির্ধারণ করবো জীবনে? পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম কি আছে যে-এককে ছাড়া চলছে? সেই এক-কে যখন আমি ধারণ করবো নিজের মধ্যে তাকে লালন করতে হবে। একাত্ম ঘোষণা করার মানেই হলো আমি তার মধ্যে ঢুকে গেলাম। আল্লাহ্ এক, সত্যও এক। পৃথিবী যত মানুষের সংস্পর্শে আমি এসেছি তার মধ্যে কাকে আমি বেছে নিলাম, যাকে আমি ধারণ করবো, লালন করবো, পালন করবো ? সত্য কি মিথ্যা – এটা দেখার ব্যপার না, যারা ধারণ ও লালন করে তাদের কাছে সবই সত্য। যে সত্যের অন্বেষণ করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রথম খলিফা আবু বকর ‘সিদ্দিক’ হলেন। নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) আবু বকরকে সম্মানসূচক সিদ্দিক বলে ডাকলেন। এ সম্মান কিন্তু আর কেউ পায়নি। সত্যকে নিয়ে যখন আমরা যাবো, আমরা কথা বলবো, তখন প্রত্যেকে নিজস্ব চিন্তার মধ্যে একটা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। হতে পারে বিষয়, হতে পারে সম্পদ, হতে পারে একজন ব্যক্তিত্ব। যেখান থেকে ‘হাক্কানী স্কুল অব থট’ বের করলেন লক্ষ্য। তোমার জীবনের লক্ষ্য কি? চূড়ান্ত লক্ষ্য কি? আশু লক্ষ্য কি? সেই আশু লক্ষ্যের সাথে চূড়ান্ত লক্ষ্যের কোন সমন্বয় তুমি সাধন করতে পারছো কি-না। না এটা তোমার মুখের কথা, কথার কথা। এই সত্য নিয়ে সূফীতত্ত্ব তৈরী হলো। সূফীতত্ত্বের উৎপত্তি সত্যকে নিয়ে, আর একাত্ম নিয়ে। সূফীতত্ত্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে-‘ ওয়াননেস উয়িথ ওয়ান ’। কেন্দ্রবিন্দু কোনটি হবে তার প্রথম দিকনির্দেশনা দিলেন হযরত আজানগাছি তাঁর ভাবশিষ্যদের মধ্যে।  আর একদিকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করলেন হাক্কানী আঞ্জুমান এবং প্রতিষ্ঠানিকভাবে তারা এগিয়ে গেলেন। হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন তা দিয়ে গেলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক সূফীতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব প্রাপ্ত হলেন। তাঁর কাছে যারা যেতেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বেছে নিয়ে তিনি বল্লেন যে প্রতিষ্ঠান কর।

১৯৯০ সনে প্রতিষ্ঠিত হলো হাক্কানী মিশন, প্রতিষ্ঠিত হলো হাক্কানী খানকা শরীফ। হাক্কানী মিশন আসার পর একে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া আরম্ভ হলো। এদের সঙ্গে কারো ঝগড়া নাই, কোন হানাহানি নাই, যার যার ধর্ম তার তার কাছে। সবার উপরে মানুষকে প্রাধান্য দেয়া হয় হাক্কানীতে, তার যোগ্যতা অনুসারে। তাই বলে পার্থিব যেসব যোগ্যতা নিয়ে আমরা পৃথিবীর বুকে আছি, এটা না। হাক্কানীতে যোগ্যতা দেখা হয় সত্যের সাথে একাত্ম হয়ে কে কতটুকু পথ এগিয়ে গেছেন এবং জীবন চলার পথে কে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পেরেছেন, সত্যের কাছে কে কতটুকু সমর্পিত হয়েছেন-এর ভিত্তিতে। কোনটাই করতে হাক্কানীতে বাধা নাই। যেটার মধ্য দিয়ে যাবেন, সেটার মধ্যেই সত্য অন্বেষণ করেন, নিজের মত করে। পৃথিবীর বুকে যতগুলো তরিকা এসেছে কেউ সত্যকে ছাড়া চলতে পারবে না, শান্তি ছাড়া চলতে পারবে না। সত্যের সঙ্গে একাত্ন ঘোষনা করতে গেলেই কেবল অনুধাবন করতে পারবেন যে বেশীরভাগ মানুষই ধর্মের নামে যা করে যাচ্ছে তা মিথ্যাচার। পরিপূর্ণ মিথ্যাচার।

নৈতিক অবক্ষয় হলে কেউ নেতা হতে পারে না

মিরপুরে জ্যোতি ভবন-এ নেতৃত্ব বিষয়ে হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের ১১ তম পর্ব

নৈতিক অবক্ষয় হলে কেউ নেতা হতে পারে না

মহান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে আলোচনার ১১শ’ পর্ব গত ২১ পৌষ ১৪২৬, ১১ জানুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’-এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ সভাপতি শাহ্ শাহনাজ সুলতানার সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশ নেন সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ-এর নির্বাহী সম্পাদক শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও  হাক্কানী বিশেষ দূত মোল্লা হাছানানুজ্জামান টিপু এবং বাহাখাশ ধীতপুর, ভালুকা’র সম্মানিত তত্ত্বাবধায়ক শাহ শাহাবুদ্দিন খান। সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন নেতৃত্ব বিষয়ে দ্বিতীয় দিনের আলোচনার শুরুতে সকলকে হার্দিক হাক্কানী (সত্যব্রত) শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, নেতৃত্ব মানেই কেন্দ্র পরিচালনার ক্ষমতা, কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে কেন্দ্র পরিচালনা সম্ভব নয়। কেন্দ্র পরিচালনার অর্থ হলো পরিধি পর্যন্ত সব কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে রেখে পরিচালনা। কেন্দ্রে পজিটিভ, নেগেটিভ-দু’ই থাকে। মোহম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত) নেতৃত্ব দেয়, আবার আবু জেহেলও দেয়; আলী নেতৃত্ব দেয় আবার মুয়াবিয়াও নেতৃত্ব দেয়, হোসাইন নেতৃত্ব দেয় আবার এজিদও নেতৃত্ব দেয়; সিরাজ উদ্ দৌল্লা নেতৃত্ব দেয় আবার মীর জাফরও দেয়। ঘটনা কী দাঁড়ায়? বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দেয়, মুশতাকও দেয় । ঘটনা তখন কী দাঁড়ায়?

হাক্কানীতে নেতৃত্বের সংকটের কথা গত আলোচনায় একজন সম্মানিত আলোচক বলে গেছেন। এট ভুল, এটা মিথ্যা। হাক্কানীতে নেতৃত্বের সংকট নেই, থাকতে পারে না। হাক্কানীর নেতৃত্ব দেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ। যারা হাক্কানীর সাথে যোগ সংযোগ করতে এসে আপন-স্বার্থসিদ্ধির খায়েশ গোপনে প্রকাশ্যে চরিতার্থ করতে প্রতিনিয়ত জিহবার লালারস ঝরাচ্ছেন-তাদের মধ্যে সংকট আছে। হাক্কানীতে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই।

আমি ‘ধারনা’ নিয়ে বসে আছি, কাজ করছি। যদিও ধারনা হলো মনের মহত্তম অবলম্বন-কিন্তু আমাদের ধারণাসমূহ কপটতায় ভরা, বাস্তবতার স্পর্শহীন। যোগ/সংযোগহীন। খেয়াল খুশি মতো। গভীর চিন্তন হতে আসে না। সচেতন ভাব হতে আসে না। সত্যের সাথে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হয় না বলে যা ইচ্ছা তাই বলে গলা ফাটাই। পাপে ভারাক্রান্ত স্বত্ত্বা। স্বার্থের গভীর বন্ধনে বাধা। ‘নিজস্ব’ সত্য আবিস্কার না করে ধার করা সত্যের বোঝা বহন করে চলি-তার ওপর নিজের কল্প ধারণা যোগ করি-পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, রাজনীতিতে, ধর্মজগতে – ‘নিজস্বতা’ যা আছে তা স্বার্থের দেয়ালে মোড়া। নেতৃত্ব-নিজস্বতা চায়-স্বাধীনতা চায়-স্বনির্ভরতা চায়-স্বাবলম্বিতা চায়-স্বপ্রতিষ্ঠা চায়।

‘আমি’ পরম সত্যের কথা বলি-যার অন্বেষণ করতে হয়-অন্তর্জগতে, আমরা অন্বেষণ করি বহির্জগতে। আমরা শুরু করি ভুল পদক্ষেপে। আর তখন আমাদের চিন্তা, কাজ, গতি সবকিছুই ভুলের দিকে যেতে থাকে। যদি প্রথম পদক্ষেপ ভুল হয় তবে সবকিছুই ভুল হয়ে যায়। ‘নেতৃত্ব’ তাই সঠিক সচেতন পদক্ষেপের সাথে জড়িয়ে আছে।

আমরা পরিভ্রমণ করছি-আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অপুষ্টি নিয়ে। সেখানে আহার যে একেবারে নেই তা নয়। কিন্তু চিন্তাজগতে সাড়া পড়ে না। অপুষ্টিতে যারা ভুগেন তারা  শারীরিক, মানসিকভাবে রুগ্ন থাকেন। তাদের মধ্য হতে রুগ্নতা প্রকাশ পায়। আধ্যাত্মিক রুগ্নতাও আমাদের উন্নতির পথে তেমনিভাবে প্রভাব বিস্তার করে। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তেমনি। রুগ্ন মানসিক গঠন-রুগ্ন আধ্যাত্মিক শিক্ষা-রুগ্ন চিন্তা জগত-রুগ্ন ধারণা-এসবের ফল রুগ্নতার সাথেই প্রকাশ পাবে। নেতৃত্ব দিতে গেলে -সেখানে রুগ্নতা/ সেখানে ব্যক্তি আর গোষ্ঠীস্বার্থের ধারণা নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলে নেতৃত্ব ভাঙবে/নেতৃত্বের যে পরিধি সেখানে অশান্ত, অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি হবে। নানা অঘটন ঘটবে। ফলে বিপর্যয় হবে। আর রুগ্নতাবিহীন হলে বিপর্যয় নয়, বিজয় আসবে। নেতা/নেতৃত্ব কেবল-বিজয় অর্জনের জন্য।

নেতৃত্বের মূল প্রিন্সিপাল (নীতি) হলো-নিজে। নিজেকে পরিচালনার হাজার পথ-হাজার মত। – নিজেকে সত্যব্রতী করতে-নিজেকে পরিচালন করতে – যে পথ চিহ্নিত করেছি সে পথে চলতে চলতে প্রতিনিয়ত নেতৃত্ব।

সত্য প্রতিষ্ঠার কোন কোন সময় কঠিন/ভীষণ কঠিন হতে হয়। বাহ্যিক গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে ফেলতে হয়। প্রয়োজনে ‘অ্যাকশন’ চালাতে হয়। কেন? কারণ, নেতা জানেন লক্ষ্য নির্ধারিত হলে তা প্রতিষ্ঠিত করতে যা যা দরকার তার সবই সত্য। তখন কার প্রতি বিচার হলো-কার প্রতি অবিচার হলো দেখার সময় নেই। নেতা ও তার নেতৃত্ব তেমনই।

সংগঠন করবেন? একটা আদর্শিক লক্ষ্যে যখন সংগঠন পরিচালিত হবে-তখন কখনো, কোনভাবে যে কারো দ্বারা, যে কোন স্থানে, সংগঠনের লক্ষ্য অর্জনে বাধার সৃষ্টি হলে -আঘাত এলে-ছেড়ে পালালে-তখন সব শেষ, ধ্বংস অনিবার্য। আত্মীয়তার ব্যাপার সেখানে নেই, বন্ধুত্বের ব্যাপার সেখানে নেই, ব্যক্তিস্বার্থের হিসেব সেখানে নেই। লক্ষ্য/ মিশন ঠিক রাখতে যা- যা করা দরকার তার সবই জায়েজ।

‘জীব হত্যা মহাপাপ’-সাধককূলের কেউ কেউ বলে গেছেন। আবার সে মহাপাপও বাহ্যিকভাবে প্রতিদিনই চলে। কেন?-দুই সাধক কেন দু’রকম করে বললেন? ভেবে দেখতে হবে। বৈধ করার জন্য আইন-কানুন বানিয়ে ফেলি-স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য-এখানে নেতার নেতৃত্ব গুণের নাকি দোষের?

ঐ সহজাত গুণ-তা ধরে রাখার কোন বিষয় আছে কি? ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এমন যা’-‘নবসৃষ্টির জন্য উন্মাদনা চাই। এটি বলে কয়ে হয় না। উন্মাদনা আপনার অন্তর্গত সত্যের প্রকাশ।’ নেতা-ফলোয়ার’ এর হিসেব কষে কিছু করেন কি? আমি যখন আমার লক্ষ্যে ধাবমান তখন আমি জানি-আমি কোথায় যাচ্ছি। যেখানে যাচ্ছি সেখানে যাবার জন্য-যখন যা-যেভাবে দরকার করে যাবো। কারো দিকে তাকিয়ে নয়-নিজের দিক ব্যতিত।

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-বাহাখাশ-হাক্কানী ট্রাস্ট-ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ‘কর্ম-মানবতা-শান্তি’ ‘লাল-সবুজ-সাদা’-সিম্বোলিক- প্রতিটি জায়গায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনকে দায়িত্ব দিয়েছেন, যারা ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন-এগিয়ে নিয়ে গেছেন-যারা ধারাবাহিতকতা ধরে রাখতে পারেননি-অন্তত যুক্ত হয়েছেন। এভাবে ব্যক্তি এসেছেন- আছেন -চলে গেছেন। প্রতিষ্ঠান/সংগঠন রয়ে গেছে-রয়ে যাবে। প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে-লক্ষ্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যক্তির কর্ম-মূল হলেও -ব্যক্তি হারিয়ে যেতে পারেন-কিন্তু কর্মটি থামবে না-যখন কর্মটির সাথে ধারাবাহিক যুক্ত-নেতৃত্ব ঠিক আছে।

মোল্লা হাছানানুজ্জামান টিপু বলেন,নেতৃত্ব বিষয়ে গত আলোচনার পরে আমার ভিতরে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, আসলে আমি কোথায় যাচ্ছি? কি করছি? কতটুকু হাক্কানীকে ধারণ করতে পেরেছি? এই সকল চিন্তা মনে উদয় হয়েছে। সেই সব চিন্তা থেকে আমার ভেতর একটা কবিতা আসলো যা শেয়ার করতে চাই-

আসছে পথে আধাঁর নেমে, তাই বলে কি রইবো থেমে?

বারে বারে জ্বালাবো বাতি, হয়ত বাতি জ্বলবে না।

হৃদয় খুড়েজ্বালাবো আলো, দুর করবো পথের কালো,

চলতি পথে কারো জন্য থামবো না, ভীরুর মতো বসে থাকা চলবে না।

এই যে আমার জড়তা, ভীরুতা এইসবকে কাটিয়ে উঠে নিজেকে একজন কর্মী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত তৈরী করতে হবে। সেই জন্য নিজেকে অপরাধী ও অক্ষম মনে হয়। স্বার্থপরের মতো নিজের চিন্তা করছি সামস্টিক চিন্তা কাজ করছে না। নেতৃত্ব আমি কিভাবে দিব, নিজেকে কিভাবে নেতৃত্বের যোগ্য করে তুলবো তাই নিশিদিন ভেবেছি। নিজেকে এক্ষেত্রে অযোগ্য, অকর্মণ্য মনে হয়।

প্রথম কথা হলো আমি এখানে কেন এসেছি? এতো জায়গা থাকতে কেন আমি জ্যোতি ভবনে আসলাম? অবশ্য একটি মকসুদ নিয়ে আসছি। একটা উদ্দেশ্য তো অবশ্যই ছিলো। আমি জিজ্ঞাসিত হয়েছিলাম, কি চাই? কি জন্য আসছেন? আমি উত্তর দিয়ে ছিলাম – দুটো জিনিস চাই: একটা হলো আপনাকে চাই। এই যে ওনাকে চাওয়া, তখন কিছু না বুঝেই বলে দিলাম, “আপনাকে চাই” এই না বুঝেই বলে দিয়েছিলাম, কিভাবে যে বলেছিলাম জানি না। একজন পুরুষকে আরেকজন পুরুষ চাইতে পারে? অবশ্য হাক্কানীর নারীত্বের ভাবনাটা আমার মধ্যে কাজ করেনি। পরে অবশ্য অনেক ভেবেছি ব্যাপারটা নিয়ে, আমি তো এসেছিলাম আমার প্রয়োজনে, এই যে আপনাকে চাই কথাটা আমি কেন বললাম? কথাটা কি আমি ওনাকে খুশি করার জন্য বললাম না নিজে থেকেই আসলো। হয়ত অন্তর থেকে উৎসরিত হয়েছিলো এই বাসনাটা।

আসলে সত্য মানুষকে চাওয়া, ওনাকে ধারণ করে স্মরণে সংস্পর্শে থাকা, নিজের আচার, আচরনে ওনাকে প্রতিষ্ঠা করা ওনার সাথে একাত্ম হওয়া, এটাকেই ওয়াননেস উইথ ওয়ান বলে আমার ধারণা। আমি এটাকে নেতৃত্ব বলবো নিজের নেতৃত্ব। এটা কি কোন সহজ কাজ? অবশ্যই না, সহজ নয়। আমাদের রিপু বা নফস বলি যাকে তা থেকে মুক্ত হওয়াকে, নিজেকে কেন্দ্রীভুত করা, আমার আমিকে নিজের মধ্যে নিয়ে আসা। মামা বলতেন ’নিমগ্ন হন’। কোথায় নিমগ্ন হবো? নিজের মধ্যে? কেন নিমগ্ন হবো? নিজের নিয়ন্ত্রন নিজে নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি কি পারি? আমার চিন্তা জগত তো বিচ্ছিন্ন। আমার চিন্তার মধ্যে সারাক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছে আমার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ব্যবসা, অফিস, ক্লায়েন্ট, হাজার, লক্ষ, কোটি টাকার চিন্তা। চিন্তার নিয়ন্ত্রণ না থাকলে যা হয়। নিজের চিন্তাকে এককেন্দ্রে প্রবাহিত করার মতো প্রজ্ঞা ও জ্ঞান আমার মধ্যে আসেনি এই যে আমার বিভ্রান্ত অবস্থা, অগোছালো অবস্থা, এই অবস্থা থেকে উত্তরণ করানোটা হলো আসল নেতৃত্ব। নেতৃত্বের একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। নেতৃত্বের সার্থকতা সংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে উন্মচিত হয়। আমার নিজের মধ্যে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকেও ইসলামে বলা হয়েছে জিহাদ নিজের নফসের বিরুদ্ধে। নিজের কামনা বাসনার বিরুদ্ধে, নিজের অসৎ চিন্তার বিরুদ্ধে নিজের সৎ স্বভাবকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার নাম জিহাদ।

এই জিহাদের পথ অনেক কঠিন, এই পথে কি সাফল্য সহজ? অবশ্যই না। খুবই কঠিন পথ। মামা বলতেন এখনো তিন সংখ্যায় যায়নি। এ রাস্তা বড়ই পিচ্ছিল-বন্ধুর। কোন জিনিসের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন নজর রাখা, দৃষ্টিকে বশে এনে এগিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন কাজ। একজন সার্থক হয়েছিলেন তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তিনি আমাদেরই নেতা সূফি সাধক শেখ আবদুল হানিফ।

একদিন জানতে চেয়েছিলাম মামা কি করে সম্ভব? একজন শিষ্য তার গুরুকে সারাক্ষণ স্মরণে রাখেন? প্রতিটি সাধনায়, প্রতিটি কথায় আপনি আপনার গুরুকে নিয়ে আসেন এটা কি করে সম্ভব? আমি যে হাজার চেষ্টা করেও পারিনা। উনি মুচকি হেসে চুপচাপ ছিলেন। আরেকদিন জানতে চেয়েছিলাম-গুরু যে শিষ্যের কাছে চলে আসে কতটুকু সংযোগ থাকলে গুরু শিষ্যের মাঝে বসত গড়ে? উনি বলেছিলেন অনেক কথা। সেই সান্নিধ্য, সম্বল, সংযোগ, নিরন্তর সাধনার কথা, সেই যে কঠিন পথ নিজেকে নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্য তার প্রমাণ দিতে হয় পদে পদে। উনি বলতেন “রাত আড়াইটার সময় একটা ফোন আসতো” কেন আসতো? উনি বলতেন, এই লাইনে (হাক্কানীতে) রাত্রেই সংযোগ ভালো হয়। রাত তিনটা থেকে ফজর পর্যন্ত সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। যারা হাক্কানী পথের যাত্রী তারা নিশ্চয়ই এটা মেনে চলবে।

আমি কি পারি আমার গুরুর আদেশ নিষেধ পালন করতে? তিনি কত নির্দেশ দিয়েছেন, আদেশ করেছেন কতটুকু পালন করতে পারি তাহলে আমার দ্বারা হবে কেন? আমার ভালোর জন্য যেসব কথা বলে গেলেন সেটাও পালন করিনা। কারণ আমার সে বুঝ, জ্ঞান হয়তো এখনো হয়নি। সে জন্যই আমি পুরাপুরি ব্যর্থ।

মামা বলতেন, দৃষ্টিকে বসে আনতে হবে, চিন্তাকে লাগাম দিতে হবে, নিজের বিচার নিজে করতে হবে। এই গুলি কোনভাবেই আমি চর্চা করতে পারিনা না আমার কাছে কৃপা আসবে কি করে? নিজের বিচার নিজে করে নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেকে যে একটা অবস্থানে নিয়ে যাবো তারও উপায় নাই। তাৎক্ষণিকতার বিচার পরবর্তীতে হবে কি করে? এই বিচার নিয়ে একদিন আড়াই ঘণ্টা কথা বলেছিলেন আমাকে। চিন্তার স্থবিরতা মানুষকে মৃতবৎ করে ফেলে, চিন্তার রূপান্তর চিন্তাশীল মানুষকে উচু স্থানে, উর্ধ্বলোকে নিয়ে যায়। স্থবিরতা হাক্কানীতে মানায় না, যাযাবরের একটা উপন্যাস পড়েছিলাম ওখানে একটা কথা আছে, ‘পরিবর্তনের অপর নাম জীবন, পাথরের জীবন নাই কিন্তু শামুক যতই আস্তে চলুক তার জীবন আছে। সে নিজেকে স্থানান্তর করতে পারে। চিন্তার সংঘর্ষই একজন সাধন পথের যাত্রীকে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। নিজেকে সরল পথে রাখতে হলে নিরন্তর চিন্তার মাধ্যমেই নিতে হবে।

মস্তিস্কের ব্যবহার সবচেয়ে বেশী করেছিলেন আইনষ্টাইন, উনি ওনার ব্রেইনের কার্যক্ষমতার ১৩% ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিউটন যার সূত্রের বলে বিজ্ঞান এতদুর এসেছে তার ব্রেইনও কত পার্সেন্ট ব্যবহৃত হয়েছিল জানা নেই। সাধনকুলের ব্রেইন হিসাবে আনলে অবশ্যই বুঝা যেত কার ব্রেইন বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। সাধককূল বিশ্বাসের বেড়াজাল ছিন্ন করে আপন আপন ভূবন তৈরী করে নিজ জগতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তৈরী করেছেন অসংখ্য ভক্তকুল।

নেতৃত্ব দিবে কে? নেতা হতে হলে কি কি গুণ থাকা প্রয়োজন? প্রথম কথা হলো তাকে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। যেমন, মামার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে আমরা তাঁর প্রেমে মজেছিলাম। অবলীলায় তার ভক্ত হয়ে গেছি।

ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া প্রথমদিন প্রথম সাক্ষাৎতে পেয়েছিলাম। প্রথমদিন এই চিন্তন বৈঠকেই ওনাকে অনেকের মাঝে আলাদা করে চিনে নিয়েছিলাম সেটা অবশ্য অনুমানে, পরে আমার অনুমানই সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রথমদিকেই মামার আকর্ষনে আকর্ষিত হয়েছিলাম। উনার ব্যক্তিত্ব যে সমীহ জাগাতো তা নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি কি পেরেছি? নিশ্চয়ই নয়।

নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন সাহসিকতা। মামার ছিলো প্রচ- সাহস। সবাই বিরুদ্ধে গেলেও উনি উনার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। এরকম অনেক ঘটনার প্রমাণ আছ স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস, আমার মধ্যে কি সেই সাহসিকতা বিদ্যমান? নিশ্চয়ই নয়। নির্দিষ্ট লক্ষ্য প্রয়োজন নেতৃত্বের জন্য। এখানে নিজেকে চেনার ব্যাপার আছে। মালিকের সন্তুষ্টি, কৃপা পাওয়াই একজন ভক্তের আরাধ্য। আমরা ছোট বেলায় পড়তাম “এইম ইন লাইফ” সেই এইম কি আমাদের মধ্যে বিদ্যমান? নিশ্চয়ই নাই! কেন নাই কারণ আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম না। নেতৃত্ব দিতে হলে সেই এইমকে কেন্দ্রিভুত করে এগিয়ে যেতে হবে।

নিজের বিচার করার ক্ষমতা না থাকলে নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না। নিজের সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগে পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ ও নিজেকে পুঙ্খনাপুঙ্খরূপে বিচার করার ক্ষমতা অর্জনই সকল নেতৃত্বের জন্য আদর্শ। অনুসরণকারীদের আস্থায় নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। নিজের আচার ব্যবহার ধীরচিত্ত হয়ে, নিজের প্রতি অনুসরণ কারীদের বিশ্বাস অর্জন করা নেতৃত্বের অন্যতম বিষয়। এক্ষেত্রে অনুসরণকারীদের প্রতি ব্যবহার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার মধ্যে কি এ দিকটা প্রকাশিত হয়েছে?

নিজেকে সক্ষম হিসাবে তুলে ধরা, উপযুক্ত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা, নিজেকে সর্বগুণে গুণান্বিত করে সবার উপরে স্থাপন করা। নিজেকে ব্যতিক্রম ও সঠিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।

অধনস্তদের সঠিক প্রণোদনা দেওয়া, উৎসাহ দেওয়া। মামা যেমন বলতেন, “ভুল বলে কিছু নাই” এগিয়ে যান! এই যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মনমানসিকতা তা নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সারাক্ষণ ফলোয়ারদের দোষী করলে হবে না। প্রেমময় হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সবকিছু জানলেও মামা কিন্তু কেউকেই ঘৃণা করতেন না, সংশোধনের সুযোগ দিতেন। নিজেকে সেই প্রেমময় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

নেতৃত্বের জন্য নীতিতে অটল থাকা জরুরি, নৈতিক অবক্ষয়প্রাপ্ত লোক কোনদিন নেতা হতে পারে না। সকলকে হার্দিক হাক্কানী শুভেচ্ছা। জয় বাংলা।

প্রবাহ

মিয়ানমার ও চীন একই মায়ের দুই সন্তান

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মিয়ানমার ও চীনকে ‘একই মায়ের দুই সন্তান’ হিসেবে উল্লেখ করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এসময় দেশ দুটির কুটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর উদযাপন করেন তারা। দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে শুক্রবার মিয়ানমারে আসেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

১৯ বছরের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের মিয়ানমার সফর। শনিবার অং সান সু চির সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এক বৈঠকের পর উভয় দেশের প্রতিনিধিরা বিনিয়োগ চুক্তি সংক্রান্ত একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

অর্থনৈতিক করিডর, রাখাইন রাজ্যে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, সীমান্তে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন এবং বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াংগুনে নতুন শহর তৈরিসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চুক্তি স্বাক্ষর করেন উভয়পক্ষের প্রতিনিধি। চীনের বেল্ট এন্ড রোড প্রকল্পের আওতায় রাখাইন রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার ও রাখাইনের সমুদ্রবন্দর সংলগ্ন কেয়াকফিউ এর উন্নয়নে বিশেষ বিনিয়োগ করবে চীন। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে মিয়ানমার হয়ে ভারত সাগরে প্রবেশ করার সুযোগ পাবে চীন।

একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও অং সান সু চি দুই দেশের মধ্যে সড়ক সংযোগসহ বিভিন্ন প্রকল্পের বিষয়ে ৩৩টি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এসময় চীনের আলোচিত ২১ শতকের সিল্ক রোড প্রকল্পে মিয়ানমারকে সংযুক্ত করার বিষয়েও একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৮ : জাতিসংঘ

গত বছরের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কম হতে পারে। চলতি ২০২০ অর্থবছরের বাংলাদেশের মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে জাতিসংঘ।

বৈশ্বিক অর্থনীতির সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি ‘বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি এবং সম্ভাবনা-২০২০’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ । তাতে বলা হচ্ছে, ২০২০ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কম হলেও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে সর্বোচ্চ। প্রতিবছর জাতিসংঘ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি গড়ে গোটা বিশ্বে জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুতগতিতে কমছে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও ২০১৯ সালে তা ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে এ সত্ত্বেও বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ ও নেপালের প্রবৃদ্ধি ছিল শক্তিশালী অবস্থানে।

এ বছর বাংলাদেশের চেয়ে প্রবৃদ্ধি কম হবে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের। চলতি বছরে দেশ দুটির প্রবৃদ্ধি হবে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতিসংঘ বলেছে, গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কম হওয়া ছাড়াও এ বছর দেশটিতে উচ্চমাত্রায় মুদ্রাস্ফীতি হতে পারে।

জাতিসংঘের ‘বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি এবং সম্ভাবনা-২০২০’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প অনেকটা সম্প্রসারিত হয়েছে। যা ২০১৯ সালে বাংলাদেশকে ৮ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে।’

এছাড়া চলতি বছরে বাংলাদেশে দ্রব্যম্ল্যু বৃদ্ধি পাবে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ হারে, গত বছর যা ছিল ৫ দশমিক ১০। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের উন্নতির বিষয়টির উল্লেখ করে বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত যেসব দেশ অন্তত ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না তারা এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা থেকে ছিঁটকে পড়বে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মাত্র ১৫টি দেশ এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাঙ্খিত জিডিপি অর্জন করতে পারছে। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, বেনিন, কম্বোডিয়া, ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, সেনেগাল ও দক্ষিণ সুদান। এসডিজি বাস্তবায়নে ১৭টি লক্ষ্য অর্জন করার পথে রয়েছে এসব দেশ।

বাণিজ্য বিরোধের কারণে ২০১৯ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে হয় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ দশমিক ৩ শতাংশ হয়। এ বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জাতিসংঘ বলছে, যদি বিরোধ কমে তাহলে ২০২০ সালে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের নির্ধারিত ৬৪ দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই প্রতি ঘণ্টায় পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি আয় করেন। আর মাসিক আয়ের ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান অত্যন্ত কম। দেশে পুরুষদের চেয়ে নারীদের মাসিক আয় মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ কম।

৫ বছরের মধ্যে ভারতকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র দেবে রাশিয়া

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হস্তান্তর করবে রাশিয়া। শুক্রবার নয়া দিল্লিতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে একথা বলেছেন রুশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাই কুদাশেভ। ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির অধীনে এগুলো ভারতকে হস্তান্তর করবে মস্কো। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস এখবর জানিয়েছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়া মিশনের উপ-প্রধান রোমান বাবুশকিন। তিনি বলেন, ভারতের জন্য এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে। আমরা আশা করছি ২০২৫ সালের মধ্যে তা ভারতকে হস্তান্তর করা যাবে।

বাবুশকিন আরও বলেন, শিগগিরই ভারতের সশস্ত্রবাহিনী ৫ হাজার কালাশনিকোভ অ্যাসল্ট রাইফেল পাবে। যা ভারতে উৎপাদিত হয়েছে।

ভারতের কাছে ২০০টি কামোভ কেএ-২২৬ হেলিকপ্টার বিক্রির একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার দিকে রয়েছে বলেও জানিয়েছেন বাবুশকিন। এগুলোর মধ্যে ৬০টি রাশিয়া সরবরাহ করবে এবং বাকিগুলো ভারতে উৎপাদিত হবে।

৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনার ভারত একেবারে নিঃশর্ত ছাড় পাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুসারে, রাশিয়ার কাছ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অস্ত্রক্রয়কারী দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হতে পারে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতকে বিশেষ ছাড় দিয়েছেন।

কুদাশেভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে কাজ করছে ভারত-রাশিয়া। অর্থ পরিশোধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কিনলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরছে না ভারত। পেন্টাগনের কাছ থেকে ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে দেশটি। এই চুক্তি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১টি ভারী পরিবহন হেলিকপ্টার সি-১৭ (ভারতের আছে দশটি), চারটি অতিরিক্ত পি৮১ সাবমেরিন বিধ্বংসী যুদ্ধবিমান, ছয়টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, ২৪টি সুখই হেলিকপ্টার এবং এম-৭৭ হাল্কা হোয়িটজার কিনবে ভারত। এছাড়া ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য মার্কিন এফ-১৮ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার কথাও রয়েছে চুক্তিতে।

চীনকে হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে চীনের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

গতকাল শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্পপন্থি আমেরিকান রেডিও টকশোতে হোস্ট হিউ হুইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এমন কথা জানান বলে ইরান প্রেসের খবরে বলা হয়।

ওই সাক্ষাৎকারে মাইক পম্পেও বলেন, ‘ইরানের কাছ থেকে তেল কিনে মার্কিন আইন ভঙ্গ করেছে চীন কোম্পানিগুলো। আমাদের বিধিনিষেধ লঙ্ঘনকারী প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যা যা করা প্রয়োজন সবই করা হবে।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও একচ্ছত্র বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়ে অভিযোগ তুলে চীন ও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং। 

ইরান ও চীনের বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গ্যাং সুয়াং বলেন, ‘আমরা একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও একচ্ছত্র বিচার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করি। আমরা বিশ্বাস করি নিষেধাজ্ঞার অযৌক্তিক ব্যবহার এবং হুমকি কোনো সমস্যার সমাধান করবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই অবৈধ নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া। আমরা চীনা ব্যবসায়ীদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার্থে সর্বদা অবিচল থাকব।’

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি থেকে সরে আসতে ২০১৫ সালে বিশ্বের পাঁচ শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি হয় ইরানের।  এরপর ২০১৮ সালে ট্রাম্প সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই চুক্তি থেকে বেড়িয়ে এসে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনৈতিক ভংগুরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ইরানও ওই চুক্তি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। 

লিবিয়ায় প্রভাব রাখতে চায় রাশিয়া ও তুরস্ক

আবারো আলোচনায় এসেছে লিবিয়া, যেখানে শান্তি আনার জন্য যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সাথে আলোচনার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। লিবিয়ায় এ মুহূর্তে দুটি পরস্পরবিরোধী প্রশাসন সক্রিয় আছে: একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতিসংঘ স্বীকৃত প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সেরাজ এবং অন্যটি জেনারেল খলিফা হাফতারের বিদ্রোহী বাহিনী। এ সপ্তাহেই রাশিয়া ও তুরস্কের চাপের মুখে দু’পক্ষই সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজী হয়েছে।

কিন্তু তারপরেই আশঙ্কা অনুযায়ী কয়েকদিনের মধ্যেই জেনারেল হাফতার যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন যা দেশটিকে আবারো অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। কিন্তু লিবিয়ার অবস্থা এতোটা জটিল হলো কিভাবে?

ভংগুর প্রতিশ্রুতি :

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো নয় মাসের তুমুল লড়াইয়ের মধ্যে একটি বিরতি আনার জন্য। শুধু গত ছয় মাসেই প্রায় দু হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বাস্তুহারা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। বার্লিনে ১৯শে জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা লিবিয়া শান্তি সম্মেলন কিন্তু এটি নিশ্চিত নয় যে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এটি হতে দেবে কিনা। কিন্তু কেন একটি যুদ্ধবিরতি এতো কঠিন? এটি জানার জন্য যেতে হবে দ্বন্দ্বের উৎস মূলে।

সংঘাতের সূচনা :

সিরিয়ার মতো লিবিয়াতেও এর সূচনা হয়েছ ২০১১ সালে আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে। ন্যাটো সমর্থিত বাহিনী লিবিয়ার দীর্ঘসময়ের নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাত করে। এরপর থেকেই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে। কয়েক বছরের সংঘাতের পর জাতিসংঘের সহায়তায় সরকার গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী সেরাজ। রাজধানী ত্রিপোলি ভিত্তিক তার জাতীয় ঐক্যের সরকারের লক্ষ্য ছিলো দেশকে এক করা। কিন্তু সবাই এতে সম্মত হয়নি এবং জেনারেল হাফতার নিজেই ক্ষমতা চান। তিনি লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এলএনএ গঠন করেন তবরুক ও বেনগাজি শহরকে ভিত্তি করে। তার দাবি একমাত্র তিনিই নিরাপত্তা পুন:প্রতিষ্ঠা ও ইসলামপন্থী সন্ত্রাসকে দুর করতে পারেন। তার বাহিনী গত বছরের এপ্রিল থেকে ত্রিপোলি অভিমুখে এগুতে থাকে এবং এ মাসে গুরুত্বপূর্ণ শহর সিরত দখল করতে সক্ষম হয়।

কিন্তু পরিস্থিতিকে জটিল করে বিভিন্ন শহর ভিত্তি মিলিশিয়ারা একের অন্যের সাথে লড়াই করছে এবং এর মধ্যে ইসলামিক স্টেটের একটি অংশও আছে।

প্রক্সি ওয়ার

এখানেও সিরিয়ার সাথে লিবিয়ার মিল আছে। লিবিয়ার বিদ্রোহীরা শুধু মাত্র নিজ দেশের নন। লিবিয়ার বিবদমান দু’পক্ষই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সমর্থন পাচ্ছে। আরব আমিরাত ও সৌদি আরব বলছে, তারা ওই অঞ্চলে ইসলামপন্থীদের থামাতে চায় এবং জেনারেল হাফতার এ দুটি দেশকে তার পক্ষে নিতে সক্ষম হয়েছেন। আবার জর্ডান ও আরব আমিরাত অস্ত্র ও বিমান সহায়তা দিচ্ছে এলএনএকে এবং জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে আরব আমিরাতের সামরিক সমর্থনকে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে। লিবিয়ার পূর্ব দিকের প্রতিবেশী মিসরও আছে জেনারেল হাফতারের দিকেই এবং দিচ্ছে নানা সহায়তা। এবং ওই অঞ্চলে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টারত রাশিয়াও শেষ পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়েছে। তারা জেনারেল হাফতারের বাহিনীর সাথে মিশে লড়াই করছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও মস্কো সরাসরি জড়িত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিপর্যস্ত সহায়সম্পদ :

অন্যদিকে আছে তুরস্ক। সম্প্রতি তারা প্রধানমন্ত্রী সেরাজের সমর্থনে সৈন্য পাঠিয়েছে। রাশিয়ার মতো আঙ্কারাও চায় প্রভাব বজায় রাখতে এবং নিজেকে তারা ওই অঞ্চলে শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চায়। যদিও তুরস্ক সরকার বলছে তারা ত্রিপোলিতে সৈন্য পাঠিয়েছে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেয়ার জন্য। যদিও একটি সূত্র বিবিসিকে নিশ্চিত করেছে যে তুরস্কের সেনাদের মধ্যে আঙ্কারা ভিত্তিক সিরিয়ান বিদ্রোহী যোদ্ধারাও আছে। বিবিসির প্রতিরক্ষা সংবাদদাতা জোনাথন মার্কাস বলছেন, তুরস্কের লক্ষ্য হতে পারে সাগরের নীচে মূল্যবান সম্পদকে কেন্দ্র করে।

জোনাথন মার্কাসের বিশ্লেষণ :

নভেম্বরে আঙ্কারা ত্রিপোলি কর্তৃপক্ষের সাথে সমুদ্র সীমা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যার মধ্যে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের দাবি করা এক্সক্লুসিভ ইকনোমিক জোনের বিষয়টিও আছে যা লিবিয়া নিজের দাবি করেছিলো।

তুরস্কের উদ্যোগ, অঞ্চলের অন্য খেলোয়াড়দের একটি বার্তা দিয়েছে যা ইউরোপে গ্যাস পাইপলাইন সুবিধাকে জটিল করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটা ইসরায়েল, মিসর, গ্রীস ও সাইপ্রাসের উদ্যোগের পাল্টা পদক্ষেপ। এ দেশগুলো পূর্ব ভূমধ্যসাগর গ্যাস ফোরাম গঠন করেছে।

লিবিয়াকে নিয়ে তুরস্কের পরিকল্পনা ওই অঞ্চলে একটি বড় সংকট তৈরি করতে পারে, এমনকি একই সাথে মস্কো, ওয়াশিংটন ও ন্যাটো সহযোগীদের সাথে সম্পর্ককেও সমস্যায় ফেলতে পারে। যা অঞ্চলটিতে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। তুরস্ক অবশ্য আশা করছে লিবিয়ায় তাদের সামরিক উপস্থিতি সামান্যই থাকবে।

আঞ্চলিক স্বার্থ

আরব আমিরাত সহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে কাতারের দ্বন্দ্ব এখনো আছে। তাই তারাও জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের দিকেও আছে তাদের সহযোগী তুরস্কের সাথে। আছে ফ্রান্সের উপস্থিতিও। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা দুই ইস্যুতেই ২০১৫ সাল থেকে দেশটি লিবিয়ায় সক্রিয় আছে। সরকারিভাবে প্যারিস জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের দিকে থাকার কথা বললেও সামরিক দিক থেকে জেনারেল হাফতারের দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে দেশটি। যদিও ফ্রান্সের কর্মকর্তারা কখনোই জেনারেল হাফতারকে সহায়তার কথা স্বীকার করেননি।

ইটালি আবার ফ্রান্সের সমালোচনা করছে হাফতার প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হবার দায়ে। প্রধানমন্ত্রী সেরাজের সরকারের দিকেই সমর্থন আছে রোমের। ২০১১ সাল থেকে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর দিয়ে অভিবাসীদের আগমন ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে ইটালি। আর যুক্তরাষ্ট্র তো আছেই। তারা দেশটির দক্ষিণ পশ্চিমে আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?

লিবিয়া সংঘাতে বাইরের অনেক খেলোয়াড় থাকার বিষয়টি অনেকটাই প্রমাণিত। উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিতে বিশাল তেল সম্পদের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস আছে। আবার লিবিয়া আফ্রিকান অভিবাসীদের ইউরোপ যাওয়ার গেইটওয়ে হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে আইএসের উত্থান ও অন্য জঙ্গি গ্রুপগুলো শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যই দু:স্বপ্ন নয়। লিবিয়ায় যদি সংঘাত অব্যাহত থাকে সংকট আরও বড় ভাবে দেশটির সীমান্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সময়ের সাফ কথা…. ‘এক’-এর মধ্যেই সকল শান্তি!

শেখ মজলিস ফুয়াদ ।। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়েছে, তাঁর পবিত্র মুখ থেকে কথা শোনার সুযোগ হয়েছে কিশোরগঞ্জের এমন একজন মানুষের কাছে বহুবার শোনা গেছে যে, কিশোরগঞ্জের ভাষায় সাধক বলতেন, ‘এহ-এ তাহুইন যে।’ মহান সাধক-এঁর এই ছোট্ট অথচ পবিত্র এই কথাটির তাৎপর্য অন্বেষণ করলে এর অর্থ এমন দাঁড়ায় যে ‘এক-এর মধ্যে থাকবেন।’ অর্থাৎ, ‘একত্রিত’ থাকবেন। ‘ঐক্যবদ্ধ থাকবেন, ‘এক’ কথায় থাকবেন। এ মর্মে মহান সাধক-এঁর বিশেষ একটি বাণী যা হাক্কানী চিন্তনে বহুল ব্যবহৃত তা হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি মনে ও মুখে এক নয় তার ইবাদত শুদ্ধ নয়।’ বর্তমান সমাজে, দেশের সর্বত্র ব্যবস্থাপনা ও সংগঠন-প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে যে-সমস্যাটি বড় হয়ে দেখা যায়, চিন্তা- চেতনার ক্ষেত্রে এবং নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে যে জিনিষটি বেশি চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে অনৈক্য, কথা ও কাজের সমন্বয়ের অভাব। কথা ও কাজের এই অনৈক্য আর সমন্বয়হীনতাই মূলত সব ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মূল কারণ যা আমাদের সর্বস্তরে অগ্রগতির চাকাকে কন্টকাকীর্ণ করে রেখেছে। আর এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় শক্তিশালী সংগঠন, ব্যবস্থাপনা, এ কথায় সুদক্ষ নেতৃত্ব।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তথা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি (সুবর্ণ জয়ন্তী) উদযাপনের এক বছর বাকী। এ মূহুর্তে জাতীয় ক্ষেত্রে আনন্দ ও স্বস্তির একটি বিষয় হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা বর্তমানে সরকার এবং সরকারি দল পরিচালনায় ও নেতৃত্ব প্রদানে অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়ে দেশবাসীর বিপুলভাবে আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিগত এগারো বছর ধরে তাঁর দলকে এক রাখতে পেরেছেন বলেই দলটিকে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও রাখতে পেরেছেন। অতীতের যে-কোনো সময়ের তুলনায় জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এখন সবচেয়ে বেশি পাকাপোক্ত এবং তাঁর এই বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সফলতা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। এই অবস্থায় গত ১৯ পৌষ ১৪২৬, ৩ জানুয়ারি ২০২০, শুক্রবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী তাঁর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ এবং উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম যৌথসভায় কিছু কথা বলেছেন যা সময়ের নিরীখে অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী সেখানে বলেছেন, ‘একটি সরকার সফলভাবে পরিচালনার জন্য দলকে সুসংগঠিত রাখা জরুরি। সরকার সফলভাবে কাজ করতে পারে তখনই যখন দল তার পেছনে সুসংগঠিত থাকে। দল সুসংগঠিত থাকলে তা একটা সরকারের জন্য বিরাট শক্তি।’ দেশপ্রেমিক একক নেতৃত্ব থাকলেই কেবল দল এমনকি দেশকে সঠিকভাবে এগিয়ে নেওয়া যাওয়া সহজতর হয়। 

এরই মধ্যে রাষ্ট্রীয় এবং দলীয়ভাবে বর্ণাঢ্য আয়োজনে শুরু হয়েছে ২০২০-২০২১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে মুজিববর্ষের ক্ষণ গণনা। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে ইতিমধ্যে বলেছেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০২০ সাল বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। কারণ, এটা জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীর বছর। ১৯২০ সালে তাঁর জন্ম, মনে হয় তাঁর জন্মই হয়েছিল বাঙালিকে জাতি হিসেবে একটা আত্মপরিচয় এনে দেওয়ার এবং একটি জাতিরাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য।’ একজন নেতার জন্মশতবার্ষিকীকে বর্ষ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের বিষয়টি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আর এক অর্থে এটিই একটি নতুন ইতিহাস। কারণ, শুধু বাংলাদেশ কেন সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসেই কোনো নেতার জন্মশতবার্ষিকীতে বর্ষ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের নজির এই প্রথম। এই জন্য বাঙালি জাতি আজ অবশ্যই গর্ববোধ করতে পারে। যে-নেতার ডাকে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে একটি জাতিরাষ্ট্রের সৃষ্টি সে রাষ্ট্রেই এই বর্ষটি পালন করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, উঠেছে-বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবন দিয়ে, তাঁর ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মাহুতি দিয়ে যে রাষ্ট্রটি তিনি দিয়ে গেলেন সেখানে কতটুকু জাতীয় ঐক্য বজায় রয়েছে। কারণ, এই জাতিরাষ্ট্রের মধ্যেই এমন অনেক দল রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছে যাদের কাছে মুজিববর্ষ পালনের কোনো তোড়জোড় তো দূরের কথা, তাদের কাছে এ বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী বা মুজিববর্ষ-এটি কোনো প্রভাব ফেলেনি। জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর কোনো কোনো মহল থেকে অবশ্য এজন্যই বলা হচ্ছে, যারা বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক হিসেবে মান্য করে না তারা এদেশের জন্য আবর্জনা। আবার, বঙ্গবন্ধু যেখানে বলতেন, ‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, আমি বিশ্বাস করি সেক্যুলারিজমে, আমি বিশ্বাস করি সোশালিজমে’-সেখানে তাঁর নিজ দল ও সরকারের মধ্যে কতজন বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শকে আজ ধারণ, পালন ও লালন করতে পারেন?-এসব প্রশ্ন আজ জাতির আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। সদ্য স্বাধীন দেশে পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তনের পর বহুদলীয় গণতন্ত্রের দিকেই দেশকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্রের অবাধ সুযোগে কোনো কোনো রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, অতি বিপ্লবী ও অতি বামপন্থীদের কারসাজি এবং তদুপরি বঙ্গবন্ধুর নিজের দল ও সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের এজেন্টদের ষড়যন্ত্রে ও দুর্নীতিতে দেশে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল-বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন বিভিন্ন ভাষণ ও বক্তৃতায় এ দুবির্ষহ পরিস্থিতি বহুবারই উঠে এসেছিল।

দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা চক্রের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সেনাবাহিনীসহ কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র জনতা ও শিক্ষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধু বহুবার আহবান জানিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশবাসীকে, সকল দেশপ্রেমিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামের একটি রাজনৈতিক দর্শনও দাঁড় করিয়েছিলেন। স্বাধীন একটি জাতির সকল শক্তিকে একটি মঞ্চে আনার লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর এই রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তাঁকে হত্যা করে ষড়যন্ত্রকারীরা এই বাকশাল-দর্শনের বিরুদ্ধে বহু মিথ্যাচার, ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করেছে বঙ্গবন্ধুর খুনী তথা স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনীচক্র ও তাদের দোসররা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে দেশটাকে ৭১’এর স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্টো পথে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। দীর্ঘ ২১টি বছর জাতির পিতার নামটিকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল। দেশটা বিভক্ত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তি-এই দুই ধারায়। একটি জাতিরাষ্ট্রের নাগরিক তথা জনগণের অগ্রগতি ও উন্নতির পথে এই বিভক্তি ও অনৈক্য যে কত বড় অন্তরায় তা সচেতন দেশবাসী ও বিবেকবান মহলই শুধু উপলব্ধি করতে পারে এবং করছে।

এই উপলব্ধি ও বিভক্তিকে দূর করে সমগ্র জাতির বৃহত্তর স্বার্থে একসূত্রে, একটি বন্ধনে আনাটাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। দীর্ঘ ২১ বছর যে রাজনৈতিক অপশক্তি এদেশের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার চেতনা ও ইতিহাস এবং জাতির পিতার নামটিকে ভুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল তাদের কারসাজি থেকে দেশবাসীকে মুক্তি দিতে পারে কেবল দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আজ সে দায়িত্বটুকু পালন করে যাচ্ছেন তাঁর পিতার এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল শহীদ ও জীবিত সংগ্রামী জনতার আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার কঠিন সংগ্রামে ব্রতী হিসেবেই-একথাই বিশ্বাস করতে চায় জাতির বিবেক। বর্তমান সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৭ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি তাঁর ওপর ভরসা ও আস্থা রাখার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। জনগণ তাঁর প্রতি আস্থা রেখেছেন বলেই তিনি একটানা তৃতীয় মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারছেন। দেশকে তিনি বহুদূর এগিয়ে নিয়েও গিয়েছেন, কিন্তু আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে হবে, বিশেষ করে মানুষে-মানুষে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে তার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। ধনী আরও ধনী হবে-সুবিধাভোগীরা আরও সুবিধা নেবে, রাজনীতির নামে, ধর্মের নামে, শিক্ষার নামে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত প্রভাব-প্রতিপত্তি তৈরির মাধ্যমে সমাজে মিথ্যাচার, দুর্নীতি, অপরাধমূলক কর্মকান্ডের প্রসার ঘটবে-এ অবস্থা দেখতে চায় না জাতি। এদেশের মানুষ শান্তিকামী ও ধার্মিক এবং তারা ধার্মিক ও শান্তিকামী হয়েই থাকতে চায়। কিন্তু দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের দৌরাত্ম তৈরি হলে সেখানে ধর্মজীবীদের দৌরাত্মও বেড়ে যায়, অসহিষ্ণুতা সমাজকে গ্রাস করে। এর পরিণতিতে অনৈক্য, বিভেদ, বিশৃঙ্খলা ব্যক্তি, পরিবারও সমাজ জীবনকে দূর্বিসহ করে তোলে যার কারণে সকল অগ্রগতি ও উন্নয়ন চাপা পড়ে যায় যা কখনো কাম্য হতে পারে না। এই অবস্থায় বাঙালি জাতিরাষ্ট্র এই বাংলাদেশের সকল জনগণকে এক সূত্রে, এক বন্ধনে রাখার জন্য আজকের দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তি বিরাজমান সকল সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন-সেটাই আজ সচেতন ও বিবেকবান মহলের প্রত্যাশা।  ‘এক’-এ থাকার মধ্যেই সকল শান্তি নিহিত।

ধর্মের নামে…. – ১৬


সংলাপ ॥ আজকের ধর্মনেতাগণ, আলেমগণ কী করছেন, তাদের কি কোন দায়িত্ব নেই? এত বড় একটি বিশাল সংবাদ তথ্য, যা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে মানুষের জন্য, তা কেবল গুনগুন সুরে পড়ে পড়ে মুখস্থ করে অক্ষওে অক্ষরে ছোয়াব পাবার আশা দিয়ে কেন মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে? যেখানে কোরান বুঝে পড়ার জন্য এবং সে অনুযায়ী চলার জন্য বিশেষ নির্দেশ এসেছে সেখানে একটা অক্ষর পাঠ করলে দশটি নেকি হবার গুজবটা কে ছড়ালো? কোরানকে এত বড় অবহেলায় কে ফেললো? সুরা আনআমের ৩৮ নং আয়াতে পড়লে দেখা যায় – এ কিতাবে কোন জিনিসের বিবরণ বাদ দেয়া হয়নি। অথচ আমরা চাল রেখে তুষ নিয়ে কামড়াকামড়ি করছি। আবার কেউ এসবের ধারে কাছেও থাকছি না। সুরা আনফালের ২২ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতর জীব হচ্ছে তারাই, যারা মুক ও বধির, যারা মোটেই বুদ্ধি খাটায় না-একথা সত্য সুনিশ্চিত’ – মানুষ জন্মগতভাবে মুক বা বধির হতে পারে তবে এখানে তাদের কথা বলা হয়নি। যারা জানে অথচ পালন করে না, শোনে অথচ মান্য করে না তারাই নিকৃষ্ট। তাদের হৃদয়েই রয়েছে রোগ ব্যাধি। সুরা বাকারার ৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ তাদের মন ও কানগুলোর উপরে মোহর করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখগুলোর উপর পর্দা পড়ে গেছে, তাদের জন্য কঠোর সাজা রয়েছে।’

কোরানে ‘দ্বীন’ বলতে যা বোঝানো হয়েছে আমাদের সমাজে সে দ্বীনকে ধর্ম বলা ঠিক হবে না। সমাজে দ্বীন নেই। আছে মানুষের তৈরি কিছু লোকাচার যা উপধর্ম নামে খ্যাত। দ্বীন আর আমাদের ধর্ম এক মানলেও কার্যত এক নয়। কোরানের দ্বীন আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় এবং সমাজের লোকাচার ও উপধর্ম কোন পুণ্যের কাজ নয়। এগুলোকে ক্ষেত্র বিশেষে আঞ্চলিক সংস্কৃতি বলা যেতে পারে যা মানুষকে সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।

দ্বীন বলতে শান্তি বুঝায়। শান্তি বলতে সর্ব বিষয়ে সর্ব দিকের শান্তি বুঝায়। আজ কি তা আছে? নেই। তবে দ্বীন! দ্বীনও নেই। আছে কী? উপধর্ম আর ব্রতপ্রথা যা নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই-বিভক্তির শেষ নেই। আমরা দ্বীন শব্দ কোরানের কোথায় কী অর্থে ব্যবহার হয়েছে তার একটি লেখচিত্র তুলে ধরবো। দ্বীন শব্দটি যেখানেই এসেছে সেখানে- আলিফ লাম সংযোগে এসেছে। আলিফ লাম দিয়ে নির্দিষ্টকরণ (মারেফা-যা ইংরেজীতে ‘দি’-এবং বাংলায় টি, টা, খানা, খানি) করা হয়েছে। সুতরাং আদদীন শব্দের অর্থ হলো বিশেষ দ্বী বা একমাত্র দ্বীন বা একমাত্র বিধি-বিধান।

দ্বীন শব্দের সাথে – ‘ইয়াওম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অনেকে ‘ইয়াওম’ শব্দের অর্থ ‘দিন’ লিখে থাকেন। কিন্তু এর অর্থ দিন নহে। এর অর্থ হচ্ছে ‘অনির্দিষ্ট কাল’ বা ‘সময়’। এটা এক মুহূর্তও হতে পারে অথবা যুগ যুগও হতে পারে। দিন ও রাতের সময় মিলিয়ে চব্বিশ ঘন্টাকে ইয়াওম বলা হয়। ‘আদদীন’ অর্থ বিধানটি। অর্থাৎ মানব রচিত সকল বিধানের বহির্ভূত আল্লাহর একক বিধান যার কোন পরিবর্তন হয় না, যার মধ্যে মানবীয় বল প্রয়োগ করা যায় না। তিনি সেই অখন্ড একক বিধানের কালের রাজা। মৃত্যুর পূর্বে এ সকল বিধানের উপর হস্তক্ষেপ করা স্রষ্টার নিয়ম বহির্ভূত। দিন-এর আরবী শব্দ নাহার। দ্বীনের অর্থ বিধি-বিধান। এ জন্য সুরা ফাতেহায় বলা হয়েছে বিধি-বিধানের মালিক অর্থাৎ রাজা। এই দ্বীনের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পর্যায় হচ্ছে ইসলাম। অর্থাৎ শান্তি-যা দ্বারা আমরা স্রষ্টার বিধি-বিধানকে শান্তির বিধান বলে মনে করি। কোন কোন স্থানে দ্বীন দ্বারা মিমাংসার মাধ্যম বুঝানো হয়েছে। কোন স্থানে কর্মফল, সুদৃঢ় পথ, জীবন ব্যবস্থা, দাসত্ব ও উপাসনা, পথনির্দেশ, রাজকীয় আইন, আল্লাহর প্রাধান্য, প্রভূত্ব স্বীকার, আদেশ পালন, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি বুঝায়। তাছাড়া একটা কথা বলা আবশ্যক যে, আলিফ ও লাম সংযোগে যেখানে দ্বীনের কথা বলা হয়েছে-সেখানে আল্লাহর বিধি-বিধান যা মানুষের অবশ্য সুনির্দিষ্টভাবে করণীয় এবং পালনীয় বিষয়রূপে বলা হয়েছে। এই দ্বীন এখন এক অর্থে অনেকেই ব্যবহার করছেন যেটা উচিৎ নয়। কারণ দ্বীনের নামে যা চালানো হচ্ছে তাতে ধর্মের গন্ধও নেই। অনেক কিছু এসে ধর্মের ক্ষেত্রে ঠাঁই নিয়ে দ্বীনের কাঁধে ঝোলার চেষ্টা করছে। সমাজে ধর্মের নামে যা চালু আছে তার ৯৯% ভাগই ধর্ম নয়, লোকাচার বা উপধর্ম যার অধিকাংশই মানুষের মনগড়া অস্থিতিশীল আচার মাত্র। এগুলো মূল দ্বীনকে ঢেকে ফেলছে। মানুষ তার সত্তাগুণের মাধ্যমে স্রষ্টার দ্বীনে জীবন পরিচালনা করবে, শান্তিতে তার প্রয়োগ ঘটাবে এটাই স্রষ্টার চাওয়া যা মানুষ দিচ্ছে না। বুঝতে চেষ্টা পর্যন্ত করছে না। (চলবে)

উপলব্ধি পর্যবেক্ষণ যার তিনিই হন লিডার

মিরপুরে ‘জ্যোতি ভবন’-এ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের ১০ম পর্ব


সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে আলোচনার ১০ম পর্ব ২০ পৌষ ১৪২৬, ৪ জানুয়ারি ২০২০  শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’ এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদের সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাহাখাশ সভাপতি শাহ্ শাহনাজ সুলতানা, মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের যুগ্মসচিব শেখ বরকত উল্লাহ  রানা এবং সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য মমতাজ বেগম। আলোচনা পর্বটির সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু। 

শাহ্ শাহনাজ সুলতানা হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন ‘লিডারশীপে কোন আপোষ নাই। কর্মে কোন আপোষ নাই। এখানেই পর্যবেক্ষণ, এখানেই ডিসিশন মেকিং। লিডার সবাই হতে পারেনা। যার উপলব্ধি আছে, যার পর্যবেক্ষণ আছে, যার ফার্ম ডিটারমিনেশন আছে যে, আমি ঐখানে যাবোই। তিনিই হতে পারবেন’। উপলব্ধি কি? সত্যমানুষ বলছেন- ‘উপলব্ধি হচ্ছে প্রাপ্তির সৌন্দর্য। উপলব্ধি হচ্ছে বোধ। বোধ মানে জ্ঞান। এক পরিপূর্ণ জানার নাম জ্ঞান।’

কেউই পরিপূর্ণ কিছু জানতে পারে না। যে যতখানি জানতে পেরেছে সে ততখানি ঐ বিষয়ে জানেন। খুব কষ্ট করতে হয়না এ বিষয়গুলো বুঝার জন্য। কারণ প্রতিটি মানুষ তার নিজের কাছে ধরা থাকেন। একমাত্র তিনিই বলতে পারেন না আসলে আমি কি? এবং তিনি কতটা আলো আর কতটা অন্ধকারের যাত্রী। বাইরে একজনকে তার সার্বিক আচার আচরণ দেখে কোন উপসংহার টানা যায়না। দীর্ঘদিন একসাথে বসবাস করেও একজনের মনের খবর কেউ ঠিকঠাক মত বলতে পারে না। এক অচিন নগরের মানুষই থেকে যায় পরস্পরের কাছে। সুতরাং নিজকে নিয়ে এই রহস্যময়তা ঠিক তখনই কাটবে যখন সে নিজেকে বুঝার পথে চলতে চেষ্টা করবে এবং চলবে। নেতৃত্ব যার বেশির ভাগ অংশ আসে জন্মগতভাবে, কিছুটা আসে অর্জন বা চেষ্টার মাধ্যমে। অথবা কারো আশু লক্ষ্য পূরণের জন্য যখন জীবনের মোড় একটা ভিন্ন দিকে ঘুরে যায় তখন সে লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে কর্মপরিধি পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হয়্। কিন্তু সেখান্ওে থাকতে হয় অধ্যবসায় আর কাজের প্রতি ভালোবাসা। অধ্যবসায় ভালবাসা-এগুলো আসবে যদি ব্যক্তির মধ্যে সে বিষয়ে এক প্রেরণা যোগায়। অর্থাৎ আমি এটাকে চাই এবং ওই পর্যন্ত যাবোই। এর জন্য যা যা দরকার নিজেকে প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে যাবতীয় উপাদান সংগ্রহ করে কর্ম সম্পন্ন করতে হয়। আসলে বিষয়টা হচ্ছে আমি সন্তুষ্ট কিনা? সত্যমানুষ সান্নিধ্য পেলে একজন মানুষ পরিবর্তনের পথে চলে এর কারণটা কি? কারণ সেখানে নিজকে নিয়ে খেলা চলে। নিজের মধ্যে হাজারো চিন্তা ভাবনা একজনকে কীভাবে চালিত করে তার বিশৃংখল জীবনধারণ বলে দেয়। কথার অপচয়, চিন্তার অপচয়, কথা শোনার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণহীনতা, দেখার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণহীনতা সবকিছুই তাকেই দিশাহারা করে ফেলে। বস্তুত সে একজন মানুষ হয়েও স্বনির্ভর হতে পারেন না। যিনি স্বনির্ভর হতে পারেননা তিনি কি করে লিডার হবেন?  স্বনির্ভরতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা আনবে। সুতরাং সব প্রাপ্তি যে সৌন্দর্য নিয়ে আসবে এমন কোন কথা নেই। যে খানে সন্তুষ্টি থাকবে সেখানে সৌন্দর্য থাকবে। ব্যক্তিও তার কর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকবে।

পর্যবেক্ষণ কখন আসে? একজন লিডার কাকে অনুসরণ করে তার পথ পরিক্রমা সাজাবে এটা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে এসে তার পরিকল্পনা তার সিদ্ধান্ত তখনই দৃঢ়তা পাবে অথবা তার মধ্যে নিশ্চয়তা কাজ করবে যখন তিনি এটাকেই ধ্রুব হিসাবে গ্রহণ করবেন। যার কারণে দেখা যায়, ইতিহাসের পাতায় বড় বড় সুযোগ উপেক্ষা করে বহু নেতা বাধাবিপত্তির মধ্যেও অটল থেকেছেন কখনো দেশপ্রেমকে কেন্দ্র করে, কখনওবা কোন ব্যক্তির আদর্শকে কেন্দ্র করে। আদর্শকে ভালবাসতে হলে পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। এটা প্রাণশক্তি হিসাবে কাজ করে। পর্যবেক্ষণই একজনকে উপলব্ধি থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়। পর্যবেক্ষণ কর্মের একটা পদ্ধতি যেখানে সচেতনতা যতœ লাগে-বলা যায়, ব্যক্তির সামর্থ্য। সামর্থ্য হচ্ছে মনোযোগ দেয়ার বা লক্ষ্য রাখার। একটা মুমূর্ষু রোগীকে যখন পর্যবেক্ষণে রাখা হয় তার স্থান হয় একটা নির্দিষ্ট কক্ষে। সকলের সাথে এ ধরণের রোগীকে রাখা হয়না। রোগীর কেয়ার এখানে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ এবং লক্ষ্য থাকে তাকে সুস্থ্য করে তোলা। পর্যবেক্ষণ শব্দটার সাথে দৃষ্টিশক্তির সম্পর্ক গভীর। দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা বলা যায় এটা মূল শব্দ। চিন্তনপীঠ বলছে- ‘দেখাই আমার সাধনা’। শুধু দেখলে চোখের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়না। লেগে থাকলে তা দর্শনে রপান্তরিত হয়্। আদর্শভিত্তিক পথ চলায় পর্যবেক্ষণ আসলে নিজের প্রতি পর্যবেক্ষণই মূল কথা। কর্ম আর চিন্তার সমন্বয় বুদ্ধিমানের কাজ- সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী। কর্ম চিন্তার সমন্বয় ঘটাতে গেলে একাগ্রতা প্রয়োজন। সবকিছু মিলিয়ে দেখা যেতে পারে নিজের মধ্যে নিজ পরবাসী কিনা? দায়বদ্ধতা আসবে নিজের প্রতি স্বচ্ছতা থাকলে। নিজের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস এসব গুণের অধিকারী করে তুলে। সৃজনশীল কর্ম করে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন।

শেখ বরকত উল্লাহ রানা বলেন, নেতার কৃতিত্ব ‘নেতৃত্ব’। একজন নেতা বা দলনায়ক বা পথপ্রদর্শক যা-ই বলা হোক না কেন তাঁর সার্থকতার অনেকটাই প্রকাশ পায় তাঁর নেতৃত্ব বা এঁর গুণে। ইংরেজিতে লিডারশিপ আর বাংলায় নেতৃত্ব বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষিত ও সংজ্ঞায়িত। বিভিন্ন থিউরি দিয়ে একে ছকে ফেলা হয়েছে, আর সময়ের সাথে সাথে তা পরিবর্তিত হয়েছে। এর মানে নেতৃত্ব সর্বদা বর্তমান। এর রূপ, সংজ্ঞা, প্রকার ও অনুশীলন স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পরিবর্তিত ও আবর্তিত। পৃথিবী সৃষ্টির আদি থেকে এর প্রকাশ। সময় যত অতিবাহিত হয়েছে, মানুষের জীবন সমৃদ্ধ হয়েছে এ গুণের উন্নত সংস্করণ প্রয়োজন হয়েছে এবং এর পুরোভাগে পাওয়া গেছে স্রষ্টার প্রতিরূপ, কৃপাসম্পন্ন মহামানবকূল, জীবন অমৃতবিরাগ সাধককূল আর তাঁদের অনুসরণকারী সমাজসংস্কারক, গোত্রীয় নেতা, সমরবীর, রাষ্ট্রনায়ক, স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক, জনকল্যাণে অগ্রজ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ যাঁদের ইতিহাস রয়েছে, যাঁদেরকে ইতিহাস সফল নেতা বা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

নেতৃত্ব কি শুধু মানবজাতির মধ্যে? নাকি সৃষ্টির অন্যত্রও এর অবস্থান রয়েছে? জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগ্রতির কল্যাণে এটা এখন প্রমাণিত যে, সৃষ্টির সব প্রাণ জগতে নেতৃত্বের বৈশিষ্ট বহনকারী একটি গোত্র থাকে যারা এই দায়িত্বটুকু পালন করে থাকে। পিঁপড়া, মৌমাছি, হিংস্র বাঘ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সকল জীবের মধ্যে এই বৈশিষ্ট রয়েছে। প্রশ্ন জাগে নেতৃত্ব কি সহজাত? এটি কি জন্মগত? নাকি এই গুণের পরিস্ফুটন সম্ভব যথাযথ পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে? স্বাভাবিকভাবে নেতৃত্ব গুণ জন্মগত-একথা বলা গেলেও এমন কোনো গবেষণা নেই যা এই বক্তব্যকে প্রমাণ করতে পেরেছে। অনেক বিখ্যাত নেতার ঘরে জন্ম নিয়ে এবং নিজের ভেতর সেই নেতার  নেতৃত্বের বীজ নিয়েও  নিজ জীবনে সম্মুখ সারির কেউ হতে পারেনি এমন উদাহরণ অসংখ্য। অথচ সাধারণ বা অতি সাধারণ ব্যক্তির সময়ের প্রয়োজনে বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নেতৃত্বে উঠে আসার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পেছনে কিছু সংযোগ বা যোগ রয়েছে যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রকাশিত থাকে। যা প্রকাশ পায় তার বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোন সাধক বা সত্যমানুষের প্রেরণা, প্রচেষ্টা, অনুপ্রেরণা ও পরিশ্রমের ফলে প্রতিভাত হয় সুপ্ত গুণের যা সাধারণের জ্ঞানের বাইরে রয়ে যায় পরশ পাথরের সান্নিধ্যের অভাবে। 

ধর্মীয় বিশ্বাসে নেতৃত্ব গুণের বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্রষ্টা যেমন এক, নেতাও তিনি একা বা এক। কিন্তু আপাতদৃষ্টির নেতা বা নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন ব্যক্তি আর সত্যমানুষের নেতা বা নেতৃত্বের মধ্যে ব্যক্তিগত, প্রকাশগত ও অনুধাবণ বা পর্যবেক্ষণগত ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। সত্যধর্ম প্রচারকগণ শান্তি ও সত্য প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত। এর বিস্তারের জন্য কখনও তারা নিজেরা সবার সামনে থেকে দিকনির্দেশনা দেন। যেমন নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত)। যুগে যুগে সত্য প্রতিষ্ঠায় ও মানবতার বাণী প্রচারে অনেকেই প্রকাশিত এই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। তবে মূল পার্থক্য শীর্ষ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েও তাঁরা নিরহংকারী, সহজ-সরল-সর্বত্যাগী ও মানবসেবায় সর্বদা জাগ্রত। এই সত্যমানুষকূলের আরেক অবস্থান সবার ভেতরে বা পেছনে, তবে তাদের কর্ম ও লক্ষ্য এক। তখন তারা বেছে নেন কোন সাধককে, যিনি তাঁকে তৈরি করেন, প্রশিক্ষণ দেন এবং নিযুক্ত করেন নির্দিষ্ট কর্মে। তারা তখন নেতার প্রয়োজন পূর্ণ করে মানব-উন্নয়ন তথা সমাজ, দেশ ও জগতের কল্যাণ সাধন করেন। কিন্তু আসল কর্মকার গোপন থাকেন নিজ ভূবনে।

তবে সব দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিই যে আদিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে পারে তা নয়। কেউ প্রথম অর্জনের পরেই হয়ে যায় অহংকারী বা তিনি আত্মতুষ্টিতে ভুগেন এবং তখনই ঘটে পরিবর্তন। এরূপে সত্যমানুষ নিজে নেতা ক্ষেত্র বিশেষে এক এবং বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গোপনে থেকে কর্মসাধনকারী। নেতা নির্লোভ, নিরহংকারী, স্বনির্ভরশীল, সমব্যথী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, মানবতাবাদী, সর্বদা আস্থাশীল ইত্যাদি। তবে সত্যমানুষ এসবের আরও উর্ধ্বের। কারণ, তাঁর যোগ ‘এক’ এর সাথে এবং তাঁর ব্যপ্তি সর্বত্র। তাই যারা তাঁর নেতৃত্বের ছায়া পায় তারা ভাগ্যবান।

জাগতিক নেতা বা নেতৃত্বের সাথে ধর্মীয় বা হাক্কানী অভিভাবকের সার্বিক অবস্থান তুলনীয় নয়। হাক্কানী অভিভাবকের সাধনা, ব্যপ্তি, স্থান, অবস্থান শুধু রহমতপ্রাপ্ত কেউ বা খুবই অল্প কয়েকজনই জানতে পারে। তাঁর প্রকাশ খুবই কম, তাঁর দর্শন,আদর্শ ও জীবনাচরণ ভিন্নধারার। হাক্কানী আদর্শে চিন্তা, অনুশাসন, পরিধি, বিধি-নিষেধ, নির্দেশ ও কর্মপ্রক্রিয়া যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও আধুনিক। তবে আধ্যাত্মিক জগতের নেতৃত্ব ভিন্ন। হাক্কানী দরবারে আমরা প্রধানত তিনজন সত্যমানুষের বাণী, জীবন-যাপন, চাল-চলন, ধর্ম ও পার্থিব জীবন বিষয়ে অবগত। তাঁরা প্রতিনিয়ত রত ছিলেন এমন মানুষ তৈরিতে যারা নেতৃত্ব দেবে মানুষকে প্রকৃত মানুষ করার কঠিন যুদ্ধে। কঠিন প্রশিক্ষণ, শাসন, পরিচর্যা ও বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে তৈরি করেন যোগ্য নেতার। সত্যমানুষ যাকে মনে করেন তাকে সম্মুখে বসান-পরীক্ষা করেন। যদি সফল হয় তবে টিকে যায় নয়তো আসে পরিবর্তন।

সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দীন যেমন একা একা পথ চলতেন আপন মনে আর এগিয়ে নিয়ে যেতেন অনুসারীদেরকে। সেই নেতৃত্বে নেই কোনো মোহ, মায়া, নেই জাগতিক কোনো চাওয়া-পাওয়া, তা শুধু বিলীন প্রেমাস্পদের মাঝে। তাই তো অকাতরে বিলিয়ে গেছেন তাঁর কৃপা আর করুণা। আর বেছে নিয়েছেন বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন কয়েকজনকে যারা তাঁর পথকে সম্বল করে এগিয়ে নেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এঁদের মাঝে সবিশেষ একজন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক যিনি পেলেন তাঁর মালিকের লেখা দুটি চিরকুট যাতে লেখা ‘আই  উইশ অল দ্য বেস্ট’। অর্থাৎ, তুমি পরীক্ষিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু এই নেতৃত্ব ভীষণ কঠিন। সব দিয়ে নিজেকে সমর্পণ করে ‘এক’ এর সাথে মিলবার প্রয়াস। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলতেন, দিনের পর দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাঁটা এবং না-খেয়ে থাকার পর মিলতো এক মুঠ মুড়ি বা পোকায় ভরা পুরনো একটা মিষ্টি। আর এই দিয়ে আবার জিজ্ঞাস করতেন, ‘কী, পেট ভরসে না?’। আনোয়ারুল হক কৃতজ্ঞচিত্তে বলতেন, ‘জি’। নিজের বিশাল সম্পত্তি ছেড়ে নিঃস্ব হয়ে এ পথে চলতে চলতে তিনি হয়ে উঠেন অসীম সম্পদের মালিক। কারণ, তাঁর মালিকের কৃপায় তিনি অধিষ্ঠিত হন মহান দায়িত্বে। 

আর এই প্রক্রিয়ার মাঝেই শুরু হয় পরবর্তী সবিশেষ খোঁজার পালা, আর সন্ধানে আসেন সূফী সাধক শেখ আবদুল  হানিফ। মামার কাছে শোনা-তাঁর হুজুর তাঁকে নিয়ে গেছেন আবু আলী আক্তার উদ্দিন-এঁর কাছে। তিনি বসে আছেন চৌকিতে আর মামাকে তাঁর হুজুর হুকুম করলেন মেশকে আম্বর দিয়ে কান্দুলিয়ার মৌলভির পুরো শরীর মেখে দিতে। মামা হুকুম পালন করছেন আর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক দূরে দাঁড়িয়ে হাসছেন। কাজ শেষে মামার সামনে চা এলো। বলা হলো-‘দয়াল চা নেন’। মামা বিস্মিত হয়ে বললেন, এটা মনে হয় অন্য কারও জন্য। চা বাহক বললেন, হুজুর বলেছেন ‘দয়ালকে চা দেন এবং আপনাকেই দেখিয়েছেন।’ অর্থাৎ, নির্ধারিত হলো পরবর্তী নেতৃত্ব।