ভিতরের পাতা

হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে তৃতীয় পর্বের আলোচনা একরৈখিক কর্মে নিমগ্নতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

মহান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে তৃতীয় পর্বের আলোচনা গত ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’এর  আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদের সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খাইরুল মোস্তফা,মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব মিসেস হামিদা নার্গিস ও সদস্য শেখ বরকত উল্লাহ রানা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধ ক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

মিসেস হামিদা নার্গিস বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ আর ‘অনিয়ন্ত্রণ’-এ দুটি শব্দ। ‘নিয়ন্ত্রণ’ অর্থ সংযম, সংকোচন, আমল, বারণ, প্রতিজ্ঞা, ইংরেজিতে কন্ট্রোল, রুল, ডিটারমিনেশন বা কন্ট্রোল-সিস্টেম। নিয়ন্ত্রণ’ জীবনকে সংগঠিত করে। দৈনন্দিন জীবনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ একটি অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনের জন্য নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। গুরুকেন্দ্রীক জীবনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ একটা ব্যবস্থাপত্র- গুরুর আশ্রয়ে থেকে তাঁর দেওয়া নির্দেশিত কর্মটি বার বার অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করার ব্যবস্থাপত্র। সাধারণ মানুষ ভুল করেই থাকে। তিন মহান সাধকের জীবনের সকল কর্মের মর্মকথাই হচ্ছে ‘নিয়ন্ত্রণ’। আমি কি, কে, কেন-অর্থাৎ, নিজেকে  জানা, বুঝা এবং চেনার চেষ্টায় রত থাকা এবং পর্যবেক্ষণ,ধৈর্য্য-ধারণ, ত্যাগ ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণে থাকা যায়। আবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নের জন্য সর্বদা গুরুর সাথে সংযোগ রেখে লক্ষ্যমুখী কর্মে একরৈখিকভাবে নিমগ্ন থাকা, সিদ্ধান্তে অটল থাকা, দ্বিচারিতা, ছলনা, প্রতারণা ও অভিনয় পরিহার এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রয়োজনে নিজেকে পরিবর্তন করে প্রাপ্তির সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। দুনিয়াদারি এবং আধ্যাত্মিক জগৎ-উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। কর্মে একরৈখিকভাবে নিমগ্নতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। সচেতনতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পবিত্রতা নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনের অবলম্বন। এ ক্ষেত্রে সাধকের মূল্যবান মূল্যবান বাণী হচ্ছে-১.‘নিজের চোখকে আয়ত্তে আনো, সাধনার পথে এগিয়ে যাও’, ২. ‘কষ্ট এবং ক্ষতির পরে মানুষ বিনয়ী ও জ্ঞানী হয়’, ৩. ‘ভোগের আনন্দ সাময়িক, ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন,’ এবং ৪. ‘মানুষ যদি হতে চাও তবে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করো।’  

শেখ বরকত উল্লাহ রানা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি শুনলে প্রথমেই মনে হয় সীমার কথা। সংযম, প্রয়োজন অনুযায়ী বা অবস্থা বা বাস্তবিকতায় যথাযথ প্রয়োগ ও প্রয়াস একে বিশ্লেষণে সহায়ক। নিয়ন্ত্রণ থেকে আসে নিয়ন্ত্রণকারী ও নিয়ন্ত্রিত-এ দু’টি সত্তা। আবার এই দুই সত্তা যখন এক হয়ে যায় তখন হয় নিয়ন্ত্রণের অভূতপূর্ব ক্ষমতার স্বরূপ-মহানন্দ।

বাঁধভাঙ্গা ভালোবাসা, প্রেম, ভক্তি, নিবেদন বা সমর্পণ কি ভালো? না কি লাগাম ধরে ক্ষেত্র অনুযায়ী এর কম বা বেশি করা বুদ্ধিমানের কাজ? ¯্রষ্টার উচ্চারণ-‘সীমা অতিক্রম করো না, সীমা অতিক্রমকারীকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না।’ স্রস্টার বেঁধে দেওয়া সীমা প্রচারে জগতের শুরু থেকে শেষ অবধি তাঁর প্রতিনিধি আসতে থাকবেন। যারা জীবন ও জগতের নিয়ন্ত্রণ রেখার সীমার সম্যক জ্ঞান প্রচার ও অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণে সর্বদা ব্যস্ত। এ সীমারেখা প্রকৃতি ও জীব সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জীবন-যাপন, ধর্মাচরণ, পারষ্পরিক সম্পর্ক, বিধি-নিষেধ সবকিছু নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নিয়ন্ত্রণ অধীন। তবে সময়ের সাথে পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতায় এর ব্যাপ্তি কম-বেশি হয়।

সীমারেখার ব্যাপ্তি শরীয়ত, তরিকত ও মারেফত জগতে পরিলক্ষিত। সাধারণত ব্যক্তি আপন মালিক বা গুরু বা প্রেমাষ্পদ হতে কৃপা গুণে সর্ব পর্যায়ে সম্যক জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রিত জীবনাচরণ পদ্ধতি অনুসরণ ও অনুশীলনে রত। কিন্তু প্রেমের আরও পরে ভাব স্বভাব উপস্থিতিতে আদৌ কোনো নিয়ন্ত্রণ রেখা থাকে কিনা প্রেমিক ও প্রেমাষ্পদের মাঝে তা তাঁরাই বলতে পারবেন যারা সেখানে গেছেন।

‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়টিকে দরবারকেন্দ্রিক করে এর তাৎপর্য অন্বেষণ করা যায়। হাক্কানী এক বিশাল সাম্রাজ্য। এর ভেতরে ডুব দিলে ‘নাই বলে কিছু নেই।’ আমার চোখে দেখা মহান দুই সাধকের সংষ্পর্শ ছোট সময় থেকে তাঁদের কৃপায় একটু একটু করে চোখ মেলে, হৃদয় দিয়ে, সচেতনতা আর উপলব্ধির রাস্তা দিয়ে যতটুক দেখেছি, শিখেছি বা দয়াপ্রাপ্ত হয়েছি তা একটি নির্দিষ্ট পন্থায় বাঁধা। কিন্তু সেটি সবার জন্য এক রকম হয় না। আমরা যাকে ‘কাস্টমাইজেশন’ বলে জানি তার প্রয়োগ যুগে যুগে হাক্কানী সাধকরা করে গেছেন। সবাইকে তার অবস্থা ভেদে তৈরি করার যে প্রক্রিয়া তা সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তাইতো কেউ হয় নানাভাই, কেউ দাদাভাই, কেউ মামু ইত্যাদি। কর্ম, শিক্ষা, অন্তর্দৃষ্টির উম্মিলন, মানবতায় জাগ্রতচিত্ত, বর্তমানের মূল্য, আদব ও  পরিমিতিশীলতার প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা দেওয়া হয়। মামার ভাষায়, হাক্কানীরা সাধকরা চাষ করতে জানেন। তাই মাটি হাতে নিয়েই বলতে পারেন আদ্যোপান্ত। এখানে সবার জন্য জন্য রাস্তা উন্মুক্ত হলেও প্রকৃত পথিক খুবই অল্প। যারা হন তারা নিয়ন্ত্রণাধিনতার শিকল ছিঁড়ে নিয়ন্ত্রণ করার কঠিন ব্রতে ব্রতী হন।তারা হন স্থিরচিত্ত, লক্ষ্য অর্জনে একনিষ্ঠ এবং সমপর্যায়ে, সর্বাবস্থায় পরিমিত জ্ঞানসম্পন্ন। মামা বলতেন-অন্বেষণে থাকুন, উত্তর আসবেই। সাধকগণের বাণীতে বারবার শরীর ও চিন্তাজগতের অবশ্য করণীয়, বর্জনীয় তথা সম্যক নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ রয়েছে। আগের যুগে সাধকগণ নির্জনে যেতেন একনিষ্ঠভাবে, বাহ্যিক প্রভাব ও মানবিক অপ্রয়োজনীয় স্বভাবগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ‘এক’এর সন্ধানলাভের পথে অগ্রসর হতে। একই পথে হাক্কানীতে এসেছে ৫টি পন্থা মেনে চলার নির্দেশনা- নিয়ন্ত্রিত খাবার, নিয়ন্ত্রিত ঘুম, নিয়ন্ত্রিত কথা, নিয়ন্ত্রিত মেলামেশা এবং নির্জন রাতে স্মরণে নিমজ্জিত হয়ে প্রেমাষ্পদের সাথে একাত্ম হওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া। অতিরঞ্জন, চাটুকারিতা, লোকদেখানো আচার-আচরণ হাক্কানীতে সম্পূর্ণ পরিহার্য। শুধু কর্ম, সচেতনতা, একনিষ্ঠতা আর ‘এক’-এর লক্ষ্য নির্ধারণই প্রকৃত হাক্কানী হবার পথের যাত্রীদের মূল সম্বল।

 নিয়ন্ত্রণ প্রতিটি অঙ্গের জন্যই প্রযোজ্য। চোখের দৃষ্টি, মনের কৃপ্রবৃত্তি ও কুচিন্তার বশবর্তী না হওয়া সবই সাধনা। অযাচিত বা অসংলগ্ন প্রেম বা ভক্তির চেয়ে জ্ঞান ও  বিচক্ষণতাপূর্ণ ও সময়োপযোগী কর্মই বেশি মূল্যবান। মহাসৃষ্টির সব কিছ্ইু নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলে। পবিত্র কুরআনে যেভাবে বলা আছে- ‘চন্দ্র ও সূর্য একে অপরকে অতিক্রম করে না।’ অর্থাৎ, প্রকৃতি ও সৃষ্টির সবই তাদের গন্ডির মধ্যে চলমান। যখনই মাত্রা অতিক্রম হয় তখনই ঘটে প্রলয় বা দুর্যোগ। শরীর জগতেও সব উপাদান আর সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যথাযথ থাকা মানেই সুস্থ সুন্দর জীবন। কিন্তু যখনই ব্যত্যয় ঘটে তখনই শুরু হয় ‘ব্যধি’ নামক বিভিন্ন রকম কষ্টের সূচনা। অথচ ‘নিয়ন্ত্রণ’এর মাধ্যমেই সম্ভব খাদ্যাভ্যাস, কার্যাভ্যাস ও মনোজগতের পরিশীলন দিয়ে সাধারণ মানুষের সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন। যারা সাধনার পথের যাত্রী তাদের জন্য নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব অযাচিত মোহ, রাগ, দুঃখ-যন্ত্রণা, ঘৃণা-পাপাচার, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা প্রভৃতি ত্যাগ করে সত্য অন্বেষণে ব্রতী হয়ে গুরুলাভে অনুরাগী হতে হয়। হাক্কানী চিন্তনপীঠের – ভালো লাগা, ভালোবাসা, প্রেম-শ্রদ্ধা-ভক্তি, ভাব-মহাভাব- এই স্তরগুলো বিভিন্ন ভাবে বেষ্টিত রয়েছে বিভিন্ন বিষয়-আবর্তে। এক্ষেত্রে যথাযথ পরিচালনাই এসব স্তরকে সঠিকভাবে উত্তরণে নিশ্চয়তা দেয়। সাধনা হেলাফেলায়  বা ইচ্ছামত কিছু করেই পরিপালন হয় না। গুরুর নির্দেশ ও উপদেশ, তাঁর শিক্ষা ও দীক্ষা, সীমার ধারণা আর নিজেকে জানার মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়াই হলো সার্থকতার পরিমাপক। জাগ্রতচিত্ত, নিয়ন্ত্রিত ও সম্যক জ্ঞানসম্পন্ন শিষ্যই প্রকৃত শিষ্য ও গুরু ধারণে সক্ষম। লক্ষ্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ একরৈখিকতা থেকে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো। তাই বলা যায়, সাধক বা সাধনাপথ যাত্রী মাত্রই নিয়ন্ত্রণাধীন কার্য্যাদির ওপর পূর্ণ মাত্রায় সজাগ ও নিজের ওপর প্রয়োগ দ্বারা সবার জন্য আদর্শরূপ ব্যক্তিত্ব।

৭ ই মার্চ ও স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা

মো.ওয়াজিউজ্জামান ॥ ইতিহাস তার নিজের স্বকীয়তায় এগিয়ে চলে। এই সভ্যতার সকল কীর্তি ইতিহাস তাঁর গর্ভে স্বদর্পে লালন করে চলেছে। সভ্যতা তাঁর প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে ইতিহাসের স্রষ্টাদের পদচিহ্ন রেখে যায়। সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জেনে নেয় সেই সব মানুষদের নাম, যাদের আত্মত্যাগ দিয়ে রচিত হয়েছে ইতিহাস। আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতীয় পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও একজন ইতিহাসজয়ী বীর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক কর্মকান্ডগুলোর মধ্যে ৭ই মার্চ অন্যতম ঐতিহ্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজ সারা বিশ্বে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক প্রামাণিক দলিল হিসেবে পরিগণিত। যাকে ইতিমধ্যে মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড, এর স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এ ভাষণ কে ঐতিহাসিকেরা বাঙালীর মুক্তির সনদ হিসেবে আখ্যায়িত করে।

কিন্তু ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই ৭ই মার্চ নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান যে উৎকন্ঠার মধ্যে ছিলো তা পূর্বের ও ৭ই মার্চ পরবর্তী সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ভার বহন করে। ২৫ মার্চ এর কালো রাত, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, মুজিবনগরের অস্থায়ী সরকার গঠন, এই ভূখন্ডের স্বাধীনতা এ সব কিছুই ৭ই মার্চের ভাষণের উপরই প্রতিষ্ঠিত।

এই ৭ই মার্চকে কেউ কেউ অভিহীত করে বাঙালীর মুক্তির সনদ, কেউ বলে স্বাধীনতার অমর কবিতা আবার কেউ বলে স্বাধীনতার মূল দলিল। কিন্তু আমি মনে করি ৭ই মার্চই ছিলো স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা।

ইতিহাসকে বিকৃত করার অধিকার কারো নেই। কিন্তু ইতিহাস থেকে নিগুঢ় সত্য উন্মোচন করার অধিকার সকলেরই আছে।

কি পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু সেদিন ভাষণ দিয়েছিলেন, আর এই ভাষণের কথাগুলো একটু চিন্তা করলেই আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারবো।

১৯৭০-এর ৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু ৭১-এর পহেলা মার্চ ১টা ৫ মিনিটে আকস্মিক এক বেতার ঘোষণা ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাংলাদেশ। ৩রা মার্চ পল্টনে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন,

‘আমি থাকি আর না থাকি, বাংলার স্বাধীকার আন্দোলন যেন থেমে না থাকে। বাঙালির রক্ত যেন বৃথা না যায়। আমি না থাকলে-আমার সহকর্মীরা নেতৃত্ব দিবেন। তাদেরও যদি হত্যা করা হয়, যিনি জীবিত থাকবেন, তিনিই নেতৃত্ব দিবেন। যে কোনো মূল্যে আন্দোলন চালাইয়া যেতে হবে-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু আগেই ঘোষণা করেছিলেন, ৭ই মার্চ রোববার রেসকোর্স ময়দানে তিনি পরবর্তী কর্মপন্থা ঘোষণা করবেন। ৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ সকাল ৬টা পর্যন্ত সারা দেশে হরতাল পালনের আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু।

এই আন্দোলনমুখর পরিস্থিতিতে ঘনিয়ে এল ৭মার্চ। ভাবিয়ে তুলল পাকিস্তান সামরিক চক্রকেও। কারণ তারা বুঝে গেছে, বাংলাদেশের মানুষের ওপর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। দেশ পরিচালিত হচ্ছে শেখ মুজিবের কথায়। চিন্তিত পাকিস্তান সামরিক চক্র কৌশলের আশ্রয় নিল। ৬ মার্চ জে. ইয়াহিয়া খান টেলিফোনে কথা বলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে, তিনি (বঙ্গবন্ধু) যেন এমন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন, যেখান থেকে ফিরে আসার উপায় না থাকে।

৭ মার্চ রেসকোর্সে জনসভায় বক্তব্য কী হবে, এ নিয়ে ৬ মার্চ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দীর্ঘ বৈঠক হয়। এক পক্ষের মত, বঙ্গবন্ধু যেন জনসভায় সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। অপরপক্ষ স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণা পরিহার করে আলোচনার পথ খোলা রাখার পক্ষে। সভা ৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত মুলতবি রইলো। ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের চরমপন্থীরা বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চের জনসভায় স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহযোগী গোলাম মোরশেদ গাড়ি চালাচ্ছিলেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে বের হয়ে তাকে বঙ্গবন্ধু বলেন, সাত মসজিদ দিয়ে চলো। তখন সাত মসজিদ রোড দিয়ে জিগাতলা হয়ে রেসকোর্সে রওয়ানা হন তিনি। রওয়ানা হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন নেতাকর্মীকে ডেকে বলেন, ইশতেহারটি সাংবাদিকদের মাঝে বিলি করবে। তার গাড়ি যখন জিগাতলার কাছে তখন গোলাম মোরশেদ বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আজ কী বলবেন?’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু জানিয়েছিলেন, আল্লাহ আমাকে দিয়ে যা বলাবেন, তাই বলব।

ভীতসন্ত্রস্ত পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দপ্তর থেকে বিভিন্নভাবে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে এই মেসেজ দেয়া হয় যে, ৭ মার্চ যেন কোনোভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা না করা হয়। ৭ মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে কামান বসানো হয়। এমনকি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়।

মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু স্যালেন্ডার’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ নেতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন,‘পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।

এমন এক কঠিন সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ মার্চ রেসকোর্সে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।

তাঁর ভাষণের কয়েকটি কথা ব্যাখ্যা কলে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরার আহ্বাণ ও স্বাধীনতার অঘোষিত ঘোষণা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়।

স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকার প্রধানের মতো এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইলো প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষকে চারটি শর্ত দিয়ে সবশেষে ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

অর্থাৎ, অতি সু-কৌশলে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা ও স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরার আহ্বান জানানো হয় এই ভাষণে। কিছু আন্তর্জাতিক পত্রিকাও তখন প্রকাশ করেছিলো, ৭ মার্চ শেখ মুজিব হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন।

৭১-এর ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার এবং ৬ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দেয়া হয়। ৬ মার্চ, ৭১ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (৭ মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।

তাছাড়াও ৭ই মার্চকে, কেউ সরাসরি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।

** সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘৭ই মার্চের ভাষণ আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল দলিল।’

** গ্রেট বৃটেনের সাবক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ বলেছেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে চির জাগরুক থাকবে। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।’

** রেসকোর্স ময়দানের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের পরপরই ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড লিখেছেন, ‘রোববার ৭ই মার্চ প্রদত্ত মুজিবের ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন, তার চেয়ে লক্ষণীয় হলো তিনি কি বলেননি। কেউ কেউ আশঙ্কা করছিলেন, আবার কেউ কেউ আশা করেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশকে সরাসরি স্বাধীন ঘোষণা করবেন। এর বদলে বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান তিনি জানালেন।

১৯৭৪ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শন ভ্যাকব্রাইড বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ভৌগলিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানুষের মুক্তি ও বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। সাম্য ও সম্পদের বৈষম্য দূর করাই স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে ঐ ভাষণেরই আলোকে।

** ১৯৯৭ সালেই এএফপি বলেছে, ‘৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যদিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালিদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে যান। ঐ ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের কৌশলও ছিল।

** ১৯৯৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, ‘শেখ মুজিব ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমেই আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ঐ ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের কৌশলও ছিল। 

** যুগোশ্লোভিয়ার প্রেসিডেন্ট যোশেফ মার্শাল টিটো বলেছেন, ৭ মার্চের ভাষণের তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এই ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিব প্রমাণ করেছেন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানিদের কোন রকম বৈধতা নেই। পূর্ব পাকিস্তান আসলে বাংলাদেশ।

** আরেকটি খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান OMICS-International an international resersch organization, তাদের ‘ওয়েব সাইটে’ উল্লেখ করেছে, শেখ মুজিব ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম. এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, বলে একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, আবার প্রদেশে (পূর্ব পাকিস্তানে) জনগণকে ‘অসহযোগ আন্দোলন, চালিয়ে যেতে বলেছেন; অন্যদিকে ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছন-যে যুদ্ধটি  কার্যত ১৮ দিন পর শুরু হয়েছিলো, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাঙালী জনসাধারণ, বুদ্ধিজীবি, ছাত্র-ছাত্রী, রাজনীতিবিদ এবং সশস্ত্রবাহিনীসমূহের সদস্যদের উপর অপারেশন সার্চলাইট, নামে আক্রমণ শুরুর পর হতেই।

তাদের ভাষায়: Sheikh Mujib proclaimed, `Our struggle is for our freedom. Our struggle is for independence’

(‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’)

He also announced the civil disobedience movement in the province, calling for `every house to turn into a fortress’ The war eventually began 18 days later, when the Pakistan Army launched Operation Searchlight against Bengali civilians, intelligentsia, students, politicians and armed personnel.

ইউনেস্কো তার ওয়েব পেজে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে বর্ণনা করেছে; The speech effectively declared the independence of Bangladesh. The speech constitutes a faithful documentation of how the failure of post-colonial nation-states to develop inclusive, democratic society alienates their population belonging to different ethnic, cultural, linguistic or religious groups. The speech was extempore and there was no written script.”

অর্থাৎ ইউনেস্কোর বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কার্যকর অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে।

ইতিহাস কখনো পুনরাবৃত্ত হয় না। কিন্তু ইতিহাসের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ঘটে এক ঘটনার গর্ভ থেকে আর এক ঘটনার জন্মলাভে।

২৫ মার্চের কালো রাতে স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার কারণে ২৬ শে মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ এর ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যা দ্বারা প্রকাশিত হয় ৭ই মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা সরাসরি না হলেও স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা ৭ই মার্চ এর ভাষণেই উজ্জ্বল রূপে দৃশ্যমান। অর্থাৎ এ কথা অনস্বিকার্য যে সরাসরি না হলেও স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়ে গেছে ৭ই মার্চের মহাকাব্যে।

জয় বাংলা,

জয় বঙ্গবন্ধু।

বিপদে ধৈর্যশালী হও, অন্যের দোষ ক্ষমা করো তাহলে তুমিও আল্লাহর দরবারে ক্ষমা পাওয়ার প্রার্থী হতে পারবে

ধৈর্য হচ্ছে – প্রফুল্ল চিত্তে সকল দুঃখ ও যন্ত্রণাকে বরণ করে নেয়া, প্রবল দারিদ্র্য আসলেও মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করা, বিপদকে আল্লাহর তরফ থেকে আসা নেয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা, দুনিয়াতে বিপদ বলতে কিছু নেই এ মনোভাব নিয়ে জীবন যাপন করা, কোন বিপদের সম্মুখীন হলে বিহ্বল না হয়ে, আল্লাহর সাথে বাদানুবাদে প্রবৃত্ত না হয়ে, অন্যের সাথে বিপদ সম্পর্কে আলোচনা না করে শান্ত থাকা, বিপদে অধীর না হয়ে এ সম্পর্কে সচেতন থাকা, আল্লাহ্ যে অবস্থায়ই রাখেন না কেন তাতে সন্তুষ্ট থাকা।

দুঃখ যেমন শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক স্তরে হয় তেমনি এ তিনটি স্তরেই ধৈর্য ধরতে হয়। শারীরিক স্তরে ধৈর্য হচ্ছে -শারীরিক দুঃখ-কষ্ট, ক্ষুধা, রাত্রি জাগরণ ইত্যাদি সহ্য করা। মানসিক স্তরে ধৈর্য হচ্ছে – মানসিক দুঃখ কষ্টে বিচলিত না হওয়া, প্রিয়জনের মৃত্যু কিংবা রোগ-ব্যাধিতে ব্যাকুল না হওয়া। আত্মিক স্তরে ধৈর্য হচ্ছে – প্রবৃত্তির তাড়না সংযত রাখা এবং ধনবান হয়েও তা প্রকাশ না করা।

ধৈর্য একটা স্থায়ী গুণ হিসেবে যার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় তিনি কোন অবস্থাতেই উচ্ছ্বসিত বা বিচলিত হয়ে উঠেন না। যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তার সাথেও তিনি সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন,যে তাকে বঞ্চিত করে তাকেও তিনি দান করেন;যে তার প্রতি জুলুম করে তার প্রতিও তাঁর প্রেমভাব থাকে।

আমরা স্থুল দৃষ্টিতে যেসব অপ্রীতিকর বিষয়কে বিপদ বলি সেগুলোও আসলে বিপদ নয়। পরোক্ষভাবে এগুলো আল্লাহর তরফ থেকে আসা এক ধরনের নেয়ামত। কেননা, বিপদের মধ্য দিয়েই আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয় তাদের প্রতিই আল্লাহ সন্তুষ্ট হন।

তাই বলা হয় যে কুরআনের দুটি আয়াতের মধ্যেই সূফী সাধনার মূল তত্ত্ব বিশ্লেষিত হয়েছে। ‘তুমি যা চাও তা পেলে আনন্দে আত্মহারা হইও না, আবার তুমি যা চাও না তা পেলে দুঃখে রোদন করো না।’ (৫৭ সুরা হাদিদ : ২৩)। আল্লাহ বলেন – আমি ধৈর্যশীলদের সাথে আছি (২ সুরা বাকারা : ২৪৯), আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ কর। ( ১৩ সুরা রাদ : ২২)। এতে বুঝা যায় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ধৈর্য যে শুধু সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, ধৈর্য নিজেই সাধনার একটা পথ। অর্থাৎ অন্য সবকিছু বাদ দিয়েও শুধু ধৈর্য ধরতে পারলেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

ধৈর্য যখন সাধনার স্বতন্ত্র পথ তখন ‘বিপদে ধৈর্যশীল হও’ এ নির্দেশের তাৎপর্য এ নয় যে – বিপদ আসলে তবে ধৈর্যশীল হতে হবে। এ নির্দেশনার তাৎপর্য হচ্ছে -‘প্রথমে বিপদ সৃষ্টি কর, তারপর ধৈর্যশীল হও’। কিভাবে বিপদ সৃষ্টি করা যায়? যেমন, ঘরে যথেষ্ট খাবার থাকা সত্ত্বেও আমরা নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি যে পরিমাণ খাবার আজ রান্না হচ্ছে তা কি প্রয়োজনীয়? স্বাস্থ্যকর? যথেষ্ট উপাদেয় খাবার সামনে থাকা সত্ত্বেও নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি, যে পরিমাণ খাদ্য আমরা গ্রহণ করছি তার কতটুকু দৈহিক প্রয়োজনে আর কতটুকু সাময়িক মজার আকর্ষণে? এসব প্রশ্ন করলে বিপদ সৃষ্টি হবে এবং নিজের সৃষ্ট বিপদে ধৈর্য ধারণ নিজেকে সুস্থতার দিকে নিয়ে যাবে। এভাবে ক্ষুধা-তৃষ্ণায়, কামোত্তেজনায়, ক্রোধে, উস্কানীর মুখে নিজেকে প্রশ্ন বিপদ সৃষ্টি হয় এবং সৃষ্ট বিপদে ধৈর্যশীল হবার প্রচেষ্টা করা যায়। সূফীতত্ত্বে ক্ষুধায় ধৈর্য ধারণের নাম ‘ক্কানাআত’, যৌন উত্তেজনায় ধৈর্য ধারণের নাম ‘সচ্চরিত্রতা’, সংগ্রামে ধৈর্য ধারণের নাম ‘হেলেম’, বিপদে ধৈর্য ধারণের নাম ‘দৃঢ়তা’ এবং উস্কানীর মুখে ধৈর্য ধারণের নাম ‘ক্ষমা’। যার যেখানে ধৈর্য কম তার সেখানে ধৈর্য ধারণ করার চর্চা করতে হয়। চর্চার মধ্যে থাকলে মানুষ ধৈর্যে শীলবান হয়ে উঠে অর্থাৎ ধৈর্য গুণের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

একবার সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর জ্বর হলো। কয়েকজন গিয়ে তাঁর মুর্শিদ হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীনকে তাঁর জ্বরের সংবাদটা দিলেন। শুনে হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীন বললেন, ‘তাকে নদীতে বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখলে -’ তাই হলো, কয়েকজনে ধরাধরি করে সাধক আনোয়ারুল হক-কে নদীতে নামিয়ে দিলেন। তিনদিন তিনরাত তিনি বুক পানিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর সারা পায়ে মাছ ঠুকরিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে তবু তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি। সত্যদ্রষ্টা সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দীন প্রায়ই বিভিন্নভাবে তার ভাব শিষ্যদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতেন। তাই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক নির্দেশ দিতে পারেন – ‘বিপদে ধৈর্যশীল হও’। ‘ধৈর্যশীল হও’ – অর্থাৎ, তুমি যা চাও তা পেলেও রাজি থাকো আর না পেলেও রাজি থাকো। কারণ কার জন্য কোন্টা পাওয়া ভালো আর কোন্টা না পাওয়া ভালো তা গুরুই ভালো জানেন। গুরুর নৈকট্য প্রত্যাশী ভক্তের দায়িত্ব – ফলাফলের প্রতি নয়, গুরুর নির্দেশে কর্মের প্রতি একনিষ্ঠতা।

বিপদে ধৈর্যশালী হওয়া মানে ধৈর্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। ধৈর্য যখন নিজ অস্তিত্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য একটা চারিত্রিক গুণ হয় তখনই মানুষ ধৈর্যে শীল হয়। বিপদ আসলেও অন্তত তিনটি কারণে গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় – প্রথমত, এ জন্য যে, বিপদ হয়ত এর চেয়ে কঠিন হতে পারত। দ্বিতীয়ত, এ জন্য যে, আল্লাহ তায়ালা বিপদ সহ্য করার মতো ক্ষমতা দিয়েছেন।  তৃতীয়ত, এ জন্য যে, বিপদে পড়লে গুরুকে স্মরণ করার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে কতক্ষণ আমরা ধৈর্য ধরবো? সবগুণেরই একটা সীমানা আছে কিন্তু ধৈর্য এমন একটা গুণ যার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। খাবারের কথাটাই ধরা যাক্ না। খাবার না খেয়ে ক্ষুধায় ধৈর্য ধারণ করতে করতে এমন স্তরেও উপনীত হওয়া সম্ভব যে স্তরে প্রায় খাদ্য গ্রহণ না করেও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা যায়। সাধক লোকনাথ ব্রহ্মচারী এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বিপদে অধৈর্য হয়ে কান্নাকাটি করা নারী ও বালক সুলভ চপলতা। হায়-হুতাশ করে নিজের দুর্বলতা অন্যের কাছে প্রকাশ করাও সমীচীন নয়। এভাবে অধৈর্য প্রকাশ করলে চারিত্রিক দুর্বলতাই প্রকাশিত হয়। পুরুষ হতে হলে বিপদে ধৈর্যশীল হতে হয়। পুরুষ অর্থ – বাহ্যিক আকৃতিতে পুরুষ হওয়া নয়। মনস্তাত্বিকভাবে নিজের মধ্যে পৌরষত্ব জাগ্রত করা। বাহ্যিক আকৃতিতে একজন নারীও ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের মধ্যে সেই পৌরষত্বকে জাগিয়ে তোলতে পারেন।

‘জীবন দুঃখময়’ -এ সত্য গ্রহণ করলে বিপদে ধৈর্যধারণ করতে সুবিধা হয়। জীবন কোন ফুলেল শয্যা নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক এবং আর্থিক দুর্যোগের সম্ভাবনা। শান্তিতে থাকতে হলে, সকল বিপদ-আপদকে চরম ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করতে শিখতে হয়। আল্লাহ্ বলেন – ‘বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করবে। এই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (৩১ সুরা লুকমান : ১৭)।

বিপদে ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশিত হয়। বিপদ এবং দুঃখকষ্ট যত কঠিনই হোক না কেন, অবশ্যই তার অবসান হবে। এজন্য অস্থির হলে বিপদ কাটে না, বিপদ কাটে মানুষ সুস্থির হলে। বিপদে অস্থিরতা এবং অধৈর্য বিপদ আরো বাড়িয়ে তোলে।

বিপদে ধৈর্যশীল ব্যক্তিই নিজেকে সমর্পণ করে মুসলিম হতে পারে। একজন প্রকৃত মুসলিম এভাবে জীবন যাপন করে যেন, তার জীবনে সবকিছুই ঘটছে আল্লাহর ইচ্ছায়। সে নিজে কিছুই ঘটাচ্ছে না। আসলে মানুষ কোন কিছুই ঘটায় না, সবকিছুই ঘটে বিধাতার বিধানে। জন্ম, যৌবন, মৃত্যু সবই ঘটনা। মানুষ যৌবনে উত্তীর্ণ হয়, যৌবন ইচ্ছে করে কেউ নিয়ে আসতে পারে না। যৌবন চলেও যায় এভাবেই, কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আমাদের জীবনে সবকিছুই ঘটছে অদৃশ্যের অমোঘ বিধানে। সুতরাং অধৈর্য না হয়ে ধৈর্যশীল হওয়াই উত্তম। জীবনে যা ঘটবার তা ঘটুক। জীবনের ভিতরে ডুব না দিয়ে, একজন দর্শকের ভূমিকা নিয়ে জীবনকে যাপন করাতেই শান্তি।

বিশ্বাসীকে ধৈর্যের মাধ্যমে তার বিশ্বাসের পরীক্ষা দিতে হয়। দেহের সাথে মাথার যেরূপ সম্পর্ক বিশ্বাসের সাথে ধৈর্যের সম্পর্কও তদ্রুপ। তাই কুরআনে অন্তত ১২ টি সূরায় ১৫ বারেরও অধিক স্থানে ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা বারবার ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা কোন সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়। আল্ল­াহর সন্তুষ্টি পেতে হলে সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হয়। সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হলে সাধককে সার্বক্ষণিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়। এ যুদ্ধ একদিক থেকে সমাজ ও পরিবেশের সাথে, অন্যদিক থেকে প্রবৃত্তির সাথে। এ দুর্গম পথে তাই ধৈর্য না থাকলে পথহারা হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। তাই আল্লাহ্ তায়ালা সুরা আল-ই-ইমরানের শেষ আয়াতে বলছেন – ‘তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর’।

আল্লাহ তায়ালা শুধু ধৈর্য ধারণের জন্যই আহ্বান জানাননি – ধৈর্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘প্রতিযোগিতা’-র আহ্বান প্রমাণ করে ধৈর্যের কোন সীমানা নাই, কোন মাত্রা নাই। ধৈর্য সীমাহীন একটি চারিত্রিক গুণ।

আল্লাহ বলছেন, ‘সুতরাং তুমি ধৈর্য ধরো, সুন্দর করে ধৈর্য ধরো’। (৭০ সুরা মা’আরিজ : ৫)। যে যত বেশি ধৈর্য ধারণ করতে পারবে সে তত বেশি সফলকাম হতে পারবে। তাই ধৈর্য ধারণের প্রতিযোগিতার সাথে সাথেই থাকছে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ। কারণ, ধৈর্য ব্যতীত কেউ কোন যুদ্ধে জয়ী হতে পারে না। বিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য এই যে, যুদ্ধে সে থাকবে – ‘সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো’ ধৈর্যশীল।

ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে, লোকে মোহাম্মদ (সা.) -কে কখনো পাগল, কখনো কবি বলে উপহাস করেছে, বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করেছে, অনেক রকমের লোভ-লালসা দেখিয়েছে। এ সবকিছুতে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছিলেন বলেই তিনি সক্ষম হয়েছিলেন ইসলামের বিজয় ঝান্ডা উড়াতে। আল্লাহ্ বলেন, ‘হে মোহাম্মদ, ধৈর্যের সাথে কাজ করতে থাকো। তোমাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা আল্লাহ্ তায়ালা দিয়েছেন। ওদের কার্যকলাপে তুমি দুঃখিত-চিন্তিত হয়ো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রের জন্য মন ভারাক্রান্ত করো না’। (১৬ সুরা নাহল : ১২৭)। ‘হে মোহাম্মদ, তোমার পূর্বেও অসংখ্য নবী রসুলকে অমান্য করা হয়েছে। কিন্তু এ নির্যাতনের মোকাবেলায় তারা ধৈর্য ধারণ করেছেন।’ (৬ সুরা আনআম : ৩৪)। এর উত্তরে মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘আমি একজন নবীকে দেখেছি, তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে প্রহার ও  রক্তপাত করেছিল। তিনি তাঁর মুখম-ল থেকে রক্তের ধারা মুছে ফেলে বলেছিলেন, ‘হে মাবুদ! আমার কওমকে ক্ষমা কর, কারণ – তারা অন্ধ।’ তাই আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন –  ‘তোমরা ধৈর্য ধরো, যেমন ধৈর্য ধরেছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রসুলগণ।’ (৪৬ সুরা আহ্কাফ : ৩৫)।

 ধৈর্যের পরপরই বলা হয়েছে ক্ষমার কথা। ‘অন্যের দোষ ক্ষমা করো তাহলে তুমিও আল্লাহর দরবারে ক্ষমা পাওয়ার প্রার্থী হতে পারবে’। এভাবে বলার কারণ, যে ধৈর্যশীল কেবল সে-ই ক্ষমা করতে পারে। আমরা যা দেই তা-ই পাই। আমরা যে রূপ বিচারে বিচার করি, সেরূপ বিচারে আমরাও বিচারিত হবো, এবং যে পরিমাপকে আমরা পরিমাণ করি, সেই পরিমাপকেই আমাদের পরিমাণ করা হবে। আমি অন্যের দোষ ক্ষমা করলে, আমার দোষও ক্ষমা করা হবে। আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন যে, আমরা যদি লোকের অপরাধ ক্ষমা করি, তবে আমাদের অপরাধও ক্ষমা করা হবে।

তবে মনে রাখতে হবে যে প্রথমত, একজন মানুষ তখনই ক্ষমা করার যোগ্যতা অর্জন করে যখন বিচার করার ক্ষমতা তার থাকে। কেউ আমার সাথে অন্যায় করল কিন্তু তার বিচার করার ক্ষমতা বা সাহস যদি আমার না থাকে তাহলে – ‘তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম’ বলা যায় না। এ ধরনের ক্ষমা করে দেয়া আসলে ক্ষমা নয় – দুর্বলতা। যখন অপরাধীকে শাস্তি দেবার পূর্ণ ক্ষমতা আমার আছে তখনই তাকে ক্ষমা করার অধিকার আমি অর্জন করি। আর তখন ক্ষমাই হচ্ছে অপরাধীর জন্য সর্বাপেক্ষা বড় শাস্তি। দ্বিতীয়ত, অপরাধী যদি না-ই বুঝে যে, সে অপরাধী তবে সে এটাও বুঝবে না যে তাকে ক্ষমা করা হয়েছে। তাই ক্ষমা করার আগে অপরাধীকেও বুঝতে হবে যে, সে অপরাধ করেছে নইলে তাকে ক্ষমা করার প্রশ্ন উঠে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ‘আমার ভ্রাতা আমার নিকটে কত বার অপরাধ করিলে আমি তাহাকে ক্ষমা করিব? কি সাত বার পর্যন্ত? যীশু তাঁহাকে কহিলেন, তোমাকে বলিতেছি না, সাতবার পর্যন্ত, কিন্তু সত্তর গুণ সাতবার পর্যন্ত’। (মথি ১৮ : ২১)। সত্তর গুণ সাতবার পর্যন্ত অন্যের দোষ ক্ষমা কর কিন্তু নিজের দোষকে একবারও ক্ষমা করিও না। – এটাই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক -এঁর শিক্ষা।

নিজের কথা – ২৭

শাহ্ মো. লিয়কত আলী ॥ আধুনিক বিশ্বে দৈহিক স্বাস্থ্যের উপর যতটা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে আমাদের সামগ্রিক সুস্থ্য জীবনযাপনের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনে নানাবিধ রোগ বালাই থেকে মুক্তিলাভের জন্য আত্মিক স্বাস্থ্যসেবার উপর নির্ভর করে তেমনটা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এর নানাবিধ ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত কারণ থাকতে পারে। তবে অর্থনৈতিক কারণে আমাদেরকে যতটা প্রয়োজনীয় রসদ সামগ্রী সংগ্রহের জন্য সময় ব্যয় করতে হয় এর পাশাপাশি অজ্ঞতার কারণে আমরা ততটা আত্মিক সাস্থ্যের প্রতি নজর দিতে পারিনা। আত্মা দেহের পরিচালিকা শক্তি। কাজেই দেহের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য আত্মিক উপযুক্ত সুস্থতা ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন অত্যাবশ্যক। দেহ পার্থিব উপাদানের উপরভ নির্ভর করে সুস্থভাবে পরিচালনা করা গেলেও আত্মিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য পার্থিব উপাদানের ব্যবহারিক জ্ঞান পর্যাপ্ত নয়। আত্মা অপার্থিব। তাই আত্মার সুস্থতা বজায় রাখার জন্য অপার্থিব আত্মিক জ্ঞানার্জন অত্যাবশ্যক। আত্মার সুস্থতা বজায় রাখার জন্য পরমাত্মা তথা ¯্রষ্টা প্রদত্ত ঐশ্বিক জ্ঞানই হল যথেষ্ট জ্ঞান। ঐশ্বিক জ্ঞান অর্জনের জন্য দরকার ঈশ্বরের প্রদত্ত স্বাস্থ্যসেবার বিধিনিষেধ অনুস্মরণ করে জীবন যাপন করা। ঈশ্বরের কারুকার্য এতো নিখুঁত যে তার কারুকার্যের মাঝে কোন ভুল খুঁজে পাবেনা। তাই স্রষ্টা মানুষকে সচেতন অবস্থায় থাকার উপযোগী করেই এ জগতে পাঠিয়েছেন। সচেতনতা ব্যাতিত কেহই জ্ঞানার্জনের যোগ্যতা লাভ করতে পারেনা। আর জ্ঞানার্জন ব্যতীত কেহই নির্ভুলভাবে কর্ম করতে পারেনা। নির্ভুল কর্মের মাধ্যমেই ব্যাক্তি সফলতা অর্জন করে থাকে। শান্তিময় জীবন যাপন করার জন্য স্রষ্টা শান্তিকামী মানুষের জন্য জ্ঞানার্জন করা অত্যাবশ্যক করেছেন। স্রষ্টার ইচ্ছা ব্যাতিত কেহই জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করতে পারেনা। তাই জ্ঞানার্জনের জন্য ব্যক্তির ইচ্ছাপোষণ করা পূর্বশর্ত। কোন কর্মশিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করার পথ প্রসস্থ হয়। ব্যক্তির কর্মের সফলতা লাভ কিংবা অসফলতা আসে ব্যাক্তির নিয়ত বা ইচ্ছে শক্তির উপর নির্ভর করে। ব্যাক্তি কোন মঙ্গলজনক কর্ম করার ইচ্ছে করলে তাঁর জন্য স্রষ্টা সে কর্মটির দশগুণ অধিক পরিমাণে করার জন্য ব্যাক্তির মাঝে আত্মিক শক্তি সঞ্চার করেন। প্রসংগত জানা যায় দয়াল মহানবীর বাণীতে ‘জ্ঞানী ব্যক্তির নিদ্রা মুর্খের ইবাদতের চেয়েও উত্তম’। দৈহিক শক্তির যোগান আসে পুস্টিকর পরিমিত পার্থিব সম্পদ ভোগের মাধ্যমে। আর আত্মিক শক্তির যোগান আসে স্রষ্টাপ্রদত্ত জ্ঞানার্জন থেকে। ¯্রষ্টার সাথে ব্যক্তির চিন্তাশক্তির সংযোগ ঘটিয়ে স্রষ্টার জ্ঞানশক্তি অর্জন করা যায়। যেমন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে চার্জারের সংযোগ ঘটলে চার্জারে বিদ্যুৎ সরবরাহ হতে থাকে। তেমনই ভাবে স্রষ্টার সাথে ব্যক্তির আত্মার সংযোগ ঘটলে ব্যক্তির আত্মায় জ্ঞানশক্তি সঞ্চার হতে থাকে। তাই প্রতিটি কর্মের শুরুতেই ব্যক্তি তার স্রষ্টাকে স্মরণ করে কাজ আরম্ভ করলে স্রষ্টার জ্ঞানশক্তিতে শক্তিবান হয়ে নির্ভুলভাবে ব্যক্তির কর্মটি সম্পাদন হতে থাকে। ঈমানদার ব্যক্তিগণ স্রষ্টার সাথে সংযোগ রেখে তার কর্মটি সম্পাদন করে থাকে। তাই তিনি নির্ভুলভাবে তার কর্মগুলো সম্পাদনা করে থাকেন। কিন্তু বেঈমান ব্যক্তি তথা মুশরিক ও মুনাফিকরা স্রষ্টাকে স্মরণ না করে তথা ¯্রষ্টার সাথে তার সংযোগস্থাপন না করে তার কর্মটি সম্পাদন করে থাকে। তাই তাদের কর্ম নির্ভুলভাবে সম্পাদন হয়না। এমনটা বেঈমান ব্যক্তিদের অজ্ঞতার কারণেই হয়ে থাকে। তাই বেঈমান ব্যক্তিগণ স্রষ্টার সাথে সংযোগ না রাখার কারণে অপবিত্র ও অসুস্থতার মাঝে ক্ষতিগ্রস্থ’ ও অশান্তির জীবন যাপন করে থাকে। চিন্তাশক্তির ব্যবহার করেই ব্যক্তি কর্ম করে থাকে। কর্ম করার জন্য নিয়ত বা ইচ্ছেশক্তির সাহায্য নিতে হয়। অতপর যে কর্ম করার ইচ্ছে করা হয় সেখানে চিন্তাশক্তির সংযোগ ঘটানো মাত্রই সেই কাজটি করার পরিবেশ তৈরি হতে থাকে। এবার কর্মটি পুণ্যকর্ম অর্থাৎ কল্যাণকর কর্ম হলে ব্যক্তির কর্মের সাথে স্রষ্টার শক্তির সংযোগ ঘটে থাকে। ফলে কাজটি দ্রুত ও নির্ভুলভাবেই সুসম্পাদিত হয়ে থাকে। কর্মটি পাপকর্ম অর্থাৎ অকল্যাণকর হলে ব্যক্তির কর্মের সাথে শয়তানি শক্তির সংযোগ ঘটে। ফলে ব্যক্তির কর্মের সাথে শয়তানি শক্তির সঞ্চার ঘটে থাকে। এমতাবস্থায় ব্যক্তি আস্থার সাথে কর্ম কতে পারেনা। ব্যক্তি হয় অস্থিরচিত্ত। যার প্রভাবে ব্যক্তির জিবনে দুরারোগ্য ব্যধির সুচনা ঘটে। এ ব্যধি ক্রমেই ব্যক্তির জীবনে অসুস্থতা ও অশান্তির সূত্রপাত ঘটায়। অতএব সুস্থ্য জীবন যাপনের জন্য সফল অর্থাৎ বিশ্বসী ব্যক্তিত্ত্বের অনুসরণ করে জীবন যাপন করতে হবে। আর অভিশপ্ত তথা দ্বিচারি মুনাফেকের ও বিভ্রান্ত মুশরিকদের কর্মাভ্যাস পরিহার করে চলতে হবে। (চলবে)

হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা

অনিয়ন্ত্রিত জীবন নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ির মত বিপজ্জনক

মহান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ  প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা ২ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সভাপতি শাহ্ শাহনাজ সুলতানার সূচনা বক্তব্যের পর মূল আলোচনা শুরু হয় এবং মহাসচিব শাহ্ খাইরুল মোস্তফার সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাহাখাশ সহ-সভাপতি সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ, নির্বাহী সদস্য শাহীনূর আক্তার এবং হাক্কানী মিশন (হামিবা)’র  নির্বাহী সদস্য শেখ সালেহ আল দ্বীন সঙ্গীত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু।

সূচনা বক্তব্যে শাহ্ শাহনাজ সুলতানা বলেন,জীবন চলার পথে মানুষ তার প্রতিটি কর্ম ও চিন্তাকে নিজ নিজ পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখলে নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি সম্পর্কে উপলব্ধি-বোধে পৌঁছুতে পারেন।  

শাহ শেখ মজলিশ ফুয়াদ তার বক্তব্যে বলেন, আভিধানিকভাবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সঙ্কোচন, নিয়ম, প্রতিবন্ধ, নিয়মিত, সংযত; নিয়ম, বন্ধক, নিয়ন্ত্রণ, সংযম, নিগ্রহ, বারণ, নিবর্তন, বন্ধ, প্রকারণ, প্রতিজ্ঞা, অঙ্গীকার, ব্রতচর্য্যা, বিধি, ব্যবস্থা, ব্রত, সূত্র ও লক্ষণ। আমার মতে, ব্যবস্থাপনা চিকিৎসাপত্র, ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশনকেও নিয়ন্ত্রণের অর্থ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

হাক্কানী চিন্তনপীঠ-এ তিন জন মহান সাধক-সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দীন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-ওনাদের যে বাণী, সেগুলোতে অন্বেষণ করলে নিয়ন্ত্রণের বিষয় ও তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর-‘নিজের বিচার নিজ কর রাত্র-দিনে’, ‘বিপদে ধৈর্যশীল হও, অন্যের দোষ ক্ষমা কর, তাহলে তুমিও আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা পাওয়ার প্রার্থী হতে পারবে,’ ‘স্বীয় জিহ্বা শাসনে রাখো-পলকে পলকে মুর্শিদ দেখো,’  ‘কৃতিত্ব সেখানে, যেখানে মুখের ভাষাকে আয়ত্তে রাখা যায়।’ ‘মানুষ যদি হতে চাও, মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করো।’ সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন’এঁর বাণী-‘ক্ষমা প্রদর্শন ভদ্রতার নিদর্শন’, আত্মকর্ম বিশ্লেষণে ব্রত নিলে সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যাবে,’ এবং সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ’এর বাণী-‘কষ্ট ও ক্ষতির পরে মানুষ বিনয়ী ও জ্ঞানী হয়.’ তুমি যতই তোমার প্রতিটি কর্মের বিশ্লেষণ করবে, ততই তোমার আত্মিক উন্নতি হবে’,  ‘চোখ থাকতে অন্ধ, কান থাকতে কালা, মুখ থাকতে বোবা হয়ে যে আল্লাহর হুকুম পালন করে সেই সর্বোত্তম’- এ সব বাণীতে নিয়ন্ত্রণের তাৎপর্য অন্বেষণ করা যেতে পারে। নিয়ন্ত্রণ একই সঙ্গে সংকোচন, নিয়ম এবং অঙ্গীকারও বটে। নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হতে পারে- শৃঙ্খলা, ইংরেজিতে কন্ট্রোল বা কমান্ড। কোনো কিছুর ওপর কন্ট্রোল বা কমান্ড হারিয়ে ফেললে কী রকমের অঘটন ঘটতে পারে তা আমরা বিভিন্নভাবে দেখে থাকি। শৃঙ্খলার বিপরীতে আছে বিশৃঙ্খলা। চালক যদি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সেটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। নিয়ন্ত্রণ মানে নিয়ম। জগতের সব কিছুই চলছে একটা নিয়মের অধীনে। একটি শিশু জন্মের পর মা’র কাছে নিয়ন্ত্রিতই থাকে এবং যে-মা তার সন্তানকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে নিয়ন্ত্রিতভাবেই বড় হয়। তাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেলেই সমস্যা। আবার, ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে’, এখানে তো নিয়ন্ত্রণহীনতার কথা বলা হচ্ছে। তাই কোথায় নিয়ন্ত্রণ থাকবে, আর কোথায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাবো-সেটা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আর এখানেই প্রয়োজন একজন সঠিক নিয়ন্ত্রক-এর যা আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় ‘হাক্কানী চিন্তন পীঠ ও হাক্কানী জগতে দেখেছি বা দেখছি যে, নিয়ন্ত্রক ঠিক থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব হয়। আমার উপলব্ধিতে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-একজন নিয়ন্ত্রক যাঁর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে কী রকম অসম্ভব ধরনের সফলতা ওনি দেখিয়েছেন! নিয়ন্ত্রণ ঠিক থাকলে অর্থাৎ, সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে, সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে অনেক সফলতা অর্জন করা যায়।

আমাদের সমাজে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনেক কিছুর ঘাটতি রয়েছে। দুনিয়াদারিতে  যারা নিয়ন্ত্রকের জায়গাগুলোতে রয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে তারা সঠিক নন, তার কারণ যাই হোক, এসব কারণে তারা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। সেজন্যই এখন বলা হয়ে থাকে, আমাদের অনেক কিছু আছে, শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই। সব কিছু, সবক্ষেত্রে ভালো ব্যবস্থাপক, ভালো প্রশাসক, ভালো নিয়ন্ত্রকের হাতে থাকলে তবেই সেখানে অনেক কিছু অর্জন সম্ভব হয়ে উঠে। আর ব্যক্তিগতভাবে হিসেব করলে দেখা যাবে,আমাদের বিগত জীবনের অনেক সময় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে থাকার কারণে নষ্ট করে ফেলেছি। এর কারণটা হচ্ছে, কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবো, কার কাছে নিয়ন্ত্রিত হবো, সেই পথ, সেই পরিবেশ জানা ছিল না। সে কারণে শুদ্ধভাবে আমরা নিয়ন্ত্রিত ছিলাম না। এখানে অর্থাৎ, হাক্কানী  চিন্তনপীঠ-এ এসে দেখেছি এটা একটা মডেল, এটা একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। এখানে যে চলতে পারবে, এখান থেকে শিক্ষা নেবে, উপলব্ধি করতে পারবে, তার মধ্যে অবশ্যই সে কিছু অর্জন করতে পারবে যা তার জীবন চলার পথে যে-কোন কর্মে, যে-কোনো ক্ষেত্রে বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে পারবে যা দেশ ও মানুষের কাজে আসবে। তার নিজের কল্যাণে কাজে আসবে তো বটেই।

ব্যক্তিজীবনে নিজেকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবো? ‘নিয়ন্ত্রণ’এর পদ্ধতি বা সিস্টেমটা কী হবে? আমাদের বেলায় নিজেকে ‘নিয়ন্ত্রণ’এর জন্য সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফএঁর জীবনাদর্শ এবং ওনি সবার কাছে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য দিয়ে গেছেন সেগুলো সঠিকভাবে মেনে চলতে পারলে, সেখানে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলতে পারবো। আমার বেলায় দেখেছি, মহান সাধকের দেয়া আদেশ-উপদেশ-নিষেধ মেনে চললে জীবন চলার পথে সকল কর্মে আল্লাহ্র কৃপা, আশীর্বাদ, রহমত, সহযোগিতা-সব কিছুই পাওয়া যায়। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর আহবান-‘হে মানব জাতি, তুমি যে ধর্মাবলম্বীই হও না কেন, জীবন চলার পথে শান্তি ও মঙ্গল হাসিল করার জন্য মুর্শিদ/গুরু/পথ প্রদর্শক তালাশ করো এবং এবং সংযোগ স্থাপন করো। যদি সংযোগ স্থাপন করতে না পারো, তাহলে অন্ততপক্ষে সংযোগ রক্ষা করে চলো।’ সংযোগ রক্ষার মধ্য দিয়েই একটা মানুষ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা অনেক ক্ষেত্রেই মোহাচ্ছন্ন । কী জন্য ঘুরাঘুরি করছি নিজেরাও জানি না। যেন কোনো লক্ষ্য নেই, উদ্দেশ্য নেই। অথচ আমরা জানি, ‘লক্ষ্যহীন জীবন মাঝিহীন নৌকার মতো’। আমরা ভাগ্যবান এই অর্থে যে, জীবনে শান্তি-মঙ্গল হাসিল করার জন্য আমাদের একটা লক্ষ্য আছে, এই লক্ষ্যপথে যতক্ষণই চলি, ততক্ষণই আমাদের মধ্যে শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে।

 নিজেকে ‘নিয়ন্ত্রণ’-এ রাখার জন্য হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে আরও শিখেছি যে, জীবন চলার পথে যে-কোনো ক্ষেত্রে ‘টেনশন’ (কঠিন মানসিক চাপ, পীড়ন), ‘ইমোশন’, (আবেগ), ‘সেন্টিমেন্ট’ (অনুভূতি-আশ্রিত মত, ভাব-প্রবণতা), ‘এক্সাইটমেন্ট’ (উত্তেজনা)-এই চারটি পরিস্থিতিতে গুরু/মুর্শিদকে ধারণ করে রাখতে পারলে, সংযোগে-স্মরণে রাখতে পারলে নিয়ন্ত্রণে থাকা যায় এবং সেখানে কল্যাণও নিহিত থাকে। তবে সব কিছুই হচ্ছে, নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি বোধের ব্যাপার। ‘সংযোগ’ আসে ‘যোগ’ থেকে। ‘যোগ’ থেকে হয় ‘যোগ্যতা’। সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন যোগ্যতা। যোগ্য না হলে নিয়ন্ত্রণও করা যায় না। সাধক কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন সেটা তিনি আমাদেরকে দেখিয়ে গেছেন। যার যার অবস্থান অনুযায়ী মানবতার কল্যাণে তাঁর রেখে যাওয়া, তাঁর দ্বারা অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে পালনের মধ্য দিয়েই আমরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো-এই আমার উপলব্ধি।

শাহীনূর আক্তার বলেন,‘নিয়ন্ত্রণ শব্দটা আমাদের জীবনের সাথে কমবেশি জড়িয়ে আছে। ছোট বেলায় বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ এবং চারপাশের পরিবেশ নানা নিয়ম-শৃঙ্খলা ও বিধি-নিষেধের বেড়াজালে নিয়ন্ত্রণ করতেন বা চাইতেন। এই নিয়ন্ত্রণকে কখনো ভালো মনে আবার কখনো মন্দভাবে নিতাম।

‘নিয়ন্ত্রণ’ জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। একটি গাড়ির চালক যখন সঠিকভাবে, অর্থাৎ মনোযাগ সহকারে চালায়, তখন তা নিরাপদ গতিতে চলতে থাকে। কিন্তু যখনই গাড়িটা চালকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না তখনই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। প্রাণহানি, সম্পদহানি এমন কি পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। সংসার যদি গাড়ি, আর চালক গৃহকর্তা হন, তখন তার সংসার পরিচালনা সঠিক পরিকল্পনা,সকলের চাহিদা ও বন্টান যখন সুষম হবে, তখন সংসার তার পূর্ণ দখলে (নিয়ন্ত্রণে) থাকবে। তখনই সেই সংসার হয়ে উঠে সুন্দরও সৌহার্দ্যপূর্ণ। জীবনের সর্বক্ষেত্রে বন্টন ব্যবস্থা সুচারুরুপে সম্পন্ন না হলে সেখানে জটিলতা সৃষ্টি হয়। ব্যক্তির যোগ্যতা ও দক্ষতা বিচার করে তাদের ওপর কার্য বন্টন করা না হলে সেখানে হতাশা, সংঘাত ও সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়।

হাক্কানী তত্ত্বাবধায়ক প্রধান মহোদয় শাহ্ সূফী শেখ আব্দুল হানিফএঁর কার্যক্রম লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মিশনে নানাবিধ প্রকল্পভিত্তিক কর্ম-বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তিনি সঠিক, যোগ্য ও দক্ষ লোকদের সমন্বয় ঘটিয়েছেন।তিনি জানেন, কোথায়, কাকে দিয়ে কোন্ কাজটি সুসম্পন্ন করা যাবে। এখানে একজন ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠান। সমস্ত প্রতিষ্ঠান-সেখানে দায়িত্বরত ব্যক্তি থেকে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির ওপর তাঁর সমান নিয়ন্ত্রণ। কাকে, কীভাবে,কতখানি দায়িত্ব-কর্তব্য ,সুবিধা বা সুযোগ দেবেন সেই মাত্রাটুকু সদা স্থির করে রাখেন। মান বন্টনের এই ক্ষেত্রে সফলতার জন্যই তিনি সকলের কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর অবস্থান। এর ফলশ্রুতিতে তিনি তাঁর সকল কর্মে সদা প্রস্তুত ও কর্ম সম্পাদনেও তিনি সফল হন।                           

‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটা প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভীষণভাবে প্রয়োজন। কারণ, নিজ সত্ত্বায় সব কিছুর ওপর ব্যক্তির একটা নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। একরৈখিকতার প্রশ্নে সব সময় নিজকে ধরে রাখার অবিরাম প্রচেষ্টার জন্য প্রয়োজন সকল কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ। তাই নিয়ন্ত্রণ বিষয়টা আমার কাছে একটা অধ্যবসায়ের পাঠ। নিয়মিত অনুশীলন ও চর্চার মধ্য দিয়েই এটি অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত বা নিয়ন্ত্রণহীন জীবন নিয়ন্ত্রণবিহীন গাড়ির মতই বিপজ্জনক। আহার-বিহার-বিলাসিতা-বিশ্রাম সব কিছুই একটা পরিমাপের মধ্যে টেনে রাখতে হয়। কিন্তু আমরা তা পারি না।

নারীশক্তির জাগরণে মহিমান্বিত হোক পৃথিবী

সংলাপ ॥ মানুষের মধ্যে পৃথক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দু’টি সৃষ্টি – নারী ও পুরুষ। শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে এদের উভয়েরই স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। কুরআনে নারী-পুরুষের সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে সকলেই সুরা নেসার ৩৪ নং আয়াতকে ভিত্তি হিসাবে উপস্থাপন করেন। এ আয়াতের পক্ষে-বিপক্ষে বাদানুবাদের অন্ত নেই। আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদ হলো – ‘পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেক্কার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ্ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে।’ ধর্মান্ধগোষ্ঠী নারীদের ক্ষমতায়নের বিরোধিতা করতে আশ্রয় নেয় এই আয়াতটির।

সত্য হলো এই যে – উক্ত আয়াতে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত পরিবারে কার কি অবস্থান, অধিকার ও কর্তব্য সে সম্পর্কে একটি মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। কুরআনের দৃষ্টিতে নারী কোন ভোগ্যবস্তু নয়, দাসীও নয়। এই আয়াতে আল্লাহ্ পুরুষের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছেন ‘কাওয়্যামুনা’। ‘কাওয়্যামুনা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সুঠাম ও সুডৌল দেহবিশিষ্ট, মানুষের গঠন কাঠামো, ঠেক্না, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, অভিভাবক, শাসক, নেতা [আরবি-বাংলা অভিধান, ই.ফা.বা.]। সুতরাং এই আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে, পুরুষ শারীরিক দিক থেকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী, তার পেশী, বাহু, হাড়ের গঠন, মেরুদ- এক কথায় তার দেহকাঠামো নারীর তুলনায় অধিক পরিশ্রমের উপযোগী, আল্লাহ্ই তাকে রুক্ষ পরিবেশে কাজ করে উপার্জন করার সামর্থ্য নারীর তুলনায় অধিক দান করেছেন। অপরদিকে নারীদেরকে আল্লাহ্ সন্তান ধারণের উপযোগী শরীর দান করেছেন, সন্তানবাৎসল্য ও সেবাপরায়ণতা দান করেছেন। তাই প্রকৃতিগতভাবেই তারা সন্তান ধারণ, লালন-পালন ও গৃহকর্ম করে থাকেন।

আদম ও হাওয়া আল্লাহর অবাধ্য হওয়ায় আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। তওরাতের বর্ণনায় আল্লাহ্ হাওয়াকে বললেন, ‘আমি তোমার গর্ভকালীন অবস্থায় তোমার কষ্ট অনেক বাড়িয়ে দেব। তুমি যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সন্তান প্রসব করবে।’ তারপর তিনি আদমকে বললেন, ‘যে গাছের ফল খেতে আমি নিষেধ করেছিলাম তুমি তোমার স্ত্রীর কথা শুনে তা খেয়েছ। তাই তোমার জন্য মাটি অভিশপ্ত হলো। সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করে তবে তুমি মাটিতে ফসল উৎপন্ন করবে। তোমার জন্য মাটিতে কাঁটাগাছ ও শিয়ালকাঁটা গজাবে, কিন্তু তোমার খাবার হবে ক্ষেতের ফসল। যে মাটি থেকে তোমাকে তৈরি করা হয়েছিল সে মাটিতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তোমাকে খেতে হবে। তোমার এই ধূলার দেহ ধূলাতেই ফিরে যাবে।’ (তওরাত: জেনেসিস: ১৬-১৯)।

‘মনুসংহিতা’য় নারীর কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্ত্রীলোকেরা সন্তান প্রসব ও পালন করে বলে তারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী; এরা গৃহের দীপ্তিস্বরূপ হয়। এই কারণে স্ত্রীলোকদের সকল সময় সম্মান-সহকারে রাখা উচিৎ, বাড়িতে স্ত্রী এবং শ্রী-র মধ্যে কোন ভেদ নেই।’

বাংলা অভিধানে স্বামী শব্দের অর্থ দেয়া হয়েছে – পতি, প্রভু, মনিব, অধিপতি, মালিক। পুরুষের দায়িত্ব হলো – স্ত্রী ও পরিবারভুক্ত সকলের জাগতিক প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা, তাদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলোর যোগান দেয়া।

উল্লিখিত কাজগুলো নারী ও পুরুষের বুনিয়াদি ও নীতিগতভাবে মৌলিক কাজ হলেও অন্যান্য অঙ্গনে তাদের কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা আল্লাহ্ দিয়েছেন। কুরআন মতে যার নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রয়েছে সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে। অযোগ্য পুরুষকে নারীর কর্তা করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত কুরআন সমর্থন করে না। যে প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতায় নারী অন্যদের থেকে অগ্রগামী সে প্রতিষ্ঠানে নারীকে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে মেনে নিতে কোন বাধা নেই।

অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে জীবিকার যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হলে তাতে ধর্মের কোন বাধা নেই। রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-এঁর অনেক নারী অনুসারী নিজ পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় কিংবা পুরুষ সদস্যরা ধর্মপ্রতিষ্ঠায় অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ করে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন। স্বয়ং খাদিজাও ছিলেন একজন ব্যবসায়ী।

রসুলাল্লাহ্র সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। আনাস (রা:) ওহুদ যুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সেদিন আমি আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা:) এবং উম্মে সুলাইমকে (রা:) দেখেছি, তাঁরা উভয়েই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাদের পায়ের গোছা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভরে পিঠে বহন করে পানি আনতেন এবং (আহত) লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার চলে যেতেন এবং মশক ভরে পানি এনে লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন’ (বোখারী শরীফ, হাদিস নং ৩৭৬৭)। মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী – রুফায়দাহ (রা:)। শুধু তাই নয়, যুদ্ধে যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে নারীকেও অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে হবে তাহলে  তারা পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করতে পারে। তার প্রমাণ ইতিহাস। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় তখন নারীরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-কে সুরক্ষা দেয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের উপর বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী অনুসারী উম্মে আম্মারার (রা.) ভূমিকা ছিল অবিশ্বাস্য। এ সম্পর্কে রসুলাল্লাহ্ ((যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাহকেই লড়াই করতে দেখেছি।’ তিনি যেভাবে যুদ্ধ করেছিলেন তা নজিরবিহীন – এক শত্রু সৈন্যের তরবারির কোপ পড়ল তার মাথায়, তিনি ঢাল দিয়ে তা প্রতিহত করেই পাল্টা আঘাত করলেন ওই সৈন্যের ঘোড়ার পায়ের উপর। অশ্ব ও অশ্বারোহী দুজনেই পড়ে গেল মাটিতে। মহানবী এই দৃশ্য দেখে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ্কে (রা.) সাহায্যের নির্দেশ দিলেন। তিনি পতিত সৈন্যকে শেষ করলেন। এলো অন্য এক শত্রু। সে আঘাত হানলো আব্দুল্লাহ্র (রা.) বাম বাহুতে। মা পুত্রের ক্ষতস্থান বেঁধে দিলেন। আর ছেলেকে আমৃত্যু লড়াই করার জন্য উদ্দীপ্ত করলেন। এই অপূর্ব দৃশ্য দেখে রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) বললেন, ‘হে উম্মে আম্মারাহ! তোমার মধ্যে যে শক্তি আছে, তা আর কার মধ্যে থাকবে?’ নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) নিজ হাতে সেদিন এই বীরাঙ্গনার ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। তাঁর কাঁধ থেকে গল গল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। বেশ কয়েকজন বীর সৈনিকের নাম উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘আল্লাহ্র কসম! আজ তাদের সবার চেয়ে উম্মে আম্মারাহ বেশি বীরত্ব দেখিয়েছেন।

যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিপদসঙ্কুল এবং সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী অনুসারীরা অংশ নিয়েছেন, সেখানে তৎকালীন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য কাজে যে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা কখনই পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিলেন না। তারা পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে যে কোন ভূমিকা রাখতে পারতেন। ঠিক একইভাবে সংসার সমরাঙ্গণেও যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে নারীকেই প্রথম সারিতে অর্থাৎ উপার্জন ও পরিবার ভরণপোষণের কাজে নামতে হবে তবে ইসলাম কোন বাধা তো দেয়ই না বরং তাকে উৎসাহিত ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার নির্দেশ দেয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব নারী রসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-এঁর পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করেছেন, তারা তাবুসদৃশ বোরখা গায়ে দিয়ে যুদ্ধ করেন নি। বোরখা পড়ে ঘোড়ায় চড়া যায় না, তলোয়ার চালানো যায় না। অথচ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এখন নারীদের গায়ে বোরকা চাপিয়ে দিয়েছে, তাদের গৃহবন্দি করেছে। দুঃখের বিষয় – তথাকথিত প্রগতিশীলরাও ধর্মান্ধদের মুর্খতাকে অসার প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মকেই দোষারোপ করছেন। বোরখা পরিহিতা কিম্ভুতকিমাকার নারীমূর্তি দেখেই তারা ধরে নিয়েছেন কুরআন বুঝি নারীকে অথর্ব, জড়বুদ্ধি, অচল, বিড়ম্বিত করেই রাখতে চায়। অথচ ধর্মান্ধদের ইসলামের সাথে আল্লাহ্-রসুলের ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

একটি জাতির প্রায় অর্ধাংশই নারী। জাতির অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অচল করে রাখা, আর এক পায়ে হাঁটার চেষ্টা করা সমান কথা। নারী-পুরুষ একে-অন্যের শুধু পরিপূরকই নয়, উভয়ে মিলেই ভারসাম্য ও জীবসত্ত্বা রক্ষা করে চলছে সৃষ্টির প্রথমাবধি। আমরা সেই পরিপূরকের জায়গাটায় ভারসাম্য রক্ষা করছি না।  নারী-পুরুষ মিলে যে পূর্ণ আকাশ, তার অর্ধেক ঢাকা পড়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক পেশী জোরে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে নারীদের শোষণ ও বঞ্চনার যে ভয়াবহ চিত্র আমরা নিরন্তর দেখতে পাই, তা পরোক্ষভাবে পিছিয়ে দেয় পুরো সমাজকেই। আমাদের দেশে কন্যাভ্রুণ হত্যা, যৌতুক কিংবা পণজনিত কারণে গৃহবধূ হত্যার তালিকা ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। আইন থাকলেও বাল্যবিবাহ হচ্ছে হরহামেশা। নারীদের প্রতি হিংসাত্মক আক্রমণের হারও কম নয়। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, দৈহিক, মানসিক নির্যাতন, অপহরণ এখনও দৈনন্দিন ঘটনা।

বুদ্ধিমত্তার নিরীক্ষায় বহু পূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে যে, যা পুরুষ পারে তা নারীও পারে। দায়িত্ব পেলে নারী যে তা পুরুষের সমান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারে, সে উদাহরণ আজ শত-সহস্র। অর্ধেক অন্ধকার আকাশ ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই রয়েছে দেশের     অগ্রগতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রগতিশীলতা, অগ্রসরমানতা ও অসাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে নারীমুক্তি সংগ্রামের সম্পর্ক দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। নারীশক্তির জাগরণে মহিমান্বিত হোক পৃথিবী।

৫ বছরে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কিনেছে সৌদি আরব!

সংলাপ ॥ গত পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরব বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করছে। এসব অস্ত্রের বেশিরভাগই আমেরিকা থেকে আমদানি করেছে রিয়াদ।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপ্রি এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরব অস্ত্র আমদানির পরিমাণ শতকরা ১৩০ ভাগ বাড়িয়েছে।

সিপ্রি’র রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিশ্বে যত অস্ত্র বিক্রি হয়েছে তার শতকরা ১২ ভাগ একা সৌদি আরব কিনেছে।

২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে সৌদি আরব যার শিকার হাজার হাজার নারী, শিশু ও অসহায় বেসামরিক মানুষ স্টকহোমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি আরো জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অস্ত্র আমদানির পরিমাণ শতকরা ৬১ ভাগ বাড়িয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে সারা বিশ্বের মোট অস্ত্রের শতকরা ৩৫ ভাগ কিনেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ইয়েমেনে আগ্রাসন চালানো সত্ত্বেও আমেরিকা এবং ব্রিটেনের মতো প্রধান অস্ত্র রফতানিকারক দেশগুলো সৌদি আরবে অস্ত্র রফতানি অব্যাহত রেখেছে। এতে আরো বলা হয়েছে, সৌদি আরব শতকরা ৭৩ ভাগ অস্ত্র আমেরিকা থেকে এবং শতকরা ১৩ ভাগ ব্রিটেন থেকে আমদানি করেছে।

কোথায় সে সাধু মহীয়ান ‘লালন’ কে করিতে লালন?

সংলাপ ॥ স্মরণ উৎসবে (দোল পূর্ণিমায়) ৩ দিন লালন মেলা হয়। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় বাংলার মহান সাধক পুরুষ লালন সাঁইয়ের সমাধি কেন্দ্রে ২টি অনুষ্ঠান হয় প্রতি বছর। একটি তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী এবং অন্যটি স্মরণ উৎসব। দোলপূর্ণিমা নামে খ্যাত এই অনুষ্ঠানটি লালন সাঁই নিজেও পালন করতেন।

এই অনুষ্ঠানের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- লালনের রীতি অনুযায়ী বাউলদের মধ্যে খাবার সরবরাহ করা। কলা পাতায় পরিবেশিত এই খাবার সাঁইজীর অনুরাগী ও অনুসারী বাউল সম্প্রদায় ‘সেবা’ হিসেবে গ্রহণ করে। সাঁইজীর নাম করে ‘আলেক সাঁই’ ডেকে সবাই একত্রে ‘সেবা’ নেয়া বাউলদের ঐতিহ্যের অংশ।

ভক্তদের মতে, লালন সাঁইকে শরীয়তি মুসলমান বানিয়ে লালন দর্শন ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। ১৯৬০ সালে ছিল লালন শাহ আখড়া কমিটি। ১৯৬৩ সালে মোনায়েম খাঁ যখন উদ্বোধন করেন, তখন ফলক উন্মোচন করার সময় দেখা যায় ‘লালন মাজার শরীফ’। আসলে এটি হওয়া দরকার ‘লালন সাঁই সমাধি’। লালন সাঁই কোন জাতি ভেদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর নাম থেকে শুরু করে সবকিছুই অসাম্প্রদায়িক। তিনি সকল ধর্মের উর্ধ্বে মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন মানবতা বিকাশের জন্যে। লালন সাঁইয়ের অন্যকোন নাম ছিল কিনা জানা যায়নি। লালন নামটিই কে বা কারা দিয়েছেন বা তিনি নিজে নিজেই নিয়েছেন কিনা এ সম্বন্ধে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। সাধারণভাবে মানুষ জন্মবার পর তার পূর্ব পুরুষের ধর্মানুসারে নাম নিয়ে বা পেয়ে ধর্মীয় সংস্কারের মধ্যে ঢুকে গিয়ে জীবন প্রবাহিত করে। কেউবা সেই প্রবাহ থেকে নিজেকে মুক্ত করে শান্তি পায় আবার কেউবা আগের সংস্কারযুক্ত হয়ে শান্তি অন্বেষণ করে। লালন সাঁই এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ‘লালন’ নাম নিয়ে বাংলার ঐতিহ্যকে তথা জাতীয় ঐতিহ্যকে নিজের জীবনে লালন করে  সবার উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। তাঁর জীবনদর্শনে পাওয়া যায়- যে নিজেকে সযতেœ পালন করছে লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সেই লালন। গুরু বা মুর্শিদই আল্লাহ্। সেই আল্লাহ্কে যারা দর্শন করতে (দেখা নয়) পেরেছে তারা ধর্মীয় সংস্কারমুক্ত মানুষ। এই মানুষই মানবতা নিয়ে জীবন কাটায়। তাই সবার উপরে মানুষ সত্য। কিন্তু ১৯৮৪ সনে লালন একাডেমী স্থানীয় মাদ্রাসার প্রিন্সিপালকে এনে ইসলামী জলসার আয়োজন করে এবং লালনের ছবি ফেলে দিয়ে সুন্নতি পোষাকের একটি ছবি ঝুলায় একাডেমীর দেয়ালে। এরা চুল, দাঁড়ি, গোঁফসহ ছবিকে লালনের নয় বলে ঘোষণা দেয়। এমনকি লালন অনুসারীদেরকে বিদআত, বিধর্মী বলে আখ্যা দেয়া হয় সেই অনুষ্ঠানে।

চিন্তাবিদদের অনেকেই মনে করেন সূফীবাদ নিয়ে বাংলাদেশে যে গবেষণা হচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে সব ভ্রান্তি কেটে যাবে। কুষ্টিয়ায় একটা বিরাট মহাশ্মশান আছে। লালন মৃত্যুর সময় নিজেকে মাটি দিতে বলে গেলেন। তাই তাঁকে কবর দেয়া হয়েছে। বাউলদেরকে ‘সুবিধাবাদী’ আখ্যা দিয়ে অনেকে বলেন, ‘আমরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। শরীয়ত এবং মারেফাত দুটোই স্বীকার করতে হবে। সব জায়গায় সব কথা বলে শরীয়ত পন্থীদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া বাউলদের একটা বদঅভ্যাস’। অতীতে লালন একাডেমীর কিছু কিছু কর্মকান্ড যে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল একথা অনেক ভক্ত স্বীকার করেছেন। লালনকে ভক্তরা রাজনীতিক বা কৃষক বিদ্রোহের উদ্গাতা হিসেবে দেখে না। তাদের মতে, লালন মানুষ হওয়ার প্রেরণাদাতা, কবি, দার্শনিক, চিন্তাবিদ, মানবতাবাদী এবং সর্বোপরি একজন সংস্কারক।

বাউল সাধকদের কাছে লালন সাঁই তাদের ধর্মগুরু। তাঁর সমাধিস্থল তাদের কাছে তীর্থভূমি। বাউলদের ধর্মস্থান বাউলরা তাদের নিজেদের মত করে সাজাতে চায়। এজন্য বাউল সম্মেলন এবং মত বিনিময় করে যাচ্ছেন। এ রকমই একটি মত বিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তাগণ লালন সাঁইকে নিজেদের জীবনে লালন করার উপর গুরুত্ব দেন। ব্যক্তিগত স্বার্থে লালন সাঁইকে নিয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট প্রাপ্তি সোজা, কিন্তু ‘লালন দর্শন’ ধারণ করা কঠিন কাজ। লালন সাঁইয়ের ব্যক্তিগত কোন সম্পদ ছিল না। সংসার ছিল না। মানুষের জন্যই তিনি সবকিছু ত্যাগ করেছেন। সেই ত্যাগী মানুষ কোথায় এখন?

লালন মেলার মূল চত্বরে ফার্নিচারের দোকানসহ বিভিন্ন পণ্যের সমারোহ সাজিয়ে একে বাণিজ্য মেলায় পরিণত করা হয়। এখানে লালনের ভাবগাম্ভীর্য অনুপস্থিত। লালন অনুপস্থিত। লালনের সেই গ্রামভিত্তিক নিজস্ব সংস্কৃতি ঝেটিয়ে বিদায় করে দিয়ে শহুরে সংস্কৃতি ঢুকালে আমরা কোথায় খুঁজবো ‘তিন পাগলের হলো মেলা নদে এসে’?

লালন হাত পেতে কিছু নেননি। তিনি দাতা। কিন্তু তাঁর মাজারে সিন্দুক বসিয়ে লেখা হয়েছে, ‘মুক্ত হস্তে দান করুন’। এটা চরম ধৃষ্টতা। লালন সাঁই মানুষকেই সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। 

মানুষই মানুষের গুরু মানুষই আল্লাহ্; মানুষই রাসুল – লালনের এই শিক্ষা বিস্মৃত হয়ে যত গবেষণাই করা হোক তাতে মানুষের কোন কল্যাণ হবে না – ডাষ্টবিনের বর্জ্য ছাড়া।

লালনের বাণী শুধু স্বরণ করলেই চলবে না, ব্যাপক প্রচারও চালাতে হবে। লালন বলেছেন-

(১)

‘যেই মুর্শিদ সেইতো রাসুল

ইহাতে নেই কোন ভুল

খোদাও সে হয়’।

(২)

‘আল্লাহ্ কে বোঝে তোমার

অপার লীলে

তুমি আপনি আল্লাহ্ ডাক

আল্লাহ্ বলে’।

লালন সাঁই যেখানে শেষ করেছেন, সেখান থেকে শুরু করার মত কিছু উদ্যমী মহৎপ্রাণ জন্ম নিলেই লালন স্মরণ সার্থক হবে দেশ ও জাতির জন্য। সর্বশেষে যত মতভেদ ও মতান্তরই থাক না কেন, সাঁইজীকে ভালবেসে যাদেরই আগমন ঘটে ছেউড়িয়ায়, তাদের মত বিনিময় দরকার। এ জন্য বাউল, সাধক, সাধু এবং সজ্জনদের মতামত পরামর্শ এবং উপদেশ গ্রহণ করতে একটি উপদেষ্টা মন্ডলী গঠন করার জন্য কুষ্টিয়া প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো।

সাঁইজীর পরিচয় তাঁর গান ও কর্মের মাঝেই অবিকৃত আছে। তিনি গেয়েছেন-

“যার মর্ম সে যদি না কয়

কার মাধ্যমে জানিতে পায়

তাইতে আমার দীন দয়াময়

মানুষ রূপে ঘোরে ফেরে”।

তাঁর জন্ম পরিচয় নিয়ে অনেক গবেষণা চলছে। বিভিন্নজনে বিভিন্নরূপ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিচ্ছেন। কিন্তু সাঁইজী নিজে বাণী দিয়েছেন-

“আমি লালন এক সিঁড়ে

ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে

ভুগেছিলাম পক্স জ্বরে

মলম শাহ করেন উদ্ধার”।

সাঁইজী হিন্দু না মুসলমান এ নিয়েও তর্ক-বিতর্কের অন্ত নেই। যার যার সুবিধামত তাঁকে হিন্দু বা মুসলমান বানিয়ে স্বার্থ হাসিলের প্রতিযোগিতাও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। কিন্তু লালন শাহ্ অত্যন্ত ব্যথাভরা কন্ঠে একটি বাণী দিয়েছেন-

“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে

লালন কয় জাতের কি রূপ

দেখলাম না এই নজরে”।

সাঁইজী হিন্দুর সন্তান, না মুসলমানের? এর জবাবও তাঁর কন্ঠে ছড়িয়েছে –

“সবে বলে লালন ফকির হিন্দু

কি যবন

লালন বলে আমার আমি

না জানি সন্ধান”।

লালন সাঁই সংসার ত্যাগী। তিনি ফকির; মোহমুক্ত মানুষ। তাঁর কর্মসূচি তিনি নিজেই বয়ান করেছেন –

“আর কি হবে এমন জনম

বসব সাধু মেলে

হেলায় হেলায় দিন বয়ে যায়

ঘিরে নিল কালে”।

মানুষই তাঁর কাছে সবকিছু। তাই তিনি গেয়েছেন –

“ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার

সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার”।

জাতিভেদের অনাচার দূর করে মহাসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর বাণী –

“এমন মানব সমাজ কবেগো সৃজন হবে

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রীষ্টান

জাতি গোত্র নাহি রবে”।

মানুষ ভজনা ভিন্ন অন্য কোন কাজ তিনি করেননি। তাঁর ভক্তদেরও এর কোন বিকল্প নেই। ভক্তদের জন্য তিনি গেয়েছেন –

“মানুষ তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে

সেকি অন্য তত্ত্ব মানে।

মাটির ঢিবি কাঠের ছবি

ভূত ভবিষ্যৎ আর দেবা দেবী

ভোলে না সে এসব রূপি

মানুষ ভজে দিব্যজ্ঞানে”।

পবিত্র কুরআন শরীফে আল্লাহ্র অবস্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে – “জীবন ধমনীরও অতি নিকটে আল্লাহ্ অবস্থিত”। লালন সাঁই কোন্ পর্যায়ের সাধক হলে ঘোষণা দিতে পারেন-

“সে আর লালন একখানে রয়

   আবার লক্ষ যোজন ফাঁকরে”।

আল্লাহ্ওয়ালা বা আল্লাহ্ময় হওয়ার জন্য লালনের উপলব্ধি হলো –

“ধর চোর হাওয়ার ঘরে

ফাঁদ পেতে”।

জীবনের শেষ গানের শেষ কলি, যা গাইতে গাইতেই ইহলীলা শেষ করলেন তা নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য –

“পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে,

ক্ষম হে অপরাধ আমার

এ ভব কারাগারে,

পাপী অধম জীব হে তোমার

তুমি যদি না কর পার

দয়া প্রকাশ করে;

পতিত পাবন পতিত নাশন

বলবে কে আজ তোমারে”।

অতএব লালনকে লালন কারী ভক্তের মাঝে লালন ছায়া পড়বে কি?

প্রবাহ

বিবিসি বাংলার জরিপে
অষ্টম স্থানে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

দু’হাজার চার সালে বিবিসি বাংলা একটি ‘শ্রোতা জরিপ’-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিলো – সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? তিরিশ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০ জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় ২০০৪-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত।

বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ কুড়িজন বাঙালির তালিকায় অষ্টম স্থানে আসেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি বিদ্যাসাগর নামেই বেশি পরিচিত। উনবিংশ শতকের বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আধুনিক বাংলা ভাষার জনক বললে হয়ত ভুল বলা হবে না।

তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করেছিলেন এবং তিনি যে শুধু বাংলা ভাষাকে যুক্তিগ্রাহ্য ও সকলের বোধগম্য করে তুলেছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাঙালি সমাজে প্রগতিশীল সংস্কারের একজন অগ্রদূত।

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা ভগবতী দেবী।

তখন  গ্রামের যে বাড়িতে ঈশ্বরচন্দ্র বড় হয়ে ওঠেন সেই বাড়িটিতে এখন একটি পাঠাগারে সংরক্ষিত আছে বিদ্যাসাগরের ব্যবহৃত দুশ বই, আছে তার ব্যবহৃত কিছু সামগ্রী বিবিসি বাংলাকে জানান ওই গ্রামের বাসিন্দা গৌরহরি সিংহ।

ছেলেবেলায় গ্রামের পাঠশালাতে পড়তেন ঈশ্বরচন্দ্র। পাঠশালার পাঠ শেষ করে আরও শিক্ষালাভের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বীরসিংহ গ্রাম থেকে কলকাতায় পৌঁছান পায়ে হেঁটে, যখন তার বয়স মাত্র আট পেরিয়েছে- বিবিসি বাংলাকে বলেন বিদ্যাসাগরের তৃতীয় কন্যা বিনোদিনী দেবীর নাতি সন্তোষ কুমার অধিকারী।

“বীরসিংহ থেকে কলকাতা ৫২ মাইল পথ। তার ভৃত্য কিছুটা পথ তাকে কাঁধে করে নিয়ে গেলেও এই দীর্ঘ পথ তিনি মোটামুটি নিজে পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিয়েছিলেন।”

কাজের সূত্রে তখন কলকাতায় থাকতেন ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। কথিত আছে ঈশ্বরচন্দ্রের লেখাপড়ায় এতটাই আগ্রহ ছিল যে বাসায় আলো জ্বালার যথেষ্ট সামর্থ্য পরিবারের না থাকায় তিনি রাস্তার আলোর নিচে পড়াশোনা করতেন।

বিদ্যাসাগরকে নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন এবং বেশ কিছু বই লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের প্রাক্তন ডিরেক্টার জেনারেল ড. অমিয় কুমার সামন্ত।

‘কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ থেকে খুবই কৃতিত্বের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি নিয়ে পাশ করেন তিনি ১৮৪১ সালে এবং তখন থেকে তিনি হয়ে ওঠেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এরপর তাকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেড পন্ডিত পদে নিয়োগ করা হয়,” বলেন ড. সামন্ত।

সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সংস্কৃত কলেজে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।

“শিক্ষা ক্ষেত্রে তার প্রধান অবদান হচ্ছে দেশের সর্বসাধারণের জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা এবং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাথমিক শিক্ষার পাঠক্রম তৈরি করা,” বলছিলেন ড. সামন্ত।”ছয় মাসের মধ্যে তিনি বাংলার মেয়েদের জন্য প্রায় ৪০টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রপৌত্র মি. অধিকারী বলেন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিদ্যাসাগর সারা জীবন লড়াই চালিয়েছিলেন।

“বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন বাল্যবিবাহের অবসান ঘটাতে। বিধবা বিবাহ প্রচলন করে নারীর অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে, বহুবিবাহ রহিত করে নারীকে অবিচার ও যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি দিতে।”

প্রয়াত ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী এই অনুষ্ঠানমালা তৈরির সময় বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, সেই সময়ে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে মেয়েদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। “সমাজে মেয়েদের খুবই ছোট চোখে দেখা হতো। কিন্তু যে দরদ নিয়ে এবং যেভাবে সাহসের সঙ্গে বিদ্যাসাগর তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য লড়াই করেছেন, তার আর তুলনা নেই।”

বাংলায় নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ছিলেন নারীশিক্ষার বিস্তারের পথিকৃৎ। তিনি মনে করতেন, নারী জাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উদ্যোগী হয়ে কলকাতায় যে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটিই ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যাসাগর ছিলেন এই বিদ্যালয়ের সম্পাদক। এটি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত।

১৮৫৭ সালে বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং এক বছরের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে বাংলার বিভিন্ন জেলায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৩৫টির বেশি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

স্ত্রী শিক্ষার সূত্রপাত ও বিস্তারে তার অবদান ব্যাপক। শুধু স্ত্রী শিক্ষাই নয়, সমাজের সকল স্তরের মানুষকে বিদ্যাসাগর শিক্ষার আলো দেখাতে চেয়েছিলেন- বলছিলেন ড. উত্তম কুমার মুখার্জি, যিনি ২০০৪ সালে বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্রের নিজের হাতে গড়া বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

“গ্রামের যেসব মানুষ শিক্ষার আলো থেকে ছিল বঞ্চিত- বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ তাদের জন্য বিদ্যাসাগর মশাই প্রথম এই বীরসিংহ গ্রামে নৈশ স্কুল তৈরি করেছিলেন।”

কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত।মি. অধিকারী বলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতেও পারদর্শী ছিলেন।

“সাঁওতাল এবং দরিদ্রদের মধ্যে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। হোমিওপ্যাথি শিক্ষার জন্য তিনি বাড়িতে সেই সময় তার ষাট বছর বয়সে কঙ্কাল কিনে এনে অ্যানাটমি শিখেছিলেন।”

মি.অধিকারীর কথায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার একজন প্রাণপুরুষ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

“তিনি বলতেন, ছাত্রদের পাঠ্য গ্রন্থে ধর্মের কথা বলতে গেলে ছাত্রদের মন প্রথম থেকেই নিজের স্বাভাবিকতা থেকে ধর্মের দিকে চলে যায়। তিনি তাই বলেছিলেন শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে, পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মের কথা, ধর্মনীতির কথা বাদ দিয়ে দাও। এটাই ছিল বিদ্যাসাগরের সেক্যুলারিজমের মূল তত্ত্ব। তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন তার ধর্ম হল মানবতাবাদ – রিলিজিয়ন অফ হিউম্যানিটি।”

অক্সফোর্ডের ঐতিহাসিক প্রয়াত অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তার স্বাধীন চিন্তায়- শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন ঈশ্বরচন্দ্র শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে বারবার বলেছেন শিক্ষা হতে হবে যুক্তি-ভিত্তিক।

“সমাজের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মধ্যেই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। শুধু তাই নয় বাংলা সাহিত্যের বিকাশে তার অবদান ছিল অসামান্য। বাংলা গদ্যের যে সৃষ্টি হল, সেই গদ্য সৃষ্টিতে তার অবদান ছিল অপরিসীম।”

কলকাতার অধ্যাপক পবিত্র সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্ধৃত করে বলেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। “গদ্যকে দখল করে তাকে যথার্থ সৌন্দর্য দিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।” সর্বস্তরের জন্য শিক্ষা বিষয়ক বই, শিশুদের বর্ণপরিচয় থেকে শুরু করে সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন তিনি। তার কিছু কিছু পাঠ্যপুস্তক কয়েক প্রজন্ম ধরে বাঙালি শিশুদের মৌলিক শিক্ষার প্রধান বাহন হয়েছে।

“বাঙালি শিশুদের কাছে বেদগ্রন্থ ছিল তার লেখা বর্ণপরিচয়। বইটি এত সুন্দরভাবে সংগঠিত ছিল যে বেশ কয়েকটি প্রজন্মের এই বই থেকে অক্ষর পরিচয় হয়েছিল। বাঙালির স্বাক্ষরতা বিস্তারে এই বর্ণপরিচয়ের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। আর সেখানেই তিনি থামেননি। এর পরে লিখেছিলেন বোধোদয়, কথামালা এবং ধাপে ধাপে শিক্ষার একটা সিঁড়ি তৈরি করে দিয়েছিলেন,” বলেছেন পবিত্র সরকার।

১৮৪৭ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্থাপন করেছিলেন সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি নামে একটি বইয়ের দোকান। ওই বছরই এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় হিন্দি ‘বেতাল পচ্চিসি’ অবলম্বনে লেখা তার বই বেতাল পঞ্চবিংশতি। প্রথম বিরাম চিহ্নের সফল ব্যবহার করা হয় এই গ্রন্থে। বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে তিনি ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ নামে একটি ছাপাখানাও স্থাপন করেছিলেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একদিকে ছিল যেমন অসাধারণ বুদ্ধি ও মেধা, অন্যদিকে ছিল চরিত্রের কঠোরতা এবং সংগ্রামী মনোভাব।

সমাজ সংস্কারের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিরলস আন্দোলন সমগ্র বাঙালি জাতিকে নতুন পথে চলার রাস্তা দেখিয়েছিল। একটা আদর্শ স্থাপন করেছিল, একটা সংগ্রামের ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল, মন্তব্য করেছিলেন প্রয়াত অধ্যাপক তপন রায় চৌধুরী। ১৮৯১ সালের ২৯শে জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনাবসান হয় কলকাতায়।

সিরিয়ার ভূমি দখল করার ইচ্ছে নেই: আবারো এরদোগানের ব্যাখ্যা

সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশে সেনা পাঠানোর পক্ষে আবার সাফাই গেয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান। তিনি দাবি করেছেন, সিরিয়ার ভূমি জবরদখল করার কোনো ইচ্ছে আঙ্কারার নেই।

তিনি ইস্তাম্বুলে এক বক্তৃতায় দাবি করেন, সিরিয়ার শরণার্থীরা যাতে নিরাপদে তাদের ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে পারে সে লক্ষ্যে সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সিরিয়ায় তার দেশের সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

তিনি এমন সময় এ দাবি করলেন যখন সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে এসব তুর্কি সেনা পাঠানোর আগে তিনি বলেছিলেন, দু’দেশের সীমান্ত থেকে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূল করতে সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে।

সিরিয়ার ইদলিবে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্প্রতি পুতিন ও এরদোগানের মধ্যে সমঝোতা হয়।

ওই বক্তৃতায় সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার যে সমঝোতা হয়েছে সে সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, সিরিয়ার সেনাবাহিনী এ যুদ্ধবিরতি মেনে না চললে তাদের ওপর প্রবল আক্রমণ চালাবে তুর্কি সেনারা।

তুরস্ক গত বছরের ৯ অক্টোবর সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে অভিযান চালিয়ে সেখানকারী বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। সিরিয়ার সেনাবাহিনী যখন ইদলিবে তৎপর উগ্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছিল তখন তুরস্ক সন্ত্রাসীদের সমর্থনে ওই সেনা প্রেরণ করে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস: কেমন আছে বাংলাদেশের নারীরা?

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীদের অধিকার সচেতন করার এ দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ঘটা করে পালন করছে নানা নারীবাদী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহ।

নব্বই দশকের পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের অভ্যুদয়ের ফলে নারীদের মধ্যে একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। একইসাথে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির কারণে সমাজে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্র নারীদের অধিক সংখ্যায় আগমনের ফলে উচ্চ শিক্ষা শেষে নানামুখী পেশায় তারা এগিয়ে যেতে থাকে। 

সরকারি ও বেসরকারি নানামুখী পদক্ষেপের কারণে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সালের আরও কয়েক বছর আগেই বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীর সমতা অর্জন হয়ে যায়। বর্তমানে প্রাথমিকে ছাত্রীদের হার প্রায় ৫১ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে প্রায় ৫৪ শতাংশ। শিক্ষার এই দুই স্তরে নারী ও পুরুষের সমতার দিক দিয়ে ভর্তির বিষয়টি শুধু দেশের মধ্যেই নয়, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য’ প্রতিবেদন বলছে, সারা বিশ্বেই শীর্ষ অবস্থানে আছে।

সরকারের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে – কলেজ পর্যায়ে এখন নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার ৪৮ শতাংশের বেশি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার ৩৬ শতাংশের ওপরে।

অনুরূপভাবে, মাদ্রাসার প্রাথমিকস্তর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রীর হার সমান। দাখিল থেকে কামিল পর্যন্ত ছাত্রীদের হার ৫৫ শতাংশ।

এদিকে, চিকিৎসা, আইনসহ পেশাগত শিক্ষায় নারীরা এবার প্রথমবারের মতো পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছেন। পেশাগত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের হার এখন ৫৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর একটি সরকারি হাইস্কুল শিক্ষিকা নুরুন্নাহার মেরী জানালেন তার আত্মবিশ্বাসের কথা। তিনি রেডিও তেহরানকে বলেন, এখনো নারীর প্রতি বৈষম্য বিরাজ করছে। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, উন্নত দেশেও এ বৈষম্য শতকরা ১০০ ভাগ দূর করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের নারীদের নানামুখী উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের পাশাপাশি এখনো অনেক নারীই জানেন না আন্তর্জাতিক নারী দিবস কী জিনিস এমনকি এরকম কোন নামও শোনেননি। রাজধানী ঢাকা শহরের একজন গৃহপরিচারিকা অকপটে এমন অজ্ঞতার কথা জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী রাইহানা বললেন, নারীরা যদি তাদের দায়িত্ব সচেতন হন তবে তাদের অধিকার আপনা আপনিই এসে যাবে।

নারী অধিকার প্রসঙ্গে বরিশালের একজন ইউনিয়ন মহিলা নেত্রী রেডিও তেহরানকে বলেন, তারা এখন সমাজে যথেষ্ট অধিকার ভোগ করছেন। নারীরা যেভাবে শিক্ষা, চাকরি-বাকরি ও উপার্জনের পথে সাহসের সাথে এগিয়ে আসছেন তাতে তারা আরো স্বাবলম্বী হতে সক্ষম হবে। আর আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে পরিবারে এবং সমাজে  তাদের অধিকার আরো নিবিঘ্ন হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেছেন, নারীদের অধিকার রক্ষা ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবার ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ইতিবাচক কর্মসূচি বজায় থাকার কারণে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে শিক্ষার সব স্তরে নারীদের এগিয়ে নেয়াসহ গুণগত শিক্ষার জন্য এই খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে।

এত কিছু অগ্রগতি অর্জন সত্ত্বেও আলোর নিচে অন্ধকারের মতো বর্তমান সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও বেশি করে সোচ্চার হতে হবে বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকরা।

পরমাণু স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি দাবি নাকচ করল ইরান

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বুশেহর পরমাণু স্থাপনার নিরাপত্তা ইস্যুতে সৌদি আরবের দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-তে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি কাজেম গরিবাবাদি বলেন, সৌদি আরবের দাবি বিভ্রান্তিমূলক। তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থায় সৌদি আরব প্রযুক্তিগত বিষয়টিকে রাজনীতিকীকরণের চেষ্টা করেছে।

ইরানের বুশেহর পরমাণু স্থাপনা নিয়ে সৌদি আরব কী অভিযোগ করেছে তা বিস্তারিত উল্লেখ না করে গরিবাবাদি সম্প্রতি আইএইএ’র বোর্ড অব গভর্নবসের বৈঠকে বলেন, সৌদি আরবের দাবি বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে এবং চরম বিভ্রান্তিমূলক।

সৌদি আরব এর আগে কয়েকবার দাবি করেছে, ‘ইরানের বুশেহর পরমাণু স্থাপনা থেকে পারস্য উপসাগরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য তা বিপদের কারণ হতে পারে। এতে সৌদি আরবের পানি, বায়ু এবং খাদ্য দূষিত হতে পারে।’

পরমাণু স্থাপনার নিরাপত্তার বিষয়টি গরিবাবাদি আবারো জোরালোভাবে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এ পরমাণু স্থাপনার জন্য আইএইএ থেকে ইরান প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পাচ্ছে এবং এজন্য তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাটিকে ধন্যবাদ জানান। এছাড়া, নিয়মিতভাবে আইএইএ বুশেহর পরমাণু স্থাপনার সমস্ত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে বলেও তিনি জানান। পারস্য উপসাগরের তীর থেকে বুশেহর পরমাণু স্থাপনাটি ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। ইরান এ পরমাণু স্থাপনা থেকে ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে।

হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে প্রারম্ভিক আলোচনা – ‘নিয়ন্ত্রণে’ ‘সত্যমানুষ’র জীবনাদর্শ অনুস্মরণীয়

মহান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ  প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রারম্ভিক আলোচনা ২৫ মাঘ ১৪২৬, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদের সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর সূচনা বক্তব্য রাখেন বাহাখাশ সভাপতি শাহ্ শাহনাজ সুলতানা। আলোচনায় অংশ নেন হাক্কানী মিশন (হামিবা)’র সহ-সভাপতি শাহ ইমতিয়াজ আহমেদ, বাহাখাশ যুগ্ম সচিব অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াহেদ, নির্বাহী সদস্য আবু ইসহাক রাজু ও হামিবা শিক্ষা বিভাগের পরিচালক মোঃ রবিউল আলম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন আইসিডিডিআরবি’র রিসার্চার ডাঃ ফারজানা ইসলাম রূপা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন  বাহাখাশ মহাসচিব শাহ খাইরুল মোস্তফা। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু।

সূচনা বক্তব্যে শাহ্ শাহনাজ সুলতানা বলেন, কোন বিষয়ের ওপর লিডারশীপ থাকলে সেখানে নিয়ন্ত্রণ থাকে। তবে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অনুসরণ না-কি অনুসরণ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ সেটা সবার আগে নির্ধারণ প্রয়োজন।  চিন্তা-চেতনা-অর্থের অপব্যয়  সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-‘আপনারা অপচয় করবেন না’-সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর এই বাণীর উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে যেখানে প্রাইয়োরিটি (অগ্রাধিকার)দেওয়া হয় সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।

শাহ ইমতিয়াজ আহমদ বলেন,  নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট। নিয়ন্ত্রণ মানে লাগাম। কোনো বিষয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ বা লক্ষ্য স্থির হলেই সেখানে নিয়ন্ত্রণের কথাটি আসে। সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলতেন, আগে আপনারা লক্ষ্য স্থির করেন। তার পর লক্ষ্য পূরণের পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। প্রতিবন্ধকতাগুলোই মানুষকে লক্ষ্য হতে দূরে নিয়ে যায়।’ উদ্ভ্রান্ত হয়ে চললে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। লক্ষ্য পূরণের জন্য স্টিয়ারিংটা হাতে নিয়ে নিতে হয়। লক্ষ্য পূরণের জন্য সবচাইতে বড় বিষয়ই হচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ, সংযম এবং শান্ত থাকা। তাহলে শান্ত থাকার প্রক্রিয়াটা কী হবে? শান্ত থাকার সহজ পথ হচ্ছে গুরু বা মুর্শিদের নাম স্মরণ। এটা যার মধ্যে যত প্রবল তার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ তত প্রতিষ্ঠিত হবে। মুর্শিদের মুখনিঃসৃত সুনির্দিষ্ট কোন উপদেশ, বাক্য বা শব্দ-যদি কাউকে তিনি দিয়ে যান তা স্মরণ করে চলতে পারলেই সেখানে  নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গুরর এই উপদেশ, বাক্য বা শব্দই তার নিয়ন্ত্রণের লাগাম, মহৌষধ বা অ্যান্টিবায়োটিক। এই নির্দিষ্ট কোনো উপদেশ না থাকলে গুরুর নাম স্মরণ করতে পারলে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে সবার আগে।

অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াহেদ বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে সাধারণত আদেশ, উপদেশ, নিষেধ দ্বারা কোন কিছু পরিচালনা বুঝি যা করা হয় সংবিধান, আইন ও বিধি দ্বারা। আলোচ্য বিষয় ‘নিয়ন্ত্রণ’ মানুষের স্বভাব বা আচার-আচরণের সাথে সংশ্লিষ্ট। এই ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকে একটি পরিচালনা পদ্ধতি হিসাবে দেখছি। যা দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয় তাকে নিয়ন্ত্রক বলতে পারি। ব্যক্তি মানুষ তার প্রয়োজনে বা লক্ষ্য অর্জনে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এক একটি পরিচালনা পদ্ধতি অনুসরণ করে চলি।

জাগতিক জীবন-যাপনে আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে সংবিধান ও আইন। এই আইন দ্বারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কিন্তু মানুষের চিন্তা-চেতনার জগৎ কি এই আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়? নিজেকে করলে এই প্রশ্নটির উত্তর আসে- হয় না।

মানুষের সকল কর্মের উৎস হচ্ছে তার চিন্তার জগৎ। এই চিন্তার ফলেই ব্যক্তি তার কর্ম পরিচালনা করে একটি পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি চেতনে বা অবচেতনে কাউকে না কাউকে অনুসরণ করতে থাকে যে তার কর্মের নিয়ন্ত্রক হিসাবে বা নেতা হিসাবে কাজ করে। আর একজন যোগ্য নেতাই তাকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতায় তাকে অনুসরণের ভেতর দিয়ে তার স্বভাবের পরিবর্তন আসে। এভাবেই একজন আর একজনকে অনুসরণ করে সমাজ ও রাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রকের বা নেতার উত্তরসূরী হয়ে উঠে।

মহা বিশ্ব কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় বা তার পরিধি কতটুকু তা এখনও মানুষের অজানা, অচেনা। তেমনি মানুষের চিন্তা-জগত ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হয়। তাই একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু মানুষ যখন স্বইচ্ছায় আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতায় কাউকে অনুসরণ করে চলতে থাকে তখন-ই সে আত্মবোধে নিজের স্বভাবকে নিজ যোগ্যতায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তখনই তার নিজ ধর্ম ও স্বভাবের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। তখন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও আইন দ্বারা আবদ্ধ থাকার বিষয় থাকে না। আপন ধর্মে আত্ম নিয়ন্ত্রণে কর্ম-মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় স্বচেষ্ট থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

আত্মদর্শন হচ্ছে সত্য দর্শন। এই দর্শনের ধারায় সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন- সূফী সাধক আনোয়ারুল হক- সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ তাঁরা তাঁদের যাত্রাপথে আমাদেরকে প্রচেষ্টারত হিসেবে গ্রহণ করে আমাদের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ উন্মুক্ত করে অসীমে যাত্রা করেছেন।

আবু ইসহাক রাজু বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ কথাটা খুবই ছোট। কিন্তু এর গভীরতা অনেক। সাধকের কথা, তাঁর চিন্তা-চেতনা-আদেশ-উপদেশ-নির্দেশ মেনে চললে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। জীবন চলার পথে প্রতিটা বিষয়ে সাবধানতা-সতর্কতা সবকিছু ব্যক্তির আমার-আপনার নিজের মধ্যেই। ‘স্বীয় জিহ্বা শাসনে রেখো, পলকে পলকে মুর্শিদ রেখো’, ‘নিজের বিচার নিজে করো রাত্র-দিনে’-‘সত্যমানুষ’-মহান সূফী সাধকের এইসব বাণী কি আমি ধরে রাখতে পারি? আমি কি এর মধ্যে আছি-এই প্রশ্ন আমার নিজের মধ্যেই। ছোট-বড় সকল কাজে সাধককে ধরে রাখলে, স্মরণে রাখলে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যদি মালিকে চান, অর্থাৎ কৃপা করেন-এটা আমার উপলব্ধি। সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-তাঁর সকল কর্মই আমাদের জন্য অনন্য রূপ নিয়ে আসে। তাঁর হাঁটা, চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, কথাবার্তা, আচার-ব্যবহার এবং সর্বোপরি মানুষকে তিনি যেভাবে সম্মান দিতেন সেটা আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুস্মরণীয়। তিনি আমাদের জন্য এক মডেল হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন যার জন্য তাঁর সকল কিছুই আমার জন্য শিরোধার্য। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টায় তাঁর অনুসারী হয়ে ‘সত্যমানুষ’ হওয়ার চেষ্টায় রত থাকবো।  

 ডাঃ ফারজানা ইসলাম রূপা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, আমার জন্য নয়। এটা তিনটা জায়গাতেই কাজ করে, এটা শুরু হয় ব্যক্তিগত জীবনে, নিজের রাষ্ট্রে এবং তারপর ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে। সব জায়গাতেই নিয়ন্ত্রণের খুব বেশি প্রয়োজন। যদি আমরা আমাদের মঙ্গল চাই, আমাদের সমাজের মঙ্গল, দেশের মঙ্গল এবং অবশ্যই পুরো পৃথিবীর মঙ্গল। এখানে যারা কথা বলেছেন, তাদের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে যে, আপনারা এটার চর্চা করেন। আরেকটা কথা ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’-এভাবেই আমরা শুনে এসেছি। কিন্তু আজকে এখানে যেটা শুনলাম- ‘সবার ওপরে সত্যমানুষ’-এই যে-মতে আপনারা বিশ্বাসী বা যে ফিলোসোফিতে আপনারা চলেন, তার মূল কথা ‘সত্যমানুষ’। আমার মনে হয় যে, এখান থেকে যাওয়ার সময় আমার ধারণাটা একটু চেঞ্জ করে নিয়ে ‘মানুষসত্য’ না ভেবে ‘সত্যমানুষ’-এই কথাটা চিন্তা করবো। যেহেতু আমি ডক্টর এবং অনেকের সাথে মেলামেশা করি। আমি ঢাকায় থাকলেও আমি মা এবং বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করি তাদের কল্যাণে । ফরিদপুরে আমি খুব বেশি থাকি, সেটা আমার দেশ। আমি যেখানেই যাবো, আপনারা যদি পারমিশন দেন এখন থেকে সবাইকে বলবো যে, ‘মানুষ সত্য না,’ কথাটা হচ্ছে ‘সত্যমানুষ’। সবাইকে ধন্যবাদ।

সভাপতির বক্তৃতায় শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মহান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ’এর জীবন ও আদর্শ এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুস্মরণীয়। ‘সবার ওপরে সত্যমানুষ’। আমাদের সৌভাগ্য এই যে, এই ‘সত্যমানুষটি’কে সরাসরি দেখার সুযোগ আমরা পেয়েছিলাম। ওনি কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন সেটা উপলব্ধি করতে পারলেই আমরা ‘সত্যমানুষে’র সহযাত্রী হওয়ার প্রচেষ্টায় রত থাকতে পারবো।