ভিতরের পাতা

হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ে মত বিনিময় সভা ও পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষাথীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত….

হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ে

মত বিনিময় সভা ও পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষাথীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান

20191029230235_IMG_3244

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ১৪ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ৩০ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার বিদ্যাপীঠের ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্মানিত সদস্য, শিক্ষকমন্ডলী, সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয় শিক্ষার গুণগত মান নির্ণয়ের লক্ষ্যে অভিভাবক মত বিনিময় সভা এবং সেই সাথে পিইসি ও জেএসসি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ১১নং ওয়ার্ড, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সম্মানিত কাউন্সিলর জনাব দেওয়ান আবদুল মান্নান এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিরপুর থানা, ঢাকার সম্মানিত  থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, জনাব আবদুল কাদের ফকির।  এই সময় বিদ্যাপীঠের প্রায় ৬৫০জন ছাত্র – ছাত্রী ও অভিভাবকদের মিলন মেলা হয়।

জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সকাল ১০.০১ মিনিটে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। তারপরই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর শিক্ষা প্রকল্পের সম্মানিত পরিচালক ছাত্র – ছাত্রী ও সম্মানিত অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে তাঁর স্বাগত বক্তব্য রাখেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে ২০২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিদ্যাপীঠের পড়ালেখার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা সকলের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বিদ্যাপীঠকে স্বপ্নের স্কুল তৈরি করার লক্ষ্যে বিদ্যাপীঠের ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আহবান জানান। তিনি বলেন, আর দশটি বিদ্যালয় থেকে আদর্শিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ভিন্নধর্মী একটি বিদ্যালয় হলো হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়। তাই এই বিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে সকলের সহযোগিতা একান্ত কাম্য। তিনি ২০২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন রূপে নতুনভাবে বিদ্যাপীঠের সমস্ত কর্মকান্ড চলবে বলে আশ্বাস দেন যার মাধ্যমে বিদ্যাপীঠ অত্র এলাকার মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা পোষণ করেন।

এরপর সম্মানিত অভিভাবকরা বিদ্যাপীঠ নিয়ে তাঁদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জনাব মো. আলী আকবর এবং সীমা আক্তার।

১০.৩০ মিনিটে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জনাব দেওয়ান আবদুল মান্নান শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে তাঁর মূল্যবান দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাঁদের সন্তানদের শুধুমাত্র বেশি নম্বর পেয়ে ভাল ফলাফলের দিকেই লক্ষ্য না রেখে তারা যেন ভাল মানুষ হতে পারে সেই দিকে বেশি নজর দেন। তিরি আরো বলেন, একজন ছাত্রের মধ্যে যে ছাত্রসুলভ আচরণ দেখা যায় অর্থাৎ তার কথা বার্তায়,পোশাক পরিচ্ছেদ, চলাফেরায় ছাত্র সুলভ ভাব বজায় থাকে সেদিকটা লক্ষ্য রাখার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহবান জানান। সন্তানদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকার গুরত্ব সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মেন করেন এবং  সন্তানদের প্রতি  মাকে আরো বেশি সচেতন হওয়ার আহবান জানান।

এরপর বক্তব্য রাখেন মিরপুর থানার সম্মানিত থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জনাব আবদুল কাদের ফকির। তিনি ছাত্র- ছাত্রীদের সৎ ও সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠার আহবান জানান।

বিদ্যাপীঠের ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্মানিত অভিভাবক প্রতিনিধি জনাব পারভিন আক্তার এবং জনাব মো. নুরুল ইসলাম ছাত্র – ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য ব্যক্ত করেন।

সকাল ১১.০০ টায় গত এক মাসের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতি শ্রেণি থেকে দুইজন করে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত করে তাদের মধ্যে সম্মানসূচক সনদপত্র বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সনদপত্র তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জনাব দেওয়ান আবদুল মান্নান। এছাড়াও বিদ্যাপীঠের চারজন শিক্ষককে বিদ্যাপীঠে তাঁদের অধিকতর সেবামূলক ভূমিকা পালনের জন্য শ্রেষ্ঠ কাউন্সিলর হিসেবে মনোনীত করা হয় এবং তাঁদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করা হয়। কাউন্সিলরা হলেন জনাব হাসনা আক্তার, জনাব ফারজানা ইয়াসমিন, জনাব মো. আমিরুল ইসলাম এবং জনাব মীর নাজির হোসেন।

এরপর শুরু হয় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব। এই পর্বে পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করা হয়। এরপরই পরীক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ৮ম শ্রেণির পরীক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম নূর তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে।

সকাল ১১.৪৫ মিনিটে পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং সবশেষে তবারক বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সঠিক নেতৃত্বই সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়

‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের ৫ম পর্বের আলোচনা

সঠিক নেতৃত্বই সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে আলোচনার ৫ম পর্ব  গত ১১ কার্তিক ১৪২৬, ২৬ অক্টোবর ২০১৯ রোজ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ সভাপতি শাহ্ শাহনাজ সুলতানার সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশ নেন বাহাখাশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মহাসচিব শাহ খায়রুল মোস্তফা এবং হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা)’র নির্বাহী সদস্য সালেহ্ আল দ্বীন (সঙ্গীত)। আলোচনা পর্বটি সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

শাহ্ খায়রুল মোস্তফা বলেন, নেতৃত্ব কীভাবে দিতে হয়, নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কী কী কাজ বা দায়িত্বপালন করতে হয় তা আমাদেরকে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ দেখিয়ে গেছেন। এই মহান সাধক-এঁর গুণাবলী বা কর্মসমূহের একটা বিষয় কেউ ধারণ-পালন-লালন করতে পারলে তার অন্য কিছু আর লাগবে না, তার আর অন্য কিছু লাগে না। তাঁর আদেশ-নিষেধ-উপদেশ মেনে চললে নেতৃত্ব গুণ অর্জন হবেই হবে। ওনার আদর্শকে ধারণ করে কর্ম করে যেতে পারলে, ওনাকে স্মরণে রেখে এগিয়ে গেলেই হবে, কোথায় কেউ বাঁধাগ্রস্ত হবেন না। সাধক-এঁর কথা কখনও ভুল হবে না, ভুল হতে পারে না। সত্যের পথে থাকলে কেউ কখনো বাঁধাগ্রস্ত হয় না, হবে না। তাই তো তিনি বলেছেন, ‘সত্য বলুন, সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হোন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’।

সালেহ আল দ্বীন  বলেন, আভিধানিক অর্থে নেতৃত্ব হচ্ছে একটি জনগোষ্ঠী, দেশ বা সমাজ বা কোনও সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্রিয়া বা কাজ। নেতৃত্ব কেন দরকার? – যে-কোন গোষ্ঠী/সংস্থা/দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। একজন চালক ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, তেমনি নেতা ছাড়াও নেতৃত্ব হয় না। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। দক্ষ একজন চালক ছাড়া যেমন গাড়ির দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়, ঠিক তেমনি একজন যোগ্য নেতার হাতে নেতৃত্ব না পড়লে সেই গোষ্ঠী/ সংস্থা/সমাজ/দেশ দুর্ঘটনার দিকেই এগিয়ে যাবে-এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আমাদের চারপাশে নেতার অভাব নেই, কিন্তু সবাই কি যোগ্যতা অর্জন করে নেতা হয় বা নেতৃত্ব দেয়। নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সবাই কি প্রয়োজন বোধ করে? ‘আমি সব জানি বা আমি সব সময় সঠিক’ এই মনোভাব থাকলে কি আর কিছু শেখার থাকে? যেহেতু নেতৃত্ব একটি প্রক্রিয়া, সেজন্য শেখার মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করেই নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। একমাত্র সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই একটি সংস্থা/গোষ্ঠী/ সমাজ/ দেশকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

একজন নেতাই সব পারেন, তিনিই অন্যদের খোঁজ-খবর নেন। দুঃখের সময় পাশে দাঁড়ান এবং বিষন্নতা থেকে তাঁর মানুষদের রক্ষা করেন। যে-কোনো কঠিন মূহুর্তে তাঁর মানুষদের পাশে থাকেন এবং তাদেরকে সঠিক পথের নির্দেশনা ও ভরসা দেন। যে-কোনো সমস্যার সমাধান তিনি দেন এবং সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেন। যোগ্যতাহীন একজন ব্যক্তিকে সময়ের সাথে সাথে যোগ্য করে তোলেন। নেতৃত্বের সুন্দর একটা উদাহরণ আমরা পিঁপড়ার মধ্যে দেখতে পাই। কী সুন্দর একটা দৃশ্যপট! একটা পিঁপড়ার পেছনে পেছনে অন্য সব পিঁপড়া সারি বেঁধে অনুসরণ করে চলে। একটুও এদিক-ওদিক হয় না সারি-এমন একটি দৃশ্য আমার জন্য অবশ্যই শিক্ষণীয় ও দিকনির্দেশনামূলক বিষয়। এই দৃশ্য দেখে আমার মধ্যেই প্রশ্ন উদ্ভূত হয়-আমি কি পেরেছি বা পারছি আমার নেতাকে এভাবে অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে?

সালেহ আল দ্বীন আরও বলেন,  আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে আমি একমাত্র ‘সত্যমানুষ-এঁর’ মধ্যে নেতৃত্বের এই গুণাবলী দেখতে পেয়েছি। আমার দৃষ্টি মোটেও প্রসারিত নয়। তাই অল্প কিছু যা ধরা পড়েছে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এসবের কোনোটাই নিজের চর্চার মধ্যেই আনতে পারিনি। আমার দৃষ্টিতে তিনিই একজন নেতা, যিনি সূক্ষ্ম, গভীর এবং সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দেন, পথ দেখান। যার চোখে প্রত্যেকটি প্রাণীকূল সমান। যিনি প্রত্যেককে আশার আলো দেন। তাঁর কাছে শেষ বলে কোনো শব্দ নেই। যোগ্যতার অভাব-বিষয়টিকে এভাবে না তুলে একজন কীভাবে যোগ্যতা অর্জন করতে পারে সে পরামর্শ দেন। দৃঢ়ভাবে কীভাবে একটি সিদ্ধান্তে দাঁড়িয়ে অটল থাকতে হয় সেই উদাহরণ দেন। সত্যের পথে সর্বদা কীভাবে নিয়োজিত রাখা যায় এবং মিথ্যাকে প্রশ্রয় না দেয়া যায় সে শিক্ষা দেন। তিনি উদাহরণ দেন কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। তিনি পথ দেখান – ভালোবাসা এবং প্রেমের মাধ্যমে সবকিছুই অর্জন করা সম্ভব।

সভাপতির সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় শাহ্ শাহনাজ সুলতানা হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর ‘সত্যমানুষ হোন-দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’-এই আহবানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, হাক্কানী সাধকের এই বাণীর যথার্থ অনুসরণ নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনে আমাদের সহায়ক হতে পারে।

মৃত্যু বলে কিছু নেই আছে রূপান্তর….

S M Shah Nawaj ali

সংলাপ ॥ কালের নিরবিচ্ছিন্ন প্রবহমান স্রোতে জীবন আসে, জীবন যায়। এ অমোঘ সত্য সকলেরই জানা। তবু জীবনের নতুন আগমনী বার্তায় মানুষ আনন্দিত হয়। কাঙ্খিত ঔৎসুক্য নিয়ে সে অধীর প্রতীক্ষায় থাকে, রোমাঞ্চিত হয় নতুন জীবনের বার্তা শুনবে বলে। যখনই সেই প্রত্যাশার যথার্থ প্রতিফলন ঘটে তখনই সে উৎফুল্ল হয়। আনন্দের বাধভাঙা স্রোতধারায় অবগাহন করে সে শুকরিয়া জানায় কাল ও কাল-স্রষ্টাকে। কিন্তু সেই কাঙ্খিত জীবন যখন কালেরই নির্মম নিয়মে চলে যায় দৃষ্টির আড়ালে ব্যাথাতুর হৃদয় তখন হাহাকার করে ওঠে। প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় কষ্টে মথিত হয় স্বজনেরা। এও সত্য বড়। স্নেহ-প্রেম-ভালবাসা-মায়া-মমতা’ – এই সব তরল ও সরল স্বভাব নিয়ে তরলিত হৃদয় আনন্দ-বেদনার দোলাচলে দুলবেই।

তবু এই সত্য মেনে নিতে কষ্ট হয়। মন মানে না। কিছুক্ষণ আগেও অস্তিত্বমান জীবন কেন হারিয়ে যাবে, নিঃশেষ হয়ে যাবে চিরতরে! এ কেমন ভাঙনের খেলা? যুথবদ্ধ জীবনের লালিত স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে কেন বেজে ওঠে বিদায়ের সুর? পার্থিব সংসারে যাপিত জীবনের সকল বন্ধন ভেঙে ফেলে কোন্ আহবানে জীবন ছুটে যায় স্বজন-সংসার ছেড়ে? অনেক যত্নে তিল তিল শ্রমে ও ঘামে, মেধায় ও মননে, মায়া ও মমতায়, স্নেহ ও ভালবাসায়, ভক্তি ও প্রেমে গড়ে তোলা আপন সংসার ও স্বজন রেখে কেন, কীভাবে চলে যায় মানুষ? কেমন করে সম্ভব?

স্বজন হারানো চিত্তে এমন হাজারো প্রশ্নের তীর ঘাতক কাটার মত বার বার আঘাত করে। শোকাতুর স্বজনেরা তখন ব্যথিত চিত্তে খোঁজে উত্তর, সামান্য স্বান্তনা। কিন্তু কোথাও কি তা মেলে? এমনই নির্মম আঘাতে স্বজনদের জর্জরিত করে দিয়ে স্বান্তনাহীন এক দুর্বোধ্য কালিক সত্যের হাত ধরে বিদায় নিয়েছেন এস. এম. শাহ্ নওয়াজ আলী। সত্যে বিলীন হয়েছেন তিনি। আর চরম সত্য রেখে গেছেন ১২ নভেম্বর, ২০০২কে তাঁর স্বজনদের কাছে। সত্যের আগুনে ঝলসানো স্বজনেরা সংযমের সে মাসের দীক্ষাকে ধারণ করেছেন নির্বিকার চিত্তে। সত্য সুন্দর বটে। তবে সত্যের নির্মম কাঠিন্যই বুঝিয়ে দেয় – ‘এ জগৎ স্বপ্ন নয়।’ বিগলিত, স্বপ্নাতুর মানুষের পক্ষে তাই সব সময় সত্যকে মেনে নেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবু মেনে নিতে হয়। জাগতিক জীবনের ঘূর্ণিপাকে অস্থির চিত্ত নতুন আশ্রয় খুঁজে নেয়। এও সত্য। তখন ঘটমান সত্য হয়ে যায় স্মৃতি। ফ্রেমে বাধা পড়ে সেই সত্য ঠাঁই নেয় অন্তরালে স্বজনেরই হৃদয়ে। এস. এম. শাহ্ নওয়াজ আলী আজ বাধা পড়েছেন অন্তরের ফ্রেমে। স্মৃতির সবুজ দিগন্তে তাঁর অসীম যাত্রা।

ঘটমান সত্যের উর্বরা ভূমি খুঁড়ে যে কেউ বলবে কেমন দরদীপ্রাণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন শাহ্ নওয়াজ। কর্তব্য ও দায়িত্ব বোধে সজাগ চিত্ত শাহ্ নওয়াজ নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন আজীবন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীটা শুধু সার্টিফিকেট হয়েই থাকেনি, সমাজ-সংসারে সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছেন পুরোদস্তুর। আত্মীয়-স্বজনের মাঝে যখন যে কেউ বিপদগ্রস্ত হয়েছেন নির্বিঘ্নে চিত্তে দ্বিধাহীন ভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্বজন বলেই নয়, মানুষের জন্য মানুষের এই টান, আকর্ষণ, মহব্বত, কর্তব্যবোধই একজন মানুষকে মহত্ত্বের অবস্থানে আসীন করে। এটাই একজন মহৎ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। মানুষ যে মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এটাই তার মূল কারণ।

নির্দ্বিধায় বলা যায় কেবলমাত্র এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বছরের পর বছর ধরে স্মরণের মাঝে জাগ্রত আছেন মিরপুর আস্তানা শরীফে। ১৯৭৮ থেকে ২০০২ দীর্ঘ ২৪ বছরের চাকরি জীবনে দায়িত্ব সচেতন, সৌহাদ্যপূর্ণ এবং দক্ষ ব্যক্তিত্বে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মানুষকে আপন করে নেয়ার আদবটা ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন তিনি আস্তানা শরীফ হতে। তাই তিনি তা পারতেন সবার মঙ্গলার্থে। আর পারতেন বলেই তিনি এতটা আপন হতে পেরেছিলেন নির্বিশেষে সবার কাছে। এ জন্যেই তাঁর প্রয়াণের সত্যতাকে সহজে মেনে নিতে পারেননি, এখনো পারছেন না তাঁর স্বজনেরা। এ যেন অবিশ্বাস্য এক দুর্ঘটনা। এ মেনে নেবার নয়। যুক্তির উর্ধ্বে।

শুধু সমাজ-সংসার নয়, মাঙ্গলিক চিন্তার পূজারী শাহ্ নওয়াজ আলী দেশমাতৃকার জন্যেও ছিলেন সচেতন। তারুণ্যের দুর্দান্ত সময়টাকে তাই তিনি বিফলে নষ্ট করেননি। শত্রুর মুঠো আগলে দেশকে মুক্ত করতে হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে গর্বিত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু কখনো এই পরিচয়কে ভাঙিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নেননি তিনি। বাঙালি হিসাবে দেশ, দেশের রাজনীতি, জাতি, জাতীয়তা তাঁকে ভাবিয়েছে বার বার। দেশের চলমান অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা, বৈষম্য, অনিয়মে তাঁর উদ্বেলিত কণ্ঠের নানা কথা আজও তাঁর চারপাশের মানুুষের স্মৃতিপটে ভাসমান। একটি সুন্দর শান্তিময় বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। জাতীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে তাঁকে ১৩ নভেম্বর ২০০২ সনে মিরপুরের কালসী গোরস্থানে। শুয়ে আছেন ঘুমে মগ্ন হয়ে মায়ের পায়ের কাছে ভাই, ভাইপো ও বড় ছেলের সাথে।

তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – ‘দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা’ তাঁকে সম্পৃক্ত করেছে মানব কল্যাণমূলক কর্মকান্ডে। তিনি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মিরপুর আস্তানা শরীফের সঙ্গে। উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য হিসেবে একাত্ম হয়েছেন দরবারের সার্বিক কর্মকান্ডে। শুধু তাই নয় হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের লক্ষ্য – ‘ধর্ম মানবতার জন্য’ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন মিশনের ধর্মভিত্তিক মানব কল্যাণমূলক নানাবিধ কর্মকান্ডে। বাইরের আবরণ হয়ে নয়, রুধির ধারার মতই গোপনে নিজের কল্যাণিক ভূমিকাকে তিনি সতত প্রবহমান রেখেছেন। তাই তাঁর অবদানকে ভোলা যায় না। একজন ‘দরবারী ও মিশন-সদস্য’ হয়ে তিনি যে নিদর্শন রেখে গেছেন তা অবশ্যই দৃষ্টান্ত স্বরূপ এবং থাকবে চির অম্লান।

আব্দুল হামিদ ও সাজেদা খাতুনের আশীর্বাদপুষ্ট সন্তান শাহ্ নওয়াজ আলী সকল বন্ধনকে অতিক্রম করে আত্মব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন স্বজনের অন্তরে অন্তরে। তিনি চলে গিয়েও আছেন। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনও। থাকতেই হবে। সত্যের চূড়ান্ত সত্য তুলে ধরতে তিনি আমাদেরই মাঝেই যে ‘বর্তমান’ ॥

মহানবীর আবির্ভাব ও লোকান্তর কি একই দিনে?

(আবির্ভাব ১২ রবিউল আউয়াল, লোকান্তর ১ রবিউল আউয়াল-ঐতিহাসিক দলিলে প্রমাণিত)

শাহ ড. আলাউদ্দিন আলন ॥ মহান রাব্বুল আলামিনের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলেন নুরে মোহাম্মদী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। তাঁকে সৃষ্টির মাধ্যমেই আল্লাহপাক সৃষ্টির লীলা শুরু করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে কুদসীতে এরশাদ হয়েছ: “লাউলাকা লামা খালাকতুল আফলাক” অর্থাৎ  হে হাবিব) আমি আপনাকে সৃষ্টি না করলে কোন কিছুই সৃষ্টি করতাম না।”

এ বিষয়ে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) অন্যত্র বলেছেন: “আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নুরী, আনা মিন নুরিল্লাহ ওয়া কুল্লু শাইয়্যিন মিন নুরী”- অর্থ-‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নুরকে সৃষ্টি করেছেন; আমি আল্লাহর নুর হতে আর সমস্ত সৃষ্টি আমার নুর হতে’। সৃষ্টি জগতের প্রাণ হলো  মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। যাকে সৃষ্টি করা না হলে কিছুই সৃষ্টি হতো না বলে স্বয়ং আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন সেই মহান রাসুলের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ধুলির ধরায় শুভ আবির্ভাব জগৎবাসীর জন্য যেমন আনন্দের তেমনি তাঁর ওফাত দিবস বেদনার যদিও ‘আল্লাহর বন্ধুদের মৃত্যু নেই’ কোরআনের ঘোষনা। জগৎজুড়ে প্রচলিত রয়েছে মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং ৬৩ বছর হায়াতে জিন্দেগী সমাপ্ত করে ঐ একই তারিখে অর্থাৎ ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন। মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর আবির্ভাব ও ওফাত দিবস একই দিন ও তারিখে এ বিশ্বাসের কারণে মানবজাতি তাঁর শুভ আবির্ভাব ও ওফাত দিবস কোনটিকেই গুরুত্ব দিয়ে পালন করে না। সুতরাং ধারণা অনুযায়ী শুভ আবির্ভাব ও ওফাত একই তারিখে হবার কারণে মানবজাতি তথা মুসলিম জাতি আনন্দ করবে না দুঃখ করবে/ শোক পালন করবে এ বিষয়ে দ্বিধা দ্ধন্ধে জর্জরিত। এহেন দ্বিধা দ্বন্ধের ফলে মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর শুভ জন্মদিন অপরিসীম রহমত ও বরকতপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান জাতি তা পালন করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিলাদি হতে প্রমাণিত হয় রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর শুভ আবির্ভাব এবং ওফাত দিবস একই তারিখে নয়।

ইসলামের ইতিহাস গ্রন্থসহ অসংখ্য গ্রন্থে বিশেষ করে মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনী মোবারক নিয়ে লিখিত গ্রন্থ সমূহে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি হিজরী পূর্ব ৫৩ সনে ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবেহ সাদিকের সময় জন্মগ্রহন করেছিলেন এবং ঐ একই তারিখে ওফাত লাভ করেছিলেন। এ বিষয়ে বিখ্যাত লোক ও গবেষক ড. ওসমান গণি রচিত মহানবী গ্রন্থের ১২৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: “মা আমিনা ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ৮ জুন, ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার উষার শুভলগ্নে একটি পুত্র সন্তান আবির্ভাব দেন।” উক্ত গ্রন্থের ৩৮৪ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন: “শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে ‘হে আল্লাহ, হে আমার পরম বন্ধু এই বলে ৬৩ বছর বয়সে মহানবী আল্লাহপাকের দিদার লাভের জন্য ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন, ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার পরলোক গমন করলেন।”

মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস:

রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)হলেন- সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তিনি আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে যেমনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাকামের অধিকারী তেমনি ব্যক্তি জীবনেও ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শের অধিকারী। তাঁর কাছ থেকেই আমরা লাভ করেছি সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কোরআন। সুদীর্ঘ ২৩ বছরের নবুয়তী জীবনের প্রতিটি ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং তিনি এই সময়ে একটি বর্বর জাতিকে ক্বালবী জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করে একটি সুশৃংখল আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। অথচ আলী (রাঃ), আবু বকর (রাঃ), ওমর (রাঃ), ওসমান (রাঃ), যায়েদ (রাঃ), আবু জর গিফারী (রাঃ) এর মতো বিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও আদর্শবান সাহাবী থাকার পরও তার কি প্রিয় নবীজির ওফাত দিবসের সঠিক তারিখটি লিপিবদ্ধ করে যাননি? রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) তো লোকচক্ষুর অন্তরালে ওয়াফ লাভ করেননি বরং সবার সামনে হাসিমুখে ওফাত লাভ করেছিলেন। তাহলে দয়াল রাসুলের ওফাত দিবসের সঠিক তারিখ বিষয়ে আমাদের মধ্যে অত বিভ্রান্তি কেন? প্রকৃত সত্য হচ্ছে আমরা চক্রান্তের শিকার। নিত্য নতুন পুস্তক রচনার মাধ্যমে উমাইয়া খ্রীষ্টান ইয়াহুদি চক্রান্তের বেড়াজালে পড়ে আমরা প্রকৃত সত্য থেকে দুরে সরে পড়েছি। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে সত্যকে আড়াল করে রাখা যায় না। তাই অপরিসীম আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাধনার দ্বারা সাধকগণ প্রমান করেছেন রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার। পবিত্র কোরআন, হাদিসের দলিল, ঐতিহাসিক তথ্য ও গবেষণার অকাট্য দলিল দিয়ে যুক্তি প্রমানের নিরীখে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবসের সঠিক তারিখ নির্ধারণ করে মানব সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দুর করেছেন।

সংস্কারের স্বপক্ষে উপস্থাপিত দলিল ও প্রমাণঃ

নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১২ই রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু তার ওফাত দিবস ১২ই রবিউল আউয়াল নয় বরং তা হচ্ছে ১লা রবিউল আউয়াল। নিম্নে পবিত্র কোরআনের আয়াত এবং হাদিসের বর্ণনা, তাফসীর গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক গবেষণা গ্রন্থ হতে তথ্য উপাত্ত দিয়ে সংস্কারকৃত বিষয়টি উপস্থাপিত হলোঃ

প্রমাণ- ১: আল কোরআনের আয়াত নাযিলের তারিখ

পবিত্র আল কোরআনের সুরা মায়েদার ৩নং আয়াতটি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর উপর অবর্তীর্ণ সর্বশেষ আয়াত যা হিজরী ১০ম বর্ষের ৯ই জ্বিলহজ্জ তারিখে বিদায় হজ্জের সময় আরাফার প্রাঙ্গনে নাযিল হয়েছিল। আয়াতটি হলোঃ “আল ইয়াউমা আকমালতু লাকুম দিনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নিইমাতি ওয়া রাফিতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা।” অর্থঃ আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পূর্ণতা প্রদান করলাম। আমার নেয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে (শান্তিতে) একমাত্র ধর্ম হিসাবে কবুল করে নিলাম। বর্ণিত আয়াতটি অবর্তীর্ণ হওয়ার স্থান, দিন, তারিখ ও সময় নিদিষ্ট হওয়ায় এ তারিখটিকে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবসের তারিখ নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে গ্রহন করা যায়। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর ঠিক কতদিন পর রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওফাত লাভ করেছিলেন এ বিষয়ে তাফসীরে মা’রেফুল কোরআন, তাফসীরে দুররে মানসুর, তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে মাযহারী ও তাফসীরে ইবনে কালির এ বর্ণিত দলিলাদি ও সাহাবায়ে কেরামগনের তথ্য নিম্নে উপস্থাপিত হলো:

এক: বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: বর্ণিত আয়াতটি ১০ম হিজরীর ৯ই জিলহজ্জ তারিখে নাজিল হয়। এরপর রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) মাত্র ৮১ দিন পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন। [সূত্র: তাফসীরে আ’রেফুল কোরআন]

দুই: তাফসীরে দুররে মানসুর এর ৩য় খন্ডের ২০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে- “ওরা আখরাজা ইবনু জারিরেন আল ইবনে জুরাইজিন ক্বালা মাকাসান নাবিয্যু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাআদা মা নাজালাত হাজিহিল আয়াতু ইহদা ওয়াসামানিলা লাইলাতান”। অর্থঃ ইবনে জারীর কর্তৃক ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) একাশি রাত দুনিয়াতে অবস্থান করেন।”

তিন: তাফসীরে তাবারীর ৪র্থ খন্ডের ৮০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- “হাদ্দায়ানা হাজ্জজু আল ইবনে জুরাইজিন ক্বালা মাকাসান নাবিয্যূ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাআদা সা নাজালাত যাজিহিল আয়াতু ইহুদা ওয়াসামানিনা লাইলাতান।” অর্থ: হাজ্জাজ ইবনে জুরাইজ হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ৮১ রাত রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) জীবিত ছিলেন।”

চার: তাফসীরে মাযহারী ৩য় খন্ডের ২৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- “ইমাম বাগবী বলেন, হারুন ইবনে আলতারা তার পিতা হতে বর্ণণা করেন, এ আয়াতটি অবর্তীণ হওয়ার পর রাসুসুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।

পাঁচ: তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খন্ডের ১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- “ইবনে জারীর ও অন্যরা বলেন, আরাফার দিবসের পর রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।’

ছয়: বিদায় হজ্জের দিবসে আলোচ্য আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিন পরবর্তী ৮১তম দিবসে রাসুলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওফাত লাভ করেছিলেন বলে আল্লামা সাবিবর আহমদ ওসমানী তাঁর বিখ্যাত উর্দু তাফসীর তাফসীরে ওসমানীতে উল্লেখ করেছেন।

উপরে বর্ণিত সূত্রগুলো হতে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বিদায় হজ্জের দিন থেকে ৮১ তম দিবসে ওফাত লাভ করেছিলেন। সুতরাং বিদায় হজ্জ্বের দিন থেকে ৮১ তম দিবস কত তারিখ ও কি বার হয় তা গণনা করলে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের সঠিক তারিখটি নির্ণয় করা সম্ভব হবে এবং আমরা প্রকৃত সত্য জানতে পারব।

ঐতিহাসিকভাবে সকলেই একমত যে, রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বিদায় হজ্জের সময় আরাফার ময়দানে বাণী মোবারক প্রদানকালে এ আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে এবং ঐ দিনটি ছিল শুক্রবার। আর এ জন্যই শুক্রবার দিনের হজ্জকে আকবরী হজ্জ বলা হয়। সুতরাং বিদায় হজ্জে আরাফার দিবস তথা ১০ম হিজরীর ৯ই জ্বিলহজ্জ শুক্রবারকে ভিত্তি ধরে ৮১ তম দিবস হিসাব করলে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের সঠিক তারিখ নির্ধারিত হবে। রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর হাদিসের বর্ণনা অনুসারে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে চান্দ্রবর্ষের একমাত্র হয় ৩০ দিনে এবং পরবর্তী মাস হয় ২৯ দিনে। এ হিসাবে জিলহজ্জ মাস হয় ২৯ দিনে, পরবর্তী মাস মহরম ৩০ দিন এবং সফর মাস ২৯ দিন হয়। সুতরাং জ্বিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ থেকে বাকী দিন ২১, মহরম মাসের ৩০ দিন, সফর মাসের ২৯ দিন এবং রবিউল আউয়াল মাসের ১ দিন বা ১ তারিখ যোগ করলে মোট ৮১ দিন হয়। সুতরাং এ হিসাবে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) একাদশ হিজরী সালের ১ লা রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেছিলেন।

আরেকটি বিষয়ে এখানে উল্লেখ যে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) রবিউল আউয়াল মাসের সোমবারে ওফাত লাভ করেছিলেন বলে সর্বসম্মত অভিমত। সুতরাং ১০ম হিজরীর ৯ই জিলহজ্জ শুক্রবার এবং এ তারিখ ও বার থেকে হিসাবে করলে ৮১ তম দিবস হয় ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার। অতএব প্রমানিত রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার।

রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনী মোবারকের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা হতে জানা যায় যে, জীবনের শেষভাগে তিনি বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। তবে ওফাতের পাঁচ দিন পূর্বে তিনি হঠাৎ সকাল বেলায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পবিত্র হুজরা শরীফ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় বরকতময় ঐ দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার যা সারা বিশ্বের মুসলমানরা “আখেরী চাহার শোম্বা” নামে পালন করে থাকে। উপরে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী একাদশ হিজরীর ২৫ শে সফর ছিল বুধবার। এই দিবস ও তারিখ হতে ৫ দিন পরে একাদশ হিজরীর ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার দিন হয়। সুতরাং আখেরী চাহার শোম্বা’ যদি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনের শেষ বুধবার হয় এবং তিনি যদি এরপর আর কোন বুধবার পেয়ে না থাকেন এবং যদি পরবর্তী সোমবার তাঁর ওফাত হয় তাহলে বুধবার থেকে সোমবার ৫ দিন পর তাঁর ওফাত দিবস। অতএব ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওফাত লাভ করেছিলেন এবং তা উপস্থাপিত তথ্যের আলোকে অকাট্য যুক্তি। পঞ্জিকার (ছক-১)-এ বর্ণিত বার ও তারিখের হিসাবটি উপস্থাপন করা হয়েছে।

nobi

উপরে উপস্থাপিত ছক থেকে স্পর্ষ্ট বুঝা যাচ্ছে যদি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১২ই রবিউল আউয়াল হতো তাহলে তা বারের হিসাবে শুক্রবার হয়। কিন্তু তিনি সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন। সুতরাং বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী অকাট্যভাবে/নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় যে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১২ই রবিউল আউয়াল নয় বরং ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ২য় খন্ডের ৩২৯ পৃষ্ঠায় রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনীতে বলা হয়েছে “জীবনের শেষ দিন সোমবার প্রত্যুষে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) দরজার পর্দা সরাইয়া সাহাবীদের সালাত আদায়ের দৃশ্য অবলোকন করিয়া পরম তৃপ্তি লাভ করেন। তাঁহার যন্ত্রনাকাতর মূখে হাসির রেখা ফুটিল। তৃতীয় প্রহরে অন্তিম অবস্থা দেখা দিল। বার বার তাঁহার সংজ্ঞা লোপ পাইতেছিল। চৈতন্য লাভের পর বারবার তিনি

বলিতে লাগিলেন, “আর রফিকুল আলা’- তিনি (আল্লাহ) শ্রেষ্ঠতম বন্ধু। আলী (রাঃ), হযরত (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর মস্তক কোলে করিয়া বলিয়াছেন, এমন সময় একবার চোখ মেলিয়া আলী (রাঃ) এর দিকে তাকাইয়া হযরত (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) অস্ফুটস্বরে বলিতে লাগিলেন, ‘সাবধান! দাস-দাসীদের প্রতি নির্মম হইও না।’ একবার আয়শা (রাঃ) কে বুকে মাথা রাখিয়া শেষ বারের মতো চোখ মেলিয়া উচ্চ কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, ‘সালাত-সালাত’; সাবধান! দাস-দাসীদের প্রতি সাবধান!’ আত্মার শেষ নিঃশ্বাসের সহিত শেষ কথা উচ্চারণ করিলেন, ‘হে আল্লাহ! শ্রেষ্ঠতম বন্ধু।’ ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার ৬৩ বছর বয়সে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ইনতিকাল হয় সুর্যাস্তের কিছু পূর্বে।” সুতরাং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ইসলামি বিশ্বকোষের তথ্য অনুযায়ী রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাত দিবস ১লা রবিউল আউয়াল সোমবার।

ওফাত দিবস ১২ই রবিউল আউয়াল প্রচারের নেপথ্যে:

রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১লা রবিউল আউয়াল ওফাৎ লাভ করেছেন এটাই সঠিক ও নির্ভূল। সমাজে প্রচলিত ১২ই রবিউল আউয়াল তাঁর ওফাতের তারিখ নয়। কারণ দশম হিজরীর ৯ই জ্বিলহজ্জ শুক্রবার হলে তিনটি মাসের সব ক’টি মাস যদি ৩০ দিন, কিংবা ২৯ দিন যে কোনভাবেই হিসাব করা হোকনা কেন, কোন হিসাবেই একাদশ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার হয় না। এখন প্রশ্ন হলো, ১২ই রবিউল আউয়াল হযরত রাসূল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)এর আবির্ভাব ও ওফাতের তারিখ হিসাবে কিভাবে প্রচারিত হলো? উমাইয়া শাসনামলে এজিদপন্থীরা রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর জন্মদিনের আনন্দকে স্লান করে দিয়ে মুসলমানদের এ দিনের রহমত ও বরকত হতে বঞ্চিত করার জন্য চক্রান্তমূলকভাবে তাঁর আবির্ভাব ও ওফাৎ একই তারিখে হয়েছে বলে প্রচার করেছে। কারণ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১লা রবিউল আউয়াল সূর্যাস্তের কয়েক মিনিট পূর্বে ওফাৎ লাভ করেছেন। তার ওফাতের সংবাদ সবার কাছে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। চান্দ্র মাসের তারিখ সূর্যাস্তের পর থেকে গনণা করা হয় বিধায় কেউ কেউ বলেছেন তিনি ২রা রবিউল আউয়াল ওফাৎ লাভ করেছেন। ফলে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের তারিখটি ১ অথবা ২ রবিউল আউয়াল হিসাবে প্রচারিত হয়। এ সুযোগে উমাইয়া শাসকরা হযরত রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ওফাতের তারিখ ১ ও ২ কে একত্রিত করে ১২ই রবিউল আউয়াল হিসাবে প্রচার করেছে। এ চক্রান্তের শিকার হয়ে মুসলমানরা ১২ই রবিউল আউয়ালকে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর শুভ আবির্ভাব ও ওফাত দিবসের দিন মনে করে এ দিনের আনন্দ উৎসব পালন করা থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এ দিনের উসিলায় অবারিত রহমত ও বরকত নাযিল হয় তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।

সুতরাং ঐতিহাসিত বিশ্লেষণে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি হযরত রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ১লা রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেছিলেন।

দয়ালের উপদেশ – ৭

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-২৬ ॥ মানবের চেয়ে শক্তিশালী আর কেউই নেই। সাধারণ মানুষ তা জানে না। এই শক্তিকে জাগ্রত করার নামই সাধনা। জীবন্মুক্ত মহাপুরুষের চিন্তা, সাধনা, ত্যাগ, বৈরাগ্য, সংযম, শিক্ষা নষ্ট হয় না-সূক্ষ্মভাবে থাকে। তাঁকে চিন্তা করলেই আধ্যাত্মিক দরজা খুলে যায়। দেখ! মুক্তি গাছের ফল নয় যে, গুরু তোদের হাতে তুলে দেবেন, – মুক্তি অনুভূতির জিনিস, তাঁর উপদেশ মতো কাজ করতে হবে তবে তো!

উপদেশ বাক্য শুনলি, যদি এ কান দিয়ে গিয়ে অপর কান দিয়ে বের হয়ে যায়, কি ফল হবে? উপদেশগুলো কানের ভেতর দিয়ে প্রাণের কাছে নিতে হয়। বার বার চিন্তা করে মনে একটা দাগ ফেলতে হয়।

আধ্যাত্মিক উন্নতি, ভক্তি, মুক্তি দয়ালের কৃপাতেই হয়। তপস্যা, জপ, সাধন, ভজন উপলক্ষ্য মাত্র। তবুও এগুলোর প্রয়োজন আছে, এগুলোই কৃপা পাওয়ার উপায়। কায়িক, বাচনিক, মানসিক তিন ভাবে প্রেমময়কে ভজন করা হয়।

উপদেশ-২৭ ॥ নবাবকে যদি তোর বাড়িতে আনতে চাস্ কি করবি? বাড়ি-ঘর পরিস্কার করবি-সাজাবি। তবেই না তাঁকে আসবার জন্য নিয়ন্ত্রণ করবি। আর যদি গোয়ালঘরে তাকে আনতে চাস্ তবে তিনি কি আসবেন? আনতে তো পারবিই না বরং তাঁকে অপমান করা হয়-তাচ্ছিল্য করা হয়।

দেখ্ দয়াল বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের বাদশাহ্। তাঁকে আনতে হলে হৃদয়-মন্দির পরিস্কার করতে হবে-সাজাতে হবে। হিংসা, নিন্দা, ঘৃণা, কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি ক্লেদে পূর্ণ গোয়ালঘরে তাঁকে আসবার জন্য ডাকলে, তিনি আসবেন কেন? ক্লেদগুলো আদর-যত্ন করে রেখে দয়ালকে আসবার জন্য ডাকলে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাই হয়। কাম, ক্রোধ, অহংকার, হিংসা, নিন্দা প্রভৃতি দিয়ে হৃদয় সাজাতে হবে। তবেই তিনি সেখানে এসে উদয় হবেন, নতুবা নয়। দয়ালের কাছে প্রার্থনা করতে হয়, ‘দয়াল, আমায় পবিত্র করে দাও।’

মনে রাখবি, প্রবৃত্তির স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে, দয়ালকে রক্ষা করতে বললে, তিনি রক্ষা করবেন না, তোকেও চেষ্টা করতে হবে। আত্মকৃপা না হলে দয়ালের কৃপা কখনও হতে পারে না।

উপদেশ-২৮ ॥ সহ্য করতে শিখ্। ‘যে সয় সে রয়, যে না সয় সে নাশ হয়।’ সংসারে থাকতে গেলে বিপদ-আপদ, রোগ-শোক, জরা-মৃত্যু এগুলো আছেই, সহ্য করতেই হবে। ওরে! সময় থাকে না, সে চলে যাবেই। আজ বিপদে-আপদে হাবুডুবু করছিস, অস্থির না হয়ে সহ্য কর, দুদিন পরই এই আপদ-বিপদ থাকবে না। আজ তোকে যে মিথ্যা নিন্দা করছে, দুদিন পর সেই তোর গুণকীর্তন করবে। আজ যে তোর সর্বনাশ করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কয়দিন পর হয়তো সেই তোর শ্রেষ্ঠ বন্ধু হবে।

রোগ, শোক, আপদ, বিপদ এগুলো নিজেরই কৃতকর্মের ফল। ঘুমন্ত মনকে জাগাবার জন্য এগুলো দরকার।

দয়াল যা করেন সমস্তই আমার মঙ্গলের জন্য-এই ভাব মনে রাখলে সহ্য করা সহজ হয়। মনে একটা বল রাখবি-বিশ্বাস রাখবি, -‘আমার পেছনে দয়াল খাড়া আছেন, ভয় চিন্তা কিসের-রোগ-শোক, আপদ-বিপদ-আমার কি করতে পারে ?’ দয়ালের দান মনে করে, হাসিমুখে সব সহ্য করতে হয়। মনে রাখবি, সকল আপদের মূল ধৈয্যের অল্পতা।

উপদেশ-২৯ ॥ মনের চঞ্চলতার একমাত্র কারণ বিষয়-আসক্তি-ভোগের আকাক্সক্ষা। মন এক সময়ে একটি মাত্র বিষয় চিন্তা করতে পারে, দু’বিষয় বা বহু বিষয় চিন্তা করতে পারে না। তোরা যতই দয়ালকে, প্রেমময়কে ভাববি ততই তাঁর প্রতি টান আসবে-ভালোবাসা বাড়তে থাকবে। প্রেমময়ের প্রতি যতই ভালোবাসা বাড়তে থাকবে ততই ভোগাকাক্সক্ষা বিষয়-আসক্তি কমতে থাকবে। দয়ালকে যতই গভীরভাবে ভাবতে থাকবি ততই মন স্থির হয়ে আসবে।

বহুমুখী মনকে অভ্যাসের দ্বারা একমুখী করার নামই সাধন। যে যত বেশি সময় একমুখী-দয়ালমুখী হয়ে থাকতে পারে, সেই তত বড় সাধক।

তোরা শুধু গাছের গোড়ায় জল ঢাল, আপনি গাছ বড় হয়ে ফল দিবে। শুধু প্রেমময়কে ভাব-চিন্তা কর। যতই ভাব গাঢ় হবে, তাতে মজনু হয়ে থাকতে পারবি ততই কাম, ক্রোধ, লোভ শত্রুগুলো দূরে চলে যাবে, বিষয়-আসক্তি-ভোগাকাক্সক্ষা নিস্তেজ হয়ে আসবে। দেখিস না বিড়াল আসলে ইঁদুরগুলো কেমন লুকিয়ে পড়ে!

কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, প্রভৃতি ইঁদুরগুলো একটি একটি করে দমন করবি, ইহা পাগলের প্রলাপ। বিড়াল নিয়ে আয়, সব দমন হতে থাকবে। দয়ালকে হৃদয়ে বসিয়ে রাখ, বেশ, আর কিছু করতে হবে না।  (চলবে)

প্রবাহ

দিল্লির দূষণ নিয়ে ভৎর্সনা সুপ্রিম কোর্টের

dilli dushon

মানুষের কি বাঁচার অধিকার নেই? অমূল্য জীবন থেকে আপনারা মানুষের আয়ু কেঁড়ে নিচ্ছেন। প্রতিবছর একই জিনিস চলছে। কিন্তু কোনও সরকারেরই সামান্য হেলদোল নেই। মানুষ মারা যাচ্ছে, আগামীদিনে আরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে। আর কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারগুলো নির্বিকারভাবে পরস্পরকে দোষারোপ করে চলেছে। দিল্লির কালান্তক দূষণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এরকম কঠোর ভাষাতেই একই সঙ্গে দিল্লি, পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা সরকার তো বটেই, কেন্দ্রীয় সরকারকেও চরম ভৎর্সনা করেছে। বিচারপতি অরুণ মিশ্র এবং বিচারপতি দীপক গুপ্তের বেঞ্চ এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন কন্ট্রোল অথরিটির জমা দেয়া রিপোর্টকে উল্লেখ করে বলেছে, বিশ্বের কোনও সভ্য দেশে এভাবে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না! জরুরি অবস্থার চেয়েও পরিস্থিতি খারাপ। সরকারের কোনও দায়িত্ব নেই? বিচারপতি অরুণ মিশ্র বলেন, বছরের পর বছর মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার রীতি চলতে পারে না। আমরা এটা কোনও মতেই মেনে নেব না। মানুষ ঘরের মধ্যেও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দিল্লি থেকে দলে দলে মানুষ চলে যাচ্ছে শুদ্ধ বাতাসের জন্য। এসব কী হচ্ছে? সর্বোচ্চ আদালত এই প্রশ্ন তুলে এখনই ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে, সরকারের নাকের ডগায় ফসলের অবশেষ পোড়ানো চলছে। দূষণ বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি ও ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরিতে যাবতীয় নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, এই নির্দেশ অমান্য করলে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হবে। শহরের মধ্যে জঞ্জাল পোড়ানোর ঘটনা ঘটলে তৎক্ষণাৎ ৫ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হবে।  গত কিছুদিনের তুলনায় খুব সামান্য অবস্থার উন্নতি হলেও দিল্লি এখনও গ্যাস চেম্বারই। স্কুল বন্ধ। শুধুই মাস্ক পরা মানুষের ভিড় রাস্তায়। আজও দিল্লির আবহাওয়া ‘মারাত্মক দূষিত’ ক্যাটাগরিতে। ০৪ নভেম্বর সোমবার ছিল ৩ বছরের মধ্যে সব থেকে বেশি দূষিত একটি দিন। মাস্ক, নিবুলাইজার এবং ব্রঙ্কাইটিসের ওষুধের চাহিদা আতঙ্কের জায়গায় চলে গিয়েছে। গত কয়েকদিনে দিল্লি থেকে বহু মানুষ অন্য শহরে চলে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্টের রোগ নিয়ে শিশুদের ভিড় মাত্রাছাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লি সরকারের ক্লিনিকগুলিতে লম্বা লাইন। উত্তরাঞ্চ, হিমাচল প্রদেশের হোটেলগুলিতে ভিড়। কারণ, দিল্লিবাসী পরিবার নিয়ে দিল্লি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বহু অফিস তাদের বৈঠক বাতিল করে দিচ্ছে। কারণ, অন্য রাজ্য থেকে কর্মী-অফিসাররা দিল্লি আসা বাতিল করছেন। অন্তত পাঁচটি দেশের দূতাবাস নিজেদের বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে জারি করেছে সতর্কতা। দিল্লি আসতে আপাতত বারণ করা হচ্ছে। কিন্তু দিল্লি এখনও বিষ বাতাসের শহরই রয়ে গিয়েছে।

২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয় অপেক্ষা করছে!

2020 tramp

আগামী ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের পরাজয় অপেক্ষা করছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যখন বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলের কংগ্রেস সদস্যরা ইমপিচমেন্টের তদন্ত চালাচ্ছেন তখন এক জনমত জরিপে এ ফলাফল উঠে এসেছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে – ডেমোক্র্যাট দল থেকে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করলে তার কাছে ১০ পয়েন্টে পরাজিত হবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। জো বাইডেন হচ্ছেন আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ে শীর্ষে রয়েছেন। ডেমোক্র্যাট দল থেকে আরো যারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন তারা হচ্ছেন এলিজাবেথ ওয়ারেন ও বার্নি স্যান্ডার্স।

নতুন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে – জো বাইডেন শতকরা ৫৩ শতাংশ ভোট পাবেন, সেখানে ট্রাম্প পাবেন ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে, যদি এলিজাবেথ ওয়ারেন ৫২ শতাংশ ভোট পান তাহলে ট্রাম্প পাবেন ৪৪ শতাংশ ভোট। আর বার্নি স্যান্ডার্স ৫১ শতাংশ ভোট পেলে ট্রাম্প পাবেন ৪৪ শতাংশ ভোট। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইমপিচ করার জন্য ডেমোক্র্যাটরা বর্তমানে একটি তদন্ত চালাচ্ছেন। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ – গত সেপ্টেম্বর মাসে এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ হয়েছে যে, জো বাইডেন এবং তার ছেলের দুর্নীতির ব্যাপারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলিনস্কিকে তদন্ত করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। ট্রাম্প বলেছেন, জো বাইডেন ও তার ছেলের ব্যাপারে তদন্ত না করলে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেয়া বন্ধ করে দেবেন তিনি। এ বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে কংগ্রেসের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছেন ইউক্রেনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত।

ইরানকে মোকাবেলার ক্ষমতা নেই মাকিন নৌ বাহিনীর!

iran

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সেনাবাহিনীর নৌ ইউনিটের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল হোসেইন খানযাদি, পানির তলদেশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার প্রযুক্তি অর্জন এবং ব্যাপক পরিমাণে এ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের খবর দিয়েছেন। তিনি তেহরানের বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তি বিভাগ পরিদর্শনে গিয়ে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে ইরানের সেনাবাহিনীর নৌ ইউনিট সাগরতল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম এবং এ সংক্রান্ত সরঞ্জাম ব্যাপক সংখ্যায় তৈরি করা হচ্ছে। রিয়ার অ্যাডমিরাল হোসেইন খানযাদি ইরানে চীন ও রাশিয়ার ত্রিদেশীয় সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আশা করা হচ্ছে আগামী দুই মাসের মধ্যে যৌথ মহড়া শুরু হবে এবং তেহরান সফররত চীন ও রাশিয়ার নৌ-কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ভৌগোলিক দিক দিয়ে ইরান গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকার কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর নৌ ইউনিটের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল হোসেইন খানযাদি বলেছেন, চীন ও রাশিয়ার মতো বৃহৎ দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও মহড়া ইরানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সমুদ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইরানের নৌ বাহিনীর প্রধান নীতি। এ ব্যাপারে ইরান দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং এ লক্ষ্যে সমুদ্রের তলদেশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য যুদ্ধ সামগ্রী তৈরিতে ইরানের সক্ষমতার ব্যাপারে কেউ যেন সন্দেহ প্রকাশ না করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় দিবস ও মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া দখলের বার্ষিকী উপলক্ষ্যে সারাদেশ থেকে আগত হাজার হাজার শিক্ষক ও ছাত্রদের এক সমাবেশে বলেছেন, “ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি অর্জন করা থেকে ইরানকে বিরত রাখার জন্য আমেরিকা ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি বলেন, “ইরানের তরুণ বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে।”

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি অর্জন ইরানের অনেক বড় সামরিক সাফল্য। এ সাফল্যের মাধ্যমে ইরান অনেক বড় প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে নৌ শক্তিতে ইরান ব্যাপক সাফল্য অর্জন করায় শত্রুদের সব হিসাব নিকাশ পাল্টে গেছে। মার্কিন সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’ লিখেছে, পারস্য উপসাগরে ইরানকে মোকাবেলার ক্ষমতা মার্কিন নৌবাহিনীর নেই। এতে আরো বলা হয়েছে, যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করে আমেরিকা আগের মতো আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে না এবং বর্তমান অবস্থায় বোঝা যায় গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে নৌ-শক্তিতে ইরানের শক্তিশালী অবস্থানকে সবাই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

৪৮ ঘণ্টায় ১৫০ দফা বিমান হামলা  ইয়েমেনে!!!

48 hours in yeamen

ইয়েমেনে ৪৮ ঘণ্টায় দেড়শ’ দফা বিমান হামলা করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন আগ্রাসী জোট। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় সা’দা ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় হাজ্জাহ প্রদেশে ১৫০ বারের বেশি বোমাবর্ষণ করেছে। এর ফলে বহু বেসামরিক ইয়েমেনি হতাহত হয়েছেন। আমেরিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশের সহযোগিতায় ২০১৫ সাল থেকে দরিদ্র প্রতিবেশী ইয়েমেনে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে সৌদি আরব। একইসঙ্গে স্থল, আকাশ ও সাগর পথে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। এর ফলে এ পর্যন্ত ১৬ হাজারের বেশি ইয়েমেনি প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আহত ও বাস্তুহারা হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। দেখা দিয়েছে খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। তবে ইয়েমেনিদের প্রতিরোধের কারণে সৌদি আরব এখন পর্যন্ত তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

সৌদি-ইরানের সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন!

saudi iran

সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে বলে খবর দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির চিফ অব স্টাফ মাহমুদ ওয়ায়েজি। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক দেশগুলো এখন একথা উপলব্ধি করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প নেই।

মাহমুদ ওয়ায়েজি তেহরান থেকে প্রকাশিত দৈনিক এতেমাদ’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরান-রিয়াদ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, অতীতে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু মার্কিন সরকারের উস্কানিমূলক আচরণের কারণে এ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কিন্তু এখন সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশ আমেরিকার বিভেদ সৃষ্টির এই নীতির স্বরূপ উপলব্ধি করতে পেরেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইরানের প্রেসিডেন্টর দপ্তর প্রধান ওয়ায়েজি বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলো একথা বুঝতে পেরেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে মতপার্থক্য ও সংঘাত পরিহার করতে হবে এবং ইরান বহুদিন ধরে তাদেরকে এ কথাই বুঝিয়ে এসেছে।

ইরানের প্রতিবেশী আরব দেশগুলো আমেরিকার বিভেদ সৃষ্টির পদক্ষেপগুলোর ব্যাপারে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন মাহমুদ ওয়ায়েজি। তিনি বলেন, সৌদি আরবসহ আরো কিছু দেশ মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার যে আগ্রহ দেখিয়েছে তাতে এ অঞ্চলের ব্যাপারে মার্কিন উস্কানিমূলক নীতি ব্যর্থ হবেই।

ইরানের এই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানান, তার দেশ সৌদি আরবসহ সবগুলো আঞ্চলিক দেশকে আলোচনায় বসার ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ সবগুলো দেশকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় উত্তেজনা প্রশমন ও পারস্পরিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা।

পাকিস্তানের স্বভাব বদলানোর নয়!

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, স্বভাব যায় না মরলে। যার যা স্বভাব সেটা সে পালন করে যাবেই। সে ভালোই হোক আর মন্দই হোক। মন্দ হলে সে কাজের সমালোচনা বা নিন্দা হবেই। কিন্তু অসম্মান আর বেইজ্জতই যাদের ভূষণ তারা এসব অসম্মানকে থোড়াই কেয়ার করে। পাকিস্তানেরও এখন সেই অবস্থা। সারা বিশ্বের নিন্দা সমালোচনা সত্ত্বেও সে এক নির্বিকার। নির্লজ্জতাই সেই রাষ্ট্রের ভূষণ। তাই ভারতে বারবার নাশকতার ছক কষে, কাশ্মীরকে অশান্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে সে সর্বত্রই নিন্দার পাত্র হয়ে উঠেছে। নিজের দেশের মাটিকে জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য ভাড়া দিয়ে তারা নিজেই একটি জঙ্গিরাষ্ট্রের মতো আচরণ করছে। বকলমে তারাই জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং অস্ত্র সরবরাহ করছে। উদ্দেশ্য একটাই, যেভাবে হোক ভারতের মাটিতে নাশকতামূলক কাজ করে হিংসা ছড়িয়ে দাও। সাম্প্রদায়িক স্থিতিশীলতাকে ভেঙে দাও। ভারতের শান্তি বিঘিœত করো। জালনোট ঢুকিয়ে ভারতের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে ভেঙে দাও। একটা দেশ শুধু এমনই একটা নেগেটিভ দৃষ্টি নিয়েই এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে। তার নিজেরই কোনও সুস্থিতি নেই। পুরো দেশের প্রশাসন জঙ্গি কব্জায় বন্দি। ইমরান খান যতই ভাষণ দিক, তিনি সেনাদের হাতের পুতুল ছাড়া আর কিছুই নন। আর দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলিকে গোপনে মদদ দিচ্ছে এই সেনাবাহিনীই। তাদের পরিকল্পনা মতোই চলে এইসব জঙ্গিসংগঠন। প্রতি বছরের মতো এবার শীতেও ভারতের মাটিতে জঙ্গি ঢোকানোর ছক কষেছে পাকিস্তান।

কাশ্মীরে বরফ পড়লেই সীমান্ত দিয়ে জঙ্গি ঢোকানোর ব্যবস্থা করে পাকিস্তান। সেইসব জঙ্গি এদেশের মানুষের মধ্যে মিশে গিয়ে নাশকতার প্রস্তুতি নেয়। এজন্য সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন লঞ্চপ্যাডে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এবারও সেই পরিকল্পনা করেছে পাকিস্তান। একটা ই-মেল উদ্ধার করা হয়েছে। তার থেকে দেখা যাচ্ছে ভাওয়ালপুরে উসমান-ও-আলি হেডকোয়ার্টারে প্রশিক্ষক এবং প্রশিক্ষিত জঙ্গিদের অবিলম্বে হাজিরা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এক জঙ্গি সংগঠনের নেতা আবু উজেইল ভারতে নাশকতামূলক কার্যকলাপের হুমকি দিয়েছে। এছাড়া এই পুরো কাজে যে পাকসেনার সবুজ সঙ্কেত আছে, সেটাও জানা গিয়েছে। উল্লেখ্য ভাওয়ালপুরেই রয়েছে জয়েশ-ই-মহম্মদের সদর দপ্তর। সেখানে রয়েছে জয়েশ প্রধান মাসুদ আজহার। কিন্তু মাসুদ অসুস্থ হওয়ায় তার হয়ে সংগঠন পরিচালনা করছে আব্দুল রউফ আসগর। সেই এখন অঘোষিত প্রধান। দু’জনের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ভারতে বড় ধরনের নাশকতা চালাতে হবে। পাশাপাশি লস্করও আসন্ন শীতে ভারতের মাটিতে এমনই নাশকতার পরিকল্পনা নিয়েছে। লস্করের মধ্যে হাফিজ সইদের পরিবর্তে এখন দলের দেখভাল করছে আব্দুল রহমান মাক্কি। সেই পুলওয়ামা হামলার পর থেকে দেশে-বিদেশে পাকিস্তানকে নানা গঞ্জনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তার উপরে বালাকোটে ভারতের সার্জিকাল স্ট্রাইকে নাক কেটেছে পাকিস্তানের। পাশাপাশি জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়ায় রাগে ফুঁসছে পাক প্রশাসন এবং জঙ্গিরা। সীমান্তে কড়া নজরদারি থাকায় এই মুহূর্তে জঙ্গি সংগঠনগুলি দিশাহারা। ধীরে ধীরে ফান্ডিং কমছে। তাই এই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জয়েশ এবং লস্কর। তারা জানে একটা বড় আঘাত হানতে পারলে ভারতকে যেমন বিপর্যস্ত করা যাবে, তেমনই তাদের সংগঠনকেও বাঁচানো যাবে। তহবিলে টান পড়লে ভেঙে যাবে সংগঠন। টাকার অভাব হলে নতুন পরিকল্পনা নেয়া যাবে না। নতুন রিক্রুটমেন্ট হবে না। তাই তাদের এখন মরিয়া অবস্থা। আর ওপাশে ঠুঁটো অবস্থায় বসে আছেন ইমরান খান। তাঁর কিছুই করার নেই। তিনি যে নিজেই বাঘের পিঠে বসে। পিঠ থেকে পড়লেই যে বাঘে তাঁকে খেয়ে নেবে। দেশটাই এখন লস্কর আর জয়েশের হাতে। তাদের পরিচালনা করছে সেনা।  কিন্তু ভারতও চুপ করে বসে নেই। ভারতের সেনাকর্মীরা সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরায় রয়েছে। বরফ পড়লেও তাঁদের চোখে ঘুম নেই। একটা মাছিও সীমান্ত দিয়ে তাঁরা গলতে দেবেন না। আর অতীতে তো দেখাই গিয়েছে, পাকিস্তান আঘাত হানলে যথার্থ প্রত্যুত্তর ভারত দিয়েছে। যেমন কুকুর তেমন মুগুর ভারতের হাতে আছে। প্রয়োজনে সেই আঘাত হেনে ভারত যোগ্য জবাব দেবে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর জেনারেল হলেন আপন দুই বোন

2 sister

মারিয়া ব্যারেট এবং পাউলা লোডি। সম্পর্কে তাঁরা সহোদরা। একজন ছোট থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। অন্যজনের ইচ্ছে ছিল ফরেন সার্ভিসের পরীক্ষা দিয়ে আমলা হবেন। কিন্তু, ভাগ্যের ফেরে দু’জনেরই ঠাঁই হল সেনাবাহিনীতে। চলতি গ্রীষ্মেই মার্কিন সেনাবাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছেন তাঁরা। পাউলা মেজর এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়েছেন মারিয়া। সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস। কারণ মার্কিন সেনাবাহিনীতে এর আগে আর কোনও বোনেদের এভাবে শীর্ষপদ আরোহণের নজির নেই। সত্যিই কি মারিয়া এবং পাউলাই প্রথম? অন্তত মার্কিন সেনা কর্তৃপক্ষের দাবি তেমনই। সাধারণত মহিলারা বিয়ের পর পদবী পাল্টে নেন। তাছাড়া মার্কিন সেনার তথ্যভান্ডার হাতড়ে, নাম এবং পদবী মিলিয়ে শুধুমাত্র বোনেদের খুঁজে বের করাও প্রায় অসাধ্য। কিন্তু, যেহেতু বাহিনীতে মহিলা জেনারেলদের সংখ্যা একেবারেই হাতে-গোনা তাই পাউলা এবং মারিয়াকে সহজেই চিহ্নিত করা গিয়েছে বলে মনে দাবি করেছেন মার্কিন সেনার এক মুখপাত্র। গত জুলাই মাসে বছর একান্নর পাউলা পদন্নোতি পেয়ে সেনাবাহিনীর সার্জন জেনারেল হিসেবে ডিরেক্টর অব হেলথ কেয়ার অপারেশনস-এর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। আর ৫৩ বছরের মারিয়া মার্কিন সেনার সাইবার শাখা নেটকম-এর কমান্ডিং জেনারেলের দায়িত্ব পেয়েছেন।

পুরুষ-শাসিত সেনাবাহিনীতে পাউলা-মারিয়ার এই উত্থান বাকি মহিলাদের উদ্বুদ্ধ যেমন করেছে, তেমনই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, বলছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীকে নিয়ে গবেষণারত এমা ম্যুর। তিনি বলেন, ‘মার্কিন সেনাবাহিনীতে যে সকলেই যোগ দিতে পারেন এবং শীর্ষে পৌঁছতে পারেন, তা প্রমাণ করেছেন পাউলা ও মারিয়া। কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস-এর তথ্য বলছে, মার্কিন সেনার ১৩ লক্ষ সক্রিয় কর্মীর মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ মহিলা। মহিলাদের পদোন্নতিতে নানা ধরনের বাধার কারণে বাহিনীর শীর্ষস্তরের তুলনায় নিচুস্তরে মহিলাদের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। এমা জানান, এক সময় সেনাবাহিনীতে মহিলাদের অন্তর্ভূক্তি ব্যাপক হারে কমে গিয়েছিল। বাহিনীর অন্দরে একের পর এক যৌন হেনস্তার ঘটনা সামনে আসছিল। শুধু গত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, তার আগের বছরের তুলনায় ওই বছর যৌন হেনস্তার ঘটনা ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। এর পাশাপাশি, মহিলাদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা, বুলেটরোধী ব¤্ররে অপ্রতুলতার (সেগুলির সবই ছিল পুরুষদের মাপের) কারণে বিরাট সংখ্যায় মহিলারা বাহিনীতে যোগ দিতে পারতেন না।

মার্কিন সেনাবাহিনীর ২৪৪ বছরের ইতিহাসে ১৯০১ সালে প্রথম নার্স হিসেবে মহিলাদের বাহিনীতে নেয়া শুরু হয়। তবে, পাউলা এবং মারিয়া সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন ১৯৯৪ সালে। সেই সময় অবশ্য সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি মহিলাদের দেয়নি পেন্টাগন। সেই ছাড়পত্র মেলে আরও পরে, ২০১৫ সালে। তবে, পাউলাদের বাহিনীতে অন্তর্ভূক্তি নিঃসন্দেহে সেই সময়কার মহিলাদের বাহিনীতে যোগদানের প্রেরণা জুগিয়েছিল। স্বয়ং মারিয়ার কথায়, ‘একই পরিবারের দুই বোনের সেনাবাহিনীর শীর্ষপদে উঠে আসাটা লটারির মতো মনে হতে পারে। কিন্তু, কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। কঠোর অধ্যাবসায়, নেতৃত্বদানের অসামান্য ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকলে আমরা এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না।’ ম্যাসাচুসেটসের ফ্র্যাঙ্কলিন শহরে বড় হন মারিয়া এবং পাউলা। বাবা রাস্টন লোদি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক। পরে এলিমেন্টারি স্কুলের প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করেন। মা ক্লারাও ছিলেন শিক্ষিকা। ছোট থেকে দু’জনের কেউ ভাবেননি বাহিনীতে যাবেন। পাউলা বলেন, ‘ছোটবেলায় স্কুলের একই টিমে ফুটবল খেলতাম আমরা। তখনও ভাবিনি ২৭-৩০ বছর পর আমরা এখানে থাকব।’ কিন্তু, অদৃষ্টই তাদের একই রাস্তায় এনে ফেলেছে। এবার সেই রাস্তায় পরবর্তী মাইলস্টোন ছোঁয়াই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই বোনের।

তাজমহলের ৪০০টি পাথর  বদলানো হচ্ছে

tazmahala

দূষণের দাপটে দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে তাজমহলের। এবার মমতাজের স্মৃতি-সৌধের বড়সড় সংস্কারে উদ্যোগী হল ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই)। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাজমহলের ‘চামেলি ফার্স’-এর ৪০০টি পাথর বদলানো হবে। এরজন্য টেন্ডার দিয়েছে এএসআই। যে পাথরগুলি বদলানো হবে, তার মধ্যে বেশিরভাগই লাল রঙের স্যান্ডস্টোন। কিছু রয়েছে সাদা মার্বেল পাথর। যাদের গড় আয়তন এক বর্গফুট থেকে নয় বর্গ ইঞ্চি। এসআইয়ের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ৪০০ পাথর বদলাতে খরচ হবে আনুমানিক ২২ লক্ষ টাকা। প্রসঙ্গত, তাজমহলের মূল গম্বুজকে ঘিরে চারপাশের এলাকা ‘চামেলি ফার্স’ নামে পরিচিত।

আজাদ হিন্দ ফৌজ-এর ৭৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সুভাষচন্দ্র বসুই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী!

Subhas_Chandra_Bose_NRB

সংলাপ ॥ ঔপনিবেশিক বাংলার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ পর্বে নানা গতিপ্রকৃতির ঘটনাস্রোত বয়ে যায়। জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে ও বাইরে বামপন্থার ব্যাপক প্রসার ছিলো সেই সময়কার একটি অন্যতম রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। তবে এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিঃসন্দেহে ছিলো সুভাষচন্দ্র বসুর জাতীয় কংগ্রেসে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং মাত্র দেড় বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রক্রিয়ায় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন বা বহিষ্কৃত হওয়া। হরিপুরা কংগ্রেস থেকে ত্রিপুরী কংগ্রেসের এই সময়কাল ভারতবর্ষে ততোটা না হলেও বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্র বসুকে কেন্দ্র করে এক বিরাট উত্থান-পতন ঘটে। জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে অবস্থানকারী একটি অন্যতম বাম-শক্তি রূপে খুব স্বাভাবিক কারণেই এই রাজনৈতিক উত্থান-পতনে বামপন্থীরাও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছিলো সুভাষচন্দ্রের দেশে ফেরা এবং ১৯৩৭ সালে সাময়িক কারামুক্তির পর। ১৯৩৮-৪০ সাল এই তিন বছর কাল ভারতবর্ষের জাতীয় রাজনীতি বাম-অভিমুখী হয়েছিলো এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের শীর্ষে উপনীত হয়েছিলো সুভাষচন্দ্র বসুকে কেন্দ্র করে। কার্যত নেহরুর পরিবর্তে সুভাষচন্দ্রই তখন হয়ে উঠেছিলেন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থার অন্যতম প্রতীক। কমিউনিস্ট পার্টি এই পর্যায়ে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে ছিলো এবং ১৯৪০-এর ফরওয়ার্ড ব্লক গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা সর্বদাই সুভাষচন্দ্রকে সমর্থন জুগিয়েছেন। পক্ষান্তরে সুভাষচন্দ্রও কমিউনিস্টদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিতে উদগ্রীব ছিলেন। লেনার্ড গর্ডনও তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সুভাষের ভালরকম আস্থা ছিলো ভারতীয় কমিউনিস্টদের উপর। গর্ডন দেখান যে বসুর কংগ্রেস সভাপতিত্বকালে সোমনাথ লাহিড়ী, বঙ্কিম মুখার্জি, গোপাল হালদার প্রমুখ কমিউনিস্ট নেতা তাঁর সঙ্গে নানা সময়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন।

সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক চিন্তাধারার ভিত্তি প্রসঙ্গে অধ্যাপক হীরেন মুখার্জির বিশ্লেষণ হয়তো অনেকটাই সঠিক। ‘অর্জুন যেমন লক্ষ্যভেদকালে উর্ধ্বে ঘূর্ণায়মান মাছের চোখের তারা ছাড়া অন্য কোথাও দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে অস্বীকৃত, তেমনই সুভাষ অটল ঐকান্তিকতা নিয়ে চেয়েছেন দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা…।’ লক্ষ্যসাধনাই তার কাছে মূল বিষয় ছিলো, মত-পথ-তত্ত্ব ও আদর্শ নিয়ে সুভাষচন্দ্র সেভাবে মাথা ঘামাননি। তবে তাৎপর্যময় বিষয় হলো ১৯৩৭-৩৯ এর ওই পর্বে সমগ্র দেশের আপামর বামপন্থী-সোস্যালিস্ট-কমিউনিস্ট সকলেরই রাজনৈতিক চেতনার ওপড়হ বা প্রতীক হয়ে ওঠেন সুভাষচন্দ্র বসু।

সুভাষচন্দ্র বসু গুজরাটের হরিপুরায় ১৯৩৮-এর ১৯-২১শে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের ৫১তম অধিবেশনে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তা বস্তুতই ছিলো দেশের বামপন্থী শক্তি সোস্যালিস্ট এবং ন্যাশনাল ফ্রন্টের তত্ত্ববাহী কমিউনিস্টদেরই মনের কথা। সভাপতির ভাষণে সুভাষচন্দ্র স্বাধীনতার দাবিতে সক্রিয় প্রতিরোধের কথা তুললেন, যদিও তা হবে অহিংস। মন্ত্রিত্ব গ্রহণ একটা সাময়িক পদক্ষেপ। বৃহত্তর সমস্যা হলো ‘ফেডারেশন’ এবং তা ঠেকাতে আরও বড় আইন অমান্য আন্দোলন করতে হবে। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো কি হবে তারও রূপরেখা দিলেন তিনি। এমনকি ভাবী স্বৈরতন্ত্রের প্রতিষেধক রূপে তিনি বহুদলের কথা বললেন, গণতান্ত্রিক ভিত্তিও মেনে নিলেন; জাতীয় পরিকল্পনার উপর জোর দিলেন এবং দেশের দারিদ্র্য দূর করতে ভূমি ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার, জমিদারী প্রথা বিলোপ, কৃষিঋণ মকুব, গ্রামীণ অর্থনীতি মজবুত করতে সস্তা মূলধনের ব্যবস্থা, সমবায় প্রথার বিস্তার, বৈজ্ঞানিক কৃষি দ্বারা উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পায়নের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণসহ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থান পেয়েছিলো।

হরিপুরা কংগ্রেসে প্রদত্ত সুভাষচন্দ্রের সভাপতির ভাষণ থেকে স্পষ্ট হলো যে, সাম্যবাদী বা সমাজতন্ত্রী না হয়েও সুভাষ বসু ক্রমশ সেইদিকেই ঘেঁষেছিলেন এবং সোভিয়েত রাশিয়ার সাফল্যে তিনি যথেষ্টই অনুপ্রাণিত। অমলেশ ত্রিপাঠী সঠিকভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল-এর অপরিণত চিন্তাভাবনা ইউরোপে কয়েক বছর (১৯৩৪-৩৮) কাটাবার ফলে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। বারবার রাশিয়ার উল্লেখ, এমনকি শেষ উদ্ধৃতিতে সি পি জি বি-র উল্লেখ; ট্রেড ইউনিয়ন, কিষানসভা, সাম্যাবাদী দলগুলির কংগ্রেসে যোগদানে সম্মতি, কংগ্রেস-সোস্যালিস্ট পার্টির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন, সকল বামপন্থী শক্তিকে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে তাকে আরো গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী করার আহ্বান – সবই যেন এক রাগিণীর বিচিত্র বিস্তার।’

বস্তুত জওহরলাল নেহরুর লক্ষ্মৌ কংগ্রেসে সভাপতির ভাষণের চেয়ে (১৯৩৬) সুভাষের ভাষণকেই বেশি স্পষ্টভাবে বামপন্থী বলতে হবে। সুভাষচন্দ্রের ভাষণে ঘোষণাঃ ‘দেশের বামপন্থী শক্তির কাছে আমার আবেদন যে তাঁরা যেন কংগ্রেসের গণতন্ত্রীকরণ এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ব্যাপক মঞ্চে তাদের টেনে আনার জন্য সর্বশক্তি ও সামর্থ্য নিয়োগ করেন। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির কার্যাবলীতে আমি সত্যিই দারুণভাবে উৎসাহিত….’ ইত্যাদি।

সুভাষচন্দ্র বসু হরিপুরায় কংগ্রেস সভাপতিরূপে যে ভাষণ দেন তার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য ছিলো ঃ ১) সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গঠনমূলক কাজের অগ্রগতির প্রভাবে ভারতেও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা কমিশন গঠনের প্রস্তাব। ২) কংগ্রেস দলকে দ্রুত পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন ও গণ-আন্দোলনের জন্য সাংগঠনিকভাবে গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী মতাদর্শে প্রস্তুত করার ডাক। ৩) অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় ১৯৩৫-এর শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও ফেডারেশনের বিরোধিতা।

ফৈজপুর কংগ্রেসে সুভাষের ঘোষণা ছিলো আরও স্পষ্ট। প্রকৃতপক্ষে নেহরু যে সময়ে দক্ষিণপন্থীদের চাপে পিষ্ট হয়ে ভারত ছেড়ে ইউরোপকেই তাঁর রাজনৈতিক ক্ষেত্ররূপে বেছে নিতে চলেছিলেন, সে সময় সুভাষচন্দ্র যেভাবে সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্টদের দু’পাশে রেখে দেশীয় রাজন্যবর্গের প্রজা দমন নীতির (কাশ্মীর, ত্রিবাঙ্কুর, মহীশূর, গুড়িশার নীলগিরি প্রভৃতি দেশীয় রাজ্যের রাজারা প্রজাদের ন্যায্য গণ-আন্দোলন দমনে লঠি-গুলি চালায় এই সময়কালেই) বিরুদ্ধে এবং বিভিন্ন প্রদেশে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নয়া ঔপনিবেশিক কৌশল’ রূপে চিহ্নিত ‘ফেডারেশনের’ বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্রর প্রতিক্রিয়া ছিলো অত্যন্ত তীখ্ন ও দ্বিধাহীন। এই সময় প্রদেশগুলিতে যেমন বোম্বাই, মাদ্রাজে কমিউনিস্টদের উপর পুলিসী দমননীতি ও বিহার-ইউ পি-তে সোস্যালিস্টদের কৃষক আন্দোলন দমনে কংগ্রেসী সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন- কংগ্রেস থেকে বিহারে কৃষক নেতা সহজানন্দকে বহিষ্কার বামপন্থীদের সহ্যসীমা অতিক্রম করেছিল। দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী এবং ব্যবসায়ী ঘনশ্যাম দাস বিড়লা প্রমুখের এসব মোটেই ভালে লাগেনি। গান্ধীও বুঝতে পারছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু আর জওহরলাল একরকম নন।

এই সময় পর্বে কংগ্রেস সভাপতি রূপে সুভাষচন্দ্র বসু কমিউনিস্টদের কাছে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। হরিপুরা কংগ্রেস নিয়েও বাংলায় (সুভাষচন্দ্র তখন বি পি সি সি-রও সভাপতি) কমিউনিস্টদের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিলো তা এককথায় নজিরবিহীন। কমিউনিস্টদের মুখপত্র রূপে প্রকাশ্যে বোম্বাই থেকে ১৯৩৮-এর জানুয়ারি মাস থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে পাক্ষিক ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ পত্রিকা। এছাড়া মাদ্রাজ থেকেও ‘নিউ এজ’ নামে একটি মাসিক তাত্ত্বিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলায় আগস্ট, ১৯৩৮ থেকে প্রকাশিত হতে থাকে নবপর্যায়ে মাসিক ‘গণশক্তি’। এর প্রথম সংখ্যায় সুভাষচন্দ্র অভিনন্দনবাণী পাঠিয়েছেন। এই তিনটি সাময়িক পত্র ১৯৩৮-৩৯ কাল পর্বে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শ্রেণীসংগ্রাম ও জাতীয় আন্দোলনে কমিউনিস্টদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কার্যত সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলো। হরিপুরা কংগ্রেসকে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী প্রভাব প্রতিষ্ঠা করার প্রধান ক্ষেত্ররূপে দেখে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন। বাংলায় তখন কমিউনিস্ট পার্টি জেলা স্তরে তার সাংগঠনিক বিস্তার কিছুটা ঘটাতে পেরেছে। কংগ্রেসের সদস্য সংগ্রহে নিচুতলার কমিউনিস্ট কর্মীদের সাংগঠনিক সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্য। এর ফলে হরিপুরায় বাংলা থেকে বেশ কিছু সংখ্যক কমিউনিস্ট যোগদান করেন। এমনকি জীবনে প্রথম খদ্দর পরিধান করে মুজফ্ফর আহমদও হরিপুরায় যান। বাংলা থেকে এ আই সি সি-তে আহমদ ছাড়াও বাঙ্কিম মুখার্জি এবং সহ-সম্পাদকদের মধ্যে পাঁচুগোপাল ভাদুড়ি এবং কমল সরকারও মনোনীত হন।

হরিপুরা কংগ্রেসে উপস্থিত এবং এ আই সি সি সদস্য তৎকালের তরুণ কমিউনিস্ট অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণঃ ‘হরিপুরায় দেখলাম সর্দার প্যাটেল সভাপতি সুভাষচন্দ্রকে আপাতদৃষ্টিতে মর্যাদা দেখালেও দিন গুনছেন তাকে হটিয়ে দেয়ার সুযোগের অপেক্ষায়-আচার্য কৃপালনি, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, গোবিন্দবল্লভ পন্থ প্রমুখের সুকৌশলী সহায়তা নিয়ে এবং তখন স্বকীয় সমীক্ষায় স্বভাবসিদ্ধ মগ্ন গান্ধীজীর আশীর্বাদকে পুঁজি করে।’ কমিউনিস্টরা এটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই সেই সময় বি পি সি সি-র সভাপতি সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে তাদের অভিমানবোধ জাগলেও তা ক্ষোভে পরিণত হয়নি।

১৯৩৮ সাল জুড়ে সুভাষচন্দের সঙ্গে যুক্ত থেকে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনকে বাদ দিলে মধ্যবিত্ত ও নগরকেন্দ্রিক যে দু’টি আন্দোলন সংগ্রামে বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি সব থেকে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলো সে দু’টি ছিলোঃ ১) রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন, ২) ফেডারেশন-বিরোধী আন্দোলন। বামপন্থীরা ফেডারেশনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আন্দোলন চেয়েছিলেন। কিন্তু দক্ষিণপন্থীদের কৌশলের সঙ্গে তাঁরা এটে উঠতে পারেনি। কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সুভাষকে সবদিক থেকে কোণঠাসা করার আয়োজন দক্ষিণপন্থীরা করেছিলেন এবং বিশেষত এই ‘অপবাদের’ অভিযোগকে কেন্দ্র করেই ১৯৩৯-র ২২শে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার সভাপতি নির্বাচিত সুভাষচন্দ্রের ওয়ার্কিং কমিটি থেকে তাকে বিপাকে ফেলার জন্য দক্ষিণপন্থী নেতারা একযোগে পদত্যাগ করলেন। সুভাষচন্দ্রের একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিলো একরোখা মনোভাব। তাই সভাপতি থাকাকালীন দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে নানা বিষয়ে তার আপস হয়নি। তার আশঙ্কা অমূলক ছিলো না যে, স্বার্থান্বেষী জমিদার ও ক্ষমতালিপ্সু কংগ্রেস নেতৃত্ব ফেডারেশনের সুযোগে সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক ঔপনিবেশিক সংসদীয় গণতন্ত্রের ফাঁদে পা দেবেন। পূর্ণ স্বরাজের লক্ষ্য যাবে দূরে সরে। বামপন্থীরা তাদের সীমিত সামর্থ্য নিয়েই এই প্রশ্নে সুভাষচন্দ্রের পেছনে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট ও নিউ এজ মুখপত্র সেইসময় হয়ে উঠেছিলো ‘ফেডারেশন’ বিরোধিতার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ছোটলাট লর্ড ব্রেবোর্ন জানিয়েছিলেন (জানুয়ারি ১৯৩৯) যে গত নয় মাসে অন্তত ছয় হাজার সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মিছিল বেরিয়েছে যার পেছনে রয়েছে বামপন্থীরা। এই অভিমত সমর্থিত হয়েছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। সে সময় পার্টি তাদের সদস্য সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটিয়েছিলো এবং জনসাধারণের মধ্যেও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তাব করেছিলো।

সুভাষচন্দ্র-র ফরওয়ার্ড ব্লক গঠনের আগে পর্যন্ত সন্দেহ নেই বামপন্থীরা জাতীয় আন্দোলনে বিপ্লবী শক্তির প্রতিনিধিরূপে সুভাষচন্দ্রকেই মেনে নিয়েছিলেন। হীরেন মুখার্জির মতে ১৯৩৮ সালের অক্টোবরে ন্যাশনাল ফ্রন্টই (কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন মুখপত্র) সর্বপ্রথম সুভাষচন্দ্র বসুর সভাপতির পদে পুনঃনির্বাচনের সপক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন। ত্রিপুরী কংগ্রেসে সোস্যালিস্ট-কমিউনিস্ট ও বামপন্থী অধ্যুষিত প্রদেশগুলি থেকে সুভাষচন্দ্র অধিক ভোট পেয়েছিলেন। ২৫শে জানুয়ারি ১৯৩৯ তারিখে কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতারা  ত্রিপুরী কংগ্রেসে ‘সমর্থন জানিয়েছিলেন’ পট্টভি সীতারামাইয়াকে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিরা ত্রিপুরী কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্রকে অসহায় ও অসুস্থ অবস্থায় পরিত্যাগ করেননি।

কমিউনিস্টরা ‘পন্থ প্রস্তাব’-এর বিপক্ষে ভোট দেবার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, তা তাঁদের পূর্বঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো। কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পি সি যোশীর তরফে বিবৃতি দেয়া হয় ঃ ‘ভারতীয় কমিউনিস্টরাই প্রথম রাষ্ট্রপতি বসুর পুনঃনির্বাচন দাবি জানিয়ে ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি বসু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে স্বীকৃত হইয়াছেন বলিয়া আমরা আনন্দিত… আমাদের জয় সুনিশ্চিত।…’ নেহরু সুভাষচন্দ্রকে সভাপতি পদে প্রার্থী হতে বারণ করেছিলেন। কমিউনিস্টরা বুঝেছিলেন বাম-ঐক্যে যে ভাঙন তৈরি হয়েছে তাতে মধ্যপন্থা বা আপস রফায় সুভাষচন্দ্রের আপত্তি ছিলো। কমিউনিস্ট পার্টি ‘পন্থ প্রস্তাবে’র বিরুদ্ধে সংশোধনী প্রস্তাব পরাজিত হয়। ‘পন্থ প্রস্তাব’ বিপুল ভোটাধিকো ত্রিপুরীতে গৃহীত হয়। তথাপি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ঘোষিত এই ‘প্লান অব অ্যাকশন’ ছিলো জাতীয় কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রায় বৈপ্লবিক।

ত্রিপুরী কংগ্রেসে যে ‘প্ল্যান অব ওয়ার্ক’ কমিউনিস্টরা রেখেছিলো পরবর্তীকালে সুভাষচন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লকের যে কর্মসূচী প্রণয়ন করেন তা ছিলো এরই প্রতিলিপি। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, হরিপুরা থেকে   ত্রিপুরী কংগ্রেসের মধ্যবর্তী পর্যায়ে সুভাষ বসুর সঙ্গে কমিউনিস্টদের আদর্শগত সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হয়েছিলো। কমিউনিজম-এর প্রতি আগ্রহ এবং কমিউনিস্টদের প্রতি আস্থা ১৯৩৮ সালে সুভাষের মধ্যে দেখা যায়-এমনকি শ্রেণী সংগ্রামের প্রতিও তাঁর আগ্রহ বাড়ে। ১৯৩৮ সালে কমিউনিজম ও কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে তাঁর সশ্রদ্ধ উক্তি হলোঃ ‘আমি সর্বদাই মনে করে এসেছি এবং বিশ্বাস করি যে মার্কস ও লেনিন অনুসারী কমিউনিজম এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের আদর্শ ও নীতিসমূহ সর্বদাই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল। তাঁদের বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রাম ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত।’

ত্রিপুরীর পর থেকে কমিউনিস্টরা সুভাষচন্দ্রের সঙ্গেই মোটামুটিভাবে ছিলেন। কমিউনিস্টরা ‘লেফট কনসোলিডেশনে’ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। গোপাল হালদার প্রমুখ কয়েকজন ‘কমিউনিস্ট’ সুভাষের ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার পরিচালনাতেও নিযুক্ত ছিলেন। এই সময় ‘ন্যাশনাল ফ্রন্টেও’ সুভাষচন্দ্রের প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হয়। কংগ্রেস থেকে চলে আসার পর থেকে ১৯৪১ সালে সুভাষচন্দ্রের দেশত্যাগের পূর্ব-পর্যন্ত ভারতীয় কমিউনিস্টরা তার সঙ্গ ছাড়েননি।

যদি সুভাষ দেশেই থাকতেন ও সংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ বামপন্থী আন্দোলনকে নেতৃত্ব দান করতেন, তবে কী হতে পারত ইতিহাস কখনও হয়তো তা নিয়ে ভাবেনি। সুভাষচন্দ্র বসুর আত্মোৎসর্গকে কমিউনিস্টরা আজ এক মহান দেশপ্রেমিকের মাতৃভূমির জন্য পালিত কর্তব্য বলেই বিবেচনা করে ও শ্রদ্ধা জানায়।

কালীপুজো সম্পর্কে দু’টি কথা

কালীপুজো। আসলে কে এই কালী? রহস্যময়ী এই দেবীর পুজো মানে শক্তির আরাধনা । এ পুজো যেন একটু অন্যরকম। আলোর পাশাপাশি অন্ধকারেরও একটা তীব্র মেজাজ পাওয়া যায় এই পুজোয়। কয়েকটা বিষয় একটু কথা বলা যাক –

কালী রহস্য : কালের উপর যে সত্ত্বা বিরাজমান সেই কালী। কালীকে লাভ করার উপায় সম্পূর্ণ আসক্তি মুক্ত হওয়া। সম্পূর্ণ আসক্তি ত্যাগই  হলো কালীর নগ্নতার প্রতীক। এছাড়া সম্পূর্ণ আসক্তি ও অসুরকে সংহার করতে না পারলে তিন কালের উর্দ্ধে কালীর কাছে পৌঁছানো যায় না। অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের আসক্তি ও ভবিষ্যতের আশা-এই তিনকালরূপী অসুর প্রলোভন দিয়ে কালমুক্ত কালীকে আবৃত করে তার জীব সন্তানকে দুঃখ দিচ্ছে। তাই আসক্তিযুক্ত অহং হলো কাল এবং আসক্তি মুক্তিই হলো কালী। তাই চৈতন্যময়ী কালীর অবস্থান চিন্তাবদ্ধ কালের উপর। আসক্তিযুক্ত কালীপুজো  হলো অসুরের স্বার্থপূজা ও নিরাসক্ত কালীপূজা হলো দেবতার নিঃস্বার্থ ভালবাসা। কালের আবরণে থাকার দরুন কালীকে আমরা কালো দেখি। চৈতন্যময়ী কালী সর্বব্যাপী, তাই তার তিন অবস্থান-আধিভৌতিক, আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক।

১) আমরা যে কালীর মূর্তিকে মাটি, পাথরের তৈরি কালো রঙ দেখি, তার কারণ আমাদের জড়-দৃষ্টি অর্থাৎ সীমিত ইন্দ্রিয় দৃষ্টি। কিন্তু ঐ মূর্তির প্রতিটি জড়কণায় রয়েছে জ্যোতি। যা ইলেকট্রন, প্রোটন রূপে জড়কণার অন্তরে সচল। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি ও বুদ্ধি সংকীর্ণ হলে জড়মূর্তির মধ্যে চৈতন্যময়ীকে দেখা যাবেনা। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ, বামাখ্যাপা, রামপ্রসাদের মতো মাতৃসন্তানেরা ঐ জড় মূর্তির সঙ্গে চিন্ময়ীবোধে কথা বলতেন। যা জড়বাদীদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

২) বিজ্ঞান বলে আমাদের দৃষ্টিশক্তির তুলনায় কম ও অধিক আলো আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়না। তাই জগতটা যে জ্যোতির সাগরে ভাসছে তা আমাদের সীমিত দৃষ্টির জন্য ঐ সর্বব্যাপী আধিদৈবিক জ্যোতির্ময়ীকে দর্শন হয়না।

৩) আমাদের অন্তরে জাগতিক চঞ্চল চিন্তার উর্দ্ধে যে স্থিত চৈতন্যময়ী সদা বিরাজমান, তা আমরা আমাদের অন্তরযোগের অভাবে উপলব্ধি করতে পারি না। এইভাবে মূর্তিতে, বিশ্বে ও অন্তরে যে চৈতন্যময়ী নিত্য বিরাজমান তা আমাদের সীমিত অজ্ঞান বা কালো দৃষ্টির কারণে দেখতে পারছি না।

কালীপূজায় দেবী ছিন্নমস্তার কথা শোনা যায়। কে বা কী এই ছিন্নমস্তা রূপ? অহংকারের অবস্থান মস্তিষ্কে। যে এই অহংকে মস্তিষ্ক থেকে ছিন্ন করতে পারে সেই কালীর অপর রূপ ছিন্নমস্তাককে লাভ করতে পারে। এই অহং ছিন্ন করতে পারলে নিজের মধ্যে তিনটে আমি-র সন্ধান পাওয়া যায়। একটি  হলো ব্রহ্মময়ী যার সঙ্গে সুষুম্না ধারার যোগ এবং আর দু’টি রূপ হলো শান্তরূপে ঈড়া ধারা ও চঞ্চলরূপে পিঙ্গলা ধারা। এই দুই ঈড়া, পিঙ্গলা ধারা যখন সুষুম্না ধারায় মেশে তখন যে অখন্ড আমির প্রকাশ হয় তাই হলো ব্রহ্মময়ী।  এই ব্রহ্মময়ীকে লাভ করলে অহং হয়ে যায় সোহহং। তাই অন্তরীয় সাধন মার্গে অহংকারকে ছিন্ন করে সোহহং প্রাপ্তির স্থূল প্রতীক বা প্রতিমাই হলো ছিন্নমস্তা। এভাবেই প্রত্যেক রূপের আড়ালে স্বরূপ বিদ্যমান। তাই স্বরূপকে লাভ করলেই রূপের পূজা ও সাধনা হয়।

এবার আসি কালীপুজোর সময় চর্চিত অন্য একটি বিষয়ে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যে এ এক সংশয়বাদী অবস্থান। তন্ত্র। তন্ত্র-সাধনা। কী এই তন্ত্র? তন বা শরীরের মধ্যেই তৎ বা ঈশ্বরের বাস। তাই তন এর মধ্যে তৎ এর বাস বলেই নিজেকে জানাকে তন্ত্র বলে। এইভাবে দেহের মধ্যে দেহীকে জানাই তন্ত্র সাধনা বা শারীরিক বিদ্যা। শরীর বিদ্যার দু’টি দিক আছে, একটি বাহ্যবিদ্যা অপরটি অন্তরবিদ্যা। তন বা শরীরে আত্মার অবস্থান আর দেহ হলো আত্মার মন্দির। আত্মা বলতে সেই বৃহৎ আমি বা ঈশ্বরকে বোঝায়। তাই গীতায় ভগবান বলেছেন, আমাকে যে দেহ বা শরীর ভাবে সে অজ্ঞানী। কিন্তু আমরা দেহে আবদ্ধ হয়েই অজ্ঞানী হয়ে আছি। তাই দেহের থেকে ত্রাণ পেতেই তন্ত্রবিদ্যার উদ্ভব। দেহতত্ত্ব তন্ত্রের প্রাথমিক বিদ্যা। তারপর মনতত্ত্বকে জানা হলো মাধ্যমিক বিদ্যা ও পরিশেষে আত্মবিদ্যাকে জানা হলো উচ্চবিদ্যা। দেহ, মন, আত্মাবিদ্যাকে নিয়েই তন্ত্রবিদ্যা। কিন্তু আসলে তো পুজো। আর বললাম যে, তন মানে শরীর আর শরীর থেকে ত্রাণই  হলো তন্ত্র। যাই হোক, কালীকথা বিস্তৃত। স্বল্প পরিসরে এই আলোচনা অসম্ভব।

আসলে মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার এই অব্যক্ত চার হাতের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ চিন্তাকালকে পরিচালনা করে কালী। কালীর মুখগহ্বরে জিহ্বার প্রকাশ  হলো বাক্ এর জন্ম। মুখগহ্বর হলো যোনি আর জিহ্বা হলো লিঙ্গ। এই দুইয়ের মৈথুনেই বাক্ এর সৃষ্টি। এইভাবে কালী হতেই কালের মধ্যে শব্দ ব্রহ্মের প্রকাশ ঘটে। কালের দ্বারাই এই জড়জগত চালিত। তাই কালের বুকে কালী হল ব্রহ্মান্ডের উপর ব্রহ্মময়ী দন্ডায়মান বা চিন্তার উর্দ্ধে চৈতন্য বিরাজমান। এইভাবে অন্তরযোগে চৈতন্যপ্রাপ্তিই হলো কালীপ্রাপ্তি। কালকে দেখা যায়না বলেই কালী কালো। এইভাবে শূন্যের ওপর পূর্ণ বিরাজমান বলেই শবের ওপর ব্রহ্মময়ীর প্রতিমা দন্ডয়মান। দুই চোখে দ্বৈত জগতের দ্রষ্টা এবং তৃতীয় চোখে অদ্বৈত জগতের দ্রষ্টা। এইভাবে খ-কাল ও অখ-কালের একত্রে দ্রষ্টাই হলো কালী বা আত্মচৈতন্য। তাই উলঙ্গকে পেতে হলে উলঙ্গ হতে হয়, অর্থাৎ আসক্তি শূন্য হলেই শক্তি পূর্ণ হয়ে যায়, যাকে বলে শক্তি পূজা। আসক্তি  হলো শক্তির আবরণ।  চিন্তার এই আবরণ গেলেই চেতনা মুক্ত বা উলঙ্গ হয়ে চৈতন্য বা কালী হয়।

প্রবাহ

আধুনিক মানুষের ‘জন্মভূমি’র খোঁজ

&

অন্তত দু’লক্ষ বছর আগে বিবর্তন ঘটে উত্তর বৎসোয়ানায় আধুনিক মানুষের জন্ম হয়েছিল। সম্প্রতি এই দাবি করলেন এক দল গবেষক। গবেষণাপত্রটি ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

আধুনিক মানুষের ‘আদি পুরুষের বাসভূমি’ ঠিক কোথায় ছিল, এতদিন তা এতটা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হত, দৈহিক গঠন অনুযায়ী (অ্যানাটমিকালি) আধুনিক মানুষের (হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স) উদ্ভাবন ঘটেছিল আফ্রিকায়। কিন্তু আমাদের প্রজাতির নির্দিষ্ট ‘জন্মস্থান’ অজানাই ছিল। আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণে কালাহারি মরুভূমির দেশ বৎসোয়ানা। বিভিন্ন দেশের ঘেরা ‘ল্যান্ডলকড’ দেশ এটি। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই হল আমাদের আদি পুরুষের জন্মভূমি।

বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার আদি বাসিন্দা ২০০ খোশিয়ান গোষ্ঠীর মানুষের ডিএনএ’র নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এদের দেহে প্রচুর মাত্রায় ‘এলও’ ডিএনএ রয়েছে। এরপরে ডিএনএ পরীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য অন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখেন বিজ্ঞানীরা যেমন – ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতœতাত্ত্বিক বদল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। গবেষকরা জানাচ্ছেন, এভাবে একটি জিনগত ‘টাইমলাইন’ মেলে। দেখা যায়, ওই ‘এলও’ ডিএনএ-টি দু’লক্ষ বছর আগেও আফ্রিকার দক্ষিণে বৎসোয়ানায় জাম্বেজি নদী তীরবর্তী এলাকায় ছিল।

এই গবেষণার অন্যতম হোতা ‘গ্যারভান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সিডনি’র অধ্যাপিকা ভেনেসা হেজ জানান, এলাকাটির নাম ‘ম্যাকগাডিকগাডি-ওকাভ্যাঙ্গো’। এক সময়ে এখানে একটি বড়  হ্রদ ছিল। আকারে ‘লেক ভিক্টোরিয়া’র দ্বিগুণ। তবে জায়গাটি এখন একেবারে মরুভূমি। দু’লক্ষ বছর আগে কোনও এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হ্রদটি জলাভূমিতে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, এখানেই আধুনিক মানুষ বসবাস শুরু করেন।

মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে মর্টার হামলা ইরাকে

markin

ইরাকের রাজধানী বাগদাদের উত্তরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে তিনটি মর্টারের গোলা আঘাত হেনেছে। ইরাকের একটি নিরাপত্তা সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্র জানায়, তাইজি সামরিক ঘাঁটির ভেতরে দুটি গোলা বিস্ফোরিত হয় এবং একটি গোলা ঘাঁটির বাইরে পড়ে ঘাঁটির বাইরে পড়া গোলাটি বিস্ফোরিত হয়নি। মর্টার হামলায় মার্কিন সেনাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা সূত্র তা বিস্তারিত জানায়নি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করেনি।

ইরাক জুড়ে যখন সরকার বিরোধী বড় রকমের বিক্ষোভ হচ্ছে তখন মার্কিন ঘাঁটিতে মর্টার হামলার ঘটনা ঘটলো। বিক্ষোভ মোকাবেলার জন্য সরকার রাজধানী বাগদাদে গত সোমবার  কারফিউ জারি করেছে। ইরাক সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় মধ্যরাত থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে এবং পরবর্তী নোটিশ জারি না করা পর্যন্ত এ অবস্থা চলবে ॥

যুদ্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে পারবে না : আব্দুল মালেক বদরুদ্দিন আল-হুথি

badad

ইয়েমেনের জনপ্রিয় হতে আনসারুল্লাহ আন্দোলনের প্রধান আব্দুল মালেক বদরুদ্দিন আল-হুথি বলেছেন, সামরিক উপায়ে তার দেশে এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না। ইয়েমেনের ওপর চলমান বর্বর আগ্রাসন এবং অবরোধের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে হুঁশিয়ার করে তিনি একথা বলেছেন।

ইয়েমেন সফররত জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিতের সঙ্গে বৈঠকে আব্দুল মালেক আল-হুথি আরো বলেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরব যে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে তা এ পর্যন্ত চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, সামরিক উপায়ে ইয়েমেনে এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে কোনভাবে শান্তি আসবে না। পরে গণমাধ্যমকে দেয়া এক বিবৃতিতে আনসারুল্লাহ আন্দোলনের মুখপাত্র আব্দুস সালাম এসব কথা জানান।

হুথি প্রধান আবদুল মালেক সামরিক সংঘাত অবসানের আহ্বান জানান এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে চলমান সংকট সমাধানের কথা বলেন। বন্দি বিনিময়ের বিষয়ে গত বছর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সৌদি আরবের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে রিয়াদ বাধা সৃষ্টি করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ওই চুক্তির আওতায় এ পর্যন্ত সৌদি আরবের শত শত বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে সানা।

স্টকহোমে সই হওয়া চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি সরেজমিনে দেখার জন্য মার্টিন গ্রিফিথ বর্তমানে ইয়েমেন সফর করছেন।

ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বাগদাদির খোঁজ দিয়েছিল

bagdadi

আইএসের হাতে মৃত্যু হয়েছিল মার্কিন মানবাধিকার কর্মী কেলা ম্যুলারের। তাঁর স্মৃতিতেই বাগদাদি নিধন অভিযানের নাম রাখা হয়েছিল। গত ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ বসছেন, ঠিক সে সময়ে ৬ হাজারেরও বেশি মাইল দূরে এলিট মার্কিন বাহিনী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে নামছে।

হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর, স্থানীয় সময়ে পাঁচটা নাগাদ আটটি চিনুক এবং ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে ডেল্টা     ফোর্স-সহ এলিট বাহিনী এক ঘণ্টা দশ মিনিট ধরে খুব বিপজ্জনক এলাকার মধ্যে দিয়ে উড়েছে। উত্তর ইরাক থেকে উড়ে তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়েছে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের বারিশার দিকে। ওই হেলিকপ্টারগুলি স্থানীয় গোলাগুলির মুখে পড়ে, এ তথ্য দিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। তবে সে বাধা কাটিয়ে ফিরতে পেরেছে বাহিনী।

রবিবার ভোরের অন্ধকারে কয়েকশো মাইল ফের পাড়ি দিয়েছে তারা। তাদের লক্ষ্য, আবু বকর আল-বাগদাদি, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রতিষ্ঠাতা এবং শীর্ষ জঙ্গি নেতা। মার্কিন বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে  যিনি নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের মুখে গতকাল ওই অভিযানের অনেকটাই উঠে এসেছে। অন্য মার্কিন অফিসারেরা অবশ্য বাগদাদির শেষ মুহূর্ত সম্পর্কে খুব একটা মুখ খোলেননি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে যতটা জানা গিয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, শনিবার মধ্যরাতের কিছু পরে সেনা কপ্টারের শব্দ শোনা যায়। তারপরে টানা গুলিবর্ষণের শব্দ। তবে সাধারণ দিনে যেমন গোলাগুলি চলে, তেমন শব্দ নয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি! তারপরে যা হয়েছে, তা ট্রাম্পের ভাষায়, ‘‘সিনেমার মতো।’’

অভিযানের নাম, কোথা থেকে বাগদাদির খবর মিলল, বাগদাদি ধ্বংসের পরে কী হতে চলেছে তাঁর সাম্রাজ্যের এমন কিছু টুকরো টুকরো তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। জানানো হয়েছে, বারিশার ওই চত্বরটিতে ঢোকার পরে মূল প্রবেশপথে বিস্ফোরক থাকতে পারে এই আশঙ্কায় মার্কিন বাহিনী একটা দেওয়াল ভেঙে ঢুকে পড়ে। সেখানে ঢোকার পরেই বেশ কয়েকজন আইএস জঙ্গিকে  সামনে পেয়ে তাদের মারে মার্কিন বাহিনী, এ তথ্য জানিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। দু’জন জঙ্গিকে জীবিত ধরা হয়, আর ১১টি শিশুকে হেফাজতে নেওয়া হয়। এই সময়ে অভিযানে দলের একটি কুকুর আহত হয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন। এরপরের নিশানা বাগদাদির দুই স্ত্রী। তাঁদের আত্মঘাতী জ্যাকেট থেকে অবশ্য বিস্ফোরণ ঘটেনি। শেষমেশ ফাঁদে পড়েন বাগদাদি। তারপরের গল্পটা ট্রাম্প কাল সবিস্তারে বলেই দিয়েছেন।

ইরাকের গোয়েন্দা বিভাগের দুই আধিকারিকের দাবি, বাগদাদিকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, ইসমাইল আল-এথাউইয়ি। ওই আধিকারিকদের বক্তব্য, এথাউইয়ি কিছুদিন আগে তুরস্কে গ্রেফতার হয়েছিল। তারপর তাকে ইরাকের হাতে তুলে দেয়া হয়। সেখানেই সে বাগদাদি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। বাগদাদির গতিবিধি এবং গোপন ডেরার খবর অনেকটাই স্পষ্ট হয় এথাউইয়ির কাছ থেকে। সে জানিয়েছিল, ধরা পড়া এড়াতে আনাজ-ভর্তি মিনিবাসে চড়ে রণকৌশল নিয়ে আলোচনা চালাতেন বাগদাদি।

এ সপ্তাহের গোড়ায় ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে বাগদাদির সম্ভাব্য আস্তানার খবর দেওয়া হয়। বারিশার ওই চত্বরে যে বাগদাদি লুকিয়ে, তা নিশ্চিত জানার পরেই কমান্ডারদের সবুজ সঙ্কেত পাঠান ট্রাম্প। প্রেসিডেন্টের কথায়, ‘‘আমরা জানতে পেরেছিলাম, উনি কোন দিকে এগোচ্ছেন। মাঝে শুনলাম, উনি অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। কিন্তু উনি যাননি। তিন-চার বার তাই চেষ্টা করেও এগোনো হয়নি। কারণ বাগদাদি ঘনঘন সিদ্ধান্ত বদলে ফেলছিলেন। শেষমেশ হাতে পাওয়া গেল তাঁকে।’’ ইরাকি এবং কুর্দিশ সেনার থেকেও তথ্য পেয়েছে সিআইএ। সেই সূত্রে এক সিরীয় ইঞ্জিনিয়ারের খোঁজ

পাওয়া যায়। যিনি বারিশা এলাকা সংলগ্ন গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। তিনি জানিয়েছিলেন, হুরাস আল-দিন নামে আর একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর কমান্ডার আবু মহম্মদ সালামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাগদাদি। অভিযানের পরে ওই কমান্ডারের কী হয়েছে, তা এখনও অস্পষ্ট।

হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রায়েন জানিয়েছেন, এই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে ‘কেলা ম্যুলার’। আইএসের হাতে বন্দি হয়েছিলেন ২৬ বছরের মানবাধিকার কর্মী কেলা। ২০১৩ সালে তুরস্ক সীমান্ত পেরিয়ে সিরিয়ার হাসপাতালে কাজ করতে যান তিনি। ২০১৫’য় তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। দেহ পাওয়া যায়নি। কেলার মর্মান্তিক পরিণতির কথা মনে রেখেই অভিযানে তাঁর নাম রাখায় আপ্লুত তাঁর বাবা-মাও।

সংবাদ মাধ্যম সূত্রেই প্রকাশিত, বাগদাদির পরে আইএসের প্রধান হয়েছে ইরাকের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনের বাহিনীর অফিসার আবদুল্লা কারদাশ। ইরাকের জেলে বাগদাদির সঙ্গে তার খাতির জমে। সেটা ২০০৩-০৪ সাল। আইএসে যোগ দেয়ার আগে আল কায়দার ধর্মীয় প্রচারক ছিল কারদাশ। নিষ্ঠুর এই জঙ্গিনেতা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দলে। আইএসের প্রচার সংস্থা আমাক-এর বিবৃতি অনুযায়ী, বাগদাদি এ বছরের আগস্টেই কারদাশকে গোষ্ঠীর দৈনন্দিন কার্যকলাপ দেখ ভালের ভার দিয়েছিলেন ।

৩ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কিত দিন

4-neta-inner20171103012248

সংলাপ ॥ ৩ নভেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিন ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ঢাকা জেলে নিহত এই চার মহান জাতীয় নেতা হচ্ছেন – স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় তৎকালীন সরকার। ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেলের অভ্যন্তরে জাতীয় এ চার নেতাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সবচাইতে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং তৎকালীন স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমদের প্ররোচনায় এক শ্রেণীর উচ্চাভিলাসী মধ্যম সারির জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা এ নির্মম হত্যাকান্ড ঘটায়। দেশের এই চার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ১৫ই আগস্টের হত্যাকান্ডের পর কারাগারে পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা প্রথমে গুলি এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। জাতীয় এ চার নেতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এএইচএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান শুধু বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনেও তারা ছিলেন অসাধারণ মানুষ। তাদের হত্যাকান্ডের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে দেশের রাজনীতিকরাও তাদের নৈতিক দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এ হত্যাকান্ডের পেছনের ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল, সে ব্যাপারে রাজনীতিকদের উচিত ছিল ব্যাপক অনুসন্ধান করা এবং সত্য খুঁজে বের করা। সেই কাজটি তাদের রাজনৈতিক সহকর্মী ও সহযোগীরা এখনো করতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য চারনেতার হত্যার বিচার সম্পন্ন হওয়া জরুরি। জাতি আশা করে জাতীয় চারনেতার হত্যার সুষ্ঠু বিচার এদেশে সম্পন্ন হবে। জাতি হত্যার কলঙ্ক থেকে মুক্তি চায়। খুনিদের শাস্তি চায়। সেই সঙ্গে হত্যা ও নৃশংসতাকে যারা উৎসাহ দিয়েছে তাদেরও বিচার করা জরুরি।