ভিতরের পাতা

ধর্মের নামে…. – ১৫

‘শান্তির (ইসলামী) জীবন বিধানে কোন জোর জবরদস্তি নেই- সুষ্ঠু ও সঠিক পথ এবং বিভ্রান্ত পথকে

আলাদা করে দেয়া হয়েছে।’

সংলাপ ॥ এর পরেও কি কোন কথা বলার দরকার আছে যে নবী নিজে কোন কথা আল্লাহর হুকুম ছাড়া বলেছেন? অবশ্যই না। সুরা মাআরিজ-এর ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নং আয়াতসমূহে যা বলা হয়েছে তা তো অবাক হবার মতো। এ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি (রাসুল) যদি আমার সম্পর্কে কোন কথা বানিয়ে বলতেন, তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম। তারপরে তার গলার রগ অবশ্যই কেটে ফেলতাম। তারপরে আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ ছিলো না, যে নাকি আমাকে ফিরিয়ে রাখতে পারতে।’

সুরা আহযাবের ১ নং ২ নং আয়াতে, সুরা ছোয়াদের ৮৬ নং আয়াতেও ঐ একথা। সুরা যুখরুফ এর ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘সুতরাং আপনি এ কোরানকেই আঁকড়ে ধরুন যা আপনার কাছে ওহী যোগে নাজিল করা হয়েছে। নিশ্চয় আপনি সহজ, সত্য, সনাতন পথে রয়েছেন।’ সুরা আহকাফির ৯ নং আয়াতে বলা হযেছে, ‘আপনি বলে দিন, আমিতো আর রাসুল হিসাবে মোটেই নতুন নই। আর আমি জানিনা- আমার সাথে কী ব্যবহার করা হবে, আর তোমাদের সাথেই বা কেমন করা হবে। আমি তো শুধু সে কথাই মেনে চলছি যা আমার কাছে ওহী যোগে আসছে। আর আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী বৈ তো নয়।’ তাই, পূর্বের নবীর সমর্থন, ওহী গোপন না করা, ওহী যোগে পাওয়া নির্দেশ মেনে চলা ইত্যাদি ছিল নবীর প্রতি আল্লাহর সরাসরি আদেশ। 

সুরা আল ইমরানের ৯৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি বলুন, আল্লাহতো সত্যই বলেছেন। সুতরাং তোমরা ইব্রাহীমের সহজ, সরল, সত্য, সনাতন জীবন ব্যবস্থাই মেনে চলো। তিনি তো আর মুশরিকদের শামিল ছিলেন না।’ ঠিক একই কথা সুরা বাকারার ১৩৫ ও ১৩৬ নং আয়াতে বর্ণিত আছে। সুরা বাণী ঈসরাইলের ১২৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তারপরে আমিই আপনাকে ওহীযোগে নির্দেশ দিলাম যেন আপনি ইব্রাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করেন। সুরা বণী ঈসরাইলের ৫৩ নং আয়াতে বলা আছে, ‘আমি তো আপনাকে তাদের নিকট দারোগা হিসাবে পাঠাইনি।’ সুরা নাহল-এর ৮৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনার কাছে এমন একখানা কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে প্রত্যেকটি বিষয়ের বিবরণ মজুদ রয়েছে। মুসলিমদের জন্য এতে পথ নির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদ রয়েছে।’ সুতরাং, কোরান পরিপূর্ণ জীবন বিধান। রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওহীযোগে এটা আল্লাহর নিকট থেকে পেয়েছেন। তিনি নিজের কোন মতামত এতে ব্যক্ত করেননি। যা কিছু বলেছেন কোরান থেকেই বলেছেন, যা কিছু করেছেন কোরান থেকেই করেছেন। আর এ কোরান পূর্ববর্তী সমাজেও নবীদেরই জীবন বিধানরূপে, তাদের সমাজের মানুষের পথ নির্দেশিকা হিসাবে এসেছে যার সত্যতা কোরান প্রমাণ করে দিল। আর আমরা মিল্লাতে ইব্রাহিমীর উপর স্থির রয়েছি। রাছুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ও মিল্লাতে ইব্রাহিমের পথে থেকেই জীবন বিধান স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছেন ¯্রষ্টার আশীষরূপে।

প্রশ্ন হলো, অনেকেই বলে থাকেন, রাসুল যা বলেছেন এবং করেছেন তা হাদীস। তা হলে কোরান কী? রাসুল তো কোরানের বাইরে, ওহীর বাইরে কোন কথা বলেননি। তবে তাঁর কথা ও কাজকে হাদীস বলা উচিৎ কিনা তা ভাবনারও অবকাশ নেই। কারণ দুর্বোধ্যরূপে কোরানের অবতারণা হয়নি। সহজ সরলভাবে মানুষকে বুঝানো হয়েছে যাতে কোন বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়। বিভ্রান্তি কে করে? মানুষই করে। মানুষ কেন করে? করে শয়তানের প্ররোচনায়, নিজের স্বার্থে, অজ্ঞতার কারণে, জেদের বশে, ক্ষমতার লোভে। এসব বিভ্রান্তি আগেও ঘটেছে এখনও ঘটছে। এত যে স্পষ্ট জীবন বিধান তার মাঝেও এত দলাদলি ভাগাভাগি কী করে এলো? এর জন্য দায়ী অজ্ঞতা।

আজকের সমাজে মানুষ কত না ভাষা শিখছে অথচ ¯্রষ্টার বাণীতে ভরা তারই জীবন বিধান যে বুঝলো না-কাজ করলো না এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কী-ই বা থাকতে পারে?  কতগুলো লোকাচারকে ধর্ম মনে করে সেটাকে জীবন বিধান হিসাবে চালিয়ে দেবার ভাওতাবাজী আর কতদিন? কোরান নিজেই বলছে, কোরান বোঝা সহজ, পরিস্কারভাবে এর আয়াতগুলো বর্ণিত, কোন বিষয়েই কোন কিছু বাদ যায়নি। অথচ কোরান বিষয়ে শুধু অজ্ঞই নয় মহামূর্খও বটে। সুরা আল কামার-এর ৭নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘আমিই তো এই কোরানকে উপদেশ লাভের জন্য সহজ করে দিয়েছি। কিন্তু তোমাদের মধ্যে বুঝবার মতো কেউ আছে কি?’ একই কথা ২২ নং আয়াতে, ৩২ নং আয়াতে, ৪০ নং আয়াতে ও ৫১ নং আয়াতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা বাকারার ৪৪ নং আয়াতে বুদ্ধি খাটানোর কথা বলা হয়েছে। সুরা বাকারার ১৭১ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কাফিরদের উপমা ঠিক এমনি যেমন কেউ চিৎকার ও শব্দ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারে না-এমন জন্তুর পিছনে ধাওয়া করছে। তারা বধির, মুক, অন্ধ তারা যে মোটেই বুদ্ধি খাটায় না।’ সুরা বাকারার ২১৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানবজাতি একই উন্মত হিসেবে ছিল।’ পরে তাদের মধ্যে যে সব বিরোধ দেখা দিয়েছে তার জন্য নবী ও কিতাব পাঠিয়েছি কিন্তু সুস্পষ্ট দলিল পাওয়ার পরেও তারা জিদের উপরেই ছিল।’ অথচ সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘ শান্তির (ইসলামী) জীবন বিধানে কোন জোর জবরদস্তি নেই-সুষ্ঠু ও সঠিক পথ এবং বিভ্রান্ত পথকে আলাদা করে দেয়া হয়েছে।’ সুরা বাকারার ২৭২ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসা আপনার দায়িত্ব নয়। বরং আল্লাহ যাকে খুশী সঠিক পথে চলার তওফিক দান করেন।’ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) সুসংবাদদাতা ও বার্তাবাহক যা আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট থেকে রহমত হয়ে এসেছেন। সুরা নিছার ৮২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা কি কোরান সম্পর্কে মোটেই চিন্তা করে না?’ (চলবে)

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য ১৫

‘জ্ঞান অর্জনে বই কেতাব হতে মানুষ কেতাব উত্তম।’

             – সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন

‘সরলে গরল মিশাইও না গরলে সরল মিশাইও না।’

             – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

‘সত্য মানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যান হবেই হবে।’

             –  সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সত্য ও সুন্দরের প্রতি তীব্র আকাঙ্খাই মানুষকে আত্মবিকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। সত্যের জন্য সব কিছুকেই ত্যাগ করতে হয় কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না। সত্যের হাতছানি যে পেয়েছে,সত্যের মাহাত্ম যে অনুভব করেছে তাকে কি আর সত্যের বিনিময়ে কোন কিছু দিয়ে ভোলানো যায়? মানব জীবনের চূড়ান্ত চাওয়াই হলো শান্তি। সত্য আর শান্তি একাত্মা। সত্য ছাড়া শান্তি আসেনা। সত্য সত্য হতে, সত্যের প্রতি, সত্যের দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

পার্থিব ধনদৌলত, প্রতিপত্তি ও চাকচিক্যের মোহ মানুষকে সাময়িকভাবে সুখ দিলেও অনাবিল শান্তির জন্য তা অতি তুচ্ছ। ‘হাক্কানী দর্শন’ মতে আত্মিক উৎকর্ষতা সাধনের মাধ্যমে অনাবিল শান্তি অর্জনই মানুষের কাম্য। তাই ধর্মান্বেষী মানুষের শান্তির পথের দিশা দিয়ে গেছেন সত্যমানুষগন সর্বকালে, এখনও তার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। এ পথ ছিলো আছে থাকবে। যতদিন মানবজাতি থাকবে পৃথিবীতে ততদিন এ ধারা অব্যাহত থাকবে। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে আহ্বান জানানো হচ্ছে ‘হে মানবজাতি, তোমরা যে ধর্মাবলম্বীই হও না কেন জীবন চলার পথে শান্তি ও মঙ্গল হাসিল করার জন্য মুর্শিদ/গুরু/পথ প্রদর্শক তালাশ কর এবং সংযোগ স্থাপন কর। যদি সংযোগ স্থাপন করতে না পারো তাহলে অন্ততঃপক্ষে সযোগ রক্ষা করে চলো।

গুরুবিহীন এ পথচলা অসম্ভব। গুরুকৃপা ছাড়া অসম্ভব। সত্য প্রতিষ্ঠার পথ প্রেমের পথ। ‘প্রেমের পথ সহজ হয়, যদি মুর্শিদ সঙ্গ দেয়’। সত্যমানুষদের কাছে প্রেমই ধর্ম। প্রেমই ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মিলন সেতু। সত্যমানুষতত্ত্ব অনুসারে আল্লাহ্ প্রেমময়। তিনিই একমাত্র প্রেমের ভান্ডার বা প্রেমাষ্পদ। সত্যমানুষতত্ত্বে প্রেম ও দয়া একই জিনিসের দুটো ভিন্ন নাম। প্রেমই ধর্মের নির্যাস। তাই আল্লাহ্ প্রেমিক সাধকগন বাহ্যিক মন্দির মসজিদ গীর্জার প্রয়োজন বোধ করেন না। প্রেমের অনুসারীরা সকল প্রকার ধর্মাচার থেকে পৃথক। যুক্তি, বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহ্কে পাওয়া যায় না। একমাত্র প্রেম, ভক্তি দ্বারা আল্লাহ্কে পাওয়া যায়। প্রেম কি জিনিস তা যুক্তি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে বোঝানো যায় না। প্রেম জীবনের পরম রহস্য। অনির্বচনীয়, অসংজ্ঞায়িত গুপ্ত ব্যাপার। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, যেখানে প্রাণ আছে সেখানে প্রেমজগৎ আছে, প্রেমেরও শেষ নেই, সত্যেরও শেষ নেই, জ্ঞানেরও শেষ নেই। আবার এই তিনটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সত্য ও জ্ঞান মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। যতক্ষণ চাওয়া আছে ততক্ষণ প্রেম, পেয়ে গেলে জ্ঞান।’

সকল সাধক এতে একমত যে প্রেম ব্যতীত ঈমান পূর্নতা পেতে পারেনা। প্রেমের সঙ্গে থাকবে ভয়। প্রেমবিহীন ভীতি কাজের নয়। প্রেম-ভীতি ও ভক্তির সমন্বয় প্রকৃতপক্ষে এমন একটি অনুভুতির স্পন্দন যা এক মুহূর্তে মানবকে এক অভাবনীয় ইন্দ্রিয়াতীত স্বর্গীয় রাজ্যে আরোহণ করিয়ে তাকে অমরত্ব ও অখন্ডত্ব দান করে অসীম সত্তায় নিমজ্জিত করে। প্রেমহীন ইবাদত তা করতে পারেনা। প্রেমের শক্তিতেই একমাত্র এই কঠিন গিরিসংকট ডিঙ্গাতে পারে। সাধককুল শিরোমনি হযরত গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী (র.) বলেছেন- প্রেমহীন এবাদতকারী যেখানে এক বছরে পৌঁছে, প্রেমিক সেখানে এক হুংকারে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ যখন মানুষ আল্লাহ্কে ভালোবাসে আল্লাহ্ও তখন মানুষকে ভালোবাসেন। অর্থাৎ নদী যখন সাগরে মিলিত হওয়ার জন্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে তখন সাগরেও জোয়ার এসে সেই মিলন আরও সহজতর ও ত্বরান্বিত করে দেয়। সূফী সাধক মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী সূফীর এই প্রেমানুভুতিকে অতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মাত্র দুটি ছত্রে-‘নিরস এবাদতকারী আল্লাহ্ প্রাপ্তির সামান্যতম পথ একমাসে অতিক্রম করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ প্রেমিক ব্যক্তি প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ্র সিংহাসনে পৌঁছে যায়। জাত ও সিফাতের মিলন সূত্র এই প্রেম। প্রেম কোন বাধাকে বাধা মনে করে না। প্রেমিক নানা বাধা বিপত্তির প্রাচীর, বন্ধুরতা ও কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে প্রেমাস্পদের সাথে মিলিত হতে ছুটে যায়। এসব প্রতিকূল অবস্থার সাথে যুদ্ধ করতে করতে সে তার মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন: ‘প্রেমিক যারা জনম ভরা কত দুঃখের বোঝা বয়, প্রেম করা হবেনা তার থাকলে কুল কলঙ্কের ভয়।’ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক প্রেম জগতের বিশালত্ব প্রকাশ করেছেন এভাবে ‘যার প্রেমের শুরুও নেই, শেষও নেই, তার প্রেম কাঁচা ’।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আরও বলেছেন ‘দুই যুগ লেগে থাকলে একজন আশেক হয়।’

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রেম জগৎ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এভাবে প্রকাশ করেছেন আমাদের জন্য আরও সহজবোধ্য করে ‘প্রেম একটা জগৎ। যেটা বহমান, সেখানে আমার অধিকার আছে, যে কোন সময়, যে কোন জায়গায় আমি বিচরণ করতে পারি এ জগতে। প্রেম নামে যে একটা জগৎ আছে, সে জগৎটা আমার মধ্যে কেমনভাবে বর্তমান। কেমনভাবে বর্তমান বললে, আমাদের যখন বয়স বাড়ছে, বিভিন্ন কর্মের মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে-নিজেকে দেখতে হবে এবং নিজের কনসেপ্ট তৈরী করতে হবে, যার যার মত করে। আপনারা শুনেছেন, ভালোলাগা আছে, ভালোবাসা আছে, ¯েœহ আছে, শ্রদ্ধা আছে, ভক্তি আছে, ভাব আছে, মহাভাব আছে, সবগুলোর সমন্বয়ে প্রেমজগৎ। আমি কোথায় অবস্থান করছি? জীবন থেকে জীবন, প্রেমের ধারাও বহমান। প্রেম বর্তমান, প্রেম পরিবর্তনশীল, বিবর্তনশীল, রূপান্তরও আছে। এর কোন জায়গায় আমি অবস্থান করছি? আমার কর্ম আছে, বেঁচে আছি। প্রেমের জন্ম নাই, মৃত্যু নাই, প্রেমিক যে, প্রেমাস্পদ যে, তাদেরও জন্ম নাই, মৃত্যু নাই, আছে রূপান্তর। কোন জায়গায় গেলে প্রত্যাশা শূণ্য হবে? সবই কিন্তু প্রেমজগৎ, কিন্তু স্তর আছে। ভালোলাগা খারাপ না, এটা শুকায়ে যেতে পারে একটা পর্যায়ে। যে কারণে ভালো লাগছে, সেটা শেষ হয়ে যাবে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে যখন চিন্তা করব তখন ভালোলাগা শেষ হয়েও যেতে পারে। প্রত্যাশা পূরণ হয়ে গেলে ভালোলাগা-ভালোবাসাও শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রেমজগৎটা কিন্তু শেষ হয়নি। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে, প্রত্যেক প্রানীর মধ্যে, অপরদিকে এভাবে বলা যায়, যেখানে জীবন আছে, সেখানে প্রেম আছে, সেখানে সত্য আছে, সেখানে শান্তি আছে। এটাকে কেমনভাবে কে এ জগতের মধ্যে ঢুকে যাতায়াতের মধ্যে আছে, কোন অবস্থানে আসছে আর যাচ্ছে, সামনে আসলে এক রকম হয়, দূরে সরে গেলে আর এক রকম হচ্ছে। প্রত্যাশা যখন থাকছে তখন সেই একই অবস্থা হয়? হয় না? এটা বাস্তবতা। এমন কেউ নাই যে বলবে আমার মধ্যে এগুলো নাই। আমি এখনও যুদ্ধ করছি। যুদ্ধই জীবন।হাক্কানীর পথটাই এটা, যে যুদ্ধই আমার জীবন। প্রেমের কথাটা কে বলতে পারে? একমাত্র প্রেমাস্পদ বলতে পারে। এছাড়া আর কারো মুখে শোভা পায় না। করলেই প্রতারণা হয়ে যাবে। একমাত্র প্রেমাস্পদ বুঝতে পারেন কে আমার প্রেমের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। প্রেম করা যায় না, হয়ে যায়। কবে, কে, কেমনভাবে হয়? হওয়াটা কিভাবে হয়? হও বললে কি হয়? সেটা কোথা থেকে আসে? কোন পর্যায়ে গেলে তবে হবে? করা যায় কিভাবে আর হওয়া যায় কিভাবে? কর্মের সঙ্গে করার একটা যোগসূত্র আছে। একটা মানুষের আপাদমস্তক একটা পৃথিবী, সেখানে কর্ম করার জন্য কোন্ কোন্ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমি ব্যবহার করছি, আর হওয়ার সঙ্গে আমার কোন্ কোন্ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জড়িত আছে। এটা বার করতে হবে যার যার মত করে তবে এই বাণীর নির্যাস, সুগন্ধিটা উপলব্ধি করা যাবে। দুনিয়াদারির কোন কথা বলে বা তুলনা দিয়ে প্রেমের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। ধরা পড়বেন আপনি। শুরু আর শেষের কথা বলা আছে, কতক্ষন সময় শুরু আর কতক্ষন সময় শেষ। শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন না? একটা ফেলেন আর একটা নেন, এর মধ্যে কতটুকু সময়? এই যে শ্বাস ফেলেন, না নিতে পারলেইতো শেষ। কতটা মুহূর্ত, এই    মুহূর্তগুলো মানুষের জীবনে নিজেরটা নিজে উপলব্ধি করতে হবে। আমি মিনিমাম একুশ হাজার, ম্যাক্সিমাম সাতাশ হাজার শ্বাস-প্রশ্বাস নর্মাল হিসাব করেছি। আমি কটা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংযোগ রেখে কোন কর্ম করছি? শ্বাস-প্রশ্বাস হিসাব করতে গেলে আপনার চিন্তার জগৎ অন্যরকম হয়ে যাবে। চোখ আপনার কাছে সারেন্ডার করবে, কানও সারেন্ডার করবে যে আমি শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে এই জিনিসটা নিয়ে চিন্তা করব। চোখ কি দেখে? কান কি শোনে?-(একজনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন) সখী প্রেম করা আর হলোনা আমার, প্রেম নিয়ে গেলো সব ভক্তজনে। প্রেমজগতে ভালোলাগা আছে, ভালোবাসা আছে, ¯েœহ আছে, প্রেম, ভক্তি, শ্রদ্ধা আছে। আমি কোথা থেকে ধরব? চলমান গতিতে যেমন একটা সমুদ্র চলছে, সেখানে আমি এক বালতি পানি তুলে নিতে পারি, হাত দিয়ে গিয়ে তুলে নিতে পারি এবং এটার পরিচয় দিতে পারি যে এটা এই সমুদ্রের পানি। আমি পরীক্ষাও করতে পারি যে এর গুনাগুন কি, এর কতটা লবনাক্ততা। এদিকে পরিস্কার সমুদ্র বয়ে যাচ্ছে, সেটার রঙ-এ রঞ্জিত হতে পারব। অন্বেষণ করতে গিয়ে দেখতে হবে যে ডুব দিছে সে’ই উপলব্ধি করতে পারবে। আর একজন দেখছে যে আমি কোন্ প্রিপারেশন নিয়ে সমুদ্রের মধ্যে বাকি জীবন বিরাজমান থাকব, সমুদ্রের হয়েই থাকব, ওটা যিনি অবর্জাভ করছেন একমাত্র তার কাছ থেকেই কিছু পাওয়া যাবে। দরবারে কাজ করবেন অথচ সেখানে নিজস্ব কোন থিম থাকবে না তা হতে পারে কি? এই যে স্ক্রলটা চলছে আর একজন সাধক আস্লে বলে দিতে পারবেন এখানে কি কি থিম আছে। করা আর হওয়ার মধ্যে যে এখানে মূল কথাটা -শুরু আর শেষ- ধনবান যিনি হইতে চাইবেন সেবা তার কাছে থাকতেই হবে। আমি আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে আসছি যতটুকু নিয়া আসতে পারছি বিলাইয়া দিব। শ্রেণীভেদ সেখানে থাকতে পারে না। সম্পদের সন্ধান তুমি পাবে না যতক্ষণ না তুমি যোগ্য হবে। সম্পদ দিলে তুমি নষ্ট করে ফেলবে। যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়।” হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে এভাবে পাচ্ছি আমরা-

হে প্রেমিক

তোমার দু-চোখ দিয়ে দেখতে যাবে

প্রেমাস্পদ দূর থেকে দূরে সরে থাকবে

নিজেকে যতই ভুলে যাবে

প্রেমাস্পদ ততই নিজেকে উন্মোচন করবে

ব্যাকুলতা তখন আলো আনবে।

আমিত্বের আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করবে

সমস্ত পৃথিবী তোমারই হবে

প্রেমাস্পদ তাঁর দরজা খুলে রাখবে

তখনই তোমার ভিতরের কাবাকেও সন্ধান পাবে

সিজদাতে রত থেকো তুমিই হবে তীর্থ পথিক। (চলবে)

মিরপুরের ‘জ্যোতিভবন’-এ নেতৃত্ব বিষয়ে ৯ম পর্বের আলোচনা – মানুষকে যারা সরল পথ দেখান তারাই নেতা

সংলাপ ॥ মহান সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ  প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে আলোচনার ৯ম পর্ব  গত ১৪ পৌষ ১৪২৬, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’ এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফার সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশ নেন সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ-এর নির্বাহী সম্পাদক শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন, হাক্কানী পরিবারের সদস্য ও বিবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সত্যানুসন্ধানী বাহাদুর ব্যাপারী এবং বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও হাক্কানী বিশেষ দূত মোল্লা হাছানানুজ্জামান টিপু। সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

মোল্লা হাছানানুজ্জামান টিপু বলেন, পবিত্র কোরআনের সূরা ইয়াসিনে বলা হয়েছে, ‘অনুসরণ কর তাদের, যাহারা তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান কামনা করে না এবং যাহারা সৎ পথ প্রাপ্ত’। এই সৎপথ হলো সূরা ফাতিহায় বর্ণিত,‘ সিরাতুম মোস্তাকিম – সরল পথ।’ সেই সরল পথে মানুষকে যে অনুসরণ করে যে নিয়ে যায়, সেই নেতা, তার কাজটিকে বলে নেতৃত্ব। উপরোক্ত বাণী থেকে বুঝা যায় নেতা কোন প্রতিদান আশা করতে পারেন না। নেতা তার কর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ জেনেই নেতৃত্বে আসেন।

কিছু মানুষ নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত গুণ নিয়ে জন্মায়। মানুষ অজান্তেই নিজেকে সেই গুণী মানুষটার কাছে সমর্পন করেন। নেতৃত্বটা অলৌকিক। কৃপা ছাড়া কেউ নেতা হতে পারে না। হাক্কানীতে সাধক আনোয়ারুল হকের দরবারে সেই কৃপায় ও আশির্বাদে ধন্য ছিলেন সাধক শেখ আবদুল হানিফ। প্রতিকূলতার মধ্যে আপন লক্ষ্য স্থির রেখে উনি এগিয়ে গেছেন। সাথে ছিলো তাঁর শ্রীগুরুর কৃপা। উনি সার্থক হয়েছিলেন, তাই ওনার গড়া প্রতিষ্ঠানে আমরা আজ সেই নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলছি।

আমাদের নেতা সূফী সাধক শেখ হানিফ পর্দা নেওয়ার পর এখানে একটা নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। ঠিক সেই সময়ই হাক্কানী চিন্তন বৈঠক নেতৃত্ব নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন একটা বিষয় নির্বাচন করার জন্য বাহাখাশ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। আমাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দানের জন্য বাহাখাশ কর্তৃপক্ষকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

কে নেতা?  কে নেতৃত্ব দিতে পারে? লিডারশীপ কোয়ালিটি যার মধ্যে আছে সে-ই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য। সেই লিডারশীপ কোয়ালিটি কি? বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখবো, লক্ষ্য সম্পর্কে যার স্বচ্ছ ধারণা আছে, দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, মানবিক, কল্যাণময়, প্রেমময় ও সচেতন তিনিই নেতা। এই গুণগুলি যার মধ্যে আছে সেই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য।

হাক্কানীতে কর্ম, মানবতা ও শান্তি- এই তিন হলো উদ্দেশ্য। মানবতার লক্ষ্যে কর্ম করে শান্তি লাভ করাই হাক্কানীদের বা সত্যপথ যাত্রীদের কাজ। এই কাজে সফলতা তখনই আসবে যখন একের সাথে একাত্মতা হবে,  দড়হবহবংং রিঃয ঙহব, ড়হবহবংং রিঃয ঃৎঁঃয’ – ‘মানে একের সাথে একাত্মতা, সত্যের সাথে একাত্মতা। 

সেই নেতৃত্ব দিতে সক্ষম যে একের সাথে একাত্ম হবে, সত্যটাকে ধারণ করবে। এই পথে চলতে গেলে একের সাথে একাত্ম হতে হবে। কথা আছে আল্লাহকে পেতে হলে আল্লাহর রঙে নিজেকে রাঙাতে হবে। আল্লাহর সকল গুণাবলী নিজের করে নিতে হবে, ধারণ করতে হবে। সময় সময়ে করলে হবে না, সর্বাবস্থায় তাকে ধারণ করতে হবে।

সে সাধন পথে প্রথম নেতৃত্বটা কিন্তু নিজেকেই নিজের উপর নিজে দিতে হবে। নিজের বিক্ষিপ্ত চিন্তাকে এককেন্দ্রিক করতে হবে, কায়মনোবাক্যে কর্ম মানবতা শান্তির পথ ধরে এগোতে হবে। মানবিক কর্ম করে শান্তি লাভ করে একের সাথে, সেই সত্যের সাথে একাত্ম হতে হবে।

দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একজন কর্মীকে নেতৃত্বে আসতে হয়। এখানে কোন শর্টকার্ট রাস্তা নাই। তার কৃপা পেতে হলে কর্ম দিয়েই তার মন জয় করতে হবে। সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এই নেতৃত্বগুণে গুণান্বিত হতে হয়। হাক্কানীতে, যে হাক্কানীর বৃহত্তর স্বার্থে, প্রতিদান প্রত্যাশা না করে কল্যাণমুখী চিন্তার দ্বারা সচেতনভাবে কর্ম সম্পাদন করে এগিয়ে যেতে পারবে সেই নেতৃত্বগুণে গুণান্বিত হবে।

কোন একদিন আমার শ্রীগুরু বলেছিলেন, হাক্কানী পথের যাত্রী হতে হলে প্রেমময় হতে হবে, দৃষ্টিকে সামলে চলতে হবে সচেতনভাবে। আত্মকর্ম বিশ্লেষণে চলতে হবে। জগতে অন্যের বিচার করতে গেলে বিচ্যুতি আসবেই। লাইন থেকে ছিটকে পড়বেই। লক্ষ্যে যাওয়ার জন্য আমাদের গাইড হলো সাধকদের বাণী। সেই বাণীগুলি বিশ্লেষণ করে পথ চললে লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হবে।

বাহাদুর ব্যাপারী বলেন, নেতৃত্বের মধ্যে আছেন নেতা এবং তাঁর গুণ। আমার ক্লাসেও এমন একটা বিষয় আছে-লিডারশীপ। এ বিষয়টি আমাকে পড়াতে হয়- প্রতি তিন-চার মাস অন্তর অন্তর। বিষয়টি নিয়ে এর আগে আমি চিন্তা করার সুযোগ পেলে আলোচনা এক ধরনের হতো। নেতা ও নেতৃত্ব নিয়ে আমরা অনেক কথা বলতে পারি। কিন্তু আমি বলি, যার অনুসারী আছে তিনি নেতা। অনুসারী তৈরি করতে পারেন বলে তার যে-যোগ্যতা সেটিই নেতৃত্ব। আমি দেখেছি ব্রেন্ডিং অব মিশ্রণÑ যাপিত জীবনের নেতৃত্ব এবং আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণে যে নেতৃত্ব তা পৃথিবীর সেরা হয়। হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের যে চিন্তা আমার মতে সেটাই পৃথিবীর সেরা।

অনুসারী তৈরি করতে হলে, নেতার কি কি গুণ থাকতে হয়, কি কি যোগ্যতা থাকতে হয় তা আলোচনা করা যায়। নেতার যে-যোগ্যতা, সে শুধু সামনের দিকে দেখে। কতদূর পর্যন্ত দেখতে পায় সেটাও বিষয়। নেতৃত্ব তো সেই জিনিষ তিনি যা করবেন সেটাই সঠিক। সে কোনো ফর্মাল পজিশনে থাকে না-ইনফর্মাল অবস্থায় থাকে। কিন্তু সে অনুসারী তৈরি করে। সে কোনো সিস্টেম মানে না, নিয়মে থাকে না। সে নিয়ম প্রতিনিয়ত তৈরি করে। সে মানুষের প্রতি লক্ষ্য রাখে- মানুষ কোন্ দিকে যাবে এবং কোন্ দিকে মানুষকে নিয়ে যেতে হবে। তাঁর লক্ষ্য শুধুই মানুষ। সে সঠিক কাজটি করে কি-না, কিন্তু সে যে-কাজটি করে সেটিই সঠিক, মানে সে-কাজটি করে ফেলবে সেটিই সঠিক। নেতৃত্ব তো সেই জিনিষ সে যা করবে তাই সঠিক। নেতৃত্বের যে গুণাবলী এসেছে তার প্রথমেই বলতে হবে যে তার ভেতরে যে ইচ্ছাশক্তি সেখানে নেতৃত্ব দেয়ার ইচ্ছা তার তৈরি হয়েছে কি, হয়নি। এই ইচ্ছা তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়েই সে এ জগতে প্রবেশ করবে এবং তার মধ্যে সততার একটি সম্মিলন থাকতে হবে। এই সততা কোন্টা? আমরা বলি, ‘সত্যমানুষ হও, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।’ আর সত্য মানুষ চাই। এই সত্য সেই সত্য, আপনার আমার সকলের সকলের সত্য। যে-জায়গায় থাকি, যে-অবস্থানে থাকি, যে-মাটির ধান খাই, যেখানকার পানি খাই, যে বাতাস নিই, তার যে ডিএনএ-আরএনএ, এর যে ক্যারেক্টার, সেই ক্যারেক্টারের মধ্য দিয়ে আমার ভেতরে যে ক্যারেক্টার তৈরি হয় তাকে ধারণ, পালন এবং লালন করার মধ্য দিয়ে, আমাদের মধ্যে দিয়ে যে-জিনিষ তৈরি হয় তাকে এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় আমার সততা। যে-সততার জন্য আমরা এখানে এসেছিলাম, মহান সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ আমাকে একদিন গল্প করতে করতে বললেন,‘অলি-আল্লাহও হওয়া যায় না  যদি দেশকে ভালোবাসা না-হয়, দেশি ভাষায় কথা বলা না-হয়, এসব না থাকলে নেতাও হওয়া যায় না, নেতৃত্বও দেয়া যায় না। আমরা সৌভাগ্যবান এ জন্য যে, এই জায়গায়, এই চিন্তন বৈঠকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলাপ শুনেছি। এটিই পৃথিবীর সত্য। এই সততা এবং এর যে সম্মিলন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই নেতৃত্ব।

আমরা অনেক সময় ক্যারিশ্মা-তার মানে সম্মোহনী ব্যাপার, সেটি যখন একজন মানুষের ভেতরে-যে ইলেক্ট্রন নিজের মধ্যে আছে তার একটি ট্যাম্পারেচার তৈরি হয়। এর বাইরে এবং ভেতরেও অন্য একটি চরিত্র তৈরি হয়। নেতৃত্ব দেয়ার কারণে, এসব ধারণ করার মধ্য দিয়ে একটি সংযোগ তার নিজের মধ্যে তৈরি হয়। ফলে তার ভেতরের চরিত্রের যে পরিবর্তন সেটা দেখলে তার শান্তি লাগে, ভালো লাগে। তাঁকে অনুসরণ করতে মন চায়, তাকে অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে নিজের মধ্যে নিজের শান্তি, নিজের স্বস্তি দিয়ে পায়-সেই রকমের যোগ্যতার মধ্য দিয়ে আমরাও আছি, আমরাও থাকবো। আমরা এখানে আসলে তিনি আমাদের কথাগুলোও বলে দিতেন। নেতা কোনো স্পেসিফিক বিষয়ে খুব ভালো জানেন এবং ওই বেশি জানার মধ্য দিয়েই তার সব জানা হয়ে যায়। ফলে ওই স্পেশিফিক বিষয়গুলো জানার মধ্য দিয়েই এগিয়ে নিয়ে যায় তার সকল কর্মকা- এবং সেখানেই তাঁর তৈরি হয় সকল জানা-এক বিষয়ে জানার মধ্য দিয়ে সকল জানা। যেমন-জাতীয়তাবাদের চরম বিকাশের নাম আন্তর্জাতিকতাবাদ- যেকোনো বিষয়ে নেতৃত্ব শুরু হলেই সে সকল বিষয়ে নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। কারণ, তাঁর ভেতরে অটোমেটিক্যালি একটি রিফ্লেক্স অব মাইন্ড তৈরি হয় এবং তিনি দিতে থাকেন। নেতার এই চরিত্র প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সঠিক কাজটি তিনি করতে থাকেন। দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী-প্রতিনিয়ত, প্রতি মূহুর্তে তাঁকে সিদ্ধান্ত দিতে হয়Ñতাঁর সবগুলো সিদ্ধান্তই যেন সঠিক হচ্ছে। সেকেন্ডে সেকেন্ডে তিনি পরিবর্তন হচ্ছেন-এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে। কখনো দলীয় অবস্থান, কখনো রাষ্ট্রীয় অবস্থান-যেকোনো অবস্থানে থাকেন তিনি সঠিক সলিউশন দাঁড় করান। এর একটা সংযোগ আছে।

নেতৃত্বে সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু বললেন,  ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’- মানুষ দাঁড়িয়ে গেলো সশস্ত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এবং দেশ স্বাধীন হলো। এই যে আত্মবিশ্বাসী ভাবÑআমিই পারি, আমরাই পারি-এটিই নেতৃত্বের একটা বিশাল গুণ। ফ্লেগজিবিলিটি এবং অ্যাডাবটিবিলিটিও নেতৃত্বের বড় গুণ। নিজের জায়গার ওপর, নিজের সত্ত্বার ওপর দাঁড়ালে কাজ করা যায়। বঙ্গবন্ধু এই জাতিকে তৈরি করেছেন। এখানে বাঙালি জাতি ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র ছিল না। বঙ্গবন্ধু এই জাতিকে দিয়ে একটি রাষ্ট্র তৈরি করে ফেলেছেন-এটিই বঙ্গবন্ধুর বড় গুণ।

এই দেশ আর এই পৃথিবীর রাজনীতিতে, আধ্যাত্মিকতা ও যাপিত জীবনের যে সংমিশ্রণ তার মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব হলে সে নেতৃত্ব পৃথিবীর মানুষকে কল্যাণ এবং মঙ্গল দিতে পারবে। এ চিন্তন বৈঠকে যে নেতৃত্বের কথা বলি, সেখানে দেখেছি, এখানে যারা কথা বলেন তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিন্তা বাঙালির কল্যাণে, পৃথিবীর ৮ শ’ কোটি মানুষের কল্যাণে। বাঙালিকে পৃথিবীর বুকে তুলে দেওয়ার জন্য যে নেতৃত্ব বাংলাদেশ দিয়েছে, ফেসবুকের কল্যাণে আমরা জেনেছি, পৃথিবীতে আধ্যাত্মিক জগতে নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ-এ কথা কে শেখালো আমাকে? কে দেন সেই নেতৃত্ব – অবশ্যই তিনি আপনার আমার সবার গুরু-সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট। এই সাধক বাংলার নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকেই দেখতে চান। এই সাধক-এঁর আশীর্বাদুপষ্ট শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের চারিদিকে আজ যে পুষ্পের হাসি, আজকে বাঙালিত্ব আমাদের মাঝে যে টিকিয়ে রয়েছে তা প্রমাণ করে ব্রেন্ডিং অব স্পিরিচুয়েলিটিকে। ‘তুমি কে? আমি কে?.. বাঙালি বাঙালি’, চারিদিকে আগুন, আর বাংলাদেশে শান্তি-প্রমাণ করে এই নেতৃত্ব, এই চিন্তন বৈঠকের গুরুত্বকে।

শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলউদ্দিন আলাউদ্দিন বলেন, সারাবিশে^ই চলছে নেতৃত্ব। নেতৃত্বহীন কোন জগত নেই। কোন একটি ক্ষণ নেই। সারাবিশ^ জুড়েই নেতৃত্ব নিয়ে চলছে আলোচনা। কেউ পরিবার চালাতে, কেউ সমাজ চালাতে, কেউ রাষ্ট্র চালাতে, কেউ চুরি করতে, কেউ যুদ্ধ করতে। যে যেই কাজ করতে চায় সে কাজের নেতৃত্বগুন তাকে অর্জন করতে হয়।

নেতৃত্ব কি? নেতৃত্ব মানে-পথ প্রদর্শন, অগ্রগামিতা, অগ্রণী ভূমিকা পালন, পরিচালন করার যোগ্যতা, ক্ষমতার প্রকাশ, প্রধান ভূমিকা পালন, নায়কোচিত আচার। নেতৃত্ব মানে ভাল ও স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্ম, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কর্ম, দক্ষভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতা। নেতৃত্ব মানে স্ব-উদ্যোগী হওয়া, স্বাধীনভাবে কাজ করার যোগ্যতা।

নেতৃত্ব কে দিতে পারে? সুনির্দিষ্ট বিষয়ে যে যোগ্য, নতুন সৃষ্টির সৌন্দর্য যে আগে থেকেই দেখতে পায়, যেকোন বিষয়ে দুর্বলতাগুলি যে চিহ্নিত করতে পারে, নিজের উপর যার আস্থা আছে, আপন যোগ্যতার পরিমাপ যার জানা আছে। নেতৃত্ব তিনিই দিতে পারেন যিনি হাজারো লক্ষ্য ও কর্মের ভীরে আপন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য চিহ্নিত করতে পারেন। আবার নেতৃত্ব তিনিই দিতে পারেন যার কোন লক্ষ্য নেই কিন্তু মানবতার কল্যাণে যেকোন স্থানে, যেকোন সময় জ¦লে উঠতে পারেন নিজের প্রয়োজনের বিচার না করে বরং পরার্থে। নেতৃত্ব তিনিই দেন যিনি স্বার্থবোধহীন, আবার একই সময়ে সবচেয়ে বেশী স্বার্থপর আপন লক্ষ্য বিন্দুতে পৌঁছার জন্যে।

নেতৃত্ব তিনিই দেন যিনি ধ্বংস করার সৌন্দর্যকে আপন উপলব্ধিতে দেখতে পান এবং যাবতীয় কুৎসিত ধ্বংস করে দিয়ে নব সুন্দর সৃষ্টির দিকে ব্যাকুলভাবে ধাবমান। স্থায়ী ভাব, স্থায়ী বিষয় যার লক্ষ্য অস্থায়ী ভাব চিন্তা বিষয়কে ধ্বংস করতে পারলেই স্থায়ী সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। আল্লাহ শ্রেষ্ঠ ধ্বংসকারী। একজন প্রকৃত নেতাও কিছু বিষয়কে ধ্বংস করেন। যেমন- নেতা ধ্বংস করেন- হতাশা, লোভ, ক্রোধ, অজ্ঞতা, অলসতা, ভুল, অকৃতজ্ঞতা, কাপুরুষতা, বোকামী, নিষ্ঠুরতা, ক্ষীণদৃষ্টি, দারিদ্রতা, মিথ্যা এবং অহংকার। নেতা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করেন এবং অসংখ্য যোগ্যতার মাঝে কোনটি করার প্রবণতা বেশী সেটিই চিহ্নিত করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেন।

প্রবাহ

ট্রাম্পের মাথার দাম

৮ কোটি ডলার!

চোখে জল আয়ায় উল্লাহ আলি খামেনেইয়ের। মার্কিন হামলায় জেনারেল কাসেম সোলেমানি খুনের প্রতিশোধ চেয়ে গত শুক্রবার থেকেই ফুঁসছেন তিনি। সোলেমানির কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন ইরানের সর্বোচ্চ এই নেতা। ‘শ্যাডো কমান্ডারের’ শেষকৃত্য তখন ইরানের সরকারি টিভিতে ‘লাইভ’। গোটা দুনিয়া দেখছে। আর সেখানেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথার দাম ঠিক করে দিল তেহরান ৮ কোটি ডলার (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৬৮০ কোটি টাকা)।  এ জন্য প্রত্যেক ইরানিকে ১ ডলার করে দিতে হবে। যে তাকে মারবে, ৮ কোটির পুরোটা তার! এদিকে পার্লামেন্টের জরুরি বৈঠক শেষে ২০১৫-র পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার কথা ঘোষণা করল ইরান সরকার।  তেহরানের জামকরন মসজিদের মাথার উপর  উড়তে দেখা গিয়েছে ইরানের ‘যুদ্ধ নিশান’ ওই লাল পতাকা।

হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্পও। ইরানে ‘মার্কিন দাদাগিরির’ প্রতিবাদে গতকাল তার নিজের দেশেরই ৮০টি শহরে মিছিল হয়েছে। হাউসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি  জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই ‘যুদ্ধবাজ শক্তির ঘোষণাপত্র’ এনে ভোটাভুটি হবে কংগ্রেসে। উদ্দেশ্য, ট্রাম্পকে আটকানো। মার্কিন আগ্রাসনের নিন্দায় সরব বেইজিংও। আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ‘৫২ টার্গেট’ ধ্বংসে অনড়।

২০১৮ থেকেই ট্রাম্প আর তেহরানের টানাপোড়েন চরমে উঠেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে রাশ টানতে ২০১৫-তে ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনকে সঙ্গে নিয়ে ইরান পরমাণু চক্তিতে সই করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার অনেকটাই তুলে নেয় আমেরিকা। কিন্তু এই চুক্তি ‘ত্রুটিপূর্ণ এবং একপেশে’ দাবি করে ২০১৮’র মে মাসে চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে যান ট্রাম্প। ফের নিষেধাজ্ঞা চাপে ইরানের উপর। এর পরেই নিজেদের উপস্থিতি ফের জানান দিতে শুরু করে জেনারেল সোলেমানির  বাহিনী।

এই ‘পরিকল্পিত’ হত্যাকান্ডের বদলা নিতেই সোলেমানির শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান থেকেই তেহরান জানাল ‘তোমরা অন্যায় ভাবে সেনাপ্রধানকে মেরেছ, আমরাও তাই আর চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নই।’ বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ট্রাম্প আগেই ভেন্টিলেশনে পাঠিয়েছিলেন পরমাণু চুক্তিকে। ইরানের ঘোষণায় সেটির মৃত্যু হল।

চুক্তির পরিণতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো, জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তাঁরা যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘উত্তেজনা কমিয়ে আঞ্চলিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আমরা সব পক্ষের সঙ্গেই আলোচনায় বসতে রাজি।’ ইরানের চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও।

ইরান কিন্তু বদলার দাবিতেই সুর চড়াচ্ছে। সরাসরি হোয়াইট হাউসে হামলার হুমকি দিয়ে ইরানের এমপি আবুল ফজল আবোতরাবি বলেন, ‘ওদের দেশেই আমরা ওদের জবাব দিতে পারি। সে ক্ষমতা আমাদের আছে। সময় হলেই আমেরিকা সেটা টের পাবে।’ চোখের জল মুছে বাবার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান থেকে ট্রাম্পকে ‘উন্মাদ’ বললেন সোলেমানি-কন্যা জেনাব। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘আমার বাবা শহিদ হওয়া মানেই সব শেষ, এটা ভেবে থাকলে বড় ভুল করবেন।’

এ দিকে ইরান-আমেরিকার উত্তেজনার আঁচ পড়ল ইরাকেও। ইরাকের মাটিতে আমেরিকা বা অন্য কোনও দেশের সেনা থাকতে পারবে না এই মর্মে গত কালই একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে ইরাকের পার্লামেন্টে। এর পাল্টা আরও বড়সড় নিষেধাজ্ঞা চাপানোর হুমকি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিলেন, ইরাকে ঘাঁটি তৈরির অর্থ ফেরত না-দিলে কোনওভাবেই সেখান থেকে সেনা সরাবেন না তিনি।

হরমুজ প্রণালীতে শতর্ক ব্রিটেন

ব্রিটেন বলেছে, তাদের তেলবাহী জাহাজগুলোকে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে এস্কর্ট করে নিয়ে যাবে ব্রিটেনের রাজকীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ। এজন্য শনিবার তারা দুটি যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরে পাঠিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানিকে হত্যার পর আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে তার প্রেক্ষাপটে লন্ডন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস জানিয়েছেন, তিনি এরইমধ্যে এইচএমএস মন্টরোজ এবং এইচএমএস ডিফেন্ডার যুদ্ধজাহাজকে ব্রিটিশ পতাকাবাহী সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজকে এস্কর্ট দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ব্রিটেনের সম্পদ এবং নাগরিকদেরকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা নেবে সরকার।

বেন ওয়ালেস জানান, তিনি এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং চলমান উত্তেজনা কমানোর জন্য মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে, বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানিকে হত্যার পর লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে বহু মানুষ প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। ওই সমাবেশে লেবারপার্টির শ্যাডো চ্যান্সেলর জন ম্যাকডোনেল প্রকাশ্যে মার্কিন হামলার নিন্দা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মার্কিন সরকারকে উত্তেজনা কমানোর জন্য শুধু আহ্বান জানানই যথেষ্ট নয়।

মার্কিন হামলা ঐক্যবদ্ধ করেছে ইরান ও ইরাককে

আমেরিকার সন্ত্রাসী হামলায় গত শুক্রবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস্ ব্রিগেডের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং ইরাকের হাশদ আশ শাবি’র সেকেন্ড ইন কমান্ড আবু মাহদি আল মুহানদিস শহীদ। কিন্তু আমেরিকার এ অপরাধযজ্ঞের ফল কি দাঁড়াবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রথমত, এ ঘটনায় ইরানের অভ্যন্তরে ঐক্য ও সংহতি জোরদার হয়েছে। ইরানের জনগণ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব, বীর, দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে পরম শ্রদ্ধেয় মানুষ ও অসাধারণ সমরনেতা হিসেবে জানতেন। এ কারণে ইরানের সর্বস্তরের মানুষ ও নেতারা জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার মার্কিন পদক্ষেপকে অপরাধযজ্ঞ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

মার্কিন অপরাধযজ্ঞের দ্বিতীয় ফলাফল হচ্ছে, এ ঘটনায় ইরান ও ইরাকের মধ্যকার ঐক্য আরো বেশি জোরদার হয়েছে। আমেরিকা গত দুই মাসে ইরান ও ইরাকের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু শহীদ সোলাইমানি ও আবু মাহদি আল মুহানদিসের জানাজা অনুষ্ঠানে এতো বিপুল সংখ্যক ইরাকির অংশগ্রহণ থেকে বোঝা যায় ওই দুই শহীদের রক্ত তেহরান ও বাগদাদকে ঐক্যবদ্ধ করেছে।

মার্কিন অপরাধযজ্ঞের তৃতীয় ফলাফল হচ্ছে, আমেরিকার প্রতি ইরাকের জনগণের ক্ষোভ ও ঘৃণা বহুগুণে বেড়ে গেল। শহীদদের জানাজা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ইরাকিরা সম্মিলিতভাবে ‘আমেরিকা নিপাত’ যাক বলে শ্লোগান দিয়ে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। তারা অবিলম্বে মার্কিন সেনাদেরকে ইরাক ছাড়ার আহ্বান জানায়।

মার্কিন অপরাধযজ্ঞের চতুর্থ ফলাফল হচ্ছে, আমেরিকার ব্যাপারে ইরানের জনগণের চিন্তাভাবনায়ও বিরাট পরিবর্তন এসেছে। এ ব্যাপারে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়েরভান্দ আব্রাহামিয়ান বলেছেন, ইরানিরা এখন পর্যন্ত আমেরিকাকে ষড়যন্ত্রকারী সরকার হিসেবে চিনতো কিন্তু জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর আমেরিকাকে তারা সন্ত্রাসী সরকার হিসেবে চেনা শুরু করেছে।

মার্কিন অপরাধযজ্ঞের পঞ্চম ফলাফল হচ্ছে, আমেরিকার এ ন্যক্কারজনক পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইসরাইল ও মার্কিন বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামীদের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে।

সোলাইমানিকে হত্যা করে আমেরিকা এটাকে তাদের জন্য বিরাট বিজয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। কারণ সোলাইমানি ছিলেন প্রতিরোধ শক্তির একজন গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী কমান্ডার। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেয়ী জনাব সোলাইমানিকে প্রতিরোধ ফ্রন্টের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকা ধারণা করেছিল এ অঞ্চলের প্রতিরোধ সংগ্রাম শুধু একজন ব্যক্তি নির্ভর। আর এখানেই আমেরিকা সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছে।

কারণ এ অঞ্চলের প্রতিরোধ সংগ্রামীরা প্রমাণ করেছে এই সংগ্রাম কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর নয়। যেমন, লেবাননের হিজবুল্লার সাবেক মহাসচিব সাইয়্যেদ আব্বাস মুসাভি শহীদ হওয়ার সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন যিনি কিনা আমেরিকা ও ইসরাইলের জন্য ত্রাস।

মার্কিন অপরাধযজ্ঞের ষষ্ঠ ফলাফল হচ্ছে, এ অপরাধযজ্ঞের পরিণতিতে ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদেরকে বহিষ্কারের সুযোগ তৈরি হবে। কারণ আমেরিকা ইরাকের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইরাক ও ইরানের জনপ্রিয় দুই সামরিক কমান্ডারকে শহীদ করেছে। এর আগে ইরাকের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সিস্তানি এক ফতোয় সেদেশে মার্কিন উপস্থিতিকে হারাম ঘোষণা দিয়েছিলেন।

শিশুমনে ডিজিটালের প্রভাব

বৈদ্যুতিন এই গতির যুগে, সর্বনাশা অনিয়ন্ত্রিত গতি, অপরিণত শিশু বা নাবালকের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে চলেছে অনেক ক্ষেত্রেই। তার প্রমাণ বর্তমান এই অশান্ত সমাজ। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। সুনাগরিক হিসেবে তাদের গড়ে তুলতে, কিছু সংস্কার ও সংযোজন প্রয়োজন। চলমান যে কোনও জিনিসের গতি-নিয়ন্ত্রক থাকে। যেমন গাড়ির জন্য স্পিড ব্রেকার। কিন্তু ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সব কিছু থাকলেও, অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গতি-নিয়ন্ত্রক নেই। ইন্টারনেটে সব কিছু দ্রুত দেখে, বাস্তবে সে রকমই দ্রুতপ্রাপ্তি ঘটাতে মানুষ দুর্ঘটনার সম্মুখীনও হচ্ছে। আবার সংযম শিক্ষাও হারিয়ে ফেলছে। অপরিণত শিশুদের জন্য বিশেষ বিশেষ তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার্থে, স্ক্রিন ধূসর হয়ে যাওয়া বা স্লো করে দেওয়া, এমন কিছু গতি-নিয়ন্ত্রক জরুরি। এ ছাড়া, মন শান্ত রাখতে, কিছু ধীর গতির কাজও অভ্যাস করা দরকার ছোট থেকে বড় সকলেরই। যেমন গান শোনা, ছবি আঁকা, খেলা, বই পড়া, গৃহকর্ম, হাতের কাজ। নয়তো ডিজিটাল সংস্কৃতি যেভাবে গ্রাস করছে পরিবারের শিশুদের, তার ভবিষ্যত কোন ভয়াবহতা নিয়ে অপেক্ষা করছে তা এখনই দেখে আগাম প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী।

ধর্মের নামে…. – ১৪

সংলাপ ॥ ধর্মকে যারা খন্ড করেছে তাদের নিয়ে চৌদ্দশত বৎসরের অধিককাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে-আজো এর রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পাইনি। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন একজন খাটি মুসলিম। তাঁর পরে এলেন হযরত (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এবং তিনি এসে বললেন ‘আমি মিল্লাতে ইব্রাহিমের উপরই স্থির হয়ে আছি।’ আবার কাফেররাও বলছে যে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের ধর্মের উপর স্থির আছি।’ এখন প্রশ্ন হল সুরা ইমরানের ৯৫ নং আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-কে বলেছেন, আপনি তো সত্যই বলেছেন। সুতরাং তোমরা ইব্রাহিমের  সহজ, সত্য, সরল, সনাতন জীবন ব্যবস্থাই মেনে চল।’ কিন্তু সুরা লোকমানের ২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদেরকে যখন বলা হয় আল্লাহ যা কিছু বিধি-বিধান দিয়েছেন তাই মেনে চলো-তারা বলে আমরা বরং তা-ই মেনে চলবো যে পথে আমাদের নিজেদের বাপ-দাদাকে চলতে দেখেছি’। নবীর কথা কেউ মানেনি। সুরা যখরুফ-এর ২২ নং ও ২৩ নং আয়াত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে আল্লাহ বলছেন, ‘বরং তারাতো একথাই বলছে; আমরা বাপ-দাদাকে একমত ও পথের উপর দেখেছি আর আমরাও তাদের পদাংক অনুসরণ করছি।’ ২৩ নং আয়াতে বিশেষভাবে যা বলা আছে তা হচ্ছে, ‘এভাবে আমি আপনার আগে কোন জনপদে এমন কোন রাছুলকে পাঠাইনি-যেখানকার অবস্থাপন্ন লোকজন একথা বলেনি; আমরা নিজেদের বাপ-দাদাকে এক পথ ও মতের উপর চলতে দেখেছি আমরাও তাদের পদাংক অনুসরণ করছি।’ একথাগুলো আজকের নয়, চৌদ্দশত বৎসর পূর্বের শ্রুত কথা যার ঘটনা আরো অনেক বেশীকাল পূর্বের। এই পরম্পরা আজো সমাজে বিদ্যমান। পবিত্র কোরান থেকেই যদি কোন কথা বলা হয় তখন ফেকা এবং হাদিসের ঢাল এনে সে কথাকে ঠেকিয়ে লোকজন বলে বেড়ায়, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা কি আলেম ছিলেন না? তারা কি এসব জানতেন না?’ আমি বলি তারা ভুল পথে ছিলেন কিনা তা ভাবো এবং বর্তমানকে দেখো-বর্তমানে কোরানের বক্তব্য মেনে চলো। ভুল করে একজন গর্তে পড়ে গেছে দেখার পরেও যদি তুমি সে গর্তেই যেতে চাও তবে আরো যাও। তবে যেখানেই যাও সাথে কোরান নিয়ে যাও। কোরানের বাইরে গেলেই বিপথগামী হবে। এ কোরানে কোন সন্দেহ নেই। যারা সত্যিকারের আল্লাহর বান্দা হতে চায় এ কোরান অবশ্যই তাদেরকে পথ নির্দেশ দেবে-এটা আমার কথা নয়-আল্লাহর কথা। তাছাড়া আল্লাহর বাণী বা ওহী গোপন করা নিষেধ। রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) তা করেননি। সুরা বাকারার ১৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা আমার প্রেরিত দলিল ও নিদর্শনসমূহ গোপন করে-তাদের জন্য কিতাবে পূর্ণ বিবরণ দেয়ার পরেও-তাদের উপরেই আল্লাহ অভিশাপ দিচ্ছেন, আর সবাই তাদের অভিশাপ দেয়।’ এখন আমরা দেখবো নবী কী বলেছেন এবং আল্লাহ কী বলেছেন। সমস্ত কোরানে বারবার এক কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে যে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নিজে বানিয়ে কোন কথা বলেননি, কোন কথা গোপন করেননি। তাছাড়া কোরান দিয়েই সমস্ত বিষয়ের মিমাংসা করতে বলা হয়েছে। কোরানের ব্যাখ্যা কোরান নিজেই -এর জন্য অন্য কোন গ্রন্থের দ্বারে যাবার দরকার নেই। স্পষ্ট কথা এই যে, এ কোরান পূর্বেও ছিল এখনো আছে এবং পরেও থাকবে। যত নবী রাসুল এসেছেন তারা পূর্বের কিতাবের সত্যতা সম্পর্কে মানুষকে কেবল স্মরণ করিয়ে গেছেন। ইব্রাহিম (আ.) মুসলিম হবার পরেও কী করে আরবের লোকেরা পৌত্তলিক হয়ে গিয়েছিল? তারা মিল্লাতে ইব্রাহিমী ভুলে গিয়েছিল। পরিবর্তে শয়তানের ধোকায় পড়ে নবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এবং আল্লাহর বাণীকে মানতে অস্বীকার করেছিল। সুরা মায়েদার ৪৪ নং আয়াতে তাওরাতের বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাওরাত দ্বারা পূর্ববর্তী গ্রন্থ ও নবীর সত্যতার সাক্ষ্য তখনকার নবীরা দিয়েছেন। তাছাড়া এ আয়াতে কঠোরভাবে বলা হয়েছে যে, ‘আল্লাহর প্রেরিত বিধান অনুসারে যে ব্যক্তি নির্দেশ দেয় না সে কাফির।’ সুরা মায়েদার ৪৬ নং আয়াতেও বলা হয়েছে, ‘হযরত ঈসা (আ.) ইঞ্জিল দ্বারা পূর্ববতী গ্রন্থের ও নবীর সত্যতা প্রমাণ ও সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন।’ ইঞ্জিল দ্বারা তাওরাতের সত্যতা প্রমাণ করা হয়েছে এ বাক্যে। ৪৭ নং বাক্যে বলা হয়েছে. ‘ইঞ্জিলধারীদেরকে ইঞ্জিলের বিধান মেনে চলতে হবে তা না হলে তারা কাফির হয়ে যাবে।’ আবার ৪৮ নং আয়াতে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) – কে নির্দেশ করে আল্লাহ বলছেন, ‘আমিইতো আপনার কাছে সত্য সঠিকভাবে কিতাব নাজিল করেছি, যা আগেকার কিতাবসমূখে সত্যতা প্রমাণ করেছে। আর তাতে যা কিছু ছিল সেসব বিষয়ের হেফাজতকারী হিসাবে। সুতরাং আল্লাহ যে বিধি-বিধান দিয়েছেন সে অনুসারেই তাদের মধ্যে মিমাংসা করে দিন। তাদের খেয়াল খুশী মেনে চলবেন না-অপনার কাছে যে সত্য এসেছে তা বাদ দিয়ে।’ ৪৯ নং আয়াতে দেখা যায় যে, তখন মানুষেরা নবীকেও বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলার চেষ্টা করেছে। এ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আপনি অবশ্যই আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে মতেই তাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। আপনি তাদের খেয়াল খুশী মোতাবেক কোন ও কাজ মোটেই করবেন না।

আপনি তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, যেন তারা আল্লাহর কোন বিধান সম্পর্কে আপনাকে বিভ্রান্ত করে না দেয়।’ সুরা আনামের ১৯ নং আয়াত দ্বারা কোরানকে মাধ্যম ধরেই সতর্ক করার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। সুরা আনামের ৫০ নং আয়াতে রাসুলকে বলতে দেখা যায়, ‘আমি তো সেই হুকুমই মেনে চলছি যা আমার কাছে ওহী যোগে পৌঁছে থাকে।’ সুরা আনামের ৫৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘আপনি বলুন; আমি তো আপনার পালনকর্তার সুস্পষ্ট দলিল প্রমাণের উপরই রয়েছি।’

এই সুরা আনামের ১০৭ নং ছত্রে একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলা হয়েছে, ‘আপনি তা-ই মেনে চলুন যা আপনার পালনকর্তার নিকট থেকে ওহী যোগে এসেছে।’ সুরা আরাফের ২০৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আপনি যখন কোন আয়াত তাদের কাছে নিয়ে আসেন না তখন তারা বলে তুমি নিজেই কেন রচনা করে নিয়ে আসছো না? আপনি বলুন; আমিতো সেই হুকুম অনুসরণ করি যা আমারই পালনকর্তার নিকট থেকে আমার কাছে নাজিল হয়ে থাকে।’ সুরা ইউনুসের ৬৪ নং ছত্রে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর কালামে কোন পরিবর্তন ঘটবে না।’ সুরা ইউনুসের ১৫ নং আয়াতে রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বলছেন, ‘আমি তো সেই হুকুমের তাঁবেদারী করবো যা আমার কাছে ওহী যোগে আসবে।’ ১০৯ নং আয়াতেও রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বলছেন, ‘আপনি তা-ই মেনে চলুন যা আপনার কাছে ওহী যোগে এসেছে।’ সুরা হুদের ১১২ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং আপনাকে যে আদেশ দেয়া হচ্ছে তার উপরে আপনি আর যারা তওবা করেছে তারা মজবুতভাবে কায়েম থাকুন।’ (চলবে)

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য – ১৪

* ‘নিজের চোখকে আয়ত্বে আনো, সাধনার পথে এগিয়ে যাও।’ – সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দীন

* ‘ভোগের আনন্দ সাময়িক ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন।’ – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

* ‘সংস্কারমুক্ত হয়ে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠার পথে পা বাড়াও, তুমি তোমার আল্লাহ্র রহমত হতে বঞ্চিত হবেনা।’ – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রমের বিমূর্ত প্রতীক সূফী সধক শেখ আবদুল হানিফ। আজন্ম পরিশ্রমী, ধর্মযোদ্ধা, মানবতার মূর্ত প্রতীক, আধুনিকতা, জাতীয়তাবোধ, উপলব্ধি, বাস্তবতা, চেতনায় শানিত, প্রচার বিমুখ বিশাল হৃদয়ের অধিকারী এই মহামানব নিজেকে লুকিয়েই রাখলেন সারাজীবন। সাধকরা চলে যাওয়ার আগে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে যান, প্রকাশ করেও যান। তাও করলেন না। নিজেকে লুকিয়ে রেখেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কি উদাহরন রেখে গেলেন আমাদের জন্য? আজন্ম ছাত্র, সারাজীবন ছাত্র থাকতে চেয়েছিলেন। এক ঝাঁক ছাত্র রেখে গেলেন যেনো। রেখে গেলেন অসংখ্য তথ্য-উপাত্ত। তা বর্ননার ভাষা নেই, আছে শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন। এমন গুরুভক্ত শিষ্য মেলা ভার, একমুহুর্তের জন্যও গুরুর উপর নিজেকে যেতে দেননি। অত্যন্ত সচেতন থেকেছেন জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত। চলে যাওয়ার পরও গুরুর নামই যাতে সর্বোচ্চে থাকে সেই ব্যবস্থাটিও করে গিয়েছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। এমন মেলা ভার। এমন শিষ্য মেলেনা মেলেনা। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর এক নাম্বার শিষ্যের স্বীকৃতি দিয়ে গিয়েছিলেন। এ সংবাদ পাওয়ার পর সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কেঁদেছিলেন, বলেছিলেন কেন আপনারা আমাকে এ সংবাদ শোনালেন, গুরুর মুখের এ কথাকে সত্যে পরিণত করার জন্য আমাকে সারা জীবন কী পরিমান কষ্ট করতে হবে ? তার পরের ঘটনাতো সবার জানা, কি পরিমান কষ্ট তিনি করেছেন গুরুর আদর্শকে বাস্তবায়ন করার জন্য। ছোট গল্পের মতই শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ। জানিনা এর শেষ কোথায়?

গুরুরই নির্দেশে প্রতিষ্ঠা করেছেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ। ১৯৯০ সন থেকে এ প্রতিষ্ঠান চলছে মানবতার মহান ব্রতে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবী মানুষ তৈরী করেছেন। একের পর এক তৈরী করেই গেছেন। সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এক এক করে তাদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিজে পদ ছেড়েছেন। পর্যবেক্ষনে রেখেছেন, পর্যবেক্ষন করেছেন। দেখেছেন তাঁর সৃষ্টি কিভাবে কাজ করে। অল রাউন্ডার বানিয়েছেন, বিভিন্ন পদে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দায়িত্ব দিয়ে। আবার বলতেন আমরা সবকিছুতে মাষ্টার না হতে পারি, জ্যাক অব অল ট্রেডস তো হতে পারি। কিন্তু কঠিন পর্যবেক্ষণে রেখেছেন সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের বাইরে যাতে না যায়। একে একে হাক্কানী মিশনের এগারোটি বিভাগ খুলেছেন। প্রতিটি বিভাগই একেকটি মানুষ তৈরীর কারখানা। প্রতিটি বিভাগই স্বেচ্ছাশ্রমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মানুষ তৈরী করার পিছনে কী পরিমান শ্রম তিনি দিয়েছেন তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন তারাই জানেন। তারপরও আফসোস করে বলতেন ‘কেউ আমাকে সাহায্য করলোনা, আর ফেরা হবেনা, যিনি আপাদমস্তক সত্য, সত্য ছাড়া একটা পা ফেলেন না, তার কাছে সামান্যতম অসামঞ্জস্যতাও ধরা পড়ে। মানুষ তৈরী করার মত এমন কঠিন কাজটি কোন সাধক নেননি। শিষ্যকে তৈরী করেছেন। এভাবে গণহারে মানুষ তৈরী করার মত কঠিন কাজ কোন সাধক এযাবত করেছেন কিনা আমার জানা নেই। তাঁর সান্নিধ্যে আসা কাউকেই তিনি পর্যবেক্ষনের বাইরে রাখেননি। সাধকদের পযবেক্ষণে সবাই  থাকে। কিন্তু মানুষ তৈরী করার জন্য এমন বিশেষ পর্যবেক্ষণ জগতে বিরল। মাঝে মাঝে অবাক হতাম এমন ধৈর্য মানুষের কি করে হয়? যেখানে নিজের একটা সন্তান আমরা তৈরী করতে পারিনা।

মাঝে মাঝে বলতেন টিউনিং আর রিপেয়ারিং এর কাজটা আমি ভালো পারি। ওনার একেকটা কথায় একেকটা জগৎ খুলে যায়। যারা ওনার সঙ্গে কাজ করেছেন তারা ভালো করেই জানেন টিউনিং রিপেয়ারিং কাকে বলে। ওনার টিউনিং রিপেয়ারিং ছিলো মানুষের টিউনিং রিপেয়ারিং। যার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলেছে অনবরত ভাঙ্গচূড়। যেখানেই গলদ দেখেছেন সেখানেই ভেঙ্গেছেন। জোড়া লাগিয়েছেন। আজীবন ছাত্র থাকতে চেয়েছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এক্সপেরিমেন্টই করেছেন আর পথ চলেছেন। জীবনের কাজ কখনও শেষ হয়না। তাই পথ চলাও বন্ধ হয়না। ভাঙ্গাচূড়া রেখেই আগাতে হয়। একেবারে ফাইন ফিনিসিং দিয়ে দিলে রাস্তা আর খোলা থাকেনা। রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এজন্যই হয়তো সাধনার জীবনে মানে গুরুকেন্দ্রিক জীবনে কোন কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে দেয়া হয়না। একটা জায়গায় এনে থামিয়ে দেয়া হয়। আবার স্থান-কাল-পাত্র, বাস্তবতাভেদে যাত্রা শুরু করানো হয়। বিনির্মাণ করার সুযোগ দেয়া হয় অণুতে অণুতে। ভিতর ফাঁকা রেখে যে আগানো তা বেশীদূর যেতে দেয়া হয়না। দেয়ালে পিঠ ঠেকতে দেয়া হয়না সাধারণত। ভিতর বিনির্মাণ করে, স্থান-পাত্র পরিবর্তন করে, বা একটা দুইটা অবস্থার পরিবর্তন করে কখনও সামগ্রিকতার ভিত্তিতে আবার যাত্রা শুরু করানো হয়। কখনও একজনকে দিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান টেনে নেয়া হয়, সাময়িকভাবে ধরে রাখা হয়। কালক্ষেপন করা হয় সময় সুযোগ ও বাস্তবতার জন্য।

এক্সপেরিমেন্ট করেই চলেছেন, চালিয়েছেন, শিখিয়েছেন। সাময়িক স্বাধীনতা দিয়েছেন, দেখেছেন, আবার সময়মত হস্তক্ষেপ করেছেন। ভুল করার সুযোগ দিয়েছেন। যেখানে গলদ ছিলো সেখানে ভুলের আঘাতে শিক্ষাটি পোক্ত করেছেন সে ভুল যেনো আর না হয়। পরিবেশ তৈরী করেছেন, ধাঁধার সৃষ্টি করেছেন। চোরকে চুরি করতে, গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলেছেন। পরীক্ষা করে, সুযোগ দিয়ে, ধাঁধার সৃষ্টি করে প্রত্যেকের জায়গাটা চিহ্নিত করেছেন, করিয়েছেন। এই খেলা চলমান। এ এক মহাবিস্ময়কর, মহাবিজ্ঞানময়, সূক্ষাতিসূক্ষ অর্ন্তজাল যা ধরতে হয় অত্যন্ত সচেতনভাবে।

অকালে পেঁকে গেলে সেই জিনিস আর সুন্দরভাবে পাকানো যায়না, কখনও আর ম্যাচিউরিটি আসেনা। বাস্তবতার কষাঘাতে যে পাকে তার মত আর হয়না। জীবনের প্রতিটি বাস্তবতায় চিরে চিরে চলা ব্যক্তি যেভাবে পোক্ত হয় আর কিছুতেই এমন পোক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শিখতে হলে বাস্তবতার নীরিখে খোলা পথে চলতে হয়। সারাজীবন যিনি ছাত্র থাকতে চান তাঁর জীবনের কাজ কখনও শেষ হয়না, তার জীবনের যুদ্ধও শেষ হয়না। মানুষ তৈরী করার কারখানায় কখনও রঙচঙা চুনকাম করা যায়না। টিউনিং রিপেয়ারিং যেখানে চলে সেখানে নতুনের সাথে পুরাতনও চলে, চালানো হয়। কাউকেই ফেলে দেয়া হয়না। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। টাকা ঢেলে যে প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়, বাহির থেকে তা দৃশ্যমান হয়, চকচকে হয়। মানুষ তৈরী করার কারখানায় সে সুযোগ থাকেনা। ক্ষতগুলো দৃশ্যমান করে রাখতেই হয় বার বার। ঘুনে ধরা জায়গায় নতুন করে ক্ষত সৃষ্টি করতে হয়। দুর্বল ঘুনেধরা পঁচনধরা জায়গাগুলো এমনভাবে পরিষ্কার করতে হয় যাতে শক্ত অবস্থানটুকু শুধু থাকে। এভাবেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পচন পরিষ্কার করে ধৌত করতে হয়। সারাজীবনব্যাপী চলে এই টিউনিং আর রিপেয়ারিং এর কাজ। সমানতালে চলে মানুষ টিউনিং আর রিপেয়ারিং এর কাজও। এ এক চলমান প্রক্রিয়া। আজ যেটা ঠিক প্রতীয়মান হয়, কাল সেটা ঠিক নাও হতে পারে। চার বছর বয়সে যেটা ঠিক ছিলো, দশ বছর বয়সে সেটা ঠিক হতে পারে কি? পরির্বতন-বিবর্তন-রূপান্তরের সাথে কর্মপদ্ধতি পরিবর্তিত হতে হয় বাস্তবতার নীরিখে। বাস্তবতার নীরিখে সচেতনভাবে সংস্কার করে করেই চলে এই পথপরিক্রমা। সত্যপ্রতিষ্ঠার স্বেচ্ছাশ্রমের এমনই পথচলা। মানুষ যতখানি তৈরী হয়, প্রতিষ্ঠানও ততখানি এগিয়ে চলে। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার উপায় নেই মানুষ তৈরী করার কারখানায়। (চলবে)

ভাষা সংগ্রামী অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ গণগ্রন্থাগার উদ্বোধন

সংলাপ ॥ আলোকিত সমাজ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কালীকচ্ছ গ্রামের শেখাবাদে যাত্রা শুরু করলো ভাষা সংগ্রামী অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ গণগ্রন্থাগার। 

২৮ ডিসেম্বর শনিবার সকালে এক অনুষ্ঠানে কালীকচ্ছে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গণগ্রন্থাগার উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও গবেষক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা  বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, ড. নূরুদ্দীন জাহাঙ্গীর। অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ স্মৃতি সংসদের সভাপতি বাবু সঞ্জীব কুমার দেবনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব এ এস এম মোসা ও উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব রফিক উদ্দীন ঠাকুর। সরাইল ইতিহাস পরিষদের সভাপতি ও গণগ্রন্থাগারের পরিচালক  শাহ শেখ মজলিশ ফুয়াদের স্বাগত বক্তব্যের পর  অন্যান্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহবায়ক অ্যাডভোকেট আব্দুর রাশেদ, সরাইল কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন ছাত্র ও সিপিবি নেতা দেবদাস সিংহ রায়, আহমেদ হোসেন, ঠাকুর মেজব্হাউদ্দিন আহমদ মিজান, সমাজকর্মী ও শিক্ষক ফজলুল হক মৃধা, ৭১’এর শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান জনাব এডভোকেট সৈয়দ তানভীর হোসেন কাউসার, সরাইল প্রেস ক্লাবের সভাপতি জনাব বদরউদ্দীন বদু, সাবেক ছাত্রলীগ (জাসদ) নেতা হোসাইন আহমেদ তফসির, কবি ও লেখক বাবু হিমাদ্রীশেখর সরকার, অনুষ্ঠানে অধ্যক্ষ আবু হামেদ এর নাতনী শেখ জাদীদা সিমরীন রুহি তার দাদার “অঙ্গে আমার বঙ্গ রক্ত বহে” কাব্য গ্রন্থ থেকে ‘এসেছি যখন বঙ্গের পৃথিবীতে, তোমাদের ভালোবাসবো’ কবিতাটি আবৃত্তি করে। তার আবৃত্তি সকলকে মুগ্ধ করে। সরাইলের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদের ৫ম ওফাত দিবস উপলক্ষে এই আয়োজনটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. নূরউদ্দীন জাহাঙ্গীর সরাইল সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ আবু হামেদের জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শেখ আবু হামেদ পঞ্চাশের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাশ করে গ্রামে ফিরে শিক্ষার আলো ছড়াতে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দীর্ঘদিন পরে হলেও শেখ আবু হামেদের নামে গণগ্রন্থাগার স্থাপন করে সমাজে শিক্ষা বিস্তারে চমৎকার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ গণগ্রন্থাগার যেন আজীবন টিকে থাকে এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয় সেজন্য তিনি সকলের সহায়তা কামনা করেন। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এস এম মোসা বলেন, সরাইলের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গণগ্রন্থাগারটি অনবদ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ অতিথি বক্তব্যে উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব রফিক উদ্দীন ঠাকুর বলেন আবু হামেদ স্যার সাদা মনের মানুষ ছিলেন। তিনি গণগ্রন্থাগারের সাফল্য কামনা করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন সরাইল ইতিহাস পরিষদের সহসভাপতি শেখ এনায়েত রাসেল সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম রিপন।

নিজের কথা – ১৯

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ সুস্থ্যতা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনবল অর্থবল ডিগ্রী পজিশন যশ-খ্যাতি গাড়ী সাজানো গুছানো পরিপাটি বাড়ি-ঘর ক্লাব বিনোদন সামগ্রী ক্লিনিক হাসপাতাল উপাসনালয় সবকিছুর সুব্যবস্থা থাকা সত্বেও কেবল সুস্থ্যতা না থাকার কারনে ব্যক্তির জীবনে ভোগ উপভোগ করার কিছুই থাকেনা। ব্যক্তি কেবল চেয়ে চেয়ে দেখে তার অর্জিত সম্পদ সামগ্রী যা অন্যেরা কত আরাম আয়েসে আর পরম সুখ সাচ্ছন্দে ভোগ করছে কিন্তু কেবল সুস্থ্যতার অভাবে তার জ্বালা যন্ত্রণা ছাড়া অর্জিত সম্পদ সমারোহ ভোগ করার কোন ক্ষমতা নেই। সে সুস্থ্যতাহীন জীবনযাপন অপেক্ষা একমাত্র মৃত্যুকেই আলিঙ্গন পূর্বক মরে বাঁচতে চায় নিয়ত। তার কাছে সুস্থ্যতার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছুই হতে পারে না। তার নিকট সেই ব্যক্তিই সুখী জীবনযাপন করার যোগ্যতা লাভ করে, যার সুস্থ্য দেহ আছে। প্রশ্ন আসে সুস্থ্য দেহ কি? কিভাবে সুস্থ্যদেহ লাভ করা যায়? বিষয়টি আলোচনার পুর্বে একজন ব্যক্তিত্বের জীবনের অভিজ্ঞতার একটি দিকের কিছু অংশবিশেষ স্মৃতিচারণ করা আবশ্যক। বাজিতপুর কিশোরগঞ্জের আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম বিংশ শতকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিত্তবান সদস্যদের  মধ্যে অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব। আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি বাজিতপুর মেডিক্যাল কলেজ সহ বহু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ইস্টার্ন হাউজিং প্রপার্টিজ এর তিনিই একক প্রোপ্রাইটর ছিলেন। জীবন চলার পথে তিনি একদা প্রচন্ড অসুখে পড়েন। এক পর্যায়ে তাঁর স্বাভাবিক নিয়মে কেবল উপাদেয় খাবার নয় বরং সাধারণ খাবার গ্রহণের ক্ষমতাও লোপ পায়। এমতাবস্থায় তিনি তাঁর এলাকার ভাই সূফী সাধক খাজা আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে তদবীরের জন্য উপস্থিত হন এবং আবেদন করেন, হুজুর দয়া করে কেবল আমাকে স্বাভাবিক নিয়মে একমুঠো ভাত খাওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন। আমি আর কিছুই চাই না। সাধক বলেন, ‘আর কতো, বিত্তবান হতে চেয়েছিলে তোমাকে দেশের সেরা বিত্তবানদের একজন করা হয়েছে, এতে স্বাদ মেটেনি।’ এবার আসা যাক স্বাস্থ্য কি? এ প্রসংগে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ নানা ভাবে বিশদ আলোচনা করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ে। আমার কাছে যার সারমর্ম হল, ব্যক্তি স্বাভাবিক থেকে বাস্তব পরিস্থিতির মাঝে যে দেহের সাহায্য লক্ষ্যকেন্দ্রিক কর্ম সুসম্পন্ন করে থাকে, ব্যক্তির এমন দেহই হল সুস্থ্যদেহ বা স্বাস্থ্য। ক্রিয়াগত দিক থেকে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ স্বাস্থ্যকে চার ভাগে ভাগ করেন। যথা- ১- ফিজিক্যাল হেল্থ বা শারিরীক স্বাস্থ্য ২ – মেন্টাল হেল্থ বা মানষিক স্বাস্থ্য ৩- সোশাল হেল্থ বা সামাজিক স্বাস্থ্য এবং ৪- স্পিরিচুয়াল হেল্থ বা আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য। শারিরীক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল ও নিয়ন্ত্রিত থাকে। আবার মানুষিক স্বাস্থ্য সামাজিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল ও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। আবার সামাজিক স্বাস্থ্য আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এমতাবস্থায় কোন ব্যক্তি আধ্যাত্মিক ভাবে সুস্থ্য থাকলে সে অবশ্যই সামাজিক মানসিক ও শারিরীক ভাবে সুস্থ্য থেকে স্বীয় জীবনে স্বাস্থ্যের প্রকৃত প্রভাব উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কিভাবে এ অবস্থাগুলি কর্ম করে পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করে ও নিয়ন্ত্রিত হয়? ব্যক্তির চেতনা স্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের চিন্তনক্ষমতানুসারে দেহজগতের বিভিন্ন অঙ্গের নানাবিধ কর্ম সুসম্পন্ন করে থাকে। ব্যক্তির চিন্তাশক্তি চেতনাজগতের যে স্তরে জ্ঞানশক্তিতে রূপান্তরিত হয় ব্যক্তির সে স্তরই হল আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের স্তর। এ স্তরে ব্যক্তি আত্মবলে বলীয়ান হয়ে কর্মযজ্ঞের মাঝে নিজে নিয়ন্ত্রিত থাকে ও স্বাস্থ্যের অন্যান্য স্তরগুলোকে নিয়ন্ত্রিত রাখে। জ্ঞান স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ চেতনস্তর। এস্তরে ব্যক্তি সুস্থ্য থেকে স্বাস্থ্যের সর্বস্তরের নিয়ন্ত্রণ রেখে প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম। এ স্তরেই ব্যক্তি বিশুদ্ধ থাকার যোগ্যতা লাভ করে থাকে। তাই শাস্ত্রে বলা হয়, ‘জ্ঞানীর নিদ্রা মুর্খের এবাদতের চেয়ে উত্তম।’ ব্যক্তির দেহের অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ গুলো কর্ম করে থাকে ব্যক্তির চেতনাস্তরের চিন্তনক্ষমতানুসারে। কাজেই চিন্তনক্ষমতা যার যতটা শক্তিশালী ও পরিচ্ছন্ন তার দৈহিক গঠনও ততটা শক্তিশালী ও পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। বিপরীতে চিন্তনক্ষমতা যতটা দুর্বল ও অপরিচ্ছন্ন হয় ব্যক্তির দেহকাঠামোও সেভাবেই

গড়ে ওঠে। একজন রাগী দেমাগী ব্যক্তির চিন্তনক্ষমতা দুর্বল কিন্তু একজন ধৈর্যশীল শান্ত ব্যক্তির চিন্তনক্ষমতা শক্তিশালী। তাই রাগী ব্যক্তি অপেক্ষা ধৈর্যশীল শান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা অনেক বেশী ভাল থাকে। পরিবার ও চারপাশের জনগণ নিয়েই সামাজিক জীবনযাপন। সামাজিক সুস্থ্য জীবনযাপন করার জন্য ব্যক্তির যে স্বাস্থ্য দরকার হয় তাই ব্যক্তির সামাজিক স্বাস্থ্য। পরিবার ও চারপাশের লোকজনের সাথে বাস্তব পরিস্থিতির মাঝে ধৈর্যধারণ পূর্বক ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমেই ব্যক্তির সামাজিক স্বাস্থ্য গড়ে ওঠে। ব্যক্তির সামাজিক সুস্থ্য জীবনযাপনই ব্যক্তির মানুষিক স্বাস্হ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এভাবে অসুস্থ্যতার কারনে ব্যক্তি জীবন চলার পথে লোভ ক্রোধ মোহ ঘৃণা হিংসা নিন্দা অহঙ্কার ইত্যাদি অমানবিক জীবনযাপন করে দু:খ অশান্তি ও অসুখী জীবন যাতনা ভোগ করে থাকে। আবার সুস্থ্যতার কারণে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে ব্যক্তি ক্রোধহীন নির্লোভ নির্মোহ অহিংসা নিরহঙ্কার ঘৃণাহীন পরোপকারী জীবনধারণ পূর্বক অনিন্দ সমৃদ্ধ আনন্দমোহন শান্তিপূর্ণ সৌভাগ্যের জীবনযাপন করার সুযোগ পেতে পারে। ব্যক্তি জ্বরা ব্যধির স্বাস্থ্যহীন অশান্তির অসুস্থ্য জীবনযাপন করবে নাকি শান্তিময় সুস্থ্য জীবনযাপন করবে, এটি একান্তই যার যার পছন্দ ও রুচির বিষয়। (চলবে)

দয়ালের উপদেশ – ১৫

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৫২: ধান সিদ্ধ করলে, সে ধানে আর গাছ হয় না। তেমনি মানুষ যখন দয়ালকে-প্রেমময়কে প্রত্যক্ষ করতে পারে, তখন সে সিদ্ধ হয়ে যায়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ প্রভৃতি রিপুগুলো থাকে বটে, কিন্তু এগুলো আর ক্ষতি করতে পারে না।

তোরা কি মনে করিস যে লোক সিদ্ধ হয়, সে অন্য একটা কিছু হয়ে যায় নাকি? তা নয়, অসৎ কাজ আর তার দ্বারা হয় না। তার ‘কু’ ‘সু’ তে পরিণত হয়।

দেখ, মানুষ যখন সিদ্ধ হন, তখনই তার প্রকৃত কাজ আরম্ভ হয়, তখনই তাঁর কাজ ও দয়ালের কাজ এক কাজ হয়। সিদ্ধ মহাপুরুষ যে কর্মই করেন, তা দয়ালের কর্ম মনে করবি। এতে আর কোন বিচার নেই, মূল হতেই ইহা শুদ্ধ হয়ে আসে।

সিদ্ধ-শুদ্ধ মহাপুরুষের নিজের জন্য কোন কর্ম করতে হয় না, যা করেন শুধু জগতের উপকারের জন্য। যে অমৃতের স্বাদ তারা পান, তা দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক-ক্লিষ্ট মানুষকে দেয়ার জন্য পাগল হয়ে যান, প্রাণ কেঁদে ওঠে। তাই কত কষ্ট সহ্য করেও মানুষকে প্রকৃত মানুষ করতে চেষ্টা করেন।

উপদেশ-৫৩: দেখ্, মন যার যত বেশি স্থির, সে-ই তত বড় সাধক। দেখিস্ না, পুকুরের জল যখন স্থির থাকে, তখন প্রতিচ্ছায়া কেমন সুন্দরভাবে দেখা যায়।

দয়াল গুরু ভাত মেখে তোর মুখে দিতে পারেন, কিন্তু চিবানো ও গিলার কাজ তোকেই করতে হবে। মন স্থির করার সমস্ত সহজ পথ তোকে বলে দিতে পারেন, দেখিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু সাধনা ও চেষ্টা দ্বারা তোকেই ইহা ঠিক করে নিতে হবে। তোরা কি মনে করছিস্ জড় পদার্থের মতো পড়ে থাকবি, আর গুরুদেবই সব করবেন?

ওরে, যতদিন পর্যন্ত আমি, আমার এই ভাব থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তোদের প্রত্যেকটি কর্মের ফল তোদেরই ভোগ করতে হবে! তোদের উন্নতি-অবনতির জন্য তোরাই দায়ী। যখন প্রেমময়কে প্রত্যক্ষ করতে পারবি, তোদের বাসনা, কামনা কিছুই থাকবে না, যখন বুঝবি সবই তিনি করাচ্ছেন, তোরা যন্ত্র মাত্র,- একমাত্র তখনই তোরা কোন কিছুর জন্য দায়ী হবি না।

উপদেশ-৫৪: দেখ, সংসারের জন্য যতই পাগল হবি, সংসারের ভোগ ততই তোদের কাছ হতে দূরে চলে যেতে চাইবে। সংসারের দিকে পেছন দিয়ে অর্থাৎ পাগল না হয়ে, যতই দয়ালের প্রতি-প্রেমময়ের প্রতি আকর্ষণ-ভালোবাসা বাড়তে থাকবে ততই দেখবি সংসারের ভোগ তোদের ধরা দেবার জন্য ছুটে আসছে। সংসার আসক্তি, ভোগাকাক্সক্ষা যতই কমতে থাকবে ততই ভোগের জিনিস তোদের ধরবার জন্য ছুটে আসবে।

এক মহাপুরুষ নির্জন বনপথে একটি স্ত্রীলোককে বসে বসে কাঁদতে দেখলেন। স্ত্রীলোকটির কপালে ও পায়ে কালো দাগ, শরীরের সম্মুখ ভাগ বেশ উজ্জ্বল, আর পেছনের ভাগ অন্ধকারাচ্ছন্ন। মহাপুরুষ স্ত্রীলোকটিকে পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। তখন সে বলতে লাগল-‘আমি সংসার। মহাপুরুষরা আমার প্রতি উদাসীন। তাদের পায়ে মাথা ঠুকতে ঠুকতে কপালে দাগ পড়েছে, তবুও তারা আমার দিকে ফিরে তাকান না, তাই কাঁদছি। সংসারী লোকগুলো দিনরাত আমার পা আঁকড়িয়ে ধরে থাকে। এগুলোকে সরাবার জন্য লাথি দিতে দিতে আমার পায়ে কালো দাগ পড়েছে। আমার পেছনের এই অন্ধকার সংসারী লোকদের জন্য। লাথি খেয়েও চিরজীবন আমার পায়েই ধরে থাকবে। মৃত্যুর পর তাদের সব অন্ধকার। উজ্জ্বল অংশ মহাপুরুষদের জন্য।’দেখ, উন্নতির সহজ, সরল, গুপ্ত রহস্য না জেনে শুধু টু টু করে সংসারের পেছনে পেছনে ছুটাছুটি করলে লাথি খাওয়াই সার হয়, আবার মৃত্যুর পর সব অন্ধকার। (চলবে)

প্রবাহ

নাগরিকত্ব আইনবিপর্যস্ত ভারতের
পর্যটন খাত, দুই লাখ পর্যটক হারিয়েছে তাজমহল

ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বিক্ষোভের ডামাডোলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশটির পর্যটন খাত। গত দুই সপ্তাহে শুধু তাজমহলই দুই লাখ পর্যটক হারিয়েছে। ইতোমধ্যেই অন্তত নয়টি দেশ ভারতে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডা, তাইওয়ান ও ইসরায়েল। রবিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে তীব্র বিক্ষোভের ফলে এ মুহূর্তে দেশটি ভ্রমণে যেতে চাইছেন না বহু পর্যটক। ওই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। ধরপাকড়ের শিকার হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের কথা স্বীকার করেছে পুলিশ। উত্তর প্রদেশে পুলিশ মুসলিম বিক্ষোভকারীদের পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে; এমন একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। আরেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘সব কটাকে পুড়িয়ে দিতে এক সেকেন্ড লাগবে।’ এমনকি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মুসলিমদের দোকানপাট-সম্পত্তি জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। এই উত্তর প্রদেশেই অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ তাজমহল। এমন পরিস্থিতিতে ভারত ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপুল সংখ্যক পর্যটক।

সাত দেশের ভ্রমণ সতর্কতায় তাদের নাগরিকদের ভারতে যাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তারপরও যেতে হলে বিক্ষোভকবলিত অঞ্চলগুলোতে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ তাজমহল প্রায় দুই হাজার পর্যটক হারিয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় ও বিদেশি উভয় ধরনের পর্যটকরা রয়েছে। অনেকে সফর বাতিল করেছে। কেউবা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভ্রমণ স্থগিত করেছে।

তাজমহল সংলগ্ন একটি বিশেষ পর্যটন থানায় দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ পরিদর্শক দিনেশ কুমার। তিনি বলেন, গত ডিসেম্বরের চেয়ে এবারের ডিসেম্বরে তাজমহলের পর্যটক কমেছে ৬০ শতাংশ।

দিনেশ কুমার বলেন, নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য ভারতীয় ও বিদেশি পর্যটকরা আমাদের কন্ট্রোল রুমগুলোতে ফোন দিচ্ছে। আমরা তাদের সুরক্ষা দেয়ার নিশ্চয়তা দিই। তারপরও অনেকে এখনও দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

২০ দিনের জন্য ভারত সফরে যাওয়া একদল ইউরোপীয় পর্যটক জানিয়েছেন তারা সফর সংক্ষিপ্ত করার পরিকল্পনা করছেন। ওই পর্যটক দলের একজন সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ডেভ মিলিকিন। দিল্লিতে রয়টার্স-এর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমরা সবই অবসরপ্রাপ্ত লোকজন। আমাদের জন্য ভ্রমণ ধীর ও আরামদায়ক হওয়া দরকার। কিন্তু সংবাদপত্রের শিরোনামগুলো উদ্বেগের অনুভূতি তৈরি করছে। আমাদের যে ভ্রমণ পরিকল্পনা ছিল তার আগেই ফিরে যাবো।

উল্লেখ্য, প্রতি বছর উত্তর প্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত তাজমহল দেখতে যান ৬৫ লাখেরও বেশি পর্যটক। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের তৈরি এ ভবনটিতে শুধু প্রবেশ ফি বাবদ বছরে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ রুপি আয় করে ভারত। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় এক কোটি ৬৬ লাখ ৪৫ হাজার ৭৮৪ টাকা। তাছাড়া তাজমহলকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় একটি অর্থনৈতিক বলয় গড়ে উঠেছে। পর্যটকদের থাকার জন্য তৈরি হয়েছে বহু বিলাসবহুল হোটেল ও গেস্ট হাউস। তাছাড়া অনেকে ওই এলাকা থেকে নানা সামগ্রী কেনাকাটা করেন। ফলে পর্যটন খাত বিপর্যস্ত হলে এর প্রত্যক্ষ ক্ষতির বাইরে পরোক্ষভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ।

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে আটকে গেল মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার

বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ফের বাড়ল। সম্ভাবনাময় বাজারটি নিয়ে চলছে একরকমের ক্যাসিনো খেলার মতো পরিস্থিতি। সরকার শ্রম বাজার খোলার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও ক্যাসিনো (সিন্ডিকেট) রাজারা তাদের প্রজাদের নিয়ে বাজারটি বন্ধ রাখতে নষ্টালজিয়ায় মেতে উঠেছে। বলা চলে এদের সঙ্গে সরকার পেরে উঠতে পারছে না এমনটিই মনে হচ্ছে। শ্রমিক নেওয়ার দিনক্ষণ নির্ধারণের লক্ষ্যে দুই দেশের যৌথ কমিটির পূর্বনির্ধারিত বৈঠক গত ২৪-২৫ নভেম্বর ঢাকা অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। হঠাৎ মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান ঢাকায় বৈঠক না করে ভারত সফরে যান। এতে হতবাক হয় বাংলাদেশ। বৈঠক বাতিলের বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলেছে, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ কারণেই বৈঠকটি আপাতত স্থগিত হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন। অপর দিকে মালয়েশিয়া বলছে, বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল। সিন্ডিকেটের বিষয়টি আঁচ করতে পেরেই বাংলাদেশের সাথে পূর্ব নিধারিত বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগে তাদের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপ রয়েছে বলে জানান। বাংলাদেশ থেকে সিন্ডিকেট মুক্ত শর্তে শ্রমিক নিতে আগ্রহ হয়েছিল দেশটি কিন্তু এই অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রভাবেই আবারও ঝুলে গেল গুরুত্বপূর্ণ এ শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অপকর্মই বাজারটি উন্মুক্ত হওয়ার পথে এখন প্রধান অন্তরায়।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর জন্য ১০টি রিক্রুটিং এজেন্টকে এককভাবে ক্ষমতা দেয়া হয়। অনলাইন ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে (এসপিপিএ) লোক পাঠানোর কথা বলা হয়। এই সিস্টেমের নাম দেয়া হয় জি টু জি প্লাস। এই নিয়মের মাধ্যমে ১০টি বাদে অন্য রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। একক আধিপত্য থাকায় ইচ্ছেমতো শ্রমিকদের কাছ থেকে নির্ধারিত পরিমাণের বাহিরে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় তারা। এসব এজেন্সির খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়ায় যাবার পর পাসপোর্ট, ভিসাসহ বিভিন্ন জটিলতায় পড়েন শ্রমিকরা। অবৈধ হয় লাখ লাখ শ্রমিক, পুলিশের ভয়ে বন জঙ্গলে মানবতার জীবন কাটায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এজেন্সিগুলোর অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও মালয়েশিয়ার নিরাপত্তা কথা ভেবে মাহাতি সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ ঘোষণা করে। বাজারটি সচল করতে দফায় দফায় আলোচনা হয় দুই দেশের সাথে। আলোচনার এক পর্যায়ে সিন্ডিকেট মুক্ত রেখে মালয়েশিয়ান সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

নভেম্বরের শেষ সপ্তায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর আসছে – দেশটি সফর শেষে এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন খোদ প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ। গত ২৪-২৫ নভেম্বর চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই দেশের যৌথ কমিটির বৈঠকের তারিখ নির্ধারিত হয়। কিন্তু হঠাৎ করে বৈঠকটি স্থগিত করে মালয়েশিয়া। এই দিন বাংলাদেশে বৈঠক না করে গতি পাল্টিয়ে দিল্লি সফরে যান মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা। বৈঠক বাতিলের বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ কারণেই বৈঠকটি আপাতত স্থগিত হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তবে আশা করছি শিগগিরই বৈঠকের তারিখ পুনর্র্নিধারণ হবে।

সূত্র জানায়, আবারো মালয়েশিয়া শ্রমিক নেবে – এমন সংবাদ প্রকাশের পর বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী শ্রমবাজারটি নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে। উচ্চ পর্যায়ে চেষ্ঠা – তদবির চালতে থাকে এ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি ফের সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে মালয়েশিয়া সরকার কৌশলে বাংলাদেশের সাথে পূর্ব নিধারিত বৈঠকটি বাতিল করে। সেই দিন ভারত সফর করে মালয়েশিয়ান প্রতিনিধিরা।

সিন্ডিকেট থাকবে কিনা এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান। এমন প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং উম্মুক্ত সিন্ডিকেটের ব্যপারে সাফাই গান। তখনি আশঙ্কা করা হয়েছিল সিন্ডিকেটের কারণে বাজারটি হাত ছাড়া হতে পারে। সেই আশঙ্কাটিই সঠিক হলো।

এ বিষয়ে বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, দুই দেশের মধ্যে কাজ হবে – এটা তো সিদ্ধান্ত হয়েই আছে। কিন্তু একটা প্রটোকল স্বাক্ষর হবে, সেই ব্যাপারটা নিয়ে দেরি হচ্ছে। আশা করছি, ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তারিখ পুনরায় নির্ধারিত হবে। মালয়েশিয়ার কেবিনেট বলেছে তাদের ছয় লাখ কর্মী প্রয়োজন। সুতরাং সে দেশে কর্মী প্রয়োজন, এটা নিশ্চিত। কী প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো হবে সেটিও মোটামুটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন কথা হলো, কবে থেকে শুরু হবে কর্মী পাঠানো – সেটাই বিষয়। ডিসেম্বরের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বৈঠকটি আপাতত হচ্ছে না। মালয়েশিয়া বলেনি প্রক্রিয়াটি বন্ধ করা হয়েছে। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যেই বৈঠকটি হবে।

বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বায়রার একজন নেতা শীর্ষ কাগজের এ প্রতিবেদককে জানান, বর্তমানে বিদেশি শ্রমবাজারে যে অন্ধকার নেমে এসেছে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর মাধ্যমে কিছুটা খরা কাটিয়ে উঠতে পারবো এমনটা মনে করছিলাম। কিন্তু দুদেশের অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রভাবেই আবারও ঝুলে গেল গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারটির উন্মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। বায়রার এই নেতার দাবি, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাই বাজারটি উন্মুক্ত না হওয়ার প্রধান অন্তরায়। তারা যদি নাক না গলিয়ে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিত তাহলে বাজারটি উন্মুক্ত হতে পারতো। আশা করি, মার্কেটটা দ্রুত খুলতে ব্যবসায়ীরা তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ ও মালয়েশিয়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মধ্যে বৈঠকের পর শ্রমবাজার নিয়ে যতটুকু আলো সঞ্চার হয়েছিল তাও এখন নিভু নিভু করছে। আশা-নিরাশার দোলাচলে সম্ভাবনার বাজারটির ভবিষ্যত এখন অনিশ্চিত। অনৈতিকভাবে শ্রমিক রফতানির ব্যবসা পরিচালনায় যুক্ত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কালো মেঘ আবারও বাড়লো। দুই দেশের কুটনীতিতে এ দীর্ঘসূত্রিতায় লোভনীয় শ্রমবাজারটি যেন হাতছাড়া না হয়ে যায় সে জন্য সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অব্যাহত তৎপরতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন করতে হবে।

জানা যায়, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়া যেতে ওই দেশগুলোর শ্রমিকদের বাংলাদেশের তুলনায় কম টাকা দিতে হয়। ওই দেশগুলোর শ্রমিকদের খরচ পড়ে আড়াই হাজার রিঙ্গিতের মতো। অথচ, গত বছরের জুনে মালয়েশিয়ার ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টার-এর অনলাইন সংস্করণে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, মালয়েশিয়ায় লোক পাঠিয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশের একটি চক্র। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় একজন শ্রমিক পাঠাতে খরচ হয় দুই হাজার রিঙ্গিত। আর বাংলাদেশি দুর্নীতিবাজ চক্রটি নিচ্ছে ২০ হাজার রিঙ্গিত। এভাবে দুই বছরে চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে ২০০ কোটি রিঙ্গিত। বাংলাদেশি মুদ্রায় চার হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংবাদে এই চক্রের হোতা হিসেবে বাংলাদেশের মন্ত্রী মর্যাদার একজন ব্যক্তির কথাও বলা হয়।

বাংলাদেশের সাধারণ পরিবারের তরুণদের কাছে এক নব প্রেরণার আলো মালয়েশিয়া। এসব পরিবারের কর্মহীন, বেকার শিক্ষিত অনেক তরুণদের স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়া। কোনোমতে যেতে পারলে ভাগ্য বদলাবে, ঘুচবে বেকারত্ব, আসবে পরিবারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, ফিরবে প্রাণ এমনই মনে করেন তারা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ওখানকার শ্রমবাজারের হাল হকিকত। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করছেন ঠিকই। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশটিতে অনেক অবৈধ রয়েছে এখনো, প্রতারণার শিকার হয়ে তারা বৈধ হতে পারেননি। তাদেরকে বৈধ করার জোর প্রচেষ্টা চালানো উচিত। যদিও ইতিমধ্যে হাজার হাজার শ্রমিককে দেশে ফেরত আসতে হয়েছে এবং এখনো আসছে।

বিগত মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ কর্মীদের বৈধতা দিতে তিনটি ভেন্ডর কোম্পানির মাধ্যমে চালু করেছিল রি-হিয়ারিং প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ বৈধ হওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। এ প্রোগ্রামে নাম ও বয়স জটিলতা এবং প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বৈধ হতে পারেননি।

এ ছাড়া প্রায় ৭০ হাজারের মতো ইমিগ্রেশনের লেভি পরিশোধ করে দেড় বছরেও বৈধতা পাননি। আর যারা বৈধতা পেয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই নিজের কোম্পানিতে কাজ না করে অন্যত্র কাজ করছেন। প্রতিনিয়তই মালয়েশিয়ায় অব্যাহত রয়েছে ইমিগ্রেশনের অভিযান। বৈধ অবৈধ উভয় ধরনের শ্রমিকই আটক করা হচ্ছে এসব অভিযানে। যারা বৈধ কোম্পানি ছেড়ে অন্যত্র কাজ করায় আটক হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দেশটিতে প্রচুর বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা আছে। যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারলে বাংলাদেশের জন্য লোভনীয় এই শ্রম বাজারের ব্যাপকতা বাড়াবে বলে অনেকে মন্তব্য করছেন। উল্লেখ্য, সরকারি-বেসরকারি যৌথ ব্যবস্থাপনায় (জিটুজি প্লাস) ২০১৭ ও ২০১৮ সালে প্রায় পৌনে তিন লাখ কর্মী মালয়েশিয়া যান। সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা হলেও কর্মীপ্রতি সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত নেয় এজেন্সিগুলো, যারা সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিত পায়। সরকারের উচিত শক্তহাতে এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কবল থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি মুক্ত করা। তাতে অল্প খরচে শ্রমিকরা বিদেশ গিয়ে নিজের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারবে। সেই সঙ্গে দেশ পাবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে কোরআন ও বাইবেল পুনর্লিখন করবে চীন

সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে কোরআন ও বাইবেল পুনর্লিখনের উদ্যোগ নিয়েছে চীন। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাদের সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের আলোকে ‘মৌলিক ধর্মগ্রন্থগুলোর’ সব অনুবাদ নতুন করে লেখা হবে। মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি মেইল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বরে চীনে ধর্মীয় বিষয়াদি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা জাতিতত্ত্ব বিষয়ক কমিটির এক সভায় সংশ্লিষ্টদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এতে কোরআন বা বাইবেলের কথা সরাসরি উল্লেখ না করলেও বেইজিং বলছে, ‘ধর্মগ্রন্থগুলোর নতুন সংস্করণে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও উপাদান থাকবে না।’

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মৌলিক ধর্মগ্রন্থগুলোর সব অনুবাদ ‘পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে।’ এ গ্রন্থগুলোর নতুন সংস্করণে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও তথ্য রাখা হবে না। কোনও অনুচ্ছেদ ‘ভুল’ মনে হলে সেন্সর বোর্ড সেগুলো সংশোধন বা পুনরায় অনুবাদ করবে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধি, ধর্মবিশ্বাসী ও বিশেষজ্ঞদের ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। চীন সরকারের পলিটিক্যাল কনস্যুলেটিভ কনফারেন্সের চেয়ারম্যান ওয়াং ইয়াংয়ের তত্ত্বাবধানে ওই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এ মাসের গোড়ার দিকে ম্যাকাওতে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

মঙ্গলবার ওয়াং ইয়াংয়ের বরাত দিয়ে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে ফিগারো জানিয়েছে, ‘প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী যুগের চাহিদা ও সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধর্মের তত্ত্ব ব্যাখ্যা দেবে চীনা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ।’

সিরিয়ায় আসাদ বাহিনী ও রাশিয়ার অভিযানে পালিয়েছে দুই লক্ষাধিক মানুষ

সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশে সম্প্রতি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগত বাহিনীর পাশাপাশি এ অভিযানে অংশ নেয় আসাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাশিয়া। আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে চালানো এ অভিযানে অঞ্চলটিতে নতুন করে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত দুই সপ্তাহে ২ লাখ ৩৫ হাজারের অধিক বাসিন্দা এলাকাটি ছেড়ে পালিয়েছে। ২৭ ডিসেম্বর শুক্রবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ওসিএইচএ-র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

রাশিয়ার সহায়তায় ইতোমধ্যেই সরকারবিরোধী বিদ্রোহীদের কাছ থেকে দেশের বেশিরভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আসাদ বাহিনী। ফলে দেশটিতে ইদলিব-কেই বিদ্রোহীদের সর্বশেষ উল্লেযোগ্য ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে এখন বিমান হামলার মুখে লোকজন এলাকাটি ছাড়তে মরিয়া হয়ে পড়েছে। হামলায় বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার কথা বলা হলেও বেসামরিক নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ওসিএইচএ জানিয়েছে, নতুন করে সহিংসতা বৃদ্ধির ফলে বেসামরিক নাগরিকরা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। বিমান হামলার ফলে লোকজন পালিয়ে যাওয়ায় ইদলিবের দক্ষিণাঞ্চল ইতোমধ্যেই প্রায় খালি হয়ে গেছে। গত ১২ ডিসেম্বর থেকে রাশিয়া ও আসাদ বাহিনীর অভিযানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরীয় গৃহযুদ্ধে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। বাস্তচ্যুত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। দেশটির গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাশিয়া ও ইরান। অন্যদিকে সিরিয়ায় আইএস বিরোধী লড়াইয়ের কথা বলে সেখানকার বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র।

জার্মানদের কাছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নেতা ট্রাম্প!

যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু দেশটির নাগরিকেদের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট খুবই অপছন্দের ও ভয়ঙ্কর। এক জরিপে জার্মানির সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কাকে আপনার বেশি ভয়ঙ্কর মনে হয়?

ওই জরিপে সর্বোচ্চ ৪১ ভাগ ভোট পড়েছে ট্রাম্পের নামের পাশে। দ্বিতীয়তে আছেন কিম জং উন (১৭ শতাংশ)। এরপর পুতিন ও খামেনেই সমান আট শতাংশ করে। সবার শেষে রয়েছে চীনা প্রেসিডেন্ট, সাত ভাগ। জরিপটি করেছে জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়চে প্রেসে-আগেনট্যুর বা ডিপিএ। দুই হাজারেরও বেশি জার্মান নাগরিক এতে অংশ নেন।

গত বছর জুলাইতে একইরকম আরেকটি জরিপ করেছিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক জরিপ সংস্থা ‘ইউগভ পোল’। সেখানেও দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেয়া ৪৮ শতাংশ জার্মান মনে করেন কিম ও পুতিনের চেয়ে ট্রাম্প বেশি ভয়ঙ্কর। ওই জরিপে অবশ্য ইরান ও চীনের নেতাদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।

আরেক সালতামামি জরিপে দেখা গেছে, জার্মানদের কাছে অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের তুলনায় চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের কদর কমে গেছে। জার্মানির ফুঙ্কে মিডিয়া গ্রুপের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কানতার ইনস্টিটিউটের করা এই গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশ নেয়া ৫৭ ভাগ জার্মান ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোর প্রতি বেশি আস্থা রাখেন আর ৫৩ শতাংশ রাখেন ম্যার্কেলে।

এমনকি খুব কম আস্থা রাখেন কার ওপর এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যবধান আরো বেড়ে গেছে। ৪৪ ভাগ বলেছেন ম্যার্কেলের ওপর তাদের আস্থা সামান্য, আর ৩২ ভাগের এমন ধারণা মাক্রোকে নিয়ে। ট্রাম্প অবশ্য এখানেও সবার শেষে। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা সবচেয়ে কম আস্থা রাখছেন তার ওপর (৮৯ শতংশ) এরপর আছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান (৮৬ শতাংশ) এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন (৭১ শতাংশ)।

শিগগিরই লিবিয়ায় যাবে তুর্কি সেনা : এরদোয়ান

যুদ্ধকবলিত লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার তুরস্ককে সেনা মোতায়েনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, এমন তথ্য দিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, লিবিয়ায় সেনা পাঠানোর জন্য সংসদে একটি বিল পাস করা হবে। আগামী মাসের মধ্যে দেশটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েন করা হবে।

চলতি মাসের শুরুতে লিবিয়ার উত্তরাঞ্চল দখল করা ভূমিপুত্র খলিফা হাফতারের বাহিনীকে মোকাবিলায় লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের একটি চুক্তি সই হয়। এরদোয়ান বলেছেন, জাতিসংঘ স্বীকৃত লিবিয়া সরকারকে সহযোগিতা করতে জানুয়ারি মাসেই তুর্কি সংসদে তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি একটি বিল আনবে।

গতকাল রাজধানী আঙ্কারায় তার দলের সদস্যদের এক সমাবেশে বক্তৃতা দেয়ার সময় এমনটা জানান এরদোয়ান। তিনি বলেন, যেহেতু লিবিয়ার পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ আছে সেক্ষেত্রে আমরা তা গ্রহণ করবো এবং আমরা শিগগিরই লিবিয়ায় সেনা পাঠানোর ব্যাপারে একটি প্রস্তাবনা সংসদের কার্যতালিকায় আনবো। তিনি আরও জানান, আগামী ৮ অথবা ৯ জানুয়ারি সংসদে এ বিল পাস হবে। লিবিয়া সরকারের সঙ্গে তুরস্ক সম্প্রতি যে সামরিক চুক্তিটি করেছিলে ইতোমধ্যে তুরস্কের সংসদে তা অনুমোদন করা হয়েছে। তবে লিবিয়ায় সেনা পাঠাতে হলে সংসদ থেকে তার জন্য আলাদাভাবে অনুমোদন নিতে হবে। ভূমধ্যসাগর উপকূলবর্তী দেশ লিবিয়ায় সেনা পাঠানোর ব্যাপারে তুরস্ক ও লিবিয়া সরকারের মধ্যে চুক্তির পর থেকেই দেশটির জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের পক্ষে লড়তে তুরস্ক সেনা পাঠানোর ব্যাপারে আগ্রহী। তবে তুর্কি সহায়তায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাত বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষ আরও খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এমন পদক্ষেপের কারণে উত্তর লিবিয়ার সামরিক ভূমিপুত্র খলিফা হাফতারের বাহিনীর সঙ্গে লিবিয়া সরকারের সামরিক সংঘাত আরও বাড়বে। হাফতার এখন জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাজধানী ত্রিপোলি অভিমুখে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

হাফতার বাহিনীকে এই লড়াইয়ে সমর্থন দিচ্ছে প্রতিবেশী মিসর ও পারস্য উপসাগর সংলগ্ন দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার। ফলে তুরস্কের সমর্থনে লিবিয়া সরকার হাফতার বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে এই দুই দেশও তাতে যোগ দিবে। ফলে বৃহৎ এক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত ফয়েজ আল সিরাজ সরকারের হাতে এখনো সীমিত সংখ্যক ড্রোন এবং অস্ত্র সরঞ্জাম আছে। যদি তুরস্ক ত্রিপোলিতে তাদের সেনা পাঠায় তাহলে এই ঘাটতি পূরণ হবে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া সম্প্রতি ত্রিপোলিতে আমিরাতে দুটি ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে সেনা পাঠানোর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর লিবিয়ার উপকূলবর্তী শহর মিসরাটায় বোমা হামলা করে সেনা ও অস্ত্র সরঞ্জাম না পাঠানোর ব্যাপারে তুরস্ককে হুঁশিয়ার করেছে আরব আমিরাত ও মিসর সমর্থিত খলিফা হাফতারের বিমানবাহিনী।

২০২০ সালে তারিখ লিখতে সাবধান

নতুন আশা ও সম্ভাবনা নিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়ে ২০২০ সাল। নতুন বছরে পৃথিবীবাসির জন্য অপেক্ষা করে আছে নতুন নতুন অনেক কিছু। আর একদিন বাদে তারিখে সালটাও পাল্টে যাবে। তারিখ লেখার ক্ষেত্রে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে সবাইকে। তারিখ লেখার সময় আমরা সাধারণত বছেরের শেষ সংখ্যা লিখতেই অভ্যস্ত। যেমন ২০১৯ সালে আমরা সালের জায়গায় শুধু ১৯ লিখেছি। কিন্তু আগামী বছর এটা করা যাবে না। এতে প্রতারকরা সেখানে অন্য কোনো সংখ্যা লিখে জালিয়াতি করতেই পারে।

এ বিষয়ে সতর্ক করতে একটি বার্তা ভাইরাল হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকে। বার্তায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালের তারিখ লেখার সময় আমাদের সম্পূর্ণ ফরম্যাটে লেখা উচিত। যেমন ৩১/০১/২০২০ এভাবে লিখুন। কখনোই ৩১/০১/২০ লিখবেন না। কারণ, যে কেউ এটিকে ৩১/০১/২০০০ বা ৩১/০১/২০১৯ বা যে কোনও বছরের মধ্যে তার সুবিধার্থে পরিবর্তন করতে পারে। এতে করে আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। এ সমস্যাটি কেবল এই ২০২০ বছরই বহাল থাকবে। তাই এ সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। কোনও ডকুমেন্ট পাওয়ার সময় সাল শুধু ২০ লিখবেন না এবং সাল শুধু ২০ লেখা গ্রহণও করবেন না।