শেষ পাতা

ভয়ঙ্কর গতিতে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’

সংলাপ।। দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের গভীর নিম্নচাপটি আজ, শনিবার বিকেলের মধ্যেই ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে চলেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের চেহারা নিতে চলেছে। থাইল্যান্ড ওই ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়েছে ‘আমফান’। প্রথমে ঘূর্ণিঝড়ের অভিমুখ উত্তরমুখী হলেও, পরে বাঁক নিয়ে তা উত্তর-পূর্ব দিকে ধীরে ধীরে এগোবে। এখনও পর্যন্ত যা গতিপ্রকৃতি, তাতে মঙ্গল-বুধবার নাগাদ উপকূলে ‘আমফান’-এর আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, আগামি রবিবার ঘূর্ণিঝড়টি  ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে। পরে তা আরও শক্তি বাড়িয়ে অতি ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড়ের গতি পৌঁছে যেতে পারে প্রতি ঘণ্টায় ১৭০-২০০ কিলোমিটার। স্থলভাগের দিকে যত এগুবে, তার গতি কিছুটা কমে। তবে আছড়ে পড়ার সময় আমফান কতটা শক্তি বাড়াবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এখন থেকেই মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে।  শনিবার দুপুরে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের উপরে গভীর নিম্নচাপটি পটুয়াখালির জেলার খেপুপাড়া থেকে ১ হাজার ৩৩০ কিলোমিটার, ভারতের ওড়িশার পারাদ্বীপ থেকে ১ হাজার ৬০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। দিঘা থেকে ১ হাজার ২২০ কিলোমিটার,  দূরে রয়েছে।

ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে ‘আমফান’ যদি উপকূলে আছড়ে পড়ে, তা হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। ক্ষতি হতে পারে চাষের। একে করোনার জেরে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, তার উপরে ‘আমফান’ যদি সরাসরি ছোবল মারে উপকূল এলাকায়, তা হলে সঙ্কট আরও বাড়বে। ইতিমধ্যেই প্রশাসনের তরফে সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আমফানের প্রভাবে  সমুদ্র উপকূল প্রবল জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে  গাঙ্গেয় উপকূলের প্রায় সব জেলাতেই। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে উত্তর-পূর্ব দিকে নেওয়া ওই বাঁকের উপরেই।

গত বছরের নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর গতিপ্রকৃতিও ঠিক একই রকম ছিল।  ওড়িশার পারাদ্বীপের কাছ থেকে বাঁক নিয়ে সুন্দরবনের উপর দিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছিল সে।

বাবা-মেয়ের করোনা-গবেষণায় অনন্য সাফল্য

সংলাপ।। সাফল্যের পাল্লায় বাঙালির আরেকটি অর্জন। বাংলাদেশের ‘চাইল্ড হেল্‌থ রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (সিএইচআরএফ)-এর ৮ সদস্যের একটি গবেষক দল সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স ম্যাপিংয়ের কাজ করেছে। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন সেঁজুতি সাহা, যিনি ঢাকা শিশু হাসপাতালে চাইল্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক। সিএইচআরএফ-এর কার্যনির্বাহী পরিচালক সমীর বাবু যিনি সেজুতির বাবা।

মাপে ৬ ফুট বাই ১২ ফুট হবে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল লাগোয়া ছোট্ট এই ঘরটাতেই ১৯৮৩ সালে মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্ট তৈরি করেছিলেন সমীরকুমার সাহা । তার পর থেকে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক নিয়ে কাজ করেছেন দেশের এই গবেষক । একাধিক সম্মানও পেয়েছেন ‘ইউনেস্কো’, ‘দ্য আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি’-র মতো সংস্থা থেকে। এ বারে ফের মেয়ে সেঁজুতিকে নিয়ে চমকে দিলেন সমীরবাবু। বিশ্বজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করা করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স উদঘাটন করলেন বাবা-মেয়ে। 

ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স জানা গেলে রোগের গতিবিধি সম্পর্কে জানা যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক শরিফ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘‘জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সাহায্যে ভাইরাসটির জেনেটিক পরিবর্তন জানা সম্ভব হবে। রোগের মূল জানা গেলে প্রতিষেধক-সন্ধান সহজ হয়ে যাবে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘বিষয়টা এ রকম, এই মুহূর্তে ভাইরাল জিনোম সিকোয়েন্স থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল আমাদের দেশে প্রচলিত নির্দিষ্ট ভাইরাল স্ট্রেনগুলো শনাক্ত করা, সংক্রমণের হটস্পট বা সুপার-স্প্রেডার শনাক্ত করা এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য কৌশল প্রণয়ন করা।’’ তিনি আরও জানিয়েছেন, এটি বাংলাদেশের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সহায়তা করবে।

এ বছর জানুয়ারিতে সমীর ও সেঁজুতিকে নিয়ে নিজের ব্লগ ‘গেটসনোট’-এ লিখেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ধনকুবের মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। লিখেছিলেন, কী ভাবে ছোট্ট সেঁজুতি রাতে খাবার টেবিলে বাবার কাছে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার গল্প শুনত। কী ভাবে সেঁজুতিও বাবার মতো মাইক্রোবায়েলজিস্ট হয়ে উঠেছেন। এ-ও লিখেছিলেন, ‘আমার ইচ্ছে হয়, আমিও যদি ওদের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসতে পারতাম। নানা অসুখ নিয়ে কত কী শিখতে পারতাম!’   

ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে করোনা ‘মহামারিমুক্ত’ ঘোষনা স্লোভেনিয়া’র

সংলাপ।। করোনা মহামারিমুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা দিল ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়া। জনসংখ্যা মাত্র ২০ লক্ষ। তার মধ্যেও প্রতি দিন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। তবু করোনা-মহামারি থেকে দেশ মুক্ত বলে ঘোষণা করল স্লোভেনিয়ার সরকার। ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ‘মহামারিমুক্ত’ ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে সে দেশে। খুলে দেওয়া হয়েছে ইটালির সীমান্তও। তবে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ জারি রাখা হয়েছে।

সরকারি ভাবে বিজ্ঞপ্তি জারির পাশাপাশি স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানেজ জানসা বলেছেন, ‘‘মহামারি পরিস্থিতিতে এখন ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে ভাল অবস্থায় রয়েছে স্লোভেনিয়া। সেই কারণেই মহামারির ইতি ঘোষণা করা হচ্ছে দেশে।’’

পাহাড়-পর্বতে ঘেরা ছোট্ট দেশ স্লোভেনিয়ার জনসংখ্যা ২০ লক্ষের মতো। ইটালির সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। সেই ইটালি, ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করোনার সংক্রমণ ছড়িয়েছে যে দেশে। স্লোভেনিয়া মোট করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দেড় হাজারের মতো। মৃত্যু হয়েছে শতাধিক মানুষের। স্বাভাবিক ভাবেই এমন পরিস্থিতিতে দেশকে ‘মহামারিমুক্ত’ ঘোষণা করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। যদিও স্লোভেনিয়া সরকারের দাবি, সংক্রমণ বৃদ্ধির হার অনেক কমে এসেছে বলেই মহামারিমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে ইটালি-সহ সমস্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্যই স্লোভেনিয়ার সীমান্ত খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়া অন্য কোনও দেশ থেকে এলে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। তবে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়-সহ সব রকম জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে শপিং মল, রেস্তরাঁ খুলে দেওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিল প্রশাসন। পাশাপাশি ২৩ মে থেকে ফুটবল-সহ যাবতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালু করার কথাও বলা হয়েছিল। সেগুলো চালু হলে নতুন করে অনেকেই আক্রান্ত হতে পারেন বলেই আশঙ্কা অনেকের।

তবে স্লোভেনিয়া বাদ দিলে বাকি বিশ্বে করোনা নিয়ে এখনও যথেষ্টই উদ্বেগের কারণ রয়েছে। জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসেবে সারা বিশ্বে এই মুহূর্তে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ লক্ষাধিক। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩ লক্ষ ৫ হাজার জনের অধিক। করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে পৃথিবীর সেরা দাম্ভিক রাষ্ট্র আমেরিকা।

‘শেখ সাব’, ‘মুজিব ভাই’ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’-তারপর বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা

সংলাপ ॥ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠ ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠিকে মুক্তি ও স্বাধীনতার পথ নির্দেশনা দিয়েছিল। তিনি প্রথমে তাঁর দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে ছিলেন প্রিয় মুজিব ভাই, আর সারাদেশের জনগণের ছিলেন ‘শেখ সাব’।

‘মনে রাখবা- রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেস কোর্স ময়দানের এক জনসভায় এই বজ্রঘোষণার মাধ্যমে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার এবং মা সায়েরা খাতুন।

ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। ১৯২৭ সালে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তাঁর সাত বছর বয়সে।

খুবই অল্প বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন সম্পর্কে আত্মীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে। নয় বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে এবং পরে ম্যাট্রিক পাশ করেন গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে।

গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় ১৯৩৯ সালে স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কাশ্মিরী বংশোদ্ভুত বাঙালি মুসলিম নেতা মি. সোহরাওয়ার্দী পরবর্তীকালে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রাভাবিত করেছিলেন।

১৯৪২ সালে এট্রান্স পাশ করার পর শেখ মুজিব ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে যেটির বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নামকরা ছিল। এই কলেজ থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন।

তবে স্কুল জীবন থেকেই তিনি তাঁর নেতৃত্ব দেবার দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।

তিনি ১৯৪৩ সালে যোগ দেন বেঙ্গল মুসলিম লীগে এবং ১৯৪৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের সম্মেলনে যোগদানের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন।

শেখ মুজিব ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে এবং এ সময়েই তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকারী নিযুক্ত হয়েছিলেন। ওই বছরই প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এসময় তিনি পাকিস্তানে আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে বেঙ্গল মুসলিম লীগের হয়ে সক্রিয় আন্দোলনে অংশ নেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকেই ১৯৪৭ সালে তিনি বি.এ. পাশ করেন এবং ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্মীদের বিক্ষোভে ‘উস্কানি’ দেবার অভিযোগ এনে কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করায় আইন পড়া তাঁর শেষ হয়নি।

 তিনি ১৯৪৮ সালে জানুয়ারির ৪ তারিখে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যার মাধ্যমে তিনি একজন অন্যতম প্রধান ছাত্র নেতায় পরিণত হন। এ সময় তিনি ঝুঁকে পড়েন সমাজতন্ত্রের দিকে এবং মনে করতেন দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য একমাত্র পথ সমাজতন্ত্রের বিকাশ।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেবার পর এর বিরুদ্ধে যে গণ আন্দোলন শুরু হয়, সে আন্দোলনে একটা অগ্রণী ভূমিকা ছিল শেখ মুজিবের।

বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার জন্য ১৯৪৮ সাল থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাভোগ করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করার পর শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে এই নতুন দলে যোগ দেন এবং তাঁকে পূর্ব পাকিস্তান অংশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নামে যে বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ গঠিত হয়েছিল, তার মূল দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন। এই জোটের টিকেটে ১৯৫৪ র নির্বাচনে গোপালগঞ্জ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন শেখ মুজিব। তাঁকে তখন কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু নির্বাচনের কয়েক মাসের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার ওই যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়।

এই অনুষ্ঠান তৈরির সময় ঢাকায় প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন মি. সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে এসে শেখ মুজিব মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দলটিকে শক্তিশালী করেছিলেন।

উনিশশ’ ৫৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। শেখ মুজিব আবার দলের মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পাকিস্তানে ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করা হয়। সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সংগ্রামের কারণে তাঁকে কয়েক বছর আবার জেল খাটতে হয়েছিল।

এরপর ১৯৬১ সালে অন্যান্য সাধারণ ছাত্রনেতাদের নিয়ে গোপনে তিনি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে এক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করা।

বিবিসি বাংলাকে আতাউস সামাদ বলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব নেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ছয় দফা দাবি’ পেশ করেন।

‘শেখ সাহেব সাহস করে ছয় দফা ঘোষণা করলেন, তাও করলেন তিনি লাহোরে। পশ্চিম পাকিস্তানে একটা সম্মেলনে গিয়ে তিনি ওই ছয় দফা ঘোষণা করলেন, যার ফলে ওঁনাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে যে মামলাটি হয় তাতে এক নম্বর আসামী করা হলো ১৯৬৮ সালের ৩রা জানুয়ারি,’ বলেন আতাউস সামাদ।

এই মামলায় বলা হয়েছিল শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগী বাঙালি কর্মকর্তারা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরে ভারত সরকারের সাথে এক বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছে।

ওই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপী যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় তা এক সময় গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। সেই গণ আন্দোলন বা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান চরম রূপ ধারণ করলে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত এই মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সকলকে মুক্তি দেয়া হয়।

 ‘ওঁনাকে ছাড়ানোর জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল যেটা ছাত্রদের ১১ দফায় রূপ নিয়েছিল, সেইখান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরদিনই তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো,’ বলেন আতাউস সামাদ।

রেস কোর্স ময়দানে ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ এক বিশাল জনসভায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়েছিল।

উনিশশ’ ৭০-এর নির্বাচনে শেখ মুজিব তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টিকে মূল বক্তব্য হিসাবে তুলে ধরেছিলেন, বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন সাংবাদিক আতাউস সামাদ। তিনি বলেন শেখ মুজিবুর রহমানের অনেকগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। তিনি দেখেছেন সব জায়গাতেই তাঁকে ছয় দফা নিয়ে কথা বলতে।

‘ছয় দফা না বলে আঙুল তুলে বলতেন আমার দাবি ‘এই’ অর্থাৎ দেশ স্বাধীন করতে হবে,’ বলেছিলেন মি. সামাদ। এই দাবিকে শেখ মুজিব ব্যাখ্যা করেছিলেন ‘‘আমাদের বাঁচার দাবি’’ হিসাবে।

শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ড. কামাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘১৯৬৯ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি পল্টনে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়ার মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয় জনগণের কত কাছাকাছি তিনি চলে এসেছেন। এটা আমি বলব একটা পালাবদল। কারণ এই বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়ার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠলেন জনগণের অবিসংবাদিত নেতা।

‘আরেকটি হচ্ছে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। নির্বাচনের সিদ্ধান্ত, নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্টই প্রমাণ করেছিল যে বাঙালির তিনি একমাত্র মুখপাত্র। এটা কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তিকে অনেক শক্ত করে দিয়েছিল বলে আমি মনে করি,’ বলেছিলেন ড. কামাল হোসেন।

এই ছয় দফা দাবির পক্ষে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন দেশব্যাপী শুরু হয়েছিল তীব্র গণআন্দোলন ।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের তিনটি বড় গুণ ছিল তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং আপোসহীন।

‘পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রধান দ্বন্দ্ব কী সেটাকে তিনি খুব সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই তিনি জেনে নিয়েছিলেন যে বাঙালির সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বন্দ্বটাই ছিল প্রধান দ্বন্দ্ব। তাঁর মধ্যে অসাধারণ একটা আকর্ষণী শক্তি ছিল-ক্যারিশমা। তিনি জনগণকে বুঝতেন, জনগণের সঙ্গে মিশতে পারতেন, তাদের ভাষা জানতেন, তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন।’

মি. সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আয়োজিত এক জনসভায় শেখ মুজিব যখন ঘোষণা করলেন যে এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত করা হবে, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্তারা তাঁকে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার তকমা দিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ওই নির্বাচনী ফলাফল পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মেরুকরণ তৈরি করল। পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো, শেখ মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির প্রবল বিরোধিতা করলেন।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বুঝতে পারল যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমানের দলকে সরকার গঠন করতে দেয়া হবে না।

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এক জনসভায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দিলেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হবার আহ্বান জানালেন। যার মধ্যে দিয়ে শুরু হল বাংলাদেশের নয় মাস ব্যাপী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম।

শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পর্কে আতাউস সামাদ বলেছিলেন, ‘রেস কোর্সে তিনি এমন একটা বক্তৃতা দিলেন যা সবার মন ছুঁয়ে গেল, সবাই ওঁনার নির্দেশ মানতে লাগল। ওঁনার নামেই স্বাধীনতা যুদ্ধ চলল নয় মাস।’

শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো পশ্চিম পাকিস্তানে এবং ফয়সালাবাদের একটি জেলে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হলো। এরপর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২-এর দশই জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে গেলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

 অল্পদিনের জন্য অন্তরবর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি থাকার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

শেখ মুজিব ১৯৭২ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, বলেছিলেন জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের কথা।

কিন্তু স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে ক্রমশ বাড়তে থাকা অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে শেখ মুজিব তাঁর ক্ষমতা বাড়াতে থাকলেন। ১৯৭৫-এ কয়েকটি দল মিলে গঠন করা হলো বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা সংক্ষেপে বাকশাল নামে রাজনৈতিক দল। বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি বদলে শেখ মুজিব নিজেকে আমৃত্যু রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করলেন।

বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠান প্রচারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তার মূল্যায়নে বলেছিলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, গণতন্ত্র অর্থাৎ পশ্চিমী ধাঁচের যে গণতন্ত্র, যার উপর বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছিল, সেই অবস্থান থেকে তিনি ক্রমাগত সরে এসেছিলেন।

‘একদলীয় যে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তা নির্দ্বিধায় বলা যায় গণতন্ত্র পরবর্তী ব্যবস্থা। সারা দেশে যখন একটা চরম বিশৃঙ্খলা, সেই সময় অন্তত আমার কাছে মনে হয় যে, বঙ্গবন্ধু এমন একটা ভাবনায় পরিবেষ্টিত থাকতেন যে, গোটা পরিস্থিতিটি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের যে বাড়িটি থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যে বাড়ি থেকে পাকিন্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করেছিল ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চের রাতে, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ১৯৭৫-সালে ১৫ই অগাস্টের রাতে সেই বাড়িতেই সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে নিহত হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মূল্যায়নে: ‘বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তার যে উদ্ভব সেটির চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘অনুঘটক নেতৃত্বের’ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কাজেই তিনি ইতিহাসের সঙ্গেই লগ্ন হয়ে আছেন। বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে।’

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, ‘১৯৪৭ থেকে ৭১ এই সময়টুকুতে অনেক নেতাকে আমরা পেয়েছি। যাদের অবদান কম নয়। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে জনগণের মুখপাত্র হয়ে ওঠা, জনগণের ভাবনা, চেতনা, অভিলক্ষ্য, স্বপ্ন সবকিছুকে ধারণ করতে পেরেছিলেন একজনই-তিনি শেখ মুজিবুর রহমান।’

 বিবিসি বাংলার যেসব শ্রোতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির আসনে বসিয়েছিলেন, তাদের কয়েকজন বলেছিলেন কেন তারা শেখ মুজিবকে ভোট দিয়েছিলেন।

মণিকা রশিদ-নাগাসাকি, জাপান: ‘তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণ মন্ত্রের মত সমগ্র বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর একটি সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে খালি হাতে লড়াইয়ে নামতে এবং সেই লড়াইয়ে জিততে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আজ আমরা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসাবে যে যেখানেই বসে যা কিছু করছি বা বলছি, তার কোনটাই সম্ভব হতো না যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সময়টাতে না পেতাম।’

শহীদুল হক-ধানমন্ডি, ঢাকা: ‘একটা দেশের স্রষ্টা যিনি সমগ্র দেশের মানুষকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন। আজকে মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার একটা স্পৃহা আছে। আমরা যে স্বাধীন এই উপলব্ধিটা কিন্তু এসেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকেই।’

জিনাত হুদা- কভেন্ট্রি, ব্রিটেন: ‘বাঙালি জাতি যদি হয় একটি স্বপ্নের নাম, আকাঙ্খার নাম, সংগ্রামের নাম এবং সফলতার নাম, তবে তার রূপকার শেখ মুজিব।’

বাঙালির দিক নির্দেশনায় সাঁইজি

সংলাপ ॥ লালন সাঁই (১৭৭২-১৮৯০) বাঙালির ভাব ও জীবন সাধনার এক দিক নির্দেশক। তিনি কবি, চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং সর্বোপরি এক সমাজসচেতন মানবপন্থী। বাউলদের ধর্ম-সাধনায় গুরুত্ব পেয়েছে ‘সহজিয়া’ পন্থা বা ‘সহজপন্থা’। ‘সহজিয়া সাধনা’র মূল কথা হলো ‘উজান-সাধনা’। এই পন্থা বুদ্ধিবাদী পন্ডিত ও শাস্ত্রীয় ধার্মিকের সাধনার মতো নয়। এদের পথ বিপরীতমুখী, উজানের দিকে। সাধারণ ভোগীর ইন্দ্রিয়সুখ নির্ভর গড্ডল প্রবাহের জীবনধারা এঁদের নয়। এঁদের পথ ‘সহজ’ সত্য স্বরূপের পথ। রূপ থেকে অরূপে পৌঁছাবার সাধনা। “বাইরের সব রূপের ভিতরে আত্মগোপন করে আছে যে ‘প্রত্যাগাত্মন’ তাই অমৃত-স্বরূপ-সেই -অমৃত-স্বরূপের সন্ধান লাভ করতে হলে ইন্দ্রিয়গুলোকে ফিরিয়ে নিতে হবে স্থূল থেকে সূক্ষ্মে। অধ্যাত্মসাধন তাই সর্বদাই উজান বা উল্টাসাধনা-বাইরের দেশ থেকে অন্তরের দেশে ফিরে যাওয়া। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় সেই আত্মোপলব্ধির জন্য মন্দির, বিগ্রহ ও ব্রাহ্মণের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ এ তো নিজের সাথে কথোপকথন, নিজের চেতনার উন্নতি সাধন” (অতীশ দাশগুপ্ত)। এই সহজ সাধনাকে সহজবোধ্য করার জন্য মাঝির গুণ টেনে নৌকাকে সহজ-স্বরূপে নিয়ে যাওয়ার উদাহরণ দিয়েছেন সিদ্ধাচার্য। তিনি বলেছেন:

“নৌবাহী নৌকা টান অ গুণে।

মেলি মেলি সহজে জাউ না আনে ॥”

প্রাচীন বাংলার ধর্ম-সাধনায় বেদ-বিরোধী লোকায়ত ধারা গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছিল জৈন ও বৌদ্ধ দর্শনে দেবতার জায়গায় মানুষকে গুরুত্ব দেয়ার কারণে। বেদের ধারণাকে খারিজ করে ওই দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের চিন্তকেরা বললেন, মানবীয় বৃত্তিসমূহের সূক্ষ্ম ও বিশুদ্ধকরণই ধর্মের মূল কথা। এই চিন্তাধারায় সঙ্গে যোগ হলো সহজিয়াদের ‘কায়াসাধনা’। এই কায়াসাধনা প্রাগার্য যুগে নাথযোগী ও তান্ত্রিক সাধকদেরও আরাধ্য বিষয় ছিল। অথর্ববেদ কায়াসাধনাকে অনুমোদন করত। ফলে বৈদিক ব্রাহ্মণ সমাজে অথর্ববেদকে ‘ব্রাত্য’ বলে অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো। কিন্তু আর্যপূর্ব-বঙ্গদেশের সাধারণ মানুষের ধর্মচর্চার কেন্দ্রে লাভ করেছিল অথর্ববেদের এই ব্রাহ্মণ্যবাদ কথিত ব্রাত্য সঙ্গীতই। এই অথর্ববেদ-এর পঞ্চদশ খন্ডে বলা হয়েছিল: ‘ধার্মিক বলেই মানুষ শ্রদ্ধেয় নয়, মানুষ বলেই মানুষ শ্রদ্ধার পাত্র’। অথর্ববেদের দ্বাদশ খ-ের প্রথম সূক্তের ৬৩টি ঋকে স্বর্গের পরিবর্তে মর্ত্যরে পৃথিবীর মহিমাই ঘোষিত হয়। অষ্টম নবম শতাব্দীর বিশেষ করে পাল আমলের বাংলায় সহজিয়া দর্শনের সাংস্কৃতিক প্রকাশ গ্রাম-বাংলার তৃণমূল পর্যায় ও প্রান্তিক জনসাধরণকে আকৃষ্ট করে। ইতিহাসের ধারায় বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব সহজিয়া, নাথযোগীদের তান্ত্রিক সাধনা, ইসলামের সূফীবাদ ইত্যাদি সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক নব মানবপন্থী ধারা। বাংলার বাউল দর্শনে এইসব মানবপন্থী সহজ মানুষের তত্ত্ব কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। সহজিয়া দর্শনে প্রচলিত চিন্তন প্রক্রিয়ায় বিপরীত ধারাই প্রতিফলিত। তাই একে বৈদিক বা শাস্ত্রীয় ধর্মের বিরোধাত্মক ভাবাদর্শ হিসাবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। “বৌদ্ধতান্ত্রিক ও সহজিয়াদের মতে, সকল সত্য আমাদের ভিতরে-শুধু অন্তরে নয়, আমাদের দেহের ভিতরেও। যে সত্য বিরাজিত বিশ্বব্রহ্মান্ডের বিপুল প্রবাহের ভিতরে, সেই সত্যই বিরাজিত আমাদের দেহের ভিতরে-সমস্ত জৈবিক প্রবাহের ভিতরে। এই দেহের ভিতরেই রয়েছে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র, সকল পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, সংবৎসর, মাস-দিবস-তিথিক্ষণ। এই দেহেই সত্যের মন্দির, সকল তত্ত্বের বাহন” (শশিভূষণ দাশগুপ্ত)। তাই বলা হয়েছে: “যা আছে ভান্ডে আছে ব্রহ্মান্ডে।”

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এইসব ধর্ম ও তত্ত্ব সাধনার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় না থাকলে বাউলদের চিন্তা-চেতনা ও মানবপন্থী আদর্শের পরিচয় বোঝা সম্ভব নয়। আর বাউল-শ্রেষ্ঠ লালনের চিন্তাধারা উপলব্ধিও অসম্ভব।

বাউল শিরোমণি লালন সাঁই সাম্প্রতিক বাংলাদেশের এক অনন্য আইকনে পরিণত হয়েছেন। বহির্বিশ্বে তিনি এখন বাংলাদেশের মানবতাবাদী-জীবনবাদী ধারার বলিষ্ঠ প্রতিনিধি। দেশে এবং বিদেশে তাঁর এই অনন্য-সাধারণ ঔজ্জ্বলের কারণ কী? এর উত্তর বলা যায়, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গানের গভীরতম ভাব-মাধুর্য, বাণীর জীবন রহস্য উন্মোচনমূলক তাত্ত্বিকতা ও প্রথাবিরোধী বক্তব্য তাঁকে ভিন্নতর উচ্চতায় স্থাপন করেছে। এই ধারণা ঠিক নয় যে, আমাদের দেশের গ্রামীণ সাধারণ মানুষ  জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তত্ত্ব-কথা বোঝে না। যারা গ্রামীণ বিচার গান, কবিগান, ভাবগান বা কুরআন, পুরাণ-নির্ভর লোকজ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের জীবন ও জগৎ জিজ্ঞাসা ও রসতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেন তারা যে তত্ত্বকথায় একেবারেই অনুৎসাহী একথা বলা যাবে না। বাংলার মানুষ শত সহস্র বছর ধরে তাদের মতো করে স্থানিক নানা দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা ও ভাবুকতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে এবং এই সব বিষয়কে অবলম্বন করে তাদের জাগতিক, ভাবাদর্শগত ও বাস্তব জীবনযাত্রার পথ-পন্থা ও লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে। আর এই জীবন-অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সূত্রেই লালন সাঁইয়ের গান তাদের কাছে জ্ঞান-অর্জনী ও চিত্তরঞ্জনী উপাদান হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলার লোকজ সাধনা বংশ পরম্পরায় হস্তারিত হয়। লালনের গানে গূঢ় তত্ত্ব দীক্ষিত বাউলদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয়েছে। আর চিত্তরঞ্জনী ধারা বিবর্তিত হয়েছে খোদাবখশ সাঁই হয়ে মকছেদ আলী সাঁই এবং ফরিদা পারভীন এর পরম্পরায়। এঁরা লালনের গানকে গায়ন মাধুর্যে সারা দেশের ব্যাপক মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলেছেন। যে গান ছিলো এক সময় একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের ভাব সাধনার বিষয়, এখন তা জাতীয় সাঙ্গীতিক প্রকাশ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

বাউলদের গান এক সময়ে শুধু দীক্ষিত বাউল এবং তাদের সম্প্রদায়ের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় ঐতিহ্য বাহকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। শিক্ষিত বাঙালি এর মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য খুঁজে পায়নি। তবে ঐতিহ্য সচেতন ও স্বাদেশিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার তৃণমূল পর্যায়ের সাধক-ভাবুক ও রসস্রষ্টাদের সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতাকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে না দেখে এর সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন প্রধানত তার ফলেই আমরা লৌকিক বাংলার বিশাল এক রতœভা-ারের উত্তরাধিকার অর্জন করেছি। এই দূরদৃষ্টিপূর্ণ কাজে প্রধান ভূমিকা রবীন্দ্রনাথের। মাত্র বাইশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতীপত্রে’ (১৯২০) ‘বাউলের গান’ শীর্ষক রচনায় দেশীয় কাব্যের সৌন্দর্য প্রকাশের সূত্রে তথাকথিত ভদ্রেতর গীত ও কাব্যের প্রতি বাঙালির মনোযোগ আকর্ষণ করেন। রবীন্দ্রনাথ অল্প বয়সের গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে নব শিক্ষিত সমাজ ক্রমশ দেশের অন্তঃস্থল হতে দূরে সরে যাচ্ছেন। এই বিচ্ছিন্নতা যে বাঙালির আবহমানকালের মানবপন্থী সংস্কৃতি-সাধনার ধারাবাহিকতায় ছেদের সৃষ্টি করছে এটা উপলব্ধি করেই তিনি বাউল ও অন্যবিধ লৌকিক সাহিত্যধারা ও চিন্তন প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে যুক্ত করে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের এই সংযোগ ও সহৃদয় পৃষ্ঠপোষকাতা ছাড়া বাংলার এই গ্রামীণ সাহিত্যধারা ও ভাবুকতা নগরবাসী গুণীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত কিনা বলা মুশকিল। ড. দীনেশ সেন, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন প্রমুখ রবীন্দ্রনাথের আনুকূল্যেই তাঁদের সৌধপ্রতিমা গ্রন্থসমূহ প্রস্তুত করতে সক্ষম হন।

১৮৯০ থেকে জমিদারী দেখাশোনার সুবাদে শিলাইদহে অবস্থান রবীন্দ্রনাথকে গ্রামবাংলার গহীন ভেতরের সঙ্গে পরিচিত করে। ফলে তাঁর জীবন ও শিল্পবোধে মৌলিক পরিবর্তন আসে। গ্রাম বাংলার নিঃস্বরিক্ত মানুষ, তাদের যাপিত জীবন, পদ্মা-গড়াই-ইছামতি নদীর প্রভাব এবং শিলাইদহের বাউলদের গান ও ভাবসাধনা রবীন্দ্রনাথকে ভিন্নতর চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। তিনি লিখেছেন, “শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ ও আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই বাউলের সুর গ্রহণ করেছি।” স্মর্তব্য রবীন্দ্রনাথ রচিত আমাদের জাতীয় সঙ্গীতও বাউল সুরের গান।

যতদূর জানা যায়, শিলাইদহের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল গগন হরকরা, গোঁসাই গোপাল, সর্পক্ষেপী বোষ্টমী প্রমুখের দেখা ও আলোচনা হলেও লালন সাঁইজীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ হয়নি। তবে তিনি যে লালনের ভক্ত ও বিশেষ অনুরাগী ছিলেন তার অনেক প্রমাণ আছে। ১৩১০ (১৯৯৩) সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস ‘গোরা’। এই উপন্যাসের সূচনার কয়েক লাইন পরেই কবি লিখেছেন: আলখাল্লা-পরা একটা বাউল নিকটে দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া গান গাহিতে লাগিল:

“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়,

ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়।”

১৩২২ (১৯১৫) সালে রবীন্দ্রনাথ প্রবাসী পত্রিকার হারামনি বিভাগে লালনের কুড়িখানা গান প্রকাশ করে লালনকে সুধী সমাজে পরিচিত করান। রবীন্দ্রনাথের আগে কাঙাল হরিনাথ, উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সরলাদেবী চৌধুরানী, সুবোধ চন্দ্র মজুমদার প্রমুখ লালনের গান প্রকাশ করলেও রবীন্দ্র-প্রকাশনাই তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। ১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসের অধিবেশনে:দঞযব চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ড়ঁৎ ঢ়বড়ঢ়ষব’ শীর্ষক প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে তিনি লালনের কবি-প্রতিভা ও ছন্দ সৌন্দর্যেরও উদাহরণ তুলে ধরেন। লালনের কবিতা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন :

“আছে যার মনের মানুষ আপন মনে

সে কি আর জপে মালা।

নির্জনে সে বসে দেখছে খেলা। ।…”

এবং অন্য একটি অংশ উদ্ধৃত করে বলছেন :

এমন মানব জনম আর কি হবে।

যা কর মন ত্বরায় কর

এই ভবে। …

এই ছন্দের গতি একঘেঁয়ে নয়। ছোটো বড়ো নানা ভাগে বাঁকে বাঁকে চলেছে। সাধু প্রসাধনে মেজেঘষে এর শোভা বাড়ানো চলে, আশা করি এমন কথা বলবার সাহস হবে না কারো।” (‘ছন্দ’ গ্রন্থ)।

রবীন্দ্রনাথ লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানখানির দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেন এ বিষয়টি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা খুবই যথাযথ। তিনি বলেছেন, “বাউল গানের এই…পদটি কবিচিত্তে দীক্ষাবীজ বপন করিয়াছিল।” আসলে লালন সাঁইয়ের জীবন জিজ্ঞাসা রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের অনেক গানেই তার পরিচয় বিধৃত। লালনের গানে আছে :

‘আমার ঘরের চাবি পরের হাতে/কেমনে খুলয়া সে ধন দেখব চক্ষেতে।’ এই বাণীরই যেন প্রতিধ্বনি শুনি রবীন্দ্রনাথের এই বিখ্যাত গানে :

‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে

ও বন্ধু আমায়।

না পেয়ে তোমায় দেখা, একা একা দিন যে

আমার কাটে নারে।’

বাউল সাধনায় দেহই সবকিছুর মূল। বাউলদের সাধন-ভজনও তাই দেহ কেন্দ্রিক। এ বিষয়ে লালন গান   বেধেছেন :

আমার এই ঘরখানায় কে বিরাজ করে।

আমি জনম ভর একদিন দেখলাম না রে ॥

নড়ে চড়ে ঈশান কোণে

দেখতে পাইনে এই নয়নে

হাতের কাছে যার ভবের হাটবাজার

আমি ধরতে গেলে হাতে পাইনে তারে ॥

এই কথাই যেন কিছু ভিন্নভাবে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন তাঁর গানের হৃদয়ে ছুঁয়ে যাওয়া

‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে

তোমায় দেখতে আমি পাইনি।

বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয় পানে চাইনি।’

এরকম আরো উদারহণ দেয়া যায়। এ থেকে বোঝা যায় লালন সাঁইজির মাপটা কোন পর্যায়ের ছিলো।

লালন সাঁইয়ের ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে রবীন্দ্রনাথ লালনের দুখানা গানের খাতা সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে খাতা শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে। লালন (খাতায় লেখা আছে ‘নালন’) লোক কবিদের মতই গান বাঁধতেন আর তা লিখে রাখতেন লালন-শিষ্য মনিরুদ্দীন সাঁই ও অন্যান্যরা। রবীন্দ্রনাথ সংগৃহীত খাতাটি ভোলাই শাহ ফকিরের বলে জানা যায়। এই দুখানা খাতায় ২৯৮টি গান আছে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ও মতিলাল দাশ সম্পাদিত লালন গীতিকায় ৩৭১টি গান আছে। শক্তিনাথ ঝা তাঁর ‘ফকির লালন সাঁই’ বইয়ে দিয়েছেন ৩৭৫টি গানের পাঠ। সম্প্রতি ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়ার আনোয়ার হোসেন মন্টুশাহ তাঁর তিন খ-ের সংকলনে ৮০০ গানের পাঠ দিয়েছেন। এইসব সংগ্রহের মধ্যে পরস্পর প্রবিষ্ট গান আছে। মন্টু শাহর সংকলনে অন্য সাধকের গানও থাকতে পারে। তবে লালনের গানের সংখ্যা কতো তা এখনো নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। হয়তো পাঁচ শতাধিক হতে পারে। আমরা বলেছি লালন মানবপন্থী মহান সাধক। এই পন্থা বাংলাদেশের মৌলিক সাধন ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “বাংলাদেশ চিরদিনই সাম্প্রদায়িক সংস্কার মুক্ত। বৌদ্ধ-জৈন প্রভৃতি মত এদেশ বা তার আশেপাশে চিরদিনই প্রবল ছিল।

তখন মগধ বাংলার সঙ্গেই ছিল একঘরে অর্থাৎ স্বাধীন হয়ে। বাংলার বৈষ্ণব ও বাউলদের মধ্যে দেখা যায় সেই স্বাধীনতা। তাদের সাহিত্য ও গানে অলঙ্কার বা শাস্ত্রের গুরুভার তারা কখনও সইতে পারেনি। শাস্ত্রের বিপুল ভার নেই অথচ কি গভীর কি উদার তার ব্যঞ্জনা। এদেশে কীর্তন-বাউল-ভাটিয়ালী প্রভৃতি গানে কোথাও তার তল মেলে না, কূল মেলে না। (ক্ষিতিমোহন সেনের : বাংলার সাধনায় উদ্ধৃত)। বাউলেরা স্বর্গের সুখ বোঝে না। বোঝান মুক্তির পরমানন্দ। …

বাউলেরা মানুষই জানেন। তাহাদের মতে স্বর্গের অমৃতের চেয়ে পৃথিবীর এই প্রেমরস মহত্তর। … শাস্ত্রের চেয়ে বাউলদের নিঃশব্দ মরম-কথা মহত্তর। প্রাণহীন শাস্ত্র অপেক্ষা মানবীয় প্রেম অনেক বেশি সত্য। … তাই প্রেমামৃতপ্রার্থী দেবতারাও পৃথিবীতে জন্মিয়া মানুষ হইতে চাহেন (বাংলার বাউল:ক্ষিতিমোহন সেন)। বাউল সাধনার এক মূল কথা হলো : ‘উপাস্য ভগবান এবং গুরু যখন আমাদের অন্তরের মধ্যে, তখন নিজের প্রতি আস্থা থাকা চাই। যে ভগবান আমার অন্তরে নাই তাহাকে দিয়া আমাদের কি হইবে? যিনি বাইরের জগতের ঈশ্বর তাহাকে তো কখনো জানিই নাই, তাহাকে চিনিই না। তিনি আমার প্রেমের বস্তু হইবেন কেমন করিয়া? তাহাকে দিয়া আমাদের কি লাভ  হইবে’ (পূর্বোক্ত)?

লালন সাঁইজির গানের মর্মবস্তু বুঝতে হলে বাংলার নানা তন্ত্রমন্ত্র নির্ভর জীবনদর্শন এবং ক্ষিতিমোহন সেনের শাস্ত্রীয় উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির কথা মনে রাখতে হবে। লালন তাঁর কবিতায় বলেন, ‘সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।’ অথবা ‘কলি যুগে মানুষ অবতার।’ বা ‘অন্তরূপে সৃষ্টি করলেন সাঁই। শুনি মানবের তুল্য কিছুই নাই। দেব-দেবতাগণ করে আরাধন। জন্ম নিতে মানবে।’ এছাড়াও সামাজিক ভেদ বিভেদ জাতপাত বৈষম্যের বিষয় নিয়ে বাঁধা তাঁর গানগুলো অসাম্প্রদায়িক গণ চেতনার দীপ্রতায় উজ্জ্বল :‘জাত না গেলে পাইনে হরি। কি ছার জাতের গৌরব করি। ছুঁসনে বলিয়ে। লালন কয় জাত হাতে পেলে। পুড়াতাম আগুন দিয়ে।’ অথবা ফকিরি করবি ক্ষ্যাপা কোন রাগে। আছে হিন্দু মুসলমান দুই ভাগে। থাকে ভেস্তের আশায় মমিন গণ। হিন্দুরা দেয় স্বর্গেতে মন। ভেস্ত স্বর্গ ফাটক সমান/কার বা তা ভাল লাগে। অথবা, সবলোকে কয় লালন ফকির হিন্দু কি যবন। লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান। উদ্ধৃত অংশের শেষাংশে বাংলার চিরায়ত লৌকিক মানবিক সাধনার সঙ্গে সমকালীন সামাজিক সমস্যা-সংকট-দ্বন্দ্বের কিছু প্রভাব যে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

তবে লালন সাঁই বা বাউলদের ভাব আন্দোলনে বঙ্গীয় রেঁনেসাসের নায়ক রামমোহন বিদ্যাসাগরের আন্দোলনে (লালন ও রামমোহনের জন্ম প্রায় একই সময়ে) প্রবল প্রভাব পড়েছিল এমন মনে হয় না। বাউল বা লালনের সাধনা বাংলায় লোকায়ত ভাবসাধনারই সমকালীন স্পর্শযুক্ত নবরূপান্তর মাত্র। তাই লালন ও রামমোহনের তুলনা যথাযথ ভাবা যায় না। একটির উৎস বাংলার মৃত্তিকায়, অন্যটি পাশ্চাত্যের প্রভাবজাত।

এ দুয়ের মধ্যে মৌলিক প্রভেদ আছে। দুটি ধারা ভিন্ন পথে এসে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। রামমোহনের আধুনিকার উৎস পাশ্চাত্যের রেঁনেসাসের মূলকথা আর লালনের, “মানুষ রতন” তত্ত্ব এসেছে নাথ যোগী বাউল বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্বের ভেতর থেকে। রামমোহন তাই ঊনিশ শতকের নবজাগ্রত নগরবাসী বাঙালির নব-ভাব আন্দোলনের ঋত্বিক, আর লালন বিশাল বাংলার শাস্ত্রীয় ধর্ম-নিরপেক্ষ নির্ভর মানবীয় ধারায় মহান সাধক। বাংলাদেশের বাউল-শ্রেষ্ঠ লালন সাঁইয়ের কবিতা-গান ও মানববাদী সাধনা সম্পর্কে বহির্বিশ্বে এখন বিপুল আগ্রহ ও কৌতূহল। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা অগ্রচারীর। তাঁর প্রচেষ্টাতেই লালন সাঁইয়ের কবিতা ও দর্শন বহির্বিশ্বে প্রথম প্রচার পায়। এর পর দেশী-বিদেশী ভাবুক-অনুরাগী-পন্ডিতের প্রয়াসে লালন এখন এক নন্দিত বিশ্ব-মানব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারোল সলোমনই এ দেশে বারবার এসে ফিল্ডওয়ার্ক ভিত্তিক গবেষণায় লালনের কাব্য সৌন্দর্য ও গভীর মানবীয় ভাবনার সারৎসারকে গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় উন্মোচন করেছেন। মার্কিন দেশের আর এক বাংলা সাহিত্য অনুরাগী এডওয়ার্ড ডিমকের লালন চর্চাও প্রশংসনীয়। জার্মান সংগীত বিশেষজ্ঞ উনিয়স, জাপানী গবেষক মাসয়ুকি অনিশ, ফরাসী প্রবাসী (বর্তমানে প্রয়াত) দেবেন ভট্টাচার্য ও সুদীপ চট্টোপাধ্যায় এবং চার্লস চ্যাপয়ে প্রমুখের লালন চর্চা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।

তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়বে মিশর-আমিরাতের নৌ কমান্ডো ইউনিট

সংলাপ ॥ লিবিয়ার উপকূলে তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি যৌথ নৌ-কমান্ডো ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছে। এই নৌ কমান্ডো ইউনিট লিবিয়ার উপকূলে তুর্কি স্বার্থে আঘাত হানবে বলে লক্ষ্য ঠিক করেছে।

মিশর এবং লিবিয়ার কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে গত সপ্তাহের সোমবার লন্ডনভিত্তিক আরবি দৈনিক আল-আরাবি আল-জাদিদ বলেছে, যেসব পথে তুরস্ক লিবিয়ায় সামরিক সহযোগিতা পাঠায় সেগুলোকে বাধা দেয়া হবে এই সামরিক স্কোয়াডের মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লিবিয়ার সরকারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক কাজ করছে তুর্কি সরকার। লিবিয়ার এ সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ফায়াজ আল-সেরাজ।  কয়েকটি সূত্র বলেছে, মিশরের নৌবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নিয়ে এরইমধ্যে ৫০ জন যোদ্ধা লিবিয়ার পূর্ব উপকূলের একটি নৌ ঘাঁটিতে ফিরেছে। ঘাঁটিটি তুরস্কের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, তুরস্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত উন্নতমানের সামুদ্রিক বোট সরবরাহ করবে। এসব বোট লিবিয়ার বিদ্রোহী নেতা জেনারেল খলিফা হাফতারের যোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তরের আগে মিশরের সামরিক বিশেষজ্ঞরা সার্বিক পরিস্থিতি তত্ত্বাবধান করবেন।

রাজধানী ত্রিপোলি দখল করার জন্য গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে ফায়াজ আল-সেরাজ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন খলিফা হাফতার। সেখানে তুরস্ক সরকার ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারকে সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে, খলিফা হাফতারকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব, মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

খলিফা হাফতারের যোদ্ধাদের কাছে রয়েছে প্রিসিশন গাইডেড সেভেন অ্যারো মিসাইল। এ ক্ষেপণাস্ত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত সরবরাহ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মাসে লিবিয়ার বিদ্রোহীরা দাবি করেছিল, তারা তুরস্কের একটি কার্গো জাহাজ ধ্বংস করেছে যা গোলাবারুদ ও অস্ত্র নিয়ে ত্রিপোলি বন্দরে দিকে যাচ্ছিল।

৫ বছরে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কিনেছে সৌদি আরব!

সংলাপ ॥ গত পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরব বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করছে। এসব অস্ত্রের বেশিরভাগই আমেরিকা থেকে আমদানি করেছে রিয়াদ।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপ্রি এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরব অস্ত্র আমদানির পরিমাণ শতকরা ১৩০ ভাগ বাড়িয়েছে।

সিপ্রি’র রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিশ্বে যত অস্ত্র বিক্রি হয়েছে তার শতকরা ১২ ভাগ একা সৌদি আরব কিনেছে।

২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে সৌদি আরব যার শিকার হাজার হাজার নারী, শিশু ও অসহায় বেসামরিক মানুষ স্টকহোমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি আরো জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অস্ত্র আমদানির পরিমাণ শতকরা ৬১ ভাগ বাড়িয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে সারা বিশ্বের মোট অস্ত্রের শতকরা ৩৫ ভাগ কিনেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ইয়েমেনে আগ্রাসন চালানো সত্ত্বেও আমেরিকা এবং ব্রিটেনের মতো প্রধান অস্ত্র রফতানিকারক দেশগুলো সৌদি আরবে অস্ত্র রফতানি অব্যাহত রেখেছে। এতে আরো বলা হয়েছে, সৌদি আরব শতকরা ৭৩ ভাগ অস্ত্র আমেরিকা থেকে এবং শতকরা ১৩ ভাগ ব্রিটেন থেকে আমদানি করেছে।

দিল্লির হিংসায় মোদি-অমিতের ইস্তফা চেয়ে লোকসভায় তোলপাড়

সংলাপ ॥ দিল্লির রক্তক্ষয়ী হিংসা নিয়ে আজ উত্তাল হল সংসদ। দফায় দফায় মূলতুবি হল লোকসভা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জবাব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ইস্তফার দাবিতে কংগ্রেসের স্লোগান, বিশাল ব্যানার হাতে ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ ঘিরে ঘটে গেল তুলকালাম কান্ড। স্পিকারের চেয়ারের সামনে লোকসভার কার্যবিবরণীর কাগজ উড়িয়ে দেওয়া হল টুকরো টুকরো করে। স্লোগান উঠল মোদি জবাব দো, অমিত শাহ ইস্তফা দো। কংগ্রেস আর বিজেপি এমপিদের মধ্যে বেঁধে গেল বিতর্ক। এমন কি তা হাতাহাতির পর্যায়েও পৌঁছল। সভায় প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দু’জনের কেউই উপস্থিত ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভ দেখাতে দেখাতে ট্রেজারি বেঞ্চের দিকে কংগ্রেস এমপিরা এগিয়ে যেতেই বাধা দিতে ছুটে এলেন বিজেপি এমপি রমেশ বিধুরি। বাধা পেয়ে প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন কংগ্রেসের হিবি ইডেন। শুরু হয়ে গেল ধাক্কাধাক্কি।

বিধুরিকে ঘিরে ফেললেন কংগ্রেসের বাকি এমপিরা। উত্তপ্ত হল পরিস্থিতি। সোনিয়া গান্ধীর নির্দেশ মতো অবস্থা সামাল দিতে ছুটে গেলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। ওদিক থেকে দৌড়ে এলেন স্মৃতি ইরানি, রবিশঙ্কর প্রসাদও। বিজেপির রাজস্থানের প্রবীণা এমপি জসকউর মীনার বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তুলে স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিলেন কংগ্রেসের দলিত এমপি রামিয়া হরিদাস।

পাল্টা চিঠি দিলেন বিজেপির মহিলা এমপিরাও। দিল্লির হিংসার ইস্যুতে সরব হল তৃণমূলও। যোগ দিল এসপি, বিএসপি, এনসিপি, ডিএমকে, এনসি, আপ, আরএসপির এমপিরাও। অমিত শাহকে ‘রাবণ’ আখ্যা দিয়ে সরব হলেন তৃণমূলের লোকসভার মুখ্যসচেতক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। স্লোগান উঠল, গুন্ডাবাজ, দাঙ্গাবাজ, অমিত শাহ মুর্দাবাদ। সম্মিলিত বিরোধী এমপিদের স্লোগান, পোস্টার, ব্যানার প্রদর্শন, হল্লায় উত্তাল হল লোকসভা।

গোড়ায় চুপ থাকলেও পাল্টা নামল বিজেপিও। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীকে লক্ষ্য করে বিজেপির এমপি দিলীপ ঘোষ স্লোগান তুললেন, মহাত্মা গান্ধী অমর রহে। নকলি গান্ধী জেল মে রহে। আক্রমণ চড়ালেন সংসদ বিষয়কমন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশিও। বললেন, যারা ৮৪’র দাঙ্গা করেছে, মানুষ মেরেছে, আজ তারা সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইস্তফা চাইছে? লজ্জা হওয়া উচিত। এদিকে, প্রবল হট্টগোলের মধ্যেই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ‘দ্য ডায়রেক্ট ট্যাক্স বিবাদ সে বিশ্বাস তক’ বিলের আলোচনা শুরু করে দিলেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে কংগ্রেস এবং তৃণমূল উভয়কেই কটাক্ষ করলেন বিজেপির বক্তা সঞ্জয় জয়সওয়াল। এতে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল বিরোধীরা।

এভাবেই শুরু হল সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় ভাগ। আর প্রথমদিনেই দিল্লির সাম্প্রতিক হিংসার ঘটনায় সরকারকে চেপে ধরল বিরোধীরা। সকালে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে পৃথকভাবে ধর্না কর্মসূচি করল তৃণমূল, কংগ্রেস। নাটকীয়ভাবে চোখে কালো কাপড় বেঁধে, মুখে আঙুল দিয়ে উত্তর-পূর্ব দিল্লির হামলার ইস্যুতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন টিএমসি। তাদের কর্মসূচি শেষ হতেই এল কংগ্রেস। বেলা দুটোর সময় লোকসভার অধিবেশন বসতেই ওয়েলে নেমে অমিত শাহর ইস্তফার দাবিতে সরব হল কংগ্রেস। যোগ দিল তৃণমূল সহ বিরোধীরা। হল্লার মধ্যেই সভা চালানোর চেষ্টা করলেন স্পিকার। কিন্তু কংগ্রেস এমপিরা সরকারি বেঞ্চের দিকে ব্যানার হাতে ছুটে গিয়ে ঘিরে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতেই বেঁধে গেল গোলমাল। বার বার মুলতবি করেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হল না। শেষমেশ সারাদিনের জন্য লোকসভা মুলতবি হয়ে গেল।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ইরানী সেনাবাহিনীর নয়া পদ্ধতির উদ্ভাবন

সংলাপ ॥ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সেনাবাহিনীর পদাতিক ইউনিটের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিয়োমার্স হেইদারি বলেছেন, তারা করোনাভাইরাস মোকাবেলায় অনেক দূর অগ্রসর হতে পেরেছেন। এই ভাইরাস মোকাবেলায় নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের কথা জানিয়েছেন তিনি।

তেহরানে সেনাবাহিনীর করোনা মোকাবেলা বিষয়ক সদর দপ্তর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সময় তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।

কিয়োমার্স হেইদারি বলেন, বিশাল এলাকাকে জীবাণুমুক্ত করতে সেনাবাহিনী যে পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে তা ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এর ফলে জীবাণুমুক্ত করার উপাদানকে কুয়াশায় পরিণত করে একসঙ্গে বিশাল অঞ্চলকে জীবাণুমুক্ত করা যাবে। এই ব্যবস্থার উপকরণ সারাদেশে বিলি করার কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, অনলাইন-ভিত্তিক আরও কিছু যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে যেগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্তের অনলাইন ভিত্তিক পদ্ধতি অন্যতম।

কিয়োমার্স হেইদারি জানান, এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। তারা এক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করছেন বলে জানান এই কমান্ডার।

দামেস্ক সফরে লিবিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী – সিরিয়া-লিবিয়া সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বারোপ

সংলাপ ॥ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বলেছেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপতৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশের জন্য হুমকি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু দেশ তাদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে সন্ত্রাসীদেরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজধানী দামেস্কে সিরিয়া সফররত লিবিয়ার উপ প্রধানমন্ত্রী আব্দুর রহমান আল-আহিরেশের সঙ্গে এক বৈঠকে এ মন্তব্য করেন। বাশার আসাদ বলেন, সিরিয়া ও লিবিয়া সন্ত্রাসবিরোধী যে যুদ্ধ করছে তা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ভাগ্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। এ সময় বাশার আল-আসাদ ও আল-আহিরেশ দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করা বিশেষ করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক মিশন পুনরায় চালু করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

তাদের সাক্ষাতে দু’দেশের অভিন্ন শত্রু মোকাবিলায় পরস্পরকে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বিশেষ করে তুরস্ক দু’টি দেশেরই সীমান্ত লঙ্ঘন করে সিরিয়া ও লিবিয়ায় যে সেনা মোতায়েন করেছে তার বিরোধিতা করেন দুই মন্ত্রী।

সিরিয়ার সেনাবাহিনী গত প্রায় দুই মাস ধরে সেদেশের ইদলিব প্রদেশ থেকে সন্ত্রাসীদের উৎখাতের লক্ষ্যে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু অভিযানের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে তুরস্ক।  ইদলিবে মোতায়েন তুর্কি সেনারা গত কয়েকদিনে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে।