শেষ পাতা

সর্বপ্রথম পরমাণু চুল্লি তৈরিতে আমিরাতের সম্মতি প্রদান

সংলাপ ॥ আরব বিশ্বের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতই সর্বপ্রথম পরমাণু চুল্লি তৈরি করার জন্য কোনো বিদেশী বিশেষজ্ঞদেরকে সম্মতি দিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির পশ্চিমে পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত বারাকাহ পরমাণু স্থাপনায় এই চুল্লি নির্মাণ করা হবে। তবে নানা কারণে এবং নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে চুল্লি নির্মাণের কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। দেশটির জাতীয় পরমাণু নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন চুল্লি নির্মাণের ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-তে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি হামাদ আল-কাবি গত সপ্তাহের সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, দেশটি চারটি পরমাণু চুল্লি নির্মাণ করবে তবে প্রাথমিকভাবে একটির নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা জানুয়ারি মাসে জানিয়েছিলেন, ওই পরমাণু স্থাপনা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চালু হবে তবে হামাদ আল-কাবি গতকাল পরমাণু স্থাপনা চালুর ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট সময় সূচি উল্লেখ করেন নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ পরমাণু স্থাপনা নির্মাণ করছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জ্বালানি কর্পোরেশন। পরমাণু স্থাপনাটি নির্মাণে ২,৪৪০ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বলছে, চারটি পরমাণু চুল্লি চালু হলে ৫,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে যা দেশটির জাতীয় চাহিদার শতকরা ২৫ ভাগ।

বিমান থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় সফল পাকিস্তান

সংলাপ ॥ পাকিস্তান গত মঙ্গলবার সফলভাবে বিমান থেকে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রা’দ নামে এ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা সফল হওয়ায় পাকিস্তান কৌশলগত যুদ্ধের ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হবে। আইএসপিআর জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ৬০০ কিলোমিটার। আইএসপিআর’র বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে-এ ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে পাকিস্তানি বিমান বাহিনী সমুদ্র এবং স্থলে হামলা চালাতে পারবে। ক্ষেপণাস্ত্রটিতে অত্যন্ত উন্নতমানের গাইডেন্স এবং নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে যার ফলে এ ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে খুবই নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে পারবে। পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের মহাপরিচালক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষাকে তার দেশের যুদ্ধক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান ক্ষেপণাস্ত্রটির সফল পরীক্ষার প্রশংসা করেছেন।

বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিল সিরিয় বাহিনী

সংলাপ ॥ নজিরবিহীন সফলতার মধ্য দিয়ে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আলেপ্পো প্রদেশের বেশিরভাগ শহর ও গ্রাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে। ইদলিব ও আলেপ্পোর প্রদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যখন তুরস্ক এবং রাশিয়া আলোচনায় বসতে যাচ্ছে তার আগ মুহূর্তে সিরিয় বাহিনী এসব এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিল।

ইরানের ইংরেজি ভাষার টেলিভিশন প্রেস টিভি জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণে আনা পুরো এলাকায় সিরিয়ার সরকারি বাহিনী সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সিরিয়ার সেনারা এসব এলাকা মুক্ত করার আগে সেখানে রাশিয়ার বিমানবাহিনী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ওপরে ব্যাপকভাবে হামলা চালায়। গত সপ্তাহের সোমবার রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়া ও সিরিয়ার সেনাদের যৌথ প্রচেষ্টায় তুর্কি সীমান্তবর্তী আনাদান এবং হারিতান শহর দুটি মুক্ত হয়েছে। ব্রিটেনভিত্তিক কথিত মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, ওই এলাকায় সিরিয়ার সরকারি সেনারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে, ২০১২ সালের পর এই প্রথমবারের মতো সরকারি বাহিনী আলেপ্পো প্রদেশের রাজধানীর আশপাশের সমস্ত এলাকায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এসব এলাকা থেকে হায়াতে তাহরির আশ-শাম ও আল কায়েদা সন্ত্রাসীরা পালাতে বাধ্য হয়েছে। সানা বলছে, আলেপ্পো শহরের পশ্চিমে মোট ২৩টি গ্রাম মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে সিরিয়ার সেনারা। এসব গ্রাম থেকেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আল্লাপ্পোর ওপর গোলা বর্ষণ করে আসছিল। আলেপ্পো হচ্ছে সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর।

ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি প্রত্যাখ্যান

সংলাপ ॥ ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করার ব্যাপারে দেশটির জাতীয় সংসদ যে প্রস্তাব পাস করেছে তা মেনে নিতে অস্বীকার করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তারা ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে যে, ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর একটি অংশ প্রত্যাহার করতে তারা রাজি।

অনলাইন ওয়েবসাইট মিডল ইস্ট আই গত সপ্তাহের রোববার এ খবর দিয়েছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী সব সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

গত সপ্তাহে জর্দানের রাজধানী আম্মানে কানাডার রাষ্ট্রদূতের বাসায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দুপক্ষের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকের সাথে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডল ইস্টকে এ তথ্য জানিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন প্রতিনিধি ইরাকি পক্ষকে বলেছেন, ইরাকের শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলো ছাড়তে প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন সেনারা। এ ধরনের একটি ঘাঁটি হচ্ছে আল-বালাদ ঘাঁটি যা রাজধানী বাগদাদ থেকে ৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। তবে ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করার কথা একেবারেই নাকচ করে দিয়েছে মার্কিন পক্ষ। তারা বলেছে, আইন আল-আসাদ ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নই ওঠে না। আইন আল-আসাদ হচ্ছে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘাঁটি যেটি পশ্চিমাঞ্চলীয় আনবার প্রদেশে অবস্থিত। সম্প্রতি ওই ঘাঁটিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ব্যাপক হামলা চালায়।

সুদানের আকাশ ব্যবহার করল ইসরাইল!

সংলাপ ॥ ইহুদিবাদী ইসরাইল সুদানের আকাশ ব্যবহার শুরু করেছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, তাদের বাণিজ্যিক বিমান এই প্রথম সুদানের আকাশসীমা ব্যবহার করেছে। নেতানিয়াহু আরও বলেছেন, চলতি মাসে সুদানের অন্তবর্তী সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ আল বুরহানের সঙ্গে তার বৈঠকের ফলেই দেশটির আকাশ দিয়ে ইসরাইলি বিমান ওড়ানো সম্ভব হয়েছে।

দখলদার ইসরাইল খুব দ্রুত সুদানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে বলে তিনি জানান। সম্প্রতি উগান্ডায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন সুদানের অন্তবর্তী সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ আল-বুরহান।

ইসরাইলের সঙ্গে আপোষের বিরুদ্ধে সুদানে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতিবাদে সুদানজুড়ে কয়েক দিন ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছে। হাজার হাজার সুদানি বিক্ষোভকারী রাজধানী খার্তুমের রাজপথে ইসরাইল-বিরোধী শ্লোগান দেন।

বিক্ষোভকারীরা ‘আত্মসমর্পন করব না’,‘দেশ বিক্রি করব না’,‘ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক মেনে নেব না’ ইত্যাদি বলে শ্লোগান দেন।

উগান্ডায় অত্যন্ত রাখঢাক করে সুদানের সামরিক শাসক ও দখলদার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর  মধ্যে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হলেও তা শেষ পর্যন্ত গোপন থাকে নি। এ সাক্ষাতের খবর দেশে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সুদানের হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নেমে আসেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে একদল আইনজীবী প্রেসিডেন্ট বুরহানের বিরুদ্ধে সুদানের আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।

সুদানের পিপলস কংগ্রসে পার্টি বলেছে, এই সাক্ষাতের ফলে ফিলিস্তিনি জাতির ন্যায়সঙ্গত অধিকারের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থনকারী দেশ হিসেবে সুদানের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে। এ কারণে আল-বুরহানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে দলটি অন্তরবর্তী সামরিক সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

ইসরাইল আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেল আবিব সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, আফ্রিকা মহাদেশে ইসরাইলি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি করতে ৭০ কোটি ডলার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। তেলসহ অন্যান্য খনিজ দ্রব্য বিশেষ করে হীরকের খনি থাকার কারণে আফ্রিকার দেশগুলোর প্রতি ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষভাবে দর্শন করার মাধ্যমেই ঘটে আত্মদর্শন

বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে –


শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥ যে আল্লাহকে খোঁজে তার ভেতরেই তিনি থাকেন লুকিয়ে। অথচ উদভ্রান্ত মানুষ তাঁকেই খোঁজে বেড়ায় আকাশে-পাতালে, বনে-জঙ্গলে কিংবা পাহাড়ের গুহায়। যে খোঁজে সে, যা খোঁজে তা থেকে পৃথক নয়। আত্মদর্শনের মাঝেই আল্লাহ দর্শন। আত্মজ্ঞানই পরমাত্মজ্ঞান। মানুষ নিজেকে চিনতে পারলেই চিনতে পারে তার আল্লাহকে। মানুষ এবং আল্লাহর মধ্যে একমাত্র পর্দা মানুষ নিজেই। ‘আমি কে?’ নিজের মধ্যে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে আমি বলে কিছু নেই। মানুষ নিজেকে যা ভাবে তা সে নয়। নিজেকে যা ভাবতে পারে না সে ঠিক তাই। এক অসীম শূণ্যতা। এক অভাবনীয়, অসীম শূণ্যতাই পারমার্থিক সত্তা। এ অসীম শূণ্যতা বোধ থেকেই আসে পূর্ণতা।

কিভাবে হবে আত্মদর্শন? আমরা কি জানি নিজেকে? কতটুকু জানি? আমরা কি জানি আমাদের জীবনের লক্ষ্য? কোন্ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যাপন করছি এ জীবন? কি পেলে আমরা শান্ত হবো, নিজেকে সার্থক ও সফল ভাবতে পারবো, তা কি আমরা জানি? আমরা কি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে জীবন যাপন করি, না-কি সাময়িক খেয়াল আমাদেরকে লক্ষ্যচ্যূত করে? আমি কে? আমি যেমন আছি, তেমন হলাম কেন? আমি কি চাই? আমি যা চাই তা কিভাবে পেতে পারি? আত্মদর্শন না থাকলে এসব প্রশ্নের উত্তর জানা যায় না। আর এসব প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে জীবন শুধু অর্থহীন কালক্ষেপন। মানুষ জীবনে কি চায় তা না জানলে জীবন নিরর্থক ব্যস্ততায় পূর্ণ হয়। জীবনের কোন অর্থ নিয়ে মানুষ মানব-জীবন লাভ করে না। প্রত্যেককে নিজের জীবনের অর্থ সৃষ্টি করতে হয়। যে যতটুকু অর্থ সৃষ্টি করতে পারে সে ততটুকুই সার্থক। মানুষের সৃষ্টি শেষ হয় নাই। পরিপূর্ণ সৃষ্ট জীব হিসেবে মানুষের জন্ম হয় না। মানুষ পৃথিবীতে আসে নিজেকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা নিয়ে। কে, কিভাবে নিজেকে সৃষ্টি করবে এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। যে যেভাবেই নিজেকে সৃষ্টি করুক না কেন, এজন্য প্রথম পদক্ষেপ – আত্মদর্শন। আত্মদর্শন থাকলে নিজের প্রতিটি কর্মের ব্যাখ্যা তার কাছে থাকবে। মানুষ জানবে – কেন, কি উদ্দেশে, সে কোন্ কাজটি করছে।

অন্যদিকে – আমি কোথায় আছি, কেমন আছি, তা না জেনে কোথায় যাব, কেমন থাকব তা ঠিক করা যায় না। যে কোন যাত্রা পথের শুরু এবং গন্তব্য থাকতেই হবে। নিরুদ্দেশের মধ্যেও উদ্দেশ্য আছে। নিঃ+উদ্দেশ্য=নিরুদ্দিষ্ট বা নিরুদ্দেশ। উদ্দেশ্য ব্যতীত নিরুদ্দেশ হয় না।

মানুষ নিজেকে বদলাতে চায়। কিন্তু নিজেকে না জানা পর্যন্ত নিজেকে বদলানো যায় না। নিজেকে জানতে থাকলে জানার প্রক্রিয়ায় নিজ বদলে যায়। কি চাই, কেন চাই, তা না জানলে কিছুই পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও এর মূল্য দেয়া যায় না। অথচ অধিকাংশ মানুষ জানে না সে কি চায়। কারণ, আত্মদর্শন নেই। মানুষ সাধারণত আত্মদর্শন করে না, নিজেকে দর্শন করে না। মানুষ দর্শন করে বাহিরের অযুত দৃশ্য। সিনেমা, টিভি, ক্রেকেট খেলা, আড্ডা ও নানারকম বিনোদনের উছিলায় পালিয়ে বেড়ায় আত্মদর্শন থেকে।

আত্মদর্শন হচ্ছে – আত্ম বা নিজের আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি, বোধ, আচরণ, ব্যক্তিত্ব, কল্পনা, স্মৃতি, নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতা, সর্বোপরি নিজেকে দর্শন। আত্মদর্শন হচ্ছে – নিজের দোষগুণ পরীক্ষা, নিজ আত্মার স্বরূপ উন্মোচন। তাই আত্মদর্শন বাস্তব, এটা অন্ধকার ঘরে কালো বেড়াল খোঁজার দর্শন নয়!এ মুহুর্ত থেকে, যে কোন ব্যক্তি, নিজেকে দর্শন করা শুরু করতে পারে এবং যে যতটুকু দর্শন করতে পারবে তার আত্মদর্শনও হবে ততটুকুই।

আত্মদর্শন নিজেকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ।আত্মদর্শনের শুরুতে একটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন যে, আত্মদর্শনের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করা যাবে,নিজেকে উন্নীত করা যাবে, নিজের প্রতি এ বিশ্বাস না থাকলে আত্মদর্শন হয় না।

আত্মদর্শনের প্রথম ধাপেই আসবে আত্মসচেতনতা। মানুষ ততটুকুই নিজের জীবনযাপন করে যতটুকু সে আত্মসচেতন। মানুষের আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি থাকে তার চেতনায়। তাই সচেতন না হলে, শরীরের কোষগুলো আত্মরক্ষার প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কোন তথ্য গ্রহণ করে না। অচেতন কোন কর্মের জন্য যেমন নিজেকে দায়ী করা যায় না, তেমনি অচেতন কর্মের মাধ্যমে যে সাময়িক সফলতা আসে তাও নিজের নয়। আত্মসচেতনতাই বর্তমান। আমি আত্মসচেতন অর্থাৎ আমি বর্তমানে আছি। কিন্তু সাধারণত মানুষ বর্তমানে থাকতে পারে না। যখন যেখানে তখন সেখানে থাকতে পারে না। চিন্তাকে পড়তে শুরু করলেই দেখা যায়, চিন্তা অতীত বা ভবিষ্যতে বিচরণ করছে।

তথাকথিত ধর্ম অতীত এবং ভবিষ্যৎ নির্ভর। কখন কে, কি বলে গেছেন, মৃত্যুর পর কি হবে – ইত্যাদি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় মিথ্যাচার চলে ধর্মানুষ্ঠানে। ধর্মের আলোচ্যসূচী সীমাবদ্ধ হয়েছে মরনের আগে ও পরের বিষয়গুলোতে। তাই জীবন চলার বন্ধুর পথ থেকে তা দূরবর্তী হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ধর্ম অতীতেও নেই ভবিষ্যতেও নেই। ধর্ম আছে বর্তমানে। বর্ত+মান = বর্তমান। বর্ত অর্থ – পথ। মান অর্থ – প্রকৃতমূল্য। যে পথের প্রকৃত মূল্য আছে তা-ই বর্তমান। ‘পাবিরে অমূল্যনিধি বর্তমানে’। কারণ – আমরা অতীতকে পরিবর্তন করতে পারি না। অতীতকে যাপন করতে পারি না। অতীতে কোন একদিন জল পান করেছিলাম এ স্মৃতির রোমন্থনে বর্তমানের জলতেষ্টা মেটে না। সুতরাং অতীতে জীবনের জন্য মূল্যবান কিছু নেই। ভবিষ্যতে কি হবে তাও আমরা জানি না। হতে পারে, এটাই জীবনের শেষ মুহূর্ত। সুতরাং এ মুহুর্তটিকে পূর্ণভাবে যাপন করার মাধ্যমেই জীবন তাৎপর্যময় হতে পারে। আর এ মুহূর্তটিকে পূর্ণভাবে যাপন করতে হলে ‘এখন-এখানে’ থাকতে হবে। জীবনের পূর্ণস্বাদ নিতে হলে ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষভাবে দর্শন করার কোন বিকল্প নেই। এ দর্শনের মধ্যেই হবে আত্মদর্শন।

আত্মসচেতন হলে নিজেকে দেখে বিষ্মিত না হয়ে উপায় নেই। আত্মসচেতন হলেই বুঝা যাবে কত রকমের ‘কাঁচা আমি’ আছে নিজের ভেতর। বুঝা যাবে – ক্ষুধার্ত আমি আর খাদ্য গ্রহণের পর আমি এক নই, ক্লান্ত ও অবসন্ন আমি আর সতেজ আমি এক নই, ঘুমন্ত আমি আর জাগ্রত আমি এক নই, ক্রোধান্বিত আমি আর শান্ত আমি এক নই। ঠিক একই ভাবে, আত্ম-সচেতনতার একটা পর্যায়ে নিজের মধ্যে টের পাওয়া যায় ‘পাকা আমি’র অস্তিত্ব। তখন প্রতিটি কর্মের মূল্যায়ন শুরু হবে ‘পাকা আমি’র সাপেক্ষে। নিজের মধ্যে ‘পাকা আমি’র অস্তিত্ব খোঁজে না পাওয়া পর্যন্ত নিজের বিচার নিজে করা যায় না। নিজেকে এমনভাবে দেখতে হয় যেন নিজের ভেতরের ‘পাকা আমি’ সামনে দাঁড়িয়ে ‘কাঁচা আমি’কে দেখছে। এখান থেকে আর একটু গভীরে গেলে শুরু হবে আত্মসমালোচনার স্তর। ‘পাকা আমি’র বিরুদ্ধে কর্ম করতে থাকলে মানুষ অনুতাপ-অনুশোচনা ও আত্মগ্লানির অনলে দাহিত হয়। আত্মগ্লানির অনলে দাহিত হয়ে পুড়তে থাকে আমিত্বের আবরণ। সোনা পুড়লে যেমন খাঁটি হয় তেমনি আত্মগ্লানির অনলে পুড়ে মানুষ খাঁটি মানুষে রূপান্তরিত হয়।তাই আত্মদর্শন,আত্মশুদ্ধির প্রথম সোপান।

বহিরঙ্গকে দেখাও আত্মদর্শনের পর্যায়ভুক্ত। বহিরঙ্গ আত্ম বা নিজেরই অঙ্গ। বহিরঙ্গকে দর্শন করার জন্য আয়নায় নিজের ছবির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজেকে দেখা, নিজের কথাবার্তা রেকর্ড করে তা শোনা, নিজের ভিডিও দেখা যেতে পারে। আমার দেহও আমি। প্রতিদিন কিছু সময় আয়নায় একদৃষ্টিতে নিজেকে দেখতে থাকলে আত্মদর্শনের একটা স্তরে উপনীত হওয়া যাবে। তবে, আত্মদর্শন মূলত চিন্তার দর্শন। আয়নায় নিজেকে দেখার সময়ও চিন্তা চলতে থাকে। যুগপৎ সেসব চিন্তাকে পড়লে আত্মদর্শন হতে থাকে।

চিন্তা ব্যতীত আবেগ, অনুভূতি, হৃদয়, মন বলতে কিছু আছে কি-না তা নিজের মধ্যে প্রত্যেকেরই খুঁজে দেখার প্রয়োজন আছে। কারো মন খারাপ মানে তার চিন্তা খারাপ। সুতরাং চিন্তা ভাল হলেই মানুষ ভাল হয়। ধারণা, কল্পনা, দৃষ্টিভঙ্গি, কল্পনা ইত্যাদি সবই চিন্তার বিভিন্ন অধ্যায় মাত্র।

সুতরাং, আত্মদর্শনের প্রধান বিষয় চিন্তাদর্শন। চিন্তা সম্পর্কে সচেতন হলে অহেতুক নানা বিষয়ে চিন্তাবিক্ষেপ বন্ধ হয় এবং চিন্তা নিজের লক্ষ্যবস্তুতে কেন্দ্রীভূত হয়। পরিবেশের প্রভাবে অসংখ্য চিন্তা মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে। সাধারণত মানুষ চিন্তা করে না। চিন্তা মানুষকে করে। অসংখ্য চিন্তা আসতে থাকে। অসংখ্য চিন্তা থেকে একটা নিয়ে সে কর্মে লিপ্ত হয়। চিন্তা বিক্ষিপ্ত হলে কর্মও বিক্ষিপ্ত হয়। লক্ষ্যের প্রতি চিন্তা যত বেশি কেন্দ্রীভূত হবে লক্ষ্য অর্জন ততটাই সহজ হবে। চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে সুক্ষভাবে। এমনভাবে যেন চিন্তায় আগত একটা শব্দও বাদ না পড়ে। কারণ, প্রতিটি চিন্তা, তা যত ক্ষুদ্রই হোক, অতিগুরুত্বপূর্ণ। চিন্তায় উদিত একটি মাত্র শব্দ হতে পারে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইন্দ্রিয়সমূহ বহির্মুখি। ইন্দ্রিয়সমূহের বর্হিমুখিতাই চিত্তচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এ চিত্তচাঞ্চল্যের প্রভাবে মানুষ অশান্ত হয়। ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শব্দ, দৃশ্য, গন্ধ, স্পর্শ প্রবেশ করে নিজের ভেতরে। প্রতিটি শব্দ, দৃশ্য, স্পর্শ, গন্ধ স্থান করে নেয় অস্তিত্বে। একবার দেখা কোন দৃশ্য, কিংবা শুনা কোন শব্দ সহজে মুছে না। ম্লান হয়,কিন্তু কোনকিছুরই বুঝি মৃত্যু নেই। তাই দেখা দৃশ্য, শুনা শব্দ,অনুভূত স্পর্শ মানুষকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে থাকে। ‘নিজ’ এর উপর এক তথ্যের উপর আরেক তথ্য বারবার লিখিত হতে থাকে। এভাবে স্তরে স্তরে আবৃত হয় নিজ। এক, একক এবং অদ্বিতীয় ‘আমি’-কে  আবৃত করে কাঁচা আমি। কাঁচা আমি নিয়ে যাপিত হয় জীবন। অসংখ্য ছবির আঘাতে জর্জরিত, অসংখ্য শব্দের আওয়াজে দূষিত হয় কাঁচা আমিগুলো।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ লিপ্ত হয় অসংখ্য কর্মে, সংযোগ হয় নানা রকম মানুষের সাথে। জীবনের প্রয়োজনে মানুষ সংযোগ করে স্ত্রী-স্বামী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-শত্রু এবং আরো অনেকের সাথে। জীবন চলার পথে কেউ তার মালিক কেউ বা তার ভৃত্যে পরিণত হয়। মানুষ নিজে কারো উপাসনা করে এবং অন্যের উপাসনার পাত্র হতে চেষ্টা করে। ‘কাঁচা আমি’-র খেলায় চিরতরে হারিয়ে যায়,হেরে যায় ‘পাকা আমি’।

ইন্দিয়গণের মধ্যে চোখ একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে যেসব দৃশ্য নিজের মধ্যে প্রবেশ করে তা মোহের সৃষ্টি করে। মোহাবিষ্ট হয়ে আচরণ করতে থাকে প্রতিটি মানুষ। চোখ বাহিরের দৃশ্য দেখে, কান বাহিরের শব্দ শুনে, ত্বক বাহিরের স্পর্শ অনুভব করে, নাক বাহির থেকে ঘ্রাণ গ্রহণ করে, জিহ্বা বাহিরের বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করে। এসব ইন্দ্রিয় দিয়ে যেসব তথ্যের প্রবেশ ঘটে তা অবিরাম পরিবর্তন করে নিজকে। এসব তথ্য কীভাবে সত্তার উপর আবরণ সৃষ্টি করছে তা সুক্ষèভাবে দর্শন করলে ইন্দ্রিয়সমূহ বাহ্য বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়। ফলে চিত্ত শান্ত হয়। শান্ত চিত্তে নিজেকে প্রকাশিত করেন পরম জ্যোর্তিময়।

আকাশ, বাতাস, আলো, পানি, মাটি এই পঞ্চতত্ত্ব দিয়ে গঠিত মহাবিশ্ব। মানব অস্তিত্বও মহাবিশ্বেরই একটা অংশ। সুতরাং, মানুষের মধ্যেও আছে পঞ্চতত্ত্বের অস্তিত্ব। মানুষের মধ্যে আকাশ উপাদান হচ্ছে – কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, লজ্জা; বাতাস উপাদান –  ধারণ, চালন, সংকোচন, প্রসারণ; আগুন উপাদান – ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, ভ্রান্তি, আলস্য; পানি উপাদান – বীর্য, রক্ত, মল, মূত্র, মজ্জা; মাটি উপাদান – অস্থি, মাংস, নোখ, লোম, চর্ম। এ পাঁচ উপাদানকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আছেন – দর্শন, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়। এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের পাশে আছেন পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় – মুখ, হাত, পা, পায়ু ও লিঙ্গ। এসব জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু এবং কর্মেন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষ্‌ভাবে দর্শন করার মাধ্যমে আত্মদর্শন হয়।

সুক্ষাতিসুক্ষèভাবে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করার অর্থ হলো নিজেকে সুক্ষ্মুতিসুক্ষ প্রশ্ন করে উত্তর বের করে আনা। যেমন, আমি কেমন মানুষ? উত্তরে বললাম, ‘আমি রাগী’। এরকম সাধারণ উত্তরে সন্তুষ্ট থাকলে নিজেকে জানা যায় না। কখন আমার রাগ হয়? কেন হয়? রাগান্বিত হলে আমার দেহে কি পরিবর্তন আসে? এভাবে একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর বের করে আনলে নিজের রাগ সম্পর্কে জানা যাবে। রাগকে জানা গেলে আর রাগ থাকবে না। রাগান্বিত অবস্থায় শরীরের মধ্যে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তা পর্যবেক্ষণ করলে রাগ থাকতেই পারে না। কারণ, যে রাগ করে সে এখন পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। তাই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই রাগ চলে যায়। আত্মদর্শনের মধ্যদিয়েই আত্মবিশুদ্ধি আসে। নিজের মধ্যে আত্মদোষের নিরাকরণ হয়। এই নিরাকরণের নিরাকরণই – জ্যোর্তিময়।

এভাবে, আত্মদর্শনের জন্য নিজেকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করে উত্তর বের করে আনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া যায়। যেমন – আমি কে? আমি কিভাবে এখন নিজেকে চিত্রিত করি? আমি কতটুকু সম্মান করি নিজেকে? নিজের কথার কতটুকু মর্যাদা দেই? আমি কি নিজের কাছে কথা দিয়ে কথা রক্ষা করি? যাব না বলেও কি আমি যাই? দেখবো না বলেও কি আমি দেখি? শুনবো না বলেও কি আমি শুনি? স্পর্শ করবো না বলেও কি আমি স্পর্শ করি? আমি কিভাবে মূল্যায়ন করি আমাকে? আমার জীবনের কোন আদর্শ আছে কি? আমার মূল্যবোধগুলো কি কি? আমার কোন লক্ষ্য আছে কি? কোন্ ব্যক্তিকে আমি সর্বাধিক গুরুত্ব দেই? এমন কোন ব্যক্তি বা বিষয় কি আমার জীবনে আছে, যাকে সর্বদা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেই? এমন কোন নীতি বা আদর্শ কি আছে যার জন্য আমি সব ত্যাগ করতে পারি কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়ে সেই নীতি বা আদর্শকে ত্যাগ করতে পারি না? আমার আত্মপ্রবঞ্চনাগুলো কোথায়? আমার দুর্বলতাগুলো কি কি? আমার সবলতাগুলো কি কি? এমন কোন কিছু কি আছে যার প্রতি আমি আকর্ষিত হই? আমার প্রতিভা, মেধা, বুদ্ধি, সততা, চিন্তার গভীরতা কতটুকু? আমার স্ববিরোধিতাগুলো কি কি? আমি অন্যের মধ্যে যেসব দোষ দেখি তা-কি আমার নিজের মধ্যে আছে? আমি কি অন্যের সমালোচনা করি, আর নিজের সমালোচনা শুনলে অসহিষ্ণু হয়ে উঠি?

এসব প্রশ্নের উত্তর আসতে পারে কেবলমাত্র আত্মদর্শনের মাধ্যমে। আর আত্মদর্শন হতে পারে জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী বিষয়বস্তু এবং কর্মেন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত কর্মগুলোকে সূক্ষভাবে দর্শন করার মাধ্যমে। কিন্তু এভাবে কেবল একটা স্তর পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া সম্ভব। মুর্শিদ দর্শন না হলে আল্লাহ দর্শন স্তরের আত্মদর্শন হয় না। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘মুর্শিদ দর্শনের মাঝে আত্মদর্শন। আর আত্মদর্শনের মাঝে আল্লাহ দর্শন।’

মুর্শিদ দর্শনে আত্মদর্শন হয় কিভাবে? লোকে সাধরণত মুর্শিদ বলতে এমন কোন ব্যক্তিত্বকে নির্দেশ করে যিনি নিজ থেকে পৃথক দেহধারী। অর্থাৎ, নিজ থেকে পৃথক কোন ব্যক্তিকে লোকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে। তাঁর কাছে যায়, তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করে, তাঁকে অনুসরণ করে। কিন্তু আসলে কি মুর্শিদ নিজ থেকে পৃথক? জগতে অনেক মুর্শিদ, গুরু বা পথপ্রদর্শক আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করার মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটা কি? যে ব্যক্তি মুর্শিদ হিসেবে কাউকে গ্রহণ করে তার মধ্যে নিজেকে বিকশিত করার একটা ইচ্ছা থাকে। সে নিজেকে একটা বিকশিত স্তরে উন্নীত করতে চায়। কাঙ্খিত বিকশিত স্তরটি কেমন হবে এ সম্পর্কে তার মধ্যে একটা অস্পষ্ট ধারণা থাকে। ব্যক্তি যেমনটি হতে চায় কিংবা নিজেকে বিকাশের যে স্তরে নিয়ে যেতে চায় যখন সে বাস্তবে ঐ স্তরের একজন ব্যক্তিকে দেখে তখন তাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে। অর্থাৎ – মুর্শিদ নিজ চিন্তার বাস্তব রূপ। লোকে যাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাতের আগেই চিন্তাজগতের কোথাও না কোথাও তিনি বিরাজ করতেন। সুতরাং ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষèভাবে দর্শন করলে দেখা যাবে যে নিজের ভেতরেই নিজের মুর্শিদ বাস করেন। মুর্শিদ নিজ চেতনারই একটা উন্নত স্তর। নিজের মধ্যে সুপ্ত সেই উন্নত চেতনার কাছে আত্মসমর্পণই, মুর্শিদ -এঁর কাছে আত্মসমর্পণ। আত্মসমর্পণ হচ্ছে – ঊর্ধ্বস্তরের নিজের কাছে নিম্নস্তরের নিজগুলোর সমর্পণ, অপরির্তনীয় ‘আমি’র কাছে অসংখ্য পরিবর্তনশীল আমির সমর্পণ। মুর্শিদ হচ্ছেন নিজের মধ্যে সেই অপরিবর্তনীয় আমি। যতক্ষণ পর্যন্ত সে-ই আমিকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ না করা হবে এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ দর্শন হয় না। আল্লাহ স্ব-য়ম্ভু অর্থাৎ নিজ থেকে জাত। আল্লাহ – আত্মভূ। এই আত্মই অনাদি এবং অনন্ত।

মুর্শিদ আত্মবৎ, আত্মভব, আত্মসদৃশ বা আপনার মত। শুধু মুর্শিদ না, সমগ্র বিশ্বজগতই আপনার মতো। যে যেমন, তেমন ভাবেই সে দেখে জগতকে। তাই আমার মুর্শিদ কেবল ‘আমার’-ই মুর্শিদ। আমি যেমন আমি ব্যতীত অন্য কেউ হতে পারি না তেমনি আমার মুর্শিদও অন্য কারো মুর্শিদ হতে পারেন না। আমার মাঝে আমার মুর্শিদ আমারই পথ চেয়ে থাকেন। এই মুর্শিদই – দেহেন্দ্রিয়ের মোক্ষসাধনে ব্যবস্থাপক, ইন্দ্রিয় সংযমের হেতু। ইন্দ্রিয়গণ আত্মবশ না মানলে মুর্শিদবশ মানবে কেমন করে? সুতরাং, চূড়ান্ত বিচারে মুর্শিদ দর্শন হচ্ছে সমত্বদর্শন,আত্মসাক্ষাৎকার বা আত্মদর্শন। একমাত্র আত্মজ্ঞ ব্যক্তিই আত্মতত্ত্ববিৎ। এই আত্মজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান।

আত্মদর্শন থেকে আত্মতত্ত্ব বা আত্মার যথার্থস্বরূপ তখনই উন্মোচিত হয় যখন মুর্শিদ নিজের মধ্যে একাগ্রভাবে স্থিত। মুর্শিদ – আত্মনিশ্চল বা আত্মসংস্থ না হলে আত্মস্বরূপ উদ্ভাসিত হয় না। মুর্শিদই আত্মেশ্বর। এ যাবৎ ঊর্ধ্বতম যতগুলো স্তর মানুষ কল্পনা করতে পেরেছে তার সবকিছুর অবস্থান নিজের ভেতরেই সুপ্ত। আল্লাহকে সপ্ত আসমানের উপরে নির্বাসিত করলে তাঁকে কোনদিন খোঁজে পাওয়া যাবে না। নিজের ভেতরেই খোঁজে নিতে হবে আসমানের সাতটি স্তর।

মুর্শিদের গুণাবলি, তার ভাব, তার ব্যক্তিত্ব নিজের জীবনে প্রতিস্থাপিত হলে ব্যক্তি মুর্শিদময় হয় অর্থাৎ সে যেমন হতে চেয়েছিলো বাস্তবে তেমন রূপ ধারণ করে। তখন তার মধ্যে অন্য কিছু হবার বাসনা থাকে না। এ কারণেই মুর্শিদময় অবস্থা শান্ত অবস্থা। এ অবস্থাতেও কর্ম থাকে কিন্তু প্রত্যাশা থাকে না। কর্ম থাকলেই প্রত্যাশা থাকতে হবে এমন নয়। কর্ম ছাড়া যেমন প্রত্যাশা থাকতে পারে তেমনি প্রত্যাশা ছাড়াও কর্ম থাকতে পারে। মানুষ যখন মুর্শিদময় হয়, প্রকৃত অর্থে তখনই সে আত্মতত্ত্বময় বা আত্মবান হয়। আত্মবানই প্রশান্তাত্মা।

বস্তু যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন তার দু’টি রূপ আছে। একটি তার বাহ্যিক রূপ অন্যটি অভ্যন্তরীণ। বস্তুর অভ্যন্তরীণ রূপকে আবিষ্কার করার বিজ্ঞান হলো আধ্যাত্মিকতা বা আত্মঅধ্যয়ন। আত্মঅধ্যয়নেরও বাহ্যিকতা আছে। আত্মঅধ্যয়ন বিষয়ে লেখা বা বলার মাধ্যমে বাহ্যিকতা সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা হয় মাত্র। আত্মদর্শনের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় প্রকৃতই আছে যা অব্যক্ত। কিভাবে আত্মর্শন হবে তা লেখা কিংবা পাঠের বিষয় নয়। মুর্শিদের কাছ থেকে না জেনে এ পথে যাত্রা করা অসম্ভব। ‘আপনাতে আপনি ফানা হলে তাঁরে যাবে জানা’। পাকা আমির অণুদর্শনে পাকা আমিতে কাঁচা আমিগুলো বিলীন হলে তাঁকে জানা যায় অর্থাৎ ‘পাকা আমি’কে জানা যায়।

আত্ম বা নিজই হেরা গুহা। এই গুহার মধ্যে অবস্থান করলে আলো আসবেই।

নাগরিকত্ব আইন: বাংলাদেশি তাড়ানো দাবি

সংলাপ ॥ ওই রাজ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ‘মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা’ দেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়নের দাবিতে ও নতুন নাগরিকত্ব নাইনের সমর্থনে এই জনসভার ডাক দিয়েছিল। আর সেখানে দলনেতা রাজ ঠাকরে ঘোষণা করেছেন ‘ভারত কোনও ধর্মশালা নয়, এখান থেকে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের তাড়িয়েই ছাড়া হবে।’ কথিত বাংলাদেশিদের দেশছাড়া করার বিষয়টি ভারতে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে বেশ কিছুকাল ধরেই। কিন্তু সেই ইস্যুতে এত বড় মাপের রাজনৈতিক কর্মসূচী এই প্রথম হল। মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওতে হিন্দু জিমখানা গ্রাউন্ড থেকে শহরের দক্ষিণ প্রান্তে আজাদ ময়দান পর্যন্ত রাজ ঠাকুরের দল মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা এদিন যে বিশাল পদযাত্রার আয়োজন করেছিল, ওই শহরে এত বড় মাপের জমায়েত অনেকদিন হয়নি। বিবিসি মারাঠির সংবাদদাতা ময়ূরেশ বলছিলেন, দলের গেরুয়া পতাকা নিয়ে হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক এদিন যেন মুম্বাইকে গেরুয়াতে রাঙিয়ে তুলেছিলেন। অচল হয়ে গিয়েছিল মেরিন ড্রাইভ। আর এই জনসভার প্রধান দাবিই ছিল ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের এদেশ থেকে তাড়াতে হবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বালাসাহেব ঠাকরের ভাইপো রাজ ঠাকরে শিবসেনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের দল ‘মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা’ গড়েছিলেন প্রায় চৌদ্দ বছর আগে। এতদিন মারাঠা জাতীয়তাবাদই ছিল তার প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র, কিন্তু ইদানীং তিনি ভাষণ শুরু করছেন আমার প্রিয় হিন্দু ভাই-বোনেরা’ বলে। কয়েকদিন আগে তিনি নিজের দলের পতাকার রং-ও পাল্টে নিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী ‘ভগওয়া’ বা গেরুয়ায়। আর এদিন তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তার দল কথিত মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধেই আক্রমণ শানাবে। রাজ ঠাকরে তার ভাষণে বলেন, ভারত কোনও ধর্মশালা নয়, যে যেখান থেকে খুশি এসে যে কেউ এখানে বসে যাবে।

রুশ প্রতিনিধিদলের তুরস্ক সফর ও নয়া সমঝোতা!

সংলাপ ॥ সিরিয়ার ইদলিবে সেদেশের সেনা ও মিত্রবাহিনীর অভিযানের ঘটনায় তুরস্ক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। অপরদিকে রাশিয়া সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। দ্বিপক্ষীয় এই মতবিরোধের ঘটনায় রাশিয়ার উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল তুরস্ক সফর করেছে।আঙ্কারায় তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের পর আলোচনা চালিয়ে যাবার ব্যাপারে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ভারশিনিন এবং সিরিয়ায় রাশিয়ার বিশেষ দূত আলেকজান্ডার লভরেন্তিভ। তুরস্কের প্রতিনিধি দলের প্রধান ছিলেন তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাদাত ওনাল।

আঙ্কারায় রাশিয়ান ও তুর্কি প্রতিনিধিদের মধ্যে গতকালের ওই বৈঠকে উভয় পক্ষ ইদলিবকে শান্ত রাখতে এবং সিরিয়ার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেয়।

রুশ প্রতিনিধি দলে রাজনীতিবিদ,সামরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে উভয় পক্ষই চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি বিবেচনা করছে এবং সেটা চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই হতে পারে। গুরুত্বের দিক থেকে আদানা’চুক্তি-২ বলা যেতে পারে এই চুক্তিকে। ১৯৯৮ সালের ২০ অক্টোবরে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে দু’পক্ষই সম্মত হয়েছিল যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোকে কেউই নিজেদের ভূমিতে ঢুকতে দেবে না। তুরস্কের সেনারাও সন্ত্রাসীদের দমনে সিরিয়ার ভূখন্ডের পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত ঢোকার অনুমতি পাবে। চুক্তি অনুযায়ী সিরিয়া তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে প্রয়োজনে তুরস্কের সীমান্তে সেনা মোতায়েন করতে পারবে। সেক্ষেত্রে তুরস্কের সেনাদের তো আর সিরিয়ার ভূখন্ডে প্রবেশের প্রয়োজন পড়ে না। সিরিয়া তাই তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রায়ই ওই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে এসেছে।

তুর্কি সরকার আদানা চুক্তি মেনে চললেই কেবল স্থগিত হয়ে যাওয়া ওই চুক্তি আবার বাস্তবায়ন হতে পারে। সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়া এবং সিরিয়ার ভূখন্ড থেকে তুর্কি সেনা প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে ওই চুক্তিতে ফিরে যাওয়া যেতে পারে। তাহলেই সিরিয়া এবং তুরস্ক দুদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ২০১৯ সালের অক্টোবরে বলেছিলেন: আমরা সীমান্ত নিরাপত্তার ব্যাপারে তুরস্কের উদ্বেগের বিষয়টি উপলব্ধি করি।এটি আদানা চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা উচিত। তুরস্কের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বেগের কথা বলে রাশিয়া মূলত সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব এবং নিজেদের ভূখন্ডের ওপর কেন্দ্রিয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের কথাই বোঝাতে চেয়েছে। রাশিয়া চায় দামেষ্ক এবং আঙ্কারার মধ্যকার উত্তেজনা কমাতে এবং সিরিয়ার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে। রাশিয়া বর্তমান সিরিয়া সরকারের ঘনিষ্ট মিত্র হিসেবে সবসময়ই অনুমতি ছাড়া বিদেশি সেনা উপস্থিতির বিরুদ্ধে এবং সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে এসেছে। ইতোপূর্বে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনও বলেছেন:মস্কো মনে করে সিরিয়া থেকে বিদেশি সেনা চলে যাওয়া উচিত। সিরিয়ার ভূখন্ডে আন-নুসরা ফ্রন্টের মতো কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠি হামলা চালালে তাদের প্রতিহত করতে সেনা অভিযান চালানোর অধিকার দামেষ্কের রয়েছে।

আসুন, আজ থেকে মাতৃভাষায় সম্বোধন করে কথা বলি

সংলাপ ॥ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার আমরা অনেকে এখনও বলে থাকি যে, অফিসের চিঠিপত্র বাংলায় লিখতে কষ্ট হয়। কথা বলতেও অসংখ্য ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করি যার কোনও প্রয়োজন নেই এবং বাংলায় অনেক সুন্দর সুন্দর শব্দ থাকা সত্ত্বেও। সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, উপবিভাগ, কোর্ট কাছারীসহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদালতে ইংরেজীতে ‘নোট’ লেখা হচ্ছে, আর কথাবলার সময় ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলার বিষয়ে উল্লেখ করার তো কোনও অপেক্ষাই রাখে না। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণ ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলে থাকেন। এমনকি সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ, সাংবাদিক ভাইয়েরা, সন্মানিত সংসদ সদস্যবৃন্দ, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়গণ, আর যারা টেলিভিশনে ‘টক শো’ অনুষ্ঠান দেখে থাকেন তারা তো অবশ্যই শুনেছেন ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলার প্রতিযোগিতা। গৃহকর্মীরা পর্যন্ত কথা বলার মধ্যে ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

বিদেশে বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিতরা কিছু কিছু ইংরেজী শব্দ শিখে বাচ্চাদের সাথে কথা বলার সময় ব্যবহার করে থাকেন। ওই বাচ্চারা যখন বিদেশে স্কুলে পড়ার পর ওই দেশীয়  ইংরেজীতে কথা বলায় অভ্যস্থ হয়ে উঠছে তখন বাসায় গিয়ে মা বাবার সাথে ইংরেজীতে কথা বলতে গিয়ে অসহায় বোধ করছে। ছেলে মেয়েরা ও মা বাবারা ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। সে সময় মা বাবারা ছেলে-মেয়েদের শুদ্ধ বাংলা শেখানোর গুরুত্বটা এবং প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এইরকম ইংরেজী বাংলা মিশায়ে কথা বলার ঢংকে উন্নত মানের পরিচায়ক বা জাতে ওঠার মানদন্ড হিসেবে আবার অনেকে  দেখেন।

আমাদের গর্ব যে, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এখন জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসাবে বিশ্বে স্বীকৃত এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালিত হয়। আমাদের আরও গর্ব যে, বিশ্বের সর্বাধিক কোনও ভাষায় কথা বলার দিক দিয়ে বাংলা ভাষার স্থান ৪র্থ। অর্থাৎ চীনা, স্প্যানিশ ও ইংরেজীর পরেই বাংলার স্থান।

বাংলার মধুকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিজ দেশ ত্যাগ করে বিদেশ চলে গেলেন এবং সেখানে হেনরিয়েটা নামে এক ফরাসী মহিলাকে বিয়ে করে বসবাস করছিলেন। কিন্তু কিছুদিন বিদেশে অবস্থানের পর তিনি উপলব্ধি করলেন তিনি তাঁর মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি গুরুতর অন্যায় করেছেন। সেই উপলব্ধিতে তিনি অনুতপ্ত হৃদয়ে লিখলেন :

হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত,করিনু ভ্রমণ

পরদেশে,ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি!

অনিদ্রায়,অনাহারে সঁপি কায়, মনঃ,

মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;

কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল-কানন!

স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে,

‘ওরে বাছা,মাতৃকোষে রতনের রাজি,

এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?

যা ফিরি,অজ্ঞান তুই,যারে ফিরি ঘরে’।

পালিলাম আজ্ঞা সুখে,পাইলাম কালে

মাতৃভাষা-রূপ খনি,পূর্ণ মণিজালে’।

তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন এবং বাকী জীবন অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচনার পর বাংলার মাটিতেই মৃত্যুবরণ করেন।তার নিজস্ব বাড়ী বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদের তীরে যশোরস্থ সাগরদাড়িতেই তিনি চির নিদ্রায় শায়িত আছেন৷

আমরা শিক্ষিতরা একটু চেষ্টা করলেই আমাদের জাতীয় স্বার্থে সর্বস্তরে বাংলা বাস্তবায়ন করতে পারি। আমরা যখন ইংরেজী বাংলা মিশিয়ে কথা বলি তখন ইচ্ছে করলে বুঝতে পারি যে আমরা অনাবশ্যক ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করছি। তখন আমরা তাৎখনিকভাবে তা সংশোধন করে নিতে পারি। অথবা অন্য কাউকে যখন বলতে শুনি তখন তাকে সংশোধন করে নিতে সবিনয় অনুরোধ জানাতে পারি। তাতে লজ্জার কিছু নেই। তা ছাড়াও যদি জাতীয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ফেসবুক ও টুইটার সহ সকল প্রচার মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়, যেভাবে বলা হতো – স্বদেশী পণ্য কিনে হও ধন্য বা ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট  ইত্যাদি। বিষয়টিকে রাজনৈতিক ভাবে একটা সামাজিক আন্দোলনে রুপদান করা হলে কাংখিত ফল লাভ হবেই  তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আসুন, আজ থেকে আমরা কুশল বিনিময়ে সতর্ক হই এবং একে অপরকে মাতৃভাষায় সম্বোধন করে  কথা বলি।

এককালের অবরুদ্ধ নারীরাই বিধ্বস্ত সিরিয়াকে গড়ছেন

সংলাপ ॥ সিরিয়ার পূর্ব আলেপ্পোর পথেঘাটে নারীদের একসময় কদাচিৎ দেখা মিলত। ঘরে অবরুদ্ধ থাকাই যেন তাদের নিয়তি ছিল। বাইরে বের হতে হলে সঙ্গে নিতে হতো কোনো পুরুষ সঙ্গীকে। শুধু পূর্ব আলেপ্পো কেন, সিরিয়ার বহু অঞ্চলের বাস্তবতাই এমন ছিল। কিন্তু এখন এ চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। অবশ্য অনেকটা নিরুপায় হয়েই। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধই এ বাস্তবতা বদলে দিয়েছে।

আলেপ্পোকে বলা হয় সিরিয়ার বাণিজ্যিক রাজধানী। এর প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো আগে থেকেই ছিল রক্ষণশীল। এসব অঞ্চলের নারীদের অবরুদ্ধ থাকাই ছিল নিয়তি। কিন্তু গৃহযুদ্ধ এই নিয়তিকে বদলে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে বহু পরিবার পুরুষশূন্য হয়ে পড়ায় এখন নারীদেরই হাল ধরতে হচ্ছে। পূর্ব আলেপ্পোসহ সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের পথেঘাটে নারীদের উপস্থিতিই এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিধ্বস্ত দেশটিকে নতুন করে গড়া এবং এতে প্রাণসঞ্চারের দুরূহ কাজটি এখন তারাই করছেন। এই নারীদের কেউ শোকাহত, কেউবা আবার আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারা। এদের অনেকেই আবার গৃহযুদ্ধের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কহীন ছিলেন।

দীর্ঘ আট বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর প্রায় পুরো সিরিয়াই এখন দেশটির সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারবিরোধীসহ অন্য সব পক্ষ শুধু কোণঠাসাই নয়, পরাজিতও। কোনো সদস্যকে হারায়নি এমন সাধারণ পরিবারের সংখ্যা খুব কম। এমন বহু পরিবার রয়েছে, যার এতিম শিশুদের দেখভালের দায় পড়েছে বৃদ্ধ দাদির ওপর। আর সঙ্গী হারিয়ে বিধবা হওয়া নারীর সংখ্যা গুনে শেষ করার মতো নয়। আবার এমন বহু নারী রয়েছেন, যারা হয়তো কোনো দিন বিয়ের জন্য কোনো পুরুষকে খুঁজে পাবেন না।

 সিরিয়ার নারীদের জন্য এই পরিস্থিতি অভিনব। আগে ঘর থেকে একা বের হওয়াই যেখানে তাদের জন্য দুরূহ ছিল, এখন সেখানে তারা ঘরের বাইরে কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা শুধু নিজ পরিবারের হালই ধরছেন না, দেশকে পথ দেখাচ্ছেন অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের মতো অগ্রসর অঞ্চলগুলোয় নতুন কিছু না হলেও দেশটির বহু অঞ্চলের জন্য এটি একেবারে অভিনব একটি বিষয়।

জীবনে প্রথমবারের মতো ঘর-বাহির সব সামলাচ্ছেন এমন নারীদের মধ্যে একজন ফাতিমা রাওয়াস। ৩২ বছর বয়সী এ নারীর স্বামী তিন বছর আগে যুদ্ধে মারা যান। বাইরের কাজের অভিজ্ঞতাহীন এ নারী গত বছরের মে মাসে প্রথম নিজের একটি ব্যবসা শুরু করেন; প্রতিষ্ঠা করেন বিউটি সেলুন। এ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এ নারী নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘আগে নারীরা সবকিছুকে ভয় পেত। কিন্তু এখন ভয় পাওয়ার মতো কিছু আর নেই। এক দীর্ঘ ও কঠিন পথ পেরিয়ে এখানে এসেছি আমরা।’

এর আগে পরিবারের বাইরের কোনো পুরুষের সঙ্গে দেখা হয়নি ফাতিমার। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এক আত্মীয়ের সঙ্গে বাগদান হয় তার। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ ক্ষেত্রে তার কোনো মত নেওয়া হয়নি। মৃদু আপত্তি জানালেও তা গ্রাহ্য হয়নি। তারপর গাঁটছড়া বেঁধে সংসারে মন দেন। বৃত্তবন্দী জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কথা কখনো মনে হয়নি। পূর্ব আলেপ্পোয় থিতু হয়ে বেশ ভালোই সময় কাটছিল ফাতিমার। কিন্তু ২০১২ সালে বাড়ির দরজায় এসে উপস্থিত হয় গৃহযুদ্ধ। ২০১৬ সালে বিদ্রোহীদের হটিয়ে পুরো আলেপ্পোর দখল নেয় বাশার আল-আসাদ সরকারের বাহিনী। দীর্ঘ চার বছরের সংঘাতে পূর্ব আলেপ্পো তত দিনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আবার বিদ্রোহীরাও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি। পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তখনো খ-যুদ্ধ চলছে। এমনই এক সময়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় বন্দী হন ফাতিমার স্বামী। এ অবস্থায় অকূলপাথারে পড়েন ফাতিমা। সন্তানদের জন্য দুধ কিনতে তাকে ঘরের চৌকাঠ পেরোতে হয় প্রথমবারের মতো। স্বামীকে মুক্ত করতে গিয়ে সম্ভব সবকিছুই বিক্রি করেন, করেছেন ধার, যুক্ত হন সেলাইয়ের কাজে। মুক্ত হওয়ার পর ফাতিমাকে তার স্বামী বলেছিলেন, ‘আমার মৃত্যু যেন তোমার আগে হয়। কারণ, আমার চেয়ে তোমার মানসিক শক্তি অনেক বেশি।’ তা-ই হয়েছিল। একদিন বোমার শব্দ শুনে বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি তিনি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার।

ফাতিমার মতো একজন নারীর জন্য এটুকু লড়াই-ই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তার সন্তানদের সামনে পড়ে ছিল গোটা জীবন, যার জন্য তাকে আরও লড়ে যেতে হতো। ঠিক তা-ই করছেন ফাতিমা। বিউটিফিকেশনের ওপর কোর্স করে রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া ঋণের অর্থে গড়ে তুলেছেন নিজের একটি প্রতিষ্ঠান। নিজের শক্তির খোঁজটি এখন তিনি পুরোদস্তুর পেয়ে গেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘যখন আপনি উপার্জন করবেন, তখন কারও কাছে আপনার কিছু চাওয়ার প্রয়োজন নেই। সন্তানেরা না থাকলে হয়তো আমার ভেতরের এই শক্তির সঙ্গে কখনো আমার পরিচয়ই হতো না। তখন নিজের জন্য হয়তো অন্য কারও ওপর আমি নির্ভর করতাম। অন্যের ওপর নির্ভরশীল নারীর দুর্বলতার সুযোগটাই সবাই নেয়।’

ফাতিমার মতো এমন নারী এখন সিরিয়ার আনাচকানাচে। নিজের একটি সংসার গঠনের স্বপ্ন নিয়ে ঘোরা নারীর সংখ্যাও কম নয়। এ বিষয়ে সিরিয়ার লাতাকিয়ার বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী নারী লেকা আল-শায়েখ নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘সিরিয়ায় কোনো পুরুষ নেই। সঙ্গী বাছাইয়ে এখন আর আগের মতো বাছবিচারের সুযোগ নেই। আমার অনেক বন্ধুই এখনো আগের মতো প্রত্যাশা নিয়ে আছে। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। সঙ্গী না পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছে। অনেকে সঙ্গী খুঁজতে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শরণ নিচ্ছে। কিন্তু তাতেও হতাশ হতে হচ্ছে। কারণ, যুবকদের অধিকাংশই প্রাণ দিয়েছে। বিবাহযোগ্য যুবকদের যারা জীবিত, তাদের জীবন সৈনিকের, যা এক স্থায়ী শঙ্কার কারণ।

  আসে সিরিয়ার এক গ্রামের কথা, যার সবকিছুই পরিচালিত হয় নারীদের দ্বারা। সেই গ্রামের নাম জিনওয়ার, যার অর্থ ‘নারীর রাজ্য’। আক্ষরিক অর্থেই এটি নারীদের রাজ্য। গৃহযুদ্ধের আগেও সেখানে কোনো গ্রাম ছিল না। তাহলে রাতারাতি একটি গ্রাম কোথা থেকে এল? যুদ্ধে নির্যাতনের শিকার হয়ে, সব হারিয়ে আসা নারীরা একজোট হয়ে এ গ্রাম গড়ে তুলেছেন। এতে মূল ভূমিকা পালন করেন কুর্দি নারীরা। সারা সিরিয়ায় যখন জাতিতে জাতিতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে যুদ্ধ চলছে, তখন তার ভেতরেই তুরস্ক সীমান্তের কাছে গড়ে উঠেছে ‘জিনওয়া’ নামের এ বহুজাতিক গ্রাম, যেখানে কুর্দিদের সঙ্গেই থাকেন ইয়াজিদি নারীরা, থাকেন আলাউইতরা, আরবরা, এমনকি বিদেশিরাও। সেখানে দিনের বেলাতেই শুধু পুরুষদের প্রবেশাধিকার রয়েছে। রাতে এখনো গ্রামটি পাহারা দেন নারীরা। এর অবকাঠামো থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সব কার্যক্রম পরিচালিত হয় নারীদের দ্বারা। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক দারুণ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা এ গ্রাম যেকোনো পক্ষের দ্বারাই আক্রান্ত হতে পারে, সে তুরস্ক কিংবা আইএস, কিংবা সিরিয়া সরকার যে-ই হোক না কেন।

যেকোনো যুদ্ধই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলোয় পরিবর্তন আনে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বলতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বের বহু অঞ্চলের জনমিতি যেমন বদলে দিয়েছে, তেমনি বদলে দিয়েছে সেখানকার সমাজে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই নারী অগ্রগতি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কারণ, ওই বিধ্বস্ত সময়ে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নারী ছাড়া আর কেউ ছিল না। পুরুষাধিপত্য তাই তার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সিরিয়ার নারীদের ক্ষেত্রেও আট বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ এ বাস্তবতা নিয়ে হাজির হয়েছে। সিরিয়ার নারী অধিকার সংস্থাগুলো এই বাস্তবতাকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানে।

যুদ্ধ সিরিয়ার নারীদের জন্য যেমন যন্ত্রণা নিয়ে এসেছিল, তেমনি এক সম্ভাবনাও নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ এ যুদ্ধ চলাকালেও সিরিয়া মূলত চলেছে তার নারীদের ওপর ভর করেই। কিন্তু এ সত্য তখন রাষ্ট্র ও নারী উভয়ের কেউই স্পষ্টভাবে টের পায়নি। এখন যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ার অর্থনীতি ও সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটিও করছেন নারীরাই। চরম রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক একটি সমাজ ভেঙে একটি তুলনামূলক সাম্যের সিরিয়া গড়া আদৌ কতটা সম্ভব হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে এখন এই নারীদের ওপর।