প্রথম পাতা

আরব কবে মুহাম্মদী আরব হবে!

সংলাপ ॥ ‘গাছ থেকে আপেল নিচের দিকে পড়ে কেন? উপরের দিকে যায় না কেন? ঠিক বরাবর নিম্নগামীই বা হয় কেন?’ এ প্রশ্নগুলোই জেগেছিলো বিজ্ঞানী নিউটনের মনে। আর এরূপ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই নিউটন আবিষ্কার করেন মধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব। যার উপর ভিত্তি করে মহাকর্ষ বিজ্ঞান পথ করে নেয় সম্মুখপানে। উদ্ভাবিত হয় সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার।

বৈজ্ঞানিক নিউটনের মনে উদয় হওয়া এই প্রশ্নের বহু আগে থেকেই গাছ থেকে আপেল ঝরে আসছিলো এবং তা দেখেও আসছিলো কোটি কোটি মানুষ। কিন’ নিউটনের মতো কাউকে বিষয়টি ভাবায়নি। এ নিয়ে কেউ গভীরভাবে ভাবেনি। তলিয়ে দেখিনি এর কার্যকারণ। গভীর পর্যবেক্ষণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণেই কেবল  উন্মোচন ঘটে সত্যের, দূর হয় মিথ্যার, অবসান ঘটে অন্ধকারের।

গোটা পৃথিবীতে আজ মুসলমান বলে পরিচিত জনগোষ্ঠীর সামনে এক কঠিন সময়। দেশ, অঞ্চল ও স্থানভেদে তীব্রতার তারতম্য থাকলেও দুর্ভোগ, দুর্যোগ, দুর্ভাবনা, অভিশাপ আর অসহনীয় অশান্তি আজ নিত্যসঙ্গী শান্তি (ইসলাম) ধর্মাবলম্বী কোটি কোটি আদম সন্তানের জীবনে। ইরাক-লিবিয়া জ্বলছে, আফগানিস্তান-ইয়েমেন পুড়ে ছাই, প্যালেস্টাইনে রক্ত ঝরছে দশকের পর দশক জুড়ে, গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত পাকিস্তান। ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর রক্তপাতের সঙ্গে নিত্য বসবাস ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, সুদান ও ইথিওপিয়া, সংখ্যালঘুর অভিশাপে জর্জরিত ভারত, ফিলিপাইন এবং যুগোশ্লাভিয়াসহ আরো কত না দেশের মুসলমানরা। তার সঙ্গে সামপ্রতিক বছরগুলোতে যোগ হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত লাখ লাখ মুসলমানের জীবনে নেমে আসা ‘সন্ত্রাস-আতঙ্ক’। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে প্রতিটি মুসলমান পরিবারের দিন কাটছে আতঙ্কের মাঝে – সন্ত্রস্ত তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।

বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের জীবনে বিরাজমান এই অভিশাপের বিপরীতে সীমাহীন বিত্ত-বৈভব আর অকল্পনীয় সুখ ভোগ ও চরম বিলাসিতায় কাটছে আরব দেশগুলোর মুসলমানদের। যারা কিনা নিজেদের দাবি করে ‘প্রথমে আরব, তারপরে মুসলমান’ বলে। এই আরব দেশগুলোরই নেতৃত্বে রয়েছে সৌদি আরব। পবিত্র ভূমি মক্কা আর মদিনা রয়েছে যার রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে। মোট আরব ভূখন্ডের শতকরা ৮০ ভাগ জুড়ে থাকা সৌদি আরব কেবল আরব বিশ্বেরই নেতা নয়, পবিত্র ভূমির জামিনদার-তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে সমগ্র বিশ্ব মুসলিমের কাছে রয়েছে এর এক বিশেষ মর্যাদা।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে বিশ্ব মুসলিমের এই বিপর্যয় দশায় সৌদি আরবের ভূমিকা কি? বিশ্বের মুসলমানদের বাঁচাতে, তাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা আনয়নে কি করছে সৌদি নেতৃত্ব? বলা বাহুল্য, সচেতন প্রতিটি মুসলমানের কাছেই এগুলো অবান্তর অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন। কারণ সৌদি নেতৃত্ব বিশ্বের মুসলমানদের কল্যাণের জন্য কি করছে এটা কোনো প্রশ্নই নয় – প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বের মুসলমানদের সর্বনাশের জন্য সৌদি বাদশারা কি না করছে? বিশ্বের মুসলমান তো বটেই বিশ্বের প্রতিটি শান্তিকামী মানুষের জীবনে চরম অভিশাপ রূপে যে মার্কিন-বৃটিশ নেতৃত্ব একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ দিয়ে চলছে সৌদি বাদশারা। তাদের সমর্থনে রয়েছে আরব বিশ্বের অন্যান্য শেখ, রাজা, বাদশারাও।

সৌদি নেতৃত্বের এই ‘শয়তানের দোসর’ ভূমিকার কারণ খোঁজার জন্য শুধু একটা প্রশ্ন মনে জাগালেই যথেষ্ট। গাছ থেকে আপেল পড়ার অতিপরিচিত দৃশ্যের মতোই অতিপরিচিত একটা বিষয় নিয়েই করা এই প্রশ্নটি। প্রশ্নটি হচ্ছে পবিত্র ভূমি মক্কা ও মদিনা অবস্থিত যে রাষ্ট্রটিতে তার নামটি সৌদি আরব কেন? কি সম্পর্ক রাসুলের সঙ্গে এই ‘সৌদি’ শব্দের? কি সম্পর্কই বা রয়েছে ইসলামের সঙ্গে এই ‘সৌদি’ নামের? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য দৃষ্টি দেয়া যাক ইতিহাসের পাতায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রণীত ‘ইসলামি বিশ্বকোষ’-এ সৌদি আরবের যে ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে প্রসঙ্গের প্রয়োজনে এখানে তা থেকে প্রয়োজনীয় অংশ তুলে ধরা হলো বর্তমান সংলাপ-এর পাঠকদের জন্য।

সা’উদ রাজবংশের নামে রাসুল (সাঃ)-এঁর আরব!

আজকের সৌদি আরব রাষ্ট্রটির নামের আগে যে শব্দটি পরিচিতিমূলক বিশেষণ হিসেবে এঁটে রয়েছে তার সঙ্গে ইসলামের কোনোই যোগসূত্র নেই। নেই দ্বীনের নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এঁর কোনো যোগাযোগ। সা’উদ রাজবংশের নামে কিনা পরিচয় সেঁটে দেয়া হয়েছে পবিত্র ভূমির! সপ্তদশ শতাব্দির প্রারম্ভে মধ্য আরবের দার’ঈয়ায় প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ আমিরাতের শাসনকর্তা সা’উদ ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন মাকরান-এর নামেই নামকরণ করা হয় আজকের সৌদি রাজবংশের। যা থেকে বর্তমান সৌদি আরব!

সা’উদীরা ধ্বংস করে দেয় কারবালায় ইমাম হুসেনের (রাঃ) সমাধি!

১৭৬৫ থেকে ১৮০৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সৌদি বাদশা আব্দুল আযীয (প্রথম) ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন সা’উদ শিয়া সমপ্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ থেকে ১৮০১ সালে কারবালা আক্রমণ করেন এবং দখল করেন। এ সময় তার সৈন্যরা ইমাম হুসেনের (রাঃ) সমাধি ধ্বংস করে দিলে শিয়ারা আযীযের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। পরিণামে এক শিয়া ঘাতক ১৮০৩ সালের ৩ নভেম্বর দার’ঈয়ার আল তারাইফ মসজিদে নামাজরত অবস্থায় বাদশা আব্দুল আযীযকে হত্যা করে। কেবল কারবালা দখলই নয় বর্বরদের মতো দখল করার দস্যুতায় ভরে আছে সা’উদ রাজবংশের ইতিহাস। সে সময়কার মক্কায় স্বাধীন শাসনকর্তা গালিবের সঙ্গেও যুদ্ধ বাঁধে সা’উদ বাদশা আযীযের। এরই ধারাবাহিকতায় দেখা যায় আযীয নিহত হওয়ার পর ক্ষমতাসীন তার পুত্র সা’উদ ইব্‌ন আব্দুল আযীয ১৮০৪ সালে মদিনা দখল করেন এবং সেখান থেকে তুর্কী নাগরিকদের তাড়িয়ে দেন। অথচ তারাও ছিলো মুসলমান। তাদের অপরাধ তুর্কী শাসকরা সা’উদ রাজবংশের বিরুদ্ধে ছিলো। এই তুর্কী-সা’উদী বিরোধের জের ধরে ১৮১৮ সালে পরবর্তী বাদশা আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন সা’উদ ইস্তাম্বুলে নিহত হন। সা’উদ রাজবংশের রাজ্যলিপ্সা ও নীতিহীনতার জন্য উচ্চ মূল্য দিতে হয় এই বংশের আরেক বাদশা তুর্কী ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন সা’উদকেও। ১৮৩৩ সালে রিয়াদের কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজরত অবস্থায় প্রাণ দিতে হয় তাকে তারই বংশীয় মুশারী ইব্‌ন আব্দুর রাহমানের হাতে।

ভোগ-বিলাস ক্ষমতায় মদমত্ত সা’উদীদের নিরন্তর অন্তর্কলহ খুনোখুনি সীমাহীন ভোগ বিলাস, নীতিহীনতা আর ক্ষমতায় মদমত্ত সা’উদ রাজবংশের গুণধর যুবরাজদের অন্তর্কলহ আর খুনোখুনি যেন এদের ভেতরগত চরিত্রেরই বাহ্যিক প্রকাশ। এই গত সত্তরের দশকেই সৌদি আরবে ক্ষমতাসীন ছিলেন বাদশা ফয়সল। ১৯৭৫ সালে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তারই ভ্রাতষ্পুত্রের হাতে নিহত হন তিনি। এটাও ছিলো ১৮৩৩ সালে রিয়াদে নিহত বাদশা তুর্কী ইব্‌ন আব্দুল্লাহ্‌র খুনেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। ১৮৪১-৪৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন বাদশা আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌ন ছুনয়্যানকে ১৮৪৩ সালে স্ববংশীয় ফয়সল ইব্‌ন তুর্কী বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করলে সেখানেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু ঘটে তার। ১৮৬৫-৭১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন অপর বাদশা আব্দুল্লাহ্‌ ইবন্‌ ফায়সালকে ১৮৭১ সালে তার ভাইয়েরা তলোয়ারের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করে। সা’উদ রাজবংশের এই অন্তর্কলহের ফলে সৃষ্ট দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই বোধ করি ১৮৮৪ সালে তারা ক্ষমতা হারায় পার্শ্ববর্তী হাইমের রাশিদী বংশের কাছে। পরবর্তীতে ১৯০২ সালে সা’উদ বংশীয় আব্দুল আযীয ইব্‌ন সা’উদ রাতের অন্ধকারে ৬০/৭০ জন অনুসারী নিয়ে রিয়াদ নগরী দখল করেন এবং রাশিদী বংশের ওয়ালী আজলানকে হত্যা করে সাউদ রাজবংশের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এবং ১৯১০ সালে মক্কা নগরী দখল করেন।

সা’উদরা পবিত্রভূমির সার্বভৌমত্ব তুলে দেয় তাদের বৃটিশ-মার্কিন প্রভুদের হাতে।

অতি সমপ্রতি লন্ডনে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পর লন্ডনের মেয়র লিভিংস্টোন বিবিস্থির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পাশ্চাত্য দেশগুলো তেলের প্রয়োজনে আজও আরবদের মাথার উপর ছড়ি ঘোড়াচ্ছে। তিনি বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা দুনিয়া যদি আরবদের ভাগ্য নিজেদেরই নির্ধারণ করার সুযোগ দিতো তাহলে লন্ডনে বোমা হামলার সুযোগ ঘটতো না।

লিভিংস্টোনের এই উচ্চারণের সত্যতা ধরা পড়ে ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রণীত ইসলামি বিশ্বকোষে বর্ণিত ইতিহাসে।  এ থেকে কিছু অংশের উদ্ধৃতি দিলে বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যাবে। ‘বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য বহুলাংশে ব্রিটেনের সৃষ্টি’ – এ মন্তব্য করা হয় ইসলামি  বিশ্বকোষে। এতে উল্লেখ করা হয় ১৯২১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল জেরুজালেমে এক নৈশভোজের পর ‘দীর্ঘ আলোচনায় চার্চিল ঠিক করলেন ট্রান্স জর্ডান নামক একটি ছোট দেশ সৃষ্টি করে তার আমীর বানানো হবে আব্দুল্লাহ্‌কে। এখানে থাকবে ব্রিটেনের ঘাঁটি। বেদুঈন উপজাতিদের নিয়ে একদল সাহসী সৈনিক গঠিত হবে একজন ইংরেজ সেনাপতির অধীনে। ব্রিটেন আর্থিক সাহায্য দিয়ে রাজকোষের ঘাটতি পূরণ করবে। বিনিময়ে আব্দুল্লাহ্‌ ইংরেজের বিশ্বস্ত ও বশংবদ মিত্রে পরিণত হবে।’

বৃটিশরা আব্দুল আযীয ইব্‌ন সা’উদকে মাসিক মাসোহারা দিতো মাত্র পাঁচ হাজার পাউন্ড! বিনিময়ে ব্রিটেন নির্ধারণ করতো তাদের বৈদেশিক নীতি! ‘১৯৭৩ সালের মে মাসে ব্রিটেন সাউদি আকাশসীমা বিপদমুক্ত রাখবার ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির কথা ঘোষণা করে।’

অপরদিকে, ১৯৫১ সালে এক চুক্তির বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাহরান বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকার পায়। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে ঘোষিত এক যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, ‘সাউদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করবার জন্য সাউদি জাতীয় রক্ষী বাহিনী আধুনিকীকরণের দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর দেয়া হচ্ছে।’

বলা বাহুল্য, মার্কিন-বৃটিশ প্রভুদের হাতে নিজেদের ভাগ্য সঁপে দেয়ার এই সাউদি নীতিরই ধারাবাহিকতায় ইরাক-আফগানিস্তানে নির্বিচারে মুসলমান নিধনে মার্কিন-বৃটিশ আধিপত্য শক্তি ব্যবহার করছে। পাচ্ছে পবিত্র ভূমির মাটি এবং রসদসহ যাবতীয় সমর্থন-সহায়তা। সাউদি বাদশাদের এই মার্কিন-বৃটিশ পদলেহী স্বভাবের পরিবর্তন ব্যতীত এ অবস্থার পরিবর্তন এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ প্রশ্নে তাই আজ বিশ্বের মুসলমানদের প্রয়োজন সোচ্চার হয়ে ওঠা। জোরালো  চাপ প্রয়োগ করা দরকার বর্তমান সৌদি নেতৃত্বের উপর। তার আগে দরকার এই আওয়াজ তোলা – ‘পবিত্র ভূমির নাম বদলাও। সৌদি আরব নয়, পবিত্র ভূমির নাম হতে হবে মুহাম্মদী আরব। মুহাম্মদী চরিত্রের নেতৃত্ব চাই পবিত্র ভূমির মাটিতে।’

বর্তমানে সৌদির বাদশাহ বিশ্ব মুসলমানের প্রাণের দাবি মেনে নিয়ে কি দেশের নাম পরিবর্তন করে ‘মুহাম্মদী আরব’ রেখে কুরআনিক ‘মুসলিম’ হওয়ার জন্য বিশ্ব-মুসলিমকে আহ্বান জানিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন???!!!

তথাকথিত জিহাদের বিরুদ্ধে জিহাদ

সংলাপ ॥ কোন রাষ্ট্রই এখন দার-উল হরব বা ধর্মযুদ্ধের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ নয়। সবদেশেই এখন সমবেত ধর্ম র্চচা ও চর্যা হয়। বিশ্বে মুসলমানদের আত্মপরিচয়েও সঙ্কট নেই। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পরের সঙ্কট থেকে মুক্তির জন্য-মক্কার ইমাম, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুফতি এবং ভারতীয় উলামারা ফতোয়া জারি করে এই মর্মে যে ভারতবর্ষ ধর্মযুদ্ধের দেশ নয়। ওই ফতোয়া জানিয়ে দেয়া হয়েছিল মুসলিম উম্মাকে। ভারতবর্ষ ভাগের পর সাময়িক বিভিন্ন সংশয় তৈরি হলেও গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ আবহ প্রতিটি জনগোষ্ঠির সর্বমুখী নিরাপত্তাকে ক্রমাগত মজবুত করেছে। বাণিজ্যে, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে সবার অবাধ অংশগ্রহণ সব রাষ্ট্রে স্বীকৃত। আরেক অর্থে, ইন্দোনেশিয়া কিংবা পাকিস্তানের জনসংখ্যার তুলনায় বর্তমান ভারতই বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত, যেখানে রাষ্ট্র এবং সংবিধান তাদের প্রতিটি অধিকারকে গণ্য করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষারোহণের দরজাকেও উন্মুক্ত রেখে। দূরের কিংবা কাছের মুসলমান দেশ যা পারেনি, ভারত তা পেরেছে অনায়াসে, নিঃসংশয়ে। ভারতের পথ নৃশংস, নৈরাজ্যের উপাসকদের  সামনে অনুকরণযোগ্য না-ও হতে পারে-কিন্তু সত্যের রাস্তা বলে যে মহাআদর্শ বাতলে দিয়েছেন উপমহাদেশের সূফিরা, যে সড়ক বেয়ে হাঁটতে চেয়েছিলেন সাধককূল, যে প্রজ্ঞা আর বাস্তবতার

মিলনে গড়ে উঠেছে ভারতে বহুমাত্রিক সমাজের ভিত আর নিবিড় বন্ধন, তথাকথিত হিন্দুত্ব ও ‘জেহাদিদের’ অস্ত্র ও কৌশলে আক্রান্ত আজ তার অস্তিত্ব।

তথাকথিত হিন্দুত্ব বা জেহাদির কোনও দেশ নেই, সীমা নেই। বর্বর হলেও তারা আন্তর্জাতিক। সর্বদলীয়  বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা অনেকবার বলেছেন, সন্ত্রাস নিয়ে রাজনীতি নয়। অপরদিকে অভ্যন্তরীণ সঙ্কটে অবরুদ্ধ এবং সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে লালন করে পাকিস্তান প্রায় দুই দশক ধরে পুষে নিজের এবং উপমহাদেশের বিপদ খাড়া করে রেখেছে। তাদের বিদেশমন্ত্রীও বলেছেন, সন্ত্রাস নিয়ে রাজনীতি বন্ধ হওয়া দরকার। সীমানার ভেতরে কিংবা বাইরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাষ্ট্র গঠনই যেমন সন্ত্রাসবাদীদের লক্ষ্য, তেমনই তাদের যে কোনও হামলার পর লাশ এবং মুমূর্ষুকে সামনে রেখে ভোটের পীড়াদায়ক হিসেব-নিকেশও অব্যাহত।

উপমহাদেশের সংবাদমাধ্যম রাজনীতির এ সব নোংরামির প্রতিবাদ করছে। সব রাষ্ট্রে ক্ষুব্ধ জনমতও প্রবল হয়ে উঠছে। সঙ্ঘবদ্ধ এবং বহু নামে পরিচিত জঙ্গিদের কারা প্ররোচিত করছে, কারা অস্ত্র যোগাচ্ছে- তার তল স্পর্শ করা কঠিন। কিন্তু জালিমের লক্ষ্য খুবই পরিষ্কার। নিরীহ মানুষ তাদের প্রধান ও প্রথম লক্ষ্য। উন্মাদনা আর বিদ্বেষ ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে ফাটল তৈরিও আরেক লক্ষ্য। তাই সব দেশে নিরস্ত্র জনশক্তির লড়াইও দ্বিমুখী। উন্মাদনার পূজারিদের বিরুদ্ধে, বিদ্বেষের  বিরুদ্ধে, তথাকথিত জিহাদিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদ অপরিহার্য। উপমহাদেশে বিদ্বেষ ছড়াতে চায়  বলেই তথাকথিত জিহাদিরা সমপ্রদায়- ঘেঁষা আরবী ও স্থানীয় ভাষায় নাম এবং ধর্মীয় ভাবাবেগকে প্রায় অবাধেই ব্যবহার করছে। মুহাম্মদী ইসলাম অবশ্য তাদের মুসলিম মানতে রাজি নয়। উপমহাদেশে যারা ধর্মবিশেষজ্ঞ এবং বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তারা এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ফতোয়া (ধর্মীয় উপদেশ) জারি করে বলেছেন, ইসলামে, ইসলামি সমাজে সন্ত্রাসের জায়গা নেই। সন্ত্রাসীরা ইসলামের প্রধান শত্রু।

উপমহাদেশের পন্ডিতরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেননি, সমপ্রতি ভারতের প্রতিটি শহরে গণসম্মেলনে জড়ো হয়ে জনমত গঠনে সরব হয়েছেন। পাকিস্তানও সরব হচ্ছে। উলামাদের সহ বাংলাদেশেও জনবলকে সঙ্ঘবদ্ধ করা দরকার। কিন্তু এই দায়িত্ব কে নেবে? যারা নিজেদের সচেতন মনে করেন, বুদ্ধিজীবী বলে সমাজে যাদের পদচারনা, যারা রাজনীতির ভেতরে আছেন, বাইরে আছেন, যারা সামান্য সঙ্কটে কিংবা শোকে হই হই করে শহীদ মিনারের দিকে বেরিয়ে পড়েন-তারা এত উদাসীন কেন? এ কীসের লক্ষণ? সংশয়, ভয়, না নৈঃশব্দের? গণতান্ত্রিক উপমহাদেশ বহু সঙ্কট দেখেছে। লড়তে লড়তে অতিক্রমও করেছে দুর্গম গিরি। দাঙ্গা, গণহত্যা বাঙালির বাংলাকে রুখতে পারেনি। জনশক্তির সরব কিংবা নীরব বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাংলার মাটি স্বমহিমা অক্ষুন্ন রেখেছে। সন্ত্রাসকেও এই পথে রুখবে। তার চিরায়ত ঐতিহ্য, তার লোকায়ত সত্তা আর বহুমতের সুন্দরকে প্রতিটি মুহূর্তে যারা ভয় দেখাচ্ছে, তথাকথিত জিহাদের নামে কলঙ্কিত করছে ইসলাম ধর্মকে, রাজনীতি না চাইলেও আজ কিংবা কাল কিংবা পরশু যুবশক্তির সাথে ধর্মভীরু সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামবে, অবিলম্বে তথাকথিত জিহাদিদের বিরুদ্ধে শুরু হবে সত্যকারের এক জিহাদ। যাদের দেশ নেই, সীমা নেই, বিবেক নেই, আদর্শ নেই, আত্মীয় নেই, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না, আবর্জনা বানিয়ে ফেলে দেয় আস্তাকুড়ে দেয়।

সর্বনাশকে বিনাশ করেই হয় সভ্যতার উত্তরণ। এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। পৃথিবী এখন উপদ্রুত অঞ্চল। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের মোকাবিলা করেছে, কিন্তু গত তিন দশকে সন্ত্রাসের এমন বিশ্বায়ন এবং সংক্রমণ বিরল বলেই সব সংশয়, সন্দেহ, আঞ্চলিক বিরোধকে রুদ্ধ করে দুনিয়া জুড়ে বীভৎসের বিরুদ্ধে শুরু হতেই হবে সংহত যুদ্ধ-তথাকথিত জিহাদের বিরুদ্ধে জিহাদ।

প্রাপ্তির সৌন্দর্য লালনে……. জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শুরু করা হোক প্রতিটি অনুষ্ঠান

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ যে জয় বাংলা ধ্বনি আমাদেরকে শক্তি যুগিয়েছিলো, যে জয় বাংলা হুঙ্কার দিয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বাঙালি, যে ধ্বনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রাণের ধ্বনি হয়ে উঠেছিলো, কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে সেই জয়ধ্বনি! কাদের ষড়যন্ত্রে স্বাধীনতার পরপরই হারিয়ে যাচ্ছে সেই ধ্বনি। যে জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ যন্ত্র ও গলায় শুনে উদ্দিপ্ত হয় বাঙালি, যে আনন্দানুভূতি বর্ণনা করা যায় না, যে সঙ্গীত শুধু রবীঠাকুরের নয়; মিশে গিয়েছে আমাদের অন্তরাত্মার সঙ্গে প্রকৃতির সঙ্গে, যে ভাষা আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় বৃক্ষরাজি এককথায় বাংলার প্রকৃতির সাথে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সেই ধ্বনি, ভাষার মাধুর্যকে, হিন্দুয়ানী অস্ত্র আরোপ করে ধর্মান্ধদের ষড়যন্ত্রে আজ বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। বাংলা ভাষা এদেশের সকল ধর্মের মানুষের ভাষা। আর আমরা মুসলমানরা খাঁটি বাংলা ভাষা থেকে সরে এসে এক মিশ্রভাষায় কথা বলছি। ধর্মের নামে পাকিস্তানী, ফার্সি, আরবি বাংলার সঙ্গে মিশিয়ে এক জগা খিচুড়ি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে আজ। আমরা বলতে পারছি না বিধাতা বা প্রভু ক্ষমা করো। হৃদয়ের গভীর থেকে উত্থিত হয়ে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা হবে হৃদয় নিংড়ানো সেখানে ভাষার কোনো বাঁধা থাকতে পারে না। ভাষা মানুষের মনের ভাব আবেগ অনুভূতি প্রকাশের জন্য, সেখানে কোনো শর্ত আরোপ চলে না। রাজনীতি চলে না। ভাষার জন্য মানুষ ধর্ম ত্যাগী হয় না। ভাষার বৈচিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ্ তাআলার সৃষ্টি সুরা আর রহমানে উল্লেখ আছে আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টি করেছেন তারপর তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।

সুরা রুম এর ২২ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তার নির্দেশনাবলীর মধ্যে রয়েছে মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বৈচিত্র।’ মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ্পাক আরো বলেছেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ সকল ঐশী গ্রন্থের মতই হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এঁর মাতৃভাষা আরবীতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি আরবী ভাষী না হলে কুরআন আরবী ভাষায় হতো না। এরকম আরও অনেক আয়াত আছে যাতে ভাব প্রকাশের জন্য মাতৃভাষার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেমনঃ- আমি তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে (দু খানঃ ৫৮)। আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে যাতে তোমরা বুঝতে পার (যুকরূফঃ ৩)। আমি যদি আজমী ভাষায় (আরবী ছাড়া অন্য ভাষায়) কুরআন অবতীর্ণ করতাম তারা অবশ্যই বলতো এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিকৃত হয় নাই কেন? কি আশ্চর্য যে এর ভাষা আজমী অথচ রাসূল আরবীর, বল মুমিনদের জন্য ইহা পথ নির্দেশ ব্যধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্নে রহিয়াছে বধিরতা এবং কুরআন হবে এদের জন্য অন্ধত্ব এবং এমন যে, যেন এদেরকে আহ্বান করা হয় বহুদূর হতে (হামিম সিজদাঃ ৪৪)। আমি যদি ইহা কোনো আজমীর কাছে অবতীর্ণ করতাম এবং সে উহা পাঠ করে তাদেরকে শুনাতো তবে তারা উহাতে ঈমান আনতো না। (শুয়ারাঃ ১৮৯-১৯৯)।

ধর্মান্ধরা কুরআনে কোনো নির্দেশনা নেই এমন বিষয়কেও শুধুমাত্র হাদিস অথবা ইজমা, অথবা কিয়াসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার হীন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আর মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে এত স্পষ্ট বর্ণনা কুরআনে থাকার পরও তাদের অন্তরে মোহর মারাই আছে।

আরবী প্রীতি তাদের এতটুকু কমেনি তারা প্রচার করে যাচ্ছে আরবী পড়লে নেকি, শুনলে নেকি, প্রতি হরফে হরফে দশ নেকি মানে ফেরাউনের নাম নিলেও দশটা নেকি পাওয়া যাবে। এই নেকির মূলা ঝুলিয়ে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছে, মানব জাতিকে মুসলমানদেরকে। এমন কি আরবী ঢংএ পোশাক পরিচ্ছদ টুপি, দাড়ি, খোরমা জয়তুন সব কিছুর মধ্যে তারা নেকি খুঁজছে। কই কুরআন তো বাংলাদেশের একটা ফলেরও নাম পর্যন্ত উল্লেখ নেই, যা আছে সব আরব দেশের। মুহম্মদ (সাঃ) বাঙালি হলে তিনি আম, জাম, কাঁঠালের কথাই বলতেন। কাজেই বাঙালির জন্য পথ প্রদর্শক বাঙালি। আর তথাকথিত ধর্মান্ধ মুসলমানরা এদেশের মাতৃভাষাকেও কেড়ে নিতে চেয়েছিলো। বাঙালি তা হতে দেয়নি ভাষার জন্য রক্ত পর্যন্ত দিয়েছে।

মাতৃভাষায় মত বিনিময় যত সহজ, ধর্মপ্রচার যত সহজ তা আর কোনো ভাষায় সম্ভব নয়। ধর্ম না বোঝার জিনিস নয়, ধর্ম ভালোভাবে বুঝে পালন করার বিষয়; আর তা মাতৃভাষাতেই একমাত্র সম্ভব।

ছোট বেলা থেকে ইংরেজী শেখার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ছিলো আমারও। বাংলায় যারা অনার্স পড়তো, মাস্টার্স করতো তাদেরকে মনে হতো কোথাও চান্স না পেয়ে বাংলায় পড়ছে, আর আজ মনে হচ্ছে কেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়লাম না। মাতৃভাষা বাংলার জন্য আজ আমার হৃদয়ে যে পিপাসা সৃষ্টি হয়েছে তা একান্ত আমার। কিন’ আজ আর সময় নেই ভুল সংশোধনের। মানুষ বোধ হয় হারিয়েই মর্যাদা বুঝতে পারে কোনো কিছুর। আমি অনুভব করতে পারি মাইকেল মধুসুদন দত্তের আক্ষেপ, যা তিনি বঙ্গভাষা কবিতায় প্রকাশ করে গেছেন, এটাই সত্য।

তিনিও ইংরেজী সাহিত্যে একজন বড় কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। বেথুনের কাছে তার ইংরেজী সাহিত্য চর্চার কিছু নথি জমা দিয়েছিলেন। বেথুন তার প্রশংসার পাশাপাশি এও বলেছিলেন যে, এই অনুশীলন তিনি (মধুসুদন দত্ত) মাতৃভাষায় করলে ভালো করতেন। বেথুনের বাণীতে তিনি শম্বিত ফিরে পান এবং বঙ্গভাষা কবিতা লিখেন, নিজের ভাবেই তিনি মাতৃভাষায় সাহিত্য চর্চায় ভালোভাবে মনোনিবেশ করেন।

জ্ঞানী গুণীজন নানানভাবে প্রকাশ করে গেছেন মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে। সবচেয়ে বড় কথা নিজে অনুভব না করলে কারো বাণী ভিতরে প্রবেশ করে না। আজ লিখতে গিয়ে দেখছি, নিজের ভাষাকে কত ভাবে প্রকাশ করা যায়। যে শব্দের আভিধানিক অর্থও ভালোভাবে জানিনা শুধু শুনেছি জন্ম থেকে অবলীলায় তা ব্যবহার করে ফেলি ঠিক জায়গা মত। কত রংএ  ঢংএ নিজেকে প্রকাশ করতে আরবি আর ইংরেজী ভাষার প্রতি কত দুর্বলতা উপলব্ধি করছি, প্রচেষ্টা চালিয়ে দাঁত বসাতে পারি না ইংরেজী সাহিত্যে তবুও চেষ্টা চালাচ্ছি। ভাষা কোনো রকম বুঝতে পারলেও সাহিত্য বোঝা খুব কঠিন। আর দশ লাইন ইংরেজী লিখেও নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি না পুরোপুরি। মনে হচ্ছে মাতৃভাষা বাংলা আমার বুকের মধ্যে বসে আছে মিশে আছে সমগ্র সত্তার সাথে রক্তের সাথে যা বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়। আমি দেখেছি আমরা অন্যভাষায় কথা বলতে গেলেও আগে মাতৃভাষায় চিন্তা করে অনুবাদ করে বলি। মানুষ তার মাতৃভাষাতেই চিন্তা করে, প্রেম করে, মহব্বত করে, ভালোবাসে, স্নেহ মায়া মমতা অনুভূতিগুলোকে লালন করে।

মাতৃভাষাতেই সে স্বপ্ন দেখে। মাতৃভাষাকে যারা অবজ্ঞা করে অন্য ভাষায় কথা বলতে পারা কৃতিত্ব মনে করে তাদেরকে আমার আজ মনে হয় মেকী নকল, এক সময় চিটাগাংএর মানুষকে নিয়ে আমি খুব হাসতাম। আজও মানুষ তিরস্কার করছে চিটাগাং সিলেটের মানুষকে নিয়ে। যারা নিজের দেশীয়রা একত্রিত হলেই চিটাগাং সিলেটের ভাষায় কথা বলে। আমিও অবাক হয়ে ভাবতাম, কি স্মার্ট স্মার্ট মেয়েগুলো যারা চিটাগাং গার্লস কলেজে আমার সঙ্গে পড়তো। নিজেরা একত্রিত হলেই, চিটাগাংএর ভাষায় অবলীলায় কথা বলতো, ভালো লাগতো না আমার কাছে। আর আজ মনে হচ্ছে নিজেদের মধ্যে নিজেরা মাতৃভাষায় কথা বলার মধ্যে দারুন একটা আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়া যায় এবং আমি দেখেছি যারা খুব সহজ সরল প্রকৃতির এবং আন্তরিক তারাই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে বেশিরভাগ। জ্ঞানী গুণীজনরা বলেন যে তার মাতৃভাষায় দক্ষ সে অন্য যে কোনো ভাষায় দক্ষ হতে পারে। আর মাতৃভাষার দূর্বল হলে সে কোনো ভাষাই ভালোভাবে শিখতে পারে না। উদাহরণ স্বরূপ ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার একজন দিকপাল, তিনি অন্য আরো আঠারোটি ভাষা রপ্ত করেছিলেন। স্থান, কাল, পাত্র অবস্থান ভেদে শুদ্ধ কথা বলা যেতে পারে অন্যভাষাও ব্যবহার ও শিখা যেতে পারে তা খুবই ভালো কিন্তু মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়।

ধর্মপ্রচার করতে গেলে বিশ্বমানবতার সাথে মত বিনিময় করতে গেলে বিভিন্ন ভাষা জানা প্রয়োজন আছে নবীজীও মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষা শিখতে সাহাবাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।

সাহাবাদের মধ্যে অনেকেই আরবী ভাষা ছাড়াও অন্যান্য ভাষা যেমন পার্শিয়ান মিশরীয় রোমান ও আফ্রিকান ভাষা জানতেন এবং এসমস্ত দেশে ধর্ম প্রচার করেছেন আবার বক্তৃতা বিবৃতিতেও পারদর্শী ছিলেন।

নিজের মাতৃভাষাকে সম্মান করার পাশাপাশি অন্যের ভাষাকেও সম্মান করতে হবে। ভাষায় বৈচিত্র যেহেতু আল্লাহই সৃষ্টি সেহেতু কোনো ভাষাকেই অনৈসলামিক বলা যাবে না। এই অনৈসলামিক বলে বলে, বিধর্মীর ভাষা বলে বলে, ধর্মান্ধরা আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলাকে কলুষিত করে ফেলেছে, মিশ্র করে ফেলেছে, কৃত্রিম করে ফেলেছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে এই বদ্ধ অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য। প্রশান্ত জলাশয় কতদূর, কতদূর, কতদূর জানিনা।

ভাষার মধ্যে যেহেতু ইসলাম নেই আছে চর্যার মধ্যে কাজেই প্রত্যেককে তার মাতৃভাষায় কুরআনকে অনুবাদ করে পড়তে হবে, বুঝতে হবে, অনুশীলন করতে হবে।

মা, মাতৃভূমি, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির স্বাধীনতা একসূত্রে গ্রথিত। এক থেকে অপরকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। যে তার মাতৃভূমিকে ভালোবাসে না, মাতৃভাষাকে ভালোবাসে না সে তার মাকে ভালোবাসতে পারে না। পারে না, পারে না। ইসলাম ধর্মে মাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

দেশপ্রেম মানুষের চিন্তা জগতে চেতনার এক উন্নত অবস্থা। দেশপ্রেমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে, নিজের দেশের কৃষ্টি সভ্যতা, সংস্কৃতি ঐতিহ্য দেশের প্রকৃতি আবহাওয়া, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের মানুষকে ভালোবাসা। যে প্রাকৃতিক লীলাভূমির মধ্যে মানুষ বেড়ে ওঠে শৈশবের স্মৃতি জড়িত থাকে তার প্রতি নির্ভেজাল দুর্নিবার আকর্ষণই হলো দেশপ্রেম। তার স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাও ঈমানের অঙ্গ। মানুষ জন্মগত ভাবেই স্বাধীনচেতা। স্বাধীনতা কেউ কাউকে দিতে চায় না অর্জন করতে হয়। স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। স্বাধীনতার চেতনাই ব্যক্তি পর্যায় থেকে ক্রমে রাষ্ট্র পর্যায়ে চলে আসে। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে, শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনচেতারা যুদ্ধ করে পৃথিবীর মাঝে যে জাতি নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তার জন্য কত রক্ত, কত জীবন দিতে হয়েছে তা সবসময় স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

মহানবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ)ও তাঁর জন্মভূমি মক্কাকে কত ভালোবাসতেন, তার প্রমাণ মিলে জন্মভূমির মানুষের শত নির্যাতনেও তাদের মঙ্গলের জন্য তিনি কাজ করে গেছেন, তাদের অত্যাচারে মদিনায় হিজরত করার সময় তিনি মক্কার দিকে বার বার ফিরে তাকান আর কাতর কন্ঠে আফসোস করে বলেন, ‘হে আমার স্বদেশ তুমি কতই না সুন্দর, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার আপন জাতি যদি ষড়যন্ত্র না করতো আমি কখনও তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ জন্মভূমির প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণে তিনি ৬৩০ খৃষ্টাব্দে বিজয়ীর বেশে মক্কায় ফিরে আসেন। যাদের অত্যাচারে দেশ ত্যাগ করেছিলেন তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন প্রত্যেক মানুষের উচিত দেশকে ভালোবাসা। যে লোক নিজের দেশকে ভালোবাসেনা সে প্রকৃত ঈমানদার নয়।

যাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে এবং যারা আপন মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছে তারা স্বীয় মাতৃভূমি উদ্ধার ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করবে এর নির্দেশও আছে। আল্লাহ্ কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন, এ সমস্ত লোকদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো। যারা (শত্রু কর্তৃক) আক্রান্ত হয়েছে কেননা তাদের প্রতি অত্যচার করা হয়েছে, আর নিশ্চিত যে আল্লাহ্ তাদের জয়যুক্ত করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। তাদের মাতৃভূমি থেকে তাদেরকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে এজন্য যে তারা বলে আমাদের প্রভু আল্লাহ্ (সুরা আল হাজ্জঃ ৩৯) একাত্তরে শত্রু  কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে যুদ্ধ করে প্রান দিয়ে যারা দেশকে স্বাধীন করেছিলেন তারা শহীদ, তাদের মর্যাদা অতি উন্নত। দ্বীনের জন্য মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য যারা শহীদ হন তাদেরকে কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ পথে নিহত হয় তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা বুঝতে পারো না। (সুরা বাকারাহ্ : ১৫৪) পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘আর যারা আল্লাহ্ রাস্তায় নিহত তাদেরকে আপনি কখনো মৃত মনে করবেন না বরং তারা নিজেদের প্রতিপালকের নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।’ (সুরা আল ইমরান আয়াত -১৬৯)

তাই আর একবার জয় বাংলা ধ্বনি তুলে জয় বাংলা হুঙ্কার দিয়ে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় এসেছে। জনগণ সেই হুঙ্কার দেবার জন্য তৈরী হয়ে আছে শুধু একটা দেশ প্রেমিক আহবানের দরকার। খুন খারাবি অত্যাচার, ব্যভিচার, অবিচারে দুর্নীতি দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিরাপত্তা হীনতা বিদ্যুতের অভাব পানির অভাব সবকিছু মিলিয়ে দেশ এক সঙ্কটময় ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে একজন মুক্তিদাতার জন্য। সে আহবান কে দেবে। নতুন একটা প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে আছে জনগণ।

যারা এই মাতৃভূমিকে মাতৃভাষাকে এর স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়।

এদেশের ক্ষমতালোভী রাজনীতিকরা আর ধর্মান্ধরাই দায়ী আজকের বাংলার এবং বাংলার মানুষের এই বিপর্যয়ের জন্য। তাদেরকে চিহ্নিত করে মুহাম্মদী ধর্ম জেনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এখনই সময়। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান – ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সত্যের সাথে একাত্ম হয়ে যান। বাংলা আমাদের সবার মাতৃভূমি, আগে আমরা বাঙালি তার পর মুসলিম, হিন্দু, খৃষ্টান, বুদ্ধ।

তাই সময়ের দাবি, বাঙালি জাতির জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শুরু করা হোক প্রতিটি অনুষ্ঠান এবং ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি আবার ধ্বনিত হোক সবার কন্ঠে।

বঙ্গবন্ধু

bangabandhuসংলাপ ॥ ১০ জানুয়ারি প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পান, সে সময়টায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একটা মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে যান। বিশ্বের প্রায় সকল দেশের স্বীকৃতি আদায় করেন। তিনি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে যখন আদর্শিক দল গঠন করার দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, তখনই স্বাধীনতার পরাজিত শক্তির দেশি বিদেশি চক্রান্তকারীরা নির্মম নৃশংসভাবে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালি জাতির আত্মার আত্মীয়। তাঁর স্মরণ, তাঁর নাম, তাঁর ছবি কাল থেকে কালান্তরে অক্ষয় এবং বর্তমান।

সময়ের সাফ কথা…. দেশপ্রেমে স্বঘোষিত দেশপ্রেমিক!

নজরুল ইশতিয়াক ॥ পরিচিত মুখগুলো সুযোগ পেলেই দেশপ্রেমের গভীর থেকে গভীর অভিব্যপ্তি আর কঠিন দায়িত্বশীলতা প্রমাণ করতে চিৎকার চেঁচামেচিতে ভারি করে বাংলার আকাশ বাতাস। মনে হয় দেশপ্রেমের ইজারাদাররা জনগণকে পরামর্শের পর পরামর্শ দেয়ার স্বঘোষিত দায়িত্ব পালনের জন্য জীবন উৎসর্গ করছেন। কি চমৎকার তাদের যুক্তি আর অসহায়ত্ব? একটি রাজনৈতিক দল আরেকটি দলকে, একটি লুটেরাগোষ্ঠী আরেকটি  লুটেরাগোষ্ঠীকে, একটি সুশীল গোষ্ঠী আরেকটি পক্ষকে দেশপ্রেমের কাল্পনিক অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করতে সদা সচেষ্ট। বহুমাত্রিক ফর্মুলা আর বহুধা বিভক্ত মিথ্যাচারের আর্বতে দেশপ্রেম শব্দটির অস্তিত্ব বিপন্নপ্রায়। আগে তো জানা দরকার দেশ কি, তারপর দেশ প্রেম। দেশ কি, কি তার চরিত্র, বৈশিষ্ট আর বিদ্যমান অবস্থা; অপর দিকে প্রেম কিভাবে কেন কোন গোপন আকাঙ্খা থেকে জাগ্রত হলো এসবই নানামুখি বিশ্লেষণের বিষয়। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উত্থাপিত হবে দেশপ্রেম এবং দেশপ্রেমিক বলতে আমরা কাদেরকে বুঝবো। দেশপ্রেমের সংজ্ঞা কি? কার কাছে দেশ কিভাবে ধরা দেয়? কে কিভাবে দেশকে ধারণ করে কোন পথে নিয়ে যেতে চায়? দেশ পরিচালনার নিক্তি কি হবে আর তার দার্শনিক অস্তিত্বই বা কি হবে? কোন ভূখন্ডে দেশপ্রেমের কোন ভুমিকা পালন করতে হবে? চিন্তায় দেশপ্রেম আর কর্মে তার প্রতিফলনের দৌঁড়ে কোন কোন শ্রেণীর অবদান কতটুকু? কোন কোন শর্তপূরণ হলে একজন ব্যক্তিকে দেশপ্রেমিক বলা যাবে এবং কোন ফ্রেমের মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে একটি সংগঠনকে দেশপ্রেমিক সংগঠন বলা হবে। না কি যা ইচ্ছা তাই করার নাম দেশপ্রেম! যা ইচ্ছা তাই বলার নাম বাক স্বাধীনতা!  লক্ষ্য প্রাণের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সব সুন্দর সত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার খলনায়ক-খলনায়িকাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব শিক্ষা সংস্কৃতি রুচি-অভিরুচি মান মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদেরকে আমরা কিভাবে দেখবো? মিথ্যাচার ষড়যন্ত্র সন্ত্রাসকে পুঁজি করে রাজনীতির নামে দেশপ্রেমের সওদাকারী বণিকদের জবরদস্তির জবাব কি হতে পারে? জনগণের সেবা করার নামে দাপ্তরিক ক্ষমতার সুযোগে নিজেদের অধিকতর ক্ষমতাবান আর ধনবান করার নাম কি দেশপ্রেম? দেশপ্রেমের পরীক্ষায় কার অবদান কতটুকু এটি নির্ণয় করা জরুরী হয়ে পড়েছে। রাজনীতি অঙ্গনে, পেশাজীবি অঙ্গনে, শিক্ষিত অঙ্গনে, ব্যবসায়ী অঙ্গনে নিখাদ দেশপ্রেমিকের সংখ্যা নির্ধারণ তাদের অবদানের মা নিরুপণ সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষী দেয় দেশপ্রেমের সকল পরীক্ষায় সাধারন মানুষের অবদান অসামান্য। তাদের ত্যাগ সংযমের হাজারো সত্য উদাহরণ দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। তারা দেশের প্রশ্নে জাতির প্রশ্নে দেশমাতৃকার মান সম্মান মর্যাদার প্রশ্নে কোন আপোষ করেননি। প্রত্যাশাহীনভাবে ব্যক্তি স্বার্থের উর্দ্ধে দেশকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। দেশের উন্নয়নে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জীবন বাজি রেখে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করেছেন করছেন। সাধারণ মানুষের কোন প্রত্যাশা নেই। গণমাধ্যম পরিচিতি কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের গোপন বাসনা থেকেও তারা এটি করেননি। জাতিকে বিভ্রান্ত করে ষড়যন্ত্রের পথ ধরে যাওয়ার অপকর্র্মটিতেও তারা নেই। উৎপাদনের সব পর্যায়ে বিদেশী রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সাধারণ মানুষই দিনরাত কাজ করছে। কৃষি উৎপাদনে, গার্মেন্টস প্রসারে, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই আমাদের অর্থনীতি।

সাধারণ মানুষ কি চায় কতটুকু চায়। বারবার মিথ্যা আশ্বাস প্রতিশ্রুতির পর সাধারণ মানুষ দেশের সংকটে জীবনবাজী রেখে মাঠে নামে। শত ভয় শংকা উপেক্ষা করে নির্বাচনকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করে। ঘাতক রাজনীতিকদের ডাকা হরতাল অবরোধকে প্রত্যাখান করে। বাজারে পন্য সরবরাহ নিশ্চিত রাখে। উৎপাদনের চাকা সচল রাখে। বন্যায়-খরায়-দুর্যোগে-দূর্বিপাকে শক্ত হাতে ফসল ফলায়। কারণ তারা জানে দেশের মানুষকে খেয়ে পরে বাঁচানোর মহৎ কর্মটি তাদের হাতে।

গার্মেন্টস এর মালিকদের পরিস্কার শোষণের পরও  সাধারন মানুষ আনন্দের সাথে কাজ চালিয়ে যায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে গার্মেন্টস কর্মীদের বিপুল সংখ্যক নারী বেড়ে উঠার প্রথম অধ্যায়ে জীবনের সাথে নান্দনিক সূচ শিল্পের যোগ ঘটিয়েছিল। তাদের সেই যোগ তাদের মননকে সংযত রাখে দারুন মুগ্ধতায় ও শ্রদ্ধায়। সূচের নিখুঁত নান্দনিকতায় গড়ে উঠা মনন ধৈর্য্যশীলতার প্রমাণ দেয়। উল্লেখ করার মত কোনরূপ সরকারী সহায়তা না পাবার পর দিনরাত পরিশ্রম করে প্রবাসীরা দারুন দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন।

৫২ ’তে প্রাণ উৎসর্গকৃত সালাম জব্বার রফিক ছিলেন সাধারণ মানুষ। ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক  কোন প্রত্যাশা প্রাপ্তির আশায় প্রাণ উৎসর্গ করেনি তারা। পাকিস্তান বিরোধী সব আন্দোলন সংগ্রামে যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা সবই ছিলেন সাধারণ মানুষ। পাকিদের ক্ষমতার মসনদ বারবার কেঁপে উঠেছে বাংলার সাধারণ মানুষের প্রকম্পিত শ্লোগানে।  ৭১’এ ৩০ লক্ষ শহীদের মধ্যে ৯৯ ভাগ সাধারণ মানুষ; কৃষক শ্রমিক ছাত্র জনতা মেহনতী মানুষ। ২ লক্ষ মা বোন যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাদের একশভাগই সাধারণ মানুষ। এসব সাধারণ মানুষতো ব্যক্তিগত প্রত্যাশা প্রাপ্তির উদ্দেশ্য থেকে জীবন দান করেননি। তাদের এসব ত্যাগের পথ ধরেই এসেছে দেশের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা পরবর্তীতে সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গকারী মানুষ তো সাধারণ। বার্ণ ইউনিটে পোড়া প্রাণগুলোর পরিচয় হচ্ছে রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ পরিশ্রমী মানুষ।

নানা সময়ে রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, বিভাজিত করেছে নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থে। ঈমানি পরিক্ষার কাল্পনিক ফতোয়া দিয়ে, দারিদ্রতা বিমোচনের নামে, ভিন্ন পথে ধনী ক্ষমতাবান করার নামে তারা এসব করেছে। কাল্পনিক বহুদলীয় গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের নামে তো শিক্ষিত রাজনীতিক কুশিলবরাই এসব করেছে। অথচ বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তার সময় কোন রাজনীতিই ছিল না এদেশে। সেখানে বহু দল কিংবা বহুদলীয় মিথ্যাচারের শক্তিশালী বাণে কত বড় মিথ্যাচারকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে!! প্রকৃত বিচারে সেটি ছিল বহুদেশীয় ষড়যন্ত্রের ভয়াবহ মিথ্যাচারের সময়।

মুক্তিযুদ্ধের লাল টকটকে রক্ত না শুকাতেই কিভাবে রাজনীতির নামে স্বশস্ত্র প্রক্রিয়ায় সমাজ বিপ্লব কিংবা তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে রাতারাতি শহীদদের রক্তের দাগ মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। অসহায় অবস্থায় ফেলে দেয়া হয়েছে সাধারণ মানুষকে। এর দায়তো রাজনীতিকদের। সুষ্পষ্টভাবেই দেখানো সম্ভব সমাজতন্ত্রের ফাটকে আটকে পড়া অবাস্তব নেতাদের দেশপ্রেমের কাল্পনিক চিত্রটি। বাংলায় বাস করে বাংলার আকাশে বাতাস জল মাটিতে থেকে বাংলাকে অস্বীকার করার প্রতিফল সেসব দেশপ্রেমিকের গলায় জুটেছে। লোভ হিংসা ষড়যন্ত্রের দোষে দুষ্টু রাজনীতি কিভাবে ক্ষত বিক্ষত করেছে বাংলার মানুষকে তা কারো অজানা থাকবার কথা নয়।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামলীগ বামপনি’ দলগুলোর সফলতার চিত্রটি কতটা সমৃদ্ধ? ব্যর্থতার পাল্লাটা কতটা ভারি এসবই আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। রাজনৈতিক দলে থাকার সুযোগে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের কতজন নেতা লুটপাট করেছেন, নামে বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন আর বিদেশে টাকা পাচার করেছেন তার পরিসংখ্যান চিত্রটি কেমন হতে পারে। রাজনীতি করে ধণিক বনিক হয়েছেন কতজন? আর নির্মোহ নিখাদ দেশপ্রেমিক রাজনীতিক কতজন? ’৭২ সালের ৭০০ কোটি টাকার বাজেট তো এখন তিন লক্ষ কোটি টাকায় উপনীত হয়েছে। তারপরও কেন পুরোপুরি দারিদ্রতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হল না তার দায় কি রাজনৈতিক দলগুলো এড়াতে পারবে? কেন দেশের সব জায়াগায় বিদ্যূতের আলো সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হল না?

রাজনীতিতে মিথ্যাচারের জন্য কি সাধারণ মানুষ দায়ী? ধর্ম দারিদ্র শিক্ষার নামে মিথ্যাচারের রাজনীতি যারা প্রণয়ন করেন তারা সাধারণ মানুষ নন। সাধারণ কর্মী সর্মথকও নন। ধর্মভীরু মানুষদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলার কৌশল প্রণয়নে ব্যস্ত ধর্মজীবিরা বিপুল ধন সম্পদের অধিকারী। নানা পদ পদবীর খেতাবে ন্যুব্জ। এরা নিজেদেরকে অসাধারণ গণ্যমান্য পদবিতে পরিচয় দেন। এসব নামি দামী স্বরচিত ধর্ম প্রবক্তা পন্ডিতদের এত এত ফতোয়ার ফলে শান্তির ধর্ম ইসলামকে দাঁড় করানো হয়েছে দেশপ্রেমের বিপরীতে।

বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে বিশেষ বিশেষ পদ পদবী নিয়ে অসন্তুষ্ট পেশাজীবিদের দেশপ্রেমের চিত্রটি খুবই ভয়াবহ। যত নষ্টের গোড়াতো তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তিরা যারা ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থে অন্ধ। সরকারী বেসরকারী সুযোগ সুবিধা পেতে ভিক্ষাবৃত্তির মতই করুন প্রানিপাত নিত্য দিনের চিত্র। বিদেশী এজেন্টদের অর্থে বিমূর্ত ধারণা তৈরী, বিভাজনের সুক্ষ্ণ ফাঁদ সৃষ্টি আর ক্ষুধার্তদের মুখে লজেন্স পুরে ঘুমপাড়ানী গান শোনানোর ভয়ানক অমানবিকতা তাদের কাজ। এটা কোন কোন শিক্ষিত ভদ্রলোকের চাকুরী। বিদেশ থেকে ডলার আসে আর সেই ডলারের নেশায় মাতাল উন্মাদ সেসব সুশীল। কথায় কথায় সুযোগ বৃদ্ধির নামে যা ইচ্ছা তাই করা হয়। টিভি টকশোতে সেমিনার সিম্পোজিয়ামে তাদের দেশপ্রেমের আওয়াজের নেপথ্যে রয়েছে লোভনীয় প্রণোদনা প্যাকেজ ।

সব প্রকৌশল সেক্টরে লুটপাট ঘুষ ওপেন সিক্রেট। বিচারাঙ্গনে কালো পোষাকধারীদের দাম্ভিকতা কোন দেশপ্রেমকে তুলে ধরে? বিচারহীন ব্যক্তি সংস্কৃতির জন্য কি সাধারণ মানুষ দায়ী? আইন শাসন শোষণ সবইতো শিক্ষিত উচ্চ ক্ষমতাধরদের হাতে বন্দি। তাহলে তারা কেন বলেন কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি? স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া যায়নি, দারিদ্র বিমোচন শিক্ষা স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত হয়নি আজও। দোষ কি সাধারণ মানুষের?

সভাসমিতি সেমিনার সিম্পোজিয়ামে সমগ্র জনগণকে নানা শ্রেণীতে আখ্যায়িত করা হয়। সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে কর্মসূচী প্রণয়নের ক্ষেত্রে লক্ষ্য ফলাফল নির্ধারন, উপকারভোগী কোন শ্রেণীর হবে সেটির সুষ্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকে। কথায় কথায় সাধারণ তৃণমূল প্রান্তিক জনগণের জীবন মান উন্নয়নের ছবক দেয়া হয় এবং বলা হয় সবই করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। ক্ষুদ্রঋন, কুটির শিল্প ঋণ, গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক সেবা সবই অভীন্ন লক্ষ্য থেকেই সরকারী ও বেসরকারী সংস্থাগুলো পরিচালনা করে আসছে। তাহলে কেন একটি অভিন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা গেল না।

সাধারণ মানুষ সত্যের পক্ষে শিক্ষিত সুশীল কুশিলবরা জটিলতা কুটিলতা ষড়যন্ত্র মিথ্যাচার অহংকার দাম্ভিকতা ভোগবিলাসীতার পক্ষে। খ্যাতিমান মর্যাদা ক্ষমতার পক্ষে তাদের অবস্থান। শিক্ষাবাণিজ্য, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, আবাসন বাণিজ্য, ক্ষমতা বাণিজ্য, শ্রম বাণিজ্য সবই তথাকথিত শিক্ষিত আধুনিক ভদ্রবেশি সুশীল সজ্জনদের কর্ম।

এত এত শিক্ষিত রাজনীতিক এত এত শিক্ষিত সুশীল বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক পন্ডিত প্রকৌশলী, আইনজীবি ডাক্তার সাংবাদিকের দেশে কেন বৈষম্য থাকবে? পুরো দেশটির দিকে তাকালে যে কেউ চেনা মূখগুলোর দেশপ্রেমের অন্তসারশূন্য ফাকা আওয়াজকে চিহ্নিত করতে পারবেন। একদিকে শিক্ষিত লুটেরা ধনিক বণিক ধান্দাবাজ শ্রেণী অন্য দিকে নিরাপরাধ সহজ সরল সাধারন মানুষ। এখানে দেশপ্রেমের পরিচয় কিভাবে দেবে? পুরো দেশে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিরাপত্তাহীনতার বিষবাষ্প ছড়ানোর দায় কি সাধারণ মানুষের? যেখানে শিক্ষিত রাজনীতিক সুশীল আমলারা নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন সেই দেশের অজপাড়া গায়ে আজও টিনের ঘরে, চাটাইয়ের ঘরে, খোলা দরজার ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমায় সাধারণ মানুষ। প্রতিটি শিক্ষিত রাজনীতিক সুশীল আমলা পেশাজীবির সুরম্য প্রাসাদে অস্ত্রধারী প্রহরী পর্যবেক্ষণ ক্যামেরা। নিরপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন ধনিক বনিক শ্রেণী। যার দায় শিক্ষিত পেশাজীবি রাজনীতিক মহলের। যারা স্বঘোষিত দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে তৎপর!

বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমগুলোর মুখোশ!

সংলাপ ॥ গুটেনবার্গের অক্ষর বিন্যাসের ছায়াপথ পার হয়ে এসে আজকের স্যাটেলাইট শাসিত বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম পুরোমাত্রায় সাবালক, আধুনিক থেকে উত্তর-আধুনিকতার পথের যাত্রী। গণমাধ্যমের এই প্রকৃতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে বিপুলভাবে ঘটছে এর পরিবেশনগত বিবর্তন, এর পরিচালনার সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে আমূল। সেই কারণেই আজকের সমাজের বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা-বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে বার্তা পরিবেশনের কৌশল তথা উদ্দেশ্য তথা পরিচালকম-লীর স্বার্থ চরিতার্থ করার পদ্ধতিসমূহ। বিশ্বখ্যাত মিডিয়াগুরু মার্শাল ম্যাকলুহান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন মানুষের চোখ এবং কানের সম্প্রসারণ। দূর-দূরান্তের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী সম্পর্কে আমরা অবগত হই গণমাধ্যমেরই সূত্রে। গণমাধ্যমের বিপুল ক্ষমতার মূল উৎস হলো তার বার্তাকে সংশ্লেষ ক্ষমতা। গণমাধ্যমের সাহায্যে একই বার্তা অপেক্ষাকৃত কম সময়ে এবং কম খরচে পৌঁছে যেতে পারে অসংখ্য মানুষের কাছে। এমনকি ভৌগোলিক সীমানাও এক্ষেত্রে বাধা হয় না। আজকের ইন্টারনেটের যুগে কোন বার্তা নিমেষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়াব্যাপী। গণমাধ্যমের সর্বব্যাপী অস্তিত্ব মানুষের কাছে অত্যন্ত নিবিড়। সকালের চা থেকে অবসরের ড্রইংরুম, এমনকি নিভৃত বেডরুম পর্যন্ত আজ বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম মানুষের সঙ্গী। এখানেই প্রাসঙ্গিক গণমাধ্যমের পরিবেশন শৈলী এবং পরিচালনার নীতি। গণমাধ্যমের নীতি, তার দৃষ্টিকোণ নিঃসন্দেহে মানুষকে প্রভাবিত করে। আর এখানেই দর্শক বা পাঠক কি পড়বে বা দেখবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কীভাবে দেখবে।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিন মাধ্যম সংক্রান্ত আলোচনায় নতুনতম উপাদান খুব সম্ভবত পেইড নিউজ টাকার বিনিময়ে খবর। অর্থাৎ কোনো খবর বা বিশ্লেষণ মুদ্রণ বা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে প্রচার করার জন্য যখন অর্থ বা অন্য সুবিধা (ক্যাশ অর কাইন্ড) প্রদান করা হয়। এই ঘটনা প্রকৃতপক্ষেই একটি অশনিসংকেত। সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের খবর বা বিশ্লেষণ এমন সুচারুভাবে পরিবেশিত হয় যাতে সাধারণ মানুষ এর অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে না পারেন! এই ধরনের পরিবেশন শৈলী অনুসৃত হয় কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন অথবা মতাদর্শের পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে। এর কার্যকারিতা অনেকটা বিজ্ঞাপনের সমতুল্য। অর্থ বা অন্য সুবিধা পাইয়ে দেবার পরিবর্তে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যগত কোনো পার্থক্য নেই। এভাবে খবর বা বিশ্লেষণ প্রচার করা ছদ্ম বিজ্ঞাপনেরই নামান্তর।

বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার মুখোশ খসে পড়ছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যেভাবে কয়েকটি কর্পোরেট সংস্থার ভাবমূর্তি নির্মাণে নিরলসভাবে রত তা দেশ ও জাতির স্বার্থের পরিপন্থী। বেশ কিছু কর্পোরেট সংস্থা এবং মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার এই ‘গোপন চুক্তি’ সম্পর্কেও সচেতন মহল উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ যে কত প্রাসঙ্গিক তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়।

অর্থের বিনিময়ে প্রচারিত সংবাদ সংবাদমাধমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম থেকে মানুষ যে বস্তুনিষ্ঠতা প্রত্যাশা করে তা ব্যাহত হচ্ছে। উইকহ্যাম স্টিড তার বিখ্যাত ‘দ্য প্রেস’ গ্রন্থে লিখেছিলেন প্রেসের কেন্দ্রীয় আলোচনা আর গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় বিষয় একই। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের কাছে প্রত্যাশা তো তেমনই। কিন্তু সংবাদ যখন ক্রমশ ছদ্ম বিজ্ঞাপনে পরিণত হয় তা তখন গণতন্ত্রের তথা মতামত প্রকাশের মৌলিক অধিকারের পক্ষেও ক্রমান্বয় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এই ভয়ঙ্কর বিপদের স্বরূপ অনুধাবন করার সময় এসেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই সমস্যাটিও আপাদমস্তক রাজনৈতিক। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে এই রাজনৈতিক সমস্যার উদ্রেক রাজনীতির ক্ষেত্রে অর্থবলের আমদানির সঙ্গে সঙ্গে। অর্থবলের এই নির্লজ্জ আস্ফালনের ফল হলো  দেশে রাজনীতিকদের মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।

বৈদ্যুতিন মাধ্যম পরিচালনার ক্ষেত্রেও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রভাবশালী মানুষগুলোর যে চাপ তা সংবাদ মাধ্যমের বস্তু নিরপেক্ষতা তথা বিশ্বাসযোগ্যতার কাছে এক ভয়ানক আঘাত। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ভূমিকা এক্ষেত্রে আরো ভীতিপ্রদ।

মুনাফা লাভের অসদুপায় আচরণে বৈদ্যুতিন মাধ্যমও পিছিয়ে নেই। স্বাভাবিক কারণেই বিশ্বাসযোগ্যতা খানিক বেশি। বার্তার দৃশ্যরূপ সর্বদা হাজির থাকায় এই মাধ্যমের প্রতি মানুষের আকর্ষণও বেশি। তাছাড়া অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তার আর একটি বড় কারণ সাক্ষরতা এখানে পূর্বশর্ত নয়। এই জনপ্রিয়তা এবং আকর্ষণকে ব্যবহার করে অ্যাজেন্ডা তৈরি অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিকোণকে দর্শকের ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টাতেও স্বভাবতই কর্পোরেট সেক্টর অগ্রগামী। টাকার বিনিময়ে সংবাদপ্রচার নিয়ে সচেতন মহল ক্রমাগত এ বিষয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করছেন।

বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের প্রভাব বিস্তারের আর একটি সূত্র হলো একই ঘটনা বারংবার প্রচার করার সুবিধা। স্বভাবতই এক্ষেত্রে সম্মতি নির্মাণের জন্য মালিকপক্ষের মতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ দৃশ্যই বারবার প্রচারিত হয়। কারিগরি কুশলতাকে কাজে লাগিয়ে ড্রইংরুম থেকে বেডরুম সম্মতি নির্মাণের এই প্রক্রিয়া চলে।  সুচারু সম্পাদনায় কোনো ঘটনা বারবার দিনের পর দিন প্রচারের ফলে মানুষের মনে প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। প্রিয় পাঠক ভাবুন, কয়েক মিনিটের ঘটনা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে কয়েক শত ঘণ্টা। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সময়ের মূল্য অপরিসীম। বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রচার তো কোনো এক পক্ষকে বিজ্ঞাপিত করাই। সংবাদের মোড়কে এও ছদ্ম বিজ্ঞাপন, কোনো ‘গোপন চুক্তি’র সম্যক সম্ভাবনাও বটে।

প্রযুক্তি নির্ভরতার কারণেই বৃহৎ পুঁজির প্রতি নির্ভরতা বাড়ছে গণ-মাধ্যমের। আধুনিক গণ-মাধ্যম আরো শক্তিশালী তার সমকেন্দ্রিকতার কারণে।

বর্তমানে কর্পোরেট ইচ্ছার অধীনে রচিত হচ্ছে সংবাদ পরিবেশনের দৃষ্টিকোণ। নোয়াম চমস্কি তার ‘সম্মতির নির্মাণ’ তত্ত্বে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার রাজনৈতিক বিরোধিতার কথা গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা আগাগোড়া সত্য। বর্তমান বাংলাদেশে মহাজোট সরকারের বিরোধিতায় প্রায় সব মেইনস্ট্রিম বৈদ্যুতিন মাধ্যমেরই একই দৃষ্টিকোণ। বহুত্ববাদের প্রাথমিক নিয়মেও এটি অস্বাভাবিক। এ যেন ঠিক পুতুলনাচের ইতিকথা – পুতুলগুলোর সুতো কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে দৃষ্টির অগোচর থেকে।

বৈদ্যুতিন মাধ্যমের অতিকথন, বৈদ্যুতিন মাধ্যমের নৈঃশব্দ সবই বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের প্রক্রিয়া। তার মুখ আর মুখোশের মধ্যে দুর্লঙ্ঘ ব্যবধান। একদিকে মহাজোটের বিরুদ্ধে ক্রমাগত কুৎসা আর অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও নব্য রাজাকারদের গোপন অভিসার সম্পর্কে মুখে কুলুপ, চোখে ঠুলি। তবে সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় এই মুখোশ খসে পড়ছে। বেরিয়ে পড়ছে প্রকৃত অবয়ব। এইসব মুখচ্ছবি সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে, একাত্মবাদ বা বহুত্ববাদের পক্ষে বিপজ্জনক এবং দেশে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি হুমকি স্বরূপ। তাই জাতির বিবেক জাগ্রত হোক এটাই সময়ের  দাবী।

রাজনীতিকরা বুঝেও বোঝেননা – মিথ্যা ও চাটুকারিতার ভয়াবহতা

শেখ উল্লাস ॥ মিথ্যা ফুলঝুরি ছড়ানো ও চাটুকারিতা আমাদের দেশে রাজনীতিকদের স্ব-ভাবে পরিণত হতে চলছে! মিথ্যার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতিকরা পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণু এবং শ্রদ্ধাশীল নন। যারা এই মিথ্যার বেসাতি করছেন তারা ভাবেন জনগণ বোকা এবং অজ্ঞ। জনগণ এদের প্রতি কেবল করুণা করছেন এবং সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছেন, রাজনীতিকরা হয়তো স্বপ্নেও ভাবার অবকাশ পান না। রাজনীতিকরা এসব করেন, কারণ দেশে স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার চর্চা অনুপস্থিত। বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে অন্ধ হয়ে রাজনীতিকদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে পার্থিব ফায়দা লুটছেন। এরা কখনো রাজনৈতিকদের ভুল ধরিয়ে দিতে সত্য কথা বলেন না।

দেশের প্রতিহিংসা পরায়ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য আমাদের ওইসব মেরুদন্ডহীন বুদ্ধিজীবীরা যেমন দায়ী তেমনি এদের সঙ্গে আছেন একশ্রেণীর সাংবাদিক নামধারী গোষ্ঠী। প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, সংস্কৃতিসেবী এবং শিক্ষাবিদ সর্বত্র দলবাজদের জয় জয়কার। আশ্চর্য লাগে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিভাবে প্রতিদিন বৈদ্যুতিন মাধ্যমে উপস্থিত হয়ে রাজনৈতিক নেতানেত্রী, রাজনীতিক কিংবা সরকারের তোষামোদে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার মান এবং ছাত্রদের হানাহানি নিয়ে উৎকণ্ঠার পরিবর্তে এরা কেমন উৎকটভাবে চিবিয়ে-চিবিয়ে কথা বলতে থাকেন যে, মনে হয় বিশ্বমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৌঁছে গেছে সেরা একশ’টির মধ্যে। প্রেসক্লাব হলো নিরপেক্ষতা এবং সাহসিকতার প্রতীক। অথচ এই প্রতিষ্ঠান এবং পেশাদার গোষ্ঠীটিকে রাজনৈতিক দলের পকেটে ঢুকিয়ে দেয়ার নজির বোধকরি বিশ্বের আর কোথাও মিলবে না। দেশে প্রকাশ্যে মানুষ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করলেও মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের পতাকা ওড়ানোর কোনো বাধা নেই যেহেতু ওই দুটোর বাংলাদেশী সংজ্ঞা নেই। দলবাজ বুদ্ধিজীবীদের সহযোগিতায় রাজনীতিকদের এই উৎকট প্রবণতা সম্পর্কে বিভিন্ন চিন্তাবিদ বিভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে যাচ্ছেন। অনেকে দলবাজ বুদ্ধিজীবীদের জঙ্গলের নিম্নজাত প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করে অভিমত ব্যক্ত করেন – শিয়াল, কুকুর, শকুন, হায়েনারা যেমন দল বেঁধে খাবারের অন্বেষণ করে, দলবাজ বুদ্ধিজীবীরাও অনেকটা সেরকম। বাঘ কিংবা সিংহকে কখনো দল বেঁধে খাবারের অন্বেষণ করতে হয় না।

বর্তমানে দেশের লোভী রাজনীতিক, রাজনীতিজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের চাটুকারিতায় মুগ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা। সম্প্রতি এক চাটুকার মন্ত্রীসভার সদস্যের কথায় দেশবাসী স্তম্ভিত! সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এ কথাটা তিনি কিভাবে বলতে পারেন? ওই সভায় উপস্থিতি কোনো প্রতিবাদ করেননি বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। উপলব্ধি করার সময় এসেছে – স্বাধীন ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা কোন পর্যায়ে? যোগ্যতা না ক্ষমতা? বিবেক না চাটুকারিতা? জনগণ আজ এসব প্রশ্নের জবাব চায়, যেহেতু সংসদীয় রাজনীতিতে রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার ইতিহাস প্রমাণ করে, কেউ যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন বাংলার মাটিতে মিথ্যাচারী ও দাম্ভিকদের ঠাঁই হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নিতে চায় না। মীর জাফর, লর্ড ক্লাইভ, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ থেকে শুরু করে সামরিক শাসক আইয়ুব ইয়াহিয়া, টিক্কা, নিয়াজী, এবং তাদের দোসররা কেউই বাংলার সহজ-সরল মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেনি, তারা আজ নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। আর সেই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্তদের আদর্শ ধারণ করে যারা বাংলার মানুষকে ধোঁকা দিতে চায় যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও নব্য রাজাকারদের  সহযোগিতা নিয়ে তারাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থই হবেন – এটাই ইতিহাসের নির্মম সত্য। মিথ্যাচার করে, রাজনৈতিক নীতি আদর্শ না মেনে যারা চাটুকারিতা করে এদেশে ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছে এবং আগামীতে নিতে উদগ্রীব তাদেরকে এখন সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। মিথ্যাচার করে, চাটুকারিতা করে বা ষড়যন্ত্র করে বাংলার মাটিতে পার পাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। বাংলার মাটিতে রাজনীতিজীবী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, ধর্মজীবী বা কোন পেশাজীবী যিনিই হোন না কেন প্রতিটি কর্মের প্রারম্ভে স্মরণ রাখার সময় এসেছে কুরআনের বাণী- সত্য এসেছে আর মিথ্যা অন্তর্ধান করেছে। মিথ্যাকে অন্তর্ধান করতেই হবে (সূরা-১৭:৭৮-৮১)। দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে যখন রাজনীতিকদের আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠবে।