প্রথম পাতা

অযোগ্য ও নীতিহীন নেতা দিয়ে দেশ ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয় – বঙ্গবন্ধু

শেখ উল্লাস ॥ তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় আশীর্বাদের এই যুগে একজন সাধারণ মানুষও ফেসবুকে পোস্ট আর স্ট্যাটাস দিয়ে সামাজিক গণমাধ্যমে অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছে। এই অর্থে মানুষ এখন কতই না স্বাধীন ও সুবিধাভোগী। কিন্তু বিজ্ঞানের (বিশেষ জ্ঞান) এই পর্যায়ে আসতে কত  সাধকের কত সাধনা, গবেষণা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হয়েছে তা ভেবে দেখেন কয়জন? ঠিক একইভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্যে এদেশের মানুষকে জাগানোর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কত সাধনা, গবেষণা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা করেছিলেন তা-ই বা চিন্তা করার  সময় ক’জনের হয়? সাধারণভাবে সবাই অনেক কিছুই জানেন, কিন্তু গভীরভাবে বিষয়টি অনুভূতিতে বা উপলব্ধিতে নেয়াটাই বড় কথা। উপলদ্ধি সত্যিকার অর্থেই অনেক দূরের ও কঠিন বিষয়। আর কঠিন বলেই রাজনৈতিক দলের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন সময়ে অনেকে এমন কিছু কাজ-কর্ম করে গেছেন যা তাঁর আদর্শের রাজনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী-বিশেষ করে এদেশের সর্ববহৎ ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগে বিভিন্ন সময়ে অনেক সুযোগসন্ধানী এর ভেতরে ঘাপটি মেরে থেকে নিজেদের কায়েমী স্বার্থ উদ্ধার করে গেছেন। এদেরই ষড়যন্ত্রে  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবন হয়তো সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। কিন্তু এদেশের মানুষের কাছে আধ্যাত্মিকভাবে তিনি চিরস্মরণীয় ও চিরঅম্লান হয়ে থাকবেন অন্ততপক্ষে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে। বিগত শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশের দশক থেকে এই বাংলার মাটি-মানুষ-জনপদ-শিক্ষা-সংস্কৃতি-সমাজ-রাজনীতির সাথে মিশে গিয়ে তিনি এদেশ সম্পর্কে একজন বড় গবেষকও হয়ে উঠেছিলেন। ওই সময়ের রাজনীতির প্রতিটি ঘটনার সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সে কারণেই তিনি যা বলতেন, মন্তব্য করতেন সেটা ছিল তাঁর অনুভূতি ও উপলব্ধিরই বাস্তব প্রকাশ।  ১৯৫৪’এর নির্বাচনে বাঙালিদের জয়লাভের কয়েক মাস না যেতেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ৯২ (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেয়। ‘৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই’- (৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু)। পরিণতিতে এদেশের মানুষের ভাগ্যে নেমে আসে বিপর্যয়। দেশে বিরাজ করতে থাকে দুর্ভিক্ষাবস্থা। ওই সময়  ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কর্মকা- দেখে বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি সম্পর্কে যথার্থভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ..‘যদি সেইদিন নেতারা  জনগণকে আহ্বান করত তবে এত বড় আন্দোলন হতো যে কোনোদিন আর ষড়যন্ত্রকারীরা সাহস করত না বাংলাদেশের উপর অত্যাচার করতে। শতকরা সাতান্নব্বই ভাগ জনসাধারণ যেখানে যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিল ও সমর্থন করল, শত প্রলোভন ও অত্যাচারকে তারা ভ্রুক্ষেপ করল না – সেই জনগণ নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে রইল! কি করা দরকার বা কি করতে হবে, এই অত্যাচার নীরবে সহ্য করা উচিত হবে কি না, এ সম্বন্ধে নেতৃবৃন্দ একদম চুপচাপ।..  দেড় ডজন মন্ত্রীর মধ্যে আমিই একমাত্র কারাগারে বন্দি। যদি ৬ই জুন সরকারের অন্যায় হুকুম অমান্য করে (হক সাহেব ছাড়া) অন্য মন্ত্রীরা গ্রেফতার হতেন  তা হলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু হয়ে যেত। দুঃখের বিষয় একটা লোকও প্রতিবাদ করল না। এর ফল হল ষড়যন্ত্রকারীরা বুঝতে পারল যে, যতই হৈচৈ বাঙালিরা করুক না কেন, আর যতই সমর্থন থাকুক না কেন, এদের দাবিয়ে রাখতে কষ্ট হবে না। পুলিশের বন্দুক ও লাঠি দেখলে এরা পালিয়ে গর্তে লুকাবে। এই সময় যদি বাধা পেত তবে হাজারবার চিন্তা করত বাঙালিদের উপর ভবিষ্যতে অত্যাচার করতে। এই দিন থেকেই বাঙালিদের দুঃখের দিন শুরু হলে। অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনো দিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা-২৭২-২৭৩)।

নীতিহীন,  অযোগ্য ও কাপুরুষ নেতারা দেশ ও জাতির কী সর্বনাশা ডেকে আনতে পারে তার বড় প্রমাণ জাতি পেয়েছিল ৭৫’এর ১৫ই আগষ্ট এবং ১৫ আগষ্টকে কেন্দ্র করে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলীতে। বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের শ্রম-মেধা-সাধনার ফসল জনগণের দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ সময়ের বিবর্তন ও পরিবর্তনের সুদীর্ঘ পথ বেয়ে আজ বাংলাদেশের গদিতে উপবিষ্ট।  নেতা বলতে এখন শুধু রাজনৈতিক দলের নেতাদেরই বোঝানো হয় না, স্বাধীনতার পর থেকে আমলারাও (উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা) দেশ পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে নেতার আসনে বসতে পেরেছেন। স্বাধীনতার আগে এই কর্মকর্তারা পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অধীনে কাজ করতেন বলে তাদের প্রায় সব কাজই ছিল পাকিস্তানী শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে, বাংলার মানুষের ক্ষতি হবে-এটা দেখার বিষয় তাদের ছিল না। তৎকালীন আমলারা (যারা জন্মগতভাবে এদেশেরই সন্তান ছিলেন) ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী সরকারের স্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের ছলা-কলা ও ধূর্ততার আশ্রয় নিতেন, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষর বিবরণ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সুন্দরভাবেই উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এইসব কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয়ভাবেই নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশ স্বাধীন না হলে তাদের এই সুযোগ-সুবিধা কল্পনাও করা যেত না। তারা রাষ্ট্রের বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। বর্তমানে দেশের আঞ্চলিক ক্ষেত্রের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসক (ডিসি)গণ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত। বলা হয়ে থাকে, দেশ চালান মূলত সচিবগণই। সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের এ কর্মচারিগণ সর্বদা দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন। ক্ষেত্র বিশেষে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষকও নেতৃত্বের আসনে বসেন। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে, শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার, সেবা করার সুযোগ পান। স্বাধীন দেশে এই সব সেবায় নিয়োজিত থাকাই বঙ্গবন্ধুর ভাষায় দেশসেবা। এইসব গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের আসনে বসে কেউ যদি অযোগ্য, নীতিহীন ও কাপুরুষ হন তবে তার কুপ্রভাব দেশ ও জনগণের ওপর পড়তে বাধ্য। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন উপজেলা-জেলায় কোনো কোনো ইউএনও, ডিসি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়নে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন এবং তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ও পুরষ্কৃতও হচ্ছেন। স্বাধীন দেশে এসব কিছুই আজ সম্ভব হচ্ছে।

কিন্তু নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় জায়গা অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে যারা আসীন হন- এখান থেকে যারা এমপি, মন্ত্রী হন, তাদের মধ্যে অযোগ্য, নীতিহীন ও কাপুরুষ মানসিকতাসম্পন্ন লোকেরা স্থান পেয়ে গেলে সমাজ ও দেশের জন্য কী সর্বনাশা পরিস্থিতি তৈরি করতো সে সম্পর্কে সচেতন মানুষেরাই কেবল উপলব্ধি করতে পারেন। অপার সম্ভাবনার এই দেশে আসলে কোনো সমস্যাই নেই। সমস্যা সৃষ্টি করে রেখেছে শুধু তারাই যারা বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের আসনে থেকে নীতিহীন কাজ করে নিজেদের পার্থিব ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থেকে এক ধরনের মোহাচ্ছন অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। ঔপনিবেশিক আমলের ঘুণে ধরা মানসিকতা, সংকীর্ণতা তাদেরকে এমনভাবে পেয়ে যায় যে, তারা জীবনের মূল্যবান সময়টুকু অযথাই ব্যয় করেন। হাক্কানী সাধক-এঁর বাণী হচ্ছে, ‘বিদ্যা, বুদ্ধি, বল-বিক্রম গর্ব দোষে খর্ব হয়’। আজকের দিনেও এ সমাজ ও দেশের কোনো কোনো নেতা এমনভাবে কথা বলেন, আচরণ করেন, বক্তৃতা দেন যেন তাদের কথা কেউই কিছু বুঝে না। আসলে এভাবে তারা নিজেরা নিজেদেরই সাথে প্রতারণা করে থাকেন। বর্তমানে সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী কোনো কোনো আমলা ও নেতার মধ্যে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে তারা অজ্ঞান, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তাদের বাস্তব জীবন ও কর্মে একেবারেই অনুপস্থিত। এদের ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র যারা অনুভব ও উপলব্ধি করতে পারেন, তারাই তাদের আসল রূপটি জানেন।

তারাই আসলে দেশের শত্রু, নিজেদের শত্রু, প্রতারক।  তাদের বেলায়, ‘তাহারা চতুরতা করিল, ঈশ্বর চতুরতা করিলেন, ঈশ্বর চতুর শ্রেষ্ঠ’-এই মহাবাণীই সত্য হয়ে দেখা দেয়। ক্ষণিকের  মোহ, ভোগ-বিলাস, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার আসনচ্যুত হওয়ার পর সমাজে তাদের আর কোনো মূল্য থাকে না। অন্যসব প্রাণীর মতোই জীবন-যাপন ওদের, মৃত্যুর পর কেউই তাদের স্মরণ করে না। ইংরেজ আমলের ঔপনিবেশিক মানসিকতার এই সব ধূর্ত নেতা-পাতি নেতাদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অনেক সতর্কবাণী আমাদের জন্য রেখে গেছেন। আগামী ২১-২২শে অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে সেখানে এ রকমের নীতিহীন কেউ যাতে স্থান না পায় সে ব্যাপারে যত সতর্ক হওয়া যাবে, এক্ষেত্রে যতটুকু সফলতা পাওয়া যাবে, দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সফলতাও হবে ততটুকু। কারণ, এই দলটি স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব, দেশের সকল সামাজিক শক্তিগুলোর সাথে এ দলেরই যোগসূত্র সবচেয়ে বেশি। এ দলের নেতৃত্ব থেকে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খাও বেশি।

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের আজ ভাগ্য ভাল যে, বহু ঘাত-প্রতিঘাত ও জীবনের ওপর হুমকি মোকাবেলা করে অপরিসীম সাহসিকতা নিয়ে দেশ পরিচালনার নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। পাকিস্তানী আমলেও বঙ্গবন্ধু নিজেও এমন সাহসিকতা নিয়ে রাজনীতি করে গেছেন। দেশকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে-এটাই ছিল বঙ্গবন্ধু জীবনের একমাত্র কামনা। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর এই কামনা-বাসনা পূরণ করতে যারা নিবেদিত নন, তাদেরকে এদলের নেতৃত্বের কোথাও স্থান দেয়া হবে-না-এটাই আজ দেখতে চায় দেশবাসী। দেশ আজ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, দেশি-বিদেশি সকল শুভ শক্তির সমর্থন ও আশীর্বাদ রয়েছে এই দল ও তার সরকারের ওপর। দলের আসন্ন সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সচেতন মানুষদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিপুল ঔৎসুক্য। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা কোনো দিন বসে ছিল না, এখনো নিশ্চয়ই বসে নেই-এটাই স্বাভাবিক। সেই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যোগ্য, মেধাবী, জনমুখী, দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে এবং তারা ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ বিনির্মাণে সফলভাবে এগিয়ে যাবে-এটাই আজ দেশের সচেতন ও বিবেকবান মানুষদের প্রত্যাশা। তবেই হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বপ্ন ও আদর্শের বাস্তবায়ন এবং তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

সময়ের সাফ কথা…. শান্তির পথ প্রদর্শনে লালন সাঁইজী

lalon_big

আল্লাহর নাম সার করে যেজন বসে রয়

তাহার কিসের কালের ভয় ॥

সময় বয়ে গেল আল্লাহর নাম বল

মালেকুত মউত এসে বলিবে চল

যার বিষয় সে লয়ে যাবে

সেকি করবে ভয় ॥

আল্লাহর নামের নাই তুলনা

সাদেক দেলে সাধলে পরে বিপদ থাকে না

যে খুলবে তালা, জ্বালবে আলো

দেখতে পাবে জ্যোতির্ময় ॥

ভেবে ফকির লালন কয়

নামের তুলনা দিতে নয়

আল্লাহ্ হয়ে আল্লাহ ডাকে

জীবে কি তার মর্ম পায় ॥

সংলাপ ॥ জাতি ধর্ম-বর্ণ, গরীব-ধনী, শিক্ষিত-মূর্খ-জ্ঞানী নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষই শান্তি চায়। কিন্তু খুব কম মানুষই শান্তি পায়। তাই যুগে যুগে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে স্ব-স্ব জাতির মধ্যে শান্তির পথ প্রদর্শক আবির্ভূত হয়েছেন। বাংলার বুকে অন্য জাতি, অন্য ভাষা ও অপসংস্কৃতি যখন বারবার হানা দিচ্ছিল সেই সময় লালন সাঁইজীর আবির্ভাব ঘটে। বাংলা ১২৯৭ সালের ১ লা কার্তিক, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর ১১৬ বৎসর বয়সে লালন সাঁইজী দেহত্যাগ করেন।

সাঁইজীর দর্শনে রয়েছে – সবার উপরে মানুষ সত্য, মানুষ মানুষের জন্য। মানুষ হওয়ার জন্যে দরকার সৎ-স্বভাব যার পরিচয় মেলে কথা ও কাজে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অমূল্য বাণী – ‘সত্য বল্ – সুপথে চল্’ – বাংলার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়ে বাঙালি জাতিকে দিয়ে আসছে দিক নির্দেশনা। গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে সাঁইজীর দর্শন বাংলার মানুষকে দেখালো নতুন দিগন্ত, নতুন প্রাণ যার ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান।

লালন সাঁইজী একজন বাঙালি। এই বাংলায় বাঙালিদের মধ্যে বাংলা ভাষায় শান্তি-ধর্ম প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। শান্তি-ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যে দর্শন দিয়েছেন তা বাঙালি জাতিকে একটি উন্নত জীবনধারার সন্ধান দিয়েছে। সহজ সরল সাধারণের ভাষায় কবিতার ছন্দে, গানের মরমী সুরে তিনি যে ‘লালন সংস্কৃতি’ সৃষ্টি করে গেছেন, তা বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সাথে অবিচ্ছেদ্য। পৃথিবীর বুকে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন লালনও হয়ে থাকবেন স্মরণীয় এবং বরণীয়।

পূজিত হবেন একজন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার উর্ধ্বে ‘শান্তি-ধর্ম’ প্রচারক হিসেবে। তাঁর সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে মনসুর উদ্দীন বলেছেন, ‘লালন ছিলেন ভোরের কোকিল, আটপৌরে ভাষার প্রাণবান কবি। হৃদয়ের অনুভূতি, দার্শনিক তত্ত্ব এমন সরল করে বাংলায় আর কোনো কবি বা গীতিকার প্রকাশ করতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই।’ একথা অনস্বীকার্য যে, তৎকালীন সময়ে বাংলার বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবহেলিত মানুষদের মন্দির-মসজিদের প্রচলিত সংকীর্ণ ধর্মীয় উগ্রতার রুদ্ধ কক্ষে বন্দি না করে উদার, উন্মুক্ত খোলা আকাশের নিচে বসে দেশ-মাটি-প্রকৃতির নিবিড় পরশে পরম স্রষ্টার সাথে এক প্রত্যক্ষ মধুর ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রেমময় সম্পর্ক সৃষ্টির শাশ্বত শান্তির ধর্মে আহ্বান জানিয়েছেন ভোরের কোকিলের মতোই। আত্মদর্শনের লালনীয় তত্ত্বাদর্শে বাংলার মানুষ খুঁজে পেয়েছিল মুক্তির পথ।

সাধকদের মতে বাঙালি জাতির প্রাণপুরুষ এই মহান দার্শনিকের দর্শন জেনে-বুঝে চর্চা করে নিষ্ঠার সঙ্গে  চিন্তা-চেতনায় ধারণ করলে সুস্থ সুন্দর সত্য স্বসংস্কৃতি সম্পন্ন একটি অসাম্প্রদায়িক মানব গোষ্ঠী গড়ে উঠতে বাধ্য।

তাই লালন সাঁইজী বাঙালির ঐতিহ্যের লালন, ইতিহাসের লালন, সংস্কৃতির লালন। সাঁইজী বাঙালির পরিচিতি। তিনি শেকড়ের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর প্রেরণাতেই বাংলার বুকে বহু সাধক আজও নিয়োজিত নিরবচ্ছিন্ন কর্ম সাধনায়। সাধন-ভজনের পদ্ধতির বীজমন্ত্রও তিনি দিলেন –

‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার

সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার।’

সমাজের প্রতিটি  স্তরে সাঁইজীর দর্শন অনুসারী রয়েছে, যারা প্রকৃতই চিন্তা- চেতনায় লালন পূজারী। বাউল সাধকদের কাছে লালন সাঁইজী তাদের ধর্মগুরু। তাঁর সমাধিস্থল তাদের কাছে তীর্থভূমি। কোনো আঙ্গিকেই সাঁইজীর সামান্যতম অবমাননা, বাঙালি জাতি সহ্য করবে না – হোক তা লালন নামের গায়ে সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানোর কসরৎ অথবা তাঁকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে ব্যবসায়িক হাতিয়ার বানানোর কূটচাল অথবা শুধুমাত্র কবি, বাউল, ফকির বানানোর অপচেষ্টা। অপরদিকে নিছক সাংবিধানিক অধিকার আদায় অথবা প্রত্নতাত্ত্বিক পূরাকীর্তি নিদর্শন সুরক্ষা জাতীয় মানবিক বিষয় মনে করলেও আমাদের ভুল হবে। আমদানীকৃত অপসংস্কৃতির হাত ধরে নগরায়ণ ও উন্নতির নামে বাঙালি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থানগুলোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

জাতির লক্ষ্য পূরণের সম্মেলন

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলন একটি অগ্নি-পরীক্ষা। ভবিষ্যত দেশ পরিচালনা,   বৈশ্বিক তথা এশিয়া-দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক যোগযাত্রা, ২১-৪১ সালের লক্ষ্য ভিত্তিক বাংলাদেশ অনেকটাই নির্ভর করছে এবারের সম্মেলনের উপর। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ কমিটিই দলকে সুসংগঠিত করে জনগণের আস্থা, ভালবাসা অর্জনে কাজ করবে। রাজনীতির নামে অতীতের যে ভয়াবহতা জাতিকে দেখতে হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি  রুখে দেয়ার কাজটিও বর্তাবে দলটির নেতৃত্বের উপর। সময়ের  চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় ফিরিয়ে আনা, জনগণকে সাথে নিয়ে, জনগণের শক্তির উপর নির্ভর করে এগিয়ে যাবার কোন বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে সরাসরি বলা যেতে পারে নাজুক একটি পরিস্থিতির ঘুর্ণাবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে দেশের রাজনীতি। যার দায় দল হিসেবে আওয়ামীলীগ এড়াতে পারে না।

সম্মেলন নিয়ে নানা বিশ্লেষণ, মতামত পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে। সকাল-বিকাল গভীর রাত পর্যন্ত হিসেব- নিকেষের বাড়াবাড়ি চলছে। লবিং-গ্রুপিং-তদবির চলছে জোরসে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রুগ্ন রাজনীতি, পকেট রাজনীতি, রেওয়াজের রাজনীতিই দলীয় অফিস থেকে আড্ডা আলাপচারিতায়। এমন কি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাচ্ছে পত্রপত্রিকায়, টিভি, রেডিওতে এসব রুগ্ন পর্যবেক্ষণই শোনানো হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে। এমন কি কোন কোন পত্র-পত্রিকা নিজেদের মতো করে রীতিমতো পুর্ণাঙ্গ কমিটিই তুলে ধরছে। কোন্ নেতার সাথে কোন্ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পরিচয়, গোষ্ঠীগত যোগাযোগ রয়েছে তা স্পষ্টতই ফুটে উঠছে সংবাদচিত্রে। এ এক দারুন দৌঁড়ঝাপ প্রতিযোগিতা চলছে, চোখে না দেখলে অনুমান করাও কঠিন। কারো কাছে আবার পদ-পদবী পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে গ্রুপিং। সেলফি, ফটোসেশন, স্থির ও ভিডিও চিত্রে নিজেদের বারবার দেখানোর মতো নিম্নমানের অসহায়ত্বও চোখে পড়ে। দলীয় সংবাদ সম্মেলন ও প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানগুলোতে চেয়ার দখল করে সস্তা উপস্থিতি দলটির এক শ্রেনীর নেতা কর্মীও করুণ দশাকে তুলে ধরে। দলের জন্য, দেশের জন্য, লক্ষ্য পুরণের রাজনীতির জন্য দলীয় ও নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের যেন তেমন কিছু করার নেই, সব করে দেবেন শেখ হাসিনা। পদধারী এবং যারা পদে আসতে চান তাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত, সামাজিক ইমেজ শূন্যের কোঠায়। এসব জানেন দলীয় প্রধান। বিশ্লেষকদের ভাষ্য তিনি একটি গুণগত মানের কমিটি উপহার দিবেন। জানা যাচ্ছে তারুণ্য নির্ভর কমিটিই হবে। ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ণ হতে যাচ্ছে। দলীয় প্রধান নিজেই কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে সতর্কভাবে কাজ করছেন। আবেগ, বিরাগের উর্ধ্বে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। অনেক চেনা মুখকে এবারে তিনি সাইডবারে বসিয়ে দিবেন এতে কোন সন্দেহ নেই। আবার সৎ, যোগ্যদের দলের মূল স্থানে আসন দিতে যাচ্ছেন। সুষ্পষ্টতই বলা যায় সম্মেলনে দরুন চমক অপেক্ষা করছে।

লক্ষ্যের পথে যেতে হলে ক্ষেত্র প্রস্তুত ও জনবল তৈরি করা দরকার সবার আগে। আজকের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কালকের ফলাফল। আজ ও কালের ফারাক বুঝতে পারাটা  দূরদর্শিতা। আপাতদৃষ্টিতে মাঠ ফাঁকা দেখালেও তা বেশিদিন ফাঁকা থাকে না। ষড়যন্ত্রের রাজনীতিটাই এমন। কাচের ঘরে বসে কাপুরুষেরা একটার পর একটা ট্রাম কার্ড খেলতেই থাকে। অপেক্ষায় থাকেন, কেবলই অপেক্ষার প্রহর গুনেন। আওয়ামীলীগের মধ্যে যারা বলেন বিএনপি নির্বাচনে না এসে ভুল করেছে তাদের পান্ডিত্যের দুর্দশা দেখলে করুণা হয়। বিএনপি-কে আসতে দেয়া হয়নি কারণ তাদের মুরুব্বীরা বলেছিল নির্বাচন হবে না। বিএনপি নির্বাচনই চায় নি, অথচ সরকারী দলের নেতারা বলেন নির্বাচনে না এসে ভুল করেছে। ফলে পর্যবেক্ষণ বাস্তবতার আদলে নতুন কমিটি গঠনই দল হিসেবে আওয়ামীলীগের জন্য ফরজ হয়ে দাড়িয়েছে। যার প্রতিফলন দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি। ঘুনেধরা বস্তাপচা জরাজীর্ণ পশ্চাৎপদদের সরিয়ে রাখার সময় এসেছে। শৈথিল্যতা দেখানো হলে পরিণাম হয় ভয়াবহ, লক্ষ্য পূরণ হয় না। দেশপ্রেমিক জনগণ শেখ হাসিনার উপর আস্থাশীল। কারণ তিনি লক্ষ্য নির্ধারণ করে চলছেন। জনগণের আস্থা আর শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা উভয়ই একটি নিবিড় যোগে পরিণত হয়েছে। একমাত্র তিনিই বাস্তবতা অনুধাবণ করেন। তার সামনে কোন্ কোন্ চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা বোঝেন-জানেন। তিনি লক্ষ্য পুরণের জন্যই যুদ্ধপরাধীদের বিচার করছেন। প্রায় একক সিদ্ধান্তে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন দেশী-বিদেশী ঘাতকের মুখে চুনকালি মেরে। বিশ্বব্যাংকের সাথে লড়ে নিজস্ব তহবিল থেকে পদ্মাসেতু করছেন। জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণের পথে এগিয়ে চলেছেন। তিনি বিনয়ী-কঠোর স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে নিয়ে গেছেন নিজেকে। মন্ত্রী পরিষদে দলীয় পদ-পদবীতে বহুক্ষেত্রে তিনি দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। চরিত্র বদলের রাজনীতিকে রুখে দিয়েছেন দৃঢ় দেশপ্রেমের অঙ্গীকারে। পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানে ধরা পড়ে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়শই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দলের সর্বোচ্চ বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা হয়। ইতোপূর্বে দলীয় পদ-পদবীতে এবং সরকারের মন্ত্রী পরিষদে তিনি এমন অনেককে এনেছেন যাদের নিয়ে পত্র-পত্রিকায় ও নিজ দলের নেতারাও কোনদিন আলোচনা করেননি। ফলে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বলা যায় দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতির স্বপ্ন পূরণের দিক নির্দেশনাকে বাস্তব করে তুলবেন আসন্ন সম্মেলনে। বাস্তবতা অনুধাবন, পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণই দিক্নির্দেশনা বয়ে আনে।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসঃ কিছু ভাবনা

শাহ্ শাহনাজ সুলতানা ॥ মন থেকে মানসিক। কথায় বলি তার মানসিক অবস্থা ভাল না। ঠিক কোন অবস্থায় এই মানসিক খুঁটিনাটি বিষয়গুলো স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে  না। পারলে শারিরীক স্বাস্থ্যের মতো যথাসময়ে এই সমস্যা সমাধানে তৎপর হতো। অবজ্ঞা আর অবহেলায় ছোটখাটো মামুলি ব্যাপার থেকে একসময় বিশাল কিছুতে পরিণত হয়। এমন একটা সমস্যার নাম মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।

১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। সারা বিশ্বে বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে  এই দিবসটিকে সামনে রেখে আলোচনা সেমিনার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

মানসিক সমস্যা তারই হয় যার অনভূতি আছে অনুভূতিহীন কাউকে মানুষ বলা যায় না। নিজের অজান্তেই চারপাশের কিছু ঘটনা, কোন কথা, অথবা চিন্তার বাড়াবাড়ি চাপের সৃষ্টি করে। বেলা রহমান (আসল নাম নয়) একসময় এতটা মানসিক চাপের মধ্যে থেকেছেন যে, ঘুমানোর সময় বাদে বাকি সময়টা কেটেছে দুশ্চিন্তায়। রিকশায় উঠলে মনে হতো এই বুঝি গাড়ির সাথে চাকাটা লেগে গেল। ঘরের বাইরে বেরুতে চাইতেন না। পরিবারের কোন সদস্য কাজের প্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করলে সারাক্ষণ চিন্তা করা, অথবা অযথা মাথা গরম করা ছিল তার নিত্য কাজ। সমীক্ষায় দেখা যায়, অধিকাংশ মহিলা মানসিক  রোগে ভোগে। কোন সুনির্দিষ্ট কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয় না। সমষ্টিগত কারণ এক হয়ে ধীরে ধীরে তাকে বা কোন ব্যাক্তিকে রোগীতে পরিণত করে। যার শিকার হয় পরিবারের সদস্য নিরীহ শিশুরা।

সফল পিতামাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  বিষয় হচ্ছে সন্তানের মনস্তাত্বিক দিকটা বুঝতে পারা। আজকাল পিতা-মাতা দুজনেই ব্যস্ত থাকে। একই সাথে তাদের অনেক কাজ করতে হয়। কিন্তু এই ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে এমন একটা সময় আসে যখন তারা দেখতে পায় তাদের প্রিয় সন্তানটি সম্পর্কের বেড়াজালে নামমাত্র জড়িয়ে আছে। আসলে সে কোন এক দূরের দ্বীপ। কথা হয়, আবার হয়না। দেখা হয়, ভালো করে কথা হয় না। মুক্ত হয়ে কথা বলা, পারস্পরিক লেনদেন হচ্ছে না। যদি কোন পিতা-মাতা ভাবেন শুধুমাত্র ডাইনিং টেবিলে খাওয়ার সময় একটু সময় দেয়া, কথা বলা, অথবা গাড়ি চালানোর সময় পাশে বসিয়ে খোঁজখবর নেয়া যথেষ্ট তবে এটাই বলতে হবে তিনি ভুলের স্বর্গে বাস করছেন। সবসময় সন্তানের পিছনে এটাসেটা নিয়ে লেগে থাকা, তার জন্য সময় দেয়া বুঝায় না।  ঠিক তেমনি নিজের কাছে প্রশ্ন রেখে বের করতে হবে সারা দিনের একটা সময় শুধুমাত্র তাকে দেয়া বা তার পিছনে উৎসর্গ করা হয় কিনা। যার নাম কোয়ালিটি টাইম দেয়া। কোয়ালিটি টাইম দেয়া মানে সবসময় তার সাথে কথা বলা বা কিছু একটা একসাথে করা নয়। মাঝে-মাঝে তাদের সাথে বসে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা , তাদের আচরণগত দিক ও অভ্যন্তরিণ বিষয় খতিয়ে দেখা। পর্যবেক্ষণ করা আর দেখাকে এক করে ফেললে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এর জন্য দরকার পরিপূর্ণ মনোযোগ দেয়া : যখন সময় দেয়া হবে শুধু তাকেই দেয়া হবে। সম্পূর্ণ মনোযোগ পাওয়া শিশুর অধিকার। রান্নার সময় কথা বলা, ড্রাইভিং এর সময় কথা বলা যথেষ্ট নয়। তার প্রতি অখন্ড ভালবাসা সন্তান বড় না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে নিরাপদ ভাবে এবং নিজেকে মেলে ধরে। আমার জানামতে ১১ বছরের এক শিশু আছে যে বাসায় গাছের সাথে কথা বলে। কারণ তার সাথে কথা বলার মানুষ নেই। এখানে কথা বলার মানুষ আছে কিন্তু শোনার মানুষ নেই। কারণ এখন প্রায় প্রত্যেক পরিবারে একটি সন্তানের বেশী নেয়া হয়না। নিলে বড়জোর দু’টি সন্তান। আমেরিকার লেখক ও গবেষক ড. স্টিফেন কোভ তার ‘দি সেভেন হ্যাবিটস অব হাইলি ইফেক্টিভ পিপল’ বইতে চার ধরণের শোনার কথা উল্লেখ করেছেন। যা সাধারণ মানুষ করে থাকে। যেমন হেলায়- হেলায় কারও কথা শোনা। ব্যাপারটা এরকম তুমি তোমার কথা বলে যাও আমি আমার কাজ করি।

আরেকটা হলো শোনার ইচ্ছা নেই তবু চেষ্টা করি। অনেকটা ভনিতা করা। চুপ করে শুনছে মনে হচ্ছে কিন্তু সে অন্য কোন চিন্তা করছে। অবচেতন চিন্তার স্তর থেকে শোনা। একটু শোনার পর প্রশ্ন করা কি বললে? অর্থাৎ কিছুটা শোনা। চার নম্বর হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। মনোযোগ দিয়ে শোনার বিষয়টা বোধের ব্যাপার। তার মানে এই নয় তার কথা গিলে খাওয়া। দু’জন ব্যাক্তি যে কোন বিষয় নিয়ে এক হতে পারে না।

এক হওয়ার নাম যুক্ত হওয়া, যেখানে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। যদি হাজারটা প্রশ্নের মধ্যে একটা প্রশ্ন খুঁজে বের করতে বলা হয় তবে এটাই সত্য সেই প্রশ্ন হবে – সম্পর্ক কি ? আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের সমন্বয়হীনতা, উত্তর না জানার কারণেই হয়। একই ছাদের নিচে অবস্থান করে একটি মানুষের অনুরক্ত হতে পারিনা। কেন? কারণ পাশাপাশি অবস্থান করেও সর্বদা বর্তমানকে অবজ্ঞা করে সহ-অবস্থান করা হয়। যার শিকার হয় পরিবারের শিশুরা। শিশুদের ব্যক্তিত্ব, স্বভাব পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। দৃষ্টিভঙ্গিও গড়ে উঠে এই আদলে। পরিবেশ সন্তানের মনস্তাত্বিক দিক উন্নত করে  বা অবদমন করে। অবদমন প্রক্রিয়া একটি সর্বনাশা দিক যা তাদের মানসিক সমস্যার দিকে  ক্রমশ নিয়ে যায়।  প্রথমদিকে পুরো ব্যাপার অগোচরে থেকে যায় যতক্ষণ পর্যন্ত  মানসিক সমস্যার লক্ষণগুলো না দেখা যায়। অনেক পিতা-মাতা সন্তানকে প্রশ্নের খাতিরে প্রশ্ন করে থাকে। যা একবারেই অনুচিত। তার মতামত পাওয়া বিশেষ করে বয়সের কারণে, হরমোনের পরিবর্তনের কারণে তাদের মুড বুঝা, বুঝার চেষ্টা খুব কম পিতা-মাতা করে থাকে। একশতে ২০ জন পিতা-মাতা এর ব্যতিক্রম হলে বর্তমান সমাজে বিরাজ করা তরুণ সমাজ নিয়ে অভিভাবকদের আহাজারি কমবে। এটাই আশার কথা। আশা বুঝতে হলে নিরাশাকে বুঝতে হয়। আশা-নিরাশা পাল তোলা নৌকা। আবেগ হয় বৈঠা, নৌকার ভারসাম্য রাখতে হলে আনন্দকে বাতাস হিসেবে নিতে হয়।

তাই সন্তানের বিভিন্ন ধাপের সাথে পরিচয় রাখা বাঞ্ছনীয়। এজন্য দরকার পিতা-মাতার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। দরকার স্ব-শিক্ষা। অন্য সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করলে নিজের সন্তানের অনেক সমস্যার সমাধান আসে। তুলনা নয় শুধু পর্যবেক্ষণ শক্তি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা। সমানুভূতি বলে একটা শব্দ আছে অভিধানে। সহানুভূতির চেয়ে সমানুভূতি দরকার অন্তত, আজকের প্রযুক্তির যুগে। কোন কোন পিতা-মাতা ধারণা পুষে রাখেন তার ছেলে অথবা মেয়ে কোন অভিযোগ করেনা চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে। এ ধরণের ধারণা পুষে রাখা সন্তানের জন্য মঙ্গলজনক নয়। চোখ খোলা রেখেও তারা বন্ধ করে রাখছেন। অভিযোগ না থাকা, বা  কোন কিছু না বলা মানে এই নয় তার কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। অযাচিত চাওয়া যেমন ভাল না ঠিক তেমনি কিছুই না বলা ভাল না। পরিস্কার ভাবে কথা বলে তার সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা প্রয়োজন। হয়না বলেই পরিবারে বেড়ে উঠা একমাত্র মেয়েটি পোষা প্রাণীর সাথে কথা বলে, একা একা বিড় বিড় করে। পড়াশুনায় কোন মনোযোগ নেই। কোন গতি নেই। সন্তানরা তাদের কিছু আচরণ আয়ত্ব করে পিতা-মাতার কাছ থেকে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, পরিবেশ থেকে। যে আচরণ অস্বাভাবিক, মাত্রাধিক্য তার নাম মানসিক রোগ। দেখা যায় বিষন্নতা, দ্রুত মুড পরিবর্তন, অস্থিরতা, আবেগ প্রবণতা, হতাশা। এক্ষেত্রে সন্তানরা কোন সময় নিজেদের নিঃসঙ্গ করে ফেলে। তথাকথিত বড়রা (!) চিন্তাভাবনা করে তাদের দিক থেকে অবস্থান করে। এটা না ভেবে সন্তানের বয়সের অবস্থানে নিজেদের কিছুটা সময় ভাবতে সক্ষম হলে তখন দেখতে পায় তারা কতটা অধৈর্য। এই সময়ে এই বয়সে তারা কি ছিল?  নিশ্চয় সমাজের আঙ্গিক পরিবর্তন হয়েছে সময়ের হাত ধরে। শিশু  বিকাশের ধাপ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়নি, হয়েছে কেবল পদ্ধতিগত দিক। আগে আমরা মাইলের পর মাইল হেঁটে স্কুলে যেতাম এখন আজকের অনেক শিশু তা ভাবতে পারেনা। শিশুদের নিজস্ব পৃথিবীটা মঙ্গলগ্রহ হয়ে যায়। জনমানবহীন এই গ্রহে তারা মানসিক রোগী হয়ে বসবাস করে যখন পিতামাতা দু’জনেই কোন না কোন ভাবে মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকে। মোহ, পরশ্রীকাতরতা, সংকীর্ণতা, হিংসা ইত্যাদির জালে পিতামাতারাই একবার ডুবে একবার ভাসে। আমরা যেমন শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখি তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও লক্ষ্য রাখা দরকার। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় যাই হোক না কেন উপলব্ধির উপরে আর কোন শব্দ থাকতে পারে না। সচেতনতার সাথে পথ চলায় আনন্দ যোগ হলে আর কি প্রয়োজন পড়ে?

মানুষ কাকে বলে?

  • ‘মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝখানে আল্লাহ্ অবস্থান করেন’ (৮:২৪)।
  • ‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রেষ্ঠতম অবয়বে’ (৯৫:৪)।
  • ‘আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনীর চেয়েও নিকটতর’ (৫০:১৬)।
  • ‘তুমি আল্লাহ্ প্রকৃতি অনুসরণ করো, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এ-ই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না’ (৩০:৩০)।
  • ‘তিনিই মানুষকে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি করেছেন’ (৩৫:৩৯)।
  • ‘তিনি পৃথিবীর সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন’ (২:২৯)।

সংলাপ ॥ কুরআনের কেন্দ্রে রয়েছেন সর্বজ্ঞ আল্লাহ্ আর এর পরিধি হচ্ছে মানুষ। আজ জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বব্যাপী অনুরণিত হচ্ছে মানুষের জয়গান। মানুষ নিজেকে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। মানুষ গঠন করেছে সমাজ, গঠন করেছে রাষ্ট্র আবার মানুষই সেই রাষ্ট্র ভাঙার সূত্র আবিষ্কার করেছে নিজেরই প্রয়োজনে। মানুষ গড়েছে নগর, মহানগর, গড়েছে সভ্যতা-সংস্কৃতির অভ্রংলিহ প্রাসাদ।

পাতঞ্জলি, সক্রেটিস, বুদ্ধ, বাল্মিকী, নূহ, দাউদ, মুসা, ঈসা, মোহাম্মদ (যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-এঁরা সবাই মানুষ। এঁরাই ধ্রুবতারা রূপে মানবজাতিকে পথপ্রদর্শন করছেন জ্যোতির্ময়ের জ্যোতির দিকে। অন্যদিকে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, চেঙ্গিস খাঁ, হালাকো খাঁ, মুসোলিনি, হিটলার, স্ট্যালিন এরাও মানুষ। মানুষই গড়ে, মানুষই ভাঙ্গে। মানুষ যেভাবে ভালো চায় সেভাবেই মন্দ চায় (১৭:১১)।  মানুষই আনে পরিবর্তন। নিজেই সৃষ্টি করে নিজের ভবিষ্যত। ‘মানুষ তাই পায় যা সে করে’ (৫৩:৩৯)। মানুষ নিজেকে ভেঙ্গে সৃষ্টি করে নতুন মানুষ। মানুষই যুদ্ধ করে, আবার মানুষই শোনায় শান্তির সুললিত বাণী। অবতার, নবী-রসুল, বিধাতা, স্বর্গ-নরক, আজাজিল-সবই আছে মানুষের রূপে। মানুষই ফেরেশতা, মানুষই ইবলিস আবার মানুষের মধ্যেই আল্লাহর প্রকাশ।

মানুষ আল্লাহ্ রহস্য, আর আল্লাহ্ মানুষের রহস্য। আল্লাহ্ সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি হচ্ছে মানুষ। কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের কাছে, মানুষেরই জন্য (৩৯:৪১)। জ্ঞানময় কুরআন মানুষকে সরলতম পথ প্র্রদর্শন করে। তিনি মানুষের জন্য বিভিন্ন উপমা দিয়ে তার বাণী বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। কুরআন মানবজাতির জন্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সাবধানীদের জন্য পথপ্রদর্শক ও শিক্ষা (৩:১৩৮)।

এই কল্যাণময় কুরআন কিভাবে চিত্রিত করেছে মানুষকে? কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষ কে? যার দু’টি হাত, দু’টি পা আছে, সোজা হয়ে হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে যে, সে-ই কি মানুষ? না-কি যার মনুষ্যত্ব আছে, বিবেক-বুদ্ধি আছে, বিশ্বাস-প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা-সংযম আছে সে-ই মানুষ?  না-কি উল্লিখিত উভয় প্রকারের প্রাণীই মানুষ? তাহলে অমানুষ কাকে বলে? মানুষই বা কাকে বলে? নানা মানুষ নানাভাবে দিয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু শ্রেষ্ঠ উত্তরটি তাঁরই যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। পরম স্রষ্টা কাকে মানুষ বলেছেন, এটাই  প্রশ্ন।

আল্লাহ্ কিভাবে সৃষ্টি করলেন মানুষকে? তিনি মানুষকে সৃষ্টি করলেন ফেরেশতা এবং শয়তানের সমন্বয়ে। ফেরেশতাগণ হচ্ছেন চরম ভালো, এরা ভালো ব্যতীত মন্দ করতেই পারেন না। অন্যদিকে শয়তান হচ্ছে চরম মন্দ, তিনি মন্দ ব্যতীত অন্য কিছু করতেই পারেন না। সুতরাং ফেরেশতা এবং শয়তান সৃষ্টি করে আল্লাহ্ সৃষ্টির আনন্দই পেলেন না। তাই ফেরেশতা এবং শয়তান অর্থাৎ চরম ভাল এবং চরম মন্দের সমন্বয়ে আল্লাহ্ সৃষ্টি করলেন মানুষ। বৈপরীত্যের সমাহার ও দ্বন্দ্ব দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করে পূর্ণতা পেলো লীলাময়ীর লীলা।  তিনি সৃষ্টি করলেন এমন এক প্রাণী যা ভালোও নয় মন্দও নয়। তবে তাকে দান করা হলো ভালো ও মন্দের জ্ঞান (৯১:৮-৯), স্বাধীনতা দেয়া হলো – যে কোন একটা বেছে নেবার। বলে দেয়া হলো, প্রত্যেকেই ভোগ করবে তার কর্মফল। আল্লাহ্ মানুষকে যোগ্যতা দিলেন আকাশ এবং পৃথিবীকে অতিক্রম করার, জগতকে জানবার, সত্য ও সুন্দরকে জানবার। সুতরাং মানুষ স্বর্গেরও নয় মর্ত্যরেও নয়, মরও নয় অমরও নয় কিন্তু মানুষের যোগ্যতা আছে অমর হবার। মানুষ ইচ্ছে করলে নিজেকে বিকশিত করে জীবাত্মা থেকে মানবাত্মা, মানবাত্মা থেকে মহাত্মা, মহাত্মা থেকে পরমাত্মায় আশ্রিত হতে পারে আবার ইচ্ছে করলে পশুর স্তরে কিংবা এর চেয়েও নিম্নস্তরে নেমে যেতে পারে।

এইভাবে মানুষ সৃষ্টি করে পরমানন্দে স্রষ্টা তাঁর ফেরেশতাদের আদেশ করলেন মানুষকে সিজদা করতে (২ঃ৩৪)। একজন ব্যতীত সকল ফেরেশতারাই তাকে সিজদা করলো। তিনি প্রমাণ করলেন – মানবের উত্তম কিছু নাই। সবার উপরে মানুষ। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। শুধু ফেরেশতাদের থেকেই শ্রেষ্ঠ নয়, সকল সৃষ্টি থেকে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়? মানুষ শারিরীক গঠনে কিংবা পেশীশক্তিতে অন্যান্য জীবের থেকে শ্রেষ্ঠ নয়। মানুষ শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞানে। কারণ, আল্লাহ্ নিজে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং মানুষকে যে জ্ঞানের দিক থেকে ফেরেশতাদের থেকেও শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে তা তিনি ফেরেশতাদের ডেকে জ্ঞানের পরীক্ষা নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে প্রমাণ করে দিয়েছেন (২ঃ৩১-৩৩)। রসুল (সা.) বলেছেন – যে জ্ঞান আহরণের জন্য পা বাড়ায় আল্লাহ্ তাকে বেহেশতের দিকে পথনির্দেশ করেন’। কুরআন বলছে – ‘যারা জানে এবং যারা জানে না তারা সমান হতে পারে না।’ কুরআন জ্ঞানকে আলো, অজ্ঞতাকে অন্ধকার, জ্ঞানবানকে জীবিত এবং অজ্ঞ ব্যক্তিকে মৃত বিবেচনা করেছে। আল্লাহ্ বলছেন – ‘অন্ধ এবং চক্ষুষ্মানরা এক নয়। অন্ধকারের গভীরতা এবং আলোর উজ্জলতা এক নয়।’ সুতরাং সিদ্ধান্ত আসে – যিনি যতটা জ্ঞানবান হতে পেরেছেন তিনি ততটা মানুষ হয়ে উঠেছেন। কে কতটা মানুষ তার নির্ণায়ক – জ্ঞান। কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের আকৃতি থাকলেও যাদের জ্ঞান নেই তারা অমানুষ বা মানুষ বলে গণ্য হবার অযোগ্য। যাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দিয়ে যারা উপলব্ধি করতে পারে না, যাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে যারা দেখতে পারে না, যাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে যারা শুনতে পারে না। তারা (আকৃতিতে মানুষ হলেও আসলে) গৃহপালিত পশুর ন্যায় (৭ঃ১৭৯)। আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জানোয়ার হলো তারাই (যদিও এদের আকৃতি মানুষেরই মতো) যারা বধির ও বোকা এবং যারা কোন কিছুই বুঝতে পারে না (৮ঃ১২)। কুরআনের সিদ্ধান্ত হলো – মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট প্রাণীই মানুষ নয়। যারা শুনতে ও বুঝতে পারে না, যাদের জ্ঞান নেই যারা সত্য ও খাঁটি পথ থেকে দূরে বিচরণ করে তারা গৃহপালিত জানোয়ার (২৫ঃ৪৪)।

অন্যদিকে, মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি (২ঃ৩০)। ‘তিনিই মানুষকে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি করেছেন’ (৩৫ঃ৩৯) এবং ‘পৃথিবীর সবকিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন’ (২ঃ২৯)। তিনি মানুষের অধীন করে দিয়েছেন আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সবকিছু (৪৫ঃ১৩)। মহাবিশ্বে যা কিছু আছে সবকিছু ভোগ করার অধিকার মানুষের আছে। কিন্তু আল্লাহ্র প্রতিনিধি হিসেবে আকাশ-জমিন-পানিতে যা কিছু আছে সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও মানুষের। সমগ্র মহাবিশ্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে মানুষ মর্যাদাবান হয়েছে। আল্লাহ্ সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের পরই প্রতিষ্ঠিত হয় ভোগের অধিকার। আল্লাহ্ হচ্ছেন রব বা পালনকর্তা। পালনকর্তার প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে সমগ্র সৃষ্টিকে পালন করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রাখা। সুতরাং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। আকাশে ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সবই আল্লাহ্ (২ঃ২৮৪)। তাই, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে যা কিছু আছে পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, জীব-জন্তু, গাছ-পালা ইত্যাদি সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মানুষের।

মানুষ শুধু আল্লাহর প্রতিনিধি নয়। মানুষ আল্লাহ্ আব্দ বা দাস। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য (৫১ঃ৫৬)। যেহেতু আল্লাহ্ তায়ালা শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, সেহেতু ইবাদত ব্যতীত আর কিছু করলে তা মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না। ইবাদতের দু’টি অংশ – একটি হচ্ছে আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালন করা (হক্কুল্লাহ্) অন্যটি হচ্ছে প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব পালন করা (হক্কুল এবাদ)। মানুষকে দু’টি চোখ দেয়া হয়েছে – যেন একটি চোখ থাকে আল্লাহর দিকে আর অপরটি সৃষ্টির দিকে; মানুষকে দু’টি হাত দেয়া হয়েছে যেন একটি হাত আল্লাহ্ দিকে আর অন্য হাতটি মানুষের দিকে প্রসারিত হয়, মানুষের দু’টি কান দেয়া হয়েছে – যেন একটি দিয়ে সে আল্লাহ্ নির্দেশনা এবং অন্যটি দিয়ে সৃষ্টির আহ্বান শুনতে পায়।

আল্লাহর সমগ্র বিধানকে চার ভাগে ভাগ করলে দেখা যায় এর তিন চতুর্থাংশ ব্যাপী রয়েছে সৃষ্টির প্রতি কর্তব্য বা হক্কুল এবাদের আলোচনা। দুনিয়ার কাজ-কর্ম পরিত্যাগ করে গাছতলায় বসে ‘আল্লাহু’ ‘আল্লাহু’ যিকির করাই কেবল ইবাদত নয়। কারণ আল্লাহ্ পূর্ণ, অভাবমুক্ত, সর্বজ্ঞ এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তিনি কারো যিকিরের মুখাপেক্ষী নন। তাই আল্লাহ্ তায়ালা চান না যে মানুষ কেবল তাঁরই নাম জপ করুক, আল্লাহ্ যদি মানুষের কাছ থেকে কেবল যিকির এবং তসবীহ-তাকসীদ অর্থাৎ, ‘আল্লাহ্ হক’-ই চাইতেন তবে তিনি আর ‘মানুষ’ সৃষ্টি করতেন না। ফেরেশ্তারাইতো দিবা-নিশি তাঁর নাম জপ করছিলেন। আল্লাহ্ তায়ালা ইচ্ছা করলে আরো অসংখ্য ফেরেশ্তা সৃষ্টি করতে পারতেন কিংবা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করতে পারতেন যে মানুষ তাঁর প্রশংসা ব্যতীত আর কিছুই করতো না। তবে কেন আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে এভাবে সৃষ্টি করলেন? কেন মানুষকে সৃষ্টি করা হলো বৈপরীত্যের সমাহার ও দ্বন্দ্ব দিয়ে – যার মধ্যে একদিকে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যৌনাবেগ, ঘৃণা আর অন্যদিকে প্রেম, দয়া, আনন্দ ও বেদনার অনুভূতি? কেন মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হলো যে, জীবন-যাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে পরস্পরের মুখাপেক্ষী হতে হবে? মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষেরই জন্যে। তার মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে এমন অভাববোধ যে, মানুষকে – মানুষেরই মুখাপেক্ষী হতে হবে। মানুষকে বেঁচে থাকতে হবে পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। এ পারস্পরিক সম্পর্ক যদি আল্লাহ্ তায়ালার বিধান মতো হয় তবে তা-ই ইবাদত। আল্লাহ্ তায়ালার বিধান – মানুষকে ভালবাসার বিধান। মানুষকে ভালবাসাই আল্লাহকে ভালবাসা, মানুষের সেবা করাই আল্লাহ্ সেবা করা। রসুল (যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) বলেন, ‘তুমি কি আল্লাহকে ভালবাসতে চাও? তাহলে এখন মানুষকে ভালবাসতে শেখ।’ মানুষকে ভাল না বেসে আল্লাহকে ভালবাসার চেষ্টা করা বৃথা। সৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে স্রষ্টাকে ভালবাসার দাবি করা যায় না।

আসলে, আমাদের কোন কাজ-কর্মের পরোয়া করার প্রয়োজন আল্লাহ্ তায়ালার নেই। মানুষের কর্মফল মানুষই ভোগ করবে। আল্লাহ্ তায়ালা মানুষের মুখাপেক্ষী নন, মানুষই মানুষের মুখাপেক্ষী, আল্লাহ্ তায়ালার মুখাপেক্ষী। তাই যখন বলা হলো, ‘আমি মানুষকে আমার ইবাদত ছাড়া অন্য কোন কাজের জন্য সৃষ্টি করিনি’ – তখন মানুষের নিজেদের কল্যাণের জন্যই তা বলা হলো, আল্লাহ্ তায়ালার কল্যাণের জন্য নয়। একজন ভাল ডাক্তার তার রোগীর জন্য একটা ঔষধের কথা বলে দিলেন। এতে ডাক্তারের কোন লাভ নেই। ঔষধ সেবনে রোগীরই কল্যাণ – ডাক্তারের নয়। ইবাদতে কল্যাণ মানুষের। আর প্রকৃত ইবাদত হচ্ছে – গরিব, অসহায় মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করা, নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দেয়া, মজলুমকে জালেমের হাত থেকে রক্ষা করা, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করা, আর্ত-পীড়িতের সেবা করা। আল্লাহ্ তায়ালা মুসা (আ.) কে জিজ্ঞাসা করলেন,  ‘হে মূসা, তুমি আমার জন্য কি কি কাজ করেছ?’ মূসা বললেন, ‘আমি আপনার জন্য নামাজ পড়েছি, রোজা পালন করেছি এবং আপনাকে সিজদা করেছি’। আল্লাহ্ বললেন, ‘নামাজ পড়েছো দোজখের আগুন থেকে বাঁচবার জন্য, রোজা রেখেছো বেহেশ্তে যাবার জন্য, আর সিজদা করেছো বেহেশ্তে গিয়ে উচ্চ মর্যাদা পাবার জন্য, এগুলো তো তোমার নিজের জন্য করেছো, এগুলো তো তোমার কাজ। আমার জন্য কি করেছো তাই বলো’। মূসা (আ.) বললেন, ‘এগুলো যদি আপনার কাজ না হয় তবে বলে দিন আপনার কাজ কি কি।’ আল্লাহ্ বললেন – ‘কোন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে কি পেট পুরে আহার করিয়েছ? কোন পিপাসাতুর ব্যক্তিকে কি পানি পান করিয়েছ? কোন মজলুম ব্যক্তিকে কি জালেমের হাত থেকে রক্ষা করেছ? কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে কি সম্মান করেছ? এইগুলো আমার কাজ’। এ কাজগুলো যারা করে তাদের মধ্যেই জাগ্রত হয় মনুষ্যত্ব। আল্লাহর দৃষ্টিতে তারাই মানুষ।

পরম করুণাময় আল্লাহ্ সৃষ্টির ঊর্ধ্বে কোন একটা বিশেষ স্থানে অবস্থিত ব্যক্তিক সত্তা নন। ‘মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝখানে আল্লাহ্ অবস্থান করেন’ (৮:২৪)। তিনি আছেন মানুষেরই মাঝে। ‘তিনজনের মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাদের মধ্যে চতুর্থজন হিসাবে তিনি হাজির না থাকেন, পাঁচজনের মধ্যেও হয় না, যেখানে তিনি ষষ্ঠজন হিসেবে না থাকেন। সংখ্যায় ওরা এর চেয়ে কম বা বেশি হোক, ওরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহ্ ওদের সঙ্গে আছেন’ (৫৮:৭)। যেখানেই মানুষ আছে সেখানেই আল্লাহ্ আছেন। মানুষের মধ্যেই  আল্লাহ্ আছেন। মানুষের মৌল প্রকৃতিতে আল্লাহ্ অবস্থান। তিনি আছেন মানুষের গ্রীবাস্থিত ধমনীর চেয়ে নিকটতরে (৫০:১৬)। নীলাচল, কাশী, মথুরা বৃন্দাবন, বুদ্ধ গয়া, জেরুজালেম, মদিনা, কাবাঘর, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মুসা, ঈসা, মোহাম্মদ সবকিছুর বাসস্থান মানুষের দিল কাবা। এই দিল কাবার সন্ধান যে লাভ করেছে   সে-ই না মানুষ!

আল্লাহর কোন রূপ নেই।  মানুষ রূপেই তিনি নিজেকে করেছেন প্রকাশিত। মানুষ আকৃতিতে নয় প্রকৃতিতে স্বয়ং আল্লাহ্। আল্লাহ্ মানুষকে সুঠাম দেহের অধিকারী করেছেন এবং তাতে রুহ ফুঁকে দিয়েছেন (৩২ঃ৭)। আল্লাহ্ তাঁর প্রকৃতিতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন (৩০ঃ৩০)। তাই খুঁজিতে হয় মানুষ, পূঁজিতে হয় মানুষ, ভজিতে হয় মানুষ। মানুষের মানসভূমি, মানুষের আরাধনায় উর্বর হলে আমিত্বের আবরণ ভেদ করে নিজেকে উন্মোচিত করেন তিনি। তাই লালন সাঁইজী বলেন, – ‘মানুষ থুইয়া খোদা ভজ, এ মন্ত্রণা কে দিয়াছে/ মানুষ ভজ, কুরআন খোঁজ পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে’।

মানুষ না ধরে, আকাশের আল্লাহকে জানবার কোন উপায় নেই। কুরআন খুঁজলেই পাতায় পাতায় সাক্ষী পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যে যিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন তিনিই আল্লাহতে আশ্রিত হন। আল্লাহতে বিলীন হতে হলে তা মানুষের মাধ্যমেই হতে হবে। এটাই বিধির বিধান।

মানুষই সত্য। এ সত্যকে উপলব্ধি করেই মহামানুষ মনসুর হাল্লাজ ঘোষণা করেছিলেন – আনাল হক অর্থাৎ ‘আমিই আল্লাহ্’। শামসে তাব্রিজ ঘোষণা করেছিলেন – ‘আমিই আদি, আমিই অন্ত, আমিই গোপন, আমিই প্রকাশ্য। একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আপনি কি মুসলিম? শামসে তাব্রিজ উত্তর দিয়েছিলেন – ‘আমি অগ্নি উপাসকও নই, খ্রিস্টানও নই, ইহুদিও নই এবং মুসলিমও নই। আমি জীবনের মধ্যে নেই, মৃত্যুর মধ্যে নেই, আমি পানিতেও নেই, মাটিতেও নেই, আমি আগুনেও নেই, বাতাসেও নেই।’ একথা শুনে তাঁকে আবার প্রশ্ন করা হলো, ‘তাহলে আপনি কে’? উত্তরে তিনি বলেছিলেন – ‘আমি-ই সত্য’। শেখ ফরিদ বলেছিলেন – ‘আমিই ওলি, আমিই আলী, আমিই নবী, আমিই মাওলা, আমিই মহাবীর, আমিই মন্দিরের ব্রাহ্মণ পুরোহিত’। আল্লাহ্ তো মানুষেরই অন্তস্থিত শূণ্যতা। যে জেনেছে তা, সে পেয়েছে পূর্ণতা।

অমানুষও মানুষ। অমানুষ থেকে ‘অ’ বাদ দিলেই মানুষ হয় কিংবা মানুষের আগে ‘অ’ যুক্ত হলেই মানুষ অমানুষ হয়। কুরআন যেমন মানুষকে প্রশংসা এবং মর্যাদাবান করেছে তেমনি করেছে তিরষ্কার। কুরআন – অজ্ঞ, অথর্ব, অসৎ, অবিশ্বাসী, অকৃতজ্ঞ, অপব্যয়ী, অসন্তুষ্ট ইত্যাদি ‘অ’ যুক্ত মানুষকে অমানুষ বা গৃহপালিত পশু বা তার চেয়ে অধম হিসেবে তিরষ্কার করে। অমানুষকে মানুষ হতে হলে তাকে মানুষপন্থী হতে হয়। একজন চিত্রশিল্পী যেমন তার সামনে বাস্তব আদর্শ (মডেল) না থাকলে ছবি আঁকতে পারেন না ঠিক তেমনি অমানুষের সামনে কোন একজন মানুষ না থাকলে তিনি নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন না। ‘মানুষ’ -এঁর সংস্পর্শে না আসা পর্যন্ত অমানুষের উপলব্ধিই হবে না যে তিনি অমানুষ! কে কতটা মানুষ কিংবা অমানুষ তা বিচারের জন্য মানুষের সামনে এমন ‘এক’ নৈতিক এবং নান্দনিক আদর্শ থাকতে হবে যাঁর সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে মানুষ কিংবা অমানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। ‘যে কর্ম আদর্শ অনুযায়ী সম্পাদিত হচ্ছে তা ভালো আর যে কর্ম আদর্শের পরিপন্থী তা মন্দ’ – এই নীতিতে অটল থেকে ‘আদর্শ’-কে সামনে রেখে, আদর্শ সাপেক্ষে,  কর্ম ও আচরণের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলে অমানুষ অবশ্যই মানুষ হবে। অমানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষপন্থী না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ হতে পারে না।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, জগতে এখন মানুষপন্থী মানুষ খুবই কম। জগতে চীন-মস্কো-সৌদিপন্থী মানুষ আছে, বাম-ডান-মধ্যপন্থী মানুষ আছে, কুরআন-বেদ-বাইবেল-ত্রিপিটকপন্থী মানুষও আছে কিন্তু মানুষপন্থী মানুষের বড়ই অভাব। অথচ এটা সুবিদিত যে, মানুষপন্থী মানুষই আল্লাহ্পন্থী মানুষ।

প্রাণীকুলের সকলেরই একটা প্রকৃতিগত ধর্ম আছে। মানুষ ব্যতীত অন্য সকল প্রাণী তার প্রকৃতিতে কোন প্রকার বিকৃতি ছাড়াই সদা প্রতিষ্ঠিত কিন্তু তারা তা জানে না। তাই ধর্মে প্রতিষ্ঠিত হবার কোন তাগিদই তাদের নেই। ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই মানব শিশুকে তার প্রাকৃতিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। মানব শিশু বাড়তে থাকে এমন একটা পরিবেশে যে পরিবেশে সকলেই তাদের প্রকৃতিগত ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে। জীবন বিকাশের একটি স্তরে উপনীত হয়ে যখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে, সে নিজের প্রকৃতিগত ধর্মকে হারিয়ে ফেলেছে তখনই সে খুঁজতে থাকে তার ধর্ম। একমাত্র মানুষকেই সেই যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, যোগ্যতায় সে তাঁর প্রভুর নৈকট্য লাভ করতে পারে। কিন্তু এজন্য মানুষকে কঠোর কর্মসাধনা করতে হবে। যে এ লক্ষ্যে কঠোর সাধনা করে সে অবশ্যই তাঁর সাক্ষাত পাবে (৮৪:৬)। কঠোর সাধনার মাধ্যমে যে নিজেকে চিনবে সেই চিনবে তাঁর আল্লাহ্কে। কারণ মানুষ আল্লাহ্র সুরত। মানুষ যখন নিজেকে জানবে, নিজ ধর্মকে জানবে তখনই সে মানুষ, রূপান্তরিত হবে স্বয়ং সত্যে।  এ সত্যই মানবজীবনের পূর্ণতা। চলো – মানুষ হই, সত্যের অভিসারে হই সাহসী অভিযাত্রী।

সময়ের সাফ কথা…. সাবধান! আমি সাংবাদিক!!

অ্যাড. এম. মাফতুন আহমেদ ॥ সাংবাদিকরা এক সময় সমাজের গুণী হিসেবে সমাদর পেতেন। প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাজের সবাই তাদের শ্রদ্ধা করতেন। ইদানিং সাংবাদিক পরিচয়টাও কোথাও কোথাও আকর্ষণের বিষয়বস্তু নয় মোটেও। এক শ্রেণীর সাংবাদিক দেখলে কেউ কেউ বলেন, চাপাবাজ-ধান্দাবাজ। কেউ কেউ ভাবেন, বেটা আস্ত একটা টাউট। লেখা নেই, পড়া নেই অথচ মস্তবড় সাংবাদিক। কারও চোখে সাংবাদিক মানে স্বল্প বেতনভুক্ত ছা-পোষা কেরাণী। এক শ্রেণীর হাইবিড রাজনীতিক দেখলে লোকেরা ভাবেন, বেটা বুঝি চাঁদা চাইতে এলো। এদের চোখে রাজনীতিক মানেই ভবঘুরে। কারও কারও দৃষ্টিতে জেলখানার কয়েদি। আর আইনজীবী! আমার পিতা বলতেন- ‘আইন  পেশা লর্ড ফ্যামিলির পেশা। আমাদের মতো হত:দরিদ্র পরিবারের লোকদের চটি পায়ে, যেনতেন কালো স্যুট গায়ে লাগিয়ে এ পেশায় তেমন একটা মানায় না। লর্ড পরিবারের সন্তানরা পেশা হিসেবে যতটুকু না বেছে নিয়েছিলেন তার থেকে সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এখন এক শ্রেণীর উকিল দেখলে অনেকে ‘লায়ার’ বলেন। আবার এক শ্রেণীর ডাক্তার দেখলে বলেন ‘কসাই’, অনেকে বলেন ‘কমিশনবাজ’।

৩৬ বছর আগের কথা। বিখ্যাত দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। উপমহাদেশের সাংবাদিকতার দিকপাল মোদাব্বের সাহেব বলতেন, ‘ভাল সাংবাদিক হতে গেলে পেশার শুরুতে একটু প্রেসের কালি মুছতে হয়; সিনিয়রদের সাথে থেকে কাজ শিখতে হয়’। তাই মুরুব্বিদের কথামত সাংবাদিকতায় দক্ষতা অর্জনে মনের বিরুদ্ধে ক’বছর প্রেসের কালি মুছতে হয়েছে। তখন জানতাম সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সাংবাদিকরা জাতির বিবেক, সাহসী সন্তান ও অতন্দ্র প্রহরী। সোনালি অতীত সাক্ষ্য দেয় যে, এই উপমহাদেশে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে সংবাদপত্র-সাংবাদিকরা পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে, এমনকি পাকিস্তান আমলেও সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী এদের আলাদা একটা মর্যাদা ছিল। লোকে ভয় করতো, শ্রদ্ধা করতো, ভালবাসতো, সম্মান করতো। আজকাল ভয়  করে। তবে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে ভালবাসেন কিনা সন্দেহ। এ কথা সত্যি যে, সবাই সমাজের কাছে অশ্রদ্বেয় ব্যক্তি নয়। বিশেষ কাউকে কাউকে শ্রদ্ধা অবশ্যই এখনও করেন। আমি সেই বিশেষের দলভুক্ত নই মোটেও।

যুগ, সমাজ, পরিবেশ, পারিপার্শি¦কতা পাল্টে গেছে। সর্বত্রই আমূল পরিবর্তন। হয়েছে নীতি-নৈতিকতার পরিবর্তন। বিশ্ব আজ উন্নয়নের চূড়ান্ত সীমায়। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে আমাদের  নৈতিক স্খলন ঘটেছে চরমভাবে? প্রত্যেক মোটর সাইকেলে কিংবা গাড়ির পেছনে নেমপ্লেট থাকে। যেখানে লেখা থাকে গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন নম্বর। কর-খাজনার বিনিময়ে সরকার নির্ধারণ করে দেয় একটি গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন নম্বর। অনেকের গাড়ির পেছনে নেমপ্লেটে লেখা থাকে ‘সাংবাদিক’! কারণ আমার মতো অনেক সাংবাদিকের গাড়ি কিংবা মোটর সাইকেলের রেজিষ্ট্রেশন নেয়া লাগে না। এসব দেখে অনেকে প্রশ্ন করেন, সাংবাদিকদের জন্য কী আলাদা আইন? আপনারা কী অন্য কোন ভূবনের বাসিন্দা? তখন কী বলি? কী-ই-বা বলার আছে? আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু একটা বলতে হয়। তাই দুরুদুরু কন্ঠে কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করে। রকমফের কৌশল করে আমার মতো অনেক সাংবাদিক সংসার চালায়। অর্থ রোজগার করেন। তাই গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন সংগত কারণে করেন না। গাড়ির গায়ে সাংবাদিক লেখা দেখলে আইন প্রয়োগকারি সংস্থার লোকেরা (!) ধরেন না। বরং সমীহ করেন।  চা-পান খাওয়ায়ে আপ্যায়ণ করেন। ব্যস, খেল খতম। নিমিষেই চলে যান পর্দার আঁড়ালে। অর্থাৎ এগিয়ে যেতে থাকেন অন্ধকার জগতে। এবার শুরু হয়ে যায় কথিত মাল্টি বিজনেস! অবশ্য সম্প্রতি সরকার গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন ও নেমপ্লেট বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে যা অবশ্যই সাধুবাদ পাবার যোগ্য, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

এক সময় সাংবাদিকদের সম্মান এমন ছিল যে, কোন সরকারি কর্মকর্তা চাকুরির সুবাদে মফস্বলে এলে আগে সাংবাদিকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হতেন। অত:পর এলাকার উন্নয়নে পরস্পর মত বিনিময় করতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা নিজ নিজ কর্মের জবাবদিহি করতেন। সেদিন পেশাগত কারণে এক মফ:স্বল শহরে গিয়েছিলাম। দেখি কিছু দলবাজ, মোসাহেব, পন্ডিত নামধারি সাংবাদিক ফুল নিয়ে এক কর্তার অফিসে বসে আছেন। আশে-পাশে অনেকে বলছেন সাংবাদিকরা এসেছেন নতুন স্যারকে বরণ করে নিতে। আবার টিপ্পনি কেটে অনেকে বলাবলি করছেন এরা কী সাংবাদিক না সাংঘাতিক? আমিও এক পর্যায়ে এ সাংবাদিকদের সাথে মিশে গেলাম। একটু সময়ক্ষেপণ করলাম। ফুল নিয়ে বসে থাকার কারণ কী আগে-ভাগে তাদের কাছ থেকে জেনে নিলাম। উপস্থিত কেউ কেউ বললেন, নতুন ‘স্যার’ আসছেন তাই সাদরে বরণ করতে এত সব আয়োজন। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, কোথায় চলেছে ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই জাতি? যারা জাতির বিবেক, কেন তাদের এই দূরবস্থা? চাটুকারি, মোসাহেবি আর কাকে বলে? এখনও জানি যে, পদস্থ কেউ মফস্বল শহরে এলে প্রথমে প্রেসক্লাব বা সংশ্লিষ্ট অফিসে আসেন। যেখানে সাংবাদিকরা বসেন। আর উল্টো করে আমার মতো নাদান হলুদ সাংবাদিকরা বাহারি ফুলের তোড়া নিয়ে গিয়ে সেখানে অপেক্ষমান থাকেন, কখন কর্তা আসবেন আর কখন তাকে বরণ করে নেবেন। এসব চাটুকারি, দলদাসি শ্রেণীর সাংবাদিকতা ভিক্ষা বৃত্তির চেয়েও নিকৃষ্ট।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এসব সাংবাদিকরা কার কাছে দায়বদ্ধ? জনতা না একজন রাষ্ট্রের আমলার কাছে। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক শুধুমাত্র দেশ-জাতির কাছে, নিজ বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ একজন ভাল সাংবাদিকের কোন বন্ধু নেই। বন্ধু গড়ে উঠতে পারে না। তার প্রকৃত বন্ধু শুধুমাত্র দেশ-জাতি। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক সবার উপরে দেশ-জাতির স্বার্থকে বড় করে দেখেন।

অতীতে জেলা কিংবা উপজেলা শহরে সাংবাদিকরা প্রেসক্লাব করতেন। এখন কথিত সাংবাদিকের সংখ্যা এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এখন গ্রামে-গঞ্জে প্রেসক্লাব গঠন হচ্ছে। গ্রাম বা ওয়ার্ডে ক্লাবের মতো করে প্রেসক্লাব গড়ে উঠেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো প্রেসক্লাবের আদলে হরেক রকমের নাম দিয়ে ‘হলুদ সাংবাদিক সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি এক গ্রামীণ জনপদে গিয়ে দেখি এক কথিত ‘প্রেসক্লাব’। জিজ্ঞেস করলাম এখানকার প্রেসক্লাবের সদস্য কারা? তারা কী সত্যিকার কোনো সংবাদপত্রসেবি? জানা গেল, নামমাত্র কিছু সাংবাদিক আছে, কিন্তু এলাকার অধিকাংশ ব্যবসায়ী এই প্রেসক্লাবের দাতা সদস্য। পাঠকের প্রশ্ন, দাতা সদস্য আবার কী? এখানে কেউ কী শিক্ষানিবাস খুলে বসেছেন? যিনি ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে জমি দান করেছেন, বা  নগদ অর্থ সাহায্য দিয়েছেন। তাই তাকে দাতা সদস্য বানাতে হবে? সবাই জানেন সাংবাদিকদের ঠিকানা সাধারণত হয় প্রেসক্লাবে। এখন ব্যবসায়িরা হয়েছে সেই প্রেসক্লাবের দাতা সদস্য। প্রেসক্লাব অন্য কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো কোন প্রতিষ্ঠান নয়। সেই প্রেস ক্লাবের সদস্য এখন চাল-আটার ব্যবসায়িরা। এসব কি গোটা জাতির জন্য অশনি সংকেত নয়? বিবেকহীনতা ও নৈতিকতার অবক্ষয় সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কেউই কোন প্রতিবাদ করছেন না। প্রতিবাদীরা রাজপথে নেমে আসছেন না। শুধু চোখ দিয়ে দেখছেন, কান দিয়ে শুনছেন। নীতিবিরুদ্ধ এসব কাজকে  মৌনভাবে সমর্থন করছেন।

শুধু যে হলুদ সাংবাদিকে দেশ ছেয়ে গেছে তা নয়। সব পেশায় একই দূরাবস্থা। সর্বত্রই ধ্বস নেমেছে; কম আর বেশি।  যে দেশে টাকায় রাজনৈতিক দলের পদ-পদবি মেলে, ভোটের নমিনেশন জোটে, দুর্নীতিমুক্ত সার্টিফিকেট মেলে, ডিগবাজির রাজনীতি যেখানে প্রকট, গোটা জাতির মাথায় যেখানে পচন ধরেছে, নীতি- নৈতিকতা যেখানে বিবর্জিত, নগদ টাকা, আলু-কচু উপঢৌকন দিলে সব মেলে। মেধাবীরা টাকার কাছে হেরে যাচ্ছে। নিরপেক্ষতা এবং সৎ বচন এখন আপেক্ষিক কথা। আমরা শুধু টাকার পেছনে ছুঁটছি। লোভের আশায় কালোবাজারি, মুনাফাখোর, সুদখোর হচ্ছি। চাঁদাবাজ, ধান্দাবাজ, দালাল, মোসাহেবির খাতায় নাম লেখাচ্ছি। এসব এখন নেশায় নয়, পেশায় পেয়েছে। রুটি-রুজির হাতিয়ার হিসেবে বেঁছে নিয়েছে। সামান্য স্বার্থে জ্বী-হুজুর, জ্বী-হুজুর বলে মুখে ফেনা তুলছি। মেট্রিক পাশ করে এমবিবিএস ডাক্তার সেজে প্রতারণা করছি। আদালত আঙ্গিনায় ভূয়া উকিল সেজে জনগণকে ধোঁকা দিচ্ছি। দেশ বাজিকরে ছেয়ে গেছে। যে যেভাবে পারছে লুট-পুটে খাচ্ছে।

গোটা দেশ-জাতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সুদ-ঘুষ রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেকে বসেছে। তবুও নিঃশঙ্ক চিত্তে সম্মুখ সমরে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে বেছে নিতে হবে। শুধু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নয়, সমস্ত সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল ও বনেদি পেশায় মেধাবীদের জন্য আগের মতো জৌলুস নেই। অথচ এ সব পেশা জাতির অহংকার যা একটি জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিনির্মাণে পালন করে অগ্রণী ভূমিকা। ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রতিটি পেশায় জবাবদিহিতা রয়েছে। পাশাপাশি পেশার উৎকর্ষতা সাধনে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। আইন পেশার মান উন্নয়নে বা আইনজীবীদের জবাবদিহিতার জন্য বার কাউন্সিল রয়েছে। চিকিৎসকদের বা সাংবাদিকদের পেশার উৎকর্ষ সাধনে অনেক  প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সব ঠিক আছে। কিন্তু সাংবাদিকতা জগতের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে আসল সমস্যাটি কোথায় এ নিয়ে ভাবেন কত জন? সময়ের প্রেক্ষাপটে হলুদ সাংবাদিকদের কেন এত উপদ্রব এটাকে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোগকে চিহ্নিত করতে হবে। অত:পর সমস্ত শরীরে মলম লাগাতে হবে। হলুদ সাংবাদিকতাকে পরিহার করতে হবে।

প্রকৃত অর্থে কারা সাংবাদিক হবেন? কী কী যোগ্যতা তাদের থাকতে হবে? কে সাংবাদিক নিয়োগ দেবেন, কোন যোগ্যতা বলে নিয়োগ পাবেন? এ সব কোন কোন প্রতিষ্ঠান তদারকি করবেন তা আগে ঠিক করতে হবে। সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুভার ছেড়ে না দিয়ে গোটা দেশে সাংবাদিক নিয়োগে একটি সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। সরকার এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। গুটি কয়েক সাংবাদিককে শুধু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে চলবে না, দেশব্যাপি সাংবাদিক নিয়োগে সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে যোগ্যতা সাপেক্ষে নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। সততাকে সামনে রেখে পরিকল্পিত জীবনের সূচনা এখনই করতে হবে। গোটা জাতিকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। তখন হলুদ সাংবাদিকদেরকে সমাজে খুব একটা দেখা যাবে না। সাংবাদিক, রাজনীতিক দেখলে কেউ ভয় পাবে না। আন্তরিক শ্রদ্ধায় তাদের প্রতি মাথা নুয়ে আসবে। ফিরে আসবে আবার সেই অতীত সোনালী ঐতিহ্য। ৃ

শরতে – হেমন্তে বাংলার এক নতুন রূপ

শাহ্ ফুয়াদ ॥ বাংলা মাস বর্ষা-শরৎ-হমন্ত আর খ্রীষ্টিয় মাস আগষ্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর সম-সাময়িক। সেইন্ট গ্রেগারি প্রবতির্ত গ্রেগারিয়ান ক্যালেণ্ডার বাঙালির বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের জীবনে এক অদ্ভূত ও আশ্চর্যজনক প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে, যার পরিণতিতে এ সমাজে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার আজ হয়ে উঠেছে দুর্লভ। তবু বাংলার মানুষের ওপর এর প্রকৃতি, জলবায়ু, আবহাওয়া এমনই এক প্রভাব সৃষ্টি করে রেখেছে যা কোনভাবেই যেন  ছেদ হওয়ার নয়। কত অপচেষ্টা ষড়যন্ত্র চলেছে, চলছে বাঙালিত্ব, বাঙালিয়ানাকে ভুলিয়ে দিতে। কিন্তু তা কি কোনোদিন সম্ভব?  যেখানে রয়েছে ৫২’ আর ৭১’। বাঙালি তাই চিরকাল বাঙালিই থাকবে। বাঙালিত্ব ভুলে গিয়ে, বাঙালিত্ব ভুলিয়ে দিতে, বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে যে-ই অন্যকিছু হতে যাবে সে এখানে পথ হারাবেই। বাঙালিকে ধর্মের নামে মুসলমান, হিন্দু, পাকিস্তানী, আফগান, আরবী বা শিক্ষার নামে ইংরেজ বা ইউরোপীয় বানাবার চেষ্টা যতই হোক না কেন তা যে দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাংলার মাটিতে ধর্মের নামে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে যারা রাজনীতি করতে চেয়েছে, অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় গিয়ে বাঙালির চেতনাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদেরকে মন্ত্রী বানিয়েছে, তারা যে দিন দিন আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। বাঙালির সত্য দিন দিনই নতুন করে উদ্ভাসিত হচ্ছে। ‘বিশ্বাসঘাতকেরা নিজ নিজ কামনায় ধরা পড়ে’-হাক্কানী সাধক-এঁর বাণী সাধারণ মানুষদের কাছে সত্য হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। জঙ্গিপোনা চাষের জন্য বাংলার মাটি উপযুক্ত জায়গা নয়, বাংলার মাটি যে খুবই শক্ত। এসবেরই ধারাবাহিকতায় বাঙালির জীবনে, বাংলার প্রকৃতিতে প্রতি বছর বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত আসে। সচেতন এরই সাথে সাথে প্রতিটি বাঙালিকে করে দিতে ১৯৭৫’এর  দুঃসহ ১৫ আগষ্ট, খন্দকার মুশতাক আহমেদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণ, ২৪ আগষ্ট মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর স্থলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নতুন সামরিক প্রধান হিসেবে নিয়োগ, ১ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্টের আদেশ বলে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) পদ্ধতি রহিত করা, ৫ অক্টোবর এক অর্ডিন্যান্স বলে রক্ষীবাহিনী বাংলাদেশ আর্মিতে একীভূত, ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় ৪ নেতা হত্যা, সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহীদের ঘটনায় কয়েক জন শীর্ষস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তা নিহত, জিয়াউর রহমানের প্রত্যাবর্তনকে জাসদ কর্তৃক স্বাগত জানানো, বেতার ঘোষণায় জিয়াউর রহমানের চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দায়িত্বভার গ্রহণ, বিদেশে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে ২০ নভেম্বর মেজর জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক বাহিনীর উপ-প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ, ১৯৭৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর ছিনতাইকৃত জাপানি বিমানের ঢাকা অবতরণ, ৩০শে ডিসেম্বর বগুড়ায় সেনাবাহিনীর মধ্যে গোলযোগ, ঢাকা সেনানিবাসে সৈন্যদের মধ্যে গুলি বিনিময়। ঢাকা বিমানবন্দরে কর্তব্যরত অবস্থায় বিমানবাহিনীর ১১ জন অফিসার ও সেনাবাহিনীর ১০ সদস্য নিহত। ১১ অক্টোবর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬০ জন নেতার সাথে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জিয়ার ঘোষণা, ‘রাজনীতির ভিত্তি হতে হবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। ১৮ অক্টোবর বগুড়া ও ঢাকার ঘটনায় অভিযুক্ত ৪৬০ জনের বিচার সম্পন্ন। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ৩৭ জনের মুত্যুদণ্ড কার্যকর, ২০ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৩১ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চট্টগ্রাম শাখার সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, ‘স্বাধীনতার শত্রুদের জনগণই দমন করবে’ ইত্যাদি ঘটনাবলীর স্মৃতি বাংলার প্রকৃতির মতো প্রতি বছরই ফিরে আসে শরৎ-হেমন্তের এই বাংলায়। আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে জিয়াউর রহমান কাদের এবং কীভাবে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন এবং স্বাধীনতার শত্রু বলতে তিনি কাদেরকে বোঝাতেন। একজন বাঙালির ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনের উন্নয়ন-কর্মকাণ্ডে উল্লিখিত এই সব তারিখ ও সময় দিক্ নির্দেশনা দিবে অগণিত কাল। আমরা যেন এসব ভুলে না যাই-এই কথাটি আমাদের বলতে। উল্লেখ্য, আরবি শব্দ ‘সন’ ও ‘তারিখ-কে ফার্সিতে বলা হয়, ‘সাল’। ‘তারিখ’-এর বহুবচন ‘তাওয়ারিখ’ যার এক অর্থ ইতিহাস। (বাংলাদেশের তারিখ, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান)।

বাঙালির নেত্রী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বসভা জাতিসংঘের ৭১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদানসহ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় প্রায় ১৭ দিনের সফর শেষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকায় ফিরেছেন। জাতিসংঘে এবারও তিনি বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন, তিনি ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ নামের দু’টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভুষিত হয়ে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে বিশ্বসভায় সম্মানের আসন এনে দিয়েছেন। এ ধরনের আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তি একজন সচেতন বাঙালি বিশেষ করে যারা প্রবাসে থাকেন তাদের কাছে কত বড় গর্ব ও অহংকারের বিষয় সেটি একজন সচেতন মানুষই কেবল বুঝতে পারেন। এমন একজন বাঙালিকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা জানাতে না পারলে জাতি হিসেবে, এ দেশের নাগরিক হিসেবে দীনতাই কেবল প্রকাশ পায়। যানজটের কারণে ভোগান্তি – বর্তমান সময়ের একজন বিশ্বখ্যাত বাঙালিকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা আয়োজনের সাথে এটা তেমন কিছুই নয়। রাজনীতির মধ্যেকার সঙ্কীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে পারলে বিষয়টা পরিষ্কারভাবেই ধরা পড়ে বিবেকবান মানুষদের কাছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর পেরিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সড়কের দু’পাশে লাখো মানুষের করতালি আর অভিবাদনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন গণভবনে পৌঁছলেন তখন সেখানে কোমলমতি শিশুসহ সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিক্ষাবিদগণ যেভাবে তাঁকে বরণ করে নিলেন, গণমাধ্যমের কল্যাণে সারা জাতি তা প্রত্যক্ষ করেছে। শরতে- হেমন্তে বাংলার এ যেন এক নতুন রূপ, নতুন প্রাপ্তি, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক নতুন প্রেক্ষাপট-‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী, ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে, তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে’- রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গানে এবং নৃত্যশিল্পী শিবলী মহম্মদ ও শামীম আরা নিপার নৃত্যের তালে বরণ করা হয় প্রধানমন্ত্রীকে। এই অনুষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রীর নিজ দলের নেতাকর্মীসহ জনগণেরও অনেক কিছু শেখার আছে। কারণ, তাঁর দল ও সরকারের বিভিন্ন স্তরের লোকদের মধ্যে সঙ্কীর্ণতা এমনভাবে ঢুকে গেছে যে, নিজেদেরকে তারা বাঙালির চেয়ে মুসলমান পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে, বাংলা ভাষায় কথা বলে নিজেকে বাঙালি ভেবে গর্ববোধ না করা যে কত বড় হীনমন্যতা, তা এই দলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে এখনো প্রকট হয়ে আছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবোধে দেশকে, সমাজে গড়ে তোলা। একজন খাঁটি বাঙালিই হতে পারেন নিঃসন্দেহভাবে একজন খাঁটি মুসলিম।

প্রকৃতির নিয়মে শরতে-হেমন্তে বাংলা তথা বাংলাদেশ প্রতি বছরই নতুন করে জেগে উঠে, নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে বাঙালির জীবনে। সামনে, ২১-২২ অক্টোবর, এই হেমন্তেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল। স্মরণ করতে হয়, ১৯৫৫ সালের আওয়ামী-মুসলিম লীগের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলটির অসাম্প্রদায়িক যাত্রা শুরু হয়েছিল বলেই এটি সত্যিকার অর্থে জনগণের দলে পরিণত হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানসহ বাঙালির সকল অর্জনের সাথে আওয়ামী লীগ তাই একাকার হয়ে আছে।’ ‘আওয়াম’ বা ‘আম’ শব্দের অর্থই যে সাধারণ মানুষ বা জনগণ। সাধারণ মানুষই এর জীবনীশক্তি। অথচ এটাও ঠিক যে, এই দলে সব সময়ই ষড়যন্ত্রকারী, বিশ্বাসঘাতক ও সুবিধাবাদীরা বড়সড় জায়গা দখলে রেখেছে এবং তাদের কারণে শুধু সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুই নন, প্রাণ দিয়েছে আরও অনেকে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এদেশের হাজার হাজার মানুষ, গোটা বাঙালি জাতি, বাধাগ্রস্ত হয়েছে স্বাধীনতার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন। এত কিছুর পরেও একথা আজ সর্বজনস্বীকৃত যে, দেশি-বিদেশি এইসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে রাষ্ট্র কার্যকর হয়েছে, অসংখ্য বিস্ময়কর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পাদনের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে দেশে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে, সাধারণ মানুষের (আওয়াম) স্বার্থকে সবার ওপরে গুরুত্ব দিয়ে এবং বাঙালি জাতীয়তাবোধের ভিত্তিতে স্বাধীনতার সোনালী ফসল ঘরে তোলার মধ্য দিয়ে যড়যন্ত্রকারীরা চূড়ান্তভাবে পরাস্ত হবে- সেটাই আজ দেখতে চায় জাতি।

থাকবে শিশু সবার মাঝে ভালো, দেশ-সমাজ, পরিবারে জ্বলবে আশার আলো

crowd_of_smiling_children_in_bangladesh-671x448

ফরিদা ॥ আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। শিশুদের সঠিক বিকাশেই রয়েছে ভবিষ্যতের সুন্দর শান্তিময় বিশ্ব। একথা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না যে বড়দের মতো শিশুদেরও রয়েছে অধিকার। যেহেতু তারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক সেহেতু তাদের জন্য বিশেষ রক্ষাব্যবস্থা আবশ্যক। আর তাই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ নভেম্বর তারিখে গৃহীত হয় শিশু অধিকার সনদ। সনদটি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কনভেনশন। শিশুদের অধিকার সম্পর্কে জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করে তোলা এবং শিশুদের অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণার জন্য জাতিসংঘের আহ্বানে প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বর হতে সপ্তাহব্যাপী পালিত হয় শিশু অধিকার সপ্তাহ। সপ্তাহের প্রথম দিনটি অর্থাৎ ২৯ সেপ্টেম্বর গুরুত্ব পায় শিশু অধিকার দিবস হিসেবে। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ নভেম্বর শিশু অধিকার সনদ গৃহীত হলেও এটির কার্যকারিতা শুরু হয় ১৯৯০ সালের ২ সেপ্টেম্বর হতে। বাংলাদেশ সনদ অনুসাক্ষরকারী প্রথম ২২টি দেশের অন্যতম। ১৯৯০ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশ শিশু অধিকার সনদে সাক্ষর করে।

প্রতিটি শিশুর রয়েছে স্বাস্থ্যকর ও শান্তিময় পরিবেশে বেঁচে থাকা ও বেড়ে উঠার অধিকার; সমাজের একজন প্রয়োজনীয় ও যোগ্য সদস্য হবার অধিকার। দুর্ভাগ্যক্রমে দারিদ্র, রোগবালাই, যুদ্ধ ও নিপীড়নের কারণে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে হাজার হাজার শিশু। জন্মসূত্রে একটি নাম ও একটি জাতীয়তার অধিকার রয়েছে প্রতিটি শিশুর। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে শিশুর জন্মমৃত্যুর রেকর্ড রাখা হয় না। শরণার্থী ও শিশুরা কোন্ দেশীয় জনগোষ্ঠী থেকে এসেছে তা প্রায়ই নিবন্ধন করা হয় না। প্রায়ই শিশুরা ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্যে পরিণত হয়। নাম বা পরিচয়হীন শিশু বৈষম্য ও দাসত্বের শিকার হয়। এসব লংঘিত মানবাধিকার বিশ্বে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৪৬ সালে তার প্রথম অধিবেশনকালেই যুদ্ধপরবর্তীকালীন ইউরোপ ও চীনের শিশুদের খাদ্য ঔষধ ও বস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার দিকে লক্ষ্য রেখে গঠন করে ইউনিসেফ। বিশ্বের শিশুদের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা ও বিকাশ মনিটরিং যা ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ইউনিসেফ মর্যাদার সঙ্গে শিশুদের শারীরিক-মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে বাস্তবায়ন করছে অসংখ্য কর্মসূচী। ১৯৫৯ সালে সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করে শিশু সংক্রান্ত অধিকার ঘোষণা-এই ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। আর সেই সাথে শিশুদেরকে তাদের নিজ নিজ দেশের উন্নয়নের জন্য গড়ে তোলা। শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণার ২০তম বর্ষ ১৯৭৯-কে সাধারণ পরিষদ ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক শিশু বর্ষ।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত শিশু অধিকার সনদে বিশ্ব মানবতা শিশুর জন্য যা কামনা করে তা সবচেয়ে স্পষ্ট ও পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই সনদ সর্বাধিক স্বীকৃত মানবাধিকার চুক্তিসমূহের অন্যতম বটে। সকল শিশুর কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সনদে বর্ণিত নীতিমালা অনুসরণের জন্য সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে বাংলাদেশ আইনগত ও নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ। শিশু অধিকার রক্ষায় মা-বাবার ভূমিকা, শিশুর মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী শিশুর বয়স ১৮ বছর পর্যন্ত। সনদের ৫৪টি ধারা আছে।

শিশুদের জীবনযাত্রা উন্নয়নে এই সনদটি বিশ্বের সর্বত্র রাষ্ট্রগুলোকে সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনা দেয়। তবে শিশু অধিকারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া বা না নেয়ার বিষয়টা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র কিংবা তার জনগণের উপরই নির্ভর করে। আর তাই জনগণ ও রাষ্ট্রকে শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নের উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে এবারও পালিত হলো শিশু অধিকার সপ্তাহ ও দিবস।

‘বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ-২০১৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত সোমবার সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘থাকবে শিশু সবার মাঝে ভালো, দেশ-সমাজ, পরিবারে জ্বলবে আশার আলো’ । অনুষ্ঠানের  প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কোন শিশুই যেন না খেয়ে কষ্ট না পায় এবং শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বিত্তবানদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের বাড়ির আশপাশে যারা দরিদ্র শিশু আছে তারা কেমন আছে, তার গায়ে কাপড় আছে কি না, তারা পেটভরে খেতে পারছে কি না,  সে লেখাপড়া করতে পারছে কি না- তা দেখবেন এবং দয়া করে এইসব শিশুর দিকে একটু নজর দেবেন।’ তিনি শিশুদের ঝরে পড়া রোধে বিদ্যালয়ে শিশু-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও ‘মিড ডে মিল’ চালুর উল্লেখ করে এই কাজে সরকারের পাশাপাশি স্ব-স্ব এলাকার বিত্তবান এবং জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এ সময় ৭৫’ এর ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমাদের মতো আমারও একটি ছোট্ট ভাই ছিল। আমি তোমাদের মাঝে আমার সেই ছোটভাই রাসেলকে খুঁজে ফিরি।’ তিনি শিশুদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের জন্য জাতির পিতা এই সুন্দর দেশ দিয়ে গেছেন। আমার প্রত্যাশা, তোমরা বড় হয়ে জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে তাঁর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলবে। বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে মর্যাদাপূর্ণ আসনে তুলে ধরবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের শিশুরা যেন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে সেজন্য তাঁর সরকার নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বইয়ের বোঝা বইতে যেন না হয় সেজন্য সরকার ই-বুক করে দেবে। বাচ্চারা ট্যাব নিয়ে স্কুলে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করতে কম্পিউটার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। কোনো ছেলে-মেয়ে যেন স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে সেদিকে আমরা বিশেষ নজর দিচ্ছি। আমাদের সরকার বই কেনার দায়িত্ব নিয়েছে, দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছে। হাওর এলাকা, পাহাড়ি এলাকায় শিশুদের দূর থেকে স্কুলে আসতে কষ্ট হয়। তাই আবাসিক স্কুল, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং আইসিটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা, বিদ্যালয়বিহীন প্রতিটি গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন, প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু, দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন, পথশিশু, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের কল্যাণে আর্থিক সহায়তা দেয়া ইত্যাদি সরকারি উদ্যোগের বিবরণ তুলে ধরেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, ইউনিসেফের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ এডওয়ার্ড বেইগবেডার এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম।

দ্বান্দ্বিক বিচারিক ক্ষমতা সত্য প্রতিষ্ঠার সহায়ক

শাহ্ মহিউদ্দীন মাসউদ ॥ বলা হয় অথবা এটাই সত্য, মানুষের মস্তিষ্কের শক্তি, আলোর গতির চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা রাখে। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছতে সময় নেয় আট মিনিট কিন্তু একজন মানুষ যদি কল্পনা করে, সে দুই বার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে আসবে, তা হলে সেকেন্ডেরও হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে, কাজটি সেরে ফেলতে পারেন। কেউ হয়তো বলবেন এটা নিছকই কল্পনা, কল্পনার গতিকে তো আর প্রমাণ করা সম্ভব নয়, আর সে কারণেই তার তুলনাও চলেনা।

একদিন মানুষ পৃথিবীতে বসেই কল্পনায় চাঁদে ভ্রমণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নিলেন, চাঁদে পৌঁছতে হবে। তখনই তার মাথায় দূরত্বটা এসে গেল। পৃথিবীতে বসেই চাঁদ এবং পৃথিবীর দূরত্বটা মেপে নিয়ে, চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। তারপর একদিন সফলও হয়ে গেলেন, এখন চাঁদ প্রতিবেশী, সে আর কল্পনায় নয়, একেবারেই বাস্তবে। শুরু হয়েছে সেখানে বসতি স্থাপনের প্রস্তুতি। একদিন সেটাও বাস্তবে দেখবো আমরা। হয়তো সেদিন আমরা থাকবো না, কিন্তু মানব সভ্যতা থাকবে, তারাই নতুন সভ্যতাকে দেখবেন।

স্যার রাধানাথ সিকদার একদিন হিমালয় দেখে, তাকে মেপে ফেলবার ইচ্ছায় কাজটি সেরে নিলেন, হিমালয়ের পাদদেশে বসেই। হিমালয় মাপার জন্য, তাকে চূঁড়ায় উঠতে হয়নি, অঙ্কের পদ্ধতিগত ব্যবহার দ্বারাই তিনি যে উচ্চতার পরিমাপটি করলেন, আজও সেটিই চলছে। সুতরাং, তার সে পরিমাপটি যে নির্ভুল ছিল, আমরা তা যুক্তিতে মেনে নিতে পারি। আবার আমরা যদি বলি, তার মাপটি সঠিক ছিলনা, ওটাতো উনিশ-কুড়ি নয় একেবারে পনেরো-কুড়ি। কিন্তু তা বলায় কী যায় আসে, তথ্য তত্ত্ব এবং উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ তো করতে হবে, স্যার রাধানাথ সিকদার ভুল ছিলেন, এ কথা মুখে বলে তো কাউকে বিশ্বাস করানো যাবেনা। প্রত্যেকটি দ্বন্দ্বের সমাধান তার দ্বান্দ্বিক বিচার পদ্ধতিতে। তা বস্তুগত কিংবা চেতনাগত উভয় ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। আদালত একটি বিচার করতে গিয়ে, আনিত অভিযোগের আসামীকে সরাসরি অপরাধী বলে তাকে শাস্তি প্রদান করেন না। তিনি উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতির দ্বন্দ্বের আদি কারণটি খুঁজে বের করে, তবেই অপরাধীকে নিশ্চিত করেন শাস্তি প্রদানে। আর তার জন্য প্রয়োজন হয় যুক্তি-তর্ক, সাক্ষ্য-প্রমাণ, তথ্য-তত্ত্ব বা আইনের অনুসরণ, এর প্রতিটি বিষয়ের দিকে বিচারক গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এই কারণে, যাতে কোন নিরাপরাধী অপরাধী হিসেবে শাস্তি না পান। এখানে বিচারকের আবেগ, অনুভূতি, ভয়-ডর কিংবা প্রভাব বিচারককে বিচলিত করতে পারেনা বা করতে সক্ষম হবেন না কেউ। এভাবেই বিচার কার্যের মধ্য দিয়ে, সত্য প্রতিষ্ঠা পায়।

আজকে বিচারিকতা নিয়ে নানা প্রশ্ন বিতর্ক আছে। তা থাকতেই পারে। আমাদের উদ্দেশ্য তা নয়। আমরা যে সত্যের প্রতিষ্ঠা চাই, তা নিরন্তর দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়ে, কারণ দ্বান্দ্বিকতা ছাড়া সত্যের রূপ চেহারা তৈরি হয়না। রূপ চেহারা ভিন্ন সত্য বায়বীয়। তিনি বলেন বা তাহারা বলেছেন। অথবা তিনি দেখেন বা তাহারা দেখেছেন, তাতেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়না। সত্যকে মূর্ত করার জন্যই তার দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণ আবার পর্যবেক্ষণ অনিবার্য। বিমূর্ত রাখার জন্য নয় মোটেও। বিমূর্ত সত্য কখনো সত্য নয়, ছায়া মাত্র। রশি দেখে সাপ মেনে নেয়ার মনোস্থিতি। তাতে পর্যবেক্ষণও নেই পরীক্ষণও নেই। যা থাকে তা চিন্তার বিভ্রম ও স্বার্থবাদিতা এবং অন্ধত্ব। অন্ধত্বের সেকাল কিংবা একাল বলে কিছু নেই। জাতি কিংবা গোষ্ঠি নেই, ধর্ম কিংবা ধর্মের আবরণ নেই, সময় কিংবা অসময় নেই, যা থাকে তা শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তি গোষ্ঠি বা দল সংগঠনের, কখনো বা কোন কোন জাতির একান্ত স্বার্থবাদি ইচ্ছার প্রয়োজন মোটাবার ব্যবস্থা মাত্র। আজকের পৃথিবীতে এই ব্যবস্থাপত্রের প্রচলণ খুব বেশি থাকায়, আমাদের কাছে সত্য বিমূর্ত। অন্যকে রসগোল্লা খেতে দেখে নিজের মুখে স্বাদ অনুভব করা যায়, এই কারণে যে, রসগোল্লার পূর্ব ধারণা নিজের মধ্যে থাকে বিধায়। যিনি কোন দিনই রসগোল্লা মুখে তুলে দেখেননি, তিনি কী করে জানবেন রসগোল্লার স্বাদ কী। এখন কেউ যদি ওই রসগোল্লায় তেঁতো মিশিয়ে পরিবেশন করে থাকেন, তবে তো পূর্ব ধারণাহীনতায় তিনি রসগোল্লার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে, মেনে নিবেন রসগোল্লার স্বাদ তেঁতো। তাই সত্য অন্ধকারে, এ ক্ষেত্রে তাকে পরীক্ষণে যেতেই হবে। তারপর তাকে দ্বান্দ্বিক বিচারে মূল স্বাদটি বের করতে হবে।

আমার কাছে যা সত্য, অন্যের কাছেও তা-ই সত্য হবে বা আমার সত্যই তারও সত্য হতেই হবে, আমার এরকম ধারণা মূর্খতা ভিন্ন আর কী হতে পারে? কারণ আমরা জানি প্রত্যেক মানুষই সম্পূর্ণ একটি আলাদা সত্ত্বা। তাই তার চিন্তা চেতনা বিশ্বাস জীবনকর্ম সবই আলাদা, তার চিন্তাধারাকে আমি যদি হুবহু মিলিয়ে নিতে যাই বা আমারটা তাকে মিলিয়ে চলতে বলি, তবে তা যে অনিবার্য সাংঘর্ষিক হবে, সেটা নিশ্চিত। প্রত্যেক মানুষ দ্বন্দ্বের রূপটি তার নিজস্ব চিন্তা দিয়ে আলাদা করে দেখেন এবং সেভাবেই তিনি তা প্রকাশ করেন। তার এই প্রকাশ ক্ষেত্রটিকে আমি সীমাবদ্ধ করার কোন অধিকার রাখিনা, যদি আমি সামাজিক মানুষ হিসেবে সামাজিক বন্ধনকে স্বীকার করি। সামাজিক মানুষের কিছু সামাজিক নিয়ম কানুন বাঁধা নিষেধ আছে বা থাকে, সেসব মেনে নিয়ে একজন মানুষ সামাজিক সত্যগুলোকে গ্রহণ এবং বর্জন করতে শেখে।

সত্যের যেমন স্থান-কাল-পাত্র আছে। তেমনি তার ভাগ বিভাগও আছে। ব্যক্তির সত্য একান্তই ব্যক্তিক। সামাজিক সত্যের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক থাকে বা হয় পরিবেশ, প্রেক্ষিত এবং ঐতিহাসিক, (যাকে আমরা জেনেটিক্যাল সত্য বলি) কিন্তু এই সামাজিক সত্য কখনই ব্যক্তির একান্ত সত্য হয়না, যতক্ষণ সে তাকে তুলনামূলক বিশ্লেষণবিহীন গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতা অর্জন না করে। পারিবারিক সত্যও একই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তবে দীর্ঘকালীন অভ্যাস তাকে তার অজান্তেই যৌক্তিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ঐতিহাসিক সত্যের নানান রূপ চেহারা আছে। সময়ের সাথে সাথে তারও চেহারা পাল্টায়। যেটা আজ স্থিতি আছে কাল তার রূপ চেহারা বদলে যেতে পারে, তার কারণ গবেষণা। নিরন্তর গবেষণা। গবেষকরা তথ্য-তত্ত্ব-উপাত্ত্ব নিয়ে নিরন্তর গবেষণা অব্যাহত রাখেন বলে। যেমন কলিংগের যুদ্ধে এক লক্ষ সামরিক মানুষের জীবন নাশ হয়েছিল, আরও অন্তত দেড় লক্ষ সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছিল। প্রশ্ন উঠছে এখানেই, প্রায় আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে উজ্জয়নী বৈশালিতে মানুষের সংখ্যা কতো ছিল। গবেষকরা এখনও তা নিয়ে তাদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের হিসেব নিয়ে এখনও চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে।

এই ঐতিহাসিক সত্যের উটন বরাবরই কঠিন কাজ, একান্ত নিবিষ্ট না হলে এই সত্যে হাল খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। বাবরি মসজিদের আগে সেখানে রাম মন্দির ছিলো কী-না তা একমাত্র প্রত্মতাত্ত্বিক খনন গবেষণা ভিন্ন নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এ কাজে সংকট বিশাল। বৈজ্ঞানিক সত্যে এই সংকট থাকেনা, তথ্য তত্ত্ব দিয়ে তাকে আবার নতুন প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। কিন্তু বাবরি মসজিদ সংকটে, দুই ধর্মের মানুষদের আবেগ, অনুভূতি সত্য আবিষ্কারের পথে দুর্লঙ্ঘণীয় বাঁধা। কিন্তু তাজমহলের শ্রমশক্তি, বিনিয়োগ, তার সুফল-কুফল এখনও আবিষ্কার করা সম্ভব। গবেষকরা তা করছেনও। সুতরাং, ঐতিহাসিক সত্য আবিষ্কারে তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ভিন্ন কোন পথ থাকেনা। আর সেখানেই গবেষকদের খনন কাজ। সে কাজটি যদি আইন করে বন্ধ করা হয়, তাতে গবেষণা বন্ধ হয়ে যায়। গবেষণা বন্ধ হলে সত্য আবিষ্কারের কোনো সুযোগ থাকেনা। কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকেনা। সে পাথরের মতো হাজার বৎসর মাটির তলে থাকার পরও তার কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হয়না, সময়ের সুযোগে সে বের হয়ে আসবেই, মানুষই তাকে আবার মাটির তলদেশ থেকে তুলে আনে। কারণ মানুষের প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং চিন্তা শক্তি, আর সত্য আবিষ্কারের সহজাত নেশা। এই নেশা থেকেই আমরা পাচ্ছি পৃথিবীর নানান ধ্বংস যজ্ঞের পরে আজকের এই সভ্যতার মানুষের ইতিহাস। হোমোসেপিয়ান কিংবা ইরিকটাসদের আগমন বিবর্তন, সবই মানুষ আজও আবিষ্কার করে চলছেন। সুতরাং, কোনো ঐতিহাসিক সত্যের, কোন ধ্রুব চেহারা যে নেই, সেটাই সব চেয়ে বড় সত্য।

সময়ের সাফ কথা….সাংবাদিকতা নিয়ে পোপের বক্তব্য ও বাস্তবতা

শেখ উল্লাস ॥ পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, সাংবাদিকতা যখন গুজব আর মিথ্যা ছড়ায় তখন এর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদকে আলাদা করা যায় না। যেসব সংবাদমাধ্যম মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং অভিবাসীদের ব্যাপারে ভীতির উদ্রেক করে তারা ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত। তিনি বলেন, সত্য অনুসন্ধানে প্রতিবেদকদের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। বিশেষ করে ২৪ ঘন্টা সংবাদ পরিবেশনের এই যুগে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গার্ডিয়ান পত্রিকাকে উদ্ধৃত করে ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকে এ খবর বেরিয়েছিল।

ইতালির সাংবাদিক নেতাদের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে পোপ আরও বলেন, ‘সাংবাদিকতাও কখনো কখনো সন্ত্রাসবাদের শামিল হতে পারে। গুজব ছড়ানো এমন এক ধরনের সন্ত্রাসবাদের দৃষ্টান্ত, যেখানে আপনি নিজের কণ্ঠ দ্বারা একজনকে খুন করে ফেললেন। এটা সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সত্য। কারণ, তাদের কথা সবার কাছে পৌঁছে যায় এবং এটা একটা শক্তিশালী অস্ত্র। তবে সাংবাদিকতাকে বিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়’।

পোপের এ বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান সাংবাদিকতার অবস্থার সঙ্গে কতটুকু প্রাসঙ্গিক? ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীতে তাকালে দেখা যায়, এদেশে যারা সাংবাদিকতার সূচনা করেছিলেন, ওই সূচনালগ্নে যারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের প্রায় সবাই ছিলেন ধর্মপ্রচারক, মিশনারী, মানবতাবাদী, কবি, সাহিত্যিক বা  রাজনীতিবিদ। শুধুমাত্র জীবিকা অর্জন বা সাংবাদিক পরিচয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল না। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মানবসেবা ও দেশ সেবা এবং এ লক্ষ্যে মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য তারা সংবাদপত্র প্রকাশনা বা এর সঙ্গে থেকে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করা। এক কথায় বলা চলে, তখন সাংবাদিকতা বিষয়টি ছিল একপ্রকার সমাজকর্ম এবং দেশসেবা ও সমাজসেবার ব্রত হিসেবেই তারা এ কর্মের সঙ্গে যুক্ত হতেন। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা অর্জন বা আরাম-আয়েশই যাদের লক্ষ্যবস্তু তারা এ পেশা থেকে নিরাপদ দূরত্বেই অবস্থান করতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজকের দিনে একজন মানুষের ‘সাংবাদিক’ পরিচিতি এবং ‘সাংবাদিকতা’ শব্দটিই এক জটিল আবর্তের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এর গাম্ভীর্য ও তাৎপর্য এখন অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কারণ, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের মালিকানার প্রায় সবটুকুই এখন বাণিজ্যিক (কর্পোরেট) জগতের দখলে চলে গেছে। এরই ফলশ্রুতিতে দেশে মুদ্রণ সাংবাদিকতার পাশাপাশি সম্প্রচার সাংবাদিকতার ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। বর্তমানে দেশে বৈদ্যুতিন মাধ্যমের (ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া) সংখ্যাই ২৮। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৩ অনুযায়ী দেশে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ৬২৩টি, এর মধ্যে ৫৮৬টি বাংলা এবং ৩৭টি ইংরেজি দৈনিক। খোদ রাজধানী ঢাকা থেকেই বের হয় ২৭৭টি দৈনিক। কিন্তু দেশে এখনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শক্তিশালী না হওয়ার কারণে আগের চাইতে জনস্বার্থে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রটি কতটুকু দুর্বল কিংবা শক্তিশালী হয়েছে তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে আজকের দিনের সাংবাদিকরা অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু অবস্থাটা এরকম যে, দেশ ও  জনগণের স্বার্থে, সত্য বলার ক্ষেত্রে যেন আরো অনেক কিছু বাকি থেকে যাচ্ছে।

২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে দেশে তথ্য অধিকার আইন (আরটিআই)  কার্যকর রয়েছে। এই আইনের আলোকে গঠিত তথ্য কমিশন জনগণের কল্যাণে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু যে লক্ষ্য নিয়ে এই আরটিআই ও তথ্য কমিশন করা হয়েছে তা পূরণ করতে দেশবাসীকে যেভাবে সচেতন হওয়া দরকার তাতে যেন এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ সমাজের সকল স্তরেই দুর্নীতি, মিথ্যাচার ও সঙ্কীর্ণতা বিরাজমান রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ সচেতন হয়তো হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ ও পার্থিব লোভ-লালসার উপরে অনেকেই উঠতে পারছে না। এর প্রভাব গণমাধ্যমের উপরেও পড়ছে। বিশেষ করে দারিদ্র্য, ধর্ম, রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও সমাজসেবার মতো জায়গাগুলোতে বসে কেউ যদি সামগ্রিক স্বার্থের চাইতে ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব দেয় সেখানে জনস্বার্থ বা সামগ্রিক স্বার্থ উপেক্ষিত হবে এবং সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হবেই-এটাই স্বাভাবিক। সাংবাদিকতা এই সামগ্রিক বিষয় নিয়েই কাজ করার কথা। কিন্তু এই জগৎটি অর্থাৎ, আজকের গণমাধ্যমের বিশাল জগতের প্রায় সবটুকুই নব্য ব্যবসায়ী, যাদের প্রধান লক্ষ্যই ব্যবসা করা, লাভ করা, ব্যক্তিগত প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করা। আর তাদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে কাজ করা কতটুকু সম্ভব তা ভুক্তভোগীরাই কেবল বলতে পারবেন। এছাড়া, যতটুকু স্বাধীনতা তারা পান সেটি দেশের স্বার্থে ব্যয় করার ইচ্ছা তাদের কতটুকু তা একটি বড় বিষয়। এ প্রসঙ্গে হাক্কানী সাধকের বাণী স্মরণযোগ্য, ‘সত্য দেখার চেয়ে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা  করা শ্রেয়।’ সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বলা হয়, ‘সাংবাদিকতায় সত্য ছাড়া মিথ্যার কোনো স্থান নেই’।  এই সত্য আর মিথ্যার যে কত রূপ তার ইয়ত্তা নেই। সাধক কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিবেকই আমার নেতা’। এই বিবেককে আজকের দিনের গণমাধ্যমের কতজন কর্মী অর্থাৎ, সাংবাদিক নিজের বিবেককে কাজে লাগাচ্ছেন তা ভেবে দেখার বিষয়। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রোববার ঢাকার প্রায় সব ক’টি দৈনিকে পত্রিকায় একজন পূর্ণ মন্ত্রীকে তার নিজ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির উপদেষ্টার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার খবর ফলাও করে প্রচার করা হলো। এ ব্যাপারে মন্ত্রীর কোনো মন্তব্যই সেদিন কোনো পত্রিকায় ছিল না। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় যে, এই খবরটির মধ্য দিয়ে মন্ত্রীকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে। মন্ত্রীর মন্তব্য কেন পত্রিকায় দেয়া যায়নি সেটাও সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য খুঁজে বের করা দরকার ছিল।  মন্ত্রীকে অব্যাহতি দেয়ার সংবাদটি পড়ে একজন পাঠক স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা করতে পারবেন, মন্ত্রী না-জানি কত বড় অপরাধ করে ফেলেছেন, আর এর মধ্য দিয়ে তার না-জানি কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল। সরকারের মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে জেলা কমিটির উপদেষ্টা থেকে অব্যাহতি, সরকারি দলের ওই জেলা কমিটির অবস্থা সম্পর্কেও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। এই ঘটনাকে একজন সচেতন সংবাদকর্মী হিসেবে একটু গভীরভাবেই চিন্তা করলেই দেখা যায় যে, জেলা কমিটির সাথে মন্ত্রীর দ্বন্দ্বের জেরে পত্রিকাগুলো জেলা কমিটির পক্ষ অবলম্বন করেছে যা পোপ ফ্রান্সিসের ভাষায়, তথ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আরও উল্লেখ্য যে, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত এই মন্ত্রীর মেয়াদকালে দেশে বর্তমানে মৎস্য সম্পদে বিশেষ করে ইলিশ মাছ উৎপাদনে সর্বকালের রেকর্ড স্থাপন করেছে এবং দেশের সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করেছে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কোনো সাংবাদিক একবারও দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন না।

বর্তমান এসব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সাংবাদিকতায় নিজের বিবেককে জাগ্রত না করে পথ চললে হুচট খাওয়া অবধারিত। সত্যের জয় চিরস্থায়ী, মিথ্যার জয় সাময়িক-এ কথা আজ আবার নতুন করে প্রমাণিত। বাংলাদেশের রাজনীতি, ধর্ম ও সাংবাদিকতার মিথ্যার পরাজয় অবধারিত বলেই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক কিছুই স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছে-যেখানে দীর্ঘদিন একটি চরম সত্যকে ঢেকে রাখা হয়েছিল। দেশের সর্বস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার আজ অনেক উন্নত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, দেশের ৫ কোটি লোক বিগত বছরগুলোতে নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উন্নীত হয়েছে। গণমাধ্যম জগতের কর্মের সাথে জড়িত লোকদের আর্থিক অবস্থারও অনেক উন্নতি হয়েছে। কারণ, বড় বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা আজ গণমাধ্যম জগতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু আর্থিক অবস্থা ভালো করার পাশাপাশি বিবেককে সদা জাগ্রত রাখতে না পারলে সব কিছুই যে অসাড় হয়ে যায়। এক জীবনে একজন মানুষের কত টাকা, ক’টা বাড়ি-গাড়ির প্রয়োজন হয়? বর্তমান সরকারের আমলে সাংবাদিকদের কল্যাণে প্রথম বারের মতো সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছে। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আইন করা হয়েছে। নীতিমালা করা হয়েছে। চলতি বছর সিড মানি হিসেবে ট্রাস্টে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে আরো ১ কোটি ৪০ লাখ অনুদান সহায়তা দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের জন্য দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে কাজ করার সুযোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলা প্রবাদে আছে, ‘ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়’-গণমাধ্যমের মালিক এবং গণমাধ্যমে নিয়োজিত সাংবাদিকগণ তাদের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগালে অপার সম্ভাবনার এই দেশের জন্য আরও অনেক কিছুই করতে সক্ষম। ঐতিহ্যগত দিক থেকেই বাংলাদেশের সাংবাদিকতা বীরত্বের ধারা বহন করে চলেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে-এটাই সচেতন দেশবাসীর প্রত্যাশা। এরই ধারাবাহিকতায় সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতা সম্পর্কে পোপ ফ্রান্সিসের মন্তব্য বাংলাদেশের বেলায় আগামী দিনে মোটেও প্রযোজ্য হবে না-এটাই আজ সকলের চাওয়া।