প্রথম পাতা

বাংলার শত্রু বাঙালি!

সংলাপ ॥ প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাস এলেই বাংলা ভাষার জন্য বাংলাদেশে যে আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখা যায় তা বাংলা একাডেমি এবং শহীদ মিনার চত্বরে, পত্রপত্রিকায় ও বৈদ্যুতিন প্রচার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ। ওই এলাকার বাইরে ঢাকা মহানগীর যে দিকে চোখ মেলা যায় শুধু ইংরেজী আর ইংরেজী। বিভিন্ন স্থাপনা, বাণিজ্য বিতান, দোকানপাট, বাড়িঘর সবকিছুর নামধাম ইংরেজী ভাষায়।

কে বলবে যে ঢাকার লোক বাংলাদেশের মানুষ? তাদের মাতৃভাষা বাংলা? হঠাৎ কি হয়ে গেলো যে আমরা আমাদের মাতৃভাষার প্রতি বিমুখ হয়ে উঠতে লাগলাম। ছেলেমেয়েদের ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পাঠাতে প্রতিযোগিতা শুরু করলাম। আমাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুর ইংরেজী নামকরণ এবং ইংরেজী নামফলক ঝুলিয়ে এক বিচিত্র আত্মপ্রসাদ উপভোগ করতে লাগলাম। আমাদের অবস্থা এখন কবি ঈশ্বর গুপ্তের একটি কবিতার সেই দুটি অবিস্মরণীয় চরণ মনে করিয়ে দেয় – ‘স্বদেশের ঠাকুর ফেলি বিদেশের কুকুর পূজি’। আমরা আমাদের আপন মায়ের ভাষা ত্যাগ করে বর্তমানে বিদেশী মায়ের ভাষাকে আমাদের ভাষা ভাবছি।

বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার যে অবর্ণনীয় দুরাবস্থা চলছে তার জন্য বিশ্বায়ন বা আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহকে দায়ী করে লাভ নেই। প্রয়োজনে আমাদের অবশ্যই বিদেশী ভাষা শিখতে হবে, ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু সে জন্য কি মাতৃভাষা বিসর্জন দিতে হবে? যে কোনো অবস্থাতেই কোনো একটি দেশে কোনো বিদেশী ভাষা সে দেশের মাতৃভাষার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশেও ইংরেজী ভাষা কোনো বিবেচনাতেই বাংলা ভাষার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক ভাষা। যদি কেউ মনে করে থাকেন যে বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে ইংরেজী ভাষার মাধ্যমে আমরা সমৃদ্ধ হবো তাহলে তিনি মূর্খের কল্পনার বেহেশতে বাস করছেন। বিদেশী ভাষা হচ্ছে বোতলের দুধের মতো, যা কোনো অবস্থাতেই মাতৃদুগ্ধের মতো নয়।

দীর্ঘ পরাধীনতা, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ বিগত তিন হাজার বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে আমরা যেমন কখনো প্রকৃত অর্থে বাঙালি দ্বারা শাসিত হইনি তেমনি বাংলা ভাষা দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হইনি। আমাদের মুখে ভাষা ছিলো বাংলা, কিন্তু রাজসভার ভাষা ছিলো বাংলার শাসক শশাঙ্কের আমলে সংস্কৃত, পাল রাজাদের আমলে প্রাকৃত বা অপভ্রংশ, সেন রাজাদের আমলে সংস্কৃত। মধ্যযুগের বাংলায় স্বাধীন সুলতানী এবং ঔপনিবেশিক মোঘল আমলে দরবারী ভাষা ছিলো ফার্সী, ইংরেজ ও পাকিস্তানী আমলে উর্দু ও ইংরেজী।

মধ্যযুগে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান কবিরা যথাক্রমে সংস্কৃত ভাষা এবং আরবী-ফার্সী ভাষায় দেবনগরী বা আরবী হরফে সাহিত্য রচনা না করার কারণে ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও কাঠ মোল্লাদের অভিশাপ বা ফতোয়ায় বাংলার মানুষ নরক কিংবা হাবিয়া দোযখে যাবার ভয়ে কেঁপেছিলো। কিন্তু সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করলে সে জন্য সাধারণ মানুষকে দায়ী করা চলে না। সর্বোপরী ওইসব ধর্মীয় গোঁড়ামি অতিক্রম করেও মাতৃভাষার সাহিত্য চর্চা হয়েছে।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের ফলাফল কি বাঙালি মুসলমানের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশকের মধ্যেই যে আমরা আবার স্বদেশ থেকে বিদেশে ফিরে যাচ্ছি তার কারণ কি? বাঙালি কি প্রকৃতই একটি আত্মবিস্মৃত এবং আত্মঘাতী জাতি! এ জাতিকে জাগিয়ে রাখতে হলে একুশ ও একাত্তরের মতো প্রচন্ড ও ভয়াবহ আঘাত কি আরো প্রয়োজন?

স্বাধীন বাংলাদেশে বৈদ্যুতিন প্রচারমাধ্যমগুলোতে আজ বহিরাগত হলিউড ও বলিউড সংস্কৃতির যে দাপট তাতে বাংলাদেশের মানুষের পিতৃপরিচয়, ঠিকানা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম – সব তো ভুলিয়ে দিচ্ছে! বাংলাদেশে প্রতিবেশী দেশের বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোর চেয়ে হিন্দি চ্যানেল পাওয়া যায় বেশি। এসব চ্যানেলের নানা রঙ্গিন অনুষ্ঠানগুলোই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ঘরে ঘরে পরমানন্দে উপভোগ করে থাকেন।

একুশ শতকে হলিউডের নকল করছে বলিউড আর বলিউডের নকল করছে ঢাকার প্রচার মাধ্যমগুলো আর আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা তা বিনা প্রতিবাদে চোখ-কান বন্ধ করে হজম করছি। আমাদের মহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বিস্মৃত হচ্ছি, পক্ষান্তরে আমরা আমাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালাকে বিসর্জন দিচ্ছি। এ কারণেই বলতে হয়, বাঙালি নিজেই তার মাতৃভাষার সবচেয়ে বড় শত্রু!

রক্তের বিনিময়ে পাওয়া মাতৃভাষা বাংলা প্রচলনে আমরা উদাসীন কেন?

* ‘কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহা হইলে ইহা বেআইনী বা অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে’।

*‘যদি কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে’।

সংলাপ ॥ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এর সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য একটি নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে তাঁর এই নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি।

সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী পূর্ণরূপে কার্যকর এবং তৎসংক্রান্ত বিষয়ে বিধি প্রণয়নের জন্য ১৯৮৭ সালে জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস হয়, যা ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ নামে মহামান্য প্রেসিডেন্টের সম্মতি নিয়ে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ থেকে আইনে পরিণত হয়েছে।

আইনটির ৩ (১) ধারায় বলা হয়, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সবক্ষেত্রে নথিপত্র ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে।’

আইনের (২) ৩ (১) উপধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহা হইলে ইহা বেআইনী বা অকার্যকর বলে গণ্য হইবে’। আইনের ৩ ধারায় বলা আছে, ‘যদি কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে’।

আইনে সুস্পষ্টভাবে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশনা থাকলেও এবং এই আইন অমান্য করলে কি শাস্তি হবে তার উল্লেখ থাকলেও আজও এই আইন পরিপূর্ণ কার্যকর করার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কোন সরকারের আমলেই। আইন অমান্য করার জন্য কারো বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের খবর এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আজো আইনটি অবহেলিত রয়ে গেছে। প্রয়োগ হয়নি। আইনটিকে আশ্রয় করে আর্জি নিয়েও কেউ আসেনি। ফেব্রুয়ারি মাসে শোকোচ্ছাস এবং বাংলা ভাষা চালুর জন্য আবেগ ও ভালবাসার আতিশয্য দেখা গেলেও কার্যত কোন আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ২১ ফেব্রুয়ারি অমর শহীদ দিবস বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেলেও আইনী এই রক্ষা কবচটি ব্যবহারে কোন গতি আসেনি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনেরও কোন অগ্রগতি নেই। তাছাড়া কোনো সরকার আইনটিকে কার্যকর করার জন্য আজো কোন বিধি প্রণয়ন করেনি। ভাষা শহীদদের পরিবারবর্গের দুর্দশাগ্রস্ত অমানবিক আহাজারীর কথা কেউ শুনলে নিজেকে ধিক্কার না দিয়ে পারবে না! সচেতন বাঙালির জিজ্ঞাসা – সরকার কিংবা আদালত কি এর দায় এড়াতে পারে?

চিত্ত আমার বাংলা রঙে, সব চাহনী বাংলা ঢঙে বাংলা বাঙালিরমিলন মেলা

সত্যদর্শী ॥ প্রাণের বাংলায় আবারো শুরু হচ্ছে বইমেলা। আক্ষরিক অর্থে বইমেলা হলেও এটি  প্রকৃতপক্ষে বইমেলা নয়। বলা যেতে পারে প্রাণের মেলা, বাংলা বাঙালির মিলন মেলা। হাজার বছরের বাঙালির চির চেনা বাংলায় সাজ সাজ রবে আসে বইমেলায়। খেজুরের  রসে ভেজা ভাপা পিঠার শীত শেষে ফাল্গুনের উদাসী হাওয়ায় বসে বইমেলা। ঋতুরাজ বসন্তের রং বাহারী আলাপন আর কোকিল বাঁশির সুর নিয়ে মাতাল হাওয়ায়, প্রেম বিকিকিনির বইমেলা।  প্যারিস কিংবা কোলকাতার মতো নয় আমাদের বইমেলা। আমাদের বইমেলায় বই উপলক্ষ হলেও এটি বাস্তবতার, ভাব, আবেগ আর স্বদেশ প্রেমের চূড়ান্ত প্রকাশ নিয়ে হাজির হয়।

বাঙালির প্রাণের বইমেলায় হাজারো মানুষের ভিড়। প্রাণের মেলায় প্রাণ মেলাতে আসে, প্রাণে-প্রাণে মিলতে আসে। মেলা মানেই মিলনমেলা। এ যেন সুরের সাথে সুরের আলাপন। সুরের স্রোতে মিলন তরী, সুরেই অবগাহন। ছোট্ট শিশুরা আসে বাবা মায়ের হাত ধরে, বিশেষ দিনে আসে বিদ্যালয়ের কঁচি-কাচারা। বয়স্ক পৌঢ় প্রবীণ আসে জীবনের স্মৃতিগুলো ঝালিয়ে নিতে, দূরের গ্রামের অখ্যাত লেখক আসে নামকরা লেখকের সাথে আলাপনে, প্রবাসে থাকা বিদগ্ধ ব্যক্তিদের অনেকেই বইমেলার দিন-তারিখ মিলিয়ে ছুটি নিয়ে ঘুরে যায়, প্রেমিক-প্রেমিকা আসে প্রেম বিনিময়ের উৎকৃষ্ট লগ্ন মনে করে, বিবাহিত দম্পতি আসে বিবাহিত জীবনের ফুরসৎ আড্ডায়, উঠতি কবি-লেখক-গীতিকার-ছড়াকার মিলিত হয় আনন্দমেলায়, নিজেকে লিখিয়ে হিসাবে আত্মপ্রচারণার শুভ লক্ষণে। বসে চটপটি ফুচকার দোকান, খই মুড়কী, পাপড়-বুটভাজা, হাল আমলের ফাষ্টফুড রেশমী চুড়ি কত কি।

বাবা-মায়ের হাত ধরে যে শিশুর আগমন ঘটে এই মেলায় সেই মেলার কি নাম দেয়া যাবে? নবজাতক কোলে যে মা বইমেলার সবুজ চত্বরে পা মিলিয়ে বসে সেই দৃশ্যপটকে কোন্ নাটকের দৃশ্যপট বলা যাবে? প্রিয় শিক্ষকের হাত ধরাধরি করে, হুড়োহুড়ি করে যে সব শিশু নতুন বইয়ের গন্ধে ডিগবাজী খায় তাকে কোন্ অভিধায় আখ্যায়িত করা যেতে পারে। বাসন্তি রঙের শাড়িতে আল্পনা আঁকা হাতে রেশমী চুড়ি, কপালে আঁকা তিলক পরে যে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে গোটা শাহবাগ থেকে বাংলা একাডেমীর চত্বরে তার কি কোন তুলনা চলে? মূলত অনেকেই আসে পরিব্রাজক পাখির মতো। কারো কারো আসতে হয় দেখতে, কেমন হচ্ছে, কারা আসছে, কতদূর এগুলো বইমেলা। চুপ করে কোন এক গাছের তলায়, কিংবা কোন এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজেকে মিলিয়ে দেখে তার সাথে বইমেলার আজন্ম সংযোগ। যুক্ত হতে আসে সাগরের স্রোতের সাথে। স্রোতে এসে  স্রোতে মিলন, সুরের সাথে সুরের ব্যঞ্জনা। এই রঙের হাটে রং বিকিকিনির মানুষগুলোকে দেখতে আসতেই হয়। প্রকৃত পক্ষে যুক্ত হতে আসে মানুষ সংযোগের মহাসড়কে। হাজারো চেনা, জানা গলিপথ পার হয়ে মহাসড়কের ব্যস্ত ঘরানায় উঁকি মেরে দেখার এই কৌতূহল নিছক কৌতূহল নয়, এটি মানুষ মন্ত্রে দীক্ষিত হবার অফুরান প্রাণ স্ফূরণ। দাঁড় বেয়ে নাবিক পার হয় তার সম্বল ভাললাগা, ভাললাগা থেকে যুক্ত হওয়া, যুক্ত হতে হতে যুক্তি খুঁজে পায়।এই ইট-পাথরের শহরের উঁচু দালানের ফাঁক গলিয়ে বাংলা একাডেমি-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গালিচায় এসে পড়ে জোছ্না রাঙা চাঁদ। মনে মনে গেয়ে উঠে – আজ জোছ্না রাতে সবাই গেছে বনে। আমি বাংলায় গান গাই/ আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই। বইয়ের হাঁটে বই কেনার এ মহৎ মহান আয়োজন মৃদুমন্দ পায়ে আমাদেরকে সব ইতিহাস, ঐতিহ্য আর অজানা কথার কাছে নিয়ে যায়। আবহমানকাল ধরে বেজে থাকা সুর কানে কানে বলে যায় এই তো আমি, এই তো বাংলা, এই তো বাঙালির স্বদেশ।

এ এক অন্য রকম ভালোলাগা-ভালোবাসা, খাতির যত্ন আমাদের বইমেলাকে ঘিরে। সব স্রোত, সব মত, সব পথ মিলেমিশে একাকার বইমেলায়। তবু মনে হয় কারা যেন ৩০ কোটি মানুষের ভাষাকে আজও পিছু টানে। বইমেলা না বসলে কাদের লাভ হয়? কারা বাঙালি শব্দটিকে নিষিদ্ধ করতে চায়? কারা বাঙালির অস্তিত্বকে মধ্যপ্রাচ্যের মোড়কে বাজারজাত করে বাঙালির অমিত শক্তিকে দমাতে চায়? বাঙালির গায়ে অন্য কোন ধর্মীয় লেবাস আটকে নিজেদের সিদ্ধিলাভ করতে চায়। বাংলিশ কথার ফুলঝুড়িতে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পায়? রেডিও জকির জকিরা প্রমিত বাংলার বিপরীতে যা বলে তা দৈন্যদশাকেই তুলে ধরে। লন্ডন প্রবাসী বাঙালীরা মাতৃভাষার গৌরব বৃদ্ধির পরিবর্তে নির্বুদ্ধিতার আবরণে আটকা পড়ে আছে বছরের পর বছর। কেন বাঙালির বাংলায় আজো আরব বসন্তের কেচ্ছা কাহিনীর ওয়াজ মাহফিল, কেন এই অ-জর অ-মর একুশের মাসে নসিহত করা হয় ফুল দেয়া বেদায়াত। কেন এত এত ইংলিশ মিডিয়াম, কেন এত এত মক্তব মতলববাজী কারবার। কি শেখানো হয় সেখানে। বাংলা হরফ কি আদৌ শেখানো হয়?  জাতীয় সঙ্গীত, রণ সঙ্গীত কেন গাওয়া হয় না। কৃর্তিমান বাঙালির জীবনী পড়ানো হয় না। এই বাংলায় কি কোন মনীষির অস্তিত্ব নাই? আর কত দিন বাংলার পানি-শষ্য-ফল-মূল মাটির কোন মূল্য দেবে না? জয় বাংলা শব্দ নিয়ে কিসের বিতর্ক? জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি কেন এত বিদ্বেষ? বইমেলার এই মাসে এসব কি ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে না? নিরাপত্তাহীনতা সব আনন্দকে যাতে ম্লাান করে দিতে পারে তারই ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাভাষার প্রতিটি শব্দের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে ভাব ও ব্যঞ্জনা। বাংলা অক্ষর ও শব্দ স্বাতন্ত্র্য, শক্তির প্রকাশে কার্যকর। তবু কেন এত অবহেলা? কেন এত তাচ্ছিল্য পেতে হয় বাংলাকে? পৃথিবীর কোন দেশ ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে উন্নতির শিখরে পৌছাতে পেরেছে কি? আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারিতে নেয়া শপথ কেন সারা বছর ভুলে থাকি। কবে হবে বাঙালির সত্যিকার বাংলা। মাথা উঁচু করে, খুব সাহস নিয়ে সব আয়োজনে উদ্ভাসিত হবে বাংলার জয়রথ। কায়মনোবাক্যে আমরা বাঙালি হবো। আমাদের চিন্তায়, প্রতিটি উচ্চারণে বাংলা হবে বাঙালির। আমাদের যা আছে তাই নিয়ে আমরা অহংকার করবো। সালাম-রফিক-জব্বার-বরকতেরা বইমেলা আমাদের দিয়েছে উপহার। বইমেলার হাত ধরে প্রকাশনা শিল্পের ক্রমবিকাশ ঘটেছে। লেখক-পাঠক-উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। মুদ্রণ ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠে নানা আয়োজনে। নানান শিল্পকর্ম আর রংবাহারী আলাপন হৃদয়কে উদ্বেলিত করে। অনিন্দ সুন্দর এক-একটি ষ্টলের নাম, আরো সুন্দর শিশুদের বইগুলোর নাম। খারাপ লাগার একটা দিক প্রতিবছরই চোখে পড়ে। বইমেলায় প্রায়দিনই থাকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা কিন্তু সবুজ চত্বরে সারি সারি পাতা দর্শক চেয়ারগুলো একপ্রকার ফাঁকাই থাকে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনায় দর্শক না থাকা মানে বইমেলার অন্তর্নিহিত আবেদন হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। সারাবছরের একটা আবেগ-উন্মাদনা, ভালবাসা-প্রেম ঘিরে থাকে এই বইমেলাকে ঘিরে। আলোর পথের এই যাত্রা দীর্ঘ হোক। শোক তাপ অস্পৃশ্যতা দূর হোক। ভাববাদী বাঙালির বাংলায় শান্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

জেগে উঠো বাংলা

তোমার বুকেতে শকুনের উৎপাত

তোমার আকাশে আজো উদ্ধত আস্ফালন

বাতাসে আজো ভেসে বেড়ায় দীর্ঘশ্বাস-হাহাকার-কান্না

তুমি জেগে উঠো বাংলা।

সময়ের সাফ কথা….ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার এখনই সময়

সংলাপ ॥ যারা বিশ্বের সামনে ইসলামকে প্রগতিশীল বিশ্বাস হিসেবে উপস্থাপন করতে চান তারা রক্ষণশীল ইসলামের ধ্বজাধারীদের কারণে অসুবিধার সম্মুখীন। এই সংঘাত অনিবার্য যখন যুক্তির বিরুদ্ধে অমূলক ধারণার দ্বন্দ্ব ঘটে। প্রগতিশীলদের এই যুক্তিযুক্ত উপস্থাপনায় একটি বড় অংশের বোধ আছে কিন্তু তারা এর সমর্থনে উচ্চবাচ্য করা থেকে বিরত থাকেন ভীতির কারণে। ইসলামের নামে ১৫০০ বছর ধরে চলতে থাকা প্রবাহমান ভীতিচক্রের কারণেই এই পরিস্থিতির উদ্ভব। এই প্রবাহমান ভীতি অতি কৌতুহলী ধর্মজীবী ও ধর্মবেত্তাদের দ্বারা সৃষ্ট একটি রাক্ষস যা ধর্মভীরুদের উপর তাদের প্রভাব বিস্তারে সাহায্য করে আসছে। এটি একটি চলমান দীর্ঘ মেয়াদী ধর্মীয় ষড়যন্ত্র। মুসলমানদের মধ্যে এ ধরনের চিন্তা-চেতনার সংঘাত নতুন নয়। অতীতে সব সময় এ ধরনের চিন্তাবিদরা ছিলেন যারা রক্ষণশীল ইসলামের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাদের ব্যর্থ করে দেয়া হয়। বর্তমান সময় যুক্তি ও কারণ প্রগতিবাদীদের শক্তি এবং তারা চাইলে তাদের কণ্ঠ মানুষকে শোনাতে পারেন। তারা এখন ধর্মান্ধ ও অবহেলাপরায়ণ মোল্লা এবং কোটি কোটি ধর্মভীরুদের মাঝে অবস্থান করছেন।

এই ধর্মভীরুরা প্রশ্ন করতে ভয় পায় কিন্তু তারা শুনতে আগ্রহী। কেউ মানুক আর না মানুক ধর্মের অবস্থান এখন দুই নৌকার মাঝে। নতুন প্রজন্মের মাঝে যুক্তি এবং কারণ না ঢুকানো হলে আগামীতে তারাই বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দেবে। শুধুমাত্র ধর্মজীবী ও ধর্মবেত্তাদের রক্ষণশীলতা ও অন্ধত্বের উপর অভিশাপ বর্ষণ করে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

চিন্তাবিদদের আত্মজিজ্ঞাসা এই ধরনের পরিস্থিতিতে পরিকল্পনাটা কী হওয়া উচিত? এই অভিযানের কার্যপ্রণালী কী হওয়া উচিত?

সংস্কার আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা সবসময় ছিল কারণ সকল ধর্মের শেকড় প্রার্থনা ঘরেই রাখা হয়েছে। এই শিক্ষা এখন সকল ধর্মের বিশেষ করে ইসলামের প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের পুনঃপরীক্ষা করার সময় এসেছে। ধর্মান্ধ তথাকথিত ইসলামী ধর্মজীবী ও ধর্মবেত্তাদের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার উপর আঘাত হানতে এটা হবে একটা সাহসী পদক্ষেপ। ইসলামের মূল্যবোধগুলো পুনঃবিবেচনা করার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মভীরুরা যে প্রথাগত ধর্ম প্রচার ও প্রসার ব্যবস্থায় আস্থাশীল তার উপর শ্রদ্ধা রেখেই এগুতে হবে। পশ্চিমে প্রগতিশীলরা একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন যেখানে তারা প্রার্থনার জন্য তাদের নিজস্ব পন্থা উদ্ভব করে থাকেন। অবশ্যই রক্ষণশীল মুসলমান বিশ্বে এক প্রবল ঝড় তুলতে হবে। এটা হবে একটা অচিন্তনীয় ও লক্ষণীয় কাজ। প্রগতিশীলরা চিন্তা করেন এর কারণে তাদের অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। ধর্মান্ধরা হয়তো তাদের অন্য নামে অভিহিত করতে পারেন – এই প্রশ্নের উত্তর তাদের পন্থার উপর নির্ভর করছে এবং সময়ই তা বলে দেবে।ইসলামে ধর্মান্ধ ধর্মজীবী মোল্লাদের কোন স্থান নেই। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় আইনেই সর্বশ্রেষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা চলবে। ধর্মীয় সন্ত্রাস চক্রকে সমূলে উৎপাটন করতে প্রার্থনা ঘর থেকে ইসলাম (শান্তি) কে বের করে এনে জনগণের প্রাত্যহিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে হবে যাতে প্রতিটি কর্মই নিষ্ঠার সাথে করা যায়। ফতোয়া দেয়ার অধিকার সম্পূর্ণ হরণ করতে যুক্তি এবং প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় শাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রগতিশীল  প্রার্থনায় ভীতি ছড়াবে না বরং তা যুক্তি ও বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠা করবে।

তোতাপাখির মতো রূপকথা এবং ভীতি প্রদর্শনে খুৎবা পাঠ করা হবে না। প্রার্থনা হবে বাস্তবধর্মী চিন্তার উপর ভিত্তি করে এবং হঠাৎ করে আকাশ থেকে সবকিছু হয়ে যাবে এরকম আশা করা যাবে না। আধিপত্যবাদিতাকে ধ্বংসের লক্ষ্যে প্রক্রিয়ায়রত ব্যক্তিগত অভিমতকে শ্রদ্ধার সাথে দেখতে হবে। সার্বিক অঙ্গনে আমলারা নির্ভর করবেন আস্থা ও শ্রদ্ধার উপর এবং ব্যক্তিগত মতামতকে বিবেচনা করতে যুক্তি ও দর্শনের সমন্বয় ঘটাবেন। অবহেলা এবং ভীতির ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারী ধর্মান্ধ ধর্মবেত্তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে এটাই যুগের আহ্বান।

মুদ্রার দুই পীঠই সচল থাকতে হয়

নজরুল ইশতিয়াক ॥ নিজেদের খেয়াল খুশি মতো কোন একটি তত্ত্ব কিংবা তকমা দাঁড় করানোই শেষ কথা নয়। যেমন সরকার তাদের নেয়া বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞকে ব্যাপক প্রচারের আওতায় এনে গণমানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। একই সাথে কিছু শ্লোগান, নীতিবাক্য বাজারজাত করে অপরাপর সমস্ত ভুতুড়ে শক্তিকে দুর্বল করতে চাচ্ছে। যা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হতে পারে। পর্যবেক্ষণ বলছে ক্রমাগত রুগ্ন হচ্ছে, কোথাও কোথাও সংকুচিত হচ্ছে বাক-চিন্তার জায়গাটি। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ধারাগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও থামিয়ে দেয়া হচ্ছে জোর করে। নানা পন্থায়, নানা নামে অলীক কাল্পনিক ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে প্রান্তিক পর্যায়ে, নগরের অলিতে-গলিতে। সামাজিক কাঠামো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। আর সেখানে লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে ঈমান-আকীদার নামে ভয়ংকর জীবন নাশক মলম। ফলে কবিতা লেখা হয় কিন্তু কবিতা পাঠ কিংবা আলোচনার পরিবেশ নেই। অনেকে সামাজিক বিশ্লেষণমূলক লেখা লেখেন সেগুলো নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হয় না। এমন কি আগে অনেক পরিবারে শিল্প সংস্কৃতির চর্চা-চর্যা হতো প্রকাশ্যে, এখন হয় না কারণ ঈমান আকিদা রক্ষার চাপ বেড়ে গেছে। বই মেলায় অসংখ্য বই প্রকাশ হয় কিন্তু বই নিয়ে বস্তুত কোথাও কোন আলোচনা নেই। শত সংকটেও যাত্রাশিল্প মূল্যবোধের কথা তুলে ধরতো কিন্তু মাঠ পর্যায়ে যাত্রা শিল্প একেবারেই হারিয়ে যাপার পথে। পালা গান, বিচার গানের কফিনেও পেরেক ঠুকে দেয়ার মহা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে, গাইতে পারছে না বাউল গান কারণ ঈমান আকিদা নাকি ধ্বংস হচ্ছে। এমন বহু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা যাবে সারা বাংলায় যা ক্ষমতাসীনদের ভাবায় না।

এটা সাধারণ সত্য যে, ভয়াবহ কিছু আকস্মিক ঘটে না। একটি উপযোগীতা দীর্ঘদিন ধরে তৈরী হতে থাকে এবং তা বিস্ফোরণমুখ হয়ে প্রকাশ পায়। সমাজ একটি বহুমাত্রিক মিশ্রন। নানামুখি শক্তির খেলা চলে প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত। শুধু অভ্যন্তরীন উৎস থেকেই নয়, বৈশ্বিক দুনিয়ার বহু ক্ষতিকর জীবানু অনায়াশে ঢুকে পড়ছে আজকের সমাজে। বিশেষ করে আমাদের মতো অরক্ষিত সংস্কৃতির দেশে। এখানে কোন বাধা ছাড়াই বাজারী পণ্যের মতো সংস্কৃতি বাজারজাত করা যায়। আর এটি আমদানী করার কাজে আমাদের মা-বাবা, দাদা-দাদী, কন্যা শিশুরাও পারদর্শী। তারা তো মহাপ্রতাপে সিরিয়াল দেখাতে ব্যস্ত। এখানেই নিয়ন্ত্রণের কোন ব্যপার নেই আর এখানেই প্রবল হয়ে দেখা দেয় জাতীয়তাবোধের প্রশ্ন সচেতন মহলে। জাতীয়তাবোধকে যারা সংকীর্ণতার চোখে দেখেন তারা বাস্তবতাবর্জিত তর্কবাজ। এদেরকে শিক্ষিত মূর্খ বলা যেতে পাওে নির্দিধায়। আবার আমরা এমন অসংখ্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর কবলে পড়েছি যারা বহুদূরের গাল গল্পকে বাজারজাত করতে নিজেদের দরকারী জিনিষ ভুলিয়ে দিচ্ছেন। কেবলমাত্র পজিশনের কারণে এরা মনগড়া সব তত্ত্ব আওড়িয়ে চলেছেন সকল প্রকারের মিডিয়ায়। গণতন্ত্র-সুশাসন-মানবাধিকার-ধর্ম নিয়ে কথা বলছেন। আর সংবাদ মাধ্যমগুলো নিজেদের সংকীর্ণস্বার্থে এগুলো প্রচার করেন। যখন বুদ্ধিজীবী, লেখক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মীর জন্ম হয় টেলিভিশন-পত্রপত্রিকায় তখন বিষয়টি গবেষনার। প্রযুক্তি নির্ভরতার কারণে এসব প্রচার গিলতে বাধ্য হচ্ছে জনগণ। আজকাল তথাকথিত আলেম সমাজ প্রযুক্তি সুবিধা কাজে লাগিয়ে চরম অরুচিকর এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এরা  সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে নানামুখি ফন্দি ফিকিরের আশ্রয় নিচ্ছেন। কিভাবে নিজেদেরকে চড়া দামে ভাড়া খাটানো যায় সেটি তারা ভালোভাবে রপ্ত করেছেন।সাধারণ ধর্মভীরু মানুষ অজ্ঞতার কারণে মধ্য রাত পর্যন্ত ঘুম ঘুম চোখে বসে এদের কথা শোনে। কেউ যেন ঘুমিয়ে না পড়ে এ জন্য কথায় কথায় বিশেষ শব্দমালা আর হিন্দিগানের-বাংলাগানের সুরে শ্রোতাদের উদ্দীপ্ত করতে বাধ্য করেন। জোর করে নিজেদের মনগড়া যুক্তির পক্ষে মতামত নেন। যাতে সাধারণ মানুষ সেসব তথাকথিত মোল্লাদের কাছে দেয়া ওয়াদার খেলাপ না করেন। আজকাল তো কোন কোন ওয়াজ মাহফিলে সতর্ক করে দেয়া হয় ওয়াজের মাঠে না আসলে কিয়ামতের দিন দায়ী থাকতে হবে! হাল আমলে বহু ওয়াজকারী নামি-দামী ব্রান্ডের গাড়ীতে করে সাঙ্গপাঙ্গ সহ উপস্থিত হন। সাধারণত আয়োজক, বাজার কমিটি, ঘাট কমিটি টাইপের উদ্যোক্তরা যখন বায়না করতে আসে এ্যাডভান্স মূল্য পরিশোধ সহ লোক সমাগমের সংখ্যাও অবগত করেন। ফলে নিরুপায় আয়োজকরা আদাজল খেয়ে লোকজন জোগাড়ে মাঠে নামেন। অনুসন্ধান বলছে হাল আমলে প্রত্যেকটি আয়োজক কমিটি স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারী দলের নেতা কর্মীদেরকে সম্পৃক্ত করার মিশনে নেমেছেন।

ভোট ও আঞ্চলিক রাজনীতির জন্যই এমনটি হচ্ছে। অথচ এসব স্থানীয় প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতেই দেশ-সংবিধান-মুক্তিযুদ্ধ পরিপন্থী কথা বলা হয়। জাতীয় সংগীত, পহেলা বৈশাখ, মাতৃভাষা দিবস পালনকে গর্হিত কাজ বলে প্রকাশ্যে এসব মোল্লার দল প্রচার চালিয়ে যান কিন্তু তাদেও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপন করা হয় না, কারণ রাজনৈতিক নেতা আর এমপি মন্ত্রীও সেসব জমায়েতের বড় চেয়ারের অতিথি। এসব চরিত্রহীন আলেমদের অঙ্গভঙ্গির মধ্যে কোন সৌন্দর্য-শিষ্টাচার নেই, চরম অশোভনীয় গল্পবাজ চাটুকার। সংশোধনের অতীত এসব নষ্টভ্রষ্ট চরিত্রহীন আলেমদের হাত থেকে সাধারণ ধর্মভীরু মানুষদের রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। সত্য তুলে ধরার কাজটি করতে হবে স্বেচ্চাসেবক ঈমানদার দেশপ্রেমিক হিসেবে। সচেতন করতে হবে সাধারণ ধর্মভীরু মুসলিমদেরকে। উন্নয়নের নামে ইট কাঠ পাথরের স্তুপের মধ্যে কি কি জন্ম নিচ্ছে, জন্ম দেয়া হচ্ছে সে ব্যাপারে নজর না রাখলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরী হয়। ধসে পড়তে পারে আপাত শক্তিশালী বৃক্ষও। ভারসাম্যহীনতার ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে ক্ষমতার মসনদ। ফলে সমাজে যদি চিন্তন পীঠ কার্যকর না থাকে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কার্যকর না থাকে, তবে আগাছারা মাঁথা তুলে দাঁড়াবেই। তখন সরকার সামলাতে পারবে তো বাস্তবতা? ভবিষ্যত বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্ধি বাংলাদেশের ভেতরেই সৃষ্টি হচ্ছে-চরমভাবে বিকশিত হচ্ছে। কার্যকর উদ্যোগ গৃহীত না হলে সকল আধুনিকতা আর উন্নয়ন কোন ধুলায় লুটাবে তা কেউ চিন্তাও করতে পারবে না।

রাজনীতি হতে সাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্বেষ বিদায় হোক

সংলাপ ॥ গণতন্ত্রে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সেই মতের সমর্থনে অনেক মানুষকে সংগঠিত করার অধিকার একটা স্তম্ভ। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষকে রোবট বানানোর একটা প্রয়াস থাকে। গণতন্ত্র  মানুষকে বেড়ি পরায় না। কাজেই, গণতন্ত্রে বিভিন্ন বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলা যায়, যদি না তা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার বা নৈরাজ্য তৈরি করার প্রয়াস হয়। গণতন্ত্রে মতটা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো তার পিছনে অন্যকে আঘাত করার বা অন্যের ওপর নিজের মত জোর করে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা আছে কিনা। কোনও মন্দির ভেঙে বা সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে মসজিদ করব, আইনকানুন মানব না, এমন বিশ্বাস গণতন্ত্রে গ্রাহ্য নয়। অন্যদিকে, ভয়হীনতার পরিবেশে যে কোনও বিষয় নিয়ে বিতর্ক বা নিজের মতের পক্ষে অনেক মানুষকে সংগঠিত করা, গণতন্ত্রের অঙ্গ। এই গণতান্ত্রিক আবহে আমাদের দেশে রাজনীতিতে ধর্ম, জাত-পাত, ভাষা   বা সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

ধর্ম, জাত, জাতি, সম্প্রদায় বা ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনও ভূমিকা থাকতে পারে কি? আবার যেখানে বিশাল সংখ্যক মানুষ অন্যদের বিরূপ মনোভাবের কারণে ন্যূনতম মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, সেখানে ধর্ম বা জাত নিয়ে কথা বলে ভোটের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া কি অন্যায়? এরকম গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাকে কি কিছুটা অস্বীকার করা হয়, যদি কোনও ধর্ম বা ভাষাভিত্তিক গোষ্ঠী বা কোনও জাত বা সম্প্রদায় চিন্তা করে দেশের শাসন ব্যবস্থায় তাদের অংশ থাকছে না, তা হলে তারা নিজেদের সংগঠিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে নিজেদের ক্ষোভ দূর করার চেষ্টা করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে জাতধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভূমিকা কি ছেঁটে ফেলা সম্ভব?

এটা নিশ্চয়ই আইন করে নিশ্চিত করা যায় যে, ভোটের সময় কেউ ‘আমি হিন্দু’ বা ‘আমি মুসলমান’ বলে ভোট চাইতে পারবেন না। বলতে পারবেন না হিন্দুরা বা মুসলমানরা আমাকে ভোট দিন ইত্যাদি। কিন্তু ঘটনা হলো, প্রকাশ্যে সেভাবে কেউ প্রচার করেন না। করলে তা আটকানোর ব্যবস্থাও আছে। কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ালে প্রার্থীকে বাতিল করা যায়। আদালতের হস্তক্ষেপে এর অতিরিক্ত কী করা সম্ভব? এরকমটা ভাবা যেতে পারে যে, কোনও দলের প্রচার ‘ধর্ম’ থেকে শুরু হলে বা কোনও দল ইস্তাহারে ধর্মের কথা রাখলে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু গণতন্ত্রে কি জাতধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে আত্মপরিচয় খোঁজা বা সামাজিক ন্যায়বিচার চাওয়া অন্যায়?

যুক্তির পথ সব সময়েই বন্ধুর। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যদি জাতধর্ম সম্প্রদায়, ভাষার স্থান না থাকে, তা হলে তো সামাজিক ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্বে মুসলমানেরা যে বহুক্ষেত্রে অন্য ধর্মের মানুষের থেকে পিছিয়ে, তাতে তো সংশয় নেই। এর জন্য মুসলমান সমাজের কর্তারাই দায়ী। এই অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রগতিশীল মুসলমানেরা কি দল গড়তে পারবেন না? আদিবাসীরা পীড়ণ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে পারবেন না গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়? ঘটনা হলো, জাতধর্ম সম্প্রদায়কে যেমন অন্ধকারের দিকে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যায়, তেমনই সামাজিক ন্যায়বিচার বা প্রগতির জন্যও ব্যবহার করা যায়। ধর্ম আর সাম্প্রদায়িকতা এক নয়। একজন দাঁড়ি-টুপি পরিহিত পুরুষ বা বোরখা পরিহিত নারী নিজের ধর্মের মধ্যে পুরোপুরি আবদ্ধ থেকেও বাইরের জগৎ সম্পর্কে পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে পারেন। কাজেই, তারা কোনও দলের হয়ে প্রচার করতে পারবেন না, একথা বলা বোধহয় সঙ্গত নয়। আর তারা যখন প্রচার করবেন, তখন তাদের পোশাকই কিন্তু ধর্মীয় অনুষঙ্গ বহন করবে। তাদের নির্বাসন জরুরি নয়, জরুরি হলো সাম্প্রদায়িকতার বিদায়, বিদ্বেষের বিদায়।

বাঙালি জীবন স্ব-ধর্মনিয়ন্ত্রিত। সমাজের সমস্ত শুভা-শুভ নির্ধারিত হয় পাপ-পুণ্যের বোধ থেকে, যা পুরোপুরি ধর্মীয় বিষয়। গত দশকের শেষলগ্ন হতে রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বর্ণের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও দেশের অর্ধেকের বেশী মানুষ ধর্মের গোঁড়ামির চক্রব্যূহ ভেঙে বেরোতে পারেননি। প্রগতিশীল ধর্মীয় নেতারা উদার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারেন কিন্তু রাজনীতি থেকে তাদের নির্বাসন কাম্য নয়। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিবাদ  তার পথ খুঁজে নেবেই। এখানেই শেষ নয়, ব্রিটিশ ভারতে স্থানীয় মানুষদের প্রতিবাদ করার অধিকার দিতেই এক সাহেব ‘কংগ্রেস’ তৈরি করেছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন এই সংগঠন হিংসাত্মক পথে যাওয়া থেকে ভারতীয়দের বিরত করবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভেদমূলক নানা শক্তি মাথাচাড়া দিয়েছে। গণতন্ত্রই তার সমাধান করেছে। এভাবেই শক্তিশালী হচ্ছে এই দেশ। মুসলমানিত্ব হাতিয়ার করে রাজনীতিকরা যখন ক্ষমতা  জয় করতে চেয়েছে, তখন তারা ব্যর্থ হয়েছে। তা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা যখন পথ বদলেছে, তখন ক্ষমতায় এসেছে। গণতন্ত্রের এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে সম্মান জানানোই শ্রেষ্ঠ পথ। সেই পথ ধরে ৪৬ বছর আসার পর আজ হঠাৎ কোনো দলের তা বদলানোর চেষ্টা না করাই বোধহয় ঠিক কাজ হবে।

সময়ের সাফ কথা….সর্বস্তরে সত্য প্রতিষ্ঠায়….

সংলাপ ॥ বিদেশীদের সাহায্য নিয়ে, দেশের মধ্যে মিথ্যাচার-দুর্নীতি চলতে দিয়ে, প্রশাসন কাঠামো আমলাতন্ত্রের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করে, রাজনৈতিক ইসলাম ও ধর্মান্ধদের সাহায্য নিয়ে এবং আঁতাত করে ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকা যায় বাংলাদেশে, তবে তা সুফল বয়ে আনে না, অন্তত ইতিহাস তাই বলে। 

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় সর্বস্তরে সত্য প্রতিষ্ঠায় সরকার দৃঢ় প্রত্যয়ী না হলে জাতির আশীর্বাদ পাওয়া কঠিন। জাতির আশীর্বাদ না পেলে আল্লাহ্র রহমত পাওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ওলী-আল্লাহ্দের দেশ। সহস্রাধিক সাধক এই মাটিতে শুয়ে আছেন। তাঁরাও দেশ ও জাতির কল্যাণে অন্তরালে থেকে সত্য প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন ও আছেন। তাই দেশের সর্বস্তরের ৭০ ভাগ মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁদেরকে অন্তরের অন্তঃস্থলে ধারণ করে রেখেছেন। আল্লাহ্ও তাঁদের সহায় আছেন। সব ধরণের চক্রান্তকে পরাস্ত করতে দেশের গরিব মানুষের ঐক্যের ভিতটাকে আরও মজবুত করার জন্য আত্মনিয়োগ করাই হবে এই মুহূর্তে সরকারের জরুরি কর্তব্য। সবকিছুর উর্দ্ধে উঠে সার্বিক অঙ্গনে সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তির লক্ষ্যে দেশ ও জাতির কল্যাণে যিনি কান্ডারি – তিনি অবশ্যই জাতি ও ওলী-আল্লাহ্দের আশীর্বাদ এবং সর্বোপরি আল্লাহ্র কৃপা হতে বঞ্চিত হতে পারেন না। ইতিহাসই তার প্রমাণ।

সংস্কার একটা পথ বা পদ্ধতি যা সময়, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর ভর করে কোনো ব্যক্তি, দেশ ও জাতি উন্নতির দিকে যায় এবং পরীক্ষিত ফলাফলের ওপর নির্ভর করে আবারও সংস্কারের পথে এগিয়ে যায়। এ পথে চলার শেষ নেই। এটা ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্র জীবনে অবশ্যই ঘটতে হবে এবং ঘটে চলেছে বলেই আমরা ব্যক্তি জীবনে প্রতিদিন প্রতিটি কর্মের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারছি সময় ও পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে। পরিবর্তনের ধারায় ব্যক্তি যে বিষয়ে উর্দ্ধারণের পাথেয় কুড়িয়ে চলেছেন তিনিই হচ্ছেন সে বিষয়ে অভিজ্ঞ > পরবর্তীতে দূরদর্শী > পরবর্তীতে দিব্যজ্ঞানী। অন্ততঃপক্ষে যারা একটা বিষয়ে অভিজ্ঞ পর্যায়ে যেতে পারেন তারাই সে বিষয়ে পৃথিবীর, রাষ্ট্রের, সমাজের বা ব্যক্তি জীবনের দিক-নির্দেশনা দিতে পারেন। তাই দেখা যায়, অভিজ্ঞরাই জ্ঞান অর্জনের জন্য যুগে যুগে শিক্ষার ওপর জোর দিতে বলেছেন কারণ শিক্ষাই জ্ঞানের বাহন। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতির মধ্যে ততো অভিজ্ঞ, দূরদর্শী ও দিব্যজ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আছেন। তারা যখন দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেন সেই দেশ ও জাতি তখন উন্নতির চরম শিখরে ওঠার পথে অগ্রসর হয়। আর যারা তা হতে পারেননি তারা ব্যক্তি জীবনে, সমাজ জীবনে এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে যদি দিক-নির্দেশনা দিতে থাকেন যে কোনো পরিস্থিতিতে ক্ষমতা হাতে পেয়ে, তাহলে দেশ ও জাতির উন্নতি ব্যাহত হবে এবং জাতির মধ্যে হতাশা প্রকটভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, রাহাজানি, খুন ইত্যাদি বেড়ে যাবে। এর মধ্যেই অগ্রসররা পরিবর্তন চাইবে এবং প্রয়োজনে  জাতিকে সেই পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, যে পথে সংস্কারের ধারা স্থবির না হয়ে চলমান থাকে (যদিও তার মধ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য বিদ্যমান থাকে)। অপ্রিয় হলেও সত্য বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দূরদর্শী শ্রেণীর ঐক্যতানে দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য একরৈখিক পথের পথিক হয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারিনি যেহেতু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের মোহে অন্ধত্বের জন্য। ফলে বারবার পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন ঘটবে বা ঘটাতে হবে এটা সুনিশ্চিত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সর্বস্তরের পেশাজীবী মানুষ যখন সামাজিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন বর্তমান সরকারই একমাত্র শক্তি। ‘সংস্কারক’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হলে শুধু প্রশাসন ও বিভিন্ন কমিশনের সংস্কার করে নয়, জাতীয় জীবনে সর্বক্ষেত্রে বিশেষ করে সামাজিক কাঠামোর উন্নতির লক্ষ্যে একরৈখিক সংস্কার কার্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। বর্তমান সরকারই পারে অবিলম্বে বাংলাদেশ বিরোধী ও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কবল হতে জাতিকে মুক্ত করে নিজের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে রাজনৈতিক ইসলামওয়ালা ধর্মজীবী, উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করে জাতির সামনে তাদের মুখোশ খুলে, তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহ বাজেয়াপ্ত করে জনকল্যাণ করতে। এছাড়াও বর্তমান সরকারই পারে বিচারবিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসমূহে যোগ্যব্যক্তিত্ব যোগ্যস্থানে বসিয়ে

দেশ ও জাতির সেবা করার সুযোগ সৃষ্টি, কঠোর হস্তে লক্ষ্যভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে সার্বিক মিথ্যাচার বন্ধ করে জাতির আস্থা ফিরিয়ে আনতে। নচেৎ চক্রান্তকারীদের খপ্পরে পড়ে রাজনীতিজীবী ও ধর্মজীবীদের সাহচর্যে থেকে যত কথা আর কার্যক্রম বর্তমান সরকার নিক না কেন তা বিফলে যাবার সম্ভাবনা বেশি এবং আগের অন্যান্য সরকারকে যেমন জাতি (?) চিহ্নিত করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তেমনি সত্যের মানদন্ডে বর্তমান সরকারকে চিহ্নিত করে জাতি নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে পারে। কারণ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি।

এখনো হাতে যথেষ্ট সময় আছে। বর্তমান সরকার কোনদিকে যাবেন এটা সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই – ক্ষমতার চেয়ে জনতা বড়, দলের চেয়ে দেশ।

দেশের উন্নতির জন্য চিন্তাশীল মানুষই দরকার

শেখ উল্লাস ॥ ‘চিন্তাশীল মানুষ’ বলতে সমাজ ও দেশের বিভিন্ন অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ও অধিষ্ঠিত মানুষদের প্রসঙ্গেই কথা বলা হয়েছে। বিপুল আর্থিক-সামজিক প্রতিপত্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এবং এর অপার সুযোগ-সুবিধাকে বিশেষ করে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়াকে) ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত ও অধিষ্ঠিত মানুষের এখন সমাজে অভাব নেই। ধর্ম ও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে ধর্মজীবী, রাজনীতিজীবী-ব্যবসায়ী বিশিষ্ট মানুষের সংখ্যাটিও আগের তুলনায় শত-সহস্র গুণ বেশি। অপরদিকে, দেশের সহজ-সরল ধর্মভীরু মানুষ সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হচ্ছে ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিভ্রান্তি ধার্মিকতার পথের বিপরীতে গিয়ে ধর্মান্ধতার পথে নিয়ে যায়। অথচ ধার্মিকতার পথই ধর্মের পথ, শান্তির পথ। কারণ, ধর্মান্ধতা কারও জীবনে কখনোই শান্তি আনতে পারে না। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত) তৎকালীন মানুষের হানাহানি ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ জীবনে শান্তির সুবাতাস আনার জন্যই ইসলাম (শান্তি)-কে মানুষের একমাত্র ধর্ম বলে প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সাধনা করেছিলেন। গবেষণায় দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত)-এঁর আগে প্রচলিত ও প্রবর্তিত যত ধর্ম এই পৃথিবীতে এসেছিল তার সবগুলোরই মূলকথা এই শান্তি। স্বাভাবিকভাবে মানুষ মাত্রই শান্তি চায়, জীবন চলার পথে শান্তিতে বসবাস করতে চায়।

হাক্কানী চিন্তনপীঠে বলা হয়,‘মান’ ও ‘হুশ’ দু’টি শব্দের মিলনে হয় ‘মানুষ’ শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ,‘মান’ সম্পর্কে যাঁর হুঁশ (জ্ঞান বা খেয়াল) আছে, সেই মানুষ। ‘মানুষ’-এর

সঙ্গে জগতের অন্য সব প্রাণী-কীট-পতঙ্গের পার্থক্যটাই এখানে। আর ‘মানুষ’-কে তাঁর নিজের সম্পর্কে এই হুঁশ জাগ্রত করা ও শিক্ষা দেয়ার জন্যই কালে কালে এই পৃথিবীতে, এই ধরাধামে নবী-রাসুল এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সূফী-সাধক-অলি-আউলিয়া-দরবেশকূল অবতীর্ণ হয়েছেন এবং তাঁরা মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য জীবনভর চেষ্টা-সাধনা করে গেছেন। মানুষ উন্নতি লাভ করে শান্তিতে থাকুক-এটাই ছিল তাঁদের একমাত্র সাধনা। বর্তমানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত কল্যাণে মানুষ নানা কঠিন ও সহজ অনেক পথের সন্ধান পেয়েছে-একথা ঠিক। কিন্তু বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও অধিষ্ঠিত হয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে তাদের বিভিন্ন কূপমন্ডুকতা ও স্বার্থপরতার কারণে সমাজে বৈষম্য ও অনাচার-অবিচারে সার্বিক পরিবেশে সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা আজও যেন সূদুরপরাহত। সেজন্যই বলা হয়েছে, অপার সম্ভাবনার এই দেশে মানুষকে (জনগণকে) দরিদ্র বানিয়ে রাখা হয়েছে, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করে, অনেক সুবিধা নিয়েও যখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ দুর্নীতির আশ্রয় নেন, তখন সেখানে অন্য যারা থাকে তারাও দুর্নীতিগ্রস্থ হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। সম্প্রতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের উদ্দেশ্যে দেয়া আচার্য্যের (মহামান্য রাষ্ট্রপতি)বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই লজ্জাজনক অবস্থাটুকু সম্পর্কে আঁচ করা যায়।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই সমাজে এখন প্রকৃত অর্থেই যারা সমাজ ও মানুষের উন্নতি চান এমন ‘মানুষ’ এর প্রয়োজনই বেশি দরকার বোধ করছে জাতি। উদাহরণ স্বরূপ: বাংলাদেশ রুর‌্যাল অ্যাডভান্সমন্টে কমিটি (ব্র্যাক)-এর প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্মরণে ১৭ জানুয়ারি শুক্রবার তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে বিশিষ্টজনদের আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে। রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আলোচনায় বলা হয়, সমাজে সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সারাজীবন কাজ করে গেছেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। শিক্ষা, পুঁজি ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলতেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। গরিব ও পিছিয়ে পড়া মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বদলের মধ্য দিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। তাঁর চিন্তা ও কাজ থেকে সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। উল্লেখ্য, স্যার  ফজলে হাসান আবেদ গত ২০ ডিসেম্বর’২০১৯-এ  প্রয়াত হন। 

স্মরণানুষ্ঠানের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার বক্তৃতায় বলেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ফজলে হাসান আবেদ বাংলাদেশের উন্নতির কথা চিন্তা করে গেছেন। গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরও তিনি সামনের দিনগুলোতে কীভাবে ব্র্যাক চলবে, নেতৃত্বে কারা থাকবে, তা নিয়ে ভেবেছেন। দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নকে নিজের কাজের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য তিনি কাজ করে গেছেন। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, স্যার আবেদ যাঁর সঙ্গেই কথা বলেছেন, তাঁর মধ্যে একটি ভিশন (লক্ষ্য) তৈরি করে দিতে চেয়েছেন। ব্র্যাকের প্রতিটি কাজেও তিনি একটি ভিশন ঠিক করতেন এবং তা বাস্তবায়নের রূপরেখো কী হবে, সেটিও ভেবে নিতেন।

এভাবে দেখা যায়, স্যার ফজলে হাসান আবেদের মতো ভিশনারি ও মানবতাবাদী মানুষই এখন সমাজে সবচেয়ে বেশি। মানুষকে ভালোবাসেন বলেই মানুষের ও দেশের উন্নতির কথা তিনি চিন্তা করতেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলে যেসব মানবতাবাদী মানুষ রাজনীতি করতেন, দেশ ও মানুষের উন্নতির কথা চিন্তা করতেন তারা সবাই চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। অবশ্য তখন রাজনীতি করতেন এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম ছিল। ব্রিটিশ-পাকিস্তানী শাসক-শোষক-দালাল-বুর্জোয়া শ্রেণীর মানুষদের সংখ্যাটিই এক্ষেত্রে বেশি ছিল। এই দালালদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এদেশের শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষদের পক্ষে কথা বলা কত যে কঠিন ছিলো এবং এ মানুষদের সংখ্যাটি যে কম ছিল তা আজকের দিনে চিন্তা করার মতো মানুষও কম। মোটা দাগে বলা যায়, এই শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষদের পক্ষে কথা বলার জায়গাটিই প্রথম তৈরি করে দেয় ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মুসলিম ছাত্রলীগ এবং প্রায় সমসাময়িক ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানী-মৌলভী শামসুল হক-শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগসহ আরও কয়েকটি ছাত্র ও যুব সংগঠন। এইসব সংগঠনের ব্যানারেই অবহেলিত বাংলার মানুষের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হতে থাকে এদেশের সচেতন ছাত্র-যুবকগণ। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে শুরু হয় বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের স্বপ্নের পথযাত্রা। তারপর স্বাধীকারের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে আসে ১৯৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান,৭০’এর নির্বাচন ও ৭১’এর রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা ও মুক্তির যুদ্ধ।  ২৫ মার্চের পাকিস্তানী হানাদারদের পরিচালিত গণহত্যার পর স্পষ্ট হয়ে যায় কারা পাকিস্তানীদের দালাল ? আর কারা দেশকে ভালোবাসে? কারা দেশের জন্য, মানুষের জন্য চিন্তা করে? কারা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার কথা ভাবতে পারে, উৎসর্গ করতে পারে? এই উৎসর্গ যারা করতে পারে তাদের আত্মত্যাগেই এই দেশ স্বাধীনতা পায়। এরাই দেশের চিন্তাশীল মানুষ, চিন্তাশীল রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। 

কিন্তু আজ দেশ যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি তথা সুবর্ণ জয়ন্তী-উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে তখন রাজনীতিতে দেশের জন্য ‘চিন্তাশীল মানুষ’-দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি অনুভব করছে জাতি। কারণ, রাজনীতিতে ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার জন্য সুবিধাবাদী ও দালাল শ্রেণীর লোকদের অনুপ্রবেশ জাতির বিবেককে ভাবিয়ে তুলছে। এই অনুপ্রবেশকারী বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি করে একদিকে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে, অপরদিকে দেশে থাকলেও সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে মিথ্যাচার ও বৈষম্যে সমাজ-পরিবেশকে কলুষিত করছে। এইসব দালাল ও মিথ্যাচারিদেরকে চিহ্নিত করে দেশপ্রেমিক ও চিন্তাশীল মানুষদের মাঝে সমাজের নেতৃত্ব ও দায়িত্ব অর্পণের মধ্যেই নির্ভর করছে দেশের সার্বিক কল্যাণ।

পাট শিল্প রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে

নজরুল ইশতিয়াক ॥ পাট আমাদের অস্তিত্ব। সোনার বাংলা আর সোনালী আশ পাট নামটি যেন একই সূত্রে গাঁথা। কত শত গল্প গৌরব এই পাটশিল্প নিয়ে।

অথচ সীমাহীন অব্যবস্থাপনা-বঞ্চনার মহাকাব্য রচিত হতে যাচ্ছে পাট শিল্প নিয়ে। দুঃখ-বেদনা, হতাশা- বঞ্চনার এই মহাকাব্য রীতিমত যন্ত্রণাদায়ক। স্বাধীন বাংলাদেশে এটি রক্তক্ষণের নাতিদীর্ঘ রচনা। অভাব-রোগ ব্যধি জরাজীর্ণতায় হাজার হাজার পরিবার পথে বসেছে। জীবনের শেষদিনগুলো চরম অনিশ্চয়তায় কাটছে। টিকে থাকার ন্যূনতম সম্ভাবনাটুকুও অনেকের নেই। সরকারী পাটকলগুলোতে নিয়মিত বেতন জুটছে না। বকেয়া বেতনসহ  মজুরী কমিশন বাস্তবায়নের দাবিতে দিনের পর দিন মাসের পর মাস অনশন করছে পাটকল শ্রমিকরা। অনেকেই জীবনের জোয়ার-ভাটার শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে স্বেচ্ছায় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। সরকারী পাটকল ধ্বংসের জন্য পাট সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরগুলোর অসাধু কর্মকতাদের ধারাবহিক দুর্নীতি ও অবহেলাকে দুষছেন শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞরা।

পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে, বিশ্লেষণ হচ্ছে এই সংকট থেকে উত্তরণের নানা দিক নিয়ে। সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয় সভা করছেন, তবু যেন এই কালো মেঘ কাটছেই না। অথচ দেশে ও বিদেশের ১২০টি দেশে পাটের বাজার রয়েছে। বেসরকারি পাটকলগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে দেশের মানুষ পাটজাত পণ্য কিনতে মুখিয়ে আছে। পাট গবেষনায় নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। পাট দিয়ে কি হয় না? নিত্য প্রয়োজনীয় অতি দরকারি সবই হয়। ঢেউটিন, পলিথিন ব্যাগ, হাত ব্যাগ, বস্তা, জুতা-স্যান্ডেল, শাড়ি-কাপড়, চাদর, কার্পেট, আকর্ষনীয় পুতুল, খেলনাসহ হস্ত ও কারুশিল্প সবই হয়। কমপক্ষে ২৭ রকমের পণ্য বাজারে পাওয়া যায়। হাল আমলে ফ্যাসনেবল ড্রেস তৈরী হচ্ছে। প্রতি বছর ঘটা করে জাতীয় পাট দিবস পালন করা হয়। বসে পাটশিল্প মেলা। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানসমূহ বাণী প্রদান করেন। বর্ণিল সাজ-সজ্জায় সজ্জিত করা হয় পাট সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলো। ঘটা করে পাট মেলা হয়। প্রচুর দর্শক-ক্রেতার সমাগম ঘটে। বিদেশ থেকেও আসে বহু উদ্যোক্তা। 

বাস্তবতা হলো আমাদের মাটি-প্রকৃতি পাট চাষের উপযোগী। শত বছর ধরে পাট চাষ করা হচ্ছে। ধান গমের পর পর পাটই আমাদের অন্যতম প্রধান কৃষি পণ্য। বর্ষা মৌসুমে মাত্র ৩ মাসের মধ্যে পাট চাষ সম্পন্ন হয়। পাট দিয়ে তৈরী হয় নিত্য প্রয়োজনীয় বহু জিনিসের। দেশের অভ্যন্তরে এবং দেশের বাইরে রয়েছে বিশাল চাহিদা। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সৃষ্টি হয়ে আছে বৈদেশিক বাজার। পাট ও পাটজাত রপ্তানীতে আয়ের পরিসংখ্যানটি ও ব্যাপক।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭৭-৭৮ সালের পর সরকারি পাটকলগুলোতে আর নতুন করে বি.এম.আর.আই. করা হয়নি। মডার্নাইজ না করার কারণে  পুরোনো মেশিনগুলোর  উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে যথাসময়ে পাট ক্রয় না করার কারণে মিলগুলো কর্মশূণ্য থাকছে। সাধারণত জুন-জুলাই পাট কেনার মোক্ষম সময় হলেও পাট ক্রয়ে সরকারি বরাদ্দ যথাসময়ে আসে না। কেন আসে না সেটি খুঁজে বের করতে হবে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে পাট বিজ্ঞানী মোবারক হোসেন পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিনের বিপরীতে পাট পলিথিন উদ্ভাবনের পরও  কেন তা উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে না সেটিও দেখার বিষয়। কেন পরিকল্পনা কমিশন এটি উৎপাদনে মাত্র ৩ শত কোটি টাকা বিগত ৪ বছরেও বরাদ্দ দেয়নি তার জবাব জানতে হবে।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে একের পর এক পদক্ষেপ নেয়া হয়। প্রয়োজনীয় আইন এবং বিধি প্রনয়ণ করা হয়। গত ৮ বছরে এখাতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। পাটপণ্যকে জনপ্রিয় করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে চরম আন্তরিক। তিনি পাটের শাড়ীসহ পাটজাত দ্রব্য নিজেও ব্যবহার করেন। তার নির্দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয় বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবু সংকট কাটছে না। পাটকল শ্রমিকরা ১১ দফা দাবি আদায়ে অনশন করছে। তাদের দাবি-দাওয়ার মধ্যে আছে অবিকৃত পাট যথাসময়ে চাষীদের কাছ থেকে ক্রয়। ২০১৫ সালে প্যাকেজিং এ্যাক্টের বাস্তবায়ন। মজুরী আইনের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন। নতুন করে ১৭ শত কোটি টাকার ভতূর্কী। বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ। তারা বলছে জাতীয় মজুরী ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ এর অধীনে শিল্প মন্ত্রাণালয়ে অধীনস্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা মজুরী পেলেও পাটকল শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সেটি কার্যকর করা হয়নি। একই সাথে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন ও স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ। বিশ্লেষকরা বলছেন পাটখাত ঘুরে দাঁড়ানোর কাজটি কঠিন নয়। অনুসন্ধান বলছে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পাট শিল্পকে ধ্বংস করে। ৩৫ রকম পণ্য হয় পাট দিয়ে। রপ্তানী হচ্ছে কয়েক হাজার কোটি টাকার পাট পণ্য। পরিবেশ সহায়ক, টেকসই তন্তু আসে পাট থেকে।

’৬৬ সালের ৬ দফায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাটকল শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন- “আমি ৫নং দফায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি। বিশেষত পাট চাষীদের দূর্দশার জন্য দায়ী এই মুদ্রা ব্যবস্থা ও অর্থনীতি।” তিনি বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বারবার পাটকল শ্রমিকদের কথা তুলে ধরেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু সরকার পাট শিল্পকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়। ৭৭টি পাটকল রাষ্ট্রীয়করণ করেন। ’৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ জুটমিল কর্পোরেশন। একই সময়ে আদমজী জুট মিলকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। ’৭৪ সালে পাট আইন এবং গবেষনার জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষনা ইনষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এত কিছুর পরও সরকারি পাটকলগুলো ৮০ দশক থেকে লোকসানে পড়তে শুরু করে। ৭০-এর দশকে পলিথিন ও প্লাস্টিকের থাবার মুখে পড়ে পাটশিল্প। সেটিকে রক্ষায় নানামুখি উদ্যোগ নেয়া হয়। সমন্বয়ের অভাবে বর্তমানে সরকারি ২৮টি পাটকলের অবস্থা নাজুক।  অথচ বেসরকারি ২৭২টি পাটকল লাভজনকভাবে চলছে।

পাকিস্তান আমলে বৈদেশিক মুদ্রার ২/৩ অংশ আসতো পাট থেকে। বাংলার পাট নিয়ে এক সময় পড়ে উঠেছিল স্কটল্যান্ডের ড্যান্ডি। গত শতাব্দীর ৬০ এর দশকে শুধু পূর্ব বাংলায় গড়ে উঠেছিল ৩০টি পাটকল। ঘটনার পরম্পরা অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে – আদমজী জুট মিলের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল ওয়াহিদ আদমজী ছিলেন পাকিস্তানের একজন শিল্পপতি। যদিও তিনি জন্মসূত্রে ছিলেন বার্মার মানুষ। ১৯৫০ সালে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আদমজী জুট মিল। এটি ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল। বলা হতো প্রাচ্যের ড্যান্ডি। ১৯৭২ সালে আদমজী জুট মিলকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। ২০০২ সালে বিএনপি সরকার এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বেকার হয় ২৬ হাজার শ্রমিক কর্মচারী। এসব ঘটনা রূপকথাকেও হার মানাবে। সরকার যথাযথ পদক্ষপে গ্রহণে ব্যর্থ হলে এ শিল্প তার গৌরব হারাবে। এখনই সময় এই শিল্পখাতে সুদৃষ্টি দেয়ার।

নগরে নির্বাচন ও নগর পিতাদের আশার ফুলঝুড়ি!

হাসান জামান টিপু ॥ মতিঝিলে একটা আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড আছে- সন্ধ্যায় প্রচুর যানজট হয়, দেখার কেউ নাই! মতিঝিলে হকার প্রচুর, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নাই – দেখার কেউ নাই! ঢাকায় একটু বৃস্টি হলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় – দেখার কেউ নাই! যানজটে জনজীবন নাকাল – দেখার কেউ নাই! পরিবেশ দুষণের জন্য ঢাকায় বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে – দেখার কেউ নাই!  মশককূলের অত্যাচারে কোন কাজে মন সংযোগ করা দায়- দেখার কেউ নাই! উপরন্ত ডেঙ্গু তো আছেই- দেখার কেউ নাই! ড্রেনগুলি সব ময়লায় ভর্তি, মশককূলের জন্মভূমি – দেখার কেউ নাই! রাস্তাগুলি চলাচলের উপযুক্ত নয় – দেখার কেউ নাই! ঢাকায় কোথাও খেলার জায়গা নাই, খোলা জায়গা নাই – দেখার কেউ নাই! পার্কগুলি অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে দেখার কেউ নাই!

পর্যাপ্ত শৌচাগার নাই! সড়কে পর্যাপ্ত আলো নাই! যথাস্থানে ফুটওভারব্রীজ নাই! ময়লা ফেলানোর নিদিষ্ট স্থান নাই! বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, আদেশ নিষেধ নাই! ফ্লাইওভারগুলির কোন কোনটিতে রাতের বাতি নাই! ট্রেডলাইসেন্সের কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নাই!

চারদিকে শুধু নাই, নাই আর নাই!!!  

আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবো আগামী বছর। এখনও আমাদের রাষ্ট্রকে একটা সরল রৈখিক চরিত্র দিতে পারিনি। সংবিধানের দিকে তাকালে মায়া লাগে। আহারে বাহাত্তরের সংবিধান!! যাক সেসব কথা। আগামী মাসের এক তারিখ ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।

পোষ্টারের শহর হয়ে গেছে ঢাকা। সয়লাব প্রচারে। মাইকিং, মিছিল, যানজট সে এক ভয়াবহ উৎসবমুখর অবস্থা। কিন্তু এখানে কিছু কথা না বললেই নয়।

প্রথম কথা হলো – নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার পরেই সনাতন ধর্মাম্বলীরা গর্জে উঠে। সরস্বতী পূজার দিনে নির্বাচন তারা মানবে না। রাস্তা অবরোধ, আইন-আদালত করার পর নির্বাচন কমিশনের মনে হলো পিছিয়ে দেই একদিন, এতে করে কি হলো এস.এস.সি পরীক্ষা পিছাতে হলো, ঐতিহ্যের বইমেলা পিছাতে হলো। একটা লেজে গোবরে অবস্থা হলো। কেন এমন হলো? এস.এস.সি পরীক্ষা- একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, সবচেয়ে বেশী অংশগ্রহণমূলক পাবলিক পরীক্ষা। নির্বাচনের তারিখ দেয়ার পূর্বে নির্বাচন কমিশনের এই পরীক্ষার্থীদের কথা ভাবা উচিৎ ছিলো না কি? প্রচারের এই ডামাডোলের মধ্যে কি যে অসহ্য অবস্থায় তাদের পরীক্ষার পড়া পড়তে হচ্ছে তা বর্ণনাযোগ্য নয়।

বইমেলা আমাদের বাঙালী চেতনার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সেই বইমেলা পিছাতে হলো নির্বাচন কমিশনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে। নির্বাচন কমিশন কোনদিনও জনগণের স্বার্থকে ততটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি যতটা রাজনীতিক আর ক্ষমতায় যাবার জন্য মুখিয়ে থাকাদের জন্য দেয়, অন্তত অতীত তাই বলে।

সিটি কর্পোরেশন সাধারণ মানুষের স্বার্থে গঠন করা হয়েছে কিন্তু আদতে কতকগুলি সংস্থার কারণে এটি ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। তবু প্রতিবার নির্বাচন আসলে ভালোই লাগে। প্রতিবার আশায় বুক বাঁধি। কিন্তু কোথায় কি? একটু আশার ঝলক দেখিয়ে ছিলেন আনিসুল হক, তার অকাল প্রস্থান আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমানে মেয়র প্রার্থীরা যেভাবে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তাতে স্পষ্টত প্রতিয়মান হচ্ছে তারা তাদের কার্যপরিধি সম্পর্কে কোন ধরণের ধারণা নাই! তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা যানজট কমাবেন তিন মাসের মধ্যে! হকারমুক্ত করবেন! জলজট দূর করবেন! পরিচ্ছন্ন নগরী গড়বেন!

আসলে বাস্তবতায় কতটুকু অর্জন সম্ভব? তাদের নিজস্ব পুলিশ নাই, লোকবল নাই, হাতের উপরে আছে রাজউক, আছে ওয়াসা, আছে পাবলিক হেলথ, স্বাস্থ্য বিভাগ, আছে জেলা প্রশাসন ইত্যাদি। এতোগুলি সংস্থার বেড়াজালে সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররা কতটুকু বন্দী তা প্রথম নির্বাচিত ও প্রয়াত মেয়র হানিফ বলেছিলেন। উনি চেয়েছিলেন স্বাধীনতা, নগরের মালিক হিসাবে নগরের কর্তৃত্ব চেয়েছিলেন কিন্তু কেউ তার কথায় কর্ণপাত করেনি।

কালের পরিক্রমায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দুই ভাগ হয়েছে- উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নামে। উত্তরে মেয়র হিসাবে আসলেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সফল ব্যবসায়ী আনিসুল হক। উনি দেখিয়ে গিয়েছেন করিৎকর্মা লোক কোন বাঁধাই মানে না। স্বদিচ্ছা থাকলে, উদ্যম থাকলে কাজ করা যায়, কোন বাঁধাকেই তখন বাঁধা হিসাবে মনে হয় না। আনিসুল হক গত হওয়ার পর দুই নির্বাচিত মেয়র কেউই কোন উল্লেখযোগ্য কাজ দেখাতে সক্ষম হননি। দক্ষিণের মেয়র এবার নমিনেশন পাননি, আর উত্তরের মেয়র আবার সুযোগ পেয়েছেন। দক্ষিণে এবার লড়ছেন দুই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত দু’জন, উত্তরে যে দু’জন তারা গত নির্বাচনেও প্রতিপক্ষ ছিলেন।

প্রতিশ্রুতির ঘোড়া দু’পক্ষই লাগামহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন যা পুরাপুরিভাবে অন্তসার শূন্য। এই রকম বাচলতাপূর্ণ অবাস্তব প্রতিশ্রুতি আমরা চাই না। আমরা চাই স্টেকহোল্ডার ও বিশিষ্টজনদের কাছে তারা যেন একাডেমিকভাবে তাদের কর্ম পরিকল্পনা তুলে ধরে,তাতে তাদের প্রতিশ্রুতির ফাঁকিঝুকি ধরা পরবে। সাধারণ ভোটাররা তাদের গঠনমূলক কথার গুরুত্ব বিবেচনা করে সঠিক প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারবে।

এভাবেই শুরু হোক রাজধানী ঢাকার নগর পিতাদের গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা। শুভ হোক নির্বাচন।