প্রথম পাতা

ভুল স্বীকার করে ক্ষমাপ্রার্থনার নতুন রাজনীতি সময়ের দাবী

সংলাপ ॥ সাধারণ মানুষরা পারেন না নিজেদের দুর্বলতাগুলোকে বেশি বেশি করে প্রকাশ্যে বলতে। স্বীকার করতে। আমরা কখনোই আলাপচারিতায় নিজেদের সম্পর্কে খারাপ বিশ্লেষণ করি না। আমরা কী বলি যে আমরা স্বার্থপর, আমরা কখনোই সেভাবে সমাজসেবা করিনি কিংবা কাউকে উপকার করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়িনি ইত্যাদি? কখনও বলি না। আমরা নিজেদের সম্পর্কে যেসব দোষের কথা বলি সেগুলো হলো ‘আমার একটাই দোষ, আমি স্পষ্টবক্তা… আমার একটাই দোষ আমি মিথ্যা সহ্য করতে পারি না… আমার একটাই দোষ, আমি মুখোশ পরা লোক পছন্দ করি না’… দেখবেন এরকম কথা আমরা প্রতিনিয়ত বলে থাকি। আসলে এর একটাও দোষ নয়। সবই গুণ। সেটাই প্রচার করতে চাই। কিন্তু বিনয় করে মুখে বলি এগুলো আমাদের দোষ। যাকে বলছি, তার সামনে নিজেকে তুলে ধরার  জন্য আমরা মরিয়া হয়ে উঠে বলি।

আমাদের সবথেকে বেশি সমস্যা হয় প্রকাশ্যে দু’টি কথা বলতে। ১) ‘আমার ভুল হয়েছে কিংবা আমি ভুল করেছি।’ আর ২) ‘আমার ঠিক জানা নেই।’ তাই আমরা প্রথমেই এককথায় ভুল স্বীকারের তুলনায় বরং অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করি-যা বলেছি বা করেছি সেটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মরিয়া হয়ে চেষ্টা করি যে ঠিকই বলেছি বা ঠিকই করেছি। আবার একইভাবে কোনও প্রশ্নের জবাবে চট করে প্রথমেই জানি না বলতেও বাধা আসে। কেউ ফোনে কিছু তথ্য জানতে চাইলে তাকে কথায় ব্যস্ত করে দিয়ে সেই ফাঁকে গুগল বা ইউটিউব দেখি এবং ভাগ্যবশত তথ্যটি পেয়ে গেলে তৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠি সঠিক উত্তরটি এবং মনে করি প্রশ্নকর্তার আমার প্রতি সাংঘাতিক সমীহ বেড়ে গেলো। ঠিক যেমন শহরের রাস্তায় কোনও মানুষ যদি জানতে চান ভাই আসাদ গেট কোন দিকে? আমরা যারা জানি না তাদেরও লজ্জা লজ্জা লাগে একবারে জানি না বলতে। তাই একটা গোলমেলে উত্তর দিয়ে দিই অথবা সামনে হাত দেখিয়ে বলি, আরও সামনে সোজা…। এর প্রধান কারণ অবশ্যই অহং এবং ‘আমি সব জানি’ এরকম একটা ভাব করা।

আমাদের মধ্যে যারা কোন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে আসীন হন অথবা খুব প্রভাবশালী হয়ে যান সমাজে, তাদের একটি বৃহৎ সমস্যা আছে। সেটি হলো নিজের প্রকৃত ওজন বুঝে ওঠা। যেহেতু তিনি প্রভাবশালী, তাই স্বাভাবিকভাবেই কমবেশি সিংহভাগ মানুষই তাকে খুশি করার চেষ্টা করে। তার সব কথায় সায় দেয়। তিনি যা বলেন সেই কথাই সঠিক এরকম একটা ধারণা দেয়ার জন্য প্রাণপণে তাকে বার্তা দেয়া হয়। এই দলে মন্ত্রী, রাজনীতিক, সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদের কর্মকর্তা, কিংবা কোনও গণমাধ্যমের উচ্চপদের কর্মী বা অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দিতে পারা কোনও হাই প্রোফাইল ব্যক্তি, চলচ্চিত্র টিভি তারকা, প্রযোজক, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, বিখ্যাত সাহিত্যিক, পাড়ার কাউন্সিলার…এরকম যে কেউ হতে পারেন।

সমস্যার কারণ হলো এদের পক্ষে বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ে যে আসলে কোনটা সত্যি আর কোনটা ফাঁকি। তাদের পদ ও প্রভাবের কারণে অনবরত হ্যাঁ হ্যাঁ শুনতে শুনতে অনেকের ধারণা হয় আমি সবটাই ঠিক। আমি এতই মহান যে সকলেই আমাকে শ্রদ্ধা করে, আমার কথায় সায় দেয়, অতএব আমি সর্বোৎকৃষ্ট। কিন্তু এর মধ্যে তার নিজের সত্যিকারের ওজন আর উচ্চতাটা কত, আর কতটা  স্রেফ ওই চেয়ার, পদ কিংবা প্রভাবের কারণে তোষামোদ, সেই দু’টি ফারাক করা খুব কঠিন হয়ে যায়। তাই অনেকেই যখন পদে থাকেন তখন দেখেন অবিরত মানুষ যোগাযোগ করছেন, হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুকে গুড মর্নিং, গুড নাইট আসছে, সামান্য কথায় হাজার হাজার মানুষ উচ্ছ্বসিত হয়ে লাইক করছে, কমেন্ট করছে, জ্বর হয়েছে শুনলে শশব্যস্ত হয়ে সকলেই মন খারাপ করে বিশ্রাম নিতে বলছে। তিনি ভাবেন আমি সাংঘাতিক জনপ্রিয়। কিন্তু তিনিই যখন পদ থেকে চলে গিয়ে প্রভাবহীন হয়ে যান, তখন কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন আসলে তার গ্রহণযোগ্যতাটা কতোটা কম অথবা গুরুত্বহীন। ঠিক এসবের কারণে আমাদের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের প্রবল ক্ষমতাবান, শক্তিশালী ভাবতে শুরু করেন এবং তাদের ধারণা হয় আমরা ভুল করলেও স্বীকার করার দরকার নেই। আমাদের সমর্থক বা সাধারণ ভোটাররা তো আমাকে নায়কের মর্যাদা দিয়েই রেখেছে। কাজেই আমি যা বলবো সেটাই ঠিক। কারণ এই তো আমার আশেপাশের সকলে আমার তোষামোদে পঞ্চমুখ, আমার সামান্য সমালোচনা কেউ করে না, আমি যা বলি সব কিছুতেই সকলে একমত হয় এবং বিন্দুমাত্র বিরোধিতা করতে দেখি না কখনও। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধিতার সম্মুখীন না হলে আমরা সকলেই কমবেশি খুব খুশি হই। এইসব নেতা বা প্রভাবশালীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরাও মনে-প্রাণে একই মনোভাবের। তাই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আমরা সবথেকে সেইসব বন্ধু বা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালবাসি যারা আমাদের কথা শুনে বলে, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছো। তোমার কথাই একদম ঠিক।’ এটা শুনলেই আমাদের ভিতরে একটা তৃপ্তি হয়। কিন্তু আমাদের কথার বিরুদ্ধ মতামত যেই প্রদান করা হয় এবং প্রবলভাবে আমার বক্তব্যের সমালোচনা করা হলে ধীরে ধীরে সেইসব মানুষ সম্পর্কে আমাদের ভিতরে একটি বীতরাগ তৈরি হয়। অতটা আর কথা বলতে ভালো লাগে না। বরং হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছো তোমাদের সঙ্গেই বেশি বেশি কথা বলি, সিনেমা নাটক ইকো পার্ক দেখতে যাই। গান, সাহিত্য, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করি। ঠিক এরকম একটি অবস্থায় যেখানে রাজনৈতিক সামাজিক প্রবণতা, ঠিক তখন আচমকা বড়সড় একটা ধাক্কা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। রাজনীতিকদের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি অবস্থান গ্রহণ করে তিনি আচমকা চমকিত করেন আমাদের। তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে রীতিমতো ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে নিজের এবং দলের তাবৎ ভুলগুলো স্বীকার করেন, তা অভিনব।

আওয়ামী লীগ দল, দলের অঙ্গসংগঠন এবং সরকার অত্যন্ত উদ্ধত হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। রাজনীতিকরা কথা বলতে চান না সাধারণ মানুষের সঙ্গে। ফলে মানুষের অভিযোগ, মনোভাব, রাগ, চাহিদা কিছুই জানতে পারেন না। এই সংযোগহীনতা ভবিষ্যতের বাংলা ও বাঙালির রাজনৈতিক ভবিষ্যত নির্ধারণে অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। কারণ একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলে বা দেখলে আমরা বুঝতে পারবো যে রাজনৈতিক দলগুলোর ঔদ্ধত্য আর সংযোগহীনতা কতো মাত্রায় বেড়েছে বা কমেছে, তার অর্থ কী? দলের অবস্থান, ভালোমন্দ, শক্তি দুর্বলতা দলীয় প্রধানরাই ঠিক করবেন। সুতরাং এটা অবশ্যই জাতি এবং দলের কাছে প্রাথমিক দায়বদ্ধতা। দল ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে, অর্থাৎ নিজের যোগ্যতা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে । এই বার্তাটি দিতে যিনি দ্বিচারিতা করবেন সেটা এক অন্যরকম রাজনীতির সৃষ্টি করবে।

প্রবীণ ও তরুণ দুই নেতাদের মধ্যে বিতর্ক ও সম্পর্ক তুঙ্গে উঠছে। তাদের মধ্যে মতান্তর প্রবল আকার ধারণ করছে এটাই গণতন্ত্র। দেশে হিংসা, সাম্প্রদায়িকতা আর অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। স্বীকারোক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একেবারেই নেই। প্রধান প্রতিপক্ষ এবং যিনি ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে চান, তার বিরুদ্ধে অতীতের কুশাসনের অভিযোগ তুলে তাকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করবো, এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

স্বীকারোক্তি আমাদের একটা শিক্ষা। রাজনীতিকরা যখন নিজেদের সবথেকে বড় দুর্বলতাটি প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধা না করবেন, তখন সাধারণ মানুষদেরও নিজেদের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে বলতে অসুবিধা। একটি বড় গাছ পড়ে গেলে একটু তো মাটি কম্পমান হবেই। নিজেদের দলের ঔদ্ধত্য আর মানুষের সঙ্গে সংযোগহীনতাকেই দায়ী করা, এটি একটি সূক্ষ্ম বার্তা। আজকাল যেখানে আমাদের চারপাশে লার্জার দ্যান লাইফের ধাঁচে মহা শক্তিশালী মহানায়ক সুলভ ভাবমূর্তি রচনার একটি প্রবণতা রাজনীতিকদের মধ্যে বিদ্যমান, সেখানে এই পথে হাঁটা অত্যন্ত ঝুঁকির হলেও একটি বিকল্প পথের বার্তা। নেতা সব ঠিক করেন… তার কোনও ভুল হয় না… এরকম একটি প্রচার ক্রমবর্ধমান। ঠিক বিপরীত পথে অত্যন্ত দোষে-গুণে ভরা, ভুল করা, ভুল স্বীকার করা, জনতার কাছে নিজের দুর্বলতাগুলো জানিয়ে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করে তাদের সাহায্য চাওয়ার মতো একটি নতুন রাজনীতি সময়ের দাবী, সেটি কতদূর সফল হবে তা দেশবাসীর কাছে এখনই হয়তো স্পষ্ট নয়। কিন্তু পথটি একটু অন্যরকম এবং উদার। একদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি কোনও ভুল স্বীকার না করার রাজনীতি। আমি যা বলছি তাই-ই ঠিক, এরকম    একটি রাজনীতি। সেই তেজোঃদীপ্ত রাজনীতিতে ক্রমেই আত্মবিশ্বাসের থেকেও বেশি করে যেন ঔদ্ধত্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সকলেই আমাকে সমীহ করছে। সকলেই আমাকে মান্য করছে। আমার সব কথায় হ্যাঁ বলছে। আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে। সেই স্বার্থপূর্ণ পারিপার্শ্বিককেই সত্য ভেবে উদ্ধত হওয়া। কখন বুঝতে পারবেন যে ভুল হয়েছে? যখন ধাক্কা খাবেন। যখন প্রত্যাখ্যাত হবেন। বিপুলভাবে পরাজিত হতে হতে এই বোধোদয় হয়। আগে কিন্তু হয়না।

আজকের শাসকদের কাছেও এটা একটা শিক্ষা। বোধোদয় যেন তখন না হয় যখন দেরি হয়ে গিয়েছে। এখনও চারদিকে অতি আত্মবিশ্বাসের বাতাস বইছে। ভুল সিদ্ধান্তের জেরে প্রান্তিক মানুষের মধ্যে হয়তো ক্ষোভের আগুন দানা বেঁধেছে। কিন্তু চাকচিক্যযুক্ত তোষামোদ আর আলোকোজ্জ্বল জয়ধ্বনিতে কান অভ্যস্ত হয়ে গেলে শাসক কিংবা আমরাও আর বৃত্তের বাইরে কান পাতি না, চোখ রাখি না। রাষ্ট্র তথা শাসক ভাবে সবই ঠিক চলছে। কিন্তু গোপনে, আড়ালে ক্ষোভ জমে মফস্সলের টিমটিমে    চায়ের দোকানে… বাজারের দরাদরিতে… কাগজে আর       টিভি চ্যানেলে রাজনীতিকদের দম্ভভরা ভাষণে…… মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধে…। এভাবেই সুপ্তমনের গুপ্তভাবনায় শুরু হয় শিক্ষা দেয়ার প্রতিজ্ঞা! শাসক জানতে বা বুঝতে পারে না। কারণ আত্মপ্রচারের আলোয় নিজেরই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কান জুড়ে বাজে জয়ধ্বনির বন্দনা। আর মন বুঁদ হয়ে থাকে আত্মতুষ্টিতে। এসব থেকে দূরে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করে অপ্রত্যাশিত পরিণাম!

আদর্শিক রাজনীতি ছেড়ে দেয়াও দুর্নীতি

সময়ের সাফকথা….

আদর্শিক রাজনীতি ছেড়ে দেয়াও দুর্নীতি

শেখ উল্লাস ॥ সম্পূর্ণ  ও সর্বাত্মক একটি আদর্শিক  রাজনৈতিক  চিন্তা  ও চেতনার  ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। আর এই রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাটি হচ্ছে দেশ ও জনগণের সামগ্রিক উন্নয়ন ও কল্যাণ, শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। এজন্য এদেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-যুবক দেশ মাতৃকার স্বাধীনতায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ১৯৭১ সালে। একটি আদর্শিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সেই সংগ্রামে ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর এই রাষ্ট্রকে একটা আদর্শিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড় করিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে সকল মানুষের কাছে অর্থবহ করে তুলতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণি সিং, বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমদ, ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ ও মহিউদ্দিন আহমদ (ন্যাপ নেতা ও পরবর্তী সময়ে বাকশালের মহিউদ্দিন নামেই বেশি পরিচিত) প্রমূখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আজীবন কাজ করে গেছেন। আজ তারা না ফেরার দেশে, কিন্তু এদেশ ও দেশের কল্যাণে রেখে যাওয়া তাদের আদর্শ, কর্ম ও চিন্তা-চেতনা এতটুকু ম্লান হয়নি। তাদের আদর্শ ও চিন্তা-চেতনার ওপর ভর করে দেশটাকে এগিয়ে নেয়াই রাজনৈতিক অঙ্গনের সকলের ব্রত হওয়া উচিত।

কিন্তু সময়ের বিবর্তন ও ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তাদের আদর্শ কতটুকু ধারণ করে চলছেন সেটাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশ এগিয়ে চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে আদর্শিক রাজনীতির পথ অবলম্বনকারীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললে হতাশ হওয়া ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না। গ্রাম-ইউনিয়ন-উপজেলা-জেলা-বিভাগ ও কেন্দ্র – রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর এই সকল স্তরের কমিটিগুলোতে যারা বিভিন্ন পদ-পদবীতে রয়েছেন বা যারা এইসব পদে আসতে চান, ক্ষমতার স্বাদ নিতে চান, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তারা কতটুকু দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন তা প্রশ্নাতীত নয়। এসব বিষয়ে, দেশের সাধারণ মানুষের মুখে সর্বদাই প্রশ্ন শোনা যায়। রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ার সুবাদে যারা এখন আমেরিকা-কানাডা-ইংল্যা-, অষ্ট্রেলিয়া, দুবাই বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে বাড়ি করেছেন, করার চেষ্টায় আছেন, বিদেশে টাকা পাচার করেছেন, তারা এসব কাজে যে সময় ও মেধা অর্থ খরচ করেছেন তাদের পক্ষে দেশকে নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি, নিজ দলের প্রতি, নিজ দায়িত্বের প্রতি তারা কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণি সিং, বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমদ, ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ ও মহিউদ্দিন আহমদ প্রমূখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কখনো কি রাজনীতি করে বিদেশে নিজেদের বাড়ি-ঘর-ব্যবসা বাণিজ্য করার কথা চিন্তা করেছিলেন? তারা কি ব্যক্তিস্বার্থে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টা করেছিলেন? সহজ উত্তর হচ্ছে, তাঁরা কখনো এসব চিন্তাই করেননি। এসব চিন্তা থাকলে তো তাঁরা রাজনীতি করতে আসতেন, জেল খাটতেন না। নিজেদের যে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পারিবারিক ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জায়গা-জমি ছিল তা দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে এই পৃথিবীর সাময়িক জীবন ভালোভাবেই কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন মানবদরদী, স্বাধীনতাকামী ও সমাজসেবক, এক কথায় দেশপ্রেমিক। তাই তাঁরা এদেশের মানুষের শ্রদ্ধার আসনে স্থান লাভ করে আছেন। তাঁদের আদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে ব্যক্তিগত ও কায়েমী স্বার্থ আদায়ে যারা নিজেদের আখের গোছাতে গিয়েছিল তারা ইতিহাসে মীরজাফর-গাদ্দার-রাজাকার-আলবদর-জামায়াত-শান্তি কমিটির লোক ইত্যাদি পরিচয়ে ইতিহাসের ঘৃণিত অবস্থানে পতিত হয়েছে। আদর্শিক রাজনীতির পথ থেকে সরে গিয়েছিল বলেই তাদের এই অবস্থা হয়েছে। এদেশের মাটি ও মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে যারা শুধু মুখে-মুখে বিভিন্ন আদর্শ ও ব্যক্তির কথা মানুষকে শোনাতে চায় তাদেরকে সাধারণ মানুষ ঠিকই চিনেছে। শুধু ঘুষ খাওয়া, সুদ খাওয়া, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করাই দুর্নীতি নয়। আদর্শিক রাজনীতির পথ থেকে দূরে সরে যাওয়াও বড় দুর্নীতি। কারণ, তাদের এই পদস্খলের পরিণতিতে দেশের সার্বিক শিক্ষা-সেবা-সংস্কৃতি-সমাজব্যবস্থা-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তথা সার্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে কুপ্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে আজ দেখা যায়, রাজনৈতিক দল ও নেতাকর্মীর অভাব নেই, প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটধারী মানুষের অভাব নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরের অভাব নেই, ধর্মজীবীদের অভাব নেই, সরকারি-বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য-সুযোগ-সুবিধার অভাব নেই। কিন্তু যা নেই তা হচ্ছে আদর্শিক রাজনীতি ও  মূল্যবোধের চর্চা।

এই প্রেক্ষাপটে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে দেশ ও জাতির কল্যাণে কতটুকু সময় ও শ্রম ব্যয় করছে, তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কতটুকু সমন্বয় তারা রাখতে পারছে আজ সেটাই বিবেচ্য বিষয়। তথ্য প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের অবাধ প্রসারের এই সময়ে মাঝে-মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, কিছু দিন পর পর এক একটা নতুন ইস্যু তৈরি হচ্ছে ও সেটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে, আবার হুট করে অন্য একটা ইস্যু সৃষ্টি করে পুরনো ইস্যুটাকে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে, যে ইস্যুর খবরও কেউ আর নিচ্ছে না।

ইস্যুর রাজনীতির ফাঁদে ফেলে দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করে ফায়দা লুটছে এক শ্রেণীর রাজনীতিজীবি। পত্র-পত্রিকা, টিভি-টকশোতে এ নিয়ে চলে দারুণ ব্যবসা। এই ইস্যুর আড়ালে কত কি যে ঘটে চলেছে তা কয়জন উপলদ্ধি করে? জনগণও ইস্যুর ফাঁদে পড়ে বিবাদ-বিসম্বাদে জড়িয়ে পড়ে। ফলে অহেতুক ইস্যু ভিত্তিক রাজনীতি থেকে দেশ ও জনগণের কোন কল্যাণই হয় না। এর চেয়ে ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশের প্রকৃত বিষয় নিয়ে ইস্যু সৃষ্টি করে জনগণকে আলোচনায় এনে বিষয়টির বাস্তবসম্মত দিক্ নির্দেশনা বের করে আনা সম্ভব। কিন্তু নীতিহীন রাজনীতির যে ভয়াল রূপ দেখা যাচ্ছে তাতে আদর্শ ও মূল্যবোধ বানের জলে খরকুটোর মতো ভেসে বেড়াবে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর রুটি-রুজির প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে ঠিকাদারী ও পরিবহন ব্যবসা। তাদের অনেকের কাছে, ক্ষমতার জন্যই তাদের রাজনীতিতে আসা। ‘ব্যক্তির  চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’-এ কথাটি তারা ভুলে গেছে। তবু আশার কথা হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি চোখে-পড়ার মতো। এদেশের মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই ধৈর্য্যশীল। সবচেয়ে বড় দিকটি হচ্ছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশের ওপর অনাকাঙ্খিত চাপ ও উস্কানী মোকাবেলায় সরকারসহ সর্বস্তরের মানুষ যে ধৈর্য্য ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তা সমগ্র বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আর এক নতুন উচ্চতায় উপনীত হয়েছে।

ইতিহাসের নতুন প্রেক্ষাপটে উপনীত এদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ তাই এখন চায় যারা রাজনীতি ও দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে, যারা ভবিষ্যতে এই দায়িত্বে আসতে চায় তাদের কথায় ও কাজে মিল। আদর্শিক রাজনীতিকে যারা ধারণ ও লালন করবে তারাই শুধু রাজনীতিতে থাকবে। জনসম্পৃক্ততা ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েই কেবল তারা কথা বলবে। শুধু মুখের কথায় নয়, নিজেদেরকে বিশ্বাসঘাতকতা বা মুনাফেকী থেকে মুক্ত রাখার জন্য, দেশ ও জনগণের কথা চিন্তা করে শান্তি ও মঙ্গলের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণই প্রত্যাশা করছে জাতি। রাজনীতিকদের কাছে দেশের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চায় জাতি।

রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিক ধর্র্ম সত্য প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা

সংলাপ ॥ অজ্ঞতার জন্য ধর্ম নিয়ে তর্কের শেষ নেই। ভুল বুঝাবুঝির শেষ নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক সকল ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাব অপরিসীম। ধর্ম মানুষের জীবন চলার পথে এক প্রক্রিয়ার নাম। ধর্মে বিশ্বাস যেমন খুব গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ধর্মচর্চা ও চর্যা করেনা এমন মানুষের জন্যেও ধর্ম সমানভাবে গুরুত্ব বহন করে। ধর্মে বিশ্বাসী এবং ধর্মচর্চায় একনিষ্ঠ মানুষ অন্য মানুষের শুভ কামনা করে, অন্যের প্রতি ভদ্র আচরণ করে এবং নিজে সবদিক থেকে পবিত্র থাকে। রাজনৈতিক ধর্ম ও উগ্রবাদিতা অন্য মানুষের ক্ষতি করে এবং নিজেকে অপবিত্র রাখে। ওই ধর্মাবলম্বীরা মানুষকে ভালোবাসে না এবং অন্য মানুষের ক্ষতি করে।

পৃথিবীতে ভাল-মন্দের বিচার করা কঠিন নয়। এক দেশের আইনে মন্দ বলে যা বলা আছে, তা অন্য দেশের আইনেও মন্দ বলা হয়েছে। মানুষকে হত্যা করা কোন দেশেই ভাল কাজ বলে চিহ্নিত করা হয়নি। যা ভাল তা সকল দেশেই ভাল আর যা মন্দ তা সকল দেশেই মন্দ। ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের দেশগুলোতে ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এসব দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একসময় ধর্মের যে বিশেষ ভূমিকা ছিল তা আজ আর নেই এখন কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি মানুষ আজ এসব দেশে প্রকাশ্যে ধর্মের উগ্রবাদী ভূমিকাকে ঘৃণা করে। এসব মানুষ ধর্মের উগ্রবাদিতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করছে এবং প্রকাশ্যে তা ঘোষণা করছে। এদের সংখ্যাই বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে বেশি।

উন্নত দেশগুলোর বেশিরভাগ মানুষকেই সমাজে পাওয়া যায় পরোপকারী মানুষ হিসেবে। আইন মান্য করা, সত্য বলা, মানুষের ক্ষতি না করা, মানুষ ও জীবকে ভালবাসা, মানবতার এই গুণাবলী উন্নত দেশগুলোর বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান। ধর্মের বাঁধনে বা শাসনে নয় বরং সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেই নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে এসব দেশের মানুষ  কাজ করে যাচ্ছে। মানুষ ও প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসাবে এই মানুষগুলো সামাজিক বিচারে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দাবি করার উপযোগিতা লাভ করেছে। মানুষ ও জীবের সেবা করে এরা ধর্মের মূল কাজটিই সম্পাদন করছে উগ্রবাদী ধর্মকে অস্বীকার করেও। আফ্রিকা, এশিয়া, এবং মধ্যপ্রাচ্যে অনুন্নত এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে  উগ্রবাদী ধর্মের প্রভাব অনেক বেশি। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, এবং ব্যক্তিগত জীবন এখানে পরিচালিত হয় ধর্মীয় মূল্যবোধ ছেড়ে ধর্মের বিধানের অনুকরণে। বেশ কয়েকটি দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় সকল কাজে ইসলাম ধর্মের নামে গোত্রীয় বাদশাহী ধম সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা রাখছে। উন্নত দেশে না হলেও এসব উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশে রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীর জন্য দেশের আইন ও বিধি-বিধানও রচিত হয় বাদশাহী ধর্মের অনুশাসনের উপর লক্ষ্য রেখে। এসব দেশের মূল অংশই ধর্মে অন্ধ বিশ্বাসী, গোঁড়া এবং আনুষ্ঠানিকতায় নিবেদিত। এশিয়া এবং আফ্রিকার কিছু অংশে মূলতঃ মানুষ এবং রাষ্ট্র, পরিবার এবং সমাজ সবকিছুই আবর্তিত হয় রাজনৈতিক ধর্মের অনুপ্রেরণায় এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায়।

রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিকতার ধর্ম সফলতার পরিবর্তে বর্তমান বিশ্বে বিফলতার পরিচয় দিচ্ছে। ওই ধর্ম মানুষকে একত্রিত করার পরিবর্তে বিভক্ত করছে। অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুসারীরা মানবতার বাণীতে ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ এই শ্লোগানে সকলে এক জায়গায় একত্রিত হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকতা ও রাজনৈতিক ধর্মের চাপে অজ্ঞতার কারণে মুসলমান খুঁজছে মুসলমানকে, হিন্দু খুঁজে হিন্দুকে, খ্রীষ্টান সাহায্য করছে খ্রীষ্টানকে এবং বৌদ্ধ এগিয়ে যাচ্ছে বৌদ্ধের অনুসারীদের পাশে। সকল মানুষ এক ও অভিন্ন এবং ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই জীবনাদর্শ শ্রেণীধর্মের আঘাতে হুমকির মুখে। অজ্ঞতার কারণে উগ্রবাদী ধর্মের কাছে বিশ্ব মানবতা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। সকল ধর্মেই উপদেশ, নির্দেশ ও নিষেধ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক উগ্রবাদী শ্রেণীধর্ম মানুষকে বিশালত্বের পরিবর্তে ধর্মীয় মূল্যবোধহীন ধর্মীয় গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টায় রত।

সকল ধর্মে স্রষ্টার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলেও ধর্মীয় মূল্যবোধহীন শ্রেণীধর্মের মানুষ নিজ নিজ ভঙ্গিতে স্রষ্টাকে স্বীকার করছে ও চিহ্নিত করছে। বিতর্কের সুযোগ সৃষ্টি করছে। মূল্যবোধের ধর্ম তাই সকল মানুষকে তার ধর্মীয় চেতনায় এক পতাকাতলে আনয়ন করতে পারছে না। অন্যদিকে দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা মানুষকে ধর্মের বিভিন্নতায় বিভক্ত করার সুযোগ করে দিচ্ছে। ধর্মীয় মানবতার পতাকাতলে পৃথিবীর সকল চৈতন্যশীল মানুষ একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

ধর্মে বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, আস্থাশীল সকল মানুষেরই শুধু একটি পরিচয়ে পৃথিবীতে চিহ্নিত হওয়ার সময় এসেছে এবং সেই পরিচয় হচ্ছে মানুষ-মানবতা। মানবতা মানুষকে নিয়ে, কোন বিশেষ শ্রেণী ধর্মকে নিয়ে নয়। বিশ্ব মানবতায় সকল ধর্মের স্থান সমান।

ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়। ব্যক্তিগতভাবে ধর্মের বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কারও জন্যেই মানবতার পতাকাতলে অবস্থান নিতে কোন সমস্যার সৃষ্টি হয় না। পৃথিবীতে ধর্ম এসেছে সকল মানুষের কল্যাণে, সকল মানুষকে একত্রিত করার জন্যে এবং সকল মানুষকে শৃঙ্খলার জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্যে। হাজার হাজার বছর অতিক্রমের পর আজ অনুধাবনের সময় এসেছে রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিকতার উগ্রবাদী ধর্ম বৃহত্তর মানুষের কল্যাণে সঠিক ভূমিকা রাখতে কতটুকু সমর্থ হচ্ছে তাই নিয়ে।

বর্তমানে উগ্রবাদীরা মানুষকে বিভক্ত করার ভূমিকা গ্রহণ করছে, তাই ধর্মের কারণে মনুষের অখন্ডতা নীতি হুমকির মুখে পড়ছে। ধর্মের মূল্যবোধ বিষয়ে মানুষের স্পষ্ট ধারণা না থাকলে বিশ্বে ধর্ম বিশ্বাসীর সংখ্যা আরও হ্রাস পেতে থাকবে। অন্ধভাবে নয়, ধর্মকে জানতে হবে মূল্যবোধের চর্চা ও চর্যা করে সত্যের ভিত্তিতে। মানুষকে সেবা করার মধ্যেই ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব। বিশ্ব মানবতার স্বার্থে ধর্মের মূল্যবোধগুলোতে আমাদেরকে প্রভাবিত করার জন্য রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিকতার উগ্রবাদী ধর্মের কবল হতে বের হয়ে আসার বিশ্বজুড়ে এখনই সময় নচেৎ মূল্যবোধের ধর্ম-মানবতার ধর্মের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং আরো হবে।

ধর্মের অন্যতম কাজ তার অনুসারীদের সত্যের পথে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা। মানুষে মানুষে হানাহানি, উচ্ছৃংখল জীবনযাপন এবং মানুষের বিভক্তিকরণ রোধ করতেই মানুষ একদিন ধর্মের আশ্রয় নিয়েছিল। অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাতেই আজ সময় এসেছে মূল্যবোধ অনুধাবনের, সময় এসেছে আত্মবিশ্লেষণের-ধর্ম মানবতার জন্য প্রমাণ করতে। রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিকতায় ব্যক্তি স্বার্থের বা গোষ্ঠী স্বার্থের বা উগ্রবাদীতার ধর্ম নয়।

ধর্ম অন্ধ বিশ্বাস নয় বরং আধুনিক বৈজ্ঞানিক সত্যের দিশারী এবং মানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ হিসেবে সকলের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে সামনের দিকে অগ্রসরমান। ধর্ম মানুষের জীবন চলার পথে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ধর্মপরায়ন মানুষ ধর্মকে ব্যক্তি জীবনের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সত্য প্রতিষ্ঠার অস্ত্র হিসাবে গণ্য করুক এটাই সময়ের দাবী।

ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থা

হাসান জামান টিপু ॥ আমাদের রাজধানী শহরের মোট আয়তন আটশত ষোলো স্কয়ার কিলোমিটারের মত যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতিদিন বিশ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকায় প্রবেশ করে, কাজ শেষে আবার চলে যায়। প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রতিদিন গণপরিবহণ ব্যবহার করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকার যানজটে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে, সাথে পুড়ছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়কৃত জ্বালানী তেল, উচ্চহারে অপচয় হচ্ছে আমদানিকৃত প্রতিটি গাড়ী, ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের, অবর্ণনীয় ক্ষতি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের কিন্তু এ ব্যাপারে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। ঢাকার এই বিশৃঙ্খল যানবাহন চলাচলের জন্য কে দায়ী তাও নিরূপিত হয়নি অদ্যবধি। সর্বোপরি ঢাকা শহরের গণপরিবহনের দ্বায়িত্ব কার হাতে সেটাই পরিস্কার নয়। ২০১২ সালে ঢাকা ও আশেপাশের জেলাগুলির সমন্বয়ে একটি ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন-২০১২ নামে একটি আইন করা হয়, যার কোন বাস্তবমূখী প্রয়োগ অদ্যাবধি দৃশ্যমান নয়। গত দুই বৎসর আগে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে বিদ্যালয়ের বাচ্চারা দেখিয়ে দিয়েছিলো ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা কতটা নাজুক এবং সদিচ্ছা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকলে ট্রাফিক ব্যবস্থা কতটা সুশৃঙ্খল করা যায়। অতীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছিলো। বর্তমানে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা যেন ভেঙ্গে পড়েছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ফলে জনগণ বিশ্বাস করেছিলো একটা ব্যাপক পরিবর্তন হবে কিন্তু মোটর সাইকেলে হেলমেটের ব্যবহার ছাড়া অন্য কোন পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। সরকারের আশ্বাস বাস্তবায়িত করার কোন উদ্যোগ কার্যকর করা হয়নি। সমস্যাগুলির মধ্যে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, রাস্তার অপ্রতুলতা, গাড়ীর সংখ্যাধিক্য, ব্যক্তিগত গাড়ীর সংখ্যা, পুরানো ট্রাফিক ব্যবস্থা, গণপরিবহনে সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা, ছোট ছোট গণপরিবাহন, ট্রাফিক রুটের বিন্যাসহীনতা, সমন্বয়হীনতা, চাঁদা, ঘুষ, দূর্নীতি, আইন না মানার সংস্কৃতি, পৌর জ্ঞানের অভাব ও নাগরিক দ্বায়িত্বজ্ঞানহীনতা ইত্যাদিকে প্রাথমিকভাবে যানজটের জন্য চিহ্নিত করা যায়। সরকারের একটি উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো সেটা হলো মেট্রোরেল যা রাজপথের অনেকটাই দখল করে অত্যন্ত ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে। এতো বড় স্থাপনা নির্মাণে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র। তারা যদি একদিক থেকে কাজটা শেষ করে আসতো তাহলে হয়তো যানজট এতোটা অসহনীয় হতো না। এলাকা ভিত্তিক কাজ শেষ করে ক্রমান্বয়ে এগোতে থাকলে যানজট অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব ছিলো। তারপরও মেট্রোরেলের নির্মাণের কারণে রুটগুলি পূণর্বিন্ন্যাস জরুরি ছিলো, এমআরটির ফেন্সিং পাশে অন্ততঃ দুইটি গাড়ী পাস পরতে পারে সে ব্যবস্থা রাখা উচিৎ ছিলো। জরুরী ছিলো ফুটপাতগুলিকে হকারমুক্ত করে নাগরিকদের চলাচলের উপযুক্ত করা, রিক্সার নিয়ন্ত্রণ করা। যেখানে মেট্রোরেলের ল্যান্ডিং ষ্টেশন হচ্ছে সেখানে ভবিষ্যতে তীব্র যানজট হবে সে ভাবনা কেউ ভাবছে কিনা জানিনা। যেহেতু রাস্তা অপ্রতুল, সেহেতু সরকারের উচিৎ গণপরিবহণ সংখ্যা বৃদ্ধি, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, চালক ও তার সহকারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ঘুষ দূর্নীতি বন্ধ করা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, ডিজিটাইজেশন ইত্যাদি। ব্যক্তিগত গাড়ীর ব্যাপারে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন এক পরিবারে এক গাড়ী, অতিরিক্ত গাড়ীর জন্য অতিরিক্ত কর আরোপ, পার্কিং চার্জ বৃদ্ধি, স্কুলে গাড়ীর ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ, নতুন রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ ইত্যাদি। গণ পরিবহনের ক্ষেত্রে মিনিবাসগুলির পরিবর্তে বড় বাস চালু করা, গতির ভিত্তিতে রাস্তা পূনর্বিন্যাস করা, নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী উঠা নামা করা সুনিশ্চিত করা, আইন মানতে নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করা ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ঢাকা শহরের যানজটের কিছুটা হলেও লাঘব হবে। রাজধানী ঢাকাকে যানজট মুক্ত করতে সর্বোচ্চ মহলকে আন্তরিক হতে হবে। সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। একটি রাজধানী শহর এরকমভাবে নিয়ন্ত্রণহীন চলতে পারে না। ইতোমধ্যে আমরা বসবাসের অযোগ্য শহর হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছি যা আমাদের জাতীয়ভাবে লজ্জায় ফেলেছে। আমাদের জিডিপি বৃদ্ধির সাথে সাথে সকল দিকে সমন্বয় সাধন করে এগিয়ে যেতে হবে।

অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য দরকার দশটি বছর

সৈয়দ এ ফয়সাল ॥ কথায় আছে যতক্ষন পর্যন্ত হাতে লাঠি না থাকে ততক্ষন কুকুরকে কিউট ডগি বলে সম্বোধন করাই উত্তম। ব্যাপারটা হল আপনার সক্ষমতা যতটুকু ততটুকু বিবেচনায় নিয়েই চলা উচিত। আর শত্রুর উপর চোখ রাঙ্গানি দেয়ার জন্য ততক্ষন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতা এবং শক্তিতে তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া না যায়। বাংলাদেশকে তো শুরু করতে হয়েছিল শূন্য হাতে তাইনা? এক ডলার রিজার্ভ নিয়ে এই দেশ যাত্রা শুরু করেনি। ছিলনা রাস্তা, সেতু, কালভার্ট। ৭ কোটির দেশে ৯৮% মানুষ ছিল দরিদ্র। সোনার চামচ নিয়ে জন্মেনি কিন্তু সেই বাংলাদেশকে হয়ত ভবিষ্যতে আমরা সোনায় মোড়াতে পারব। বিশ্বের বুকে বুক উঁচিয়ে উচ্চারিত হবে এদেশের নাম। কিন্তু এতই কি সহজ? আমাদের আশেপাশের প্রতিবেশিদের কেউ কি আমাদের ভাল চায়? কখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তাল আবার কখনো বার্মার উস্কানি। বন্যা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত এই দেশে চাল বিক্রি করতেও কত নাটক। কিন্তু আমাদের কি আটকিয়ে রাখতে পেরেছে? নীরবে সগর্বে আমরা এগিয়ে চলেছি। বার্মার সমর শক্তি আমাদের থেকেও বেশি। আক্ষেপের বিষয় বৈকি। কিন্তু যুদ্ধ যুদ্ধ আবেগ ত্যাগ করে এই দেশটাকে মাত্র ১০ টি বছর চলতে দিন। আর মাত্র ১০ টি বছর। প্রশ্ন করতে পারেন কি হবে এই ১০ বছরে? তার আগে কি হয়েছে বিগত ১০ বছরে সেটা একটু পর্যালোচনা করা যাক।

১০ বছর আগে দেশে দারিদ্রের হার ছিল ৪১%। সেটা এখন ২১% এ নেমেছে। হ্যা। ১৭ কোটির দেশে এই ২১% প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। মোটেও কম নয়। কিন্তু ৮ কোটি দরিদ্র মানুষ যখন ছিল তার থেকে অনেক খানি বেরিয়ে এসেছে এই দেশ। ২০০১ সালের পর থেকেও এই দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫% এর থেকে বেশি হয়ে এসেছিল। একি কম অর্জন? এখন দেখি আর ১০ বছর যে লাগবে তাহলে কি পাব এই সময়ে? ১০ বছর আগে বাজেট ছিল ৮৯০০০ কোটি টাকা। ১০ বছর পর ২০১৯ এ এসে সেটা ৬ গুন বেড়ে হয়েছে ৫২৪০০০ কোটি টাকা। ঠিক এভাবে চলতে থাকলে ১০ বছর পর ২০২৯ সালে বাজেট গিয়ে দাড়াবে ৫২৪০০০ কোটি এর ৬ গুন বা ৩১,৪৪,০০০ কোটি টাকা। সেই সময়ে যদি ডলারের রেট $১=৳১০০ হয় তাহলেও $৩১৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট পাশ হবে বাংলাদেশে। বর্তমানে আমাদের জিডিপি $৩১৪ বিলিয়ন ডলার। তখন আমরা বাজেট দিতে পারব $৩১৪ বিলিয়ন। বেশি বেশি করে হিসাব না করি। ধরে নেই বাজেট প্রতিবছর ১৫% করে বাড়বে। সেই হিসাবেও আমাদের বাজেট হবে কমপক্ষে $২১২ বিলিয়ন ডলার। জিডিপি এর দিক থেকে যদি ৮% প্রবৃদ্ধি চলমান থাকে তবে ১০ বছর পর বাংলাদেশের জিডিপি থাকবে $৬৮০ বিলিয়ন ডলার। আর যদি ভিত্তি বছর চেঞ্জ করে ২০১৫ সাল কে বাছাই করা হয় তাহলে জিডিপি প্রায় $৯০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে। উল্লেখ্য আমাদের জিডিপির বর্তমান ভিত্তিবছর ২০০৫ সাল যেখানে মোট ১৫ টা খাতের হিসাব হয়। প্রস্তাবিত ২০১৫ সালকে ভিত্তি বছর করা হলে নতুন ৬ টি খাত যুক্ত হয়ে মোট খাত হবে ২১ টি। ধরে নিচ্ছি ভিত্তি বছর পরিবর্তন হলে জিডিপি ৩০% বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এর বেশিও বাড়তে পারে। তাই খুব বেশি সম্ভাবনা রয়েছে $১০০০ বিলিয়ন বা $১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবার। ১০ বছর পর আমাদের রপ্তানি হবে প্রায় $১৭০ বিলিয়ন ডলার। এটা অনুমান। কারন ইকোনমিক জোনগুলি চালু হলে প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি হবার কথা। সেখানে ১৫% করে ধরাটা খুব বেশি না। ওই সময়ের ভেতর রেমিট্যান্স থেকে আসবে আনুমানিক $৫০ বিলিয়ন। আর সামরিক বাজেট হিসাব করলে জিডিপির ১.৫% সামরিক খাতে ব্যয় করা হলেও $৮০০ বিলিয়নের জিডিপির ১.৫% প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার হয়। অর্থাৎ সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি না করলেও কমপক্ষে ১০ বছর আমাদের এই খাতে বাজেট $১২ বিলিয়ন ডলার হয়ে যাবে। এখানে যে অনুমানগুলি করেছি সেগুলি বিগত ১০ বছরের তথ্যের ভিত্তিতে ফোরকাস্টিং। বাস্তবে কতটুকু হবে সেটা আমরা সবাই বুঝব ১০ বছর পর। আমাদের প্রতিবেশি বার্মার জিডিপি তখন হবে $১৭০ বিলিয়ন। অর্থাৎ আমাদের বাজেট ওদের জিডিপি থেকেও বেশি হবে। এই ১০ বছরে যদি সব কিছু ঠিক থাকে তবে পদ্মা সেতু, ইকোনমিক জোন, পায়রা বন্দর, মাতারবাড়ি বন্দর, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি বিদ্যুৎ, পরমাণু বিদ্যুৎ, সব প্রধান সড়ক ৪ লেন, মেট্রোরেল, সম্ভব হলে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, যমুনা রেল সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, হাই স্পীড ট্রেনের মত প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। আর এগুলো হলে ধারণার চেয়েও দ্রুত গতি পাবে অর্থনীতি। তবে সব কিছু নির্ভর করছে দূর্নীতি হ্রাস, দ্রুত প্রকল্প শুরু করা, এবং সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের উপর। যদি বড় কোন সঙ্কট না ঘটে এবং আল্লাহর রহমত থাকে তবে ১০ বছর পর আমাদের অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের বৃহৎ ২০ টা অর্থনীতি এ-২০ এর ভেতর প্রবেশের পথ আরো সহজ হবে। এত বিশাল বাজারের লোভ বিশ্বের কোন কোম্পানি বা দেশ হাতছাড়া করতে চাইবে না। বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু কেউ কেউ যদি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠে উপরের সব স্বপ্ন জলে ভেসে যাবে। তাই আমাদের দরকার আর মাত্র ১০ টি বছর। প্রমাণ করার জন্য, যে আমরাও পারি। উপযুক্ত জবাব দিয়ে দেয়া যাবে তখন। কিন্তু নিজের ভিত আরেকটু শক্ত করে নেয়াই হবে এখন বুদ্ধিমানের কাজ। যারা টিটকারি করে এদেশ নিয়ে তাদের সমুচিত জবাব দেবার ক্ষমতা তখন আমাদের থাকবে আর আমরা সেদিকেই ধাবমান।

বাঙালির ঈমানী শক্তি আর মনুষ্যত্বের জয়!

শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ ॥ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসা মুক্তিবাহিনীর এক সমাবেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবেগাপ্লুত একটি ভাষণ যা ফেসবুক-এর কল্যাণে এখন ভাইরাল হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ওই আবেগাপ্লুত ভাষণে তৎকালীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দুর্বিসহ অবস্থা ছাড়াও পাকিস্তানীদের বর্বরতার চিত্র এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে মুক্তিযোদ্ধাদের করণীয় ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা গভীর মর্মবেদনার সঙ্গে ফুটে উঠেছিল। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলছেন-‘টাকা নাই, পয়সা নাই, চাল নাই, ডাইল নাই, রাস্তা নাই, রেল ভেঙ্গে দিয়ে গেছে, স-অব শেষ করে দিয়ে গেছে ওই ফেরাউনের দল, সব শেষ করে দিয়ে গেছে (পাকিস্তানীদেরকে লক্ষ্য করে)। কিন্ত আছে আমার মানুষের একতা, আছে তাদের ঈমান, আছে তাদের শক্তি । এই মনুষ্য শক্তি নিয়েই এই বাংলাকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাই। তোমাদের কাছে আমি চাই, যুদ্ধ যদি আরও দু’মাস কি তিন মাস লাগতো স্বাধীন হতে, তবে তোমরা কি যুদ্ধ করতা না ? যদি এক বছর লাগতো তবে তোমরা কি যুদ্ধ করতা না, না খেয়ে কষ্ট করতা না? তোমরা শত্রুর মোকাবেলা করতা না ? (উত্তরে করতাম) গুলি খেয়ে মরতা না? (উত্তরে মরতাম)। এই এক বছর তোমাদের সর্বস্ব ত্যাগ করে আমার দেশের গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ তোমাদের করতে হবে। করবা? (উত্তরে করবো) .. রাস্তা তোমাদের নিজেদের করতে হবে। ব্রিজ তোমাদের নিজেদের করতে হবে। ফসল উৎপাদন তোমাদের করতে হবে। গ্রামে গ্রামে তোমাদের কাজ করতে হবে। শান্তি-শৃঙ্খলা তোমাদের এরিয়াতে তোমাদের রাখতে হবে। করবা?..(উত্তরে করবো)। তখন হাসি মুখে বললেন, ‘আমি জানি তোমরা করবা? যখন আমি ছিলাম না তখন যখন আমার কথামতো তোমরা করেছো, নিশ্চয়ই করবা। এ বিশ্বাস না থাকলে আমি বাঁচতে পারতাম না। আর তোমরা যদি  আমার সংগ্রাম না করতা, তাহলে বোধ হয় আমি গণবাহিনী, মুজিববাহিনী, আমার আওয়ামী লীগের কর্মীরা আর সমস্ত দল যারা আমাকে সমর্থন করেছেন সেই সমস্ত দলের কমীরা যদি সমর্থন না করতেন বোধ হয় পাকিস্তান থেকে আমি আসতে পারতাম না’।

জাতির পিতার মুখ থেকে বের হওয়া ‘টাকা নাই, পয়সা নাই, চাল নাই, ডাইল নাই, রাস্তা নাই’-এসব কথা থেকে বোঝা যায় দেশের, মানুষের ঘরে ঘরে কী অবস্থা ছিল সেদিন। আবার এই অবস্থার মধ্যেই তিনি বলে উঠেছিলেন, ‘আছে আমার মানুষের একতা, আছে তাদের ঈমান, আছে তাদের শক্তি। এই মনুষ্য শক্তি নিয়েই এই বাংলাকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাই’। নিজের দেশ, দেশের মানুষ ও নিজের দলের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা ছিলো বলেই ঈমানী শক্তি দিয়ে, মনুষ্য শক্তি দিয়ে দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন যা আজ তাঁরই সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে  দেশ নতুন করে গড়ে উঠছে।

স্বাধীনতার পর পর যে-দেশে চাল-ডালের সংস্থান করা কঠিন ছিল সে-দেশ আজ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিকভাবে কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা এক গভীর চিন্তা ও উপলব্ধির বিষয়। বাংলাদেশ আজ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মহানির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার বাস্তবতা দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি, অর্থভাণ্ডার আজ কত বড় আকারে উপনীত হয়েছে তার সর্বশেষ একটি চিত্র ফুটে উঠেছে গত ২ সেপ্টেম্বর সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত ও খসড়া হিসেবে অনুমোদিত একটি আইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইনান্সিং কর্পোরেশনসহ স্বশাসিত ৬৮ সংস্থার ২ লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয়  কোষাগারে যাচ্ছে। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।

বিপুল অঙ্কের এই অর্থ ‘অলস’ হিসেবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে। এই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইনান্সিয়াল কর্পোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন ২০১৯’এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আইনটি চূড়ান্ত হলে ওইসব স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়সহ প্রয়োজনীয় টাকা রেখে বাকি টাকা সরকারের কোষাগারে জমা নেয়া হবে। এই টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট হিসাবে আছে। এই টাকাগুলো কোনো ভালো কাজে ইনভেস্ট হচ্ছে না। এই জন্য সরকারের পলিসি হল, নতুন আইনের মাধ্যমে কিছু প্রভিশন রেখে বাকি টাকা সরকারি কোষাগারে নিয়ে আসা। আমাদের অনেক প্রজেক্ট আছে, জনকল্যাণমূলক কাজ, যেগুলো আর্থিক সংকটের কারণে ফাইনান্স করা যায় না, সেখানে এসব টাকা ব্যয় করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এ সব সংস্থা চালাতে যে খরচ হয় এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরে যে অর্থ লাগে, তা তাদের নিজস্ব তহবিলে জমা রাখা হবে। তাছাড়া আপদকালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য পরিচালন ব্যয়ের আরও ২৫ শতাংশ অর্থ এসব সংস্থা সংরক্ষণ করতে পারবে। এরপর যে অর্থ বাকি থাকবে, সেটা সরকারের কোষাগারে জমা দেবে। অর্থাৎ, ওনাদের বিপদে ফেলা হবে না, ওনাদের প্রয়োজনীয় অর্থ রেখে বাকিটা দেবে। এটা হচ্ছে, ওনাদের যে আইডেল মানি আছে, তা সরকারের ইনভেস্টমেন্টে কাজে লাগানো। আইনি অধিকারও ক্ষুন্ন করা হয়নি, ওনাদের যে টাকার প্রয়োজন হয়, তাতো সরকার দিচ্ছে। পরিচালন ব্যয় হিসেবে কোন সংস্থা কত টাকা রাখবে, তা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে’।

মন্ত্রিসভায় এই আইনের খসড়া অনুমোদন হওয়ার মধ্য দিয়ে এদেশে আবারও এ সত্যই প্রকাশিত ও প্রমাণিত হলো যে, বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের মধ্যে যে ঈমানী ও মনুষ্যত্বের শক্তি দেখেছিলেন তারই পথ ধরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। পাকিস্তানী ফেরাউন আর তাদের এদেশীয় বেঈমান ও আন্তর্জাতিক দোসররা বাংলাদেশকে যতই অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করুক, তাদের সে অপচেষ্টা কখনো সফল হয়নি, হবে না। এই ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, এর আগে ‘দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিয়েছে, জাতীয় ৪ নেতাসহ অনেক বীর বাঙালিকে হত্যা করেছে, দেশটাকে পাকিস্তান বানাবার চেষ্টাও করেছে, কিন্তু পারেনি। পারবেও না কখনো। বরং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এখন বিশ্বের সেরা ১০ জন প্রধানমন্ত্রীর একজন হিসেবে বিশ্ব পরিম-লে স্থান করে নিয়েছেন। তবে নব্য আওয়ামী লীগার আর দুর্নীতিবাজ, দুষ্টচক্র যেন  ‘ফেরাউন’দের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের সকল উন্নতি ও অগ্রগতির পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে দেশ পরিচালনার দায়িত্বশীল মহল কতটুকু  সতর্ক, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ। কারণ, এই দুষ্টচক্র ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। স্বাধীনতার সুফল যাতে সমগ্র বাঙালির ঘরে ঘরে না পৌঁছতে পারে , সেজন্য এই চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে বাঙালির ঈমানী ও মনুষ্যত্বের শক্তিকে গ্রাস করতে চায়। এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক থেকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের সকল সম্পদকে কাজে লাগানোর কৃতিত্বের ওপরই নিহিত সকল অগ্রগতি।

সময়ের সাফ কথা…. জাতি কঠিন সময় পার করছে!

সত্যব্রতী ॥ চারিদিকে অসংখ্য পোষ্টার-ব্যানার। অফিস আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, পাড়ায় মহল্লায়। রাজধানী ঢাকা কিংবা দূরের মফস্বলের কোন অজপাড়া গায়ে কেবলই সেসব পোষ্টারে নেতা নেত্রীর ছবি আর নানান কথামালা। দেশ ছড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে বাঙালিরা আছে প্রায় সর্বত্রই। ফেসবুকে নানান রঙে নানা সম্ভাষণে মহান নেতার গুণকীর্তন। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে হাজারো কাব্য কথায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের গুণকীর্তনে ভরা রঙ বাহারী পোষ্টার। এ যেন পোষ্টারের নগরী। আজকাল স্কুল পরিচালনা পর্ষদ, বাজার কমিটি, মসজিদ কমিটির নির্বাচনেও হরেক রকম পোষ্টার ব্যানার। কত আপ্তবাক্য, কত মনীষীর বাণী, কত কোটেশন, কত সমৃদ্ধির জয়গান। তবু মনে হয় যেন জাতির জনকের আদর্শ, দেশরতœ শেখ হাসিনার দেখানো পথে কেউ নেই। কেউ কেউ হয়তো আছে তারা চুপচাপ পোষ্টারে ব্যানারে তাদের দেখা মেলে না। এ এক দারুণ খরা, মড়ক লাগা রাজনীতি।

টেলিভিশনে পত্রিকার পাতায় অনলাইনে হরহামেশাই জাতির জনকের কথা, দেশরত্ন শেখ হাসিনার কথা। কিন্তু যারা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে, যারা সরকার পরিচালনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত, যারা জনপ্রতিনিধি তাদের ক’জন বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন জাতির জনকের আদর্শ ধারন লালন পালন করে পথ চলছেন? তারা ক’জন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা উপদেশ পরামর্শ দিকনির্দেশনা মেনে চলছেন? তারা ক’জন বলতে পারবেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মানে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন? তারা ক’জন নিজেদের আমলনামাকে স্বচ্ছ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। তারা হয়তো বলবেন এটা ২০১৯ সাল। এখন সময়টা অন্যরকম। এখন আদর্শের ধারণাও পাল্টে গেছে। তাদেরকে বলবো সময়টা অন্য রকম বলতে কোন রকম! দয়া করে বলবেন?

জাতির জনকের দিকনির্দেশনা উপেক্ষার শত শত দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। তিনি তো এমন বর্ণচোরা লুটেরা অজ্ঞ অশোভন চাননি। তিনি তো জনগণের উপর জগদ্দলের পাথরের মতো চেপে বসার রাজনীতি করেননি। তিনি সাধারণ মানুষের ভালবাসা, সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সারাজীবন কাজ করেছেন। কিছু লুটেরা তৈরী করা তো তাঁর কাজ ছিল না। তাঁর প্রতিটি ভাষনে লুটেরা ঘাতক বর্ণচোরা ব্যক্তিদের ক্ষমতাকেই তিনি নির্মূল করতে চেয়েছেন। নামেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছি বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে।

বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী প্রধানমন্ত্রীর নাম শেখ হাসিনা। তিনি দিন রাত পরিশ্রম করে একটি দেশকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে দারুণ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। দারিদ্র কমেছে, শিক্ষা হার বেড়েছে। সামাজিক সূচকে নিরাপদ হয়েছে নারী শিশুর জীবন। সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে আনা হয়েছে বিধবা, বৃদ্ধ হত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। বড় বড় বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে॥ ছিটমহল সমস্যা, সাগরে জলসীমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার। উল্লেখ করার মত বহু মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পথে। তারপরেও জনজীবন কি নিরাপদ হয়েছে, সামাজিক সংকট কি কেটেছে, বিভেদ – বিভাজন কি কমেছে!!! সংঘাতময় অবস্থা কি কেটে গেছে? দেশ বিরোধী সংস্কৃতি বিরোধী তৎপরতা কি কমে গেছে? যাদেরকে সাথে নিয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা একটি উন্নত সমৃদ্ধ জাতি গঠনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আজ তারাই নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। জনগণের সাথে সীমাহীন প্রতারণা করছে, দূরত্ব বেড়েছে। যে ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মানুষের আশা ভরসার স্থল হয়েছে বারবার তা আজ খোদ নিজ দলের সব পর্যায়ের নেতা কর্মীরাই ভুলুন্ঠিত করছে অবজ্ঞা করছে।

মাঠ পর্যায়ে তোলাবাজ লুটেরা অজ্ঞ নেতাদের কারণে ডুবে যেতে বসে বাঙালির সম্ভাবনার জয়রথ। এই তরী কোন পথে কোন দিকে যাবে? কাদের সহযোগিতায় কাদের শক্তিতে পার হবে এই বৈরী পথ তা আজ কঠিন এক দুর্যোগে পড়েছে।

এ কোন সকাল, রাতের চেয়ে অন্ধকার!

নজরুল ইশতিয়াক ॥ দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনীতির মান তলানীতে ঠেকেছে বহু আগেই। সেই তলানী ছিদ্র হয়ে বর্তমানে রাজনীতি কোথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেটিই দেখার বিষয়। সত্য বলেও তেমন একটা লাভ হয়না। কেননা সত্য দর্শন এবং উপলব্ধির বিষয়। দেশ পরিচালনার সাথে যারা সম্পৃক্ত তারা যদি উপলব্ধি না করতে পারেন তবে আখেরে তার জন্য চরম খেসারত দিতেই হয় পুরো দেশকে। খারাপের বিপর্যয়ের একটা মাত্রা আছে, সেই মাত্রায় পৌঁছালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি ভেঙে পড়ে এবং পরিণতি যা হবার তা-ই হয়।

বর্তমানে দেশে রাজনীতি কিংবা জননীতির সার্বিক চিত্র একটা অসহায় অবস্থা প্রকাশ করে বরং জনগণের যন্ত্রণা সীমাহীন হয়ে পড়েছে। নাভিশ্বাস উঠছে সর্বত্র। কি নাগরিক জীবনে, কি দূরের মফস্বলের জীবনে। চরম অস্থিরতা উদ্বিগ্নতা সর্বোপরি চরম বিকৃতির জোয়ারে ভাসছে তরুণ প্রজন্ম। এখন পদ, পদবী, সংগঠন, কবিতা, গান, গল্প, যোগাযোগ, কমেন্টস, আড্ডাবাজী সবই কোন না কোন ভাবে টাকা পয়সা রোজগারের জন্য। কিছু ভূঁইফোড় বুদ্ধিজীবী কেবল তথ্য মুখস্ত শিক্ষা, কেবল সুদর্শন চেহারাকেই সুচক ধরে বলছে তরুণরা এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রযুক্তিজ্বরে হয়তো তাৎক্ষণিক হিসেব টা মেলানো যাচ্ছে না। হয়তো ডিজিটাল বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শ্লোগানের জোরে উপলব্ধির জায়গাটিই হয়তো ভোতা হয়ে এসেছে তবু পর্যবেক্ষণ বলছে ভিতরে ভিতরে ক্ষত প্রকট হচ্ছে। যার ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। এমনকি আজকাল ওয়াজ নসিহতে প্রযুক্তির ব্যবহার, বায়না-যোগাযোগ, পরামর্শ ব্যবসাও চলছে জোরেসোরে। গ্যাং কালচার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। গ্যাং কালচারের সাথে স্থানীয় নেতাদের সম্পর্কের বিষয়টি তো ওপেন সিক্রেট। এসব গ্যাং রাজনীতিকদের মাঠ ঘাট পথ পন্থার পাহারাদার হয়ে কাজ করে। আরো সহজ করে বললে লুটপাটের পাহারাদার। এর বিনিময়ে এরা নিজেরা বাইক মোবাইল সহ হাত খরচের টাকা পায়। এদের কাজ তোলাবাজী করা, দখল করা, ইভটিজিং করা সর্বোপরি নেশাদ্রব্য বিক্রি করা। রাজধানী ঢাকার জীবন যাত্রার পুরোটাই কোন না কোনভাবে গ্যাং কালচারে মোড়া। নেতার পক্ষে শ্লোগান দেয়া, নেতার কর্মকান্ডে শো ডাউন করাও এদেরই কাজ। গ্যাং কালচার বিশাল একটি অর্থনৈতিক নেটওয়াক।

ফলে পুলিশের পক্ষ থেকে যখন গ্যাং নিমূর্লের ঘোষণা দেয়া হয় তখন তা লোক দেখানো বাকোয়াজী বলেই মনে হয়। বরগুনা হত্যাকান্ড গ্যাং কালচারের ভয়াবহতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। মোড়ে মোড়ে আড্ডাবাজীর নেপথ্যে বিশাল একটি জগত কিংবা দেশের মধ্যে আরেকটি দেশ হলো গ্যাং জগত। আমরা একটু গভীরে গেলে দেখবো মসজিদ মাদ্রাসা ওয়াজ নসিহত ভিত্তিক অর্থনীতির নেপথ্যেও একটি গ্যাং ব্যবস্থাপনা জড়িত।

অথচ শিল্প সংস্কৃতির চর্চায়, সাহিত্য সৃজনশীল উদ্ভাবনী চর্চার ক্ষেত্রে যে তারুণ্যের জাগরণ জরুরী ছিল সেখানে দারুণ নীরবতা, দারুণ খরা চোখে পড়ে।

ছাত্র রাজনীতিতে যে জ্ঞানের চর্চা ছিল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেগুলো হারিয়ে গেছে। মাঠে ঘাটে শিক্ষাঙ্গন গুলোতে সৃজনশীল চর্চার নামে সীমাহীন বেলেল্লাপনা কিংবা বাজারীপনাও সবকিছু ছাপিয়ে চোখে পড়ে। এ যেন গভীর অন্ধকার। শিল্পীর ভাষায়- এ কোন সকাল রাতের চেয়ে অন্ধকার! এখন ছাত্র নেতারা দুপুরে ঘুম থেকে উঠে, আলিশান বাড়ীতে থাকে। সারা রাত কি করে, কি নিয়ে থাকে। এখন কর্মীরা নেতার বাসা পাহারা দেয়, ফরমায়েস খাটে। দলের নেতারা কেবল ছুটাছুটি করে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে। সংসার বিদেশে, সম্পদ বিদেশে অথচ দেশের মানুষের ভাগ্য বদলের কথা বলে। মসজিদের ঈমাম সাহেব সুদে টাকা খাটায় অথচ খোতবায় সুদের বিরুদ্ধে কথা বলে। শিক্ষকরা মহান মানুষের কথা বলে অথচ নিজেরা রাতের পর রাত তেলবাজীতে সময় ব্যয় করে। এই অসহায় ক্ষেপে উঠা সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা সামাল দিতে পারবো তো?

অনগ্রসর মানুষদের এগিয়ে নিতে

হাসানুজ্জামান টিপু ॥ আমি প্রায়শই ঢাকার বাইরে যাই। মানুষের আচার আচরণ প্রত্যক্ষ করি। মানুষের সাথে কথা বলি। তারা কেমন আছে জানার চেষ্টা করি। অনেকেই মন খুলে কথা বলতে চায় না। অনেকে আবার খুবই আন্তরিকভাবে কথা বলে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বরাবরই বেশী। তারা চায়ের স্টলে বসে দেশ নিয়ে অনেক কথা বলে। সব কথা যে গুরুত্বপূর্ণ তাও না, তবে মাঝে মাঝে তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলেন। সাধারণ জনতার মাঝে বঙ্গবন্ধুর জয়প্রিয়তা বেশ বেড়েছে। সব বয়সের মানুষের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসীম ভালোবাসা। বর্তমান সরকার সম্পর্কে মানুষের প্রতিক্রিয়া অনেকটাই মিশ্র। তবে বালিশ, পর্দা ইত্যাদি নিয়ে মানুষ বেশ হতাশায় আছে। হতাশায় আছে মাদ্রাসা শিক্ষক, ধর্মীয় শিক্ষকদের সাম্প্রতিক স্খলন নিয়ে। গ্রামের সাংস্কৃতিক চিত্র পুরো পাল্টে গেছে। বর্তমানে যে সকল পরিবর্তন হয়েছে তা সমাজ গবেষকদের চিন্তার খোড়াক যোগাবে। দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরণের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, একজন মানুষ এসে সব ঠিক করে দিবে এরকম অপ্রত্যাশিত চিন্তা মানুষের মাঝে কাজ করে। কেন কাজ করে? বিকেলবেলা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামে কোন খেলাধূলার চর্চা নাই, পাঠাগার নাই, বিনোদন নাই, সেই হুক্কা কেন্দ্রিক আড্ডা নাই। আগে গ্রামে গ্রামে নাটক হতো, জারিসারি গান হতো, গাজীকালুর কিসসা ইত্যাদি হতো, নতুন করে কিছু হয় না। কেউ ভাবেও না। বিকেলবেলা প্রতিটি চায়ের দোকানে চলে তামিল সিনেমা সহ ভারতীয় সব চ্যানেল।

আমি কোথাও বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল চলতে দেখি নাই। তবে কিছু ঔষধের দোকানে ছোট টিভিতে চলে দেশী চ্যানেল। প্রতিটি চায়ের দোকানের অতি উচ্চ আওয়াজে বেশ বড় বড় টিভি চলে। যার টিভি যত বড় লোক সমাগম সেখানেই বেশী। যার দোকানে টিভি নাই তার দোকানে কাষ্টমার তেমন নাই। এই যে গ্রামের নিত্যদিনকার এই চিত্র তা সামাজিক জীবনে বিশেষ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। মানুষ চেষ্টা করছে বাস্তবে টিভির জীবন প্রতিফলিত হচ্ছে। তারা তা স্বীকারও করছে। ফলে কমছে সামাজিক মূল্যবোধ, বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা ও আইন অমান্য করার মতো ঘটনা। মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে এতে সামাজিক শৃংখলা ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদেশের টিভিতে দেখা ভীনদেশী সংস্কৃতি ও সমস্যাগুলি সে তার সমাজের প্রতিফলিত করছে। তার মূল কারণ হলো মানুষের সামনে কোন বিকল্প নাই। দেশী টেলিভিশন চ্যানেলগুলির আলাদা কোন অনুষ্ঠান নাই। টিভির লোগোগুলি উঠিয়ে দিলে আলাদা করে বুঝার উপায় নাই কোনটা কোন চ্যানেল। কারো কোন স্বকীয়তা নাই। কোন অনুষ্ঠানে কোন নতুনত্বের স্বাদ নাই, সর্বত্র বৈচিত্র্যহীনতা, অনূকরণ প্রবণতা। গ্রামীন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে একটা স্থবিরতা ভর করেছে। এখন আগের মতো উৎসাহী তরুণরা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের আয়োজক হয় না। পাড়ায় পাড়ায় যে সুস্থ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ছিলো তা এখন তলানীতে ঠেকেছে। কোন পর্যায়ে কোন পৃষ্ঠপোষকতা আছে বলে মনে হয় না। সবকিছু কেমন যেন অচল স্থবিরতায় পেয়ে বসেছে। রাষ্ট্রের সমস্ত মনোযোগ যেখানে অবকাঠামোগত উন্নায়ন সেখানে মানুষের আতিœক, মনো-দৈহিক উন্নয়ন উপেক্ষা করে বিকলাঙ্গ জাতিতে আমরা পরিণত হচ্ছি কিনা তা ভেবে দেখার সময় হয়েছে। রাষ্ট্রকে গভীরভাবে ভাবতে হবে আমার আপন সাংস্কৃতিক শিকড়কে কিভাবে বিকশিত করে, সংস্কৃতিকে এমন একটা মহিরুহ করে গড়ে তোলা যাতে ভিন্ন সংস্কৃতির আগাছা এখানে জন্ম না নেয়। বাঙালীর ঐতিহ্যকে লালন না করলে মানুষের জাতিসত্ত্বা যে সংকটে পড়বে তা অবধারিত। মানুষকে সঠিকধারায় আনতে হলে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই। ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণ ঘটাতে হবে, সর্বস্তরের মানুষের মধ্য এই বোধকেই জাগ্রত করতে হবে যে, আমি বাঙালী। আমার আত্মপরিচয় আছে। আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। বাঙালী হিসাবেই নিজেকে তৈরী করতে করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বাংলার শিক্ষিত সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। অগ্রসর মানুষগুলিই পারে অনগ্রসর মানুষদের চিন্তা, চেতনা বিনির্মানে সহযোগিতা করতে। সকল মানুষের অংশগ্রহণে বাঙালীর জয় হোক, বাঙালিত্বের জয় হোক।

ভারতের বাংলাদেশ বাজার দখল !

সৈয়দ এ ফয়সাল ॥ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটা কথা খুব চালু হয়েছে, তা হলো ভারত বাংলাদেশের বাজার দখল করে বসে আছে। সঠিক তথ্য-প্রমান অনুসন্ধান করলে বুঝা যায় কথাটা একইসাথে সত্য এবং মিথ্যা উভয়ই। পৃথিবীর যেকোন দেশ চায় তার পণ্যের জন্য বিদেশে বাজার খুঁজতে। সে নিয়মে ভারতও তাই করে, বাংলাদেশও তাই করে। তবে একটা স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে আমদানী কমিয়ে রপ্তানি বাড়াতে হবে, স্বাবলম্বী হতে হবে এবং ডাইভারসিফাই করতে হবে। বাস্তবতা হলো এই ব্যাপারগুলো বাংলাদেশের মানুষ সাধারণতঃ বিপদে পড়ে শেখে। যেমন,

১। বাংলাদেশের সকল ইট ভাটায় একসময় কাঠ পোড়ানো হতো। পরিবেশের কথা চিন্তা করে সরকার সিদ্ধান্ত নিলো যে এখন থেকে শুধু কয়লা আর গ্যাস পুড়িয়ে ইট বানানো যাবে। যেহেতু ভারতের আসাম এবং মেঘালয় আমাদের খুবই কাছে, সেহেতু সিলেটের ডাউকি বর্ডার দিয়ে কয়লা আমদানী শুরু হলো। ভারতীয়রা যখন এই ব্যবসা পেলো, তখন তারাও একটা চালাকি করলো। হঠাৎ এক বছর ভারতের রপ্তানীকারকরা সিন্ডিকেট করে বাংলাদেশে কয়লা পাঠানো কমিয়ে দিলো। ফল কি দাঁড়ালো ? বাংলাদেশে কয়লার দাম হুহু করে কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। ফলে ইটের দামও বেড়ে গেলো। তাতে করে বাড়ি বানানোর খরচ প্রায় দেড়গুণ বেড়ে গেলো। এই ঘটনা প্রায় ১২-১৩ বছর আগের। আকস্মিক ঠেকায় পড়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা কি করলো? তারা ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়লা আমদানী শুরু করলো। এসব কয়লা আরো উন্নতমানের এবং বার্ন রেট বেশি। মানে অল্প কয়লাতে বেশি আগুন হয়। এই ঘটনার দুই বছরের মধ্যে ভারতীয়দের মাথায় হাত! কারণ তারা বাংলাদেশের পুরা বাজার হারালো। এতে বাংলাদেশের কি লাভ হলো? বাংলাদেশ যেহেতু সেভাবে কয়লা উত্তোলন করে না, তাই কয়লার সোর্স ডাইভারসিফাই হয়ে গেলো। এখন আর সস্তার কয়লা ভারত থেকে বেশি দামে কিনতে হয় না। এটা ছিলো বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে একটা স্ট্র্যাটেজিক পদক্ষেপ। বাংলাদেশের কয়লার বাজার চিরতরে হারালো ভারত।

২। বাংলাদেশে একসময় ভারত থেকে প্রচুর গরু আসতো। আপনারা জানেন যে মোদি ক্ষমতায় এসে এসব বন্ধ করে দিলো। ফলাফল কি দাঁড়ালো? তখন বাংলাদেশের কোরবানীর বাজার এবং চামড়া শিল্পে হাহাকার! কিন্তু তখনই বাংলাদেশের লোকজন গরু খামার গড়ে গরু লালন-পালন শুরু করলো ব্যাপকভাবে। এতে করে এখন গরু তো আমদানী করা লাগেই না, বরং দেশে কয়েক লক্ষ লোকের জীবিকা তৈরি হয়ে গেলো। গরুর খাবার বা ফিডের উৎপাদক এবং ব্যবসায়ী তৈরি হলো। দেশের টাকা ভারতে যাওয়া বন্ধ হলো। বছরে যেখানে ২৫-২৮ লক্ষ গরু ভারত থেকে আসতো, সেটা এখন দেশেই হয়। এতে করে দেশের ফুড সিকিউরিটিও নিশ্চিত হলো।

৩। একসময় দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ ছাড়া আর কোথাও উচ্চ শিক্ষা ছিলো না। সবাই তো আর পাবলিকে পড়তে পারে না কারণ আসন সংকট। তখন সমাজে হাতে গোনা উচ্চবিত্তরা সন্তানদের ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া পাঠাতো পড়তে। কিন্তু মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত সন্তানদের পাঠাতো ভারতে। দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা ভারতে যেতো পড়া এবং থাকার খরচ বাবদ। এ সমস্যা সমাধান আসে দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এখন আর তেমন কেউ ভারতে পড়তে যায় না এবং যাওয়ার সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। এভাবে ভারত এদেশের স্টুডেন্ট বাণিজ্য হারালো।

৪। বাংলাদেশে যখন গার্মেন্টস শিল্পের জয়জয়কার শুরু হলো, তখন দেশে তেমন সূতা তৈরি হতো না। সূতা আসতো মূলতঃ ভারত থেকে। নব্বই দশকের শেষ দিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এখানেও সিন্ডিকেট করে সূতার বাজার অস্থিতিশীল করতে থাকলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো অতিরিক্ত মুনাফা করা এবং ভারতের গার্মেন্টস শিল্প এগিয়ে নেওয়া এবং একই সাথে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প দমন করা। এতে অনেক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হলো। তখন শুরু হলো এদেশের সূতা শিল্পের অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা দেশে নতুন নতুন স্পিনিং মিল তৈরি করতে শুরু করলো। ফলাফল কি দাঁড়ালো ? ফলাফল এই যে, কটন বা মিক্সড/বেন্ডেড সূতায় বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেলো। যদিও এখন এই শিল্পে সমস্যা চলছে, এবং প্রয়োজনের তূলনায় বিনিয়োগ বেশি হয়ে গেছে, তবুও বাংলাদেশ এখন আর ভারতের উপর নির্ভরশীল না।

৫। বাংলাদেশ এখনও একটা জায়গায় ভারতের উপর পুরাপুরি নির্ভরশীল তা হলো মেডিকেল ট্যুরিজম। চিকিৎসা করতে ভারত যেতে হয় বাংলাদেশিদের। গত সপ্তাহে একটা রিপোর্টে দেখলাম যে শুধ নাকি রংপুর থেকেই বছরে ৫০০ কোটি টাকা চিকিৎসা বাবদ ভারতে ব্যয় হয়। ভারতের পূর্ব এবং দক্ষিণের হাসপাতালগুলোতে ৪৫% রোগী বাংলাদেশী। এটা একটা ভয়াবহ ব্যাপার। বাংলাদেশকে দ্রুত এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলাকে এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে যেটা স্কয়ার গ্রুপ করেছে। সেই সাথে সেবার মনোভাব নিয়ে হাসপাতালগুলোকে চালাতে হবে।

পরিশেষে এটাই বলবো যে, বাংলাদেশের মানুষ ধাক্কা খেয়ে, মাইর খেয়ে, লাথি খেয়ে সব শিখে। ঠ্যাকায় না পড়লে সবাই আরামে দিন কাটায়। ধাক্কা খাওয়ার অপেক্ষা না করে বাংলাদেশের মানুষকেই খুঁজে বের করতে হবে কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা ভারতের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল এবং সেইসব ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হতে হবে। প্রয়োজনের সময় বাঙালির উত্থান কেউ ঠেকাতে পারে না। বাংলার মানুষ অতীতেও পেরেছে, ভবিষ্যতেও পারবে।