প্রথম পাতা

ফাগুনের আহ্বান সত্যের পথে যুব সমাজ হও আগুয়ান

সংলাপ ॥ জাগো যুব সম্প্রদায় জাগো। ঘুমিয়ে থাকার দিন শেষ হয়ে গেছে। আর কত ঘুমাবে! বাংলার আকাশে আজ দূর্যোগের ঘনঘটা। ধর্মের নামে অধর্ম, রাজনীতির নামে রাজনীতিকদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে উন্মাদনা, বিদেশীদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাংলাকে বাঁচাতে – সামাজিক পরিবর্তনে মূল কান্ডারি যুব সম্প্রদায় – আগামী প্রজন্মের আলোর দিশারীদেরকে নেশাগ্রস্ত রাজনীতির ঘুম ভাঙিয়ে বাংলা মায়ের আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে মুক্তির জয়গান গেয়ে। সত্যের জয়গান গেয়ে। সময় আজ দ্বারপ্রান্তে।

যুব সমাজের সার্বিক উন্নতি ছাড়া এদেশে উন্নতি হতে পারে না। যুব সমাজের উত্থান সময়ের দাবি। দারিদ্র, অজ্ঞতা আর রাজনীতিকদের নিপীড়নে হতবিহ্বল গণমানুষকে বাঁচাতে যুব সমাজের হৃদয় প্রসারিত হোক, মুক্তির চিন্তায় বিভোর হোক – সহানুভূতির ডালা নিয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ুক সব বাধা অতিক্রম করে – এটাই সময়ের আহ্বান।

ভাবতে অবাক লাগে, যে যুব শক্তিকে জাতি সালাম জানিয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন সমূহের জন্য, যে যুব শক্তি জাতির জন্যে জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছে – সেই যুব শক্তি নেতিবাচক ও ব্যর্থ কাজে জড়িয়ে পড়েছে এবং পড়ছে। অল্প বয়সে জীবন চলার পথে লক্ষ্য ও ব্রতকে পদদলিত করে কিভাবে নিজের এবং দেশের অমঙ্গল ডেকে আনছে রাজনৈতিক প্ররোচনায় হঠাৎ বড়লোক হওয়ার নেশায়।

রাজনীতিকরা বিপ্লব, পরিবর্তন, বিবর্তন, ধর্মযুদ্ধের কথা বলছে বাংলার মাটিতে – কিন্তু মুক্তির কথা বলছে না। সব রকমের মুক্তি পেতে হলে যুব সমাজের চিন্তা জগতের চিন্তাগুলোর পরিবর্তন কার্যক্রম প্রণয়ন করে মুক্তির পথে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এরজন্য অধ্যাত্মবিদ্যায় স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে কারণ বাংলার মাটি-পানি-বাতাস আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর।

রাজনীতিকরা নিজ ও দলীয় স্বার্থে যুব সমাজকে বাধ্য করেছে এবং করছে বিদেশী সাংস্কৃতির মধ্যে হাবুডুবু খেতে। জীবন চলার পথে ওই বিদেশী সংস্কৃতি প্রবাহিত করতে গিয়ে আজ যুব সমাজ দূষিত। বাংলার মাটির ঐতিহ্য হলো কর্মের মাঝে আধ্যাত্মিকতা। সেই আধ্যাত্মিকতা যুব সমাজ ভুলতে বসেছে এবং নিজস্ব সংস্কৃতিহীন জীবন ধারায় জীবন চলার পথ বেছে নিয়েছে। সময় এসেছে, বর্তমান সরকারের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব যুব সমাজকে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগ্রত করে ঐতিহ্যবাহী বাংলার সহজ-সরল পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রেরণা দেয়া। যুব শক্তিই পরিবর্তন ঘটাবে দূষিত পরিবেশকে। যুব শক্তিকে অনুপ্রাণিত করতে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শপথ নেয়ার জন্য এবং সমাজ পরিবর্তনে জনগণকে সাথে নিয়ে পথ চলার জন্য।

অনেক দেরী হয়ে গেছে। এসেছে আর একটি ফাল্গুন। রাজনৈতিক দলগুলোকে সব ভুল শুধরিয়ে যুব শক্তির পিছনে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়াতে হবে যাতে সত্যের পথ ধরে যুবশক্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, চিন্তাজগতে চেতনার প্রসারতা বাড়িয়ে, দেশের সামগ্রিক উন্নতি সাধন করতে পারে।

যুব সমাজের এক অংশ বিভিন্নরকম নেশায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। নেতিবাচকতায় আবদ্ধ হয়ে গেছে। সুস্থ চিন্তা ও স্বাস্থ্যকে হারিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিথ্যাচার যুব শক্তির অন্য এক অংশকে সন্ত্রাস, হিংসা, লোভ ও ক্রোধের  বন্ধু হতে সহায়তা করছে। তাদের মধ্যে নতুন করে মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করতে রাজনীতিকদেরকে শপথ নিতে হবে, যুব সমাজকে লক্ষ্য অর্জনে কা-ারি করতে হবে সার্বিক সহযোগিতায় উন্নয়নের পথে।

সময় এসেছে, জাতীয় সব মহৎকাজে যুব শক্তিকে ফিরিয়ে আনতে দৃঢ় হবার। যুব সমাজ এক জলন্ত মোমবাতি। বাংলার মানুষ ওই শক্তিকে আজও অনুস্মরণ করে-অনেক কিছু আশা করে। রাজনীতিকরা তাদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করলে অধিকার পাওয়া যাবেই। যুব সমাজের আলোতেই আছে অগ্রগতি ও উন্নতি – দেশ ও জাতির উন্নয়নের ও পরিবর্তনের মূল কথা। কর্মের মাঝে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়াচ লাগলে ঘরে ঘরে আবার সত্যের জয়ধ্বনি উঠবে এবং সেই জয়গানে বাংলার আকাশ বাতাস মোহিত হয়ে শান্তির পরশ আনবে।

সময়ের সাফ কথা….চেতনার পদচারণা চলছে চলবে

সংলাপ ॥ সারা বিশ্বে বাঙালি জাতি অত্যুজ্জ্বল তার গৌরবময় স্বাতন্ত্রে। প্রত্যেক জাতিরই আছে নির্দিষ্ট ভাষা যার পুষ্পিত শাখায় প্রস্ফুটিত হয় সে জাতির স্বকীয় চিন্তা, চেতনা, ধ্যান-ধারণা অর্থাৎ তার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। ভাষাতেই প্রবাহিত হয় তার সত্তার সলিল ধারা।  ভাষা জাতির প্রাণের সম্পদ, অচ্ছেদ্য হৃদ-স্পন্দন। কখনো কেউ সে হৃদ-স্পন্দনে যমের কালো থাবা বসাতে চাইলে কিংবা প্রাণের সম্পদ জবর দখল করে ফলাতে চায় স্ব-ইচ্ছার ফসল তখনই জাতি সোচ্চার হয়ে ওঠে প্রতিবাদে, অস্তিত্বের ভিত্তি রাখতে সুদৃঢ় হয়ে ওঠে উৎসর্গিত প্রাণ। প্রমাণ করেছে একমাত্র বাঙালি জাতি সমস্ত বিশ্বের মধ্যে। নিঃসঙ্কোচে দূরন্ত সাহসে বুকের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে সুরক্ষিত করেছে বাঙালি জাতি অমূল্য মানিক – বাংলা ভাষা।

শুধু ইতিহাসের ধূলিধূসর কালো অক্ষরে নয়, সমস্ত বাঙালির সতেজ বুকে ৮ ফাল্গুন তাই এক অমর অমলিন রক্তাক্ত পোষ্টার। ৮ ফাল্গুন আসে। ৮ ফাল্গুন যায় না। প্রতিনিয়ত ৮ ফাল্গুন আমাদের বন্ধ দরজার কড়া নেড়ে আমাদের জাগায়। ৮ ফাল্গুন তার আলিঙ্গনে আমাদেরও রাঙিয়ে তোলে নিত্য নতুন চেতনায়। তাই তো আমরা পেয়েছি ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস। প্রতিবারের মতো এবারও ৮ ফাল্গুন ও ২১ ফেব্রুয়ারি এসেছে সততঃ নিয়মে। কিন্তু এ যাত্রা বাঙালি জাতির চরম পরীক্ষার। মুখোশধারী বাঙালিদেরকে চিনিয়ে দিয়ে যাবে নীরব অভিমানে। রেখে যাবে এক বিরাট প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো – তথাকথিত ধর্মীয় আচার, না-কি জাতীয় চেতনা, কোনটা বড়? এ দুয়ের কোন সরোবরে ম্লান করে সত্তাকে পূত সজীব রাখতে হবে? মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণের যে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিক কর্মতৎপরতা তা কি একেবারেই মূল্যহীন? ‘সারিবদ্ধ বাঙালি উন্মুক্ত পায়ে ধীর লয়ে হেঁটে চলে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে হাতে ফুল। মুখে অমর-অমর গান। বিভিন্ন নিবেদিত সংগঠনের বিচিত্র আল্পনা পথে পথে। অসংখ্য বাঙালির সমাবেশ শহীদ মিনার চত্বরে। বক্তৃতা, সেমিনার, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত চতুর্দিক।’ এমনই হয়ে থাকে, হয় প্রতি বছরে। আন্দোলন মুখর বাঙালি ফাল্গুনের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েই একদিন জয় করলো কাক্সিক্ষত মুক্তির সোনালী সূর্য। পরাধীনতার সেই নিগুঢ়ে বাঙালি যে কুঠারাঘাত হেনেছিলো তা ’৫২র ফাল্গুনেরই শাশ্বত বিদ্রোহী মুক্তিপাগল চেতনারই চরম প্রকাশ।

জাতীয় চেতনার সাথে ধর্মীয় চেতনার কোনো তফাৎ নেই কিন্তু তফাৎ আছে ধর্মীয় চেতনার নামে আনুষ্ঠানিকতা এবং তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির সঙ্গে। জাতীয় চেতনাকে ছাপিয়ে তথাকথিত ধর্মীয় স্বরচিত অনুশাসন কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না। তাহলে নিঃসন্দেহে সে জাতি সম্মুখীন হয় বিরাট বিপর্যয়ের। আজ সমগ্র বিশ্বের মানচিত্রে একবার চোখ ফিরালেই এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। যে জাতির মধ্যে তার জাতীয়তাবাদ প্রবলভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত, সে জাতি কখনোই বিভক্ত থাকতে পারে না।

স্বকীয় জাতীয় সত্তাকে অক্ষুন্ন রাখার তাগিদেই অবধারিতভাবে বাঙালি ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। এরপরে আর জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ধর্মীয় চেতনার মাঝে বিতর্কের অবকাশ থাকে না। তথাকথিত ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে অর্থাৎ তার সামগ্রিক সত্তাকে পরিপূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও তার স্বজাতীয়তাবোধ তাকে উজ্জীবিত করবেই। পৃথিবীতে কোথাও ধর্মীয় জাততত্ত্বের বন্ধনে কোনো জাতিই সৃষ্টি হয়নি, হবেও না। সবকিছুর উর্দ্ধে অর্থাৎ সর্বপ্রথম জাতীয়তা তারপর অন্য কিছু এই সহজ বোধ কি সর্বসাধারণের মাঝে সুপ্রতিষ্ঠিত? কেন এই কঠিন পরীক্ষায়  আমরা উতরাতে পারিনি? কাদের দায়িত্ব এই বোধ সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তোলার? নিঃসন্দেহে বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলের, কিন্তু এই বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকরা যে একই দ্বন্দ্বের ঘূর্ণিপাকে আজো আবদ্ধ হয়ে ঘুরছে। অন্যকে পরিত্রাণের পথ তারা কি করে দেখাবে?

নিজেদের উৎসর্গিত করে যারা রেখে গেলেন অমূল্য মানিক বাংলাভাষা, তারা কি চিরস্মরণীয়, চিরপূজনীয় নয়?  মহান ভাষা শহীদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও চরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশে যে দ্বিধাগ্রস্থ বা উদাসীন সে কি সত্যিকারভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ? না অন্য কিছু? অকৃতজ্ঞের মতো কি ভুলে যাওয়া যায় আজন্মের ঋণ? তাই ভাষার জন্য শহীদদের চেতনা দীপ্ত মহান দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালিকে হয়ে উঠতে হবে যথাযথ বাঙালি সর্বাগ্রে। নতুবা পরিপূর্ণ মূল্যবোধ বিকাশ কোনোদিনই সম্ভব নয়। হানা দিচ্ছে আজ ধর্ম-পণ্যসর্বস্ব সওদাগরের সর্বগ্রাসী দল। সময় থাকতে তাই সতর্ক হতে হবে এবং সক্রিয়ভাবে তৎপর হওয়ার সময় এসেছে জাতীয় মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত এক মহান জাতি গঠনে।

আজও বাঙালি জেগে ঘুমাচ্ছে!

সংলাপ ॥ পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মতো বাঙালি একটি জাতি। তাদের রয়েছে হাজার-হাজার বৎসরের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস। সে ইতিহাস নিখুঁতভাবে আমরা আজও জড়ো করতে পারিনি। তা সত্ত্বেও যে ইতিহাস আজ পর্যন্ত আমরা পেয়েছি তাতে করে এই জাতির ভাষা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং ভৌগলিক অবস্থান অনেক গৌরবময়। বহু জাতির সংমিশ্রণের ফলে বাঙালি জাতি একটি শংকর জাতিতে পরিণত হয়েছে শতাব্দির ধাপে ধাপে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অনেক জাতির সংমিশ্রণ হলেও এই জাতি নিজেদের বাঙালি অস্তিত্বকে বিলুপ্ত হতে দেয়নি। তাদের স্বাধীনতা ও পরাধীনতার অনেক উত্থান-পতনের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক মানদন্ড  তৈরি করে উর্দ্ধরণের পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।

বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, আসামের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তথা মেঘালয়, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গ সহ বাঙালির ভৌগলিক পরিচয় নিয়ে এই জাতির আদিকাল থেকেই বসবাস। যে সমস্ত বাঙালি বিজ্ঞ রাজনীতিকরা বৃটিশ আমলে একটি স্বাধীন বৃহৎ বাংলা গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা বৃটিশ এবং তৎকালীন দিল্লী কেন্দ্রিক রাজনীতিতে রাজনীতিকদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে পারেননি। এটাই ছিল বাঙালির সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। তা না হলে এতদিনে হয়তো বাঙালিরা বিশ্বের বুকে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অনেক দূর এগিয়ে যেতো।

মাথাপিছু আয় কিংবা বাংলা ভাষাভাষী এলাকার জাতীয় গড় আয়ের হিসাব কষলে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে তা মোটেই সুখকর নয়। দারিদ্র্যের চরম কষাঘাত শতকরা ৭৩টি পরিবারে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সকল সরকার যেভাবে মাথাপিছু আয়, জাতীয় উৎপাদন কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হিসাব কিংবা পরিসংখ্যানাদি নথিভুক্ত করে তা অতিশয় লোক  ভোলানো ব্যাপার। এ হিসাব সরকারের আত্মরক্ষার হিসাব। যে কোনো সরকারের কিংবা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বাজেট ঘাটতি, কর্পোরেশন ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহ যদি প্রতিনিয়ত লোকসানের দায়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তাহলে একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে সক্ষম হয় দেশের অর্থনীতি কোন পর্যায়ে আছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, চাকুরির সংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যে কোনো শ্রমের মূল্যায়ণ থেকে অতি সহজেই অনুমান করা যায় একটি জাতির দারিদ্র্যতার মাপ কতটুকু।

বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহের যে বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় তা থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় ভারতস্থ বাঙালি জাতি যে অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলো সেই অন্ধকারে আজও নিমজ্জিত। ওই সমস্ত অঞ্চল সমূহের বাঙালিরা স্বদেশী বেনিয়াদের শোষণে জর্জরিত এবং পণ্যের ক্রেতা হিসেবে তারা লুটেরা ও কালোবাজারীদের পুঁজির যোগানদাতা। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চরমভাবে বিকৃত ইংরেজি ও বিদেশী সংস্কৃতির উগ্র থাবায়। কিছু সংখ্যক লোক-সমষ্টি কিংবা উন্নত পেশাজীবীদের উন্নয়ন, একটি জাতির উন্নয়নের কোনো মাপকাঠি নয়। ঝলমলে বিপনী বিতান, পাশ্চাত্যের অনুকরণে লেফাফা দুরস্ত  বৈদ্যুতিন মাধ্যমে আর  নাটকে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে অভিজাতদের ঘর-দুয়ার এবং বিলাসবহুল আসবাবপত্রসমূহ বারবার দেখানো উন্নয়নের কোনো পরিচয় নয়।

আজ বিশ্বের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কাঁচামাল থেকে তৈরি পণ্যদ্রব্য, বৈদ্যুতিক, ইলেক্ট্রনিক, ডিজিটাল কিংবা কুটির শিল্পের উন্নত পণ্য সামগ্রী, হাল্কা কিংবা ভারী যন্ত্র ও যান্ত্রিক শিল্পদ্রব্য কিছুই বাঙালি জাতির আয়ত্তাধীন নয়। কৃষি, সরকারী চাকুরী ও দৈহিক পরিশ্রম ব্যতীত বাঙালির কোনো জাতীয় পুঁজি নেই। একটি মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাবার কোনো উপকরণ কিংবা পুঁজি কিছুই বাঙালির আয়ত্তে নেই। খাদ্য এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যে জাতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না সে জাতি যতই বিত্ত-বৈভবের বড়াই করুক না কেন তার সে বড়াই ঠুনকো এবং বালির বাঁধের মতো তুচ্ছ। আমরা অতি নিকটবর্তী ইতিহাস ঘাটলে স্পষ্টই দেখতে পাবো বিশ্বের আধিপত্যবাদী দেশগুলো বাঙালি অঞ্চলসমূহকে বাজার কলোনী হিসেবেই দেখছে।

সুজলা-সুফলা নদ-নদী প্রবাহিত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহের উজানে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণের কারণে বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সাথে জড়িত যে কৃষি ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থা এখন দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে ভগ্নস্তুপের মতো। অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক গোলযোগ ও দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে যাতে বাঙালির অস্তিত্বের বিলুপ্তি হয়ে যায় এটা তার একটা সুদূরপ্রসারী নীলনক্সা বলে চিন্তাবিদরা মনে করছেন। প্রতিটি নদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে বহু উপনদী সমূহের। সেই উপনদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে ছোট বড় অনেক ধরনের খাল এবং নালার।

এভাবেই জালের মতো দেশের আনাচে-কানাচে বিস্তৃতি লাভ করেছে বাঙালির কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার এক প্রাকৃতিক পদ্ধতি। সেই পদ্ধতিকে তছনছ করে দিচ্ছে রাজনীতির জঘন্য কারসাজি। বিদ্যুৎ উৎপাদন আর সেচ ব্যবস্থার অজুহাতে ভারত সরকার যেভাবে একের পর এক আগ্রাসনী ভূমিকা নিচ্ছে তাতে সহজেই আধিপত্যবাদীতার সাথে তুলনা করা যায়। গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কর্মকা-ের পর্যালোচনা টেনে আনলে দেখা যাবে ভারতে গণতন্ত্রের ভিতরে ওত পেতে বসে আছে একদল শক্তিশালী পুঁজিপতি, বুদ্ধিদাতা আমলা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দল। তাদের বাহ্যিক বেশভূষা অতি সাধারণ।

তারাই ভারত সরকারের গণতন্ত্রের হর্তাকর্তা। তারা কোটি-কোটি ভারতীয় নাগরিকের শিক্ষা, চিকিৎসা ও চরম দারিদ্র্যতাকে উপেক্ষা করে সুপার পাওয়ার হওয়ার কামনায় দিনরাত রঙিন স্বপ্ন দেখছে। ভারতে দু’এক জাতির বসবাস নয়। বহু জাতির বসবাস। নদীতে বাঁধ মানেই বাঙালি জাতির মুন্ডুপাত, একটি নীরব সর্বনাশী আগ্রাসন। বাঙালির জীবনে নদী নেই, পানি নেই এটা বিশ্বাস করতে চরম কষ্ট হয়।

হাজার-হাজার বৎসরের ইতিহাসকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেও বাঙালি জীবনের সাথে নদীর সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। এটা একটা প্রাকৃতিক বন্ধন। পলিবাহিত খরস্রোতা নদী দু’কূল ভেঙ্গে নিয়ে মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিলেও বাঙালিরা এই নদীকে ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। এক অবিশ্বাস্য মায়ার বন্ধনে এই নদনদী সকলের নাড়ির সাথে মিশে আছে। সুতরাং নদীকে সচল ও উজ্জ্বীবিত রাখার দায়-দায়িত্ব সমস্ত বাঙালি জাতির। নদী-বিহীন বাঙালি জীবন মানেই হচ্ছে বাঙালির অস্তিত্বের প্রশ্নের জীবন। কাশ্মীরে চেনাব নদীর উৎস মুখে ভারত বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনায় পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। ১৯৬০ সাল থেকে সিন্ধু নদীর পানি বন্টন নিয়েও পাকিস্তানের সাথে চলছে মনোমালিন্যতা। ফারাক্কা বাঁধের নির্মমতায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা সকলের জানা। টিপাইমুখ সহ বিভিন্ন নদীর পানি ও বাঁধ নিয়ে ভারতের যে আগ্রাসনী মনোভাব রয়েছে তাতে করে বাঙালি জাতি চিরতরে খাদ্য এবং অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে থাকবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের প্রায় তিন শতাধিক উল্লেখযোগ্য নদী ও উপনদীর অস্তিত্ব শেষ হতে চলেছে। বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো শুধু তাদের চিহ্ন বুকে ধারণ করে বেঁচে আছে।

প্রায় তিন যুগ ধরে নদীর তীরে তীরে ভারত বিভিন্ন কর্পোরেশনকে লাইসেন্স দিয়েছে কেমিক্যাল জাতীয় কারখানা তৈরির। সেই কারখানাসমূহ থেকে বিষাক্ত বর্জ্য ও তরল পদার্থ নদীর পানিতে মিশে গিয়ে এক চরম দুর্গতির সৃষ্টি হয়েছে বাঙালির জীবনে। নদীর পানি এখন আর সুপেয় নয়। নদীর মাছে আজ স্বাদ নেই, নেই মাছের বংশবিস্তারের কোনো সুযোগ। সেই নদীর পানি যেসকল তৃণ শস্যাদি শুষে নেয় তাতেও রয়েছে কেমিক্যালের প্রভাব। এভাবে এক নীরব নিঃশব্দ এবং লক্ষণহীন ক্ষয়রোগের শিকারে পরিণত হয়েছে বাঙালির জীবন এবং তার কৃষি। অপরদিকে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত কীটনাশক ঔষধ এবং সারসমূহ অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের ফলে তা মাটিতে মিশে গিয়ে বৃষ্টি জলের সাথে ভূগর্ভের নিচে চলে যাওয়াতে ভূগর্ভের পানি কিছুটা দূষিত হচ্ছে। ভূগর্ভের নিচে, মাটির স্তরে স্তরে ভেজা ভেজা নমুনায় আটকে থাকে যে পানি সেই পানির যোগানদার হচ্ছে নদীর প্রবাহ, আদ্র জলবায়ু এব বৃষ্টি। একটি এলাকায় যখন নদী, উপনদী, খাল, নালা ইত্যাদিতে জলের ধারণ ক্ষমতা কিংবা জলের প্রবাহ কমে যায় তখন ভূগর্ভের পানিও কমে যেতে বাধ্য। এমতাবস্থায় সহজেই পানির স্তরে ঘাটতি শুরু হয়। যার ফলশ্রুতিতে পানি আরো অধিক নিচে নেমে যায়। খবরে প্রকাশ ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৭০ মিটার নিচে নেমে গেছে। এটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার যে পানি নিচে নেমে যাবার প্রাক্কালে মাটির স্তরের বিভিন্ন কেমিক্যাল জাতীয় পদার্থ দ্রবীভূত হয়ে তা পানির সাথে থিতিয়ে পড়ে। সেই ভূগর্ভের পানি চাপকলের সাহায্যে উপরে উঠিয়ে পান করা হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে এর বহুল ব্যবহারও হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতি আজ আর্সেনিক নামে এক ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত।

ভারতের নদীতে বাঁধ দিয়ে জলের প্রাকৃতিক গতিকে রোধ করার কারণে বাংলাদেশকে বহু অদৃশ্য দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিভিন্ন নদীর উৎসমুখে ভারত সরকার বিবেকহীন ভাবে যে সমস্ত বাঁধ দিয়ে চলেছে তা বাঙালি জাতিকে গলাটিপে হত্যা করার মতোই এক ভয়ঙ্কর অপরাধ। নদীর স্রোতের প্রবাহ ঠিক না থাকার কারণে নদীর তলদেশে পলিমাটি জমে তা ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য বর্ষা মৌসুমে এই পানি দ্রুত সাগরে পতিত হতে পারে না। যার ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে। নদীর পানিতে লবণ নেই, তাই সাগরের নোনা জল নদীর জলের স্থান দখল করে নিচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবন সহ উপকূলীয় এলাকায় গাছপালা, মাছ এবং পশুপাখীদের জীবন আজ অকাল-মৃত্যুর দাপটে বিলীন। এভাবে চারিদিকে বাঙালি জাতির জন্য সৃষ্টি হয়েছে এক চরম বিপর্যয়। এভাবে সময়ের ধাপে ধাপে মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে, অভাব অনটনে বাঙালিরা বিপর্যস্ত। অদূর ভবিষ্যতে যারা বেঁচে থাকবে তারা হবে মেধাহীন, শিক্ষাহীন, পঙ্গু, অলস, দুর্বল, জ্বরাজীর্ণ, শীর্ণ কায়া এবং বিশ্বের কাছে অবহেলিত ও চির লাঞ্ছিত।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে অনেক জ্ঞানী গুণী খ্যাতিমান দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের জন্ম হয়েছে। সমাজ এবং বিশ্ব তাদের দ্বারা অনেক উপকৃত হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু গোটা বাঙালি জাতির ভাগ্য উন্নয়নে এতদিন কেউ সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারেননি। জ্ঞান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় এই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো আজ মানানসই ফর্মূলা আবিষ্কার হয়েছে। নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ভারতের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে লড়বার মতো কোনো দুঃসাহসী বাঙালি নেতাও আজ গড়ে উঠছে। কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদীদের আস্ফালনে আর পুঁজিপতি রাজনীতিকদের দেখেই চুপ আছে বাঙালি জাতি। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা আজ শুধুই অবহেলিত। অপরদিকে রাজনৈতিক ভাবে ভারতের বাঙালিরা দিল্লীর ডান্ডার ভয়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে অন্ধকারের দিকে। অভাবের তাড়নায় কে কতটা সহ্য করতে পারে এই যেন তাদের প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশের বাঙালিরা কিছু সংখ্যক ধর্ম ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, চোরা কারবারী, খুনী, লুটেরা ও তাদেরকে সহায়তা দানকারী রাজনীতিকদের কাছে জিম্মি এবং চরমভাবে পর্যুদস্ত। রাজনীতিকদের তাড়নায় কে কত বড় মিথ্যুক, ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসী হতে পারে এরই চলছে প্রতিযোগিতা। ঠান্ডা এবং স্থির মস্তিষ্কে চলছে মেধার নিধন।  চলছে অবাধ সম্পদ পাচার এবং নিজ সন্তানদের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার হিড়িক। আজকে সারা বিশ্বে বাঙালি জাতির পরিচয় খরা এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি জাতি হিসাবে। খুনী, লুটেরা এবং দুর্নীতিতে বারবার অভিশপ্ত বাংলাদেশ প্রবল জনসংখ্যার চাপ, ভবিষ্যতে পানিবিহীন শহর হওয়ার আশঙ্কা এবং বস্তি, আর্সেনিকের দাপট, খরা ও বন্যার ছোবল, বনজ সম্পদ উজাড় এবং অগণিত মানুষের সৃষ্ট আবর্জনায় জর্জরিত।

জাতিকে ভাবতে হবে সে কোন জাতি? তার ভাষা ও অতীত ইতিহাস কি? তার ভৌগলিক সীমারেখা কতটুকু? আজ বাঙালি জাতিকে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে গড়ে তোলার ইস্পাত কঠিন শপথ নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ষড়যন্ত্র চলছে যাতে করে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির মধ্যে সবসময় একটা হানাহানি ও শত্রুতা লেগে থাকে।

বাংলাদেশের বাজারে মাঝে মধ্যে ছাড়া হয় নকল টাকার নোট। প্রায়ই তুচ্ছ কারণে সীমান্তের বাঙালিদের মধ্যে উস্কানি ও বিবাদ সৃষ্টি করে নিরীহ বাঙালিদের করা হচ্ছে হত্যা। হত্যার পর লাশ গুম করে কিডনী, হার্ট, হাড়, চক্ষু, লিভার ইত্যাদি বিক্রির ব্যবসাও চলছে। গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতে এর কোনো বিচার হচ্ছে না। বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও ভারত তিস্তা পানি বন্টনের চুক্তিকে অগ্রাহ্য করছে এবং আন্তর্জাতিক বিধান লঙ্ঘন করে বিভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম সমস্যা বহাল রেখেছে। শুধু বাংলাদেশের তরফ থেকে নয় ভারতের বাঙালিরাও এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ভারতের কাছে যতটুকু ঋণী তারচেয়ে শতগুণে বেশি ঋণী আমাদের প্রতিবেশী বাঙালিদের কাছে। বাঙালি হিসেবে আমরা বাঙালির কাছে আশ্রয় পেয়েছি। সেদিন প্রশ্ন ছিলো না আমরা মুসলিম না হিন্দু। আমরা সে সময় অনুভব করেছি বৃটিশপূর্ব ভারতের বাঙালি। আমরা ছিলাম এক মাতৃভূমির সন্তান, এক ভাষার সন্তান। বৃটিশ আমাদের বিভক্ত করে দিয়ে গেছে বাঙালি জাতিকে চিরকাল দুর্বল ও পঙ্গু করে রাখার উদ্দেশ্যে। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে প্রতিবেশী বাঙালি। অস্ত্র, খাদ্য, ট্রেনিং তাদেরই বদৌলতে হয়েছে।

পরবর্তীতে প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য ভারতের হাত দিয়ে এসেছে। বাঙালির জন্য বাঙালির দরদ ছিলো, স্নেহ এবং সহানুভূতি ছিলো, যার ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সুযোগ হয়েছিলো তাড়াতাড়ি। কিন্তু আজ বাঙালির সেই জাতীয়তাবোধ ও মমত্ববোধ কোথায় গেলো?

আজ এই সত্য হারিয়ে গেছে কুচক্রী বাংলাদেশ ও ভারতের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে। তারা ধর্মের নামে এবং বাংলাদেশী ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের নামে রাজনীতির মুখোশ পরে বাঙালি জাতিকে চিরতরে পঙ্গু ও নিঃস্ব করার পাঁয়তারা করছে। বাঙালিদের মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমান এই দুই জাতির ধর্মীয় পার্থক্য দেখিয়ে সবসময় নানাবিধ অপপ্রচার চালাচ্ছে। ভারতের দিল্লী এবং পাকিস্তানের পিন্ডি চায় না বাঙালিরা একতাবদ্ধ হোক।

অপপ্রচারকারীরা তলে তলে ভারত-পাকিস্তানের সাথে অবাধ গুপ্ত বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় ব্যবসা ছাড়াও চাল ডাল থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি কাপড় চিনি ইত্যাদির ব্যবসা গোপনে করে যাচ্ছে আর বাংলাদেশের তৈরি পণ্যদ্রব্য অবিক্রিত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। বাঙালি বিরোধী ধর্মীয় মুখোশ পরা মিথ্যুকরা ভারতের গরু দ্বারা ঈদের উৎসব পালন করে আর হোটেল রেষ্টুরেন্টে গোমাংসের চালান দেয়। এভাবেই জনগণকে ধোঁকা দিয়ে রাজনীতি করছে তথাকথিত ইসলামপন্থীরা।

দেশবাসী চায় নতুন যুবশক্তি আর দীর্ঘদিন থেকে যারা সততা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা দেখেছে তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে যে সমস্ত রাজনীতিকরা শোষক শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে তারা এলাকায় দশ কোটি টাকার খরচ করে কিছুটা উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং সেই সুবাদে সেই এলাকার জনগণ সেই লোকটিকে বারবার ভোট দিচ্ছে। সে টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসী লালন করতে পারছে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বোমাবাজ ও সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিতে পারছে। দেখা যাচ্ছে সম্পদ এবং ক্ষমতা – দুটোই সকল অপরাধের জন্য দায়ী। জনগণ শুধু চেয়ে চেয়ে এসব দেখছে। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিকার ও প্রতিবাদ করার কোনো বিশ্বস্ত প্লাটফর্ম নেই। নেই আত্মরক্ষার কোনো হাতিয়ার। পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনী এসবের বিরুদ্ধে কিছুই করছে না। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী পর্দার অন্তরালে লুটপাট সম্পদের ভাগীদার হচ্ছে। বখরা এবং চাঁদা আদায়ের জন্য প্রকাশ্য এবং নেপথ্য উভয় রাস্তাই তারা অনুসরণ করছে বলে জনগণের মধ্যে অবিশ্বাসের দানা বেঁধে উঠছে। আজকের বাঙালি জাতিকে বাঁচতে হলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সত্য সুন্দর সমৃদ্ধশালী দেশ উপহার দিতে হলে জাতির ঐক্য ছাড়া কোনো বিকল্প রাজনীতি নেই। বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে এবং বহুমুখী শোষণের নাগপাশ থেকে বাঁচতে হলে বাঙালিকে অবশ্যই কৌশলগত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আধিপত্যবাদীরা চাইবে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করে নিতে। বাঙালি জাতিকে সঠিকভাবে কিছু করতে হলে ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্ত্বকে ভুলতে হবে। ভুলতে হবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে। অগ্রসর হতে হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে। রাজনীতির নেতৃত্বে যাবার আগে ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও পরিকল্পনাকে একটি সাংবিধানিক কাঠামোতে আনতে হবে। থাকতে হবে একটি দিক নির্দেশনা ও লক্ষ্য পূরণের পূর্ণাঙ্গ এবং প্রকাশ্য দলিল। এই দলিল ভিত্তিক সবকিছুই হবে সুসংগঠিত। অতএব * বাঙালি জাতীয়তা * বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা * নিজ নিজ ধর্মীয় স্বাধীনতা  * গডফাদারহীন গণতন্ত্র এবং * প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণকে রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে মূল্যায়ণ করতে হবে সর্বাগ্রে।

আমি বাঙালি আমাকে বাঁচতে হবে….

সংলাপ ॥ ‘অন্য কোন দর্শন নয় – আমি বাঙালি আমাকে বাঁচতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক হয়ে’- উক্তিটি বাংলার একজন সূফী সাধকের। অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি উচ্চারণ করেন – আজকের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব থেকে মুক্তি পেতে বাঙালিকে চিন্তা ও মননে বাঙালি হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। বাঙালির জীবন চলার পথে আজ আর বাঙালির দর্শন নেই, আছে জগাখিঁচুড়ি। নেই তার জাতীয়তাবোধের আত্মশক্তি ও সাহস। যা দ্বারা একদিন সে শিরদাঁড়া সোজা করে বৈশ্বিক চেতনা ধারণ করতে পেরেছিল। আজকের বাঙালিকে ইতিহাসের ধারায় খুঁজে পাওয়া কিংবা চিনে নেয়া কষ্টকর। তার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ব্যাপ্তি ক্রমাগত ধর্মজীবীদের এবং রাজনৈতিক বেনিয়াদের হাতে লুন্ঠিত হতে হতে আজ এক ক্ষীণ দীপ শিখা মাত্র।

এ জন্যেই সূফী সাধক উপদেশ দিলেন সর্বাগ্রে একজন বাঙালি হবার। এই বাঙালি দর্শনেই নিহিত আছে রাজনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি। একজন মানুষ তার নিজের মধ্যে আপন স্বকীয়তার অস্তিত্ব অনুভব করতে না পারলে, অন্যের উপস্থিতিটা তার কাছে অনুপস্থিতিই থেকে যায়। তখনই দেখা দেয় আমিত্বের আবরণে সর্বস্ব গ্রাস করবার পাশবিক মনোবৃত্তি। যা আজ আমাদের রাজনৈতিক ধারাগুলোর মধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। 

এখন বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতিক পছন্দ করে না কিন্তু নির্বাচন আসলে সে যে কোন রাজনীতির সাময়িক বাহক হয়ে উঠে। এর বাইরে বেরিয়ে বাঙালি দর্শন এবং তার সংস্কৃতির চেতনায় ধারক হতে চায় ক’জনা? সুতরাং দেশ এবং তার মানুষের জন্য আর কেউ কোন দরদ অনুভব করে না। রাজনীতিকরাই দেশের মানুষকে ব্যবহার করে চলছে শুধুই তাদের আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে। যদিও এদের অনেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাইনবোর্ডটি যথাযথই ঝুলিয়ে রেখেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন। স্বাভাবিক প্রশ্ন এই জাতীয়তাবোধ যা আজ নির্বাসিত হওয়ার পথে, তার প্রতিষ্ঠার পথ এবং পদ্ধতি কি?

আধিপত্যবাদী রাজনীতির প্রয়োজনে যে সন্ত্রাসের সৃষ্টি তা এখন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। তাকে কি ভোটতন্ত্রের বর্তমান পথ এবং পদ্ধতিতে জিইয়ে রেখে পরিবর্তনের আদৌ সম্ভাবনা আছে? যারা আজ বুদ্ধিজীবী সেজে পুরো দেশটাকে তাদের নিজেদের মতো করে ইজারা নেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদের নির্লজ্জতা কত নগ্ন তার প্রমাণ পাওয়া যায় দেশের রাজনীতিকদের ও তাদের পোষ্যদের সন্ত্রাসের পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রচারে।  

সমগ্র দেশব্যাপী আধিপত্যবাদী বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ সদস্য, নাগরিক সমাজ সদস্য ও ধর্মজীবী সমাজ সদস্য সমন্বিত স্বার্থবাদী একটা শ্রেণীর দৌরাত্ম্য চলছে। অন্তর থেকে এরা কেউই আর এই দেশ এই মাটি এই মানুষের কেউ নয়। এরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ও গোষ্ঠীস্বার্থে মোহাচ্ছন্ন এবং বাঙালি ও তার জাতীয়তার আজন্ম শত্রু। এদের অভিন্ন ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের কাছে বাঙালির জাতীয়তাবোধ বার বার উপেক্ষিত।

একদিকে আকাশ সংস্কৃতির ক্রমাগত আগ্রাসন অন্যদিকে আধিপত্যবাদী সন্ত্রাসী রাজনীতির ব্যাপক বিস্তার, জাতির ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। এখন একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ শিক্ষা নিতে গিয়ে হয় নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে অথবা নিজেকে পরিবর্তিত করছে একজন রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ক্যাডার হিসেবে।

এই বাস্তবতায় বাঙালি জাতীয়তা-বোধে দেশ গড়ার সত্য ও সহজ পথ – সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে বিপ্লব। একদিকে রাজনীতিকদের মিথ্যাচার এবং প্রবল প্রতাপে প্রতিটি জনপদের অসহায় মানুষের নির্বিকার ক্রন্দন, অন্যদিকে শান্তি ধর্মের নামে আমাদানিকৃত মধ্যপ্রাচ্যের জীবনাচার ও সন্ত্রাস দ্বারা মোহাবিষ্ট করে বাঙালির বাঙালিত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। এই সাড়াশি আক্রমণের প্রক্রিয়ায় বাঙালির সহজ সতেজ সবল চিন্তার সূত্রগুলো প্রতিদিন মরে যাচ্ছে। পৃথিবীর অধ্যাত্মচিন্তা ও চিরন্তন প্রেরণা বাণীসমূহ বাঙালি মানসে আর কোন আলোড়ন তুলছে না ভোগ, লোভ আর স্বার্থের আবর্তে প্রতিনিয়ত ঘূর্ণায়মান সমাজে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে প্রতিঘাতের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপেই হবে বাঙালির পূণর্জাগরণ শুরু। সামাজিক বাস্তবতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অর্থনৈতিক শোষণ, আধিপত্যবাদী আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক মুক্তি প্রতিটি স্তরেই জাতীয়তাবোধের অদম্য ইচ্ছা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রেমের প্রজ্ঞায় প্রজ্ঞায়িত হওয়ার জন্য সত্যমানুষের পথে চলার এখনই সময়। কর্মে অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা বহমান বাঙালিত্বে প্রতিষ্ঠিত করবার ডাক বর্তমান সময়ের বিচারেই সংজ্ঞায়িত। নিজের রূপে বিশ্বরূপ প্রতিফলিত করবার অহংবোধ বাঙালিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একমাত্র পথ।

মাত্র দুই-তিন লক্ষ ধর্মীয় আধিপত্যবাদী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিক এবং তাদের পোষ্য সন্ত্রাসীদের জন্য সমগ্র দেশের মানুষকে শান্তির জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে, এটা একেবারেই অবাস্তব। সুতরাং বাস্তবতা হলো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে জাতীয়তাবোধ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে জাগ্রত রাখা। পাঁচ হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যকে আবার তার স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত ও বহমান রাখতে সত্যের দ্বারা মিথ্যার প্রতিরোধের কোন বিকল্প নেই। প্রশাসন, রাজনীতি এবং শোষণের শ্রেণীবৈষম্য প্রত্যেকেই একে অপরের পরিপূরক বিধায় এরা প্রত্যেকেই আজ সাধারণ মানুষের শত্রুতে পরিণত। অধিকার আদায়ের গতানুগতিক আন্দোলনে বারবার সুবিধাবাদী চরিত্রের উদ্ভব ঘটছেই এবং তা বিগত ইতিহাসের মতোই পুনরাবৃত্তি হবে মাত্র।

লড়াইটা এখন বাঙালির। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে আধিপত্যবাদী ধর্মীয় শোষণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রাজনৈতিক শোষণের ব্যবস্থাদিও। তারপরও ঐক্যবদ্ধ সাধারণ মানুষের সামনে তা অত্যন্ত নগণ্য। সত্যমানুষের দর্শনে ‘আমরা বাঙালি – চির নতুন ও শাশ্বত’ এই আহ্বান ধারণ করাই বাঙালির আজকের প্রজন্ম ও নতুন প্রজন্মের প্রাথমিক ও প্রধান কাজ।

প্রয়োজন লক্ষ্য ভিত্তিক সামাজিক পরিবর্তন

সংলাপ ॥ এক সামাজিক পরিবর্তন। আমাদের অভিব্যক্তি এবং উদ্যোগই বলে দেবে কিভাবে দেশ শাসন করতে চাচ্ছি। কিভাবে সমাজের নানা স্তরের মানুষকে উপযুক্ত নাগরিক সুবিধা দিতে পারছি। সরকারের কাজই হলো তা নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজ, বেসরকারি ক্ষেত্র, সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থারও সমান ভূমিকা এবং দায়িত্ব রয়েছে এই সামাজিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে। দেশ মানে মানুষ, দেশ মানে মৃত্তিকা নয়। অকাজে কেবল কথা না বলে কাজ করে যাওয়া। ভালো কাজ। জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদেরকে নিবেদন করলে যা করতে চাইছি, তার অনেকটাই সম্পূর্ণ হয়ে যায়। যা আরও পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে উল্লেখযোগ্য অনুপ্রেরণা জোগায়। উৎসাহ দেয়। তৈরি করে কৌতূহল।

তাই সময় এসেছে দেশ পরিবর্তনের। সুশাসনের। মজবুত অর্থনৈতিক ভিতের ওপর ভর করে দেশ আর্থিক বৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একইভাবে সম্মিলিতভাবে আমাদের নজর দিতে হবে রাষ্ট্র, সামাজিক বুনন এবং পরিষেবায়। বিশেষত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে। জীবন-যাপনের মানোন্নয়নই সবার ওপর দর্শনীয় হওয়া উচিত।

গুণগত মানের শিক্ষাই হলো সার্বিক উন্নয়নের প্রাথমিক পথ। জাতি চায় সেই শিক্ষা যা চরিত্র গঠন করে, শক্তি বৃদ্ধি করে এবং বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। যার জোরে একজন মানুষ নিজের পায়ে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারে।

দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ পায়, সেটা রাজনীতিকদের দেখতে হবে। স্বচ্ছতার অভ্যাসকে আয়ত্ত করতে হবে। ক্ষুধা এবং অপুষ্টি আমাদের অন্যতম সমস্যা। একই রকমভাবে বড় সমস্যা হলো শিশুমৃত্যু এবং প্রসূতির মৃত্যুও। তারই সঙ্গে দুর্নীতি, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, চরমপন্থী আচরণের মতো দীর্ঘদিনের সামাজিক রোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। কড়া হাতে দমন করতে হবে সন্ত্রাসীদের। নির্বাচনী এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করার পথে এগতে হবে।

বাংলাদেশের এমন নেতৃত্ব দরকার যাঁরা চারিত্রিক দৃঢ়তায় ভরপুর। রাজনৈতিকভাবে যে মানুষ যে মতেরই হোক না কেন, দেশ গঠনে রাজনৈতিক সর্বসম্মত হওয়াই প্রয়োজন। সবার ওপর জাতির স্বার্থ। ভাষা, জাতি, আঞ্চলিকতা সব কিছুর শেষ পরিচয় জাতীয় পরিচয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের দিকেও আমাদের জরুরী নজর দেয়ার সময় এসেছে। বায়ু, শব্দ এবং জলদূষণ সমস্যা দূর করতে অগ্রাধিকার সময়ের দাবী। আমাদের যা প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তা অভাবনীয়। অদ্ভূত এক আকর্ষণীয় সম্পদের অধিকারী আমাদের দেশ। সত্য এটাই, সম্মিলিতভাবে এগলে, উদ্যোগ নিলে কোনও কাজই অসম্ভব নয়। অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি, বাস্তবায়ন এবং নতুনত্বই হোক আমাদের উদ্দেশ্য যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে স্পন্দনশীল এবং পুনরুজ্জীবিত করবে।

সময়ের সাফ কথা…. – অ-ঘৃণা আদর্শের একটা প্রধান স্তম্ভ

সংলাপ ॥ দেশবসী জানেন, মন্দ কাজের জন্য শাস্তি না দিলে সমাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, কিন্তু তবুও ক্ষমা করা শ্রেয়। আমাদের উচিত ওদের চিন্তা পাল্টানোর জন্য চেষ্টা করা।

ঘৃণা জিনিসটা নিয়ে গভীর ভাবে ভাবলে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের জন্য কাউকে ঘৃণা করাটা জরুরি নয়। ভুল ভাবনায় ওদের দোষ দেয়া যায়না, ওদের জন্য কষ্ট অনুভব করতে হবে, ওরা একটা ভুল ভাবনার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই, ওদের প্রতি, আমাদেরও প্রতি,সকলের প্রতি প্রশ্ন: আমি যা ঠিক বলে চিন্তা করি, আমার নিজেরই বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে স্ত্রী যখন সেটা না করে, যখন কোনও ভুল করে, আমি কি তাকে ‘ঘৃণা’ করি, না কি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি?

নিজের লোকেদের ক্ষেত্রে যখন তা-ই করি, অন্যের ক্ষেত্রেও সেই একই কাজ করব না কেন? তাদের ততটা আপন ভাবতে পারব না কেন? অ-ঘৃণা’ই আদর্শের একটা প্রধান স্তম্ভ।

যে মুহূর্তে ঘৃণাকে বড় করে দেখা যায়, ঘৃণা ‘মহৎ’ হয়ে ওঠে। কোনও ক্ষুদ্র সংকীর্ণ সাংসারিকতা থেকে তার উৎপত্তি নয়, দেশকে বাঁচানোর নামে, জাতিকে নবজীবন দানের নামে যখন ঘৃণার বিকাশ, তখনই তার ‘মহত্ত্ব’। প্রবল হয়ে উঠতে পারে সেই মহত্ত্বের দায়বোধ। হঠাৎ আবেগের বশে এ কাজ করা যায় না। ভেবেচিন্তে, অনেক ‘সাধনা’র পথ বেয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়।

দুই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিত্ব পরস্পরের সামনা-সামনি হননা। তারা দুটি আলাদা চিন্তাধারার দুই পরাক্রান্ত প্রতিনিধি। ওই দুই ধারার মূল দ্বন্দ্বটা হলো ‘ধর্মীয় তোষণবাদ’ আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ রক্ষা’র মধ্যে। দ্বন্দ্বটা ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মান্ধতার মধ্যে। কিন্তু দ্বন্দ্বটাকে আমরা যখন আদর্শ-উদ্দেশ্য-তত্ত্বের চক্করে না ফেলে দুটো আলাদা মানস-জগতের মধ্যে দেখতে চেষ্টা করবো, তখন স্পষ্ট হবে যে, এক দিকে দাঁড়িয়ে আছে ‘অ-ঘৃণা’র মানসজগৎ, অন্যদিকে ‘বড় ঘৃণা’র মানসজগৎ।

দুই মানসিকতা পরস্পরের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ঝকঝকে যুযুধান: তাদের মধ্যে কোনও বোঝাপড়া হয় না, হওয়ার কথাও নয়, দুই পক্ষই অন্য পক্ষকে ভুল পথের পথিক ভাবেন।

অহিংসা দিয়ে ‘অ-ঘৃণা’কে পুরোটা বোঝা যায় না। অহিংসার ‘অ-সাধারণ’ আদর্শ ছাড়াও একটা খুব সাংসারিক ভালবাসার ‘সাধারণ’ আদর্শ এই অ-ঘৃণার মধ্যে বহমান। পুত্র কন্যা ভুল করলে তাদের যেমন শুধরে দেয়া হয়, অন্যদেরও তাই করা, দূরে ঠেলে ফেলা না,সকলকে একটা ‘আপন’ বৃত্তের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। সেই আপন বৃত্তে এমন লোকও থাকতে পারে, যাকে ততো ভালবাসতে পারা যায় না। কিন্তু ভাল না বাসার মানেই কি ঘৃণা করা? এ-ই কি আমরা শিখি সংসারে? না। ভাল-মন্দ সবাইকে পাশে নিয়ে চলতে শিখি। তবে দেশ বা সমাজেও তাই নয় কেন?

অনেক রকম সমস্যা রয়েছে মানুষের জীবনে; সেই সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করা যেতে পারে। সৎ আন্দোলন হলে জনগণ পাশে দাঁড়াবেই। কিন্তু ক্ষমতা লাভের ইচ্ছায় যখন একমাত্র আন্দোলন হয়ে থাকে, তা অবলুপ্ত হতে বাধ্য।

কথা হোক। আলোচনা হোক। মানব মনস্তত্ত্ব দর্শন বলে আমরা সব সময় পৃথিবীর সমস্ত ঘটনা, সমস্ত বিষয়কে শ্রেণিবিভাগ করি। কোনও রাজনৈতিক নেতা, তিনি সফল হলেও তার মধ্যে কিছু ভাল থাকে, কিছু খারাপ থাকে। সর্বদাই একজন নেতা ভাল এবং খারাপের সংমিশ্রণ। শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তার সেই সাফল্যের প্রশংসা করে দেশের মানুষ। এ কথা সত্য, অন্য কোন রাজনীতিক পারেননি, তিনি পেরেছেন। দেশের মানুষ তাকে বিশ্বাস করেছেন এবং এখনো করেন। পদ্মা সেতুকে কে জনপ্রিয় করে শুধু দেশে নয়, গোটা পৃথিবীর সামনে নিজের সাফল্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। কঠোরভাবে ধর্মীয় সন্ত্রাস দমন দেশের মানুষকে বিপুলভাবে আন্দোলিত করেছে। হিংসা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রেম-ভালবাসা, শান্তি ও অহিংসার আবহ  তৈরি করতে হবে বলে সাধারণ মানুষ তার আন্তরিকতাকে পছন্দ করছেন। ধর্মভিত্তিক ধর্মান্ধ ব্যবস্থার দেশগুলোর জনগণকে আতঙ্কিত করে তুলছে বিশ্বব্যাপী। আমরা জনগণের ভোট ও মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, তাদের মতামতকে শ্রদ্ধা করি। জনগণ যে দিকেই ভোট দিক না কেন আমাদের সেটাকে মূল্যায়ন করার দয়িত্ব আছে। জনগণের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়ার অধিকার আমাদের কাউকে দেয়া হয়নি।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ঐশি ধর্মের মূল বিষয়। ইসলামে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় মানুষকে যে পূর্ণতায় পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে তার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তা-চেতনার পার্থক্য রয়েছে। তারা রাজনৈতিক উন্নতি বলতে কেবল শিল্পোন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণমূলক কর্মকান্ডকেই বুঝিয়েছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোনো পরিস্থিতি পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা উচিত রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থার। রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় ঐশি মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। সব শ্রেণীর মানুষের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া এবং আদর্শ ভিত্তিক প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যা কিনা জনগণের ভোটে নির্ধারিত । 

জনগণের শাসন ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা হিসেবে অভিহিত করে রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও গণতন্ত্রের এ ধারা ছড়িয়ে দেয়া উচিত যা মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণার বিষয়ে পরিণত হতে পারে।

মুক্তিপাগল চেতনায়….

সংলাপ ॥ সারা বিশ্বে বাঙালি জাতি অত্যুজ্জ্বল তার গৌরবময় স্বাতন্ত্রে। প্রত্যেক জাতিরই আছে নির্দিষ্ট ভাষা যার পুষ্পিত শাখায় প্রস্ফুটিত হয় সে জাতির স্বকীয় চিন্তা,চেতনা,ধ্যান-ধারণা অর্থাৎ তার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। ভাষাতেই প্রবাহিত হয় তার সত্তার সলিল ধারা। ভাষা জাতির প্রাণের সম্পদ,অচ্ছেদ্য হৃদস্পন্দন। কখনো কেউ সে হৃদস্পন্দনে যমের কালো থাবা বসাতে চাইলে কিংবা প্রাণের সম্পদ জবর দখল করে ফলাতে চায় স্ব-ইচ্ছার ফসল তখনই জাতি সোচ্চার হয়ে ওঠে প্রতিবাদে, অস্তিত্বের ভিত্তি রাখতে সুদৃঢ় হয়ে ওঠে উৎসর্গিত প্রাণ। প্রমাণ করেছে একমাত্র বাঙালি জাতি সমস্ত বিশ্বের মধ্যে।নিঃসঙ্কোচে দূরন্ত সাহসে বুকের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে সুরক্ষিত করেছে বাঙালি জাতি অমূল্য মানিক -বাংলা ভাষা।

শুধু ইতিহাসের ধূলিধূসর কালো অক্ষরে নয়, সমস্ত বাঙালির সতেজ বুকে ২১ তাই এক অমর অমলিন রক্তাক্ত পোষ্টার। ২১ আসে। ২১ যায় না। প্রতিনিয়ত ২১ আমাদের বন্ধ দরজার কড়া নেড়ে আমাদের জাগায়। ২১ তার আলিঙ্গনে আমাদেরও রাঙিয়ে তোলে নিত্য নতুন চেতনায়।

প্রতিবারের মতো এবারও ২১ আসছে সততঃ নিয়মে। কিন্তু এ যাত্রা বাঙালি জাতির চরম পরীক্ষার। মুখোশধারী বাঙালিদেরকে চিনিয়ে দিয়ে যাবে নীরব অভিমানে। রেখে যাবে এক বিরাট প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো – তথাকথিত ধর্মীয় চেতনা, না-কি জাতীয় চেতনা, কোনটা বড়? এ দুয়ের কোন সরোবরে ম্লান করে সত্তাকে পূত সজীব রাখতে হবে? ২১ এলেই মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণের যে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিক কর্মতৎপরতা তা কি একেবারেই মূল্যহীন? ‘সারিবদ্ধ বাঙালি উন্মুক্ত পায়ে ধীর লয়ে হেঁটে চলে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে হাতে ফুল। মুখে অমর ২১-এর গান। বিভিন্ন নিবেদিত সংগঠনের বিচিত্র আলপনা পথে পথে। অসংখ্য বাঙালির সমাবেশ শহীদ মিনার চত্বরে। বক্তৃতা, সেমিনার, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত চতুর্দিক।’ এমনই হয়ে থাকে, হয় প্রতি ২১-এ। আন্দোলন মুখর বাঙালি ২১-এর চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েই একদিন জয় করলো কাঙ্খিত মুক্তির সোনালী সূর্য। পরাধীনতার সেই নিগুঢ়ে বাঙালি যে কুঠারাঘাত হেনেছিলো তা ২১-এরই শাশ্বত বিদ্রোহী মুক্তিপাগল চেতনারই চরম প্রকাশ।

জাতীয় চেতনার সাথে ধর্মীয় চেতনার কোনো তফাৎ নেই কিন্তু তফাৎ আছে ধর্মীয় চেতনার নামে তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির সঙ্গে। জাতীয় চেতনাকে ছাপিয়ে তথাকথিত ধর্মীয় অনুশাসন কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না। করলে নিঃসন্দেহে সে জাতি সম্মুখীন হয় বিরাট বিপর্যয়ের। আজ সমগ্র বিশ্বের মানচিত্রে একবার চোখ ফিরালেই এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। যে জাতির মধ্যে তার জাতীয়তাবাদ প্রবলভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত,সে জাতি কখনোই বিভক্ত থাকতে পারে না।

স্বকীয় জাতীয় সত্তাকে অক্ষুন্ন রাখার তাগিদেই অবধারিতভাবে বাঙালি ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। এরপরে আর জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ধর্মীয় চেতনার মাঝে বিতর্কের অবকাশ থাকে না। তথাকথিত ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে অর্থাৎ তার সামগ্রিক সত্তাকে পরিপূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও তার স্বজাতীয়তাবোধ তাকে উজ্জীবিত করবেই। পৃথিবীতে কোথাও ধর্মীয় জাততত্ত্বের বন্ধনে কোনো জাতিই সৃষ্টি হয়নি হবেও না। সবকিছুর উর্দ্ধে অর্থাৎ সর্বপ্রথম জাতীয়তা তারপর অন্য কিছু এই সহজ বোধ কি সর্বসাধারণের মাঝে সুপ্রতিষ্ঠিত? কেন এই কঠিন পরীক্ষায় আমরা উতরাতে পারছি না? কাদের দায়িত্ব এই বোধ সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করে তোলা? নিঃসন্দেহে বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলের, কিন্তু এই বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকরা যে একই দ্বন্দ্বের ঘূর্ণিপাকে আজো আবদ্ধ। অন্যকে পরিত্রাণের পথ তারা কি করে দেখাবে?

নিজেদের উৎসর্গিত করে যারা রেখে গেলেন অমূল্য মানিক বাংলাভাষা,তারা কি চিরস্মরণীয়, চিরপূজনীয় নয়? মহান ভাষা শহীদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও চরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশে যে দ্বিধাগ্রস্থ বা উদাসীন সে কি সত্যিকার ভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ? না অন্য কিছু? অকৃতজ্ঞের মতো কি ভুলে যাওয়া যায় আজন্মের ঋণ? তাই ’২১-এর চেতনা দীপ্ত মহান দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালিকে হয়ে উঠতে হবে যথাযথ বাঙালি সর্বাগ্রে। নতুবা পরিপূর্ণ মূল্যবোধ বিকাশ কোনোদিনই সম্ভব নয়। যে কোনো সময় হানা দিতে পারে ধর্ম-পণ্যসর্বস্ব সওদাগরের সর্বগ্রাসী দল। সময় থাকতে তাই সতর্ক হতে হবে এবং সক্রিয়ভাবে তৎপর হওয়ার সময় এসেছে জাতীয় মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত এক মহান জাতি গঠনে।

বাঙালি আজ জেগেও স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারছে না!

সংলাপ ॥ পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মতো বাঙালি একটি জাতি। তাদের রয়েছে হাজার হাজার বৎসরের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস। সে ইতিহাস নিখুঁতভাবে আমরা আজও জড় করতে পারিনি। তা সত্ত্বেও যে ইতিহাস আজ পর্যন্ত আমরা পেয়েছি তাতে করে এই জাতির ভাষা,নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং ভৌগলিক অবস্থান অনেক গৌরবময়। বহু জাতির সংমিশ্রণের ফলে বাঙালি জাতি একটি শংকর জাতিতে পরিণত হয়েছে শতাব্দির ধাপে ধাপে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে,অনেক জাতির সংমিশ্রণ হলেও এই জাতি নিজেদের বাঙালি অস্তিত্বকে বিলুপ্ত হতে দেয়নি। তাদের স্বাধীনতা ও পরাধীনতার অনেক উত্থান পতনের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক মানদন্ড তৈরি করে উর্দ্ধারণের পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।

বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, আসামের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তথা মেঘালয়, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গ সহ বাঙালির ভৌগলিক পরিচয় নিয়ে এই জাতির আদিকাল থেকেই বসবাস। যে সমস্ত বাঙালি বিজ্ঞ রাজনীতিকরা বৃটিশ আমলে একটি স্বাধীন বৃহৎ বাংলা গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা বৃটিশ এবং তৎকালীন দিল্লী কেন্দ্রিক রাজনীতিতে রাজনীতিকদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে পারেননি। এটাই ছিল বাঙালির সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। তা না হলে এতদিনে হয়তো বাঙালিরা বিশ্বের বুকে তাদের শিক্ষা দীক্ষা ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অনেক দূর এগিয়ে যেত।

মাথাপিছু আয় কিংবা বাংলা ভাষাভাষী এলাকার জাতীয় গড় আয়ের হিসাব কষলে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে তা মোটেই সুখকর নয়। দারিদ্র্যের চরম কষাঘাত শতকরা ৭৩টি পরিবারে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সকল সরকার যেভাবে মাথাপিছু আয়, জাতীয় উৎপাদন কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হিসাব কিংবা পরিসংখ্যানাদি নথিভূক্ত করে তা অতিশয় লোক ভুলানো ব্যাপার।এ হিসাব সরকারের আত্মরক্ষার হিসাব। যে কোনো সরকারের কিংবা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বাজেট ঘাটতি, কর্পোরেশন ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহ যদি প্রতিনিয়ত লোকসানের দায়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তাহলে একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে সক্ষম হয় দেশের অর্থনীতি কোন পর্যায়ে আছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, চাকুরির সংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যে কোনো শ্রমের মূল্যায়ণ থেকে অতি সহজেই অনুমান করা যায় একটি জাতির দারিদ্র্যতার মাপ কতটুকু।

বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহের যে বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় তা থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় ভারতস্থ বাঙালি জাতি যে অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলো সেই অন্ধকারে আজও নিমজ্জিত। ওই সমস্ত অঞ্চল সমূহের বাঙালিরা স্বদেশী বেনিয়াদের শোষণে জর্জরিত এবং পণ্যের ক্রেতা হিসেবে তারা লুটেরা ও কালোবাজারীদের পুঁজির যোগানদাতা। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চরমভাবে বিকৃত ইংলিশ ও বিদেশী সংস্কৃতির উগ্র থাবায়। কিছু সংখ্যক লোকসমষ্টি কিংবা উন্নত পেশাজীবীদের উন্নয়ন,একটি জাতির উন্নয়নের কোনো মাপকাঠি নয়। ঝলমলে বিপনী বিতান,পাশ্চাত্যের অনুকরণে লেফাফা দুরস্ত বৈদ্যুতিন মাধ্যমে আর  নাটকে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে অভিজাতদের ঘর-দুয়ার এবং বিলাসবহুল আসবাবপত্র সমূহ বারবার দেখানো উন্নয়নের কোনো পরিচয় নয়।

আজ বিশ্বের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কাঁচামাল থেকে তৈরি পণ্যদ্রব্য, বৈদ্যুতিক, ইলেক্ট্রনিক, ডিজিটাল কিংবা কুটির শিল্পের উন্নত পণ্য সামগ্রী, হাল্কা কিংবা ভারী যন্ত্র ও যান্ত্রিক শিল্পদ্রব্য কিছুই বাঙালি জাতির আয়ত্বাধীন নয়। কৃষি, সরকারী চাকুরী ও দৈহিক পরিশ্রম ব্যতীত বাঙালির কোনো জাতীয় পুঁজি নেই। একটি মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাবার কোনো উপকরণ কিংবা পুঁজি কিছুই বাঙালির আয়ত্বে নেই। খাদ্য এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যে জাতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না সে জাতি যতই বিত্ত-বৈভবের বড়াই করুক না কেন তার সে বড়াই ঠুনকো এবং বালির বাঁধের মতো তুচ্ছ। আমরা অতি নিকটবর্তী ইতিহাস আওড়ালে স্পষ্টই দেখতে পাবো ভারত রাষ্ট্র ভারতস্থ বাঙালি অঞ্চলসমূহকে বাজার কলোনী হিসেবেই দেখছে।

সুজলা সুফলা নদ-নদী প্রবাহিত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহের উজানে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণের কারণে বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সাথে জড়িত যে কৃষি ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থা এখন দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে ভগ্নস্তূপের মতো। অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক গোলযোগ ও দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে যাতে বাঙালির অস্তিত্বের বিলুপ্তি হয়ে যায় এটা তার একটা সুদূরপ্রসারী নীল নক্সা বলে চিন্তাবিদরা মনে করছেন। প্রতিটি নদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে বহু উপনদী সমূহের। সেই উপনদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে ছোট বড় অনেক ধরনের খাল এবং নালার।

এভাবেই জালের মতো দেশের আনাচে কানাচে বিস্তৃতি লাভ করেছে বাঙালির কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার এক প্রাকৃতিক পদ্ধতি। সেই পদ্ধতিকে তছনছ করে দিচ্ছে রাজনীতির জঘন্য কারসাজি। বিদ্যুৎ উৎপাদন আর সেচ ব্যবস্থার অজুহাতে ভারত সরকার যেভাবে একের পর এক আগ্রাসনী ভূমিকা নিচ্ছে তাতে সহজেই আধিপত্যবাদীতার সাথে তুলনা করা যায়। গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কর্মকান্ডের পর্যালোচনা টেনে আনলে দেখা যাবে ভারতে গণতন্ত্রের ভিতরে ওত পেতে বসে আছে একদল শক্তিশালী পুঁজিপতি, বুদ্ধিদাতা আমলা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দল। তাদের বাহ্যিক বেশভূষা অতি সাধারণ। তারাই ভারত সরকারের গণতন্ত্রের হর্তাকর্তা। তারা কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিকের শিক্ষা, চিকিৎসা ও চরম দারিদ্র্যতাকে উপেক্ষা করে সুপার পাওয়ার হওয়ার কামনায় দিনরাত রঙিন স্বপ্ন দেখছে। ভারতে দু’এক জাতির বসবাস নয়। বহু জাতির বসবাস। নদীতে বাঁধ মানেই বাঙালি জাতির মুন্ডপাত, একটি নীরব সর্বনাশী আগ্রাসন। বাঙালির জীবনে নদী নেই,পানি নেই এটা বিশ্বাস করতে চরমকষ্ট হয়।

হাজার হাজার বৎসরের ইতিহাসকে ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিলেও বাঙালি জীবনের সাথে নদীর সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। এটা একটা প্রাকৃতিক বন্ধন। পলিবাহিত খরস্রোতা নদী দু’কূল ভেঙ্গে নিয়ে মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিলেও বাঙালিরা এই নদীকে ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। এক অবিশ্বাস্য মায়ার বন্ধনে এই নদনদী সকলের নাড়ির সাথে মিশে আছে। সুতরাং নদীকে সচল ও উজ্জ্বীবিত রাখার দায়-দায়িত্ব সমস্ত বাঙালি জাতির। নদী-বিহীন বাঙালি জীবন মানেই হচ্ছে বাঙালির অস্তিত্বের প্রশ্নের জীবন। কাশ্মীরে চেনাব নদীর উৎস মুখে ভারত বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনায় পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে।১৯৬০ সাল থেকে সিন্ধু নদীর পানি বন্টন নিয়েও পাকিস্তানের সাথে চলছে মনমালিন্যতা। ফারাক্কা বাঁধের নির্মমতায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা সকলের জানা। টিপাইমুখ সহ বিভিন্ন নদীর পানি ও বাঁধ নিয়ে ভারতের যে আগ্রাসনী মনোভাব রয়েছে তাতে করে বাঙালি জাতি চিরতরে খাদ্য এবং অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের প্রায় তিন শতাধিক উল্লেখযোগ্য নদী ও উপনদীর অস্তিত্ব শেষ হতে চলেছে। বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো শুধু তাদের চিহ্ন বুকে ধারণ করে বেঁচে আছে।

প্রায় তিন যুগ ধরে নদীর তীরে তীরে ভারত বিভিন্ন কর্পোরেশনকে লাইসেন্স দিয়েছে কেমিক্যাল জাতীয় কারখানা তৈরির। সেই কারখানাসমূহ থেকে বিষাক্ত বর্জ্য ও তরল পদার্থ নদীর পানিতে মিশে গিয়ে এক চরম দুর্গতির সৃষ্টি হয়েছে বাঙালির জীবনে। নদীর পানি এখন আর সুপেয় নয়। নদীর মাছে আজ স্বাদ নেই, নেই মাছের বংশবিস্তারের কোনো সুযোগ। সেই নদীর পানি যেসকল তৃণ শস্যাদি শুষে নেয় তাতেও রয়েছে কেমিক্যালের প্রভাব। এভাবে এক নীরব নিঃশব্দ এবং লক্ষণহীন ক্ষয়রোগের শিকারে পরিণত হয়েছে বাঙালির জীবন এবং তার কৃষি। অপরদিকে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত কীটনাশক ঔষধ এবং সারসমূহ অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের ফলে তা মাটিতে মিশে গিয়ে বৃষ্টি জলের সাথে ভূগর্ভের নিচে চলে যাওয়াতে ভূগর্ভের পানি কিছুটা দূষিত হচ্ছে। ভূগর্ভের নিচে, মাটির স্তরে স্তরে ভেজা ভেজা নমুনায় আটকে থাকে যে পানি সেই পানির যোগানদার হচ্ছে নদীর প্রবাহ, আদ্র জলবায়ু এব বৃষ্টি। একটি এলাকায় যখন নদী, উপনদী, খাল, নালা ইত্যাদিতে জলের ধারণ ক্ষমতা কিংবা জলের প্রবাহ কমে যায় তখন ভূগর্ভের পানিও কমে যেতে বাধ্য। এমতাবস্থায় সহজেই পানির স্তরে ঘাটতি শুরু হয়। যার ফলশ্রুতিতে পানি আরো অধিক নিচে নেমে যায়। খবরে প্রকাশ ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৬৬ মিটার নিচে নেমে গেছে। এটা অতি স্বাভাবিক ব্যাপার যে পানি নিচে নেমে যাবার প্রাক্কালে মাটির স্তরের বিভিন্ন কেমিক্যাল জাতীয় পদার্থ দ্রবীভূত হয়ে তা পানির সাথে থিতিয়ে পড়ে। সেই ভূগর্ভের পানি চাপকলের সাহায্যে উপরে উঠিয়ে পান করা হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে এর বহুল ব্যবহারও হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতি আজ আর্সেনিক নামে এক ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত।

ভারতের নদীতে বাঁধ দিয়ে জলের প্রাকৃতিক গতিকে রোধ করার কারণে বাংলাদেশকে বহু অদৃশ্য দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিভিন্ন নদীর উৎসমুখে ভারত সরকার বিবেকহীন ভাবে যে সমস্ত বাঁধ দিয়ে চলেছে তা বাঙালি জাতিকে গলাটিপে হত্যা করার মতোই এক ভয়ঙ্কর অপরাধ। নদীর স্রোতের প্রবাহ ঠিক না থাকার কারণে নদীর তলদেশে পলিমাটি জমে তা ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য বর্ষা মৌসুমে এই পানি দ্রুত সাগরে পতিত হতে পারে না। যার ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে। নদীর পানিতে লবণ নেই, তাই সাগরের নোনা জল নদীর জলের স্থান দখল করে নিচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবন সহ উপকূলীয় এলাকায় গাছপালা, মাছ এবং পশুপাখীদের জীবন আজ অকাল-মৃত্যুর দাপটে বিলীন। এভাবে চারিদিকে বাঙালি জাতির জন্য সৃষ্টি হয়েছে এক চরম বিপর্যয়। এভাবে সময়ের ধাপে ধাপে মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে, অভাব অনটনে বাঙালিরা বিপর্যস্ত। অদূর ভবিষ্যতে যারা বেঁচে থাকবে তারা হবে মেধাহীন,শিক্ষাহীন, পঙ্গু,অলস, দুর্বল, জ্বরাজীর্ণ,শীর্ণ কায়া এবং বিশ্বের কাছে অবহেলিত ও চির লাঞ্ছিত।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে অনেক জ্ঞানী গুণী খ্যাতিমান দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের জন্ম হয়েছে। সমাজ এবং বিশ্ব তাদের দ্বারা অনেক উপকৃত হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু গোটা বাঙালি জাতির ভাগ্য উন্নয়নে এতদিন কেউ সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারেনি। জ্ঞান,শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতায় এই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো আজ মানানসই ফর্মূলা আবিষ্কার হয়েছে। নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ভারতের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে লড়বার মতো কোনো দুঃসাহসী বাঙালি নেতাও আজ গড়ে উঠছে। কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদীদের আস্ফালনে আর পুঁজিপতি রাজনীতিকদের দেখেই চুপ আছে বাঙালি জাতি। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা আজ শুধুই অবহেলিত। অপরদিকে রাজনৈতিক ভাবে ভারতের বাঙালিরা দিল্লীর ডান্ডার ভয়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে অন্ধকারের দিকে। অভাবের তাড়নায় কে কত সহ্য করতে পারে এই যেন তাদের প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশের বাঙালিরা কিছু সংখ্যক ধর্ম ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, চোরা কারবারী, খুনী লুটেরা ও তাদেরকে সহায়তা দানকারী রাজনীতিকদের কাছে জিম্মি এবং চরমভাবে পর্যুদস্ত। রাজনীতিকদের তাড়নায় কে কত বড় মিথ্যুক, ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসী হতে পারে এরই চলছে প্রতিযোগিতা। ঠান্ডা এবং স্থির মস্তিষ্কে চলছে মেধার নিধন।চলছে অবাধ সম্পদ পাচার এবং নিজ সন্তানদের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার হিড়িক। আজকে সারা বিশ্বে বাঙালি জাতির পরিচয় খরা এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত একটি জাতি হিসাবে।খুনী, লুটেরা এবং দুর্নীতিতে বারবার অভিশপ্ত বাংলাদেশ প্রবল জনসংখ্যার চাপ, ভবিষ্যতে পানিবিহীন শহর হওয়ার আশঙ্কা এবং বস্তি, আর্সেনিকের দাপট, খরা ও বন্যার ছোবল, বনজ সম্পদ উজাড় এবং অগণিত মানুষের সৃষ্ট আবর্জনায় জর্জরিত।

জাতিকে ভাবতে হবে সে কোন জাতি? তার ভাষা ও অতীত ইতিহাস কি? তার ভৌগলিক সীমারেখা কতটুকু? আজ বাঙালি জাতিকে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে গড়ে তোলার ইস্পাত কঠিন শপথ নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ষড়যন্ত্র চলছে যাতে করে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির মধ্যে সবসময় একটা হানাহানি ও শত্রুতা লেগে থাকে।

বাংলাদেশের বাজারে মাঝে মধ্যে ছাড়া হয় নকল টাকার নোট। প্রায়ই তুচ্ছ কারণে সীমান্তের বাঙালিদের মধ্যে উস্কানি ও বিবাদ সৃষ্টি করে নিরীহ বাঙালিদের করা হচ্ছে হত্যা। হত্যার পর লাশ গুম করে কিডনী, হার্ট, হাড়, চক্ষু, লিভার ইত্যাদি বিক্রির ব্যবসাও চলছে। গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতে এর কোনো বিচার হচ্ছে না। বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও ভারত পানি বন্টনের চুক্তিকে অগ্রাহ্য করছে এবং আন্তর্জাতিক বিধান লঙ্ঘন করে বিভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম সমস্যা বহাল রেখেছে। শুধু বাংলাদেশের তরফ থেকে নয় ভারতের বাঙালিরাও এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ভারতের কাছে যতটুকু ঋণী তারচেয়ে শতগুণে বেশি ঋণী আমাদের প্রতিবেশী বাঙালিদের কাছে। বাঙালি হিসেবে আমরা বাঙালির কাছে আশ্রয় পেয়েছি।সেদিন প্রশ্ন ছিলো না আমরা মুসলিম না হিন্দু। আমরা সে সময় অনুভব করেছি বৃটিশপূর্ব ভারতের বাঙালি। আমরা ছিলাম এক মাতৃভূমির সন্তান, এক ভাষার সন্তান। বৃটিশ আমাদের বিভক্ত করে দিয়ে গেছে বাঙালি জাতিকে চিরকাল দুর্বল ও পঙ্গু করে রাখার উদ্দেশ্যে। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে প্রতিবেশী বাঙালি। অস্ত্র, খাদ্য, ট্রেনিং তাদেরই বদৌলতে হয়েছে।

পরবর্তীতে প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য ভারতের হাত দিয়ে এসেছে। বাঙালির জন্য বাঙালির দরদ ছিলো, স্নেহে এবং সহানুভূতি ছিলো, যার ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সুযোগ হয়েছিলো তাড়াতাড়ি। কিন্তু আজ বাঙালির সেই জাতীয়তাবোধ ও মমত্ববোধ কোথায় গেলো?

আজ এই সত্য হারিয়ে গেছে কুচক্রী বাংলাদেশ ও ভারতের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে। তারা ধর্মের নামে এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে রাজনীতির মুখোশ পরে বাঙালি জাতিকে চিরতরে পঙ্গু ও নিঃস্ব করার পাঁয়তারা করছে। বাঙালিদের মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমান এই দুই জাতির ধর্মীয় পার্থক্য দেখিয়ে সবসময় নানাবিধ অপপ্রচার চালাচ্ছে। ভারতের দিল্লী এবং পাকিস্তানের পিন্ডি চায় না বাঙালিরা একতাবদ্ধ হোক।অপপ্রচারকারীরা তলে তলে ভারত-পাকিস্তানের সাথে অবাধ গুপ্ত বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় ব্যবসা ছাড়াও চাল ডাল থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি কাপড় চিনি ইত্যাদির ব্যবসা গোপনে করে যাচ্ছে আর বাংলাদেশের তৈরি পণ্যদ্রব্য অবিক্রিত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। বাঙালি বিরোধী ধর্মীয় মুখোশ পরা মিথ্যুকরা ভারতের গরু দ্বারা ঈদের উৎসব পালন করে আর হোটেল রেষ্টুরেন্টে গোমাংশের চালান দেয়। এভাবেই জনগণকে ধোঁকা দিয়ে রাজনীতি করে তথাকথিত ইসলামপন্থীরা।

দেশবাসী চায় নতুন যুবশক্তি আর দীর্ঘদিন থেকে যারা সততা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা দেখেছে তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে যে সমস্ত রাজনীতিকরা শোষক শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে তারা এলাকায় দশ কোটি টাকার খরচ করে কিছুটা উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং সেই সুবাদে সেই এলাকার জনগণ সেই লোকটিকে বারবার ভোট দিচ্ছে। সে টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসী লালন করতে পারছে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বোমাবাজ ও সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিতে পারছে। দেখা যাচ্ছে সম্পদ এবং ক্ষমতা – দুটোই সকল অপরাধের জন্য দায়ী। জনগণ শুধু চেয়ে চেয়ে এসব দেখছে। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিকার ও প্রতিবাদ করার কোনো বিশ্বস্ত প্লাটফর্ম নেই। নেই আত্মরক্ষার কোনো হাতিয়ার। পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনী এসবের বিরুদ্ধে কিছুই করছে না। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী পর্দার অন্তরালে নাকি লুটপাট সম্পদের ভাগীদার হচ্ছে। বখরা এবং চাঁদা আদায়ের জন্য প্রকাশ্য এবং নেপথ্য উভয় রাস্তাই তারা অনুসরণ করছে বলে জনগণের মধ্যে অবিশ্বাসের দানা বেঁধে উঠছে। আজকের বাঙালি জাতিকে বাঁচতে হলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সত্য সুন্দর সমৃদ্ধশালী দেশ উপহার দিতে হলে জাতির ঐক্য ছাড়া কোনো বিকল্প রাজনীতি নেই। বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে এবং বহুমুখী শোষণের নাগপাশ থেকে বাঁচতে হলে বাঙালিকে অবশ্যই কৌশলগত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আধিপত্যবাদীরা চাইবে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করে নিতে। বাঙালি জাতিকে সঠিকভাবে কিছু করতে হলে ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্ত্বকে ভুলতে হবে। ভুলতে হবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে। অগ্রসর হতে হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে। রাজনীতির নেতৃত্বে যাবার আগে ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও পরিকল্পনাকে একটি সাংবিধানিক কাঠামোতে আনতে হবে। থাকতে হবে একটি দিক নির্দেশনা ও লক্ষ্য পূরণের পূর্ণাঙ্গ এবং প্রকাশ্য দলিল। এই দলিল ভিত্তিক সবকিছুই হবে সুসংগঠিত। অতএব *বাঙালি জাতীয়তা *বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা * নিজ নিজ ধর্মীয় স্বাধীনতা *গডফাদারহীন গণতন্ত্র এবং *প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণকে রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে সর্বাগ্রে।

সময়ের সাফ কথা….বিবেকের কাছে প্রশ্ন –

শাহ্ ফুয়াদ ॥ *নিজের মাতৃভাষা বাংলা,এর ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আমরা এখন কতটুকু ভালোবাসি? ধর্মের নামে আরবি,শিক্ষার নামে ইংরেজি আর বিনোদনের নামে হিন্দি-তেই কি আমরা গা ভাসিয়ে দিবো?এ দুরাবস্থা থেকে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির উত্তরণের উপায় কি?

* নিজের মাতৃভাষা,এর ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ভালো না বাসলে,এর সাথে মিশে যেতে না পারলে কখনো ধার্মিক হওয়া সম্ভব কি?    

* বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করে নিজের উন্নতি কতটুকু সম্ভব? সমাজ ও দেশের উন্নতিই বা কতটুকু সম্ভব? বিশ্বমানব হওয়ার পূর্বশর্ত-কায়মনোবাক্যে বাঙালি হওয়ার শপথ নেয়ার দিন আজ নয় কি?

* মহান ভাষা আন্দোলন ও শহীদ দিবসের অঙ্গীকার ছিল, এদেশে বাংলা ভাষা পরবাসী হবে না। অথচ আমরা জোর গলায় আজ বলতে পারছি কি বাংলা ভাষা আমাদের অহংকার? বৈদ্যুতিন মাধ্যমে হিন্দি অনুষ্ঠানের দাপটে শহরে, বন্দরে, গ্রাম-গঞ্জের সর্বস্তরে দেশীয় ভাষার অনুষ্ঠানগুলো আজ অপাংক্তেয় হয়ে উঠছে কেন?

* বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে বাংলা ভাষা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে,বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার সম্মানজনক ব্যবহার আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি? তথাকথিত শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষদের আচার-আচরণে নিজ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি আজ কতটুকু প্রতিষ্ঠিত?

* মাতৃভাষার সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনদানকারী একটি জাতির মাতৃভাষার প্রতি কোনো প্রকার নেতিবাচক মনোভাব দুর্ভাগ্যজনক নয় কি?

* ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে,বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে,বিভিন্ন রকমের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না কেন?

*রাজধানী ও দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো যেভাবে ইংরেজি ভাষার বিজ্ঞাপন বোর্ড ও বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে তাতে মনে হয়,দেশের মানুষ বাংলা বোঝে না,অথবা বাংলা ভাষাভাষী লোকই এদেশে নেই। জাতীয় জীবনের এই সংকীর্ণতা দূর করতে সবাইকে এগিয়ে আসা আজ জরুরি নয়কি?

* বিশ্বায়নের যুগে বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষা শেখার গুরুত্ব কেউ অস্বীকার করছে না। কিন্তু তাই বলে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে ভাষার যে জগাখিচুড়ি অবস্থা এখন চলছে তা কি কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য? এই অবস্থায় আত্মমর্যাদাশীল একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা কখনও সম্ভব কি? কে দেবে এর উত্তর?   

* যারা আজ বাংলা ভাষাকে বিভিন্নভাবে অসম্মান ও উপেক্ষা করে বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি এদেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে তারা কি ৭১’এর সে রাজাকার বা তাদেরই উত্তরসূরী?

* মহান ভাষা আন্দোলন ও অমর শহীদদের আদর্শ অর্থাৎ মাতৃভাষার মর্যাদা সবার ওপরে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গঠনকরা সম্ভব কি?

দৈন্যতা কোথায়?

সংলাপ ॥ বর্ষ-চক্র ঘুরে আবারো মহান একুশ সমাগত। চলছে বরণীয় আয়োজন। বায়ান্নোর স্বাধীকার আন্দোলন ছিলো যার একান্ত প্রয়োজন। যে প্রয়োজনের শিকার হয়েছিলো – সালাম, বরকত, রফিক, সফিক, জব্বারসহ আরো কতো নাম না জানা মহাবীর। একুশ আসে একুশ চলে যায়। বায়ান্নোর পর থেকে নিঃসঙ্গ রক্তাক্ত একুশ জাতির শ্রদ্ধাবনত চিত্ত আর মিনারের বেদীভরা পুষ্প স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে কেঁদে যায় বার বার। দোয়েল কোয়েল আর বিহঙ্গের কন্ঠেও ভোরের ভারী করা বাতাসে শোনা যায়, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি’। চিরভাস্বর এই গানের সুর ও ছন্দ বাঙালি ভুলে নাই বটে। কিন্তু ভাষা শহীদের রক্ত স্মৃতি মাতৃভাষার পাশাপাশি একটা চেনা-অচেনা পুরনো শক্তি যেন নীরবে নিঃশব্দে ভুল করার পথ দেখিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে উর্দু-হিন্দীর সুর সঙ্গীতে প্রায়শই ভ্রান্ত সিন্ধুর কৃত্রিম জলরাশিতে ডুবে যাই আমরা। নিঃশ্বাস ফেলার জন্য ভেসে উঠে দেখি, রক্ত ঝরা একুশ আবারো দাঁড়িয়ে। আবারো শুনি কপোতাক্ষ, ধানসিঁড়ি আর বুড়িগঙ্গার অমর স্রোতে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’। দুঃখজনক হলো সরকারী বেসরকারী অফিস আদালতে ব্যক্তিত্ব বিকাশের অমোঘ টানে রক্ত রঞ্জিত অ, আ, ক, খ -এর পরম গুরুত্বকে আজও আমরা প্রবাসী স্রোতে বিলিয়ে দিতে চাই!

নিজের ভাষা মনে প্রাণে জেনে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান রেখে সর্বত্র গর্ব ভরে প্রাধান্য দিয়ে অন্য যে কোনো ভাষা শিখতে কোনো আপত্তি নেই। সে তো জ্ঞান পরিধির প্রসারতা মাত্র। মাতৃভাষা ভালো করে না জানলে অন্য ভাষার স্বাদ এবং তার বিষয়গত নির্যাস সহজে হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। যায় শুধু দুইয়ের মাঝে নিজকে উপস্থিত করে রাখা। অনেকে মনে করেন – এটাই পান্ডিত্য। আসলে পান্ডিত্য তো ভাষা চর্যারই মূল অংশ। একটা জাতিকে ধ্বংস কিংবা কব্জা করে রাখার মূল পূর্ব শর্তই হলো সে জাতির আপন ভাষা কেড়ে নিয়ে অন্য ভাষা চাপিয়ে দেয়া। ১৯৫২ সালে বাঙালির জাতীয় জীবনে তাই তো ঘটতে যাচ্ছিলো। সে সময় আমরা অতি সতর্ক, ঐক্যবদ্ধ এবং নিবেদিত ছিলাম বলেই ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙ্গে দেয়া সম্ভব হয়েছিলো। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাতৃভাষা বাংলার শঙ্কাহীন স্বাধীনতা। প্রশ্ন জাগে আজো সে ভাষা বিস্তারের সফলতা অর্জিত হলো কতটুকু?

ভাষার শঙ্কাহীন স্বাধীনতার জের ছিলো বলেই তো প্রনীত হয়েছিলো বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭। তারপর থেকে বাংলা ভাষা চালু হয়ে থাকলেও সে চালু হলো ধরি মাছ না ছুঁই পানি – সাদামাটা। ইংরেজী প্রীতি শেষ হয়নি। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আরবী প্রীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। যার মধ্যে ইসলামের মূল্যবোধসমূহ কতটুকু আছে তা নিয়ে চিন্তাবিদগণ শঙ্কিত।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আরবীতে কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে শুরু করে আমরা গর্ববোধ করি। এ আমাদের কিসের দৈন্য। পৃথিবীর বুকে অন্য ভাষাভাষি রাষ্ট্র যেমন নিজের ভাষাকে মাথায় করে নিজ ভাষায় কথা বলছে শত চেষ্টাতেও তার মুখ দিয়ে ইংরেজী বা আরবী বের করা যায় না তখন আমরা কোথায়? এই প্রীতি কি আমাদের উন্নতির পথে সহায়ক হয়েছে? এমন প্রমাণ কি কেউ দিতে পারবেন? নাকি দাসত্বের আবরণ খুলে ফেলতে পারিনি আমাদের স্বভাব ধর্মের মধ্যে? আমরা তো জানি গুণীজনেরা বলে গেছেন যে নিজের ভাষায় পারদর্শী নয় সে কোনো ভাষায় পারদর্শী হতে পারে না।তাহলে এটা কি ভুল?

তাই বাংলার স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী মহল তথা বর্তমান সরকারের নিকট তথা সমগ্র বাঙালির নিকট আমাদের আকুল আবেদন বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে জাতীয়করণ করুন যাতে লেখা ও বলায় এবং সর্বস্তরে বাংলা না থাকলে তা বাংলাদেশের মাটিতে গ্রহণযোগ্য না হয়।