প্রথম পাতা

মুজিববর্ষের ক্ষণ গণনা শুরু ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হতে

অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ এ, দেশে ফিরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়কে ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন- ‘আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে’। কৃতজ্ঞতা চিত্তে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলার মায়েদের-সন্তানদের কথা স্মরণ করেন। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-বুদ্ধিজীবীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বাঙালির অনগ্রসরতা অস্পৃশ্যতা সম্বন্ধে বঙ্গমাতা কবিতায় লেখা বিশ্বকবির আক্ষেপের জবাব দিতে গিয়ে বলেন-‘কবিগুরু আপনি বলেছিলেন-সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙ্গালি করে মানুষ কর নি’। আপনার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা আজ মানুষ হয়েছে। এত আত্মত্যাগ দুনিয়ার কোথাও হয়নি। কেউ আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারেনি।

দীর্ঘ বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের নানা দিক তুলে ধরেন। রাষ্ট্রের চরিত্র, নীতি কাঠামোর বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। জাতির জনকের সেই সেই ভাষণটি আমরা চাইলেই দেখে নিতে পারি।

‘১৯৭২ থেকে ২০২০’ এই দীর্ঘ সময়ে জাতির জনকের বাংলাদেশ কোন পথে অগ্রসর হয়ে কোথায় অবস্থান করছে সেটিই এখন দেখার বিষয়। খোদ বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের শ্রমে-ঘামে গড়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কিংবা ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলো সেই সত্য কতটা অনুধাবন করেছে?

আজকে চুলচেরা বিশ্লেষণের সময় এসেছে। শুধু বিশ্লেষণ নয়, সময় এখন সত্য বলার এবং সত্য প্রতিষ্ঠার।

দেশের ভিতরে অন্য কোন দেশ থাকতে পারে না। বাঙালি সংস্কৃতির রঙ অন্য কোন রঙে ফিকে হতে পারে না। আমরা অন্যের মতো হতে পারবো না, নিজেদের ধরে রেখে অন্য সব সুন্দরের পুজারী হতে পারি কেবল। আমাদের ভূগোল-সংস্কৃতি-প্রকৃতি কারো চাওয়াতে পাল্টানো যাবে না। এ দেশের প্রতিটি মানুষের রক্তধারায়-যাপিত জীবনের উৎসধারায় বয়ে চলেছে এক শ্বাশত চিরন্তন সত্য ধারা, সেখানে মিশতে হবে, কান পেতে শুনতে হবে সুন্দরের সেই জয়গান। যতটুকু নবায়ন হবে সেই উৎস ধরে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-‘বাঙালির পল্লীর জনজীবনের গভীরে রয়েছে উৎস। সেই উৎস ধরেই নির্মিত হবে আমাদের সব আয়োজন’।

১৯৭১ আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছে। এই স্বাধীনতা অর্থবহ করার সংগ্রামই তো অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। ’৭১ ছিল মুক্তি সংগ্রামের একটি ধাপমাত্র।

মুক্তি সংগ্রাম কখনো থামেনা। অজ্ঞতা থেকে উৎসরিত হয় যে অন্ধকার, সে অন্ধকারের মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া- পলায়নপরতা  থেকে মুক্তির যে সক্ষমতা তাই তো মুক্তির সংগ্রাম।

যে পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেই পথ কতটা কঠিন, কত ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় কোথায় বাধা সেটি নির্নয় করে এগিয়ে চলার নামই তো দূরদর্শীতা। এ বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে মুজিববর্ষ ক্ষণ গণনা। গৃহীত হয়েছে নানা আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। দলীয় কর্মসূচীর বাইরে সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সারা বছরব্যাপী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। সেসব কর্মসূচীর হয়তো যৌক্তিকতা রয়েছে তবু অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ণের জায়গাটি দেখার সময় এসেছে। বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে যারা এখন মুজিববর্ষ উদযাপন নিয়ে তৎপর সেসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, কাজের মান, তাদের প্রতি জনগণের ধারণা মুজিববর্ষ পালনের সত্য তুলে ধরতে পারে। আমলাতান্ত্রিকতার নামে জনগণের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার সকল রুট বন্ধ করার কাজটি যদি না হয়, তবে মুজিববর্ষ উদযাপনে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেসব কাজ কোন উপকারে আসবে? সেবার নামে, শিক্ষার নামে, শিক্ষক চিকিৎসকেরা যদি নিজেরাই নিজেদের কর্ম মূল্যায়ণ করতে না শেখেন তবে তারা কোন মুজিববর্ষ পালন করবে? এসব লোক দেখানো কাজ আমাদের এগিয়ে চলার পথে অন্তরায় হতে বাধ্য। 

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা শুরু হলো’।

ইতিহাস সচেতন নির্মোহ দেশপ্রেমিকেরাই কেবল অন্ধকারের দিকটি জানেন। জানেন কোন পথে বাঙালির বিজয় সম্ভব হয়েছে। জানেন পথের বাঁকে বাঁকে কোন সত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু যারা বহু পড়াশুনা করেও সত্য উপলব্ধির পর্যায়ে আসতে পারেন নি তারা অন্ধকারের আরেকটি দরজা উন্মোচন করেছেন মাত্র। এরা বর্ণচোরা চরিত্রহীন ঘাতক হয়ে বাধার সৃষ্টি করছেন। আত্মকর্ম বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দেখতে হবে নিজেদের আমলনামা। আলো এবং অন্ধকার তো পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলে। আজকে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশের আলো বাতাস মাটিতে বসে নিজেদের কথা বলতে পারছি, নিজেদের স্বপ্ন-সম্ভাবনার জয়গাঁথা নিয়ে আত্মতুষ্ট হচ্ছি, নিজেদের অধিকার দাবী দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হচ্ছি এসবই অন্ধকার থেকে আলোর নবতর পথে যাত্রা। বিপরীতে অপরাধ মেনে নেয়ার প্রবণতার নামও অন্ধকার। আপোষ কিংবা মেনে নেয়া কখনো কখনো বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে পড়ে।

আমরা কি দেশ বিরোধী মানবতা বিরোধী সমস্ত অকল্যাণকর প্রচেষ্টা কে রুখে দিতে পেরেছি? অলীক কল্পকাহিনী নির্ভর খোরমা খেঁজুরের গল্পের বিপরীতে নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনাদর্শ তুলে ধরতে পারছি? নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এর শিক্ষা দর্শনকে  বিকৃত করার প্রচেষ্টার বিপরীতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার নামই তো আলোর পথে অগ্রসর হওয়া। যদি না পারি তাহলে কি অন্ধকার থেকে আলোর পথের এই যাত্রা, কোথায় কোন অবস্থান কোন ফাটকে আটকা পড়েছে তা খুঁজে বের করার নামই আলো। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এঁর  মহান জীবনের  গভীরতাকে বাস্তবতার নিরিখে অনুধাবন না করে কল্পকাহিনী নির্ভর ওয়াজ নসিহত আমাদেরকে অন্ধকারের গভীর তিমির নিয়ে যাবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমরা এদিকটা উপেক্ষা করেই এগিয়ে যেতে চাচ্ছি, যা সম্ভব নয়। এখানে কাজ করতে হবে।

অন্ধকার থেকে আলোর পথের এই যাত্রা সব সময় চলমান। জানি এই পথটি কঠিন, মুখের কথা নয়। কিন্তু যারা মুজিব আদর্শকে ধারণ-লালন-পালনের কথা বলেন তারা যদি নিজেরাই হন্তারক হয়ে উঠেন তবে এই সীমাহীন নির্লজ্জতার জবাব আমরা কোথায় খুঁজবো?

শুধু দলীয় কর্মী নন, শুভাকাঙ্খি হয়ে আসা শিক্ষক বুদ্ধিজীবিদের একটি শ্রেণীও আজ ধান্দাবাজ হয়ে উঠেছে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই ক্ষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- এই দেশ সবার। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রীষ্টানের রক্তে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। তিনি তার ভাষণের শুরুতে ছাত্র-মজুর-কৃষক-শ্রমিকের কথা বলেছেন। আজকে স্বাধীনতার এই ৪৯ বছরে আমাদের কৃষকরা কেমন আছেন, কেমন আছে শ্রমিক মজুর খেটে খাওয়া মানুষেরা? উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় কি তারাও সমান তালে যুক্ত হতে পারছেন? তথ্য পরিসংসখ্যান বলছে আরো অযৌক্তিক দূরত্ব তৈরী হয়েছে। শিক্ষার নামে দেশে কোন কোন শিক্ষা পদ্ধতি জারি রয়েছে, তা চুলচেরা বিশ্লেষণের দাবী রাখে। স্বাধীন দেশে শিক্ষার নামে জাতি-মানবতা বিরোধী পশ্চাৎপদ শিক্ষার ধারা আজও অব্যাহত। যারা যুক্তি মানে না, সৌন্দর্য মানে না, আইন-কানুন সংবিধান মানে না, তারা আখেরে কোন সেবা নিশ্চিত করবে? না কি বিভেদ-বিভাজনের দেয়াল শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ কোন বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে আমাদেরকে, এমন প্রশ্ন তুলতেই হবে।

আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে পারিনি। এটা তো সত্যি যে হাজার হাজার মানুষ কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সহিংসতার স্বীকার হয়েছে। কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রামু নাসিরগর ভোলার মানুষ চরম সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে। ’৭২ এর সংবধিানের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসেবে বাজারজাত করতে সফল হয়েছে। চতুর এসব বর্ণচোরা ঘাতকেরা ধর্মভীরু মুসলমানদেরকে প্রগতি বিরোধীতার কাতারে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। এসব তৎপরতার বিপরীতে কি কোন বাস্তব সম্মত কার্যক্রম আদৌ গ্রহণ করা হয়েছে?

ইসলামিক ফাউন্ডেশন তো সময়ের পথপরিক্রমায় নামেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন হয়ে আছে। তাদের কার্যক্রম পবিত্র ইসলাম ধর্মের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তুলে ধরতে ব্যর্থ। লুটেরাদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি, সামাজিক দুর্বৃৃত্তায়নের স্বীকার হয়েছে আমাদের সাধারণ মানুষ, আমরা কি সেই অন্ধকারের দিকটি অন্বেষণ করতে পেরেছি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়- চরিত্রহীনদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে কখন যে নিজেরাই চরিত্রহীন হয়ে গেছে তা আমরা নিজেরাই জানি না। সত্য বড় নির্মম। ৭৫’ এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা যাদের জন্য অনিবার্য ছিল, আর যারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, উভয়েই এই দেশের বাসিন্দা। আমরা কি আজও ’৭৫ এর ১৫ আগষ্টের কারণ যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি। খুঁজে বের করতে পেরেছি কেন বাঙালির উত্থানকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় বারবার। আমরা কি আজও উপলব্ধি করতে পারি কেন শেখ হাসিনাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়? আমরা উপলব্ধি করতে পারিনা বলেই নিজেদেরকে বিণির্মান করতে পারি না। বিদেশের মাটিতে এক পা আর দেশের মাটিতে আরেক পা রেখে কখনো দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। অনুসন্ধান বলছে বহু তথকাথিত দেশপ্রেমিক! স্বাধীনতার পক্ষের লোকেরা বিদেশের মাটিতে আরেকটি ঠিকানা গেড়েছেন, লুটপাট করে টাকা পাচার করেছেন। এসবই সীমাহীন অজ্ঞতার গহবরে জন্ম নেয়া অন্ধকার। যখন দেশরতœ শেখ হাসিনা বারবার সততার কথা বলেন, মোটা কাপড় মোটা চালের কথা বলেন তখনো আমরা তার এই কথার অর্থ বুঝিনা। তারই দলীয় নেতা কর্মীরা যখন তার এই নির্দেশনাকে থোড়ায় কেয়ার করে যা খুশি তা করেন তখন কোন অন্ধকারের মধ্যে পড়ে থাকে দেশ ও জাতি?

সততা মুখের কথা নয়। আচরণে আমলনামায় তা ধরা পড়ে। এখনো বহু নেতা কর্মী ভিতরে ভিতরে লুটেরা দস্যূ সংস্কৃতি ধারন করে আছে। সেই অন্ধকার থেকেই মুক্ত হতে হবে সবার আগে। দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সব সময় দেশের পক্ষে এই সরল সত্য উপলব্ধি করতে না পারলে কোন উন্নয়ন টেকসই হবে না।

সময়ের সাফ কথা….স্ব-স্ব কর্তব্য পালনে আন্তরিক হই নতুন বছরে….

সংলাপ ॥ ২০১৯ কে বিদায় জানিয়ে আরও একটি নতুন বছরে পা দিল বিশ্ব। ভালো-মন্দে কেটেছে আগের বছরটি। নতুন বছরে আমরা কেবল ভালোই চাইব। চাইব সারা বিশ্ব শান্তিতে থাকুক। বিশ্ববাসীর কল্যাণ হোক। বিগত বছরের যাবতীয় গ্লানি আর অপূর্ণতার পুনরাবৃত্তি চাই না। চাই কলুষমুক্ত বিশ্ব, পৃথিবীর আকাশ হোক যাবতীয় অকল্যাণের মেঘমুক্ত। ২০১৯-তে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা আর যুদ্ধের দামামা কোটি কোটি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল, শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে চকচকে মোড়কে পাল্টা অশান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টাও দেখতে হয়েছে বিশ্ববাসীকে। মুখে যত বড় বড় কথাই বলা হোক না কেন, ক্ষমতার দাপাদাপি আর রাজনৈতিক মিথ্যাচার যে শেষমেশ সাধারণ মানুষের উপরই কঠিন আঘাত হানে, বিগত বছরে তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়েছে অসংখ্য নিরীহ প্রাণ। সামান্য সুখ আর স্বস্থির বেশি চাহিদা যাদের নেই, যারা কেবল কামনা করেন ‘আমার সন্তান থাক দুধে-ভাতে,’ তারাও নানান ক্ষমতাধরের দাবার চালে অসীম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। এমন আর চায় না দেশবাসী ২০২০-তে।

১৬ কোটি বাঙালির কাছে ২০১৯ সালও অপ্রত্যাশিত এক সংকট নিয়ে হাজির হয়েছিল। সাধারণ মানুষের জীবনে অচিরে এক মহাশক্তিধর আশা জাগিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বাংলার আকাশে প্রধানমন্ত্রীর দেখানো সেই স্বপ্নের ধূমকেতুর দর্শন বাংলার সাধারণ মানুষের নজরে আসেনি। নতুন বছরে ওই দুর্ভোগের অবসান ঘটে বাঙালির জীবনে নতুন দিনের আলো দেখা দেবে, এমন প্রত্যাশায় বুক বাঁধতে চান লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ।

একদা সারা ভারতবর্ষে তথা এশিয়ায় বাংলার স্থান ছিল একেবারে সামনের সারিতে। তারপর অনেককাল কেটে গিয়েছে। নানা কারণে এদেশ মাঝের একটি পর্বে পিছিয়ে পড়েছিল অনেকটাই। পরে সেই পশ্চাদগামিতাকে রুখে দিয়ে ফের প্রগতির পথের পথিক হতে পেরেছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে, শিক্ষাবিস্তারে, বিজ্ঞানসাধনায়, অর্থনৈতিক প্রগতিতে এখনই বিশ্বের বহু দেশকে পিছনে ফেলেছে এই বাংলাদেশ। তবু এতে আমরা আত্মসন্তুষ্টিতে আপ্লুত হতে রাজি নই। আমরা এখনও স্বপ্ন দেখি বাংলা আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লভে। ধর্মে মহান হবে, কর্মে মহান হবে। নতুন বছর বাঙালির এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত হওয়ার দিকে আরও বেশ কয়েক কদম এগিয়ে দিক, যাবতীয় অপূর্ণতা, বিভ্রান্তি আর ব্যর্থতাকে সহ¯্র যোজন দূরে হঠিয়ে দিয়ে এই বাংলায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক আমাদের মাঝে মহামিলনের দীপশিখা। সেই শিখার আলো মশালের রূপ নিয়ে দূর করে দিক যাবতীয় ভেদাভেদ, অসাম্য, অবিচার আর জীবন-যাপনে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। এই প্রত্যাশা পূরণে প্রতিটি বাঙালিকেই সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করার সময় এসেছে। স্ব-স্ব কর্তব্য পালনে আন্তরিক সক্রিয়তা, সহ-নাগরিকের প্রতি সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কঠোর মানসিক শক্তির প্রয়োগই আমাদের স্বপ্ন পূরণের পাথেয় হতে হবে। শুভ হোক নতুন বছর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

নিজেদের চরিত্র না বদলালে দেশ ও জাতির চরিত্র বদলায় না

সংলাপ ॥ বিশ্ববাজার এবং বিশ্বমহাজনদের নিয়ন্ত্রিত উপমহাদেশে আর্থ-সামরিক নীতির স্বীকৃতি পেয়েছিলো বাংলাদেশ। দুর্নীতি দমনের নামে যে সন্ত্রাস এবং লুটপাট চালিয়েছিলো তদারকি সুশীলরা এবং তার আগের পাঁচ বছর তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা, তা দেখে পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা আরম্ভ করেছিল। ইতিহাস বলছে, আমলা-সুশীল-সামরিক শাসনের থেকে যে-কোনও নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের শাসন ব্যবস্থা অনেক ভাল। পঁচতে পঁচতে তারা এক জায়গাতে থামতে বাধ্য হয় বলেই একসময় তারা বদলায়। সীমাহীন মিথ্যাচার, ভন্ডামী, বেঈমানী, অকৃতজ্ঞতা থেকে তারা সহজে নিজেদের বদলায় না। কিন্তু জনতার চাপ পড়লে এবং তাদের ওপর আঘাত আসলে বদলায় অতি দ্রুত।

জমির চরিত্র বদল চাইলে, কৃষকের কৃষি-উত্তর বদল হয় না, মানুষের সংস্কার বদলাতে চাইলে, নিজের চারিত্রিক বদলও হয় না। এগুলোর বদল করতে গেলে বদলাতে হবে নিজেকে, ত্যাগ করতে হবে অনবরত মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভ্যাস। নিজের মিথ্যা বলার অভ্যাস, বলতে বলতে একজন মাদক-আসক্তের মতো মিথ্যাবাদী হয়ে যায়। মসজিদের অনেক ইমামদের মতো কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হাদিসের নামে মিথ্যা বলা শুরু করে।

রাজনৈতিক ইসলামের নামে একসময় মসজিদের ইমাম মসজিদের নামাজীদের ডাকলেন মুসলমানদের উদ্ধার করার নিমিত্তে জেহাদ করার জন্য। মিথ্যার মজা হচ্ছে দুধ দোয়ার মতো, মনে হয় বালতি ভরে গেছে, রেখে দিলে একটু পরে দেখা যাবে ২০০ গ্রাম! অল্প সময়ে ধর্মের কথা বলে প্রচুর লোক জমায়েত হয়, সব মানুষকে তো আর চিরকাল বোকা বানানো যায় না। বুঝতে পেরে তারা সরে পড়ে, মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্তরে সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে, ¯্রফে গোষ্ঠী লাভের জন্য ধর্মের আবেগে সুড়সুড়ি দেয়। কৌশল ফাঁস হয়ে যায়। মানুষ দ্বিগুণ ঘৃণা করে। নিজের ধর্মের অনুশীলন করে ধ্বংস হওয়া শ্রেয়! ত্যাগ করতে হয় মাথা-মুখ-হাতের স্ববিরোধিতা। মুখে বলব কৃষক-কৃষক, মাথায় থাকবে জমির বা সম্পত্তির চিন্তা, কাজে করব আধিপত্যবাদীদের পুঁজির সেবা-আজকের মানুষ তা বুঝতে পারে। ত্যাগ করতে হয় নামের আকাঙ্খা, ধ্বংস করতে হয় ‘আমিত্বের আবরণ’। কেউ যখন সত্যি সত্যি বদলের কাজে হাত লাগান, তার আকাঙ্খাগুলো ধ্বংস হয়। তিনি নিজেও বদলে যান। যখন দেখা যায় তিনি বদলাচ্ছেন না, অথচ বদলের কথা বলছেন, মানে তিনি নিজের বদল চাইছেন না।

মানুষ কেন চোরের জায়গায় ডাকাত এনে বদলানোর পথে যাবেন? সুখের থেকে স্বস্থি ভালো। বাংলায় স্বৈরশাসকেরা ভেবেছিল মিথ্যা, হুমকি আর মস্তানি করে বাংলাকে শাসন করে  যাবে। করেও ছিল, শারীরিক মানসিকভাবে মানুষকে সন্ত্রস্ত করেছিল। অনবরত ভয় দেখিয়ে মানুষকে বাধ্য করা হয়েছিল অনুসরণ করতে। শান্তিপ্রিয় মানুষ গুন্ডামি আর ভন্ডামির অভ্যুত্থানের মুখে নিরাপত্তা-বিধানকারী রাষ্ট্রকে যখন দেখল, গুন্ডামি আর ভন্ডামির সামনে অসহায় মানুষ ঘরে ঢুকে গেল। মস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করে বাঁচতে চাইল। যা ঘটেছিল ২০০১ এর নির্বাচনে। নিস্ক্রিয় প্রতিরোধ মানুষকে লুটেরাদের হাতে ঠেলে দেয়। কিন্তু কতদিন? দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ খালি হাতেই তাদেরকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দেয়। ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তান্ডবের ফল হলো অনেক মিথ্যার সঙ্গে কিছু সত্যও মানুষ বর্জন করলেন। যেমন প্রাক্তন শাসকদের দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র সেগুলোও মানুষ মনে রাখলেন না। না-রাখাটাই স্বাভাবিক। আগের সরকাররা যে এসব ক্ষেত্রে সমস্ত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। বিশ্বব্যাংক এবং আমেরিকাও সুযোগ নিয়েছিল। সত্যিকারের দুর্নীতিগ্রস্তরা জাল কেটে বেরিয়ে গেলো। সন্ত্রাস দমনের নামে রাজনীতিক ও সত্যভাষী মানুষের ওপর নামিয়ে আনা হয়েছিল অবর্ণনীয় অত্যাচার। নির্বাচনী বিধি তৈরির নামে বাধ্য করা হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে। কিন্তু সব পাল্টে দিলেন বাংলাদেশের জনগণ। আড়ালে চলে গেলো রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তি, দুর্নীতি আর গ্রামবাংলার হা-অন্ন, হা-অন্ন চিৎকার। একমুঠো আটার জন্য সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রামবাংলার মানুষ মরেছে। জড়ো হচ্ছিল এবং সুযোগ নিচ্ছিল নানা অনভিপ্রেত শক্তি। বড় গলা করে সস্তায় বাজিমাত করতে চেয়েছিল ধর্মের নামে রাজনৈতিক ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীরা। লোকের হাতে পয়সাও নেই। ১৬ কোটির দেশে শুধু হাহাকার। ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে বন্ধ হয়ে গেল আমদানি-চাল, ডাল, গম, বিদ্যুৎ আর গ্যাস নিয়ে চুক্তির নামে একতরফা হুমড়ি খেয়ে পড়ল, হাহাকার রূপান্তরিত হলো ক্ষোভে। প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার জন্য মানুষ অন্যপথে ভাবতে শুরু করেন। ভাবনাটা বার করে দিতে না পারলে পুরো মাথাটাই যে নষ্ট হয়ে যেতো। তদারকি সরকার তদারকির অবসান ঘটিয়ে মানুষের উত্তেজনা প্রশমনের জন্য নির্বাচনী ঘোষণা করতে বাধ্য হলো নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্য। যেহেতু তারা যে মই দিয়ে গাছে উঠেছিলেন সেই মই তাদের অজান্তে কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

তাদের স্বস্থি নির্বাচিত সরকার তাদের বিচার আজো করেনি। সুতরাং বদলান বললেই বদল হয় না। ‘বদলানো’ একটা প্রক্রিয়া, যার মধ্যে নিজেকে বদলিয়ে নিয়ে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হয়। প্রক্রিয়া মানেই ‘গতি’, ভাঙা রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি নয়।

এক অস্ত্র বার বার ব্যবহার করলে ভোঁতা হয়ে যায়। গতিতে থাকলে পরিবর্তন আসে, এই পরিবর্তনে থেমে থাকলে দেশ ও জাতি পিছিয়ে পড়ে হাবুডুবু খেতে বাধ্য। আর রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকরা ‘ভাঁড়ে’ পরিণত হয়ে জনগণের কাছে হাস্যকর হয়ে ওঠে।

পরিবর্তন আনে বিকাশ। প্রতিটি স্তরে বিকাশ-সচেতন থেকে নিজেকে পাল্টে নিতে হয়। একজনের মুখ থেকে ‘বদলে দেয়ার’ আহ্বান তখনই মানুষ গুরুত্ব দেন, যখন দেখেন আহ্বায়ক নিজে বদলানোর প্রক্রিয়াতে নিজেকে বদলেছেন। বদলেছেন নিজের স্বভাব, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, জীবন-জীবিকার সংগ্রামে। না-হলে ব্যাপারটা হয়ে যাবে যাত্রাদলের অভিনয়ের মতো।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চারণভূমিতে আতঙ্ক!

সংলাপ ॥ সুদূর অতীত কাল থেকেই আমাদের বাংলাদেশ বা বঙ্গদেশে বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠী শাসন করে গিয়েছে। স্থানীয় জনগণ নিজেরাই সেই শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে নিয়েছিলেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। একই সঙ্গে শাসকও তার অধীন জনগোষ্ঠীকে নিজের আপন ভেবেই কাজ করে গিয়েছে। সুদীর্ঘ কাল এই ভাবেই চলেছে। বৌদ্ধ আমলেও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিহার তৈরি হয়েছে। শিক্ষাদান হয়েছে। প্রাচীন বঙ্গদেশ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের ঠিক আগে পর্যন্ত যে সব শাসকেরা এই দেশ শাসন করে গিয়েছেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন সচেতন ভাবেই। চৈতন্যের বাংলায় সেই সম্প্রীতি এখনও লোকমুখে খুঁজে পাওয়া যায়। বৈষ্ণব সাহিত্যেও সেই ছবি লক্ষ্য করা যায়।

যদিও হিন্দু বাঙালির মধ্যে কৌলিন্য প্রথার সংস্কার করেন বল্লাল সেন। তবুও বাংলায় ইসলামি শাসন প্রবর্তনের সময়ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঘাটতি ছিল না। বাংলার ইসলামি শাসনের স্বর্ণযুগ ছিল হুসেন শাহের আমল। সেই আমলে বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ছিল চোখে পড়ার মতো।চৈতন্য এবং তাঁর অনুগামীদেরকে ভক্তিপ্রচারে হুসেন শাহ সহায়তা করেন। তাঁর প্রশাসনে উচ্চ পর্যায়ের হিন্দু কর্মকর্তা ছিলেন রূপ গোস্বামী আর সনাতন গোস্বামী।

কিন্তু ব্রিটিশ শাসন আমলে ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি ধীরে ধীরে বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বিষবাষ্পের সৃষ্টি করে। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর যে পরিমাণ উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি হয়, তাতে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত অঞ্চলেই উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ সর্বত্র জনবিস্ফোরণ হয়। তবুও এপার বাংলার মানুষ ওপার বাংলার শিকড় বিচ্ছিন্ন মানুষদেরকে ধীরে ধীরে আপন করে নেন। শত যন্ত্রণার মধ্যেও ক্ষোভ-দুঃখ নিয়ে ভিটেমাটি হারানো মানুষেরাও এখানকার মানুষদের সঙ্গে মিশে যান।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, এই বহুচর্চিত বিষয়গুলি এখন আবার লিখতে বসা কেন? আসলে এক বিশাল ভয় বা আতঙ্ক ধীরে ধীরে গ্রাস করছে মনে। এই রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলায় সম্প্রীতির যে পরিবেশ এবং তা বজায় রাখার যে স্পৃহা মানুষের মধ্যে ছিল, তা কেমন যেন এখন ঠুনকো হয়ে ভেঙে পড়ছে। শিক্ষিত সমাজের এক অংশ যখন যুক্তিকে হারিয়ে, বিক্রিত বিকৃত আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন বলতেই হয়, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা আমাদের সমাজের অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। চতুর্দিকে যা চলছে, তা দেখে ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ এই কথাটাও আজ সত্যিই কেমন যেন ফিকে ফিকে লাগছে।

বর্তমান এই ঝরা সময়ের মাঝে এই কথাটাই বারবার মনের ভিতর নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, এর জন্য কারা দায়ী? সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে হবে। তবে যদি অশান্ত এই সময়ে শান্তি ফিরে আসে। ভোটের কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে রাজনীতি চলেছে, সেটা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। কিন্তু তার জন্য ফল ভুগতে হচ্ছে সব মানুষকে। ভোটসর্বস্ব রাজনীতির শিকার আমাদের এই সম্প্রীতির চারণক্ষেত্র বাংলাতেই এখন অশান্তি আছড়ে পড়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রীতির শান্ত, স্নিগ্ধ বার্তা আজ ঘৃণা আর ভয়ের কালো থাবায় দিশেহারা। হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে হানাহানির মধ্যে।

সাধারণ মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু লাগাম হারাচ্ছে। যে পরিমাণ হিং¯্রতা ক্ষোভ প্রত্যেকের মনের মধ্যে উস্কে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাতে সভ্যতার অর্থটাই বদলে যাচ্ছে ক্রমাগত।

আমরা আধুনিক হচ্ছি বলে দাবি করি। সত্যিই কি তাই? ক্রমশ বন্য হিং¯্রজন্তু হয়ে যাচ্ছি না তো? কেই কারো ধর্ম নিয়ে বাজে কথা বলতে যেমন দ্বিধা করি না, তেমনি ধর্মীয় উগ্রতায় কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করতে, কেউ গরুর মাংস খেলে তাকে মেরে ফেলতে দ্বিধা করি না। ধর্মের জিগির তুলে, কাউকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে গা কাঁপে না। রাজনীতি সর্বস্ব নেতাদের কাছে সাধারণ মানুষ কি কেবলই দাবার ঘুটি?

কথায় বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। সে তো এখন আর কথার কথা নয়, দেশের প্রতিচ্ছবি যেন। চারিদিকে শুধু ভয়ের দেওয়াল ঘিরে ফেলছে মানুষকে। শিক্ষিত বিবেকের এখন বড়ই অভাব। যুক্তি দিয়ে সমস্যাকে বোঝা এবং তার সমাধানের চেষ্টা তাই এখন বিশেষ ভাবে জরুরি। আবার একটা নবজাগরণের খুব দরকার আমাদের। ততদিন পর্যন্ত সম্প্রীতি তাই শুধুই খাতায়-কলমে আর মহাপুরুষদের বাণীর মধ্যে আবদ্ধ না থেকে আমাদের মনে, বিশ্বাসে, জেগে থাকুক।

বাংলাদেশের অর্থনীতি: শংকা ও আশাবাদ

হাসান জামান টিপু ॥ বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কলকাতায় জন্ম নেওয়া বাঙালী অর্থনীতিবিদ কৌসিক বসু ‘হোয়াই বাংলাদেশ ব্লোমিং’ নামক প্রবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। কিভাবে একটি “তলাবিহীন ঝুড়ি” থেকে বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে  সফলতা অর্জন করেছে তা নিয়ে উনি গবেষণা করেছেন ও নানান দিক নিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।

তার ভাষায় বাংলাদেশ এখন এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে  “চমকপ্রদ ও অপ্রত্যাশিত” সাফল্যের একটি বড় উদাহরণ। এই প্রবন্ধে উনি দেখিয়েছেন কিভাবে একটি দরিদ্রপীড়িত ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশ হওয়া সত্বেও অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকগুলিতে পাকিস্তান, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে।

২০০৬ সালে যখন বাংলাদেশকে অনেকেই “ব্যর্থ রাষ্ট্র” হিসাবে মনে করতো সে বছরই বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেলে তা অনেকের কাছেই অঘটন হিসাবে বিবেচিত হয়েছিলো। ২০০৬ সালের পরবর্তী বছরগুলিতে বাংলাদেশ সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পাকিস্তানের চেয়ে আড়াইগুণ বেশী প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এবং বর্তমানে ভারতের শ্লথ অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের সামনে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই অসাধারণ কাজটি কিভাবে ঘটলো তার কোন সুনির্দিষ্ট কোন উত্তর কারো কাছে নাই, এধরণের ঐতিহাসিক বিষয়ে তা থাকেও না, শুধুমাত্র অনুসন্ধান করা যায়।

কৌশিক বসুর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পালাবদলের পেছনে বড় ভূমিকাটি পালন করেছে সামাজিক পরিবর্তন – বিশেষ করে সমাজে নারীর ক্ষমতায়ণ।

এক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার কথা। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারও নারী শিক্ষার প্রসার এবং সমাজে মেয়েদের ভূমিকা জোরালো করতে ব্যাপক ভূমিকা নিয়েছে।

কৌশিক বসু বলছেন, এর ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু পৌঁছে গেছে ৭২ বছর, যেখানে ভারতে তা ৬৮ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৬ বছর।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পালাবদলে কৌশিক বসু দ্বিতীয় যে কারণটির কথা উল্লেখ করছেন, সেটি গার্মেন্টস শিল্প। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ যে ভারতের তুলনায় গার্মেন্টস শিল্পে অনেক বেশি ভালো করেছে, এর পেছনে অনেক কারণ আছে। তবে একটি কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের শ্রম আইন।

তার মতে ভারত এবং পাকিস্তানের যে শ্রম আইন, তা নানাভাবে এই দুই দেশের কারখানা মালিকদের শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। এর ফলে এসব দেশের কারখানাগুলো খুব বড় আকারে করা যায়নি, সেখানে বেশি সংখ্যায় শ্রমিকও নিয়োগ করা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে এরকম কোন আইনের অনুপস্থিতি বড় বড় গার্মেন্টস শিল্প স্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আমরা মনে করি বৈদেশিক কর্মসংস্থান এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে।

কিন্তু বাংলাদেশ কি তার এই সাফল্য ধরে রাখতে পারবে?

কৌশিক বসু বলছেন, এখনো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। কিন্তু কিছু ঝুঁকির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, যা নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখনই সচেতন হওয়া দরকার। তাঁর মতে, যখন কোন দেশের অর্থনীতি ভালো করতে থাকে, তখন সেদেশে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য – এসবও বাড়তে থাকে। যদি এসবের রাশ টেনে ধরা না যায়, তা সমৃদ্ধির গতি থামিয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও কোন ব্যতিক্রম নয়।

তবে তাঁর মতে এর চেয়েও বড়ঝুঁকি হলো কট্টর ধর্মীয় এবং সামাজিক রক্ষণশীল শক্তি। এরা প্রগতিশীল সামাজিক খাতে বাংলাদেশের যে বিনিয়োগ, তার বিপক্ষে। ভারতের মতো দেশের শ্লথ অর্থনীতির মূল কারণই হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। যদি বাংলাদেশ এই বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়, সেটি বাংলাদেশকে আবার অনেক পেছনে নিয়ে যাবে। কিভাবে ইতিহাসে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে তার কিছু নজির তিনি টেনেছেন।

তিনি উল্লেখ করেছেন হাজার বছর আগে যে বিশাল আরব খেলাফত বিরাট এক অর্থনৈতিক সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। কিভাবে দামেস্ক আর বাগদাদের মতো নগরী হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতি, গবেষণা আর নতুন আবিস্কারের এক বিশ্ব কেন্দ্র। তবে কৌশিক বসু একেবারে সাম্প্রতিককালের নজিরও দিয়েছেন। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের কাহিনীও একই। স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতে পাকিস্তানের অর্থনীতি ভারতের চেয়ে ভালো করছিল। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি পাকিস্তানকে পিছনে ফেলে দেয়।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব, অর্থের অপরিণামদর্শী ব্যবহার, অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ ইত্যাদি বিষয়গুলি এদেশকে, তার অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে অনেকটাই প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে।

বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া ৭ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব নয়, তবে চ্যালেঞ্জিং। এটি অর্জন করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখা ও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চারটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। এগুলো হলো ইউরোপের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি, নড়বড়ে আর্থিক খাত, পোশাকশিল্পের চলমান রূপান্তরকাল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। সংস্থাটি বলছে, ইউরো অঞ্চলের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হলে তাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, ইউরোপে বাংলাদেশের একটি বড় রপ্তানিবাজার রয়েছে। একইভাবে ইউরোপের সংকট কেটে গেলে তা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক ফল নিয়ে আসতে পারে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এর মতে, মানবিক যথা স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে উন্নয়ন ছাড়া কোন উন্নয়নই টেকসই হয় না। কথাগুলি সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ বহু আগ থেকে বলে আসছে। মানুষের আত্মিক উন্নয়ন না হলে আর্থিক উন্নয়ন কোন দিনও টেকসই হবে না।

বিভিন্ন দেশের সহায়তায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এ ক্ষেত্রে সরকার ‘উড্ডয়ন বা টেক অফ’ পর্যায়ে রয়েছে। ঠিকমতো উড্ডয়ন করতে পারলে তাতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে আর তাতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করে বিশ্বব্যংক।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে যেভাবে বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকায় নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং বাংলাদেশ হবে বিশ্বে অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি। শুভ কামনা বাংলাদেশের জন্য।

স্বাগত ২০২০ বাঙালির জয়রথে গতির সঞ্চার হোক

নজরুল ইশতিয়াক ॥ নতুন বছরে দেশ নিয়ে প্রত্যাশা বাড়বেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পরিবর্তন যাত্রার সূচনা হয়েছে তার যৌক্তিক ধারা অব্যাহত থাকবে এই প্রত্যাশা দেশের মানুষের। দিন বদলের সময় এসেছে। সময়টা কাজে লাগাতে হবে। নিজেদেরকে শুদ্ধ করার শিক্ষাই হলো সময়ের শিক্ষা। 

রাজনীতির নামে প্রকারান্তরে প্রতারণার যে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, বারবার বাংলা-বাঙালির অস্তিত্বের উপর আঘাত হানা হয়েছে, বোধ-বিবেক রুদ্ধ করা হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে বাংলার পথ প্রান্তর, সেসব তৎপরতার কফিনে পেরেক ঠুকে দিতে হবে। ধর্মের নামে, দারিদ্র বিমোচনের নামে যা যা হয়েছে তার বিপরীতে কল্যাণ যাত্রা, শুদ্ধি যাত্রার পাল্লা ভারি করতে হবে দিনে দিনে। সমাজে-মানুষের দৌঁড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে সৌরভ সৌন্দর্যের শুভবারতা। স্বপ্ন জাগানিয়া সব চিন্তা বাস্তবে রূপলাভ করবে এটাই তো সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। অজ্ঞতা-অন্ধত্ব -বর্বরতার বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী জাগরণ ঘটানোর কাজটি করতে হবে সব শ্রেণী পেশার দেশপ্রেমিক মানুষদের সম্মিলনে। সাহস করে সত্য কথা বলার পরিবেশ তৈরীতে কাজ করতেই হবে, বোধ বুদ্ধিহীন দেশ জাতি বিরোধী অযৌক্তিক ওয়াজ নসিহতের প্রতিটি মাইক বন্ধ করে দিতে হবে। বিশেষ করে নারীর কর্মক্ষেত্রকে আরো বিস্তৃত করতে হবে। উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের দিকে বাড়তি নজর দেয়ার সময় এখন।

নতুন বছরে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তর- প্রতিষ্ঠানের কাছে। শিক্ষার নামে কোন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে গভীরভাবে। শিক্ষা বাণিজ্য, ঈমানের নামে শিক্ষা নৈরাজ্য থামাতে গভীর পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় বরাদ্দ দিতে হবে।

কেবল তিন বেলা ঠিক মত ভাত না জোটার কারণে হাজার হাজার এতিম অসহায় ছেলে মেয়েরা মাদ্রাসায় পড়তে বাধ্য হয়। কওমী মাদ্রাসাগুলোর মানুষ ঠকানো শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে কিভাবে সঠিক ধারায় আনা যায় তা ভেবে দেখার অনুরোধ থাকবে দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদদের কাছে। বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে গণশুনানীর মাধ্যমে পরিকল্পনা নিতে হবে।

ডিজিটাল সুবিধাগুলো পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সব পর্যায়ের অতি মুনাফাখোরদের দৌরাত্ম থামাতেই হবে।

সর্বোপরি পারস্পারিক দায়বোধের ভিত্তিত্বেই রাজনীতি কিংবা সরকার পরিচালিত হবে। সরকার গৃহীত জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে যেমন উচ্ছসিত প্রশংসা করতে হবে আমাদেরকে তেমনি লোক দেখানো হঠকারী যে কোন বিষয়ে জনগণের দেয়া মতামতকে স্বাগত জানানোর উদারতা দেখাতে হবে। জনগণের প্রতি রাজনীতিকদের দায় এবং জনগণের পক্ষ থেকে সমর্থনের মধ্য দিয়েই পারস্পারিক এই পথ চলা। পরিস্কার ভাবে পক্ষ দুটি। যেমন একজন স্বাভাবিক মানুষের দুটি হাত-পা, দুটি চোখ-কান তেমনি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও একই সত্য।

অনেকেই বলেন, দেশে এক দলীয় শাসন চলছে। রাজপথে কিংবা সংসদে দৃশ্যত কোন দলের অস্তিত্ব নেই। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই কার্যত রাজনীতির মাঠে প্রবল শক্তি নিয়ে দাঁিড়য়ে আছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। তবু আওয়ামীলীগকে মনে রাখতে হবে অনেক বড় গাছও ভিতরে ভিতরে অসার গুড়ায় পরিণত হয়। ঘুণ ধরলে শক্ত কাঠও ধসে পড়ে।  চরম বিভ্রান্তিকর আত্মঘাতি রাজনীতি করার কারণে যেসব দল আজও জনগণ দ্বারা প্রত্যাখাত তারা আত্মকর্ম বিশ্লেষণ না করে কেবল বাকোয়াজী করলে আখেরে কোন সুফল পায় না। রাজনীতিকে জননীতিতে রূপান্তরিত করতেই হবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। উপলব্ধির এখনই সময়। সময় বুঝে বাধাল বাধতে হয়। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের মূল নেতৃত্ব হয়তো সত্য কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করার চেষ্টা করছে। তাদের গ্রহীত এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কতটা চলে সেটা দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি। ফলে রাজনীতির মাঠে আপাত শক্তিশালী আওয়ামীলীগ যদি সময় বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করতে পারে  পারে তবে জনগণই তাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত জনগণই দেশের মালিক হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।

নতুন বছরে পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আরো চুলচেরা মূল্যায়ণ করতে হবে। দেশে অবকাঠামো গত উন্নয়ন দৃশ্যমান, দেশপ্রেমের শিক্ষায় পুরো জাতিকে উজ্জীবিত করার সময় এখন। শান্তিপ্রিয় বাঙালি শান্তির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে সব সময় প্রস্তুত। প্রস্তুত থাকে বলে শেষ পর্যন্ত কোন ঘাতক টিকে থাকে না। তার প্রমাণ ৫২-৬২-৬৯-৭১-৯০ সনগুলো। সব সময় অকাতরে সাধারণ বাঙালিরা রুখে দাড়িয়েছে। কেন রুখে দাঁড়ায় এই সত্য দেশ পরিচালনার সাথে যুক্ত নেতাদের বুঝতে হবে। যতটুক ঘূণ ধরেছে তার বেশীটাই শিক্ষিত ক্ষমতাধরদের কারণে। সাধারণ বাঙালি সব সময় এসব আবর্জনা পঙ্কিলতার উর্দ্ধে। যে গাছে ফুল ফোটে, ফল ধরে সে গাছেরও পাতা ঝরার সময় আসে। পুরাতন পাতা ঝরে গজায় নতুন কচি পাতা। গাছ যত সহজে নিজেকে নতুন করে নেয় আগামীর জন্য, মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। আর নয় বলেই বহু আক্ষেপ সত্বেও আজও বাঙালির এগিয়ে চলার গতি আশাবাদ জাগায়। আমরা তো জয় করেছি, পরেছি বিজয় মাল্য। সেটা ধরে রাখতে হবে প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণে। বহু দূর দেখার আগে দেখতে হবে কাছে, নিকটে নিজের বাড়ির কাছে। বাঙালির জয়রথে গতি সঞ্চার হোক এই প্রত্যাশা এই ইংরেজি নববর্ষে। আমরা আমাদের বাঙালিপনার আদলেই সাজাবো নতুন বছরকে। স্বাগত টুয়েন্টি টুয়েন্টি। 

গোটা বিশ্ব যেমন একটি সমাজ তেমনি তার শত সহস্র শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে আছে পৃথিবী নামক এই বৃক্ষাঞ্চলে। নানা রূপে, নানা মাত্রায়, নানান বৈশিষ্ট্যে। চোখ মেলে যার দেখার ক্ষমতা আছে সে দেখে, সে জানে কত বিপুল ঐশ্বর্যময় এই জগত সংসার। এই যে মানবজীবন তা তো দেখবার, মেলাবার, মেলবার জন্য। দেখার চোখ তৈরী না হলে দেখা হয়ে উঠে না। জীবন সমৃদ্ধ হয় না, শান্ত-স্থির গতিশীল হয় না। পরমভাবে পাওয়া যায় না জীবনকে।

বাঙালি জীবন প্রবাহে কত মাত্রা তা অনুসন্ধানী মাত্রই জানেন। আর্থ-সামাজিক প্রবাহের ভাঁজে ভাঁজে যেমন বেঁচে থাকা সহায়ক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে আবার পারস্পারিক দ্বন্ধ বৈরীতাও আছে। সংঘাত সংকটের বিপরীতে শুভযোগ শুভবারতা। দু’য়ে মিলেই আবর্তিত হচ্ছে আমাদের এগিয়ে চলার স্বপ্ন-সম্ভাবনা। সার্বিকভাবেই অভাব দারিদ্র কমেছে। সচেতন হয়ে উঠার নানান সুযোগ-সুবিধা দৌঁড়গোড়ায়। পোশাকে, পুষ্টিতে আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আমরা। বিদ্যুৎ ও  যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে বাংলাদেশ। গভীর আলোচনায় না যেয়েও বলা যাচ্ছে- ‘এগিয়ে যাচ্ছি আমরা শুভ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে।’

বাস্তবতার নিরিখেই রাজনীতিতে নেতৃত্ব সৃষ্টির একটা নব উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। আড়মোড়া ভেঙে এমন কান্ড হয়তো সহসাই মেনে নিতে পারছেন না খোদ রাজনীতিক নেতা কর্মীরাই। মোটা কাপড়, মোটা চালের কথা শুনতে অভ্যস্ত নয় অনেকে। চরিত্র যে বেশ খানিকটা হননের রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বপ্ন দেখাচ্ছেন দেশরত্ন  শেখ হাসিনা। পিতার মতোই দুর্বার এক অভিযাত্রা তিনি শুরু করেছেন অনেকটা স্রোতের প্রতিকূলেই। এ এক বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদর্শীতাকেই তুলে ধরে। ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি বাংলা বাঙালির ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পথে আহবান জানাচ্ছেন। জাতিস্বত্ত্বার সাথে যোগস্থাপন ব্যতিরেকে যে কোন জাতি এগুতে পারে না এই শিক্ষা দিচ্ছেন। এটিই আমাদের জন্য বিরাট প্রাপ্তি।

যৌক্তিক সুযোগ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণমূলক জনসমাজ সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তো কেবল ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার বিচার সম্ভব। ধর্ম আর দারিদ্রকে পুঁজি করে মিথ্যাচারের রাজনীতির বিপরীতে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপ দলীয় কর্মীদের যোগ্য দক্ষ করে গড়ে তোলার অভিপ্রায় থেকে উৎসরিত। 

শুদ্ধি অভিযান অপেক্ষা দলীয় নেতা-কর্মীর আত্মশুদ্ধিই যে এই সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটা তিনি ভালো করেই জানেন। একজন মহান দেশনেতা হিসেবে তার যে এই উপলব্ধি এটি বাঙালিকে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তবু বলবো- কারো কথায় বলায় কারো আত্মশুদ্ধি হয়ে যাবে না। দেশতো কেবল বাইরে নয়, প্রতিটি আত্মশুদ্ধির এই যাত্রা শুরু হতে পারে আত্ম-উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। দেশ মানে দিশা, দিশা থেকে দিশারী দশা কিংবা দশ কিংবা মৈত্রী একতা।

দলীয় কর্মীরা না হোক, যারা নেতা তাদেরকে সবার আগে নিজের দেশটিকে আবিস্কার করতে হবে। সেখানেই দেখা মিলবে কেন আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন।

মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করার চিরসুন্দর আবেদনের মধ্য দিয়ে আশা জাগানিয়া এক মাহেন্দ্রক্ষণ উপনিত আমাদের সামনে। আগামী বছর ২০২০ সাল বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ। এটিকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাপক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। ২০২১ সাল স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালিত হবে। এই দুটি বিশেষ বছর আমাদের জাতীয় জীবনে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে। তরুণ প্রজন্ম যেমন জানতে পারবে ইতিহাসের সত্য, তেমনি দায় বাড়বে বয়স্কদের। প্রস্ফুটিত ফুল হয়ে উঠার মধুক্ষণ আমাদের সকলের সামনে….

সময়ের সাফ কথা…. মানুষের উৎস এক তবে এত বিভাজন কেন?

ধর্ম সুস্থ জীবনযাপনের দর্শন, মানুষে – মানুষে বিভেদ সৃষ্টির উপকরণ নয়।

সংলাপ॥ মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমির ক্লাসে শিক্ষক একটি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে পড়াচ্ছিলেন। হঠাৎই মৃতদেহটি দেখিয়ে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি একটি প্রশ্ন করেন ‘বল তো এই ব্যক্তির ধর্ম, বর্ণ, জাত কী? তোরা তো রাস্তায় নেমে বাস, ট্রেন, সরকারি সম্পত্তি জ্বালিয়ে রাজনীতিতে নেমেছিস তা এই মৃতদেহটি কোন দলের?’

না মানুষের কোনও ধর্ম, জাত, বর্ণ হয় না। কিছু রীতিনীতি, নিয়মকানুন, সংস্কার মানুষের প্রতিটি শ্রেণি আলাদা রাখতে পারে, কিন্তু আমাদের একটাই পরিচয়। বায়োলজিক্যালি, আমরা মানুষ। একটি মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যতক্ষণ পর্যন্ত না তার মা-বাবা, পরিবার তাকে কিছু শেখায় ততদিন সে শুধুমাত্র মানবশিশুই থাকে। ঠিক যে মুহূর্ত থেকে তাকে শেখানো হয় সে কোন ধর্ম, কোন জাতের, কোন বর্ণের, কোন বংশের সেই মুহূর্ত থেকে মানবধর্ম চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে সে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে তৈরি হয় দূরত্ব অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে।

কিন্তু যদি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা চিন্তা করি বা বিষয়ের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করি তবে আমরা বুঝতে পারব যে এই বিভাজনের তত্ত্ব খাঁড়া করে যারা আমাদের আলাদা করার চেষ্টা করছেন, তা পুরোটাই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। মিথ্যাচারের কৌশল এক শ্রেণীর স্বার্থবোধসম্পন্ন মানুষের।

আমরা যদি মানুষের পূর্বপুরুষের জিনতত্ত্ব নিয়ে একটু গভীরে যাই তবে দেখব আমরা একই আদিম আধুনিক মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স) থেকে সকলেই উদ্ভুত। সম্প্রতি মানুষের বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চমানের যে জেনেটিক স্টাডি করা হয়েছে, সে বিষয়ে একটা ধারণা তৈরি হলেই আমরা পুরো বিষয়টি বুঝতে পারব।

পৃথিবীর আদিম আধুনিক মানুষ ৭৫ হাজার পূর্বে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়েছে। এই বিভিন্ন মহাদেশের মানুষের মধ্যে আফ্রিকায় উদ্ভূত মানুষের পূর্বপুরুষের জিনের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। সেই জিন রয়েছে মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ বা এমটি ডিএনএ-এর মধ্যে। মাইটোকনড্রিয়া, যা কোষের শক্তিঘর হিসাবে পরিচিত, সেই অঙ্গাণুর মধ্যেও এক বা একাধিক ডিএনএ থাকে। একে মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ বা এমটি ডিনএনএ বলা হয়। এই এমটি ডিএনএ-র বিশ্লেষণ করে মানুষের মাতৃবংশ পরম্পরা বোঝা হয়। এর মধ্যেই রয়েছে এল-৩ টাইপ জিন, যা ইউরোপ ও এশিয়ার মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়। উত্তর ভারত হোক বা দক্ষিণ ভারত, ভারত ভূখন্ডের সব মানুষের কোষেই এই এল-৩ জিনটি রয়েছে। বাকি এল-১ থেকে এল-সি (১৫টি রূপভেদ) পাওয়া যায় আফ্রিকার মানুষের মধ্যে।

অন্যদিকে, x ক্রোমোজোমে থাকে R1a1 জিন। সেই জিনের R1a1Z93 রূপভেদ সম্পন্ন মানুষই ইউরেশিয়া থেকে ভারত ভূখন্ডে প্রবেশ করেছিল। বৈদিক যুগের মানুষের দেহাংশের অবশেষের ডিএনএ পরীক্ষা করে সেখানে এই  R1a1Z93 প্রকারের জিন-এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ, বৈদিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তথাকথিত ‘বহিরাগত’দের হাত ধরে। এই জিনের অস্তিত্ব রয়েছে ইরান, আফগানিস্তান এমনকি, সাইবেরিয়ার মানুষের ডিএনএ’তে। অন্য দিকে, দক্ষিণ ভারতীয় ভূখন্ডের মানুষ, রাখিগড়ি ও সিন্ধু সভ্যতায় পাওয়া মানুষের দেহাংশের ডিএনএ-র মধ্যে কিন্তু এই R1a1Z93 জিনটি নেই।

অর্থাৎ, বৈদিক যুগের মানুষ এবং দক্ষিণ ভারতের মানুষ তথা সিন্ধু সভ্যতা বা রাখিগড়ি সভ্যতার মানুষ উভয়েই ভারত ভূখন্ডের বাসিন্দা হলেও (এল-৩ জিন থাকলে ভারত ভূখন্ডের বাসিন্দা), বৈদিক যুগের মানুষ বহিরাগত এবং পরে আসা। কারণ, এদের ডিএনএ’তে রয়েছে R1a1Z93 জিন, যা আদি বাসিন্দা অর্থাৎ, সিন্ধু সভ্যতার মানুষ বা দক্ষিণ ভারতীয় মানুষের ডিএনএ’তে নেই। সিন্ধু সভ্যতা বা রাখিগড়ি সভ্যতা গড়ে উঠেছিল প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে এবং বৈদিক যুগের শুরু প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে। তাহলে ভারত ভূখন্ডে কারা বহিরাগত আর কারাই বা মূলবাসী? তবে কি এখন মানুষের বংশলাতিকা এবং জিনতত্ত্ব বিচার করে এই ‘বহিরাগত’দের দেশের বাইরে বার করে দেওয়া উচিত?

বিষয়টা খুব সহজ ভাবে বললে, আমাদের কারও যখন রক্তের প্রয়োজন হয় কিংবা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয় তখন আমরা বর্ণ, ধর্ম, জাতির বিচার করি না। চিকিৎসক যখন রোগী দেখেন কিংবা শিক্ষক যখন ছাত্রছাত্রী পড়ান তখন তারা কোনও ভেদাভেদ রাখেন না। তবে অধিকার পাওয়া বা না পাওয়ায় কেন ভেদাভেদ থাকবে? খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের স্বাভাবিক চাহিদা ভুলে আমরা যখন বিভেদের লড়াই নিয়ে মেতে উঠি, তখন সমাজকে আমরা অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিই।

এই অন্ধকারের জন্যই আমরা ক্ষুধার দেশে বাস করি। কেন আমরা জাপান হতে পারি না। যে দেশ ১৯৫২ সালে স্বাধীন হয়ে গুঁড়িয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হতে পারে, যে দেশে ৮০ বছরের উপরে মানুষের গড় আয়ু। যে দেশে এত ধর্মীয়, জাতিগত, সাম্প্রদায়িক লড়াই হয় না। যে দেশের মানুষ উন্নতির চরম সীমায় পৌঁছেও সাইকেলে বা হেঁটে অফিস বা স্কুল, কলেজে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জার্মানী যদি এগিয়ে যেতে পারে, ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা পাওয়া ভিয়েতনাম যদি অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ হতে পারে, তবে আমরা কেন পিছিয়ে? আমরা পারি না কেন?

মানুষের মধ্যে বাসা বেধেছে এই বিভেদ নীতি। বাংলায় এর প্রভাব তীব্র না হলেও ভারতে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিভেদের আচ পড়তে পারে বাংলায়। এই বিভেদ  নীতির  সম্মুখ বিরোধিতায় ইতিমধ্যেই ভারতে প্রতিবাদে নেমেছে তরুণ-যুবারা। সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের উচিত ওইসব তরুণ-যুবাদের হাত শক্ত করা। মানুষের মধ্যে সচেতনতার প্রসার ঘটানো। মানুষের মধ্যে নতুন করে সচেতনতা সৃষ্টির এখনই সময়। বারবার ধর্মের ধোয়া তুলে হানাহানির প্রসার ঘটানো উগ্রশ্রেণীকে থামানো না গেলে সভ্যতা যতই আধুনিক হোক না কেন তা ধ্বংস হতে বেশী সময় লাগবে না।  ধর্ম সুস্থ জীবনযাপনের দর্শন, মানুষে-মানুষে বিভেদ সৃষ্টির উপকরণ নয়- এই আহবান সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।

রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহবাড়ানোই নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ

সংলাপ ॥ শুরু হলো খ্রীস্টিয় বর্ষপঞ্জি ২০২০ সাল-গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের নতুন বছর। বিদায় খ্রীস্টিয় বর্ষপঞ্জি ২০১৯ সাল। সেইন্ট (সাধু) গ্রেগোরিয়ান কর্তৃক তাঁর প্রভু যীশু খ্রীস্টের নামে প্রবর্তিত এই বর্ষপঞ্জি এদেশে কীভাবে বা কতটুকু অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে তা নিয়ে বিশদ ব্যাখার প্রয়োজন পড়ে না-তা সকলেরই কমবেশী জানা। এটাই বাস্তবতা। থার্টি ফার্স্ট নিয়ে মাতামাতির কিছু না থাকলেও এই বর্ষপঞ্জিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এই গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার দিয়েই আমাদের অর্থবর্ষ, জাতীয় দিবস, শিক্ষাবর্ষসহ সবকিছু গণনা ও হিসাবনিকাশের অনেক কিছুই জড়িত হয়ে গেছে। ডিসেম্বর, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, আগস্ট-ইত্যাদি এক একটি মাসের সাথে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের আনন্দ-বেদনা সবকিছুই এখন একাকার হয়ে গেছে। তাই বলে প্রকৃতির সন্তান হিসেবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত কালের সম্পর্ক এতটুকু ম্লান হওয়ার নয়। এখানে প্রকৃতি এক এক কালে-এক এক ঋতুতে এক এক বৈচিত্র নিয়ে হাজির হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পেরিয়ে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে পদার্পণ। ২০১৯ সালটা শুরু হয়েছিল এর আগের দিন-২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় আসার আগাম খবর নিয়ে। ওই নির্বাচনে সরকারি দল হিসেবে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয়ের ঘটনাটি যেমন ছিল বিস্ময়কর, তেমনিভাবে মাত্র ৭টি আসনে প্রধান বিরোধী শক্তি-বিএনপির জয়লাভের ঘটনাটিও ছিল আরও বিস্ময়কর। এর পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণই করেনি। এসব কারণে গত ১০ বছর ধরে দেশে গণতন্ত্র বজায় রয়েছে-এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়েও বড় সত্য হলো জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের অতি দুর্বল অবস্থান এই গণতন্ত্রকে দুর্বলই করে রেখেছে। আর এই দুর্বলতার কারণে রাজনীতিতে জনগণের সম্পৃক্ততাও দুর্বল অবস্থায় রয়ে গেছে। গণতন্ত্রের এই দুর্বলতা দুর্নীতিবাজ ও গণবিরোধী চক্রের জন্য সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি করে দিয়েছে। সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ও জামায়াত-বিএনপিপন্থী বিভিন্ন চক্রের অনুপ্রবেশ ঘটার কারণে শান্তিপ্রিয় ও সত্যনিষ্ঠ মানুষগুলো রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। গত ১০ বছরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকা- বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি দলের চাইতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ব্যর্থতাই অনেক বেশি। বিরোধী শক্তিগুলো সরকারের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেনি। দুর্নীতি, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের অনেক ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলেও বিরোধী শক্তি এ নিয়ে জনগণের পাশে এসে দাঁড়াতে পারেনি, দাঁড়ায়নি। জনগণকে এবং জনস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কখনো জনগণের সমর্থন পায় না-এ কথাটিই ভুলে বসে আছে সরকারবিরোধী শক্তিগুলো।

অপরদিকে, সরকারি দল-বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচির সাথেও জনগণের সম্পৃক্ততা কতটুকু তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বহু আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি এদেশের জনগণের আকর্ষণ ও মোহ এখনো না-কাটার কারণ দলের প্রধান বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক শক্ত হাতে তাঁর দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে চলেছেন। কিন্তু গেলো বছরের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের  জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আশানুরূপ ও প্রত্যাশিত পরিবর্তন না ঘটায় জনগণ এখানেও হতাশ। এক বছর আগে গঠিত মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন মুখ দিয়ে সরকারি কার্যক্রম, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে চোখে পড়ার মতো কোনো পরিবর্তন এখনো দেখা যায়নি। কিছুদিন আগেও সরকারি উদ্যোগে দুর্নীতিবিরোধী ও শুদ্ধি অভিযানের প্রতি সচেতন দেশবাসী গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছিল, কিন্তু সেটিও এখন বন্ধ রয়েছে। তবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখার জন্য সরকারের পুলিশবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাগুলোর কৃতিত্বকে স্বীকার করতেই হবে সত্যের খাতিরে।                   

একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে-দেশের জন্ম সে দেশের জনগণ রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেললে সেটা শুভ লক্ষণ নয়। ১৯৭৫’এর ১৫ ই আগষ্ট ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এদেশের জনগণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ তৈরি করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এই অনাগ্রহের পরিবেশের মধ্যেই এদেশে তখন একে একে ঘটতে থাকে জেলখানার অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতা হত্যাসহ আরও অনেক দুঃসহ ঘটনাবলী। তারপর দীর্ঘ একুশ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে  মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। এই শক্তি সকল হত্যাকান্ড এবং ৭১’এর যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করলেও সেই গণবিরোধী শক্তি আজও যে বসে নেই সে কথা ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই জনগণকে রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুললে হবে না। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কথা ও কাজের মধ্যে যতটা সম্ভব সমন্বয় সাধন। কারণ, এদেশের এতিহ্যবাহী রাজনীতির সংস্কৃতিটাই হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ। ১৯৭০’এর নির্বাচনে এদেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে নৌকায় ভোট দিয়েছিল বলেই জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ৭১’র ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় স্বাধীনতার ডাক দিতে পেরেছিলেন। এই ৭ই মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর আহবানেই সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো যে-যুদ্ধটা পরিণত হয়েছিল একটা জনযুদ্ধে। তখন রাজনীতি আর যুদ্ধটা কোনো ব্যক্তিগত লাভ, ব্যবসায়িক প্রতিপত্তি বা পারিবারিক সম্পত্তি অর্জনের বিষয় ছিলো না।

ষাটের দশকে এদেশের প্রতি পাকিস্তানী আমলের বৈষম্য তুলে ধরে সাড়া জাগানো অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্প্রতি রাজধানীতে এক সেমিনারে বলেছেন, ‘রাজনীতি ব্যবসা বা ব্যক্তিগত লাভের বিষয় নয়। রাজনীতি হলো জনসেবা। সংসদ হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটিমাত্র স্তম্ভ। আর গণতন্ত্র হলো সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব’। এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ আয়োজিত সোসাইটির মিলনায়তনে ‘সাসটেইনিং ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ : দ্য পলিটিক্যাল লিগ্যাসি অব তাজউদ্দীন আহমদ’ শীর্ষক বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পথে টাকা ও পেশিশক্তি যেন ভূমিকা রাখতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের মতো এমন আদর্শের জনপ্রতিনিধি জাতীয় সংসদে পাঠানোর পথ সুগম করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে রেহমান সোবহান আরও বলেন, ‘তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের নেপথ্যের নায়ক (আনসাং হিরো)। তরুণ প্রজন্মকে তাঁর আদর্শ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তাজউদ্দীন আহমদ যখন মারা যান, তখন তিনি অর্ধনির্মিত বাড়ি ছাড়া কিছুই রেখে যাননি।

তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার সারা জীবনের একটি অর্জন বলে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, তাজউদ্দীন আহমদের দর্শন ছিল শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একটি সুষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাজউদ্দীন আহমদের চিন্তা-চেতনার প্রতি একমত পোষণ করে তিনি বলেন, অর্থনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চা ছাড়া রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া টেকসই হবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ এই ধরনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন।  

বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সাধনার ফসল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদের মতো আজ দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। তাঁরই কন্যা অত্যন্ত শক্ত হাতে, সফলতার সাথে দেশ ও দলের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন-এ কথা ঠিক। কিন্তু তাঁর দল ও সরকারের সকল স্তরে জনকল্যাণকামী নেতা ও কর্র্মী এবং সরকারি কর্মচারিদের অভাব আজও রয়ে গেছে প্রচ-ভাবে যা রাজনীতির প্রতি জনগণের অনাগ্রহ ও অনাসক্তির প্রধান কারণ। এই নতুন বছরে-২০২০ সালে জনগণের এই অনাগ্রহ ও অনাসক্তি দূর করতে সরকারি ও প্রশাসনযন্ত্রের সর্বস্তরে যথাযথ পদক্ষেপ দেখতে চায় জাতি। বিরোধী দলগুলোও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে তাদের কর্মসূচি প্রণয়ণ এবং সর্বস্তরের জনগণকে সেখানে উদ্বুদ্ধ করলে অবশ্যই রাজনীতির প্রতি জনগণের আগ্রহ বাড়বে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের প্রতি নতুন  আস্থা তৈরি হবে – নতুন বছরে বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে এটাই আজ সচেতন দেশবাসীর প্রত্যাশা।

মিল্ক ব্যাংকঃ ধর্মের নামে মানবিকতায় প্রতিবন্ধকতা!

হাসান জামান টিপু ॥ ‘অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা জবাই কালে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়েছে। অতঃপর কেউ সীমালঙ্ঘন কারী না হয়ে নিরুপায় হয়ে পড়লে তবে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। -সুরা আন নাহল, আয়াত-১১৫।

‘আপনি বলে দিন, যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌঁছেছে, তন্মধ্যে আমি কোন হারাম খাদ্য পাই না কোন ভক্ষণকারীর জন্যে, যা সে ভক্ষণ করে; কিন্তু মৃত অথবা প্রবাহিত রক্ত অথবা শুকরের মাংস এটা অপবিত্র অথবা অবৈধ; যবেহ করা জন্তু যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়। অতপর যে ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে এমতাবস্থায় যে অবাধ্যতা করে না এবং সীমালঙ্ঘন করে না। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা ক্ষমাশীল দয়ালু।’ সুরা আনআম, আয়াত-১৪৫

‘তিনি তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জীব, রক্ত, শুকর মাংস এবং সেসব জীব-জন্তু যা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো নামে উৎসর্গ করা হয়। অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানী ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোন পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।’ সুরা বাকারা, আয়াত-১৭৩।

‘তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কন্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চ স্থান থেকে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে, কিন্তু যাকে তোমরা যবেহ করেছ। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বন্টন করা হয়। এসব গোনাহর কাজ। আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীন থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং শান্তিকে (ইসলাম) তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতএব যে ব্যক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে কিন্তু কোন গোনাহর প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।’ সুরা মায়িদাহ, আয়াত- ৩।

উপরোক্ত পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলি দ্বারা প্রমানিত হয় প্রয়োজনে, বাঁচার তাগিদে, মানবিকতার জন্য আল্লাহর নিষেধাজ্ঞাও রহিত হয়ে যায়। এই জন্য রাব্বুল আলামিন দয়ালু, পরম করুণাময়।

মানবিকতার উর্ধ্বে কোন কিছু নয়। সবার উপরে মানুষ সত্য। মানুষের জন্যই জগতে সকল আয়োজন। মানুষকে কি করে ভালো রাখা যায় এটাই সভ্য মানুষের একান্ত কাম্য। সকল ধর্মে মানুষকে ভালো রাখার জন্য, সঠিক পথে থাকার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া আছে। সময় পরিবেশ বাস্তবতায় তা শিথিল করা হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে চালু হয়েছে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ বা মায়ের বুকের দুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা। প্রথমবারের মতো উদ্যোগটি নিয়েছে ঢাকা মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র (স্ক্যানো) ও নবজাতক আইসিইউ (এনআইসিইউ) বিভাগ। ১ ডিসেম্বর থেকে চালু হলেও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে বেসরকারি আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এই কার্যক্রমটি।

জানা যায়, যে মায়েদের সন্তান জন্মের পর মারা গেছে বা নিজের সন্তানকে খাওয়ানোর পরও মায়ের বুকে অতিরিক্ত দুধ আছে, সেইসব মায়েরা হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকে দুধ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন। আর যে নবজাতকের জন্মের পরই মা মারা গেছেন বা যাদের মা অসুস্থতার জন্য দুধ খাওয়াতে পারছেন না, সেই নবজাতকেরা সংরক্ষিত এই দুধ খেতে পারবে। তা ছাড়া দত্তক নেওয়া সন্তানের অভিভাবকেরা এখান থেকে দুধ নিয়ে খাওয়াতে পারবেন। বিভিন্ন সময় স্বজনেরা নবজাতককে ফেলে দেন, এই স্বজন-পরিত্যক্ত নবজাতকদের বাঁচাতেও মিল্ক ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে জানিয়েছে উদ্যোক্তারা। আরও জানা যায়, মায়ের বুকের দুধ সংগ্রহ ও বিতরণে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করা হবে না।

শরিয়তের বিধান মেনে যে সকল মুসলিম দেশে মিল্ক ব্যাংক আছে সে সকল দেশের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে এ হাসপাতালে এই মিল্ক ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে যা কঠোর নিয়ম কানুনে চলবে। গত ডিসেম্বরের প্রথমদিন এটি চালু করার কথা ছিলো কিন্তু কতিপয় ধর্মজীবির মামলার কারণে এ প্রকল্পের সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

এমন একটি শুভ ও মানবিক উদ্যোগ অলীক কল্পনায় কিছু ধর্মজীবির বিরোধিতায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সাধারণত মুসলমানরা নতুন কোন কিছু গ্রহণ করে না। আবার তারা সৌদি আরবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত ‘হালাল পতিতালয়’ সহ আরো অনেক বিকৃত ধর্মাচার নিয়ে কথা বলেন না। কথা বলেন না সৌদিতে বাংলাদেশী নারী কর্মীদের শারিরীক ও যৌন নির্যাতন নিয়ে। যা মানবিক ও মানবতার বৃহত্তর কল্যানে বিশেষ প্রশংসার দাবীদার তা নিয়ে তারা বেশ সরব হয় যা এক বিষ্ময়কর ব্যাপার বর্তমান বিশ^ বাস্তবতায়। 

অথচ জীবন বাঁচাতে ইসলামে অনেককিছু হালাল করা হয়েছে তবে তা অবশ্যই শর্ত সাপেক্ষে। মানবিকতার জন্য। সূরা কাহাফ এর একটি ঘটনা মনে আছে তো, জ্ঞানী লোকটি একটা শিশুকে হত্যা করেছিলেন কারণ সে ভবিষ্যতে অনেকের মৃত্যুর কারণ হবে। এখানে হত্যা কে বৈধ করা হয়েছে।

মায়ের দুধের এমন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা নিয়ে আপত্তি উঠেছে দেশের শীর্ষ আলেম ও মুফতিদের থেকে। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন এমন উদ্যোগ নবজাতক অনেক শিশুর জন্য আপাতদৃষ্টিতে উপকারী মনে হলেও মুসলিম সমাজের আত্মীয়তার বন্ধনে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করবে। কারণ হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক থেকে দুগ্ধ পানকারী শিশুরা কোন মায়ের দুধ পান করছে, তা অজানা থাকার সম্ভাবনা থেকে যাবে। যেহেতু মিল্ক ব্যাংকে একসঙ্গে অনেক মায়ের দুধ একত্রিত থাকবে, তাই কার দুধ তাকে দেওয়া হচ্ছে, তা নির্ণয় করাও অসম্ভব হয়ে যাবে। ফলে তার অজানা অসংখ্য দুধ ভাই-বোনের সৃষ্টি হবে; ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক যাদের সঙ্গে তার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কঠোরভাবে হারাম। ফলে তার বিবাহের সময় এই আশঙ্কা পূর্ণমাত্রায় থেকে যাবে যে, যাকে সে বিয়ে করছে, সে তার দুধ ভাই-বোন কি না!

বিষয়টি নজরে এসেছে সুপ্রিমকোর্টেরও। ইতোমধ্যে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক নিয়ে আইনি নোটিস প্রেরণ করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান। ধর্ম মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইসিএমএইচ), নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র (স্কানো), নবজাতক আইসিইউ (এনআইসিইউ) এবং ঢাকা জেলা প্রশাসককে ডাকযোগে পাঠানো নোটিসে বলা হয়, ‘মিল্ক ব্যাংক’ ইস্যুতে ধর্মীয় সমস্যা রয়েছে। তা ছাড়া দেশে মিল্ক ব্যাংক করা ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তাই নোটিস অনুসারে মিল্ক ব্যাংক স্থাপনে যথাযথ শর্ত আরোপ চাওয়া হয়েছে। অন্যথায় এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নোটিসে উল্লেখ করা হয়।

অন্য মায়ের দুধ পানে ইসলাম কী বলে!!

শিশুর জন্মদাতা মা ছাড়া অন্য মহিলারাও দুধ পান করাতে পারবেন। ইসলাম একে সমর্থন করে। নবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) স্বয়ং অন্য মায়ের দুধ পান করেছেন। তার দুধ মা ছিলেন বিবি হালিমা সাদিয়া। তবে এ ক্ষেত্রে ইসলামে বড় বিধান হলো শিশু দুই বছর বয়সের মধ্যে যে মায়ের দুধ পান করবে সে তার দুধ মা হিসেবে গণ্য হবে। আর দুধ মা নিজের মায়ের মতোই। ফলে ওই মহিলার সন্তানরা তার দুধ ভাই-বোন হয়ে যায়। চাই মহিলার স্তন থেকে সরাসরি পান করুক, চাই দুধ বের করে অন্য মাধ্যমে পান করুক। (ফাতাওয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত : ৬/২৩২)

শীর্ষ আলেম ও মুফতিদের বক্তব্য

ইসলামের দৃষ্টিতে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’-এর বৈধতা আছে কি না জানতে চাইলে ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা মাদ্রাসার মহাপরিচালক মুফতি আরশাদ রাহমানী বলেন, যেহেতু এটা দুধ পানের বিষয়, এ নিয়ে ইসলামে নির্দিষ্ট মাসয়ালা রয়েছে। মৌলিকভাবে এক মায়ের দুধ অন্য মায়ের শিশু খাওয়া জায়েজ। মায়ের দুধ যেকোনো প্রক্রিয়ায় বের করে অন্য শিশুকে খাওয়ানো জায়েজ। তবে ইসলামে রক্তের সম্পর্ক এবং দুধ ভাই-বোনের সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপন ভাই-বোনের মধ্যে যেমন বিয়ে করা যায় না তেমনি দুধ ভাই-বোনের মধ্যেও বিয়ে করা ইসলামে নিষিদ্ধ।’

তিনি বলেন, ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের দুধ প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাবে। এ ক্ষেত্রে কোন মায়ের দুধ কোন শিশু খাচ্ছে এটা জানা যাবে কি না তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। যদি জানা না যায় তাহলে একদিকে যেমন ইসলামে দুধ মায়ের যে গুরুত্ব সেটা ক্ষুন্ন হবে। অন্যদিকে এমন হতে পারে পরবর্তী সময়ে দুধ ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অবশ্য কোন মায়ের দুধ কোন শিশু খাচ্ছে এটা যদি জানা যায় এবং দুই পরিবারের মধ্যে এ বিষয়ে সতর্ক থাকেন তাহলে সমস্যা নেই। তবে বাস্তবে সবাই কতটা সতর্ক থাকবে সেটা দেখার বিষয়। তাছাড়া উদ্যোক্তারা কতটুকু শরিয়তের বিধান মানবে, সেটাও ভাববার বিষয়। তাই আমি মনে করি এ ধরনের ব্যাংক না হওয়াই নিরাপদ।’

রাজধানীর শায়েখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের উদ্যোগ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রক্রিয়া ব্যাপকতা লাভ করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। অসংখ্য হারাম বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে সবার অজান্তে’

দুধ ভাই-বোনের বিয়ের শঙ্কা, জবাবে উদ্যোক্তারা যা বলছেন –

ডা: মুজিবুর রহমান বলছেন, এমন কোনো আশংকাই থাকবে না, কারণ মিল্ক ব্যাংক থেকে দুধ দাতা ও গ্রহীতা পরস্পর সম্পর্কে বিস্তারিত জানবেন এবং তাদের নিজস্ব পরিচয়পত্রও থাকবে। এমনকি তাদের তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রতি বছর প্রকাশও করা হবে যাতে করে দাতা ও গ্রহীতার সব প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যায়।

জনাব রহমান বলেন, ধর্মীয় বিষয়গুলো দেখার জন্য তারা ইরান ও কুয়েতে কিভাবে মিল্ক ব্যাংক পরিচালিত হয়, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করেছেন।

প্রতিটি মায়ের দুধ আলাদা বিশেষ পাত্রে নেয়া হবে এবং আলাদা লেবেলিং থাকবে যা কখনো নষ্ট হবে না। যিনি দুধ দেবেন তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি নিজেও নিজের দুধ প্রয়োজনে নিতে পারবেন বা অন্য কেউ নিলে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে আইডি কার্ড থাকবে। দাতা ও গ্রহীতা এ বিষয়ে একে অন্যের বিস্তারিত জানতে পারবে।’

এছাড়া বিয়ের মতো সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি কোনো প্রভাব ফেলবে না, কারণ এই ব্যাংক সাধারণভাবে সবার জন্য নয়, বরং এটি বিশেষ ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর জন্য যেখানে জীবন বাঁচানোর চেষ্টাই প্রধান কর্তব্য, বলছিলেন জনাব রহমান।

হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক-এর এই সমন্বয়ক বলেন, ‘এটা কিন্তু সাধারণ ব্যবহারের জন্য নয়, যেসব শিশুর আর কোনো বিকল্প নেই তাদের জন্য।’

তিনি বলেন, ‘এমন কিছু রোগ আছে মায়ের দুধ ছাড়া ভালো হয় না। সেসব ক্ষেত্রে এ দুধ ব্যবহার করবে। অনেকে নিজের দুধ জমা রেখে নিজের সন্তানকে খাওয়াতে পারবেন। মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য জরুরি এ মহৎ উদ্দেশ্যে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে বিস্তারিত ডাটা সংরক্ষণ করে মায়ের দুধ সংগ্রহ ও দেয়া হবে এই মিল্ক ব্যাংক থেকে।’

মুসলমানদের সুদ, ঘুষ, দূর্নীতি, জেনা, জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, পায়ুসঙ্গম সম্পর্কে নানান নিষেধাজ্ঞা রয়েছে আমাদের আলেম সমাজ যদি ঐগুলি নিয়ে কথা বলতো তবে সমাজে অনাচার থাকতো না। এই শুভ উদ্যোগে তারা স্বতঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসার পরিবর্তে কেন যে বাধা প্রদান করছেন তা তাদের ব্যাখ্যায় পরিস্কার নয়। ডিজিটালাইজেশনের যুগে তারা যে আশংকা প্রকাশ করছেন তা নিতান্তই অমূলক।

যেখানে প্রাণ বাঁচাতে হত্যাকে জায়েজ করা হয়েছে সেখানে ভবিষ্যতে কি হবে এটা নিয়ে আশংকা প্রকাশ করে একটা চমৎকার উদ্যোগকে থামিয়ে দেওয়া শান্তি (ইসলাম) ধর্মের পরিপন্থী নয় কি?

কেন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কৈশোর?

সংলাপ ॥ শৈশব থেকে যৌবনে উত্তরণের মাঝের ধাপ হল কৈশোর। এই সময় শারীরিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক বিকাশও ঘটে। পরিবর্তন হয় পরিবার ও সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির। আজকের কিশোর কিশোরীরাই ভবিষ্যতের নাগরিক। কিন্তু বর্তমানে প্রায়ই আমরা দেখতে পাচ্ছি কিশোর-কিশোরীরা নানা ঘৃণ্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন, যে বয়সে ক্ষুদিরামের মতো বিপ্লবীরা দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন সেই কিশোর বয়সেই এখনকার প্রজন্মের কিছু কিশোর-কিশোরী অসামাজিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ছে কেন?

কিশোর-কিশোরীদের চিন্তাভাবনা আর প্রাপ্তবয়স্কদের চিন্তা ভাবনার মধ্যে কিন্তু যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কৈশোর অনেক সময়ই আবেগ দ্বারা, কৌতুহল দ্বারা পরিচালিত হয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, ধর্মীয় উন্মাদনা ইত্যাদি সহজেই তাদের মনোজগতে আলোড়ন তৈরি করে। আর এর ফলে মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ কিশোর- কিশোরীরাও জড়িয়ে পড়ে নানান অসামাজিক কাজে।

এ তো গেল প্রাথমিক একটি সম্ভাবনা। বিষয়টি আরেকটু তলিয়ে দেখলে বুঝব, কৈশোর হল বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সময়। ভাল বন্ধু যেমন ভাল আবহ, সুস্থ প্রতিযোগিতা, মানসিক উন্নয়নের কারণ হয়, তেমনই খারাপ বন্ধু তাকে বিপথগামী করে। আবার যে সব কিশোর-কিশোরীর তেমন কোনও বন্ধুই নেই তারা নিজেদের প্রমাণ করার জন্য নানান ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যোগ দেয় ও অনেক সময় পথ হারিয়ে ফেলে।

অনেক সময় এই বিপথগামী হওয়ার পিছনে পারিবারিক কারণও থাকে। বাবা-মায়ের ও পরিবারের সদস্যদের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া, বাবা বা মায়ের পুনর্বিবাহ, পারিবারিক কলহ, নিয়মানুবর্তিতার অভাব, অতিরিক্ত শাসন বা শাসনের অভাব, পারিবারিক সদস্যদের নেশা করার প্রবণতা, শারীরিক, মানসিক ও যৌন উৎপীড়ন ইত্যাদি কিশোর-কিশোরীদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, ক্ষুধা সংবলিত শহরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মনুষ্যেতর জীবনযাপন যেমন অনেকসময় কিশোর মনে অসামাজিকতার বীজ বপন করে, তেমনই উচ্চবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা কিশোর-কিশোরীও অর্থ ও ক্ষমতার গর্বে অন্ধ হয়ে ভুল পথে চালিত হয়।

কোনও কিশোর বা কিশোরী নেশার জালে জড়িয়ে পড়লে সে নিজের ভাললাগার কাজগুলি না করে, নিজের পড়াশোনা ও কাজ কর্মের ক্ষতি করে। ক্রমশ নেশাদ্রব্য ব্যবহারের পরিমাণ বাড়তে থাকে ও নেশা না করলে তার অস্বস্তি হতে থাকে। নেশাদ্রব্য কেনার টাকা জোগাড় করার জন্য সে অনেক সময় বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে বা অন্য কোনও অসৎ উপায় অবলম্বন করে। এই ভাবে ওই কিশোর ধীরে ধীরে নেশার দুষ্টচক্রের মধ্যে তলিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, নেশা আমাদের চিন্তা-চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তাই নেশার ঘোরে, কৈশোরের উন্মাদনায় বাস্তব বুদ্ধি হারিয়েও অনেকসময় তারা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।

আবার বিভিন্ন সংবাদপত্র, টেলিভিশন, ফেসবুক ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবৃত বিভিন্ন অপরাধের বিবরণ বা ভিডিও কিশোর-কিশোরীদের মনে গভীর ছাপ ফেলে, সেখান থেকেও অনেক সময় তারা বিপথে চালিত হতে পারে।

অনেকসময় শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের কিছু মানসিক সমস্যা থাকলে তাদের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অ্যাটেনসন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি) হল একপ্রকার মানসিক রোগ যার লক্ষণগুলি হল মনোযোগের অভাব ও অতি চঞ্চলতা। বড় হওয়ার সঙ্গে এই রোগের লক্ষণগুলি সংখ্যায় কমলেও কিছু সমস্যা থেকেই যায় যা কর্মক্ষেত্রে নানান বাধা সৃষ্টি করে।

আবার কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার নামক রোগের মূল লক্ষণগুলি হল-অসামাজিক আচরণ, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা, ঔদ্ধত্য, পশুপাখি বা অন্য মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন, অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা, মিথ্যে কথা বলা, স্কুল থেকে পালানো, চুরি করা ইত্যাদিও। এই রোগ ছোট থেকে শুরু হয়। উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে এরা কৈশোর অবস্থা থেকেই বা বড় হয়ে নানান অসামাজিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। অনেকসময় এইরকম একই মানসিকতার কিছু কিশোর-কিশোরী দলবেঁধে অপরাধ করে।

এই মানসিক সমস্যাগুলি সম্পর্কে অনেক অভিভাবক বা শিক্ষক-শিক্ষিকাই বিশেষ ভাবে অবগত নন। তাই এই সব বিষয়ে তাঁদের অবগত করা ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। উপরে বর্ণিত মানসিক সমস্যাগুলি থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

অপরাধ করলে শাস্তি দেওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু অপরাধ প্রবণতা কমানোর চেষ্টা করা বোধ হয় আরো বেশি দরকার। বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে বাচ্চার সুসম্পর্ক থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কৈশোরের চাহিদা বুঝে সেই অনুযায়ী অভিভাবকদের যতœশীল আচরণ করতে হবে। ভয়হীন ভাবে বাবা-মাকে মনের কথা খুলে বলতে পারলে কিশোর-কিশোরীরা সহজেই অনেক মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পারে। শারীরিক-মানসিক বা যৌন উৎপীড়নের ঘটনা ঘটলে বা হঠাৎ করে বাচ্চার ব্যবহারে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

দরিদ্র শিশু-কিশোরদের উপযুক্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন নেশা দ্রব্যের জোগান বন্ধ করতে হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলোকে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের উপযোগী ও শিক্ষামূলক নানান অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে। বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনাগুলির বিবরণ প্রকাশের ব্যাপারে সাংবাদ মাধ্যমগুলিকেও যতœশীল হতে হবে। কারণ অপরাধ সংগঠনের বিস্তারিত বিবরণ ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ ঘটানোর রাস্তা প্রশস্ত করে।