প্রথম পাতা

এক যুগেও কার্যকর হয়নি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ!

সংলাপ ॥ বাংলার মহান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেছেন “নিজের বিচার নিজে কর রাত্র দিনে”। সচেতন ব্যক্তি ছাড়া নিজের বিচার নিজে করতে পারা যে কত কঠিন তা সবাই বুঝতে পারে। নিজের কর্মের বিচার নিজে করতে সমর্থ না হলেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব, ফ্যাসাদ, হানাহানি। আর তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় নিয়মের ব্যত্যয় হয় আর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় সকলকেই। সেখানে সবারই প্রত্যাশা থাকে ন্যায় বিচার পাওয়ার। ন্যায় বিচারের জন্য নিরপেক্ষতা নয় প্রয়োজন সত্যের পক্ষাবলম্বন। কিন্তু প্রচলিত আইনের ধারায় তা যেন এক সোনার হরিণ। ব্যক্তিস্বার্থ আর গোষ্ঠীস্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে বিচারের নামে প্রহসন তৈরী হয়। ন্যায় বিচার বঞ্চিত হয় বিচার প্রত্যাশীরা। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য গঠিত আদালতে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকলে সেখানে ব্যক্তিস্বার্থ আর গোষ্ঠীস্বার্থের জন্য তা প্রয়োগ করবেই। তাই প্রয়োজন নিরপেক্ষ প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে প্রভাবমুক্ত করার তাগিদেই সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়। সে মোতাবেক বিচারবিভাগ পৃথকীকরণ দিবস ছিল গত ১ নভেম্বর। কোর্টের রায়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের লক্ষ্য পূরণে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নসহ ১২ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব নির্দেশনার অধিকাংশই পৃথকীকরণের এক যুগেও বাস্তবায়ন করেনি কোনো সরকার। প্রতিষ্ঠিত হয়নি বিচার বিভাগের জন্য নিজস্ব পৃথক সচিবালয়ও। ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তন যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল তার তেমন কোন অগ্রগতি আসেনি বিচার বিভাগে; বরং মামলাজট আর জটিলতা বেড়েছে দুই গুণ।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ-সংক্রান্ত মাজদার হোসেন মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা থমকে রয়েছে। তাছাড়া পৃথক সচিবালয় গঠন না হওয়ায় স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে সঙ্গত কারণেই। কারণ, এখনও বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নের বিষয়গুলোতে আইন মন্ত্রণালয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে অর্থ্যাৎ নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে। ঢাকার বাইরে আবাসন, যাতায়াত, নিরাপত্তাসহ কয়েকটি সমস্যাও বিচারকদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। যদিও পৃথক সচিবালয় গঠন করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

তবে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়ের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, “বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক দেশেই বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় নেই। ভবিষ্যতে যাই হোক, এখন যে ব্যবস্থা বিদ্যমান, বিচার বিভাগের জন্য সেটাই ভালো। অবশ্য অধস্তন আদালতের বিচারকদের সমস্যা সমাধানে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। ‘সরকার মামলাজট কমানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তা কমানোর জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিচার কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে এবং এজলাস সংকট নিরসনে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে।”

আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘‘মামলার দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো এজলাস সংকট। এ সংকট দূর করে সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ব্যবহার করে বিচার কাজে গতিশীলতা আনতে সরকার কাজ করছে। মামলা ব্যবস্থাপনার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।’’

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সময় দেশের সব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার। বর্তমানে দেশের সব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখ। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ২৯১টি। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সময় ২০০৭ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন  মামলার জট ছিল পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার। গত এক যুগে এ জট বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে নয় লাখ ১৬ হাজার ৭২৯টি। অর্থাৎ প্রায় চার লাখ মামলা বেড়েছে। সার্বিকভাবে অধস্তন আদালতে অন্যান্য শাখায় মামলাজট বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ১১৭টি এবং বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৪টি। এর মধ্যে সিজেএম ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছয় লাখ ৪৮ হাজার ৬০৩টি এবং সিএমএম ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দুই লাখ ৬৮ হাজার ১২৬টি। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা নয় লাখ ১৬ হাজার ৭২৯টি।

মাজদার হোসেন মামলার রায় অনুসারে সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন ও এর প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এ চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সচিবালয় নির্মাণের কার্যক্রম উদ্বোধনের জন্য দিন ও সময় চাওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন এই চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সাত বছরেও চিঠির কোনো জবাব মেলেনি বলে জানা যায়।

বিচার বিভাগে কাজের পরিধি বর্তমানে অনেক বেড়েছে। এসব কাজের সবকিছুই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে দেখতে হয়। ফলে অনেকাংশে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। পৃথক সচিবালয় হলে বিচার প্রশাসন আরও গতিশীল হবে। আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। তাই যে কোনো প্রতিকারের জন্য তারা আদালতে ছুটে আসছেন। কিন্তু বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর সরকার চাইলেও এককভাবে কোনো কিছু করতে পারে না। তাই মামলাজট নিরসনের জন্য সরকার ও বিচার প্রশাসনকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

কোনো রাজনৈতিক সরকারই চায়নি বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক। মাজদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী সরকার ইতোমধ্যে অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য পৃথক জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করেছে। এর আওতায় এ পর্যন্ত ১২টি পরীক্ষা হয়েছে। বর্তমান সরকারের টানা তিনটি মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৮৭৬ জন সহকারী জজ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও ১০০ জন সহকারী জজ নিয়োগের কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০০৭ সালের আগে সরকারি কর্মকমিশনের আওতায় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী জজ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় অধস্তন আদালতের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ, বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র পে-স্কেল  প্রণয়ন, কয়েকটি স্তরে গাড়ি সুবিধা দেওয়াসহ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য বাজেটে বরাদ্দও বেড়েছে। যদিও তা পর্যাপ্ত নয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোর জন্য বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ২৭৩ কোটি ৮২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি পদের সংখ্যা কয়েক বছরে বেড়েছে। সব মিলিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ৬৮৬টি। তবে বিচারক স্বল্পতার কারণে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা অনুমোদিত পদের চেয়ে কম। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা-সংক্রান্ত মাজদার হোসেন বনাম সরকার মামলার যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে ৩০১ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়ে বিচার বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে অধস্তন আদালতে এক হাজার ৭৯০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা কাজ করছেন।

বর্তমানে দেশ সবদিক দিয়েই এগুচ্ছে। কেবলমাত্র বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সরকারের বহু অর্জন মানুষের কাছে মর্যাদা পায় না। সম্প্রতি জনগণের ফুসে উঠার কারণে কিছু মামলা দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দেশবাসীকে শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে সামান্য মামলা নিয়ে যেভাবে আদালত পাড়ায় সাধারণ মানুষকে ভুগতে হয় তা দূর করার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকার বাস্তবমূখী পদক্ষেপ নেবে এই প্রত্যাশা দেশের মানুষের।

সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকরে প্রয়োগ আর অপপ্রয়োগের চ্যালেঞ্জ!

সময়ের সাফকথা….

সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকরে

প্রয়োগ আর অপপ্রয়োগের চ্যালেঞ্জ!

সংলাপ ॥ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে কার্যকর হলো বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮। গত ১ নভেম্বর হতে কার্যকর হলো আইনটি। গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের ঢাকা সেনানিবাস সংলগ্ন জিয়াকলোনী এলাকায় বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ঘটনার বিচারের দাবিতে সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ।একটি সফল ও যুগান্তকারী আন্দোলনের মুখে একই বছরের ৫ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায় আট বছর ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইন। গত সেপ্টেম্বরে সংসদে পাসের পর ৮ অক্টোবর তা গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। এর এক বছর পর গত  ১ নভেম্বর’২০১৯ হতে কার্যকর হলো আইনটি যদিও সড়কের বাস্তব চেহারা এখনও আগের মতোই।

এ আইন ভঙ্গ করার অপরাধে বিভিন্ন ধারায় সাজা বাড়ছে কয়েকগুণ। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিধিমালা প্রণয়ন এবং প্রস্তুতি ও প্রচার ছাড়াই আইনটি কার্যকর হওয়ায় এ সেক্টরে দেখা দিতে পারে বিশৃঙ্খলা। এই আইন বাস্তবায়নেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে সংশ্লিষ্টদের। জেল-জরিমানা বেড়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে পারেন মালিক, চালক যার শেষ ভোগান্তির শিকার হবে  যাত্রী তথা সাধারণ মানুষেরা। আইনটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো উচিত ছিল বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি একটি বহুল আলোচিত আইন। ২০১০ সাল থেকে এ নিয়ে কথা চলছে। দফায় দফায় মিটিং মিছিল করে সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে আইন প্রণয়নের পূর্বে।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আইন কার্যকর হওয়ার পর এর ফলাফল তথা আইনের প্রায়োগিক বাস্তবতা জনস্বার্থে কতটা কাজে লাগছে, তা বোঝা যাবে। তবে এই আইনে অনেক কিছুই রয়েছে, যার বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি প্রাক্তন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ‘চালক বা শ্রমিককে সাজা বা ফাঁসি দিলে দুর্ঘটনা বন্ধ হবে, এমন অলীক কল্পনা যারা করেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।’ তিনি সড়ক পরিবহন আইনের সব মামলা জামিনযোগ্য করার দাবি জানান। উল্লেখ্য, এ আইনে সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চলাচলের কারণে কারও মৃত্যু হলে চালককে পাঁচ বছর কারাদন্ড ভোগ করতে হবে। দিতে হবে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা প্রমাণ হলে ৩০২ ধারায় মামলা করা যাবে।

পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রচার ছাড়াই আইন কার্যকরের অভিযোগ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান ড. মো. কামরুল আহসান বলেন, ‘এ আইনের উদ্দেশ্য ঢালাও সাজা দেওয়া নয়, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম দিকে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে তা ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নতুন আইন কার্যকরের মাধ্যমে রহিত হয়ে যাচ্ছে মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩। নতুন আইনে সড়কে নিয়ম ভঙ্গে সাজা বেড়েছে কয়েকগুণ। অধ্যাদেশে বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। নতুন আইনে সর্বোচ্চ জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা এবং ছয় মাসের কারাদন্ড। ভুয়া লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনে গাড়ি চালানোর সাজা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা বা দুই বছর জেল অথবা উভয় দন্ড। অধ্যাদেশে রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি চালানোর সাজা ছিল সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানা ও তিন মাস কারাদন্ড। ফিটনেসবিহীন গাড়ির ক্ষেত্রে একই পরিমাণ সাজা ভোগ করতে হতো। নতুন আইনে রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ছয় মাস জেলের বিধান রয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর সাজা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা।

একটি বিষয় গভীর চিন্তার উদ্রেক করে আর তা হলো- আইনের অধিকাংশ ধারায় সর্বোচ্চ সাজার কথা বলা থাকলে সর্বনিম্ন সাজার কোন উল্লেখ নেই। বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. ইউছুব আলী মোল্লা বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা পরিস্থিতি ও অপরাধ বিবেচনা করে জরিমানা নির্ধারণ করবেন। তবে তা সর্বোচ্চ নির্ধারিত জরিমানার চেয়ে বেশি হবে না। বিধিমালায় এসব বিস্তারিত থাকবে।

সড়ক পরিবহন আইন তফসিলভুক্ত করতে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। আইনটি কার্যকর হলেও এখনও বিধিমালা হয়নি। এভাবে আইন কার্যকর করায় প্রশ্ন তুলেছেন শাজাহান খান। গত বৃহস্পতিবার তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকার আইনটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। প্রশ্ন হলো, বিধিমালা প্রণয়ন ছাড়াই আইন প্রয়োগে জটিলতার অবসান হবে কীভাবে?’

বিআরটিএর পরিচালক এবং বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য মাহবুব-ই রাব্বানী বলেন, ‘যতদিন বিধিমালা না হবে, ততদিন মোটরযান বিধি-১৯৮৪ কার্যকর থাকবে।’ কবে বিধিমালা প্রণয়ন শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে তিনি বলেননি। আইনে বর্ধিত জেল-জরিমানা প্রসঙ্গে বলেন, সব আইনেই সর্বোচ্চ জরিমানা ও শাস্তির কথা বলা থাকে। বিচারক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্নেষণ করে সর্বোচ্চ বা তার চেয়ে কম সাজা দেন। বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালালে ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও, এর চেয়ে কম জরিমানাও করা যাবে।

গত বছর পাস হলেও আইনটি শিথিলে ‘সংশোধনী প্রস্তাব’ দিয়েছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বাধাতেই গত আট বছর এ আইন করা যায়নি। এ প্রসঙ্গে শাজাহান খান বলেন, শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যাবে না। শৃঙ্খলা আনতে তার নেতৃত্বাধীন কমিটির ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।

নতুন আইনে-

১) ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গে জরিমানা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

২) উল্টোপথে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

৩) হেলমেট না থাকলে এখন জরিমানা ২০০ টাকা। নতুন আইনে জরিমানা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা।

৪) গাড়ি চালানোর সময় সিল্টবেল্ট না বাঁধলে, মোবাইলে কথা বললে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

৫) বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে তিন লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে চালককে। তিন বছর পর্যন্ত জেলও হতে পারে।

৬) নতুন আইনে চালকদের লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হবে। চালকের সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে।

৭) ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। সড়কে আইন ভঙ্গে জেল-জরিমানা ছাড়াও লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা যাবে। পুরো ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হবে।

৮) চালক ও তার সহকারীকে নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

৯) গাড়িতে অতিরিক্ত পণ্য বহন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছর কারাদন্ড ভোগ করতে হবে মালিককে। তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী লোডিং পয়েন্টে ওভারলোড পরীক্ষা করতে হবে।

১০) আইনের ৮৪ ধারায় গাড়ির আকৃতি পরিবর্তনে তিন বছর কারাদন্ড বা এক থেকে তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

১১) ৮৪ ধারা ছাড়াও বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে আহত করা (৯৮ ধারা), সড়কে মৃত্যুর (১০৫ ধারা) মামলা জামিন অযোগ্য করা হয়েছে এ আইনে। তবে সব ধারার মামলা জামিনযোগ্য করার দাবি জানিয়েছেন শাজাহান খান।

এ দিকে এ আইন সম্পর্কে সচেতনতা অভিযান চালাতে মাঠে নামছে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বাধীন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইন করে সব ঠিক করা যাবে না। সচেতনতা আর দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে না পারলে আইনের প্রয়োগ আর আরেক পক্ষে অপপ্রয়োগ বাড়বেই। বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি পরিবহন সেক্টরের সকল শ্রেনীর মানুষের আস্থার জায়গাটি এখনো পর্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক নয়। পারস্পরিক আস্থা এবং সততার জায়গাটি সৃষ্টি করতে না পারলে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, অরাজকতা তৈরী হবে যা সহজেই অনুমেয়। সরকার এ বিষয়ে নিজেদের সংস্থার প্রতি সজাগ থাকলে বাকিটা আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সেনানিবাসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনের এবং আইনের প্রয়োগের যে বাস্তব উদাহরণ রয়েছে তা হতে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে পারে। শুধু শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা সকল পক্ষের জন্যই জরুরী।

ভোগ থেকেই ভয়ের উৎপত্তি

নজরুল ইশতিয়াক ॥ কামনা কিংবা আকাঙ্খা থেকেই জন্ম হচ্ছে মানুষ। এটির নেপথ্যেও ভোগের সংশ্লেষ রয়েছে। জীবনের যে বহুমাত্রিক অস্থিরতা তার পিছনেও ভোগবাদী মনোভাবের যোগ। দখলদারিত্ব-আধিপত্য বিস্তার কিংবা কর্তৃত্ব জারি করার প্রবণতার পিছনে একই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে মানুষের অজান্তেই। দেহকে আরাম দিতে দিতে, দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধির মলম মাখতে মাখতে, দেহকে উপাদেয় খাবার দিতে দিতে একসময় এই দেহটাই ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়। দেহ নির্ভর কিংবা শরীর নির্ভর চিন্তা মানুষকে বাজারী মানুষে পরিণত করে। কেবলমাত্র জীবিকা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ চিন্তার জীবন দূর্ভাগ্যজনক হয়ে আসে। জীবন থেকে জীবনের এই চলা। কর্ম অনুযায়ী পরিবেশ-মাতৃগর্ভ। এই আসা যাওয়ার নেপথ্যে গভীর থেকে গভীরতর সত্য আছে। সেই সত্য উপলব্ধির জন্য যে সহায়ক পরিবেশ পারিবারিক শিক্ষা দরকার সেটি না থাকায় পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানদের ভোগবাদী জীবনের গল্প শোনাচ্ছে। এমন সব বিষয়ে পড়াশুনা করাচ্ছে যেগুলো প্রচুর অর্থ আয়বর্ধক। এ কারণে কোরআনুল করিমে বাপ দাদার ধর্ম মেনে চলার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। সূরা ওয়াক্বিয়ায় বলা হয়েছে- মানুষকে তিন ভাবে ভাগ করা হয়েছে। বাম ডান ও অগ্রগামী। বাম দিকের লোকেরা এক সময় স্বচ্ছল ছিল। গভীর তাৎপর্যবহ এই কথাটি প্রতিটি সত্যানুসন্ধানীর জন্য চিন্তার খোরাক যোগাবে। এ জন্যই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বাণী- ভোগের আনন্দ সাময়িক-ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন। প্রতিটি জীবনের সীমা আছে।

সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য এবং গভীর সত্য নিহিত। সেই জীবন প্রকৃতির সীমা জানা কঠিন। এ জন্য জ্ঞানী ব্যক্তির সান্নিধ্য লাগে। সেই সত্য উপলব্ধি হলে জীবনের কোন অনিশ্চয়তা নিরাপত্তাহীনতা থাকে না। ভয় শব্দটিরও কোন অস্তিত্ব নেই সেখানে। কিন্তু সাধারণ জীবনের পুরোটাই ভোগ্যবস্তু। ব্যক্তি নিজে হয়তো জানে না যে সে নিজেও একটা ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আবার তার চারপাশ নিরেট একটা ভোগের কারখানা। এই ভোগ তাকে ক্রমাগত সংকুচিত করতে করতে সত্য থেকে বহুদূরে নিয়ে যায়। পথ হারানো পথিকের মতো সেই জীবন আষ্ট্রেপৃষ্ঠে বাধা পড়ে। ভোগ থেকেই ভয়ের উৎপত্তি। একসময়  আপাতদৃষ্টিতে বোঝা না গেলেও একজন ভোগী খুবই ভয়কাতুরে মানুষ। ভোগের বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনাকে নিশ্চিত করতেই তার পক্ষে সমাজে ভয়-শংকাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন পড়ে। যিনি ভোগী তিনি সম্পদ সংগ্রহ-আহরণের দিকে যেমন গভীর মনোযোগী থাকেন তেমনি তা রক্ষায় বহু কলা কৌশল তাকে রপ্ত করতে হয়। যেমন দূর্গ সমেত বাড়ী-গাড়ী, নিরাপত্তা কর্মী এবং নেটওয়ার্ক। প্রয়োজনে নিরাপদ বাসস্থান খোঁজেন সুদূর প্রবাসে। কারণ সার্বক্ষণিক তাকে একটা ভয়কাতুর চিন্তা গ্রাস করে রাখে। এ জন্য তার সৈন্য সামন্ত লাগে। আর তিনি সমাজে অপরকে ভয় দেখান যাতে কেউ তার এই অসুস্থ্য প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ান। বৃহত্তর আঙ্গিকে চিন্তা করলে তথাকথিত চরম উন্নত দেশগুলোর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলো মারনাস্ত্র উৎপাদন। এটিও ভোগের পরাকাষ্ঠা থেকেই জন্ম নেয়া। এ বিষয়ের সত্য বের করা অনুসন্ধানীর কাজ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে বিষয়টি দেখা গেলেও এই সত্যতা ধরা পড়বে। রাজনীতি একটি ক্ষমতা। যা সুরক্ষা দেয় এবং সুযোগ তৈরী করে দেয় সম্পদ কুক্ষিগত রাখার। ক্ষমতার রাজনীতিতে নীতি কথা চলে না। আদর্শ শব্দটিও লোক দেখানো। একজন আপাদমস্তক ভোগী সমাজে তার নিজেকে নিরাপদ রাখতে, নিজের সব কিছুকে জায়েজ করতে একটা আবরণ তৈরী করে রাখেন। বলা যেতে পারে একটা দেয়াল তৈরী করেন। এই দেয়াল তাকে সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। ফলে তিনি এমন কিছু নীতি বাক্য কিংবা তথাকথিত ভালো কাজের অভিনয় করেন নিজ সম্মানার্থে যা অন্য সব কামনালিপ্সু মানুষকে সেই পথে টেনে আনে। ক্ষমতাধর ভোগী ছিটেফোটা অংশ ব্যয় করেন এ কাজে। এভাবে সমাজে শুরু হয় ভোগী হবার প্রবনতা। ভীড় বাড়তে থাকে।

অন্যদিকে অনেকের হয়তো ডাক্তারী পড়ার কথা নয়, কিন্তু বৃত্তশালী পিতার চাপে পড়ে তাকে মেডিকেল পড়তে হচ্ছে। পাসও করে যাচ্ছে সবাই। মেডিকেলে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হয়নি এমন লোকের সংখ্যা নেই। ফলে এমন ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারে রোগী মেরে ফেলবে অথবা রোগীর বড় কোন ক্ষতি করবে এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে প্রকৌশল বিষয়েও পড়তে বাধ্য হচ্ছে অনেকে। পড়াশুনা শেষে সরকারী চাকুরী জুটলে কোটিপতি হতে বেশিদিন লাগে না। তাহলে কাজের গুণগত মান কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ঘুষখোর জামাই কিংবা জামাইয়ের ইনকাম কত এটা পাত্রী পক্ষের একটা বিরাট চাহিদা। ফলে পরিবারই যখন লোভী ভোগী দুর্নীতি সহায়ক তখন আত্মশুদ্ধির জায়গা কোথায়?

ধর্মের নামে…. – ৭

সংলাপ ॥ স্রষ্টা এক ধর্মও এক। এখানে সত্য ধর্ম আর মিথ্যা ধর্মের অবতারণ বোকামী। সত্তাগুণের নিয়ন্ত্রিত বিকাশ হলে সেটা ধর্ম। অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ অধর্ম। ধর্ম সমাজের কোনো বিধি-বিধান নয়। মানুষের সৃষ্টি কোনো আইনের বাধনও নয়। স্রষ্টা কে? আমি কে ? আত্মা কী? আত্মা কিভাবে দেহে প্রবেশ করে? কিভাবে দেহ থেকে তা বেরিয়ে যায়? মন ও প্রাণ জীবের কোথায় থাকে? আত্মা কি জীবকোষের সমপরিমাণ? এসব প্রশ্নের উত্তর পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে জন্ম রহস্যের পরম্পরায়। প্রশ্ন হতে পারে অনেক। আল্লাহর রূপ কী? আল্লাহ কি মানুষ ভাবাপন্ন? মানুষ শোনে, দেখে, বলে আর আল্লাহও তো শোনেন, বলেন এবং দেখেন। আল্লাহর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রূপ কী? স্রষ্টা কি সৃষ্টি হতে ভিন্ন? আল্লাহ নিরাকার-প্রাণও নিরাকার। কার সাথে কার সম্পর্ক ? এসব কি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ? আল্লাহ কি মানুষকে তার প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন? ধর্ম নিয়ে গবেষণা করলে এর সবগুলো উত্তর পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন দেখা যাবে খারাপ কর্ম, খারাপ ধর্ম = নাস্তিক। ভাল কর্ম, ভাল ধর্ম=আস্তিক।

প্রতিটি শিশু একই প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে। পিতা-মাতা এবং সমাজ তাকে অন্যভাবে গড়ে তোলে। সকল শিশুরই ভাব-ভঙ্গি, হাসি-কান্না, ভয়-ভীতি, ক্ষুধা ইত্যাদি একই প্রকৃতির। জন্মকালে কারো দাঁত থাকে না। যদি থাকতো তবে মাতৃস্তনে ক্ষতের সৃষ্টি হতো। তাছাড়া, শিশুরা তখন তরল খাবারেই বেড়ে ওঠে। যখন শক্ত খাবার খাওয়ার সময় হয় তখন দাঁত আপনা আপনি গজিয়ে ওঠে। এগুলো প্রকৃতিরই অংশ। ধর্ম, প্রকৃতি ও বিজ্ঞান একই। একটি অপরটির বিরুদ্ধে কথা বলে না। তাছাড়া বিজ্ঞান স্রষ্টার কর্ম আর ধর্ম বিধান সেই স্রষ্টারই বাণী।

ধর্ম মানবের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত আইন। এ আইন সর্বজীবে সর্বজড়ে জন্ম থেকেই বিরাজ করছে। রেলগাড়ী যেমন লাইন ছাড়া চলতে পারে না, মানুষ ও জড় তেমনি ধর্ম ছাড়া চলতে পারে না। তাই, জন্মলগ্ন থেকে মানুষ যে প্রকৃতি বা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত তারই অপর নাম ধর্ম। ধর্ম পালন মানুষের জন্য অপরিহার্য। ধর্মই মানুষকে সত্যিকারের মানুষে পরিণত করে। ধর্মহীন মানুষ ভয়ংকর পশুর চাইতেও অধম। সঠিকভাবে ধর্মের অনুশীলন অন্তরের পবিত্রতা আনে, অন্তরের অন্তস্থলে আধিপত্য আনে। এক দেশের মানুষ অন্য দেশের জাগতিক আইন মানতে বাধ্য নয় কিন্তু পৃথিবীর সব মানুষ মানসিক, দৈহিক ও আত্মিকভাবে একই আইনের উপর যেহেতু প্রতিষ্ঠিত সেহেতু সকলকে তা অপরিহার্যরূপেই মেনে চলতে হবে। মানুষের তৈরি জাগতিক আইন নিয়ত পরিবর্তনশীল কিন্তু মানুষের সত্তাগুণের কোনো পরিবর্তন হয় না-হবার নয়। যদি হয়ে যায় তবে সে ধর্মহীন। মানুষ তার নিজের রচিত আইন দ্বারা অন্যের উপর প্রভুত্ব সৃষ্টি করতে পারে-নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে-কিন্তু মানব প্রকৃতি তা পারে না। ধর্মের অনুশীলন মানুষকে শান্ত-শীতল বাতাবরণে এনে দেয়-স্রষ্টার কাছে নিয়ে যায়। শিশুর জন্মের পূর্বেই তার খাদ্যের ব্যবস্থা প্রাকৃতিক। প্রকৃত ধর্মে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের

প্রতিটি অবস্থা ও স্তরের সমাধান বিদ্যমান রয়েছে। মানুষ যখন সত্তাগুণ হারিয়ে বসে তখন ঐশী বাণী নিয়ে মহাপুরুষদের আগমন ঘটে স্রষ্টার নিকট থেকে। যুগ-যুগান্তরে যারা ধর্মের কথা বলে গেছেন তারা সকলেই সাধু, সৎ ও সত্যবাদী। সমস্ত জীবনের সাধনা দিয়ে তারা ধর্মকে সত্য প্রমাণ করে গেছেন। তারা কিন্তু স্রষ্টাকে দেখাতে পারেননি। স্রষ্টাতো আসলে মানুষের ভেতরে। ভেতরের জিনিস বাইরের চোখ দিয়ে দেখবে কিভাবে? অন্তরের চোখ থাকলেই দর্শন সম্ভব। সূর্যের দিকেই তাকানো যায় না – সূর্যের স্রষ্টার দিকে কিভাবে তাকাবে বা দেখবে ? নবীগণ যে প্রক্রিয়ায় সেই মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছেন আমাদেরকেও সেই পথেই যেতে হবে। পথ একটাই যত মত তত পথ এটা ঠিক কিন্তু সকল মত ও পথে তাঁকে পাওয়া যায় না। মতের পার্থক্যে পথের সংখ্যা এত বেশি হয়ে গেছে যে কে কোন পথে যাবে তার কোনো দিশা করে উঠতে পারছেনা।

সিজারিয়ান অপারেশন : দৃষ্টি দেয়ার এখনই সময়

হাসান জামান টিপু ॥ স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি অনেক বিদেশী সংস্থা কাজ করছে। এক্ষেত্রে বিরাট বাজেট প্রতিবছর বরাদ্ধ হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে নেওয়া হয় ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। সাধারণ মানুষ জানে না পেশাগত ও নৈতিকতার কোন পাঠ সেখানে দেওয়া হয় কি না। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা মূলত দুইভাগে বিভক্ত; সরকারী ও বেসরকারী। সরকারী ও বেসরকারী সকল ক্ষেত্রেই নীতি নৈতিকতার একটা পাঠ বা শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে আজ। সরকারী হাসপাতালগুলিতে যদিও তুলনামূলক ভাবে মানবিক দিকটা মোটামুটি দেখা হয়, বেসরকারী হাসপাতালে অর্থের জন্য যে কোন অনৈতিক কাজ করতে তাদের বাঁধে না। এক্ষেত্রে সরকারও বোধকরি অনেকটাই অসহায়। দেশের বড় বড় বেসরকারী হাসপাতাল গুলির বিরুদ্ধে প্রায়শ অনৈতিকতার ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আসে। লাশকে দিনের পর দিন লাইফ সাপোর্ট দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তো নিয়মিতভাবেই শোনা যায়। ভুল চিকিৎসা, রোগীকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের থেকে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ নিত্য দিনের করুণ কাব্য।

এই অনৈতিকতার অন্যতম দিক হলো সিজারিয়ান অপারেশন এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বিশিষ্ট সাহিত্যিক ডা. জাকির তালুকদারের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে বাস্তব ঘটনা শেয়ার করতে চাই। “সিজারিয়ান অপারেশন ও আমার সন্তান:

আল্ট্রাসনোগ্রামের দেয়া তারিখ অনুযায়ী গাইনি ওয়ার্ডে নিয়ে গেলাম স্ত্রীকে। একদিন যায়, দুইদিন যায়। কিন্তু তার প্রসববেদনা ওঠে না। গাইনি-অবস-এর প্রফেসর ম্যাডাম খুব যত্নের সাথে দেখছিলেন আমার স্ত্রীকে। অন্য ডিউটি ডাক্তার, ইন্টার্নিবৃন্দ, ওয়ার্ডের স্টাফ সবাই ছিলেন খুব আন্তরিক এবং যত্নশীল।

কিন্তু তৃতীয় দিন ম্যাডামের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। বললেন- সিজারের জন্য তৈরি হও। আজকেই করে ফেলব।

আমি তখন নতুন ডাক্তার। ম্যাডামের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কোথায় পাই! তবু বললাম- ম্যাডাম, সাতদিন তো অপেক্ষা করাই যায়।

ম্যাডামের মুখে বিরক্তি। আমি তবু বলে চললাম- গর্ভের সন্তানের হার্টরেট স্বাভাবিক, হেড এনগেজড, পজিশন নরমাল, প্রেজেন্টেশন সেফালিক, অ্যামনিওটিক ফ্লুইড যথেষ্ট। সন্তানের মায়ের প্রেসার স্বাভাবিক, পায়ে কোনো পানি নেই, ইউরিনে অ্যালবুমিন নেই, কোনো খিঁচুনির লক্ষণ নেই। এই রোগীকে এখনই সিজারের সিদ্ধান্ত কেন দিচ্ছেন ম্যাডাম?

তিনি রেগে বললেন- তুমি কি আমার চাইতে বেশি জানো?

এই কথার কী উত্তর দেব? বললাম- আপনার চাইতে বেশি জানার প্রশ্নই ওঠে না ম্যাডাম। আপনি যেটুকু শিখিয়েছেন, সেটুকুই বলেছি।

এবার ম্যাডাম হেসে ফেললেন। বললেন- ঠিক আছে। অবজারভেশনে রাখো।

নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই পৃথিবীতে এসেছিল আমার পুত্র।’

২.

গতকাল আমার যে নতুন মায়ের জন্ম হয়েছে, আমার ছোট ভাইয়ের কন্যা, ফেসবুকে ছবি দেখে যাকে আপনারা অশেষ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, সেই মায়ের ক্ষেত্রেও ঘটনা কাছাকাছি। লিকিং হয়েছিল কিছুটা আগেরদিন। তাই তোড়জোড়। সিজার করতে হবে।

এখন আমি সিনিয়র ডাক্তার। (যদিও গাইনির নই)। ধমকের সুরে বললাম-দুই ঘণ্টা পর পর বাচ্চার হার্টরেট আর মায়ের ব্লাড প্রেসার মাপো। আর অপেক্ষায় থাকো।

আমার নতুন মা-ও পৃথিবীতে এসেছে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই।

[কী ওয়ার্ড: ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করো। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করো। শতকরা ৯০টা নরমাল ডেলিভারি হবে।]”

একজন ডাক্তারের অভিজ্ঞতা যদি এই হয় তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এক্ষেত্রে আমার নিজের অভিজ্ঞতাও বেশ হতাশার। পাঠকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই আরো করুণ। বাস্তবে ডাক্তারগন একটা আতংকজনক ও চিকিৎসাজনিত জটিলতা প্রসুতি ও তার স্বজনদের সামনে তুলে ধরেন যাতে তারা সিজার করানোর জন্য সহজেই রাজী হয়।

এদিকে দিন দিন এই হার বাড়ার জন্য সিজারিয়ান বেসরকারি ক্লিনিকের অর্থলিপ্সা, সরকারি ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু না হওয়া এবং ডাক্তারদের নৈতিকতার ঘাটতিকে দায়ী করছেন গবেষকরা।

বিদেশী একটি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রসব সিজারিয়ান বা সি-সেকশনে করানোর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডাব্লিউএইচও কিন্তু বাংলাদেশে সেই সীমা ছাড়িয়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। দিন দিন বাড়ার জন্য সিজারিয়ান বেসরকারি ক্লিনিকের অর্থলিপ্সা, সরকারি ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু না হওয়া এবং ডাক্তারদের নৈতিকতার ঘাটতিকে দায়ী করছেন গবেষকরা। দায়ী কিছু প্রসুতি মায়ের প্রসব পরবর্তী দাম্পত্য জটিলতার বিষয়।

আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় উঠে আসে এই ব্যাপক হারে সিজার করানোর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর কি রকমের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। ওই গবেষণায় উঠে আসে বাংলাদেশে বিভিন্ন পরিবার সম্ভবত তাদের আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ খরচ করছে বাচ্চা প্রসবের ক্ষেত্রে। কাউকে কাউকে ঋণ করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙেও এই খরচ করতে হচ্ছে।

ওই গবেষণায় দেখা গেছে, সিজারিয়ানের ক্ষেত্রে তাদের গড়ে খরচ পড়ছে ২৫০ ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ২০,০০০/-, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে যে খরচ মাত্র ৬০ ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ৪,৮০০/-।

এভাবে বাচ্চা প্রসবে খরচ বৃদ্ধি বাংলাদেশের ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার’ অর্জনে বড় বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় ওই গবেষণায়। বাংলাদেশে সিজারিয়ান নিয়ে আইসিডিডিআরবির ওই গবেষণা দলের প্রধান ডা. আবদুর রাজ্জাক সরকার এই বিদেশী সংস্থাকে বলেন, ‘‘বাড়িতে ডেলিভারি করা হলে মাত্র ১৪শ টাকা খরচ হয়। যখন সরকারি ইনস্টিটিউশনে ডেলিভারি করা হয়, সেখানে গড়ে ৬ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়। যখন সি-সেকশন করতে হয়, তখন এই খরচটা গড়ে ২১ হাজার টাকা হয়ে যায়। এটা মানুষের উপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।”

২০১৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশে সিজারিয়ান প্রসবের সংখ্যা শতকরা ৩১ ভাগ, যা বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত হারের দ্বিগুনেরও বেশি। তাদের নির্ধারিত হার অনুযায়ী, এই সংখ্যা হতে পারে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছেন, এই হার ক্রমশ বাড়তির দিকে। এর অন্যতম প্রধান কারণ প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো, এগুলির আয়ের ৯৫% ভাগই সিজারিয়ান অপারেশন থেকে আসে। একবার একজন প্রসূতিকে সিজার করতে পারলে দ্বিতীয় বাচ্চাও সিজারই হবে এটাই সিজারিয়ানের হার বাড়ার অন্যতম কারণ।

আইসিডিডিআরবির গবেষণায় উঠে এসেছে, ৩৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি মায়েরা অন্যদের তুলনায় বেশি খরচ করছেন। অন্যদিকে, শহুরে নারীদের মধ্যে যারা শিক্ষিত এবং জন্মদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন, তাঁরাও এই বেশি খরচের পথই ধরছেন। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হেলথ প্লানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে আইসিডিডিআরবি’র ওই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এ অবস্থা কমবে যদি ডা. জাকির তালুকদারের মতো ডাক্তাররা যদি এগিয়ে আসেন। নৈতিকতার যে অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, স্বাস্থ্যসেবা খাত তার বাইরে নয়। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে এবং সরকারের কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোকে। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালতে হবে।

নৈতিকতার শিক্ষা যদি অন্তর থেকে আসে তবেই অনৈতিক কাজ থেকে মানুষ বিরত থাকে। সেই শিক্ষাই মেটিভেটর হিসাবে দিতে পারে সিনিয়র ডাক্তারগন। এক্ষেত্রে ক্লিনিক মালিকদের বুঝতে হবে অসহায় রোগীদের চরম নির্ভরশীলতার জায়গা তার স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সেখানে নির্ভরশীলতার সুযোগে অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া অনুচিত এই বোধে বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। স্বাস্থ্যখাত যে একটি সেবামূলক খাত তা ক্লিনিক মালিকদের বুঝাতে হবে, সেবার মন মানসিকতায় তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং সরকারের কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে হবে। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালতে হবে। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রসূতি ও তার পরিবারকে সচেতন করতে হবে। সর্বোপরি একজন প্রসূতি ও তার নবজাতককে পৃথিবীতে আনতে হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে।

কর্মফলে লব্ধ শিক্ষা জাতির জন্য কল্যাণকর

শেখ উল্লাস ॥ বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজারবাইজানে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) ১৮তম সম্মেলনে যোগদান শেষে দেশে ফেরার আগে গত ১০ কার্তিক ১৪২৬,২৬ অক্টোবর ২০১৯ শনিবার ওই দেশের রাজধানী বাকুতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘অন্যকে শিক্ষা দেওয়াটা নিজের ঘর থেকেই শুরু করা উচিত। আমি সেটাই করছি এবং এটি অব্যাহত রাখব’। অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে পুনরায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, সে যে-ই হোক এবং যে দলই করুক না কেন। আপনারা দেখেছেন, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যদি আমাদের দলের কেউ অপরাধে জড়িত হয়, সে তৎক্ষণাৎ শাস্তি ভোগ করছে।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘অপরাধীরা অপরাধীই, আমরা অপরাধী দৃষ্টিতেই দেখব এবং আমরা সেটাই দেখার চেষ্টা করছি।’ বিএনপি-জামায়াত সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের পাঁচ বছরের দুঃশাসনে দেশে দুর্নীতির কোনো সীমা ছিল না।’ শেখ হাসিনা বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের হীন স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।

‘শিক্ষা দেওয়াটা নিজের ঘর থেকেই শুরু করা উচিত’-মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটি দেশের বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা দেওয়া বলতে তিনি যা বুঝিয়েছেন দেশের চলমান বাস্তবতায় তা অনুধাবন করতে পারা কারো পক্ষেই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশে বর্তমানে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছে এবং সে অভিযানের প্রাথমিক টার্গেটই হচ্ছে তাঁর নিজ দল ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ভেতরে দুর্নীতিবাজদের যে অশুভ চক্র গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অথচ তাঁর দল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ এদেশের স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, এ দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক-পৃষ্ঠপোষক ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নিজেদের প্রাণ বিসর্জনও  দিয়েছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে, দেশে সুশাসন ও ন্যায় বিচার  প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রামে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন এই দলের নিঃস্বার্থ নেতাকর্মীরাই, যাঁদের অনেকেই আজ দলের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এর বিপরীতে আজ দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় তখন দলে অনুপ্রবেশকারী ‘হাইব্রীড’রাই সুবিধা নিচ্ছে, দলের নাম ভাঙ্গিয়ে, বঙ্গবন্ধুর সাইডবোর্ড লাগিয়ে দোকান খুলে নগদ-অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছে। এরা কেউই কিন্তু অশিক্ষিত নয়, সবাই শিক্ষিত!

এদিকে, সম্প্রতি গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তারা ৫০ লাখ গ্রাজুয়েটকে সনদপত্র দিয়েছেন। এই বিশাল অংক থেকে দেশে উচ্চ শিক্ষিত লোকের বিশাল সংখ্যাটি সম্পর্কে আঁচ করা যায়। এছাড়া দেশে বর্তমানে শতাধিক  সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেগুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে। আর ধর্মীয় বিষয় নিয়ে শিক্ষার সাথে জড়িত বিভিন্ন ধরনের মক্তব-মাদ্রাসার সংখ্যা তো এখন সবচেয়ে বেশি। মসজিদ নেই এমন কোনো পাড়া-মহল্লা-গ্রাম বাংলাদেশে এখন একটিও পাওয়া যাবে না। মানুষ-সমাজ-সরকার ও রাষ্ট্র সকলই এখন অর্থবিত্তের মালিক, আর সেই অর্থবিত্ত দিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির জন্য মসজিদই বেশি সংখ্যক হারে নির্মাণ চলছে সারা দেশে। প্রতি বছর হজ্ব করতে যান লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যে যে জিনিষটির অভাব বেশি বোধ করছে জাতি সেটা হচ্ছে মানুষকে নৈতিকভাবে, ধর্মের প্রকৃত অনুশাসন মেনে চলার মতো শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কোথায় যেন ফারাক তৈরি হয়েছে।

তাই তো এ কথা আজ স্বীকার করতেই হয় যে, প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হচ্ছে না। কোথায় যেন একটি সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। আর এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট আকার ধারণ করে যখন একটি দল ক্ষমতায় আসীন হয় তখন থেকে। এ অবস্থাটা ক্ষমতাসীন সকল রাজনৈতিক দলের বেলাতেই দেখা গেছে। স্বাধীনতার এই অবস্থাটি নিশ্চয়ই কারও কাম্য ছিল না। এ অবস্থাটি উপলব্ধি করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রহমান তাঁর জীবদ্দশায় বহুবার বহুভাবে আক্ষেপ করেছেন। তিনি বলতেন, দুর্নীতি বাংলার কৃষকরা করে না, দুর্নীতি করে শিক্ষিত সমাজ। কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সর্বজনশ্রদ্ধেয় সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, ‘যদি রাজনীতি করো তাহলে দুর্নীতি করো না, আর যদি দুর্নীতি করো তাহলে রাজনীতি ত্যাগ করো।’  তাঁর মতে, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম।’  বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।’  প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সেই সোনার মানুষ কতজন সৃষ্টি হচ্ছে, কেন হচ্ছে না, কীভাবে সৃষ্টি করা যাবে-এসব বিষয়ে কর্মপন্থা গ্রহণই আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা শিক্ষিত হয়েও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হয়, মিথ্যাচার করে, বিদেশে টাকা পাচারসহ বিভিন্ন রকমের অনিয়ম ও অনাচারের সঙ্গে জড়িত হয় তাদেরকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে। এই শিক্ষা অনানুষ্ঠানিক এবং প্রাকৃতিক। মহান সাধকের বাণী এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য, ‘প্রত্যেক ব্যক্তিই তার স্বীয় কর্মবৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকিবে।’ কর্মফল ভোগের মধ্য দিয়ে লব্ধ শিক্ষার স্থায়িত্ব ও ফল ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও জাতি সবার জন্যই কল্যাণকর হতে পারে।

ঘৃণার চাষাবাদ কে বন্ধ করবে?

সময়ের সাফ কথা….

ঘৃণার চাষাবাদ কে বন্ধ করবে?

হাসান জামান টিপু ॥ সমগ্র মানবজাতি এক ও অভিন্ন সত্বা। কিন্তু আজ আমরা ভয়ংকর রকমের বিভক্ত হয়ে পড়েছি। রাজনৈতিক, ধর্মীয়, শাসন, শোষণ এবং বাদ প্রতিবাদেও আমরা বিভক্ত হয়ে গেছি। রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা থাকলে এক রকম প্রতিবাদ, রাজনীতি না থাকলে নির্লিপ্ততা।

এই বাংলাদেশেই ইয়াসমিন, রাজন, সাগর-রুনি, তণু হত্যাকান্ড নিয়ে যেরকম সার্বজনিন প্রতিবাদ হয়েছিলো, ত্বকী হত্যার পর যেমন আলোড়ন হয়েছিলো এখনকার সেই প্রতিবাদে এক প্রকারের শ্রেণী বৈষম্য চলে আসছে। সড়ক দূর্ঘটনার পরে যে প্রতিবাদ হয়েছিলো তা সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ডে মানুষ শিউরে উঠিয়েছিলো। মসজিদ, মাদ্রাসায়, স্কুলে, বাসা বাড়ীতে যখন আমাদেও মেয়েরা ধর্ষিত হয়, নির্যাতিত হয়, নূসরাতকে যখন পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হয় তখন এদেশের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে, প্রতিবাদ করে, আন্দোলন করে, পুলিশের মার খায়, গুলি খায়। এক শ্রেণীর মানুষ কখনোই রাস্তায় নামে না, তাদের মুখ থাকে কুলুপ আটা।

সৌদি আরব গৃহকর্মী নেয়ার জন্য বাংলাদেশ কে চাপ দিতে থাকে, সরকার নিরুপায়, গৃহকর্মী না দিলে পুরুষ কর্মী নিবে না। একরকম বাধ্য হয়ে সরকার রাজী হয় গৃহকর্মী পাঠাতে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি এসব মহিলা কর্মী পাঠায় তারা বড় অংকের কমিশন পায়। অথচ পুরো ব্যাপারটাতে যা ঘটেছে তা রীতিমতো ভয়ংকর, আর প্রচলিত ইসলাম বিরুদ্ধ। কারণ সৌদি ইসলামে কোন মহিলার একা ভ্রমন করার কোন এখতিয়ার নাই। তবুও তারা প্রতিবাদ করেনি, তাদের মুখ কুলুপ আটা।

সৌদিরা যখন আমাদের মহিলা কর্মীদের ধর্ষণ করে, নির্যাতন করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়, মহিলারা কান্নাকাটি করে তাদের উপর জঘন্য নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় তখনও তারা কিছু বলে না। তাদের মুখে কুলুপ আটা। এই যে মহিলা কর্মীর লাশ দেশে আসলো তারা কেউ কোন আওয়াজ তুলেনি। তারা আজ বোবা কালা। তাদের মুখে কুলুপ আটা। বস্তুত বাংলাদেশের কোন মানুষের জন্য তাদের কোন দরদ ও মনোকষ্ট কিছু নাই। এদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, সুনামী, বন্যায় কোন দুর্যোগইে তারা আমাদের কোনই উপকারে আসে না। তাদেরকে মানবতার কোন কাজে পাওয়া যায় না। তবুও তারা আমাদের সমাজকে চালায়, কারণ তারা যখন ভয়ংকর হয় তখন তারা বিধ্বংসী হয়। সব কিছু লন্ডভন্ড করে ফেলে তারা।

তারা নাকি বড় হেফাজতকারী! শান্তির ধর্ম ইসলামের হেফাযতকারী! তাদের দেখা যায় ইজরাইলের বিরুদ্ধে, ফিলিস্তিনে কিছু ঘটলে, রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের দরদ, কাশ্মীরীদের জন্য দরদ, ভারতীয় মুসলমানদের জন্য তাঁরা জিহাদে ঝাপিয়ে পড়তে চায়, আফগানিস্তানে তালেবান হতে চায়। সিরিয়ায় আই এস হতে চায়। বাংলাদেশকে তারা আফগান বানাতে চায়।

তারা রামুতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে, সর্বশেষ ভোলাতে যে কারণে এতো ভয়ংকর হলো তাঁর কারণ হলো ফেসবুকের হ্যাক করা একাউন্টে মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এর উপর কুৎসা রটনা। অন্য ধর্মের মানুষরা যদি এরকম করতো তাদের আইনের আশ্রয় নেয়া যেত কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় মুসলমানরা ফেসবুক হ্যাক করে নিজের নবীর নামে কুৎসা রটনা করে অসৎ উদ্দেশ্যে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সাধারণ নিরীহ মানুষ। তাদের কোন অপরাধে এই শাস্তি পেতে হয় তাঁরা জানে না। কিন্তু সেই সব লোকগুলি ঘটনা জেনেও সেই হ্যাককারীকে কিছু বলে না।

ফেসবুকে অনেককেই দেখি নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) কে অপমান করে ষ্ট্যাটাস লিখে। এখানে অনেকেই প্রতিবাদ করে, আমিও করেছি কয়েক জায়গায় কিন্তু সেই সব লোকগুলি এই স্ট্যাটাসের ব্যাপারে কিছু বলে না, কোন আন্দোলন করে না, প্রতিবাদ করে না। শুধু সনাতন ধর্মের নিরীহ লোকদের তারা অকারণে বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে দেয়, বাস্তুচ্যুত করে।

ফেসবুক সেলিব্রেটি সেফুদা, যেদিন পবিত্র কোরআনকে অপমান করেছিলো তখন কিন্তু ঢাকায় বাইতুল মোকাররম এলাকায় সেফুদার ফাঁসি চেয়ে কোন মিছিল হয় নি। কারণটা অজ্ঞাত।

আমরা জানি তায়েফে হুজুর পাককে (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) পাথর ছুড়ে রক্তাক্ত করলেও উনি পাথর নিক্ষেপকারীদের প্রতি কোন ঘৃণা প্রকাশ করেননি, প্রতিশোধ নেননি, এমনকি বদদোয়া পর্যন্ত দেননি। আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর হাবিবের এই অবস্থা দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও আল্লাহর নবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) তাদের জন্য দোয়া করেছেন- হে আল্লাহ তাদের হেদায়েত কর, তাদের সুমতি দাও। অথচ সেই নবীর উম্মত দাবীদার লোকগুলি কি ভয়ংকর তান্ডব করে! কেমন করে তারা তা করে! তারা নিজেদের পরিচয় দেয় তৌহিদী জনতা বলে! এই হিংস্র প্রকৃতির মানুষগুলি কেমন করে তৌহিদের কান্ডারি সাজে!

একেকটা ঘটনা ঘটে। মানুষ হয়ে মানুষকে আঘাত করে। সেই মানুষগুলি অসহায় হয়ে নিজের জন্মের প্রতি অভিসম্পাত করে থাকে। সরকারও যেন অসহায়! সেই লোকদের কাছে জিম্মি! কারণ তারা সংগঠিত হয় দ্রুত। তাঁরা যেকোন কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে যে কোন সময়! কেন নতজানু সরকার! দেশে সাংবিধানিক আইন থাকতে তথাকথিত তৌহিদি জনতার দিনের পর দিন তান্ডব কেমন করে সহ্য কওে সরকার?

তবুও আমরা অবাক হয়ে, অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দেখি বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, গলার কাছে কান্না জমে রয়, অসহায় আক্রোশে অক্ষমতায় কুঁকড়ে যাই, তাদের জন্য কোথাও কেউ নাই। মানুষ অপমানিত হয় মানুষের কাছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো ধর্ম বড় হয়ে যায় মানবতার কাছে। মানুষ কে উপেক্ষা করে কোন ধর্ম কি প্রতিষ্ঠা হয়েছে আল্লাহর জগতে?  শান্তির (ইসলামের) ধর্মের মূল শিক্ষা কি তাই? মানবতা ভ্রাতৃত্ববোধ, অন্য ধর্মের মানুষদের প্রতি কি আচরণ করতে হবে তা ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা স্বত্বেও কেন মানুষ ঘৃণার চাষাবাদ করে? সাধক নজরুল বলেছিলেন ‘যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে সে অপরের ধর্মকে ঘৃনা করতে পারে না’। শান্তি (ইসলাম) ধর্ম বাংলার সাংবিধানিক ধর্ম। এ ব্যপারে কিছু বলার বা করার থাকলে রাষ্ট্র তা করবে। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম অথচ হেফাযতে ইসলাম, তৌহিদী জনতা আর তথাকথিত ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি কেন, কিভাবে সাংবিধানিক ধর্মের বিষয়ে দেশে তান্ডব সৃষ্টি করে! সাংবিধানিক ধর্ম রক্ষায় সরকার তথা ধর্ম মন্ত্রনালয়ের কাজটা কি দেশের সচেতন নাগরিকরা জানতে চায়?

ভারত বিরোধীতার নামে ধর্মীয় কার্ড ব্যবহারের সেই পুরোনো রাজনীতি!

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ সালে, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) দ্বিতীয় সম্মেলনে ৩২ তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল এতে যোগ দেয়। সম্মেলনে যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে আঞ্চলিক চাপ ছিল। সেই সম্মেলনে বাংলাদেশকে মুসলিম দেশগুলো কি কি দিয়েছিল সেটি একটি বিরাট আলোচনার বিষয়। তবে পুরাতন মসজিদগুলো নির্মাণের সহায়তার আশ্বাস মিলেছিল বলে জানা যায়। সেই বৈঠকে একমঞ্চে পাশাপাশি বসে থাকা বহু ইসলামিক দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের পূর্বে। উপরন্তু এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের নায্য দাবীর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। অথচ জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সহ বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম হয়তো আশা করেছিল ইসলামিক দেশগুলো বৃহত্তরস্বার্থেই বাংলাদেশকে সাহায্য সহযোগিতা করবে। সেটা তারা করেনি। পরবর্তীতে দেখা গেল সেনা শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর এদের মধ্যেকার কিছু কিছু দেশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য সহযোগিতা বাংলাদেশ পেয়েছে!

৭২-৭৫’ এ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল করার পিছনে জাসদ নামক দলটি বিরাট ভূমিকা রাখে। জাসদের লোভের আগুনে পুড়ে ছারখার হয় দেশের রাজনীতি। জাসদও আওয়ামীলীগকে তাবেদার হিসেবে আখ্যায়িত করে ভারত বিরোধীতার রাজনীতিকেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে। দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ৭৫ এর ২৪ জানুয়ারী বাকশাল প্রবর্তন হয়। কিন্তু মাত্র ৭ মাসের মাথায় ১৫ আগস্ট জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে থেমে যায় সমস্ত তৎপরতা। পর্যবেক্ষকদের মতে আরও আগেই বাকশাল গঠন করা গেলে এমনটি নাও হতে পারতো।

১৫ আগস্ট ঘাতকেরা সফল হয়েছে আর তৎকালীন রাজনীতিকরা ব্যর্থ হয়েছে এটিই চুড়ান্ত মূল্যায়ণ। আজকে যেসব প্রবীন বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিক বুদ্ধিজীবীরা বড় বড় কথা বলেন তাদের পরিপক্কতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে অর্জিত সাফল্য এবং ভারত বিরোধীতার নামে ধর্মীয় কার্ড ব্যবহারের সফলতাকে পুজি করেই ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে আছে একটি বিপথগামী শক্তি। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে বর্তমানেও এই শক্তিটি প্রবল প্রতাপে বিপুল বিক্রমে ছড়িয়ে আছে।

ভারতই বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে। ৭১ এ তাদের সরাসরি সহযোগিতায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ভারত আমাদের ১ কোটির বেশি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল, এসব ঘটনা সবাই জানি। প্রতিবেশী হিসেবে ভারত না হয়ে চীন কিংবা অন্য কেউ হলে আর তারা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলে আমরা তাদের প্রতিও একই কারণে কৃতজ্ঞ থাকতাম। যেহেতু দেশটি ভারত এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু ফলে ভারত বিরোধীতার একটি কার্ড রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। কেননা আমাদের দেশটিকে ইসলামীকরণের একটি গোপন গভীর অভিসার নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক কোন কোন গোষ্ঠী। এ কারণে জামায়াতে ইসলামীকে মডারেট মুসলিম দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল আমেরিকা। যুদ্ধপরাধীদের বিচার থামাতে হিলারী ক্লিনটন ফোন দিয়েছিল। কাদের মোল্লা গংদের বিচার প্রশ্নে পাকিস্তানে মিছিল মিটিং হয়েছিল। আমরা হয়তো কখনোই ভেবে দেখি না দেশের বড় বড় ব্যাংক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে রাতারাতি গজিয়ে তোলা হয়েছে ইসলাম, শরীয়াহ, হালাল এর নামে।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক শত সহস্র বছরের। বলা যেতে পারে বাংলাদেশ নামক দেশটি কিংবা বাঙালি নামক জাতিসত্ত্বার সাথে ভারতের সম্পর্ক এক ও অবিচ্ছেদ্য। বিশেষ করে বাঙালির চিন্তা ও ভাবধারার ক্ষেত্রে। এমনকি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অবদান বাঙালিদের।

কেবলমাত্র আকারে বড় বলে নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর অজানা শংকা এবং প্রতিবেশী হিসেবে কিছু কিছু ক্ষত্রে ভারতের সংকীর্ণতাকে পুঁজি করেই এখন পর্যন্ত আবর্তিত হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। আমাদের সাথে তাদের রয়েছে ৪০৯৬.৭ কিলোমিটারের সীমান্ত। বৃহৎ প্রতিবেশি হিসেবে তাদের সাথে দেশের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে নানা চুক্তি হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া সরকারের আমলেও ভারতের সাথে চুক্তি করেছে। বরং জিয়াউর রহমান এক ধাপ এগিয়ে ভারত গিয়ে বলেছিল- ভারত আমাদের অভিভাবক। আর বেগম জিয়া তিস্তার পানির ব্যপারে কোন কথা না বলে দেশে ফিরে এসেছিল।

৭৪ সালে স্বাক্ষরিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকেই ৭৫ এর ১৫ আগস্ট পর গোলামী চুক্তি হিসেবে প্রচারণা চালানো হয়েছে জোরেসোরে। অথচ সেটি ছিল মূলত স্থলবন্দর চুক্তি। শত শত আর্টিকেল লেখা হেয়েছিল। আর সারাদেশ ঘুরে বিএনপি জামাত ফ্রিডমপার্টির লোকেরা ৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে গোলামী চুক্তি হিসেবে প্রচার করেছে।

ইতোপূর্বে ট্রানজিট এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফেনী নদীর পানি ও বেসরকারী পর্যায়ে এলপিজি গ্যাস রপ্তানী সংক্রান্ত পৃথক চুক্তি হয়েছে। এসব নিয়ে নতুন করে সেই বিরোধীতার রাজনীতিই দেখা যাচ্ছে। অনুসন্ধান বলছে বে-সরকারী কিংবা বলা যেতে পারে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে গ্যাস রপ্তানী সংক্রান্ত চুক্তির ফলে বাংলাদেশের যে কোন বৈধ অনুমোদিত ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে এলপিজি গ্যাস এনে তা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ভারতের ত্রিপুরায় রপ্তানী করতে পারবে। এই এলপিজি গ্যাস আমাদের দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস নয়। এতে সরকার ট্যাক্স পাবে। কিন্তু কোনভাবে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস ভারতে যাচ্ছে না। আর ফেনী নদীতে গভীর টিউবয়েল বসিয়ে পানি, ভারত আগেই তুলে নিয়ে যেত। তারা কি পরিমান নিয়ে যেত তা আমরা না জেনেই হইচই করছি। এবারে চুক্তির ফলে মাত্র ১.৮২ কিউসেক পানি খাবার পানি হিসেবে বৈধভাবে পাবে।

ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলো দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে কতটুকু কাজ করছে সেটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরাই বিস্তারিত বলতে পারবেন। কিন্তু কথায় কথায় রাজনৈতিক কার্ড হিসেবে ভারত বিরোধীতা চরম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এতে কোন সন্দেহ নেই। এটি চরম রুগ্ন একটি প্রক্রিয়া। এই নীতির উপর ভর করেই টিকে আছে কিছু দলের রুটি রুজি সর্বোপরি ক্ষমতায় যাবার পথ। বাবরী মসজিদ না রাম মন্দির কিংবা গরু খাওয়া না খাওয়ার বিবাদকে কাজে লাগিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির সস্তা কাজটি আজও অব্যাহত রয়েছে। একজন জবর দখলকারী সম্রাট বাবর (ভারতীয় নয়- আফগানিস্তানের মানুষ) নিজ নামে মসজিদ নির্মাণ করলেই সেটি ইসলামের পবিত্র সম্পদ হয়ে যায় না। বাবরী মসজিদ ভেঙে ফেলার পর গোটা দেশে যে ম্যাসাকার করা হয়েছিল, সেই ক্ষত থেকে আজও আমরা বের হতে পারিনি। ইসলামের নামে ভারত বিরোধী ওয়াজে সয়লাব ইউটিউব পাড়া। মাঝে মাঝে মনে হয় তথাকথিত ওয়াজ নসিহতকারীর একমাত্র কাজ ভারত বিরোধীতা। এটি না করলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ঈমানদার মুসলিম হবার শর্ত যদি হয় কথায় কথায় ভারত বিরোধীতা তবে সেটি সীমাহীন অজ্ঞতা। অনুসন্ধান বলছে ধর্মের নামে ভারত বিরোধীতার পিছনে আধিপত্যবাদীদেরই চক্রান্ত কাজ করছে। এ কাজে বৃহৎ শক্তিগুলোর বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। এ কারণে আমাদের দেশের ধর্মীয় সংগঠনগুলো এমনকি বিএনপির মতো দলগুলোর কখনো টাকার অভাব হয় না। বলা যেতে পারে আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেপথ্যে বিশাল বিনিয়োগই কাজ করছে। প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ ধর্মভীরু মুসলিম। ভারত কিংবা হিন্দু উপাসনার বিরোধীতা ধর্মের কোন বিষয় হতে পারে না। পবিত্র কোরআন হাদিসের কোথাও এমন কোন নির্দেশনা কেউ দেখাতে পারবেন না। তবে কোরআনের কয়েকটি সূরার অপব্যাখ্যা দেন ওয়াজকারীরা। যা অজ্ঞ ও চরিত্রহীন আলেমের কাজ। ইসলামের স্পিরিটের সাথে এটি যায় না।

ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় আমাদের দেশের তথাকথিত মুসলিম সংগঠনের কোন কার্যক্রমের প্রতি গুরুত্ব দেয় বলে জানা যায়নি। বরং আমাদের দেশের তথাকথিত নষ্ট ভ্রষ্ট ধর্মপ্রতারকেরাই সব সময় ভারত বিরোধীতাকে ঈমানী দায় হিসেবে দেখে। এমনকি কিছু বামপন্থি রাজনৈতিক দলও ভারত বিরোধীতার নামে সংকীর্ণতার সীমাহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত। কোন কিছু না পেলে ভারতকে জুড়ে একটা গালি দেয়।

ভারত নিজেদের ভারেই ভারাক্রান্ত একটি দেশ। কোন পথে যাবে, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক রচিত হবে কিসের ভিত্তিতে এটি তারা হয়তো আজও পরিস্কার করে নির্ধারণই করতে পারেনি। এটি নির্ভর করে পারস্পরিক আস্থা বিশ্বাসের উপর। আমরা নিজেরাও শতভাগ আস্থার পরিচয় দিতে পারিনি। স্মরণে থাকা উচিত উলফার একাধিক নেতা ঢাকা থেকে গ্রেফতার হয়েছিল। চট্রগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়েছিল। সেই অস্ত্র কাদের, কোন কাজে ব্যবহৃত হতো তা কি দেশের মানুষ জানেন?

উপরন্তু ভারত বহুজাতির বহু বিভেদ-বিভাজন আর সংকটের মধ্য দিয়েই মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে তারা হয়তো উপলব্ধিই করতে পারেনা প্রতিবেশি বাংলাদেশের সাথে তাদের গৃহীত নীতি কৌশল কেমন হবে। সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দেয়াটাকে তারা যতটা সহজভাবে দেখছে, বাংলাদেশের মানুষের এতটা সহজভাবে নেয়নি। ২০১৯ সালে এসেও সীমান্তে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়। হতে পারে এরা ছোটখাটো চোরাকারবারী, গরুর দালাল, তাই বলে কি হত্যা করার পর্যায়ে যেতে পারে? প্রতিবেশি দেশের মানুষের জীবন কি এতটা তুচ্ছতার সাথে দেখা যায়? এমনকি এখনো বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিভাবে ভারতে দেখানো যায় এই ক্ষুদ্র বিষয়টির কোন যৌক্তিক সমাধান হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে করা এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলা হলেও এটি বাড়তি দুঃচিন্তা যোগ করেছে। ভারত একটি পৃথক দেশ হলেও তাদের গৃহীত বিভিন্ন নীতির জোরদার প্রভাব পড়ে আমাদের দেশে। উগ্রধর্মীয় কার্ড ব্যবহারের কুফল আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকেই শংকিত করছে। ভারত বিরোধীতা থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না সংগত কারণেই। তবে কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এ জন্য জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্ক  যোগাযোগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পারস্পারিক অবিশ্বাস নিরসনে গুরুত্ব দিতে হবে। শক্তিশালী বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকেই এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

বিশ্ব রাজনীতির চক্রান্তের ফাঁদে ইসলাম ও বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোর যুবসমাজ

ফয়সাল ॥ হান্টিংটন হলেন বিখ্যাত মার্কিন জিও-পলিটিশিয়ান। তিনি তার থিওরিতে যেটা বলতে চেয়েছিলেন সেটা হচ্ছে কমিউনিজমের পতনের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সভ্যতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যাচ্ছে ইসলামিক সভ্যতা। মুসলিম দেশগুলি আলাদা-আলাদা ভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকলেও তিনি পুরো মুসলিম সমাজকে একত্রেই দেখেছেন। যেহেতু পশ্চিমা সভ্যতা মুসলিমদেরকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করবে, কাজেই মুসলিমরাও প্রায় স্বভাবসিদ্ধভাবেই নিজেদেরকে একই কাতারে দেখা শুরু করবে…।

এটা মুসলিম দেশগুলির সরকারের ক্ষেত্রে নয়, বরং মুসলিম দেশগুলির জনগণের চিন্তায় প্রতিফলিত হবে। হান্টিংটন দেখিয়েছেন যে, মুসলিম সভ্যতার সাথে সবচাইতে কম রেষারেষি হচ্ছে চৈনিক সভ্যতার বা চীনের। অর্থাৎ ইসলামিক দুনিয়াকে শক্তিশালী হতে চীন সাহায্য করতে পারে। এই গ্র্যান্ড থিউরির উপরে নির্ভর করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সভ্যতার জন্যে হান্টিংটন কিছু উপদেশ দিতেও কার্পণ্য করেননি যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন `to restrain the development of the conventional and unconventional military power of Islamic and Sinic countries”.

ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, এবং অন্যান্য দেশের বর্তমান অবস্থা দেখলে বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয় না যে হান্টিংটন কে পশ্চিমারা হাল্কাভাবে নেয়নি এবং হান্টিংটনের পরের থিউরিস্টরাও ওই একই পথ বেছে নেয়াকেই যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন।

এখানে বলাই বাহুল্য যে হান্টিংটনের কাছে জিওপলিটিক্সে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিতে পারা শক্তি ছাড়া বাকিরা গুরুত্ব পায়নি একেবারেই। যেমন আফ্রিকান সভ্যতা নিয়ে তিনি তেমন মাথা ঘামাননি। তবে ল্যাটিন আমেরিকান সভ্যতাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন এই বলে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হতে পারে।

রাশিয়া,জাপান এবং ভারতকে তিনি আলাদা শক্তি হিসেবে দেখেছেন, তবে তাদের আসল দ্বন্দ্বের (পশ্চিম বনাম ইসলাম) সাইড শো’র বাইরে গুরুত্ব দেননি। তার কথায় এরা নিজেদের স্বার্থ বুঝে প্রধান দল দুটির যেকোন একটির সাথে যাবে।

হান্টিংটনের লেখায় প্রথমেই প্রত্যেক মানুষকে তিনি প্রশ্ন করেছেন যে, মানুষ নিজের পরিচয় সন্বন্ধে কতটা ওয়াকিবহাল। সেই পরিচয়ের উপরে নির্ভর করেই তিনি তার থিউরি সাজিয়েছেন। তিনি এক্ষেত্রে আরব মুসলিমদের জন্যে আরব এর চাইতে মুসলিম কে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। অর্থাৎ আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরবের জাতীয়তার চাইতে মুসলিম পরিচয় বেশি গুরুত্ব বহন করবে। এই মুসলিম পরিচয় কিন্তু শুধু আরবের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে শুধু করে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত সকল মুসলিম-প্রধান দেশকেই বুঝিয়ে থাকে। আর যখন আমরা উপরে উল্লিখিত হান্টিংটনের উপদেশের কথা মনে করি, তখন শিউরে উঠি এই ভেবে যে, এই সকল মুসলিম দেশই এই হিসাবের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। মানে সকল মুসলিম দেশকে নিরস্ত্র করার মাঝেই পশ্চিমা সভ্যতার গ্রানাইট ফাউন্ডেশন! বাংলাদেশও এই একই হিসাবের ভেতরে রয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে সমস্যা হিসেবে দেখানো হলেও এই জনসংখ্যার কারণেই যে এই দেশ গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে সেটা অনেকেই হিসেব করেন না।

যারা বিশ্বাস করতে পারেন না যে কেন ছোট্ট বাংলাদেশ এই হিসেবের মধ্যে পড়বে তারাও হয়তো বিশ্বাস করবেন যখন এই হিসেবের সরাসরি Receiving End এ থাকবেন। বাংলাদেশ ছোট দেশ নয়। একুশ শতকে দেশের আকার হিসেব হচ্ছে সেই দেশের জনসংখ্যা এবং সেই জনসংখ্যার প্রকৃতির উপরে। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের স্থান।

হান্টিংটন দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার দেশগুলির জিওপলিটিক্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনার কথা বলেছেন কারণ যার জনসংখ্যা যত দ্রুত বাড়বে, তার কাছেই যুব সমাজের (১৫ থেকে ২৪ বছর বয়স) সবচাইতে বড়  অংশটা থাকবে যারা সমাজের চালিকাশক্তি হবে।

একটা দেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে এই যুব সমাজই কিন্তু জীবন দেবার জন্যে তৈরি থাকে। হান্টিংটন মুখে না বললেও বিভিন্ন গ্রাফিক্যাল এনালাইসিসের মাধ্যমে এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন যে মুসলিম বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার কারণে মুসলিম যুবসমাজ পশ্চিমের জন্যে হুমকি। জনসংখ্যার দিক থেকে বড় মুসলিম দেশগুলির কাছেই এই যুবসমাজের সবচাইতে বড় অংশটুকু রয়েছে যা কিনা এখন টার্গেট।

একটা রাষ্ট্র বা সভ্যতা দাঁড় করাতে মানুষ লাগে। যন্ত্রপাতি লাগে সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে, কিন্তু মানুষই তো সেই যন্ত্র তৈরি করে। তালগাছ ভর্তি একটা দেশ কোন দেশ নয় যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে মানুষ বসতি স্থাপন না করে। কাজেই এই মুসলিম জনসংখ্যার কারণেই আমরা যে টার্গেট সেটা বুঝতে বাকি থাকেনা। এই টার্গেটকে তাহলে কি করে দুর্বল করা যায় সেটা বুঝতে পারলে টার্গেটের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব।

প্রথম টার্গেট হলো জনসংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখা। আমাকে কেউ যদি বড় জনসংখ্যার সমর্থক বলে ধিক্কার দিতে চান তাহলে দিতে পারেন কিন্তু এটা তাদের বোঝা উচিত যে চীন এবং ভারত শক্তিশালী দেশ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে তাদের বিশাল জনসংখ্যার কারণে, জনসংখ্যা কমিয়ে রাখার কারণে নয়।

আর দ্বিতীয়ত, যুবসমাজই যেহেতু মূল টার্গেট কাজেই যুবসমাজকে অগ্রগামী হতে বাধা দেওয়া। তাদেরকে ঝঁনাবৎংরড়হ এর মাধ্যমে বিপথে নেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি কাজে লাগানো এবং সরাসরি মাদক এবং অন্যান্য অবৈধ কাজে তাদেরকে নিয়োজিত করে ফেলে তাদের একটা শক্তি হিসেবে আবির্ভাবে বাধা প্রদান করা।

তৃতীয়ত, দেশকে অকারণে একটা যুদ্ধে নিয়োজিত করা যাতে যুবসমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শেষোক্ত এই পদ্ধতি মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই পাওয়া যাবে যেখানে বিরাট এক যুবসমাজকে মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে মারামারি লাগিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সিরিয়া এবং ইরাকে অযথা যুদ্ধ বাধিয়ে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর সবচাইতে ভালো অংশটিকে পশ্চিমা সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হয়েছে। তাহলে এই তিনটি পদ্ধতিকে একত্র করলে আমরা পশ্চিমা সভ্যতার রক্ষাকবচ বলতে যা দেখতে পাই তা হচ্ছে মুসলিম জনসংখ্যা কমিয়ে রাখো যদি তারপরেও বেড়ে যায়, তাহলে তাদের যুবসমাজকে নষ্ট করো; আর তার পরেও যদি জেগে ওঠার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের নিজেদের মধ্যে মারামারি লাগিয়ে ধ্বংস করো।

ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া থেকে আমাদেরও শিক্ষা নিতে হবে। ইরম Picture না বুঝতে পারলে মহাবিপদের সম্মুখীন হওয়াটা আমাদের জন্যে অসম্ভব নয়।

ধর্মের নামে…. – ৬

‘যার যার অভ্যন্তরীণ গুণাবলীই তার ধর্ম। প্রতিটি জীব ও জড়ের অভ্যন্তরীণ গুণাবলীর স্বকীয় বিকাশকে ধর্ম বলা হয়। এসব প্রকৃতি যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন তা হয় অধর্ম। নিয়ন্ত্রিত হলে অর্থাৎ স্রষ্টার নির্দেশ মতে চললে তা হয় ধর্ম।’

সংলাপ ॥ প্রশ্ন হচ্ছে অন্য সব সৃষ্টিরও তো ধর্ম আছে অর্থাৎ ফিৎরাত আছে সেটা কেমন এবং কিভাবে? যার যার অভ্যন্তরীণ গুণাবলীই তার ধর্ম। এটাই ধর্মের একমাত্র পরিচয়-একমাত্র সংজ্ঞা। প্রতিটি পদার্থের প্রকৃতি ঐ পদার্থেই নিহিত থাকে সারাজীবন সুপ্তভাবে এবং তা যথাসময়ে প্রকাশিত হয়। ষড়রিপুকে পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যথাযথ নিয়ন্ত্রণের নাম ধর্ম। রিপু আসলে অপগুণ নয়। এগুলো মানব প্রকৃতির বিভিন্ন বিকাশ বা রূপ মাত্র। এক কথায়, এগুলো মানবীয় গুণ বিশেষ। আগুনের প্রকৃতি হচ্ছে দাহ করা, তাপ দেয়া, আলো দেয়া। যে কোনো একটি প্রকৃতি না থাকলে তাকে আগুন বলা যায় না। পানির প্রকৃতি হচ্ছে দ্রব করা এবং আগুন ও পানির প্রকৃতিকে অপ-ব্যবহার অধর্ম। আবার কাম, ক্রোধ, লোভ মোহ, মদ, মাৎসর্য প্রভৃতি প্রকৃতি যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন তা অধর্ম। সুতরাং, প্রতিটি জীব ও জড়ের অভ্যন্তরীণ গুণাবলীর স্বকীয় বিকাশকে ধর্ম বলা হয়। এসব প্রকৃতি যখন অনিয়ন্ত্রিত হয় তখন তা হয় অধর্ম। নিয়ন্ত্রিত হলে অর্থাৎ স্রষ্টার নির্দেশ মতে চললে তা হয় ধর্ম। লবণের ধর্ম কটুতা, চিনির ধর্ম মিষ্টতা, মরিচের ধর্ম ঝাল ইত্যাদি। এগুলো হচ্ছে সত্তাজ্ঞান যা মানুষকে চালিত করে জীবনের পথে-স্রষ্টার পথে। যা প্রকৃতি বিরুদ্ধে তা কখনো ধর্ম নয়। ধর্ম কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধে কথা বলে না। মানুষের ধর্ম তা-ই যা তার কর্মের মাঝে বিদ্যমান। যেখানে স্রষ্টার বিধান, সেখানে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। মানব প্রকৃতি ধর্ম ও স্রষ্টার প্রতি এমনিভাবে জড়িত যেমন বাতাসের সঙ্গে জীব বা পানির সঙ্গে মাছের সম্পর্ক।

ধর্ম মেনে চলবো কেন? কী দরকার? এ প্রশ্নের উত্তরে স্রষ্টাকে প্রাসঙ্গিকভাবেই টানতে হয়। স্রষ্টার সৃষ্টি স্রষ্টারই দেয়া সত্ত্বাজ্ঞানে চলবে এটাই প্রকৃতি। যারা স্রষ্টাকে মানে না তারা বলে যে স্রষ্টাকে দেখাও যদি তিনি থেকেই থাকে বিরাজমান। এগুলো বোকাদের প্রশ্ন। যা আছে তা কেবল দেখানোর মাধ্যমেই লাভ করা যায় তা সব সময় সত্য নয়। ঝাল অনুভব করতে জিহ্বা লাগে। টক, মিষ্টতা, তিক্ততার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। বাতাস তো দেখি না। তাই বলে বাতাস নেই একথা বলতে পারি না। সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ নাক দ্বারা বোঝা যায়। জীবনের পরিচয় আমরা পাই তার বিকাশের মাধ্যমে। দুধের মধ্যে ঘি অবশ্যই আছে। দেখানো সম্ভব নয় ? অসম্ভব বলা যাবে না। দুধ জ¦াল দিলে সর জমবে। সর ফেটিয়ে নিলে মাখন বের হবে। মাখন দিলে ঘি প্রকাশ পাবে। সুতরাং দুধেই তো ঘি থাকে এবং সেটা দেখাতে হলে যে সকল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অবশ্যই দরকার তা আমরা করলেই বুঝবো, দেখবো এবং অনুভব করবো। মানুষ তার স্রষ্টাকে দেখবে কিভাবে ? ঐ যে প্রক্রিয়ার কথা বললাম। সৎ পথে থেকে ষড়রিপুকে পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সত্যিকারের স্রষ্টার দাস হতে হবে। নিজের দেহের ভেতর সাধনার বীজমন্ত্র দিয়ে নিজকে উত্তপ্ত করতে হবে। চরম সাধনার দ্বারা জীবাত্মা থেকে সূক্ষ্মত্মায়, সূক্ষ্মত্মা থেকে পরমাত্মায় বিলীন হলে স্রষ্টাকে আর দেখার বাকী থাকবে না। লোহাকে উত্তপ্ত করলে আগুন আর লোহা যেমন বিচ্ছিন্ন নয়, চিনির সাথে পানি মিশালে তা যেমন আলাদা কিছু নয়, ঠিক তেমনি স্রষ্টাও তার স্বরূপে প্রতি জীবে, প্রতি বস্তুতে, অণুতে সর্বত্র বিরাজ করে বাঁচা-বৃদ্ধির লীলা খেলায় খেলে চলছেন নিরবধিকাল। আজ যেটা ধর্ম কাল সেটার কোনো পরিবর্তন হবে না। হলে সেটা ধর্ম নয়। সূর্য সঠিক সময়ে চলে। ফল-ফুলের মৌসুম না এলে তার বিকাশ সম্ভব নয়। কোরানের মতে, ‘পৃথিবীর সবকিছুই তাদের ধর্ম মেনে চলছে, সেজদা করছে স্রষ্টাকে, পালন করছে স্রষ্টার আদেশ সৃষ্টির সেই শুরু থেকেই।’