প্রথম পাতা

‘হাক্কানী দিবস’ প্রতীকী শপথের দিন, প্রতীকী সত্য দিবস

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সত্য শাশ্বত – চির বহমান, চির অম্লান। হাক্কানী দিবস সার্বজনীন। সত্য সবার জন্য। মহাকাল এসে মিলে গেলো একটি বিন্দুতে। আকাশের বুকে গ্রহ নক্ষত্র আছে বলেই আকাশ এত সুন্দর। ফুল আছে বলেই প্রকৃতির রাজ্য এত মনোরম। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আছে বলে সমুদ্র রূপময়। বিশ্ব চরাচর সত্যমানুষের রূপের ছটায় মুগ্ধ, ধন্য। তাঁদের স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ত্রিভূবন আলোকিত। সে জ্যোতি দৃষ্টিকে ঝলসে দেয় না বরং আকর্ষণ করে। তাঁরা তাঁদের স্বর্গীয় প্রভায় পৃথিবীর শ্রীহীন মানুষের দীনতা দূর করেন। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে। অজ্ঞ মানুষ তা বুঝতেও পারেনা। মানুষের কল্যাণে সত্যের নিবিড় সাধনায় যাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেন – সাধারণ মানুষের সাধ্য কি তাদের মহিমা বুঝতে পারা? যাদের অঙ্গুলী হেলনে বিশ্ব প্রকৃতি, দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি নতুন রূপ লাভ করে। সেই ঊর্ধ্ব লোকাচারী মানুষ সাধারণের জানার সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা মুক্তমানুষ, সত্যমানুষ, সত্যের আকাশে এক একটি ধ্রুবতারা। সমাজ সংস্কারের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ নিজস্ব সৃষ্টি শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করছে। সংস্কারের কালোমেঘ তাদের জীবনকে তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। জীবনের নানান সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে খুঁজে খুঁজে ব্যাকুল একটা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। তাদের ত্রাণকর্তারূপে যুগে যুগে আগমন ঘটে কালজয়ী মহাপুঁরুষদের। মানুষের অসহায়ত্ব তাঁদের কষ্ট দেয়। তাঁদের হৃদয় কাঁদে নিভৃতে ।

সত্যমানুষের হাত ধরে আবির্ভাব হয়েছিল বাঙালির জাতিসত্তার। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে বাঙালি জাতিসত্তার বীজ রোপিত হয় সত্যমানুষের মাধ্যমে। সেই থেকে আজ অবদি চলমান রয়েছে এই পথ। তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতি সত্যমানুষদের দেখানো শান্তি ও সত্যের পথ ধরে চলে এসেছে কিন্তু এমন ঐতিহ্যের  অধিকারী এই জাতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বহি:শত্রুর আক্রমনে নির্যাতিত হতে হতে নিজ জাতিসত্তার সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ হারিয়ে ফেলতে বসেছে। নানান দেশ হতে আগত ঔপনিবেশিক ধর্ম ও সংস্কৃতি বাঙালির চির শাশ^ত ও সৌন্দর্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির মাঝে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছে স্বধর্ম ও সংস্কৃতি। মিশ্র ধর্ম ও সংস্কৃতির যাতাকলে পড়ে যেন ভুলে যেতে বসেছে জাতিসত্তার আসল রূপ, আপন সত্তার আসল সত্য।

বাঙালির জাতিসত্তার আসল রূপ পুনরুদ্ধারে যুগে যুগে এই মাটিতে আগমন করেছেন সত্য ও শান্তির দিশারী সত্যমানুষ সূফী সাধকগণ। সত্যমানুষ সূফী সাধকদের আবির্ভাবের ফলে বাঙালি আপন সত্য ও সৌন্দর্যের সাথে পুনঃসংযোগ করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সত্য ও সৌন্দর্যের সংযোগ সূত্র যখনই ভুলতে বসেছে বাঙালি তখনই আবির্ভাব ঘটেছে সত্যমানুষদের অর্থাৎ সূফী সাধকদের। একেক জন সাধক একেক প্রক্রিয়ায় সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ প্রকাশ করেছেন এই জাতির মাঝে। আজও প্রকাশ করে চলছেন এই জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য। সত্যমানুষ সূফী সাধকদের আবির্ভাবের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতির মুক্তি ও শান্তির দূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, তিনিও বেড়ে উঠেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার চাঁন্দপুর গ্রামে। এই দুই মহান সাধক বাংলায় হাক্কানী তথা সত্য প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। জীবন ও জগতের সত্য, মানুষের সত্য, ধর্মের সত্য, এক কথায় মানুষের জীবনের প্রকৃত রহস্যের সন্ধান দেন এই দুই মহান সাধক। এই সাধকদের মহা সত্যকে জগতে বহমান রাখার জন্যে আবির্ভূত হন আরো অনেক সত্যমানুষ। সৃষ্টির বৈচিত্রময়তায় আর এক নব সংযোজন। পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক বাবা-মা পুত্র সন্তানের আশায় দারস্থ হন গাজী বাবার দরগায়। সেখানে মানুষ যায় স্বপ্ন পূরনের আশায়। দরগাহের সীমানার ভিতরে পুকুরে কলাপাতায় মোড়ানো শিন্নী ভাসায় কৃপাপ্রার্থীরা। সেই শিন্নী ভাসমান থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কৃপাপ্রার্থীরা পুকুরের কোলঘেঁসে পানির মধ্যে দুহাত পেতে বসে থাকে। শিন্নী ভাসতে ভাসতে যার হাতে এসে পৌঁছায় তার স্বপ্ন পূর্ণ হয়। গাজীবাবার দরগাহতে হাত পেতে সেই বাবা-মা লাভ করলেন এক দুর্লভ সন্তান। নাম রাখেন শেখ আবদুল হানিফ। এক সময় সেই সন্তান নিতান্ত খেয়ালের বশে, শুধু কি খেয়ালের বশে? না কি মূলের আকর্ষণে ছুটে গিয়েছিলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর ধানমন্ডি’র দরবারে। প্রথম দর্শনেই পেলেন ভিন্ন এক জ্যোর্তিময়তা। জ্যোতির্ময় গুরু প্রথম দেখায় পেলেন শান্তির সত্যের এক বাহককে। তাঁর মানসপটে এঁকে নিলেন এক ভাস্কর্যমূর্তি। তাঁর শৈল্পিকনন্দনে সৃষ্ট ভাস্কর্য জগৎকে উপহার দিলেন এবং তাঁর শিষ্যের হাতে তুলে দিলেন হাক্কানী দর্শন। পরিয়ে দিলেন হাক্কানীর রাজটীকা। প্রথম দর্শনে শিষ্য তাঁর সত্যকে ধারণ করলেন তেমনিভাবে, যেমনভাবে ঝিনুক বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করে নিজের বক্ষে সৃষ্টি করে মূল্যবান রত্ম। গুরুর সৌন্দর্যে বিমোহিত থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে জীবনের সাধনারূপে গ্রহণ করে গুরুর কৃপায় সত্যের অতন্দ্র প্রহরী নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছেন বিশালতার দিকে। বাংলার বুকে, বাঙালির জাগরণে, বাঙালির জাতিসত্তার সত্য উন্মোচনে দিয়েছেন মুক্তির বাণী ও দিক নির্দেশনা। সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি বাঙালি জাতির উত্তরণের সেই মন্ত্র- ‘সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নির্ভীক মহান সাধক বাঙালির জাগরণে আবারো দিয়েছেন আর এক মহামন্ত্র- ‘সত্য মানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।’

হাক্কানী দিবস-সত্য দিবস। সত্যমানুষ-এঁর আবির্ভাব দিবস। সত্য ছিল-আছে-থাকবে কিন্তু মানুষের জীবনাচরণে ক্রমশ তা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ তথা সারা বিশে^ হাক্কানী দিবস হিসেবে কোন দিবস পালিত হয়নি যা সারা বিশ্বের মানুষকে একই ব্যানারে একই আহ্বানে একত্রিত করতে পারে। হাক্কানী দিবস অত্যন্ত সূদুরপ্রসারি উন্মুক্ত একটি আহ্বান নিয়ে এসেছে যা সার্বজনীন।

হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীদের সত্য উপলব্ধি করার জন্য তাঁদের নির্দেশে বাংলার বুকে শুরু হয়েছে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার উদাত্ত আহ্বান। আর তাই চৈত্র মাসের তৃতীয় সোমবার ১৪২১ বঙ্গাব্দে প্রথম বারের মতো ঢাকাস্থ হাক্কানী আস্তানা শরীফ পাইকপাড়া মিরপুরে, ‘এক দিনের জন্য হলে ও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি’ – এই আহ্বানে বাংলার বুকে তথা বিশ্বের বুকে সর্বপ্রথম উদ্যাপিত হয়েছে হাক্কানী (সত্যব্রত) দিবস। এরই ধারাবাহিকতা চলছে এবং চলবে। মানবের মাঝে লুকায়িত থাকা সত্যকে আবিষ্কার করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে একটি দিবসকে সত্যব্রত দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে সত্য অনুসন্ধিৎসুদের প্রেরণায়।

হাক্কানী দিবসের সাথে বাংলার প্রকৃতির রয়েছে এক অপরূপ মিল। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে হাক্কানী দিবস ও বাংলার চৈত্র মাসের সাথে যোগ- সৌন্দর্যের কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। চৈত্র মাসের আবহটা কেমন এই বাংলায়? চৈত্র মাসের ঠিক আগে বাংলার প্রকৃতি কেমন? ষড়ঋতুর বাংলায় বসন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সৌন্দর্যের ঋতু। ফাল্গুন চৈত্র এই দুই মাস নিয়ে হয় বাংলার বসন্তকাল। বসন্ত মানেই রং এর প্রাচুর্য। নতুনের আবির্ভাব। প্রকৃতিতে নতুন পাতা, নতুন ফুল সবই বাহারী রং নিয়ে আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। শীতের জরা-জীর্ণতার শেষে বাংলা প্রকৃতির এমন রূপ দেখে নেচে উঠে বাঙালির চিত্ত খুশি আর আনন্দে। কবির ভাষায় –  আহা আজি এ বসন্তে / কত ফুল ফুটে / কত পাখি গায়…..।

বসন্তের আগমনে বাংলার প্রকৃতি সাজে সম্পূর্ণ নতুনসাজে, নতুন উদ্যমে, নতুন জাগরণে, নতুন স্বপ্নে। ফাগুনে প্রকৃতির বুকে নতুন সৌন্দর্যের জোয়ার আসে, চৈতালিতে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়। চৈত্রের খর তাপে ফুল, পাতা, ফলের জোয়ার আসে গাছে গাছে। তেমনি ভাবে হাক্কানী তথা সত্য পথের যাত্রীগণও হাক্কানী সাধকদের সান্নিধ্যে এসে সত্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে নিজকে জানা ও চেনার দিকে এগিয়ে যায়।

বস্তুত ‘হাক্কানী দিবস’ একটি প্রতীকী শপথের দিন, একটি প্রতীকী সত্য দিবস। একটি দিন এ দিবস পালন করলেই সকলে সত্যমানুষ হয়ে যাবেনা। কিন্তু সত্যমানুষ হয়ে ওঠার অঙ্গীকার করতে পারবে। দৃঢ় শপথের মাধ্যমে এ দিবসকে পালন করে নিজের জীবনে সত্যকে বাস্তবায়ন করে নিতে পারলে- এর চেয়ে পরমপ্রাপ্তি নবীন হাক্কানীদের জন্য আর কি হতে পারে !

হাক্কানী (সত্যব্রত) দিবসের অঙ্গীকার- ‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি – অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’। যে একদিনের জন্য নিজ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে, সে সত্যমানুষ হওয়ার পথের যাত্রী হিসাবে সত্যানুসন্ধানী হবে। নিজ সত্যের স্বরূপের সঙ্গে একবার সংযোগ হলে আর ভয় থাকেনা কিছু হারাবার। এটাই শাশ্বত চিরন্তন। হাক্কানী (সত্যব্রত) দিবস আবহে কৃপার সাগরে ধুয়ে যাক, মুছে যাক আমাদের সকল পঙ্কিলতা এই আমাদের প্রার্থনা।

আবির্ভাবের মাহেন্দ্রক্ষণে…….

‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি –
অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’

সংলাপ ॥ সত্য শাশ্বত – চির বহমান, চির অম্লান। সত্য সার্বজনীন। সত্য সবার জন্য। মহাকাল এসে মিলে গেলো একটি বিন্দুতে। আকাশের বুকে গ্রহ নক্ষত্র আছে বলেই আকাশ এত সুন্দর। ফুল আছে বলেই প্রকৃতির রাজ্য এত মনোরম। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আছে বলে সমুদ্র রূপময়। বিশ্ব চরাচর সত্যমানুষের রূপের ছটায় মুগ্ধ, ধন্য। তাঁদের স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ত্রিভূবন আলোকিত। সে জ্যোতি দৃষ্টিকে ঝলসে দেয় না বরং আকর্ষণ ও উজ্জ্বল করে। তাঁরা তাঁদের স্বর্গীয় প্রভায় পৃথিবীর শ্রীহীন মানুষের দীনতা দূর করেন। কখনও প্রকাশ্যে কখনও গোপনে। অজ্ঞ মানুষ তা বুঝতেও পারেনা। মানুষের কল্যাণে সত্যের নিবিড় সাধনায় যাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেন – সাধারণ মানুষের সাধ্য কি তাদের মহিমা বুঝতে পারা? যাদের অঙ্গুলী হেলনে বিশ^প্রকৃতি, দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি নতুন রূপ লাভ করে – সেই ঊর্ধ্ব লোকাচারী মানুষ সাধারণের জানার সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা মুক্ত মানুষ, সত্যমানুষ, সত্যের আকাশে এক একটি ধ্রুবতারা। সমাজ সংস্কারের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ নিজস্ব সৃষ্টি শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করছে। সংস্কারের কালোমেঘ তাদের জীবনকে তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। জীবনের নানান সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে খুঁজে একটা নিরাপদ আশ্রয়। তাদের ত্রাণকর্তারূপে যুগে যুগে আগমন ঘটে কালজয়ী মহাপুঁরুষদের। মানুষের অসহায়ত্ব তাঁদের কষ্ট দেয়। তাঁদের হৃদয় কাঁদে নিভৃতে ।

সত্যমানুষের হাত ধরে আবির্ভাব হয়েছিল বাঙালির জাতিসত্তার। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে বাঙালি জাতিসত্তার বীজ রোপিত হয় সত্যমানুষের মাধ্যমে। সেই থেকে আজ অবদি চলমান রয়েছে এই ধারা। তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতি সত্যমানুষদের দেখানো শান্তি ও সত্যের পথ ধরে চলে এসেছে কিন্তু গৌরবান্বিত ঐতিহ্যের অধিকারী এই জাতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বহি:শত্রুর আক্রমণে নির্যাতিত হতে হতে নিজ জাতিসত্তার সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ হারিয়ে ফেলতে বসেছে। নানান দেশ হতে আগত ঔপনিবেশিক ধর্ম ও সংস্কৃতি বাঙালির চির শাশ্বত ও সৌন্দর্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির মাঝে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছে স্বধর্ম ও সংস্কৃতি। মিশ্র ধর্ম ও সংস্কৃতির যাতাকলে পড়ে যেন ভুলে যেতে বসেছে জাতিসত্তার আসল রূপ, আপন সত্তার আসল সত্য।

বাঙালির জাতিসত্তার আসল রূপ পুনরুদ্ধারে যুগে যুগে এই মাটিতে আগমন করেছেন সত্য ও শান্তির দিশারী সত্যমানুষ সূফী সাধকগণ। সত্যমানুষ সূফী সাধকদের আবির্ভাবের ফলে বাঙালি আপন সত্য ও সৌন্দর্যের সাথে পুনঃ সংযোগ করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সত্য ও সৌন্দর্যের সংযোগ সূত্র যখনই ভুলতে বসেছে বাঙালি তখনই আবির্ভাব ঘটেছে সত্যমানুষদের অর্থাৎ সূফী সাধকদের। একেক জন সাধক একেক প্রক্রিয়ায় সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ প্রকাশ করেছেন এই জাতির মাঝে। আজও প্রকাশ করে চলছেন এই জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য। সত্যমানুষদের আবির্ভাবের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতির মুক্তি ও শান্তির দূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। এই দুই মহান সাধক বাংলায় হাক্কানী তথা সত্য প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। জীবন ও জগতের সত্য, মানুষের সত্য, ধর্মের সত্য, এক কথায় মানুষের জীবনের প্রকৃত রহস্যের সন্ধান দেন এই দুই মহান সাধক। এই সাধকদের মহা সত্যকে জগতে বহমান রাখার জন্যে আবির্ভূত হন আরো এক সত্যমানুষ। সৃষ্টির বৈচিত্রময়তায় আর এক নব সংযোজন।

তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের (বর্তমান পশ্চিম বাংলার) সোনারপুর মহকুমার চাকবেড়িয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক বাবা-মা পুত্র সন্তানের আশায় দারস্থ হন গাজী বাবার দরগায় (হযরত গাজি মোবারক শাহ, যার রওজা ঘুটিয়া শরীফ নামে পরিচিত)। সেখানে মানুষ যায় স্বপ্ন পূরণের আশায়। দরগাহের সীমানার ভিতরে পুকুরে কলাপাতায় মোড়ানো শিন্নী ভাসায় কৃপাপ্রার্থীরা। সেই শিন্নী ভাসমান থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কৃপাপ্রার্থীরা পুকুরের কোলঘেঁসে পানির মধ্যে দুহাত পেতে বসে থাকে। শিন্নী ভাসতে ভাসতে যার হাতে এসে পৌঁছায় তার স্বপ্ন পূর্ণ হয়। গাজীবাবার দরগাহতে হাত পেতে সেই বাবা মা লাভ করলেন এক দুর্লভ সন্তান। জগতবাসী পেল এক শান্তির দূত। এক সময় সেই সন্তান নিতান্ত খেয়ালের বশে, শুধু কি খেয়ালের বশে? না কি মূলের আকর্ষণে ছুটে গিয়েছিলেন বাংলার মহান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে। প্রথম দর্শনেই পেলেন ভিন্ন এক জ্যোর্তিময়তা। জ্যোতির্ময় গুরু প্রথম দেখায় পেলেন শান্তির সত্যের এক বাহককে। তাঁর মানসপটে এঁকে নিলেন এক ভাস্কর্যমূর্তি। তাঁর শৈল্পিকনন্দনে সৃষ্ট ভাস্কর্য জগৎকে উপহার দিলেন এবং তাঁর শিষ্যের হাতে তুলে দিলেন হাক্কানী দর্শন। পরিয়ে দিলেন হাক্কানীর রাজটীকা। প্রথম দর্শনে শিষ্য তাঁর সত্যকে ধারণ করলেন তেমনিভাবে, যেমনভাবে ঝিনুক বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করে নিজের বক্ষে সৃষ্টি করে মূল্যবান রত্ম। গুরুর সৌন্দর্যে বিমোহিত থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে জীবনের সাধনারূপে গ্রহণ করে গুরুর কৃপায় সত্যের অতন্দ্র প্রহরী নিরলসভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বিশালতার দিকে। বাংলার বুকে, বাঙালির জাগরণে, বাঙালির জাতিসত্তার সত্য উন্মোচনে দিয়েছেন মুক্তির বাণী ও দিক নির্দেশনা। জগতের বুকে পরিচিতি পেয়েছেন সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ নামে। সত্যমানুষ শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি বাঙালি জাতির উত্তোরণের সেই মহামন্ত্র-

‘সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’।

সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নির্ভীক মহান সত্যমানুষ বাঙালির জাগরণে আবারো দিয়েছেন আর এক মহামন্ত্র-

‘সত্য মানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।’

মা-মাতৃভাষা-মাতৃভূমির তথা বাঙালি জাতিসত্ত্বার সত্য প্রকাশে, প্রচারে ও প্রতিষ্ঠায় কেমন অনুরাগী ছিলেন তা তাঁর বাণী থেকেই উপলব্দি করা যায়।

সত্যমানুষ আবির্ভূত হন, জগতের বুকে সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার তরে। সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলে। হাক্কানী দর্শন প্রচার-প্রসারের যাত্রা হযরত আজানগাছি হতে শুরু হয়ে সূফী সাধক হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক হয়ে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ এঁর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। হাক্কানী দর্শনকে তিনি নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

সৃষ্টির বিধানে সকলেই বাধা। সত্যমানুষ সে বিধানে পরিবর্তন করেন না। অগনিত ভক্ত আশেকানদের ফাঁকি দিয়ে মহামিলনে পাড়ি জমিয়েছেন ৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার, সকাল ৭ টায় এবং ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২২ জুলাই ২০১৯, সোমবার, বেলা ১১.২১ মি. তাঁকে রওযায় চির বিশ্রামে শায়িত করা হয়। সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীদের শিখিয়েছেন আপনসত্য উপলব্ধি করার পথ। ‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি – অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’। যে একদিনের জন্য নিজ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে, সে সত্যমানুষ হওয়ার পথের যাত্রী হিসাবে সত্যানুসন্ধানী হবে। নিজ সত্যের তথা স্বরূপের সঙ্গে একবার সংযোগ হলে আর ভয় থাকেনা কিছু হারাবার। এটাই শাশ্বত, এটাই চিরন্তন। সত্যমানুষের কৃপার সাগরে ধুয়ে যাক, মুছে যাক আমাদের সকল পঙ্কিলতা এই আমাদের প্রার্থনা। সত্যমানুষ হারান না, সর্বদা বর্তমান। যে হৃদয় সত্যময় হয়ে উঠে সে হৃদয়ে সর্বদা সত্যমানুষ বর্তমান। সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীর হৃদয় নিজেকে প্রবোধ দেয় এই বলে – ‘নয়নের সম্মূখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’। ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছো নয়নে নয়নে’।

‘উপলব্ধি’ বিষয়ে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ পরিচালিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে উপলব্ধি বিষয়ে ২৬টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি পর্বে সত্যমানুষ উপস্থিত হয়ে বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের আলোচনাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। পথ দেখিয়েছেন। সম্মানিত আলোচকগণের চিন্তাশক্তিকে গভীর থেকে গভীরতম পর্যায়ে নিতে সহায়তা করেছেন। উপলব্ধি হচ্ছে প্রাপ্তির সৌন্দর্য এই সঙ্গা ধরেই হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীরা তাদের উপলব্ধিকে নিয়ে শাণিত করছেন প্রতিমুহুর্ত, প্রতিদিন।

‘উপলব্ধি’ বিষয়ে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ

আমি এক। এক ছাড়া আর কিছু কি আছে? সময় কি? আমি। অভ্যাস কি? আমি। আমি ছাড়া কেউ কি করতে পারবে? প্রাপ্তি এক, হানিফ এক, হানিফের প্রাপ্তি এক। ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান মানে- বল  আল্লাহ এক। হাক্কানী স্কুল অব থট বলছে – “তুমি এক উপলব্ধি কর”। প্রাপ্তি ঘটছে কিনা জানতে হলে তোমাকে অবশ্যই একটা বিন্দুতে সংযোগ করতে হবে। একটা নিয়ে চিন্তা করলে তা সঠিক হবে। তাই এক এ নিমগ্ন থাকতে হবে। এক এর সাথে একটাই কথা একাত্ম হওয়া। এক এর সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য সময়ের কি কোন প্রয়োজন আছে? কর্মের সাথে কতক্ষণ একাত্ম থাকেন। এক এর মূল্য কি? ১+১= ২ হয়? এক একাত্ম হয়ে তাঁর সৌন্দর্য অবলোকন কর। নিজেকে শূন্য করতে পারলে অবশ্যই এক এর সাথে একাত্ম হওয়া যায়। উপলব্ধিতে আসতে হলে পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠতা থাকতে হবে। যখন যে কর্ম করেন তখন সেই কর্মের মধ্যে ঢুকেন কিনা?

দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য- অন্যের কথায় নয়।দর্শন কি? দেখতে দেখতে দর্শন। আমার সমস্ত কর্মের মধ্যে দেখছি। ধারণের চোখে দেখছি। চিন্তা জগত, কর্মজগত, সর্বক্ষেত্রে সর্বসময়ে এক কে ধারণ করে চলা। কল্পনার জগতে তাঁকে ধরে রেখে নিষ্ঠার সাথে নিমগ্নতায় থাকা। দেখাই আমার সাধনা, স্মরণ আমার জীবন। সর্বকাজে সর্বসময়ে উপলব্ধি আছে। নিষ্ঠার সাথে নিমগ্নতার সাথে দেখলে সেখানে সৌন্দর্য পাওয়া যাবে। যেখানে উপলব্ধি আছে, সেখানে সফলতা আছে। এক এর দরজায় পোঁছালে আমার দর্শন শক্তি যোগাবে। প্রকৃতির অংশ হিসাবে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে যাও – এটাই এক। যা তিনি বহন করেন। বহন করেন তার সময়ের সাথে সাথে। সেখানেই ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান। সে যেদিকে যাবে সেদিকে সফল হবে। তার মধ্যে ৩টি গুনাবলীর সমন্বয় হবে। ১. পর্যবেক্ষণ (যে মুহুর্তে শুনছি ঐ মুহুর্তে করণীয় কি) ২. নিমগ্নতা (কি কি আমাকে করতে হবে) ৩. নিষ্ঠা (নিজস্ব সৌন্দর্যের সাথে ভাব হবে)। আপনি কি দেখেছেন আপনি কোন জায়গায় কতক্ষণ নিমগ্ন থাকতে পারেন ? এটাই ল্যাবরেটরি। এটাই ধর্ম। নিমগ্ন থাকলে আমি সৌন্দর্য দেখতে পাবো। প্রতিটি কর্মে একাত্মতা আছে। যেখানে একাত্মতা আছে সেখানে সৌন্দর্য আছে। যে মুহুর্তে যার সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছি, যেটা শুনেছি সেটাই করা। সংকীর্নতা সন্দেহ ভাল মানুষকেও নষ্ট করে দেয়। সংকীর্নতা মানে তুলনা বুঝায়। হীনমন্যতা থাকে বলে এটা হয়। উদ্বেগ, আবেগ, সংবেদনশীলতা, আর উত্তেজনা এই চারটা অবস্থানে একাত্ম থাকতে পারি কিনা ? পর্যবেক্ষণ করা যে আমি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছি কিনা এবং একাত্ম ছিলাম কিনা। তাহলে সৌন্দর্য দেখতে পাবো। আপনার মুখ যা বলেন তাই করেন কিনা নাকি মুনাফেকি করেন? দ্বিচারিতায় ভুগছেন। যিনি সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তিনি চুপচাপ আছেন। যেভাবেই যোগ হয় সেখানেই স্পার্ক হবে। সৌন্দর্যের ক্ষেত্র তৈরী হবে। সেটা কি আমি অনুধাবন করতে পারছি? অথবা তোমার মধ্যে যে কম্পন হয়ে গেল সেখানে কিছু ঘটে গেল কি না? বা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেলাম কি না ? ঐ কম্পন, অনুভবের জায়গা ধরে ফেলতে পারছি কিনা? ধরে ফেলতে পারলে আমি শান্ত হয়ে যাবো । ‘ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান’ হাক্কানী স্কুল অব থটের কথা। তোমাকে মোহাম্মদ হতে হবে। এটাই মহৎ। নিষ্ঠা, নিমগ্নতা দিয়ে প্রতিটি কর্মে প্রতিটি সময়ে থাকতে পারলে উপলব্ধির দরজায় আসতে পারবে। এগিয়ে যাওয়ার জন্যই সমুদ্রের স্রোতের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এখানে দু:খ নাই, কষ্ট নাই। আছে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ।  

কর্ম ব্যাখ্যা করলে তা সেবার মধ্যে পড়ে। সেবা করার চিন্তাটা এখনও আমাদের মধ্যে পৌঁছে নাই। কাছাকাছি যাওয়ার জন্য সেবা একটা মাধ্যম। বিশ্বাসের ঘরে যখন যাওয়াই হয়নি তখন গেলেই কি আর না গেলেই কি? সেবার পরিপূর্ণ জিনিস স্মরণ করতে হয়। চিন্তার জগতে করা যায়, দৃষ্টিতে করা যায়, মুখের কথায় উচ্চারণ করে করা যায়। সত্য যে খুঁজবো সে সত্যের আলো তার মধ্যে আসতে পারে আবার নাও আসতে পারে। দরবারে যখন খাচ্ছি সেটা কি কোন কিছু পাওয়ার আশায় নাকি ভক্তি বা শ্রদ্ধার সাথে হচ্ছে? পর্যবেক্ষণ শক্তি নিজের মধ্যে নিজে তৈরি করতে পারছি কিনা? অনুভূতির কোন জায়গায় আমি ধারণ করে আছি?

আমার আপাদমস্তক অর্থাৎ পা থেকে মাথা পর্যন্ত যতগুলি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে সে অঙ্গের একটি জায়গায় ধরে রাখতে পারছি কিনা। একটুখানি ধরে রাখতে পারলে আমি বুঝতে পারি? অনুভূতির জায়গায় আমি আছি কিনা? অনুভূতি ছাড়া পরিবর্তন হয়না। আমি কোন জায়গায় আমি স্থিত করেছি। অর্থাৎ অনুভব করছি। যেখানে নিয়ন্ত্রন আছে সেখানে স্থিতি আছে। নিয়ন্ত্রণ কি নিচে থেকে উপরের দিকে? নাকি উপরের দিক হতে নিচের দিকে করবো? চিন্তাজগত থেকে একটা চিন্তা বাছাই করে নাম স্মরণ করতে গেলে কি পরিবর্তন আসে? বুঝতে হবে। পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিজে নিজে উপার্জন করে অর্জন করতে হবে। কখনও কি চিন্তা জগতে তুমি ছাড়া রাখছি? আমাদের প্রায় ষাট হাজার চিন্তার আর চার হাজার কর্ম আছে। এর মধ্যে এটা একটা পদ্ধতি। সময়ের তালে তালে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। বই পড়ে পান্ডিত্য করা যাবে। নিজেকে চেনা যাবে না। কোন জায়গায় নিজেকে স্থিত করলাম?  বর্তমানই সত্য। কার সাথে একাত্ম হলে আত্মিক সম্পর্ক হলে শান্তি পাবো? নিজেকে শান্তিময় করে তুলতে পারবো।

শান্তির একটাই পথ। হাক্কানী সত্যের সাথে একাত্মতা। এজন্য আমি বহন করে যাচ্ছি সেখানে কোন জায়গায় আমি সত্যটাকে রাখছি? সেই সত্য আমার মধ্যে বাসা বাঁধছে। সত্য অন্বেষণ করে, পর্যবেক্ষণ করে, অনুসরণ করে কি আমি আমার অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারছি? কোথায় আছি আমরা? শুরু কোথা থেকে করতে হবে? মিরপুর আস্তানা শরীফ এটা একটা পরীক্ষাগার। সত্যময় সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। এত সস্তায় আনারকে ধরবেন?

সত্য অন্বেষণ করবেন কিনা তা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নিজেকে নিজে তৈরি করতে হবে। প্রশংসা আমরা বুঝি কি না?  সর্বস্তরে যিনি ধারণ ও লালন করতে পারে তিনিই প্রশংসা করতে পারেন। প্রশংসা করতে পারে একমাত্র গুরু। আমাদের জন্য করণীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, আরও পাবে। উপলব্ধির উৎস এক এ। সেখান থেকে উপলব্ধির শুরু। এক এ আসা মানে উপলব্ধির দরজায় আসা। উপলব্ধি মানে বোধ। উপলব্ধি শক্তি নয়। বোধ মানে জ্ঞান। উপলব্ধি হয়না বলেই আমি কোনটাতেই তৃপ্ত হইনা। জ্ঞান একটাই। যে কোন একটাতে আমি ঐ বিষয় নিয়ে পড়ে আছি। সে সৌন্দর্যের কোন শেষ আছে? আমি আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে আছি। আমাকে বার বার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমার ভাললাগা, অনুভূতি বার বার ঐ দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। বোধ জ্ঞানের পথে প্রথম দরজা। সব প্রাপ্তির মধ্যে এক প্রাপ্তি কোথায়? সব প্রাপ্তি প্রাপ্তি না। প্রাপ্তির কোন শেষ নাই। হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে প্রাপ্তির সত্যটা কোথায়? উপলব্ধির সত্য কোনটা?” সেইটার সাথে একাত্মতা হতে পারছি কিনা? ঐ এক পেয়ে আমি কি সন্তুষ্ট ? বহু প্রাপ্তি আছে। জ্ঞান সাগরে আমি দাড়িয়েছি। পা ফেলে ফেলে যাব। জ্ঞানের দরজার কাছে চলে এসেছি। প্রাপ্তি নেতিবাচক হতে পারে। ইতিবাচক হতে পারে। নেতিবাচক না হলে আমি সিজনড হবো কি করে? কোন প্রাপ্তি থেকে আমি সন্তুষ্ট?  ইলমাদুন্নবী  মানে দূরদর্শিতা। চেতনার স্তর যত মোটা তত সে জ্ঞানের দিকে যাবে। বাস্তবতা তাকে ফুয়েল দিবে। বাস্তবতার নিরিখে তুমি বার বার দেখো। সূক্ষ রেখা থেকে বাড়তে থাকে এই উপলব্ধি। সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে সে তখন নিজেই সৌন্দর্য হয়ে যাবে। স্পিরিট মানে আধ্যাত্মিকতা। চেতনার সর্বোত্তম শিখরে যখন যাবে তখন সে খেলবে। যে কোন রূপ ধরতে পারে। যে কোন ঘটনা ঘটাতে পারে। একমাত্র গুরুই চিনতে পারে। প্রাপ্তি তো সেখানেই।

ব্যক্তির সবচাইতে কঠিন জায়গা হচ্ছে তার ইচ্ছা। ইচ্ছা যখন প্রাপ্তির আশা করে তখন এই ইচ্ছা অন্য একটি ইচ্ছার কাছে সমর্পিত হতে হয়॥ তা না হলে হয় না। হামিবা যখন করবো তখন সত্য হবে ব্রত হিসাবে ধারণ। সত্য কোনটা? আমি লেখাপড়া করছি, আমি চাকরি করছি, এখানে কোন সত্য খুঁজতে যাবো? যে শাস্ত্রই বলেন, সব শাস্ত্র ঘেটে পাওয়া যাবে এক ঈশ্বরবাদ। সেই এক কে আমি কিভাবে বাস্তবায়ন করছি? কিভাবে একাত্মতা হচ্ছি? এখানে আমরা বসে আছি চার দেয়ালের মধ্যে। এখানেও প্রাপ্তি আছে। ভাল খারাপ বলছি না। এই মধ্যেও বৈচিত্র আছে। এই যে দেখা শুনার অনুভূতি সেইটা কতটুকু কোন জায়গায় একাত্ম হচ্ছে? আবার সরিয়ে দিচ্ছে? এই জন্যই উপলব্ধির জায়গায় যেতে হবে। প্রথমে নিজেকে এক এর মধ্যে অবগাহন করতে যেয়ে যে উপলব্ধি আসবে সেটাকে সে আস্তে আস্তে প্রতিনিয়ত নিয়ে যাবে। কাল আমি যে রূপ দেখেছি সেই রুপ বহন করে আবার আজ যে রূপ দেখছি এ দুটোর মধ্যে কতটা পার্থক্য হচ্ছে? পরিবর্তন হচ্ছে?

আমি ছেড়ে দিতে হবে। তুমিতে আসতে হবে। কিন্তু আমি ভুলে গিয়ে তুমির মধ্যে চলে তখন আমি কোথায় থাকে? যেখানে “তুমি” যতই দেখতে পাবে আমি ততই দুরে সরে যাবে। কেন? দৈহিক যে জিনিসটা আমরা বুঝি দৈহিক শক্তি যা বহন করার শক্তি আছে। সে শক্তিটা কি আমরা বুঝি? সেখানে দেখা যায় নিজের ইচ্ছার উপর নিজের আস্থা নাই। প্রতেক্যের কোন জায়গায় আকর্ষন করলো, বৈচিত্রতা সেখানে কার কতটুকু, কোথায় কতটুকু সময় এটা বৃদ্ধি করাতে হয়।এটা করলে ডেভেলপমেন্ট তাড়াতাড়ি হয়। যাই হোক। কম হোক বেশী হোক। যে সময়টা কাটানো হচ্ছে সেখানে কিছু না কিছু গ্রহণ থাকবে। প্রত্যেকের একটা অভ্যন্তরিণ সৌন্দর্য আছে। সে সৌন্দর্যটা সে দেখলো কি না। ব্যক্তি যে পরিবর্তনের ধারার মধ্য দিয়ে চলছে, ক’জন আছে মানুষ তার পরিবর্তন ধরতে পারে? যে ঐ পরিবর্তন ধরতে পারে সে তত নিজের সত্যের কাছে আসতে পারে। নিজের মধ্যে অভ্যাসের দাস, ইচ্ছার দাস, ভোগের দাস কোনটা নাই? এটা দোষ না। পৃথিবীতে জন্মাবার পর থেকে শুধু দেখেই আসলাম নিজের সৌন্দর্য দেখার অবকাশ পেলাম কোথায়?

এক- এর থিওরিতে যাবো কি করে? এটা নিজের আত্মবিশ্লেষণ করলে, নিজেকে নিজে পর্যবেক্ষণ করলে ধরা যায়। উপলব্ধি হচ্ছে প্রেমের পথে শুরুর বিন্দু। এখানে অনুসরণ এবং অনুস্মরণ বাধ্যতামুলক। চিন্তার পদ্ধতি শুরু হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত অনুভূতি আছে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈচিত্র আছে। বৈচিত্রময়তা আছে। অনুভব হলে তা স্থিত হয়।

স্ব-ভাব

মানুষ জন্মাবার পর পারিপার্শ্বিকতা হতে তার অভ্যাস গড়ে তোলে। প্রথমে সে চোখকে বেশি কাজে লাগায়। অনুকরণ ও অনুসরণ করতে চেষ্টা করে পরিবারের সদস্যদের এবং চোখ দিয়ে যা দেখছে সেগুলোকে। অতঃপর চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের সহযোগিতায় হাত, পা, মুখ, পায়খানা ও প্রসাবের রাস্তা সমূহের দ্বারা বিভিন্ন কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। যখনই কোন কর্ম করে তখনই সে সুখ, দুঃখ বা ঔদাসীন্যের সঙ্গে জড়িত হয়, কর্মফলের উপর নির্ভর করে। এভাবেই ধীরে ধীরে সে বড় হতে থাকে পরিবেশগত কর্মের মাধ্যমে। গবেষকদের মতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ৫ (পাঁচ) হাজার হতে ৭ (সাত) হাজার কর্মের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে প্রতিদিন। প্রতিদিনের এই কর্মগুলোর মধ্য দিয়েই একই পরিবেশ অন্তর্ভূক্ত কর্মের বারবার বাস্তবায়নে তার গড়ে ওঠে অভ্যাস। এই অভ্যাসের প্রকাশ ভঙ্গিতেই আস্থা গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে স্ব-ভাবে পরিণত হয়। ধর্মীয় আঙ্গিকে স্ব-ভাবের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্ব-ভাবকে দুই ভাগ করে সৎ স্ব-ভাব ও মন্দ স্ব-ভাব বলা হয়েছে এবং সৎ স্ব-ভাবের উপর বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সর্বযুগে-সর্বকালে সকল ধর্মে।

ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে সরাসরি সৎ স্ব-ভাবের উপর জোর দেয়া হয়েছে আত্মিক উন্নতির জন্য। নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন ঃ

– সৎ স্ব-ভাবই ধর্ম।

– সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট কার্য সৎ স্ব-ভাব।

– সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট গুণ সৎ স্ব-ভাব।

– সৎ স্ব-ভাবের বলে মানুষ ‘ছায়েমুদ্দাহার’ অর্থাৎ সারা বৎসর সিয়াম পালন করার এবং ‘ক্বায়েমুল্লাইল’ অর্থাৎ সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে এবাদত করার ফযিলত ও ছওয়াব লাভ করতে পারে।

ধর্মীয় গবেষকগণ সৎ স্ব-ভাবের পরিচয় বা তত্ত্ব বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হয়ে নানা মত ও পথের জন্ম দিয়েছেন নিজেদের জানা ও উপলব্ধিবোধ হতে। যেমন – হাসি মুখ, কষ্ট সহ্য করা বা অত্যাচারে প্রতিশোধ না নেয়া সৎ স্ব-ভাব। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলো এক একটি শাখা বা লক্ষণ কিন্তু সৎ স্ব-ভাবের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নয়।

মানুষ প্রাকৃতিক নিয়মেই জন্ম নেয়। পরবর্তীতে নিজের এক এক রূপ সৃষ্টি করে বিবর্তনের ধারায়। পরিবেশকে মোকাবিলা করার জন্যে কর্ম করে। কর্মের মধ্য দিয়েই তার দেহ শক্তিশালী হয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রকৃতি ও বৃত্তিগুলি সমভাবেই বিকশিত ও স্ফূর্ত হয়। এই বিকাশের ধারা থেকেই বিভিন্ন অঙ্গের শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, নিয়ন্ত্রণ শক্তি এবং প্রবৃত্তি জেগে উঠে। এদের মাঝে সমতা এবং সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্য আবির্ভাব ঘটে বিচার শক্তির। এই চার শক্তির কোনটা কম বা বেশি থাকলে স্ব-ভাব গড়ে উঠে না অপূর্ণ থাকে। কম হলে দুর্বল বা অকর্মণ্য হয় আর বেশি হলে কুৎসিত আকার ধারণ করে এবং তা তার কর্মের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। একই তালে চারশক্তির প্রবৃদ্ধি যখন ঘটে একটা কর্মকে কেন্দ্র করে তখনই গড়ে ওঠে স্ব-ভাব। স্ব-ভাব দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং তা যথাক্রমে সৎ স্ব-ভাব ও অসৎ স্ব-ভাব। এই দুই স্ব-ভাবের মধ্যে ব্যবধান নির্ণয় করার জন্য কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। ব্যক্তি যখন তার কর্ম অঙ্গগুলো সজাগ রাখে, তার বিচার শক্তি দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং প্রতিটি কর্ম বিশ্লেষণ করে তখনই তার মধ্যে চিন্তাজগতে দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয় আর এই দ্বন্দ্বই তাকে সৎ-অসৎ পথের সন্ধান দেয়।

যখনই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় প্রতিটি কর্মকে ঘিরে তখনই সৎ সংসর্গে আসা একান্ত আবশ্যক যিনি সংশোধনের জন্য পথ দেখান। তিনি অসৎ পথগুলোর ব্যাখ্যা করেন এবং পারিপার্শ্বিকতা গড়ে তুলতে অসৎ হতে সৎ পথের যাত্রীকে সহযোগিতা করেন। এছাড়াও যখন কেহ কর্ম বিশ্লেষণ করে নিজেকে উপলব্ধির পর্যায়ে উন্নীত করেন তখন তার কর্মগুলো খারাপ হতে পারে না। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং চিন্তাজগতকে সঠিক পথে চালাতে পারে। এইভাবে কোন কাজের অভ্যাস করতে থাকলে পরিশেষে ওই অভ্যাসই তার স্ব-ভাব হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কারণেই বলা হয় অভ্যাস দ্বিতীয় স্ব-ভাব। এখানেই অনুসন্ধিৎসু মানুষ পথ প্রদর্শক খোঁজে এবং মুর্শিদের সন্ধান করে আত্মসমর্পণ করে আত্মিক উন্নতির জন্যে। মুর্শিদ তাকে পথ দেখায় – আল্লাহ্ প্রেমের সন্ধান দিয়ে।

শরীর অসুস্থ হলে ভাল খাবারও যেমন মুখে খারাপ লাগতে পারে অরুচির জন্যে, ঠিক তেমনি চিন্তা ও চেতনায় খারাপগুলো অনুপ্রবেশ ঘটালে আল্লাহ্ প্রেম হতে সে দূরে থাকবে। তার ভাল লাগবে না আজ্ঞাবহ হতে।

চিন্তাজগতকে একরৈখিকতায় কার্যকরী করে যে সমস্ত কাজ করা যায় তার একটা প্রভাব অভ্যন্তরীণ চেতনায় বিস্তার লাভ করে। ফলে ব্যক্তি এক অনির্বচনীয় জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন – আল্লাহ্র নির্দেশ আনন্দের সাথে পালন কর। যদি না পার তবে জবরদস্তি সহকারে পালন কর, কেননা এই জবরদস্তি করার মধ্যে প্রচুর পুণ্য রয়েছে।

সাধনা এবং পরিশ্রম দুটোর সাহায্যেই ফিরিশতার স্ব-ভাব ও গুণ অর্জন করা যায় এবং আধ্যাত্মিক জগতই মানবজাতির মূল উৎপত্তিস্থল। ধন-দৌলত এবং পার্থিব প্রতিপত্তির মোহে মত্ত থাকিলে নিকৃষ্ট স্ব-ভাব গড়ে উঠে। সেই নির্বোধ যে নিজের সম্বন্ধে ভাল ধারণা পোষণ করে, নিজকে বহু গুণের অধিকারী বলে মনে করে ও নিজের মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি আছে বলে মনে করে না। বুদ্ধিমান সেই যে নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে সজাগ থাকে।

“একদা এক জিহাদ হতে আসার পর সাহাবাগণকে নবী মুহাম্মদ (সঃ) জিজ্ঞাসা করলেন – আমরা ছোট জিহাদ হতে আসলাম, না বড় জিহাদ হতে? সকলে আরয করলেন – ইয়া রাসুলাল্লাহ্ (সঃ),বড় জিহাদ কি? তিনি উত্তর দিলেন – নিজের নফস্ বা প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করাই বড় জিহাদ।” যত বড় দুর্দম্য এবং অবাধ্য প্রজাতি হোক না কেন নফস্ বা প্রবৃত্তি তদপেক্ষা অধিকতর অবাধ্য। তাই শক্তির লাগাম হতে অধিকতর শক্ত লাগাম দিয়ে নফস্কে সর্বদা বশে রাখা আবশ্যক। আর এর জন্য মুর্শিদের উপদেশ নামক অধিকতর শক্ত লাগামটি সর্বোৎকৃষ্ট।

এই আলোকে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সৎ স্ব-ভাবের কি প্রয়োজন তা একটু চিন্তা করলে বেশ বুঝা যাবে। মা-বাবা সৎ স্ব-ভাবী হলে ছেলে-মেয়ে সৎ স্ব-ভাবী হতে বাধ্য। এভাবে প্রত্যেকটি পরিবার সচেতন হলে সমাজ সচেতন হবে এবং সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলে যাবে। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় জীবনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন কর্ণধারদের অবশ্যই সৎ স্ব-ভাবী হতে হবে। তাঁদের সৎ স্ব-ভাব থাকলে তারই স্পর্শে প্রশাসনিক ধারায় সৎ স্ব-ভাবের প্রভাব পড়তে থাকবে যা শুধু সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করবে না বরং আত্ম-উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।

পৃথিবীর সকল চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় কিন্তু নিজের বিবেককে ফাঁকি দেয়া যায় না। তাই মানুষ সংসার জীবনে শুধু লোভ আর মিথ্যা অহং ভাবের বশবর্তী হয়ে বিবেকের তাড়নাকে ঢাকা দেয়ার জন্য অভিনয় করে যাচ্ছে মাত্র। ব্যক্তি জীবনে প্রত্যেক মানুষই ধর্মপালন করে যাচ্ছে আর সেটা হচ্ছে তার মোহাচ্ছন্নতার ইচ্ছাধর্ম। পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু তাতে তার লোভ ও অহংকার দিন দিন বাড়ছে বই কমছে না। ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলে শব্দটা বই পুস্তকে রয়ে যাচ্ছে কিন্তু ব্যক্তি জীবনে এর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণকে স্ব স্ব জীবনে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে চোখ। এই চোখই যতো নষ্টের গোড়া আবার এই চোখই সাধারণ মানুষকে আত্মিক উন্নতিতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে স্ব-ভাব গড়াতে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির স্ব-ভাবের পরিবর্তন দলের উপর প্রভাব বিস্তার করতে করতে সমগ্র জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করে জাতীয় জীবনে এক মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। তাই প্রয়োজন নেতৃত্বদানকারী নেতা-নেত্রীর সত্য ও দৃঢ় প্রত্যয়ী স্ব-ভাবী হওয়া। বিপদে পড়লে মানুষের চরিত্রের অনেক গোপন রহস্য উদ্ঘাটিত হয় আবার প্রকৃত বন্ধুও চেনা যায়।

আমাদের স্মরণে রাখতে হবে দেশবাসী না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তারা একটু শান্তি চায়, একটা সুন্দর পরিবেশ চায় যেখানে সার্বিক আতঙ্কমুক্ত থাকতে পারা যায়। আসুন, আমরা সৎ স্ব-ভাবী হওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের পথে পা রাখি।

সত্যমানুষতত্ত্ব

শাহ্ শাহনাজ সুলতানা ॥ ‘সূফী মানে সত্যমানুষ। মানবপ্রজাতির মধ্যে আবহমান কাল ধরে সত্যমানুষের স্বরূপের সমাহারই সূফীজম বা সূফীতত্ত্ব বা সত্যমানুষতত্ত্ব। স্বরূপ ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত যে জন তিনিই সত্যমানুষ। তিনি বর্তমান। তিনি প্রাকৃতিকরূপে বিরাজমান। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সত্য ছাড়া কিছুই দেখেননা। একেকজন একেক জনপদে আসছেন তিনি তাঁর মত করে তাঁর জনপদের উত্তরণ ঘটিয়ে যাচ্ছেন। এসবের সমাহারই সত্যমানুষতত্ত্ব। এটাই ঘটছে। এটাই আধ্যাত্মিকতা’। (-সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ)

সত্যমানুষতত্ত্বের আধুনিক ও যুগোপযোগী রূপরেখা প্রণয়ণে নিরলস কাজ করেছেন বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) তত্ত্বাবধায়ক প্রধান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ। সত্য অন্বেষণকারীদের প্রতি সত্যমানুষের বাণী, আহ্বান হাক্কানী স্কুল অব থট বা হাক্কানী চিন্তনপীঠ এর অন্তর্ভূক্ত। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে যা বলা হয় তা হচ্ছে হাক্কানী চিন্তন ধারা। এই ধারা থেকে বলা হচ্ছে-সবার উপরে সত্যমানুষ, তাঁহার উপরে নাই।

সত্যমানুষতত্ত্বের আধুনিক রূপরেখার স্বরূপ কি? যে ব্যক্তি যে রূপে আপাদমস্তক পরিপূর্ণ থাকেন সেটাই তার স্বরূপ। তিনি সেটাকে লালন করেন। যুগোপযোগী করেন। জ্ঞানার্জন করেন এবং প্রতিটি সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অর্জনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন এবং এগিয়ে যান। সত্যকে খুঁজতে গিয়ে কালে কালে কর্মের মধ্যে সত্যমানুষের স্বরূপের আধার অন্বেষণ করলে দেখা যায় তাঁরা পথ দেখিয়েছেন শান্তির। শান্তির পূর্বশর্তই হলো সত্য। যিনি যে কর্মে তার সত্যকে ধারণ করেছেন তিনি সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে যান একজন সত্যমানুষ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একেকজন একেক সত্য নিজের মধ্যে ধারণ করে লালন-পালনের ধারায় মানবজাতির জন্য নিজেকে প্রকাশিত ও বিকশিত করেছেন। সত্য প্রচার, প্রসার ও বিস্তার করেছেন। এখানেই সত্যমানুষতত্ত্বের নিগূঢ় কথা। সত্যমানুষ প্রাকৃতিকভাবে বিরাজমান এবং তিনি বর্তমান। বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন সম্পর্কের বেড়াজালে নিজেকে প্রকাশিত করেন। কেউ বলেন প্রাণের সখা, সুখ-দুখের সাথী, দয়াল, বন্ধু, সঙ্গের সাথী, দয়াল মুর্শিদ, বাবা, ভাই, মামা, এমন বহু নামের আড়ালে তিনি তাঁর কর্ম করে যান এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে মানবজাতির কল্যাণে বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে শান্তির জন্য আহবান রাখেন। সাধারণ মানুষ নানাভাবে তাকে ডেকে সম্বোধন করে মুক্তির পথ খুঁজেন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন- ‘আমি যারে চাই তার ভাবের অন্ত নাই- আমি যারে পাই তার রূপের অন্ত নাই’। আর তাই সত্যমানুষ নিরানন্দের মাঝে আনন্দের উৎস হন।

সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন- ধর্ম এবং ধর্ম্ম এক নয়। ধর্ম্মে ধারণের ব্যাপার আছে। এখানে ধর্ম কি? অনুভূতিসম্পন্ন হওয়া। এক বা ওয়ান সর্বোচ্চ শক্তি লক্ষ্যকে পাওয়ার ক্ষেত্রে। ওয়াননেস উয়িথ ওয়ান। নেশা খারাপ কিন্তু এক এর নেশা ভালো। অন্যের চিন্তা যখন নিজের চিন্তাকে উদ্ভাসিত করে তখন মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে। আমি যে মানুষ আমার যে সৌন্দর্য আছে, নিজের অবয়বের মধ্যে যা আছে নিজের সৌন্দর্যের মধ্যে নিজে পাগল থাকতে পারছিনা। প্রত্যেক কর্মে নিষ্ঠা খুব কঠিন জিনিস। কর্মের মধ্যে নিষ্ঠা থাকলে এবং নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেলে তার ফল পাওয়া যায়। যেটা শিখবেন, ভালমত শিখবেন। মায়ার বন্ধন, শ্রদ্ধার বন্ধন এবং ভাবের বন্ধন কি এক হতে পারে?

কখন মঙ্গলপ্রদীপ জ¦ালানো হয়? যখন একটা অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সূর্যাস্তের সময় এবং সূর্যোদয়ের সময়। সব আছে কিন্তু নিষ্ঠার অভাব। নির্দেশিত পথে চলা খুব কঠিন। ক’জন পারে? নিজের ইচ্ছায় সবাই চলতে পছন্দ করে। আবার যখন নিজের ইচ্ছায় চলে তখন বলে আল্লাহ আমায় দেখছেনা।” এভাবেই সত্যমানুষ যুগে যুগে কথা দিয়ে, বাণী দিয়ে সাধারণ মানুষদের দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলা হচ্ছে- সত্যমানুষের কর্ম হলো সমাজ সংস্কার করা। সুতরাং সত্যমানুষ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। যার দুটি দিক আছে। অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান যেখানে তাঁর সত্যের সাথে একাত্মতার কর্মপ্রণালী বিদ্যমান। অন্যটি হচ্ছে বাহ্যিক প্রতিষ্ঠান। মিশন স্কুল, কলেজ, গবেষণাকেন্দ্র, স্বাস্থ্য সেবা, হাক্কানী চিন্তনবৈঠক এর মাধ্যমে সমাজে সংস্কার মূলক কাজ করে যাওয়া এবং সম্পৃক্ত করা।

হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে বলা হয়েছে -“হক থেকে হাক্কানী। সত্য এবং সত্যের সাথে একাত্মতা। মহাসত্যের পথ। এই সত্যকে খুঁজতে গিয়ে যুগে যুগে কালে কালে কর্মের মধ্যে সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন সত্যমানুষ। নিজের মধ্যে একটি সত্যকে যখন ধারণ করে লালন করা হয় তখন দেখা যায় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগ, সংযোগ, সম্পর্ক হয়েছে। এই অবস্থায় আমরা দেখতে পাই সূফী সাধক আজানগাছী, সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রত্যেকেই এক একটি প্রতিষ্ঠান এবং এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত ও বিকশিত হয়েছে। সত্যমানুষ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে দ্বীন ও দুনিয়া এক করে ফেলেন। দ্বীনের মধ্যে দুনিয়াকে চাদরের মধ্যে আবৃত করে ফেলেন।”

মানুষের অন্বেষণ হচ্ছে শান্তি নিয়ে। চিন্তনপীঠে থেকে বলা হয়েছে- “যত রাসুল এসেছেন সবাই ইসলাম মানে শান্তি বলেছেন কিন্তু ধর্ম মানে শান্তি বলেননি। সূফী সাধক আজানগাছী এটাকে উপলব্ধি করেছেন। তৎকালীন সময়ে চার তরিকার সকলের সাথে সমন্বয় করেছেন। তাদের আদর্শ নীতি জেনেছেন। সকল ধর্মের সারাংশ হলো সত্যদর্শন। সেই সত্যের ধারাবাহিকতা এগিয়ে নিয়ে গেছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। সত্যদর্শন নিজের জীবনে লালন পালন করলেন। তিনি সত্যকে আলিঙ্গন করলেন। প্রধান শিষ্য সূফী সাধক আনোয়ারুল হককে বেছে নিলেন। হাক্কানীতে এমন কোন তরিকা নেই যার জিস্ট নেই। বর্তমানে যে ধারা চলছে তাতে ইসলাম মানে শান্তি এটা স্থাপন করা যাবেনা। এটা ভেবেই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে কাছে যতজন গেছেন তাদেরকে তিনি দুইভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

১. প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২. আধ্যাত্মিকভাবে।

প্রাতিষ্ঠানিক এবং আধ্যাত্মিক দুইভাবে সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসোবে কর্ম করেছেন তাঁর অন্যতম শিষ্য সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ। হাক্কানী চিন্তনপীঠে বলছে – সত্যকে যিনি আলিঙ্গন করেন তিনি হাক্কানী। একটা সত্যকে যিনি ধারণ লালন করেছেন তিনিও হাক্কানী পথের যাত্রী। সকল কর্মকান্ডে সত্য প্রতিষ্ঠা করার পিছনে যিনি সর্বক্ষণ নিয়োজিত তিনি হাক্কানী। যারা ধারন করেন, লালন করেন তাদের কাছে সবই সত্য। যে সত্যের অন্বেষণ করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের খলিফা আবু বকর হলেন ছিদ্দিক। এটা আর কেউ পায়নি। লক্ষ্য কি? আশু লক্ষ্য কি? চূড়ান্ত লক্ষ্য কি? এটা কি মুখের কথা? এই সত্য নিয়ে সূফীজমের কনসেপ্ট নিয়ে আবু আলী আক্তার উদ্দিন বাংলার মাটিতে পা রাখলেন এবং পরবর্তীতে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে তুলে দিলেন। ১৯৯০ সনে প্রতিষ্ঠা পেল হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

যোগ্যতা দেখা হয় হাক্কানীতে। কতটুকু সত্য নিয়ে তিনি সমাজে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং কতটুকু নিজের পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। পৃথিবীর বুকে যত তরিকা এসেছে সত্য ছাড়া চলতে পারবে না। যিনি ধারন করতে পেরেছেন তাদের কাছে পরম পাওয়া। নিজের মধ্যে যে অভ্যাসগুলো গড়ে উঠেছে তা কি এক-কে কেন্দ্র করে? যতক্ষণ পর্যন্ত হাবুডুবু খাবে ততক্ষণ হবে না। মোবাইল এসেছে। এ সংস্কারকে মেনে নিতে হবে। হাক্কানীর কথা এর উর্ধ্বে যাও। দেখ, সত্য তোমাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে?

কোরানিক মুসলিম মানে ভদ্র শান্ত। কোরান মানে পাঠ করা। আমি প্রতিদিন কি পাঠ করছি? আমি প্রতিদিন আমার এক কে পড়ছি কিনা? এটা যার যার উপলব্ধির ব্যাপার। আল্লাহ পাগল তাঁর পাগলের জন্য। সত্যকে আলিঙ্গন না করলে কেউ শান্ত হবে না। অর্ধসত্যে থাকলে ছল চাতুরি আশ্রয় নিতে হবে। শান্তি আনতে গেলে শান্ত হতে হবে। যেখানে যে সত্যের উপরে দাঁড়িয়ে আছে সে থাকবে নির্ভীক। কাউকে ভয় পাবেনা। স্বশিক্ষায় উদ্ভাসিত করতে না পারলে উপলব্ধি আসবেনা। যার যত কর্মের প্রতি অনুসন্ধিৎসুতা থাকবে, একনিষ্ঠতা থাকবে তার তত উপলব্ধি আসবে। মানুষ হিসাবে যে শক্তি ছিল তা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। কিভাবে উপলব্ধি আসবে? আর যারা সংযোগে থাকবে আপাদমস্তক যে আবরণে আছে তারা বিশ্লেষণ করতে পারবে কোনপথে আছে।”

সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন- ‘সত্য বের করা কঠিন। সত্যমানুষ হওয়া আরও কঠিন। নিজের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে নিজের সত্যকে বের করতে হয়’। এজন্যই আহবান রেখেছেন – ‘সত্যমানুষ হোন – দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’।

কর্মই ধর্ম হোক

সংলাপ ॥ বাংলার মানুষ থাকতে চায় সার্বিক অঙ্গনে মুক্ত। বাঁধন থেকে মুক্তি। সবধরনের বন্ধন অবসান। সকল রাজনীতিক দুর্বৃত্তের-দুশ্চরিত্রের-দুঃশাসনের-দুর্নীতির আকাশচাপা অবরোধ দূর হোক – এই হচ্ছে বাংলার মানুষের প্রার্থনা।

একপ্রকার প্রবল অনিশ্চয়তা, ব্যাখ্যাতীত ভীতির ছায়া ক্রমশই  গ্রাস করে চলেছে সমাজজীবন, নাগরিক, এমনকী ব্যক্তি-জীবনকেও। এখন বাংলাদেশের চল-চ্চিত্রায়ণে এমনই এক ইঙ্গিত। ইশারায় নয়, স্পষ্ট অভিব্যক্তিতে। হয়তো এ ভাবনার সমীচীনতা সকলে স্বীকার না করতেও পারেন, তবুও সন্দেহ নেই যে, বিপন্নতা বাড়ছে। না;এ কোনও বিষাদের বিলাপ নয়, বরং রাজনৈতিক সংকটের পূর্বাভাসে আগাম সতর্কতা।

সরকার আছে। শুধু একে দুষে কোন লাভ নেই। কারণ অনেক কিছুরই যে অভাব সেখানে। প্রাজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা, অধ্যবসায়, সাংগঠনিক পরম্পরা-দলীয় এবং প্রশাসনিক সব প্রয়োজনীয় উপাদানে পুষ্ট হওয়ার পূর্বেই ভূমিষ্ট হয়ে বাংলাদেশ আজ ৪৪ বছরের কীর্তিমান। কারও চেষ্টায় নয়, পরিকল্পিত পন্থাতেও নয়, কেবল পূর্বতন অজ্ঞ শাসকদের ভুলের ফলে ঘটেছে পূর্বান্তর। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব চেপেছে মহাজোট সরকারের কাঁধে। কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই। কারণ মানুষ এমনটাই চেয়েছিলেন। পরিবর্তনের হাওয়া দিন বদলের পালা। সুতরাং এখন কর্মই ধর্ম হোক। অক্ষমতা স্বাভাবিক, তাকে দূর করে স্ব-নির্ভর হতে হবে। নিছক আবেগের বশে একটি অনৈতিহাসিক ঘটনাকে ঐতিহাসিক বলে চালানো নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের পরিবর্তন বিরাট কিছু নয়। বরং খুবই মামুলি ব্যাপার। এমনকী ওই পরিবর্তনের পিছনে যন্ত্রণার বিস্তৃত বিবরণ থাকলেও নয়। অতীতে এ দেশেও তো এমন ঘটনা কম ঘটেনি! অথচ দুর্ঘটনা, লোভ বা অজ্ঞাত এমন একটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে হইহই করাটা বিরোধী রাজনীতিকদের নেহাত বাড়াবাড়ি। সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের অতিশয়োক্তির প্রতি অতিবিশ্বাসও শাসকদলের বা বিরোধীদলের পক্ষে বাস্তবানুগ হচ্ছে না। যতটা বিবৃত হল ততটা রূপায়িত হল না। এ সুযোগ চতুরেরা ছাড়ে না। কোমরে গামছা বেঁধে তারাও এখন আসছে। বিতর্ক-বিবাদে ক্রমশ অশান্ত হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গন। মন্ত্রিসভা, কিংবা সরকারি বা বিরোধীদলের কাজের পক্ষে এমন পরিবেশ মোটেই শুভ নয়! দুষ্টজনের মুখেও মিষ্ট কথা আরম্ভ হয়েছে। শাসক-নেতৃত্বকেই এটা প্রাধান্য দিয়ে ভাবতে হবে।

কেবল বৈষয়িক উন্নতিই নয়, উন্মুক্ত হোক মুক্তির আদিগন্ত আকাশ। শহরে-গ্রামে-গঞ্জে, গণমানুষ গণতন্ত্র ফিরে পাক। পথঘাট-কলকারখানা-চাষবাস-বিদ্যালয়-শুশ্রুষাকেন্দ্র; এ-সব তো থাকছেই, তবে তার চেয়েও যা জরুরি তা হল অধিকার-যা কিনা ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল চারদলীয় জোটের হাতে। তাই শান্তি-শৃঙ্খলা-সন্তোষ-স্নিগ্ধতা-সন্তানের জীবন; এগুলোই চায় মানুষ। এ চাওয়ার বোধ তার কাছে সবচেয়ে বড় চাহিদা। অথচ এ চাওয়া, এ প্রাপ্তি এখনও অধরা। যত ছোটই হোক, অশান্তির চরিত্র যে অশনির দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে তা সরকারকে স্মরণ রাখতে হবে।

বাংলাদেশে শোষণ এবং জীবন সমার্থক। কাজেই এ দেশের গড়পড়তা মানুষের কাছে উন্নয়ন মানে দু’বেলার দু’মুঠো ভাত। আর এরই সঙ্গে অন্যসব প্রয়োজনের কিছুটাও মেটে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। উন্নয়নের বান ডাকালেই যে সার্থকনামা, এ সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। যেটুকু যা, তার সবটুকুই তো বড়লোকের ভাগে। গরিবের ভরসা কী?

গোলমালটা মূলেই রয়েছে। একদিকে বিশ্বায়ন এবং আর্থিক সংস্কারের জেরে সাধারণ মানুষ জেরবার। অন্যদিকে ধনবৈষম্যের বাড়বাড়ন্তে ঈর্ষার বৃদ্ধি। সমাজে আর্থিকভাবে ভারাক্রান্ত শ্রীহীন অংশটি ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, সংখ্যাগুরু মানুষের মরিয়াভাব বাড়ছে। ফলে সামাজিক ভারসাম্যের স্তরচ্যুতি, মূল্যবোধের ক্রম-অবলুপ্তি, শৃঙ্খল ভাঙার আওয়াজ তুলে শৃঙ্খলাতেই আঘাত। সমাজের প্রায় সব ঘটনাতেই এই প্রবণতার প্রাদুর্ভাব। আপাতদৃষ্টে একেই এখন আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বলা হচ্ছে। কিন্তু তা নয়। আসলে এটি সর্বনাশা ঝোঁক, ক্রোধের অনর্থ, ভাঙনের ভীষণ্মতা। এ প্রবণতার প্রাবল্য গোটা দেশ জুড়ে। বিশ্বায়নের হাত ধরে পুঁজিবাদী উন্নয়নই আর্থিক অগ্রগতির একমাত্র পথ, এতেই অশান্তির অবসান, সব সমস্যার সমাধান; এই বিশ্বাসই অনর্থের জন্য দায়ী। সবই অনৈতিক রাজনীতির কুফল। প্রশাসনিকভাবে কোনও সরকারের পক্ষেই এ অঘটনের স্থায়ী নিরসন করা অসম্ভব। এমনকী আয়ত্তে রাখাও আয়াসসাধ্য ব্যাপার। আবার প্রথাগত পুঁজিবাদী উন্নয়নও এর সমাধান নয়। 

বৈষম্যের সঙ্গে বিরতিহীন বিরোধ এবং দুই সমাজের শিক্ষাগত সংস্কার-ভাবনায়-ভাষণে-লেখনীতে-শিল্পে-সাহিত্যে সর্বত্র, অশান্তির মূল কারণ অনুসন্ধানের বিশ্লেষণে। উনবিংশের উদাহরণে একবিংশর পুনর্জাগরণ। জীবনেই যখন পচন তখন সংস্কারের প্রয়োজন। দেশবাসীর জীবনাভিমুখ এখন সেদিকেই তাকিয়ে। উনবিংশে সমাজের সংস্কার, আর একবিংশে মনুষ্যবিমুখ পচাগলা রাজনীতির ঢালাও সংস্কার। আদর্শহীন রাজনীতিকদের বহিষ্কার। ঢেলে সাজানোর চেষ্টা। পারবেন কি আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ পথে হাঁটতে? মানুষকে হাঁটাতে? পারলে ইতিহাসও তাঁর পায়ে-পায়ে হাঁটবে এবং একইসঙ্গে মানুষও।

সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী! মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করেছে। এখনও সে বিশ্বাস অটুট। তাই ডাক দিন। ঘরে ঘরে ডাক পাঠান। দলতন্ত্র নিকেশ হোক, দলবাজি নিপাত যাক, ধর্মের নামে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি দূর হোক, ধর্মান্ধতা দূর হোক প্রশাসন নিরপেক্ষ হোক-কঠোরতম নিরপেক্ষতা শাসনের ধর্ম হোক, স্বচ্ছতা সর্বাঙ্গের ভূষণ হোক। প্রমাণ করুণ কেবল একটি দেশের-একটি দলের মামুলি প্রধানমন্ত্রীই নন, আপনি তার চেয়ে অনেক বড়; মহৎ কোনও উদ্দেশ্যের অভিযাত্রী! দল আছে, থাকবেও; কিন্তু প্রমাণ করুন দলের চেয়ে দেশ বড়, মা হিসাবে মানুষের প্রতি দায় আরও বড়। সময়ও লাগবে অনেক। তা লাগে তো লাগুক। কত সময়ই তো নষ্ট করেছি আমরা। আমাদের মতো সাধারণ যারা তারা তো অপেক্ষাতেই আছে। সেই কতকাল, কতযুগ ধরে।

সময়ের সাফ কথা…. জাতি রাজনীতিক চায় না রাজনীতিবিদ চায়


সংলাপ ॥ বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করেন তাদেরই আমরা রাজনীতিক বলি। তাদের মধ্যে অন্য পেশায় সাফল্য লাভে অক্ষমতার কারণে রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নেন তাদের সংখ্যা বর্তমানে অনেক বেশী। এটা একাধারে যেমন পেশা তেমনি তাদের কাছে ব্যবসাও বটে। এ পেশা বা ব্যবসায় যেমন নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতার দরকার হয় না তেমনি দরকার হয় না পুঁজি বা মূলধনের। অবশ্য কিছু শিক্ষিত সচ্ছল এবং পেশাজীবী মানুষও এতে শামিল হয় বিভিন্ন পরিবেশ বুঝে। তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে রাষ্ট্রের শীর্ষ ক্ষমতায় আসীন হয়ে ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার ব্যবহার এবং সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা। দেশের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের মঙ্গল ও মুক্তি সাধন তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে না। যদিও তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে এসব ব্যাপারে তারা থাকে মিথ্যাচারে উচ্চকণ্ঠ। গরিব দেশের গরিব মানুষের মঙ্গল ও মুক্তি বলতে বোঝায় দারিদ্র্য বিমোচন তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সংস্থান। রাষ্ট্রীয় শক্তিকে যথার্থভাবে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হলো বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনীতি। এই গণমুখী রাজনীতির অভাবের কারণে রাষ্ট্র জনগণের বন্ধু না হয়ে কালে কালে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এ কাজটি করার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে সবসময় সরকারি দলে আগত বহিরাগত রাজনীতিক এবং ক্ষমতালোভী শীর্ষ নেতারা। তারা রাষ্ট্রক্ষমতার মাধ্যমে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেরা সম্পদশালী হয়। কিন্তু সে সম্পদের করটুকু পর্যন্ত তারা প্রদানে তাদের থাকে প্রচ- অনীহা। ওই সময় তারা একবারও উপলব্ধি করেন না যে তারা মুসলমান। তাদেরও মরতে হবে। ধর্মে মিথ্যাচার আর মুনাফেকীর শাস্তি আছে। দুঃখের বিষয় তারা তখন না থাকেন বাঙালি, না মুসলিম, না দলের আদর্শিক ধারক হয়ে। বেকার এবং দারিদ্র্র্য মানুষের বিশাল জনসমুদ্রে স্বল্পসংখ্যক রাজনীতি ব্যবসায়ীদের ধন-সম্পদ এবং প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জনের মাধ্যমে নামি-দামি হওয়ার প্রবণতা স্বাধীনতার পর হতে লক্ষ্য করার মতো। সমাজ সেটিকে মেনে না নিলেও সুযোগের অপেক্ষায় আছে। অন্যদিকে নীতি-নৈতিকতা, সত্য ও জ্ঞান দেশ ও সমাজে তেমন একটা প্রশংসিত হচ্ছে না রাজনৈতিক দলগুলোর মিথ্যাচারের ফলে।

তাই দেশে এক শ্রেণীর লম্পট এবং লুটেরা শাসকশ্রেণী গড়ে উঠেছে। তারা উৎপাদন করে না, বরং উৎপাদনকারী কৃষক, শ্রমিক এমনকি উদ্যোক্তাদের উৎপাদনে তারা ভাগ বসায় এবং ভোগবিলাসের জীবনযাপন করে। তাদের ক্ষমতার উৎস গণমানুষের ইচ্ছা বা আকাক্সক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়। শীর্ষ নেতানেত্রীর সেবা এবং তোষামোদ তাদের কাজ। বিনিময়ে পায় বিত্তবান ও ক্ষমতাবান হওয়ার সুযোগ। নূন্যতম নীতি-আদর্শ, ত্যাগ-তিতিক্ষা কিংবা দেশ ও গণমানুষের প্রতি ভালবাসার স্থান তাদের জীবনে থাকে না। রাষ্ট্রনায়ক তারাই যারা রাজনীতিকে গণমানুষের প্রতি একটি পবিত্র দায়িত্ব বলে চিন্তা করেন। তারা ধারণ ও লালন করেন আদর্শ। দেশ ও জাতির ভাগ্য এবং ভবিষ্যৎ তাদের অর্থাৎ ক্ষমতাসীন নিস্বার্থ সরকারের নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং দূরদর্শিতার উপর নির্ভরশীল। রাজনীতি সেরা নীতি। এর ব্যত্যয় ঘটলে দল বা দলীয় নেতারা দেশব্যাপী শুধু ধিকৃত হন না, তাদের রাজনীতির অপমৃত্যু ঘটে এবং ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হয়, এটা বাংলার গণমানুষ বার বার প্রমাণ করেছে কিন্তু রাজনীতিকদের অভ্যাস পাল্টায়নি।

গণতন্ত্রে রাজনীতিকদের কিংবা রাজনৈতিক দলের চাওয়া নয়, গণমানুষের চাওয়াই সব। গণমানুষ চাইলে দেশ শাসনের ভার নেয়া যেতে পারে। প্রত্যাখ্যান করলে অবশ্যই সরে যেতে হবে। যে কোন মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসিকতা বা ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে গণতন্ত্র, দেশ কিংবা জাতি কোনটির জন্য শুভ নয়। তাই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের সরকার গঠনের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ ও সরকার পরিচালনায় সহায়তা দেয়া গণপ্রতিনিধিদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। বর্তমানে দেশে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের নেতানেত্রীদের যেকোন উপায়ে ক্ষমতা দখলের যে বেপোরোয়া মনোভাব এবং প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে তাতে তাদের গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার নগ্ন লোভ ও উগ্র স্বৈরাচারী মন-মানসিকতার পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবসার মূলে যেহেতু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসিন হতে হয় তাই সে নির্বাচনে সর্বপ্রকার ছলচাতুরি, কারচুপি, সন্ত্রাসী কর্মকা- এবং ক্ষমতা অপব্যবহারে আমাদের দেশের বড়ো রাজনৈতিক দলগুলো এবং নেতাদের সবসময় বেপরোয়া হয়ে উঠতে দেখা যায়।

গণমানুষ জানেন আন্দোলন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার ধারাবাহিকতায় দেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও তাদের শাসন এত দীর্ঘায়িত  হোক তা কেউ চায়নি। গণমানুষ স্বীকার করেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তত্ত্বাবধানে জাতি একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ নির্বাচন পেয়েছে। আজকে বিএনপি ও তাদের নেত্রী বেগম জিয়াকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, বর্তমান  আওয়ামী লীগের মহাজোট সরকার আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ষড়যন্ত্রের ফসল, তখন রাজনীতিক ও বাংলাদেশের তথাকথিত গণতান্ত্রিক চেহারাটা ফুটে ওঠে। রাজনীতিকদের গণতন্ত্রের পোষাকটা খসে পড়ে যায়।

বিরোধীদলগুলো অনবরত বিগত নির্বাচনকে ভুয়া এবং ষড়যন্ত্রমূলক বলে আখ্যায়িত করে যাচ্ছেন। গণতন্ত্র চর্চার নামে ক্ষমতা লোভে নির্বাচনী খেলায় তারা মেতে ওঠেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সত্যিকার সম্মতি নিয়ে দেশ শাসনে তারা ক্ষমতায় আসতে না পারলে ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার উল্লাসে একটি সত্যিকার নির্বাচনকে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করতে একটুও বিবেকে বাধে না। বিগত নির্বাচন শুধু দেশের গণমানুষের কাছে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও নন্দিত হয়েছে। কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের কাছে হয়নি।

বিশ্বে গণতান্ত্রিক নেতাদের জীবনাচারে গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। গণতন্ত্রে বিলাস বাহুল্য নেই, রাজকীয় চালচলন নেই, অসংখ্য তোষামোদকারী পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা নেই। নেই চিত্র তারকার মতো উজ্জল ফিনফিনে সাজে সজ্জিত হওয়া। সুদূর ব্রিটেনে বা আমাদের প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকালেই গণতান্ত্রিক মানসিকতার বেশ কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জীবনাচার অতিশয় সাদাসিদে। জীবনযাপন একজন শিক্ষিত সাধারণ ভারতীয় নাগরিকেরই মতো। সততা, দক্ষতা, জনসেবা এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতা ও মূল্যবোধের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের সেরা আস্থাভাজন রাজনীতিবিদের স্বীকৃতি পেয়েছেন। বর্তমানে ভারতে রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেশের জনগণ তাকেই সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন, নির্লোভ এবং জনহিতৈষী বলে মনে করছেন।

গণতন্ত্র উন্নয়নের মানদন্ডে ভারত অতুলনীয় নয়, তবে আমাদের দেশের জন্য অনুকরণযোগ্য। গণতন্ত্র চর্চায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারত আজ সারাবিশ্বে সম্মানজনক আসন লাভ করেছে। পৃথিবীর ৪টি এবং এশিয়ার ২টি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে ভারত এখন একটি। একই সঙ্গে স্বাধীনতা লাভকারী পাকিস্তান গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মাপকাঠিতে এখন কোন অবস্থানে আছে তা বিশ্ববাসীর অজানা নয়। সামরিক শাসকদের বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে পাকিস্তান তার স্বাধীনতার অর্ধেক জীবন কাটিয়েছে। কিছু দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধান শত্রু ভারত নয়, সন্ত্রাস।

ধর্মকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটির মূলেই নিহিত গণতন্ত্রহীনতা এবং সামরিক স্বৈরাচারের বীজ। রাজনীতিতে ধর্মের প্রাধান্যই পাকিস্তানে ধর্মীয় জঙ্গিদের জন্ম দিচ্ছে। পাকিস্তানের ১১ হাজার মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর ৪-৫ লাখ ছাত্র বের হয়। তাদের বিরাট সংখ্যক জঙ্গিতে পরিণত হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রতাকে হাতিয়ার করে। পাকিস্তান জেহাদি সংস্কৃতির জনক এবং নায়ক। ধর্মান্ধ এবং জঙ্গিবাদিদের দমনে ইদানিং পাকিস্তান এত ব্যস্ত যে, তার সম্পদ এবং শক্তি এখন ঘরশত্রু ঠেকাতেই নিঃশেষিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও কিছু রাজনীতিক আছেন যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানি আদলে পরিচালিত করতে চান এবং কথায় কথায় বিদেশী প্রভুর তাঁবেদারির সরকার, আধিপত্যবাদী শক্তি, জাতীয় শব্দ মিথ্যাচারের ভাষণে ব্যবহার করেন। ভারত-বিরোধিতার সস্তা রাজনীতি বর্তমানে দেশের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনছে না এবং গণমানুষ ওই টোপ আর গিলছে না। জাতির কাছে স্পষ্ট হয়ে  উঠেছে সুবৃহৎ গণতান্ত্রিক প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরিতার সৃষ্টি উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে আর কিছু করতে পারে না।

দেখে শেখার আগ্রহ আমাদের রাজনীতি ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের নেই। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেমন দুর্বল তেমনি অভিজ্ঞতার শিক্ষাও নেই বললেই চলে। তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে মিথ্যাচার, দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস। ব্যতিক্রমীরা সংখ্যায় খুবই স্বল্প। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য তাই দরকার রাজনীতিক থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোতে তদবিরবাজ, তোষামোদকারী, সন্ত্রাসী এবং দুর্নীতিবাজদের স্থান আছে কিন্তু জ্ঞানী ও গুণীকে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। তাই সৎ এবং দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ গড়ে উঠছে না। বিশেষ করে শীর্ষ নেতৃত্বে ও সরকার গঠনে রাজনীতিবিদ ব্যক্তিত্বের দরকার খুব বেশি। যাতে তারা রাষ্ট্রনায়কের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হন। দেশ রাজনীতিক চায় না- চায় রাজনীতিবিদ, এটাই সময়ের  দাবী।

রাজনৈতিক অঙ্গনে মেধার ঘাটতি!

সংলাপ ॥ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, গত কয়েক দশক ধরে, ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোয় যারাই রাজনৈতিক অঙ্গনে শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছেন, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তারা প্রায় সবাই মেধাবী। মেধাই তাদের শীর্ষে ওঠার প্রধান মাধ্যম এবং বেশিরভাগ নেতাই ওইসব দেশের একেবারে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। জনগণ তাদের যোগ্যতাই বিচার করে, সামাজিক বা পারিবারিক অবস্থান বিচার করেনি। ওইসব দেশের তুলনায় আমরা এতটাই পশ্চাৎপদ যে, কোনোভাবেই কোন বিষয়ে তুলনা করা যায় না। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির চাবিকাঠি চলে যাচ্ছে সম্পদশালীদের হাতে। তারাই হয়ে উঠছে জনগণের ভাগ্য বিধাতা। গাড়ি-বাড়ি-অর্থ না থাকলে রাজনৈতিক নেতা হওয়া যায় না বর্তমানে। ‘ত্যাগের’ বিষয়টা এখন দৃশ্যের অন্তরালে। স্বাভাবিক কারণেই উঠে গেছে মেধার চর্চা। সাংগঠনিক শক্তি, মেধার শক্তি, ভালো বক্তৃতার যোগ্যতার বদলে স্থান করে নিয়েছে আজ অর্থশক্তি, পেশিশক্তি এমনকি অস্ত্রশক্তিও। বর্তমান রাজনীতির এই বাস্তবতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে রাজনীতিক ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের এক বিরাট সংখ্যক নেতা-কর্মী। তারা ধরেই নিয়েছে বিপুল অর্থের মালিক হলে রাজনীতির পেছনে তাকে ঘুরতে হবে না। রাজনীতির ক্ষমতা-নেতৃত্ব একদিন তার পেছনেই ঘুরবে। তাই দলগুলোর ত্যাগী-পুরানো নেতা-কর্মীরা দারুণভাবে উপেক্ষিত। তাদের খবর তো কেউ রাখেই না, নতুন নতুন বসন্তের কোকিলের দ্বারা তারা পদে পদে অপমানিতও হচ্ছেন। বর্তমান রাজনীতিতে এটাই চলছে। এ অবস্থায় ভিন্ন কোনো কথা বলা বা ভিন্ন কোনো চেষ্টা নেয়ার অর্থই হবে অপমানজনক উপেক্ষা।

পাকিস্তান আমলে সারাদেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনে মেধাবী প্রার্থীদের বিজয়ের হার ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। সেদিন ছাত্রজীবনে ছাত্ররা কল্পনাও করেনি, টেন্ডার, কমিশন, এজেন্সি, ঠিকাদারি ব্যবসার কথা। আর আজ?

তখন তো অভিভাবকদের পাঠানো বেতন, হোস্টেল চার্জের টাকা বাঁচিয়ে সংগঠনের জন্য ব্যয় করতে হতো। যা আজকের ছাত্র-রাজনীতির কর্মীর কাছে দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হবে।

রাজনীতি থেকে নীতি-আদর্শ-ত্যাগ-সততা একেবারে বিসর্জিত হয়ে যাক, তা কারোরই কাম্য নয়। সমাজের এক বিরাট সংখ্যক মানুষও চায় নেতারা তাদের সামনে সততার উদাহরণ সৃষ্টি করুক। তাদের সন্তানরা যাতে নেতাদের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের সে আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে। এখন তারাও ধরে নিয়েছে, নেতার যদি গাড়ি-বাড়ি অঢেল সম্পদ না থাকে তাহলে তিনি কেমন নেতা?

জাতীয় রাজনীতিকে কলুষিত করে গেছেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনিই সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’। তার আমলে ‘মানির’ সেই নোংরা খেলা বাঙালি লক্ষ্য করেছে। সেই থেকে রাজনীতিতে টাকার নগ্ন খেলা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, রাজনীতির নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকা। মিথ্যাচারের মাধ্যমে টাকা উপার্জনের থাবা যে কতদূর পৌঁছেছিল তার কিছু নমুনা বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জাতি লক্ষ্য করেছে।

এই বিপুল টাকার খেলার মাঝে দাঁড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষ এবং দলীয় আদর্শিক কর্মীরা আজ বড়ই অসহায়। জামাতে ইসলাম – যারা ধর্মের কথা বলে ফায়দা লোটায় মহাপারঙ্গম, তারাও নীতি-আদর্শের চেয়ে বড় অস্ত্র ধরে নিয়েছে টাকাকে। এখন সেই বিপুল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য টাকা তারা ব্যবহার করছে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। নীতি-আদর্শের প্রশ্নে যেসব বাম-ছোট দলগুলো বরাবর সোচ্চার ছিল তারাও অন্যান্য দলের টাকার খেলার মাঝে পড়ে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য নীতির বিষয়গুলো পাশে ঠেলে রেখে টাকা কামানোর চেষ্টায় তৎপর রয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করছে বিশ্লেষকরা।

জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের সব ক্ষেত্র থেকে নীতি-আদর্শ-সততা-ত্যাগ বস্তাপচা-বাসি জিনিসের মতো পরিত্যক্ত হতে চলেছে। আর তাতেই গড্ডালিকা প্রবাহে রাজনীতিকরা গা ভাসিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক শক্তির দৃঢ় মনোবল ও লক্ষ্যাভিসারী অভিযাত্রা। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলকেই গড়ে তুলতে হবে তেমন লক্ষ্যে। আদর্শ জাতি গঠনে সততা ও নিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। বিশাল কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে আদর্শ-নীতি-সততার মানদন্ডে। তেমন কর্মী বাহিনীই পারে আদর্শ জাতি গঠনে নেতৃত্ব দিতে। বর্তমানে সরকার  দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ হাতে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ভবিষ্যতের আশাপ্রদ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ভিশন-২১ কে সামনে নিয়ে দেশবাসীকে নতুন স্বপ্ন দেখাতেও সক্ষম হয়েছে। এ কর্মকা- বা উদ্যোগ দেখে চিন্তাবিদদের ধারণা হয়তো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আগামীতে আর দল বা সরকারের দায়িত্ব কাঁধে নেবেন না, হয়তো দেশের জন্য, দেশের আপামর মানুষের জন্য সোনালি পথের দিশা দিয়ে যেতে চান। একজন জাতীয় নেতা হিসাবে এই কর্তব্য পালনের পতাকা  বহন করে নেয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন দল ও নেতৃত্বের অভাব পূরণ করতে না পারলে সব কিছুই একদিন মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশংকা রয়েছে। স্বপ্ন পূরণের একমাত্র উপায় একটা নীতি-নিষ্ঠ রাজনৈতিক দল ও তার নেতৃত্ব। যার অভাব প্রকটভাবেই দেশে রয়ে গেছে।

ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়ী হতে হলে আরো বহুকাল ধরে বহু পথ হেঁটে যেতে হবে জাতিকে এক আদর্শিক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে।

অনেক পথ যেতে হবে, অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। সততা, ন্যায়-নীতি-আদর্শ-ত্যাগের রাজনীতি ও সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। এখনো ন্যায়নিষ্ঠ রাজনীতি ও রাজনীতিকের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়নি। ভিশন-২১ এ সফলভাবে পৌঁছাতে চাইলে জাতীয় জীবনে নিশ্চিতভাবেই দরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নীতি-আদর্শ-সততা ও ত্যাগী রাজনীতিকদের আপোসহীন সংগ্রাম।

ঘুণে ধরা রাজনৈতিক অঙ্গন!

সংলাপ ॥ কাঁচা বাঁশে ঘুণ ধরে না। এটাই প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম। কাঁচা বাঁশের শুকনা ছালের নিচে যে রস থাকে, তাতে ঘুণপোকাদের বাঁশ খেতে অসুবিধা হয়। খটখটে না হলে তারা খেতে পারে না। তবে প্রকৃতিতে অঘটনও ঘটে। কাঁচা বাঁশেও ঘুণে ধরে। সে বড় অলক্ষুণে। ঘুণে ধরা বাঁশ দাঁড়িয়ে থেকে বাঁশঝাড় শেষ করে দেয়।

প্রকৃতির সেই অলক্ষুণে অঘটনটা রাজনীতিতে একটা সরকারের ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। কাঁচা বয়সের সরকারে ও বিরোধী দলে ঘুণে ধরছে ভুলের জন্য। কুর কুর শব্দ করে খাচ্ছে। যারা সে শব্দ শুনছে আর মানুষকে শোনাচ্ছে, তাদের  ভয়ভাবনা হচ্ছে।  যারা ঘুণের শব্দ শুনেও শুনতে চায় না, তারা বাঁশটার দিকে তাকিয়ে আছে।

ঘুণ কথাটার তিনটা অর্থ। একটি হলো ওই ঘুণপোকা। এরা রসহীন শুকনো খটখটে বাঁশে ধরে, কাঠে ধরে, মরাগাছের গিটে ধরে, গুঁড়িতে ধরে। খেয়ে খেয়ে অক্ষরের মত ক্ষত তৈরি করে। তাকেই বলে ঘুণাক্ষর। ঘুণ কথাটার আরেক অর্থ ছলাকলায়, গোঁজামিলে, নিপুণ, ওস্তাদ। তৃতীয় অর্থটি – ঈপ্সিত, আভাস। ঘুণের এই তিন অর্থই দেশের কাঁচা বাঁশ সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ফুটে উঠেছে।

ঘুণে ধরার প্রথম অর্থ ফুটেছে : বাঁশে যেটা রসের জোর, সরকারের ক্ষেত্রে সেটা হলো সাধারণ মানুষ দরদী -নীতির জোর। কাঁচা বাঁশ যখন মাটি থেকে রস নেবার শক্তি হারায়, ভেতরে দুর্বল হয়ে, খটখটে হয়ে পড়ে, তাকে ঘুণে ধরে। কাঁচা বাঁশের শুকনো হবার লক্ষণ ফুটে ওঠে।

ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বাঁশের মতো সরকারও যখন সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্যাণকর নীতি ও তার রূপায়নের শক্তির জোর হারাতে থাকে বিরোধীদলীয় ষড়যন্ত্রের জন্য তখন ভেতরে সঙ্কট তৈরি হয়। সরকার খটখটে হয়ে পড়ে। তাকে ঘুণে ধরে। তাদের কাজে-কথায় ফুটে ওঠে ব্যর্থতা, অনিয়ম, বেনিয়ম, মুখে বড়াই। হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি হয়। অপরদিকে বিরোধী রাজনীতিকরা ঢিলেঢালা, অগ্রাধিকার, জ্ঞানহীন, অস্থির, দিশাহারা হয়ে পড়ে। হলো না, মুখে আস্ফালন, মিথ্যা আশ্বাস, ধর্ম গেল দেশ গেল বলে মিথ্যাচার করে। কাজে ও কথায় ফারাক দেখা দেয়। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সঙ্কট সমাধানে তারা পথ খোঁজে না।

ছড়ায় আছে – পানের ভিতর ফোপরা। কাঁচা বাঁশ সরকারের ভিতর ফোপরা। স্বাস্থ্যক্ষেত্র, শিক্ষাক্ষেত্র, কৃষিক্ষেত্র, আইনশৃঙ্খলাক্ষেত্র, বিদ্যুৎক্ষেত্র, অর্থক্ষেত্র – এমন একটি ক্ষেত্র নেই যেখানে সঠিক ব্যবস্থাপনার নীতি গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য ঘুণে ধরেনি এবং তা হতে উত্তরণের জন্য নানা যুক্তি, দাবি, তর্ক তুলছে সরকার।

অপরদিকে বিরোধী শক্তির মিথ্যাচারে জেলায় জেলায় সাধারণ মানুষ রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। ক্ষেতমজুরের মজুরি কমছে। বন্টনবিলি ঠিক চলছে না। লুটতরাজের সন্ত্রাস সৃষ্টিতে দুর্বৃত্তরা প্রশ্রয় পাচ্ছে। প্রভাব খাটিয়ে  বিরোধী শক্তি অভিযুক্তকে আড়াল করছে, থানা থেকে ছাড়িয়ে – ছিনিয়ে নিচ্ছে। গণতন্ত্রের মাথায় কদর্য পা রেখে শিক্ষাঙ্গনে দলতন্ত্র বাড়াচ্ছে। জোট ও গোষ্ঠীর সংঘর্ষে এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীকে মারছে। শরিক দলের নেতাকর্মী আক্রান্ত হচ্ছে। এলাকায় মানুষ ভয়ে, অশান্তিতে সন্ত্রস্ত হয়ে  থাকছে। প্রতিহিংসা, আক্রমণ চলছে। খুন করা হচ্ছে। স্কুল -কলেজে ছাত্র পেটাচ্ছে। প্রতিবাদের মিটিং মিছিলে সন্ত্রাস করছে। মুখে গণতন্ত্রের কাঠামো রক্ষার কথা, গণতন্ত্রপ্রিয়তার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু কাজে বিপরীতটা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে আমলাতন্ত্রকে কাছে টানার পথ করছে। বিজ্ঞপ্তি দিয়ে,বিজ্ঞপ্তি বদল করে বিভ্রান্তি, ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়াচ্ছে বিরোধী শক্তি, অধিকারের মাত্রাবোধ হারাচ্ছে। জনগণতন্ত্রের নীতিরীতি অনুসরণ না করে জনগণের কাছে নিজেদেরকে হাস্যস্পদ করে তুলছেন। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা অগ্রাহ্য হচ্ছে। প্রতিশ্রুতির যত ফানুস একে একে ফাটছে।

প্রবাদ আছে, সকাল দেখে দিন কেমন যাবে বোঝা যায়। সরকারের ঢিলেঢালা নীতি তাকে ঘুণে ধরিয়েছে। ঘুণে ধরা কাঁচাবাঁশ সরকারটা সময়ের তালে তালে কঠোর ব্যবস্থা প্রতি অঙ্গনে না নিলে কখন দেশবাসীর মাথায় ভেঙে পড়ে এই আশঙ্কায় জাতি দোদুল্যমান!

ঘুণে ধরার দ্বিতীয় অর্থ ফুটেছে : ঘুণ ধরার কথা আড়াল করতে, দেশবাসীর সব মৌলিক ও জরুরি জীবন-যন্ত্রণার সমস্যা সমাধানে সরকারের উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নতুন সরকার গড়তে যে জনমর্থন ছিল তা ধরে রাখতে সরকার নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছে। ইতোমধ্যে আমলাদের দপ্তর বার বার বদলি করা হয়েছে। অপেক্ষায় আছেন অনেক মন্ত্রী। সরকারের নীতি জনস্বার্থমুখী হলেও ঘুণে ধরায় দোষ অপদার্থ কিছু মন্ত্রীর।

বিরোধী রাজনীতিকদের আরেক দক্ষ কৌশল হলো – বাঙালির অন্তরে যে দিকে টান বেশি, ভাবাবেগ বেশি, যে আবেগ যে বিষয়ে তাদের মধ্যে খেলে বেশি, সে সব ভাঙিয়ে খাও। সে সব নিয়ে নতুন নতুন ঘোষণা, হইচই, কাজের জিগির ও কর্মব্যবস্ততা তোলায় সুযোগ খুঁজতে থাকো। বরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্বকে, বিদ্রোহী  কর্মাত্মাকে, বিপ্লবী ঐতিহ্যকে ভাঙিয়ে খাও। ঘুণে খাওয়ার কুর কুর শব্দ চাপা দিয়ে বিরোধীদল যে সবুজ  আছে, তার প্রমাণ করো। পাশাপাশি কৌশল নিয়েছে সরকারের ব্যর্থতা, বিরোধিতা ও বিদ্বেষ বাড়ানোর।  উদ্দেশ্য একটাই, পিছিয়ে থাকা মানুষদের মনকে সরকার সম্পর্কে বিষাক্ত করা। এরপর হয়তো বলা হবে সরকার চক্রান্ত করেছে। ছলাকলা চমক ভঙ্গি। ঘুণধরা থেকে মানুষের চোখ সরাতে যতই বাঁশের গিটে গিটে চমক ও প্রতিশ্রুতির নতুন পাতা ও কঞ্চি পোঁতা হোক আর তাকে সজিব প্রমাণের চেষ্টা করা হোক, ঘুণ বিরোধীদের ছাড়ছে না। হ-য-ব-র-ল-ব খট খটে বিরোধীদের বড় সুখ। কুরকুর শব্দে তারা বাঁশ খায়, কাঠ খায়, মরাগাছের গিট খায়, সরকারও খায়। ইতিহাসে শোনা যায়, একদল পন্ডিত মানুষের মাথাতেও ঘুণ ধরে। মস্তিষ্ক কুরে কুরে খায়। সেখানে ঘুণাক্ষর তৈরি করে। তখন প্রভু তাদের যা নির্দেশ দেয়, তারা সে মতো চলে, বলে, কাজ করে সেটাও চলছে বর্তমানে।

ঘুণে ধরার তৃতীয় অর্থ ফুটেছে ঃ ঘুণে খাওয়ার কুরকুর শব্দের মধ্যে, আর ঘুণাক্ষর পড়ে সরকার  আশঙ্কার ইঙ্গিত, আভাস, আঁচ করছে। সরকারের যত হিতাকাঙ্খীরা যারা কাঁচা বাঁশ – সরকারটিকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এনেছে, তারা কাঁচা বাঁশে এখন ঘুণের কথা দেখিয়ে সরকারকে সতর্ক করছে। পরামর্শ দিচ্ছে, সরকার কাঁচা নবীন সবুজ থাকে যদি তার শেকড়ে শেকড়ে, প্রশাসনিক দক্ষতা, সমন্বয় ও সফলতায় রসের যোগান যাতে থাকে। তা না হলে মেঠো বক্তৃতা আর মনোরঞ্জনী প্রচারে চিঁড়ে ভেজে না। বিরোধী অবস্থানে যা চলে, সরকারের অবস্থান থেকে তা চলে না। গোঁজামিলে প্রশাসন দুর্বল হয়। মরা বাঁশে চমক ও প্রতিশ্রুতির ডালপালা সাজিয়ে মরাকে জীবিত বলে ভ্রম সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু ঘুণপোকাকে ফাঁকি দেয়া যায় না।

জোট-শরিক সম্পর্ক তাদের অসন্তোষের বিষয়ে সজাগ করছে। প্রতিরোধের চেহারা, জনমত সৃষ্টির সাফল্য, শুনিয়ে সতর্ক করছে। ঘুণপোকা মারার কৃৎকৌশল সম্পর্কে ইঙ্গিত, আভাসও দিচ্ছে। সরকারের কাছে তাদের বিপুল প্রত্যাশায়,প্রতিশ্রুতি পূরণের কার্যকর ভবিষ্যৎ দিশা পাচ্ছে না – এসব কথা সরকার হিতাকাঙ্খীরা নানাভাবে শোনাচ্ছে। সরকার ঠিক ঠিক নজর দিচ্ছে না বলে ক্ষোভও প্রকাশ করছে। কমিটি গঠনে আধিক্য, অনিয়ম-বেনিয়ম সম্পর্কে সতর্ক করছে।

অপরদিকে মিথ্যাচার আর ষড়যন্ত্র করে বিরোধীদলীয় শক্তিতে ঘুণ তার সব অর্থেই কাঁচা বাঁশ রাজনীতিতে আগাগোড়ায় ধরেছে। ঘুণাক্ষরে ফুটে উঠছে – বিরোধী শক্তির ভিতর ফোপরা।

ঘুণে ধরা বাঁশের রাজনৈতিক ইতিহাস হলো – ভেতরে ফোপরা নিয়েও সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে অনেকদিন। কিন্তু সময় বুঝে, দেশবাসীর হাত জড়ো করে, সরকারের জোর সাহসী ধাক্কা বিরোধী শক্তির মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে দেয়া হলে, ঘুণে ধরা বাঁশ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে বাধ্য। বিপদ কাটে। সাধারণ মানুষ বাঁচে। স্বস্তি শান্তি ফিরে আসে দেশে।

জাতীয়তা : বাঙালি বনাম বাংলাদেশী

সংলাপ ॥ ১৫ আগষ্ট ’৭৫ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন, তাদের দ্বারা রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চালু এবং ধর্মের রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের দরুণ জনগণের ঐক্যের ভিতটাই আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং বিনষ্ট হয় জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২৩ বছরের পাকি শোষণ বিরোধী আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগ এবং ’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এবং চুর্ণ বিচুর্ণ করতে পেরেছিল যা, পাকি-পাঞ্জাবী হায়নাদের, বিশ্বের সেরা সৈনিক হওয়ার দর্প; অপরদিকে, যাদের ওরা তাচ্ছিল্য করে খেতাব দিয়েছিল, ‘ভেতো বাঙালি’ তাঁরা ভূষিত হলেন বিশ্বে, বীর বাঙালি অভিধায়।

রাজনৈতিকভাবে দেশের জনগণের মধ্যে আজও জাতীয়তার প্রশ্নে সন্দেহ দেখা যায়। বাংলাদেশী নামের একটি ক্ষীণ ধারা যার স্রষ্টা, ধারক এবং বাহক নির্মম পরিণতির শিকার জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা। অথচ আমরা বাঙালি। বাঙালি ও বাংলাদেশী – এ দু’য়ের মধ্যে মূলতঃ কোন বিরোধ নেই। আমার মাতৃভাষা বাংলা। অতএব জাতিসত্তায় আমি বাঙালি। যেমন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর মাতৃভাষা আরাবী হওয়ার কারণে তিনি গর্ববোধ করতেন, ‘আরবী’ বলে। আর যেহেতু আমি বাংলাদেশের নাগরিকও বটে; সেহেতু আমার নাগরিকত্ব বাংলাদেশী। যেমন, মিশরের প্রেসিডেন্ট হুসনী মোবারক জাতিসত্তায় আরবী এবং নাগরিকত্বে মিশরীও বটে। খৃষ্টান মার্গারেট থেচার বৃটিশ নাগরিক হয়েও ইংরেজ হওয়াতে যখন কোন বাধা নেই, মুসলিম প্রেসিডেন্ট হুসনী মোবারকের নাগরিকত্বে মিশরী হয়েও জাতীয়তায় আরব হওয়াতে তার ধর্ম নষ্ট হয় না, তখন মরহুম জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়া সাহেবদের জাতীয়তায় বাঙালি থেকেও বাংলাদেশী নাগরিক হওয়াতে বাধা কোথায়? দেশের নামকরণ তো হয়েছে স্বাধীনতার পর। এর নিকট অতীত নামতো ছিল, পূর্ব পাকিস্থান। সুদূর অতীতে এর ভিন্ন ভিন্ন নাম ছিল। দেশের নাম অনেকবার বদল হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বদল হয়েছে দেশবাসীর নাগরিকত্ব। যথা : বঙ্গবাসী, পাকিস্তানী ইত্যাদি। কিন্তু তাদের জাতীয়তা বদলায়নি। চিরদিনই তারা বাঙালি থেকেছে। বস্তুতঃ জাতীয়তা বদলায় না এবং বদলানো যায় না। তাই তো কবিগুরু বলেন – ‘সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি’। বস্তুত সিরাজি, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মাওলানা ভাসানী প্রমুখ বাঙালির পথিকৃতদের বাঙালির জাতিসত্তাকে সজাগ ও সংগ্রামী করে তোলার যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, তা-ই সফল পরিণতি প্রাপ্ত হয় ১৯৭১ এ, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রাম ও তিতীক্ষার ফলশ্রুতি হিসেবে। তাই তো বাঙালি গর্জে ওঠে একটি শ্লোগানে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো; জয় বাংলা।’ কই সেদিন তো ‘বাংলাদেশী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ বলে কেউ শ্লোগান দেয়নি। এটা কি বলার অপেক্ষা রাখে যে, এটা বাঙালির হাজার হাজার বছরের দমিত জাত্যাভিমান ও জাতীয় চেতনা এবং বাঙালি জাতিসত্তারও অদম্য বহিঃপ্রকাশ। আর এরই অর্জন বাঙালির ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

বলাবাহুল্য যে,এ স্বাধীন বাঙালিরা নিজেদের এ স্বাধীন দেশটির নাম অন্য কিছুও রাখতে পারতো এবং এখনো পারে। বোম্বাই তার রাজ্যের নাম বদল করেছে। বার্মাও নিজের নাম বদল করে মায়ানমার করেছে। দেশের নাম বদলের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট জনগণের নাগরিকত্বও বদল হতো, হয়েছে। কিন্তু তাতে জাতীয়তার কোন পরিবর্তন হয় না। কারণ জাতীয়তা শাশ্বতঃ স্থায়ী, অপরিবর্তনীয়, অবিচ্ছেদ্য এবং মাতৃভাষার সাথে চিরায়তভাবে যুক্ত। আর নাগরিকত্ব অস্থায়ী এবং পরিবর্তনীয়। এমতাবস্থায়, জাতীয়তা ও নাগরিকত্বের এ মৌলিক পার্থক্যটা উপেক্ষা করে অথবা এ পার্থক্যবোধের অভাবে অথবা বাঙালির স্বাধীনতার দেশী-বিদেশী শত্রুদের স্বার্থে নাগরিকত্বকে জাতীয়তার অর্থে ব্যবহার করার আত্মঘাতী ও অপমানজনক অপচেষ্টা আজো চলছে।

জাতীয়তার ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’র স্থলে ‘বাংলাদেশী’ ব্যবহারের প্রচেষ্টাকে আত্মঘাতী বললাম এ জন্য যে, নাগরিকত্ব, যা পরিবর্তনীয় তাকে জাতীয়তা বলে মেনে নিলে সে জাতি শিকড়হীন বৃক্ষে পরিণত হয় এবং জাতির ভিত্টা দুর্বল হয়ে যায়। সে অবস্থায়, যে কেউ যে কোন সময়ে সামান্য প্রচেষ্টাতেই তা উপড়ে ফেলতে পারে। অপরদিকে, জাতীয়তার ভিত্ মজবুত ও স্থায়ী এবং প্রতিষ্ঠিত হলে শ্বাশ্বত স্থায়ী অবিচ্ছেদ্য সত্তার উপর, সে জাতিকে কোন বড় শক্তিও চিরদিন অধীন করে রাখতে পারে না। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ এর প্রমাণ। হাজার হাজার বছর ধরে অনেক রক্ত দিয়ে বাঙালি স্বাধীন হয়েছে – মানুষ হয়েছে।

‘বাঙালি স্বাধীন হয়ে মানুষ হয়েছে’ বললাম এ জন্য যে, ভাষায়-সাহিত্যে, শিল্পে-সংস্কৃতিতে, আহারে-আচরণে, চলনে-বলনে, বেশভুষায়, আচার-অনুষ্ঠানে, ইতিহাস-ঐতিহ্যে, চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণায় এবং মন-মানসিকতা ও আবেগ-অনুভূতিতে আবহমান থেকে বাঙালি একটি স্বতন্ত্র জাতি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকার কারণে বাংলার ধনভান্ডার সবাই লুট করেছে কিন্তু জাতি হিসেবে এর কোন বিশ্ব স্বীকৃতি ছিল না। এজন্য স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত করার জন্য বাঙালি কবি-সাহিত্যিকগণ নানাভাবে জাতিকে কথা ও লেখনির মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক আঘাত করেন দৃঢ় প্রত্যয়ী হওয়ার জন্য। কবি বজলুর রশীদ স্বাধীনতা বিহনে জাতিকে মেষের সাথে তুলনা করেন। মোহাম্মদ আলী নিজের পরাধীন দেশের বদলে স্বাধীন পরদেশে মৃত্যুও শ্রেয় মনে করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তো পরাধীন বাঙালিকে মানুষ বলেই স্বীকার করেন নি। তাই তো বঙ্গবন্ধু পাকি জিন্দানখানা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এসে বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ লক্ষ বাঙালির সমাবেশে কবিকে উদ্দেশ্য করে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন – ‘কবি গুরু! আপনি এসে দেখে যান, এবার বাঙালিরা মানুষ হয়েছে।’ বস্তুতঃই বাঙালিরা মানুষ হয়েছে – স্বীকৃতি পেয়েছে শতাধিক জাতি রাষ্ট্রের।

এমতাবস্থায়, বাঙালির স্থায়ী শ্বাশ্বত জাতিত্বকে অস্থায়ী ও পরিবর্তনীয় নাগরিকত্বের সাথে মিশিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা আত্মঘাতী তো বটেই। বলা বাহুল্য যে, নাগরিকত্বের নামান্তর বা বদল সর্বজন গ্রহণীয় – যেমন বঙ্গবাসী থেকে পাকিস্তানী এবং তা থেকে বাংলাদেশী অথবা পশ্চিমবঙ্গবাসী থেকে ভারতীয়। এমতাবস্থায়, কোন সম্প্রসারণ বা উপনিবেশবাদী শক্তি বাংলাদেশীকে অন্য কোন নাম দেয়ার চেষ্টা করলে জাতীয়তার স্বতন্ত্র মজবুত ভিত্ না থাকলে, তা ঠেকাবেন কি দিয়ে অথবা তা ঠেকাবার প্রয়োজনবোধ বা প্রেরণাটাই আসবে কোত্থেকে?

অপরদিকে, জাতীয়তার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশী’ শব্দের প্রয়োগকে অপমানজনক বলার কারণ এই যে, ‘বাংলাদেশী’ শব্দটি বাংলাদেশের নাগরিকসহ সমস্ত জীব ও পণ্যের দেশীয় পরিচয় বহন করে। ‘বাংলাদেশী’ বললে দেশের জনগণের কেবল জাতীয় পরিচয় তো বহন করেই না; এমনকি এককভাবে নাগরিক পরিচয়ও বহন করে না,যতক্ষণ না ‘বাংলাদেশী’ শব্দের সাথে ‘নাগরিক’ শব্দ যুক্ত হয়। এভাবে,জাতীয়তার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশী’ শব্দের ব্যবহার দেশের জনগণকে অন্যান্য জীব-পণ্যের পর্যায়ে নিয়ে যায়। এটা যেমন আত্মঘাতী, তেমনই অপমানজনকও বটে।

বলা বাহুল্য,বাংলাদেশী প্রত্যেকটি জীব-পণ্যই আমাদের প্রিয় শুধু নয়, আমাদের অহংকার। বাংলাদেশী নাগরিক পরিচয়ে আমরা সর্বাধিক গর্বিত। এ জন্য আমরা আমাদের জতীয়তাকে অন্যান্য জীব পণ্যের দেশীয় পরিচয়ের সাথে মিশিয়ে দিতে রাজি নই। আমাদের জাতীয় পরিচয় অবশ্যই স্বদেশী অন্যান্য জীব-পণ্যের দেশীয় পরিচয়ের থেকে স্বতন্ত্র হতে হবে। আমরা সৃষ্টির সেরা মানুষ। মানব জাতির মধ্যে বর্তমানে প্রায় ছ’ হাজার ভাষাভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মতো আমারাও জাতিসত্তা,আমাদের মাতৃভাষা-বাংলা। সুতরাং মানব জাতির অংশ হিসেবে আমাদের জাতীয় পরিচয়, প্রথমে আমরা বাঙালি, তারপর আমরা বাংলাদেশী নাগরিক।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে সেনা শাসনের প্রবর্তক জেনারেল জিয়া কর্তৃক অগণতান্ত্রিক উপায়ে বেয়নটের জোরে চাপিয়ে দেয়া বাংলাদেশী জাতীয়তা সরকারি দলিলপত্রে আজও বহাল আছে। লজ্জানক হলেও বলতে হয় যে,স্বাধীনতার পক্ষবদল দাবিদারগণ স্বয়ং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে দেশের সরকারি ক্ষমতায় বহাল থাকার পরও এক্ষেত্রে ত্রিশ লক্ষ বাঙালির রক্তে লেখা এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারের স্বীকৃত বাঙালি জাতীয়তায় প্রত্যাবর্তনে গৃহীত উদ্যোগ এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, জাতীয়তার ব্যাপারে সাংবিধানিক অস্পষ্টতা চলমান ‘বাঙালি’ বনাম ‘বাংলাদেশী’ বিতর্ক সৃষ্টির জন্য সম্পূর্ণ দায়ী না হলেও সহায়ক হয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। ৭২ এর সংবিধানের প্রস্তাবনায় যেখানে বলা হয়েছে, ‘যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল’ সেখানে অন্যতম মূলনীতি হিসাবে কেবল ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এটা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, না বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, তার সুস্পষ্ট উল্লেখ সংবিধানের কোথাও নজরে পড়েনি।

শোনা যায়, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এ দিল্লির আপত্তি ছিল এবং আছে।  কারণ,‘বাঙালি’ শব্দটি তাদের পছন্দ নয়। তা হলেও, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ‘আকাশবাণী’তে ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ জোরেসোরে চালিয়েছে তারা। বাঙালি ঐক্যের শিকড় খুঁজে বেড়িয়েছেন, তাদের পন্ডিতগণ। অতপর আমরা যখন বাঙালি হলাম, যুদ্ধ করে, পশ্চিম বাংলার নাম বদল হয়ে হলো পশ্চিম বঙ্গ এবং পশ্চিম বাংলার জনগণকে চেষ্টা করা হচ্ছে হিন্দি শিখিয়ে ভারতীয় বানাবার। আর তারা তাই হয়ে যাচ্ছেন।

এমতাবস্থায়, বাংলাদেশে যদি ‘বাঙালি’ শব্দ উচ্চারিত হতে থাকে অথবা বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ সত্যি সত্যি যদি শক্ত শিকড় গেড়ে বসে, আর ধীরে ধীরে তা পল্লবিত হয়ে ডালপালা বিস্তার করতে থাকে, তাহলে, এর ছায়া কোথায় পতিত হয়ে কি প্রভাব ফেলে, তা কে জানে। তখন পশ্চিমবঙ্গের জনগণকে ভারতীয় বানাবার বেলায় একই বাধার সম্মুখীন হতে পারে দিল্লি, যে বাধার সম্মুখীন হয় পিন্ডি, পূর্ববাংলার জনগণকে উর্দু শিখিয়ে পাকিস্তানী বানাতে গিয়ে। শোনা যায়, অনুরূপ আশংকার বসে সাধু সাবধানী ও দূরদর্শিতা থেকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’ ব্যবহার না করার অনুরোধ করেছিলেন। জানি না, সে কারণে কিনা, সংবিধানে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটি নিরাভরণ রাখা হয়। তবে, সংবিধানে যা-ই থাক, বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়ে, ঐতিহাসিক কারণেই পাসপোর্টসহ সব সরকারি দলিলপত্রে জাতীয়তার ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’ লেখা হতো। এটা আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান মিত্র দিল্লি কতটা সহজভাবে মেনে নিয়েছিলেন অথবা মোটেই মেনে নিয়েছিলেন কিনা কে জানে! এমতাবস্থায় পরবর্তীতে সেনাশাসক দ্বারা ‘বাঙালি’ স্থলে বাংলাদেশী চালু করার পিছনে দিল্লির মনোরঞ্জনের ইপ্সা থাকার বিষয়টি চিন্তক মনে আসতেই পারে।

সে যা হোক, বঙ্গবন্ধু শহীদ হলেন। জিয়া সাহেবরা ক্ষমতায় এলেন। সরকারি দলিলপত্রে জাতীয়তার কলামে ‘বাঙালি’র স্থলে ‘বাংলাদেশী’ প্রতিস্থাপিত হয়।এ বিশেষ কলামটাকে জাতীয়তার পরিবর্তে নাগরিকত্বের কলাম বানিয়ে ‘বাংলাদেশী’ লেখা বাধ্যতামূলক করা হলে কারোই কোন আপত্তির কারণ থাকে না এবং বিনষ্ট হয় না জাতীয় ঐক্য।

প্রসঙ্গক্রমে জয় বাংলা ও জিন্দাবাদ সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। কারণ, ‘বাঙালি’ আর ‘বাংলাদেশী’ বিতর্কের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভক্তরা ‘জয়বাংলা’ পছন্দ করেন না। সে সঙ্গে দেশের বামগোষ্ঠিও অধুনা ‘জয়বাংলা’ বলতে শরমবোধ করেন। অপরদিকে ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাগণের দ্বিতীয়, তৃতীয় স্তর থেকে  নিচের দিকে ক্রমবর্ধমান জোরেশোরে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনী শোনা যায়। দ্বিতীয় পক্ষের সর্বোচ্চ পর্যায়েও এ ধ্বনী ক্রমান্বয়ে শিথিল হয়ে আসছে। কারণ, হয়ত তাই, যে কারণে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটি সংবিধানে নিরাভরণ রাখা হয়।

স্মর্তব্য, ’৭১ এর গণঅভ্যুত্থানে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনী ছিল জনগণের মুখে মুখে।

‘জয়বাংলা’ ধ্বনী শক্তির উৎস। অনেকেই দেখেছেন, উঁচুতে আরোহনের সময়ে রিক্সাচালক উচ্চকণ্ঠে ‘জয়বাংলা’ বলে রিক্সার পেডেল চাপছে এবং কুলিরা কোন ভারী জিনিস তুলতে এ ধ্বনী ব্যবহার করছে। পরবর্তীতে তা মুক্তিযোদ্ধাদের ‘রণধ্বনী’তে পরিণত হয়। পাকি হায়নারা ‘পাকিস্তান-জিন্দাবাদ’ বলে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর হামলা চালাতো, আর মুক্তিযোদ্ধারা জয়বাংলা বলে তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়তো।

বাংলার জয় হয়, মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হন এবং ‘জয়বাংলা’ জাতীয় শ্লোগানে পরিণত হয়। ’৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পর বেতারের বদলে রেডিও, বাঙালির বদলে বাংলাদেশী’র মত ‘জয়বাংলা’র বদলে চালু হয় ‘জিন্দাবাদ’। সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত বামরাও জিন্দাবাদ গ্রহণ না করলেও ‘জয়বাংলা’ সযত্নে পরিহার করেন।

‘জিন্দাবাদ’ ফার্সী শব্দ। অর্থ ‘অমর বা দীর্ঘজীবী হোক’। ফার্সী ভালো ভাষা। ব্যাকরণের দিক থেকে খুব সহজ। ফাজিল শ্রেণীতে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বাংলার সাথে ফার্সী পড়ানো হয়। কারণ, ফার্সীতে জ্ঞানের এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা অন্য ভাষায় নেই। বিশেষ করে, সূফী দর্শন। সুতরাং ভাষা হিসেবে ‘জিন্দাবাদ’ এর প্রতি আমার কোন অনীহা নেই।

কিন্তু ‘জিন্দাবাদ’ ধ্বনীটি পাকি হায়না, আলবদর, রাজাকার, আলশামস দ্বারা বাঙালি নিধন, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং নারী নির্যাতনে ’৭১ এ ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হওয়াতে এটির প্রতি ঘৃণা জন্মে গেছে। তখন পাকি হায়নাদের দোসর, আলবদর ও রাজাকাররা আল্লাহু আকবর ও জিন্দাবাদ ধ্বনী দিয়ে এলাকায় ঢুকতো, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা ও লুটপাট চালাতো। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, এ সব ধ্বনী শুনলেই জনগণ সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তো এবং মহিলাদের ঘরের বাইরে বাগান-ঝোপে-ঝাড়ে লুকিয়ে রাখা হতো। এ ধ্বনীর আতংকে মহিলারা রাতের অন্ধকারে সাপ-বিচ্ছুর ভয় পর্যন্ত ভুলে যেতো। ফলে মনে হয় যেন, এ ধ্বনীর মধ্যে গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং নারী নির্যাতনের মতো ধর্মের দৃষ্টিতে মহাপাপ কার্যাদির উৎস নিহিত রয়েছে, যেমনই রয়েছে ‘জয়বাংলা’র মধ্যে বীরত্বের প্রেরণা। 

কোন শব্দের অপব্যবহার কিভাবে শব্দটিকে ঘৃণিত করে তোলে, এটাই তার প্রমাণ। এভাবে তথাকথিত ইসলামপন্থীরা জিন্দাবাদসহ আলবদর, রাজাকার (আসলে রেজাকার) এর মত ঐতিহাসিক এবং সুন্দর কতিপয় শব্দকে অপব্যবহার করে সাধারণ্যে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে ফেলেছে। মীর জাফর শব্দের অর্থ – যাই থাক, এখন এর অর্থ দাঁড়িয়েছে বিশ্বাসঘাতক। কেউই এখন নিজের ছেলের নাম মীরজাফর রাখে না। তেমনই আলবদর এবং রাজাকার অর্থ এখন রাষ্ট্রদ্রোহী আর ‘জিন্দাবাদ’ অর্থ পাকিস্তান অমর হোক। এ ‘জিন্দাবাদ’ রক্ষার নামে, এ দেশের জনগণের রক্ত ঝরানো হয়েছে, লুন্ঠন করা হয়েছে মা-বোনেদের অমূল্য সম্পদ। এমতাবস্থায়, উক্ত দুষ্টকর্মের দোসররা ছাড়া ’৭১ এর জনগণের মনে জিন্দাবাদের প্রতি ঘৃণা থাকাই স্বাভাবিক এবং তারা তা শুনলে আতকে উঠবেন। কারণ, এ ধ্বনীর সাথে সাথে পাকি হায়না ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিভীষিকাময় চেহারা তাদের সামনে ভেসে আসে। সুতরাং ওদের কাছে তা যে কারণে মধুর লাগে, যারা এর নির্মম শিকার হয়েছেন, তাদের কাছে সে কারণেই তা ততোধিক বিষময় লাগে। তা ছাড়া এটাই এখন স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিরূপণের মানযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। যারা জিন্দাবাদ ব্যবহারে কোন দোষ দেখেন না, আমি তাদের কোন ছেলের নাম মীরজাফর রাখতে অনুরোধ করবো। তা রাখতে রাজী না হলে, উক্ত কারণে জিন্দাবাদপন্থীদের ঘৃণার সাথে বর্জন করা এবং সমধিক ব্যাপকভাবে ‘জয়বাংলা’ উচ্চারণ করা সকল সুস্থ ও সচেতন নাগরিকের জাতীয় কর্তব্য হওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবী বলে স্বাধীনতার পক্ষশক্তি মনে করে।