All posts by bartaman

আমি বাঙালি আমাকে বাঁচতে হবে….

সংলাপ ॥ ‘অন্য কোন দর্শন নয় – আমি বাঙালি আমাকে বাঁচতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক হয়ে’- উক্তিটি বাংলার একজন সূফী সাধকের। অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি উচ্চারণ করেন – আজকের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব থেকে মুক্তি পেতে বাঙালিকে চিন্তা ও মননে বাঙালি হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। বাঙালির জীবন চলার পথে আজ আর বাঙালির দর্শন নেই, আছে জগাখিঁচুড়ি। নেই তার জাতীয়তাবোধের আত্মশক্তি ও সাহস। যা দ্বারা একদিন সে শিরদাঁড়া সোজা করে বৈশ্বিক চেতনা ধারণ করতে পেরেছিল। আজকের বাঙালিকে ইতিহাসের ধারায় খুঁজে পাওয়া কিংবা চিনে নেয়া কষ্টকর। তার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ব্যাপ্তি ক্রমাগত ধর্মজীবীদের এবং রাজনৈতিক বেনিয়াদের হাতে লুন্ঠিত হতে হতে আজ এক ক্ষীণ দীপ শিখা মাত্র।

এ জন্যেই সূফী সাধক উপদেশ দিলেন সর্বাগ্রে একজন বাঙালি হবার। এই বাঙালি দর্শনেই নিহিত আছে রাজনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি। একজন মানুষ তার নিজের মধ্যে আপন স্বকীয়তার অস্তিত্ব অনুভব করতে না পারলে, অন্যের উপস্থিতিটা তার কাছে অনুপস্থিতিই থেকে যায়। তখনই দেখা দেয় আমিত্বের আবরণে সর্বস্ব গ্রাস করবার পাশবিক মনোবৃত্তি। যা আজ আমাদের রাজনৈতিক ধারাগুলোর মধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। 

এখন বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতিক পছন্দ করে না কিন্তু নির্বাচন আসলে সে যে কোন রাজনীতির সাময়িক বাহক হয়ে উঠে। এর বাইরে বেরিয়ে বাঙালি দর্শন এবং তার সংস্কৃতির চেতনায় ধারক হতে চায় ক’জনা? সুতরাং দেশ এবং তার মানুষের জন্য আর কেউ কোন দরদ অনুভব করে না। রাজনীতিকরাই দেশের মানুষকে ব্যবহার করে চলছে শুধুই তাদের আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে। যদিও এদের অনেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাইনবোর্ডটি যথাযথই ঝুলিয়ে রেখেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন। স্বাভাবিক প্রশ্ন এই জাতীয়তাবোধ যা আজ নির্বাসিত হওয়ার পথে, তার প্রতিষ্ঠার পথ এবং পদ্ধতি কি?

আধিপত্যবাদী রাজনীতির প্রয়োজনে যে সন্ত্রাসের সৃষ্টি তা এখন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। তাকে কি ভোটতন্ত্রের বর্তমান পথ এবং পদ্ধতিতে জিইয়ে রেখে পরিবর্তনের আদৌ সম্ভাবনা আছে? যারা আজ বুদ্ধিজীবী সেজে পুরো দেশটাকে তাদের নিজেদের মতো করে ইজারা নেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদের নির্লজ্জতা কত নগ্ন তার প্রমাণ পাওয়া যায় দেশের রাজনীতিকদের ও তাদের পোষ্যদের সন্ত্রাসের পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রচারে।  

সমগ্র দেশব্যাপী আধিপত্যবাদী বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ সদস্য, নাগরিক সমাজ সদস্য ও ধর্মজীবী সমাজ সদস্য সমন্বিত স্বার্থবাদী একটা শ্রেণীর দৌরাত্ম্য চলছে। অন্তর থেকে এরা কেউই আর এই দেশ এই মাটি এই মানুষের কেউ নয়। এরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ও গোষ্ঠীস্বার্থে মোহাচ্ছন্ন এবং বাঙালি ও তার জাতীয়তার আজন্ম শত্রু। এদের অভিন্ন ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের কাছে বাঙালির জাতীয়তাবোধ বার বার উপেক্ষিত।

একদিকে আকাশ সংস্কৃতির ক্রমাগত আগ্রাসন অন্যদিকে আধিপত্যবাদী সন্ত্রাসী রাজনীতির ব্যাপক বিস্তার, জাতির ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। এখন একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ শিক্ষা নিতে গিয়ে হয় নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে অথবা নিজেকে পরিবর্তিত করছে একজন রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ক্যাডার হিসেবে।

এই বাস্তবতায় বাঙালি জাতীয়তা-বোধে দেশ গড়ার সত্য ও সহজ পথ – সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে বিপ্লব। একদিকে রাজনীতিকদের মিথ্যাচার এবং প্রবল প্রতাপে প্রতিটি জনপদের অসহায় মানুষের নির্বিকার ক্রন্দন, অন্যদিকে শান্তি ধর্মের নামে আমাদানিকৃত মধ্যপ্রাচ্যের জীবনাচার ও সন্ত্রাস দ্বারা মোহাবিষ্ট করে বাঙালির বাঙালিত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। এই সাড়াশি আক্রমণের প্রক্রিয়ায় বাঙালির সহজ সতেজ সবল চিন্তার সূত্রগুলো প্রতিদিন মরে যাচ্ছে। পৃথিবীর অধ্যাত্মচিন্তা ও চিরন্তন প্রেরণা বাণীসমূহ বাঙালি মানসে আর কোন আলোড়ন তুলছে না ভোগ, লোভ আর স্বার্থের আবর্তে প্রতিনিয়ত ঘূর্ণায়মান সমাজে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে প্রতিঘাতের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপেই হবে বাঙালির পূণর্জাগরণ শুরু। সামাজিক বাস্তবতা, সাম্প্রদায়িকতা ও অর্থনৈতিক শোষণ, আধিপত্যবাদী আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক মুক্তি প্রতিটি স্তরেই জাতীয়তাবোধের অদম্য ইচ্ছা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রেমের প্রজ্ঞায় প্রজ্ঞায়িত হওয়ার জন্য সত্যমানুষের পথে চলার এখনই সময়। কর্মে অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা বহমান বাঙালিত্বে প্রতিষ্ঠিত করবার ডাক বর্তমান সময়ের বিচারেই সংজ্ঞায়িত। নিজের রূপে বিশ্বরূপ প্রতিফলিত করবার অহংবোধ বাঙালিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একমাত্র পথ।

মাত্র দুই-তিন লক্ষ ধর্মীয় আধিপত্যবাদী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিক এবং তাদের পোষ্য সন্ত্রাসীদের জন্য সমগ্র দেশের মানুষকে শান্তির জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াতে হবে, এটা একেবারেই অবাস্তব। সুতরাং বাস্তবতা হলো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ধরে জাতীয়তাবোধ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে জাগ্রত রাখা। পাঁচ হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যকে আবার তার স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত ও বহমান রাখতে সত্যের দ্বারা মিথ্যার প্রতিরোধের কোন বিকল্প নেই। প্রশাসন, রাজনীতি এবং শোষণের শ্রেণীবৈষম্য প্রত্যেকেই একে অপরের পরিপূরক বিধায় এরা প্রত্যেকেই আজ সাধারণ মানুষের শত্রুতে পরিণত। অধিকার আদায়ের গতানুগতিক আন্দোলনে বারবার সুবিধাবাদী চরিত্রের উদ্ভব ঘটছেই এবং তা বিগত ইতিহাসের মতোই পুনরাবৃত্তি হবে মাত্র।

লড়াইটা এখন বাঙালির। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে আধিপত্যবাদী ধর্মীয় শোষণের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রাজনৈতিক শোষণের ব্যবস্থাদিও। তারপরও ঐক্যবদ্ধ সাধারণ মানুষের সামনে তা অত্যন্ত নগণ্য। সত্যমানুষের দর্শনে ‘আমরা বাঙালি – চির নতুন ও শাশ্বত’ এই আহ্বান ধারণ করাই বাঙালির আজকের প্রজন্ম ও নতুন প্রজন্মের প্রাথমিক ও প্রধান কাজ।

প্রয়োজন লক্ষ্য ভিত্তিক সামাজিক পরিবর্তন

সংলাপ ॥ এক সামাজিক পরিবর্তন। আমাদের অভিব্যক্তি এবং উদ্যোগই বলে দেবে কিভাবে দেশ শাসন করতে চাচ্ছি। কিভাবে সমাজের নানা স্তরের মানুষকে উপযুক্ত নাগরিক সুবিধা দিতে পারছি। সরকারের কাজই হলো তা নিশ্চিত করা। নাগরিক সমাজ, বেসরকারি ক্ষেত্র, সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থারও সমান ভূমিকা এবং দায়িত্ব রয়েছে এই সামাজিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে। দেশ মানে মানুষ, দেশ মানে মৃত্তিকা নয়। অকাজে কেবল কথা না বলে কাজ করে যাওয়া। ভালো কাজ। জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদেরকে নিবেদন করলে যা করতে চাইছি, তার অনেকটাই সম্পূর্ণ হয়ে যায়। যা আরও পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে উল্লেখযোগ্য অনুপ্রেরণা জোগায়। উৎসাহ দেয়। তৈরি করে কৌতূহল।

তাই সময় এসেছে দেশ পরিবর্তনের। সুশাসনের। মজবুত অর্থনৈতিক ভিতের ওপর ভর করে দেশ আর্থিক বৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একইভাবে সম্মিলিতভাবে আমাদের নজর দিতে হবে রাষ্ট্র, সামাজিক বুনন এবং পরিষেবায়। বিশেষত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে। জীবন-যাপনের মানোন্নয়নই সবার ওপর দর্শনীয় হওয়া উচিত।

গুণগত মানের শিক্ষাই হলো সার্বিক উন্নয়নের প্রাথমিক পথ। জাতি চায় সেই শিক্ষা যা চরিত্র গঠন করে, শক্তি বৃদ্ধি করে এবং বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। যার জোরে একজন মানুষ নিজের পায়ে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারে।

দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ পায়, সেটা রাজনীতিকদের দেখতে হবে। স্বচ্ছতার অভ্যাসকে আয়ত্ত করতে হবে। ক্ষুধা এবং অপুষ্টি আমাদের অন্যতম সমস্যা। একই রকমভাবে বড় সমস্যা হলো শিশুমৃত্যু এবং প্রসূতির মৃত্যুও। তারই সঙ্গে দুর্নীতি, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, চরমপন্থী আচরণের মতো দীর্ঘদিনের সামাজিক রোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। কড়া হাতে দমন করতে হবে সন্ত্রাসীদের। নির্বাচনী এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করার পথে এগতে হবে।

বাংলাদেশের এমন নেতৃত্ব দরকার যাঁরা চারিত্রিক দৃঢ়তায় ভরপুর। রাজনৈতিকভাবে যে মানুষ যে মতেরই হোক না কেন, দেশ গঠনে রাজনৈতিক সর্বসম্মত হওয়াই প্রয়োজন। সবার ওপর জাতির স্বার্থ। ভাষা, জাতি, আঞ্চলিকতা সব কিছুর শেষ পরিচয় জাতীয় পরিচয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের দিকেও আমাদের জরুরী নজর দেয়ার সময় এসেছে। বায়ু, শব্দ এবং জলদূষণ সমস্যা দূর করতে অগ্রাধিকার সময়ের দাবী। আমাদের যা প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তা অভাবনীয়। অদ্ভূত এক আকর্ষণীয় সম্পদের অধিকারী আমাদের দেশ। সত্য এটাই, সম্মিলিতভাবে এগলে, উদ্যোগ নিলে কোনও কাজই অসম্ভব নয়। অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি, বাস্তবায়ন এবং নতুনত্বই হোক আমাদের উদ্দেশ্য যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে স্পন্দনশীল এবং পুনরুজ্জীবিত করবে।

সময়ের সাফ কথা…. – অ-ঘৃণা আদর্শের একটা প্রধান স্তম্ভ

সংলাপ ॥ দেশবসী জানেন, মন্দ কাজের জন্য শাস্তি না দিলে সমাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, কিন্তু তবুও ক্ষমা করা শ্রেয়। আমাদের উচিত ওদের চিন্তা পাল্টানোর জন্য চেষ্টা করা।

ঘৃণা জিনিসটা নিয়ে গভীর ভাবে ভাবলে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের জন্য কাউকে ঘৃণা করাটা জরুরি নয়। ভুল ভাবনায় ওদের দোষ দেয়া যায়না, ওদের জন্য কষ্ট অনুভব করতে হবে, ওরা একটা ভুল ভাবনার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই, ওদের প্রতি, আমাদেরও প্রতি,সকলের প্রতি প্রশ্ন: আমি যা ঠিক বলে চিন্তা করি, আমার নিজেরই বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে স্ত্রী যখন সেটা না করে, যখন কোনও ভুল করে, আমি কি তাকে ‘ঘৃণা’ করি, না কি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি?

নিজের লোকেদের ক্ষেত্রে যখন তা-ই করি, অন্যের ক্ষেত্রেও সেই একই কাজ করব না কেন? তাদের ততটা আপন ভাবতে পারব না কেন? অ-ঘৃণা’ই আদর্শের একটা প্রধান স্তম্ভ।

যে মুহূর্তে ঘৃণাকে বড় করে দেখা যায়, ঘৃণা ‘মহৎ’ হয়ে ওঠে। কোনও ক্ষুদ্র সংকীর্ণ সাংসারিকতা থেকে তার উৎপত্তি নয়, দেশকে বাঁচানোর নামে, জাতিকে নবজীবন দানের নামে যখন ঘৃণার বিকাশ, তখনই তার ‘মহত্ত্ব’। প্রবল হয়ে উঠতে পারে সেই মহত্ত্বের দায়বোধ। হঠাৎ আবেগের বশে এ কাজ করা যায় না। ভেবেচিন্তে, অনেক ‘সাধনা’র পথ বেয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়।

দুই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিত্ব পরস্পরের সামনা-সামনি হননা। তারা দুটি আলাদা চিন্তাধারার দুই পরাক্রান্ত প্রতিনিধি। ওই দুই ধারার মূল দ্বন্দ্বটা হলো ‘ধর্মীয় তোষণবাদ’ আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ রক্ষা’র মধ্যে। দ্বন্দ্বটা ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মান্ধতার মধ্যে। কিন্তু দ্বন্দ্বটাকে আমরা যখন আদর্শ-উদ্দেশ্য-তত্ত্বের চক্করে না ফেলে দুটো আলাদা মানস-জগতের মধ্যে দেখতে চেষ্টা করবো, তখন স্পষ্ট হবে যে, এক দিকে দাঁড়িয়ে আছে ‘অ-ঘৃণা’র মানসজগৎ, অন্যদিকে ‘বড় ঘৃণা’র মানসজগৎ।

দুই মানসিকতা পরস্পরের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ঝকঝকে যুযুধান: তাদের মধ্যে কোনও বোঝাপড়া হয় না, হওয়ার কথাও নয়, দুই পক্ষই অন্য পক্ষকে ভুল পথের পথিক ভাবেন।

অহিংসা দিয়ে ‘অ-ঘৃণা’কে পুরোটা বোঝা যায় না। অহিংসার ‘অ-সাধারণ’ আদর্শ ছাড়াও একটা খুব সাংসারিক ভালবাসার ‘সাধারণ’ আদর্শ এই অ-ঘৃণার মধ্যে বহমান। পুত্র কন্যা ভুল করলে তাদের যেমন শুধরে দেয়া হয়, অন্যদেরও তাই করা, দূরে ঠেলে ফেলা না,সকলকে একটা ‘আপন’ বৃত্তের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। সেই আপন বৃত্তে এমন লোকও থাকতে পারে, যাকে ততো ভালবাসতে পারা যায় না। কিন্তু ভাল না বাসার মানেই কি ঘৃণা করা? এ-ই কি আমরা শিখি সংসারে? না। ভাল-মন্দ সবাইকে পাশে নিয়ে চলতে শিখি। তবে দেশ বা সমাজেও তাই নয় কেন?

অনেক রকম সমস্যা রয়েছে মানুষের জীবনে; সেই সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করা যেতে পারে। সৎ আন্দোলন হলে জনগণ পাশে দাঁড়াবেই। কিন্তু ক্ষমতা লাভের ইচ্ছায় যখন একমাত্র আন্দোলন হয়ে থাকে, তা অবলুপ্ত হতে বাধ্য।

কথা হোক। আলোচনা হোক। মানব মনস্তত্ত্ব দর্শন বলে আমরা সব সময় পৃথিবীর সমস্ত ঘটনা, সমস্ত বিষয়কে শ্রেণিবিভাগ করি। কোনও রাজনৈতিক নেতা, তিনি সফল হলেও তার মধ্যে কিছু ভাল থাকে, কিছু খারাপ থাকে। সর্বদাই একজন নেতা ভাল এবং খারাপের সংমিশ্রণ। শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তার সেই সাফল্যের প্রশংসা করে দেশের মানুষ। এ কথা সত্য, অন্য কোন রাজনীতিক পারেননি, তিনি পেরেছেন। দেশের মানুষ তাকে বিশ্বাস করেছেন এবং এখনো করেন। পদ্মা সেতুকে কে জনপ্রিয় করে শুধু দেশে নয়, গোটা পৃথিবীর সামনে নিজের সাফল্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। কঠোরভাবে ধর্মীয় সন্ত্রাস দমন দেশের মানুষকে বিপুলভাবে আন্দোলিত করেছে। হিংসা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রেম-ভালবাসা, শান্তি ও অহিংসার আবহ  তৈরি করতে হবে বলে সাধারণ মানুষ তার আন্তরিকতাকে পছন্দ করছেন। ধর্মভিত্তিক ধর্মান্ধ ব্যবস্থার দেশগুলোর জনগণকে আতঙ্কিত করে তুলছে বিশ্বব্যাপী। আমরা জনগণের ভোট ও মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, তাদের মতামতকে শ্রদ্ধা করি। জনগণ যে দিকেই ভোট দিক না কেন আমাদের সেটাকে মূল্যায়ন করার দয়িত্ব আছে। জনগণের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়ার অধিকার আমাদের কাউকে দেয়া হয়নি।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ঐশি ধর্মের মূল বিষয়। ইসলামে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় মানুষকে যে পূর্ণতায় পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে তার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তা-চেতনার পার্থক্য রয়েছে। তারা রাজনৈতিক উন্নতি বলতে কেবল শিল্পোন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণমূলক কর্মকান্ডকেই বুঝিয়েছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোনো পরিস্থিতি পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা উচিত রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থার। রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় ঐশি মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। সব শ্রেণীর মানুষের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া এবং আদর্শ ভিত্তিক প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যা কিনা জনগণের ভোটে নির্ধারিত । 

জনগণের শাসন ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা হিসেবে অভিহিত করে রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও গণতন্ত্রের এ ধারা ছড়িয়ে দেয়া উচিত যা মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণার বিষয়ে পরিণত হতে পারে।

ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষভাবে দর্শন করার মাধ্যমেই ঘটে আত্মদর্শন

বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে –


শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥ যে আল্লাহকে খোঁজে তার ভেতরেই তিনি থাকেন লুকিয়ে। অথচ উদভ্রান্ত মানুষ তাঁকেই খোঁজে বেড়ায় আকাশে-পাতালে, বনে-জঙ্গলে কিংবা পাহাড়ের গুহায়। যে খোঁজে সে, যা খোঁজে তা থেকে পৃথক নয়। আত্মদর্শনের মাঝেই আল্লাহ দর্শন। আত্মজ্ঞানই পরমাত্মজ্ঞান। মানুষ নিজেকে চিনতে পারলেই চিনতে পারে তার আল্লাহকে। মানুষ এবং আল্লাহর মধ্যে একমাত্র পর্দা মানুষ নিজেই। ‘আমি কে?’ নিজের মধ্যে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে আমি বলে কিছু নেই। মানুষ নিজেকে যা ভাবে তা সে নয়। নিজেকে যা ভাবতে পারে না সে ঠিক তাই। এক অসীম শূণ্যতা। এক অভাবনীয়, অসীম শূণ্যতাই পারমার্থিক সত্তা। এ অসীম শূণ্যতা বোধ থেকেই আসে পূর্ণতা।

কিভাবে হবে আত্মদর্শন? আমরা কি জানি নিজেকে? কতটুকু জানি? আমরা কি জানি আমাদের জীবনের লক্ষ্য? কোন্ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যাপন করছি এ জীবন? কি পেলে আমরা শান্ত হবো, নিজেকে সার্থক ও সফল ভাবতে পারবো, তা কি আমরা জানি? আমরা কি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে জীবন যাপন করি, না-কি সাময়িক খেয়াল আমাদেরকে লক্ষ্যচ্যূত করে? আমি কে? আমি যেমন আছি, তেমন হলাম কেন? আমি কি চাই? আমি যা চাই তা কিভাবে পেতে পারি? আত্মদর্শন না থাকলে এসব প্রশ্নের উত্তর জানা যায় না। আর এসব প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে জীবন শুধু অর্থহীন কালক্ষেপন। মানুষ জীবনে কি চায় তা না জানলে জীবন নিরর্থক ব্যস্ততায় পূর্ণ হয়। জীবনের কোন অর্থ নিয়ে মানুষ মানব-জীবন লাভ করে না। প্রত্যেককে নিজের জীবনের অর্থ সৃষ্টি করতে হয়। যে যতটুকু অর্থ সৃষ্টি করতে পারে সে ততটুকুই সার্থক। মানুষের সৃষ্টি শেষ হয় নাই। পরিপূর্ণ সৃষ্ট জীব হিসেবে মানুষের জন্ম হয় না। মানুষ পৃথিবীতে আসে নিজেকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা নিয়ে। কে, কিভাবে নিজেকে সৃষ্টি করবে এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। যে যেভাবেই নিজেকে সৃষ্টি করুক না কেন, এজন্য প্রথম পদক্ষেপ – আত্মদর্শন। আত্মদর্শন থাকলে নিজের প্রতিটি কর্মের ব্যাখ্যা তার কাছে থাকবে। মানুষ জানবে – কেন, কি উদ্দেশে, সে কোন্ কাজটি করছে।

অন্যদিকে – আমি কোথায় আছি, কেমন আছি, তা না জেনে কোথায় যাব, কেমন থাকব তা ঠিক করা যায় না। যে কোন যাত্রা পথের শুরু এবং গন্তব্য থাকতেই হবে। নিরুদ্দেশের মধ্যেও উদ্দেশ্য আছে। নিঃ+উদ্দেশ্য=নিরুদ্দিষ্ট বা নিরুদ্দেশ। উদ্দেশ্য ব্যতীত নিরুদ্দেশ হয় না।

মানুষ নিজেকে বদলাতে চায়। কিন্তু নিজেকে না জানা পর্যন্ত নিজেকে বদলানো যায় না। নিজেকে জানতে থাকলে জানার প্রক্রিয়ায় নিজ বদলে যায়। কি চাই, কেন চাই, তা না জানলে কিছুই পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও এর মূল্য দেয়া যায় না। অথচ অধিকাংশ মানুষ জানে না সে কি চায়। কারণ, আত্মদর্শন নেই। মানুষ সাধারণত আত্মদর্শন করে না, নিজেকে দর্শন করে না। মানুষ দর্শন করে বাহিরের অযুত দৃশ্য। সিনেমা, টিভি, ক্রেকেট খেলা, আড্ডা ও নানারকম বিনোদনের উছিলায় পালিয়ে বেড়ায় আত্মদর্শন থেকে।

আত্মদর্শন হচ্ছে – আত্ম বা নিজের আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি, বোধ, আচরণ, ব্যক্তিত্ব, কল্পনা, স্মৃতি, নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতা, সর্বোপরি নিজেকে দর্শন। আত্মদর্শন হচ্ছে – নিজের দোষগুণ পরীক্ষা, নিজ আত্মার স্বরূপ উন্মোচন। তাই আত্মদর্শন বাস্তব, এটা অন্ধকার ঘরে কালো বেড়াল খোঁজার দর্শন নয়!এ মুহুর্ত থেকে, যে কোন ব্যক্তি, নিজেকে দর্শন করা শুরু করতে পারে এবং যে যতটুকু দর্শন করতে পারবে তার আত্মদর্শনও হবে ততটুকুই।

আত্মদর্শন নিজেকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ।আত্মদর্শনের শুরুতে একটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন যে, আত্মদর্শনের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করা যাবে,নিজেকে উন্নীত করা যাবে, নিজের প্রতি এ বিশ্বাস না থাকলে আত্মদর্শন হয় না।

আত্মদর্শনের প্রথম ধাপেই আসবে আত্মসচেতনতা। মানুষ ততটুকুই নিজের জীবনযাপন করে যতটুকু সে আত্মসচেতন। মানুষের আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি থাকে তার চেতনায়। তাই সচেতন না হলে, শরীরের কোষগুলো আত্মরক্ষার প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কোন তথ্য গ্রহণ করে না। অচেতন কোন কর্মের জন্য যেমন নিজেকে দায়ী করা যায় না, তেমনি অচেতন কর্মের মাধ্যমে যে সাময়িক সফলতা আসে তাও নিজের নয়। আত্মসচেতনতাই বর্তমান। আমি আত্মসচেতন অর্থাৎ আমি বর্তমানে আছি। কিন্তু সাধারণত মানুষ বর্তমানে থাকতে পারে না। যখন যেখানে তখন সেখানে থাকতে পারে না। চিন্তাকে পড়তে শুরু করলেই দেখা যায়, চিন্তা অতীত বা ভবিষ্যতে বিচরণ করছে।

তথাকথিত ধর্ম অতীত এবং ভবিষ্যৎ নির্ভর। কখন কে, কি বলে গেছেন, মৃত্যুর পর কি হবে – ইত্যাদি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় মিথ্যাচার চলে ধর্মানুষ্ঠানে। ধর্মের আলোচ্যসূচী সীমাবদ্ধ হয়েছে মরনের আগে ও পরের বিষয়গুলোতে। তাই জীবন চলার বন্ধুর পথ থেকে তা দূরবর্তী হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ধর্ম অতীতেও নেই ভবিষ্যতেও নেই। ধর্ম আছে বর্তমানে। বর্ত+মান = বর্তমান। বর্ত অর্থ – পথ। মান অর্থ – প্রকৃতমূল্য। যে পথের প্রকৃত মূল্য আছে তা-ই বর্তমান। ‘পাবিরে অমূল্যনিধি বর্তমানে’। কারণ – আমরা অতীতকে পরিবর্তন করতে পারি না। অতীতকে যাপন করতে পারি না। অতীতে কোন একদিন জল পান করেছিলাম এ স্মৃতির রোমন্থনে বর্তমানের জলতেষ্টা মেটে না। সুতরাং অতীতে জীবনের জন্য মূল্যবান কিছু নেই। ভবিষ্যতে কি হবে তাও আমরা জানি না। হতে পারে, এটাই জীবনের শেষ মুহূর্ত। সুতরাং এ মুহুর্তটিকে পূর্ণভাবে যাপন করার মাধ্যমেই জীবন তাৎপর্যময় হতে পারে। আর এ মুহূর্তটিকে পূর্ণভাবে যাপন করতে হলে ‘এখন-এখানে’ থাকতে হবে। জীবনের পূর্ণস্বাদ নিতে হলে ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষভাবে দর্শন করার কোন বিকল্প নেই। এ দর্শনের মধ্যেই হবে আত্মদর্শন।

আত্মসচেতন হলে নিজেকে দেখে বিষ্মিত না হয়ে উপায় নেই। আত্মসচেতন হলেই বুঝা যাবে কত রকমের ‘কাঁচা আমি’ আছে নিজের ভেতর। বুঝা যাবে – ক্ষুধার্ত আমি আর খাদ্য গ্রহণের পর আমি এক নই, ক্লান্ত ও অবসন্ন আমি আর সতেজ আমি এক নই, ঘুমন্ত আমি আর জাগ্রত আমি এক নই, ক্রোধান্বিত আমি আর শান্ত আমি এক নই। ঠিক একই ভাবে, আত্ম-সচেতনতার একটা পর্যায়ে নিজের মধ্যে টের পাওয়া যায় ‘পাকা আমি’র অস্তিত্ব। তখন প্রতিটি কর্মের মূল্যায়ন শুরু হবে ‘পাকা আমি’র সাপেক্ষে। নিজের মধ্যে ‘পাকা আমি’র অস্তিত্ব খোঁজে না পাওয়া পর্যন্ত নিজের বিচার নিজে করা যায় না। নিজেকে এমনভাবে দেখতে হয় যেন নিজের ভেতরের ‘পাকা আমি’ সামনে দাঁড়িয়ে ‘কাঁচা আমি’কে দেখছে। এখান থেকে আর একটু গভীরে গেলে শুরু হবে আত্মসমালোচনার স্তর। ‘পাকা আমি’র বিরুদ্ধে কর্ম করতে থাকলে মানুষ অনুতাপ-অনুশোচনা ও আত্মগ্লানির অনলে দাহিত হয়। আত্মগ্লানির অনলে দাহিত হয়ে পুড়তে থাকে আমিত্বের আবরণ। সোনা পুড়লে যেমন খাঁটি হয় তেমনি আত্মগ্লানির অনলে পুড়ে মানুষ খাঁটি মানুষে রূপান্তরিত হয়।তাই আত্মদর্শন,আত্মশুদ্ধির প্রথম সোপান।

বহিরঙ্গকে দেখাও আত্মদর্শনের পর্যায়ভুক্ত। বহিরঙ্গ আত্ম বা নিজেরই অঙ্গ। বহিরঙ্গকে দর্শন করার জন্য আয়নায় নিজের ছবির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজেকে দেখা, নিজের কথাবার্তা রেকর্ড করে তা শোনা, নিজের ভিডিও দেখা যেতে পারে। আমার দেহও আমি। প্রতিদিন কিছু সময় আয়নায় একদৃষ্টিতে নিজেকে দেখতে থাকলে আত্মদর্শনের একটা স্তরে উপনীত হওয়া যাবে। তবে, আত্মদর্শন মূলত চিন্তার দর্শন। আয়নায় নিজেকে দেখার সময়ও চিন্তা চলতে থাকে। যুগপৎ সেসব চিন্তাকে পড়লে আত্মদর্শন হতে থাকে।

চিন্তা ব্যতীত আবেগ, অনুভূতি, হৃদয়, মন বলতে কিছু আছে কি-না তা নিজের মধ্যে প্রত্যেকেরই খুঁজে দেখার প্রয়োজন আছে। কারো মন খারাপ মানে তার চিন্তা খারাপ। সুতরাং চিন্তা ভাল হলেই মানুষ ভাল হয়। ধারণা, কল্পনা, দৃষ্টিভঙ্গি, কল্পনা ইত্যাদি সবই চিন্তার বিভিন্ন অধ্যায় মাত্র।

সুতরাং, আত্মদর্শনের প্রধান বিষয় চিন্তাদর্শন। চিন্তা সম্পর্কে সচেতন হলে অহেতুক নানা বিষয়ে চিন্তাবিক্ষেপ বন্ধ হয় এবং চিন্তা নিজের লক্ষ্যবস্তুতে কেন্দ্রীভূত হয়। পরিবেশের প্রভাবে অসংখ্য চিন্তা মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে। সাধারণত মানুষ চিন্তা করে না। চিন্তা মানুষকে করে। অসংখ্য চিন্তা আসতে থাকে। অসংখ্য চিন্তা থেকে একটা নিয়ে সে কর্মে লিপ্ত হয়। চিন্তা বিক্ষিপ্ত হলে কর্মও বিক্ষিপ্ত হয়। লক্ষ্যের প্রতি চিন্তা যত বেশি কেন্দ্রীভূত হবে লক্ষ্য অর্জন ততটাই সহজ হবে। চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে সুক্ষভাবে। এমনভাবে যেন চিন্তায় আগত একটা শব্দও বাদ না পড়ে। কারণ, প্রতিটি চিন্তা, তা যত ক্ষুদ্রই হোক, অতিগুরুত্বপূর্ণ। চিন্তায় উদিত একটি মাত্র শব্দ হতে পারে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইন্দ্রিয়সমূহ বহির্মুখি। ইন্দ্রিয়সমূহের বর্হিমুখিতাই চিত্তচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এ চিত্তচাঞ্চল্যের প্রভাবে মানুষ অশান্ত হয়। ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শব্দ, দৃশ্য, গন্ধ, স্পর্শ প্রবেশ করে নিজের ভেতরে। প্রতিটি শব্দ, দৃশ্য, স্পর্শ, গন্ধ স্থান করে নেয় অস্তিত্বে। একবার দেখা কোন দৃশ্য, কিংবা শুনা কোন শব্দ সহজে মুছে না। ম্লান হয়,কিন্তু কোনকিছুরই বুঝি মৃত্যু নেই। তাই দেখা দৃশ্য, শুনা শব্দ,অনুভূত স্পর্শ মানুষকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে থাকে। ‘নিজ’ এর উপর এক তথ্যের উপর আরেক তথ্য বারবার লিখিত হতে থাকে। এভাবে স্তরে স্তরে আবৃত হয় নিজ। এক, একক এবং অদ্বিতীয় ‘আমি’-কে  আবৃত করে কাঁচা আমি। কাঁচা আমি নিয়ে যাপিত হয় জীবন। অসংখ্য ছবির আঘাতে জর্জরিত, অসংখ্য শব্দের আওয়াজে দূষিত হয় কাঁচা আমিগুলো।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ লিপ্ত হয় অসংখ্য কর্মে, সংযোগ হয় নানা রকম মানুষের সাথে। জীবনের প্রয়োজনে মানুষ সংযোগ করে স্ত্রী-স্বামী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-শত্রু এবং আরো অনেকের সাথে। জীবন চলার পথে কেউ তার মালিক কেউ বা তার ভৃত্যে পরিণত হয়। মানুষ নিজে কারো উপাসনা করে এবং অন্যের উপাসনার পাত্র হতে চেষ্টা করে। ‘কাঁচা আমি’-র খেলায় চিরতরে হারিয়ে যায়,হেরে যায় ‘পাকা আমি’।

ইন্দিয়গণের মধ্যে চোখ একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে যেসব দৃশ্য নিজের মধ্যে প্রবেশ করে তা মোহের সৃষ্টি করে। মোহাবিষ্ট হয়ে আচরণ করতে থাকে প্রতিটি মানুষ। চোখ বাহিরের দৃশ্য দেখে, কান বাহিরের শব্দ শুনে, ত্বক বাহিরের স্পর্শ অনুভব করে, নাক বাহির থেকে ঘ্রাণ গ্রহণ করে, জিহ্বা বাহিরের বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করে। এসব ইন্দ্রিয় দিয়ে যেসব তথ্যের প্রবেশ ঘটে তা অবিরাম পরিবর্তন করে নিজকে। এসব তথ্য কীভাবে সত্তার উপর আবরণ সৃষ্টি করছে তা সুক্ষèভাবে দর্শন করলে ইন্দ্রিয়সমূহ বাহ্য বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়। ফলে চিত্ত শান্ত হয়। শান্ত চিত্তে নিজেকে প্রকাশিত করেন পরম জ্যোর্তিময়।

আকাশ, বাতাস, আলো, পানি, মাটি এই পঞ্চতত্ত্ব দিয়ে গঠিত মহাবিশ্ব। মানব অস্তিত্বও মহাবিশ্বেরই একটা অংশ। সুতরাং, মানুষের মধ্যেও আছে পঞ্চতত্ত্বের অস্তিত্ব। মানুষের মধ্যে আকাশ উপাদান হচ্ছে – কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, লজ্জা; বাতাস উপাদান –  ধারণ, চালন, সংকোচন, প্রসারণ; আগুন উপাদান – ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, ভ্রান্তি, আলস্য; পানি উপাদান – বীর্য, রক্ত, মল, মূত্র, মজ্জা; মাটি উপাদান – অস্থি, মাংস, নোখ, লোম, চর্ম। এ পাঁচ উপাদানকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আছেন – দর্শন, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়। এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের পাশে আছেন পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় – মুখ, হাত, পা, পায়ু ও লিঙ্গ। এসব জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু এবং কর্মেন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষ্‌ভাবে দর্শন করার মাধ্যমে আত্মদর্শন হয়।

সুক্ষাতিসুক্ষèভাবে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করার অর্থ হলো নিজেকে সুক্ষ্মুতিসুক্ষ প্রশ্ন করে উত্তর বের করে আনা। যেমন, আমি কেমন মানুষ? উত্তরে বললাম, ‘আমি রাগী’। এরকম সাধারণ উত্তরে সন্তুষ্ট থাকলে নিজেকে জানা যায় না। কখন আমার রাগ হয়? কেন হয়? রাগান্বিত হলে আমার দেহে কি পরিবর্তন আসে? এভাবে একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর বের করে আনলে নিজের রাগ সম্পর্কে জানা যাবে। রাগকে জানা গেলে আর রাগ থাকবে না। রাগান্বিত অবস্থায় শরীরের মধ্যে কি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তা পর্যবেক্ষণ করলে রাগ থাকতেই পারে না। কারণ, যে রাগ করে সে এখন পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। তাই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই রাগ চলে যায়। আত্মদর্শনের মধ্যদিয়েই আত্মবিশুদ্ধি আসে। নিজের মধ্যে আত্মদোষের নিরাকরণ হয়। এই নিরাকরণের নিরাকরণই – জ্যোর্তিময়।

এভাবে, আত্মদর্শনের জন্য নিজেকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করে উত্তর বের করে আনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া যায়। যেমন – আমি কে? আমি কিভাবে এখন নিজেকে চিত্রিত করি? আমি কতটুকু সম্মান করি নিজেকে? নিজের কথার কতটুকু মর্যাদা দেই? আমি কি নিজের কাছে কথা দিয়ে কথা রক্ষা করি? যাব না বলেও কি আমি যাই? দেখবো না বলেও কি আমি দেখি? শুনবো না বলেও কি আমি শুনি? স্পর্শ করবো না বলেও কি আমি স্পর্শ করি? আমি কিভাবে মূল্যায়ন করি আমাকে? আমার জীবনের কোন আদর্শ আছে কি? আমার মূল্যবোধগুলো কি কি? আমার কোন লক্ষ্য আছে কি? কোন্ ব্যক্তিকে আমি সর্বাধিক গুরুত্ব দেই? এমন কোন ব্যক্তি বা বিষয় কি আমার জীবনে আছে, যাকে সর্বদা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেই? এমন কোন নীতি বা আদর্শ কি আছে যার জন্য আমি সব ত্যাগ করতে পারি কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়ে সেই নীতি বা আদর্শকে ত্যাগ করতে পারি না? আমার আত্মপ্রবঞ্চনাগুলো কোথায়? আমার দুর্বলতাগুলো কি কি? আমার সবলতাগুলো কি কি? এমন কোন কিছু কি আছে যার প্রতি আমি আকর্ষিত হই? আমার প্রতিভা, মেধা, বুদ্ধি, সততা, চিন্তার গভীরতা কতটুকু? আমার স্ববিরোধিতাগুলো কি কি? আমি অন্যের মধ্যে যেসব দোষ দেখি তা-কি আমার নিজের মধ্যে আছে? আমি কি অন্যের সমালোচনা করি, আর নিজের সমালোচনা শুনলে অসহিষ্ণু হয়ে উঠি?

এসব প্রশ্নের উত্তর আসতে পারে কেবলমাত্র আত্মদর্শনের মাধ্যমে। আর আত্মদর্শন হতে পারে জ্ঞানেন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী বিষয়বস্তু এবং কর্মেন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত কর্মগুলোকে সূক্ষভাবে দর্শন করার মাধ্যমে। কিন্তু এভাবে কেবল একটা স্তর পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া সম্ভব। মুর্শিদ দর্শন না হলে আল্লাহ দর্শন স্তরের আত্মদর্শন হয় না। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘মুর্শিদ দর্শনের মাঝে আত্মদর্শন। আর আত্মদর্শনের মাঝে আল্লাহ দর্শন।’

মুর্শিদ দর্শনে আত্মদর্শন হয় কিভাবে? লোকে সাধরণত মুর্শিদ বলতে এমন কোন ব্যক্তিত্বকে নির্দেশ করে যিনি নিজ থেকে পৃথক দেহধারী। অর্থাৎ, নিজ থেকে পৃথক কোন ব্যক্তিকে লোকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে। তাঁর কাছে যায়, তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করে, তাঁকে অনুসরণ করে। কিন্তু আসলে কি মুর্শিদ নিজ থেকে পৃথক? জগতে অনেক মুর্শিদ, গুরু বা পথপ্রদর্শক আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করার মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটা কি? যে ব্যক্তি মুর্শিদ হিসেবে কাউকে গ্রহণ করে তার মধ্যে নিজেকে বিকশিত করার একটা ইচ্ছা থাকে। সে নিজেকে একটা বিকশিত স্তরে উন্নীত করতে চায়। কাঙ্খিত বিকশিত স্তরটি কেমন হবে এ সম্পর্কে তার মধ্যে একটা অস্পষ্ট ধারণা থাকে। ব্যক্তি যেমনটি হতে চায় কিংবা নিজেকে বিকাশের যে স্তরে নিয়ে যেতে চায় যখন সে বাস্তবে ঐ স্তরের একজন ব্যক্তিকে দেখে তখন তাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে। অর্থাৎ – মুর্শিদ নিজ চিন্তার বাস্তব রূপ। লোকে যাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাতের আগেই চিন্তাজগতের কোথাও না কোথাও তিনি বিরাজ করতেন। সুতরাং ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষèভাবে দর্শন করলে দেখা যাবে যে নিজের ভেতরেই নিজের মুর্শিদ বাস করেন। মুর্শিদ নিজ চেতনারই একটা উন্নত স্তর। নিজের মধ্যে সুপ্ত সেই উন্নত চেতনার কাছে আত্মসমর্পণই, মুর্শিদ -এঁর কাছে আত্মসমর্পণ। আত্মসমর্পণ হচ্ছে – ঊর্ধ্বস্তরের নিজের কাছে নিম্নস্তরের নিজগুলোর সমর্পণ, অপরির্তনীয় ‘আমি’র কাছে অসংখ্য পরিবর্তনশীল আমির সমর্পণ। মুর্শিদ হচ্ছেন নিজের মধ্যে সেই অপরিবর্তনীয় আমি। যতক্ষণ পর্যন্ত সে-ই আমিকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ না করা হবে এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ দর্শন হয় না। আল্লাহ স্ব-য়ম্ভু অর্থাৎ নিজ থেকে জাত। আল্লাহ – আত্মভূ। এই আত্মই অনাদি এবং অনন্ত।

মুর্শিদ আত্মবৎ, আত্মভব, আত্মসদৃশ বা আপনার মত। শুধু মুর্শিদ না, সমগ্র বিশ্বজগতই আপনার মতো। যে যেমন, তেমন ভাবেই সে দেখে জগতকে। তাই আমার মুর্শিদ কেবল ‘আমার’-ই মুর্শিদ। আমি যেমন আমি ব্যতীত অন্য কেউ হতে পারি না তেমনি আমার মুর্শিদও অন্য কারো মুর্শিদ হতে পারেন না। আমার মাঝে আমার মুর্শিদ আমারই পথ চেয়ে থাকেন। এই মুর্শিদই – দেহেন্দ্রিয়ের মোক্ষসাধনে ব্যবস্থাপক, ইন্দ্রিয় সংযমের হেতু। ইন্দ্রিয়গণ আত্মবশ না মানলে মুর্শিদবশ মানবে কেমন করে? সুতরাং, চূড়ান্ত বিচারে মুর্শিদ দর্শন হচ্ছে সমত্বদর্শন,আত্মসাক্ষাৎকার বা আত্মদর্শন। একমাত্র আত্মজ্ঞ ব্যক্তিই আত্মতত্ত্ববিৎ। এই আত্মজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান।

আত্মদর্শন থেকে আত্মতত্ত্ব বা আত্মার যথার্থস্বরূপ তখনই উন্মোচিত হয় যখন মুর্শিদ নিজের মধ্যে একাগ্রভাবে স্থিত। মুর্শিদ – আত্মনিশ্চল বা আত্মসংস্থ না হলে আত্মস্বরূপ উদ্ভাসিত হয় না। মুর্শিদই আত্মেশ্বর। এ যাবৎ ঊর্ধ্বতম যতগুলো স্তর মানুষ কল্পনা করতে পেরেছে তার সবকিছুর অবস্থান নিজের ভেতরেই সুপ্ত। আল্লাহকে সপ্ত আসমানের উপরে নির্বাসিত করলে তাঁকে কোনদিন খোঁজে পাওয়া যাবে না। নিজের ভেতরেই খোঁজে নিতে হবে আসমানের সাতটি স্তর।

মুর্শিদের গুণাবলি, তার ভাব, তার ব্যক্তিত্ব নিজের জীবনে প্রতিস্থাপিত হলে ব্যক্তি মুর্শিদময় হয় অর্থাৎ সে যেমন হতে চেয়েছিলো বাস্তবে তেমন রূপ ধারণ করে। তখন তার মধ্যে অন্য কিছু হবার বাসনা থাকে না। এ কারণেই মুর্শিদময় অবস্থা শান্ত অবস্থা। এ অবস্থাতেও কর্ম থাকে কিন্তু প্রত্যাশা থাকে না। কর্ম থাকলেই প্রত্যাশা থাকতে হবে এমন নয়। কর্ম ছাড়া যেমন প্রত্যাশা থাকতে পারে তেমনি প্রত্যাশা ছাড়াও কর্ম থাকতে পারে। মানুষ যখন মুর্শিদময় হয়, প্রকৃত অর্থে তখনই সে আত্মতত্ত্বময় বা আত্মবান হয়। আত্মবানই প্রশান্তাত্মা।

বস্তু যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন তার দু’টি রূপ আছে। একটি তার বাহ্যিক রূপ অন্যটি অভ্যন্তরীণ। বস্তুর অভ্যন্তরীণ রূপকে আবিষ্কার করার বিজ্ঞান হলো আধ্যাত্মিকতা বা আত্মঅধ্যয়ন। আত্মঅধ্যয়নেরও বাহ্যিকতা আছে। আত্মঅধ্যয়ন বিষয়ে লেখা বা বলার মাধ্যমে বাহ্যিকতা সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা হয় মাত্র। আত্মদর্শনের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় প্রকৃতই আছে যা অব্যক্ত। কিভাবে আত্মর্শন হবে তা লেখা কিংবা পাঠের বিষয় নয়। মুর্শিদের কাছ থেকে না জেনে এ পথে যাত্রা করা অসম্ভব। ‘আপনাতে আপনি ফানা হলে তাঁরে যাবে জানা’। পাকা আমির অণুদর্শনে পাকা আমিতে কাঁচা আমিগুলো বিলীন হলে তাঁকে জানা যায় অর্থাৎ ‘পাকা আমি’কে জানা যায়।

আত্ম বা নিজই হেরা গুহা। এই গুহার মধ্যে অবস্থান করলে আলো আসবেই।

নাগরিকত্ব আইন: বাংলাদেশি তাড়ানো দাবি

সংলাপ ॥ ওই রাজ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ‘মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা’ দেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়নের দাবিতে ও নতুন নাগরিকত্ব নাইনের সমর্থনে এই জনসভার ডাক দিয়েছিল। আর সেখানে দলনেতা রাজ ঠাকরে ঘোষণা করেছেন ‘ভারত কোনও ধর্মশালা নয়, এখান থেকে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের তাড়িয়েই ছাড়া হবে।’ কথিত বাংলাদেশিদের দেশছাড়া করার বিষয়টি ভারতে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে বেশ কিছুকাল ধরেই। কিন্তু সেই ইস্যুতে এত বড় মাপের রাজনৈতিক কর্মসূচী এই প্রথম হল। মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওতে হিন্দু জিমখানা গ্রাউন্ড থেকে শহরের দক্ষিণ প্রান্তে আজাদ ময়দান পর্যন্ত রাজ ঠাকুরের দল মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা এদিন যে বিশাল পদযাত্রার আয়োজন করেছিল, ওই শহরে এত বড় মাপের জমায়েত অনেকদিন হয়নি। বিবিসি মারাঠির সংবাদদাতা ময়ূরেশ বলছিলেন, দলের গেরুয়া পতাকা নিয়ে হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক এদিন যেন মুম্বাইকে গেরুয়াতে রাঙিয়ে তুলেছিলেন। অচল হয়ে গিয়েছিল মেরিন ড্রাইভ। আর এই জনসভার প্রধান দাবিই ছিল ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের এদেশ থেকে তাড়াতে হবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বালাসাহেব ঠাকরের ভাইপো রাজ ঠাকরে শিবসেনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের দল ‘মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা’ গড়েছিলেন প্রায় চৌদ্দ বছর আগে। এতদিন মারাঠা জাতীয়তাবাদই ছিল তার প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র, কিন্তু ইদানীং তিনি ভাষণ শুরু করছেন আমার প্রিয় হিন্দু ভাই-বোনেরা’ বলে। কয়েকদিন আগে তিনি নিজের দলের পতাকার রং-ও পাল্টে নিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী ‘ভগওয়া’ বা গেরুয়ায়। আর এদিন তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তার দল কথিত মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধেই আক্রমণ শানাবে। রাজ ঠাকরে তার ভাষণে বলেন, ভারত কোনও ধর্মশালা নয়, যে যেখান থেকে খুশি এসে যে কেউ এখানে বসে যাবে।

রুশ প্রতিনিধিদলের তুরস্ক সফর ও নয়া সমঝোতা!

সংলাপ ॥ সিরিয়ার ইদলিবে সেদেশের সেনা ও মিত্রবাহিনীর অভিযানের ঘটনায় তুরস্ক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। অপরদিকে রাশিয়া সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। দ্বিপক্ষীয় এই মতবিরোধের ঘটনায় রাশিয়ার উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল তুরস্ক সফর করেছে।আঙ্কারায় তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের পর আলোচনা চালিয়ে যাবার ব্যাপারে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ভারশিনিন এবং সিরিয়ায় রাশিয়ার বিশেষ দূত আলেকজান্ডার লভরেন্তিভ। তুরস্কের প্রতিনিধি দলের প্রধান ছিলেন তুরস্কের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাদাত ওনাল।

আঙ্কারায় রাশিয়ান ও তুর্কি প্রতিনিধিদের মধ্যে গতকালের ওই বৈঠকে উভয় পক্ষ ইদলিবকে শান্ত রাখতে এবং সিরিয়ার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেয়।

রুশ প্রতিনিধি দলে রাজনীতিবিদ,সামরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে উভয় পক্ষই চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি বিবেচনা করছে এবং সেটা চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই হতে পারে। গুরুত্বের দিক থেকে আদানা’চুক্তি-২ বলা যেতে পারে এই চুক্তিকে। ১৯৯৮ সালের ২০ অক্টোবরে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে দু’পক্ষই সম্মত হয়েছিল যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলোকে কেউই নিজেদের ভূমিতে ঢুকতে দেবে না। তুরস্কের সেনারাও সন্ত্রাসীদের দমনে সিরিয়ার ভূখন্ডের পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত ঢোকার অনুমতি পাবে। চুক্তি অনুযায়ী সিরিয়া তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে প্রয়োজনে তুরস্কের সীমান্তে সেনা মোতায়েন করতে পারবে। সেক্ষেত্রে তুরস্কের সেনাদের তো আর সিরিয়ার ভূখন্ডে প্রবেশের প্রয়োজন পড়ে না। সিরিয়া তাই তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রায়ই ওই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে এসেছে।

তুর্কি সরকার আদানা চুক্তি মেনে চললেই কেবল স্থগিত হয়ে যাওয়া ওই চুক্তি আবার বাস্তবায়ন হতে পারে। সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়া এবং সিরিয়ার ভূখন্ড থেকে তুর্কি সেনা প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে ওই চুক্তিতে ফিরে যাওয়া যেতে পারে। তাহলেই সিরিয়া এবং তুরস্ক দুদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ২০১৯ সালের অক্টোবরে বলেছিলেন: আমরা সীমান্ত নিরাপত্তার ব্যাপারে তুরস্কের উদ্বেগের বিষয়টি উপলব্ধি করি।এটি আদানা চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা উচিত। তুরস্কের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বেগের কথা বলে রাশিয়া মূলত সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব এবং নিজেদের ভূখন্ডের ওপর কেন্দ্রিয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের কথাই বোঝাতে চেয়েছে। রাশিয়া চায় দামেষ্ক এবং আঙ্কারার মধ্যকার উত্তেজনা কমাতে এবং সিরিয়ার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে। রাশিয়া বর্তমান সিরিয়া সরকারের ঘনিষ্ট মিত্র হিসেবে সবসময়ই অনুমতি ছাড়া বিদেশি সেনা উপস্থিতির বিরুদ্ধে এবং সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে এসেছে। ইতোপূর্বে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনও বলেছেন:মস্কো মনে করে সিরিয়া থেকে বিদেশি সেনা চলে যাওয়া উচিত। সিরিয়ার ভূখন্ডে আন-নুসরা ফ্রন্টের মতো কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠি হামলা চালালে তাদের প্রতিহত করতে সেনা অভিযান চালানোর অধিকার দামেষ্কের রয়েছে।

হারিয়ে যাচ্ছে নদী : হারিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি – 2

॥ হাসান জামান টিপু ॥

(পূর্বে প্রকাশের পর)

বাংলায় সভ্যতার শুরু হয়েছিলো নদী থেকেই।নদী দিয়েছে পলি মাটি, নদী দিয়েছে মিঠা পানি, নদী দিয়েছে সুস্বাদু মাছ, নদী দিয়েছে যোগায়োগের মাধ্যম।নদী অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাজার, মিল কলকারখানা। নদীকে অবলম্বন করে সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়েছে। সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে।

এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক বাস্তবতা হলো নদী। আমাদের অর্থনীতিকে স্বল্প খরচে উৎপাদন, কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবাহনের নদী আমাদের সহায়ক। বড় বড় মিল, কলকারখানা সব নদী তীরে এইজন্যই গড়ে উঠেছে। নদী আমাদের দেহের রক্ত সংবাহনতন্ত্রের মতো মতো সতত প্রবাহমান। তুলনামূলক সুবিধার সঙ্গে পণ্য ও সেবা উৎপাদনের খরচ জড়িত। মোটাদাগে বলতে গেলে, যে অঞ্চলে যে পণ্য বা সেবা তুলনামূলকভাবে কম খরচে উৎপাদন করা যায়, সে অঞ্চলে সেই পণ্য সেবা উৎপাদন করা। নিজেদের চাহিদা পূরণ করে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার উদ্বৃত্ত অংশ অন্য অঞ্চলে রফতানি করা আর অনুৎপাদিত প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা। প্রকৃতির দান অর্থাৎ প্রকৃতি আমাদের যে সুবিধাগুলো দিয়েছে, তা দিয়ে যে ধরনের পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক আমাদের সে ধরনের পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে হবে। প্রকৃতির দান তুলনামূলক সুবিধাকে খুব সহজে ও গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ধারণ করে। অর্থনীতি শাস্ত্রের এই নিয়ম মেনে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার। এই শিষ্টাচার না মেনে পৃথিবীতে যখন যেখানেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, তা টেকসই ও মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হয়নি; প্রক্ষান্তরে বিশ্বায়নের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ভুল ব্যবহার করেছে।

ভারত ও বাংলাদেশ, আমরা কেউ এই শিষ্টাচার মানছি না। যে কারণে আমাদের অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও টেকসই হচ্ছে না এবং সবার কল্যাণে উন্নয়ন কাজে আসছে না। নদীকেন্দ্রিক ও নদীবান্ধব অর্থনীতি গড়া বলতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে নদীকে কেন্দ্রীয় প্রাণ করা, যাতে নদীতে কোনো ধরনের বাঁধ দেওয়া, ভরাট ও দখলের অপ-অর্থনীতি না দাঁড়ায়। এ লক্ষ্যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে না গিয়ে আমাদের বরং প্রকৃতি বিশেষত নদীবান্ধব অর্থনীতি গড়তে হবে।

কি করে নদী বান্ধব অর্থনীতি গড়ে উঠবে? ভারত ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে আমাদের মূল পনি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। পদ্মার মতো নদী মৃতপ্রায়, মেঘনা, যমুনায় পানি নাই। বেশীরভাগ নদীই মরে গেছে বা মৃতপ্রায়। তিস্তা নিয়ে ভারতের টালবাহানা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। নদীর পানির যে ন্যায্য হিস্যা আমরা পাই তা থেকে ভারত আমাদের সুনিদিষ্টভাবে বঞ্চিত করছে। সৎ প্রতিবেশীসূলভ আচরণ আমদের প্রত্যাশিত হলেও আমরা বারবার প্রায়, সকল ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের সরকার বারে বারে চেষ্টা করা স্বত্বেও পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রীর একঘেয়ামির কারণে তিস্তা নদীর পানি আসছে না। গঙ্গার পানি কতটুকু আসছে তা আমাদের সরকারের কেউ জানে বলে প্রতীয়মান হয় না। যৌথ নদী কমিশনও অকার্যকর। পারস্পারিক বিষয়গুলি নিষ্পত্তির জন্য গঠিত সার্কও অকার্যকর। বৃহৎ প্রতিবেশী হিসাবে ভারত আমাদের পানির ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে যা আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন। সরকারের উচিৎ এ ব্যাপারে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া।

ভারতের সাথে যুক্ত হয়েছে এদেশের দুর্বৃত্তশ্রেণী। তারা নদী থেকে অপরিকল্পিত বালি উত্তোলন, নদী দখলের মতো কাজ করছে। সরকারী বিভিন্ন সংস্থাও আছে এসকল কাজে জড়িত। কিছু পরপর আমাদের কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে উদ্যোগ নিলেও কয়েকদিন পর পর পূর্বাপর অবস্থায় ফিরে যেতে বেশী দিন প্রয়োজন হয় না। আবার কিছুদিন পূর্বে বালু নদীতে যে সীমানা পিলার দেওয়া হয়েছে তা নদীর অনেক গভীরে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এব্যাপারে তদন্ত প্রয়োজন। নদী ভরাট ও দখলের পিছনে সরকারের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে খবরের কাগজে প্রায়শই রিপোর্ট আসে, এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া উচিৎ।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার নদী ড্রেজিং-এর বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। নদীতে নব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য তিন হাজার দুইশত কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নিয়েছে যা বর্তমানে চলমান। নদীতে নব্যতা ফিরিয়ে আনতে যে সকল প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার তা আন্তরিকতাপূর্ণ তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্প সফল হয় না আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ও প্রভাবশালীদের চতুরতায়। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃঢ়তা কাম্য। ড্রেজিং ঠিকমত হচ্ছে কি না তা পরিমাপ করা একটা দুরূহ কাজ, এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।কোন কোন এলাকায় ড্রেজিং এর ফলে নদী ভাঙ্গনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ, এ ব্যাপারে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। নদীকে কুলষিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে। বুড়িগঙ্গার নীচে পলিথিনের স্তুপ সরাতে হবে, নদীতে শিল্প বৈর্জ্য ফেলানো প্রতিষ্ঠানগুলিকে জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে, কঠোর আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে।

নদীর পানির জন্য জন্য আমাদের মিঠা পানির মাছের জীব বৈচিত্র হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে সুস্বাদু মাছের প্রজাতিগুলি। নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রভাবশালীদের মাছ চাষের ফলে পানির স্বাভাবিক গতিপথে প্রতিবন্ধকতার সৃস্টি করছে, ফলে নদী হারাচ্ছে স্বাভাবিক নব্যতা। প্রশাসন এব্যাপারে দ্রুত ও যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন আশা করি।

সরকারের পাশাপাশি আমাদের জনগণ-কে সচেতন হতে হবে। এতো নদীর দেশের, নদী মাতৃক দেশ বাংলাদেশকে মরুভূমি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। পোষাকী আন্দোলন নয়, প্রকৃত গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে আমাদের নদীগুলি রক্ষায়, না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী হবো।

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য – ১৯

* ‘বিদ্যা, বুদ্ধি, বল, বিক্রম, পান্ডিত্য গর্ব দোষে খর্ব হয়।’

                – সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন

* ‘এহসানের প্রতিদান এহসান ব্যতীত অন্য কিছু কি হইতে পারে?’

                – সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন

* ‘সুখ সুখ করি আমি, এ সুখ কি আমার রবে চিরদিন,কালে কালে এ সুখ হবে কালেতে বিলীন।’    – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ আর একবার চোখ বুলানো যাক সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর ‘হাক্কানী কথা’য় ‘হযরত আজান গাছী সত্যের দর্শন তুলে দিয়েছিলেন তাঁর ভাবশিষ্য হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন এঁর কাছে এবং হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন তাঁর ভাবশিষ্য সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর কাছে যারা এসেছেন তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে মনোনীত করে তিনি এগিয়ে যাবার পথ দেখালেন। এই আঙ্গিকে ১৯৮৭ সনের রজব মাসে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর শিষ্যদের পরীক্ষা আরম্ভ হলো। তিনি পরীক্ষা করতে লাগলেন কারা কারা এই সত্য দর্শনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। তিনি নির্দেশনা দিলেন-প্রতিষ্ঠানিকভাবে এবং আধ্যাত্মিকভাবে এগিয়ে যাবার, চর্চা এবং চর্যার মাধ্যমে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় হাক্কানী খানকা শরীফ গড়ে উঠলো। সারা বাংলাদেশে ৪৩ টির উপরে হাক্কানী খানকা শরীফ আছে। মিরপুর আস্তানা শরীফের তিনি উদ্বোধন করলেন ১৯৮৮ সনের ১৩ ই মাঘ। তিনটি তরিকার সমন্বয়ের মাধ্যমে আস্তানা শরীফের উৎপত্তি। কাদেরীয়া, চিশতিয়া ও মোজাদ্দেদীয়া তরিকার সারোৎসার একত্রিত করে তিনি আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠিত করলেন। প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে হাক্কানী মিশনের জন্ম হলো ১৯৯০ সনে। হাক্কানী মিশন কারো মুখাপেক্ষি না। আমি যখন হাক্কানী মিশনের সভাপতি ছিলাম তখন পাশ্চাত্য দেশ থেকে এবং আরব দেশ থেকে খুব লোভনীয় সাহায্য আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছিলো। কিন্তু হাক্কানী তাদের কোন প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। যারা সত্যকে নিয়ে চর্চা এবং চর্যা করবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিংবা আধ্যাত্মিকভাবে তাদের সাথেই হাক্কানী মিশনের সংযোগ থাকবে। হাক্কানী মিশন পরিচালিত হয় সত্যানুসন্ধানীদের অংশগ্রহণে। সর্বনিম্ন অংশগ্রহণ হচ্ছে মাসে ৫১ টাকা। যখন এনজিও বুরো থেকে ১৯৯৮ সনে অডিটে আসলো তখন তারা জিজ্ঞেস করলেন-আপনাদের টাকা পয়সা কি আছে? কি কি প্রজেক্ট করেছেন? আমরা বললাম যে ২৮ হাজার টাকা আছে। তিনি একটা অট্টহাসি দিয়ে বললেন-‘আপনারা এই দিয়ে এনজিও চালাবেন? আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভাবলাম-এদের কাছে এনজিও কথাটার অর্থ কি? এনজিও ব্যুরোর কাছে কথাটার অর্থ কি? এরা কোন দিকে নিয়ে যাবে? ঠিক একইভাবে যখন সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ আস্ল- বর্তমান সংলাপ যারা নিজের মধ্যে উপলব্ধি নিয়ে পড়বেন তারা সমাজের রাষ্ট্রের তথা সমগ্র বিশ্বের একটা প্রতিচ্ছবি সেখানে খুজে পাবেন। সত্যের সঙ্গে সত্যের মিল হবে। সত্যের সঙ্গে অর্ধসত্যও সমাজে চলে। যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যাচ্ছেন তখন আপনার বাহ্যিক আবরণ এবং চিন্তাজগতের সাথে সমন্বয় কতটুকু থাকে?-এখানে অর্ধসত্য আছে। আপনার ভালোলাগেনা, তথাকথিত সালাম আলাইকুম দিচ্ছেন। এখানে ইসলাম নাই। আপনি কে আমার উপর শান্তি বর্ষণ করার জন্য সালাম আলাইকুম দিচ্ছেন? আপনি কে যে আমার উপর রহমত বর্ষণ করবেন? কিন্তু তা চলে আসছে আমাদের এই উপমহাদেশে। কিন্তু যারা মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন তারা যানেন যে, সেখানে তারা সালাম দেয় না, সুপ্রভাত ও শুভসন্ধ্যা বলে। তাহলে কোথা থেকে এগুলো আসল? এটা সহজভাবেই উপলব্ধি করা যায় বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে । যারা স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেছেন কিংবা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারা নিশ্চয়ই দেখতে পারছেন ইতোমধ্যে কত পরিবর্তন ঘটেছে। এখন তো পাঁচ মিনিটের মধ্যে সারা পৃথিবী জেনে ফেলছে কি হচ্ছে? আমাদের মধ্যে ভীতি আছে যে, যা বলছি তা বিশ্বময় প্রচার হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ১৪০০ বছর আগেতো সে ভীতিও ছিলো না। এবার ভেবে দেখুন, ১৪০০ বছরে কত পরিবর্তন আসতে পারে?

সত্যকে আলিঙ্গন না করলে আপনি শান্ত হবেন না। সাধারণভাবে আপনারা দেখবেন যে,দুনিয়াদারী করতে গিয়ে যে বিষয়ে বা যে ব্যক্তির কাছে আপনি সত্য হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারেন সেখানে আপনার শরীরের ভাষাই আলাদা হবে। আর যেখানে অর্ধসত্যের মধ্যে থাকবেন সেখানে মাথা এমনিতেই নুয়ে আসবে,ছল-চাতুরির আশ্রয় নিতে হবে।

ইসলাম শান্তি। আর অন্য কিছু না। শান্তি আনতে গেলে আপনাকে শান্ত হতে হবে। যে শান্ত, যে বিষয়ে শান্ত সেখানে শান্তি আছে। যেখানে আপনি সত্যের উপর দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে আপনি নির্ভীক,কাউকে ভয় করেন না। শান্ত হতে গেলে তার পূর্বশর্ত হচ্ছে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সব সত্য না। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন রূপ এক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সব সত্য হবে না। আপনি প্রথমে একটি-কে সত্য হিসেবে ধারণ করুন। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে চলুন। কালক্রমে এক সত্যই আপনার মধ্য থেকে সব মিথ্যাকে সরিয়ে দেবে। এক সত্যকে নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে প্রথমেই আসতে হবে উপলব্ধি। আপনি যে শিক্ষায়ই শিক্ষিত হন না কেন, যত শিক্ষা যত বিদ্যা আপনার জানা হয়েছে সবগুলোর সমন্বয় সাধন করে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত না হতে পারলে, স্বশিক্ষায় নিজেকে উদ্ভাসিত না করতে পারলে উপলব্ধি আসবে না। যার যত উপলব্ধি থাকবে, প্রতিটি কর্মে যার যত অনুসন্ধিৎসা থাকবে, যে কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে সে-ই এগিয়ে যাবে। হাক্কানী ওজায়িফে লেখা রয়েছে- কর্মই ধর্ম। কিন্তু কোন কর্ম ধর্ম? যে কর্মের মধ্যে আপনি নিয়োজিত আছেন সে কর্মের মধ্যে আপনি একনিষ্ঠ আছেন কি-না? একনিষ্ঠ না থাকলে কর্ম ধর্ম হয় না। একনিষ্ঠ হলেই উপলব্ধি আসবে। যে মুহূর্তে উপলব্ধি আসবে সে মুহূর্ত থেকে তা চেতনায় নাড়া দেবে। আস্তে আস্তে নিজের পথ নিজে তৈরী করতে থাকবে। যুগে যুগে যত ধর্ম এসেছে, যত তরিকা এসেছে তাকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। কারণ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলে গেলেন তাঁর ভাবশিষ্যকে ‘দুনিয়াতে মিথ্যা বলে কিছু নেই’। মিরপুর আস্তানা শরীফে তিনি এই বানী দিয়ে গেলেন আর বলে গেলেন যে, এটাই তোমার চলার পথ।

কয়েকদিন আগে কুষ্টিয়ায় সাঁইজির যে অনুষ্ঠান হয়ে গেলো সেখানে কে গাজা খাচ্ছে সেটা নিয়ে এক শ্রেণীর লোক ব্যস্ত হয়ে গেছে। সে তো তার পয়সায় খাচ্ছে। কিন্তু তুমি কি করছ? তুমি কেন তারটা দেখতে যাচ্ছো? তোমাকে কে অধিকার দিয়েছে যে তুমি তা দেখবে আর যা খুশি বলবে? তুমি কেন অন্যদিকে তাকাও? তুমি যখন অন্যদিকে তাকাও তখন এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তোমার উপলব্ধি হয়নি, তুমি নিজে তোমার শক্তিকে নষ্ট করে দিচ্ছ। তোমার চেতনা আসবে কোত্থেকে? তুমি যা বলছো তাতো বলছো তোমার পূর্বধারণা থেকে। পৃথিবীর বুকে যত ধর্ম আছে, সকল ধর্মে যতজন সাধক আসছেন তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটা ভাষা আছে। সে ভাষা উপলব্ধি করার জন্য যে সংযোগ স্থাপন করতে হয়, সে সংযোগ কতজন করতে পারে? যারা সংযোগ স্থাপন করবে, যারা সংযোগের পথে চলবে তারা সাধকের চাহনিতে, সাধকের শরীরের ভাষায়, সাধকের পোষাক থেকে বিশ্লেষণ করে সত্যকে আবিষ্কার করবে।

হাক্কানী হাজার- লাখের দরকার নাই। একজন হাক্কানী ই সারা বিশ্বকে কাপিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে তা বাহ্যিক ভাবে না। যারা সূরা কাহাফ পড়েছেন তারা সেটা উপলব্ধি করতে পারবেন। হাক্কানী এক ছাড়া কিছু বুঝেনা। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক, ৪০ হাজার ফুট উপর দিয়েই যাক, পানির মধ্য দিয়েই যাক, আর মাটিতেই হাঁটতে থাকুক তারা এক ছাড়া আর কিছু বুঝেনা। পৃথিবীতে যারা রাষ্ট্র শাসন করে তাদেরকে কে পরিচালিত করে? যারা সত্যের কান্ডারি আছেন পৃথিবীর বুকে, যার সংখ্যা এখনো তিন ডিজিটে আসে নাই, তারাই তাদের অবস্থান থেকে বিশ্ব নেতৃত্বকে দিক নির্দেশনা দেন। কিন্তু নেতৃত্ব তা ধরতে পারে না। হয়তো তারা সকলের সাথে আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু পরদিনই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। তার কাছে কিভাবে নির্দেশনা আসে? কেমনভাবে আসে? যারা আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাপনায় থাকেন তারা চিন্তার তরঙ্গ সৃষ্টি করে যখন যা প্রয়োজন তা করিয়ে নেন। সেটা মানুষের বিবেচনায় নির্মম হলেও কিছু যায় আসে না। বিশ্বকে একটা জায়গায় পৌঁছানোর জন্য তাঁরা তাদের কাজ করে যাচ্ছেন। সেখানে দুনিয়াদারিতে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে কিংবা কোন দল বা কোন গোষ্ঠির ক্ষতি হলে কিছু যায় আসে না। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কয়েকজন মানুষ যখন কোন একটি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে নিহত হয় তখন সারা দেশে হৈ চৈ হয় কিন্তু যখন লঞ্চডুবিতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় তখন কিন্তু এত হৈ-চৈ দেখা যায় না। এটাই হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতি কাউকে মিথ্যা বলার অধিকার দেয় না।

আমরা যখন স্বীকার করি নবী মোহাম্মদ(যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী তখন তাঁর সাথে কি আর কারো তুলনা করতে পারি? পারি না। কিন্তু এজিদ তা করেছে। ইব্রাহীম (আ:)এঁর বংশধরদের প্রতি যেরূপ শান্তি বর্ষণ করেছো, মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)এঁর বংশধরদের প্রতিও সেরূপ শান্তি বর্ষণ করো’- এটা এজিদের দোয়া। এজিদই প্রথম এই দোয়া পড়েছিল যখন ইমাম হোসেনকে হত্যার সংবাদ পেয়েছিল। যখন ইমাম হোসেনের খন্ডিত মস্তক এজিদের দরবারে আনা হয় তখনও সভাসদদের নিয়ে ভয় ভীতিতে এই দোয়া সে পাঠ করেছিল। অথচ এখন এই দোয়া পাঠের প্রচলন হয়ে গেছে। কোন সাধক এই দোয়া পাঠ করেন না। কারণ কোন সাধকই নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর সাথে অন্য কোন নবীর তুলনা করেন না।

কয়েকদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন যে নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা অমাদের উপর বর্ষিত) নিজেওতো শান্তি আনার জন্য যুদ্ধ করেছেন, মানুষ হত্যা করেছেন। হ্যাঁ,তিনি তা করেছেন। প্রয়োজনের তাগিদে দেশবাশীকে বাঁচানোর জন্যে, হাজার হাজার মানুষকে বাঁচানোর জন্য, একজন বা কয়েকজনকে হত্যা করা যদি প্রয়োজন হয়ে পড়ে তাহলে তাতে অধর্ম  হয় না। কিন্তু এটা প্রমান করে যেতে হবে যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে, দেশের সমৃদ্ধির জন্যে, এই দেশকে একটা লক্ষে পৌঁছানোর জন্য তা করা হয়েছে। আল্লাহ্ কে সন্তুষ্ট করতে হবে।

বাংলাদেশে কিছু ধর্মবেত্তা আছে তারা ভালো করেই জানে আল্লাহ্ র নাম নিয়ে যত কিছুই করি না কেন কিছুই হবে না। আল্লাহ্ ব্যস্ত আছেন তাঁর পাগলদের নিয়ে, তাই তাঁর নাম নিয়ে অন্যরা কে কি করছে তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। দুনিয়াদারিতেও তাই। সরকার প্রধানই জানেন কোথা দিয়ে কি ঘটছে। মাঠ কর্মী বা সাধারণ মানুষ তা জানতে, বুঝতে পারে না। যে বলবে যে উচ্চ পর্যায়ে যা ঘটছে তার সবই জানে সে, নিশ্চয়ই মিথ্যা বলছে।

হাক্কানী লাকুম দ্বীনুকুম নিয়ে চলে। তোমার ধর্ম তোমার কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে। হাক্কানীর মধ্যে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান বলতে কিছু নেই। যার মধ্যে সত্য আছে,সত্যকে যে ধারণ, লালন, পালন করেন তিনিই হাক্কানী। হাক্কানী সবার উর্ধ্বে মানুষকে মূল্য দেয়। তাই বলে সব মানুষকে না। হাক্কানী সেই মানুষকেই মূল্য দেয় যিনি এক সত্যকে ধারণ করেছেন। সব তরিকার সারমর্ম নিয়ে তৈরী হয়েছে হাক্কানী তরিকা। হাক্কানী ওজায়িফ এসেছে ১৯৯০ সনে। প্রতিটি হাক্কানী  দরবারে রবিবার ও বুহস্পতিবার হাক্কানী ওজায়িফ পাঠ ও চর্চা করা হয় । যারা হাক্কানী ওজায়িফের পথ ধরে যেতে চায় তারা এগিয়ে যাবে। কিন্তু শুধু এই পথেই তুমি তোমার লক্ষ অর্জন করবে তা না। এমন কোন পথ নেই যে পথ তাকে আল্লাহ্র কাছে পৌঁছে দেবে না। তুমি কোন পথ ভালোবাস? তুমি কি ভালোলাগার স্তরে আছো নাকি ভালোবাসার স্তরে আছো? তুমি তোমার ভালোবাসার স্তর থেকে নিজেকে প্রেমজগতের দিকে অগ্রসর করতে চাও কি না, তোমার লক্ষকে কেন্দ্র করে, যে লক্ষ তুমি নির্ধারণ করলে সেই লক্ষকে কেন্দ্র করে তুমি প্রেমজগতে যেতে পারবে কি না তার উপরই নির্ভর করবে তোমার সফলতা। মোনাফেকি ও র্শিক ত্যাগ করতে হবে। মোনাফেকি হচ্ছে অন্তরে এক বাহিরে আরেক, আর র্শিক হচ্ছে তুলনা করা। আমরা নিজেকে তুলনা করি অন্যের সাথে, ভুলেই যাই যে, আমরা প্রত্যেকে অনন্য মানুষ। ইসলামে নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করাকে হারাম করা হয়েছে। দুজন মানুষ কখনও এক হতে পারে না। (চলবে)

বাঙালির বাংলা

বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে – ‘বাঙালির বাংলা’ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে। সেদিন একা বাঙালিই ভারতকে স্বাধীন করতে পারবে। বাঙালির মতো জ্ঞান-শক্তি ও প্রেম-শক্তি (ব্রেন সেন্টার ও হার্ট-সেন্টার) এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীতে কোন জাতির নেই। কিন্তু কর্ম-শক্তি একেবারে নেই বলেই তাদের এই দিব্যশক্তি তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাদের কর্ম-বিমুখতা, জড়ত্ব, মৃত্যুভয়, আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিচ্ছার কারণ। তারা তামসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে চেতনা শক্তিকে হারিয়ে ফেলেছে। এই তম, এই তিমির, এই জড়ত্বই অবিদ্যা। অবিদ্যা কেবল অন্ধকার পথে ভ্রান্তির পথে নিয়ে যায়; দিব্যশক্তিকে নিস্তেজ, মৃতপ্রায় করে রাখে। যারা যত সাত্বিক ভাবাপন্ন, এই অবিদ্যা তাদেরই তত বাধা দেয় বিঘ্ন আনে। এই জড়তা মানবকে মৃত্যুর পথে নিয়ে যায়। কিছুতেই অমৃতের পানে আনন্দের পথে যেতে দেয় না। এই তমকে শাসন করতে পারে একমাত্র রজগুণ, অর্থাৎ ক্ষাত্র-শক্তি। এই ক্ষাত্রশক্তিকে না জাগালে মানুষের মাঝে যে বিশ্ব-বিজয়ী ব্রহ্মশক্তি আছে তা তাকে তমগুণের নরকে টেনে এনে প্রায় সংহার করে ফেলে। বাঙালি আজন্ম দিব্যশক্তিসম্পন্ন। তাদের ক্ষাত্রশক্তি জাগলো না বলে দিব্যশক্তি কোনো কাজে লাগলো না – বাঙালির চন্দ্রণাথের আগ্নেয়গিরি অগ্নি উদ্গিরণ করলো না। এই ক্ষাত্রশক্তিই দিব্য তেজ। প্রত্যেক মানুষেই ত্রিগুণান্বিত। সত্ব, রজ ও তম এই তিন গুণ। সত্বগুণ, ঐশীশক্তি অর্থাৎ সৎশক্তি সর্ব অসৎ শক্তিকে পরাজিত করে পূর্ণতার পথে নিয়ে যায়। এই সত্ব গুণের প্রধান শত্রু তম গুণকে প্রবল ক্ষাত্র শক্তি দমন করে। অর্থাৎ, আলস্য, কর্ম-বিমুখতা, পঙ্গুত্ব আসতে দেয় না। দেহ ও মনকে কর্মসুন্দর করে। জীবনশক্তিকে চির-জাগ্রত রাখে, যৌবনকে নিত্য তেজ-প্রদীপ্ত করে রাখে।  নৈরাশ্য, অবিশ্বাস, জরা ও ক্লৈব্যকে আসতে দেয় না। বাঙালির মস্তিষ্ক ও হৃদয় ব্রহ্মময় কিন্তু দেহ ও মন পাষাণময়। কাজেই এই বাংলার অন্তরে-বাহিরে যে ঐশ্বর্য পরম দাতা আমাদের দিয়েছেন, আমরা তাকে অবহেলা করে ঋণে, ব্যাধিতে, অভাবে, দৈন্যে, দুর্দশায় জড়িয়ে পড়েছি। বাংলার শিয়রে প্রহরীর মতো জেগে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গিরি হিমালয়। এই হিমালয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মুনি-ঋষি-যোগীরা সাধনা করছেন। এই হিমালয়কে তাঁরা সর্ব দৈব-শক্তির লীলা নিকেতন বলেছেন। এই হিমালয়ের গভীর হৃদ-গুহার অনন্ত স্নেহধারা বাংলার শত শত নদ-নদী রূপে আমাদের মাঠে-ঘাটে ঝরে পড়েছে। বাংলার সূর্য অতি তীব্র দহনে দাহন করে না। বাংলার চাঁদ নিত্য স্নিগ্ধ।

বাংলার আকাশ নিত্য প্রসন্ন, বাংলার বায়ুতে চিরবসন্ত ও শরতের নিত্য মাধুর্য ও শ্রী। বাংলার জল নিত্য প্রাচুর্যে ও শুদ্ধতায় পূর্ণ। বাংলার মাটি নিত্য-উর্বর। এই মাটিতে নিত্য সোনা ফলে। এত ধান আর কোনো দেশে ফলে না। পাট শুধু একা বাংলার। পৃথিবীর আর কোনো দেশে পাট উৎপন্ন হয় না। এত ফুল, এত পাখি, এত গান, এত সুর, এত কুঞ্জ, এত ছায়া, এত মায়া আর কোথাও নেই। এত আনন্দ, এত হুল্লোড়, আত্মীয়তাবোধ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এত ধর্মবোধ – আল্লাহ্, ভগবানের উপাসনা, উপবাস-উৎসব পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বাংলার কয়লা অপরিমাণ, তা কখনো ফুরাবে না। বাংলার সুবর্ণ-রেখার বালিতে, পানিতে স্বর্ণরেণু। বাংলার অভাব কোথায়? বাংলার মাঠে মাঠে ধেনু, ছাগ, মহিষ। নদীতে ঝিলে বিলে পুকুরে ডোবায় প্রয়োজনের অধিক মাছ। আমাদের মাতৃ-ভূমি পৃথিবীর স্বর্গ, নিত্য সর্বৈশ্বর্যময়ী। আমাদের অভাব কোথায়। অতি প্রাচুর্য আমাদের বিলাসী, ভোগী করে শেষে অলস, কর্ম-বিমুখ জাতিতে পরিণত করেছে। আমাদের মাছ, ধান, পাট, আমাদের ঐশ্বর্য শত বিদেশী লুটে নিয়ে যায়, আমরা তার প্রতিবাদ তো করি না, উল্টো তাদের দাসত্ব করি; এ লুন্ঠনে তাদের সাহায্য করি।

বাঙালি শুধু লাঠি দিয়েই দেড়শত বছর আগেও তার স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রাখতে চেষ্টা করেছে। আজো বাংলার ছেলেরা স্বাধীনতার জন্য যে আত্মদান করেছে, যে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, ইতিহাসে তা থাকবে স্বর্ণ-লিখায় লিখিত। বাংলা সর্ব ঐশীশক্তির পীঠস্থান। হেথায় লক্ষ লক্ষ যোগী-মুনি-ঋষি-তপস্বীর পীঠস্থান, সমাধি; সহস্র সহস্র ফকির-দরবেশ-ওলী-গাজীর দর্গা পরম পবিত্র। হেথায় গ্রামে হয় আজানের সাথে শঙ্খ ঘন্টার ধ্বনি। এখানে যে শাসনকর্তা হয়ে এসেছে সেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। বাংলার আবহাওয়ায় আছে স্বাধীনতা-মন্ত্রের সঞ্জীবনী শক্তি। আমাদের বাংলা নিত্য মহিমাময়ী, নিত্য সুন্দর, নিত্য পবিত্র।

আজ আমাদের আলস্যের, কর্ম-বিমুখতার, পৌরুষের অভাবেই আমরা হয়ে আছি সকলের চেয়ে দীন। যে বাঙালি সারা পৃথিবীর লোককে দিনের পর দিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে পারে তারাই আজ হচ্ছে সকলের দ্বারে ভিখারি। যারা ঘরের পাশে পাহাড়ের অজগর, বনের বাঘ নিয়ে বাস করে, তারা আজ নিরক্ষর বিদেশীর দাসত্ব করে। শুনে ভীষণ ক্রোধে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠে, সারা দেহমনে আসে প্রলয়ের কম্পন, সারা বক্ষ মন্থন করে আসে অশ্রুজল।

যাদের মাথায় নিত্য স্নিগ্ধ মেঘ ছায়া হয়ে সঞ্চারণ করে ফিরে, ঐশী আশীর্বাদ অজস্র বৃষ্টিধারায় ঝরে পড়ে, শ্যামায়মান অরণ্য যাকে দেয় স্নিগ্ধ -শান্তশ্রী, বজ্রের বিদ্যুৎ দেখে যারা নেচে উঠে, …হায় তারা এই অপমান এই দাসত্ব বিদেশী দস্যুদের এই উপদ্রব নির্যাতনকে কি করে সহ্য করে? ঐশী ঐশ্বর্য – যা আমাদের পথে ঘাটে মাঠে ছড়িয়ে পড়ে আছে তাকে বিসর্জন করে অর্জন করেছি এই দৈন্য, দারিদ্র্য, অভাব লাঞ্ছনা। বাঙালি সৈনিক হতে পারলো না। ক্ষাত্র শক্তিকে অবহেলা করলো বলে তার এই দুর্গতি তার অভিশপ্তের জীবন।

তার মাঠের ধান, পাট, রবি ফসল, তার সোনা তামা লোহা কয়লা – তার সর্ব ঐশ্বর্য বিদেশী দস্যু বাটপাড়ি করে ডাকাতি করে নিয়ে যায়, সে বসে বসে দেখে। বলতে পারে না ‘এ আমাদের ভগবানের দান, এ আমাদের মাতৃ-ঐশ্বর্য! খবরদার, যে রাক্ষস একে গ্রাস করতে আসবে, যে দস্যু এ ঐশ্বর্য স্পর্শ করবে – তাকে ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’ দিয়ে বিনাশ করবো, সংহার করবো।’

বাঙালিকে, বাঙালির ছেলে-মেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও ঃ

‘এই পবিত্র বাংলাদেশ

বাঙালির – আমাদের।

দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’

তাড়াব আমরা, করি না ভয়

যত পরদেশী দস্যু ডাকাত

‘রামা’দের ‘গামা’দের।’

বাঙলা বাঙালির হোক! বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক।

দয়ালের উপদেশ – ২১

বাবা জোহর আলী শাহানশাহ, বাংলার এক মহান সত্যমানুষ। ভক্তদের প্রতি তাঁর উপদেশাবলী সংকলিত করেছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাশ। সূফীতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচনে তথা সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের জন্য এ সকল উপদেশমূলক বাণীতে রয়েছে সঠিক পথের দিশা। ধারাবাহিকভাবে ‘দয়ালের উপদেশ’ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

উপদেশ-৭০: মূল জিনিস হলো প্রেমময়ের প্রতি – দয়ালের প্রতি প্রাণের টান। প্রাণের টান হলে আর কি? অমুকে বিশ বছর ব্রহ্মচর্য পালন করে, সেদিন বিয়ে করেছে। সংসারী হয়েছে, তোরা খুব হৈ চৈ আরম্ভ করেছিস। আমি বলি, যদি দয়ালের প্রতি তার প্রাণের টান থাকে, তবে একটা কেন,বিশটা বিয়ে করলেই তাঁর কি ক্ষতি হবে? আর যদি দয়ালের প্রতি প্রাণের টান না থাকে, তবে বিয়ে না করে,সংসারী না হলেই লাভ কি? বরং ভীষণ ক্ষতি। খোজারাও তো বিয়ে করে না, স্ত্রী-সঙ্গ করে না। দামড়া গরু, খাসি প্রভৃতিও তো কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে পারে না, -সংসারী হয় না, তা বলে কি ওগুলো মুক্ত হয়ে গেল,-মহাপুরুষ হয়ে গেল?

তবে একটা কথা হয়েছে কি জানিস? সাধকদের প্রথম অবস্থা হতেই মনের কু-প্রবৃত্তিগুলোর সাথে যুদ্ধ করতে হয়, জয়ী হলেই সে মুক্ত। কু-প্রবৃত্তিগুলোকে প্রশ্রয় দিলেই বিপদ, একেবারে ধ্বংস করে দেবে। দয়ালের প্রতি যদি প্রাণের টান হয়, ভালোবাসা হয়, তবে কু-প্রবৃত্তিগুলো দমন করা সহজ হয়।

দয়ালের প্রতি যতই প্রাণের টান ও ভালোবাসা গভীর হতে থাকে, ততই মন খালি দয়ালের চিন্তায় রত থাকতে চায়, -দূরে যেতে চায় না। তখন সংসার-ফংসার, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের কথা মনেও হতে চায় না, বরং ঐগুলো বিরক্তিকর মনে হয়।

মুখে মুখে শুধু ‘দয়ালের প্রতি প্রাণের টান আছে, ভালোবাসা আছে’ বললেই চলবে না। কাজের দ্বারাই বুঝা যায়, দয়ালের প্রতি কার কতটুকু প্রাণের টান আছে।

দয়ালের প্রতি গভীর প্রাণের টানে যে অবস্থায় লোকে অন্য সবকিছু হতে আস্তে আস্তে দূরে সরে দাঁড়ায়, সেই অবস্থায়, তুই যদি দূরে সরে দাঁড়ানো দূরে থাক, বাজে জিনিসে আগ্রহ করিস, তবে কি তোর প্রাণের টান দয়ালের প্রতি গভীর বলতে হবে?

উপদেশ-৭১: সাধু বা ফকির নামধারী লোক শ’হিসাবে পাবি। অনেকে লোকের রোগ ভালো করে, মামলা জিতিয়ে টাকা আদায়ের ফিকিরে আছে। কয়েকজন বাস্তবিকই দয়ালের ভাবে আছে, তাঁকে অনুভব করবার, প্রত্যক্ষ করবার চেষ্টা করছে। এমন হাজার চেষ্টা করা লোকের মধ্যে একজনেরও দয়ালের ভাবে সমাধি হয় কিনা সন্দেহ। নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে দয়ালের সাথে ভাবে মিশে থাকাই সমাধি। সমাধিতে পাঁচ, সাত, দশ ঘন্টাও থাকে। সমাধি হতে নেমে আসলেও সর্বদা স্মরণ মনন করে। তাদের সংসারের সব কিছুতেই কেমন একটা উদাসীনতা। দয়ালের প্রেমিক ফুলের আঘাতে ব্যথা পায়, আবার বজ্রের আঘাতে ভ্রুক্ষেপ নেই।

প্রকৃত দয়াল প্রেমিকের অভাব বলে কোন কথাই নেই। রাজার চাকরি যে করে, দেশে শত অভাব পড়লেও তার কোন চিন্তা নেই। দয়াল পূর্ণ, তাঁর চিন্তা করে, তাঁর সেবা করে, কেউ অভাবে পড়তে পারে না। অন্তর দিয়ে প্রাণ ঢেলে দয়ালের সেবা করতে হয়, তাঁর ভাবে মশগুল হয়ে থাকতে হয়, নতুবা লোক দেখানো কাজে ফল ধরে না।

উপদেশ-৭২: একজন বড়লোকের সাথে যদি আত্মীয়তা করতে পারিস, দেখবি অনেক বড়লোকই তোর আত্মীয় হয়ে গেছে। কোন একজন জীবন্মুক্ত মহাপুরুষের চরণে যদি আশ্রয় নিতে পারিস, তবে বহু মহাপুরুষেরই আশীর্বাদ পাবি, স্নেহ-আদর পাবি।

ওরে, জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ যথায় তথায় মিলে না। একটা দেশে একটা রাজাই থাকে, অনেক রাজা থাকে না। আচার-ব্যবহারে, ভাবে মহাপুরুষ চেনা যায়। দেখ, দয়ালের ভাবে যিনি সমাধিস্থ হন, তিনি প্রকৃত মহাপুরুষ বলে জানবি।

অনেক সাধন-ভজন না করলে, দয়ালের প্রতি গভীর ভালোবাসা না হলে, দৃঢ় অভ্যাস না হলে সমাধি হতে পারে না।

অনেক লোকের নানা রকম অলৌকিক শক্তি থাকতে পারে, রোগ ভালো করতে পারে, মামলা জিতাতে পারে, এমন কি মরা জীবিত করতে পারে, তা হলেও এসব লোক জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ নাও হতে পারে। অনেক লোক তান্ত্রিক মতে নানা রকম কাজ করে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন হয়।

দেখ, প্রকৃত দয়ালভক্ত মহাপুরুষেরা অলৌকিক শক্তি দেখাতে চান না। দু’একটা কোন কারণে প্রকাশ হলে বিব্রত হয়ে পড়েন। এগুলোকে তারা বিষ্ঠার মতো মনে করেন। বিষ্ঠা নিয়ে নাড়াচাড়া করা পছন্দ করেন না, দয়ালের ভাবে মশগুল হয়ে থাকতে চান। দয়ালের ভাবে মশগুল যে হতে পারে তার জীবনই সার্থক। দয়ারের ভাবে সমাধিযুক্ত লোককে প্রকৃত মহাপুরুষ বলে জানবি, এতে কোন ফাঁকি থাকতে পারে না।  গরিব লোকে যদি দু’শ টাকা পায়, তবে মাথা গরম হবার যো হয়। অহংকারে পা কোথায় ফেলবে ঠিক পায় না। আর রাজার বেটা যদি দু’চার কোটি টাকা পায় তবুও ‘হলুম কী’ মনে করে না। ছোট আধারগুলোই একট সাধন-ভজন করে যদি একটু শক্তি পায়, তবেই লাফালাফি আরম্ভ করে। (চলবে)