All posts by bartaman

মুজিববর্ষের ক্ষণ গণনা শুরু ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হতে

অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ এ, দেশে ফিরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়কে ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন- ‘আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে’। কৃতজ্ঞতা চিত্তে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলার মায়েদের-সন্তানদের কথা স্মরণ করেন। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-বুদ্ধিজীবীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বাঙালির অনগ্রসরতা অস্পৃশ্যতা সম্বন্ধে বঙ্গমাতা কবিতায় লেখা বিশ্বকবির আক্ষেপের জবাব দিতে গিয়ে বলেন-‘কবিগুরু আপনি বলেছিলেন-সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙ্গালি করে মানুষ কর নি’। আপনার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা আজ মানুষ হয়েছে। এত আত্মত্যাগ দুনিয়ার কোথাও হয়নি। কেউ আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারেনি।

দীর্ঘ বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের নানা দিক তুলে ধরেন। রাষ্ট্রের চরিত্র, নীতি কাঠামোর বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। জাতির জনকের সেই সেই ভাষণটি আমরা চাইলেই দেখে নিতে পারি।

‘১৯৭২ থেকে ২০২০’ এই দীর্ঘ সময়ে জাতির জনকের বাংলাদেশ কোন পথে অগ্রসর হয়ে কোথায় অবস্থান করছে সেটিই এখন দেখার বিষয়। খোদ বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের শ্রমে-ঘামে গড়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কিংবা ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলো সেই সত্য কতটা অনুধাবন করেছে?

আজকে চুলচেরা বিশ্লেষণের সময় এসেছে। শুধু বিশ্লেষণ নয়, সময় এখন সত্য বলার এবং সত্য প্রতিষ্ঠার।

দেশের ভিতরে অন্য কোন দেশ থাকতে পারে না। বাঙালি সংস্কৃতির রঙ অন্য কোন রঙে ফিকে হতে পারে না। আমরা অন্যের মতো হতে পারবো না, নিজেদের ধরে রেখে অন্য সব সুন্দরের পুজারী হতে পারি কেবল। আমাদের ভূগোল-সংস্কৃতি-প্রকৃতি কারো চাওয়াতে পাল্টানো যাবে না। এ দেশের প্রতিটি মানুষের রক্তধারায়-যাপিত জীবনের উৎসধারায় বয়ে চলেছে এক শ্বাশত চিরন্তন সত্য ধারা, সেখানে মিশতে হবে, কান পেতে শুনতে হবে সুন্দরের সেই জয়গান। যতটুকু নবায়ন হবে সেই উৎস ধরে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-‘বাঙালির পল্লীর জনজীবনের গভীরে রয়েছে উৎস। সেই উৎস ধরেই নির্মিত হবে আমাদের সব আয়োজন’।

১৯৭১ আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছে। এই স্বাধীনতা অর্থবহ করার সংগ্রামই তো অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। ’৭১ ছিল মুক্তি সংগ্রামের একটি ধাপমাত্র।

মুক্তি সংগ্রাম কখনো থামেনা। অজ্ঞতা থেকে উৎসরিত হয় যে অন্ধকার, সে অন্ধকারের মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া- পলায়নপরতা  থেকে মুক্তির যে সক্ষমতা তাই তো মুক্তির সংগ্রাম।

যে পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেই পথ কতটা কঠিন, কত ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় কোথায় বাধা সেটি নির্নয় করে এগিয়ে চলার নামই তো দূরদর্শীতা। এ বছরের ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে মুজিববর্ষ ক্ষণ গণনা। গৃহীত হয়েছে নানা আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। দলীয় কর্মসূচীর বাইরে সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সারা বছরব্যাপী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। সেসব কর্মসূচীর হয়তো যৌক্তিকতা রয়েছে তবু অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ণের জায়গাটি দেখার সময় এসেছে। বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে যারা এখন মুজিববর্ষ উদযাপন নিয়ে তৎপর সেসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, কাজের মান, তাদের প্রতি জনগণের ধারণা মুজিববর্ষ পালনের সত্য তুলে ধরতে পারে। আমলাতান্ত্রিকতার নামে জনগণের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার সকল রুট বন্ধ করার কাজটি যদি না হয়, তবে মুজিববর্ষ উদযাপনে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেসব কাজ কোন উপকারে আসবে? সেবার নামে, শিক্ষার নামে, শিক্ষক চিকিৎসকেরা যদি নিজেরাই নিজেদের কর্ম মূল্যায়ণ করতে না শেখেন তবে তারা কোন মুজিববর্ষ পালন করবে? এসব লোক দেখানো কাজ আমাদের এগিয়ে চলার পথে অন্তরায় হতে বাধ্য। 

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা শুরু হলো’।

ইতিহাস সচেতন নির্মোহ দেশপ্রেমিকেরাই কেবল অন্ধকারের দিকটি জানেন। জানেন কোন পথে বাঙালির বিজয় সম্ভব হয়েছে। জানেন পথের বাঁকে বাঁকে কোন সত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু যারা বহু পড়াশুনা করেও সত্য উপলব্ধির পর্যায়ে আসতে পারেন নি তারা অন্ধকারের আরেকটি দরজা উন্মোচন করেছেন মাত্র। এরা বর্ণচোরা চরিত্রহীন ঘাতক হয়ে বাধার সৃষ্টি করছেন। আত্মকর্ম বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দেখতে হবে নিজেদের আমলনামা। আলো এবং অন্ধকার তো পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলে। আজকে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশের আলো বাতাস মাটিতে বসে নিজেদের কথা বলতে পারছি, নিজেদের স্বপ্ন-সম্ভাবনার জয়গাঁথা নিয়ে আত্মতুষ্ট হচ্ছি, নিজেদের অধিকার দাবী দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হচ্ছি এসবই অন্ধকার থেকে আলোর নবতর পথে যাত্রা। বিপরীতে অপরাধ মেনে নেয়ার প্রবণতার নামও অন্ধকার। আপোষ কিংবা মেনে নেয়া কখনো কখনো বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে পড়ে।

আমরা কি দেশ বিরোধী মানবতা বিরোধী সমস্ত অকল্যাণকর প্রচেষ্টা কে রুখে দিতে পেরেছি? অলীক কল্পকাহিনী নির্ভর খোরমা খেঁজুরের গল্পের বিপরীতে নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এঁর জীবনাদর্শ তুলে ধরতে পারছি? নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এর শিক্ষা দর্শনকে  বিকৃত করার প্রচেষ্টার বিপরীতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার নামই তো আলোর পথে অগ্রসর হওয়া। যদি না পারি তাহলে কি অন্ধকার থেকে আলোর পথের এই যাত্রা, কোথায় কোন অবস্থান কোন ফাটকে আটকা পড়েছে তা খুঁজে বের করার নামই আলো। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর বর্ষিত) এঁর  মহান জীবনের  গভীরতাকে বাস্তবতার নিরিখে অনুধাবন না করে কল্পকাহিনী নির্ভর ওয়াজ নসিহত আমাদেরকে অন্ধকারের গভীর তিমির নিয়ে যাবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমরা এদিকটা উপেক্ষা করেই এগিয়ে যেতে চাচ্ছি, যা সম্ভব নয়। এখানে কাজ করতে হবে।

অন্ধকার থেকে আলোর পথের এই যাত্রা সব সময় চলমান। জানি এই পথটি কঠিন, মুখের কথা নয়। কিন্তু যারা মুজিব আদর্শকে ধারণ-লালন-পালনের কথা বলেন তারা যদি নিজেরাই হন্তারক হয়ে উঠেন তবে এই সীমাহীন নির্লজ্জতার জবাব আমরা কোথায় খুঁজবো?

শুধু দলীয় কর্মী নন, শুভাকাঙ্খি হয়ে আসা শিক্ষক বুদ্ধিজীবিদের একটি শ্রেণীও আজ ধান্দাবাজ হয়ে উঠেছে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই ক্ষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- এই দেশ সবার। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রীষ্টানের রক্তে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। তিনি তার ভাষণের শুরুতে ছাত্র-মজুর-কৃষক-শ্রমিকের কথা বলেছেন। আজকে স্বাধীনতার এই ৪৯ বছরে আমাদের কৃষকরা কেমন আছেন, কেমন আছে শ্রমিক মজুর খেটে খাওয়া মানুষেরা? উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় কি তারাও সমান তালে যুক্ত হতে পারছেন? তথ্য পরিসংসখ্যান বলছে আরো অযৌক্তিক দূরত্ব তৈরী হয়েছে। শিক্ষার নামে দেশে কোন কোন শিক্ষা পদ্ধতি জারি রয়েছে, তা চুলচেরা বিশ্লেষণের দাবী রাখে। স্বাধীন দেশে শিক্ষার নামে জাতি-মানবতা বিরোধী পশ্চাৎপদ শিক্ষার ধারা আজও অব্যাহত। যারা যুক্তি মানে না, সৌন্দর্য মানে না, আইন-কানুন সংবিধান মানে না, তারা আখেরে কোন সেবা নিশ্চিত করবে? না কি বিভেদ-বিভাজনের দেয়াল শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ কোন বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে আমাদেরকে, এমন প্রশ্ন তুলতেই হবে।

আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে পারিনি। এটা তো সত্যি যে হাজার হাজার মানুষ কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সহিংসতার স্বীকার হয়েছে। কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রামু নাসিরগর ভোলার মানুষ চরম সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে। ’৭২ এর সংবধিানের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসেবে বাজারজাত করতে সফল হয়েছে। চতুর এসব বর্ণচোরা ঘাতকেরা ধর্মভীরু মুসলমানদেরকে প্রগতি বিরোধীতার কাতারে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। এসব তৎপরতার বিপরীতে কি কোন বাস্তব সম্মত কার্যক্রম আদৌ গ্রহণ করা হয়েছে?

ইসলামিক ফাউন্ডেশন তো সময়ের পথপরিক্রমায় নামেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন হয়ে আছে। তাদের কার্যক্রম পবিত্র ইসলাম ধর্মের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য তুলে ধরতে ব্যর্থ। লুটেরাদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি, সামাজিক দুর্বৃৃত্তায়নের স্বীকার হয়েছে আমাদের সাধারণ মানুষ, আমরা কি সেই অন্ধকারের দিকটি অন্বেষণ করতে পেরেছি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়- চরিত্রহীনদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে কখন যে নিজেরাই চরিত্রহীন হয়ে গেছে তা আমরা নিজেরাই জানি না। সত্য বড় নির্মম। ৭৫’ এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা যাদের জন্য অনিবার্য ছিল, আর যারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, উভয়েই এই দেশের বাসিন্দা। আমরা কি আজও ’৭৫ এর ১৫ আগষ্টের কারণ যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি। খুঁজে বের করতে পেরেছি কেন বাঙালির উত্থানকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় বারবার। আমরা কি আজও উপলব্ধি করতে পারি কেন শেখ হাসিনাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়? আমরা উপলব্ধি করতে পারিনা বলেই নিজেদেরকে বিণির্মান করতে পারি না। বিদেশের মাটিতে এক পা আর দেশের মাটিতে আরেক পা রেখে কখনো দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। অনুসন্ধান বলছে বহু তথকাথিত দেশপ্রেমিক! স্বাধীনতার পক্ষের লোকেরা বিদেশের মাটিতে আরেকটি ঠিকানা গেড়েছেন, লুটপাট করে টাকা পাচার করেছেন। এসবই সীমাহীন অজ্ঞতার গহবরে জন্ম নেয়া অন্ধকার। যখন দেশরতœ শেখ হাসিনা বারবার সততার কথা বলেন, মোটা কাপড় মোটা চালের কথা বলেন তখনো আমরা তার এই কথার অর্থ বুঝিনা। তারই দলীয় নেতা কর্মীরা যখন তার এই নির্দেশনাকে থোড়ায় কেয়ার করে যা খুশি তা করেন তখন কোন অন্ধকারের মধ্যে পড়ে থাকে দেশ ও জাতি?

সততা মুখের কথা নয়। আচরণে আমলনামায় তা ধরা পড়ে। এখনো বহু নেতা কর্মী ভিতরে ভিতরে লুটেরা দস্যূ সংস্কৃতি ধারন করে আছে। সেই অন্ধকার থেকেই মুক্ত হতে হবে সবার আগে। দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সব সময় দেশের পক্ষে এই সরল সত্য উপলব্ধি করতে না পারলে কোন উন্নয়ন টেকসই হবে না।

সময়ের সাফ কথা….স্ব-স্ব কর্তব্য পালনে আন্তরিক হই নতুন বছরে….

সংলাপ ॥ ২০১৯ কে বিদায় জানিয়ে আরও একটি নতুন বছরে পা দিল বিশ্ব। ভালো-মন্দে কেটেছে আগের বছরটি। নতুন বছরে আমরা কেবল ভালোই চাইব। চাইব সারা বিশ্ব শান্তিতে থাকুক। বিশ্ববাসীর কল্যাণ হোক। বিগত বছরের যাবতীয় গ্লানি আর অপূর্ণতার পুনরাবৃত্তি চাই না। চাই কলুষমুক্ত বিশ্ব, পৃথিবীর আকাশ হোক যাবতীয় অকল্যাণের মেঘমুক্ত। ২০১৯-তে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা আর যুদ্ধের দামামা কোটি কোটি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল, শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে চকচকে মোড়কে পাল্টা অশান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টাও দেখতে হয়েছে বিশ্ববাসীকে। মুখে যত বড় বড় কথাই বলা হোক না কেন, ক্ষমতার দাপাদাপি আর রাজনৈতিক মিথ্যাচার যে শেষমেশ সাধারণ মানুষের উপরই কঠিন আঘাত হানে, বিগত বছরে তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়েছে অসংখ্য নিরীহ প্রাণ। সামান্য সুখ আর স্বস্থির বেশি চাহিদা যাদের নেই, যারা কেবল কামনা করেন ‘আমার সন্তান থাক দুধে-ভাতে,’ তারাও নানান ক্ষমতাধরের দাবার চালে অসীম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। এমন আর চায় না দেশবাসী ২০২০-তে।

১৬ কোটি বাঙালির কাছে ২০১৯ সালও অপ্রত্যাশিত এক সংকট নিয়ে হাজির হয়েছিল। সাধারণ মানুষের জীবনে অচিরে এক মহাশক্তিধর আশা জাগিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বাংলার আকাশে প্রধানমন্ত্রীর দেখানো সেই স্বপ্নের ধূমকেতুর দর্শন বাংলার সাধারণ মানুষের নজরে আসেনি। নতুন বছরে ওই দুর্ভোগের অবসান ঘটে বাঙালির জীবনে নতুন দিনের আলো দেখা দেবে, এমন প্রত্যাশায় বুক বাঁধতে চান লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ।

একদা সারা ভারতবর্ষে তথা এশিয়ায় বাংলার স্থান ছিল একেবারে সামনের সারিতে। তারপর অনেককাল কেটে গিয়েছে। নানা কারণে এদেশ মাঝের একটি পর্বে পিছিয়ে পড়েছিল অনেকটাই। পরে সেই পশ্চাদগামিতাকে রুখে দিয়ে ফের প্রগতির পথের পথিক হতে পেরেছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে, শিক্ষাবিস্তারে, বিজ্ঞানসাধনায়, অর্থনৈতিক প্রগতিতে এখনই বিশ্বের বহু দেশকে পিছনে ফেলেছে এই বাংলাদেশ। তবু এতে আমরা আত্মসন্তুষ্টিতে আপ্লুত হতে রাজি নই। আমরা এখনও স্বপ্ন দেখি বাংলা আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লভে। ধর্মে মহান হবে, কর্মে মহান হবে। নতুন বছর বাঙালির এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত হওয়ার দিকে আরও বেশ কয়েক কদম এগিয়ে দিক, যাবতীয় অপূর্ণতা, বিভ্রান্তি আর ব্যর্থতাকে সহ¯্র যোজন দূরে হঠিয়ে দিয়ে এই বাংলায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক আমাদের মাঝে মহামিলনের দীপশিখা। সেই শিখার আলো মশালের রূপ নিয়ে দূর করে দিক যাবতীয় ভেদাভেদ, অসাম্য, অবিচার আর জীবন-যাপনে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। এই প্রত্যাশা পূরণে প্রতিটি বাঙালিকেই সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করার সময় এসেছে। স্ব-স্ব কর্তব্য পালনে আন্তরিক সক্রিয়তা, সহ-নাগরিকের প্রতি সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কঠোর মানসিক শক্তির প্রয়োগই আমাদের স্বপ্ন পূরণের পাথেয় হতে হবে। শুভ হোক নতুন বছর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

নিজেদের চরিত্র না বদলালে দেশ ও জাতির চরিত্র বদলায় না

সংলাপ ॥ বিশ্ববাজার এবং বিশ্বমহাজনদের নিয়ন্ত্রিত উপমহাদেশে আর্থ-সামরিক নীতির স্বীকৃতি পেয়েছিলো বাংলাদেশ। দুর্নীতি দমনের নামে যে সন্ত্রাস এবং লুটপাট চালিয়েছিলো তদারকি সুশীলরা এবং তার আগের পাঁচ বছর তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা, তা দেখে পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা আরম্ভ করেছিল। ইতিহাস বলছে, আমলা-সুশীল-সামরিক শাসনের থেকে যে-কোনও নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের শাসন ব্যবস্থা অনেক ভাল। পঁচতে পঁচতে তারা এক জায়গাতে থামতে বাধ্য হয় বলেই একসময় তারা বদলায়। সীমাহীন মিথ্যাচার, ভন্ডামী, বেঈমানী, অকৃতজ্ঞতা থেকে তারা সহজে নিজেদের বদলায় না। কিন্তু জনতার চাপ পড়লে এবং তাদের ওপর আঘাত আসলে বদলায় অতি দ্রুত।

জমির চরিত্র বদল চাইলে, কৃষকের কৃষি-উত্তর বদল হয় না, মানুষের সংস্কার বদলাতে চাইলে, নিজের চারিত্রিক বদলও হয় না। এগুলোর বদল করতে গেলে বদলাতে হবে নিজেকে, ত্যাগ করতে হবে অনবরত মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভ্যাস। নিজের মিথ্যা বলার অভ্যাস, বলতে বলতে একজন মাদক-আসক্তের মতো মিথ্যাবাদী হয়ে যায়। মসজিদের অনেক ইমামদের মতো কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হাদিসের নামে মিথ্যা বলা শুরু করে।

রাজনৈতিক ইসলামের নামে একসময় মসজিদের ইমাম মসজিদের নামাজীদের ডাকলেন মুসলমানদের উদ্ধার করার নিমিত্তে জেহাদ করার জন্য। মিথ্যার মজা হচ্ছে দুধ দোয়ার মতো, মনে হয় বালতি ভরে গেছে, রেখে দিলে একটু পরে দেখা যাবে ২০০ গ্রাম! অল্প সময়ে ধর্মের কথা বলে প্রচুর লোক জমায়েত হয়, সব মানুষকে তো আর চিরকাল বোকা বানানো যায় না। বুঝতে পেরে তারা সরে পড়ে, মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্তরে সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে, ¯্রফে গোষ্ঠী লাভের জন্য ধর্মের আবেগে সুড়সুড়ি দেয়। কৌশল ফাঁস হয়ে যায়। মানুষ দ্বিগুণ ঘৃণা করে। নিজের ধর্মের অনুশীলন করে ধ্বংস হওয়া শ্রেয়! ত্যাগ করতে হয় মাথা-মুখ-হাতের স্ববিরোধিতা। মুখে বলব কৃষক-কৃষক, মাথায় থাকবে জমির বা সম্পত্তির চিন্তা, কাজে করব আধিপত্যবাদীদের পুঁজির সেবা-আজকের মানুষ তা বুঝতে পারে। ত্যাগ করতে হয় নামের আকাঙ্খা, ধ্বংস করতে হয় ‘আমিত্বের আবরণ’। কেউ যখন সত্যি সত্যি বদলের কাজে হাত লাগান, তার আকাঙ্খাগুলো ধ্বংস হয়। তিনি নিজেও বদলে যান। যখন দেখা যায় তিনি বদলাচ্ছেন না, অথচ বদলের কথা বলছেন, মানে তিনি নিজের বদল চাইছেন না।

মানুষ কেন চোরের জায়গায় ডাকাত এনে বদলানোর পথে যাবেন? সুখের থেকে স্বস্থি ভালো। বাংলায় স্বৈরশাসকেরা ভেবেছিল মিথ্যা, হুমকি আর মস্তানি করে বাংলাকে শাসন করে  যাবে। করেও ছিল, শারীরিক মানসিকভাবে মানুষকে সন্ত্রস্ত করেছিল। অনবরত ভয় দেখিয়ে মানুষকে বাধ্য করা হয়েছিল অনুসরণ করতে। শান্তিপ্রিয় মানুষ গুন্ডামি আর ভন্ডামির অভ্যুত্থানের মুখে নিরাপত্তা-বিধানকারী রাষ্ট্রকে যখন দেখল, গুন্ডামি আর ভন্ডামির সামনে অসহায় মানুষ ঘরে ঢুকে গেল। মস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করে বাঁচতে চাইল। যা ঘটেছিল ২০০১ এর নির্বাচনে। নিস্ক্রিয় প্রতিরোধ মানুষকে লুটেরাদের হাতে ঠেলে দেয়। কিন্তু কতদিন? দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ খালি হাতেই তাদেরকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দেয়। ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তান্ডবের ফল হলো অনেক মিথ্যার সঙ্গে কিছু সত্যও মানুষ বর্জন করলেন। যেমন প্রাক্তন শাসকদের দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র সেগুলোও মানুষ মনে রাখলেন না। না-রাখাটাই স্বাভাবিক। আগের সরকাররা যে এসব ক্ষেত্রে সমস্ত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। বিশ্বব্যাংক এবং আমেরিকাও সুযোগ নিয়েছিল। সত্যিকারের দুর্নীতিগ্রস্তরা জাল কেটে বেরিয়ে গেলো। সন্ত্রাস দমনের নামে রাজনীতিক ও সত্যভাষী মানুষের ওপর নামিয়ে আনা হয়েছিল অবর্ণনীয় অত্যাচার। নির্বাচনী বিধি তৈরির নামে বাধ্য করা হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে। কিন্তু সব পাল্টে দিলেন বাংলাদেশের জনগণ। আড়ালে চলে গেলো রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তি, দুর্নীতি আর গ্রামবাংলার হা-অন্ন, হা-অন্ন চিৎকার। একমুঠো আটার জন্য সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রামবাংলার মানুষ মরেছে। জড়ো হচ্ছিল এবং সুযোগ নিচ্ছিল নানা অনভিপ্রেত শক্তি। বড় গলা করে সস্তায় বাজিমাত করতে চেয়েছিল ধর্মের নামে রাজনৈতিক ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীরা। লোকের হাতে পয়সাও নেই। ১৬ কোটির দেশে শুধু হাহাকার। ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে বন্ধ হয়ে গেল আমদানি-চাল, ডাল, গম, বিদ্যুৎ আর গ্যাস নিয়ে চুক্তির নামে একতরফা হুমড়ি খেয়ে পড়ল, হাহাকার রূপান্তরিত হলো ক্ষোভে। প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার জন্য মানুষ অন্যপথে ভাবতে শুরু করেন। ভাবনাটা বার করে দিতে না পারলে পুরো মাথাটাই যে নষ্ট হয়ে যেতো। তদারকি সরকার তদারকির অবসান ঘটিয়ে মানুষের উত্তেজনা প্রশমনের জন্য নির্বাচনী ঘোষণা করতে বাধ্য হলো নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্য। যেহেতু তারা যে মই দিয়ে গাছে উঠেছিলেন সেই মই তাদের অজান্তে কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

তাদের স্বস্থি নির্বাচিত সরকার তাদের বিচার আজো করেনি। সুতরাং বদলান বললেই বদল হয় না। ‘বদলানো’ একটা প্রক্রিয়া, যার মধ্যে নিজেকে বদলিয়ে নিয়ে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হয়। প্রক্রিয়া মানেই ‘গতি’, ভাঙা রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি নয়।

এক অস্ত্র বার বার ব্যবহার করলে ভোঁতা হয়ে যায়। গতিতে থাকলে পরিবর্তন আসে, এই পরিবর্তনে থেমে থাকলে দেশ ও জাতি পিছিয়ে পড়ে হাবুডুবু খেতে বাধ্য। আর রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকরা ‘ভাঁড়ে’ পরিণত হয়ে জনগণের কাছে হাস্যকর হয়ে ওঠে।

পরিবর্তন আনে বিকাশ। প্রতিটি স্তরে বিকাশ-সচেতন থেকে নিজেকে পাল্টে নিতে হয়। একজনের মুখ থেকে ‘বদলে দেয়ার’ আহ্বান তখনই মানুষ গুরুত্ব দেন, যখন দেখেন আহ্বায়ক নিজে বদলানোর প্রক্রিয়াতে নিজেকে বদলেছেন। বদলেছেন নিজের স্বভাব, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, জীবন-জীবিকার সংগ্রামে। না-হলে ব্যাপারটা হয়ে যাবে যাত্রাদলের অভিনয়ের মতো।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চারণভূমিতে আতঙ্ক!

সংলাপ ॥ সুদূর অতীত কাল থেকেই আমাদের বাংলাদেশ বা বঙ্গদেশে বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠী শাসন করে গিয়েছে। স্থানীয় জনগণ নিজেরাই সেই শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে নিয়েছিলেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। একই সঙ্গে শাসকও তার অধীন জনগোষ্ঠীকে নিজের আপন ভেবেই কাজ করে গিয়েছে। সুদীর্ঘ কাল এই ভাবেই চলেছে। বৌদ্ধ আমলেও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিহার তৈরি হয়েছে। শিক্ষাদান হয়েছে। প্রাচীন বঙ্গদেশ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের ঠিক আগে পর্যন্ত যে সব শাসকেরা এই দেশ শাসন করে গিয়েছেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন সচেতন ভাবেই। চৈতন্যের বাংলায় সেই সম্প্রীতি এখনও লোকমুখে খুঁজে পাওয়া যায়। বৈষ্ণব সাহিত্যেও সেই ছবি লক্ষ্য করা যায়।

যদিও হিন্দু বাঙালির মধ্যে কৌলিন্য প্রথার সংস্কার করেন বল্লাল সেন। তবুও বাংলায় ইসলামি শাসন প্রবর্তনের সময়ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঘাটতি ছিল না। বাংলার ইসলামি শাসনের স্বর্ণযুগ ছিল হুসেন শাহের আমল। সেই আমলে বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ছিল চোখে পড়ার মতো।চৈতন্য এবং তাঁর অনুগামীদেরকে ভক্তিপ্রচারে হুসেন শাহ সহায়তা করেন। তাঁর প্রশাসনে উচ্চ পর্যায়ের হিন্দু কর্মকর্তা ছিলেন রূপ গোস্বামী আর সনাতন গোস্বামী।

কিন্তু ব্রিটিশ শাসন আমলে ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি ধীরে ধীরে বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বিষবাষ্পের সৃষ্টি করে। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর যে পরিমাণ উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি হয়, তাতে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত অঞ্চলেই উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ সর্বত্র জনবিস্ফোরণ হয়। তবুও এপার বাংলার মানুষ ওপার বাংলার শিকড় বিচ্ছিন্ন মানুষদেরকে ধীরে ধীরে আপন করে নেন। শত যন্ত্রণার মধ্যেও ক্ষোভ-দুঃখ নিয়ে ভিটেমাটি হারানো মানুষেরাও এখানকার মানুষদের সঙ্গে মিশে যান।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, এই বহুচর্চিত বিষয়গুলি এখন আবার লিখতে বসা কেন? আসলে এক বিশাল ভয় বা আতঙ্ক ধীরে ধীরে গ্রাস করছে মনে। এই রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলায় সম্প্রীতির যে পরিবেশ এবং তা বজায় রাখার যে স্পৃহা মানুষের মধ্যে ছিল, তা কেমন যেন এখন ঠুনকো হয়ে ভেঙে পড়ছে। শিক্ষিত সমাজের এক অংশ যখন যুক্তিকে হারিয়ে, বিক্রিত বিকৃত আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন বলতেই হয়, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা আমাদের সমাজের অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। চতুর্দিকে যা চলছে, তা দেখে ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ এই কথাটাও আজ সত্যিই কেমন যেন ফিকে ফিকে লাগছে।

বর্তমান এই ঝরা সময়ের মাঝে এই কথাটাই বারবার মনের ভিতর নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, এর জন্য কারা দায়ী? সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে হবে। তবে যদি অশান্ত এই সময়ে শান্তি ফিরে আসে। ভোটের কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে রাজনীতি চলেছে, সেটা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। কিন্তু তার জন্য ফল ভুগতে হচ্ছে সব মানুষকে। ভোটসর্বস্ব রাজনীতির শিকার আমাদের এই সম্প্রীতির চারণক্ষেত্র বাংলাতেই এখন অশান্তি আছড়ে পড়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রীতির শান্ত, স্নিগ্ধ বার্তা আজ ঘৃণা আর ভয়ের কালো থাবায় দিশেহারা। হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে হানাহানির মধ্যে।

সাধারণ মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু লাগাম হারাচ্ছে। যে পরিমাণ হিং¯্রতা ক্ষোভ প্রত্যেকের মনের মধ্যে উস্কে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাতে সভ্যতার অর্থটাই বদলে যাচ্ছে ক্রমাগত।

আমরা আধুনিক হচ্ছি বলে দাবি করি। সত্যিই কি তাই? ক্রমশ বন্য হিং¯্রজন্তু হয়ে যাচ্ছি না তো? কেই কারো ধর্ম নিয়ে বাজে কথা বলতে যেমন দ্বিধা করি না, তেমনি ধর্মীয় উগ্রতায় কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করতে, কেউ গরুর মাংস খেলে তাকে মেরে ফেলতে দ্বিধা করি না। ধর্মের জিগির তুলে, কাউকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে গা কাঁপে না। রাজনীতি সর্বস্ব নেতাদের কাছে সাধারণ মানুষ কি কেবলই দাবার ঘুটি?

কথায় বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। সে তো এখন আর কথার কথা নয়, দেশের প্রতিচ্ছবি যেন। চারিদিকে শুধু ভয়ের দেওয়াল ঘিরে ফেলছে মানুষকে। শিক্ষিত বিবেকের এখন বড়ই অভাব। যুক্তি দিয়ে সমস্যাকে বোঝা এবং তার সমাধানের চেষ্টা তাই এখন বিশেষ ভাবে জরুরি। আবার একটা নবজাগরণের খুব দরকার আমাদের। ততদিন পর্যন্ত সম্প্রীতি তাই শুধুই খাতায়-কলমে আর মহাপুরুষদের বাণীর মধ্যে আবদ্ধ না থেকে আমাদের মনে, বিশ্বাসে, জেগে থাকুক।

বাংলাদেশের অর্থনীতি: শংকা ও আশাবাদ

হাসান জামান টিপু ॥ বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কলকাতায় জন্ম নেওয়া বাঙালী অর্থনীতিবিদ কৌসিক বসু ‘হোয়াই বাংলাদেশ ব্লোমিং’ নামক প্রবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। কিভাবে একটি “তলাবিহীন ঝুড়ি” থেকে বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে  সফলতা অর্জন করেছে তা নিয়ে উনি গবেষণা করেছেন ও নানান দিক নিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।

তার ভাষায় বাংলাদেশ এখন এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে  “চমকপ্রদ ও অপ্রত্যাশিত” সাফল্যের একটি বড় উদাহরণ। এই প্রবন্ধে উনি দেখিয়েছেন কিভাবে একটি দরিদ্রপীড়িত ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশ হওয়া সত্বেও অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকগুলিতে পাকিস্তান, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে।

২০০৬ সালে যখন বাংলাদেশকে অনেকেই “ব্যর্থ রাষ্ট্র” হিসাবে মনে করতো সে বছরই বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেলে তা অনেকের কাছেই অঘটন হিসাবে বিবেচিত হয়েছিলো। ২০০৬ সালের পরবর্তী বছরগুলিতে বাংলাদেশ সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পাকিস্তানের চেয়ে আড়াইগুণ বেশী প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এবং বর্তমানে ভারতের শ্লথ অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের সামনে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই অসাধারণ কাজটি কিভাবে ঘটলো তার কোন সুনির্দিষ্ট কোন উত্তর কারো কাছে নাই, এধরণের ঐতিহাসিক বিষয়ে তা থাকেও না, শুধুমাত্র অনুসন্ধান করা যায়।

কৌশিক বসুর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পালাবদলের পেছনে বড় ভূমিকাটি পালন করেছে সামাজিক পরিবর্তন – বিশেষ করে সমাজে নারীর ক্ষমতায়ণ।

এক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্রাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার কথা। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারও নারী শিক্ষার প্রসার এবং সমাজে মেয়েদের ভূমিকা জোরালো করতে ব্যাপক ভূমিকা নিয়েছে।

কৌশিক বসু বলছেন, এর ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু পৌঁছে গেছে ৭২ বছর, যেখানে ভারতে তা ৬৮ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৬ বছর।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পালাবদলে কৌশিক বসু দ্বিতীয় যে কারণটির কথা উল্লেখ করছেন, সেটি গার্মেন্টস শিল্প। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ যে ভারতের তুলনায় গার্মেন্টস শিল্পে অনেক বেশি ভালো করেছে, এর পেছনে অনেক কারণ আছে। তবে একটি কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের শ্রম আইন।

তার মতে ভারত এবং পাকিস্তানের যে শ্রম আইন, তা নানাভাবে এই দুই দেশের কারখানা মালিকদের শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। এর ফলে এসব দেশের কারখানাগুলো খুব বড় আকারে করা যায়নি, সেখানে বেশি সংখ্যায় শ্রমিকও নিয়োগ করা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে এরকম কোন আইনের অনুপস্থিতি বড় বড় গার্মেন্টস শিল্প স্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আমরা মনে করি বৈদেশিক কর্মসংস্থান এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে।

কিন্তু বাংলাদেশ কি তার এই সাফল্য ধরে রাখতে পারবে?

কৌশিক বসু বলছেন, এখনো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। কিন্তু কিছু ঝুঁকির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, যা নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখনই সচেতন হওয়া দরকার। তাঁর মতে, যখন কোন দেশের অর্থনীতি ভালো করতে থাকে, তখন সেদেশে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য – এসবও বাড়তে থাকে। যদি এসবের রাশ টেনে ধরা না যায়, তা সমৃদ্ধির গতি থামিয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও কোন ব্যতিক্রম নয়।

তবে তাঁর মতে এর চেয়েও বড়ঝুঁকি হলো কট্টর ধর্মীয় এবং সামাজিক রক্ষণশীল শক্তি। এরা প্রগতিশীল সামাজিক খাতে বাংলাদেশের যে বিনিয়োগ, তার বিপক্ষে। ভারতের মতো দেশের শ্লথ অর্থনীতির মূল কারণই হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। যদি বাংলাদেশ এই বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়, সেটি বাংলাদেশকে আবার অনেক পেছনে নিয়ে যাবে। কিভাবে ইতিহাসে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে তার কিছু নজির তিনি টেনেছেন।

তিনি উল্লেখ করেছেন হাজার বছর আগে যে বিশাল আরব খেলাফত বিরাট এক অর্থনৈতিক সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। কিভাবে দামেস্ক আর বাগদাদের মতো নগরী হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতি, গবেষণা আর নতুন আবিস্কারের এক বিশ্ব কেন্দ্র। তবে কৌশিক বসু একেবারে সাম্প্রতিককালের নজিরও দিয়েছেন। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের কাহিনীও একই। স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতে পাকিস্তানের অর্থনীতি ভারতের চেয়ে ভালো করছিল। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি পাকিস্তানকে পিছনে ফেলে দেয়।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব, অর্থের অপরিণামদর্শী ব্যবহার, অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ ইত্যাদি বিষয়গুলি এদেশকে, তার অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে অনেকটাই প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে।

বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া ৭ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব নয়, তবে চ্যালেঞ্জিং। এটি অর্জন করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখা ও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চারটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। এগুলো হলো ইউরোপের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি, নড়বড়ে আর্থিক খাত, পোশাকশিল্পের চলমান রূপান্তরকাল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। সংস্থাটি বলছে, ইউরো অঞ্চলের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হলে তাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, ইউরোপে বাংলাদেশের একটি বড় রপ্তানিবাজার রয়েছে। একইভাবে ইউরোপের সংকট কেটে গেলে তা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক ফল নিয়ে আসতে পারে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এর মতে, মানবিক যথা স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে উন্নয়ন ছাড়া কোন উন্নয়নই টেকসই হয় না। কথাগুলি সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ বহু আগ থেকে বলে আসছে। মানুষের আত্মিক উন্নয়ন না হলে আর্থিক উন্নয়ন কোন দিনও টেকসই হবে না।

বিভিন্ন দেশের সহায়তায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এ ক্ষেত্রে সরকার ‘উড্ডয়ন বা টেক অফ’ পর্যায়ে রয়েছে। ঠিকমতো উড্ডয়ন করতে পারলে তাতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে আর তাতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করে বিশ্বব্যংক।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে যেভাবে বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকায় নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং বাংলাদেশ হবে বিশ্বে অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি। শুভ কামনা বাংলাদেশের জন্য।

এত বড় বিপদ স্বাধীন ভারতে আগে কখনও আসেনি

সংলাপ ॥  একটি লড়াইয়ের ভিতরে আর একটি লড়াই চলছে। বাইরের লড়াই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে, দেশ জুড়ে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রবর্তনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ভিতরের লড়াই চলছে ওই বাইরের লড়াইয়ের সংজ্ঞা, ধর্ম এবং গতিপথকে কেন্দ্র করে। সিএএ-এনআরসি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন যাতে কেবলমাত্র মুসলমান সমাজের আন্দোলনে পর্যবসিত না হয়, ভিতরের লড়াই সেই উদ্দেশ্যে। ভিতরের লড়াইয়েই নিহিত রয়েছে বাইরের লড়াইয়ের প্রাণশক্তি। সেই লড়াই ব্যর্থ হলে ওই প্রাণশক্তি বিনষ্ট হবে। তা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নহে, বিপজ্জনক। সেই বিপদ অত্যন্ত বড় আকারের, কারণ তা ভারতীয় রাজনীতিকে আড়াআড়ি ভাগ করে দিতে পারে, রাজনীতির মেরুকরণ ষোলো আনা সম্পন্ন করে মেরুকরণকেই রাজনীতিতে পরিণত করতে পারে।

এত বড় বিপদ স্বাধীন ভারতে আগে কখনও আসে নাই। বিপদ এই কারণে গুরুতর যে, রাষ্ট্রনীতি নিজেই মেরুকরণের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নুতন নাগরিকত্ব আইন মেরুকরণের জমি তৈরি করেছে, সেই জমিতে অতঃপর জাতীয় নাগরিক পঞ্জির ইমারত গড়া হবে। একটি কথা বুঝে নেয়া আবশ্যক। সিএএ সত্যই কত ‘নিপীড়িত হিন্দু’কে নাগরিকত্ব দিবে এবং নাগরিক পঞ্জিতে শেষ অবধি কত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’র নাম বাদ পড়বে ও তাদের গতি কী হবে, তা কেউ জানে না, শাসকেরাও জানেন না। কিন্তু, অনুমান করা সহজ, তাদের জানবার প্রয়োজনও নাই। সিএএ দেখিয়ে হিন্দুদের অভয় দিয়ে যদি তাদের বলা হয় যে, এনআরসি-র ঔষধ দিয়া ‘অবাঞ্ছিত’দের বিতাড়ন করা হবে এবং সেই ব্যবস্থাপত্রে যদি তারা সন্তুষ্ট হন, তা হলেই কার্য সিদ্ধ হবে। এই হিসাবটি পরিষ্কার বলেই বোধ করি নাগরিকত্ব আইন বলবৎ করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য বিরোধীরা সকলে একযোগে আপত্তি করলেও সিএএ-র বিষয়ে এক ইঞ্চি পিছু না হটবার হুমকি।

নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলন মুসলমানের আন্দোলন হয়ে উঠলে মেরুকরণের পথ সুগম হত। আশ্বাসের কথা, তা হয় নাই। এই আন্দোলন একটি বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। দেশ জুড়ে এই প্রতিবাদে সংখ্যালঘু মানুষের ভূমিকা অবশ্যই প্রবল। তা অত্যন্ত স্বাভাবিক যারা গোষ্ঠী হিসাবে বিপন্ন বোধ করছেন তারা গোষ্ঠী হিসাবেই প্রতিরোধে নামবেন। কিন্তু দুই দিক হতে এই আন্দোলন গোষ্ঠীর সীমা অতিক্রম করেছে।

এক, সংখ্যালঘু সমাজের বাহির হতেও অগণিত মানুষ গণতন্ত্র তথা সংবিধানকে রক্ষার তাগিদে জনপথে দাঁড়িয়ে ‘উই দ্য পিপল…’ পাঠ করেছেন। সংখ্যালঘুর স্বার্থ কেবল সংখ্যালঘুকেই দেখতে হবে এই জিন্না-ধর্মী সঙ্কীর্ণ মন্ত্র উড়িয়ে দিয়ে সমস্বরে ঘোষণা করেছেন হম দেখেঙ্গে! মেরুকরণের কারিগরদের মুখের উপর ইহা এক প্রচ- জবাব।

দুই, সংখ্যালঘু মানুষও তাদের প্রতিবাদকে গোষ্ঠীস্বার্থের গ-িতে বেধে রাখেন নাই, তার উত্তরণ ঘটিয়েছেন বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। শাহিনবাগের রাজপথে একটি মিছিল হতে ধর্মীয় স্লোগান উঠলে সেখানকার ঐতিহাসিক সমাবেশের আয়োজকরাই আপত্তি করেছেন এবং স্লোগানদাতারা তৎক্ষণাৎ ভুল স্বীকার ও সংশোধন করেছেন, স্লোগান বদলিয়েছে। দুই দিক হতেই সম্মানিত হয়েছে গণতন্ত্রের একটি মৌলিক শর্ত: সংখ্যালঘুর অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষা করা সংখ্যাগুরুর নৈতিক দায়িত্ব। সংখ্যাগুরুবাদের প্রবক্তা ও সেনাপতিরা এই শর্ত মানেন না। মানতে পারেন না। মানলে মেরুকরণের প্রকল্পটি ধসে পড়ে। সেখানেই সংখ্যাগুরুবাদের সাথে গণতন্ত্রের লড়াই। ভিতরের লড়াই ।

মসজিদের মাথায় ‘যুদ্ধের নিশান’ উড়াল ইরান

সংলাপ ॥ ইরান তার দেশের মসজিদের মাথায় ‘যুদ্ধের নিশান’ লাল পতাকা ওড়াল। বেরিয়ে এল ২০১৫ এর পরমাণু চুক্তি থেকে। আর ও-দিকে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানালেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে এ বার ‘খুব দ্রুত এবং ‘বড় হামলা’ হবে ইরানে। ইরানের ৫২টি ‘টার্গেট’ ঠিক করেছে আমেরিকা। জেনারেল কাসেম সোলেমানি খুনের বদলা চেয়ে গোড়া থেকেই ফুঁসছে ইরান। মুখে ‘যুদ্ধ চাই না’ বলছেন বটে, কিন্তু ধারাবাহিক হুমকি দিয়ে চলেছেন ট্রাম্পও। এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস।

গত শুক্রবার ভোররাতে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের কাডস ফোর্সের কমান্ডার সোলেমানি। তার পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াত উল্লাহ আলি খামেনেইকে বদলার দাবিতে সুর চড়াতে শোনা গিয়েছিল। গত সপ্তাহে শনিবার শিয়া অধ্যুষিত কোম শহরের ঐতিহ্যবাহী জামকরন মসজিদের উপর ধর্মীয় নীল পতাকার বদলে উড়তে দেখা গেল যুদ্ধের নিশানবাহী লাল পতাকা। বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশের দাবি, ইরানের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম। তাঁদের মতে, এর অর্থ দেশের জনগণকে যুদ্ধের জন্য তৈরি থাকতে বলা। এদিকে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ও বালাড বায়ুসেনা ঘাঁটিতে হামলার খবর আসে। বাগদাদে মার্কিন ‘গ্রিন জোন’ লক্ষ্য করেও ইরানের তরফে মর্টার হামলা হয় বলে অভিযোগ ওয়াশিংটনের।

এরই পাল্টা ট্রাম্পের ‘৫২টি টার্গেটের’ টুইট বলে মনে করছেন অনেকে। কয়েক বছর আগে ইরানের মার্কিন দূতাবাসে ৫২ জনকে পণবন্দি করার পাল্টা হিসেবেই এই সংখ্যা বেছেছেন ট্রাম্প। তাঁর কথায়, ‘এগুলি ইরান ও তার সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় হামলা হবেই। আমেরিকা আর কোনও হুমকি সহ্য করবে না।’ এ দিকে শনিবারই ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়’ এই দাবিতে আমেরিকার ৩৪টি প্রদেশের ৮০টি শহরে পথে নামেন অসংখ্য মানুষ।

রবিবার রাতে ইরান ঘোষণা করে, এই মার্কিন আগ্রাসনের মুখে ২০১৫ এর পারমাণবিক চুক্তি আর মানবে না তারা। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি জানান, যে কোনও মুহূর্তে তাঁর দেশ পরমাণু অস্ত্র বিষয়ক গবেষণা এবং  ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ শুরু করে দিতে সক্ষম। এই চুক্তি থেকে ২০১৮-তেই বেরিয়ে এসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

ইরানের তরফে প্রত্যাঘাতের আশঙ্কায় ট্রাম্পের নির্দেশে কাল থেকেই নানা দেশের সঙ্গে বার্তালাপ শুরু করে দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব মাইক পম্পেয়ো। হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর, পম্পেয়ো ফোনে কথা বলেছেন পাক সেনাপ্রধান কমর বাজওয়ার সঙ্গে। ইরাক ও আফগানিস্তানের  সঙ্গেও কথা হয়েছে তার। সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গেও হোয়াইট হাউসের কথা হয়েছে। কূটনীতিকদের একাংশ মনে করছেন, ইরানকে ‘জবাব’ দিতে আমেরিকা অন্য দেশের ভূখ- ব্যবহার করতে চাইছে। বিশেষত ট্রাম্পের নজর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের দিকে। কিন্তু আফগানিস্তান যে সেটা করতে দেবে না, শুক্রবারই 

তা স্পষ্ট করে দেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। তাঁর কথায়, ‘২০১৪ এর কাবুল-ওয়াশিংটনের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ক যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছিল, তা মেনে কোনও ভাবেই অন্য দেশের উপর আঘাত হানতে আমাদের মাটি কাউকে ব্যবহার করতে দিতে পারি না।’

একই সুরে ‘না’ বলল পাকিস্তানও। বার্তা দিয়েছে সৌদি আরবও। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক রিয়াদের এক উচ্চপদস্থ কর্তা জানান, ড্রোন হামলার আগে সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি আমেরিকা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার আর্জি জানিয়ে ইরাকের তদারকি প্রধানমন্ত্রী আদেল মাহদিকে ফোন করেন সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমান। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, আমেরিকার মিত্র দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি ও আরব আমিরশাহির উপরেও হামলা চালাতে পারে ইরান।

এ-দিকে সোলেমানির শেষ যাত্রাতেও দাবি উঠল বদলার। একই দৃশ্য ছিল ইরাকে।  ইরানেও মিছিল কার্যত জনসমুদ্রের চেহারা নেয়। স্লোগান উঠতে থাকে, ‘শয়তান আমেরিকা, নিপাত যাক’। শিয়াপন্থী বিপুল সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিছিলে পা মেলান রাজনৈতিক নেতাদেরও একটা বড় অংশ। কাল ইরাকে বাগদাদ থেকে শুরু হওয়া মিছিল কারবালা ঘুরে পৌঁছায় নাজাফ শহরে। তেহরানের মিছিল শেষে আজই সোলেমানির দেহ পৌঁছবে তার জন্মস্থান কেরমানের শহরতলিতে। সেখানেই দাফন করা হবে তাকে।

ধর্মের নামে…. – ১৫

‘শান্তির (ইসলামী) জীবন বিধানে কোন জোর জবরদস্তি নেই- সুষ্ঠু ও সঠিক পথ এবং বিভ্রান্ত পথকে

আলাদা করে দেয়া হয়েছে।’

সংলাপ ॥ এর পরেও কি কোন কথা বলার দরকার আছে যে নবী নিজে কোন কথা আল্লাহর হুকুম ছাড়া বলেছেন? অবশ্যই না। সুরা মাআরিজ-এর ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নং আয়াতসমূহে যা বলা হয়েছে তা তো অবাক হবার মতো। এ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি (রাসুল) যদি আমার সম্পর্কে কোন কথা বানিয়ে বলতেন, তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম। তারপরে তার গলার রগ অবশ্যই কেটে ফেলতাম। তারপরে আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ ছিলো না, যে নাকি আমাকে ফিরিয়ে রাখতে পারতে।’

সুরা আহযাবের ১ নং ২ নং আয়াতে, সুরা ছোয়াদের ৮৬ নং আয়াতেও ঐ একথা। সুরা যুখরুফ এর ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘সুতরাং আপনি এ কোরানকেই আঁকড়ে ধরুন যা আপনার কাছে ওহী যোগে নাজিল করা হয়েছে। নিশ্চয় আপনি সহজ, সত্য, সনাতন পথে রয়েছেন।’ সুরা আহকাফির ৯ নং আয়াতে বলা হযেছে, ‘আপনি বলে দিন, আমিতো আর রাসুল হিসাবে মোটেই নতুন নই। আর আমি জানিনা- আমার সাথে কী ব্যবহার করা হবে, আর তোমাদের সাথেই বা কেমন করা হবে। আমি তো শুধু সে কথাই মেনে চলছি যা আমার কাছে ওহী যোগে আসছে। আর আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী বৈ তো নয়।’ তাই, পূর্বের নবীর সমর্থন, ওহী গোপন না করা, ওহী যোগে পাওয়া নির্দেশ মেনে চলা ইত্যাদি ছিল নবীর প্রতি আল্লাহর সরাসরি আদেশ। 

সুরা আল ইমরানের ৯৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি বলুন, আল্লাহতো সত্যই বলেছেন। সুতরাং তোমরা ইব্রাহীমের সহজ, সরল, সত্য, সনাতন জীবন ব্যবস্থাই মেনে চলো। তিনি তো আর মুশরিকদের শামিল ছিলেন না।’ ঠিক একই কথা সুরা বাকারার ১৩৫ ও ১৩৬ নং আয়াতে বর্ণিত আছে। সুরা বাণী ঈসরাইলের ১২৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তারপরে আমিই আপনাকে ওহীযোগে নির্দেশ দিলাম যেন আপনি ইব্রাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করেন। সুরা বণী ঈসরাইলের ৫৩ নং আয়াতে বলা আছে, ‘আমি তো আপনাকে তাদের নিকট দারোগা হিসাবে পাঠাইনি।’ সুরা নাহল-এর ৮৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনার কাছে এমন একখানা কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে প্রত্যেকটি বিষয়ের বিবরণ মজুদ রয়েছে। মুসলিমদের জন্য এতে পথ নির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদ রয়েছে।’ সুতরাং, কোরান পরিপূর্ণ জীবন বিধান। রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওহীযোগে এটা আল্লাহর নিকট থেকে পেয়েছেন। তিনি নিজের কোন মতামত এতে ব্যক্ত করেননি। যা কিছু বলেছেন কোরান থেকেই বলেছেন, যা কিছু করেছেন কোরান থেকেই করেছেন। আর এ কোরান পূর্ববর্তী সমাজেও নবীদেরই জীবন বিধানরূপে, তাদের সমাজের মানুষের পথ নির্দেশিকা হিসাবে এসেছে যার সত্যতা কোরান প্রমাণ করে দিল। আর আমরা মিল্লাতে ইব্রাহিমীর উপর স্থির রয়েছি। রাছুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ও মিল্লাতে ইব্রাহিমের পথে থেকেই জীবন বিধান স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছেন ¯্রষ্টার আশীষরূপে।

প্রশ্ন হলো, অনেকেই বলে থাকেন, রাসুল যা বলেছেন এবং করেছেন তা হাদীস। তা হলে কোরান কী? রাসুল তো কোরানের বাইরে, ওহীর বাইরে কোন কথা বলেননি। তবে তাঁর কথা ও কাজকে হাদীস বলা উচিৎ কিনা তা ভাবনারও অবকাশ নেই। কারণ দুর্বোধ্যরূপে কোরানের অবতারণা হয়নি। সহজ সরলভাবে মানুষকে বুঝানো হয়েছে যাতে কোন বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়। বিভ্রান্তি কে করে? মানুষই করে। মানুষ কেন করে? করে শয়তানের প্ররোচনায়, নিজের স্বার্থে, অজ্ঞতার কারণে, জেদের বশে, ক্ষমতার লোভে। এসব বিভ্রান্তি আগেও ঘটেছে এখনও ঘটছে। এত যে স্পষ্ট জীবন বিধান তার মাঝেও এত দলাদলি ভাগাভাগি কী করে এলো? এর জন্য দায়ী অজ্ঞতা।

আজকের সমাজে মানুষ কত না ভাষা শিখছে অথচ ¯্রষ্টার বাণীতে ভরা তারই জীবন বিধান যে বুঝলো না-কাজ করলো না এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কী-ই বা থাকতে পারে?  কতগুলো লোকাচারকে ধর্ম মনে করে সেটাকে জীবন বিধান হিসাবে চালিয়ে দেবার ভাওতাবাজী আর কতদিন? কোরান নিজেই বলছে, কোরান বোঝা সহজ, পরিস্কারভাবে এর আয়াতগুলো বর্ণিত, কোন বিষয়েই কোন কিছু বাদ যায়নি। অথচ কোরান বিষয়ে শুধু অজ্ঞই নয় মহামূর্খও বটে। সুরা আল কামার-এর ৭নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘আমিই তো এই কোরানকে উপদেশ লাভের জন্য সহজ করে দিয়েছি। কিন্তু তোমাদের মধ্যে বুঝবার মতো কেউ আছে কি?’ একই কথা ২২ নং আয়াতে, ৩২ নং আয়াতে, ৪০ নং আয়াতে ও ৫১ নং আয়াতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা বাকারার ৪৪ নং আয়াতে বুদ্ধি খাটানোর কথা বলা হয়েছে। সুরা বাকারার ১৭১ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কাফিরদের উপমা ঠিক এমনি যেমন কেউ চিৎকার ও শব্দ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারে না-এমন জন্তুর পিছনে ধাওয়া করছে। তারা বধির, মুক, অন্ধ তারা যে মোটেই বুদ্ধি খাটায় না।’ সুরা বাকারার ২১৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানবজাতি একই উন্মত হিসেবে ছিল।’ পরে তাদের মধ্যে যে সব বিরোধ দেখা দিয়েছে তার জন্য নবী ও কিতাব পাঠিয়েছি কিন্তু সুস্পষ্ট দলিল পাওয়ার পরেও তারা জিদের উপরেই ছিল।’ অথচ সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘ শান্তির (ইসলামী) জীবন বিধানে কোন জোর জবরদস্তি নেই-সুষ্ঠু ও সঠিক পথ এবং বিভ্রান্ত পথকে আলাদা করে দেয়া হয়েছে।’ সুরা বাকারার ২৭২ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসা আপনার দায়িত্ব নয়। বরং আল্লাহ যাকে খুশী সঠিক পথে চলার তওফিক দান করেন।’ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) সুসংবাদদাতা ও বার্তাবাহক যা আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট থেকে রহমত হয়ে এসেছেন। সুরা নিছার ৮২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা কি কোরান সম্পর্কে মোটেই চিন্তা করে না?’ (চলবে)

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য ১৫

‘জ্ঞান অর্জনে বই কেতাব হতে মানুষ কেতাব উত্তম।’

             – সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন

‘সরলে গরল মিশাইও না গরলে সরল মিশাইও না।’

             – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

‘সত্য মানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যান হবেই হবে।’

             –  সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সত্য ও সুন্দরের প্রতি তীব্র আকাঙ্খাই মানুষকে আত্মবিকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। সত্যের জন্য সব কিছুকেই ত্যাগ করতে হয় কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না। সত্যের হাতছানি যে পেয়েছে,সত্যের মাহাত্ম যে অনুভব করেছে তাকে কি আর সত্যের বিনিময়ে কোন কিছু দিয়ে ভোলানো যায়? মানব জীবনের চূড়ান্ত চাওয়াই হলো শান্তি। সত্য আর শান্তি একাত্মা। সত্য ছাড়া শান্তি আসেনা। সত্য সত্য হতে, সত্যের প্রতি, সত্যের দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

পার্থিব ধনদৌলত, প্রতিপত্তি ও চাকচিক্যের মোহ মানুষকে সাময়িকভাবে সুখ দিলেও অনাবিল শান্তির জন্য তা অতি তুচ্ছ। ‘হাক্কানী দর্শন’ মতে আত্মিক উৎকর্ষতা সাধনের মাধ্যমে অনাবিল শান্তি অর্জনই মানুষের কাম্য। তাই ধর্মান্বেষী মানুষের শান্তির পথের দিশা দিয়ে গেছেন সত্যমানুষগন সর্বকালে, এখনও তার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। এ পথ ছিলো আছে থাকবে। যতদিন মানবজাতি থাকবে পৃথিবীতে ততদিন এ ধারা অব্যাহত থাকবে। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে আহ্বান জানানো হচ্ছে ‘হে মানবজাতি, তোমরা যে ধর্মাবলম্বীই হও না কেন জীবন চলার পথে শান্তি ও মঙ্গল হাসিল করার জন্য মুর্শিদ/গুরু/পথ প্রদর্শক তালাশ কর এবং সংযোগ স্থাপন কর। যদি সংযোগ স্থাপন করতে না পারো তাহলে অন্ততঃপক্ষে সযোগ রক্ষা করে চলো।

গুরুবিহীন এ পথচলা অসম্ভব। গুরুকৃপা ছাড়া অসম্ভব। সত্য প্রতিষ্ঠার পথ প্রেমের পথ। ‘প্রেমের পথ সহজ হয়, যদি মুর্শিদ সঙ্গ দেয়’। সত্যমানুষদের কাছে প্রেমই ধর্ম। প্রেমই ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মিলন সেতু। সত্যমানুষতত্ত্ব অনুসারে আল্লাহ্ প্রেমময়। তিনিই একমাত্র প্রেমের ভান্ডার বা প্রেমাষ্পদ। সত্যমানুষতত্ত্বে প্রেম ও দয়া একই জিনিসের দুটো ভিন্ন নাম। প্রেমই ধর্মের নির্যাস। তাই আল্লাহ্ প্রেমিক সাধকগন বাহ্যিক মন্দির মসজিদ গীর্জার প্রয়োজন বোধ করেন না। প্রেমের অনুসারীরা সকল প্রকার ধর্মাচার থেকে পৃথক। যুক্তি, বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহ্কে পাওয়া যায় না। একমাত্র প্রেম, ভক্তি দ্বারা আল্লাহ্কে পাওয়া যায়। প্রেম কি জিনিস তা যুক্তি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে বোঝানো যায় না। প্রেম জীবনের পরম রহস্য। অনির্বচনীয়, অসংজ্ঞায়িত গুপ্ত ব্যাপার। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, যেখানে প্রাণ আছে সেখানে প্রেমজগৎ আছে, প্রেমেরও শেষ নেই, সত্যেরও শেষ নেই, জ্ঞানেরও শেষ নেই। আবার এই তিনটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সত্য ও জ্ঞান মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। যতক্ষণ চাওয়া আছে ততক্ষণ প্রেম, পেয়ে গেলে জ্ঞান।’

সকল সাধক এতে একমত যে প্রেম ব্যতীত ঈমান পূর্নতা পেতে পারেনা। প্রেমের সঙ্গে থাকবে ভয়। প্রেমবিহীন ভীতি কাজের নয়। প্রেম-ভীতি ও ভক্তির সমন্বয় প্রকৃতপক্ষে এমন একটি অনুভুতির স্পন্দন যা এক মুহূর্তে মানবকে এক অভাবনীয় ইন্দ্রিয়াতীত স্বর্গীয় রাজ্যে আরোহণ করিয়ে তাকে অমরত্ব ও অখন্ডত্ব দান করে অসীম সত্তায় নিমজ্জিত করে। প্রেমহীন ইবাদত তা করতে পারেনা। প্রেমের শক্তিতেই একমাত্র এই কঠিন গিরিসংকট ডিঙ্গাতে পারে। সাধককুল শিরোমনি হযরত গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী (র.) বলেছেন- প্রেমহীন এবাদতকারী যেখানে এক বছরে পৌঁছে, প্রেমিক সেখানে এক হুংকারে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ যখন মানুষ আল্লাহ্কে ভালোবাসে আল্লাহ্ও তখন মানুষকে ভালোবাসেন। অর্থাৎ নদী যখন সাগরে মিলিত হওয়ার জন্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে তখন সাগরেও জোয়ার এসে সেই মিলন আরও সহজতর ও ত্বরান্বিত করে দেয়। সূফী সাধক মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী সূফীর এই প্রেমানুভুতিকে অতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মাত্র দুটি ছত্রে-‘নিরস এবাদতকারী আল্লাহ্ প্রাপ্তির সামান্যতম পথ একমাসে অতিক্রম করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ প্রেমিক ব্যক্তি প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ্র সিংহাসনে পৌঁছে যায়। জাত ও সিফাতের মিলন সূত্র এই প্রেম। প্রেম কোন বাধাকে বাধা মনে করে না। প্রেমিক নানা বাধা বিপত্তির প্রাচীর, বন্ধুরতা ও কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে প্রেমাস্পদের সাথে মিলিত হতে ছুটে যায়। এসব প্রতিকূল অবস্থার সাথে যুদ্ধ করতে করতে সে তার মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন: ‘প্রেমিক যারা জনম ভরা কত দুঃখের বোঝা বয়, প্রেম করা হবেনা তার থাকলে কুল কলঙ্কের ভয়।’ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক প্রেম জগতের বিশালত্ব প্রকাশ করেছেন এভাবে ‘যার প্রেমের শুরুও নেই, শেষও নেই, তার প্রেম কাঁচা ’।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আরও বলেছেন ‘দুই যুগ লেগে থাকলে একজন আশেক হয়।’

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রেম জগৎ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এভাবে প্রকাশ করেছেন আমাদের জন্য আরও সহজবোধ্য করে ‘প্রেম একটা জগৎ। যেটা বহমান, সেখানে আমার অধিকার আছে, যে কোন সময়, যে কোন জায়গায় আমি বিচরণ করতে পারি এ জগতে। প্রেম নামে যে একটা জগৎ আছে, সে জগৎটা আমার মধ্যে কেমনভাবে বর্তমান। কেমনভাবে বর্তমান বললে, আমাদের যখন বয়স বাড়ছে, বিভিন্ন কর্মের মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে-নিজেকে দেখতে হবে এবং নিজের কনসেপ্ট তৈরী করতে হবে, যার যার মত করে। আপনারা শুনেছেন, ভালোলাগা আছে, ভালোবাসা আছে, ¯েœহ আছে, শ্রদ্ধা আছে, ভক্তি আছে, ভাব আছে, মহাভাব আছে, সবগুলোর সমন্বয়ে প্রেমজগৎ। আমি কোথায় অবস্থান করছি? জীবন থেকে জীবন, প্রেমের ধারাও বহমান। প্রেম বর্তমান, প্রেম পরিবর্তনশীল, বিবর্তনশীল, রূপান্তরও আছে। এর কোন জায়গায় আমি অবস্থান করছি? আমার কর্ম আছে, বেঁচে আছি। প্রেমের জন্ম নাই, মৃত্যু নাই, প্রেমিক যে, প্রেমাস্পদ যে, তাদেরও জন্ম নাই, মৃত্যু নাই, আছে রূপান্তর। কোন জায়গায় গেলে প্রত্যাশা শূণ্য হবে? সবই কিন্তু প্রেমজগৎ, কিন্তু স্তর আছে। ভালোলাগা খারাপ না, এটা শুকায়ে যেতে পারে একটা পর্যায়ে। যে কারণে ভালো লাগছে, সেটা শেষ হয়ে যাবে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে যখন চিন্তা করব তখন ভালোলাগা শেষ হয়েও যেতে পারে। প্রত্যাশা পূরণ হয়ে গেলে ভালোলাগা-ভালোবাসাও শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রেমজগৎটা কিন্তু শেষ হয়নি। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে, প্রত্যেক প্রানীর মধ্যে, অপরদিকে এভাবে বলা যায়, যেখানে জীবন আছে, সেখানে প্রেম আছে, সেখানে সত্য আছে, সেখানে শান্তি আছে। এটাকে কেমনভাবে কে এ জগতের মধ্যে ঢুকে যাতায়াতের মধ্যে আছে, কোন অবস্থানে আসছে আর যাচ্ছে, সামনে আসলে এক রকম হয়, দূরে সরে গেলে আর এক রকম হচ্ছে। প্রত্যাশা যখন থাকছে তখন সেই একই অবস্থা হয়? হয় না? এটা বাস্তবতা। এমন কেউ নাই যে বলবে আমার মধ্যে এগুলো নাই। আমি এখনও যুদ্ধ করছি। যুদ্ধই জীবন।হাক্কানীর পথটাই এটা, যে যুদ্ধই আমার জীবন। প্রেমের কথাটা কে বলতে পারে? একমাত্র প্রেমাস্পদ বলতে পারে। এছাড়া আর কারো মুখে শোভা পায় না। করলেই প্রতারণা হয়ে যাবে। একমাত্র প্রেমাস্পদ বুঝতে পারেন কে আমার প্রেমের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। প্রেম করা যায় না, হয়ে যায়। কবে, কে, কেমনভাবে হয়? হওয়াটা কিভাবে হয়? হও বললে কি হয়? সেটা কোথা থেকে আসে? কোন পর্যায়ে গেলে তবে হবে? করা যায় কিভাবে আর হওয়া যায় কিভাবে? কর্মের সঙ্গে করার একটা যোগসূত্র আছে। একটা মানুষের আপাদমস্তক একটা পৃথিবী, সেখানে কর্ম করার জন্য কোন্ কোন্ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমি ব্যবহার করছি, আর হওয়ার সঙ্গে আমার কোন্ কোন্ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জড়িত আছে। এটা বার করতে হবে যার যার মত করে তবে এই বাণীর নির্যাস, সুগন্ধিটা উপলব্ধি করা যাবে। দুনিয়াদারির কোন কথা বলে বা তুলনা দিয়ে প্রেমের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। ধরা পড়বেন আপনি। শুরু আর শেষের কথা বলা আছে, কতক্ষন সময় শুরু আর কতক্ষন সময় শেষ। শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন না? একটা ফেলেন আর একটা নেন, এর মধ্যে কতটুকু সময়? এই যে শ্বাস ফেলেন, না নিতে পারলেইতো শেষ। কতটা মুহূর্ত, এই    মুহূর্তগুলো মানুষের জীবনে নিজেরটা নিজে উপলব্ধি করতে হবে। আমি মিনিমাম একুশ হাজার, ম্যাক্সিমাম সাতাশ হাজার শ্বাস-প্রশ্বাস নর্মাল হিসাব করেছি। আমি কটা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংযোগ রেখে কোন কর্ম করছি? শ্বাস-প্রশ্বাস হিসাব করতে গেলে আপনার চিন্তার জগৎ অন্যরকম হয়ে যাবে। চোখ আপনার কাছে সারেন্ডার করবে, কানও সারেন্ডার করবে যে আমি শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে এই জিনিসটা নিয়ে চিন্তা করব। চোখ কি দেখে? কান কি শোনে?-(একজনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন) সখী প্রেম করা আর হলোনা আমার, প্রেম নিয়ে গেলো সব ভক্তজনে। প্রেমজগতে ভালোলাগা আছে, ভালোবাসা আছে, ¯েœহ আছে, প্রেম, ভক্তি, শ্রদ্ধা আছে। আমি কোথা থেকে ধরব? চলমান গতিতে যেমন একটা সমুদ্র চলছে, সেখানে আমি এক বালতি পানি তুলে নিতে পারি, হাত দিয়ে গিয়ে তুলে নিতে পারি এবং এটার পরিচয় দিতে পারি যে এটা এই সমুদ্রের পানি। আমি পরীক্ষাও করতে পারি যে এর গুনাগুন কি, এর কতটা লবনাক্ততা। এদিকে পরিস্কার সমুদ্র বয়ে যাচ্ছে, সেটার রঙ-এ রঞ্জিত হতে পারব। অন্বেষণ করতে গিয়ে দেখতে হবে যে ডুব দিছে সে’ই উপলব্ধি করতে পারবে। আর একজন দেখছে যে আমি কোন্ প্রিপারেশন নিয়ে সমুদ্রের মধ্যে বাকি জীবন বিরাজমান থাকব, সমুদ্রের হয়েই থাকব, ওটা যিনি অবর্জাভ করছেন একমাত্র তার কাছ থেকেই কিছু পাওয়া যাবে। দরবারে কাজ করবেন অথচ সেখানে নিজস্ব কোন থিম থাকবে না তা হতে পারে কি? এই যে স্ক্রলটা চলছে আর একজন সাধক আস্লে বলে দিতে পারবেন এখানে কি কি থিম আছে। করা আর হওয়ার মধ্যে যে এখানে মূল কথাটা -শুরু আর শেষ- ধনবান যিনি হইতে চাইবেন সেবা তার কাছে থাকতেই হবে। আমি আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে আসছি যতটুকু নিয়া আসতে পারছি বিলাইয়া দিব। শ্রেণীভেদ সেখানে থাকতে পারে না। সম্পদের সন্ধান তুমি পাবে না যতক্ষণ না তুমি যোগ্য হবে। সম্পদ দিলে তুমি নষ্ট করে ফেলবে। যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়।” হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে এভাবে পাচ্ছি আমরা-

হে প্রেমিক

তোমার দু-চোখ দিয়ে দেখতে যাবে

প্রেমাস্পদ দূর থেকে দূরে সরে থাকবে

নিজেকে যতই ভুলে যাবে

প্রেমাস্পদ ততই নিজেকে উন্মোচন করবে

ব্যাকুলতা তখন আলো আনবে।

আমিত্বের আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করবে

সমস্ত পৃথিবী তোমারই হবে

প্রেমাস্পদ তাঁর দরজা খুলে রাখবে

তখনই তোমার ভিতরের কাবাকেও সন্ধান পাবে

সিজদাতে রত থেকো তুমিই হবে তীর্থ পথিক। (চলবে)

মিরপুরের ‘জ্যোতিভবন’-এ নেতৃত্ব বিষয়ে ৯ম পর্বের আলোচনা – মানুষকে যারা সরল পথ দেখান তারাই নেতা

সংলাপ ॥ মহান সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ  প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের অংশ হিসেবে ‘নেতৃত্ব’ বিষয়ে আলোচনার ৯ম পর্ব  গত ১৪ পৌষ ১৪২৬, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’ এর আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফার সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশ নেন সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ-এর নির্বাহী সম্পাদক শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন, হাক্কানী পরিবারের সদস্য ও বিবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সত্যানুসন্ধানী বাহাদুর ব্যাপারী এবং বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও হাক্কানী বিশেষ দূত মোল্লা হাছানানুজ্জামান টিপু। সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

মোল্লা হাছানানুজ্জামান টিপু বলেন, পবিত্র কোরআনের সূরা ইয়াসিনে বলা হয়েছে, ‘অনুসরণ কর তাদের, যাহারা তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান কামনা করে না এবং যাহারা সৎ পথ প্রাপ্ত’। এই সৎপথ হলো সূরা ফাতিহায় বর্ণিত,‘ সিরাতুম মোস্তাকিম – সরল পথ।’ সেই সরল পথে মানুষকে যে অনুসরণ করে যে নিয়ে যায়, সেই নেতা, তার কাজটিকে বলে নেতৃত্ব। উপরোক্ত বাণী থেকে বুঝা যায় নেতা কোন প্রতিদান আশা করতে পারেন না। নেতা তার কর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ জেনেই নেতৃত্বে আসেন।

কিছু মানুষ নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত গুণ নিয়ে জন্মায়। মানুষ অজান্তেই নিজেকে সেই গুণী মানুষটার কাছে সমর্পন করেন। নেতৃত্বটা অলৌকিক। কৃপা ছাড়া কেউ নেতা হতে পারে না। হাক্কানীতে সাধক আনোয়ারুল হকের দরবারে সেই কৃপায় ও আশির্বাদে ধন্য ছিলেন সাধক শেখ আবদুল হানিফ। প্রতিকূলতার মধ্যে আপন লক্ষ্য স্থির রেখে উনি এগিয়ে গেছেন। সাথে ছিলো তাঁর শ্রীগুরুর কৃপা। উনি সার্থক হয়েছিলেন, তাই ওনার গড়া প্রতিষ্ঠানে আমরা আজ সেই নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলছি।

আমাদের নেতা সূফী সাধক শেখ হানিফ পর্দা নেওয়ার পর এখানে একটা নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। ঠিক সেই সময়ই হাক্কানী চিন্তন বৈঠক নেতৃত্ব নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন একটা বিষয় নির্বাচন করার জন্য বাহাখাশ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। আমাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দানের জন্য বাহাখাশ কর্তৃপক্ষকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

কে নেতা?  কে নেতৃত্ব দিতে পারে? লিডারশীপ কোয়ালিটি যার মধ্যে আছে সে-ই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য। সেই লিডারশীপ কোয়ালিটি কি? বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখবো, লক্ষ্য সম্পর্কে যার স্বচ্ছ ধারণা আছে, দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, মানবিক, কল্যাণময়, প্রেমময় ও সচেতন তিনিই নেতা। এই গুণগুলি যার মধ্যে আছে সেই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য।

হাক্কানীতে কর্ম, মানবতা ও শান্তি- এই তিন হলো উদ্দেশ্য। মানবতার লক্ষ্যে কর্ম করে শান্তি লাভ করাই হাক্কানীদের বা সত্যপথ যাত্রীদের কাজ। এই কাজে সফলতা তখনই আসবে যখন একের সাথে একাত্মতা হবে,  দড়হবহবংং রিঃয ঙহব, ড়হবহবংং রিঃয ঃৎঁঃয’ – ‘মানে একের সাথে একাত্মতা, সত্যের সাথে একাত্মতা। 

সেই নেতৃত্ব দিতে সক্ষম যে একের সাথে একাত্ম হবে, সত্যটাকে ধারণ করবে। এই পথে চলতে গেলে একের সাথে একাত্ম হতে হবে। কথা আছে আল্লাহকে পেতে হলে আল্লাহর রঙে নিজেকে রাঙাতে হবে। আল্লাহর সকল গুণাবলী নিজের করে নিতে হবে, ধারণ করতে হবে। সময় সময়ে করলে হবে না, সর্বাবস্থায় তাকে ধারণ করতে হবে।

সে সাধন পথে প্রথম নেতৃত্বটা কিন্তু নিজেকেই নিজের উপর নিজে দিতে হবে। নিজের বিক্ষিপ্ত চিন্তাকে এককেন্দ্রিক করতে হবে, কায়মনোবাক্যে কর্ম মানবতা শান্তির পথ ধরে এগোতে হবে। মানবিক কর্ম করে শান্তি লাভ করে একের সাথে, সেই সত্যের সাথে একাত্ম হতে হবে।

দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একজন কর্মীকে নেতৃত্বে আসতে হয়। এখানে কোন শর্টকার্ট রাস্তা নাই। তার কৃপা পেতে হলে কর্ম দিয়েই তার মন জয় করতে হবে। সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এই নেতৃত্বগুণে গুণান্বিত হতে হয়। হাক্কানীতে, যে হাক্কানীর বৃহত্তর স্বার্থে, প্রতিদান প্রত্যাশা না করে কল্যাণমুখী চিন্তার দ্বারা সচেতনভাবে কর্ম সম্পাদন করে এগিয়ে যেতে পারবে সেই নেতৃত্বগুণে গুণান্বিত হবে।

কোন একদিন আমার শ্রীগুরু বলেছিলেন, হাক্কানী পথের যাত্রী হতে হলে প্রেমময় হতে হবে, দৃষ্টিকে সামলে চলতে হবে সচেতনভাবে। আত্মকর্ম বিশ্লেষণে চলতে হবে। জগতে অন্যের বিচার করতে গেলে বিচ্যুতি আসবেই। লাইন থেকে ছিটকে পড়বেই। লক্ষ্যে যাওয়ার জন্য আমাদের গাইড হলো সাধকদের বাণী। সেই বাণীগুলি বিশ্লেষণ করে পথ চললে লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হবে।

বাহাদুর ব্যাপারী বলেন, নেতৃত্বের মধ্যে আছেন নেতা এবং তাঁর গুণ। আমার ক্লাসেও এমন একটা বিষয় আছে-লিডারশীপ। এ বিষয়টি আমাকে পড়াতে হয়- প্রতি তিন-চার মাস অন্তর অন্তর। বিষয়টি নিয়ে এর আগে আমি চিন্তা করার সুযোগ পেলে আলোচনা এক ধরনের হতো। নেতা ও নেতৃত্ব নিয়ে আমরা অনেক কথা বলতে পারি। কিন্তু আমি বলি, যার অনুসারী আছে তিনি নেতা। অনুসারী তৈরি করতে পারেন বলে তার যে-যোগ্যতা সেটিই নেতৃত্ব। আমি দেখেছি ব্রেন্ডিং অব মিশ্রণÑ যাপিত জীবনের নেতৃত্ব এবং আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণে যে নেতৃত্ব তা পৃথিবীর সেরা হয়। হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের যে চিন্তা আমার মতে সেটাই পৃথিবীর সেরা।

অনুসারী তৈরি করতে হলে, নেতার কি কি গুণ থাকতে হয়, কি কি যোগ্যতা থাকতে হয় তা আলোচনা করা যায়। নেতার যে-যোগ্যতা, সে শুধু সামনের দিকে দেখে। কতদূর পর্যন্ত দেখতে পায় সেটাও বিষয়। নেতৃত্ব তো সেই জিনিষ তিনি যা করবেন সেটাই সঠিক। সে কোনো ফর্মাল পজিশনে থাকে না-ইনফর্মাল অবস্থায় থাকে। কিন্তু সে অনুসারী তৈরি করে। সে কোনো সিস্টেম মানে না, নিয়মে থাকে না। সে নিয়ম প্রতিনিয়ত তৈরি করে। সে মানুষের প্রতি লক্ষ্য রাখে- মানুষ কোন্ দিকে যাবে এবং কোন্ দিকে মানুষকে নিয়ে যেতে হবে। তাঁর লক্ষ্য শুধুই মানুষ। সে সঠিক কাজটি করে কি-না, কিন্তু সে যে-কাজটি করে সেটিই সঠিক, মানে সে-কাজটি করে ফেলবে সেটিই সঠিক। নেতৃত্ব তো সেই জিনিষ সে যা করবে তাই সঠিক। নেতৃত্বের যে গুণাবলী এসেছে তার প্রথমেই বলতে হবে যে তার ভেতরে যে ইচ্ছাশক্তি সেখানে নেতৃত্ব দেয়ার ইচ্ছা তার তৈরি হয়েছে কি, হয়নি। এই ইচ্ছা তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়েই সে এ জগতে প্রবেশ করবে এবং তার মধ্যে সততার একটি সম্মিলন থাকতে হবে। এই সততা কোন্টা? আমরা বলি, ‘সত্যমানুষ হও, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।’ আর সত্য মানুষ চাই। এই সত্য সেই সত্য, আপনার আমার সকলের সকলের সত্য। যে-জায়গায় থাকি, যে-অবস্থানে থাকি, যে-মাটির ধান খাই, যেখানকার পানি খাই, যে বাতাস নিই, তার যে ডিএনএ-আরএনএ, এর যে ক্যারেক্টার, সেই ক্যারেক্টারের মধ্য দিয়ে আমার ভেতরে যে ক্যারেক্টার তৈরি হয় তাকে ধারণ, পালন এবং লালন করার মধ্য দিয়ে, আমাদের মধ্যে দিয়ে যে-জিনিষ তৈরি হয় তাকে এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় আমার সততা। যে-সততার জন্য আমরা এখানে এসেছিলাম, মহান সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ আমাকে একদিন গল্প করতে করতে বললেন,‘অলি-আল্লাহও হওয়া যায় না  যদি দেশকে ভালোবাসা না-হয়, দেশি ভাষায় কথা বলা না-হয়, এসব না থাকলে নেতাও হওয়া যায় না, নেতৃত্বও দেয়া যায় না। আমরা সৌভাগ্যবান এ জন্য যে, এই জায়গায়, এই চিন্তন বৈঠকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলাপ শুনেছি। এটিই পৃথিবীর সত্য। এই সততা এবং এর যে সম্মিলন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই নেতৃত্ব।

আমরা অনেক সময় ক্যারিশ্মা-তার মানে সম্মোহনী ব্যাপার, সেটি যখন একজন মানুষের ভেতরে-যে ইলেক্ট্রন নিজের মধ্যে আছে তার একটি ট্যাম্পারেচার তৈরি হয়। এর বাইরে এবং ভেতরেও অন্য একটি চরিত্র তৈরি হয়। নেতৃত্ব দেয়ার কারণে, এসব ধারণ করার মধ্য দিয়ে একটি সংযোগ তার নিজের মধ্যে তৈরি হয়। ফলে তার ভেতরের চরিত্রের যে পরিবর্তন সেটা দেখলে তার শান্তি লাগে, ভালো লাগে। তাঁকে অনুসরণ করতে মন চায়, তাকে অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে নিজের মধ্যে নিজের শান্তি, নিজের স্বস্তি দিয়ে পায়-সেই রকমের যোগ্যতার মধ্য দিয়ে আমরাও আছি, আমরাও থাকবো। আমরা এখানে আসলে তিনি আমাদের কথাগুলোও বলে দিতেন। নেতা কোনো স্পেসিফিক বিষয়ে খুব ভালো জানেন এবং ওই বেশি জানার মধ্য দিয়েই তার সব জানা হয়ে যায়। ফলে ওই স্পেশিফিক বিষয়গুলো জানার মধ্য দিয়েই এগিয়ে নিয়ে যায় তার সকল কর্মকা- এবং সেখানেই তাঁর তৈরি হয় সকল জানা-এক বিষয়ে জানার মধ্য দিয়ে সকল জানা। যেমন-জাতীয়তাবাদের চরম বিকাশের নাম আন্তর্জাতিকতাবাদ- যেকোনো বিষয়ে নেতৃত্ব শুরু হলেই সে সকল বিষয়ে নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। কারণ, তাঁর ভেতরে অটোমেটিক্যালি একটি রিফ্লেক্স অব মাইন্ড তৈরি হয় এবং তিনি দিতে থাকেন। নেতার এই চরিত্র প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সঠিক কাজটি তিনি করতে থাকেন। দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী-প্রতিনিয়ত, প্রতি মূহুর্তে তাঁকে সিদ্ধান্ত দিতে হয়Ñতাঁর সবগুলো সিদ্ধান্তই যেন সঠিক হচ্ছে। সেকেন্ডে সেকেন্ডে তিনি পরিবর্তন হচ্ছেন-এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে। কখনো দলীয় অবস্থান, কখনো রাষ্ট্রীয় অবস্থান-যেকোনো অবস্থানে থাকেন তিনি সঠিক সলিউশন দাঁড় করান। এর একটা সংযোগ আছে।

নেতৃত্বে সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু বললেন,  ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’- মানুষ দাঁড়িয়ে গেলো সশস্ত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এবং দেশ স্বাধীন হলো। এই যে আত্মবিশ্বাসী ভাবÑআমিই পারি, আমরাই পারি-এটিই নেতৃত্বের একটা বিশাল গুণ। ফ্লেগজিবিলিটি এবং অ্যাডাবটিবিলিটিও নেতৃত্বের বড় গুণ। নিজের জায়গার ওপর, নিজের সত্ত্বার ওপর দাঁড়ালে কাজ করা যায়। বঙ্গবন্ধু এই জাতিকে তৈরি করেছেন। এখানে বাঙালি জাতি ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র ছিল না। বঙ্গবন্ধু এই জাতিকে দিয়ে একটি রাষ্ট্র তৈরি করে ফেলেছেন-এটিই বঙ্গবন্ধুর বড় গুণ।

এই দেশ আর এই পৃথিবীর রাজনীতিতে, আধ্যাত্মিকতা ও যাপিত জীবনের যে সংমিশ্রণ তার মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব হলে সে নেতৃত্ব পৃথিবীর মানুষকে কল্যাণ এবং মঙ্গল দিতে পারবে। এ চিন্তন বৈঠকে যে নেতৃত্বের কথা বলি, সেখানে দেখেছি, এখানে যারা কথা বলেন তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিন্তা বাঙালির কল্যাণে, পৃথিবীর ৮ শ’ কোটি মানুষের কল্যাণে। বাঙালিকে পৃথিবীর বুকে তুলে দেওয়ার জন্য যে নেতৃত্ব বাংলাদেশ দিয়েছে, ফেসবুকের কল্যাণে আমরা জেনেছি, পৃথিবীতে আধ্যাত্মিক জগতে নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ-এ কথা কে শেখালো আমাকে? কে দেন সেই নেতৃত্ব – অবশ্যই তিনি আপনার আমার সবার গুরু-সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট। এই সাধক বাংলার নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকেই দেখতে চান। এই সাধক-এঁর আশীর্বাদুপষ্ট শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের চারিদিকে আজ যে পুষ্পের হাসি, আজকে বাঙালিত্ব আমাদের মাঝে যে টিকিয়ে রয়েছে তা প্রমাণ করে ব্রেন্ডিং অব স্পিরিচুয়েলিটিকে। ‘তুমি কে? আমি কে?.. বাঙালি বাঙালি’, চারিদিকে আগুন, আর বাংলাদেশে শান্তি-প্রমাণ করে এই নেতৃত্ব, এই চিন্তন বৈঠকের গুরুত্বকে।

শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলউদ্দিন আলাউদ্দিন বলেন, সারাবিশে^ই চলছে নেতৃত্ব। নেতৃত্বহীন কোন জগত নেই। কোন একটি ক্ষণ নেই। সারাবিশ^ জুড়েই নেতৃত্ব নিয়ে চলছে আলোচনা। কেউ পরিবার চালাতে, কেউ সমাজ চালাতে, কেউ রাষ্ট্র চালাতে, কেউ চুরি করতে, কেউ যুদ্ধ করতে। যে যেই কাজ করতে চায় সে কাজের নেতৃত্বগুন তাকে অর্জন করতে হয়।

নেতৃত্ব কি? নেতৃত্ব মানে-পথ প্রদর্শন, অগ্রগামিতা, অগ্রণী ভূমিকা পালন, পরিচালন করার যোগ্যতা, ক্ষমতার প্রকাশ, প্রধান ভূমিকা পালন, নায়কোচিত আচার। নেতৃত্ব মানে ভাল ও স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্ম, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কর্ম, দক্ষভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতা। নেতৃত্ব মানে স্ব-উদ্যোগী হওয়া, স্বাধীনভাবে কাজ করার যোগ্যতা।

নেতৃত্ব কে দিতে পারে? সুনির্দিষ্ট বিষয়ে যে যোগ্য, নতুন সৃষ্টির সৌন্দর্য যে আগে থেকেই দেখতে পায়, যেকোন বিষয়ে দুর্বলতাগুলি যে চিহ্নিত করতে পারে, নিজের উপর যার আস্থা আছে, আপন যোগ্যতার পরিমাপ যার জানা আছে। নেতৃত্ব তিনিই দিতে পারেন যিনি হাজারো লক্ষ্য ও কর্মের ভীরে আপন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য চিহ্নিত করতে পারেন। আবার নেতৃত্ব তিনিই দিতে পারেন যার কোন লক্ষ্য নেই কিন্তু মানবতার কল্যাণে যেকোন স্থানে, যেকোন সময় জ¦লে উঠতে পারেন নিজের প্রয়োজনের বিচার না করে বরং পরার্থে। নেতৃত্ব তিনিই দেন যিনি স্বার্থবোধহীন, আবার একই সময়ে সবচেয়ে বেশী স্বার্থপর আপন লক্ষ্য বিন্দুতে পৌঁছার জন্যে।

নেতৃত্ব তিনিই দেন যিনি ধ্বংস করার সৌন্দর্যকে আপন উপলব্ধিতে দেখতে পান এবং যাবতীয় কুৎসিত ধ্বংস করে দিয়ে নব সুন্দর সৃষ্টির দিকে ব্যাকুলভাবে ধাবমান। স্থায়ী ভাব, স্থায়ী বিষয় যার লক্ষ্য অস্থায়ী ভাব চিন্তা বিষয়কে ধ্বংস করতে পারলেই স্থায়ী সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। আল্লাহ শ্রেষ্ঠ ধ্বংসকারী। একজন প্রকৃত নেতাও কিছু বিষয়কে ধ্বংস করেন। যেমন- নেতা ধ্বংস করেন- হতাশা, লোভ, ক্রোধ, অজ্ঞতা, অলসতা, ভুল, অকৃতজ্ঞতা, কাপুরুষতা, বোকামী, নিষ্ঠুরতা, ক্ষীণদৃষ্টি, দারিদ্রতা, মিথ্যা এবং অহংকার। নেতা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করেন এবং অসংখ্য যোগ্যতার মাঝে কোনটি করার প্রবণতা বেশী সেটিই চিহ্নিত করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেন।