All posts by bartaman

এমন তো কথা ছিল না


নজরুল ইশতিয়াক।। এমন তো কথা ছিল না। তবু সব কথা, সব সময় পূরণ হয়না, চাইলেও পূরণ করা যায় না। কথা দিয়ে কথা রাখার ক্ষমতাও থাকে না। 

কথা তো ছিল ২১, ৪১ সালের রূপকল্প অনুযায়ী সব পেয়ে যাবো আমরা। ১০০ বছরের ডেল্টা প্লানও আলোর মুখ দেখবে কোন এক সময়। এ জন্যই রাজনীতি কিংবা সমাজিক চরিত্রের-সক্ষমতার উন্নয়নের দিকে না তাকিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকটিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সমাজে তীব্র বৈষম্য, মুর্খতা, পশ্চাৎপদতাকে রঙিন কাগজে মুড়িয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে নানা নামে। কিছু ভাতা কার্যক্রম দিয়ে ভাতের বদলে লজেন্স মুখে পুরে ঘুম পাড়ানী গান শোনানো হয়েছে। 

ফেসবুক, ইউটিউব নির্ভরতা, হুজুরের বয়ান আর নেতা কর্মীদের দাপটে ফাঁকা মাঠে একের পর এক গোল দেয়ার মহড়া চলেছে এতদিন। বিকল্প সামাজিক -রাজনৈতিক শক্তির অভাব কিংবা চেনা কিছু রাজনৈতিক দলের দস্যুপনার ক্ষত তো ছিলই মানুষের মনে। সেসব ভয়ংকর দুঃশাসনের কথা ভেবে দোদুল্যমান জনগণ মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নিয়েছে সব।

আপাতদৃষ্টিতে সাময়িক উন্নয়ন বিড়ম্বনাকে জনগণ মেনেও নিয়েছে। 

বর্তমান সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে বহু সমালোচনা, বহু কটু কথা শোনার পরও কোন দিকে না তাকিয়ে একটার পর একটা মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নিঃসন্দেহে, গুরুত্বপূর্ণ সেসব প্রকল্প দেশের সার্বিক উন্নয়নেই গৃহীত । এগুলোর সফল পরিসমাপ্তি হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশাল এক মাইল ফলক ছুয়ে যাবে দেশ। কিন্তু করোনা ঝড়ে বিপর্যয়ের শংকা তৈরী হয়েছে। বড় সংকট দেখা দিয়েছে।

আমরা বারবার বলেছিলাম সবার আগে দরকার রাজনীতির উন্নয়ন। রাজনীতির উন্নয়ন মানে সমাজ- সংস্কৃতি- দর্শনের উন্নয়ন। যাতে সমাজ যে কোন ঝড় সামলে নিতে পারে, একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে। সমাজিক এন্টিবডি তৈরী হয়। ব্যক্তি অর্থনৈতিক ও মানসিক ভাবে শক্তিশালী হয়। বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে। দেশপ্রেমকেই অগ্রগণ্য করে দেখার সুযোগ পায়। অভ্যন্তরীণ  প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে মানুষ মানবিক হয়, সহমর্মী হয়, বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীকে চিনতে পারে। সম্মিলিত ভাবে বেঁচে থাকতে পারে। সরকারের যে কোন পদক্ষেপ মেনে নেয়ার জন্য উপযুক্ত হতে পারে । সামাজিক দায়বদ্ধতা দিয়ে সফল করে তুলতে পারে যে কোন জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ। 

এই করোনাকালীন সময়ে দেখা গেল সমাজ কতটা অস্থির, কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়ে আছে। ভাতের জন্য হাহাকার, গ্রামে ফিরছে অনেকে। কর্ম হারিয়ে ফেলছে। চাকরী বাঁচাতে জীবনকে বাজী রেখে ছুটছে। প্রনোদোনা আর প্রনোদোণা নির্ভর হয়ে পড়ছে। মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্তরা ধার দেনা করে কোন রকমে মুখ লুকিয়ে বেঁচে আছে। করোনা ঝড়ে মুহুর্তেই উন্নয়নের মহাজোয়ারে শক্ত উচু ভাটার প্রাচীর তৈরী হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে করোনা মোকাবেলায় সমাজ প্রস্ততি নেয়ার জোরালো সামর্থ্য রাখেনা। কারণ সমাজের সেই শক্তি নেই। শক্তিমান করার কাজটি হয়তো এতকাল। 

নিতান্তই গভীর এক সংকটে আমাদের সামাজিক জীবন। হাজার হাজার মাদ্রাসাগুলোকে হয়তো কিনে ফেলবে দুষ্টু চক্র। অস্থিরতার বহমাত্রিক পদধ্বনি শুনতে হতে পারে সহসাই। 

কেবল মাত্র কিছু বৃত্তশালী লুটেরা আর সরকারী কর্মকতারাই নাকে শর্ষের তেল দিয়ে ঘুমাতে পারেন। কারণ এরাই তো মিলেমিশে সরকার ও সমস্ত সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

এমনকি বড় কোন সামাজিক বিদ্রোহ হলে কেউ কেউ পালিয়েও যেতে পারেন বিদেশে। অনেকের সেকেন্ড হোম থার্ড হোম রয়েছে। রয়েছে ব্যক্তিগত বিমান। বিদেশের ব্যাংকে জমা রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। একই সাথে পরিস্থিতি জটিল করার মহান দায়িত্ব পালন করার চক্র তো সক্রিয় রয়েছেই। তাহলে হলোটা কি এতদিন? ফল ভোগ করার উপযোগিতা এত দ্রুত দেখা দিলো? 

আমরা যখন অবকাঠামোগত বৈষয়িক উন্নয়নের পরিবর্তে রাজনীতির উন্নয়নের কথা বলেছি, লিখেছে, তা কারো কর্নে পৌঁছায়নি এটা নিশ্চিত। হয়তো বর্তমান রাজনীতি একথার গভীরতা অনুধাবনেও অক্ষম। 

তবে বলতে শুনিছি মাহাথীর মোহাম্মদ মডেল ধরেই নাকি সরকার এগুচ্ছে।  

আমরা বলেছিলাম এটা ম্যালেয়েশিয়া না, এটা বাংলাদেশ। স্থান-কাল-পাত্র ভেদ ভিন্ন। আর সব কিছু সব সময় কারো দেখাদেখি  সফল নাও হতে পারে। 

বলেছিলাম উন্নয়নের নামে গরু মেটাতাজাকরণ করে আখেরে লাভ হবে না! আমাদের দরকার সামাজিক জাগরণ, মূল্যবোধের জাগরণ। 

জোড়াতালি দিতে দিতে এক সময় আর জোড়াতালি দেয়ার জায়গা থাকে না।

গত কয়েক বছরে ডিজিটাল ডিজিটাল বাংলাদেশ শ্লোগান বাজারজাত করা হয়েছে। আমরা প্রশ্ন তুলেছিলেম ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে কিছু হয় না। প্রযুক্তি কেবল সেবা কর্মটিতে সহায়তা করতে পারে, প্রযুক্তি কখনো মুখ হতে পারে না। মুখ থাকবে মুখের জায়গায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার আমেরিকায় এক অনুষ্ঠানে বলেও ছিলেন- কল্যাণমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। তার সেই কথাটি মোসাহেব তাবেদাররা কখনো প্রচার করেননি।

কে শোনে কার কথা। আমরা লিখে চলেছি বিবেকের বোধ থেকে সত্য প্রকাশের অনিবার্যতা থেকে। করোনা ঝড়ে যেখানে দারিদ্র্য বাড়বে, দেশে বিদেশে নতুন করে জীবন জীবিকা হারাবে ৩/৪ কোটি মানুষ। সেখানে বড় বড় প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। 

প্রকৃতি এবং জীবন সব সময় রহস্যময়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই মানুষ এতদূর এসেছে। এই যে লড়াই করার ক্ষমতা এটিই মানুষের শক্তি। 

কিন্তু না খেয়ে, গাছের নিচে বসে থেকে লড়াই চলবে না। আবার আস্থাহীনতার সংকটে নেতৃত্বকে অমান্য করার বিষয়টিও কাজ করে।

একই সমাজে কেউ খাবে, কেউ জমিয়ে রাখবে, এটি মানুষ বেশিদিন মেনে নিতে পারে না। সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। 

এমন এক পরিস্থিতি তৈরী হয়, যাতে মনগড়া সব উন্নয়ন ভেস্তে যায়। বালির বাধের মতো। এটিই তো সামাজিক প্রবাহ। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন- আমার বাঙ্গালিরা সব বুঝতে পারে, কারো রক্তচক্ষুতে মাথা নত করে না। প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন- বাঙালি কিছুদিন হয়তো চুপ থাকে কিন্তু জেগে উঠে অল্প সময়েই, অধিকার আদায় করে নেয়। 

উন্নয়ন তো দর্শন। সমাজিক শক্তি, চরিত্রকে বিচার করেই তো উন্নয়ন পরিকল্পনা। 

এ জন্য তো নেতার আসন জনগণের মনে রচিত হয়। রাজনীতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। রাজনীতি বাদ দিয়ে সুশাসন উন্নয়ন টেকসই হয়না। সত্য ছাড়া রাজনীতি বেশিদিন টেকে না। 

বহু আগে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন- বুড়োদের দিয়ে ভারত স্বাধীন হবে না।তিনি আমলাতন্ত্র কে ছাগলের সাথে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন দরকার তারুণ্য নির্ভর শক্তির। একই সাথে তিনি বলেছিলেন এই তারুণ্য শক্তি হবে সমাজ থেকে উঠে আসা, সমাজকে চেনে এমন তরুণরা।  উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে দেশ/ এখন সময় বাংলাদেশের। কথাগুলো থাকবে কাগজে কলমে। কিন্তু পথ হারাবে না বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি।

বাজেট ভাবনা ও বাস্তবতা

হাসান জামান টিপু 

করোনার আঘাতে কঠিন বিপদে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি দেশ। মাঝ দরিয়ায় ঝড়ে পড়লে যে রূপ ঠাহর করা যায় না কোথায় তীর বা কোন দিকে দিশা,এখন সকলের অবস্থাই তাই। এখন শুধুই টিকে থাকার লড়াই। 

বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থা সকলে অবহিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রচুর মেগা প্রকল্প নিয়ে নূন্যতম গণতন্ত্র নিয়ে বিরোধীদলহীন অদ্ভুতভাবে দেশ এগিয়ে চলছিলো। এতোদিন ইকোনোমিস্টসহ বিভিন্ন পত্রিকা তাই লিখছিলো- অর্থনৈতিক সকল সূচকে আমরা উড়ন্তগতিতে বাংলাদেশ । টাকা সারাদেশে উড়ছিলো, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছিল, কানাডায় বেগম পল্লী, মালয়েশিয়ায় ও দুবাইতে সেকেন্ড হোম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দূর্নীতিববাজদের উপনিবেশ তৈরী হচ্ছিল। সুইচ ব্যাংকে জমা হচ্ছিল এই গরিব দেশের কোটিপতি লুটেরাদের টাকা। করোনায় সব তছনছ হয়ে গেল। বিদেশ থেকে আমাদের শ্রমিক রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ফেরত আসছেন দলে দলে, গার্মেন্টস এর অর্ডার একে একে বাতিল হচ্ছে, আমাদের বায়ার জায়ান্ট কোম্পানীগুলি একে একে দেউলিয়া যাচ্ছে, রপ্তানীর সকল খাত বন্ধ নতুন বিনিয়োগ আসা শূন্যের কোঠায়। এতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে আমাদের অর্থমন্ত্রী যে একটা বাজেট দিতে পেরেছেন এটা বিরাট সাফল্য। 

একটা পরিকল্পনা তৈরী করার জন্য একটা সুস্থ বা স্বাভাবিক পরিবেশ অগ্রগন্য এই করোনাকালের ঝড়ে সে অবস্থা তিরোহিত। টানেলের ওপারে শুধুই অন্ধকার,আলো কোথাও নাই। এই অবস্থায় যে বাজেট অর্থমন্ত্রী পেশ করেছেন কিছু সমালোচনাসহ প্রশংসাই করবো|

সবচেয়ে যে বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে তা হলো, কালো টাকা সাদা করা বিষয়ে। টাকার আবার কালো আর সাদা কি? এই টাকা কি শুধুই দূর্নীতির টাকা? এগুলি কি অন্য দেশের টাকা?  

অর্থনীতিবিদ এবং আয়কর আইনজীবীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে কালো টাকা বলতে সে সম্পদ বা আয়কে বুঝায় যে সম্পদ বা আয়ের বিপরীতে কর প্রদান করা হয়নি৷ কিন্তু এর আবার দু’টি ভাগ আছে বলে তাঁরা জানান৷ এর একটি হলো বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ, আরেকটি হলো অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ৷

তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, ‘‘আইনে কালো টাকা হলো অপ্রদর্শিত আয়৷ যে আয়ের কর দেয়া হয়নি৷ সেই আয় বৈধ এবং অবৈধ দুটোই হতে পারে৷ কিন্তু এনবিআর আয়কর নেয়ার সময় আয়ের উৎস জানতে চায়না৷ এখানে আয় বৈধ না অবৈধ সেটা আলাদা করার সুযোগ নেই৷ তবে খরচের খাত যখন দেখানো হয় তখন তার আয়ের উৎস বলতে হয়৷ এটি আয়কর দেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়৷’’

বিদেশের নয় টাকাগুলি দেশের। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় সরকার কালো টাকা টাকাকে সাদা করতে এতো ইতস্তত করে কেন? কালো টাকা সাদা করার বিধান আগেও ছিলো। ফখরুদ্দিন সরকারের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও সাবেক প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান কালোটাকা সাদা করেছিলেন সরকারের আইন মেনেই। গত বাজেটেও এই সুযোগ ছিলো সেটা উচ্চ কর হারের ফলে কালো টাকার মালিকরা নিরুৎসাহিত বোধ করতো। আর টাকার প্রবাহ বেশী হলে মুদ্রাস্ফিতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে, দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার ব্যাপার থাকে। 

প্রশ্ন থাকে এই টাকা থাকে কোথায়? অবৈধ কালোটাকা বেশীর ভাগই পাচার হয়ে যায়, কিছু টাকা থাকে সিন্ধুকে, তোষকের নীচে, আলমারীর উপরে, ফলস সিলিং এর ভিতর ও চিপায় চাপায়। কিছু থাকে বেনামী একাউন্টে, আত্নীয় স্বজনের কাছে। অর্থাৎ দেশে থাকে।  

সত্যমানুষ শেখ হানিফ এঁর সাথে একদিন এসব ব্যাপারে কথা হচ্ছিল। উঁনি বলেছিলেন, যারা বিদেশে টাকা পাচার করে তারা জারজ, দেশের টাকা দেশে থাকলে দেশের কাজে লাগালে দেশ উন্নতি হবে, কর্মসংস্থান হবে।” উনি বলেছিলেন, “দূর্নীতি তো হবেই এটাকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়,এই টাকাকে অস্বীকার করার জো নাই। ” সেই সুযোগ কে অবারিত করেছে সরকার দেশের প্রয়োজনেই। সত্য মানুষের অভিপ্রায় এভাবেই প্রতিফলিত হলো। 

দেশে যে দূর্নীতি হচ্ছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না, টাকা যে হাজারে হাজারে পাচার হচ্ছে তা সাবেক অর্থমন্ত্রী স্বীকার করে গিয়েছেন। এই টাকাকে আটকানো প্রয়োজন, টাকাকে সচল করতে হবে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এই টাকাকে হিসাবের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। দেশের ঘোরতর অন্ধকার সময়ে এই সিদ্ধান্ত আমি ইতিবাচক হিসাবেই নিবো। 

আপনি হয়তো বলবেন দূর্নীতিকে জিরো টলারেন্স বলে কলো টাকাকে সাদা করবেন এটা সাংঘর্ষিক। আমি তা মনে করি না। দূর্নীতি কেন হয় সে বিষয়ে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। সিস্টেমে বহু ফাঁক ফোকর আছে নীতির বিচ্যুতি ঘটানোর সেই ফাঁক দিয়ে হয় দূর্নীতি। সেই ফাঁক বন্ধ না করে জিরো টলারেন্স রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি ভিন্ন কিছু নয়। 

 সমাজে যে অবৈধ টাকা আছে একথাটা অস্বীকার করার অর্থই হলো আপনি জেগে ঘুমান। বিশেষজ্ঞ দের ধারণা বাংলাদেশের মোট বাজেটের দ্বিগুন, তিনগুন টাকা থাকতে পারে হিসাবের বাইরে কালো টাকা হিসাবে। এতো টাকা বাইরে রাখা যে কোন সরকারের জন্যই বিশাল ঝুঁকির কারণ। সেই ঝুঁকি কোন সরকারই নিতে চাইবে না স্বাভাবিক কারণে।

আধুনিক মালয়েশিয়ায় রূপকার ড.মাহাথির মোহাম্মদ একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন এক  প্রশ্নে একজন বললেন আমাদের দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে, কিভাবে উন্নয়ন হবে অর্থনীতির?তিনি বললেন, পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশে বিভিন্ন মাত্রায় দূর্ণীতি বিদ্যমান রয়েছে। সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত দেশ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে দুর্ণীতি দুই প্রকারের। টেবিলের উপরে আর টেবিলের নিচদিয়ে, দ্বিতীয় পন্থায় দুর্ণীতি করলে কিছুটা হলেও মানুষ শংকিত থাকে, লজ্জিত থাকে এবং এ প্রকারের দুর্নীতি নিয়ে খুব বেশি আশঙ্কা নেই। প্রকৃতপক্ষে প্রথম প্রকারের দূর্ণীতি অর্থাৎ নির্লজ্জ দূর্ণীতিকে দূর করতে হবে, যার মাধ্যমে অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। (তথ্য সূত্র ঃড.নূরল ইসলাম তপন, আমার শ্রদ্ধেয়)

এই সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারে সরকার, অগ্রসর ব্যাক্তিবর্গ, মিডিয়া। আমরা কি করো প্রতি নীতিবাক্য প্রদানকরার মতো ব্যক্তিগতভাবে নীতিবান? 

নিজের কথা- ৩১

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ।।

“কাম করে গপ করা ভালা” অমৃতকথাটি বলেন,সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। শ্রমের মর্যাদা দিতে পারলে জীবনের উন্নতি নিশ্চিত ভাবে লাভ করা যায়। অন্যথায় জীবন চলার পথে ব্যক্তি গতানুগতিক জীবন যাপন করে থাকে। সূফী সাধক আগ্রহী অনুসারীবৃন্দের উন্নত জীবন যাপন করার ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা দেন আলোচ্য বাণীতে। বাণীর প্রথম শব্দ “কাম” । এ “কাম” শব্দটির অর্থ – কাজ করা। জীবন একটা চলমান সত্ত্বা। এ চলমান সত্ত্বাকে কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে কাজ করার বিকল্প কিছু নেই। কারণ স্রষ্টার নিকট থেকে এ পৃথিবীতে আমরা সবাই আগমন করেছি। এ পৃথিবী থেকে আমরা সবাই একদিন প্রস্থান করব। প্রস্থান কালে আমাদের অবলম্বন অন্য কিছুই থাকবে না কেবলমাত্র আমাদের কৃতকর্মের হালনাগাদ ফিরিস্তি। স্রষ্টা আমাদেরকে শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছেন। তাই আমরা শ্রমের মর্যাদা দিতে পারলে জীবনের উন্নতি হবে। আমাদের জীবনের উন্নতি বলতে বুঝায় আমরা কতটা স্রষ্টার কৃপায় তাঁর বিধিমালা অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারি। একমাত্র সফল ব্যক্তিরা উন্নত জীবন যাপন করতে পারেন। আর তাঁরাই সফল ব্যক্তি যারা জীবনে শ্রমের মর্যাদা দিতে পারেন। কিভাবে শ্রমের মর্যাদা দিতে পারি? কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জন ব্যতীত ঐ কর্ম সম্পাদনের সময়ানুবর্তীতা স্থান উপযোগিতা বিষয়ে কে তাগিদ দেবে আমার জানা নেই। এমতাবস্থায় কিভাবে শ্রমের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারা যাবে। যে ব্যাক্তি চা খাওয়া পছন্দ করেন, কিন্তু তা কিভাবে তৈরি করা যায় তা জানেনা। পৃথিবীর অন্য কেউ কি তার পছন্দের চা তৈরি করে খাওয়াতে পারবে? সেই ব্যক্তি পারবে যে সেই মত চা বানানোর জন্য পরিমিত জ্ঞানার্জন করেছেন। এ জন্যই শান্তিময় জীবনযাপন করার জন্য জ্ঞানার্জন অপরিহার্য শর্ত ধরা হয়। জ্ঞানার্জন কি? জীবন ভোর অন্যের বানানো চা পান করে গেলাম। সে চা এর মজাদার স্বাদের অনুভূতিও ধরে রাখলাম, এটা ঐ চা বানানো ব্যক্তির জ্ঞানার্জন হলেও সে চা ভোগকারী ব্যাক্তির জ্ঞানার্জনের কোনো বিষয় নয়। যতদিন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি তার পছন্দের কোন বিষয় যতবার ইচ্ছা তৈরি করার অভিজ্ঞতা অর্জন না করবে ততদিন পর্যন্ত সে ব্যক্তি সে বিষয়ে জ্ঞানার্জনের কোনো সুযোগ পেতে পারে না। কিন্তু আফসোস আমাদের জীবনের পরনির্ভরশীলতা এতোই বেশি যে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পরনির্ভরশীল জীবন যাপন করে থাকি। বিপুল পরিমাণ অজ্ঞতার কারণেই কর্মে একদিকে যেমন আত্মবল অনুভব করি না অন্যদিকে সঠিক সময়ে সঠিক কর্ম সম্পাদন করতে পারি না। কিন্তু প্রকৃতির সকল জীবজগতের দিকে তাকিয়ে দেখল দেখা তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনের জীবিকা বাসস্থান পরিবার প্রতিপালন স্বাস্থ্য সচেতনতা বিনোদন এ সকল কর্মের কোন বিষয়েই অন্যের উপর নির্ভরশীল না থেকে প্রত্যেক বিষয়ে অত্যন্ত সচেতনভাবে নানান প্রতিকূল পরিবেশে মোকাবেলা করে নিজেরাই নিজেদের জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান দিয়ে থাকে। এদের জীবন যাপন কার্যক্রমের মাঝে কাম ফেলে গপ করে চলার কোনো অবকাশ দেখা যায় না। স্রষ্টা মানুষ সম্পর্কে তার বাণীতে মন্তব্য করেন, “আমি মানুষকে কতইনা চমকপ্রদভাবে সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তারা সৌন্দর্যের অবস্থানে না থেকে অধঃপতনের অতল তলে নিপতিত হলো।” স্রষ্টা সূক্ষ্মভাবে কর্মীদের কর্মফল দিয়ে থাকেন। কর্ম নির্ভর করে ব্যাক্তির আন্তরিকতার উপর। আন্তরিকতা বাহ্যিক লোক দেখানো কোন বিষয় নয়। আমাদের শরীর অন্য কিছুই পড়তে পারে না। আমরা চিন্তাশক্তির মাধ্যমে যা কিছু করতে চাই,তাই করার জন্য সাধ্যমতো আমাদের শরীর আমাদের সহযোগিতা করে থাকে। আমাদের নবীজি বলেন,” মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী কর্ম করে এবং কর্মফল পেয়ে থাকে।” কর্ম ফলপ্রসূ করার জন্য দরকার কর্ম বিষয়ক জ্ঞানার্জন করা অপরিহার্য শর্ত। কর্ম বিষয়ক জ্ঞানার্জন করা না হলে অন্যকে নকল করে মানুষ কর্ম করে থাকে। নকল করা কর্ম থেকে জ্ঞানার্জন করা কর্মের আনন্দ পাওয়া সম্ভবপর হয়না। শান্তি আসে নির্ভুল কর্ম করার উপযোগী জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে। তাই শান্তির জীবন যাপন জ্ঞানার্জনের উপর। জ্ঞানার্জন ব্যতীত মানুষ থাকে অন্ধ। আর অন্ধদের অন্যের উপর নির্ভর করে জীবন যাপন করতে হয়। তারা স্বাধীন জীবন যাপন করার আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে। জ্ঞানার্জন ব্যতীত কেহ নিজেকে ইসলামের অনুসারী বলে পরিচিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে তা বিবেকবানদের মুল্যায়য়ণ করার এখনই যথাযথ সময়।

‘আঙ্কেল আপনি কি হিন্দু’! কোথায় আমরা! কোন অভিমুখে!!

 সাগর সগীর

ফেইসবুকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি আমি অন্তত দু’জনের কাছ থেকে। সম্বোধন থেকে পরিস্কার যে এরা বাঙ্গালি মুসলমান তরুন প্রজম্মের প্রতিনিধি। একই ধরনের আরও প্রশ্ন ধেয়ে আসছে। এর উত্তর দেয়াটা এখনি প্রয়োজন মনে হওয়ায় এই লেখা। ফেইসবুক কমেন্ট বক্সে আমার ফেইসবুক কাভার ফটোর প্রেক্ষিতে করা প্রশ্ন ছিলো এটি।

 এনিয়ে প্রয়োজনীয় বিশদ উত্তর দেয়ার আগে প্রশ্ন কর্তাকে তাৎক্ষনিক কমেন্ট বক্সে যে উত্তর দিয়েছিলাম সেটা আগে উল্লেখ করে নেই। উত্তর হিসাবে আমি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম, স্যুট কোট পরা কাউকে দেখে (যদি জানা মতে তিনি বাঙ্গালি এবং/ অথবা বাঙ্গালি মুসলমান হন) তাকে কি জিজ্ঞেস করা যায় যে ‘ আপনি কি খৃষ্টান, আপনি কি ইহুদি ?’ অথবা কি জিজ্ঞেস করা যায় ‘আপনি কি বৃটিশ, আপনি কি ইউরোপিয়ান? আমেরিকান? কানাডিয়ান? ওয়েষ্টার্ন কেউ? প্রশ্নকর্তাকে অবশ্য এই প্রশ্নটি তাৎক্ষনিক করিনি যে  আপনি কি আপনি কি বৃটিশ? আমেরিকান? কারণ, তার প্রশ্নটাই ছিলো হুবহু ‘আঙ্কেল আপনি কি হিন্দু?’ একজন বাঙ্গালি আরেকজন বাঙ্গালিকে প্রশ্ন করছে অথচ সম্বোধন করছে ‘আঙ্কেল’! না বললো চাচা, না বললো মামা, বা না বললো ভাই!

মুর্তি নয় ভাস্কর্য –

আমার প্রোফাইল পিকচারের পেছনে দাঁড়িয়ে স্বামী বিবেকানন্দ, এ নিয়েও প্রশ্ন পেছনে মূর্তি কেন? তাৎক্ষনিক উত্তরে যা বলেছিলাম আরও একটু বিশদ করে এখানে তা উল্লেখ করছি ‘মুসলমান’ ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত এবং মার্কিনি প্রভুদের নির্দেশে ইরাকের ‘মুসলমান’ ক্ষমতাসীনরা ও তাদের পুতুল বিচারকরা ফাঁসিতে হত্যা করেছিলো ‘বাপের ব্যটা সাদ্দাম’কে (বাংলাদেশে গর্বের সাথে তাই বলা হতো, অন্তত এক শ্রেনীর মুসলমানদের মুখে)। সেই সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকের রাজধানী বাগদাদে স্থাপন করা সাদ্দামের সুউচ্চ ‘মুর্তি’ দড়ি বেঁধে টেনে নামানো হয়, গুঁড়ানো হয়। বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষকদের বৃহৎ সংগঠনের সেই সময়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং দেশে ইসলাম ধর্মের অন্যতম রক্ষক দাবীদার দৈনিক ইনকিলাব ‘মাওলানা’ মান্নান ছিলেন সাদ্দামের ‘বান্ধা কাষ্টমার’ এর মতই নিয়মিত ইরাকের রাষ্ট্রীয় অতিথি। জনাব মান্নান ছাড়াও দেশের সে সময়ের অনেক নাম করা সাধক কবি নজরুলের ভাষায় ‘মৌ-লোভী’র দলও একইভাবে সাদ্দামের জামাই আদরে আপ্যায়িত হতেন। এদের একজনকেও দেখা যায়নি, শোনা যায়নি সাদ্দামের ‘গর্হিত পাপ’ (!) এই মুর্তি স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন করতে, দেশে ফিরে নিন্দা করতে কিংবা একবার দেখে এসে ওমুখি আর না হওয়ার ঘোষনা দিতে। সাদ্দামের নিজ দেশে শীর্ষ স্থানীয় কোন মুসলিম ধর্মীয় নেতারাও এর বিরোধীতা করেছেন বলে শুনা যায়নি, জানা যায়নি। নিদেন পক্ষে তার প্রতিবাদ করে একজন ইরাকি ধর্মীয় নেতাও সাদ্দামের রোষানলে পড়েছেন, জেলে গিয়েছেন, অথবা অন্তত ‘মুর্তি’ পাপের প্রতিবাদে প্রতিবাদী হয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন তেমন কোন খবরও পাওয়া যায়নি।

আসলে ‘ মুর্তি’ গড়তে দিয়ে সাদ্দাম কোনই পাপ করেননি অথবা সে দেশে এর প্রতিবাদ না করে কেউই পাপী  হননি। কারন ওটি ছিলো ‘ মুর্তি’ নয় ভাস্কর্য। চলতি ধর্মীয় ব্যাখায় বলতে গেলে (যা দেশের মাদ্রাসা শিক্ষিত মোল্লাদের কাছ থেকে জানা যায়)  পূজা করার উদ্দেশে তা না নির্মিত হয়েছিলো না স্থাপিত হয়েছিলো। ওটা ছিলো শিল্প। শিল্পে ভাস্কর্যে না আছে কোন পাপ, না আছে কোন কদর্যতা, কিংবা না আছে কোন নোংরামি বা অশ্লীলতা। কিন্তু একথা কে বলবে কাকে বলবে? কে শুনাবে কাকে শুনাবে? যাকে বলবে যাকে শুনাবে তারা যে ‘মৌ-লোভী’ মতলবী  ধর্মজীবি  ধর্মব্যবসায়ীদের ‘মতলবী বয়ান’- এ বেঁহুশ হয়ে আছে, হয়ে চলেছে – বছর বছর নয় যুগ যুগ নয় শতক শতক ধরে! সাধক নজরুল প্রায় শত বছর আগে গভীর খেদে বলেছিলেন ” বিশ্ব যখন এগিয়ে চলে আমরা তখন বসে/ স্ত্রী তালাকের ফতোয়া খুঁজি ফেকা হাদিস চষে”।

আগে মানুষ না আগে মুসলমান না আগে হিন্দু-

প্রশ্নকর্তাকে এ প্রশ্নটিও করা হয়নি, যা বড়ই আফসোসের,  কোন্ প্রশ্নটি আগে তোলা উচিত,আগে তোলা জরুরী অথবা দরকারী – ‘আপনি আগে  একজন মানুষ না আগে  একজন মুসলমান কিংবা একজন হিন্দু’? একজন লোক হিন্দু বা মুসলমান কিংবা বৌদ্ধ বা খৃষ্টান যাই হোক না কেন প্রতিষ্ঠানের সমাজের রাষ্ট্রের এমনকি খোদ পরিবারেরও তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না (অবশ্যই প্রচলিত মুসলমান প্রচলিত হিন্দু বা প্রচলিত বৌদ্ধ খৃষ্টান অর্থে )। লোকটি যদি একটি অমানুষ হয়, কুমানুষ হয়, বে-মানুষ হয় ‘যেমনটি হয়ে থাকে, হয় হচ্ছে’  ঘুষখোর জোচ্চর প্রতারক খুনি লোভী হিংসুটে প্রতিহিংসাপরায়ন অসভ্য সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান অঞ্চল সমাজ এমনকি গোটা রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হয় অসুস্থ হয় অধপতিত হয়। এবং অবশ্যই বলার অপেক্ষা রাখেনা যে খোদ ওই বদ মানুষটি পথভ্রষ্ট লোকটি  তার নিজ পরিবারের কষ্ট যন্ত্রনা ও ক্ষতির কারন হয় এবং নিজেও হয় ধ্বংসপ্রাপ্ত। বলাবাহুল্য প্রকৃত মুসলমান, প্রকৃত হিন্দু, প্রকৃত বৌদ্ধ বা খৃষ্টান যিনি হন তিনি এসবের উর্ধে। কারন তিনি বা তারা আসলে কার্যত নিজ ধর্মের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে যথার্থই একজন মানুষ হয়ে উঠেন। কিন্তু ও বলে কোন লাভ নেই। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা থেকে (আমার জানার সুযোগ হয়েছিলো) বাংলাদেশী একজন প্রবাসী মুসলমান দেশে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছিলেন ‘অষ্ট্রিয়াতে ইসলাম আছে মুসলমান নেই আর বাংলাদেশে মুসলমান আছে ইসলাম নেই’। সতের কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে পনের কোটির উপর জন্ম সূত্রে মুসলমান। কোন এক দেশে দিনের বেলায় হারিকেন জ্বালিয়ে হাতে নিয়ে ঘুরতে থাকা এক লোককে কৌতুহলি এক লেখক জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘ আপনি দিনের বেলায় হারিকেন জ্বালিয়ে ঘুরছেন কেন? উত্তরে লোকটি বললো আমি খুঁজছি। আরও বিস্ময়ে লেখক জিজ্ঞেস করলেন খুঁজছেন? কি খুঁজছেন? লোকটি নির্বিকারে উত্তর দিলেন মানুষ খুঁজছি। ‘কোরআনের লন্ঠন নিয়ে’ বাংলাদেশে (যেহেতু বাংলাদেশ নিয়েই কথা হচ্ছে) ঘরে ঘরে গিয়ে ক’জন ‘কুরানিক মুসলমান’ পাওয়া যাবে তার হিসাব মনে হয় কম্পিউটারে বা খাতায় লিখে নয়, অঞ্চল ভেদে  আঙ্গুলে গুনেই করা যাবে। 

কি ধারণ করছি আমরা ?

অপর এক লেখক তার এক লেখায় জানিয়েছিলেন বাজার করতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে তিনি টের পান তার পিঠে কেউ একজন হাত বুলিয়েছে। তিনি যখন পেছন ফিরে তাকালেন দেখলেন স্বাভাবিক পোষাক পরা মাঝ বয়সি একজন লোক ততক্ষনে তার কাছ থেকে সরে অন্য আরেকজনের পিঠে হাত দিচ্ছেন। তিনি আরও লক্ষ্য করে দেখেন তিনি একই কাজ আরও কয়েকজনের ক্ষেত্রে করছেন। লেখক  তখন বাজার করা রেখে ওই লোকের পিছে পিছে ঘুরে এক পর্যায়ে তাকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘আপনি মানুষের পিঠে হাত দিচ্ছেন কেন? লোকটি উত্তরে বললো দেখছিলাম মেরুদন্ড আছে কিনা। হতভম্ব লেখক তখন জিজ্ঞেস করলেন কি দেখলেন, পেলেন? লোকটি দুঃখি ভাব নিয়ে বললেন, না একজনও না। নবী মোহাম্মদ কে মানদন্ড করে সেই মানদন্ডে যাচাই করতে গেলে ক’জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে আমি মুসলমান! দূরবীন বা অনুবীক্ষণ যন্ত্র লাগবে সেরূপ মুসলমান খুঁজে পেতে। ধর্ম পোষাকে নয়, আচার-অনুষ্ঠান নয়। জন্মগত পরিচয় বা নামে বা পদ পদবিতে নয়, এমনকি শুধু পালনেও নয়। ধর্ম ধারন করার বিষয় লালন করার বিষয় এবং সেই সাথে পালন করার বিষয়। আর সেখানেই প্রশ্ন হচ্ছে ‘ধারণ’টা কি করছি আমরা ? মুসলমানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে কোরআন কে কি ধারণ করছি? কোরআনের শিক্ষা কে কি ধারণ করছি? রাসুল  কে কি ধারণ করছি? রাসুল এর চরিত্র চারিত্রিক গুনাবলী  কি ধারণ  করছি? না কি ধারণ করছি, করে চলেছি  লোভ ঘৃণা হিংসা বিদ্বেষ পরশ্রীকাতরতা কিংবা বর্বরতা বা নৃশংসতাকে।

নামে মুসলমান কামে নয় !

আমার ফেইসবুকের কমেন্ট বক্সে আরেকজন প্রশ্ন করেছেন আপনি মুসলমান হলে আপনার নাম সাগর সগীর কেন? তিনি যা বুঝাতে চেয়েছেন তার অর্থ দাঁড়ায় সগীর না হয় বুঝলাম ‘মুসলমান শব্দ’ অর্থাৎ আরবী শব্দ কিন্তু সাগর? এতো  হিন্দু, হিন্দুয়ানা শব্দ। অর্থাৎ আমাদের অজ্ঞতা কতদূর পর্যন্ত  কত গভীর পর্যন্ত যে  শব্দও হয়ে, গেছে নামও হয়ে গেছে ধর্মীয় পরিচিতির কারন । কমেন্ট বক্সেই তাৎক্ষনিকভাবে উত্তর দিতে গিয়ে বলেছিলাম এখানে তা  একটুবিশদে বলছি । জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম ‘ মুসলিম দেশ’ ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি অবশ্যই মুসলমান, যার নাম ছিলো মেঘবতী সুকর্ণ পুত্রী। এরকম কয়েকটি নয় লক্ষ লক্ষ নয় কোটি কোটি ইন্দোনেশিয়ানদের পাওয়া যাবে যাদের নাম  এই ধরনের । তাদের কে  কি প্রশ্ন করা যাবে আপনি কি হিন্দু?, এই ইন্দোনেশিয়ারই রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহনের নাম ‘গারুর’। যা কিনা সনাতন ধর্মের ভগবান বিষ্ণুর বাহন (একটি পাখি)। ওদের লোগোতেও তার ছাপ রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় মুদ্রার নাম রূপীয়া যাতে ছাপ রয়েছে হিন্দু দেবতা শ্রী গণেশের। এই দুই প্রসঙ্গ তুলে এক বিদেশি সাংবাদিক ইন্দোনেশিয়ার এক মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলো যে আপনারা মুসলিম দেশ হওয়া সত্তেও আপনাদের মুদ্রায় কেন হিন্দু দেবতা গণেশের ছবি? কিংবা ভগবান বিষ্ণুর বাহন গারুর এর নামে কেন আপনাদের রাষ্ট্রীয় এয়ার লাইন্স এর নাম? একই সাথে তিনি এও বুঝাতে চেয়েছিলেন হিন্দুদের নামে কেন তাদের নাম অথবা তাদের সংস্কৃতিতে হিন্দুত্বের ছাপ। উত্তরে ওই মন্ত্রী গম্ভীরভাবে বলেছিলেন ‘We had changed our religion not our ancesters’ বাংলায় যা অর্থ দাড়াঁয় আমরা আমাদের ধর্ম বদল করেছিলাম, আমাদের পূর্ব পুরুষদের নয়। অর্থ্যাৎ পরিস্কার করে বললে উনি যা বুঝাতে চেয়েছিলেন তার অর্থ দাঁড়ায় ইন্দোনেশিয়ানরা তাদের পূর্ববর্তী ধর্ম (সনাতন ধর্ম) ছেড়ে এসেছেন, তাদের পূর্ব পুরুষদের নয় । অর্থ্যাৎ পূর্ব পুরুষদের কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে  (চলতি পরিচয়ে যা সনাতনী)  তারা ছেড়ে আসেননি। 

এটাই সঠিক। এটি মোটেও  ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। ইসলাম পূর্ববর্তী আরব আর ইসলাম পরবর্তী আরবেও এর ভূড়ি ভূড়ি নজির পাওয়া যায়। খোদ আরবের শেখরা গর্ব করে বলে থাকে, ‘First we are Arabian  than Muslim’। অর্থ্যাৎ,’ প্রথমে আমরা আরবীয় তারপর মুসলমান’। যার মানে দাঁড়ায় প্রথম যদি মুসলমানিত্বকে সামনে নিয়ে আসা হয়, এই পরিচয়ই যদি হয় প্রথম এবং এটিকে (মুসলমানিত্বকে) বড় পরিচয় হিসাবে যদি গ্রহন করে নেয়া হয় তাহলে চৌদ্দশ বছরেই  আটকে যাবে আরবের ইতিহাস আরবের অহংকার।  মুছে যাবে তার কয়েক হাজার বছরের অতীত ঐতিহ্য  অর্থ্যাৎ, ইসলাম – পূর্ব অতীত গর্ব, তার যুগ যুগের সমৃদ্ধ  পরম্পরা। 

এসব প্রশ্ন যারা ফেইসবুকে উত্থাপন করেন তাদের মুসলমানিত্বের ধ্যান ধারণার আড়তদার হলো দেশের কথিত ধর্মীয় নেতারা (পড়ুন ধর্মজীবিরা)। আরও সঠিক শব্দে বলতে হয়  ধর্মব্যবসায়ীরা – যাদের ধর্মীয় শিক্ষার সূতিকাগার হচ্ছে মাদ্রাসা। আর এই  মাদ্রাসা শিক্ষার প্রচলন করেছিলো মুসলমান উদ্যোগক্তারা নয় (তৎকালীন মুসলিম নেতারা),  এদেশে  মাদ্রাসা শিক্ষার প্রচলন ঘটিয়েছিলো ‘খৃষ্টান ইংরেজ’। তারচেয়েও ভয়ংকর তথ্য কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার (যার উত্তরসূরী ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা) প্রথম দিককার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে দেখা গেছে খৃষ্টান পাদ্রী (যারা মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত নয়!)। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কক্ষে আজও যে কেউ প্রবেশ করে দেয়ালের বোর্ডে টানানো প্রাক্তন অধ্যক্ষের তালিকাটা দেখে নিন প্রথমজন থেকে কতজন খৃষ্টান (পাদ্রী) এর নাম রয়েছে সেখানে। ‘খৃষ্টান’ পাদ্রীদের নেত্তৃত্বে পরিচালনায় ‘খৃষ্টান’ বৃটিশদের সুপরিকল্পিত নীল নকশায় প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রমের ফসল এই মাদ্রাসা ব্যবস্থা। যার ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে উঠে আমাদের মুসলমানিত্বের ধ্যান ধারনা।

জল নয় পানি দাদা নয় ভাই – 

বাংলাদেশে ‘একটু জল খেতে দিন ‘ যদি কেউ বলে তার দিকে বাঁকা চোখে না হলেও ভ্রু কুচকে একজন মুসলমান বাংলাদেশী তাকাবে। মুখে জিজ্ঞেস করে বসতে পারে, না হলে মনে মনে অন্তত প্রশ্ন  তুলবে ‘লোকটা হিন্দু নাকি’? ‘দাদা’ সম্বোধন করলেও ফলাফল একই !  ভারতে আনুমানিক  ছয় কি সাত কোটি বাঙ্গালি হিন্দু ‘পানি’ বলে না, বলে ‘জল’। ‘ভাই’ বলে না বলে ‘দাদা’। বাংলাদেশের হিন্দুরাও একই অবস্থা। বিপরিতে বাংলাদেশের মুসলমানরা ব্যবহার করে ‘পানি’ ও ‘ভাই’। অর্থ্যাৎ ‘পানি’ ও ‘ভাই’  হলো মুসলমানী শব্দ। বিস্ময়কর হচ্ছে ভারতের ৮০-৯০ কোটি হিন্দীভাষী হিন্দু ব্যবহার করে দৈনন্দিন কথায় লেখায় সর্বত্র সর্বক্ষেত্রে (জল নয়) ‘পানি’,( দাদা নয়) ‘ভাই’। এরূপ আরও ভূড়ি ভূড়ি শব্দ রয়েছে যা ধর্মজীবি ধর্ম ব্যবসায়ীদের মতলবী প্রচারনায় বাংলাদেশে সাধারনভাবে মুসলমানদের কাছে পরিচিতি পেয়ে আসছে মুসলমানি শব্দ বলে। ৬ থেকে ৮ কোটি (এপার বাংলা ওপার বাংলা মিলিয়ে)  বাংলাভাষী হিন্দুর  ব্যবহৃত শব্দ হয়ে গেল ‘হিন্দু শব্দ’  আর, ৮০- ৯০ কোটি  হিন্দি ভাষী হিন্দুর ব্যবহৃত শব্দ হয়ে আছে মুসলমান শব্দ (নির্বুদ্ধীতা কাকে বলে, চিন্তা ভ্রষ্টতা কাকে বলে !) ।

কেউ ধূতি পরলে (অবশ্যই বাংলাদেশে) অপরিচিত হলে তাকে কোন বাংলাদেশী মুসলমান (ব্যতিক্রম ছাড়া)  নিশ্চিত ধরে নিবেন লোকটি হিন্দু। আর যদি তা কোন পরিচিত মুসলমানকে পরতে দেখা যায় তাহলে হাতে মারমুখি না হলেও জ্বিহ্বায় মারমুখি হয়ে উঠবেন  ‘ধর্ম – অনুভূতি’ (আসলে অধর্ম অনুভূতি) জেগে উঠা ঐ বাংলাদেশী মুসলমানদের। অথচ যুগ যুগ ধরে ধুতি ছিলো বাঙ্গালীর (কি মুসলমান বাঙ্গালী কি হিন্দু বাঙ্গালীর) প্রিয় পোশাক, ঐতিহ্যর পোশাক। আমার ব্যক্তিগত পারিবারিক তথ্য থেকে বলতে পারি আমার দাদা (বাবার বাবা) মৌলভী মোশাররফ হোসেন ছিলেন কোলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে গোল্ড ম্যাডেল সহ সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত, যশস্বী ধর্মীয় শিক্ষক হিসাবে এবং নামজাদা ধর্মীয় নেতা হিসাবে বড় মাপের আলেম হিসাবে আমাদের গোটা অঞ্চলে ছিলো তাঁর বহুল পরিচিতি ব্যপক সুখ্যাতি। তিনি প্রায়ঃশই পরিধান করতেন এই ‘হিন্দু ধুতি’ যা পড়ে তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় বক্তৃতা (ওয়াজ) করতেন। আফসোস আজ ধুতি হয়ে গেছে হয়ে আছে হিন্দু পোষাক !

পরিশেষে, আমি জানি নিশ্চিত করেই জানি ‘হিন্দু হওয়া’ যায় না, কারও পক্ষে ‘হিন্দু হওয়া’ সম্ভবও না। আমি এও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছি আমার ধর্মচ্যুতি ঘটেনি। আমি স্বধর্মেই স্থিত আছি  এবং থাকবো, থাকবো আমৃত্যু।

সমাজ -জীবনের রোজনামচা

নজরুল ইশতিয়াক।। কোন কোন সময় বিশেষ পরিস্থিতি কিংবা উপলক্ষ্য আসে,  যখন ভিতরের ক্ষত প্রকাশ হয়ে পড়ে। কসমেটিক চেহারাও লুকিয়ে রাখা যায় না। মন ভুবনের বিক্ষিপ্ত  অবস্থার প্রতিচ্ছবি প্রতিটি আচারণে প্রকাশ হয়, এটা ধরতে পারে একজন শান্ত- শিষ্ট মানুষ। এই যে সত্য এটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, সমাজ কিংবা দেশের বেলায় একই । 

আপনি হয়তো এতদিন পুরোপুরি জানতেনই না  এক সাথে, একই ঘরে থাকা মানুষটা কেমন। সময় ও বাস্তবতা সেটিকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে দেয়নি। সারাদিনের দৌঁড়ঝাপের ব্যস্ততা শেষে খাওয়া-দাওয়া, ক্ষণিক সময়ের ক্লান্তি এবং ঘুমের মধ্যে বন্দি জীবন, সবার ক্ষেত্রে কম বেশী এমনই। সীমাহীন রুগ্ন অস্থির বাজে কয়েদী অথচ অবাধ্য জীবনে যা হয় তাই-ই হচ্ছে এখন বহু ঘরে। লুকোচুরির বিভ্রান্তি থেকে পালিয়ে বাঁচা জীবনে যা হয় তারই চিত্র আমরা বর্তমানে দেখছি। এভাবেই করোনাকালীন এই সময়ে থলের বিড়ালই যেন বের হয়ে আসছে। চরম নিষ্ঠুরতার চিত্র ফুঁটে উঠছে পরিবারে ঘরে ঘরে। পারিবারিক বহুমাত্রিক নির্যাতন নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব উদ্বিগ্ন। উন্নত দেশের মতো না হলেও  আমাদের দেশে ইতোমধ্যেই এসব পারিবারিক  সামাজিক নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে কথা উঠছে। খোদ সৌদী আরবে তালাক বাড়ছে। অথচ এই দেশটি এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ মানুষের কাছে মডেল। অথচ  মডেল তো কেবল হযরত মুহাম্মদ ( যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। সেটা না হয়ে সৌদী আরবের বহু গল্পগুচ্ছ মডেল হয়ে আছে। আর তেল- হজ ওমরাহর টাকায় ক্ষমতান্ধ সৌদী ধনকুবেররা এখনো নারী ও দাস দাসীদের গণিমতের মাল মনে করে। 

সে কথা থাক, এতদিনের গভীর প্রেম! দায়িত্বই যেন উগরে পড়ছে বর্তমানে। যারা মদ খেত, হোটেলে মোটেলে, প্রমোদ বিহারে, সমুদ্রবক্ষে সময় কাটাতো, জুয়া হাউজিতে মত্ত থাকতো তাদের জন্য করোনা বেশ খারাপ সময়। আবার যারা পরকীয়া, পরচর্চা টাঙকিবাজী করে সময় কাটাতো তারাও বেশ মুশকিলে রয়েছেন। অফিস পাড়ায় আডডাবাজী, খোশগল্প, গা ঘেষে বসা, দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও একটা বিপদরেখা এখনও বহাল। মলে মলে, বারে ক্যাফতে সমাগম নেই বললেই চলে। ভরসা শুধু মোবাইলে অনলাইনে নির্যাতনের নতুন প্রবাহে। মসজিদে, কোরআন তেলওয়াত এবং করোনা সংবাদগুলোতে। অনেক বাসায় দীর্ঘক্ষণ কোরআন তেলওয়াত ও নামাজ পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই কবে যাবে করোনা? করোনা চলে গেলেই যেন সব সংকট শেষ হয়ে যাবে। কি সুন্দর সমীকরণ!  জীবন পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। 

আমরা দেখছি এক পীঠের জীবন। 

মুদ্রার দুই পীঠ না দেখে সত্যটা উপলব্ধি করা যায় না। 

বয়ে যাচ্ছে জীবন প্রকৃতি। শত জীবনই সমাজ সৃষ্টি করেছে। ফলে সমাজের অবস্থা জীবনের বাইরে নয়। আমরা সমাজকেও ধরতে পারবো একটু নজর দিলে।  

এতদিন উন্নয়নের বিরাট বিরাট লেকচার শুনে বাঙালি যখন মারা যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এক পশলা বৃষ্টির জল হয়ে এসেছে করোনা। এক পশলা করোনা বৃষ্টিতেই যেন সয়লাব সর্বত্র। গা বাঁচাতে অনেকে গর্তে ঢুকলেন, ব্যবসা বাঁচাতে প্রণোদনা চাইলেন, শ্রমীক মেহনতি মানুষের জন্য কারো কারো অতিশয় প্রেমাভক্তি দেখা গেল। 

কিন্তু শ্রমীক প্রেম যে কতটুকু  তা তো অনুসন্ধানী মাত্রেই জানেন। রক্তচুষে খাওয়া যে সব ব্যবসায়ী দেশ বিক্রি করতে পারে, ব্যাংক লুট করতে পারে, তারা দেখাবে শ্রমীক ভালোবাসা! 

পুরো অর্থনীতিই তো লুটপাট করেছে ব্যবসায়ী, ব্যাংকের এমডি পরিচালকরা মিলেমিশে।  

প্রযুক্তি সুবিধা ব্যবহার করে  হয়তো নতুন কোন লুটপাটের আয়োজন অব্যাহত রয়েছে, সেই অজানা সংবাদ চিত্র আগামীতে জানা যাবে। 

আর করোনা চিকিৎসার নামে নতুন নতুন বাণিজ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচছে।  কেবলই বাণিজ্যে বসতি গেড়েছে জীবন। ভোগবাদী জীবন ও উন্নয়নের ক্ষত তো করোনার চেয়ে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। কোন পথে যাবি মনা ঠিক হইলো না তোর।  কি অদ্ভুত সমৃদ্ধি?? 

কত বিশৃঙ্খল সমাজ। আর কতটা প্রাজ্ঞ আমাদের পরিস্থিতি মোকাবেলাকারী কর্তৃপক্ষ!!!  হাহাকার আর্তনাদ লোক দেখানো মাইকিং।  রঙ লাগিয়ে ক্ষত ঢাকবার শত ব্যবস্থাপনা। এমনকি ওয়াজ নসিহতের  বাণিজ্যে নয়া সংযোজন হয়তো মিলবে কিছুদিনেই। অন্যদিকে সাধারণ ওয়াজীরা বাজার জমাতে মানে নামি দামী কাটতি হুজুরদের ফিল্ড বাড়াতে  আগের চেয়ে আওয়াজ বাড়িয়ে বলতে  পারে মহিলারা পর্দা না করলে, স্বামী সেবায় মনোযোগ না দিলে, নারী শিক্ষা বাতিল না করা হলে সর্বপরি আল্লাহর আইন  না জারি করা হলে, আগামীতে বড় আঘাত   নাজিল করতে পারে! তাহলে কি করোনার ফলাফল হলো সাময়িক বেহুদা অবস্থা মাত্র! আবার ছুটবে, গান গাইবে, সে গানে গানে জীবন বয়ে যাবে কোন উত্তর না দিয়ে? 

ছাব্বিশ বাঙালী, জর্জ ফ্রয়েড একটি গর্ভবতী হাতি ও একজন সাহাবউদ্দীন

হাসান জামান টিপু 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী মানুষ বিভিন্ন দেশ হয়ে কান্খিত দেশে আশ্রয় নেয়। সাদারা এশিয়া, আফ্রিকা অস্ট্রিয়ায় গিয়েছে, ভুমিপুত্রদের তাদের দাস বানিয়েছে, ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ করেছে, খুন, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ করেছে পরিবেশ ধ্বংস করেছে। কেউ গিয়েছে যোদ্ধার বেশে, কেউ বণিক হয়ে, কেউ গিয়েছে বাইবেল হাতে। উদ্দেশ্য একটাই দখল, প্রভূত্ব। সবাই নিজ দেশে কিছু করতে না পেরে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। 

দ্বিতীয়, মহাযুদ্ধের পরে সাম্রাজ্যবাদী এই বিস্তার একসময় থেমে যায়, আসে অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তীতে মানুষ বিভিন্ন দেশে মাইগ্রেট করতে থাকে, তৃতীয় বিশ্ব থেকে লোকজন নানান কায়দায় ইউরোপ, আমেরিকায় যেতে থাকে। কমিউনিস্টদের পতনের পর আশি নব্বই দশকগুলিতে এদেশের মানুষ ব্যাপকহারে ইউরোপ আমেরিকায় যেতে থাকে। তুরস্ক, রাশিয়া, রুমানিয়া, লিবিয়া হয়ে বাঙালিরা জীবনবাজী রেখে বিভিন্ন পন্থায় দালালের মাধ্যমে পাড়ি দিতে থাকে। এটা নিরন্তর প্রক্রিয়ায় মানুষ তার ভাগ্যান্বেষণে দেশান্তরি হতে থাকে, এটা দেশের ভিতরে ও বাইরে হয়ে থাকে। 

কিছুদিন পূর্বে লিবিয়ায় ছাব্বিশ বাংলাদেশীকে দ্রোণ দিয়ে গুলি করে মারা হলো। ভাগ্যবিড়ম্ভবনায় ছাব্বিশ জন মানুষ বলি হয়ে গেল। তাদের দোষ ছিলো তারা ভাগ্যকে বদলে দিতে চেয়েছিলো, দেশে তাদের ভাগ্যকে কোন ভাবেই পরিবর্তন করতে পারছিলো না। কাকে দোষ দিব এই ছাব্বিশ প্রাণ সংহারের জন্য? সরকার কে? সিস্টেম কে?নাকি বিধাতাকে? আমাদের পত্রপত্রিকায়, চিন্তায়, আমাদের চেতনায়, আমাদের লেখায় তাদের কথা তাদের জন্য সমবেদনা দৃষ্টিকটুভাবে কম হয়েছে। কেন হয়েছে? 

গত পঁচিশে মে আমেরিকার মিনিয়াপোলিস অঙ্গরাজ্যের পুলিশ একটি রেস্তোরাঁর ৪৬ বয়স্ক কালো নিরাপত্তা কর্মী জর্জ ফ্লয়েডকে একটি সন্দেহজনক প্রতারণার মামলায় গ্রেফতার করে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দশ মিনিটের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় একজন সাদা পুলিশ অফিসার জর্জের ঘাড়ের উপর হাঁটু দিয়ে চেপে আছেন। জর্জ বার বার বলছিলেন, আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। তবুও তাদের দয়া হয়নি। এতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু হয়। এতে গোটা আমেরিকা জুড়ে বিক্ষোভ, লুটতরাজ শুরু হয়, বিশ্ব জুড়ে মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠে। আমেরিকায় পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। 

আমেরিকার মতো অগ্রসর একটা দেশে যেভাবে বর্ণবাদকে লালন করা হচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যে দেশে প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা, একজন ইমিগ্রেন্ট আফ্রিকান সে দেশে বর্ণবাদের গোড়া এতো গভীরে প্রোথিত এটা বুঝা যায়নি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসে উগ্রজাতীয়তাবাদী তথা হোয়াইট সুপ্রিমেসির জোড়ে। এটা একটা সময় আমেরিকার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে তা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের ট্রাম্পের নির্বাচনী বক্তব্যে ও নির্বাচনের পরে পরেই বুঝা গিয়েছিলো।  আজকের এ অবস্থা  ট্রাম্পের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফসল। আগামীতে আমেরিকাকে বর্ণবাদের জন্য প্রচুর মূল্য দিতে হবে। 

ফেণীর সোনাগাজী উপজেলার একজন সাহাবউদ্দীন পেট্রোল পাম্পে সামান্য বেতনে কাজ করে। হঠাৎ তার জ্বর, সর্দি ও শ্বাস সে তার বাড়ী গেল। একজন মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো তার বাড়ী। সে বাড়ীতে যাওয়ার সাথে সাথে তাকে একটি কক্ষে তালা দিয়ে রাখা হয়, তার জ্বর ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। সারারাত সে পানি ও খাবারের জন্য কান্নাকাটি করে। কেউ এগিয়ে আসেনি। অবশেষে তালাবদ্ধ রুমে তার মৃত্যু হয় অত্যন্ত কষ্টে, বিবস্ত্র অবস্থায়। 

এখানে দৃশ্যটি কল্পনা করলে বাঙালি সহজাত যে পারিবারিক বন্ধন তার চিত্র ধরা পড়ে না। মানুষ যে কত নিষ্ঠুর, নির্দয় হতে পারে এই করোনা আমাদের নানাভাবে দেখিয়ে দিলো। ঘটনা পড়ে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া কি আর করার আছে? 

ভারতের দক্ষিণের কেরালাতে একটি অন্তঃসত্ত্বা হাতিকে বিস্ফোরক ভর্তি আনারস খাওনো হয় বা হাতিটি যে কোনভাবে খেয়ে ফেলে এতে হাতিটি মারাত্নকভাবে আহত হয়। সে একটা জলভুমিতে আশ্রয় নেয়, সেখানে সে তিনদিন দাঁড়িয়ে ছিলো। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ওখান থেকে তুলে আনা যায়নি হাতিটি ওখানেই মারা যায়। পরে জানা যায় হাতিটির বয়স ছিলো পনের ষোল বৎসর, সে অন্তঃসত্ত্বা ছিলো।ঘটনাটি একজন ফরেষ্ট অফিসার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার দিলে তা ভাইরাল হয়। শুধু ভারতে নয় বাংলাদেশেও ফেসবুকে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। মানুষের মানবিক দিকের পরিচয় খুব উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়ে। 

জর্জ ফ্লয়েড যতটুকু কাঁদিয়েছে, একটা হাতি আমাদের যতটুকু কাঁদিয়েছে আমাদের ছাব্বিশজন বাঙালি ও একজন সাহাবউদ্দীন কি ততটুকু হৃদয়কে সিক্ত করেছে? তুলনামূলক একটা চিত্র আমি ভাবছি কেন এরকম হয়? কেন আমরা নিজেদের ব্যাপারগুলিকে কম গুরুত্ব দিচ্ছি অথচ আন্তর্জাতিক ব্যাপারগুলিতে নিজেদের আবেগটা বেশী প্রকাশ করছি। 

ছাব্বিশ জন জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিক, সাহাবউদ্দীনের মত বঞ্চনার জীবন যাদের তাদের জন্য আমাদের মন তেমন ভাবে কাঁদে না। আমাদের আবেগ এখানে ভোতা হয়ে যায়।

আমরা কি খুব বেশী আন্তর্জাতিক হয়ে যাচ্ছি? এমনিতেই আমরা হজুগে জাতি তাই যেদিকে হুজুগ উঠেছে সেদিকেই ঝুঁকেছি!! 

আমাদের মনোবিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীদের এব্যাপারে গবেষণা প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে সাহাবউদ্দীনের ঘটনা ও বুড়ো বাবা মা নিয়ে এরকম আরো অনেক ঘটনা এই করোনাকালে ঘটেছে। যা জাতি হিসাবে, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বা একে অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতা কি হ্রাস পাচ্ছে? মেকী ভালোবাসায় আমরা এগিয়ে থাকতে পছন্দ করছি না তো?  

এই করোনা আমাদের শিখিয়ে দিলো কি করে স্বার্থপর হতে হয়।

করোনায় হচ্ছে কি বোধোদয়?

শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ ।। মানুষে-মানুষে সংক্রামক ব্যাধি করোনার মহামারিতে সমগ্র বিশ্বই আজ মহাসংকটে। কভিট-১৯ নামের এক ভাইরাসের তাণ্ডবে গোটা বিশ্ব এখন তটস্থ। গত ৮মার্চ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর এরই মধ্যে তিন মাস পার হয়েছে। বাংলাদেশে ২৫ মার্চ সরকার কর্তৃক গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণার পরই মূলত এই মহামারী-পরিস্থিটা আঁচ করতে পারে দেশবাসী। একই ধরনের বা একটি মহামারী সমগ্র মানব জাতি এক সাথে মোকাবেলা করেছে- এমন নজির এর আগে পৃথিবীর কেউ কখনও দেখেনি। বিশ্বায়নের যুগ ও তথ্য-প্রযুক্তির অভূতপূর্ব প্রয়োগের সুবিধার কারণে বর্তমান মানবসভ্যতার কাছে এই মহামারী তাই সম্পূর্ণ এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই প্রেক্ষাপটে করোনা-সংকট মোকাবেলায় সাধারণ জনগণ ও সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাদি এবং জনজীবনে এর প্রতিফলন, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া-বাস্তবতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক ও গবেষণা প্রয়োজন।   

এই ভাইরাস ধনী-গরীব-উঁচু-নীচ-শিক্ষিত-অশিক্ষিত কাউকেই পরোয়া করছে না। বিশ্বের সবচাইতে পরাক্রমশালী রাষ্ট্র আমেরিকাসহ ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে সবচেয়ে বড় আঘাতটি হানার পর এখন ভাইরাসটির নজর যেন অপেক্ষাকৃত কম উন্নত ও স্বলোপন্নত দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা এরই মধ্যে সাড়ে ৮শ’ ছাড়িয়েছে এবং অনেকে সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। অর্থাৎ,মারণাস্ত্র, নগদ অর্থ-বিত্ত, পেশি-শক্তি, নাম-যশ কাউকেই যেন কোনো ছাড় দিতে চায় না এই ভাইরাসজনিত পরিস্থিতি। প্রকৃতির মতোই সকলের সাথে এই ভাইরাসটির  সমান আচরণ, এ যেন প্রকৃতির সমান বিচার। গত ৭ জুন রোববার বাংলাদেশ সময় রাত ১ টা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে শনাক্ত হওয়া করোনায় সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ লাখ ৪০ হাজার। মৃত্যু ৪ লাখেরও বেশি।

করোনা-হামলায় জর্জরিত জনজীবনে, সচেতন মানুষের চিন্তা-জগতে নতুন নতুন উপলব্ধি জাগ্রত কথা। কিন্তু বিশেষ করে দেশের সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবাখাতের দুর্বল ও সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনা, গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের অমানবিক ও নীতি-নৈতিকতাহীন  চাওয়া-পাওয়া-আবদার করোনা-সংকট মোকাবেলায় সামগ্রিক উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে দিয়েছে-এসব বাস্তবতা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এছাড়া,অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের অসচেতনতা, অজ্ঞতা, ধর্মান্ধতা এবং ইসলামের নামে ওয়াজ-মাহফিল ও ফেসবুকে অবৈজ্ঞানিক কথা-বার্তা ও ফতোয়াবাজি সংকটের শুরু থেকেই পরিস্থিতি সামলানোর পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্র ও সরকারের সার্বিক কর্মসূচির বিরাট যজ্ঞকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। মানুষ বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে বাস করে, কিন্তু বাতাস ও  অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে হলে গভীরভাবে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। ঠিক তেমনি এত বড় বিশ্বমহামারির সময়ে দেশ এবং দেশের মানুষ শত অস্থিরতার মধ্যে শান্তিতে রয়েছে সেটাও স্বীকার করতে হবে। এ জন্যএককভাবে কাউকে ধন্যবাদ দিতে হলে অবশ্যই সেটা দিতে হয় বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকেই। দেশ ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে গত তিন মাস ধরে তাঁর পরিচালিত সকল উদ্যোগ ও কর্মকান্ডে সচেতন দেশবাসী আশ্বস্ত। এক্ষেত্রে সরকার গৃহীত যাবতীয় সকল পদক্ষেপে সমন্বয়হীনতা যতটুকু ছিল তার দায় একটি রাষ্ট্র ও তথা দেশের নাগরিক হিসেবে সকলকেই নিতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্র ও সরকার সে দেশের জনগোষ্ঠীর সকলকেই প্রতিনিধিত্ব করে। যে দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও আদর্শ অনুযায়ী শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যেখানে আজ বলা হচ্ছে দেশের অধিকাংশ সম্পদ ২২ হাজার  পরিবারের কাছে (স্বাধীনতার পূর্বে ছিল ২২ পরিবার) পুঞ্জিভূত হয়ে পড়েছে, যেখানে অশিক্ষা-কুশিক্ষা, দুর্নীতি, ভণ্ডামী, মিথ্যাচার, লোভ, হিংসা-প্রতিহিংসা সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে, বিশেষ করে সমাজপতিদের মধ্যে সেখানে সরকার গৃহীত সকল কর্মসূচির সমন্বিত ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কেউই আশা করে না। তবে একজন ব্যক্তি সচেতনভাবে চলতে চাইলে,পরিস্থিতি মোকাবেলায় সচেতনতার সাথে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে সরকার সেখানে তার সহায়ক হবে-এমন পরিবেশ দেশে বিরাজমান রয়েছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

করোনা-পরিস্থিতি মোকাবেলার এ সময়টিতে  সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে কাজে লাগাতে সরকারের সকল প্রয়াসকে স্বার্থক করে তুলতে এ মূহুর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দলমত-নির্বিশেষে সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণ। কৃষক ও কৃষিখাতে সরকারের ভর্তুকি ও আন্তরিক সহযোগিতা, সমর্থন ও প্রণোদনা যত বেশি কার্যকর হবে, জনগণের নৈতিক ও আর্থিক শক্তি ততই শক্তিশালী হবে।

করোনা-পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে এখন মৃত্যুভয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বাসের পথে যাত্রীগণ (মোমেনগণ) কখনও মৃত্যুভয়ে ভীত হতে পারেন না। তাদেরকে তাদের প্রভুর নির্দেশিত পথে চলতে এবং লক্ষ্য পূরণে সব সময় ব্যস্ত ও সদাজাগ্রত থাকতে হয়। কর্মটাই এখানে বড়। আর এ জন্য দরকার পরিবর্তন, বিবর্তন ও রূপান্তরের ধারায় নতুন বোধোদয় ও উপলব্ধি। একজন ব্যক্তির নিজেকে জানা ও নিজেকে চেনা। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী, ‘নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে’ , সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর বাণী, ‘নিজেকে রতনে রাখাও ইবাদত’, প্রাচীন কালের মহাজ্ঞানী সক্রেটিস-এঁর বাণী ‘নো দাইসেল্ফ’-‘নিজেকে জানো’, পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘যে নিজেকে চিনতে পেরেছে সে তার রবকে (প্রভুকে) চিনতে পেরেছে’, কবিগুরুর বাণী-’ আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেকে করো জয়’-এ সব কিছুই নিজেকে জানার পথ প্রশস্ত করে দেয় এবং ব্যক্তিকে আস্থাবান করে তুলে যা মূহুর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিজ্ঞান বলছে, নিজের শরীরের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি (ইমিউনিটি তৈরি) করা করোনা মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই অবস্থায় মানবজাতির কঠিন বাস্তবতার এই সময়ে ব্যক্তির মধ্যে, সমাজের সুবিধাভোগী অংশ ও সমাজপতিদের মধ্যে নতুন বোধোদয় সৃষ্টি হয়েছে কি-না সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।   

করোনা ঠেকানোর আগে চাই ভয় কে ঠেকানো-

সাগর সগীর

করোনা ভাইরাসের প্রতিকার নিয়ে মাথা ব্যথা হচ্ছে তাদের যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিংবা করোনা রোগিদের সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব যাদের কাঁধে সেই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এবং আক্রান্তদের পরিবার পরিজন তথা স্বজনদেরও (অবুঝ শিশু,পাগল এবং যাদের এ-নিয়ে কোন খোঁজ খবর নেই, মাথা ব্যথাই নেই তারা ছারা)। করোনা ভাইরাস নিয়ে আজকের বাস্তবতায় মানুষের মাথাব্যথা হচ্ছে কি করলে করোনার সংক্রমন হবে না অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক কি এই ভাবনা।

করোনার ছোবল থেকে নিজেকে দূরে রাখার মোক্ষম উপায় নিয়ে কথা বলার শুরুতে একটি ছোট্ট গল্প বলে নেয়া যাক। পেটের অসুখে প্রায়শঃই ভোগা এক রোগীকে নিয়মিতই একজন ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। ডাক্তার যথারীতি ঔষধ দিতেন এতে রোগীর কিছুটা বা অনেকটা কখনওবা পুরোটা উপশম হলেও কিছুদিন পর আবারো ডাক্তারের কাছে যেতে হতো ঐ পেটের গন্ডগোল নিয়েই। এবার ডাক্তার রোগীকে তার রোগী দেখার টেবিলে শুইয়ে দিয়ে তার চোখে ‘আই ড্রপ’ দিতে উদ্দত হলেন। রোগী তখন চেঁচিয়ে বলে উঠল, ডাক্তার সাহেব আপনি মনে হয় ভুলে গেছেন আমিতো আপনার কাছে আসি পেটের সমস্যার জন্য চোখের নয়! ডাক্তার তখন বললেন, না সমস্যা আপনার পেটের নয় সমস্যা আপনার চোখে। আপনি যা-ই দেখেন তা-ই খেতে ইচ্ছে করে । আগে আপনার চোখ ঠিক করতে হবে!

‘আগে চোখ ঠিক করতে হবে’ -ঠিক তাই । করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে ‘আগে চোখ ঠিক করতে হবে’। না, এখানে চোখ বলতে চোখ-কে বুঝানো হচ্ছে না। এক্ষেত্রে চোখ বলতে ‘ভয়’কে বুঝানো হচ্ছে। আর ‘ঠিক করা’ মানে ‘দূর করা’ অর্থাৎ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়কে দূর করা এটাই হচ্ছে করোনা সংক্রমন থেকে নিজেকে নিশ্চিত বাঁচানোর সুনিশ্চিত উপায়, বলা যায় ‘অব্যর্থ হাতিয়ার’। এই প্রসঙ্গে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির ঝুলিতে জমা হওয়া পাঁচটি শব্দ উল্লেখ করতে হচ্ছে, যে শব্দগুলি করোনা জাতীয় বিপদজনক ভাইরাসগুলির চেয়েও বিপজ্জনকভাবে কাজ করে মানুষকে বিপদগ্রস্থ সঙ্কটগ্রস্থ করে তোলার জন্য । এই শব্দ পাঁচটি হচ্ছে – ‘যদি’, ‘হয়তো’, ‘কিনা’, ‘নাকি’ এবং ‘কিন্তু’। এই পাঁচটি শব্দ মানুষের চিন্তা ভাবনা বুদ্ধি বিবেচনাবোধের উপর কাজ করে অনেকটা মোবাইল-কম্পিউটারকে ‘হ্যাঙ্গ’ করে দেয়া ভাইরাসের মতই। কেউ বলতেই পারেন যে ‘যদি করোনায় আক্রান্ত হই’ বা ‘করোনা পেয়ে বসে কিনা’ – এই জাতীয় আশঙ্কাতো থাকবেই, ভয়তো হবেই! চারদিকেইতো সংক্রমন হচ্ছে দিনকে দিন, আর আমি আর মানুষ ভয় পাবে না! শঙ্কিত হবে না! বললেই হলো !

কথাটি ঠিক। করোনা সংক্রমনের ভয় আশঙ্কা জনমনে জেঁকে বসেছে বলেইতো এই প্রসঙ্গ আসছে । এই ভয় এই আশঙ্কা খাল হয়ে ‘করোনা নামক কুমিরকে ডেকে আনে! আর এই ভয়টাও আবার নিছক ভয়ের পর্যায়ে আটকে থাকে না । গিয়ে পৌঁছায় আতংকের পর্যায়ে । প্রশ্ন হচ্ছে এই ভয়টি আতংকের পর্যায়ের যাওয়ার দাবি রাখে কি? করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পথ ঘাটগুলি কি, অর্থাৎ ভাইরাসটি নাক দিয়ে ঢুকে শুধু, নাকি চোখ দিয়ে মুখ দিয়েও ঢুকে, দূরত্ব ছয় ফুট না বার ফুট? দেহে ঢুকে কাদেরকে কাবু করতে পারে আর কাদেরকে কাবু করতে পারেনা এ নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে দেখা দিচ্ছে ‘নানা মুনির নানা মত’। এমনকি ইউরোপ আমেরিকার করোনা আর এশিয়া আফ্রিকার করোনা, তার স্বভাব প্রকৃতি, ক্ষতি করার ক্ষমতার প্রশ্নেও উঠে আসছে নানান মত; এমনকি পরস্পর বিরোধী ভিন্ন মতও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও এসব অনেক প্রশ্নেই সময়ে সময়ে কম বেশী মত বদল করতে দেখা যায়।

করোনা সংক্রমিত হওয়ার এই ভয় নিয়ে আলোচনাটা এটুকুতে রাখা এই লেখা মূল নজর নয়। মূল নজরটি কি তা বলার আগে আরও একটি ছোট্ট গল্প। এক প্রতিবেশীর ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ শুনে অপর প্রতিবেশী তার কাছে কান্নার কারণ জানতে চাইলে তার কাছে তিনি বললেন, গতরাতে শিয়াল তার দুটি মুরগী চুরি করে নিয়ে গেছে। শুনে প্রতিবেশী বললো, আপনারতো বারিতে অনেক মুরগী রয়েছে দুটি মুরগীর জন্য কাঁদতে হয়? কান্নারত ব্যক্তিটি তখন বললো আরে ভাই শেয়ালে যে মুরগী নিয়ে গেছে তার জন্য কাঁদছি না শেয়ালে যে বাড়ি চিনে গেছে এই জন্য কাঁদছি। করোনা ভাইরাসে সংক্রমিতহওয়ার আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট ভয় যা অনেক ক্ষেত্রেই অনেকের ক্ষেত্রেই রীতিমতো আতঙ্কের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে এই ভয়টা মুরগী নিয়ে যাওয়ার মতই বড় বিষয় না।শেয়ালে বাড়ি চিনে ফেলার মূল দুঃচিন্তার মতই সংক্রমনের ভয় আতঙ্কের আসল বিপদটি হচ্ছে তা ভীত আতংকিত মানুষটির মাঝে এক ধরনের দিশেহারা অস্থির ভাব অশান্ত দশা নিয়ে আসে। এর ফলে তার মধ্যে একদিকে যেমন এক ধরনের অসহায়তা, শক্তিহীনতা নিয়ে আসে অপর দিকে এই দিশেহারা অস্থির ভাব তাকে করোনা সংক্রমন প্রতিরোধ করনিয় পদক্ষেপ যথাযথভাবে নেয়ার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আবার অসহায় শক্তিহীন দশা করোনা প্রতিরোধে জানা মানা তথা করনীয় সঠিকভাবে সম্পাদনে নিস্কিয় করে রাখে। অপরদিকে যারা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে থাকেন সেই আতঙ্ক দশা তার লিভারকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, তার স্নায়ুতন্ত্রর উপর চাপ বাড়ায় যা উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ জাতীয় জীবন ঝুঁকিপূর্ণ রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় অথবা রোগকে সজ্জাসঙ্গী করে তোলার পর্যায়ে নিয়ে যায়।

‘তাবিজ কবজ পানি পরায়ও রোগ ভালো হয়’ –

প্রশ্ন হচ্ছে করোনা ঠেকানোর আগে মনে সংক্রমিত হওয়া ভয় ঠেকানোর পথ কি? লকডাউন ভ্যাক্সিন যেমন স্থায়ী নিশ্চিত কার্যকরি উপায় না (আমার করোনা শিক্ষা করোনা বার্তা লেখা প্রবন্ধে এ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে যা আমার ফেইসবুকে দেয়া আছে) তেমনি করোনা সংক্রমন থেকে বাঁচার বর্তমানে চালু উপায়গুলোও  যেমন, মাস্ক পরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি করোনা প্রতিষেধক মোক্ষম হাতিয়ার না। মোক্ষম হাতিয়ার কয়েকটির মধ্যে আজকের লেখায় যেটি তুলে ধরেছি সেটিই হচ্ছে করোনা হওয়ার ভয়কে আগে ঠেকানো। তাহলে শহর অঞ্চল গোটা রাষ্ট্র লকডাউন করে দেয়ার মতই নিজেকে লকডাউন করে দেয়া যাবে সফলভাবে, যার ফলে করোনা ভাইরাস আক্রমন করতেই পারবেনা। করোনার সংক্রমন হবে না, করোনা দেহে ঢুকে গেলেও তা কোন ক্ষতিই করতে পারবেনা।

 বিষয়টি পরিস্কার করে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার আগে প্রাসঙ্গিক হওয়ায় প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নূরুল ইসলামের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ন অবাক-করা উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরা হচ্ছে। আকুপ্রেশার চিকিৎসা নিয়ে ২০০৮ সালে ঐ সময়ের দুই টাকা মূল্যের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক ‘দৈনিক আমাদের সময়’ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে আকুপ্রেশার চিকিৎসা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশে এই চিকিৎসা পদ্ধতির পথিকৃত হিসাবে ঐসব ধারাবাহিক প্রতিবেদনে পরপর ৩দিন প্রথম পাতায় শীর্ষ দ্বিতীয় প্রতিবেদন হিসাবে (2nd lead) আমার (সাগর সগীর) সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক বক্তব্য প্রকাশিত হয়। এইসব প্রতিবেদন দেখে জাতীয় অধ্যাপক নূরুল ইসলাম আগ্রহ প্রকাশ করেন এ-নিয়ে বিস্তারিত জানার, আমার সাথে কথা বলার।

২০০৮ এর অক্টোবরে আমাদের সময়ের অফিসে আমার সৌভাগ্য হয় জাতীয় অধ্যাপক নূরুল ইসলাম স্যার এর কাছে আকুপ্রেশার চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরার। সেদিন তিনি আকুপ্রেশার চিকিৎসাটি দেশের সাধারন মানুষের জন্য, বিশেষ করে গরীব মানুষের জন্য কি পরিমান প্রয়োজনীয়  বলে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে আকুপ্রেশার চিকিৎসার উপর আমার লিখিত প্রকাশিত ‘স্বচিকিৎসা প্রয়োগবিধি’ বইটির ভূমিকাতে তিনি কি কি বলেছিলেন সে সব ভিন্ন প্রসঙ্গ । এখানে প্রসঙ্গ হচ্ছে  ঐ বৈঠকে ডাঃ নূরুল ইসলাম আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন তাবিজ কবজ পানি পরাতেও রোগ ভালো হয়। উল্লেখ্য ঐ বৈঠকে ডাঃ নূরুল ইসলামের সাথে আলাপচারিতায় আমার সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে আকুপ্রেশার ছরিয়ে দেয়ার অভিযানে আমার সাথে কাজ করতে এগিয়ে আসা সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডাঃ মোহাম্মদ কছিমউদ্দিন, বিশিষ্ট গাইনী বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুলতানা আহমেদ, স্বনামধন্য হোমিও চিকিৎসক ডাঃ শওকত আলী ও ডাঃ মোহাম্মদ আলী এবং আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদ আল আমিন। যিনি ছিলেন ঐ ধারাবাহিকগুলির প্রতিবেদক।

তাবিজ কবজ পানি পরাতেও রোগ ভালো হয় ডাঃ নূরুল ইসলামের একথা শুনে সবিস্ময়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম ‘বলেন কি স্যার, আপনি বলছেন একথা! উনি তখন বললেন, হ্যাঁ আমি বলছি, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আসলে তাবিজ কবজ পানি পরায় রোগটা ভালো হয় না, রোগটা ভালো হয় যখন মানুষটি আস্থা জন্মানো কোন মৌলভি তথা কোন হুজুর কিংবা পুরহিত বা এই জাতীয় কোন ব্যক্তিত্ব তার কাছে হাজির হওয়া রোগগ্রস্থ মানুষটিকে কোন তাবিজ বা কোন পানি পরা দিয়ে থাকেন তখন ঐ মানুষটির মনে তাবিজ কবচ পরার কিংবা পানি খাওয়ার আগে এরূপ একটা বিশ্বাস জন্মায় যে ‘এখন আমি ভালো হয়ে যাব’। ডাঃ নূরুল ইসলামের কথা অনুযায়ী তখন তার শরীরের একটি অনাল গ্রন্থী ( Endocrine gland -যতদূর মনে পরে তিনি বলেছিলেন পিটিউটারি গ্লান্ডস-এর কথা) থেকে এক ধরনের রস (হরমোন) নিঃসৃত হয় যা তার রোগ দূর করার কারণ হয়ে থাকে। 

সুতরাং ভয়ের পরিবর্তে যখন একটা মানুষের মনে, তার চিন্তা প্রবাহে এই ধারনা প্রবল হয়ে উঠে যে আমার করোনা ভাইরাস হবে না, হতে পারে না; আর করোনা ভাইরাস না হওয়ার জন্য যা যা করনীয় তা আমি করছিও। মানুষটির এই বিশ্বাসটিই তাকে সেই ‘self lockdown’ এ ঢুকিয়ে রাখবে যেখানে, যা ভেদ করে করোনা ভাইরাস তাকে ছুতেই পারবেনা। আবার ঘটনা-দূর্ঘটনা ক্রমে ঐ ভাইরাস দেহে ঢুকে গেলেও তাকে নিস্কৃয় করে মরণ ঘুম পারিয়ে রাখবে ওর মৃত্যু পর্যন্ত। এ প্রসঙ্গে যুগ যুগ ধরে চলে আসা গ্রাম বাংলার প্রবাদ ‘বনের বাঘে খায়না মনের বাঘে খায়’ কিংবা আধুনিক কালে বেদ বাক্যের মতই যে প্রবাদ বাক্যটি পাওয়া যায় তারও উল্লেখ খুবই প্রাসঙ্গিক। আর সেটি হচ্ছে ‘you are what you eat, you are what you think’ অর্থাৎ আপনি যা খাচ্ছেন যা খেয়ে থাকেন আপনি (আপনার শরীর) আসলে তাই অর্থাৎ সেরকমটাই হয়ে থাকে শরীর এবং আপনি আসলে যা ভাবেন আপনি কার্যত তাই অর্থাৎ আপনার ভাবনাই প্রতিফলিত হয় আপনার জীবনে। ফলে করোনা হওয়ার আশঙ্কা, ‘করোনা ভয়’ নামক খালের জলে ভেসে আসবে করোনা নামক কুমির আপনার দেহে। (চলবে)

কে তুমি অচেতন, কোথায় ছিলে সে মহাসৃজন কালে?

নজরুল ইশতিয়াক।। আমরা এই ধরাধামে সাধারণের ভীড়ে যে নজরুল ইসলামকে জানি চিনি সেটা বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যময় নজরুল ইসলাম। গানে কবিতায় প্রবন্ধে তার ক্ষুদ্র প্রকাশ মেলে। তিনি নিজেই বলেছেন আমার ষোল আনা সৃষ্টির নেশায় ডগমগ। এক আনা প্রকাশ পায়।

আবার মাজারের খাদেম, লেটোর দলের গাতক-লেখক পরবর্তীতে সৈনিক, বাম আন্দোলনের নেতা।। একই সাথে মাতৃশক্তির সাধক, যোগ সাধক এবং সূফী সাধক। সামগ্রিক নজরুল ইসলাম এক অখণ্ড চরিত্র হয়ে উঠে। জীবনের নানান রূপান্তরের ধারায় পর্যবেক্ষণ- অনুসন্ধানের দৃষ্টি দেয়া ছাড়া তাঁকে চিহ্নিত করা মস্ত ভুল হবে, এটা শতভাগ সত্যি। মাজারের খাদেম কিংবা লেটোর দলের নজরুল মনস্তত্ত্ব উপলব্ধি করলেও বিস্ময় অপেক্ষা করে। কি করতেন, কি ভাবতেন কিশোর নজরুল? আর দশম শ্রেণীর ছাত্র নজরুল ইসলাম তো তখনই বিশ্বটাকে এক প্রকার জেনে গেছেন। 

বীরত্বে- বিদ্রোহে, লেখায়, বলায় তিনি খণ্ড, বৈচিত্রময়।

আর স্রষ্টা নজরুল একটি কালে এসে মহাকালের তীর্থযাত্রী।

ফলে সাধক কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সাধারণ আলোচনা বড়ই অন্যায় অবিচার অনায্য হয়ে উঠতে পারে। 

আমি বলছি না তাকে নিয়ে আলোচনা নয়। আমি বলছি আলোচনার আগে নজরুলের মতো করে বর্তমান বাস্তবতায় জীবন যাপন করে দেখুন। ঘরে বসে দু চার কলম লেখা তো নস্যি। বাস্তবতার সাথে না মিশে, জীবনকে বাজী না ধরে, কল্পনায় আলপনা এঁকে কি হয়? বড় জোর পান্তা ভাত।

নজরুল ইসলামকে দেখতে হবে ভিতরের শক্তি দিয়ে, প্রেমের গভীরতা দিয়ে, দায়িত্বশীলতার মাপকাঠি দিয়ে। 

২৪ ঘণ্টা হৃদয়কে পর্যবেক্ষণ করে। না হলে যা জুটবে তা সিকি আনারও উপার্জন হবে না। ফলে আমি বলবো যারা সাধক নজরুল ইসলামকে ছুঁয়ে দেখতে চান, তাদেরকে বাস্তবতার নিরীখে উপলব্ধি করতে হবে। 

কাজী নজরুল ইসলাম চৈতন্যময় জগতের বাসিন্দা।

চৈতন্য শক্তি জড়ানো বক্ষে নজরুল এসে খেলা করে। তাই এই বিপুলায়তনে এসে নজরুল ইসলাম খেলা করে বেলা শেষে গান গায়। তবু বলে”   খেলা শেষ হলো তবু শেষ হয়নি বেলা, আবার খেলা তো বাকি কিন্তু বেলা শেষ। 

সন্ধার গোধূলি লগ্নে জীবন জন্মের পরম দেবতাকে ছুঁয়ে পরম প্রাপ্তির অভিমান ঝরে পড়ে। আবার কোথাও বলে উঠেন” কেন আরও আগে তুমি জাগালে না, এই অবেলায় কেন? ঘুম ভাঙালে তোমায় নম নম” 

সাধক নজরুল ইসলামই কেবল বলতে পারে” কে তুমি অচেতন কোথায় ছিলে সে মহাসৃজনকালে….

দেশবাসী কবে সত্যদ্রষ্টা সাধক নজরুলকে চিনবে!

সংলাপ ॥ ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক অনাচার আর শোষণের বিরুদ্ধে এবং প্রেম, সৌন্দর্য মানবতার পক্ষে সাধক কবি নজরুলের সৃজন কর্ম যুগ যুগ ধরে আজ পর্যন্ত প্রতিটি সূফী সাধকের কাছে সাধনায় অনুপ্রেরণার উৎস। তাই তিনি সাধকদের কাছে পুরুষোত্তম।

“মুখোশের যুগ এটা। মুখোশ! হা-হা মুখোশ চতুর্দিকে। শুয়োরের চামড়া ঢাকা, মাথায় মোষের শিং। ভাড়ামির রঙ্গশালায়। প্রগলভ সঙ্গীত, মুখোশের মঞ্চে মঞ্চে। মহাযোগ্যশালা পিচাশের প্রদর্শনী! শশংকিত, সুরক্ষিত দ্বার! টিকেট লাগেনা মুখোশে! মুখ খোলা নিষিদ্ধ এইখানে। খোলা কথা খোলাখুলি বলা অসম্ভব। মুখোশের আভিজাত্য উচ্চমার্গে উচ্চ প্রশংসিত। খোলাখুলি মত বিনিময় অবাঞ্চিত, অবাস্তব মুখোশের দেশে। মুখোশ হা হা মুখোশ চতুর্দিকে! মুখোশের রঙ্গালয়ে যারা আজো পায়নি টিকিট- অনাহূত, উপেক্ষিত, অনিমন্ত্রিত, অনন্তর, অদ্ভূত হস্তপদ- এ নগরী পথ নিষিদ্ধ যাদের কাছে, খোলামুখ, খোলাবুক, খোলামন ভৈরব উল্লাসে, তারা আসে, দলে দলে আসে। কাঁপে উঠে রঙ্গশালা’- ভেঙ্গে পড়ে নিষিদ্ধ তোরণ।”

এখানে প্রথম অংশে সমাজ চিত্র এবং পরে নজরুলের আত্মচিত্র ফুটে উঠেছে। জাহেরী অর্থ তো ব্যাখার অপেক্ষা রাখে না। হাকিকতে মানব দেহ নামক রঙ্গশালায় রব বন্দি এবং নফ্সের তাবেদারী সবাইকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন পুরুষোত্তম নজরুল, যাকে কথা বলতে ও কলম চালাতে ওই মুখোশধারীরা কারাগারে নিয়ে – কাফের ফতোয়া দিয়ে – নাস্তিক বলে বাধা প্রদান করতো। কিন্তু সে মুক্তপুরুষ কি আর কারো বাঁধা-বিঘ্নকে তোয়াক্কা করে নাকি! সে যে মুক্ত-চিরমুক্ত — তাঁকে বন্দিতে আনে কার সাধ্য! আলোকে কি কেউ ইচ্ছামত কোন ঘরে বন্দি করে রাখতে পারে নাকি – নাকি পেরেছে! কোন না কোন রাস্তা দিয়ে সে বাহিরে তথা খোলা জায়গায় মুক্ত আলোর সাথে মিলিত হবেই। বন্ধ ঘরে তথা মানব দেহে যে আলোর অংশ – যা কারামুক্তকামী বা মুক্তির দেশের সন্ধানী তাঁর অর্থাৎ ভগবান বা আল্লাহ্র অবস্থান যে মানব দেহে এবং এখানেই যে ইহার প্রকাশ বা জাহের সম্ভব সে সম্বন্ধে পুরুষোত্তম  বলেছেনঃ

“তোমাদেরই বুকে জাগে নিত্য ভগবান

ভয়হীন, দ্বীধাহীন, মৃত্যুহীন তিনি।

তোমারে আধাঁর করিয়া সেই মহাশক্তি প্রকাশিত হন নিত্য,

চাহ আঁখি খুলি, আপনার মাঝে দেখ আপন স্বরূপ।

তোমাদের মাঝে আছে বীর সব্যসাচী।

আমি শুনিয়াছি বন্ধু সে ঐশীবাণী।

উর্ধ্ব হতে রুদ্র মোরে নিত্য কহে হাঁকি।

শোনাতে ঐ কথা, এই তাঁহার আদেশ।

কথিত আছে যে, আল্লাহ্কে যাহারা দর্শন করিয়াছেন, যুবক রূপেই দর্শন করিয়াছেন। তাই জ্বরা-জীর্ণ দেহে নয় বরং শুদ্ধ মানব দেহে ভগবান বা রবকে খুঁজতে পুরুষোত্তম এখানে ইঙ্গিত করেছেন এবং এই শুদ্ধদেহ বলে যৌবনের অধিকারী যুবককে বুঝাতে চেয়েছেন এবং যৌবনকে তিনি বয়সের ফ্রেমে বাঁধেননি। যার মাঝে প্রাণ-চাঞ্চল্য আছে — নিজেকে জানার স্পৃহা আছে তাকেই তিনি যৌবনের অধিকারী বলেছেন। তাইতো তিনি যৌবনের গানই গেয়েছেন। এখানে যৌবন বলে এমন একটা শক্তিকে বোঝানো হয়েছে যে শক্তি নিজেকে না জানা পর্যন্ত অদম্য-অপ্রতিরোধ্য। ইহা সালাত ব্যতীত আর কিছু নয়। এ রকম যৌবনের অধিকারী তথা সালাতের মাঝে বা সালাতী সত্ত্বার মাঝেই বিদ্যমান বা জাগ্রত আপনার রব। তাই তিনি যৌবনকে বয়সের ফ্রেমে বাঁধেননি। অর্থাৎ সালাতী লোকদেরকেই এখানে যুবক বলা হয়েছে যারা ধ্যান করতে জানে এবং তাদের মাঝেই আল্লাহ্ বা রবকে খুঁজে পাওয়া যায়। “যে নিজেকে জানলো সে তার রবকে জানলো” হাদিসটির পূর্ণ সমর্থন এখানে নজরুল সাহিত্যেও পাওয়া যায়। যুবকদের প্রতি ইঙ্গিত করে এখানে সালাতী সত্তাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং তাদের মাঝে “বীর সব্যসাচী” আছে বলে জুলফেকারকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ সব্যসাচী অর্থাৎ দু-ধারী তলোয়ার- ইহা জুলফেকার ব্যতীত কিছুই নয়।

যিনি সর্বশক্তিমান তাঁহার কাছে নজরুল -শুদ্ধ- জ্ঞান কামনা করেন যার দ্বারা ধরার ধূলিতে পুণ্য, প্রেম, ভক্তি মঙ্গল ও কল্যাণে গান তিনি গাইতে পারেন এবং সেই শুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমেই নজরুল যে আত্মশক্তি অর্জন করেছিলেন তার বলেই গেয়ে উঠেনঃ

বিধি নিষেধের উর্ধ্বে স্থির,

রহি যেন চির উন্নত শির।

যাহা চায়-যেন জয় করে পাই।

গ্রহণ না করি যেন দান।

এতবড় কথা কেবল তাঁরাই বলতে পারে যাঁরা সেই শক্তির সন্ধান পেয়েছেন। এটা অহংকারের মত শুনালেও এটা অহংকার নয়। এটা পরমাত্মার জ্ঞান-আত্মপলব্ধি-রবের জাগরণ-রবের জগৎ তথা আলোর বা নূরী জগতে অবগাহন করেই একথা বলেছেন পুরুষোত্তম নজরুল। যেমন মনসুর বলেছিলেন – “আনাল হক”। মন-মগজ চোখ ও কানে পর্দা বা পীড়া রেখে খোঁজাখুজি করলে এ দর্শনের সন্ধান মিলবে না। তাঁর ভক্তিগীতি, লোকগীতি, কাব্যগীতি, ইসলামী গান ইত্যাদিতে প্রচুর জ্ঞানের খোরাক বিদ্যমান। ‘বিদ্রোহী’ হয়ে এই বিদ্রোহীকে বা ‘কাফের’ হয়ে এই কাফেরকে বা ‘পাগল’ হয়ে এই পাগলের সন্ধান করতে হবে তাঁর  মাঝে। তবেই সম্যক স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যাবে এই কালোত্তীর্ণ পুরুষোত্তম নজরুলের এবং পাওয়া যাবে তাঁর দর্শনের দেশনা।

পুরুষোত্তম তাঁর নিজের সম্বন্ধে নিজে কি বলেছেন বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন  ভাবে:

“আপনারা জেনে রাখুন- আল্লাহ্ ছাড়া আর কিছুর কামনা আমার নাই। আমার সব প্রার্থনা, নামাজ- রোজা, তপস্যা, জীবন মরণ সবকিছু বিশ্বের একমাত্র পরম প্রভু আল্লাহর পবিত্র নামে নিবেদিত। আল্লাহে পূর্ণ আত্মসমর্পণ যার হয়েছে তিনি এই মুহূর্তে এই দুনিয়াকে ফেরদৌসে পরিণত করতে পারেন। আমার মন্ত্র “ইয়াকানা বুদু ওয়া ইয়া কানাস্তাইন”। অসুন্দরের সাধনা আমার নয়। আমরা আল্লাহ্ পরম সুন্দর। তিনি আমার কাছে নিত্য প্রিয় ঘন সুন্দর, প্রেমঘন সুন্দর, রস-ঘন সুন্দর, আনন্দঘন সুন্দর। কুরআনের সূরা নূরের ভিতরে উল্লেখিত জয়তুন ও রসগুনের যেসব কথা রয়েছে, তার অর্থ অনুধাবন করার জন্য আমি সকলকে অনুরোধ জানাচ্ছি। দুঃখ সয়েছি, আঘাতকে আমি হাসিমুখে বরণ করেছি কিন্তু আত্মার অবমাননা কখনো করিনি। নিজের স্বাধীনতাকে (আজাদ) কখনো বিসর্জন দিইনি।

“বলবীর, চির উন্নত মম শির”- এ গান আমি আমার এ শিক্ষার অনুভূতি হতেই পেয়েছি। আমার ‘বিদ্রোহী’ পড়ে যারা আমার উপর বিদ্রোহী হয়ে উঠেন, তারা যে হাফেজ-রুমীকে শ্রদ্ধা করেন – এও আমার মনে হয় না। আমিতো আমার চেয়েও বিদ্রোহী মনে করি তাঁদের। আবার বলি, যারা মনে করেন- আমি ইসলামের বিরুদ্ধবাদী বা তার সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, তারা অনর্থক এ ভুল করেন। ইসলামের নামে যে সব কুসংস্কার, মিথ্যা আবর্জনা স্তুপীকৃত হয়ে উঠেছে- তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান? এ ভুল যারা করেন, তারা যেন আমার লেখাগুলি মন দিয়ে পড়েন দয়া করে। এ ছাড়া আমার আর কি বা বলবার থাকতে পারে? কেউ বলে আমার বাণী যবন, কেউ বলে ‘কাফের’, আমি বলি, এ দুটোর কোনটাই নই। বিদ্রোহ মানে কাউকে মানা নয়, বিদ্রোহ মানে ‘যেটা বুঝিনা সেটা মাথা উঁচু করে ‘বুঝিনা’ বলা।’ আর বিদ্রোহ করতে হলে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে, ‘আমি আপনাকে ছাড়া করিনা কাহারো কুর্ণিশ?”

“আমি সত্য, হাতে ন্যায় দন্ড।” আমার পক্ষে সকল রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্ত কাল ধরে সত্য জাগ্রত ভগবান। আমার পক্ষে আদি অন্তহীন অন্তত স্রষ্টা। রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে রুদ্র। রাজার বাণী বুদবুদ, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র। আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। আমি ভগবাণের হাতের বীণা। সে যাহার সৃষ্টি তাঁহাকেই সে বন্দী করতে চায়, শাস্তি দিতে চায়। আমি সত্য প্রকাশের যন্ত্র। আমার হাতের বাঁশী কেড়ে বাঁশীর সুরের মৃত্যু হবে না; কেননা আমি আর এক বাঁশী নিয়ে বা তৈরি করে তাতে সেই সুর ফোটাতে পারি। সুর আমার বাঁশীতে নয়- আমার মনে ও বাঁশী সৃষ্টির কৌশলে। অতএব দোষ বাঁশীরও নয়- সুরেরও নয়, দোষ আমার, যে বাজায়, তেমনি যে বাণী আমার কণ্ঠ দিয়ে নির্গত হয়েছে তার জন্য দায়ী আমি নই। দোষ আমারও নয়- বীণারও নয়, দোষ- তাঁর যিনি আমার কণ্ঠে বীণা বাজান। সুতরাং রাজবিদ্রোহী আমি নই। প্রধান রাজবিদ্রোহী সেই বীণাবাদক ভগবান। রাজার অনুবাদক রাজসভায় সে বাণীর শুধু ভাষাকে অনুবাদ করেছে, তাঁর প্রাণকে অনুবাদ করেনি, তাঁর সত্যকে অনুবাদ করেনি, করতে পারেনি। আমি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি। আমি জানি এবং দেখেছি, আসামী কাঠগড়ায় আমি একা দাঁড়িয়ে নই, আমার পশ্চাতে স্বয়ং সত্য-সুন্দর ভগবানও দাঁড়িয়ে। আমার আত্মা সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা। আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহৎকার নয় – আত্মোপলব্ধি, আত্মবিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি। আমি সত্য রক্ষার ন্যায় উদ্ধারের বিশ্ব প্রলয় বাহিনীর লাল সৈনিক। মহারুদ্রের তীব্র আহবান নিদ্রিত ভূমে আমায় তিনি পাঠিয়েছিলেন অগ্রদূত তুর্যবাদক করে। অমৃতের পুত্র আমি। চিরশিশু প্রাণের উচ্ছল আনন্দের পরশমণি দিয়ে নির্যাতিত লোহাকে মনিকাঞ্চনে পরিণত করার শক্তি ভগবান আমায় না চাইতেই দিয়েছেন। আমার ভয় নাই, দুঃখ নাই কেননা ভগবান আমার সাথে আছেন। আমি জানি আমাকে পরিপূর্ণরূপে আজো দিতে পারিনি, আমার দেয়ার ক্ষুধা আজো মেটেনি। বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরি অভিযান সেনাদলের তুর্য বাদকের একজন আমি। এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। কোন অনাসৃষ্টি করতে আমি আসিনি। আমি যেখানে ঘা দিয়েছি, সেখানে ঘা খাবার প্রয়োজন অনেক আগে থেকেই তৈরি ছিল।”

পুরুষোত্তম নজরুলের এতসব উক্তি কি কোনদিনও কেউ বিচার করে দেখবে না? অবশ্যই দেখবে। যারা দেখার তারা ঠিকই দেখবে। কিন্তু যাদের মগজে-কানে-চোখে পীড়া/পর্দা তারা যখন নজরুলেকে নিয়ে হৈ চৈ করে তখন যেমনি হাসি পায়- তেমনি দুঃখও লাগে। অনেক লেখক নজরুলকে স্ববিরোধী হিসাবে দেখাতে চেয়েছেন তাদের বিশ্লেষণে এবং ‘বিদ্রোহীতে” নাকি স্ববিরোধী উক্তি বিদ্যমান তাদের ভাষায়। এ রকম আরো বই বাজারে দেখা যায়, যার মাঝে ‘নজরুলকে স্রষ্টা বিরোধী ও অনুসরণকারী হিসাবে অংকিত করা হয়েছে’ আবার বলা হয়েছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করেছেন। আসলে তাদের বিশ্লেষণগুলি স্ববিরোধীতায় ভরপুর। মন-মগজে পর্দা নিয়ে পুরুষোত্তম নজরুলের স্বরূপ বুঝা এবং তাঁর দর্শনের সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। অতএব নজরুলকে নিয়ে এরা নাড়াচাড়া করলে সম্মানের চেয়ে অসম্মানই হবে বেশি।

যেমনটি হচ্ছে প্রচলিত ভন্ড মোল্লাদের দ্বারা ইসলাম ও মহানবীর অমর্যাদা, যারা মহানবীকে তাদের বড় ভাই বানাতে সদা উদ্যত (নাউযুবিল্লাহ)। বহুল প্রচলিত আযানের দোয়ার মাধ্যমে মহানবীকে কতটুকু সম্মান করা হয় সেটা ভেবে দেখার বিষয় নয় কি? এজিদ পন্থী মোল্লা, মৌ-লভীদের কথা না হয় বাদই দিলাম। ঠিক তেমনি আমাদের দেশের বিদ্যার জাহাজ ও দিকপালদিগকে আগে চিন্তা করতে হবে নজরুলকে তারা কি মনে করেন। এটা তাদের পান্ডিত্য বিস্তারের ক্ষেত্র নয়-পান্ডিত্য দিয়ে নজরুলের স্বরূপ বোঝা বা বুঝতে যাওয়া এক ধরনের মূর্খ বিলাসিতা। নজরুলের লেখা বা বাণীর উপর হাত দিতে গিয়ে প্রথমেই মনে করতে হবে যে, একজন মহাপুরুষ, আলোক শিশু, কালোত্তীর্ণ পুরুষ, নূরী বীর্যের ধারক-বাহক একজন মুক্ত পুরুষের বাণীর উপর হাত দিতে যাচ্ছি। এতটুকু মনে করতে না পারলে সেখানে নজরুল কবিতার ব্যাখ্যা হবে না। এতে করে মহাপুরুষের স্বরূপটি হয়ে উঠবে বিতর্কিত। এমতাবস্থায় যারা নজরুলকে ভালবাসেন তাদের নীরবে ভালবাসাই সমীচীন-সরব বা কলমে নয়। এই শুদ্ধ ও সিদ্ধ-পুরুষের ‘বিদ্রোহী’ নামক কবিতাটি ব্যাখ্যা করার মত কাউকে আমি জানিনা বা চিনিনা। হয়তো থাকতে পারে আমার পরিচয় নেই। দিকপাল বিদ্যার জাহাজদের কাছে অনুরোধ নিজেদের পান্ডিত্য বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে পুরুষোত্তম নজরুল ও তাঁর দর্শনের সাহিত্য দয়া করে বেচে দিবেন না। এতে সম্মান দিতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। একজন নজরুল প্রেমিক হিসেবেই আমার অনুভূতিটুকু প্রকাশ করলাম মাত্র। কেউ আমাকে ভুল বুঝবেন না। অবশ্যই নজরুল ও তাঁর সাহিত্যের উপর সবারই সমান অধিকার আছে। পাশাপাশি মহাপুরুষের ভাবমূর্তি ও তাঁর  দর্শনকে বিতর্কিত করার অধিকারতো আপনার আমার কারো নেই। এতটুকু মনে রাখলেই তাঁর সঠিক স্বরূপ অনুধাবন করে তাঁর দর্শন থেকে  আমরা সবাই উপকৃত হতে পারবো সমষ্টিগতভাবে। ব্যক্তিগতভাবে তো যার যা পাওয়ার তা পেয়েছি এবং তা পেয়েই চলেছি। এবার দেখা যাক পুরুষোত্তমের আপন ভাষায় কি পরিচয় আমাদের দিচ্ছেনঃ

“আমার আল্লাহ্ পরম সুন্দর। আপনাদের আহ্বানে যখন কর্ম জগতের ভীড়ে নেমে আসি, তখন আমার পরম সুন্দরের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হই, আমার অন্তরে বাহিরে দুলে উঠে অসীম রোদন। সুন্দরের ধ্যান ও তাঁর স্তবই আমার ধর্ম। আমি তাঁর বিরহ এক মুহূর্তের জন্যও সইতে পারি না। আমার সর্ব অস্তিত্ব, জীবন-মরণ কর্ম, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ যে তাঁরই নামে শপথ করে তাঁকে নিবেদন করেছি। আজ আমার বলতে দ্বিধা নেই, আমার ক্ষমা-সুন্দর প্রিয়তম আমার আমিত্বকে গ্রহণ করেছেন। যদি আর বাঁশি না বাজে আমায় ক্ষমা করবেন- আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন অসাম্য ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ-সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। অসুন্দরকে ক্ষমা করতে- অসুরকে সংহার করতে এসেছিলাম- আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম- প্রেম পেতে এসেছিলাম সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম। মনে করবেন পূর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে যে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতায় বেদনায় তাঁরই নির্গত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল। আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান-বেদনার গান গেয়ে যাব আমি, দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে সকলের বাঁচার মাঝে থাকবো আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা। রবীন্দ্রনাথ আমাকে প্রায় বলতেন, ‘দেখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত কীটস্- এর মত খুব বড় একটা ট্রাজেডী আছে, তুই প্রস্তুত হ!’ জীবনে সেই ট্রাজেডী দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারণে অন্যের জীবনে অশ্রূর বর্ষায় আছন্ন করে দিয়েছি। কিন্তু আমারই জীবনে রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত তপ্ত মেঘের উর্ধ্বে শূন্যের মত। কেবল হাসি! কেবল গান! কেবল বিদ্রোহ!

আমার বেশ মনে পড়ছে, একদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথা! আমার ছেলে মারা গেছে, আমার মন তীব্র পুত্রশোকে যখন ভেঙ্গে পড়েছে-ঠিক সেই দিনই, সেই সময়ে আমার বাড়িতে হাস্না হেনা ফুঠেছে আমি প্রাণ ভরে সেই হাস্না-হেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম।

আমার কাব্য-আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য হতে সৃষ্টি হয়েছে। যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়তোবা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা-কত কবিতা বেরুবে হয়তো আমার নামে। দেশ-প্রেমিক, বীর বিদ্রোহী-বিশেষণের পর বিশেষণ, টেবিল ভেঙ্গে ফেলবে থাপ্পড় মেরে। বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে, বন্ধু তুমি যেন যেওনা। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের একটি কথা স্মরণ করো। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো, বন্ধু, আমি তোমায় পেয়েছি।’

“তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু

আর আমি জাগিব না-

কোলাহল করি সারা দিন মান

কারো ধ্যান ভাঙ্গিব না।

নিশ্চল, নিশ্চুপ- আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধুর ধূপ!”