৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মিলনমেলায় মিরপুর আস্তানা শরীফ

সত্যের দুর্নিবার ঝাণ্ডা নিয়ে বাংলার এই অঞ্চলে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠায় পূর্ব দিগন্তে এক মাহেন্দ্রক্ষণে যে জ্যোতির্ময়ের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাঁরই জ্যোতি আজ দিক হতে দিগন্তে প্রসারিত। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক সেই জ্যোতি, সত্যের কান্ডারী। হাক্কানী হওয়ার পথযাত্রী ও সত্যানুসন্ধানীদের জীবনে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মিরপুর আস্তানা শরীফ হাক্কানী চিন্তনপীঠের প্রাণকেন্দ্র্র। নিজের সত্যকে উপলব্ধি করার নতুন প্রেরণাশক্তি নিয়ে আমাদের জীবনে প্রতিবছর ফিরে আসে মিরপুর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, আসে অনাবিল আনন্দ উদ্যাপনের শুভ লগ্ন। ১৯৮৮ সন থেকেই তা হয়ে আসছে। বাংলা ১৩৯৪ সনের ১৩ মাঘ, ইংরেজি ১৯৮৮ সনের ২৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার ‘মিরপুর আস্তানা শরীফ’ প্রতিষ্ঠিত হয় রাজধানী ঢাকার মিরপুরে।

হাক্কানী দর্শনের তিন সত্যমানুষের মহামিলনের পূণ্য তীর্থকেন্দ্র মিরপুর আস্তানা শরীফ দীর্ঘ ৩১ বছর অতিক্রম করে এবছর ৩২-এর প্রোজ্জলন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। ৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনে মিরপুর আস্তানা শরীফ ১২ ও ১৩ মাঘ ১৪২৫, (২৫-২৬ জানুয়ারি ২০১৯) রোববার ও সোমবার সত্যানুসন্ধানীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রারম্ভে কিশোরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মাজার চান্দপুর শরীফে যথাযথ ভক্তি ও আদবের সাথে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়।

দু’দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ১২ মাঘ ১৪২৬, (২৬ জানুয়ারি ২০২০) রবিবার দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত হাক্কানী খানকা, দরবার ও আস্তানা শরীফ থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ ও দরবারি ভাই বোনদের নাম নিবন্ধন, বরণ, স্বত:স্ফূর্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বিকেল ০৪.৪৫ মিনিটে আস্তানা শরীফ প্রাঙ্গনে হাক্কানী শব্দ তরঙ্গের তালে পতাকা উত্তোলন করেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের সহসভাপতি শফিউল আলম খোকন, হামিবা-র সহসভাপতি শাহ্ ইমতিয়াজ আহমেদ টিটু এবং বাহাখাশ এর সহসভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ। এরপর হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদ-এর নেতেৃত্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন পর্ষদ ও মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের সদস্যবৃন্দ, বাহাখাশ কেন্দ্রিয় ব্যবস্থাপনা সংসদের সদস্যবৃন্দসহ বাহাখাশের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ ও বিভিন্ন প্রকল্পের সদস্যবৃন্দ এবং উপস্থিত দরবারি ভাই-বোন দরবারে প্রদক্ষীণ করে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন। শব্দ তরঙ্গ পরিবেশনায় ছিলেন হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ। এদিন দিবা-রাত্রি সন্ধিক্ষণে দরবারের পশ্চিম পার্শ্বের মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হামিবা সভাপতি – শাহ্ সূফী ড. মুহাম্মদ মেজবাহ উল ইসলাম। এবং দরবারের পূর্ব পাশ্বের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হামিবা মহাসচিব এন সি রুদ্র, নির্বাহী সদস্য মো. ওয়াহিদুজ্জামান, নির্বাহী সদস্য হারুন অর রশিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এম আর জয়ন্ত, সাংগঠনিক সচিব নাসরিন সুলতানা জুলি, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এর সদস্য শেখ সাদি, হাক্কানী মহিলা উন্নয়ন বিভাগ এর সভাপতি এ্যাড. রানু আখতার, হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর সদস্য নার্গিস সুলতানা সুমি, হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাসিমা করিম, হামিবা স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের সদস্য সালমা আক্তার এবং হাক্কানী যুব উন্নয়ন বিভাগের সদস্য সোহরাব আহমেদ শিপলু।

মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলনের পরবর্তী পর্ব ছিল ‘বন্ধনে তুমি-আমি’ বিষয়ক মুক্ত আলোচনা। সূচনা বক্তব্য রাখেন হামিবা মহাসচিব শাহ্ এন সি রুদ্র। এরপর ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য রাখেন হাক্কানী বিশেষ দূত মোল্লা হাসানুজ্জামান টিপু,হামিবা সদস্য বহরদার টিপু সুলতান, বিবি ফাউন্ডেশন এর সভাপতি – সত্যানুসন্ধানী বাহাদুর বেপারি এবং হামিবা সভাপতি শাহ্ সূফী ড. মুহাম্মদ মেজবাহ উল-ইসলাম।

সন্ধ্যা ৭.০১ মিনিটে হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদের নেতৃত্বে কেক কেটে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন উপস্থিত সকল ভক্ত ও আশেকানবৃন্দ। সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে হাক্কানী আস্তানা শরীফ এর তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ শওকত আলী খান এবং রোজলিন বিশ্বাস ববিকে বিবাহোত্তর সংবর্ধনা দেয়া হয়। শোধনসেবা বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের মূলতবী করা হয়।

দ্বিতীয় দিন ১৩ মাঘ, ২৭ জানুয়ারি, সোমবার বিকেল ৪.০১ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিকেল ৪.৪৫ মিনিটে গিলাপ, ফুল ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের অন্যান্য উপাদান নিয়ে দরবার প্রদক্ষীণ করে মিরপুর আস্তানা শরীফ-এর নেতৃত্বে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর রওজায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। দিবারাত্রির সন্ধিক্ষণে ৫.৪০ মিনিটে দরবারের পশ্চিম দিকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলন করেন হামিবার নির্বাহী সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মি, দরবারের পূর্ব দিকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা’র নেতৃত্বে শাহ্ এন সি রুদ্র, শাহ্ মনোয়ারা সুলতানা, শাহ্ তৌহিদা জেসমিন,শাহ্ খায়রুল আলম রাসেল, শহীদুল ইসলাম খান, আব্দুল্লাহ আল মাসুম, আব্দুল হামীম মিয়া, কাজী সবুর, মমতাজ বেগম এবং মমতাজ বেগম।

একই সাথে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর রওজার সম্মুখে বাহাখাশ এর প্রধান উপদেষ্টা শাহ্ মো. লিয়াকত আলী’র নেতৃত্বে বাহাখাশ এর সকল সদস্যবৃন্দ মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলন করে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন।

অনুভূতি প্রকাশ পর্বে ‘মিরপুর আস্তানা শরীফ ও আমি’ বিষয়ের উপর মোট ১২ জন ভক্ত আস্তানা শরীফের সঙ্গে তাদের জীবনের স্মৃতি বিজরিত কর্ম ও বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে আলোচনা করেন। তারা হলেন -ড. খাঁন সরফরাজ আলী পরশ, শহীদুল ইসলাম খান, আব্দুল কাদের টিটু, শেখ বরকত উল্লাহ রানা, শাহ্ খায়রুল আলম রাসেল, শাহ্ শহীদুল আলম, শাহ্ ইমতিয়াজ আহমেদ, শাহ্ আশরিফা সুলতানা, শাহ্ মনোয়ারা সুলতানা, শাহ্ মো. লিয়াকত আলী, শাহ্ শাহনাজ সুলতানা এবং শাহ্ শওকত আলী খান।

৩২ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণে অর্থাৎ ৭.০১ মিনিটে ‘তোমারই আশীসে মোদের রেখো ক্ষমায়’ এই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে হাক্কানী শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে দরবারের ক্ষুদে বন্ধুরা এবং উপস্থিত সকল ভক্ত ও আশেকান ক্ষুদে বন্ধুদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। বিশেষ পর্বে মিরপুর আস্তানা শরীফের ভক্ত ও হামিবা নির্বাহী সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা কে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)মিরপুর আস্তানা শরীফ এর তত্ত্বাবধায়ক এর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। একই সাথে তাঁকে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) ও হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা) এর পক্ষ হতে শাহ্ উপাধি দেয়া হয়। এরপর সরারচর আস্তানা শরীফ এর মাননীয় তত্ত্বাবধায়ক দেওয়ান শাহ সূফী কামরুল হাসান তাঁকে (সুমাইয়া সুলতানা) শাহ্ সূফী উপাধিতে অলংকৃত করেন।

এরপর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর পরিচালনায় ভাবসঙ্গীত পরিবেশন করেন হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ কুষ্টিয়া থেকে আগত অতিথি শিল্পীবৃন্দ,এবং হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মী ও একাডেমীর অন্যতম সদস্য-হাক্কানী আস্তানা শরীফ-এর তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ শওকত আলী খান। যন্ত্রসঙ্গীতে সহযোগিতায় ছিলেন তবলায়-আলী নূর এবং বাঁশিতে কৌশিক।

২ দিনব্যাপী আয়োজিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদের সাংগঠনিক সচিব নাসরিন সুলতানা জুলি, নির্বাহী সদস্য ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মি, বর্তমান সংলাপ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শেখ সাদি এবং হাক্কানী আস্তানা শরীফ এর মহাসচিব আব্দুল কাদের টিটু। ভোর ৫.৩০ মিনিটে হাক্কানী স্মরণ ও নৈবেদ্যের মধ্য দিয়ে ১৪২৭ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পর্যন্ত অনুষ্ঠান মূলতবী হয়।