হারিয়ে যাচ্ছে নদী : হারিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি

হাসান জামান টিপু ॥ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। মাতা যেমন প্রসব করে, নদী সেরকম বাংলা নামক ব-দ্বীপটি প্রসব করেছে, তাই নদীমাতৃক বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল হিমালয় থেকে ছুটে আসা অসংখ্য নদ-নদীর প্রবাহ থেকে। যে প্রবাহের সাথে বহমান বিন্দু বিন্দু পলিমাটি হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে তুলেছিল পৃথিবীর বৃহত্তম এই ব-দ্বীপ। এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা সবকিছুতেই রয়েছে নদীর প্রভাব। সভ্যতার প্রধান দুই উপকরণ সুপেয় পানি ও খাদ্য নদী থেকে নিয়েই গড়ে উঠেছে নদীতীরের বসতি। নদীর পাড়ের এই মানুষের জীবন-জীবিকা ও পেশা নিয়ে তৈরী হয়েছে গান, কবিতা, উপন্যাস ও চলচ্চিত্র। সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের সংস্কৃতিজগত।

মুলত তিব্বতী ভাষায় বঙ্গ অর্থ ভেজা। আবার বাংলায় বঙ্গ শব্দটি বহন এবং ভাঙ্গার সাথে জড়িত। তাই বঙ্গ একসাথে বহন করে উপরের পানি ও পলিমাটি আবার সেটা বিভিন্ন পথে ভাঙ্গনের সৃষ্টি করে। তাই এ দেশের অন্য নাম হল বঙ্গ দেশ। 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর হিসাব অনুযায়ি বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫টি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১০২টি, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ১১৫টি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী ৮৭টি, উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী ৬১টি, পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী ১৬টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী ২৪টি হিসেবে বিভাজন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদ-নদীর মধ্যে অনেকগুলোই আকার এবং গুরুত্বে বিশাল। এসব নদীকে বড় নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বৃহৎ নদী হিসেবে কয়েকটিকে উল্লেখ করা যায় এমন নদীসমূহ হচ্ছে: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, গোমতী ইত্যাদি। বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমা।৩৯৯ কিলোমিটার লম্বা। সবথেকে চওড়া যমুনা। দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্র। গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গা, এর থেকে পদ্মা হয়ে সাগরে মিশেছে। আবার ব্রহ্মপুত্র থেকে যমুনা হয়ে সাগড়ে মিশেছে। লুসাই পাহাড় থেকে মেঘনার উৎপত্তি। বাংলাদেশের সব নদীর উৎপত্তি হিমালয় থেকে। একমাত্র সাংগু নদীর শুরু ও শেষ বাংলাদেশে।

হাজার বছরের বাঙালি ও বাংলাদেশের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত নদী। হাজার হাজার বছরের বাঙালি সভ্যতার ভিত্তিই তৈরী করেছিলো নদী কেন্দ্রিক জীবনধারা। এখানকার নদীবিধৌত পলি আমাদের উর্বর জমি দিয়েছিলো চাষাবাদের জন্য, নদী ছিলো আমাদের যাতায়াতের প্রধানতম উপায় তাই গড়ে উঠেছিলো নদী কেন্দ্রিক হাট, বাজার, গঞ্জ ইত্যাদি। নদী কেন্দ্রিক শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গড়ে উঠে ছিলো। মানুষের শিরা উপশিরা যেমন মানুষের শরীরকে সচল রাখে তেমনি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে সচল রাখতে সাহায্য করে।

নদী কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড গড়ে উঠেছিলো এই বাংলাদেশে। পাল তোলা, গুনটানা, ছোট ছোট নৌকা চলমান নৌকা প্রকৃতিকে সমৃদ্ধি করে, পরিবেশকে মনোরম করে, দৃশ্যগুলিকে মোহনীয় করে। নদীর কুলে কুলে সাঁতার, মাছধরা ইত্যাদি মনোরম দৃশ্য ছবির মতো। নদীর পাঁড়ের বধু জল নিয়ে যাচ্ছে এরকম একটা দৃশ্য আমাদের গল্প, কবিতা, শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করেছে। ভাটিয়ালি সুর এই নদীরই সৃষ্টি।

মানুষের মত বিভিন্ন পাখ পাখালি সাথে সক্ষতাও গড়ে তুলেছে নদী।

বাঙালি স্বকীয়তার আন্দোলনে, আত্মপরিচয়ে তুলে ধরতে নদীর ভূমিকা অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুও তাজউদ্দীন আহামেদ একই নৌকায় ছবিটা এক্ষেত্রে বিচার্য। আওয়ামী লীগে নির্বাচনী প্রতিক নৌকা নদীর অপরিহার্যতার সাক্ষ্য দেয়। স্বাধীনতার অন্যতম শ্লোগান ছিলো, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নৌপথে আমাদের মুক্তিবাহিনী ছিলো অপ্রতিরোধ্য।

 নদী বিধৌত বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল করেছে নদী। আমাদের নগরায়নের ভিত্তি স্থাপন করেছে নদী। নদী আমাদের একান্ত আপনজন । (চলবে)