হাক্কানী মর্মকথা

সংলাপ ॥ ‘আহলে-আল-হাক্ক’ অর্থাৎ সত্যের অনুসারীগণই হাক্কানী। ইসলামের আবির্ভাবের সাথে খ্রি. সপ্তম শতকে এমন কিছু সাধকের আবির্ভাব ঘটে যাঁরা আত্মিক উন্নতির জন্য কর্ম ও প্রেমের পথ বেছে নেন। তাঁদেরকে ‘আহলে-আল-হাক্ক’ বলা হতো।  

আরবি ‘হক’ শব্দের সাথে ‘নী’ প্রত্যয় নিয়ে ‘হাক্কানী’ শব্দটির উৎপত্তি। ‘হক’ অর্থ সত্য। ‘হক’ এর সাথে ‘নী’ প্রত্যয় যুক্ত হবার তাৎপর্য হলো – সত্যের সাথে একাত্মতা ঘোষণার নিশ্চয়তা। এইভাবে, হাক্কানী অর্থ হচ্ছে – সত্যের সাথে একাত্মত.

‘সত্যের সাথে একাত্ম’- অর্থ হলো ‘আমিই সত্য’ (আনাল হক) -এর ঘোষণা। ‘আনাল হক’ বা ‘আমিই সত্য’, ‘আমিই পরম সত্তা’ প্রথম এই ঘোষণাটি দিয়েছিলেন সূফী সাধক আবু মুসা ইবনে মনসুর হাল্লাজ। পরমসত্তার সাথে অভিন্ন সাধক নিজেই পরম সত্তা। কিন্তু বিভ্রান্তরা ‘আনাল হক’ ঘোষণাকে অংশীদারী বললো।

মানুষ সত্যের প্রতিনিধি অর্থাৎ মানুষ সত্যেরই অংশ। সাধনার মাধ্যমে অংশ সমগ্রতে নিজেকে বিলীন করতে পারে – এটা তারা বুঝতে চাইলো না। তারা ফতোয়া দিলো – সূফী সাধক মনসুর আল হাল্লাজ ইসলাম দ্রোহী। ‘আমিই সত্য’ ঘোষণাকে তারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করলো। এই ঘোষণাকে বাতিল বলে স্বীকারোক্তি আদায় করতে প্রথমে তাঁর উপর নির্যাতন চালানো হলো। চাবুক মারা হলো, দু’পা কেটে ফেলা হলো। তাঁকে ঝুলিয়ে রাখা হলো সারারাত। তবু তিনি তাঁর ঘোষণাকে প্রত্যাহার তো করলেনই না বরঞ্চ হাসি মুখে ভক্তদের নির্দেশনা দিয়ে চললেন। এক ভক্ত তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘হক, তোমার এই করুণ অবস্থা কেন?’ মুচকি হেসে সাধক মনসুর জবাবে বললেন, – “তাঁর আদরের প্রকাশ এরকমই; যে তাঁর সঙ্গে মিলন চায়, তাকে এভাবেই তিনি কাছে টেনে নেন”। তারপর কারাগার থেকে জল্লাদ আনা হলো, নির্মমভাবে হত্যা করা হলো সূফী সাধক মনসুরকে। তিনি আনন্দের সাথে বরণ করলেন সব নির্যাতন কিন্তু ত্যাগ করতে পারলেন না ‘হক’ বা ‘সত্য’-কে। কিভাবে করবেন? অংশ সমগ্রতে বিলীন হয়ে গেলে কি সেই অংশকে পৃথক করা যায়? একফোঁটা জল সমুদ্রের পানিতে মিশে গেলে কি এই ফোঁটাটাকে আবার সমুদ্র থেকে আলাদা করা যায়? যায় না। – এটাই সত্যের সাথে একাত্মতা। সত্যের সাথে যিনি একাত্ম, তিনি সত্যের জন্য সব ত্যাগ করতে পারেন কিন্তু সত্যকে ত্যাগ করতে পারেন না। কারণ, আমিই যখন সত্য তখন সত্যকে ত্যাগ করলে যেমন আমি থাকে না তেমনি আমিকে ত্যাগ করেও সত্য থাকতে পারে না। সত্য আর আমি একাকার হলে, অর্থাৎ – আমির সাথে সত্য এবং সত্যের সাথে আমি অবিচ্ছিন্ন, অবিচ্ছেদ্য হলেই সত্যের সাথে একাত্মতা হয়। এটাই ‘হাক্কানী’ শব্দের পারিভাষিক তাৎপর্য।

নিজেকে পরিশুদ্ধ করে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই এ হাক্কানীতত্ত্বের মূলকথা। যিনি নিজেকে তাঁর স্রষ্টার সাথে সংযুক্ত রাখার সাধনায় নিয়োজিত রাখেন তাকেও হাক্কানী বলা হয়। হাক্কানী তত্ত্ব তরিকত বা আল্লাহর প্রাপ্তির পথ। ‘তরীকা’ শব্দটি ‘তারীক’ শব্দ থেকে উদ্ভুত। তারীক শব্দের আভিধানিক অর্থ – পদ্ধতি, পথ, পন্থা, নিয়ম, প্রণালী। সূফী পরিভাষায় – ‘তরীকা’ শব্দটির পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে – সত্যের সাথে একাত্ম হবার – ‘আনাল হক’ বা ‘আমিই সত্য’ হবার নির্দেশিকা, নির্দেশনা, নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, পদ্ধতি বা প্রণালী।

যে যান পানির উপর দিয়ে চলে কিন্তু পানি যার ভেতরে ঢোকে না সে যানকে বাংলায় তরী বা নৌকা বলা হয়। হাক্কানী তত্ত্ব এমনই একটা তরী বা তরণসাধনীর নাম, যে সাধনী ব্যবহার করে নদী পার হয়ে ওপাড়ে যাওয়া যায় কিন্তু শরীর ভেজে না। সূফীতত্ত্বে এই তরণসাধনী একটা নতুন মাত্রা এনেছে। হাক্কানী তত্ত্ব বিশ্ব মানবতাকে আহ্বান জানায় – সংসারের জালে আবদ্ধ থেকেও উপনীত হওয়া যায় সাধনার সর্বোচ্চ শিখরে। ‘তুমি পানিতেই থাক, পানিতেই সাঁতার কাট কিন্তু রাজহংসের মতো হও, এমন হও যেন পানি তোমার শরীর ভিজিয়ে না দেয়। তরী চলার জন্য পানি লাগবেই। কিন্তু পানি থাকবে তরীর বাইরে। তরীর ভেতরে পানি ঢুকে গেলে তরী ডুবে যাবে। তুমি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না।’

যে ব্যক্তি জগতের জন্য কিছু করতে চায়, তাকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয় জগত যেন তার মধ্যে ঢুকে না যায়। জগত অত্যন্ত নিপুণভাবে মায়ার জাল বিস্তার করে রেখেছে। জগত ব্যক্তির মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করবার, ভেতরে ঢুকবার অবিরাম চেষ্টায় আছে, সমুদ্রের পানি যেমন অবিরাম চেষ্টা করে নৌকার ভেতরে ঢুকে যেতে। সুন্দর নর-নারী, তেজস্বী ঘোড়া, স্বর্ণালঙ্কার কোন কিছুর অভাব নেই এখানে। জগতের প্রতি এই মায়ার জাল ছিন্ন করা বড়ই কঠিন কাজ। একটু ছিদ্র থাকলেই পানি ঢুকে যায়। পানি ঢুকতে ঢুকতে ছিদ্রটা বড় হতে থাকে ফলে নৌকাডুবি হয়।

সমাজ ও সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাম, ক্রোধ, মোহ, ঈর্ষা ইত্যাদি কিভাবে উৎপন্ন হচ্ছে, কিভাবে পরম প্রকৃতির উপর আবরণ তৈরি করছে তা পরীক্ষা করা যায় না, জানা যায় না। সংসারের বাইরে থাকলে কাম-ক্রোধ উৎপন্ন করার মতো পরিবেশ থাকে না, ফলে তা উৎপন্ন নাও হতে পারে। ফলে কিছুদিন সংসারের বাইরে থাকলে এমন একটা ধারণার জন্ম হতে পারে যে এসবের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু আবার মানুষের মাঝে ফিরে এলেই টের পাওয়া যাবে, ‘এই ধারণা সঠিক ছিল না’। পরিবেশের প্রভাবে সুপ্ত শক্তিগুলো ভিন্ন পরিবেশে এসে শক্তি সঞ্চয় করে জাগ্রত হতে পারে। তাই সমাজ ও সংসার অর্থাৎ মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কই সত্যের সাথে একাত্ম হবার সঠিক পন্থা। পারস্পরিক সম্পর্কই জীবন। এমনকি সমাজ ও সংসারের সাথে যার কোন সম্পর্ক নেই তারও সম্পর্ক আছে জগতের সাথে, জীবনের সাথে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের মাধ্যমেই দ্বন্দ্ব, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, পরনির্ভরতা, পরচর্চা ও পরমুখাপেক্ষিতার অবসান ঘটিয়ে এর স্থলে স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা, প্রেম, শ্রদ্ধা ও ভক্তির সৃষ্টি করা যায়। জীবন চলার পথে নানান রকম মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়। পারস্পরিক সম্পর্কের মিথষ্ক্রিয়ায় উন্মোচিত হয় নিজের মধ্যে সুপ্ত পরম প্রকৃতি। তাই হাক্কানীতত্ত্বের মূল কথা – “অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ।”

অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় মুক্তির স্বাদ লাভের পদ্ধতিই “হাক্কানীতত্ত্ব”। হাক্কানীতত্ত্ব – “ভেতর থেকে বাহিরে” এবং “বাহির থেকে ভেতরে” এই দুটি পদ্ধতির সমন্বিত পথ নির্দেশনা। এই নির্দেশনার একটি দিক – ‘নিজ’-কে পর্যবেক্ষণ করা, অন্য দিকটি হচ্ছে – কিভাবে ‘নিজ’, জগত-সমাজ-সংসারের সাথে সম্পর্কিত হচ্ছে তা দর্শন করা। এই সমন্বিত পদ্ধতিতে সত্যের সাথে একাত্ম হবার সাধনায় রত থাকার নিমিত্তে হাক্কানীতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘হাক্কানী মিশন’। হাক্কানী মিশন হচ্ছে হাক্কানী তত্ত্বানুসারীদের সাধনার ক্ষেত্র। মিশনের মাধ্যমে দেশে এবং বহি:র্বিশ্বে হাক্কানী তরীকা তুলে ধরছে তার কর্ম, মানবতা ও শান্তির সূফীতত্ত্ব। এই তত্ত্বের লক্ষ্য হলো শান্তি, আদর্শ হলো মানবতা, মূলনীতি হলো কর্ম। সৃষ্টির প্রতি প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রেমার্জন হাক্কানী মিশনের মূল আদর্শ।

জীবন থেকে পালিয়ে নয়, জীবনের প্রবাহে থেকে জগতের অশুভ ও অকল্যাণের সাথে যুদ্ধ করে নিজেকে বিকশিত করা হাক্কানী নীতি। হাক্কানীতে হেরে যাওয়া মনোবৃত্তি, নিষ্ক্রিয়তা ও অসাড়তার কোন স্থান নেই। জীবনের সকল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দুঃখকে জয় করার শিক্ষা দেন হাক্কানী সাধকগণ।

বস্তুত: এটাই ছিল মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর শিক্ষা। কিন্তু কালক্রমে বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েছে নবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) প্রদর্শিত পথ। সত্য আর শান্তির যে বার্তা মরু-আরবে  মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নিয়ে এসেছিলেন সে বার্তার ভাবান্তর  ঘটেছে। ধর্মকে ব্যক্তি আর গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহারের তৎপরতায় মোহাম্মদী ইসলাম বা সাধনার ইসলাম রপান্তরিত হয়েছে স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ইসলামে। ধর্মের মর্মবাণীকে নির্বাসনে ঠেলে একে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থ করার বর্ম হিসেবে। ফলে ধর্ম হয়েছে লুন্ঠন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার এবং শোষিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সম্পদ পিপাসু আর ক্ষমতা লিপ্সু রাজারূপী আরব, তুর্কি আর পার্সিয়ান দস্যুদের তরবারির খাপে করে ভারতীয় উপমহাদেশে ১২০৪ সালে ঢুকে পড়েছিল এই মতলবি ইসলাম। প্রাচীন বাংলার গৌড়ের রাজা লক্ষণ সেনকে পরাস্ত করে দস্যু ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গ বিজয় করেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। বখতিয়ার খিলজি এদেশে শান্তির ধর্ম ইসলামের সাম্য আর মৈত্রীর বাণী নিয়ে আসেনি, এসেছে মতলবি ইসলামের হিংস্রতা ও বর্বরতা নিয়ে! তৎকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ উস সিরাজসহ সমকালিন ঐতিহাসিকদের বিবরণে জানা যায়, বখতিয়ার খিলজি ও তাঁর পরবর্তী শাসকরা সে সময় হিন্দু মন্দির আর বৌদ্ধ বিহারগুলো কেবল ধ্বংসই করেনি, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নিধনে চালিয়েছিল গণহত্যা। অবাধে লুন্ঠন করেছিল মন্দির আর বৌদ্ধ বিহারে থাকা সোনা-দানা আর ধনসম্পদ। এর বিপরীতে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তার আগেই ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী এদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেন সূফী দরবেশগণ। যাঁরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন ত্যাগ, প্রেম আর মানবসেবা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বখতিয়ার খিলজিরও শত বছর আগে সূফী দরবেশ বাবা আদম ধর্ম প্রচারে এসেছিলেন বাংলায়। তারপরই পাওয়া যায় শাহ্ মোহাম্মদ সুলতান রুমীর নাম। যিনি ধর্ম প্রচার করে গেছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলে। এই সাধকদেরই হাত ধরে বাংলা তথা গোটা ভারতবর্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রহণ করেছিল শান্তি ধর্ম ইসলাম। খিলজি ও তার উত্তরসূরী  তথাকথিত মুসলমান শাসকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক ইসলাম ভারতবর্ষে তার স্থান করে নেয় ক্ষমতাকে ঘিরে। তবে আচার সর্বস্ব এই রাজনৈতিক ইসলাম ভারতবর্ষে ইংরেজ রাজত্ব পূর্ব পর্যন্ত ঘোরতর শান্তি বিনষ্টের কারণ হয়নি কখনও। তারও কারণ অবশ্য ওই ক্ষমতা। ভারতবর্ষে মুসলমান নামধারী এই শাসকদের আচার সর্বস্ব ধর্মের প্রচার প্রসার নিয়ে ভাবনা ছিল না। ক্ষমতাকে ধরে রাখার এবং ক্ষমতা বিস্তারের দিকেই তাদের মনোযোগ ছিল। গোল বাঁধলো যখন শুরু হলো এদেশে ইংরেজ রাজত্ব। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার চিন্তা থেকে ইংরেজরা এদেশে নিয়ে আসলো ঘৃণ্য বিভেদ নীতি। ইতিহাসে যা কুখ্যাত হয়ে আছে উরারফব ধহফ জঁষব চড়ষরপু নামে। এই নীতি ভারতবর্ষের প্রধান দুই ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু আর মুসলমানকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বিশেষ করে হাজার বছরের অভিন্ন বাঙালি সত্তা মুখোমুখি হয়ে পড়ে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক বৈরিতায়। আনুষ্ঠানিকতা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক ইসলামকে ইংরেজ সর্বাত্মক সুচতুর পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, কখনো প্রকাশ্যে কখনো নেপথ্যে। উদ্যোগ নেয় আচারসর্বস্ব মোল্লা তৈরির কারখানা-মাদ্রাসা শিক্ষার। এরই অংশ হিসেবে ১৭৮১ সালে ইংরেজরা প্রতিষ্ঠা করে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা। একের পর এক ইংরেজ পাদ্রীদের অধ্যক্ষ করে তাদের ভাবধারায় এদেশে বিস্তার ঘটে মাদ্রাসা শিক্ষার।  আরবে এই নিকৃষ্ট রাজনৈতিক ইসলামের মতাদর্শগত নেতৃত্ব দেয় যা পরিচিত লাভ করে ওহাবী ভাবধারা নামে। এই ওহাবী ভাবধারাই গত শতকে আবির্ভূত হয় রাজনৈতিক ইসলাম রূপে। ইংরেজ মদদপুষ্ঠ শান্তিধর্ম বিনাশি এই ওহাবি ভাবধারা উত্তর ভারতে নিয়ে আসেন স্যার সৈয়দ আহমদ (১৭৮৩-১৮৩১)। আর বাংলাদেশে এই বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এনায়েত আলী (১৭৯৪-১৮৫৮) এবং কেরামত আলী (১৮০০-১৮৭৪) তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া নামে আন্দোলনের মাধ্যমে। সমসাময়িক কালেই এদেশে ওহাবি ভাবধারা ছড়িয়ে দেয়ায় ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে ফরিদপুরের শরিয়ত উল্ল্যাহকে (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজি আন্দোলন নামে। এই তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া এবং ফরায়েজি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাঙালি মুসলমানদেরকে ধর্মের মর্মমূল থেকে তুলে এনে কেবলি গোঁড়া আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব করে তোলা।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটে আনুমানিক ১৮৩০-৪০ সালে ভারতীয় মুসলমান বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের সত্যের পথ দেখাতে আর্বিভাব ঘটে একজন মহান সূফী সাধকের। এই সাধক  আজানগাছী নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর জন্ম আজকের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। আত্মপ্রচার বিমুখ এই সাধক নাম পরিচয় মুছে দিয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তাঁর গাঁয়ের নামে। হাওড়া ও হুগলি এই দুই জেলার সঙ্গমস্থলে রূপনারায়ণ নদীর তীরে ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই আজানগাছী গ্রাম অবস্থিত। গ্রামের নাম এরূপ হওয়ার কারণ যতদূর জানা যায়, গাছে উঠে এক ব্যক্তি আজান দিয়েছিলেন এবং এই আজানের শব্দ যতদূর শুনা গিয়েছিল ততদূর জুড়ে এলাকার নাম হয়েছিল আজানগাছী। জানা যায়, কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাগ্রহণ করতে যেয়ে তাঁর সত্যপিপাসু চিত্তে ধরা পড়ে ধর্মব্যবসায়ীদের স্বরূপ। ধর্মের নামে প্রতারণাপূর্ণ আচার সর্বস্বতা, ভোগের ছড়াছড়ি আর হিংসা হানাহানি দেখে সত্যের অন্বেষণে ব্রতী হন তিনি। ত্যাগের মন্ত্রে সমর্পিত হয়ে ডুব দেন সত্যের সাধনায়।

২৫ বৎসর বয়সে সত্যের মহা আকর্ষণে সংসারের মায়াজাল ছিন্ন করে তিনি গৃহত্যাগী হন। ঘুরতে থাকেন  দেশ থেকে দেশান্তরে, সান্নিধ্যে আসেন বিভিন্ন তরিকার  সূফী সাধকদের। বহুদেশ ভ্রমণ শেষে তিনি কলকাতার উত্তরে শুড়ার জঙ্গলে গভীর তপস্যায় আত্মনিয়োগ করেন।  জানা যায়, সাধনার প্রথম অবস্থায় তিনি সপ্তাহে একদিন লোকালয়ে এসে কিছু ছোলা নিয়ে যেতেন। দিনান্তে একবার আহার করতেন। আগুনের সাহায্যে প্রস্তুত কোন খাদ্য গ্রহণ করতেন না। পরবর্তীকালে গাছের পাতা ও পানি দিয়ে ক্ষুদা-পিপাসা নিবারণ করতেন। এইভাবে একনিষ্ঠ সাধনায়  ১৫ বছর কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন লোকালয়ে। সর্বপ্রথম মধ্য কলিকাতার মির্জাপুরে মানুষদের আহ্বান জানাতে থাকেন ধর্মের মর্মপথে। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগ বাধাপ্রাপ্ত হয়।সঙ্ঘবদ্ধ কাবুলী সম্পদ্রায় তাঁকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে। তিনি বুঝতে পারেন – ধর্মের নামে প্রতারণাপূর্ণ আচার সর্বস্বতা আর লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় আল্লাহকে পাওয়া যায় না। স্রষ্টাকে পাওয়ার সহজ ও মোক্ষম উপায় হচ্ছে মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা। তাই সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে কলিকাতার মানিকতলা খালের পূর্ব পারে বাগমারী রোডে আসেন এবং সেখানে অনাথ মল্লিক নামে একজন হিন্দু জমিদারের বস্তিতে কিছু জায়গা বন্দোবস্ত নিয়ে সেখানে একটি বেড়ার ঘর তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হাক্কানী আঞ্জুমান’ নামক একটি সংগঠন। হাক্কানী আঞ্জুমানের মধ্য দিয়ে তিনি সত্যকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালান। সাধারণ মানুষের ঝোঁক থাকে কি করে আরও ধন-সম্পত্তি অর্জন করা যায় কিন্তু তাঁর ঝোঁক ছিল কিভাবে এবং কত শীঘ্র সর্বস্ব আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে মানবতার সেবায় বিলিয়ে দেয়া যায়। এইভাবে ত্যাগের মন্ত্রে সমর্পিত হয়ে তিনি ডুব দেন সত্যের সাধনায়। তাঁর সুদীর্ঘ সাধনার জীবনে উপলব্ধি করেছিলেন -‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’

১৯৩২ সালের ১৯ ডিসেম্বর বাংলা ১৩৩৯ সালের ৪ পৌষ লোকান্তরিত হন এই মহান সাধক রাজধানী কলকাতায়। ঠিক চার বছর পর যেখানে ১৯৩৬ সালে আর্বিভাব ঘটে তাঁরই উত্তর প্রজন্ম সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর। তবে হযরত আজানগাছী সূচিত হাক্কানী ভাবধারা সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আরেক মহান সাধক পুরুষ হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দীন শাহ্ কলন্দর গউস পাক। যিনি ছিলেন হযরত আজানগাছীরই ভাবশিষ্য – সুযোগ্য উত্তরসূরী।

সূফী সাধক হযরত আজানগাছী, হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ পরম্পরায় সত্যের সাথে একাত্ম হবার তত্ত্বকে ধারণ-লালন-পালন করে আমরা হাঁটছি হাক্কানী হবার অন্তহীন অভিযাত্রায়।