হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে তৃতীয় পর্বের আলোচনা একরৈখিক কর্মে নিমগ্নতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

মহান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)-এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে তৃতীয় পর্বের আলোচনা গত ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতি ভবন’এর  আক্তার উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাহাখাশ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদের সভাপতিত্বে বিষয়টির ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খাইরুল মোস্তফা,মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব মিসেস হামিদা নার্গিস ও সদস্য শেখ বরকত উল্লাহ রানা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধ ক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

মিসেস হামিদা নার্গিস বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ আর ‘অনিয়ন্ত্রণ’-এ দুটি শব্দ। ‘নিয়ন্ত্রণ’ অর্থ সংযম, সংকোচন, আমল, বারণ, প্রতিজ্ঞা, ইংরেজিতে কন্ট্রোল, রুল, ডিটারমিনেশন বা কন্ট্রোল-সিস্টেম। নিয়ন্ত্রণ’ জীবনকে সংগঠিত করে। দৈনন্দিন জীবনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ একটি অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনের জন্য নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। গুরুকেন্দ্রীক জীবনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ একটা ব্যবস্থাপত্র- গুরুর আশ্রয়ে থেকে তাঁর দেওয়া নির্দেশিত কর্মটি বার বার অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করার ব্যবস্থাপত্র। সাধারণ মানুষ ভুল করেই থাকে। তিন মহান সাধকের জীবনের সকল কর্মের মর্মকথাই হচ্ছে ‘নিয়ন্ত্রণ’। আমি কি, কে, কেন-অর্থাৎ, নিজেকে  জানা, বুঝা এবং চেনার চেষ্টায় রত থাকা এবং পর্যবেক্ষণ,ধৈর্য্য-ধারণ, ত্যাগ ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণে থাকা যায়। আবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নের জন্য সর্বদা গুরুর সাথে সংযোগ রেখে লক্ষ্যমুখী কর্মে একরৈখিকভাবে নিমগ্ন থাকা, সিদ্ধান্তে অটল থাকা, দ্বিচারিতা, ছলনা, প্রতারণা ও অভিনয় পরিহার এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রয়োজনে নিজেকে পরিবর্তন করে প্রাপ্তির সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। দুনিয়াদারি এবং আধ্যাত্মিক জগৎ-উভয় ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। কর্মে একরৈখিকভাবে নিমগ্নতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। সচেতনতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পবিত্রতা নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনের অবলম্বন। এ ক্ষেত্রে সাধকের মূল্যবান মূল্যবান বাণী হচ্ছে-১.‘নিজের চোখকে আয়ত্তে আনো, সাধনার পথে এগিয়ে যাও’, ২. ‘কষ্ট এবং ক্ষতির পরে মানুষ বিনয়ী ও জ্ঞানী হয়’, ৩. ‘ভোগের আনন্দ সাময়িক, ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন,’ এবং ৪. ‘মানুষ যদি হতে চাও তবে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করো।’  

শেখ বরকত উল্লাহ রানা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি শুনলে প্রথমেই মনে হয় সীমার কথা। সংযম, প্রয়োজন অনুযায়ী বা অবস্থা বা বাস্তবিকতায় যথাযথ প্রয়োগ ও প্রয়াস একে বিশ্লেষণে সহায়ক। নিয়ন্ত্রণ থেকে আসে নিয়ন্ত্রণকারী ও নিয়ন্ত্রিত-এ দু’টি সত্তা। আবার এই দুই সত্তা যখন এক হয়ে যায় তখন হয় নিয়ন্ত্রণের অভূতপূর্ব ক্ষমতার স্বরূপ-মহানন্দ।

বাঁধভাঙ্গা ভালোবাসা, প্রেম, ভক্তি, নিবেদন বা সমর্পণ কি ভালো? না কি লাগাম ধরে ক্ষেত্র অনুযায়ী এর কম বা বেশি করা বুদ্ধিমানের কাজ? ¯্রষ্টার উচ্চারণ-‘সীমা অতিক্রম করো না, সীমা অতিক্রমকারীকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না।’ স্রস্টার বেঁধে দেওয়া সীমা প্রচারে জগতের শুরু থেকে শেষ অবধি তাঁর প্রতিনিধি আসতে থাকবেন। যারা জীবন ও জগতের নিয়ন্ত্রণ রেখার সীমার সম্যক জ্ঞান প্রচার ও অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণে সর্বদা ব্যস্ত। এ সীমারেখা প্রকৃতি ও জীব সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জীবন-যাপন, ধর্মাচরণ, পারষ্পরিক সম্পর্ক, বিধি-নিষেধ সবকিছু নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নিয়ন্ত্রণ অধীন। তবে সময়ের সাথে পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতায় এর ব্যাপ্তি কম-বেশি হয়।

সীমারেখার ব্যাপ্তি শরীয়ত, তরিকত ও মারেফত জগতে পরিলক্ষিত। সাধারণত ব্যক্তি আপন মালিক বা গুরু বা প্রেমাষ্পদ হতে কৃপা গুণে সর্ব পর্যায়ে সম্যক জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রিত জীবনাচরণ পদ্ধতি অনুসরণ ও অনুশীলনে রত। কিন্তু প্রেমের আরও পরে ভাব স্বভাব উপস্থিতিতে আদৌ কোনো নিয়ন্ত্রণ রেখা থাকে কিনা প্রেমিক ও প্রেমাষ্পদের মাঝে তা তাঁরাই বলতে পারবেন যারা সেখানে গেছেন।

‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়টিকে দরবারকেন্দ্রিক করে এর তাৎপর্য অন্বেষণ করা যায়। হাক্কানী এক বিশাল সাম্রাজ্য। এর ভেতরে ডুব দিলে ‘নাই বলে কিছু নেই।’ আমার চোখে দেখা মহান দুই সাধকের সংষ্পর্শ ছোট সময় থেকে তাঁদের কৃপায় একটু একটু করে চোখ মেলে, হৃদয় দিয়ে, সচেতনতা আর উপলব্ধির রাস্তা দিয়ে যতটুক দেখেছি, শিখেছি বা দয়াপ্রাপ্ত হয়েছি তা একটি নির্দিষ্ট পন্থায় বাঁধা। কিন্তু সেটি সবার জন্য এক রকম হয় না। আমরা যাকে ‘কাস্টমাইজেশন’ বলে জানি তার প্রয়োগ যুগে যুগে হাক্কানী সাধকরা করে গেছেন। সবাইকে তার অবস্থা ভেদে তৈরি করার যে প্রক্রিয়া তা সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তাইতো কেউ হয় নানাভাই, কেউ দাদাভাই, কেউ মামু ইত্যাদি। কর্ম, শিক্ষা, অন্তর্দৃষ্টির উম্মিলন, মানবতায় জাগ্রতচিত্ত, বর্তমানের মূল্য, আদব ও  পরিমিতিশীলতার প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা দেওয়া হয়। মামার ভাষায়, হাক্কানীরা সাধকরা চাষ করতে জানেন। তাই মাটি হাতে নিয়েই বলতে পারেন আদ্যোপান্ত। এখানে সবার জন্য জন্য রাস্তা উন্মুক্ত হলেও প্রকৃত পথিক খুবই অল্প। যারা হন তারা নিয়ন্ত্রণাধিনতার শিকল ছিঁড়ে নিয়ন্ত্রণ করার কঠিন ব্রতে ব্রতী হন।তারা হন স্থিরচিত্ত, লক্ষ্য অর্জনে একনিষ্ঠ এবং সমপর্যায়ে, সর্বাবস্থায় পরিমিত জ্ঞানসম্পন্ন। মামা বলতেন-অন্বেষণে থাকুন, উত্তর আসবেই। সাধকগণের বাণীতে বারবার শরীর ও চিন্তাজগতের অবশ্য করণীয়, বর্জনীয় তথা সম্যক নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ রয়েছে। আগের যুগে সাধকগণ নির্জনে যেতেন একনিষ্ঠভাবে, বাহ্যিক প্রভাব ও মানবিক অপ্রয়োজনীয় স্বভাবগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ‘এক’এর সন্ধানলাভের পথে অগ্রসর হতে। একই পথে হাক্কানীতে এসেছে ৫টি পন্থা মেনে চলার নির্দেশনা- নিয়ন্ত্রিত খাবার, নিয়ন্ত্রিত ঘুম, নিয়ন্ত্রিত কথা, নিয়ন্ত্রিত মেলামেশা এবং নির্জন রাতে স্মরণে নিমজ্জিত হয়ে প্রেমাষ্পদের সাথে একাত্ম হওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া। অতিরঞ্জন, চাটুকারিতা, লোকদেখানো আচার-আচরণ হাক্কানীতে সম্পূর্ণ পরিহার্য। শুধু কর্ম, সচেতনতা, একনিষ্ঠতা আর ‘এক’-এর লক্ষ্য নির্ধারণই প্রকৃত হাক্কানী হবার পথের যাত্রীদের মূল সম্বল।

 নিয়ন্ত্রণ প্রতিটি অঙ্গের জন্যই প্রযোজ্য। চোখের দৃষ্টি, মনের কৃপ্রবৃত্তি ও কুচিন্তার বশবর্তী না হওয়া সবই সাধনা। অযাচিত বা অসংলগ্ন প্রেম বা ভক্তির চেয়ে জ্ঞান ও  বিচক্ষণতাপূর্ণ ও সময়োপযোগী কর্মই বেশি মূল্যবান। মহাসৃষ্টির সব কিছ্ইু নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলে। পবিত্র কুরআনে যেভাবে বলা আছে- ‘চন্দ্র ও সূর্য একে অপরকে অতিক্রম করে না।’ অর্থাৎ, প্রকৃতি ও সৃষ্টির সবই তাদের গন্ডির মধ্যে চলমান। যখনই মাত্রা অতিক্রম হয় তখনই ঘটে প্রলয় বা দুর্যোগ। শরীর জগতেও সব উপাদান আর সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যথাযথ থাকা মানেই সুস্থ সুন্দর জীবন। কিন্তু যখনই ব্যত্যয় ঘটে তখনই শুরু হয় ‘ব্যধি’ নামক বিভিন্ন রকম কষ্টের সূচনা। অথচ ‘নিয়ন্ত্রণ’এর মাধ্যমেই সম্ভব খাদ্যাভ্যাস, কার্যাভ্যাস ও মনোজগতের পরিশীলন দিয়ে সাধারণ মানুষের সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন। যারা সাধনার পথের যাত্রী তাদের জন্য নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব অযাচিত মোহ, রাগ, দুঃখ-যন্ত্রণা, ঘৃণা-পাপাচার, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা প্রভৃতি ত্যাগ করে সত্য অন্বেষণে ব্রতী হয়ে গুরুলাভে অনুরাগী হতে হয়। হাক্কানী চিন্তনপীঠের – ভালো লাগা, ভালোবাসা, প্রেম-শ্রদ্ধা-ভক্তি, ভাব-মহাভাব- এই স্তরগুলো বিভিন্ন ভাবে বেষ্টিত রয়েছে বিভিন্ন বিষয়-আবর্তে। এক্ষেত্রে যথাযথ পরিচালনাই এসব স্তরকে সঠিকভাবে উত্তরণে নিশ্চয়তা দেয়। সাধনা হেলাফেলায়  বা ইচ্ছামত কিছু করেই পরিপালন হয় না। গুরুর নির্দেশ ও উপদেশ, তাঁর শিক্ষা ও দীক্ষা, সীমার ধারণা আর নিজেকে জানার মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়াই হলো সার্থকতার পরিমাপক। জাগ্রতচিত্ত, নিয়ন্ত্রিত ও সম্যক জ্ঞানসম্পন্ন শিষ্যই প্রকৃত শিষ্য ও গুরু ধারণে সক্ষম। লক্ষ্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ একরৈখিকতা থেকে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো। তাই বলা যায়, সাধক বা সাধনাপথ যাত্রী মাত্রই নিয়ন্ত্রণাধীন কার্য্যাদির ওপর পূর্ণ মাত্রায় সজাগ ও নিজের ওপর প্রয়োগ দ্বারা সবার জন্য আদর্শরূপ ব্যক্তিত্ব।