সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য ১৫

‘জ্ঞান অর্জনে বই কেতাব হতে মানুষ কেতাব উত্তম।’

             – সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন

‘সরলে গরল মিশাইও না গরলে সরল মিশাইও না।’

             – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক

‘সত্য মানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যান হবেই হবে।’

             –  সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সত্য ও সুন্দরের প্রতি তীব্র আকাঙ্খাই মানুষকে আত্মবিকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। সত্যের জন্য সব কিছুকেই ত্যাগ করতে হয় কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না। সত্যের হাতছানি যে পেয়েছে,সত্যের মাহাত্ম যে অনুভব করেছে তাকে কি আর সত্যের বিনিময়ে কোন কিছু দিয়ে ভোলানো যায়? মানব জীবনের চূড়ান্ত চাওয়াই হলো শান্তি। সত্য আর শান্তি একাত্মা। সত্য ছাড়া শান্তি আসেনা। সত্য সত্য হতে, সত্যের প্রতি, সত্যের দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

পার্থিব ধনদৌলত, প্রতিপত্তি ও চাকচিক্যের মোহ মানুষকে সাময়িকভাবে সুখ দিলেও অনাবিল শান্তির জন্য তা অতি তুচ্ছ। ‘হাক্কানী দর্শন’ মতে আত্মিক উৎকর্ষতা সাধনের মাধ্যমে অনাবিল শান্তি অর্জনই মানুষের কাম্য। তাই ধর্মান্বেষী মানুষের শান্তির পথের দিশা দিয়ে গেছেন সত্যমানুষগন সর্বকালে, এখনও তার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। এ পথ ছিলো আছে থাকবে। যতদিন মানবজাতি থাকবে পৃথিবীতে ততদিন এ ধারা অব্যাহত থাকবে। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে আহ্বান জানানো হচ্ছে ‘হে মানবজাতি, তোমরা যে ধর্মাবলম্বীই হও না কেন জীবন চলার পথে শান্তি ও মঙ্গল হাসিল করার জন্য মুর্শিদ/গুরু/পথ প্রদর্শক তালাশ কর এবং সংযোগ স্থাপন কর। যদি সংযোগ স্থাপন করতে না পারো তাহলে অন্ততঃপক্ষে সযোগ রক্ষা করে চলো।

গুরুবিহীন এ পথচলা অসম্ভব। গুরুকৃপা ছাড়া অসম্ভব। সত্য প্রতিষ্ঠার পথ প্রেমের পথ। ‘প্রেমের পথ সহজ হয়, যদি মুর্শিদ সঙ্গ দেয়’। সত্যমানুষদের কাছে প্রেমই ধর্ম। প্রেমই ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মিলন সেতু। সত্যমানুষতত্ত্ব অনুসারে আল্লাহ্ প্রেমময়। তিনিই একমাত্র প্রেমের ভান্ডার বা প্রেমাষ্পদ। সত্যমানুষতত্ত্বে প্রেম ও দয়া একই জিনিসের দুটো ভিন্ন নাম। প্রেমই ধর্মের নির্যাস। তাই আল্লাহ্ প্রেমিক সাধকগন বাহ্যিক মন্দির মসজিদ গীর্জার প্রয়োজন বোধ করেন না। প্রেমের অনুসারীরা সকল প্রকার ধর্মাচার থেকে পৃথক। যুক্তি, বুদ্ধি দ্বারা আল্লাহ্কে পাওয়া যায় না। একমাত্র প্রেম, ভক্তি দ্বারা আল্লাহ্কে পাওয়া যায়। প্রেম কি জিনিস তা যুক্তি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে বোঝানো যায় না। প্রেম জীবনের পরম রহস্য। অনির্বচনীয়, অসংজ্ঞায়িত গুপ্ত ব্যাপার। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, যেখানে প্রাণ আছে সেখানে প্রেমজগৎ আছে, প্রেমেরও শেষ নেই, সত্যেরও শেষ নেই, জ্ঞানেরও শেষ নেই। আবার এই তিনটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সত্য ও জ্ঞান মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। যতক্ষণ চাওয়া আছে ততক্ষণ প্রেম, পেয়ে গেলে জ্ঞান।’

সকল সাধক এতে একমত যে প্রেম ব্যতীত ঈমান পূর্নতা পেতে পারেনা। প্রেমের সঙ্গে থাকবে ভয়। প্রেমবিহীন ভীতি কাজের নয়। প্রেম-ভীতি ও ভক্তির সমন্বয় প্রকৃতপক্ষে এমন একটি অনুভুতির স্পন্দন যা এক মুহূর্তে মানবকে এক অভাবনীয় ইন্দ্রিয়াতীত স্বর্গীয় রাজ্যে আরোহণ করিয়ে তাকে অমরত্ব ও অখন্ডত্ব দান করে অসীম সত্তায় নিমজ্জিত করে। প্রেমহীন ইবাদত তা করতে পারেনা। প্রেমের শক্তিতেই একমাত্র এই কঠিন গিরিসংকট ডিঙ্গাতে পারে। সাধককুল শিরোমনি হযরত গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী (র.) বলেছেন- প্রেমহীন এবাদতকারী যেখানে এক বছরে পৌঁছে, প্রেমিক সেখানে এক হুংকারে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ যখন মানুষ আল্লাহ্কে ভালোবাসে আল্লাহ্ও তখন মানুষকে ভালোবাসেন। অর্থাৎ নদী যখন সাগরে মিলিত হওয়ার জন্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে তখন সাগরেও জোয়ার এসে সেই মিলন আরও সহজতর ও ত্বরান্বিত করে দেয়। সূফী সাধক মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী সূফীর এই প্রেমানুভুতিকে অতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মাত্র দুটি ছত্রে-‘নিরস এবাদতকারী আল্লাহ্ প্রাপ্তির সামান্যতম পথ একমাসে অতিক্রম করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ প্রেমিক ব্যক্তি প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ্র সিংহাসনে পৌঁছে যায়। জাত ও সিফাতের মিলন সূত্র এই প্রেম। প্রেম কোন বাধাকে বাধা মনে করে না। প্রেমিক নানা বাধা বিপত্তির প্রাচীর, বন্ধুরতা ও কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে প্রেমাস্পদের সাথে মিলিত হতে ছুটে যায়। এসব প্রতিকূল অবস্থার সাথে যুদ্ধ করতে করতে সে তার মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন: ‘প্রেমিক যারা জনম ভরা কত দুঃখের বোঝা বয়, প্রেম করা হবেনা তার থাকলে কুল কলঙ্কের ভয়।’ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক প্রেম জগতের বিশালত্ব প্রকাশ করেছেন এভাবে ‘যার প্রেমের শুরুও নেই, শেষও নেই, তার প্রেম কাঁচা ’।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আরও বলেছেন ‘দুই যুগ লেগে থাকলে একজন আশেক হয়।’

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রেম জগৎ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এভাবে প্রকাশ করেছেন আমাদের জন্য আরও সহজবোধ্য করে ‘প্রেম একটা জগৎ। যেটা বহমান, সেখানে আমার অধিকার আছে, যে কোন সময়, যে কোন জায়গায় আমি বিচরণ করতে পারি এ জগতে। প্রেম নামে যে একটা জগৎ আছে, সে জগৎটা আমার মধ্যে কেমনভাবে বর্তমান। কেমনভাবে বর্তমান বললে, আমাদের যখন বয়স বাড়ছে, বিভিন্ন কর্মের মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে-নিজেকে দেখতে হবে এবং নিজের কনসেপ্ট তৈরী করতে হবে, যার যার মত করে। আপনারা শুনেছেন, ভালোলাগা আছে, ভালোবাসা আছে, ¯েœহ আছে, শ্রদ্ধা আছে, ভক্তি আছে, ভাব আছে, মহাভাব আছে, সবগুলোর সমন্বয়ে প্রেমজগৎ। আমি কোথায় অবস্থান করছি? জীবন থেকে জীবন, প্রেমের ধারাও বহমান। প্রেম বর্তমান, প্রেম পরিবর্তনশীল, বিবর্তনশীল, রূপান্তরও আছে। এর কোন জায়গায় আমি অবস্থান করছি? আমার কর্ম আছে, বেঁচে আছি। প্রেমের জন্ম নাই, মৃত্যু নাই, প্রেমিক যে, প্রেমাস্পদ যে, তাদেরও জন্ম নাই, মৃত্যু নাই, আছে রূপান্তর। কোন জায়গায় গেলে প্রত্যাশা শূণ্য হবে? সবই কিন্তু প্রেমজগৎ, কিন্তু স্তর আছে। ভালোলাগা খারাপ না, এটা শুকায়ে যেতে পারে একটা পর্যায়ে। যে কারণে ভালো লাগছে, সেটা শেষ হয়ে যাবে ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে যখন চিন্তা করব তখন ভালোলাগা শেষ হয়েও যেতে পারে। প্রত্যাশা পূরণ হয়ে গেলে ভালোলাগা-ভালোবাসাও শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রেমজগৎটা কিন্তু শেষ হয়নি। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে, প্রত্যেক প্রানীর মধ্যে, অপরদিকে এভাবে বলা যায়, যেখানে জীবন আছে, সেখানে প্রেম আছে, সেখানে সত্য আছে, সেখানে শান্তি আছে। এটাকে কেমনভাবে কে এ জগতের মধ্যে ঢুকে যাতায়াতের মধ্যে আছে, কোন অবস্থানে আসছে আর যাচ্ছে, সামনে আসলে এক রকম হয়, দূরে সরে গেলে আর এক রকম হচ্ছে। প্রত্যাশা যখন থাকছে তখন সেই একই অবস্থা হয়? হয় না? এটা বাস্তবতা। এমন কেউ নাই যে বলবে আমার মধ্যে এগুলো নাই। আমি এখনও যুদ্ধ করছি। যুদ্ধই জীবন।হাক্কানীর পথটাই এটা, যে যুদ্ধই আমার জীবন। প্রেমের কথাটা কে বলতে পারে? একমাত্র প্রেমাস্পদ বলতে পারে। এছাড়া আর কারো মুখে শোভা পায় না। করলেই প্রতারণা হয়ে যাবে। একমাত্র প্রেমাস্পদ বুঝতে পারেন কে আমার প্রেমের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। প্রেম করা যায় না, হয়ে যায়। কবে, কে, কেমনভাবে হয়? হওয়াটা কিভাবে হয়? হও বললে কি হয়? সেটা কোথা থেকে আসে? কোন পর্যায়ে গেলে তবে হবে? করা যায় কিভাবে আর হওয়া যায় কিভাবে? কর্মের সঙ্গে করার একটা যোগসূত্র আছে। একটা মানুষের আপাদমস্তক একটা পৃথিবী, সেখানে কর্ম করার জন্য কোন্ কোন্ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমি ব্যবহার করছি, আর হওয়ার সঙ্গে আমার কোন্ কোন্ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জড়িত আছে। এটা বার করতে হবে যার যার মত করে তবে এই বাণীর নির্যাস, সুগন্ধিটা উপলব্ধি করা যাবে। দুনিয়াদারির কোন কথা বলে বা তুলনা দিয়ে প্রেমের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। ধরা পড়বেন আপনি। শুরু আর শেষের কথা বলা আছে, কতক্ষন সময় শুরু আর কতক্ষন সময় শেষ। শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন না? একটা ফেলেন আর একটা নেন, এর মধ্যে কতটুকু সময়? এই যে শ্বাস ফেলেন, না নিতে পারলেইতো শেষ। কতটা মুহূর্ত, এই    মুহূর্তগুলো মানুষের জীবনে নিজেরটা নিজে উপলব্ধি করতে হবে। আমি মিনিমাম একুশ হাজার, ম্যাক্সিমাম সাতাশ হাজার শ্বাস-প্রশ্বাস নর্মাল হিসাব করেছি। আমি কটা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংযোগ রেখে কোন কর্ম করছি? শ্বাস-প্রশ্বাস হিসাব করতে গেলে আপনার চিন্তার জগৎ অন্যরকম হয়ে যাবে। চোখ আপনার কাছে সারেন্ডার করবে, কানও সারেন্ডার করবে যে আমি শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে এই জিনিসটা নিয়ে চিন্তা করব। চোখ কি দেখে? কান কি শোনে?-(একজনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন) সখী প্রেম করা আর হলোনা আমার, প্রেম নিয়ে গেলো সব ভক্তজনে। প্রেমজগতে ভালোলাগা আছে, ভালোবাসা আছে, ¯েœহ আছে, প্রেম, ভক্তি, শ্রদ্ধা আছে। আমি কোথা থেকে ধরব? চলমান গতিতে যেমন একটা সমুদ্র চলছে, সেখানে আমি এক বালতি পানি তুলে নিতে পারি, হাত দিয়ে গিয়ে তুলে নিতে পারি এবং এটার পরিচয় দিতে পারি যে এটা এই সমুদ্রের পানি। আমি পরীক্ষাও করতে পারি যে এর গুনাগুন কি, এর কতটা লবনাক্ততা। এদিকে পরিস্কার সমুদ্র বয়ে যাচ্ছে, সেটার রঙ-এ রঞ্জিত হতে পারব। অন্বেষণ করতে গিয়ে দেখতে হবে যে ডুব দিছে সে’ই উপলব্ধি করতে পারবে। আর একজন দেখছে যে আমি কোন্ প্রিপারেশন নিয়ে সমুদ্রের মধ্যে বাকি জীবন বিরাজমান থাকব, সমুদ্রের হয়েই থাকব, ওটা যিনি অবর্জাভ করছেন একমাত্র তার কাছ থেকেই কিছু পাওয়া যাবে। দরবারে কাজ করবেন অথচ সেখানে নিজস্ব কোন থিম থাকবে না তা হতে পারে কি? এই যে স্ক্রলটা চলছে আর একজন সাধক আস্লে বলে দিতে পারবেন এখানে কি কি থিম আছে। করা আর হওয়ার মধ্যে যে এখানে মূল কথাটা -শুরু আর শেষ- ধনবান যিনি হইতে চাইবেন সেবা তার কাছে থাকতেই হবে। আমি আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে আসছি যতটুকু নিয়া আসতে পারছি বিলাইয়া দিব। শ্রেণীভেদ সেখানে থাকতে পারে না। সম্পদের সন্ধান তুমি পাবে না যতক্ষণ না তুমি যোগ্য হবে। সম্পদ দিলে তুমি নষ্ট করে ফেলবে। যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়।” হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে এভাবে পাচ্ছি আমরা-

হে প্রেমিক

তোমার দু-চোখ দিয়ে দেখতে যাবে

প্রেমাস্পদ দূর থেকে দূরে সরে থাকবে

নিজেকে যতই ভুলে যাবে

প্রেমাস্পদ ততই নিজেকে উন্মোচন করবে

ব্যাকুলতা তখন আলো আনবে।

আমিত্বের আবরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করবে

সমস্ত পৃথিবী তোমারই হবে

প্রেমাস্পদ তাঁর দরজা খুলে রাখবে

তখনই তোমার ভিতরের কাবাকেও সন্ধান পাবে

সিজদাতে রত থেকো তুমিই হবে তীর্থ পথিক। (চলবে)