রাজনীতি হতে সাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্বেষ বিদায় হোক

সংলাপ ॥ গণতন্ত্রে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সেই মতের সমর্থনে অনেক মানুষকে সংগঠিত করার অধিকার একটা স্তম্ভ। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষকে রোবট বানানোর একটা প্রয়াস থাকে। গণতন্ত্র  মানুষকে বেড়ি পরায় না। কাজেই, গণতন্ত্রে বিভিন্ন বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলা যায়, যদি না তা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার বা নৈরাজ্য তৈরি করার প্রয়াস হয়। গণতন্ত্রে মতটা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো তার পিছনে অন্যকে আঘাত করার বা অন্যের ওপর নিজের মত জোর করে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা আছে কিনা। কোনও মন্দির ভেঙে বা সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে মসজিদ করব, আইনকানুন মানব না, এমন বিশ্বাস গণতন্ত্রে গ্রাহ্য নয়। অন্যদিকে, ভয়হীনতার পরিবেশে যে কোনও বিষয় নিয়ে বিতর্ক বা নিজের মতের পক্ষে অনেক মানুষকে সংগঠিত করা, গণতন্ত্রের অঙ্গ। এই গণতান্ত্রিক আবহে আমাদের দেশে রাজনীতিতে ধর্ম, জাত-পাত, ভাষা   বা সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

ধর্ম, জাত, জাতি, সম্প্রদায় বা ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনও ভূমিকা থাকতে পারে কি? আবার যেখানে বিশাল সংখ্যক মানুষ অন্যদের বিরূপ মনোভাবের কারণে ন্যূনতম মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, সেখানে ধর্ম বা জাত নিয়ে কথা বলে ভোটের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া কি অন্যায়? এরকম গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাকে কি কিছুটা অস্বীকার করা হয়, যদি কোনও ধর্ম বা ভাষাভিত্তিক গোষ্ঠী বা কোনও জাত বা সম্প্রদায় চিন্তা করে দেশের শাসন ব্যবস্থায় তাদের অংশ থাকছে না, তা হলে তারা নিজেদের সংগঠিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে নিজেদের ক্ষোভ দূর করার চেষ্টা করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে জাতধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভূমিকা কি ছেঁটে ফেলা সম্ভব?

এটা নিশ্চয়ই আইন করে নিশ্চিত করা যায় যে, ভোটের সময় কেউ ‘আমি হিন্দু’ বা ‘আমি মুসলমান’ বলে ভোট চাইতে পারবেন না। বলতে পারবেন না হিন্দুরা বা মুসলমানরা আমাকে ভোট দিন ইত্যাদি। কিন্তু ঘটনা হলো, প্রকাশ্যে সেভাবে কেউ প্রচার করেন না। করলে তা আটকানোর ব্যবস্থাও আছে। কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ালে প্রার্থীকে বাতিল করা যায়। আদালতের হস্তক্ষেপে এর অতিরিক্ত কী করা সম্ভব? এরকমটা ভাবা যেতে পারে যে, কোনও দলের প্রচার ‘ধর্ম’ থেকে শুরু হলে বা কোনও দল ইস্তাহারে ধর্মের কথা রাখলে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু গণতন্ত্রে কি জাতধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে আত্মপরিচয় খোঁজা বা সামাজিক ন্যায়বিচার চাওয়া অন্যায়?

যুক্তির পথ সব সময়েই বন্ধুর। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যদি জাতধর্ম সম্প্রদায়, ভাষার স্থান না থাকে, তা হলে তো সামাজিক ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্বে মুসলমানেরা যে বহুক্ষেত্রে অন্য ধর্মের মানুষের থেকে পিছিয়ে, তাতে তো সংশয় নেই। এর জন্য মুসলমান সমাজের কর্তারাই দায়ী। এই অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রগতিশীল মুসলমানেরা কি দল গড়তে পারবেন না? আদিবাসীরা পীড়ণ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে পারবেন না গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়? ঘটনা হলো, জাতধর্ম সম্প্রদায়কে যেমন অন্ধকারের দিকে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যায়, তেমনই সামাজিক ন্যায়বিচার বা প্রগতির জন্যও ব্যবহার করা যায়। ধর্ম আর সাম্প্রদায়িকতা এক নয়। একজন দাঁড়ি-টুপি পরিহিত পুরুষ বা বোরখা পরিহিত নারী নিজের ধর্মের মধ্যে পুরোপুরি আবদ্ধ থেকেও বাইরের জগৎ সম্পর্কে পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে পারেন। কাজেই, তারা কোনও দলের হয়ে প্রচার করতে পারবেন না, একথা বলা বোধহয় সঙ্গত নয়। আর তারা যখন প্রচার করবেন, তখন তাদের পোশাকই কিন্তু ধর্মীয় অনুষঙ্গ বহন করবে। তাদের নির্বাসন জরুরি নয়, জরুরি হলো সাম্প্রদায়িকতার বিদায়, বিদ্বেষের বিদায়।

বাঙালি জীবন স্ব-ধর্মনিয়ন্ত্রিত। সমাজের সমস্ত শুভা-শুভ নির্ধারিত হয় পাপ-পুণ্যের বোধ থেকে, যা পুরোপুরি ধর্মীয় বিষয়। গত দশকের শেষলগ্ন হতে রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বর্ণের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও দেশের অর্ধেকের বেশী মানুষ ধর্মের গোঁড়ামির চক্রব্যূহ ভেঙে বেরোতে পারেননি। প্রগতিশীল ধর্মীয় নেতারা উদার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারেন কিন্তু রাজনীতি থেকে তাদের নির্বাসন কাম্য নয়। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিবাদ  তার পথ খুঁজে নেবেই। এখানেই শেষ নয়, ব্রিটিশ ভারতে স্থানীয় মানুষদের প্রতিবাদ করার অধিকার দিতেই এক সাহেব ‘কংগ্রেস’ তৈরি করেছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন এই সংগঠন হিংসাত্মক পথে যাওয়া থেকে ভারতীয়দের বিরত করবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভেদমূলক নানা শক্তি মাথাচাড়া দিয়েছে। গণতন্ত্রই তার সমাধান করেছে। এভাবেই শক্তিশালী হচ্ছে এই দেশ। মুসলমানিত্ব হাতিয়ার করে রাজনীতিকরা যখন ক্ষমতা  জয় করতে চেয়েছে, তখন তারা ব্যর্থ হয়েছে। তা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা যখন পথ বদলেছে, তখন ক্ষমতায় এসেছে। গণতন্ত্রের এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে সম্মান জানানোই শ্রেষ্ঠ পথ। সেই পথ ধরে ৪৬ বছর আসার পর আজ হঠাৎ কোনো দলের তা বদলানোর চেষ্টা না করাই বোধহয় ঠিক কাজ হবে।