নেতাজির সেক্যুলার ভারত!

সংলাপ ॥ যে মানুষটি ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণে শুধু ধর্ম নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শুধু যোগ্যতাকেই করছেন মানদ- তাঁর সেই সমদর্শী, প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী মানসিকতা কি আজকের ভারত ভুলে যাবে?

ধর্মীয় বিদ্বেষ ও জাতপাতের রাজনীতি-দীর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বব্যাপী দুর্ভাগ্যের মেঘ কি সেই দিনই ঘনিয়েছিল যে দিন থেকে ভারতবাসী দেখল ‘সুভাষ ঘরে ফিরেনি’?

এ প্রশ্ন দেশের জল-হাওয়া-মাটি-মানসের আবহমানতায় মিশে গিয়েছে। অবিভক্ত ভারতের বেশ কয়েকটি টুকরোর এক টুকরো বুকে নিয়ে ভারতবাসী আজও খুঁজে বেড়ায় এই প্রশ্নের উত্তর। সুভাষের মতাদর্শের আত্তিকরণের চেয়ে সে বড় বেশি ভাবে তিনি বেঁচে আছেন কিনা। তাঁর অন্তর্ধান নিয়ে আজও কেন নিরপেক্ষ তদন্ত হল না কিংবা আজও কেন সরকার নেতাজি-সংক্রান্ত সব ফাইল প্রকাশ্যে আনল না- এ সব প্রশ্নেই তার উৎসাহ বেশি। প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারি শীতের রোদে পিঠ ঠেকিয়ে ছুটির আবেশে বেশ একটা পিকনিক পিকনিক মেজাজে মশগুল বাঙালি তার শৌর্যের আইকন নেতাজির মতাদর্শ নিয়ে কতটা ভাবছে?

তবুও, তবুও তো কিছু আছে, যা তার প্রাণপ্রিয় নেতাজির সত্ত্বার সঙ্গে মিশে আছে।

সেই সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে অসংখ্য ভারতীয়র সত্ত্বার সঙ্গে। সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছে শ্বাসে-প্রশ্বাসে। কিংবা নিরাশার দীর্ঘশ্বাস হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাঁকেই, তাঁর বিশ্বাস ও ভাবধারার ফল্গুতে স্নান করতে চেয়ে, প্রতিদিন। স্বপ্ন দেখছে তাঁর স্বপ্নের সেক্যুলার ভারতের। সমস্ত অনাচার, বঞ্চনা, শোষণ থেকে তাঁর স্বপ্নের পূর্ণ স্বরাজই কি আজও অসংখ্য ছাত্র-যুব’র কাঙ্খিত ‘আজাদি’?

হ্যাঁ, আজাদি। ঘরে-বাইরে সর্বত্র কান পাতলেই আ-সমদ্র হিমাচল তোলপাড় করা আওয়াজ আসছে-আজাদি। যেন সেই ব্রিটিশ ভারতের আবহ। স্বাধীনোত্তর ভারতে এমন তোলপাড় এই প্রথম। যে সেক্যুলার ভারত ছিল সুভাষের স্বপ্ন, যে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার সর্বাত্মক চর্চা ও উপস্থিতি ছিল তাঁর সর্বব্যাপী ক্রিয়াকান্ডে, আজ যখন তাকে নস্যাৎ করে দেশ দেখছে ধর্মের ভিত্তিতে নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, যখন দেশকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে একরৈখিক হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের দিকে, যখন দিকে দিকে স্লোগান উঠছে ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান’, তখন ভীষণ মনে পড়ে তাঁর ‘Indian Struggle’-এ লেখা সেই মোক্ষম কথাগুলো- “The growth of sectarian movements among both Hindus and Moslems accentuated intercommunal tension. The opportunity was availed of by interested third parties who wanted to see the two communities fight, so that the Nationalist forces could be weakened.” কী দূরদর্শী বিশ্লে­ষণ! চোখে আঙুল দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন সেই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে, যা তাঁর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ ভারতের সংহতি ও সেক্যুলার সত্ত্বাকে নষ্ট করতে চায়।

মনে হচ্ছে যেন এটাই আজকের ভারতের জন্য সব চেয়ে প্রয়োজনীয় কথন। কেউ কেউ যে এমন কথা আজও  বলছেন না, তা তো নয়। কিন্তু নেতাজির মতো বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়? ইতিহাস বলে, পাকিস্তানের কট্টর দাবিদার স্বয়ং জিন্নাহ পর্যন্ত এই একটি মানুষের সেকুলার সত্তায় বিশ্বাস করতেন। কেন করতেন? না, তাঁর মধ্যে কোনও নাটক ছিল না, ছিল না সংখ্যালঘু তোষণের কদর্য রাজনীতি। জিন্নাহ তো বটেই, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আপামর  ব্রিটিশ বিরোধী ভারতীয় দেখেছিল ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয় জাগরণ ও নতুন ভারত নির্মাণের প্রশ্নে তাঁর নির্ভেজাল ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান।

ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে নেতাজির আপসহীন মনোভাবকে সাভারকর ও তাঁর  অনুগামীরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভাল ভাবে নেননি। এ ছিল তাঁদের চোখে ‘militant spirit of secularism’| অবশ্য সুভাষের তাতে কিছু এসে যায়নি। বরং এই আপসহীন প্রোজ্জ্বল স্পিরিট থেকেই তিনি ১৯৪০-এর ৪ মে লিখলেন, “…the Indian National Congress has put into its constitution a clause to the effect that no member of a communal organisation like Hindu Mahasobha and Muslim League can be a member of an elective committee of Congress..” আর এ সব দেখেশুনে ১৯৪১-এ ভাগলপুরে হিন্দু মহাসভার ২৩তম অধিবেশনে সাভারকর হিন্দু সম্প্রদায়কে খোলাখুলি ডাক দিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সদলবলে যোগ দিতে।

 শুধু কি তাই? খোদ কংগ্রেসের মধ্যেই সুভাষকে হতে হল চরম কোণঠাসা। কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী শাখা সরাসরি তাঁর বিরোধিতা করল। স্বয়ং গাঁধীর নেতৃত্বে প্যাটেলকে দাঁড় করানো হল তাঁর বিরুদ্ধে। হেরে গেলেন প্যাটেল। ভোটের ফল— সুভাষ ১৫৭৫, প্যাটেলে ১৩৭৬। কংগ্রেসে থেকেও দক্ষিণপন্থী প্যাটেল স্বঘোষিত ‘সোশ্যালিস্ট’ সুভাষের গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানতে পারলেন না। বলে দিলেন- “The lion becomes a king by birth, not by an election in the jungle..”

ভাবতে অবাক লাগে, কংগ্রেসের মধ্যে থেকে কংগ্রেসেরই নির্বাচিত সভাপতি সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেন যিনি, তারঁই সর্বোচ্চ মূর্তি তৈরি হল এ ভারতে, যার নাম Statue of Unity’। খরচ তিন হাজার কোটি টাকা। কারণ, ইতিহাস বলছে নেতাজির সেক্যলারিজম ও সোশ্যালিস্ট মনোভাবকে অন্তর থেকে যাঁরা কখনওই মানতে পারেননি, উল্টে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে প্রত্যক্ষ সওয়াল না করলেও পরোক্ষে নরম মনোভাব ছিল যাঁদের, প্যাটেল ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। আর এ কারণেই নেহরু খুব কৌশলে তাঁকেই ব্যবহার করেছিলেন জিন্নার সঙ্গে বাটোয়ারা-সহ অন্য প্রয়োজনে।

আর সুভাষ? সুভাষের সেক্যুলারিজম? সে কি তবে আজ ভেন্টিলেশনে? যে মানুষটি ব্যক্তিজীবনে সনাতন ভারতের আধ্যাত্মিক পরাকাষ্ঠাকে সম্মানের সঙ্গে মান্যতা দিতেন, বিবেকানন্দ যাঁর আদর্শ, সেই মানুষটিই রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণে শুধু ধর্ম নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শুধু যোগ্যতাকেই করছেন মানদন্ড-তাঁর সেই সমদর্শী, সেকুলার, প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী মানসিকতা কি আজকের ভারত ভুলে যাবে?

তিনিই তো পৃথিবীর প্রথম কম্যান্ডার-ইন-চিফ যিনি তাঁর আজাদ-হিন্দ বাহিনীতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য কমন কিচেন, কমন রাঁধুনি, একাসনে খাওয়া, একই ছাউনিতে শোওয়ার প্রচলন করলেন। ‘বন্দেমাতরম্’ নিয়ে তৎকালীন বিতর্কে না ঢুকে হয়ে উঠলেন সর্বজনমান্য ‘জয়হিন্দ’ ধ্বনির উদ্গাতা। আর সে জন্যই তাঁর জীবনিকার লিওনার্দ আ গর্ডন বলছেন – “His ideal, as indeed the ideal of the Indian National Congress, was that all Indians, regardless of region, religious affiliation, or caste join together to make common cause against foreign rulers.

আজকের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে যে ধর্মীয় বৈষম্য, তা কি নেতাজির এই ভাবাদর্শের সঙ্গে মেলানো যায়? আর সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে দেশজোড়া প্রতিবাদ এবং সেই প্রতিবাদের বিরুদ্ধের প্রতিবাদকে নেতাজি আজ কি চোখে দেখতেন? তাঁর সেক্যুলার ভারত কি তবে সত্যিই এখন ভেন্টিলেশনে?