ধর্মের নামে…. – ১৫

‘শান্তির (ইসলামী) জীবন বিধানে কোন জোর জবরদস্তি নেই- সুষ্ঠু ও সঠিক পথ এবং বিভ্রান্ত পথকে

আলাদা করে দেয়া হয়েছে।’

সংলাপ ॥ এর পরেও কি কোন কথা বলার দরকার আছে যে নবী নিজে কোন কথা আল্লাহর হুকুম ছাড়া বলেছেন? অবশ্যই না। সুরা মাআরিজ-এর ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নং আয়াতসমূহে যা বলা হয়েছে তা তো অবাক হবার মতো। এ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি (রাসুল) যদি আমার সম্পর্কে কোন কথা বানিয়ে বলতেন, তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম। তারপরে তার গলার রগ অবশ্যই কেটে ফেলতাম। তারপরে আর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ ছিলো না, যে নাকি আমাকে ফিরিয়ে রাখতে পারতে।’

সুরা আহযাবের ১ নং ২ নং আয়াতে, সুরা ছোয়াদের ৮৬ নং আয়াতেও ঐ একথা। সুরা যুখরুফ এর ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘সুতরাং আপনি এ কোরানকেই আঁকড়ে ধরুন যা আপনার কাছে ওহী যোগে নাজিল করা হয়েছে। নিশ্চয় আপনি সহজ, সত্য, সনাতন পথে রয়েছেন।’ সুরা আহকাফির ৯ নং আয়াতে বলা হযেছে, ‘আপনি বলে দিন, আমিতো আর রাসুল হিসাবে মোটেই নতুন নই। আর আমি জানিনা- আমার সাথে কী ব্যবহার করা হবে, আর তোমাদের সাথেই বা কেমন করা হবে। আমি তো শুধু সে কথাই মেনে চলছি যা আমার কাছে ওহী যোগে আসছে। আর আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী বৈ তো নয়।’ তাই, পূর্বের নবীর সমর্থন, ওহী গোপন না করা, ওহী যোগে পাওয়া নির্দেশ মেনে চলা ইত্যাদি ছিল নবীর প্রতি আল্লাহর সরাসরি আদেশ। 

সুরা আল ইমরানের ৯৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনি বলুন, আল্লাহতো সত্যই বলেছেন। সুতরাং তোমরা ইব্রাহীমের সহজ, সরল, সত্য, সনাতন জীবন ব্যবস্থাই মেনে চলো। তিনি তো আর মুশরিকদের শামিল ছিলেন না।’ ঠিক একই কথা সুরা বাকারার ১৩৫ ও ১৩৬ নং আয়াতে বর্ণিত আছে। সুরা বাণী ঈসরাইলের ১২৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তারপরে আমিই আপনাকে ওহীযোগে নির্দেশ দিলাম যেন আপনি ইব্রাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করেন। সুরা বণী ঈসরাইলের ৫৩ নং আয়াতে বলা আছে, ‘আমি তো আপনাকে তাদের নিকট দারোগা হিসাবে পাঠাইনি।’ সুরা নাহল-এর ৮৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আপনার কাছে এমন একখানা কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে প্রত্যেকটি বিষয়ের বিবরণ মজুদ রয়েছে। মুসলিমদের জন্য এতে পথ নির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদ রয়েছে।’ সুতরাং, কোরান পরিপূর্ণ জীবন বিধান। রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ওহীযোগে এটা আল্লাহর নিকট থেকে পেয়েছেন। তিনি নিজের কোন মতামত এতে ব্যক্ত করেননি। যা কিছু বলেছেন কোরান থেকেই বলেছেন, যা কিছু করেছেন কোরান থেকেই করেছেন। আর এ কোরান পূর্ববর্তী সমাজেও নবীদেরই জীবন বিধানরূপে, তাদের সমাজের মানুষের পথ নির্দেশিকা হিসাবে এসেছে যার সত্যতা কোরান প্রমাণ করে দিল। আর আমরা মিল্লাতে ইব্রাহিমীর উপর স্থির রয়েছি। রাছুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ও মিল্লাতে ইব্রাহিমের পথে থেকেই জীবন বিধান স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছেন ¯্রষ্টার আশীষরূপে।

প্রশ্ন হলো, অনেকেই বলে থাকেন, রাসুল যা বলেছেন এবং করেছেন তা হাদীস। তা হলে কোরান কী? রাসুল তো কোরানের বাইরে, ওহীর বাইরে কোন কথা বলেননি। তবে তাঁর কথা ও কাজকে হাদীস বলা উচিৎ কিনা তা ভাবনারও অবকাশ নেই। কারণ দুর্বোধ্যরূপে কোরানের অবতারণা হয়নি। সহজ সরলভাবে মানুষকে বুঝানো হয়েছে যাতে কোন বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়। বিভ্রান্তি কে করে? মানুষই করে। মানুষ কেন করে? করে শয়তানের প্ররোচনায়, নিজের স্বার্থে, অজ্ঞতার কারণে, জেদের বশে, ক্ষমতার লোভে। এসব বিভ্রান্তি আগেও ঘটেছে এখনও ঘটছে। এত যে স্পষ্ট জীবন বিধান তার মাঝেও এত দলাদলি ভাগাভাগি কী করে এলো? এর জন্য দায়ী অজ্ঞতা।

আজকের সমাজে মানুষ কত না ভাষা শিখছে অথচ ¯্রষ্টার বাণীতে ভরা তারই জীবন বিধান যে বুঝলো না-কাজ করলো না এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কী-ই বা থাকতে পারে?  কতগুলো লোকাচারকে ধর্ম মনে করে সেটাকে জীবন বিধান হিসাবে চালিয়ে দেবার ভাওতাবাজী আর কতদিন? কোরান নিজেই বলছে, কোরান বোঝা সহজ, পরিস্কারভাবে এর আয়াতগুলো বর্ণিত, কোন বিষয়েই কোন কিছু বাদ যায়নি। অথচ কোরান বিষয়ে শুধু অজ্ঞই নয় মহামূর্খও বটে। সুরা আল কামার-এর ৭নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘আমিই তো এই কোরানকে উপদেশ লাভের জন্য সহজ করে দিয়েছি। কিন্তু তোমাদের মধ্যে বুঝবার মতো কেউ আছে কি?’ একই কথা ২২ নং আয়াতে, ৩২ নং আয়াতে, ৪০ নং আয়াতে ও ৫১ নং আয়াতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা বাকারার ৪৪ নং আয়াতে বুদ্ধি খাটানোর কথা বলা হয়েছে। সুরা বাকারার ১৭১ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কাফিরদের উপমা ঠিক এমনি যেমন কেউ চিৎকার ও শব্দ ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারে না-এমন জন্তুর পিছনে ধাওয়া করছে। তারা বধির, মুক, অন্ধ তারা যে মোটেই বুদ্ধি খাটায় না।’ সুরা বাকারার ২১৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানবজাতি একই উন্মত হিসেবে ছিল।’ পরে তাদের মধ্যে যে সব বিরোধ দেখা দিয়েছে তার জন্য নবী ও কিতাব পাঠিয়েছি কিন্তু সুস্পষ্ট দলিল পাওয়ার পরেও তারা জিদের উপরেই ছিল।’ অথচ সুরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘ শান্তির (ইসলামী) জীবন বিধানে কোন জোর জবরদস্তি নেই-সুষ্ঠু ও সঠিক পথ এবং বিভ্রান্ত পথকে আলাদা করে দেয়া হয়েছে।’ সুরা বাকারার ২৭২ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসা আপনার দায়িত্ব নয়। বরং আল্লাহ যাকে খুশী সঠিক পথে চলার তওফিক দান করেন।’ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) সুসংবাদদাতা ও বার্তাবাহক যা আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট থেকে রহমত হয়ে এসেছেন। সুরা নিছার ৮২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা কি কোরান সম্পর্কে মোটেই চিন্তা করে না?’ (চলবে)