চিত্ত আমার বাংলা রঙে, সব চাহনী বাংলা ঢঙে বাংলা বাঙালিরমিলন মেলা

সত্যদর্শী ॥ প্রাণের বাংলায় আবারো শুরু হচ্ছে বইমেলা। আক্ষরিক অর্থে বইমেলা হলেও এটি  প্রকৃতপক্ষে বইমেলা নয়। বলা যেতে পারে প্রাণের মেলা, বাংলা বাঙালির মিলন মেলা। হাজার বছরের বাঙালির চির চেনা বাংলায় সাজ সাজ রবে আসে বইমেলায়। খেজুরের  রসে ভেজা ভাপা পিঠার শীত শেষে ফাল্গুনের উদাসী হাওয়ায় বসে বইমেলা। ঋতুরাজ বসন্তের রং বাহারী আলাপন আর কোকিল বাঁশির সুর নিয়ে মাতাল হাওয়ায়, প্রেম বিকিকিনির বইমেলা।  প্যারিস কিংবা কোলকাতার মতো নয় আমাদের বইমেলা। আমাদের বইমেলায় বই উপলক্ষ হলেও এটি বাস্তবতার, ভাব, আবেগ আর স্বদেশ প্রেমের চূড়ান্ত প্রকাশ নিয়ে হাজির হয়।

বাঙালির প্রাণের বইমেলায় হাজারো মানুষের ভিড়। প্রাণের মেলায় প্রাণ মেলাতে আসে, প্রাণে-প্রাণে মিলতে আসে। মেলা মানেই মিলনমেলা। এ যেন সুরের সাথে সুরের আলাপন। সুরের স্রোতে মিলন তরী, সুরেই অবগাহন। ছোট্ট শিশুরা আসে বাবা মায়ের হাত ধরে, বিশেষ দিনে আসে বিদ্যালয়ের কঁচি-কাচারা। বয়স্ক পৌঢ় প্রবীণ আসে জীবনের স্মৃতিগুলো ঝালিয়ে নিতে, দূরের গ্রামের অখ্যাত লেখক আসে নামকরা লেখকের সাথে আলাপনে, প্রবাসে থাকা বিদগ্ধ ব্যক্তিদের অনেকেই বইমেলার দিন-তারিখ মিলিয়ে ছুটি নিয়ে ঘুরে যায়, প্রেমিক-প্রেমিকা আসে প্রেম বিনিময়ের উৎকৃষ্ট লগ্ন মনে করে, বিবাহিত দম্পতি আসে বিবাহিত জীবনের ফুরসৎ আড্ডায়, উঠতি কবি-লেখক-গীতিকার-ছড়াকার মিলিত হয় আনন্দমেলায়, নিজেকে লিখিয়ে হিসাবে আত্মপ্রচারণার শুভ লক্ষণে। বসে চটপটি ফুচকার দোকান, খই মুড়কী, পাপড়-বুটভাজা, হাল আমলের ফাষ্টফুড রেশমী চুড়ি কত কি।

বাবা-মায়ের হাত ধরে যে শিশুর আগমন ঘটে এই মেলায় সেই মেলার কি নাম দেয়া যাবে? নবজাতক কোলে যে মা বইমেলার সবুজ চত্বরে পা মিলিয়ে বসে সেই দৃশ্যপটকে কোন্ নাটকের দৃশ্যপট বলা যাবে? প্রিয় শিক্ষকের হাত ধরাধরি করে, হুড়োহুড়ি করে যে সব শিশু নতুন বইয়ের গন্ধে ডিগবাজী খায় তাকে কোন্ অভিধায় আখ্যায়িত করা যেতে পারে। বাসন্তি রঙের শাড়িতে আল্পনা আঁকা হাতে রেশমী চুড়ি, কপালে আঁকা তিলক পরে যে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে গোটা শাহবাগ থেকে বাংলা একাডেমীর চত্বরে তার কি কোন তুলনা চলে? মূলত অনেকেই আসে পরিব্রাজক পাখির মতো। কারো কারো আসতে হয় দেখতে, কেমন হচ্ছে, কারা আসছে, কতদূর এগুলো বইমেলা। চুপ করে কোন এক গাছের তলায়, কিংবা কোন এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজেকে মিলিয়ে দেখে তার সাথে বইমেলার আজন্ম সংযোগ। যুক্ত হতে আসে সাগরের স্রোতের সাথে। স্রোতে এসে  স্রোতে মিলন, সুরের সাথে সুরের ব্যঞ্জনা। এই রঙের হাটে রং বিকিকিনির মানুষগুলোকে দেখতে আসতেই হয়। প্রকৃত পক্ষে যুক্ত হতে আসে মানুষ সংযোগের মহাসড়কে। হাজারো চেনা, জানা গলিপথ পার হয়ে মহাসড়কের ব্যস্ত ঘরানায় উঁকি মেরে দেখার এই কৌতূহল নিছক কৌতূহল নয়, এটি মানুষ মন্ত্রে দীক্ষিত হবার অফুরান প্রাণ স্ফূরণ। দাঁড় বেয়ে নাবিক পার হয় তার সম্বল ভাললাগা, ভাললাগা থেকে যুক্ত হওয়া, যুক্ত হতে হতে যুক্তি খুঁজে পায়।এই ইট-পাথরের শহরের উঁচু দালানের ফাঁক গলিয়ে বাংলা একাডেমি-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গালিচায় এসে পড়ে জোছ্না রাঙা চাঁদ। মনে মনে গেয়ে উঠে – আজ জোছ্না রাতে সবাই গেছে বনে। আমি বাংলায় গান গাই/ আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই। বইয়ের হাঁটে বই কেনার এ মহৎ মহান আয়োজন মৃদুমন্দ পায়ে আমাদেরকে সব ইতিহাস, ঐতিহ্য আর অজানা কথার কাছে নিয়ে যায়। আবহমানকাল ধরে বেজে থাকা সুর কানে কানে বলে যায় এই তো আমি, এই তো বাংলা, এই তো বাঙালির স্বদেশ।

এ এক অন্য রকম ভালোলাগা-ভালোবাসা, খাতির যত্ন আমাদের বইমেলাকে ঘিরে। সব স্রোত, সব মত, সব পথ মিলেমিশে একাকার বইমেলায়। তবু মনে হয় কারা যেন ৩০ কোটি মানুষের ভাষাকে আজও পিছু টানে। বইমেলা না বসলে কাদের লাভ হয়? কারা বাঙালি শব্দটিকে নিষিদ্ধ করতে চায়? কারা বাঙালির অস্তিত্বকে মধ্যপ্রাচ্যের মোড়কে বাজারজাত করে বাঙালির অমিত শক্তিকে দমাতে চায়? বাঙালির গায়ে অন্য কোন ধর্মীয় লেবাস আটকে নিজেদের সিদ্ধিলাভ করতে চায়। বাংলিশ কথার ফুলঝুড়িতে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পায়? রেডিও জকির জকিরা প্রমিত বাংলার বিপরীতে যা বলে তা দৈন্যদশাকেই তুলে ধরে। লন্ডন প্রবাসী বাঙালীরা মাতৃভাষার গৌরব বৃদ্ধির পরিবর্তে নির্বুদ্ধিতার আবরণে আটকা পড়ে আছে বছরের পর বছর। কেন বাঙালির বাংলায় আজো আরব বসন্তের কেচ্ছা কাহিনীর ওয়াজ মাহফিল, কেন এই অ-জর অ-মর একুশের মাসে নসিহত করা হয় ফুল দেয়া বেদায়াত। কেন এত এত ইংলিশ মিডিয়াম, কেন এত এত মক্তব মতলববাজী কারবার। কি শেখানো হয় সেখানে। বাংলা হরফ কি আদৌ শেখানো হয়?  জাতীয় সঙ্গীত, রণ সঙ্গীত কেন গাওয়া হয় না। কৃর্তিমান বাঙালির জীবনী পড়ানো হয় না। এই বাংলায় কি কোন মনীষির অস্তিত্ব নাই? আর কত দিন বাংলার পানি-শষ্য-ফল-মূল মাটির কোন মূল্য দেবে না? জয় বাংলা শব্দ নিয়ে কিসের বিতর্ক? জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি কেন এত বিদ্বেষ? বইমেলার এই মাসে এসব কি ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে না? নিরাপত্তাহীনতা সব আনন্দকে যাতে ম্লাান করে দিতে পারে তারই ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাভাষার প্রতিটি শব্দের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে ভাব ও ব্যঞ্জনা। বাংলা অক্ষর ও শব্দ স্বাতন্ত্র্য, শক্তির প্রকাশে কার্যকর। তবু কেন এত অবহেলা? কেন এত তাচ্ছিল্য পেতে হয় বাংলাকে? পৃথিবীর কোন দেশ ভাষার প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে উন্নতির শিখরে পৌছাতে পেরেছে কি? আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারিতে নেয়া শপথ কেন সারা বছর ভুলে থাকি। কবে হবে বাঙালির সত্যিকার বাংলা। মাথা উঁচু করে, খুব সাহস নিয়ে সব আয়োজনে উদ্ভাসিত হবে বাংলার জয়রথ। কায়মনোবাক্যে আমরা বাঙালি হবো। আমাদের চিন্তায়, প্রতিটি উচ্চারণে বাংলা হবে বাঙালির। আমাদের যা আছে তাই নিয়ে আমরা অহংকার করবো। সালাম-রফিক-জব্বার-বরকতেরা বইমেলা আমাদের দিয়েছে উপহার। বইমেলার হাত ধরে প্রকাশনা শিল্পের ক্রমবিকাশ ঘটেছে। লেখক-পাঠক-উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। মুদ্রণ ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠে নানা আয়োজনে। নানান শিল্পকর্ম আর রংবাহারী আলাপন হৃদয়কে উদ্বেলিত করে। অনিন্দ সুন্দর এক-একটি ষ্টলের নাম, আরো সুন্দর শিশুদের বইগুলোর নাম। খারাপ লাগার একটা দিক প্রতিবছরই চোখে পড়ে। বইমেলায় প্রায়দিনই থাকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা কিন্তু সবুজ চত্বরে সারি সারি পাতা দর্শক চেয়ারগুলো একপ্রকার ফাঁকাই থাকে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনায় দর্শক না থাকা মানে বইমেলার অন্তর্নিহিত আবেদন হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। সারাবছরের একটা আবেগ-উন্মাদনা, ভালবাসা-প্রেম ঘিরে থাকে এই বইমেলাকে ঘিরে। আলোর পথের এই যাত্রা দীর্ঘ হোক। শোক তাপ অস্পৃশ্যতা দূর হোক। ভাববাদী বাঙালির বাংলায় শান্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

জেগে উঠো বাংলা

তোমার বুকেতে শকুনের উৎপাত

তোমার আকাশে আজো উদ্ধত আস্ফালন

বাতাসে আজো ভেসে বেড়ায় দীর্ঘশ্বাস-হাহাকার-কান্না

তুমি জেগে উঠো বাংলা।