‘উপলব্ধি’ বিষয়ে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ

সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ পরিচালিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে উপলব্ধি বিষয়ে ২৬টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি পর্বে সত্যমানুষ উপস্থিত হয়ে বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের আলোচনাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। পথ দেখিয়েছেন। সম্মানিত আলোচকগণের চিন্তাশক্তিকে গভীর থেকে গভীরতম পর্যায়ে নিতে সহায়তা করেছেন। উপলব্ধি হচ্ছে প্রাপ্তির সৌন্দর্য এই সঙ্গা ধরেই হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীরা তাদের উপলব্ধিকে নিয়ে শাণিত করছেন প্রতিমুহুর্ত, প্রতিদিন।

‘উপলব্ধি’ বিষয়ে শাহ্ সূফী শেখ আবদুল হানিফ

আমি এক। এক ছাড়া আর কিছু কি আছে? সময় কি? আমি। অভ্যাস কি? আমি। আমি ছাড়া কেউ কি করতে পারবে? প্রাপ্তি এক, হানিফ এক, হানিফের প্রাপ্তি এক। ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান মানে- বল  আল্লাহ এক। হাক্কানী স্কুল অব থট বলছে – “তুমি এক উপলব্ধি কর”। প্রাপ্তি ঘটছে কিনা জানতে হলে তোমাকে অবশ্যই একটা বিন্দুতে সংযোগ করতে হবে। একটা নিয়ে চিন্তা করলে তা সঠিক হবে। তাই এক এ নিমগ্ন থাকতে হবে। এক এর সাথে একটাই কথা একাত্ম হওয়া। এক এর সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য সময়ের কি কোন প্রয়োজন আছে? কর্মের সাথে কতক্ষণ একাত্ম থাকেন। এক এর মূল্য কি? ১+১= ২ হয়? এক একাত্ম হয়ে তাঁর সৌন্দর্য অবলোকন কর। নিজেকে শূন্য করতে পারলে অবশ্যই এক এর সাথে একাত্ম হওয়া যায়। উপলব্ধিতে আসতে হলে পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠতা থাকতে হবে। যখন যে কর্ম করেন তখন সেই কর্মের মধ্যে ঢুকেন কিনা?

দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য- অন্যের কথায় নয়।দর্শন কি? দেখতে দেখতে দর্শন। আমার সমস্ত কর্মের মধ্যে দেখছি। ধারণের চোখে দেখছি। চিন্তা জগত, কর্মজগত, সর্বক্ষেত্রে সর্বসময়ে এক কে ধারণ করে চলা। কল্পনার জগতে তাঁকে ধরে রেখে নিষ্ঠার সাথে নিমগ্নতায় থাকা। দেখাই আমার সাধনা, স্মরণ আমার জীবন। সর্বকাজে সর্বসময়ে উপলব্ধি আছে। নিষ্ঠার সাথে নিমগ্নতার সাথে দেখলে সেখানে সৌন্দর্য পাওয়া যাবে। যেখানে উপলব্ধি আছে, সেখানে সফলতা আছে। এক এর দরজায় পোঁছালে আমার দর্শন শক্তি যোগাবে। প্রকৃতির অংশ হিসাবে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে যাও – এটাই এক। যা তিনি বহন করেন। বহন করেন তার সময়ের সাথে সাথে। সেখানেই ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান। সে যেদিকে যাবে সেদিকে সফল হবে। তার মধ্যে ৩টি গুনাবলীর সমন্বয় হবে। ১. পর্যবেক্ষণ (যে মুহুর্তে শুনছি ঐ মুহুর্তে করণীয় কি) ২. নিমগ্নতা (কি কি আমাকে করতে হবে) ৩. নিষ্ঠা (নিজস্ব সৌন্দর্যের সাথে ভাব হবে)। আপনি কি দেখেছেন আপনি কোন জায়গায় কতক্ষণ নিমগ্ন থাকতে পারেন ? এটাই ল্যাবরেটরি। এটাই ধর্ম। নিমগ্ন থাকলে আমি সৌন্দর্য দেখতে পাবো। প্রতিটি কর্মে একাত্মতা আছে। যেখানে একাত্মতা আছে সেখানে সৌন্দর্য আছে। যে মুহুর্তে যার সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছি, যেটা শুনেছি সেটাই করা। সংকীর্নতা সন্দেহ ভাল মানুষকেও নষ্ট করে দেয়। সংকীর্নতা মানে তুলনা বুঝায়। হীনমন্যতা থাকে বলে এটা হয়। উদ্বেগ, আবেগ, সংবেদনশীলতা, আর উত্তেজনা এই চারটা অবস্থানে একাত্ম থাকতে পারি কিনা ? পর্যবেক্ষণ করা যে আমি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছি কিনা এবং একাত্ম ছিলাম কিনা। তাহলে সৌন্দর্য দেখতে পাবো। আপনার মুখ যা বলেন তাই করেন কিনা নাকি মুনাফেকি করেন? দ্বিচারিতায় ভুগছেন। যিনি সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তিনি চুপচাপ আছেন। যেভাবেই যোগ হয় সেখানেই স্পার্ক হবে। সৌন্দর্যের ক্ষেত্র তৈরী হবে। সেটা কি আমি অনুধাবন করতে পারছি? অথবা তোমার মধ্যে যে কম্পন হয়ে গেল সেখানে কিছু ঘটে গেল কি না? বা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেলাম কি না ? ঐ কম্পন, অনুভবের জায়গা ধরে ফেলতে পারছি কিনা? ধরে ফেলতে পারলে আমি শান্ত হয়ে যাবো । ‘ওয়াননেস ওয়িথ ওয়ান’ হাক্কানী স্কুল অব থটের কথা। তোমাকে মোহাম্মদ হতে হবে। এটাই মহৎ। নিষ্ঠা, নিমগ্নতা দিয়ে প্রতিটি কর্মে প্রতিটি সময়ে থাকতে পারলে উপলব্ধির দরজায় আসতে পারবে। এগিয়ে যাওয়ার জন্যই সমুদ্রের স্রোতের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এখানে দু:খ নাই, কষ্ট নাই। আছে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ।  

কর্ম ব্যাখ্যা করলে তা সেবার মধ্যে পড়ে। সেবা করার চিন্তাটা এখনও আমাদের মধ্যে পৌঁছে নাই। কাছাকাছি যাওয়ার জন্য সেবা একটা মাধ্যম। বিশ্বাসের ঘরে যখন যাওয়াই হয়নি তখন গেলেই কি আর না গেলেই কি? সেবার পরিপূর্ণ জিনিস স্মরণ করতে হয়। চিন্তার জগতে করা যায়, দৃষ্টিতে করা যায়, মুখের কথায় উচ্চারণ করে করা যায়। সত্য যে খুঁজবো সে সত্যের আলো তার মধ্যে আসতে পারে আবার নাও আসতে পারে। দরবারে যখন খাচ্ছি সেটা কি কোন কিছু পাওয়ার আশায় নাকি ভক্তি বা শ্রদ্ধার সাথে হচ্ছে? পর্যবেক্ষণ শক্তি নিজের মধ্যে নিজে তৈরি করতে পারছি কিনা? অনুভূতির কোন জায়গায় আমি ধারণ করে আছি?

আমার আপাদমস্তক অর্থাৎ পা থেকে মাথা পর্যন্ত যতগুলি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে সে অঙ্গের একটি জায়গায় ধরে রাখতে পারছি কিনা। একটুখানি ধরে রাখতে পারলে আমি বুঝতে পারি? অনুভূতির জায়গায় আমি আছি কিনা? অনুভূতি ছাড়া পরিবর্তন হয়না। আমি কোন জায়গায় আমি স্থিত করেছি। অর্থাৎ অনুভব করছি। যেখানে নিয়ন্ত্রন আছে সেখানে স্থিতি আছে। নিয়ন্ত্রণ কি নিচে থেকে উপরের দিকে? নাকি উপরের দিক হতে নিচের দিকে করবো? চিন্তাজগত থেকে একটা চিন্তা বাছাই করে নাম স্মরণ করতে গেলে কি পরিবর্তন আসে? বুঝতে হবে। পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিজে নিজে উপার্জন করে অর্জন করতে হবে। কখনও কি চিন্তা জগতে তুমি ছাড়া রাখছি? আমাদের প্রায় ষাট হাজার চিন্তার আর চার হাজার কর্ম আছে। এর মধ্যে এটা একটা পদ্ধতি। সময়ের তালে তালে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। বই পড়ে পান্ডিত্য করা যাবে। নিজেকে চেনা যাবে না। কোন জায়গায় নিজেকে স্থিত করলাম?  বর্তমানই সত্য। কার সাথে একাত্ম হলে আত্মিক সম্পর্ক হলে শান্তি পাবো? নিজেকে শান্তিময় করে তুলতে পারবো।

শান্তির একটাই পথ। হাক্কানী সত্যের সাথে একাত্মতা। এজন্য আমি বহন করে যাচ্ছি সেখানে কোন জায়গায় আমি সত্যটাকে রাখছি? সেই সত্য আমার মধ্যে বাসা বাঁধছে। সত্য অন্বেষণ করে, পর্যবেক্ষণ করে, অনুসরণ করে কি আমি আমার অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারছি? কোথায় আছি আমরা? শুরু কোথা থেকে করতে হবে? মিরপুর আস্তানা শরীফ এটা একটা পরীক্ষাগার। সত্যময় সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। এত সস্তায় আনারকে ধরবেন?

সত্য অন্বেষণ করবেন কিনা তা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নিজেকে নিজে তৈরি করতে হবে। প্রশংসা আমরা বুঝি কি না?  সর্বস্তরে যিনি ধারণ ও লালন করতে পারে তিনিই প্রশংসা করতে পারেন। প্রশংসা করতে পারে একমাত্র গুরু। আমাদের জন্য করণীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, আরও পাবে। উপলব্ধির উৎস এক এ। সেখান থেকে উপলব্ধির শুরু। এক এ আসা মানে উপলব্ধির দরজায় আসা। উপলব্ধি মানে বোধ। উপলব্ধি শক্তি নয়। বোধ মানে জ্ঞান। উপলব্ধি হয়না বলেই আমি কোনটাতেই তৃপ্ত হইনা। জ্ঞান একটাই। যে কোন একটাতে আমি ঐ বিষয় নিয়ে পড়ে আছি। সে সৌন্দর্যের কোন শেষ আছে? আমি আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে আছি। আমাকে বার বার টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমার ভাললাগা, অনুভূতি বার বার ঐ দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। বোধ জ্ঞানের পথে প্রথম দরজা। সব প্রাপ্তির মধ্যে এক প্রাপ্তি কোথায়? সব প্রাপ্তি প্রাপ্তি না। প্রাপ্তির কোন শেষ নাই। হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে প্রাপ্তির সত্যটা কোথায়? উপলব্ধির সত্য কোনটা?” সেইটার সাথে একাত্মতা হতে পারছি কিনা? ঐ এক পেয়ে আমি কি সন্তুষ্ট ? বহু প্রাপ্তি আছে। জ্ঞান সাগরে আমি দাড়িয়েছি। পা ফেলে ফেলে যাব। জ্ঞানের দরজার কাছে চলে এসেছি। প্রাপ্তি নেতিবাচক হতে পারে। ইতিবাচক হতে পারে। নেতিবাচক না হলে আমি সিজনড হবো কি করে? কোন প্রাপ্তি থেকে আমি সন্তুষ্ট?  ইলমাদুন্নবী  মানে দূরদর্শিতা। চেতনার স্তর যত মোটা তত সে জ্ঞানের দিকে যাবে। বাস্তবতা তাকে ফুয়েল দিবে। বাস্তবতার নিরিখে তুমি বার বার দেখো। সূক্ষ রেখা থেকে বাড়তে থাকে এই উপলব্ধি। সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে সে তখন নিজেই সৌন্দর্য হয়ে যাবে। স্পিরিট মানে আধ্যাত্মিকতা। চেতনার সর্বোত্তম শিখরে যখন যাবে তখন সে খেলবে। যে কোন রূপ ধরতে পারে। যে কোন ঘটনা ঘটাতে পারে। একমাত্র গুরুই চিনতে পারে। প্রাপ্তি তো সেখানেই।

ব্যক্তির সবচাইতে কঠিন জায়গা হচ্ছে তার ইচ্ছা। ইচ্ছা যখন প্রাপ্তির আশা করে তখন এই ইচ্ছা অন্য একটি ইচ্ছার কাছে সমর্পিত হতে হয়॥ তা না হলে হয় না। হামিবা যখন করবো তখন সত্য হবে ব্রত হিসাবে ধারণ। সত্য কোনটা? আমি লেখাপড়া করছি, আমি চাকরি করছি, এখানে কোন সত্য খুঁজতে যাবো? যে শাস্ত্রই বলেন, সব শাস্ত্র ঘেটে পাওয়া যাবে এক ঈশ্বরবাদ। সেই এক কে আমি কিভাবে বাস্তবায়ন করছি? কিভাবে একাত্মতা হচ্ছি? এখানে আমরা বসে আছি চার দেয়ালের মধ্যে। এখানেও প্রাপ্তি আছে। ভাল খারাপ বলছি না। এই মধ্যেও বৈচিত্র আছে। এই যে দেখা শুনার অনুভূতি সেইটা কতটুকু কোন জায়গায় একাত্ম হচ্ছে? আবার সরিয়ে দিচ্ছে? এই জন্যই উপলব্ধির জায়গায় যেতে হবে। প্রথমে নিজেকে এক এর মধ্যে অবগাহন করতে যেয়ে যে উপলব্ধি আসবে সেটাকে সে আস্তে আস্তে প্রতিনিয়ত নিয়ে যাবে। কাল আমি যে রূপ দেখেছি সেই রুপ বহন করে আবার আজ যে রূপ দেখছি এ দুটোর মধ্যে কতটা পার্থক্য হচ্ছে? পরিবর্তন হচ্ছে?

আমি ছেড়ে দিতে হবে। তুমিতে আসতে হবে। কিন্তু আমি ভুলে গিয়ে তুমির মধ্যে চলে তখন আমি কোথায় থাকে? যেখানে “তুমি” যতই দেখতে পাবে আমি ততই দুরে সরে যাবে। কেন? দৈহিক যে জিনিসটা আমরা বুঝি দৈহিক শক্তি যা বহন করার শক্তি আছে। সে শক্তিটা কি আমরা বুঝি? সেখানে দেখা যায় নিজের ইচ্ছার উপর নিজের আস্থা নাই। প্রতেক্যের কোন জায়গায় আকর্ষন করলো, বৈচিত্রতা সেখানে কার কতটুকু, কোথায় কতটুকু সময় এটা বৃদ্ধি করাতে হয়।এটা করলে ডেভেলপমেন্ট তাড়াতাড়ি হয়। যাই হোক। কম হোক বেশী হোক। যে সময়টা কাটানো হচ্ছে সেখানে কিছু না কিছু গ্রহণ থাকবে। প্রত্যেকের একটা অভ্যন্তরিণ সৌন্দর্য আছে। সে সৌন্দর্যটা সে দেখলো কি না। ব্যক্তি যে পরিবর্তনের ধারার মধ্য দিয়ে চলছে, ক’জন আছে মানুষ তার পরিবর্তন ধরতে পারে? যে ঐ পরিবর্তন ধরতে পারে সে তত নিজের সত্যের কাছে আসতে পারে। নিজের মধ্যে অভ্যাসের দাস, ইচ্ছার দাস, ভোগের দাস কোনটা নাই? এটা দোষ না। পৃথিবীতে জন্মাবার পর থেকে শুধু দেখেই আসলাম নিজের সৌন্দর্য দেখার অবকাশ পেলাম কোথায়?

এক- এর থিওরিতে যাবো কি করে? এটা নিজের আত্মবিশ্লেষণ করলে, নিজেকে নিজে পর্যবেক্ষণ করলে ধরা যায়। উপলব্ধি হচ্ছে প্রেমের পথে শুরুর বিন্দু। এখানে অনুসরণ এবং অনুস্মরণ বাধ্যতামুলক। চিন্তার পদ্ধতি শুরু হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত অনুভূতি আছে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈচিত্র আছে। বৈচিত্রময়তা আছে। অনুভব হলে তা স্থিত হয়।