আবির্ভাবের মাহেন্দ্রক্ষণে…….

‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি –
অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’

সংলাপ ॥ সত্য শাশ্বত – চির বহমান, চির অম্লান। সত্য সার্বজনীন। সত্য সবার জন্য। মহাকাল এসে মিলে গেলো একটি বিন্দুতে। আকাশের বুকে গ্রহ নক্ষত্র আছে বলেই আকাশ এত সুন্দর। ফুল আছে বলেই প্রকৃতির রাজ্য এত মনোরম। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আছে বলে সমুদ্র রূপময়। বিশ্ব চরাচর সত্যমানুষের রূপের ছটায় মুগ্ধ, ধন্য। তাঁদের স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ত্রিভূবন আলোকিত। সে জ্যোতি দৃষ্টিকে ঝলসে দেয় না বরং আকর্ষণ ও উজ্জ্বল করে। তাঁরা তাঁদের স্বর্গীয় প্রভায় পৃথিবীর শ্রীহীন মানুষের দীনতা দূর করেন। কখনও প্রকাশ্যে কখনও গোপনে। অজ্ঞ মানুষ তা বুঝতেও পারেনা। মানুষের কল্যাণে সত্যের নিবিড় সাধনায় যাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেন – সাধারণ মানুষের সাধ্য কি তাদের মহিমা বুঝতে পারা? যাদের অঙ্গুলী হেলনে বিশ^প্রকৃতি, দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি নতুন রূপ লাভ করে – সেই ঊর্ধ্ব লোকাচারী মানুষ সাধারণের জানার সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁরা মুক্ত মানুষ, সত্যমানুষ, সত্যের আকাশে এক একটি ধ্রুবতারা। সমাজ সংস্কারের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ নিজস্ব সৃষ্টি শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করছে। সংস্কারের কালোমেঘ তাদের জীবনকে তমসাচ্ছন্ন করে রেখেছে। জীবনের নানান সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে খুঁজে একটা নিরাপদ আশ্রয়। তাদের ত্রাণকর্তারূপে যুগে যুগে আগমন ঘটে কালজয়ী মহাপুঁরুষদের। মানুষের অসহায়ত্ব তাঁদের কষ্ট দেয়। তাঁদের হৃদয় কাঁদে নিভৃতে ।

সত্যমানুষের হাত ধরে আবির্ভাব হয়েছিল বাঙালির জাতিসত্তার। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে বাঙালি জাতিসত্তার বীজ রোপিত হয় সত্যমানুষের মাধ্যমে। সেই থেকে আজ অবদি চলমান রয়েছে এই ধারা। তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতি সত্যমানুষদের দেখানো শান্তি ও সত্যের পথ ধরে চলে এসেছে কিন্তু গৌরবান্বিত ঐতিহ্যের অধিকারী এই জাতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বহি:শত্রুর আক্রমণে নির্যাতিত হতে হতে নিজ জাতিসত্তার সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ হারিয়ে ফেলতে বসেছে। নানান দেশ হতে আগত ঔপনিবেশিক ধর্ম ও সংস্কৃতি বাঙালির চির শাশ্বত ও সৌন্দর্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির মাঝে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছে স্বধর্ম ও সংস্কৃতি। মিশ্র ধর্ম ও সংস্কৃতির যাতাকলে পড়ে যেন ভুলে যেতে বসেছে জাতিসত্তার আসল রূপ, আপন সত্তার আসল সত্য।

বাঙালির জাতিসত্তার আসল রূপ পুনরুদ্ধারে যুগে যুগে এই মাটিতে আগমন করেছেন সত্য ও শান্তির দিশারী সত্যমানুষ সূফী সাধকগণ। সত্যমানুষ সূফী সাধকদের আবির্ভাবের ফলে বাঙালি আপন সত্য ও সৌন্দর্যের সাথে পুনঃ সংযোগ করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সত্য ও সৌন্দর্যের সংযোগ সূত্র যখনই ভুলতে বসেছে বাঙালি তখনই আবির্ভাব ঘটেছে সত্যমানুষদের অর্থাৎ সূফী সাধকদের। একেক জন সাধক একেক প্রক্রিয়ায় সত্য ও সৌন্দর্যের রূপ প্রকাশ করেছেন এই জাতির মাঝে। আজও প্রকাশ করে চলছেন এই জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য। সত্যমানুষদের আবির্ভাবের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতির মুক্তি ও শান্তির দূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। এই দুই মহান সাধক বাংলায় হাক্কানী তথা সত্য প্রচারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। জীবন ও জগতের সত্য, মানুষের সত্য, ধর্মের সত্য, এক কথায় মানুষের জীবনের প্রকৃত রহস্যের সন্ধান দেন এই দুই মহান সাধক। এই সাধকদের মহা সত্যকে জগতে বহমান রাখার জন্যে আবির্ভূত হন আরো এক সত্যমানুষ। সৃষ্টির বৈচিত্রময়তায় আর এক নব সংযোজন।

তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের (বর্তমান পশ্চিম বাংলার) সোনারপুর মহকুমার চাকবেড়িয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক বাবা-মা পুত্র সন্তানের আশায় দারস্থ হন গাজী বাবার দরগায় (হযরত গাজি মোবারক শাহ, যার রওজা ঘুটিয়া শরীফ নামে পরিচিত)। সেখানে মানুষ যায় স্বপ্ন পূরণের আশায়। দরগাহের সীমানার ভিতরে পুকুরে কলাপাতায় মোড়ানো শিন্নী ভাসায় কৃপাপ্রার্থীরা। সেই শিন্নী ভাসমান থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কৃপাপ্রার্থীরা পুকুরের কোলঘেঁসে পানির মধ্যে দুহাত পেতে বসে থাকে। শিন্নী ভাসতে ভাসতে যার হাতে এসে পৌঁছায় তার স্বপ্ন পূর্ণ হয়। গাজীবাবার দরগাহতে হাত পেতে সেই বাবা মা লাভ করলেন এক দুর্লভ সন্তান। জগতবাসী পেল এক শান্তির দূত। এক সময় সেই সন্তান নিতান্ত খেয়ালের বশে, শুধু কি খেয়ালের বশে? না কি মূলের আকর্ষণে ছুটে গিয়েছিলেন বাংলার মহান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর দরবারে। প্রথম দর্শনেই পেলেন ভিন্ন এক জ্যোর্তিময়তা। জ্যোতির্ময় গুরু প্রথম দেখায় পেলেন শান্তির সত্যের এক বাহককে। তাঁর মানসপটে এঁকে নিলেন এক ভাস্কর্যমূর্তি। তাঁর শৈল্পিকনন্দনে সৃষ্ট ভাস্কর্য জগৎকে উপহার দিলেন এবং তাঁর শিষ্যের হাতে তুলে দিলেন হাক্কানী দর্শন। পরিয়ে দিলেন হাক্কানীর রাজটীকা। প্রথম দর্শনে শিষ্য তাঁর সত্যকে ধারণ করলেন তেমনিভাবে, যেমনভাবে ঝিনুক বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করে নিজের বক্ষে সৃষ্টি করে মূল্যবান রত্ম। গুরুর সৌন্দর্যে বিমোহিত থেকে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে জীবনের সাধনারূপে গ্রহণ করে গুরুর কৃপায় সত্যের অতন্দ্র প্রহরী নিরলসভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বিশালতার দিকে। বাংলার বুকে, বাঙালির জাগরণে, বাঙালির জাতিসত্তার সত্য উন্মোচনে দিয়েছেন মুক্তির বাণী ও দিক নির্দেশনা। জগতের বুকে পরিচিতি পেয়েছেন সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ নামে। সত্যমানুষ শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি বাঙালি জাতির উত্তোরণের সেই মহামন্ত্র-

‘সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হন, নিজে বাঁচুন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’।

সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নির্ভীক মহান সত্যমানুষ বাঙালির জাগরণে আবারো দিয়েছেন আর এক মহামন্ত্র-

‘সত্য মানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।’

মা-মাতৃভাষা-মাতৃভূমির তথা বাঙালি জাতিসত্ত্বার সত্য প্রকাশে, প্রচারে ও প্রতিষ্ঠায় কেমন অনুরাগী ছিলেন তা তাঁর বাণী থেকেই উপলব্দি করা যায়।

সত্যমানুষ আবির্ভূত হন, জগতের বুকে সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার তরে। সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলে। হাক্কানী দর্শন প্রচার-প্রসারের যাত্রা হযরত আজানগাছি হতে শুরু হয়ে সূফী সাধক হযরত আবু আলী আক্তারউদ্দিন, সূফী সাধক আনোয়ারুল হক হয়ে সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ এঁর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। হাক্কানী দর্শনকে তিনি নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

সৃষ্টির বিধানে সকলেই বাধা। সত্যমানুষ সে বিধানে পরিবর্তন করেন না। অগনিত ভক্ত আশেকানদের ফাঁকি দিয়ে মহামিলনে পাড়ি জমিয়েছেন ৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ জুলাই ২০১৯, শনিবার, সকাল ৭ টায় এবং ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২২ জুলাই ২০১৯, সোমবার, বেলা ১১.২১ মি. তাঁকে রওযায় চির বিশ্রামে শায়িত করা হয়। সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীদের শিখিয়েছেন আপনসত্য উপলব্ধি করার পথ। ‘একদিনের জন্য হলেও নিজের সত্যকে উপলব্ধি করি – অন্তত একজনের নিকট হলেও সত্য কথা বলি’। যে একদিনের জন্য নিজ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে, সে সত্যমানুষ হওয়ার পথের যাত্রী হিসাবে সত্যানুসন্ধানী হবে। নিজ সত্যের তথা স্বরূপের সঙ্গে একবার সংযোগ হলে আর ভয় থাকেনা কিছু হারাবার। এটাই শাশ্বত, এটাই চিরন্তন। সত্যমানুষের কৃপার সাগরে ধুয়ে যাক, মুছে যাক আমাদের সকল পঙ্কিলতা এই আমাদের প্রার্থনা। সত্যমানুষ হারান না, সর্বদা বর্তমান। যে হৃদয় সত্যময় হয়ে উঠে সে হৃদয়ে সর্বদা সত্যমানুষ বর্তমান। সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীর হৃদয় নিজেকে প্রবোধ দেয় এই বলে – ‘নয়নের সম্মূখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’। ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছো নয়নে নয়নে’।