আত্মপ্রতিষ্ঠার অনন্য উপাদান মা-মাতৃভাষা-মাতৃভূমি-মানুষ

সংলাপ ॥ একটা দেশ শান্তির বাগান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে যখন মা-মাতৃভাষা -মাতৃভূমি-মানুষ সেই দেশে বেশি সম্মান ও গুরুত্ব পাবে। মায়ের জাতকে অবহেলা করে, দাবিয়ে রেখে বা ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করে কোনো জাতি বিশ্বে সম্মানজনক স্থান দখল করতে পারেনি। মা পারেন যেমন একটা সংসারকে সুখের আঁধার ও শান্তিধাম করে গড়ে তুলতে তেমনি সুযোগ পেলে সমাজ ও রাষ্ট্রেরও আমূল সংস্কার সাধন করতে পারেন মায়ের জাত। তাই মা ও মায়ের জাতকে আমাদের দেশে সর্বস্তরে সবচেয়ে বেশি অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য দিয়ে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে যাতে এ দেশ গড়ে উঠতে পারে।

মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ সম্মান না দিয়ে বিশ্বের কোনো জাতি গড়ে উঠতে পারেনি। মাতৃভাষার সমান মর্যাদা অন্য কোনো ভাষা পেতে পারে না। মাতৃভাষাকে ধারণ, লালন ও পালনের মধ্যেই নিহিত আছে দেশ ও জাতির কল্যাণ। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বাঙালি জাতি হিসেবে বাংলা ভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে পারেনি। আনুষ্ঠানিকতায় ভরপুর থাকলেও তা সাময়িক। এত বছর পরেও যখন ফাল্গুন আসে তখন সাজ সাজ রব পড়ে আমরা যে বাঙালি তা বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করার মাধ্যমে।

শুধু তাই নয়, আজও পর্যন্ত কিছু বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ছাড়া আধা-ঘন্টা নিজের ভাষায় বক্তৃতা দিতে পারেন না অন্য ভাষার সাহায্য ছাড়া। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে যে জাতিকে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হয়েছি বাংলা ভাষাকে সেই একইভাবে ধারণ-লালন-পালন করতে। এ দৈন্যতায় বাঙালি জাতি ভুগছে। আরো কতদিন ভুগতে হবে তার ইয়ত্তা নেই। রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, ধর্মজীবী সবার মধ্যেই একটা উপনিবেশিক দাসত্ববোধ কাজ করছে যা বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে তারা দাঁড় করাচ্ছেন নিজের ভাষার সঙ্গে অন্য জাতির ভাষাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে। আজ পর্যন্ত কোনো সরকার মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে বাঙালি জাতিকে গড়ে তোলার জন্য কোনো আধুনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। এ ব্যর্থতায় আমরা আমাদের সংস্কৃতির, আমাদের ভাষার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যবোধ হারিয়ে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মধ্যে ধীরে ধীরে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছি তাতে অদূর ভবিষ্যতে জগাখিঁচুড়ি একটা ভাষা নিয়ে জাতিকে চলতে হবে। বিশ্বায়নের জিকির আর তথাকথিত ধর্মীয় জিকির তুলে আমরা ইংরেজী, আরবী, হিন্দী, উর্দুর মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে নতুন প্রজন্মকেই দেশ ও জাতিকে বাঁচাবার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

ভূমি ও তার নিচের মূল্যবান সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। দেশের দশভাগ মানুষ ভোগ বিলাসের মধ্যে জীবনযাপন করবে আর নব্বই ভাগ মানুষ এক বেলা বা আধাপেট খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে তাতে দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও উন্নতি স্তিমিত হয়ে পড়বে। মাটির নিচের মহামূল্যবান সম্পদেরও যথার্থ ব্যবহার কাঠামো গড়ে উঠেনি। আমরা দুর্নীতি, সন্ত্রাস, রাহাজানির কথা বলি কিন্তু কেন এই অবক্ষয়? প্রযুক্তির জন্যে বিদেশের কাছে ধর্ণা দিতে হচ্ছে অথচ দেশীয় প্রযুক্তি ও মেধা ব্যবহার করা হচ্ছে না মাটির নিচের সম্পদকে খুঁজে বের করে দেশের কাজে লাগানোর জন্য। এর পিছনে কাজ করছে এক শ্রেণীর ব্যবসায়িক, রাজনীতিক ও আমলাতন্ত্র চক্র তাদের ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারের জন্য। যতক্ষণ পর্যন্ত না মাটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নদী ও খনিজ সম্পদ যথাযথ ব্যবহার হবে সঠিক কাঠামোগত বিন্যাস সাধন না করে, ততোদিন এ দেশের বেকার সমস্যা কমবে না; আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনও আসবে না এবং বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে অন্যতম জায়গা করে নিতে পারবে না। দেশের সম্পদ বিদেশী বেনিয়াদের কাছে বিক্রি করে নয় বরং উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে দেশের সম্পদ দেশের মেধা সমন্বয়ে দেশের কাজেই লাগাতে হবে। শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে শিল্পায়নের জন্য।

দেশের মহামূল্যবান সম্পদ ‘মানুষ’কে পরিকল্পনা মাফিক গড়ে তুলতে হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য আজ পর্যন্ত কোনো সরকার এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ দৃষ্টি দেয়নি। দেশের মানুষ ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনীতিকদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে, দেশের জন্যে নয়।  মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে আর গাধা তৈরি করা হচ্ছে দেশে যাতে তারা বোঝা টানা ছাড়া আর কিছু করতে না পারে। রাজনীতিকরা চান না দেশের মানুষকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা  বাস্তবায়ন করে। বরং দলবাজি করার প্রবণতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছেন এবং অসৎ উপায়ে উপার্জনে মদদ যোগাচ্ছেন। ফলে অর্থ+বেকারত্ব+মাদক ব্যবসা সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি তো ঘটছেই তার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষ হয়ে যাচ্ছে পঙ্গু। শ্রমলব্ধ উপার্জন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দেশের মানুষ। অপরদিকে দেশের মানুষকে আরো পঙ্গু করে দিচ্ছে এ দেশের ধর্মজীবীরা। আল্লাহ্র নামের উপর দিয়ে সবকিছু পার করার অপচেষ্টা এবং বেহেশ্ত-দোযখের ভয় দেখিয়ে বস্তাপচা বাদশাহী আমলে প্রণীত মিথ্যা হাদিস, ফেকাহশাস্ত্র এবং সর্বোপরি শরিয়ার দোহাই দিয়ে অলীক কল্পনার ফানুস উড়িয়ে দেশের অশিক্ষিত মানুষকে ধর্মান্ধ করার প্রচেষ্টায় রত।

তাই তারা তথাকথিত ইসলামের নামে জিহাদ ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধর্মের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ধর্মশিক্ষার নামে বেসরকারী মাদ্রাসা সৃষ্টি করে নিম্নমানের তথাকথিত ইসলামের শিক্ষা দিয়ে এক শ্রেণীর ধর্মজীবী এমন এক সম্প্রদায় গড়ে তুলছে যারা দেশ ও জাতির জন্যে বোঝা স্বরূপ। তারা কায়িক পরিশ্রম করতে পারে না আবার মেধার চর্চাও করতে পারে না। ফলে তারা সব সময় এমন এক মানসিক অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে যা কখনও এতো নি¤œমানের অবস্থা তৈরি করে যে তখন তারা যে কোনো অসামাজিক কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না। আবার অনেক সময় তথাকথিত ইসলাম ধর্ম জানার সঙ্গে আরবী ভাষা জানায় তাদের অহংবোধ এতই প্রকট হয়ে ওঠে যে তখন তাদের ফতোয়াবাজিতে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এই অবস্থা দেশের মধ্যে বিরাজমান রাখতে এক শ্রেণীর স্ব-ঘোষিত বুদ্ধিজীবী, ধর্মজীবী  এবং রাজনীতিকরা কাজ করে যাচ্ছে  স্বাধীনতার পর থেকে যাতে তাদেরকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারে পরজীবী এবং নির্ভরশীল করে রাখতে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষা ও কওমী মাদ্রাসা গড়ে ওঠার পিছনে রাজনৈতিক তথাকথিত ইসলামকে যে কাজে লাগানো হচ্ছে পাশ্চাত্য আধিপত্যবাদীদের মদদে তার প্রমাণ পাওয়া যায় একশত বছরের আমাদের দেশের দৈনিক পত্রিকাসমূহের খবরাদির মধ্যে।

এ ক্ষেত্রে মা-মাতৃভাষা-মাটি-মানুষকে সমভাবে সমান মর্যাদা দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার্বিক কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনায় মায়ের জাতকে যথাযথ জায়গা ছেড়ে না দিলে-মাতৃভাষার যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা না করলে-মাটির সম্পদকে ব্যবহারের জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে-মানুষ সম্পদকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে গড়ে তুলে দেশ ও বিশ্বায়নের যুগে মূল্যবান সম্পদ শক্তি হিসাবে ব্যবহার না করলে এ দেশের শান্তি শুধু কথার কথা হয়ে থাকবে। দেশের মানুষকে গালভরা বুলি শোনানো যাবে, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তাদের ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন হয়ে রাজনীতিক, আমলারা ও ব্যবসায়ীমহল সম্পদশালী হতে পারবেন কিন্তু সার্বিক দেশের কোনো কল্যাণ নিয়ে আসতে পারবেন না। ৪৪ বছর ধরে যে মিথ্যাচার চলছে তা চলতেই থাকবে – গরীব গরীব হবে, ধনী ধনী হবে আর মধ্যবিত্তশ্রেণী দু’দিক দিয়ে ব্যবহৃত হয়ে এবং দুই শ্রেণীকে ব্যবহার করে দ্বি-চারীর সংখ্যা বাড়াবে যা দেশের জন্য ভয়াবহ…..।