হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে ৫ম পর্বের আলোচনা

প্রভুর আদেশপ্রাপ্ত হয়ে চলাতেই নিয়ন্ত্রণ!

সংলাপ ॥ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) আয়োজিত সাপ্তাহিক নিয়মিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে  ৫ম পর্বের আলোচনা গত ২২ ভাদ্র ১৪২৭, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের জ্যোতিভবনে আবু আলী আক্তারউদ্দীন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। করোনাজনিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অনুষ্ঠিত এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন বাহাখাশ সভাপতি শাহ্ শাহনাজ সুলতানা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন হাক্কানী আস্তানা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ শওকত আলী খান, বাহাখাশ সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ পরিচালনা পরিষদের সদস্য মমতাজ বেগম এবং হামিবা কম্পিউটার একাডেমির সভাপতি সালেহ আল দ্বীন সঙ্গীত। মিরপুর আস্তানা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ সূফী ডাঃ সুমাইয়া সুলতানার উপস্থিতিতে পর্বটির সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ রওজা শরীফ ব্যবস্থাপনা কমিটির যুগ্ম-সচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

শাহ্ শওকত আলী খান বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে হলে সবার আগে প্রভুকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। জন্মগতভাবে, স্বভাবগতভাবে আমি নিয়ন্ত্রণহীন। আমি পরিচালিত হচ্ছি আমার অহংকার, আমার মায়া, আমার ইন্দ্রিয়, সেটা পঞ্চম ইন্দ্রিয় বলি আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেভাবেই বলি সেই ইন্দ্রিয় দ্বারা, আমরা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি নফ্স দ্বারা। নিজেকে না-চেনা পর্যন্ত এক অচেনা দ্বারা আমি পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত যেখানে রয়েছে শয়তানের উপস্থিতি। নিজেকে চেনার পর সেখানে শয়তানের উপস্থিতি আর থাকে না, সেখানে প্রভুময়, অর্থাৎ প্রভুর উপস্থিতি হয়ে গেলে আরেক আমি। চিন্তার মধ্যে প্রভুর অবস্থান, নতুবা সেখানে শয়তানের অবস্থান। প্রভুর অবস্থান যেমন বিভিন্নভাবে থাকে, শয়তানও উপস্থিত হয় তার চতুরতা, তার চালাকি-ইত্যাদি বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন রংঙ-এ। আমার চিন্তায়, আমার মস্তিস্কে প্রভুকে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব। যে নিজের ওপর যতটুকু প্রতিষ্ঠিত হবেন সেখানে সে ততটুকু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। প্রভুর প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই এখানে আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। এখানকার পরিবেশটা আমাদের জন্য নয়, আমাদের অনুকূলে নয়। এখানে যে নোংরামী, অভদ্রতা, দ্বিচারিতা চলছে তার কোনোটাই আমাদের সঙ্গে যায় না। আমরা শয়তানের রাজত্বে অবস্থান করছি। কিন্তু এসেছি প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে, প্রভুর তরফ থেকে তাকে (শয়তান)কে পরাজিত করার জন্য। সেটা করতে গেলে প্রভুর উপস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণের মূল শক্তি। আমাকে সেজন্যই নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে, প্রভুর ছত্রচ্ছায়ায়, প্রভুর সান্নিধ্যে, প্রভুর অবস্থানে অবস্থান করতে হবে। সমগ্র বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করেন প্রভু। সেখানে আমাকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছে। আমার সমস্ত শক্তি প্রদর্শন করতে পারলেই আমি প্রভুর প্রতিনিধিত্ব করতে পারবো, শয়তান সেখানে পরাস্ত হবেই হবে। আমার সাথে প্রভুর উপস্থিতি আছে, কিন্তু প্রভুর সাথে আমার সম্পৃক্ততা নাই। কারণ, শয়তানের মধ্যেও প্রভুর উপস্থিতি আছে।  প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে শয়তানের সাথে যুদ্ধ করাটাই মূল খেলা। শয়তানের দ্বারা প্রতারিত হয়ে এখানে এসেছি, আমাদের প্রত্যেকেরই অবস্থানের বিচ্যুতি ঘটেছে। আমরা স্বর্গে ছিলাম, আবার স্বর্গেই ফিরে যাবো। কিন্তু শয়তান থেকে মুক্ত না হয়ে, প্রভুর নিয়ন্ত্রণে না-যাওয়া পর্যন্ত আমাদের যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এসবের প্রত্যেকটা মূল বিষয়ে আমাদেরকে আরও আন্তরিক হয়ে জানতে হবে। সত্য’র সাথে একাত্ম থাকতে হবে। এখনই জানার সময়, বোঝার সময়। আমরা যদি ইউনাইটেড না হই, সত্যের সাথে একাত্ম না হই আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। প্রভুকে স্মরণে রেখে, নিয়ন্ত্রণে রেখে ঈমানের সঙ্গে আমাদেরকে বিদায় নিতে হবে- আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে, শয়তানের প্রতি বিশ্বাস রেখে নয়। এই অবস্থানে নিজেকে নিয়ে যেতে হলে নিজেকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রভুকে আমরা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারিনি বলেই আমাদের রাগ উঠে, আমাদের ব্যক্তির নফ্স জাগ্রত হয়ে যায়, সেকেন্ডে সেকেন্ডে, মূহুর্তে মূহুর্তে, তখন প্রভুর স্মরণ থাকে না। আমি অনিয়ন্ত্রিত মানেই আমি শয়তান দ্বারা আবদ্ধ, শয়তান দ্বারা আকৃষ্ট-শয়তানের দাসত্ব স্বীকার করে শয়তানের প্রভুত্বকে বরণ করে নিয়েছি। আর আমার মধ্যে প্রভু থাকা মানেই নিয়ন্ত্রিত। আমার প্রভু আছে মানেই আমি নিয়ন্ত্রিত।

শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ বলেন,খাঁটি বাংলা শব্দ ‘নিয়ন্ত্রণ’ গভীর তাৎপর্যবহ। এর আভিধানিক অর্থ নিয়ম, নিয়মন, সংযমন, প্রশমন, ব্রতচর্য্যা, বারণ, নিবর্তন, নিষ্ঠা, নিত্যকর্মানুষ্ঠান ইত্যাদি। ‘নিয়ন্ত্রণ’ কেন বা কার জন্য দরকার? আর কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? আরবিতে ‘নিয়ন্ত্রণের’ অর্থ সবুর মানে ধৈর্যধারণ করা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,‘ইন্নাল্লাহা মাআ’স সাবেরিন’ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন’। পৃথিবীতে একমাত্র মানবপ্রজাতির জন্যই নিয়ন্ত্রণ শব্দটি প্রযোজ্য। আরও যে লক্ষ লক্ষ প্রজাতি রয়েছে তাদের কারও জন্য এই শব্দটির প্রয়োজন হয় না। মানুষ সভ্য প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনেও এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ই প্রধান কারণ। পৃথিবীর প্রথম মানব, সভ্যমানব হযরত আদম (আঃ) এবং এঁর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিলের ঘটনাবলী আমরা জানি। ধর্মের শুরু তখন থেকেই। যাঁরা ধার্মিক হয়েছেন তাঁরাই ছিলেন নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণ কেন দরকার? এর দরকার হয় জীবনচলার পথে শান্তির জন্য। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে কেউ আর শান্ত বা শান্তিতে থাকতে পারে না। একটা গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে কী ঘটে বা ঘটতে পারে, একটা কমান্ড যদি ফেইল করে তবে কী অশান্তি আসতে পারে আমরা তা সবাই জানি। জন্মের পর থেকে মানুষ তাঁর মা-বাবা বা সঠিক কোনো অভিভাবক দ্বারা চালিত হন। কিন্তু সে যখন বড় হতে থাকে তখন সে আর মা-বাবার কোলে থাকতে পারে না, ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। হাজারো চিন্তা, হাজারো রকমের পরিস্থিতি তার মোকাবেলা করতে হয়। আর তখনই তার প্রয়োজন হয় একজন সত্যিকারের নিয়ন্ত্রকের যাঁকে বলা যায় সম্যক গুরু-মুর্শিদ বা পথ-প্রদর্শক। এই সম্যক গুরুর দ্বারা চালিত হতে পারলে সে নিজেই একদিন নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।

তবে ‘নিয়ন্ত্রণ’র ক্ষমতা অর্জন করাটাও একটা যোগ্যতা-এটা একজন মানুষের সারাজীবনের সাধনার ফসল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ এবং তাঁর ১৮ মিনিটের ওই ভাষণ শোনার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর পিনপতন নিরবতা মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটি বড় উদাহরণ। মিরপুর আস্তানা শরীফে এসে আমরা দেখেছি সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ কীভাবে এখানে সকলের ওপর একটি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পেরেছিলেন-এসব নিয়ন্ত্রণ আরোপের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন চলার পথে সত্য ও মঙ্গল হাসিল হয়েছে। নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠাও একটি যোগ্যতার ব্যাপার, যা একদিনে হয় না, শুধুমাত্র নিরবিচ্ছন্ন সাধনা করেই সেটি অর্জন করতে হয়। গুরু-মুর্শিদ-পথ প্রদর্শক পাওয়ার পর তাঁকে পলকে পলকে স্মরণে রাখতে পারলে সেখানে অর্জন কিছু থাকবেই। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে আমরা জানি, টেনশন, ইমোশন, সেন্টিমেন্ট, এক্সাইটমেন্ট-এই চারটি সময়ে মুর্শিদকে স্মরণে রাখতে পারলে অপার আনন্দ ও শান্তি লাভ করা যায়। তাই নিজের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ’ অর্জনে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্ম নিয়ে কথা বলার সুযোগের এক পর্যায়ে একদিন সূফী সাধক শেখ সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর পবিত্র মুখ থেকে শুনেছিলাম,-‘ধর্ম অর্থও নিয়ন্ত্রণ’। 

মমতাজ বেগম বলেন, নিয়ন্ত্রণ এমন এক ব্যাপার যা আমাদের জীবনচলার পথ সুন্দর ও সহজ করে। জীবনের প্রতিটি মূহুর্তেই চলছে নিয়ন্ত্রণের এক একটি খেলা। প্রকৃতিতে যা কিছু বিরাজমান তার সবই একটা নিয়মেই ঘটে থাকে। এক একটা নিয়মই নিয়ন্ত্রণ। যখনই নিয়ম বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে কিছু হয় তখনই অনিয়ম হয়। নিয়ন্ত্রণ একটা আপেক্ষিক ব্যাপার,পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।সকল প্রতিকূলতার মাঝে নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করা কঠিন। নিয়ন্ত্রণের সাধনা বা চর্চার জন্য প্রয়োজন কেন্দ্রবিন্দু যাকে কেন্দ্র করে জীবনে প্রতিটি মূহুর্ত নিয়ন্ত্রণে থাকা যায় তিনি হলেন গুরু, শ্রীগুরু, মহামানব। তিনি অন্যদের আহবান করেন নিয়ন্ত্রণে চলতে। সঠিকভাবে সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণে থাকলে অবশ্যই আসবে দৃঢ় সিদ্ধান্ত। দরবারে মহান সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফকে দেখেছি তিনি কী এক কঠিন নিয়ন্ত্রণে নিজেকে রেখেছিলেন এবং আমাদেরকে আহবান জানিয়েছিলেন। ওনি ওনার উদারতা, ভালোবাসায় সবাইকে যা দিয়ে গেছেন প্রত্যেকে প্রত্যেকের ভেতরে নিজ নিজ বোধে বিচার করে চললে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ আসবে। এটা যার যার ব্যাপার, একজনেরটা অন্য কারও পক্ষে করে দেয়া সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রণটা চলন্ত গাড়ির ড্রাইভিং’র মতো। নির্দিষ্ট গতি ঠিক রেখে আগাতে হবে। নিজে ঠিক থাকবো, অন্যদের ঠিক রাখার চেষ্টা করবো। যে-জীবনের চাহিদার শেষ নেই, সেখানে ‘নিয়ন্ত্রণ’ই ব্যালেন্স ঠিক রাখবে। এর জন্য অবশ্যই যার যার গুরুর স্মরণে থাকতে হবে।

সালেহ আল দ্বীন সঙ্গীত বলেন, মানুষকে সৃষ্টির সেরা বলা হয়। মানুষ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই সেরা হয়, শারীরিক কাঠামোর জন্য নয়। বনমানুষেরও হাত পা আছে। মানুষ আলাদা তার চিন্তা, আচার, ব্যবহার, সংস্কৃতি, সামাজিক এবং নৈতিক মূল্য ইত্যাদির জন্য। এতক্ষণ সেই বৈশিষ্টের উদাহরণ দিলাম তার মূল মন্ত্রের একটি হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা বিবর্তনের ধারায় এসেছি। প্রাথমিক পর্যায় সভ্যতার ছিটেফোটাও ছিল না। বর্বর জাতি হিসেবে ধরা হত। আমরা বিভিন্ন প্রাণীদের সাথে মিশে থাকতাম। বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ ইত্যাদি বন্য প্রাণীরা সাধারণ হিংসা এবং আক্রমনাত্মক হয়ে থাকে। ওদের এরকমই মানায়। সাধারণত জন্মগতভাবেই এটাই তাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য এবং তারা চরিত্র ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়ও না। আমরা মানুষেরাও এরকম। কতটুকুই বা আলাদা? আমরা কেনই বা এই চরিত্রগুলো ধারণ করলাম এবং এখনও বহন করে নিয়ে যাচ্ছি। এখানেই আমরা থেমে যাইনি, আগামীর সেই প্রজন্ম আসছে তাদের ভিতরেও এগুলো প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছি বিভিন্ন পদ্ধতিতে। কারণ আমরা নিয়ন্ত্রণহীন। আমরা সর্বক্ষণ চর্চা করেই চলেছি কিভাবে আরও নিয়ন্ত্রণহীন হওয়া যায়।

অন্যদিকে চিন্তা করলে দেখা যায়, কোন পশু বা পাখি নিজ জাতির কাউকে হত্যা করে না অথচ আমরা বুদ্ধি খাটিয়ে অন্যদের ক্ষতি করি,যা হাস্যকর। অন্য প্রাণীরা দল বেধে চলে, অন্যায় ভাবে কেউ আঘাত করলে এক হয়ে প্রতিবাদ করে। আর আমরা এমন একটু চিন্তা করলেই বেরিয়ে আসবে সত্য। বিভিন্ন পরিবেশের মধ্যে পড়ে আমাদের মুখোশ খসে পড়ে এবং বেরিয়ে আসে প্রকৃত রূপ।

কম্পিউটার তিনটা ধাপে কাজ করে। ইনপুট, প্রসেসিং, আউটপুট। একই নিয়মে মানুষও চলছে। এই তিনটি বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন। প্রথমে আসে ইনপুট, যা দেখছি, তাই চিন্তায় রাখছি কিনা এবং সঠিক প্রকাশ করছি কি না। আমি যেহেতু সত্য না সেক্ষেত্রে আমার চিন্তায় সত্যতা থাকবে কোথা থেকে? তাই প্রসেসিং এ নিয়ন্ত্রণ খুব জরুরি। যা দেখলাম তার সাথে নিজের চিন্তা না জুড়ে দেয়া উত্তম। কোনচিন্তা যখন একটা ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে তখন সঠিক এবং নির্ভুলভাবে বিষয়টি নিজের ভেতর প্রকাশ পাবে। এবার আসি আউটপুটে। কারও সময় কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যা দেখলাম ও চিন্তা করলাম কিছু সত্য ও মিথ্যা মিথ্যা মিশিয়ে বললাম। লাভের লাভ এই যে সত্য চাপা পড়ে গেল। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে গেল – যা শয়তানের কর্ম।

সাধক বলেন বর্তমানে থাকতে। বর্তমান শান্তির এবং নিয়ন্ত্রিত। অতীত এবং ভবিষ্যত অনিয়ন্ত্রিত। অতীতে আছে, হতাশা, দু:খ। ব্যর্থতার গ্লানী যা বর্তমান কে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে। অন্যদিকে ভবিষ্যত মানে অনিশ্চয়তা তার উৎকণ্ঠা।

সভাপতির বক্তৃতায় শাহ্ শাহনাজ সুলতানা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’-এই শব্দটি যেখানে থাকে, সেখানে ‘নিয়ন্ত্রক’ শব্দটি এসে যায়। নিয়ন্ত্রক মানে যিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব যে-রূপ সেটা স্বরূপ, যেটা ঋতু পরিবর্তনের মতো মূহুর্তে মূহুর্তে বদলায়। পবিত্র কুরআনের একটা আয়াত, ‘রূহ আমার প্রভুর আদেশ’। সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ এটা একাধিকবার আমাদের অনেকের সামনে বলেছেন, যে যার মতো বিষয়গুলো আমরা চিন্তা করেছি। আয়াত অনুসারে বলা যেতে পারে তাহলে মানুষের একজন প্রভু থাকতে হবে এবং সে প্রভুর একটা আদেশ থাকতে হবে এবং যার কাছে এটা আছে তিনি আদেশপ্রাপ্ত , তিনি রূহপ্রাপ্ত। এ বিষয়টা খুব সহজ বলে ভাবছি, আসলে কি সহজ?  তার কাছে প্রভু আছে কি-না এবং সেই প্রভুকে কিভাবে নিলাম সেই স্বরূপটাকে না-চেনা পর্যন্ত সেখানে কোনো নির্ভেজাল আনন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার প্রভু- সেটা আমার একটা নিজস্ব জগৎ। সেই প্রভুর আদেশ থেকে যে বিষয়গুলো আসছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেই আদেশ অনুযায়ী কর্ম করবে ততক্ষণ মানুষ তার  দৈনন্দিন কর্ম বিশ্লেণে প্রায়োরিটি শব্দ প্রয়োগ করা শিখতে থাকবে। তার জীবনে অপ্রয়োজনীয় কর্ম করার প্রতি আগ্রহ ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। কিছু বিষয় গৌণ হবে, কিছু বিষয় মুখ্য হবে। তিনি তখন নিয়ন্ত্রিত হয়ে  চলার চেষ্টা করেন। কর্ম আগ্রহ, আকর্ষণ মনোযোগ ইত্যাদি কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আদেশপ্রাপ্ত হয়ে চলার পথে নিয়ন্ত্রক হন একমাত্র তার প্রভু। ‘রূহ আমার প্রভুর আদেশ’-এই আয়াত আমি কীভাবে নিয়েছি সেটা জানতে হবে বা আমার কাছে কোন আদেশ আছে কিনা জানতে হবে।এমন জীবন কজন পায়? হাজার হাজার অযাচিত চিন্তার ভীড়ে মানুষ কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ মানুষ তার স্বরূপ নিয়ে গবেষণা করেনা। হাক্কানী চিন্তনপীঠে বার বার বলা হয়েছে -নিজের গবেষণাগারে পরীক্ষা করে তা লব্ধ করতে হয়। উপলব্ধির উপর সত্যমানুষগণ গুরুত্ব দিয়েছেন এ কারণে।