হাওয়া লাগছে সন্ত্রাসের আগাছায়!

পাঠ্যক্রম আর পাঠাভ্যাসের ফাঁক আছে। নিঃসন্দেহে পারিপার্শ্বিকে ধর্ম আর বেহায়া রাজনীতির নৈরাজ্য দেশের চিন্তাবিদদের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

সংলাপ ॥ বাংলার নানা প্রান্তে ইদানীং প্রায় ধর্ম আর হিংসার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে অসহিষ্ণুতার উদ্গীরণ ঘটছে। হুমকি আর হুঙ্কার ছুঁড়ছে ক্ষমতামত্তরা। এ সব ঘটনায় সমাজের আতঙ্ক ক্রমশ বাড়ছে। উদ্বিগ্ন সম্মিলিত বিবেক। বহু দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব গত কয়েক বছর জুড়ে ধর্ম আর হিংসার রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে, বহুমুখী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, গঠনহীন রাজনীতির বিভাজনপ্রীতির বিরুদ্ধে লাগাতার বলে যাচ্ছেন, এই পথ বাংলাদেশের নয়। বিভ্রান্তি আমাদের সামাজিকতাকে ঘেরাও করছে। অবিলম্বে ঘৃণাকে প্রতিহত করা জরুরি। স্বাস্থ্যময় মতভেদ আর বহুত্বের সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যার সুরাহা খুঁজতে হবে।

দেশের রাজনীতিকরা ‘নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ’র চেহারাকে, তাদের উদাসীনতাকে, নিষ্ক্রিয় স্বভাবকে প্রশ্নহীন চিত্তে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। জনগণ নীরব, প্রতিবাদহীন, প্রতিরোধহীন মানসিকতার জন্য আজ অবরুদ্ধ বিকার বাইরে বেরিয়ে এসে হুমকি দিচ্ছে।  এখানে ওখানে মেতে উঠছে তান্ডব নৃত্যে। এখন জাতপাত আর ধর্মের বাছবিচার প্রকট হয়ে উঠছে। এ সব ঠেকাতে হলে অঙ্ক ও ইংরেজি-সহ বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি ছাত্রদের মানবাধিকার ও সমানাধিকার শেখানো প্রয়োজন। নিশ্চয় আমাদের পাঠ্যক্রম আর পাঠাভ্যাসের ফাঁক আছে। নিঃসন্দেহে পারিপার্শ্বিকে ধর্ম আর বেহায়া রাজনীতির নৈরাজ্য দেশের চিন্তাবিদদের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ইতিহাসকে সামনে আনলে দেখা যায়, বাঙালি সংস্কৃতিতে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান ছাড়া অন্য কোন ধরনের শ্লোগানের কোনও জায়গা ছিল না। এর পর বহু শ্লোগান উঠেছে বাংলাদেশে যার সঙ্গে বাঙালির কোনও যোগ নেই। আজ যখন শুনি বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের মানুষকে ভীত, শঙ্কিত হয়ে রাস্তায় বের হতে হচ্ছে, তখন গর্বের ঢাকা শহরকে চিনতে পারা খুব কষ্টকর হয়ে ওঠে। এক সময় বাংলাদেশে এক এক রকমের আরবীয় সংস্কৃতি নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল রাজনীতিকরা বিভেদের বাতাবরণ তৈরি করতে কিন্তু সফল হয়নি। আবার একই উদ্দেশ্যে ওই সংস্কৃতি আমদানির প্রয়াস চলছে যার সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধের কোন সংযোগ নেই, যা এক বিপজ্জনক প্রবণতা।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সহনশীল শান্তি ধর্ম আর বাঙালি সংস্কৃতিকে বিকৃত করার যে ঝোঁক প্রবল হয়ে উঠছে, যেভাবে হিংসার রাজনীতি, দুরাচারকে আমল দেওয়া হচ্ছে, তাতে বহুমাত্রিক সমাজদ্রষ্টাদের উদ্বেগ ও আশঙ্কা স্বাভাবিক। একপাশের অসভ্যতা, অন্য পাশের স্তিমিত, সঙ্কোচিত অসভ্যতাকে জ্বালানি জোগায়। আজ যারা হুজুগ জাগাতে ব্যস্ত, কাল তাদের দিকেই বুমেরাং হয়ে ছুটতে পারে রক্তখেকো অস্ত্রের আরেক পিঠ। হাওয়া লাগছে সন্ত্রাসের আগাছায়। তাদের নির্বীজ আর নির্বিষ করতে ব্যর্থ হলে, ভয়ঙ্কর বিপদ গ্রাস করবে ধর্মের নির্বিশেষের সত্যকে। স্ফুলিঙ্গ থেকে, বিচ্ছিন্ন অগ্নিকান্ড থেকে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে। এক্ষুণি আগুন নেভানোর জবরদস্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। না হলে গ্রাম পুড়বে। শহর পুড়বে। পুড়ে ভস্ম হয়ে যেতে পারে গণতন্ত্রের মন্ত্রায়িত অভিমুখ।

এখন পর্যন্ত দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোর যে মুখচ্ছবি দেখাচ্ছে, সেটাই বা কী! বিরোধীরা সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করবে, জনস্বার্থে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তৈরি করবে, তার মাধ্যমে জনমত সংগঠিত করার চেষ্টা করবে। এমনকি সংঘাতও হবে। এগুলি স্বাভাবিক। এর ফল পাওয়াও সাধারণত সময়সাপেক্ষ। বিরোধী রাজনীতি এ ভাবেই পরিপুষ্ট হয়। এতেই ভোট আসে। রাতারাতি ‘সরকার ফেলব’ বলে লাফালেই সরকার পড়ে না। অন্তত সোজা পথে সেটা করা বেশ কঠিন। যদিও বিরোধীদের কার্যকলাপে মনে হচ্ছে, তারা বোধ হয় সোজা পথের ধাঁধায় না গিয়ে বাঁকা পথে চলতেই বেশি আগ্রহী!

দেশের স্বার্থে কথা বলার ক্ষেত্রে কোনও নাগরিকের ভয় পাওয়া উচিত নয়। রাজনীতিকদের ভুল-ত্রুটিগুলি নিয়ে আলোচনা না করলে পরিস্থিতি বদলাবে কী করে? বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। যদি কোনও কিছুর, মূলত সরকারের সমালোচনা করেন, তাহলে তখনই আপনাকে দেশবিরোধী বানিয়ে দেওয়া হবে, এমন ভয় পাওয়া উচিত নয়। কিছু বলার জন্য কারোর প্রশংসাপত্রের দরকার নেই।