সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকরে প্রয়োগ আর অপপ্রয়োগের চ্যালেঞ্জ!

সময়ের সাফকথা….

সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ কার্যকরে

প্রয়োগ আর অপপ্রয়োগের চ্যালেঞ্জ!

সংলাপ ॥ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে কার্যকর হলো বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮। গত ১ নভেম্বর হতে কার্যকর হলো আইনটি। গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের ঢাকা সেনানিবাস সংলগ্ন জিয়াকলোনী এলাকায় বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ঘটনার বিচারের দাবিতে সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ।একটি সফল ও যুগান্তকারী আন্দোলনের মুখে একই বছরের ৫ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায় আট বছর ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইন। গত সেপ্টেম্বরে সংসদে পাসের পর ৮ অক্টোবর তা গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। এর এক বছর পর গত  ১ নভেম্বর’২০১৯ হতে কার্যকর হলো আইনটি যদিও সড়কের বাস্তব চেহারা এখনও আগের মতোই।

এ আইন ভঙ্গ করার অপরাধে বিভিন্ন ধারায় সাজা বাড়ছে কয়েকগুণ। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিধিমালা প্রণয়ন এবং প্রস্তুতি ও প্রচার ছাড়াই আইনটি কার্যকর হওয়ায় এ সেক্টরে দেখা দিতে পারে বিশৃঙ্খলা। এই আইন বাস্তবায়নেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে সংশ্লিষ্টদের। জেল-জরিমানা বেড়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে পারেন মালিক, চালক যার শেষ ভোগান্তির শিকার হবে  যাত্রী তথা সাধারণ মানুষেরা। আইনটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো উচিত ছিল বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি একটি বহুল আলোচিত আইন। ২০১০ সাল থেকে এ নিয়ে কথা চলছে। দফায় দফায় মিটিং মিছিল করে সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে আইন প্রণয়নের পূর্বে।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আইন কার্যকর হওয়ার পর এর ফলাফল তথা আইনের প্রায়োগিক বাস্তবতা জনস্বার্থে কতটা কাজে লাগছে, তা বোঝা যাবে। তবে এই আইনে অনেক কিছুই রয়েছে, যার বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি প্রাক্তন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ‘চালক বা শ্রমিককে সাজা বা ফাঁসি দিলে দুর্ঘটনা বন্ধ হবে, এমন অলীক কল্পনা যারা করেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।’ তিনি সড়ক পরিবহন আইনের সব মামলা জামিনযোগ্য করার দাবি জানান। উল্লেখ্য, এ আইনে সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চলাচলের কারণে কারও মৃত্যু হলে চালককে পাঁচ বছর কারাদন্ড ভোগ করতে হবে। দিতে হবে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা প্রমাণ হলে ৩০২ ধারায় মামলা করা যাবে।

পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রচার ছাড়াই আইন কার্যকরের অভিযোগ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান ড. মো. কামরুল আহসান বলেন, ‘এ আইনের উদ্দেশ্য ঢালাও সাজা দেওয়া নয়, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম দিকে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে তা ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নতুন আইন কার্যকরের মাধ্যমে রহিত হয়ে যাচ্ছে মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩। নতুন আইনে সড়কে নিয়ম ভঙ্গে সাজা বেড়েছে কয়েকগুণ। অধ্যাদেশে বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। নতুন আইনে সর্বোচ্চ জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা এবং ছয় মাসের কারাদন্ড। ভুয়া লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনে গাড়ি চালানোর সাজা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা বা দুই বছর জেল অথবা উভয় দন্ড। অধ্যাদেশে রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি চালানোর সাজা ছিল সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানা ও তিন মাস কারাদন্ড। ফিটনেসবিহীন গাড়ির ক্ষেত্রে একই পরিমাণ সাজা ভোগ করতে হতো। নতুন আইনে রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ছয় মাস জেলের বিধান রয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর সাজা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা।

একটি বিষয় গভীর চিন্তার উদ্রেক করে আর তা হলো- আইনের অধিকাংশ ধারায় সর্বোচ্চ সাজার কথা বলা থাকলে সর্বনিম্ন সাজার কোন উল্লেখ নেই। বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. ইউছুব আলী মোল্লা বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা পরিস্থিতি ও অপরাধ বিবেচনা করে জরিমানা নির্ধারণ করবেন। তবে তা সর্বোচ্চ নির্ধারিত জরিমানার চেয়ে বেশি হবে না। বিধিমালায় এসব বিস্তারিত থাকবে।

সড়ক পরিবহন আইন তফসিলভুক্ত করতে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। আইনটি কার্যকর হলেও এখনও বিধিমালা হয়নি। এভাবে আইন কার্যকর করায় প্রশ্ন তুলেছেন শাজাহান খান। গত বৃহস্পতিবার তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকার আইনটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। প্রশ্ন হলো, বিধিমালা প্রণয়ন ছাড়াই আইন প্রয়োগে জটিলতার অবসান হবে কীভাবে?’

বিআরটিএর পরিচালক এবং বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য মাহবুব-ই রাব্বানী বলেন, ‘যতদিন বিধিমালা না হবে, ততদিন মোটরযান বিধি-১৯৮৪ কার্যকর থাকবে।’ কবে বিধিমালা প্রণয়ন শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে তিনি বলেননি। আইনে বর্ধিত জেল-জরিমানা প্রসঙ্গে বলেন, সব আইনেই সর্বোচ্চ জরিমানা ও শাস্তির কথা বলা থাকে। বিচারক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্নেষণ করে সর্বোচ্চ বা তার চেয়ে কম সাজা দেন। বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালালে ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও, এর চেয়ে কম জরিমানাও করা যাবে।

গত বছর পাস হলেও আইনটি শিথিলে ‘সংশোধনী প্রস্তাব’ দিয়েছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বাধাতেই গত আট বছর এ আইন করা যায়নি। এ প্রসঙ্গে শাজাহান খান বলেন, শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যাবে না। শৃঙ্খলা আনতে তার নেতৃত্বাধীন কমিটির ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।

নতুন আইনে-

১) ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গে জরিমানা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

২) উল্টোপথে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

৩) হেলমেট না থাকলে এখন জরিমানা ২০০ টাকা। নতুন আইনে জরিমানা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা।

৪) গাড়ি চালানোর সময় সিল্টবেল্ট না বাঁধলে, মোবাইলে কথা বললে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

৫) বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে তিন লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে চালককে। তিন বছর পর্যন্ত জেলও হতে পারে।

৬) নতুন আইনে চালকদের লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হবে। চালকের সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে।

৭) ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। সড়কে আইন ভঙ্গে জেল-জরিমানা ছাড়াও লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা যাবে। পুরো ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হবে।

৮) চালক ও তার সহকারীকে নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

৯) গাড়িতে অতিরিক্ত পণ্য বহন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছর কারাদন্ড ভোগ করতে হবে মালিককে। তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী লোডিং পয়েন্টে ওভারলোড পরীক্ষা করতে হবে।

১০) আইনের ৮৪ ধারায় গাড়ির আকৃতি পরিবর্তনে তিন বছর কারাদন্ড বা এক থেকে তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

১১) ৮৪ ধারা ছাড়াও বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে আহত করা (৯৮ ধারা), সড়কে মৃত্যুর (১০৫ ধারা) মামলা জামিন অযোগ্য করা হয়েছে এ আইনে। তবে সব ধারার মামলা জামিনযোগ্য করার দাবি জানিয়েছেন শাজাহান খান।

এ দিকে এ আইন সম্পর্কে সচেতনতা অভিযান চালাতে মাঠে নামছে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বাধীন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইন করে সব ঠিক করা যাবে না। সচেতনতা আর দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে না পারলে আইনের প্রয়োগ আর আরেক পক্ষে অপপ্রয়োগ বাড়বেই। বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি পরিবহন সেক্টরের সকল শ্রেনীর মানুষের আস্থার জায়গাটি এখনো পর্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক নয়। পারস্পরিক আস্থা এবং সততার জায়গাটি সৃষ্টি করতে না পারলে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, অরাজকতা তৈরী হবে যা সহজেই অনুমেয়। সরকার এ বিষয়ে নিজেদের সংস্থার প্রতি সজাগ থাকলে বাকিটা আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সেনানিবাসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনের এবং আইনের প্রয়োগের যে বাস্তব উদাহরণ রয়েছে তা হতে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে পারে। শুধু শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা সকল পক্ষের জন্যই জরুরী।