স্বাস্থ্যবিধি মেনে ‘জ্যোতিভবন’-এ হাক্কানী চিন্তন বৈঠকের প্রথম দিনের আলোচনায় বক্তারা

নিজের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ’ অর্জনেই শান্তি

সংলাপ ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) আয়োজিত সাপ্তাহিক নিয়মিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠক আবারও শুরু হয়েছে। পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে গত ১৫ ভাদ্র ১৪২৭, ৩০ আগষ্ট ২০২০ শনিবার রাজধানীর মিরপুর আস্তানা শরীফের জ্যোতিভবনে আবু আলী আক্তারউদ্দীন মিলনায়তনে প্রথম দিনের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাহাখাশ সহ-সভাপতি শাহ্ আশরিফা সুলতানা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা, যুগ্ম-সচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহিদ এবং সাংগঠনিক সচিব দেলোয়ার হোসেন পিন্টু। নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, অন্যকে নয়, নিজের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ’ অর্জনের মধ্যেই মানবজীবনে শান্তি নিহিত।  

বাহাখাশ মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা তার বক্তব্যে ‘স্বীয় জিহ্বা শাসনে রেখো, পলকে পলকে মুর্শিদ দেখো’-মহান সাধকের এই বাণী স্মরণ করে বলেন, যে ব্যক্তি নিজেকে যতই চিনবে, সে ততই তার আল্লাহকে চিনতে পারবে। সবার সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। নিজ নিজ চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মহান সাধক বলেছেন, ‘তুমি তোমার প্রতিটি কর্ম যত বিশ্লেষণ করবে, ততই তুমি সঠিক পথের সন্ধ্যান পাবে’। নিয়ন্ত্রণের প্রধান কথাটিই হচ্ছে, ধৈর্য্য ধারণ করা। আবার লোভ আছে যার তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। তবে একজন ব্যক্তির সব কিছুই প্রকাশ পায় তার কর্মের মধ্য দিয়ে। নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই কেবল ব্যক্তির আত্মিক উন্নতি হবে। 

বাহাখাশ যুগ্ম-সচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কোনো কিছুকে নিজের অধীনে পরিচালনা করা। কোনো কিছু পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যক্তি যখন তার ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু নিয়ম-কানুন মেনে কর্ম সম্পাদন করতে পারেন তখন তার নিয়ন্ত্রণক্ষমতা প্রকাশ পায়। বিশ্ব শাসনসহ সকল পরিচালন ব্যবস্থায় মানুষ তার প্রয়োজনে রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারকে লিখিত বা অলিখিতভাবে নিয়ন্ত্রণ বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে থাকে।

ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি হচ্ছে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার চিন্তা-চেতনা, লোভ-ক্রোধ, কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে তার বিপদগামী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তার দ্বারা তখন অশান্তি ও অশান্ত পরিবেশ তৈরি হয়।

মানুষ তার কর্মপ্রচেষ্টা সাধনা দ্বারা অপার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘সবার ওপরে সত্যমানুষ, তার ওপরে নাই।’ একজন সত্যমানুষই নিজ ক্ষমতাবলে সকল কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি বস্তুগত-অবস্তুগত, জীব ও জড়জগতের হতে পারে। এখানে সাধারণ মানুষ কিছু কিছু বিষয় অনুভব করতে পারে, আবার কিছু কিছু বিষয় পারে না। বিজ্ঞানে অগ্রগতি ও ‘সত্যমানুষ’এর সত্য দর্শনের ফলে মহাজগতের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি চলে আসে। কে কাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে? বিজ্ঞান তার নিজস্ব পদ্ধতির অনুসরণ করে তার গবেষণা থেকে নতুন নতুন তথ্য ও অগ্রগতি লাভ করে। এই বিশ্বে মহাজাগতিক বিষয়ে সম্যক জ্ঞান অর্জনে তাই সাধককূল নিজ দেহকে অবলম্বন করে কর্ম ও সাধনা-আত্মদর্শন ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নিজের চিন্তা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

আমরা যারা অজানাকে জানার প্রচেষ্টারত যাত্রী, তারাই শুধু অগ্রগামীর পথকে অনুসরণ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে সত্যপথকে পরম শান্তির জন্য ‘অসীম’এর উদ্দেশ্যে মিলিত হতে চাই। তাই সুফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘ভোগের আনন্দ সাময়িক, ত্যাগের আনন্দ চিরন্তন।’ ভোগে সাময়িক আত্মতুষ্টি অনুূভূত হলেও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য ত্যাগই উত্তম। পার্থিব ক্ষেত্রেও বেঁচে থাকা ও কর্মক্ষমতা অর্জনের জন্য ভোগের প্রয়োজন আছে কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় না করলে বিভিন্ন রোগ-শোক ও অশান্তি ভোগ করতে হয়-এটাই প্রকৃত সত্য।

বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর ভক্ত-আশেকানগণকে নিজের মুখের কথা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণে বা শাসনে রাখতে বলেন। তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরী হাক্কানী বরপুত্র সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘পাশাপাশি চলো, বন্ধু হতে পারো’-এই বাণীতে সাধকের আধুনিক সূফী দর্শনের সংস্কারকৃত অগ্রগতিই প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ, পাশাপাশি চলার ভেতরও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ পরিলক্ষিত হয়। আগে ও পেছনে চললে নিয়ন্ত্রণে থাকবো না, পথ হারাতে পারি-বিশ্বাস নাও করতে পারি। সাধক তাঁর উপলব্ধি ও চৈতন্যশীল অবস্থান থেকে মানুষের মর্যাদা সমুন্নত রেখে হাক্কানী চিন্তনপীঠকে তাঁর বাণী দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন।

নিয়ন্ত্রণ বলতে শোষণ-নিপীড়ণ করা হয়, প্রেমের বন্ধনে একে অপরের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত হওয়াকেই বোঝায়। প্রত্যেকের স্ব স্ব অবস্থানের সর্বোত্তম কর্ম ও ধর্ম পালন করা। সত্যের সাথে একাত্ম হওয়ার প্রচেষ্টারত থাকা।

দেলোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে আমি প্রথমে সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন শাহ্ কলন্দর’এঁর একটি বাণী-‘জ্ঞান অর্জনে বই-কিতাব হতে মানুষ-কিতাব উত্তম’-স্মরণ করতে চাই। আমাদের, চিন্তা-চেতনা সব সময় যেহেতু বর্হিমুখী, আমরা সব সময় অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি। কে কী করলো, কার সাথে কী হলো-আমি সেখানে গিয়ে কী করলাম ইত্যাদি। এমন কি আমরা যা শিখি তাও হলো অন্যের। অথচ বই-কিতাবের মধ্যে যা আছে তা অন্যের উপলব্ধি। যিনি কিতাব রচনা করলেন তাকে আমার জীবনে কখনও উপলব্ধি করেছি কি-না, ওই কিতাবের কোনো মর্মকথা নিজের উপলব্ধিতে এসেছে কি-না ভেবে দেখি না। এভাবে চলতে চলতে নিজের অজান্তেই কিতাবের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। আমার নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে উঠে কিতাব, আমি বই-কিতাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ি।

 নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বলতে গেলে নিজের সংসার জীবন থেকে শুরু করতে হয়। প্রতিটি সংসারে একজন অভিভাবক থাকেন। তিনি বাবা অথবা মা। তিনিই সংসারের নিয়ন্ত্রক। কিন্তু আমার জীবনে নিয়ন্ত্র্রণকারী একজন কি না, না কি অনেকজন। দরবারে এসে চিন্তায় ধরা পড়ে আমার প্রতিটি কর্মের মাঝে একজন কি না। প্রথমে বলবো, আমার প্রতিটি কর্মের মাঝে বহুজন, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। এই বহুজন থেকে এক-এ কীভাবে আসবো? কে আমাকে এই পথ দেখাবে? দরবারে আসার পর এই প্রশ্নটা নিজের উপলব্ধিতে ধরা পড়ে। জীবনে পথ চলতে চলতে কোনো প্রকৃত মানুষ পেয়েছি কি-না যাকে দেখার পর তাঁর প্রতি ভালো লাগা, ভালোবাসার জন্ম হয়। তাঁকে নিজের চিন্তায় দেখতে গিয়ে তাঁর প্রতি ব্যাকুলতা সৃষ্টি হয়েছে, যাঁকে দেখে জীবন গঠন করা যায়। তেমনই এক মহাপ্রাণ সত্যমানুষ ‘সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ’-আমার দেখা জীবনে প্রকৃত মানুষ যাঁকে দেখার পর শুধুই কাছে টানে। এই সত্যমানুষকে আমার নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে নিয়েছি কি? আমি তাঁর কর্মে কর্মী, তাঁর চিন্তায় বিভোর থাকি, তাঁর দুঃখে দুঃখি থাকি। আমার প্রতিটি কর্মের মধ্যে তাঁকে স্মরণ করি কি না-এসবের মধ্যে থাকলে ধরে নিতে পারি যে, তিনি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। অন্যথায় আমি অনিয়ন্ত্রিত, দরবারের ভাষায় দ্বিচারিতা করি। এভাবে আমি সব সময় দ্বিচারিতার মধ্যে আছি। অর্থাৎ, আমি ‘এক’এর মধ্যে নেই।

এভাবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে আমার নিজস্ব উপলব্ধি ব্যক্ত করবো এই এই বলে যে, ‘নিজের মধ্যে আমার (আপন) প্রভুকে প্রতিষ্ঠিত করাই হলো নিয়ন্ত্রণ।’  

সভাপতির বক্তৃতায় শাহ আশরিফা সুলতানা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটা নিয়ে আমরা বাস্তবজীবনে খুব কমই চিন্তা করি। শুধু দুটো ক্ষেত্রে- যেমন আমরা বলে থাকি যে, চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে গাড়িটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এছাড়া ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’এর কথাটা অনেক সময় বলা হয়। কিন্তু নিজের জীবনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে আমরা ভাবি না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে আমরা সব সময় অন্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাই। জীবনের ছোট-বড় সকল ক্ষেত্রেই অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা প্রবণতা আমাদের আছে বলেই সমাজে তৈরি হয় অশান্তি। কিন্তু হাক্কানী চিন্তনপীঠে নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে নিজেকে। ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটার গুরুত্ব এত বেশি যে, আমাদের তিনজন সাধকই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে গেছেন তাদের বাণীর মাধ্যমে। তাঁদের বাণীগুলোর প্রায় সবগুলোতেই নিজেকে দেখার জন্য বলা হয়েছে। অন্যকে শাসন করা নয়, নিজেকে শাসন করা, নিজের বিচার নিজে করার ওপরই তাঁরা সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। নিজেকে চিনতে হলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জনের চাইতে বড় গুণ আর হতে পারে না।