স্বাগত ২০২০ বাঙালির জয়রথে গতির সঞ্চার হোক

নজরুল ইশতিয়াক ॥ নতুন বছরে দেশ নিয়ে প্রত্যাশা বাড়বেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পরিবর্তন যাত্রার সূচনা হয়েছে তার যৌক্তিক ধারা অব্যাহত থাকবে এই প্রত্যাশা দেশের মানুষের। দিন বদলের সময় এসেছে। সময়টা কাজে লাগাতে হবে। নিজেদেরকে শুদ্ধ করার শিক্ষাই হলো সময়ের শিক্ষা। 

রাজনীতির নামে প্রকারান্তরে প্রতারণার যে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, বারবার বাংলা-বাঙালির অস্তিত্বের উপর আঘাত হানা হয়েছে, বোধ-বিবেক রুদ্ধ করা হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে বাংলার পথ প্রান্তর, সেসব তৎপরতার কফিনে পেরেক ঠুকে দিতে হবে। ধর্মের নামে, দারিদ্র বিমোচনের নামে যা যা হয়েছে তার বিপরীতে কল্যাণ যাত্রা, শুদ্ধি যাত্রার পাল্লা ভারি করতে হবে দিনে দিনে। সমাজে-মানুষের দৌঁড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে সৌরভ সৌন্দর্যের শুভবারতা। স্বপ্ন জাগানিয়া সব চিন্তা বাস্তবে রূপলাভ করবে এটাই তো সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। অজ্ঞতা-অন্ধত্ব -বর্বরতার বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী জাগরণ ঘটানোর কাজটি করতে হবে সব শ্রেণী পেশার দেশপ্রেমিক মানুষদের সম্মিলনে। সাহস করে সত্য কথা বলার পরিবেশ তৈরীতে কাজ করতেই হবে, বোধ বুদ্ধিহীন দেশ জাতি বিরোধী অযৌক্তিক ওয়াজ নসিহতের প্রতিটি মাইক বন্ধ করে দিতে হবে। বিশেষ করে নারীর কর্মক্ষেত্রকে আরো বিস্তৃত করতে হবে। উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের দিকে বাড়তি নজর দেয়ার সময় এখন।

নতুন বছরে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তর- প্রতিষ্ঠানের কাছে। শিক্ষার নামে কোন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে গভীরভাবে। শিক্ষা বাণিজ্য, ঈমানের নামে শিক্ষা নৈরাজ্য থামাতে গভীর পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় বরাদ্দ দিতে হবে।

কেবল তিন বেলা ঠিক মত ভাত না জোটার কারণে হাজার হাজার এতিম অসহায় ছেলে মেয়েরা মাদ্রাসায় পড়তে বাধ্য হয়। কওমী মাদ্রাসাগুলোর মানুষ ঠকানো শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে কিভাবে সঠিক ধারায় আনা যায় তা ভেবে দেখার অনুরোধ থাকবে দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদদের কাছে। বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে গণশুনানীর মাধ্যমে পরিকল্পনা নিতে হবে।

ডিজিটাল সুবিধাগুলো পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সব পর্যায়ের অতি মুনাফাখোরদের দৌরাত্ম থামাতেই হবে।

সর্বোপরি পারস্পারিক দায়বোধের ভিত্তিত্বেই রাজনীতি কিংবা সরকার পরিচালিত হবে। সরকার গৃহীত জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে যেমন উচ্ছসিত প্রশংসা করতে হবে আমাদেরকে তেমনি লোক দেখানো হঠকারী যে কোন বিষয়ে জনগণের দেয়া মতামতকে স্বাগত জানানোর উদারতা দেখাতে হবে। জনগণের প্রতি রাজনীতিকদের দায় এবং জনগণের পক্ষ থেকে সমর্থনের মধ্য দিয়েই পারস্পারিক এই পথ চলা। পরিস্কার ভাবে পক্ষ দুটি। যেমন একজন স্বাভাবিক মানুষের দুটি হাত-পা, দুটি চোখ-কান তেমনি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও একই সত্য।

অনেকেই বলেন, দেশে এক দলীয় শাসন চলছে। রাজপথে কিংবা সংসদে দৃশ্যত কোন দলের অস্তিত্ব নেই। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই কার্যত রাজনীতির মাঠে প্রবল শক্তি নিয়ে দাঁিড়য়ে আছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। তবু আওয়ামীলীগকে মনে রাখতে হবে অনেক বড় গাছও ভিতরে ভিতরে অসার গুড়ায় পরিণত হয়। ঘুণ ধরলে শক্ত কাঠও ধসে পড়ে।  চরম বিভ্রান্তিকর আত্মঘাতি রাজনীতি করার কারণে যেসব দল আজও জনগণ দ্বারা প্রত্যাখাত তারা আত্মকর্ম বিশ্লেষণ না করে কেবল বাকোয়াজী করলে আখেরে কোন সুফল পায় না। রাজনীতিকে জননীতিতে রূপান্তরিত করতেই হবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। উপলব্ধির এখনই সময়। সময় বুঝে বাধাল বাধতে হয়। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের মূল নেতৃত্ব হয়তো সত্য কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করার চেষ্টা করছে। তাদের গ্রহীত এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কতটা চলে সেটা দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি। ফলে রাজনীতির মাঠে আপাত শক্তিশালী আওয়ামীলীগ যদি সময় বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করতে পারে  পারে তবে জনগণই তাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত জনগণই দেশের মালিক হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।

নতুন বছরে পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আরো চুলচেরা মূল্যায়ণ করতে হবে। দেশে অবকাঠামো গত উন্নয়ন দৃশ্যমান, দেশপ্রেমের শিক্ষায় পুরো জাতিকে উজ্জীবিত করার সময় এখন। শান্তিপ্রিয় বাঙালি শান্তির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে সব সময় প্রস্তুত। প্রস্তুত থাকে বলে শেষ পর্যন্ত কোন ঘাতক টিকে থাকে না। তার প্রমাণ ৫২-৬২-৬৯-৭১-৯০ সনগুলো। সব সময় অকাতরে সাধারণ বাঙালিরা রুখে দাড়িয়েছে। কেন রুখে দাঁড়ায় এই সত্য দেশ পরিচালনার সাথে যুক্ত নেতাদের বুঝতে হবে। যতটুক ঘূণ ধরেছে তার বেশীটাই শিক্ষিত ক্ষমতাধরদের কারণে। সাধারণ বাঙালি সব সময় এসব আবর্জনা পঙ্কিলতার উর্দ্ধে। যে গাছে ফুল ফোটে, ফল ধরে সে গাছেরও পাতা ঝরার সময় আসে। পুরাতন পাতা ঝরে গজায় নতুন কচি পাতা। গাছ যত সহজে নিজেকে নতুন করে নেয় আগামীর জন্য, মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। আর নয় বলেই বহু আক্ষেপ সত্বেও আজও বাঙালির এগিয়ে চলার গতি আশাবাদ জাগায়। আমরা তো জয় করেছি, পরেছি বিজয় মাল্য। সেটা ধরে রাখতে হবে প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণে। বহু দূর দেখার আগে দেখতে হবে কাছে, নিকটে নিজের বাড়ির কাছে। বাঙালির জয়রথে গতি সঞ্চার হোক এই প্রত্যাশা এই ইংরেজি নববর্ষে। আমরা আমাদের বাঙালিপনার আদলেই সাজাবো নতুন বছরকে। স্বাগত টুয়েন্টি টুয়েন্টি। 

গোটা বিশ্ব যেমন একটি সমাজ তেমনি তার শত সহস্র শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে আছে পৃথিবী নামক এই বৃক্ষাঞ্চলে। নানা রূপে, নানা মাত্রায়, নানান বৈশিষ্ট্যে। চোখ মেলে যার দেখার ক্ষমতা আছে সে দেখে, সে জানে কত বিপুল ঐশ্বর্যময় এই জগত সংসার। এই যে মানবজীবন তা তো দেখবার, মেলাবার, মেলবার জন্য। দেখার চোখ তৈরী না হলে দেখা হয়ে উঠে না। জীবন সমৃদ্ধ হয় না, শান্ত-স্থির গতিশীল হয় না। পরমভাবে পাওয়া যায় না জীবনকে।

বাঙালি জীবন প্রবাহে কত মাত্রা তা অনুসন্ধানী মাত্রই জানেন। আর্থ-সামাজিক প্রবাহের ভাঁজে ভাঁজে যেমন বেঁচে থাকা সহায়ক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে আবার পারস্পারিক দ্বন্ধ বৈরীতাও আছে। সংঘাত সংকটের বিপরীতে শুভযোগ শুভবারতা। দু’য়ে মিলেই আবর্তিত হচ্ছে আমাদের এগিয়ে চলার স্বপ্ন-সম্ভাবনা। সার্বিকভাবেই অভাব দারিদ্র কমেছে। সচেতন হয়ে উঠার নানান সুযোগ-সুবিধা দৌঁড়গোড়ায়। পোশাকে, পুষ্টিতে আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আমরা। বিদ্যুৎ ও  যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে বাংলাদেশ। গভীর আলোচনায় না যেয়েও বলা যাচ্ছে- ‘এগিয়ে যাচ্ছি আমরা শুভ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে।’

বাস্তবতার নিরিখেই রাজনীতিতে নেতৃত্ব সৃষ্টির একটা নব উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। আড়মোড়া ভেঙে এমন কান্ড হয়তো সহসাই মেনে নিতে পারছেন না খোদ রাজনীতিক নেতা কর্মীরাই। মোটা কাপড়, মোটা চালের কথা শুনতে অভ্যস্ত নয় অনেকে। চরিত্র যে বেশ খানিকটা হননের রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বপ্ন দেখাচ্ছেন দেশরত্ন  শেখ হাসিনা। পিতার মতোই দুর্বার এক অভিযাত্রা তিনি শুরু করেছেন অনেকটা স্রোতের প্রতিকূলেই। এ এক বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদর্শীতাকেই তুলে ধরে। ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি বাংলা বাঙালির ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পথে আহবান জানাচ্ছেন। জাতিস্বত্ত্বার সাথে যোগস্থাপন ব্যতিরেকে যে কোন জাতি এগুতে পারে না এই শিক্ষা দিচ্ছেন। এটিই আমাদের জন্য বিরাট প্রাপ্তি।

যৌক্তিক সুযোগ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণমূলক জনসমাজ সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তো কেবল ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার বিচার সম্ভব। ধর্ম আর দারিদ্রকে পুঁজি করে মিথ্যাচারের রাজনীতির বিপরীতে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপ দলীয় কর্মীদের যোগ্য দক্ষ করে গড়ে তোলার অভিপ্রায় থেকে উৎসরিত। 

শুদ্ধি অভিযান অপেক্ষা দলীয় নেতা-কর্মীর আত্মশুদ্ধিই যে এই সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটা তিনি ভালো করেই জানেন। একজন মহান দেশনেতা হিসেবে তার যে এই উপলব্ধি এটি বাঙালিকে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তবু বলবো- কারো কথায় বলায় কারো আত্মশুদ্ধি হয়ে যাবে না। দেশতো কেবল বাইরে নয়, প্রতিটি আত্মশুদ্ধির এই যাত্রা শুরু হতে পারে আত্ম-উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। দেশ মানে দিশা, দিশা থেকে দিশারী দশা কিংবা দশ কিংবা মৈত্রী একতা।

দলীয় কর্মীরা না হোক, যারা নেতা তাদেরকে সবার আগে নিজের দেশটিকে আবিস্কার করতে হবে। সেখানেই দেখা মিলবে কেন আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন।

মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করার চিরসুন্দর আবেদনের মধ্য দিয়ে আশা জাগানিয়া এক মাহেন্দ্রক্ষণ উপনিত আমাদের সামনে। আগামী বছর ২০২০ সাল বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ। এটিকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাপক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। ২০২১ সাল স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালিত হবে। এই দুটি বিশেষ বছর আমাদের জাতীয় জীবনে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে। তরুণ প্রজন্ম যেমন জানতে পারবে ইতিহাসের সত্য, তেমনি দায় বাড়বে বয়স্কদের। প্রস্ফুটিত ফুল হয়ে উঠার মধুক্ষণ আমাদের সকলের সামনে….