সৃষ্টিশীলতা ও অন্ধত্বের সংঘাতে আলো আসবেই

হাসান জামান টিপু  ।। প্রকৃতিতে নিরন্তর সঙ্গীত বেজেই চলছে। কত রকমের সঙ্গীত যে বাতাস বাজিয়ে চলছে তা শোনার জন্য কান নয়- পবিত্র  হৃদয়তন্ত্রীর অধিকারী হতে হয়। বাতাসে কান পাতলে অনেকেই শুনবে না সেই সঙ্গীত। শুধু বাতাস কেন বৃষ্টির গান, সমুদ্রের নিরন্তর গর্জন, পাখির কলকাকলী, নদীর স্রোতের গান, নৌকা ও পানির ঐক্যতান, ধানক্ষেতে এলোমেলো বাতাসের গান, রাখালের গান, মাঝির গান, কৃষকের গান, গাড়িয়ালের গান সেই সঙ্গীত শুনে শুনে প্রকৃতির সুরকে আত্মস্থ করে যুগে যুগে একধরনের সৃষ্টিশীল মানুষ – বাউলরা নিরন্তর সাধনায় তাদের  সঙ্গীতকে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন। এই সুরের সম্মিলন তা চলতে থাকবে কারণ সংঙ্গীত অপার্থিব। 

ভাটির পুরুষ শাহ আবদুল করিম আমাদের সেই সঙ্গীতই শুনিয়েছিলেন। আমরা এই সুরের যাদুকরের কাছে ঋণি। আমাদের আবহমানকালের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে দিয়ে গেছেন শাহ আবদুল করিম। কত সহজ ভাষায় আমাদের হৃদয়তন্ত্রীতে ঝংকার তুলেছেন সেই সাধক। সেই সাধকের সুরের উত্তরাধিকারগণ সেই সঙ্গীত, সেই সুরকে মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে সুরের আবহ ধরে রাখার জন্য কাজ করে চলেছেন। 

বাউলরা সাধারণত নিরীহ হন, আপন ভাবে নিজেকে নিমগ্ন রাখেন প্রকৃতিকে উপলব্ধি করার জন্য। তাদের দুনিয়ার কোন মোহ কাজ করে না, তারা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য এক সাধককূল। তবুও বারে বারে এই সকল নিভৃতচারীদের উপর হামলা হয়। লালনকে নানান প্রতিকূলতার মধ্যেই তার সাধন কার্য চালিয়ে নিতে হয়। কালজয়ী লালন আজ বাংলাদেশের অনন্য সম্পদ, সাধক নজরুলকেও নিগৃহীত হতে হয়েছে গানের জন্য। শাহ্ আবদুল করিমের উপর হামলা হয়েছিলো। তবুও তাকে থামানো যায়নি। তার গান মানুষের মুখে মুখে। আর আজকে বাউল রণেশ ঠাকুর। 

একজন বাউল, একজন কবি, একজন লেখক, একজন গীতিকার, সুরকার, সর্বোপরি সৃষ্টিশীল ক্রিয়ায় যারাই জড়িত তারাই আমার কাছে সিদ্ধ পুরুষ মনে হয়। কারণ হৃদয় পবিত্র না হলে কোন সৃষ্টিশীল কর্মই সেখানে থেকে সৃষ্টি হতে পারে না। ঈশ্বর প্রদত্ত কৃপাই মানুষকে সৃষ্টিশীল করে। চিন্তার নিরন্তর বুনন একজন সৃষ্টিশীল মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এই সৃষ্টি কর্মের শুরু সৃষ্টির আদি হতে, কিছু মানুষ চেষ্টা করেছেন নিজেদের মতো করে সৃষ্টিকে বুঝাতে কিন্তু যুগে যুগে চিন্তার ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ লোকগুলিই চিন্তা শতদল ফুটতে বাধা দিয়েছে এখনো দিচ্ছে। সর্বশেষ উদাহরণ রনেশ ঠাকুর। 

এখানে কথা থেকে যায়, কেন স্বাধীন ও স্বচ্ছ চিন্তার মানুষগুলি বাধাগ্রস্ত হয়? কারা তাদের বাধা দেয়, কেন বাধা দেয়? কথাগুলি কয়েকদিন থেকে ভাবছি। রনেশ ঠাকুরের পোড়া ভিটা, তার এতো বছরের সাধনার ছাইয়ের উপর রনেশ ঠাকুর দাড়িয়ে আছেন। এ দৃশ্য সভ্য সমাজের জন্য, আধুনিক সমাজের জন্য ঘৃণ্য, জঘন্য। 

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী আছে আমাদের সমাজে যারা কতকগুলি মুখস্ত শ্লোকের ও আনুষ্ঠানিকতায় বেশ শান্তি অনুভব করেন। এরা সব সময় ভাবেন সবাই কেন আমাদের মতো নয়? আমাদের মতো কেন শুধু অনুসরণ করে না?  কেন তারা স্বাধীন চিন্তা করে? কেন তারা নতুন চিন্তা করে?

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর দলটির সৃষ্টির অপার লীলা বুঝার মত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নাই, তাদের এই সীমাবদ্ধতা তাদের প্রতিহিংসা পরায়ণ করে। শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার জন্য সৃষ্টির যে সঙ্গীত তারা উপলব্ধি করতে পারে না, তাদের হৃদয় বিশুদ্ধ নয় তাই তারা নিজের বিচার না করে অন্যের বিচার করতে যায়। 

যে সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা নাই সে সমাজ বিভক্ত সমাজ, সে সমাজ অনুগ্রসর সমাজ। যতই শিক্ষার হার বাড়ুক, মানুষের চাকচিক্য বাড়ুক, আধুনিক প্রযুক্তি হাতে আসুক – তাদের চিন্তা, চেতনা সেই মান্ধাতার আমলের। আসলে যা দেখছি এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, এরাই সক্রেটিসকে হেমলক দিয়েছিলো, এরাই যুগে যুগে সমাজে জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করছে। এরাই সবসময় জ্ঞান চর্চাকে ধর্মবিরোধী মনে করে সৃষ্টিশীল মানুষের প্রতি খড়গহস্ত হয়েছে। এই তথাকথিত ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যদি বাধা না দিতো তবে পৃথিবীর চেহারা পাল্টে যেত। আমরা বহু সাধক, মনিষী, চিন্তাবিদ, বৈজ্ঞানিককে হারিয়েছি এই রকম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের দ্বারা। 

তারা সৃষ্টিকর্তাকে তাদের একক কর্তৃত্বের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে!!! তাদের আঙ্গুলী হেলনের বাইরে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির প্রশংসাও করা যাবে না, এরা বাধা হয়ে দাঁড়াবেই!!! 

আশার কথা হলো এতো যে নির্যাতন, নৃশংসতা তবুও জ্ঞানের চর্চায় সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন, বাউল সাধনায় সৃষ্টিকর্তার অপার লীলার বন্দনা, কবিতায় সৃষ্টির রূপের কাব্যিক উপস্থাপন, সাধকের সাধনা কোন কিছুই থেমে নাই। এরা বোঝে না যে, মানুষের মনকে কোনদিন কোন বাঁধনে আটকানো যায় না। সৃষ্টির উন্মেষ সেটা ঘটবেই। 

আলোকিত পৃথিবী গড়ার জন্য সবাই পরমতসহিষ্ণু হবে এটাই কাম্য।