সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে

সত্য দেখার আগে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করা শ্রেয়

শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥ ‘সত্য’ একটি বহু অর্থবোধক শব্দ। সত্যের কোন সংজ্ঞা দেয়া যায় না। কারণ, সকল সংজ্ঞাই মানুষের ধারণা প্রসূত। সত্য কোন ধারণা নয় যাকে শব্দের সীমানায় আবদ্ধ করা যায়। ব্যাংকে টাকা জমানোর মতো কিংবা লাইব্রেরীতে বই সংগ্রহ করার মতো সত্য সংগ্রহ করা যায় না। সত্যকে স্মৃতিতে আটকে রাখা যায় না। বরঞ্চ স্মৃতি ও পূর্ব ধারণা আছে বলেই আমরা সত্যকে দেখতে পারি না।

পানির সংজ্ঞা আমরা দিতে পারি। কিন্তু পানির সংজ্ঞা আর পানি এক নয়। এক ফোঁটা পানি সত্য, কিন্তু পানি সম্পর্কে হাজার পৃষ্ঠার বিবরণ ও বিশ্লেষণ পানি নয়। পানি সম্পর্কে তথ্যপূর্ণ বিশ্লেষণ যেমন পানি নয়, সত্য সম্পর্কে পর্যালোচনাও তেমনি সত্য নয়। পানি পান করা ছাড়া পানি সম্পর্কে কোন জ্ঞান লাভ করা অসম্ভব। একইভাবে নিজের জীবনে সত্যকে প্রতিষ্ঠা না করে কেউ সত্যকে দেখতে পারে না। তাই হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীন বলছেন – ‘সত্য দেখার আগে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করা শ্রেয়।’

যা বাস্তব তা সত্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মানুষ বাস্তবতাকে দেখে না বা দেখতে পারে না। কোন বস্তু, ব্যক্তি বা ঘটনাকে যেমন আছে ঠিক তেমনভাবে দেখতে না পারার কারণ হলো, লোকে দেখে তার কল্পনা দিয়ে, আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। মানুষ বস্তু এবং ঘটনাসমূহকে দেখে একটা সুবিধাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। যেভাবে দেখতে ভালো লাগে সেভাবেই দেখে। কারো কাছ থেকে কোন কথা শুনা মাত্রই সুবিধামতো শুনা কথার অংশ বিশেষকে গ্রহণ-বর্জন করা হয়। পাঠের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়। এমনকি কুরআনের মতো কেতাব পাঠের বেলায়ও নিজেদের চিন্তার স্তর অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা তৈরি করা হয় কিংবা তৈরি ব্যাখ্যা মেনে নেয়া হয়। মানুষের সকল গ্রহণ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে কিছু একটা আছে যা বাস্তবতাকে নিজ স্বার্থের অনুকূলে বিকৃত করে গ্রহণ-বর্জন করে। তাই মানুষ বাস্তবতাকে দেখতে দেয় না। যে যে স্তরের মানুষ, বিষয়সমূহ সেভাবে তার মধ্যে ধরা দেয়। সত্য হচ্ছে ফলের ঘন জুসের মতো এর সাথে ভেজাল না মিশিয়ে পান করা কষ্টকর। মানুষের দৃষ্টি, প্রত্যাশা ও নিজ নিজ কামনায় আচ্ছন্ন থাকে। দৃষ্টির স্বচ্ছতা তখনই আসে যখন মানুষ প্রত্যাশা, কামনা ও আসক্তি থেকে মুক্ত হয়। তাই সত্যকে দেখার আগে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। অর্থাৎ নিজেকে অনাসক্ত করে দৃষ্টির স্বচ্ছতা আনতে হয়।

‘সত্য’ অর্থ একদিকে মুর্শিদ, গুরু বা পথপ্রদর্শক, অন্যদিকে ব্রহ্ম, নারায়ণ, পরমসত্তা বা বিধাতা। সত্য শব্দের এই দুটো অর্থ বাণীতে প্রতিস্থাপন করলে  বাণীটির তাৎপর্য হবে – ‘বিধাতাকে দেখার আগে মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা শ্রেয়’। স্বীয় মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই বিধাতা প্রতিষ্ঠিত হন। এই অর্থে, বাণীটির নির্দেশনা হচ্ছে – ‘মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করাই শ্রেয়’। শ্রেয় অর্থ – শ্রেষ্ঠ বা সর্বশ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠত্ব বিধাতারই একটা গুণ। বিধাতার একটি গুণবাচক নাম  কাবীরু অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ। মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করলেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়। স্বীয় মুর্শিদে বিলীন সাধক নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেন ‘আমিই সত্য’ – আনাল হক। তাই সাঁইজী বলেন – ‘যেহি মুর্শিদ সেহি রসুল, আহাতে নাই কোন ভুল, খোদাও সে হয়’।

অন্যদিকে, জগতে যা কিছু আছে তা-ই সত্য। এমনকি যা কিছু নাই তাও সত্য। যদি বলা হয় – সত্য বলতে কিছু নাই তাহলে এই নাই শব্দটিও আছে, না থাকলে নাই বলা যেতো না। সুতরাং, নাইও সত্য। বস্তুত নাই বা শূন্যতাই পরম সত্য। আমরা ‘ক’ কে ‘ক’ বলে চিনতে পারি কারণ ‘ক’ এর মাঝখানে নাই বা শূন্যতা আছে। মাঝখানের এই শূন্যতাটুকু না থাকলে ‘ক’ হতো একটা কালির ছুপ। একই ভাবে যখন একটা বাক্য লেখা হয় তখন শব্দগুলোর মাঝখানে ফাঁকা জায়গা থাকে। এই ফাঁকা জায়গা না থাকলে কি লেখা হয়েছে তা পড়া যেতো না। মানুষের কথা আমরা বুঝতে পারি কারণ, শব্দগুলোর মাঝখানে ফাঁক বা শূন্যতা আছে। বস্তুত, ‘নাই’ আছে বলেই আমরা আছি। কোন একটা বস্তু আমাদের কাছে তখনই দৃশ্যমান হয় যখন তার চারিপাশে শূণ্যতা থাকে। একমাত্র শূন্য পেয়ালাই ব্যবহারযোগ্য। সাধকের বাণীতে সত্য লুকিয়ে থাকে তাঁর কথাগুলোর ফাঁকের মধ্যে। সাধক তখনই সবচেয়ে মূল্যবান বার্তাটি প্রেরণ করেন যখন কোন কথা বলেন না। সাধক যা বলেন, তা তাঁর বার্তা নয় তিনি যা বলেন না তা-ই তাঁর মূল বার্তা। এই নাই বার্তাটিকে নিজের মতো করে ধরতে হয়, বুঝতে হয়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। তাহলে নাইকে দেখা যায়। তাই সত্যানুসন্ধানে ‘নেতি’ ‘নেতি’  একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।

সত্য অদ্বৈত। সত্য বলতে – সত্য + মিথ্যাকে, দিন বলতে – দিন + রাতকে আর মঙ্গল বলতে মঙ্গল+অমঙ্গলকে বুঝায়। কিন্তু মানুষ তার অবিদ্যার কারণে সত্যকে বুঝতে পারে না। তাই সে জগতে ভাল-মন্দ, মঙ্গল-অমঙ্গল ও শুভ-অশুভ দেখতে পায়। মানুষ যখন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সমগ্র জগতে সে শুধু সত্যকেই দেখে। তখন সত্য-মিথ্যার আলাদা কোন অস্তিত্ব থাকে না। প্রতিটি বস্তুই সত্য-মিথ্যা বা ইলেকট্রন-নিউট্রন কণা দিয়ে গঠিত। বিধাতা শুধু মঙ্গলই দেন না তিনি অমঙ্গলও দেন তাই বিধাতা অদ্বৈত। আমরা যাকে অমঙ্গল বলছি হয়তো তা-ই মঙ্গল। কারণ, তিনি যা জানেন আমরা তা জানি-না।

সত্য সম্পর্কে মানুষের বিচার বিশ্লেষণ একটা ছোট বাচ্চার মতো। একটা ছোট বাচ্চাকে আইসক্রীম দিলে খুশি হয়, মনে করে বাবা খুব ভাল কাজ করেছেন। কিন্তু টীকা দিলে কাঁদতে থাকে, মনে করে বাবা খুব মন্দ কাজ করেছেন। বাবা যা জানেন, শিশুটি তা জানে না। শিশুটির কাছে ভাল-মন্দের সংজ্ঞা এক রকম আর বাবার কাছে অন্য রকম। এ প্রসঙ্গে, কুরআনে বর্ণিত সুরা কাহাফের মুসা আ. ও খিজিরের গল্পটি উল্লেখযোগ্য। মুসা আ. জ্ঞান অন্বেষণের জন্য খিজিরকে অনুসরণ করেন।  খিজির শর্ত দেন, কোন প্রশ্ন করা যাবে না। পথিমধ্যে খিজির একটা শিশুকে অকারণে হত্যা করেন, ভাল নৌকা ফুটো করে দেন, বিনা পারিশ্রমিকে ভাঙ্গা দেয়াল মেরামত করে দেন।

মুসা আ. শর্ত ভঙ্গ করে তিনবারই প্রতিবাদ জানান, এবং যাত্রার অবসান ঘটে। পরবর্তীতে খিজির – অকারণে শিশুটিকে হত্যা করা, ভাল নৌকা ফুটো করে দেয়া এবং প্রাচীর মেরামত করার কারণ ব্যাখা করেন। মানুষের বিচারে একটা শিশুকে অকারণে হত্যা করা নিশ্চয়ই মন্দ কাজ। কিন্তু যিনি জীবন ও মৃত্যুদাতা, তিনিই ভাল জানেন – কেন একটা শিশুর জীবন দিলেন আবার কেনইবা তার মৃত্যু দিলেন। মানুষ ভাল-মন্দের বিচার করে স্থান ও কালের পরিধির মধ্যে থেকে কিন্তু বিধাতার বিচার স্থান-কালের অতীত। মানুষ যখন বিধাতাকে অনুসরণ করে তাঁর মতো স্থান-কালের ঊর্ধ্বে উঠে ভাল-মন্দের মন্দের বিচার করতে পারবে তখন সে বিধাতার পরিচয় লাভ করবে।

কেউ কেউ বলেন, জগতে সত্য ও মিথ্যা এই দুইটি পরস্পরবিরোধী শক্তি ক্রিয়াশীল। সত্য বিধাতার আর মিথ্যা শয়তানের। বিধাতা শুধু মঙ্গল করেন আর শয়তান অমঙ্গল করে। কিন্তু দুইটি পরস্পরবিরোধী শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলে বিধাতার সর্বশক্তিমান গুণের তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না। বিধাতা সর্বশক্তিমান, তাই শুভ এবং অশুভ সব শক্তিই তাঁর। এটা হতে পারে না যে, বিধাতা গোলাপ সৃষ্টি করেছেন আর শয়তান কাঁটা সৃষ্টি করেছে। কাঁটা এবং গোলাপ সব একই বিধাতার সৃষ্টি। সত্য এবং মিথ্যা দুইটি পরস্পরবিরোধী শক্তি নয়, একই শক্তির ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। বিষয়সমূহকে খন্ডিতভাবে দেখা নিম্ন বিশ্লেষণমূলক জ্ঞান। সত্য সর্বত্রই বিরাজমান। জগতের প্রত্যেকটা বিষয়ে, প্রত্যেকটা বস্তু ও প্রাণীতে, প্রত্যেকটা ঘটনায় সেই সত্যকে দেখাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠা।

মিথ্যা আছে বলেই আমরা চিনতে পারি সত্য কি। রাত না থাকলে মানুষ দিনের মর্ম বুঝত না, দিন না থাকলে বুঝতো না রাতের মর্ম। দুঃখ না থাকলে মানুষ সুখ চাইতো না, তৃষ্ণা না থাকলে পান করতো না, যন্ত্রণা না থাকলে স্বস্তি থাকতো না। রিপুর অদম্য ভোগেচ্ছা না থাকলে আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সাধনা বলে কিছু থাকতো না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট থাকবে, রোগ-ব্যাধি থাকবে, অভাব-দারিদ্র্য থাকবে, শোক ও মৃত্যু থাকবে, থাকবে রিপুর তাড়না তাই মানুষ এই সবের সাথে সংগ্রাম করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে নিজের জীবনে।

সত্য শব্দের আরেকটি অর্থ সংকল্প, প্রতিজ্ঞা বা শপথ। অন্যের সাথে কথা দিলে তা প্রতিশ্রুতি, নিজের সাথে কথা দিলে – সংকল্প। সংকল্প রক্ষা না করলে নিজের সাথে নিজের মিথ্যাচার হয়। যে ব্যক্তি নিজের সাথে নিজে মিথ্যাচার করে সে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সহজ কিন্তু সংকল্প রক্ষা করা খুবই কঠিন। সংকল্প রক্ষা করতে হলে ইচ্ছাশক্তি চাই। ইচ্ছাশক্তি না থাকলে কোন সাধনা বা প্রচেষ্টাই সফল হয় না। অন্যদিকে, সাধনা না থাকলে ইচ্ছাশক্তিও শক্তিশালী হয় না। ইচ্ছা শক্তির বলেই সাধক অসাধ্য সাধন করেন। তাই সত্যকে দেখার আগে সত্য বা সংকল্প নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।

সত্য হচ্ছে বাকসিদ্ধির মন্ত্র। সত্য বললে বাকসিদ্ধ হয়। সাধকগণ বলেন – কোন রকম মিথ্যাচার না করে কেউ একটানা ১৪ বছর সত্য কথা বললে, তিনি যা বলেন তা-ই সত্য হয়।

সত্য – অমিশ্র, বিশুদ্ধ। মানুষ যখন বিশুদ্ধতা অর্জন করে অর্থাৎ চিন্তাজগত ‘এক’ বিধাতা ব্যতিত অন্য কিছুর মিশ্রণ থেকে মুক্ত হয় তখনই বিধাতা বা সত্য নিজেকে উন্মোচিক করেন। তাই সত্য দেখার আগে নিজের জীবনকে মিশ্রণমুক্ত বা বিশুদ্ধ করা শ্রেয়।