সুজন, কুজন আর আপনজন এই নিয়ে হয় জীবনযাপন

– শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক

‘আমি’ এক বৃত্ত। বৃত্ত রচনা না করে ‘আমি’ অস্তিত্বে শীল থাকতে পারে না। ‘আমি’ বৃত্তের কেন্দ্রে যিনি অবস্থান করেন তিনি আপনজন। যিনি কেন্দ্রের নিকটবর্তী তিনি সুজন। যিনি কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী তিনি কুজন। কুজন সীমালঙ্ঘনকারী। ‘আমি’র সীমানা অতিক্রম করে তিনি ‘আমার’ জগতে অবস্থান কারী, অহংবোধে অন্ধ। আপনজন আমির সাথে যুক্ত হয়ে ‘আমরা’।

‘কু এবং ‘সু’ অস্তিত্বের দুটি অবস্থান। অস্তিত্বের স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে উচ্চ বা নিচ, মোটা বা সরু, উজ্জ্বল বা অনুজ্জ্বল, উৎকুচিত বা সঙ্কুচিত। কিন্তু আপনজন  – অস্তিত্ব।

কুজন ‘কু’ জনন করে, সুজন ‘সু’ জনন করে কিন্তু আপনজন ?  সু, কু উভয়কে গ্রহণ করে।

কুজন নিকৃষ্ট, সুজন ভাল, আপনজন উৎকৃষ্ট। উৎকৃষ্ট নিশ্চিন্তে চলে নিকৃষ্টের সাথে, সেই মধ্যম যে চলে তফাতে।

সুজন কুজন আর আপনজন এই নিয়ে হয় জীবনযাপন। সুজন আর কুজন উভয়েই ঘুরছে কিন্তু নিজে থেকে ঘুরছে না। কোন একটা কেন্দ্র তাকে ঘুরাচ্ছে। যে শক্তি তাকে ঘুরাচ্ছে সে ‘ক’ বা ‘স’। ‘ক’ বা ‘স’ এর সাথে ‘উ’ যুক্ত হয়ে ‘কু’ বা ‘সু’ হয়েছে। তাই পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করা শ্রেয়। কেন্দ্র শক্তি বিচ্ছুরণ করে টানতে পারলে তারা কেন্দ্রেই আসবে। আপনজন হবে। কেন্দ্রের এই টানাটানিই জীবন।

‘ক’ বা ‘স’ বিভিন্ন করণ শক্তি। আপনি আপনার হবার সাধানার সার কথা – এসকল করণ শক্তিকে একত্রিত করে বৃহৎ শক্তিতে রূপান্তর। শক্তি কখনও ‘কু’ বা ‘সু’ হয় না। শক্তিকে কুপথে বা সুপথে ব্যবহার করে কর্তা। কর্তা পরমশক্তির সাথে সংযোগ না রাখলে ‘ক’ বা ‘স’ শক্তির অধীনস্ত হয়ে ‘কু’ বা ‘সু’ কর্ম করে। সব কর্ম করা হয় শক্তি দ্বারা। শক্তি ব্যতীত কর্ম নাই। শক্তিকে দোষমুক্ত করার প্রশ্নই আসে না, আপনার অধীনে সকল শক্তির সমন্বিত কর্মেই আসে কেন্দ্রের নিকট্য। ফলতঃ কেন্দ্রে অবস্থান। বিভিন্ন করণ শক্তিকে একশক্তিতে রূপান্তর করতেও শক্তি লাগে। এ শক্তি আসে আপনজনের কাছ থেকে।

কে সুজন, কে কুজন তা নির্ণয় করে কে? যখন পার্থক্য জ্ঞান কাজ করে তখন তো আমিই কুজন। আমি এক নই বলেই আসে দ্বৈততা। আপন যদি হই আপনার তাহলে কী দিয়ে জানবো কে সুজন আর কে কুজন? আত্মার সাথে আত্মীয়তা হলে আত্মা চারিদিকে শুধু আত্মাকেই দেখে। চারিদিকে যা কিছু আছে সবই তো তিনি। কোথায় সুজন, কোথায় কুজন, সবই যে এক আত্মা।

ইন্দ্রিয়ের দুয়ারগুলো বাহিরের দিকে খোলা তাই তো দেখি সুজন-কুজন। যখন আপনজনকে দেখি তখন সবই তো এক আকার বা নিরাকার। আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন তো কিছু নেই। থাকবে কী করে? চোখ তো কিছু দেখে না, যে দেখে সে তো আপন। যে দেখে, শুনে, জানে, বলে, সে এক হলে দুই দেখবে কি করে?

আপনাকে জানতে হলে আপনবোধকেই যে জানতে হয়। চিন্তাকে জানতে হলে জানতে হয় চিন্তককে। কিন্তু চিন্তককে জানতে গিয়ে আমরা আটকে যাই চিন্তার জালে। ক্রমে হয়ে উঠি চিন্তাময়, পতিত হই ভ্রমে। কোথায় আপনজন? কোথায় পাবো তারে? চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আমরা এক আকার না হয়ে বহু আকারের হই। ইচ্ছে করলেই আমরা সব সময় চিন্তাকে তার নানামুখী বিচ্ছুরণ থেকে একে আনতে পারি না। যখন পারি না, কুজন-সুজন, আর যখন পারি – আপনজন।

সুজন-কুজন, আপনজন এতো অন্তর্বৃত্তিরই বিভাজন। একদিকে চিন্তার নানামুখী বিচ্ছুরণ অন্যদিকে কেন্দ্রের শক্তিতরঙ্গ। একদিকে জীবন জীবিকার টান, চাওয়া পাওয়ার কর্মপ্রমত্ত জগত, অন্যদিকে আপনজনের আকর্ষণ শক্তি। জীবনের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে আত্মা চায় আত্মীয়তা করতে। আবার জগতও চায় গ্রাস করতে আপনাকে। আপনজনের প্রেমের স্রোত যখন প্রত্যাশাকে ভাসিয়ে নেয় অকূলপানে তখন আসে আনন্দ।

চিন্তক ও চিন্তার মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন। চিন্তুক চিন্তাসাগরে ডুব দিয়ে ভেসে চলে প্রবাহে। ঢেউয়ের পর ঢেউ আসে কে রাখবে হিসাব? কীভাবে রাখবে? কতক্ষণ রাখবে? তাই চিন্তককে জানতে হলে ফিরে যেতে হয় অতীত স্মৃতির ভান্ডারে। ওখানে সমীক্ষকের তীক্ষ্মদৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয় সুজন-কুজনের অবয়ব। আমি কতটা সুজন-কুজন তা জানার এই উপায়। কিন্তু এ উপায়ে সফলতা আসে চিন্তক যখন অন্ধকার স্মৃতিভান্ডারকে আলোকিত করে। এজন্য  আপন থেকে পৃথক হয়ে জানতে হয় আপনাকে। চিন্তাতরঙ্গে ভেসে চিন্তককে যায় না জানা।

আমি সুজন বা কুজন এমন সিদ্ধান্ত নিলে তলিয়ে যেতে হবে। সুতরাং কোন বিচার বা সিদ্ধান্ত নয় নিস্পন্দ অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে আপনজনকে পর্যবেক্ষণ। আঁধারের অন্দরমহল থেকে যতটুকু আবিষ্কার করা যায়। এটা আবিষ্কার, বিচার নয়। বিচার করতে গেলেই সুজন-কুজন, আপনজনকে একসাথে নিয়ে জীবনযাপন করতে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে। আপনার সাথে আপনার দ্বন্ধে সৃষ্টি হবে স্ব-বিচ্ছিন্নতা। আবার হারিয়ে যেতে হবে আত্মবিভাজনের তমসায়।

একই কথা সত্য বহিঃজগতেও। কে সুজন, কে কুজন এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার কারও নেই। আমি যখন কাউকে সুজন বা কুজন বলি তখন নিজেই অন্যের জীবনের চৌহদ্দিতে প্রবেশ  করে সীমানালঙ্ঘনকারী হই। আমি যদি মানুষকে সত্য পথে সহযোগিতা করতে চাই তাহলে প্রথম শর্ত হলো – যে যেমন, তাকে তেমনভাবে গ্রহণ করা। যে যেমন তাকে তেমনভাবেই সৃষ্টি করেছে মহাশক্তি। নিশ্চয়ই তাকে দিয়েও কোন মিশন বাস্তবায়িত করতে চান তিনি। আর অন্যদিকে – সুজন, কুজন কেউ স্থিত নয়, ঘূর্ণায়মান। আজ যে সুজন, কাল সে কুজন। সুতরাং কোন মন্তব্য নয়, যে যেমন তেমনভাবে তাকে গ্রহণ করেই জীবনের পথে চলা। মানুষকে ভালোবাসা, নিজেকে ভালোবাসা। কাউকে ঘৃণা করা নয়। আমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবো, শ্রদ্ধা ও সম্মান করবো। এবং এইভাবে এক হবো সমগ্র সৃষ্টির সাথে। এতেই আছে শান্তি। তাই হোক।