সিজারিয়ান অপারেশন : দৃষ্টি দেয়ার এখনই সময়

হাসান জামান টিপু ॥ স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি অনেক বিদেশী সংস্থা কাজ করছে। এক্ষেত্রে বিরাট বাজেট প্রতিবছর বরাদ্ধ হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে নেওয়া হয় ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। সাধারণ মানুষ জানে না পেশাগত ও নৈতিকতার কোন পাঠ সেখানে দেওয়া হয় কি না। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা মূলত দুইভাগে বিভক্ত; সরকারী ও বেসরকারী। সরকারী ও বেসরকারী সকল ক্ষেত্রেই নীতি নৈতিকতার একটা পাঠ বা শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে আজ। সরকারী হাসপাতালগুলিতে যদিও তুলনামূলক ভাবে মানবিক দিকটা মোটামুটি দেখা হয়, বেসরকারী হাসপাতালে অর্থের জন্য যে কোন অনৈতিক কাজ করতে তাদের বাঁধে না। এক্ষেত্রে সরকারও বোধকরি অনেকটাই অসহায়। দেশের বড় বড় বেসরকারী হাসপাতাল গুলির বিরুদ্ধে প্রায়শ অনৈতিকতার ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আসে। লাশকে দিনের পর দিন লাইফ সাপোর্ট দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তো নিয়মিতভাবেই শোনা যায়। ভুল চিকিৎসা, রোগীকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের থেকে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ নিত্য দিনের করুণ কাব্য।

এই অনৈতিকতার অন্যতম দিক হলো সিজারিয়ান অপারেশন এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বিশিষ্ট সাহিত্যিক ডা. জাকির তালুকদারের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে বাস্তব ঘটনা শেয়ার করতে চাই। “সিজারিয়ান অপারেশন ও আমার সন্তান:

আল্ট্রাসনোগ্রামের দেয়া তারিখ অনুযায়ী গাইনি ওয়ার্ডে নিয়ে গেলাম স্ত্রীকে। একদিন যায়, দুইদিন যায়। কিন্তু তার প্রসববেদনা ওঠে না। গাইনি-অবস-এর প্রফেসর ম্যাডাম খুব যত্নের সাথে দেখছিলেন আমার স্ত্রীকে। অন্য ডিউটি ডাক্তার, ইন্টার্নিবৃন্দ, ওয়ার্ডের স্টাফ সবাই ছিলেন খুব আন্তরিক এবং যত্নশীল।

কিন্তু তৃতীয় দিন ম্যাডামের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। বললেন- সিজারের জন্য তৈরি হও। আজকেই করে ফেলব।

আমি তখন নতুন ডাক্তার। ম্যাডামের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস কোথায় পাই! তবু বললাম- ম্যাডাম, সাতদিন তো অপেক্ষা করাই যায়।

ম্যাডামের মুখে বিরক্তি। আমি তবু বলে চললাম- গর্ভের সন্তানের হার্টরেট স্বাভাবিক, হেড এনগেজড, পজিশন নরমাল, প্রেজেন্টেশন সেফালিক, অ্যামনিওটিক ফ্লুইড যথেষ্ট। সন্তানের মায়ের প্রেসার স্বাভাবিক, পায়ে কোনো পানি নেই, ইউরিনে অ্যালবুমিন নেই, কোনো খিঁচুনির লক্ষণ নেই। এই রোগীকে এখনই সিজারের সিদ্ধান্ত কেন দিচ্ছেন ম্যাডাম?

তিনি রেগে বললেন- তুমি কি আমার চাইতে বেশি জানো?

এই কথার কী উত্তর দেব? বললাম- আপনার চাইতে বেশি জানার প্রশ্নই ওঠে না ম্যাডাম। আপনি যেটুকু শিখিয়েছেন, সেটুকুই বলেছি।

এবার ম্যাডাম হেসে ফেললেন। বললেন- ঠিক আছে। অবজারভেশনে রাখো।

নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই পৃথিবীতে এসেছিল আমার পুত্র।’

২.

গতকাল আমার যে নতুন মায়ের জন্ম হয়েছে, আমার ছোট ভাইয়ের কন্যা, ফেসবুকে ছবি দেখে যাকে আপনারা অশেষ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, সেই মায়ের ক্ষেত্রেও ঘটনা কাছাকাছি। লিকিং হয়েছিল কিছুটা আগেরদিন। তাই তোড়জোড়। সিজার করতে হবে।

এখন আমি সিনিয়র ডাক্তার। (যদিও গাইনির নই)। ধমকের সুরে বললাম-দুই ঘণ্টা পর পর বাচ্চার হার্টরেট আর মায়ের ব্লাড প্রেসার মাপো। আর অপেক্ষায় থাকো।

আমার নতুন মা-ও পৃথিবীতে এসেছে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই।

[কী ওয়ার্ড: ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করো। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করো। শতকরা ৯০টা নরমাল ডেলিভারি হবে।]”

একজন ডাক্তারের অভিজ্ঞতা যদি এই হয় তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এক্ষেত্রে আমার নিজের অভিজ্ঞতাও বেশ হতাশার। পাঠকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই আরো করুণ। বাস্তবে ডাক্তারগন একটা আতংকজনক ও চিকিৎসাজনিত জটিলতা প্রসুতি ও তার স্বজনদের সামনে তুলে ধরেন যাতে তারা সিজার করানোর জন্য সহজেই রাজী হয়।

এদিকে দিন দিন এই হার বাড়ার জন্য সিজারিয়ান বেসরকারি ক্লিনিকের অর্থলিপ্সা, সরকারি ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু না হওয়া এবং ডাক্তারদের নৈতিকতার ঘাটতিকে দায়ী করছেন গবেষকরা।

বিদেশী একটি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রসব সিজারিয়ান বা সি-সেকশনে করানোর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডাব্লিউএইচও কিন্তু বাংলাদেশে সেই সীমা ছাড়িয়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। দিন দিন বাড়ার জন্য সিজারিয়ান বেসরকারি ক্লিনিকের অর্থলিপ্সা, সরকারি ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু না হওয়া এবং ডাক্তারদের নৈতিকতার ঘাটতিকে দায়ী করছেন গবেষকরা। দায়ী কিছু প্রসুতি মায়ের প্রসব পরবর্তী দাম্পত্য জটিলতার বিষয়।

আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় উঠে আসে এই ব্যাপক হারে সিজার করানোর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর কি রকমের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। ওই গবেষণায় উঠে আসে বাংলাদেশে বিভিন্ন পরিবার সম্ভবত তাদের আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ খরচ করছে বাচ্চা প্রসবের ক্ষেত্রে। কাউকে কাউকে ঋণ করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙেও এই খরচ করতে হচ্ছে।

ওই গবেষণায় দেখা গেছে, সিজারিয়ানের ক্ষেত্রে তাদের গড়ে খরচ পড়ছে ২৫০ ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ২০,০০০/-, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে যে খরচ মাত্র ৬০ ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ৪,৮০০/-।

এভাবে বাচ্চা প্রসবে খরচ বৃদ্ধি বাংলাদেশের ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার’ অর্জনে বড় বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় ওই গবেষণায়। বাংলাদেশে সিজারিয়ান নিয়ে আইসিডিডিআরবির ওই গবেষণা দলের প্রধান ডা. আবদুর রাজ্জাক সরকার এই বিদেশী সংস্থাকে বলেন, ‘‘বাড়িতে ডেলিভারি করা হলে মাত্র ১৪শ টাকা খরচ হয়। যখন সরকারি ইনস্টিটিউশনে ডেলিভারি করা হয়, সেখানে গড়ে ৬ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়। যখন সি-সেকশন করতে হয়, তখন এই খরচটা গড়ে ২১ হাজার টাকা হয়ে যায়। এটা মানুষের উপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।”

২০১৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশে সিজারিয়ান প্রসবের সংখ্যা শতকরা ৩১ ভাগ, যা বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত হারের দ্বিগুনেরও বেশি। তাদের নির্ধারিত হার অনুযায়ী, এই সংখ্যা হতে পারে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছেন, এই হার ক্রমশ বাড়তির দিকে। এর অন্যতম প্রধান কারণ প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো, এগুলির আয়ের ৯৫% ভাগই সিজারিয়ান অপারেশন থেকে আসে। একবার একজন প্রসূতিকে সিজার করতে পারলে দ্বিতীয় বাচ্চাও সিজারই হবে এটাই সিজারিয়ানের হার বাড়ার অন্যতম কারণ।

আইসিডিডিআরবির গবেষণায় উঠে এসেছে, ৩৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি মায়েরা অন্যদের তুলনায় বেশি খরচ করছেন। অন্যদিকে, শহুরে নারীদের মধ্যে যারা শিক্ষিত এবং জন্মদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন, তাঁরাও এই বেশি খরচের পথই ধরছেন। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হেলথ প্লানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে আইসিডিডিআরবি’র ওই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এ অবস্থা কমবে যদি ডা. জাকির তালুকদারের মতো ডাক্তাররা যদি এগিয়ে আসেন। নৈতিকতার যে অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, স্বাস্থ্যসেবা খাত তার বাইরে নয়। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে এবং সরকারের কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোকে। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালতে হবে।

নৈতিকতার শিক্ষা যদি অন্তর থেকে আসে তবেই অনৈতিক কাজ থেকে মানুষ বিরত থাকে। সেই শিক্ষাই মেটিভেটর হিসাবে দিতে পারে সিনিয়র ডাক্তারগন। এক্ষেত্রে ক্লিনিক মালিকদের বুঝতে হবে অসহায় রোগীদের চরম নির্ভরশীলতার জায়গা তার স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সেখানে নির্ভরশীলতার সুযোগে অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া অনুচিত এই বোধে বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। স্বাস্থ্যখাত যে একটি সেবামূলক খাত তা ক্লিনিক মালিকদের বুঝাতে হবে, সেবার মন মানসিকতায় তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং সরকারের কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে হবে। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালতে হবে। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রসূতি ও তার পরিবারকে সচেতন করতে হবে। সর্বোপরি একজন প্রসূতি ও তার নবজাতককে পৃথিবীতে আনতে হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে।