সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেল!

সংলাপ ॥ বাংলাদেশে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শক্ত অবস্থান নিয়েছে সরকার। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও বলেছেন তথ্যমন্ত্রী। বেসরকারি চ্যানেলগুলোতে যে আর্থিক সংকট চলছে তা কি ভাবে মোকাবেলা করা যাবে?

বাংলাদেশে অন এয়ারে থাকা বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল এখন ৩০টি এর বাইরে বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ড এবং সংসদ বাংলাদেশ নামে আরো ৩টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল আছে।

একমাত্র বিটিভি টেরিস্টেরিয়াল সম্প্রচার চালায়। ২০১২ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর জরিপ অনুযায়ী তখন বাংলাদেশে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার পরিবারে টেলিভিশন ছিল। এই সংখ্যা আরো বেড়েছে। কেবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)-এর সূত্র মতে বাংলাদেশে আনুমানিক ৫০ লাখ কেবল কানেকশন আছে। অ্যানালগ হওয়ায় তাদের নিকট কোনো পরিসংখ্যান নেই। এটা তাদের ধারণা।

২০১৮ সালে সাত হাজার ৯শ’ ৬০ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন গেছে বিটিভিসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে। রায়ানস- এর মতে টেলিভিশনের রেটকার্ড ও প্রচারিত বিজ্ঞাপনের সময় হিসেব করে বের করা হয়েছে। কমিশন বাদ দেয়া হলে টাকার অংকটি আরো কম হবে। টেলিভিশন চ্যানেল মালিক সমিতি (অ্যাটকো)-র সূত্রে জানা যায়, প্রাইভেট টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে বাজার বছরে ৭২০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার। আগে এর প্রায় অর্ধেকই ভারতের চ্যানেলে চলে যেতো। কিন্তু চাপের কারণে এখন তা কমেছে। এখনো ২০-২৫ শতাংশ বিজ্ঞাপন ভারতের চ্যানেলে যায়।

‘আইন অনুযায়ী কোনো বিদেশি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বাংলাদেশে দেখাতে হলে ‘ক্লিন ফিড’ দেখাতে হবে। ক্লিন ফিড মানে হলো কোনো বিজ্ঞাপন থাকতে পারবে না।” তথ্যমন্ত্রনালয় মতে সরকার বিদেশি চ্যানেল বন্ধ করছে না, আইন বাস্তবায়না করছে। কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬-এর ১৯ ধারার ১৩ উপধারায় বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশি কোনো চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ক্লিন ফিডের বিধানটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আছে। আমাদের দেশে এটা কার্যকর না হওয়ায় দেশীয় টেলিভিশনগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেখা যায় খবরের জন্য বাংলাদেশের দর্শকরা বাংলাদেশি চ্যানেল দেখেন। কিন্তু অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের জন্য ভারতীয় চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। বিজ্ঞাপনদাতারাও এটা জানেন। ক্লিন ফিড নীতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ক্ষতিগ্রস্থ তো হচ্ছেই, বিজ্ঞাপনের কলাকুশলীরাও বঞ্চিত হচ্ছেন।

পে চ্যানেলের দাবি জানাচ্ছেন টেলিভিশন মালিকরা। একইসঙ্গে তারা বিতরণ ব্যবস্থা ডিজিটাল করার কথা বলছেন। তারা মনে করেন, পে-চ্যানেল হলে টিভিগুলোর আয়ের নতুন একটি উৎস হবে। তখন চ্যানেলগুলোর মধ্যে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান বানানোর প্রতিযোগিতা বাড়বে। ডিজিটাল হলে প্রচার-মানও বাড়বে, ঝকঝকে ছবি ও শব্দ পাওয়া যাবে। কত গ্রাহক তারও হিসাবও থাকবে।

বাংলাদেশের ৩০টি চ্যানেলে ঢাকায় কম করে হলেও ৬ হাজার সাংবাদিক, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য সংবাদকর্মী কাজ করেন। কোনো কোনো চ্যানেলে ৫ মাস ধরে বেতন হয় না। একমাত্র আয় বিজ্ঞাপন, সে কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আর টিভিতে কোনো ওয়েজবোর্ড না থাকায়ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে জানা যায় ওয়েজ বোর্ডের কাজ চলছে।

বাংলাদেশে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বাড়ছে। কিছু চ্যানেল সংবাদভিত্তিক, কিছু বিনোদনের। তবে বিষয়ভিত্তিক চ্যানেলের অভাব প্রকট, বিশেষ করে শিশুদের চ্যানেল একটাও নেই। শিশুদের জন্য হোক চ্যানেল আগে। কিন্তু গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না সরকার। শিশু চ্যানেল হলে কোন সময়ে কোন বয়সের শিশুরা তাদের চ্যানেলটি দেখবে সেটা তাদের হিসেবে থাকবে। সকালের দিকে কিন্ডারগার্টেনগামী শিশুদের জন্য উপযোগী অনুষ্ঠান প্রচার হতে পারে, আবার সন্ধ্যা সাতটায় কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী অনুষ্ঠান। সপ্তাহান্তের অনুষ্ঠানের তালিকায় প্রয়োজন আছে শিক্ষামূলক ডকুমেন্টারি, যা সব বয়সি শিশুদের জন্যই প্রযোজ্য। কার্টুনের মাধ্যমে শিশুদের স্বাবলম্বী করে তোলার একটা উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হবে বিশেষ করে বহু সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়া আর পরের উপকার করার মতো বিষয়াদি সুন্দর করে শেখানো যায় কার্টুনে। আর নাচগানের অনুষ্ঠানতো আছেই।

শিশু চ্যানেল হলে অনুষ্ঠানের আরেকটি ইতিবাচক দিক হবে শিশুদের ভাষার উপর দখল পোক্ত করতে সহায়তা করা। বিশুদ্ধ, সঠিক উচ্চারণে শিশুদের ভাষা শেখানোর প্রাথমিক ধাপটা অনেকটা করে দিতে পারে যা বিশেষ করে নিম্নবিত্তের পরিবারের শিশুদের জন্য এটা এক বড় সুবিধা।

শিশুদের জন্য সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময়ের দাবী। বাংলাদেশের সরকারের জন্য জরুরি এই দিকটাতে বিশেষ খেয়াল দেয়া। ক্রমশ অর্থনৈতিকভাবে উপরের দিকে ওঠা একটি দেশের শিশুদের জন্য একটি চ্যানেল তৈরি অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়। প্রয়োজন আসলে সদিচ্ছা। উপযুক্ত চ্যানেল তৈরি করা গেলে শিশুদের হিন্দি চ্যানেল বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী নয় এমন কার্টুন দেখার প্রয়োজন পড়বে না। বরং শিশুদের অনেক শিক্ষা দেয়া যাবে যা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার পথে সহায়ক হবে।