সময়ের সাফ কথা…. বর্তমানটা সাধারণ সময় নয়

সংলাপ ॥ বর্তমান সময়টা ঠিক ‘সাধারণ’ সময় নয়। তাই, কোনও দিন যা ভাবা যায়নি, আজ সেটা ভাবা এবং স্পষ্ট করে বলা জরুরি হয়ে উঠছে। এত মানুষ চার দিকে এত অর্থহীন ও মিথ্যা কথা বলছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’-এর সৌজন্যে সেই সব কথার এত বড় মাপের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়ে উঠছে, প্রতিদিন এত বেশি করে ফুলেফেঁপে উঠছে চিন্তা-ভাবনা বিচার-বিবেচনার প্রতি অভব্য, অন্যায়, উদ্ধত আক্রমণ যে চুপ করে থাকার এখন একটাই অর্থ: মেনে নেয়া।

মেনে নেয়া যে, দেশ জুড়ে যা চলছে এখন, সে সবই ‘স্বাভাবিক’ ব্যাপার। মেনে নেয়া যে, ভুল ও মিথ্যে কথা বলা হলেও আমাদের উল্টে কিছুই বলার থাকতে পারে না। অন্য দিকে রোজ নিয়ম করে খবর: দেশ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় মানুষকে বেঁধে, ঘাড় ধরে টেনে, চলমান ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া হচ্ছে – মেরেও ফেলা হচ্ছে। যারা এ সব কাজ করছে, তাদের প্রতি রাজনীতিকরা অত্যন্ত সদয়। আর যারা বিস্ময় বা ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তাদের প্রতি রাজনীতিকদের তীব্র ভর্ৎসনা। এই আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক ‘সংস্কৃতি’। এই আমাদের বর্তমান ‘রাজনীতি’। একটা তীব্র অশিক্ষা ও অভব্যতার পরিবেশে ধাপে ধাপে বেড়ে চলেছে আক্রমণের বর্বরতা। কখনও নেতা, কখনও গণমাধ্যম, কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করছেন, জয় বাংলা জাতীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাঙালির স্বাভাবিক, চিরাচরিত, দৈনন্দিন সমাজ আর রাজনীতি।

চুপ করে থাকা মানে, সব কিছু মেনে নেয়া। তাই, সহজ কথাটাই আজ খুব জোর দিয়ে উঠছে – বাংলার সংস্কৃতি কী এবং কেমন, তার ধারণা নেতাদের নেই, সাধারণ মানুষের আছে। বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ে সত্যিকারের ধারণা থাকলে রাজনৈতিক সন্ত্রাসী হওয়া যায় না। আপাত-গুরুত্বহীন, কিন্তু এখন-জরুরি একটি কথা, যে-কোনও বিষয়ে মত প্রকাশের অধিকার এ দেশে সকলের আছে-এখনও পর্যন্ত-এবং বিরোধী দলের মানুষদের আরও বেশি করেই আছে। ক’জন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, আজীবন সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতির চর্চা করা পন্ডিত মানুষ আমাদের মধ্যে আছেন, আমাদের উচিত তাদের কথা ধৈর্য ধরে শোনা ও বোঝা। তর্ক যদি করতে হয়, তবে সম্মান ও উপযুক্ত শিক্ষাসহকারে সেটা করা। একটা ভ- অন্যায় আক্রমণসর্বস্ব রাজনীতিতে গা-ভাসানো যুক্তিহীন ইতিহাসবোধহীন দাবি বাঙালি জাতি মেনে নেয়নি-নেবে না।

পরসংস্কৃতি-অসহিষ্ণু উন্মাদনা-লিপ্সু জনগণ ও নেতা-সংসদ সদস্যদের এত অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করার ‘অধিকার’টি দিয়েছে-গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের অধিকারে মন্ডিত হয়েই তারা আজ গণতন্ত্রকে দলে-পিষে মারতে উদ্যত হয়েছেন। যে গণতন্ত্রের অর্থ ‘সকলের অধিকার’- ‘কারও কারও বেশি অধিকার’ নয়-তাকে দেশ থেকে দূর করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। হুমকি আর ধমকিকে ‘গণতান্ত্রিক’ ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরই মন্ত্রী-নেতারা ‘বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত’ বিষয় বলে অনেক ঘটনায় মাথা ঘামাচ্ছেন না। এ সব যে সম্পূর্ণত ‘ব্যতিক্রমী’, অতীব ‘বিক্ষিপ্ত’, বুঝতে কিছুমাত্র অসুবিধে হয় না, যখন দেখা যায় এক মাসের মধ্যে একই রকম ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সারা দেশে। সত্যিই, এ আর এমন কী। ‘গণ’ যদি চায়, আমাদের চুপ করে থাকাই কর্তব্য!

এই মুহূর্তে এ দেশে যা ঘটছে, সেটাকে আমরা বলছি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদ। দেখেশুনে কিন্তু চিন্তা হয়, রাষ্ট্র এমন জায়গায় সমাজকে নিয়ে আসছে, যেখানে রাষ্ট্রের হাত থেকে কর্তৃত্ববাদের পতাকা চলে যাচ্ছে দেশজোড়া হিংসা-উন্মত্ত জনসমাজের এক অংশের হাতে। নৈরাজ্যের হুঙ্কার আর অপরাধের আস্ফালন দিয়ে গণতন্ত্রই আজ ফুঁসে উঠে গণতন্ত্রকে খেতে শুরু করছে।