সময়ের সাফ কথা…. জনতার মাঝে বন্ধু আছে

সংলাপ ॥ জনপ্রিয়তাবাদের ধরন হল তা জনকল্যাণকেন্দ্রিক, জনমুখী, এবং জনতাই তার শুরু ও শেষ। এই জনপ্রিয়তাবাদ জাতীয়তাবাদে উদ্বেল, উন্মত্ত হয় না, ভাষা, বর্ণ, জাতি বা অন্য পরিচিতিকে সম্বল করতে পারে, সমাজের নানা আইনবহির্ভূত কাজকে সহ্য করে এবং সংসদীয় সর্বস্বতার বাইরে জনতা বলে একটা কিছুর অস্তিত্ব বজায় রাখে।

এ বারের সংসদ নির্বাচনে সর্বাত্মক ক্ষমতা দেখিয়েছে যে, তা বর্ণ, জাতি, ভাষা, লিঙ্গ ইত্যাদি পরিচিতি ও বিভেদকে অতিক্রম করে সমগ্র জাতির উপর একাধিপত্য বিস্তারে সক্ষম। কঠোরতার প্রতিশ্রুতি এবং বিশৃঙ্খলা দমনের আশ্বাস দিয়ে সে জনপ্রিয়তাবাদী প্রতিরোধকে পরাস্থ করতে পারে।

জনপ্রিয়তাবাদীদের এত দিন ধারণা ছিল যে, জনকল্যাণমুখী কর্ম প্রসার এবং অসংগঠিত জনতাকে মূল সম্বল করে রাজনীতি করা যাবে। এই পথে প্রবল প্রতিপত্তিশালী আগ্রাসী ক্ষমতার বিরোধিতা বজায় রেখে স্বাধিকার ও স্বাতন্ত্র বজায় রাখা যাবে। কিন্তু এই চিন্তাধারায় প্রথম ভুল হল- জনপ্রিয়তাবাদীরা এটা হিসেবে রাখেনি যে ‘জনতা’র বিরুদ্ধে ‘জনগণ’ বা ‘সমাজ’ সমাবিষ্ট হতে পারে, কেননা প্রত্যেকটি পরিচিতিকেই উল্টো উদ্দেশ্যে ঘোরানো যায়। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ের মাঝে, শ্রেণী শ্রেণীর মাঝে ক্রমবর্ধমান বৈরিতা, বিভিন্ন মহলে উগ্রবাদের প্রসার, ধর্মীয়দের শ্রেণী বিদ্বেষ এ সবকে ঠেকানোর মতো কোনও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অস্ত্র জনপ্রিয়তাবাদীদের কাছে নেই।

জনপ্রিয়তাবাদীরা এখনও এর উত্তর খুঁজে উঠতে পারেনি, এত অর্থনৈতিক ও সামজিক বিপর্যয়ের পরেও লোকে ব্যাপক হারে আগ্রাসী শক্তিকে সমর্থন করে কেন? কৃষিসঙ্কট, কর্মসংস্থান সঙ্কোচন কোনও কিছুই তো প্রতিবাদী প্রচার থেকে বাদ যায় না। উন্নয়নের সুফলকে ছাপিয়ে ক্ষমতার ‘নৈতিকতা’এক পরাক্রমশালী চরিত্র অর্জন করে। উন্নয়নের সুফল বণ্টনে অসাম্য, দুর্নীতি, আঞ্চলিকতা, অন্তর্কলহ, এবং বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের একাংশের বৈরিতাকে কমানো যায় না। দুর্মুখরা বলবে, উন্নয়ন বেড়েছে, শ্রেণী বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িকতাও বেড়েছে। আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ সওয়ার হয়েছে উন্নয়নের পিঠে।

জনপ্রিয়তাবাদীরা এখনও জানেন না প্রশাসনিক নীতি যে বন্ধ দরজায় আটকে গেলে, তাকে কী উপায়ে খোলা যাবে। অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়ছে বই কমছে না। অর্থনীতির উর্দ্ধমুখী পুনরুজ্জীবন ঘটাতে গেলে ব্যাঙ্ক ঋণ শোধ করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানো, ভোক্তার ব্যয়বৃদ্ধি। আদিম পুঁজি সঞ্চয়, আর্থিক সঙ্কট এবং কৃষিসঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের অর্থনীতি অব্যাহত থাকে। এর সঙ্গে চলে জনপ্রিয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে তকমা লাগানো, এরা বেহিসেবি, এরা মজুরি নিয়ন্ত্রণ করে না, এরা খালি মন্দির মসজিদ আর মাদ্রাসায় টাকা দান করে। আসল উন্নয়নের পথে এ সব কিছুই হল বাধা, অর্থাৎ সমাজের শত্রু। জনগণ এই শাসকদের ছুড়ে ফেলতে চায়।

শাসনের রাজনীতি কোন পথে গেলে এই রাজনৈতিক সঙ্কট কেটে বেরিয়ে আসা যাবে এর কোনও উত্তর নেই। যদি আইনবহির্ভূত প্রশাসন, রাজনীতি ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোনও পথ না থাকে, তবে বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে ঋণ দান, যে সব আইনবহির্ভূত কাজ গত কুড়ি বছরে হয়েছে, তার মাত্রা ও ভূমিকা যে আলাদা, এবং অসংগঠিত মানুষকে যে ছোটখাটো বেআইনি কাজ করেই বেঁচে থাকতে হয়, তার নৈতিক দাবি জনপ্রিয়তাবাদীদের জোর করে বলতে শোনা যায় না। তারা যেন নিজেদের ভেতরেই হেরে বসে আছে, যুদ্ধের আগেই অস্ত্রসমর্পণ করেছে।

সম্পদ ও উদ্যাপন এই দুইয়ের প্রতি জনপ্রিয়তাবাদীদের এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি তাদেরকে নৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য করে তোলে। কারা জনপ্রিয়তাবাদী? যাদের কোনও নীতি নেই, শুধু জনতাকে তৃপ্ত করতে ব্যস্ত। তাই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকারি ব্যয়, ছুটি, সরকারি কর্মচারিদের বিভিন্ন সুবিধা, পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে অর্থদান এই সবই হল সম্পদ অপচয় এবং এক অহেতুক উদ্যাপনের মনোভাব। কৃচ্ছতা সাধনের মনোভাব জনপ্রিয়তাবাদীদের নেই। তাই তাদের প্রশাসিত দেশ দুর্বল। তাই তারা আর্থিক প্রগতি আনতে অপারগ। এ দিকে জনসমাবেশের মধ্যে ক্রমাগত তৃপ্তি পাওয়ার এবং বিভিন্ন কারণে উদ্যাপনের এই ভঙ্গি যদি জনপ্রিয়তাবাদীরা ত্যাগ করে, আমলাতান্ত্রিক মনোভঙ্গি নেয়- তা হলে তারা আর জনপ্রিয়তাবাদী থাকে না। তা তাদের অস্থিত্বের সঙ্কট আনবে। অন্য দিকে নয়া উদারনীতিবাদীদের কাছে তাদের ক্রমাগত জবাবও দিতে হবে, তারা কি দরিদ্র নয়? তবে তারা কেন এত খরুচে, এত অপব্যয়ী? এই অপব্যয়ের কারণেই তো সার্বিক সামাজিক উন্নয়ন হয় না।

সম্ভবত সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল, জাতীয়তাবাদীদের আলাপচারী রাজনীতি অনুসরণ করার ক্ষমতা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক দিকে জনতার মাঝে নানা আস্থাকেন্দ্রিক সম্পর্ককে আঁকড়ে টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা, তাই তাদের ভ্রাম্যমাণতা, জনসমাবেশ, নানা উৎসব উদ্যাপন, অন্য দিকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি সম্পর্কে অনীহা এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যার মূল কথা, ‘জনতার মাঝে বন্ধু আছে, রাজনীতিতে বন্ধু নেই।’

বন্ধু ছাড়া রাজনীতি চলবে কী করে? কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির হালহকিকত সম্যক না বুঝলে, মোর্চা তৈরি হবে কী করে, আর বন্ধুই বা পাওয়া যাবে কী করে? জনপ্রিয়তাবাদীরা হয়তো এ রাস্তা ধরতে পারে না। অন্য দিকে এই সর্বব্যাপী ক্ষমতার সামনে বন্ধুত্ব ছাড়া বাঁচাও অসম্ভব। তখন আত্মসমর্পণ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি সর্বস্বদের সামনে অন্য কোনও পথ নেই। কিন্তু জনপ্রিয়তাবাদীরা কোন নতুন পথে যাবে? কোনও নতুন বিকল্প কি সম্ভব, যার সাহায্যে জনপ্রিয়তাবাদীরা নিজস্ব রাজনীতির স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে পারে, আবার বন্ধু সংগ্রহও করতে পারে, এবং তার মাধ্যমে পরাক্রমশালী এই নতুন ক্ষমতার বিরোধিতা করতে পারে?

উদীয়মান ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সাফল্য লাভ করা জনপ্রিয়তাবাদীদের পক্ষে দুরূহ। জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি জনতার সমাবেশ করতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক পদ্ধতি ও সংস্কৃতিতে কোনও পরিবর্তন আনতে পারে কি? হয়তো কিছুটা পারে। কিন্তু যে হেতু জনপ্রিয়তাবাদী আমলে প্রশাসনিক বর্ম অত পুরু নয়, বা প্রশাসন দলীয় সাহায্য পায় না, বড় ধাক্কা এলে ধাক্কা সামলানো শক্ত হয়ে পড়ে। তখন জনপ্রিয়তাবাদীদের আত্মসমর্পণ করতে হয় আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে। যদি জনতা দেখে যে জনপ্রিয়তাবাদী শাসক তাদের রক্ষা করতে পারছে না, তখন তারা জনপ্রিয়তাবাদী শাসককে ছেড়ে চলে যাবে।

উদীয়মান ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধের পথ তবে কী? জনপ্রিয়তাবাদীদের সারি থেকে কোনও আধুনিক শাসক কি উঠে আসবে, যে একাধারে জননেতা, অন্য দিকে শক্ত প্রশাসক? যে শাসন পার্টিকেন্দ্রিক নয়, অথচ গণশাসন ও তার জন্য উপযুক্ত সংগঠনকে মূল্য দেয়?

জনপ্রিয়তাবাদের এই নতুন বিবর্তন ঘটবে কি না, তা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জনপ্রিয়তাবাদের বিবর্তনের সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়নি। জনপ্রিয়তাবাদ শুধু কৌশলসর্বস্ব রাজনীতি নয়। তার রণনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশের সম্ভাবনা আছে। তার প্রয়োগপদ্ধতির ভিত্তিই হল সমাজের বিভিন্ন ফাটল, যাকে অবলম্বন করে তার স্ফুরণ হয়। প্রতিরোধ করা তার রক্তে।