সমাজ -জীবনের রোজনামচা

নজরুল ইশতিয়াক।। কোন কোন সময় বিশেষ পরিস্থিতি কিংবা উপলক্ষ্য আসে,  যখন ভিতরের ক্ষত প্রকাশ হয়ে পড়ে। কসমেটিক চেহারাও লুকিয়ে রাখা যায় না। মন ভুবনের বিক্ষিপ্ত  অবস্থার প্রতিচ্ছবি প্রতিটি আচারণে প্রকাশ হয়, এটা ধরতে পারে একজন শান্ত- শিষ্ট মানুষ। এই যে সত্য এটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, সমাজ কিংবা দেশের বেলায় একই । 

আপনি হয়তো এতদিন পুরোপুরি জানতেনই না  এক সাথে, একই ঘরে থাকা মানুষটা কেমন। সময় ও বাস্তবতা সেটিকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে দেয়নি। সারাদিনের দৌঁড়ঝাপের ব্যস্ততা শেষে খাওয়া-দাওয়া, ক্ষণিক সময়ের ক্লান্তি এবং ঘুমের মধ্যে বন্দি জীবন, সবার ক্ষেত্রে কম বেশী এমনই। সীমাহীন রুগ্ন অস্থির বাজে কয়েদী অথচ অবাধ্য জীবনে যা হয় তাই-ই হচ্ছে এখন বহু ঘরে। লুকোচুরির বিভ্রান্তি থেকে পালিয়ে বাঁচা জীবনে যা হয় তারই চিত্র আমরা বর্তমানে দেখছি। এভাবেই করোনাকালীন এই সময়ে থলের বিড়ালই যেন বের হয়ে আসছে। চরম নিষ্ঠুরতার চিত্র ফুঁটে উঠছে পরিবারে ঘরে ঘরে। পারিবারিক বহুমাত্রিক নির্যাতন নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব উদ্বিগ্ন। উন্নত দেশের মতো না হলেও  আমাদের দেশে ইতোমধ্যেই এসব পারিবারিক  সামাজিক নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে কথা উঠছে। খোদ সৌদী আরবে তালাক বাড়ছে। অথচ এই দেশটি এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ মানুষের কাছে মডেল। অথচ  মডেল তো কেবল হযরত মুহাম্মদ ( যার কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। সেটা না হয়ে সৌদী আরবের বহু গল্পগুচ্ছ মডেল হয়ে আছে। আর তেল- হজ ওমরাহর টাকায় ক্ষমতান্ধ সৌদী ধনকুবেররা এখনো নারী ও দাস দাসীদের গণিমতের মাল মনে করে। 

সে কথা থাক, এতদিনের গভীর প্রেম! দায়িত্বই যেন উগরে পড়ছে বর্তমানে। যারা মদ খেত, হোটেলে মোটেলে, প্রমোদ বিহারে, সমুদ্রবক্ষে সময় কাটাতো, জুয়া হাউজিতে মত্ত থাকতো তাদের জন্য করোনা বেশ খারাপ সময়। আবার যারা পরকীয়া, পরচর্চা টাঙকিবাজী করে সময় কাটাতো তারাও বেশ মুশকিলে রয়েছেন। অফিস পাড়ায় আডডাবাজী, খোশগল্প, গা ঘেষে বসা, দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও একটা বিপদরেখা এখনও বহাল। মলে মলে, বারে ক্যাফতে সমাগম নেই বললেই চলে। ভরসা শুধু মোবাইলে অনলাইনে নির্যাতনের নতুন প্রবাহে। মসজিদে, কোরআন তেলওয়াত এবং করোনা সংবাদগুলোতে। অনেক বাসায় দীর্ঘক্ষণ কোরআন তেলওয়াত ও নামাজ পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই কবে যাবে করোনা? করোনা চলে গেলেই যেন সব সংকট শেষ হয়ে যাবে। কি সুন্দর সমীকরণ!  জীবন পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। 

আমরা দেখছি এক পীঠের জীবন। 

মুদ্রার দুই পীঠ না দেখে সত্যটা উপলব্ধি করা যায় না। 

বয়ে যাচ্ছে জীবন প্রকৃতি। শত জীবনই সমাজ সৃষ্টি করেছে। ফলে সমাজের অবস্থা জীবনের বাইরে নয়। আমরা সমাজকেও ধরতে পারবো একটু নজর দিলে।  

এতদিন উন্নয়নের বিরাট বিরাট লেকচার শুনে বাঙালি যখন মারা যাচ্ছিল, ঠিক তখনই এক পশলা বৃষ্টির জল হয়ে এসেছে করোনা। এক পশলা করোনা বৃষ্টিতেই যেন সয়লাব সর্বত্র। গা বাঁচাতে অনেকে গর্তে ঢুকলেন, ব্যবসা বাঁচাতে প্রণোদনা চাইলেন, শ্রমীক মেহনতি মানুষের জন্য কারো কারো অতিশয় প্রেমাভক্তি দেখা গেল। 

কিন্তু শ্রমীক প্রেম যে কতটুকু  তা তো অনুসন্ধানী মাত্রেই জানেন। রক্তচুষে খাওয়া যে সব ব্যবসায়ী দেশ বিক্রি করতে পারে, ব্যাংক লুট করতে পারে, তারা দেখাবে শ্রমীক ভালোবাসা! 

পুরো অর্থনীতিই তো লুটপাট করেছে ব্যবসায়ী, ব্যাংকের এমডি পরিচালকরা মিলেমিশে।  

প্রযুক্তি সুবিধা ব্যবহার করে  হয়তো নতুন কোন লুটপাটের আয়োজন অব্যাহত রয়েছে, সেই অজানা সংবাদ চিত্র আগামীতে জানা যাবে। 

আর করোনা চিকিৎসার নামে নতুন নতুন বাণিজ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচছে।  কেবলই বাণিজ্যে বসতি গেড়েছে জীবন। ভোগবাদী জীবন ও উন্নয়নের ক্ষত তো করোনার চেয়ে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। কোন পথে যাবি মনা ঠিক হইলো না তোর।  কি অদ্ভুত সমৃদ্ধি?? 

কত বিশৃঙ্খল সমাজ। আর কতটা প্রাজ্ঞ আমাদের পরিস্থিতি মোকাবেলাকারী কর্তৃপক্ষ!!!  হাহাকার আর্তনাদ লোক দেখানো মাইকিং।  রঙ লাগিয়ে ক্ষত ঢাকবার শত ব্যবস্থাপনা। এমনকি ওয়াজ নসিহতের  বাণিজ্যে নয়া সংযোজন হয়তো মিলবে কিছুদিনেই। অন্যদিকে সাধারণ ওয়াজীরা বাজার জমাতে মানে নামি দামী কাটতি হুজুরদের ফিল্ড বাড়াতে  আগের চেয়ে আওয়াজ বাড়িয়ে বলতে  পারে মহিলারা পর্দা না করলে, স্বামী সেবায় মনোযোগ না দিলে, নারী শিক্ষা বাতিল না করা হলে সর্বপরি আল্লাহর আইন  না জারি করা হলে, আগামীতে বড় আঘাত   নাজিল করতে পারে! তাহলে কি করোনার ফলাফল হলো সাময়িক বেহুদা অবস্থা মাত্র! আবার ছুটবে, গান গাইবে, সে গানে গানে জীবন বয়ে যাবে কোন উত্তর না দিয়ে?