সমাজ উন্নয়নে গণতন্ত্র ও সুশাসন- ২

আইনের শাসন অনুসরণ: সঠিকভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণে রাষ্ট্র পরিচালনার সকল পর্যায়ে আইনের শাসন অনুসরণ করা জরুরী।  কোন ধরণের অনুরাগ বা বিরাগের শিকার যাতে কোন নাগরিক না হন তা’ নিশ্চিত করা গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা উপরের আলোচনায় দেখতে পেলাম সমাজ উন্নয়নে গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভূমিকা। কিন্তু আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ এবং এমনিতর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দিকে আলোকপাত করলে যে চিত্রটি দেখা যায় তা’ রীতিমত হতাশাজনক। এসব দেশগুলোর অনেক ক’টিতে নামমাত্র গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি বহাল থাকলেও বাস্তবতায় সেসব দেশে সুশাসনের উপাদানসমূহের বড্ড অভাব। আর এ কারণেই সেখানে সমাজ উন্নয়নের ধারা হয় থমকে আছে নয়তো তা’ পশ্চাদমুখী। লেবাননের সাবেক রাষ্ট্রপতি Emile Lahud যথার্থই বলেছেন, `Democracy, good governance and modernity cannot be imported or imposed from outside a country.’ গণতন্ত্র, সুসাশন এবং আধুনিকতা দেশের বাইরে থেকে আমদানী করা বা চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের মত দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের উন্নয়ন ঘটাতে হলে সুশাসনের উপাদানগুলির চর্চার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী।

গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই যেসব মানুষদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো দরকার তাদের মধ্যে আছেন- (ক) জাতীয় পর্যায়ের সরকারি নীতি নির্ধারক, নিয়োগকৃত স্থানীক নীতি নির্ধারক, আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক নীতি নির্ধারক, (খ) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম, (গ) মধ্যবিত্ত, (ঘ) ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ট্রেড ইউনিয়ন, (ঙ) মধ্যম শ্রেণীর সরকারি চাকুরিজীবী, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের কর্মকর্তাবৃন্দ, সুশীল সমাজ ইত্যাদি,  (চ) এনজিও, সিবিও ও (ছ) দিনমজুর, নিুস্তরের সরকারি কর্মী, অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, নারী। সমাজের যে শ্রেণীর মানুষের উন্নতির কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই অর্থনীতির মাপকাঠিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।

উপসংহার:

রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার প্রায় সবটাই জুড়ে আছে মধ্যবিত্ত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় আরো বিশুদ্ধভাবে যাকে বলা হয় পেটিবুর্জোয়া শ্রেণী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একাত্তরে যে সশস্ত্র বিপ্লব এখানে সংঘটিত হয়েছে, তাও প্রকৃতপক্ষে একটা পেটিবুর্জোয়া-বিপ্লবই। স্বাধীনতা লাভের পর প্রায় চল্লিশটি বছর কেটে গেলো। এখনো শাসনক্ষমতায় ও সমাজের নেতৃত্বে যে পেটিবুর্জোর কর্তৃত্ব চলছে, তার না ঘটছে কোনো শ্রেণী রূপান্তর, না ঘটছে তার বিকাশ, না বিলুপ্তি, বিনাশ। এখনো কার্যত একটা স্থিতাবস্থাই চলছে গত চল্লিশ বছর ধরে। না বাস্তবায়িত হচ্ছে সুশাসন, না হচ্ছে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনির্মাণ। ফলে ব্যাহত হচ্ছে সমাজের উন্নয়ন।

রাষ্ট্রের অনুন্নয়ন, সমাজের বন্ধ্যত্ব, সব এই স্থিতাবস্থা ও স্থবিরতার কারণে। এর পেছনে মূল কারণটি অবশ্যই অর্থনৈতিক; পুঁজির ঘনীভবন এখানে ঘটছে না, গড়ে উঠছে না স্বাধীন নিজস্ব পুঁজি। স্বাধীন ভূখণ্ড ও জাতিরাষ্ট্র কায়েম হওয়ার পরও বিদেশী লগ্নিপুঁজির প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণই এখানে বজায় রয়েছে, যা এখানকার স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি ও পুঁজির বিকাশকে ব্যাহত করছে। পুঁজিবাদের স্বাধীন, সুস্থ, স্বাভাবিক বিকাশ ঘটছে না এ সমাজে, ফলে, একটা বিকৃত ও নিকৃষ্ট পুঁজির শাসনের সবরকম লক্ষণই ফুটে উঠছে।

বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটেনসহ ইউরোপের অনেক দেশে বিপ্লব সংঘটিত হয়। তার সঙ্গে আসে পুঁজিবাদ, যার একটি অনিবার্য ফসল হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সে মধ্যবিত্ত শ্রেণী রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রকেই নিয়ন্ত্রণ করে। এশিয়া ও অনেক মহাদেশেই তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। যে সব দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উন্নতি যত বেশী হয়েছে সেসব দেশের সামাজিক উন্নয়নের অবস্থান উপরের সারিতে। সে সব দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামো অনেক বেশী শক্তিশালী এবং সে সব দেশে সুশাসন-এর উপাদানগুলো অনেক বেশী কার্যকরী।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই জাতিরাষ্ট্র কায়েমের পেছনে মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই অবদান সবচেয়ে বেশি; তার সুদীর্ঘ সংগ্রাম, রক্তদান, বিশাল ত্যাগ-তিতীক্ষার ফলেই এ ভূখণ্ডে বিশ্বের প্রথম স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্র কায়েম হয়েছে। সাতচল্লিশে দেশভাগের পর ষাটের দশক পর্যন্ত এ ভূখণ্ডে মধ্যবিত্ত ক্রমশ তার আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্নকে লালন ও বিকশিত করার মধ্য দিয়ে জাতীয় আত্মপরিচয়ের স্থানটুকু সংহত ও সুদৃঢ় করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালায়। তারই সুস্পষ্ট ফলাফল বাহান্নর রক্তক্ষয়ী ভাষা সংগ্রাম, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ঐতিহাসিক ৬ দফার সংগ্রাম, আর ঐতিহাসিক ১১ দফাভিত্তিক ঊনসত্তরের মহান গণঅভ্যুত্থান। এ সবই বাঙালি মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও আত্মবিকাশ থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সে সংগ্রামেরই অনিবার্য যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও তার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন।

মধ্যবিত্তের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের কথা বলতে গেলে অমর কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্পের কথাই মনে হয়। ‘সবার আগে চাই’ নামের সে গল্পে আছে এক ছাপোষা মধ্যবিত্তের কথা। জীবনযুদ্ধে হিমশিম খাওয়া এক মানুষ ঘরের দাওয়ায় বসে ভাবছিল, কী করা যায়। সামনে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এক পড়শীকে ছুটতে দেখে তার গন্তব্য জানতে চাইলো সে। পড়শী ছুটছে ময়দানে, মিটিংয়ে, মিছিলে, তার কথা হলো, ‘সবার আগে শান্তি চাই।’ সেকথা শুনে মানুষটাও নেমে এলো দাওয়া থেকে, ছুটে চললো পড়শীর সঙ্গে, তারও সবার আগে শান্তি চাই।

মানিক বাবুর এ গল্পটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালের মধ্যবিত্তের প্রত্যাশার গল্প। আজ যুদ্ধ নেই। কিন্তু তবুও আজ ধর্মীয় গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, হিংসা-দ্বেষ, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈতিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়, অপসংস্কৃতি, কূসংস্কার, শোষণ-বঞ্চনা-প্রতারণা মানুষের জীবনকে বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা হুমকির সম্মুখীন। আজ লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার পদে পদে। সব মিলিয়ে স্বাধীনতা অর্থবহ হয়নি। গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পূরণ হয়নি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের মানুষের স্বপ্ন ও আশা-আকাঙক্ষা।

ফরাসি বিপ্লবে আমরা জানি, শ্রমিক-কৃষক সর্বহারা শ্রেণীকে নিয়ে সাম্যমৈত্রী স্বাধীনতার স্লোগা দিয়ে নব্যধনিক শ্রেণী শোষণ-নিপীড়নের দুর্গ বাস্তিলকে ভেঙে গুঁড়িয়ে চুরমার করে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সামন্ততন্ত্রকে উৎখাত করে। পরে, শ্রমিক-কৃষক সর্বহারা শ্রেণী ধনিকতন্ত্রের হাতেই নতুন করে শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়। এখানে আজ অবস্থাটা তেমন নয়। শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্তের মিলিত শক্তি স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য ও বিশ্বস্ত শক্তি হিসেবেই রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছে বাঙালি নব্যধনিক শ্রেণীকে, যারা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় মূলত মধ্যবিত্ত পেটিবুর্জোয়া শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সমাজের উন্নয়ন ঘটেনি, এ ভূখন্ডে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বলই থেকে যাচ্ছে, সুশাসন যেন সুদূর পরাহত। এর কারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি ক্ষমতার মসনদে বসলেও রাষ্ট্রশক্তির স্বাদ গ্রহণের পর তারা তাদের মধ্যবিত্ত চরিত্র বদল করে বিত্তাহরণে বেশী তৎপর হয়ে ওঠে। তাদের চিন্তায় তখন গুরুত্ব পায় ব্যক্তি, পরিবার আর স্বজন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়ভার যাদের কাঁধে তাদের বড় অংশের চরিত্র যদি এ ধরণের হয়ে ওঠে তা’ হলে যা’ হওয়ার কথা তা’-ই হচ্ছে এ দেশে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের এ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামে ক্ষমতার মসনদ দখলের অশুভ লড়াই চলে, ক্ষতির সম্মুখীন হয় সাধারণ মানুষ। এক স্থায়ী অচলাবস্থা ও স্থিতাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে। অনেক ক্ষেত্রেই এ কারণে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের পরিবর্তে বিপ্রতীপ ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে।

এ অচলাবস্থা ও স্থিতাবস্থার অবসান না ঘটাতে পারলে এ দেশের সাধারণ জনগণের মুক্তি নেই। সুকান্তের ‘মধ্যবিত্ত ’৪২’ কবিতাটিতে সে সময় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কবলিত দেশের পূর্বপ্রান্তরের ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এখনো তাই কিছু প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে :

পৃথিবীময় যে সংক্রামক রোগে,

আজকে সকলে ভুগছে একযোগে,

এখানে খানিক তারই পূর্বাভাস

পাচ্ছি, এখন বইছে পূর্ব-বাতাস।

বাংলাদেশে সাধারণ নাগরিকদের হতাশা এবং অবক্ষয় গ্রাস করেছে, ঘুঁচছে না তার স্বভাবগত দোদুল্যমানতা, সিদ্ধান্তহীনতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব। ঘুঁচছে না তাদের বন্ধ্যাত্ব ও দেউলিয়াপনা। হতাশা থেকেই জন্ম নিচ্ছে চরমপন্থা, নকশালপন্থা, জঙ্গিবাদ, উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ। জন্ম নিচ্ছে জনবিচ্ছিন্নতা, সুবিধাবাদ, সংকীর্ণতা, আত্মকেন্দ্রিকতা। এ মহাসংকট থেকে উত্তরণের জন্য দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে আর এর মাধ্যমেই ঘটবে সমাজের উন্নয়ন।