সময়ের সাফ কথা….আমরা ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শে হানিফ


সাদিকুল হক ॥ আল্লাহ আদেশ করেছেন – ‘কুল বাল মিল্লাতা ইব্রাহিমা হানিফা’ (২:১৩৫)। অর্থাৎ, ‘বল, আমরা ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শে হানিফ।’ আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে মানবজাতির নেতা হিসেবে মনোনীত করেছেন (২:১২৪); মক্কার কাবাঘর ইব্রাহিম (আ.)-ই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন (২:৯৬)। মানব-ধর্মে সংকল্পের বিধান তাঁর সময় থেকে। এক উপাস্যের তত্ত্ব দিয়ে তিনিই প্রথম প্রার্থনা বা সালাতের পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন। মৌলিকভাবে মানব ধর্মের সূচনা করেছিলেন ইব্রাহিম (আ.)। তিনিই ধর্ম বিধান দিয়ে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন (২:১৩১, ১৩২)। তাই কুরআন আদেশ করে – তোমরা হানিফ হয়ে ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর, ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শে হানিফ হও। কুরআনের আদেশটি পালন করা অবশ্য কর্তব্য।

হানিফ অর্থ একনিষ্ঠতা।একের প্রতি নিষ্ঠা আছে যার কেবল তার ক্ষেত্রেই আরবি হানিফ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। হযরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর আবিভার্বের পূর্বেও একনিষ্ঠ মানুষ ছিল। এই একনিষ্ঠ সম্প্রদায়কে বলা হতো হানিফ সম্প্রদায়। ইব্রাহিম (আ.)-এঁর একনিষ্ঠতার বিবরণ সকলেরই জানা। স্বজাতির লোকেরা তাঁকে নিক্ষেপ করেছিল জ্বলন্ত আগুনে। কিন্তু কোন প্রতিকূলতাই টলাতে পারেনি একত্বের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও সমর্পণ।

ইব্রাহিম (আ.)-এঁর ধর্মাদর্শের সারকথা হানিফ। হানিফ বা একনিষ্ঠতা ব্যতীত ইব্রাহিমের ধর্মাদর্শ পালন করা যায় না। হানিফ না হয়ে বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান পালন করলে দুনিয়া ও আখেরাত, অসার-অন্ধকার। হানিফ ব্যতীত মানব জীবন মূল্যহীন। হানিফ হলো আকাশ ও পৃথিবীর একমাত্র পালনীয় ধর্ম। গোটা মহাবিশ্বই কায়েম হয়েছে হানিফকে কেন্দ্র করে। মানব জীবনে হানিফ প্রতিষ্ঠার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে চাঁদ, সূর্য, সমুদ্র, আকাশ, বাতাস তথা মহাবিশ্ব। হানিফের জন্যই বিধিবদ্ধ হয়েছে জান-মাল ত্যাগের বিধান। আকাশ ও পৃথিবী তথা গোটা মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। সকল নিয়ামত ও বরকতের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি অদ্বিতীয় ইলাহ্, তাই ইবাদত বন্দেগীর সকল ধরন-ধারণ, অনুভূতি, ভাব, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান নিবেদিত হবে কেবল মাত্র তাঁরই উদ্দেশ্যে। যারা হানিফ ভাবের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করতে নারাজ, যারা একত্বের শীতল  ছায়ায় নিজেদের দাঁড় করাতে অনিচ্ছুক, যারা আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কাউকে মাবুদ বলে মানে, তারা অশান্তিতে আছে, ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি থাকা সত্ত্বেও আকাশ ও পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় সত্য হানিফকে ধারণ না করার কারণে তারা মানুষ হয়েও সাধারণ জীবে অধঃপতিত।

হানিফ সবচেয়ে মূল্যবান শক্তি, যা একজন মানুষ এ পৃথিবীতে অর্জন করতে পারে। হানিফ এর সাথে যার মৃত্যু হলো সে মৃত্যুঞ্জয়ী হলো। যে ব্যক্তি হানিফকে অন্তরে ধারণ করে, হানিফ তার সকল পাপ মুছে দেয়। হানিফই হলো বড় মাধ্যম, যা অবলম্বন করে একজন মানুষ তার সৃষ্টিকর্তার নিকটবর্তী হয়। হানিফের মাধ্যমেই অর্জিত হয় শান্তি ও স্থিরতা।

হানিফ অবলম্বনের জন্য প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শিরক থেকে বেঁচে থাকার জন্য যে যতটকু অগ্রসর হয়,সে ততটুকুই নিরাপত্তা পায়। হানিফ এর সারমর্ম – সৃষ্টি একমাত্র আল্লাহই করেন, রিযক একমাত্র আল্লাহই দান করেন, জীবন ও মৃত্যু একমাত্র আল্লাহই দেন। মহাবিশ্বের পরিচালনা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই করেন। ইবাদত-বন্দেগী, প্রার্থনা, নজর-মান্নত, বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া, সাহায্য চাওয়া ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহর  উদ্দেশে নিবেদিত। ‘আপনারই আমরা ইবাদাত করি এবং আপনারই নিকট  সাহায্য চাই’ (১:৫)।

হানিফ এমন একটি বিষয়, যা সদা যত্নের দাবি রাখে। হানিফকে সদা আলোকোজ্জ্বল ও স্বচ্ছ-শুভ্র রাখার জন্য প্রয়োজন হয় সার্বক্ষণিক পরিচর্যার। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা -তিনি যেন আমাদের নিয়ত সংশোধন করে দেন। আমাদের ধর্ম চর্চাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে যথার্থ রূপে হানিফ শক্তিতে শক্তিবান হওয়ার তাওফীক দান করুন। আপনি আমাদেরকে যথার্থ রূপে হানিফ বাস্তবায়ন করার তাওফীক দিন। আমরা যেন কখনো কোনো র্শিকে লিপ্ত না হই সে তাওফীক আমাদের দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বুল আলামীন।