সময়ের সাফ কথা…. – অ-ঘৃণা আদর্শের একটা প্রধান স্তম্ভ

সংলাপ ॥ দেশবসী জানেন, মন্দ কাজের জন্য শাস্তি না দিলে সমাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, কিন্তু তবুও ক্ষমা করা শ্রেয়। আমাদের উচিত ওদের চিন্তা পাল্টানোর জন্য চেষ্টা করা।

ঘৃণা জিনিসটা নিয়ে গভীর ভাবে ভাবলে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের জন্য কাউকে ঘৃণা করাটা জরুরি নয়। ভুল ভাবনায় ওদের দোষ দেয়া যায়না, ওদের জন্য কষ্ট অনুভব করতে হবে, ওরা একটা ভুল ভাবনার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই, ওদের প্রতি, আমাদেরও প্রতি,সকলের প্রতি প্রশ্ন: আমি যা ঠিক বলে চিন্তা করি, আমার নিজেরই বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে স্ত্রী যখন সেটা না করে, যখন কোনও ভুল করে, আমি কি তাকে ‘ঘৃণা’ করি, না কি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি?

নিজের লোকেদের ক্ষেত্রে যখন তা-ই করি, অন্যের ক্ষেত্রেও সেই একই কাজ করব না কেন? তাদের ততটা আপন ভাবতে পারব না কেন? অ-ঘৃণা’ই আদর্শের একটা প্রধান স্তম্ভ।

যে মুহূর্তে ঘৃণাকে বড় করে দেখা যায়, ঘৃণা ‘মহৎ’ হয়ে ওঠে। কোনও ক্ষুদ্র সংকীর্ণ সাংসারিকতা থেকে তার উৎপত্তি নয়, দেশকে বাঁচানোর নামে, জাতিকে নবজীবন দানের নামে যখন ঘৃণার বিকাশ, তখনই তার ‘মহত্ত্ব’। প্রবল হয়ে উঠতে পারে সেই মহত্ত্বের দায়বোধ। হঠাৎ আবেগের বশে এ কাজ করা যায় না। ভেবেচিন্তে, অনেক ‘সাধনা’র পথ বেয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়।

দুই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিত্ব পরস্পরের সামনা-সামনি হননা। তারা দুটি আলাদা চিন্তাধারার দুই পরাক্রান্ত প্রতিনিধি। ওই দুই ধারার মূল দ্বন্দ্বটা হলো ‘ধর্মীয় তোষণবাদ’ আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ রক্ষা’র মধ্যে। দ্বন্দ্বটা ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মান্ধতার মধ্যে। কিন্তু দ্বন্দ্বটাকে আমরা যখন আদর্শ-উদ্দেশ্য-তত্ত্বের চক্করে না ফেলে দুটো আলাদা মানস-জগতের মধ্যে দেখতে চেষ্টা করবো, তখন স্পষ্ট হবে যে, এক দিকে দাঁড়িয়ে আছে ‘অ-ঘৃণা’র মানসজগৎ, অন্যদিকে ‘বড় ঘৃণা’র মানসজগৎ।

দুই মানসিকতা পরস্পরের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ঝকঝকে যুযুধান: তাদের মধ্যে কোনও বোঝাপড়া হয় না, হওয়ার কথাও নয়, দুই পক্ষই অন্য পক্ষকে ভুল পথের পথিক ভাবেন।

অহিংসা দিয়ে ‘অ-ঘৃণা’কে পুরোটা বোঝা যায় না। অহিংসার ‘অ-সাধারণ’ আদর্শ ছাড়াও একটা খুব সাংসারিক ভালবাসার ‘সাধারণ’ আদর্শ এই অ-ঘৃণার মধ্যে বহমান। পুত্র কন্যা ভুল করলে তাদের যেমন শুধরে দেয়া হয়, অন্যদেরও তাই করা, দূরে ঠেলে ফেলা না,সকলকে একটা ‘আপন’ বৃত্তের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। সেই আপন বৃত্তে এমন লোকও থাকতে পারে, যাকে ততো ভালবাসতে পারা যায় না। কিন্তু ভাল না বাসার মানেই কি ঘৃণা করা? এ-ই কি আমরা শিখি সংসারে? না। ভাল-মন্দ সবাইকে পাশে নিয়ে চলতে শিখি। তবে দেশ বা সমাজেও তাই নয় কেন?

অনেক রকম সমস্যা রয়েছে মানুষের জীবনে; সেই সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করা যেতে পারে। সৎ আন্দোলন হলে জনগণ পাশে দাঁড়াবেই। কিন্তু ক্ষমতা লাভের ইচ্ছায় যখন একমাত্র আন্দোলন হয়ে থাকে, তা অবলুপ্ত হতে বাধ্য।

কথা হোক। আলোচনা হোক। মানব মনস্তত্ত্ব দর্শন বলে আমরা সব সময় পৃথিবীর সমস্ত ঘটনা, সমস্ত বিষয়কে শ্রেণিবিভাগ করি। কোনও রাজনৈতিক নেতা, তিনি সফল হলেও তার মধ্যে কিছু ভাল থাকে, কিছু খারাপ থাকে। সর্বদাই একজন নেতা ভাল এবং খারাপের সংমিশ্রণ। শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তার সেই সাফল্যের প্রশংসা করে দেশের মানুষ। এ কথা সত্য, অন্য কোন রাজনীতিক পারেননি, তিনি পেরেছেন। দেশের মানুষ তাকে বিশ্বাস করেছেন এবং এখনো করেন। পদ্মা সেতুকে কে জনপ্রিয় করে শুধু দেশে নয়, গোটা পৃথিবীর সামনে নিজের সাফল্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। কঠোরভাবে ধর্মীয় সন্ত্রাস দমন দেশের মানুষকে বিপুলভাবে আন্দোলিত করেছে। হিংসা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রেম-ভালবাসা, শান্তি ও অহিংসার আবহ  তৈরি করতে হবে বলে সাধারণ মানুষ তার আন্তরিকতাকে পছন্দ করছেন। ধর্মভিত্তিক ধর্মান্ধ ব্যবস্থার দেশগুলোর জনগণকে আতঙ্কিত করে তুলছে বিশ্বব্যাপী। আমরা জনগণের ভোট ও মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, তাদের মতামতকে শ্রদ্ধা করি। জনগণ যে দিকেই ভোট দিক না কেন আমাদের সেটাকে মূল্যায়ন করার দয়িত্ব আছে। জনগণের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়ার অধিকার আমাদের কাউকে দেয়া হয়নি।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ঐশি ধর্মের মূল বিষয়। ইসলামে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় মানুষকে যে পূর্ণতায় পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে তার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তা-চেতনার পার্থক্য রয়েছে। তারা রাজনৈতিক উন্নতি বলতে কেবল শিল্পোন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণমূলক কর্মকান্ডকেই বুঝিয়েছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোনো পরিস্থিতি পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা উচিত রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থার। রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় ঐশি মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার। সব শ্রেণীর মানুষের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া এবং আদর্শ ভিত্তিক প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা যা কিনা জনগণের ভোটে নির্ধারিত । 

জনগণের শাসন ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা হিসেবে অভিহিত করে রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও গণতন্ত্রের এ ধারা ছড়িয়ে দেয়া উচিত যা মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণার বিষয়ে পরিণত হতে পারে।