সময়ের সাফ কথা…. শিক্ষা নিয়ে নতুন চিন্তার সময় বয়ে যায়!

শেখ উল্লাস ॥ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং এই প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল পরীক্ষা (জেডিসি) পরীক্ষাসমূহ এ বছরের জন্য বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ মাস ধরে বন্ধ থাকার পর গত ১২ ভাদ্র ১৪২৭, ২৭ আগস্ট ২০২০ বৃহস্পতিবার এক সরকারি ঘোষণায় এগুলোতে ছুটির মেয়াদ আগামী ০৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানোর হয়েছে। অর্থাৎ কোনো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা ছাড়াই ২০২০ শিক্ষাবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার অবস্থা ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসজনিত অতিমারীর এই সময়ের বাস্তবতা হচ্ছে, এই ভাইরাসের সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরেই রয়েছে। প্রতিদিন আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যাটাও বড় হচ্ছে দিন দিন।

এমনিতেই দেশে বাণিজ্যিক, ব্যবসায়িক এবং বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যমূলক অবস্থা ও ব্যবস্থার কারণে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সঠিক শিক্ষাপ্রদানের ক্ষেত্রটি এবং এর বাস্তবতা নিয়ে নানা কথা, নানা অভিযোগ ছিল করোনা ভাইরাস আসার আগে থেকেই। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে, এর শিক্ষকদের জন্য এক সময় যখন আর্থিক প্রতিপত্তি ছিল না, অবকাঠামোগত অবস্থা ছিল খুবই অনুন্নত, অধিকাংশ ছিল টিনের ঘর, তখন সেখানে যে মানের শিক্ষক ছিল, ওই শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ ছিল, সেখানকার সমাজ ও পরিবেশের ওপর তাঁদের একটি প্রভাব ছিল। শিক্ষার্থীরাও ছিল সমাজ-মনস্ক। সমাজে কোনো অন্যায় দেখলে ছাত্র-যুবকরা প্রতিবাদমুখর হতো। কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা হচ্ছে,শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ‘কালচার’টা আগের মতো নেই। বাহ্যিক সুযোগ-সুবিধাই যেন অনেক বেড়েছে, এই প্রতিযোগিতাতেই এখন যেন সবাই ব্যস্ত! এখন অবস্থাটা এরকম যে, সবাই এখন ‘ক্যারিয়ারিস্ট’। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। আগে শিক্ষকরা সামাজিক কাজে শিক্ষার্থীদেরকে এগিয়ে দিতেন। নিজেরা পেছন থেকে দিক-নির্দেশনা দিতেন। এসবের মধ্য দিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে একটা আস্থার বিষয় ছিল এরকম যে, তাদের সন্তানরা খারাপ কিছু করবে না। সমাজের কাজে অর্থাৎ, উপকারে আসবে ধরে নিয়ে সন্তানের কাজে বাবা-মায়ের মৌন সমর্থন থাকতো। আর শিক্ষার্থীদের প্রতিও সমাজের একটা স্নেহ, সহানুভূতি, আস্থা ও আশা-ভরসার সম্পর্ক ছিল। নানা রকমের খেলাধুলা করে, আড্ডা দিয়ে, ঘন্টার পর ঘন্টা পুকুরে সাঁতার কেটে সময় কাটতো। শিক্ষার্থীরা ছিল এলাকার সকল সামাজিক কর্মকান্ডে অগ্রণী কর্মীবাহিনী। ফলে কোথাও কোনো অশুভ ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসতো। তাদের অভিভাবক হিসেবে থাকতো বয়োজ্যেষ্ঠরা এবং এলাকার শিক্ষকেরা। শিক্ষার্থীরা কোনো ব্যাপারে সোচ্চার হলে তাদের পক্ষে মিলতো অকুণ্ঠ সমর্থন। কোণঠাসা হয়ে পড়তো অসামাজিক কাজে জড়িতরা, তাদের ইন্ধনদাতারা। এখন সেই অবস্থাটির যেন বড় অভাব! এখন সবাই আত্মকেন্দ্রিক, বিচ্ছিন্ন। শিক্ষার্থীরা জিপিএ’র চিন্তায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোচিং,হোমওয়ার্ক ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত। তাদের অবসর কাটে মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখে,বান্ধবহীন, উদ্যমহীন নির্লিপ্ততায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযোগ্য, অদক্ষ, অপ্রাসঙ্গিক এবং স্কুল-কলেজ পরিচালনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাঞ্চিত লোকদের দাপটে তটস্থ শিক্ষকেরা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের নিদারুণ অনুপস্থিতি, মূল্যবোধ গঠনের কোনো চর্চার কথা বলা তো দূরের বিষয়। শিক্ষকরা ব্যস্ত ক্লাস, কোচিংসহ একাডেমিক কাজে, নিজেদের টাকার ক্যারিয়ার রক্ষায়, প্রতিযোগিতায় স্কুলের অবস্থান ধরে রাখার চাপে। সমাজ, পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা থেকে গাঁ বাঁচিয়ে চলেন তারা।

শিক্ষক হিসেবে সমাজে মতামত, সংগঠক, পরামর্শক, অভিভাবক, পথ-প্রদর্শকের কোনো ভূমিকায় নেই তারা। অভিভাবকদের দৃষ্টিও নিবদ্ধ যার যার সন্তানের প্রতি। নিজের সন্তানকে আগলে রাখেন, তাকে নি:সঙ্গ, সমাজবিমুখ নির্বিকার স্বার্থপর মানুষ হিসেবে বড় হওয়ার পথটাকেই খোলা রাখেন। ফলে সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ তৈরি হয় না, প্রতিবাদ বা প্রতিবাদের ভাষায় শিক্ষা হয় না।  ৩০/৪০ বছর আগে এদেশের স্কুলগুলোর অবস্থা এবং স্কুলছাত্রের জীবনস্মৃতির সাথে মিলিয়ে দেখলে আজকের অবস্থা তুলনা করলে সচেতন যে-কারোরই চোখে এই পার্থক্যগুলো চোখে পড়বে। এখনকার শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী, প্রখর। শিক্ষকরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষিত, বিশেষ করে প্রাইমারি শিক্ষায়। তবু কী যেন নেই, যা আজ থেকে ৪০ বছর আগে ছিল, লুঙ্গি-পায়জামা পড়া গ্রামের স্কুলের শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে। তবে এই প্রতিকূল অবস্থায় যেসব শিক্ষক-অভিভাবক-বয়োজ্যেষ্ঠরা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি বিবেকের দায়বোধ থেকে তাঁদের করণীয় ও কর্তব্যগুলো যথাযথভাবে করেন বা চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাঁরা অবশ্যই সময়ের সাহসী ও শ্রেষ্ঠ সন্তান।

গত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা করোনার কারণে দেশের সবক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গ্রাম-মফস্বল এমনকি শহরেরও অধিকাংশ স্কুল-কলেজে, সরকারি-বেসরকারি সবক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষাদানে সমস্যা আগে থেকেই ছিল। সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে এরকমই যে,এগুলোতে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকারাও তাদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে উপযুক্ত মনে করেন না। কারণ, নিজেরাই জানে যে, তাদের স্কুলে ঠিকমত পড়াশোনা হয় না। করোনাকালীন এই সময়টিতে শিক্ষার্থীদের অবস্থাটি কী তা শুধু ধারণাই করা যেতে পারে।     

এই অবস্থায় শিক্ষা নিয়ে নতুন চিন্তার অবকাশ রয়েছে। শ্লোগানে বলা হয়, ‘শিক্ষা সুযোগ নয় অধিকার।’ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন এবং এর সুফল এ জাতি পেয়েছিল যা অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৫ই আগষ্ট তাঁকে হত্যা করা না হলে এই সুফল শিক্ষাব্যবস্থার সর্বত্র পৌঁছে যেত, হয়তো সব স্তরের শিক্ষার জাতীয়করণ হতো, বৈষম্যের পার্থক্যটা হয়তো আরও অনেক কম হতো-সন্দেহ নেই। তবু আজকের যে বাস্তবতা সেটা হচ্ছে, শিক্ষার বিস্তার ও প্রসারে সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা-উদ্যোগ আগের চাইতে শত গুণ বৃদ্ধি পেলেও নানামুখী অব্যবস্থাপনার কারণে এবং সদিচ্ছার অভাবে অপার সুযোগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবহার করা হচ্ছে না। এর জন্য শুধুমাত্র সরকার, মন্ত্রণালয় বা প্রশাসনকে দোষ দিয়ে দায়িত্ব কারোরই শেষ হয়ে যায় না। আজকের দিনে দু:খজনক বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা আর স্বার্থপরতার কারণে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদেরকে সঠিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন না। এক্ষেত্রে জনগণ সচেতন না হলে এই অবস্থার পরিবর্তন কখনও সম্ভব নয়। সরকার ও রাষ্ট্র থেকে বর্তমানে শিক্ষার উন্নয়নে যে সহযোগিতা করা হয় তার যথাযথ ব্যবহারের সক্ষমতার ওপরই সব কিছু নির্ভরশীল। তাই প্রয়োজন শিক্ষা নিয়ে নতুন চিন্তা এবং সেটি করতে হবে সমগ্র জনগণ তথা অভিভাবকগণকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে। ভুলে গেলে চলবে না যে, ইংরেজরা এদেশে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা শিক্ষার যে ব্যবস্থাটা চালু করেছিলো তার মূললক্ষ্য ছিল তাদের চিন্তা-চেতনাসমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী তৈরি করা, ‘কেরাণী’ বানানো আর তাদের মত করে ধর্মীয় বিশেষ করে নাম সর্বস্ব ইসলাম শিক্ষার প্রসার। এক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে, তাদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েই অনেকে এই দেশবাসীকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল।

তথ্য প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের অবাধ সুযোগ-সুবিধা আজ বলতে গেলে সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে তার যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমেই কেবল এক্ষেত্রে অনেক ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। আর তা না হলে ফল হবে উল্টো। পরিবর্তন-বিবর্তন-রূপান্তরের পথ ধরে সময়ের সাথে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হলে সংশ্লিষ্ট সবার মাঝে বিবেকবোধ জাগ্রত করতে হবে- করোনাজনিত পরিস্থিতি আমাদেরকে আজ আবারও সেই কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিতে এসেছে যেন।