সময়ের সাফ কথা…. জাতি রাজনীতিক চায় না রাজনীতিবিদ চায়


সংলাপ ॥ বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করেন তাদেরই আমরা রাজনীতিক বলি। তাদের মধ্যে অন্য পেশায় সাফল্য লাভে অক্ষমতার কারণে রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নেন তাদের সংখ্যা বর্তমানে অনেক বেশী। এটা একাধারে যেমন পেশা তেমনি তাদের কাছে ব্যবসাও বটে। এ পেশা বা ব্যবসায় যেমন নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতার দরকার হয় না তেমনি দরকার হয় না পুঁজি বা মূলধনের। অবশ্য কিছু শিক্ষিত সচ্ছল এবং পেশাজীবী মানুষও এতে শামিল হয় বিভিন্ন পরিবেশ বুঝে। তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে রাষ্ট্রের শীর্ষ ক্ষমতায় আসীন হয়ে ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার ব্যবহার এবং সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা। দেশের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের মঙ্গল ও মুক্তি সাধন তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে না। যদিও তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে এসব ব্যাপারে তারা থাকে মিথ্যাচারে উচ্চকণ্ঠ। গরিব দেশের গরিব মানুষের মঙ্গল ও মুক্তি বলতে বোঝায় দারিদ্র্য বিমোচন তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সংস্থান। রাষ্ট্রীয় শক্তিকে যথার্থভাবে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হলো বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনীতি। এই গণমুখী রাজনীতির অভাবের কারণে রাষ্ট্র জনগণের বন্ধু না হয়ে কালে কালে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এ কাজটি করার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে সবসময় সরকারি দলে আগত বহিরাগত রাজনীতিক এবং ক্ষমতালোভী শীর্ষ নেতারা। তারা রাষ্ট্রক্ষমতার মাধ্যমে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেরা সম্পদশালী হয়। কিন্তু সে সম্পদের করটুকু পর্যন্ত তারা প্রদানে তাদের থাকে প্রচ- অনীহা। ওই সময় তারা একবারও উপলব্ধি করেন না যে তারা মুসলমান। তাদেরও মরতে হবে। ধর্মে মিথ্যাচার আর মুনাফেকীর শাস্তি আছে। দুঃখের বিষয় তারা তখন না থাকেন বাঙালি, না মুসলিম, না দলের আদর্শিক ধারক হয়ে। বেকার এবং দারিদ্র্র্য মানুষের বিশাল জনসমুদ্রে স্বল্পসংখ্যক রাজনীতি ব্যবসায়ীদের ধন-সম্পদ এবং প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জনের মাধ্যমে নামি-দামি হওয়ার প্রবণতা স্বাধীনতার পর হতে লক্ষ্য করার মতো। সমাজ সেটিকে মেনে না নিলেও সুযোগের অপেক্ষায় আছে। অন্যদিকে নীতি-নৈতিকতা, সত্য ও জ্ঞান দেশ ও সমাজে তেমন একটা প্রশংসিত হচ্ছে না রাজনৈতিক দলগুলোর মিথ্যাচারের ফলে।

তাই দেশে এক শ্রেণীর লম্পট এবং লুটেরা শাসকশ্রেণী গড়ে উঠেছে। তারা উৎপাদন করে না, বরং উৎপাদনকারী কৃষক, শ্রমিক এমনকি উদ্যোক্তাদের উৎপাদনে তারা ভাগ বসায় এবং ভোগবিলাসের জীবনযাপন করে। তাদের ক্ষমতার উৎস গণমানুষের ইচ্ছা বা আকাক্সক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়। শীর্ষ নেতানেত্রীর সেবা এবং তোষামোদ তাদের কাজ। বিনিময়ে পায় বিত্তবান ও ক্ষমতাবান হওয়ার সুযোগ। নূন্যতম নীতি-আদর্শ, ত্যাগ-তিতিক্ষা কিংবা দেশ ও গণমানুষের প্রতি ভালবাসার স্থান তাদের জীবনে থাকে না। রাষ্ট্রনায়ক তারাই যারা রাজনীতিকে গণমানুষের প্রতি একটি পবিত্র দায়িত্ব বলে চিন্তা করেন। তারা ধারণ ও লালন করেন আদর্শ। দেশ ও জাতির ভাগ্য এবং ভবিষ্যৎ তাদের অর্থাৎ ক্ষমতাসীন নিস্বার্থ সরকারের নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং দূরদর্শিতার উপর নির্ভরশীল। রাজনীতি সেরা নীতি। এর ব্যত্যয় ঘটলে দল বা দলীয় নেতারা দেশব্যাপী শুধু ধিকৃত হন না, তাদের রাজনীতির অপমৃত্যু ঘটে এবং ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হয়, এটা বাংলার গণমানুষ বার বার প্রমাণ করেছে কিন্তু রাজনীতিকদের অভ্যাস পাল্টায়নি।

গণতন্ত্রে রাজনীতিকদের কিংবা রাজনৈতিক দলের চাওয়া নয়, গণমানুষের চাওয়াই সব। গণমানুষ চাইলে দেশ শাসনের ভার নেয়া যেতে পারে। প্রত্যাখ্যান করলে অবশ্যই সরে যেতে হবে। যে কোন মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসিকতা বা ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে গণতন্ত্র, দেশ কিংবা জাতি কোনটির জন্য শুভ নয়। তাই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের সরকার গঠনের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ ও সরকার পরিচালনায় সহায়তা দেয়া গণপ্রতিনিধিদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। বর্তমানে দেশে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের নেতানেত্রীদের যেকোন উপায়ে ক্ষমতা দখলের যে বেপোরোয়া মনোভাব এবং প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে তাতে তাদের গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার নগ্ন লোভ ও উগ্র স্বৈরাচারী মন-মানসিকতার পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবসার মূলে যেহেতু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসিন হতে হয় তাই সে নির্বাচনে সর্বপ্রকার ছলচাতুরি, কারচুপি, সন্ত্রাসী কর্মকা- এবং ক্ষমতা অপব্যবহারে আমাদের দেশের বড়ো রাজনৈতিক দলগুলো এবং নেতাদের সবসময় বেপরোয়া হয়ে উঠতে দেখা যায়।

গণমানুষ জানেন আন্দোলন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার ধারাবাহিকতায় দেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও তাদের শাসন এত দীর্ঘায়িত  হোক তা কেউ চায়নি। গণমানুষ স্বীকার করেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তত্ত্বাবধানে জাতি একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ নির্বাচন পেয়েছে। আজকে বিএনপি ও তাদের নেত্রী বেগম জিয়াকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, বর্তমান  আওয়ামী লীগের মহাজোট সরকার আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ষড়যন্ত্রের ফসল, তখন রাজনীতিক ও বাংলাদেশের তথাকথিত গণতান্ত্রিক চেহারাটা ফুটে ওঠে। রাজনীতিকদের গণতন্ত্রের পোষাকটা খসে পড়ে যায়।

বিরোধীদলগুলো অনবরত বিগত নির্বাচনকে ভুয়া এবং ষড়যন্ত্রমূলক বলে আখ্যায়িত করে যাচ্ছেন। গণতন্ত্র চর্চার নামে ক্ষমতা লোভে নির্বাচনী খেলায় তারা মেতে ওঠেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সত্যিকার সম্মতি নিয়ে দেশ শাসনে তারা ক্ষমতায় আসতে না পারলে ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার উল্লাসে একটি সত্যিকার নির্বাচনকে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করতে একটুও বিবেকে বাধে না। বিগত নির্বাচন শুধু দেশের গণমানুষের কাছে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও নন্দিত হয়েছে। কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের কাছে হয়নি।

বিশ্বে গণতান্ত্রিক নেতাদের জীবনাচারে গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। গণতন্ত্রে বিলাস বাহুল্য নেই, রাজকীয় চালচলন নেই, অসংখ্য তোষামোদকারী পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা নেই। নেই চিত্র তারকার মতো উজ্জল ফিনফিনে সাজে সজ্জিত হওয়া। সুদূর ব্রিটেনে বা আমাদের প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকালেই গণতান্ত্রিক মানসিকতার বেশ কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জীবনাচার অতিশয় সাদাসিদে। জীবনযাপন একজন শিক্ষিত সাধারণ ভারতীয় নাগরিকেরই মতো। সততা, দক্ষতা, জনসেবা এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতা ও মূল্যবোধের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের সেরা আস্থাভাজন রাজনীতিবিদের স্বীকৃতি পেয়েছেন। বর্তমানে ভারতে রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেশের জনগণ তাকেই সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন, নির্লোভ এবং জনহিতৈষী বলে মনে করছেন।

গণতন্ত্র উন্নয়নের মানদন্ডে ভারত অতুলনীয় নয়, তবে আমাদের দেশের জন্য অনুকরণযোগ্য। গণতন্ত্র চর্চায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারত আজ সারাবিশ্বে সম্মানজনক আসন লাভ করেছে। পৃথিবীর ৪টি এবং এশিয়ার ২টি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে ভারত এখন একটি। একই সঙ্গে স্বাধীনতা লাভকারী পাকিস্তান গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মাপকাঠিতে এখন কোন অবস্থানে আছে তা বিশ্ববাসীর অজানা নয়। সামরিক শাসকদের বুটের তলায় পিষ্ট হয়ে পাকিস্তান তার স্বাধীনতার অর্ধেক জীবন কাটিয়েছে। কিছু দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধান শত্রু ভারত নয়, সন্ত্রাস।

ধর্মকে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটির মূলেই নিহিত গণতন্ত্রহীনতা এবং সামরিক স্বৈরাচারের বীজ। রাজনীতিতে ধর্মের প্রাধান্যই পাকিস্তানে ধর্মীয় জঙ্গিদের জন্ম দিচ্ছে। পাকিস্তানের ১১ হাজার মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর ৪-৫ লাখ ছাত্র বের হয়। তাদের বিরাট সংখ্যক জঙ্গিতে পরিণত হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রতাকে হাতিয়ার করে। পাকিস্তান জেহাদি সংস্কৃতির জনক এবং নায়ক। ধর্মান্ধ এবং জঙ্গিবাদিদের দমনে ইদানিং পাকিস্তান এত ব্যস্ত যে, তার সম্পদ এবং শক্তি এখন ঘরশত্রু ঠেকাতেই নিঃশেষিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও কিছু রাজনীতিক আছেন যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানি আদলে পরিচালিত করতে চান এবং কথায় কথায় বিদেশী প্রভুর তাঁবেদারির সরকার, আধিপত্যবাদী শক্তি, জাতীয় শব্দ মিথ্যাচারের ভাষণে ব্যবহার করেন। ভারত-বিরোধিতার সস্তা রাজনীতি বর্তমানে দেশের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনছে না এবং গণমানুষ ওই টোপ আর গিলছে না। জাতির কাছে স্পষ্ট হয়ে  উঠেছে সুবৃহৎ গণতান্ত্রিক প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরিতার সৃষ্টি উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে আর কিছু করতে পারে না।

দেখে শেখার আগ্রহ আমাদের রাজনীতি ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের নেই। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেমন দুর্বল তেমনি অভিজ্ঞতার শিক্ষাও নেই বললেই চলে। তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে মিথ্যাচার, দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস। ব্যতিক্রমীরা সংখ্যায় খুবই স্বল্প। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য তাই দরকার রাজনীতিক থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোতে তদবিরবাজ, তোষামোদকারী, সন্ত্রাসী এবং দুর্নীতিবাজদের স্থান আছে কিন্তু জ্ঞানী ও গুণীকে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। তাই সৎ এবং দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ গড়ে উঠছে না। বিশেষ করে শীর্ষ নেতৃত্বে ও সরকার গঠনে রাজনীতিবিদ ব্যক্তিত্বের দরকার খুব বেশি। যাতে তারা রাষ্ট্রনায়কের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হন। দেশ রাজনীতিক চায় না- চায় রাজনীতিবিদ, এটাই সময়ের  দাবী।