সত্য যে কঠিন কঠিনেরে ভালোবাসিলাম

সংলাপ ॥ রবীন্দ্র-মানবতাবাদ আসন নিয়ে ছিল ভাববাদের ওপর। ইউরোপীয় রেনেসাঁয় জাগরিত রবীন্দ্রনাথ ‘নানা রবীন্দ্রনাথের’ জন্ম দিয়েছেন কিন্তু সাধারণের রবীন্দ্রনাথ কি তিনি হতে পেরেছেন?


‘পঁচিশে বৈশাখ চলেছে

জন্মদিনের ধারাকে বহন করে

মৃত্যুদিনের দিকে।

সেই চলতি আসনের উপর বসে

কোন ভাবুক গাঁথছে

জন্মমৃত্যুর সীমানায়

নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণে রাখতে হয় রবীন্দ্রনাথের নানামুখী সৃষ্টি কর্মে গাঁথা একখানা কালোত্তর বৃহত্তর রবীন্দ্রনাথের জন্যেই। সাহিত্যের সৃজনশীল ধারায় নিজের একক অবস্থানকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তিনি। নিজের কালের এবং পাঠকের কালে তাঁর ব্যাপ্তি এতোটাই প্রসারিত যে রবীরশ্মির জাজ্জ্বল্যমানতা এখনো অক্ষুন্ন।

সাহিত্যে শিল্পমানের বিচারে রবীন্দ্রনাথ অপ্রতিদ্বন্দ্বী নিঃসন্দেহে। বাংলা সাহিত্যের গলিপথ থেকে রাজপথ তাঁর হাতেই পেয়েছে উৎকর্ষতা। সদ্য প্রসূত বাংলা গদ্য যখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলতে শুরু করেছে, প্রবেশ করছে সাহিত্যের নানা ধারায়, তখন রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল প্রতিভালোকে বাংলা গদ্য পেল নতুন প্রাণরস, পল্লবিত হলো যৌবন রাগে। পদ্যকেও তিনি প্রসারিত করলেন তাঁর আদর্শিক স্রোতধারায়। তাঁর শিল্প কর্মের কাছে সমালোচকের তলোয়ার ‘কুর্নিশ’ করলেও, কর্মের পেছনে যে এক ও অভিন্ন ভাবাদর্শ কাজ করেছে, তা নিয়ে বিতর্কের কাটাকুটি বিস্তর। বোধ করি, বাংলা সাহিত্যে একমাত্র তিনিই এই সৌভাগ্যের অধিকারী যাঁর জীবন ও কর্মের ভুবনে ভীড় করেছে ও করছে অসংখ্য সমালোচক ছুরি, কাঁচি, মোমবাতি ও ফুল হাতে।

যে কালের হাতে নির্মিত হয় যে মনন বা সত্তা, সেই কালকে সেই মনন বা সত্তা কতটুকুইবা অতিক্রম করতে পারে? রাবীন্দ্রিক বিতর্কটা সেখানেই। অভিযোগ আছে এবং সত্যও যে, রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিটি শিল্প কর্মের ধারায় অবগাহন করতে করতে এক সময় ‘একমাত্র সত্য’কে আঁকড়ে ধরেছেন। আত্মার সাধনাতেই হয়েছেন তিনি মশগুল নিরন্তর। এ জন্যে বাস্তবতার সুকঠিন পথে লব্ধ অভিব্যক্তিকে তিনি সেই সত্যময় জ্যোতির্ময় সত্তার স্বার্থেই অবলীলায় পরিহার করেছেন। আর্থ-সামাজিক জীবনের কোন প্রকার আবিলতায় তিনি তাকে কলুষিত হতে দেননি। এখানে তাঁর আত্মমগ্ন এক অটল ধ্যানী ব্যক্তিত্বের পরিচয় বিভাসিত হয়। এ জন্যেই তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয় – ‘সত্য যে কঠিন কঠিনেরে ভালবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা, অমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন, সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে’। সত্যের উপাসক রবীন্দ্রনাথ জানতেন যে, কর্মে ও কথায় ঐক্যতা এলেই সত্যের সাথে আত্মীয়তা হয়। এই বোধ থেকেই তিনি ব্যক্ত করেছিলেন –

‘সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের

খ্যাতি করা চুরি

ভালো নয়, ভালো নয় নকল

সে সৌখিন মজদুরি’।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজেই কি এই ‘সৌখিনতার’ ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন? তাঁর সামাজিক অবস্থান কি তাঁকে কখনোই প্রভুত্বের আসন থেকে নেমে এসে মাটির সাধারণ মানুষের সাথে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে দিয়েছে?

‘এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক’ – পরিচয়ে তিনি পরিচিত হতে চেয়েছেন, কিন্তু পারেননি। ত্রিশোত্তর কালের রবীন্দ্রনাথের এই চাওয়া বাস্তবে রূপ দিতে দেয়নি, তাঁর ভিতরে অবস্থিত সোহংবাদী ও সামন্তবাদী রবীন্দ্রনাথ।

তাই বৈশ্বিক চেতনায় রবীন্দ্রনাথ যতটা উদ্ভাসিত ও প্রতিষ্ঠিত, ঠিক ততটাই ব্যর্থ তাঁর মাঝে অন্য এক বিপ্লবী শিশু রবীন্দ্রনাথকে বিজয়মাল্যে বরণ করে নিতে। আসলে রবীন্দ্র-মানবতাবাদ আসন করে নিয়ে ছিল ভাববাদের ওপর। ইউরোপীয় রেনেসাঁয় জাগরিত রবীন্দ্রনাথ ‘নানা রবীন্দ্রনাথের’ জন্ম দিয়েছেন কিন্তু সাধারণের রবীন্দ্রনাথ কি তিনি হতে পেরেছেন! মানুষের সাধারণ সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, দৈন্যতা, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সমস্যা সব কিছুই তিনি চিত্রিত করেছেন, কিন্তু সে চিত্রায়নে কোন স্বাধীনতা ছিল না। বার বার ভাববাদীতার পরাধীনতায় তা আটকা পড়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ে তিনি সে স্বীকারোক্তিও করেছেন যে তিনি সামন্ত-বুর্জোয়া মানসিকতা বর্জনে ব্যর্থ। এই স্বীকারোক্তি তাঁর মাহাত্ম্যকেই প্রকাশ করেছে কি? তাঁর ‘ঔপনিষদিক-মন্ত্রপূত সাহিত্য’ তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কি সহায়তা প্রদান করেনি? কবি মনন ও কর্ম প্রক্রিয়ায় যে দ্বান্দ্বিকতার চেনা জগতে তিনি বিচরণ করেছেন, তা তিনি কোন্ সত্যের শক্তিতে করেছেন? আসলে তাঁর ছিল একটি নিজস্ব দর্শন, যা তাঁকে তাঁর আভিজাত্যতাকে প্রকাশিত করেছে অনন্য মাত্রায়।

শরৎচন্দ্রের ভাষায় বলা যায়, ‘সার্বভৌম কবি’ তিনি। কিন্তু কতটুকু বাঙালি? বাঙালির আপনজন তিনি। বাঙালির গৌরব। এখনো পর্যন্ত তিনিই একমাত্র বাংলা সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী। পৃথিবীতে একমাত্র তিনিই দু’দেশের জাতীয়সঙ্গীতের রচয়িতা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান যে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল তা কখনোই অস্বীকার করবার নয়। তাঁর নিকট আমাদের দায়বদ্ধতা এবং তার স্বীকারোক্তি আমাদের চেতনাকেই করবে সত্য-সুন্দর। সমালোচকের দৃষ্টিতে ‘নানা রবীন্দ্রনাথ’ নানাভাবে মূর্ত হয়ে উঠবেন, হবেন বিতর্কিত। এটা সাহিত্যের ধারায় চলবে অনিবার্যভাবেই। কিন্তু আমাদের মত সাধারণ পাঠকের কাছে তাঁর সাহিত্য আর কতকাল আনন্দের খোরাক হয়ে থাকবে? ‘ভাষার ভঙ্গির জীবন দৃষ্টির জীবন-পদ্ধতির পরিবর্তনের ফলে রবীন্দ্র সাহিত্যও ভবিষ্যতে সুখপাঠ্য থাকবে না’ – ড. আহমদ শরীফের এই যুক্তিবাদী সূত্র কি একদিন সত্য হবে??