সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য – ৯

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ বলেন ‘নির্দেশে কাজ করলে ১০০ পার্সেন্ট আউটপুট আনাই কঠিন, আর নিজের উপলব্ধি থেকে কাজ করলে ২০০ পার্সেন্টও আউট পুট আনা সম্ভব’।

সত্য প্রতিষ্ঠায় সত্যমানুষ প্রয়োজন। সত্য প্রতিষ্ঠায় সত্যমানুষের সাহায্য প্রয়োজন। স্বেচ্ছাশ্রম হলো সম্পূর্ণরূপে প্রত্যশামুক্ত, মানবতাবোধে অনুপ্রাণিত শ্রম। একটি প্রত্যাশা মানুষের অবশ্যই থাকবে আর তা হলো সত্যকে পাওয়া, সত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তবে তা নিয়ে ভাবতে হয়না, সত্য প্রতিষ্ঠার পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়না। সত্যের প্রতি ব্যাকুলতাই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। ব্যাকুলতাই আনে আলো, পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে এক অনন্ত আলোর পথে। সেখানে ‘না’ থাকে না, ‘কেন’ থাকে না, ‘যুক্তি’ থাকে না, ‘তর্ক’ থাকে না। নদী যখন সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয় সকল পানির উৎসগুলে এসে মিশে যায় সেখানে। সত্যমানুষের আবির্ভাব যেখানে হয়, মানবজাতির ঢল নামে সেখানে। কোন বাধায় সে ঢল থামেনা।

মানবজাতির শুরু থেকেই সত্যমানুষগন কাজ করে গেছেন সত্য প্রতিষ্টার জন্য স্থান-কাল-পাত্রের বাস্তবতায়। যখনই মানবজাতি বিপদে পড়েছে সত্যমানুষগন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানুষ তাঁদের ছায়ায় আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে সর্বকালে। তাঁরা মানবসমাজে বিশ্বস্ত বলে পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁদের উপদেশে মানুষ উপকৃত হয়েছে। তাঁরাই শিখিয়েছেন এটা তোমাদের জন্য লাভ, এটা তোমাদের জন্য ক্ষতি। লাভ-ক্ষতি, উপকার-অপকার, শান্তি-অশান্তি এ সমস্ত দিয়ে পার্থক্য করা গেছে আপাতত সত্য-মিথ্যাগুলো। তারা হলেন সময়ের অবতার বা যুগাবতার।

কোন পশুর জন্য পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়নি। সর্বকালে সর্বসমাজে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়েছে। বস্তুবিজ্ঞানের উন্নতিতে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে। আবার মানুষেরই হাতে বহু মানবসভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বস্তুবিজ্ঞানের উন্নতিতে মানুষের জীবন সুবিধাজনক হয়েছে-আধ্যাত্মবিজ্ঞান শিখিয়েছে কিভাবে তা ব্যবহার করতে হয়। ব্যাপকহারে মানবসমাজ কখনও আধ্যাত্মবিজ্ঞান গ্রহন করেনি। কাজেই দুটো বিজ্ঞানের সমন্বয়ের অভাবে মানবসমাজে সংঘাত, অনাচার অনিবার্য হয়ে উঠেছে, মানুষ দ্বারাই মানুষ নির্যাতিত হয়েছে সর্বকালে। তখন সত্যমানুষগনই তাদের পাশে দাড়িয়েছেন। তাদের ব্যাথায় ব্যাথিত হয়েছেন। সমস্যার সমাধানে পথ খুঁজেছেন। সত্যমানুষদের চিন্তারজগৎ থেকেই বেরিয়ে এসেছে সমস্যার কারণ ও সমাধান। নিজেদের জীবনে পরীক্ষা করেই এগিয়েছেন, তাঁরা নিজেকে চিনে নিজের প্রভুকে চিনেছেন। নিজে সত্য হয়ে সত্যের পথে মানুষকে টেনেছেন। তাঁরাও নির্যাতিত হয়েছেন মানবসমাজ কর্তৃক। অনেক সময় মৃত্যুবরণও করতে হয়েছে তাঁদেরকে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের সাথে সংগ্রামের ইতিহাসই মানবসভ্যতার ইতিহাস। আজও সচেতন সত্তা সত্যমানুষরা বসে নেই। তাঁদের কাজ তাঁরা করে যাচ্ছেন সর্ব অবস্থার মধ্য দিয়ে। কখনও প্রকাশ্যে কখনও গোপনে। আজকের পৃথিবী আরও কঠিন এক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বেশীরভাগ মানুষই সেই সম্পর্কে উদাসীন। আজও চলছে সারাবিশ^ ব্যাপী সম্পদ কুক্ষিগত করার, সম্পদের পাহাড় গড়ার, সম্পদের উপর কর্তৃত্ব সৃষ্টি করার, আধিপত্য বিস্তার করার বুদ্ধিবৃত্তিক কারসারজি। তার উপর শুরু হয়েছে বস্তুবিজ্ঞানের চাকচিক্যের নেশা ও সাইবার যুদ্ধ। আধ্যাত্মিক সাধকদের ঘুম হারাম। তাঁদের চুপ করে বসে থাকার সময় নেই। জ্ঞানীদের, ধার্মিকদেরও এখন মাঠে নামতে হবে। ধর্ম ও দারিদ্রকে পুজি করে একশ্রেনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা পৃথিবী। আধ্যাত্মবিজ্ঞান এর পাশাপাশিও এর উপর দিয়ে না যেতে পারলে কঠিন এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে পৃথিবী। তাই আজকের সত্যমানুষদের আহবান ও প্রচেষ্টা, সত্যমানুষ হওয়ার ও সত্যমানুষ বানানোর। একশ্রেনীর মানুষ ধর্ম ও দরিদ্রের নামে অশান্ত করে তুলছে সারা পৃথিবী। বিশেষ করে অনুন্নত বিশে^র মানুষের মস্তিস্ককে বিভ্রান্ত করে তুলছে। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে ব্যস্ত তারা। মানুষ আজ দিশেহারা হয়ে ছুটছে ভোগবাদের দিকে। শান্তি খুঁজছে পার্থিব বিত্তের মধ্যে-যার চুড়ান্ত পরিণতি দূর্ভোগ এবং অশান্তি। আজ অনিবার্য হয়ে উঠছে সচেতন মানুষদের একত্রিত হওয়ার, সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজার। বিভ্রান্ত মানবজাতিকে পথের দিশা দেয়ার। আধ্যাত্মিক ও জাগতিক রাজত্বের সমন্বয় ছাড়া তা অসম্ভব। আজ আর গাছতলায় বসে সাধনা করার অবকাশ নেই। সমাজে বাস করেই মানুষকে পথের দিশা দিতে হবে। তাই হাক্কানী সাধকগন হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে দিয়ে যাচ্ছেন সাধনার আধুনিক পথ ও পদ্ধতি নিজেদের জীবনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই। যাহা নিজেদের জীবনে পরীক্ষিত তাহাই ‘হাক্কানী থট’ হিসাবে এসেছে। আজ কোন পুরোনো পদ্ধতি নয়। পুরোনো পদ্ধতিতে পৃথিবী জর্জরিত, ভারাক্রান্ত। আজ সত্যমানুষদের সান্নিধ্যে এসেই নিজেদের জীবনে পরীক্ষা করে করেই বাস্তবতার নিরীখে পথ চলে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়া সম্ভব। শান্তি সবসময় বর্তমান ও বাস্তব। যুগের জন্য যুগের, সময়ের জন্য সময়ের সাধক প্রয়োজন। অতীত হয়ে গেলেই মানবসমাজ আবার বিভ্রান্তিতে পতিত হয়। দল মতে বিভক্ত হয়ে যায়। সত্যমানুষগন সত্য, তাই তাঁরা ভালো করেই জানেন সত্য কি এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য।

সাধকগন এক পর্যায়ে নিজের মধ্যেই চূড়ান্ত সত্যে উপনীত হন, তার পর দুটো সত্যের মধ্যে সমন্বয় করে চলেন-ভিতর বাহির, জাগতিক ও শাশ্বত। মানুষ সৃষ্টির মূল লক্ষ্যই হলো সেই চূড়ান্ত সত্যে উপনীত হওয়া। বিভিন্ন ধর্মে, বিভিন্ন ভাষায় সত্যমানুষদের বিভিন্ন নামকরন করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে তাঁরা সূফী নামে পরিচিত। সূফী সত্যমানুষ, তাঁরা যে তত্ত্ব দেন, যে মূলনীতির উপর ভিত্তি করে চলেন, মানুষকে পথের দিশা দেন তাহা সূফীতত্ত্ব। এককথায় সূফীতত্ত্ব সত্যমানুষদের সৌন্দর্যের সমাহার।

মানবজাতি একটি প্রজাতি। তাদের ধর্মও এক, আর তাহলো মানবতা। সত্যমানুষগন পৃথিবীতে শুরু থেকে একই ধর্ম প্রচার করেছেন তা হলো মানবতা। শুধু স্থান-কাল-পাত্র ভেদে আনুষ্ঠানিকতায় পার্থক্য ছিলো। আজও মানবসমাজে বাহ্যিক ধর্মাচরণে সেই পার্থক্য বিরাজমান। সত্যমানুষের তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানবসমাজে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে সর্বকালে, সেই ধারা এখনও চলছে। সেই বিভাজন অজ্ঞতার, সীমাবদ্ধতার, মতলবের বিভাজন। সত্যমানুষগন তাদের সত্যের জোরে, প্রেমের জোরে, মানবতার জোরে, জ্ঞানের জোরে বাঘে মহিষে একঘাটে জল খাইয়েছেন। সত্যের এমনই গুন, সত্যের এমনই শক্তি, সত্যের এমনই মহিমা। সত্যমানুষদের পরিচয় যে যেভাবেই দিক না কেন, সত্য সত্যই। সত্যের আবির্ভাবে মিথ্যা বিদূরিত হয়। ফুল যেখানেই ফুটুক না কেন, পাহাড়ে-পর্বতে, যত দূর্গম স্থানেই হোক, কীট-পতঙ্গ, ভ্রমর-মৌমাছি সেখানে যাবেই মধূ আহরন করতে। তেমনি সত্যমানুষের আবির্ভাব যেখানেই হোক, মানবজাতির সমাবেশ সেখানে হবেই হবে। শারীরিকভাবে চলে যাওয়ার পরও তাই তাঁদের রওজায় মানুষের ঢল নামে এবং উত্তরোত্তর তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে ঢল কেউ থামাতে পারেনি কোনদিন পারবেও না। কারন তাঁরা মৃত নয় জীবিত, জাগ্রত।

মানুষের কাঙ্খিত লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি, কিন্তু সত্য ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। তার জন্য একজন সত্যমানুষকেতো জীবনের লক্ষ্য হিসাবে নিতে হবে। সত্যের সাথে একাত্মতাই একমাত্র কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন হয় কঠিন সাধনার। দর্শন ও উপলব্ধিতে হয় সত্য। সত্যব্রতীরা সত্যমানুষকুলের সত্য ধারণ-লালন-পালন এর পথ ধরে চলেন। উপলব্ধি অর্থাৎ প্রাপ্তির সৌন্দর্য পর্যবেক্ষন ও অনুভবের মাধ্যমে বাস্তবতার নিরীখে জীবন চলার পথ অবলোকন করলেই সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। সত্য গোপন, আপেক্ষিক, অর্ধসত্য এবং পরমসত্যরূপে মানুষ প্রজাতির মধ্যে বিরাজমান। সত্য আপেক্ষিকতা এবং অর্ধসত্যের মধ্য দিয়ে পরমসত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য বাস্তবতাকে প্রাধান্য দেয়। লক্ষ্যকেন্দ্রিক চলার পথে যাহা নিত্য তাহাই সত্য। সত্যের সাথে একাত্মতাই একমাত্র সত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে। আর কোন পথ নেই। তাঁর দ্বারাই হতে পারে সত্য প্রতিষ্ঠার কাজ। কারণ সত্যে প্রেম আছে। ব্যাকুলতা আছে। মানবতা আছে।